সৃজিতা
আজ সাতসকালে ঘুম ভেঙ্গে গেছে ঝিল্লীর| অন্যদিন আটটায় ঘুম থেকে উঠে সোজা অফিসের জন্যে রেডি হয়ে যায়| কিন্তু কাল সারারাত ঘুম হয়নি‚ ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে গেছিল| তাও ছ্'টার পরেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে| চিন্তার কারণ একটাই‚ আজ বসের সাথে লাঞ্চ করতে যাবে| ঝিল্লী যে অফিসে চাকরী করে সেই অফিসের দুটো ব্রাঞ্চ এশহরে আছে| একটা ব্রাঞ্চ কোম্পানীর মালিক সামলায়‚ অন্যটা মালিকের কোন এক আত্মীয় দেখাশোনা করে| ঝিল্লী এই দ্বিতীয় ব্রাঞ্চে পোস্টিং আছে| কোম্পানির মালিক‚ লোকটা খারাপ না| কিন্তু ওনার যে আত্মীয় মানে ঝিল্লীর অফিসের বস‚ তার থেকে সবাই একটু দূরে দূরেই থাকতে চায়| আজ সেই বস সন্দীপণ ঘোষ ঝিল্লীকে লাঞ্চে ইনভাইট করেছে| প্রথমে অবশ্য ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল| ঝিল্লী নানা অছিলায় কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল| কিন্তু শেষ অবধি লাঞ্চ করতে রাজী হতে হয়েছে ঝিল্লীকে| রাজী না হয়ে উপায় ছিল না ঝিল্লীর| বস বলে কথা‚ আবার সামনে প্রোমোশনের সুযোগ আছে| বসের পার্সোনাল আসিস্টেন্ট মোনা এই কোম্পানীর জব ছেড়ে অন্য কোম্পানীতে জয়েন করেছে| সেই পোস্ট খালি আছে| এছাড়া মালিক যে ব্রাঞ্চে আছে সেখানেও একটা পোস্ট খালি আছে| যেকোন একটা পোস্টে জয়েন করলেই মাইনে অনেকটা বেড়ে যাবে| ঝিল্লীর যদিও বসের আসিস্টেন্ট হবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই| কিন্তু এই বস সহজে পিছু ছাড়বে না| মোনার মতো মেয়েরা চাকরীতে উন্নতি করার জন্য অনেক কিছু করতে পারে| মোনার সাথে সন্দীপণ স্যারের সম্পর্ক অফিসে চর্চার বিষয় ছিল| ঝিল্লী সেরকম মেয়ে নয়| কিন্তু মোনা চলে যাবার পর এখন ওর ওপর বসের নজর পড়েছে| কাজের অছিলায় প্রায়ই নিজের রুমে ডেকে পাঠায়| তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে| ঝিল্লীর খুব অস্বস্তি হয়| কিন্তু কিছু বলতে পারেনা| দুদিন আগে বস নিজের রুমে ঝিল্লীকে ডেকে পাঠালো| তারপর--- ----কাল ইভনিং এ তুমি ফ্রী আছো তো? ----হ্যাঁ‚ মানে কেন স্যার? ----তাহলে অফিসের পর একসাথে ডিনার করা যায়| ----না‚ মানে স্যার কাল তো হবে না| ----কেন‚ কি প্রবলেম?! -----আসলে মা'র শরীরটা কদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না| কাল মাকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাব| ----ও‚ তাহলে পরশু? ----পরশু‚ না পরশু তো হবে না| সে দিন তো বিকেলে আপনার মিটিং আছে| ----ওহ‚ আমি তো ভুলেই গেছিলাম| তুমি কত খেয়াল রাখ| ভেরি গুড| তো দুপুরে তো আমরা যেতেই পারি| এই ১২টা নাগাদ| ---কিন্তু স্যার ঐ টাইমে অফিস থেকে বেরোনো যাবে? ----ওহ‚ একসাথে বেরোনো ঠিক হবে না| ঠিক আছে সে দিন তোমাকে অফিসে আসতে হবে না| অফিসের গাড়ি ঠিক টাইমে তোমাকে নিতে চলে যাবে| তোমাকে নিয়ে সোজা রেস্টুরেন্টে চলে যাবে| তুমি তৈরী থেকো| -----ওকে স্যার| আর কথা না বাড়িয়ে ঝিল্লী রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছিল| সেদিন থেকে ঝিল্লীর রাতের ঘুম উড়ে গেছে| একা পেয়ে ব্স তার সাথে কি করবে‚ সেই ভেবেই ওর খিদে-তৃষ্ঞা সব চলে গেছে| ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানাতেই চুপচাপ শুয়ে ছিল ঝিল্লী| মা এসে ওকে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়---- ----কিরে‚ এখনও শুয়ে আছিস?! -----শরীরটা ভালো লাগছে না| -----কি হ্'ল আবার? জ্বর এল নাকি? -----না তেমন কিছু নয়| আজ আর অফিসে যাব না| -----সে না যাস‚ না যাবি| আজ একটু রেস্ট নে| চা খাবি তো? টেবিলে আয়| মা চলে গেল| যাক কিছু বুঝতে পারেনি| ঝিল্লী উঠে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল| চা খাবার পর‚ বিস্কুটের কৌটো নিয়ে ঘরে চলে এল| মাকে বলল খিদে পেলে বিস্কুট খাবে| অন্য আর কিছু খাবে না| সময় এগিয়ে চলেছে| ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে| না এবার রেডি হতে হবে| ঝিল্লী রেডি হয়ে নেয়| সন্দীপণ ঘোষ লোকটা খুব ফিটফাট থাকতে পছন্দ করেন| যে কোনো জিনিষই দামী ব্র্যান্ডের প্রডাক্ট ব্যবহার করেন| অফিসের স্টাফেদেরও সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছ্ন্ন দেখতে চান| রেডি হয়ে ঝিল্লী ঘর থেকে বের হ্'ল| সামনেই মা‚ -----কিরে আবার কোথায় চললি?! -----অফিস থেকে ফোন এসেছিল| একবার যেতেই হবে| -----একটা দিনও ছুটি দিতে পারে না! তাড়াতাড়ি ফিরো| একে শরীর ভালো নেই| তবু যেতেই হবে| মা গজগজ করতে থাকে| ঝিল্লী বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরে| গলি থেকে বেড়িয়ে মোড়ের মাথায় আসে| অন্যদিন এখান থেকেই বাসে ওঠে| আজ আরও এগিয়ে সামনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায়| এখান থেকেই গাড়িতে উঠবে| দূর থেকে বসের গাড়ী দেখা যায়| গাড়ী এলে ঝিল্লী গাড়ীতে উঠে পড়ে| হোটেলের সামনে গাড়ী এসে থামে| গাড়ী থেকে নেমে ড্রাইভার ওকে হোটেলের নির্দিষ্ট রুমের সামনে পৌঁছে দেয়| যা আন্দাজ করেছিল তাই| রুম বুক করা হয়েছে| যা হবে বন্ধ ঘরের মধ্যে| ঝিল্লী রুমে নক করে| বস দরজা খুলে দেয়| একটা স্মাইল দিয়ে ঝিল্লী ঘরে ঢোকে| সুসজ্জিত বেডরুম| বেডের সামনে সোফা| সোফার সামনে টেবিলে অনেক রকম খাবার| হালকা সুরে মিউজিক বাজছে| একেবারে পরিপূর্ণ আয়োজন| ------আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো? -----না স্যার| ------ওকে| এই স্যার বলাটা তুমি ছাড়ো তো‚ অফিসে বাইরে নো স্যার| ওনলি সন্দীপণ| এবার বসো| ঝিল্লী সোফায় বসে পড়ে| বস এসে ওর পাশে বসে| প্লেটে খাবার তোলে| ------নাও শুরু করো| ------আপনি আগে শুরু করুন| -------না‚ আজকে তোমার দিন‚ তাই তোমাকে দিয়ে শুরু হোক| ঝিল্লী ইতস্তত করতে থাকে| খাবার ইচ্ছা হলেও খেতে পারেনা| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| একটা হাত ঝিল্লীর কাঁধের পেছনে সোফায় রাখে| ------কি হ্'ল খাও| ঝিল্লী চোখে চোখ রাখে| সন্দীপণ আরও কাছে সরে আসে| ঝিল্লীর নি:শ্বাস সন্দীপণের মুখে পড়ে| একটু দূরে সরে যায় সন্দীপণ| কিছু অস্বস্তি বোধ করে| তারপর একটু হেসে আবার কাছে সরে আসে| কাঁধে মাথা রেখে সঙ্গে সঙ্গেই সরিয়ে নেয়| পাশ থেকে উঠে গিয়ে সামনের চেয়ারে গিয়ে বসে| -----আমার মিটিং এর দেরী হয়ে যাচ্ছে| আমি এখনি বেড়িয়ে যাব| ------সেকি‚আপনি তো কিছুই খেলেন না| আর মিটিং তো.চারটেয়| -------না টাইম এগিয়ে গেছে| দুটোর মধ্যে আমাকে পৌঁছাতে হবে| তুমি খেয়ে নিয়ে চলে যেও| ------আমি কিসে যাব? গাড়ী তো আপনি নিয়ে চলে যাচ্ছেন| ------ঠিক আছে| আমাকে পৌঁছে দিয়ে তোমাকে নিতে আসবে| ------ওকে স্যার| বস তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে গেল| ঝিল্লী ওয়েটারকে ডেকে খাবার গুলো প্যাক করে দিতে বলল| খাবারের বিশাল প্যাকেট নিয়ে ঝিল্লী বাড়ী ফিরল| মা দেখে অবাক| -----কিরে‚ এসব কি?! -----খাবার| অফিস থেকে দিল| আমি নিয়ে চলে এসেছি| ------আমার তো রান্না হয়ে গেল| -------ফ্রিজে রেখে দাও‚ রাতে খাব| এখন এগুলো মাইক্রো ওভেনে গরম করে দাও| আমি স্নান করেই আসছি| খুব খিদে পেয়েছে| প্যাকেটটা মায়ের হাতে দিয়ে ঝিল্লী ঘরে এসে জামা-কাপড় নিয়ে তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে গেল| সকালে থেকে শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে আছে| ব্রাশ না করে ও অন্য কিছু খেতে পারেনা| | এদিকে কাল রাতে স্যালাডে বেশী করে পিঁয়াজ খেয়েছে| নি:শ্বাসের গন্ধে টের পাওয়া যাচ্ছে| তাছাড়া সকালে স্নানও করেনি| জামাটাও কাচতে হবে‚ এই নিয়ে তিনদিন ধরে পড়া হ্'ল| কাল বাড়ী ফেরার সময় বাসে এত ভিড় ছিল‚ খুব ঘেমে গেছিল ঝিল্লী| বাড়ী ফিরে জামাটা গুটিয়ে রেখে দিয়েছিল কাচবে বলে| আজ সেটাকেই তুলে পড়ে নিয়েছে| গুটিয়ে রাখার জন্যে ঘামের গন্ধটা জামায় বসে গেছে| আর ঝিল্লী কোন বডিস্প্রে ব্যবহার করেনি| ঘামের গন্ধে ঝিল্লীর নিজেরই একএক সময় বিরক্তি লেগে যাচ্ছিল| পরের দিন অফিসে ঝিল্লীর টেবিলে প্রোমোশন লেটার পৌঁছে গেল| অন্য ব্রাঞ্চে পোস্টিং| এখানে আর রাখবে না| |
শিবাংশু
দক্ষিণে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। উত্তরদিকে গড়িয়ে যাওয়া ওঠানামা করা পাহাড়ি জমিতে ছড়িয়ে আছে বিস্তৃত বৌদ্ধবিহারের অবশেষ। চন্দ্রশিলার ধাপগুলির পাশে, খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সেই রহস্যময় বৌদ্ধ তান্ত্রিকদেবী, কুরুকুল্লা। যাঁকে 'তারা কুরুকুল্লা'ও বলা হয়। প্রথম থেকে তেরো শতকের মধ্যে নির্মিত ইঁটমাটির চোদ্দোটি সমাধিস্তূপও আছে তাঁকে ঘিরে। কিছুক্ষণ সামনে দাঁড়ালে মনে অন্যরকম অনুভূতি আসে। পিছনে দিগন্তবিস্তৃত নদীমাতৃক হরিৎ শষ্যখেত। দিকচক্রবালে নীলপাহাড়ের সারি। চোখ আর মন থাকলে এই পরাবাস্তব চরাচর আগন্তুককে অনেক প্রাপ্তির ইশারা জানায়। রত্নগিরি যাবার পথে সামান্য ঘুরপথে গেলেই চমকে দেবে এই রত্নখনিটি। দুটি পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় বনজঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করেছিল এই পুরাবশেষ।এই সেদিন পর্যন্ত কেউ জানতই না এদেশের এরকম একটি বৃহৎ বৌদ্ধ পুরানিদর্শন এভাবে মাটির নীচে লুকিয়ে রয়েছে। সন্ধান চলেছে ১৯৫৮ থেকেই। কিন্তু তাকে কিছুটা খুঁজে পাওয়া গেছে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালে খননের পর। এই পুরাবশেষটি এখনও পর্যন্ত ওড়িশার বৃহত্তম বৌদ্ধ ইতিহাসের নিদর্শন। ওড়িশায় ভুবনেশ্বরের কাছে উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি নামে যুগল পাহাড়ে অতি প্রাচীন জৈন গুহামন্দিরের যেসব অবশেষ জনপ্রিয় ও বহুজানিত, তার সঙ্গে বৌদ্ধ উদয়গিরির সম্পর্ক নেই। এটি আছে জাজপুর জেলায় এবং রত্নগিরির কাছে। বৌদ্ধ ইতিহাসে এর নাম ছিল 'মাধবপুরা মহাবিহার'। খননসুবাদে এখানে বিশাল ইঁটনির্মিত বৌদ্ধবিহার ও নানা মূর্তিভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, পণ্ডিতেরা বলেন এখন পর্যন্ত যা উদ্ধার হয়েছে তার পরিমাণ প্রকৃত নির্মাণের ছোট্টো ভগ্নাংশ মাত্র। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সবুজে সবুজ উপত্যকায় নির্মিত এই বিহারটির সৌন্দর্য এককথায় অনুপম। এখানের প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাবশেষে এখনও পর্যন্ত আবিষ্কার হয়েছে একটি স্তূপ, দুটি বিহার, একটি প্রাচীন সিঁড়িভাঙা কূপ এবং অসংখ্য মহাযানী বৌদ্ধ মূর্তি। এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে এই বিহারটির নির্মাণ হয়েছিল সপ্তম থেকে বারো শতকের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এর সময়কাল ললিতগিরি ও রত্নগিরির পরবর্তী যুগে। একটু বিস্ময় লাগে যখন আমরা দেখি মাধবপুরা মহাবিহারে বজ্রযানী বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতির নিদর্শন এখনও বিশেষ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এটা নিশ্চিত বজ্রযানী বৌদ্ধতন্ত্রের কেন্দ্র রত্নগিরির প্রাধান্য পরবর্তীকালে কমে গিয়েছিল। উৎখননের পর উদ্ধার করা অসংখ্য অতি উচ্চমানের পাথরের মূর্তি ও ভাস্কর্য এখানে খোলা আকাশের নীচে রাখা আছে। মহাযানী বৌদ্ধ দেবতাকুলের নানা দেবদেবী, বিশেষত বোধিসত্ত্ব ও ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তিগুলির সৌন্দর্য মোহিত করে। ইতিহাস ও শিল্পপ্রেমী মানুষজনের কাছে এই জায়গাটির আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। কেউ জানেনা এখনও মাটির নীচে কোন সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে। যাঁরা ট্রেকিং করেন, তাঁদের জন্য সংলগ্ন পাহাড়গুলির আহ্বান এড়ানো মুশকিল। উৎখনিত অবশেষগুলির দুটি ভাগ আছে। এক এবং দুই। একটি ইংরেজি ইউ-আকারের উপত্যকায় যে মহাস্তূপটি দেখা যায়, সেটি মহাযানী মতের স্থাপত্য। তার চারটি কুলুঙ্গিতে চারজন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। মহাযানী বিশ্বাস মতো এইসব বুদ্ধেরা চারটি দিক রক্ষা করেন। এছাড়া একটি বর্গাকার বিহারও রয়েছে এখানে। তার কারুকার্যময় তোরণ পেরোলে শাক্যমুনি বুদ্ধের ভূমিস্পর্শ মুদ্রার মূর্তি স্থাপিত আছে। এছাড়া বৌদ্ধ দেবতাকুলের তারা, মঞ্জুশ্রী, ভৃকুটি, হারীতী,চুন্দ,অবলোকিতেশ্বর, মৈত্রেয়, অপরাজিতা, বৈরোচন, জটামুকুট লোকেশ্বর, ললিতাসন অমিতাভ এবং বসুধারার মূর্তিও দেখা যায়। মাধবপুরা মহাবিহার, ললিতগিরি ও রত্নগিরির মতো অতি বৃহৎ পুষ্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ ছিল। এই তিনটি পুরানিদর্শনকে একসঙ্গে ওড়িশার রত্নত্রিভুজ বলা হয়।
মনোজ ভট্টাচার্য
কিস্যা আটলান্টা কা ! ১৯৯০ সালের পরে কয়েক মাস আটলান্টায় থাকতে হয়েছিল । সেই সময় আটলান্টায় অলিম্পিক’৯৬ হবে বলে শহরের ভাংচুর আরম্ভ হয়ে গেছে । পিচ ট্রি রোড এর ওপর রেড হুক ইন নামে একটা মোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম ! একেবারে শহরের মাঝখানে - আশেপাশে কোনো দোকান-পাট নেই । উল্টোদিকে একটা আটতলা পার্কিং বিল্ডিং ! সারাক্ষন আলোয় ঝলমল করছে ! এই মোটেলটাও ভাঙ্গার তালিকায় ! তবে এখনো দেরী আছে । মোটেলের মালিকও যতদিন পারে ভাড়া দিচ্ছে ! যেহেতু এই বাড়িটা ভাঙ্গা হবে - তাই এখানে বোর্ডার আর বিশেষ আসে না - বেশির ভাগ ঘরই খালি পরে আছে । সারা তিনতলায় একমাত্র আমি আছি । যদি আমাকেও যেতে বলে - তবে ওরাই অন্য মোটেলে ব্যবস্থা করে দেবে ! হোটেল ও মোটেলের তফাত আছে । আমি সে সবে কিছুর মধ্যে যাচ্ছি না ! মূল পার্থক্য হলো - নিরাপত্তা ! মোটেলের বাসিন্দাদের কোনো নিরাপত্তা নেই । যে কোনো সময় বাইরের যে কেউ ঘরের দরজায় হাজির হতে পারে ! – এমন কি বন্দুকধারিও হতে পারে – ওখানে ওটাই স্বাভাবিক ! বারান্দার দুটো সিঁড়ি সবসময় খোলা । কোনো দরজা নেই ! এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যে বেলায় ঘরে ফিরে জামা-কাপড় পাল্টে চা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়েছি । সামনে পীচ ট্রি স্ট্রিটে আপনা আপনি ট্র্যাফিক সিগন্যাল জ্বলছে নিভছে । চোখ গেল পাশের ঘরের দিকে ! একটি কালো মেয়ে দাড়িয়ে আছে দরজায় ! - সকালে দেখেছি বটে পাশের ঘরে বোর্ডার এসেছে ! সেই বোর্ডারই কি এই মেয়ে - হতে পারে ! রাস্তায় তখন ফিরতি গাড়ির জ্যাম - সবাই বাড়ি ফিরছে I ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল - মেয়েটি ওর দরজা থেকে আমার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে । আসলে আমাকে ডেকে কিছু বলতে চাইছে । ' - কিছু বলছ আমাকে ?' ' - তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে !' - শুনে ভালো করে দেখলাম মেয়েটিকে ।একটি দুঃস্থ মেয়ে - স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালো । অনেকেই জানেন - আমেরিকায় দুটো জাতি থাকে - 'আছে' আর 'নেই '! - উত্তরে, পশ্চিমে বা টেক্সাসে - মোটামুটি 'আছে'দের প্রাধান্য । আর দক্ষিনে ও মধ্যে - 'নেই'দের প্রাধান্য ! আমেরিকাতে সাদা-কালো ছাড়াও অর্থনৈতিক ভাবে - আমাদের দেশের মতই অনেক গুলো শ্রেণী আছে । ধনী, উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দুঃস্থ ! - এই দুঃস্থ শ্রেনীর মধ্যে সাদা বা কালো - দুইই আছে । এরা সরকারি সব রকম সাহায্যই পায় - যেমন এস এস আই , ফুড স্ট্যাম্প ইত্যাদি – আরও কি কি - আমি সব জানিও না । কিন্তু এদের মধ্যে লেখা-পড়া বা চাকরি-বাকরি করার কোনো ব্যাপার নেই ! অপরাধ-প্রবনতা এদের যেন রক্তের মধ্যে ! ছেলে-মেয়েদের পোশাক-আশাকের মধ্যে দিয়েই সামাজিক অবস্থান প্রকট হয়ে ওঠে ! ' - কি কথা !' - আমি ওর দিকে তাকিয়ে বলি । ' - তুমি ভেতরে চলো - বলছি ' বলেই মেয়েটি আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে ! ' - আরে তুমি ভেতরে ঢুকছো কেন ? কি বলবে - এখানে বলো ' - আমার তখন বুঝতে আর বাকি নেই - মুরগী হতে চলেছি ! ' - আমায় দুটো টাকা (ডলার ) দেবে ? আজ সারাদিন খাই নি ! ' - ততক্ষনে আমার বিছানায় বসে পড়েছে ! আর বিছানার পাশেই ছোট টেবিলে আমার টাকার ব্যাগ ! আমি অনন্যোপায় হয়ে বললাম : ' - তুমি উঠে বাইরে এসো - আমি টাকা দিচ্ছি '! ' - কেন - তুমি আমার পাশে বসো না ! আমরা গল্প করি !' - বলেই যে কাজ করলো - আমি অত তাড়াতাড়ি ভাবতেও পারিনি - কেউ এরকম করতে পারে ! টি-শার্টটা খুলে ফেলেছে ! একেবারে টপলেস ! কিছুদিন আগেই এখানে কোনো এক জায়গায় - এই কালো মেয়েকে নিয়েই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছিল ! কালো-সাদা বিভাজন হয়ে গিয়ে - সে এক বিশ্রী ব্যাপার ! - পুলিশ এসে আগে অভিযুক্তকে হাতকড়ি পরিয়ে নিয়ে যায় ! কাগজে-টি ভি তে ছবি-টবি উঠে একাক্কার হয় ! আর সরকার অভিযুক্তকে দিয়ে প্লী ডীল করিয়ে নেয় ! - কালোদের চটাবে না - অনেকটা আমাদের দেশের মতই ! এক গাদা টাকা গুনাগার দিতে হবে - অথবা কারাবাস ! ' - তুমি শীগগির জামা পরে নাও আর উঠে বাইরে এসো - বলছি -' আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম - ভয়েতেই বোধয় ! - 'এখুনি আমি পুলিশে ফোন করব ।' ' - আমায় কুড়ি টাকা দাও - আমি চলে যাবো ! তা নাহলে আমিই পুলিশ ডাকবো !' - বলে ফোনটা তুলে নিল ক্র্যাডেল থেকে । আমি উত্তর কলকাতার মানুষ - আমায় টুপি পড়াবে ! - রাগের চোটে তেড়ে গিয়ে ও'র হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে জিরো ডায়াল ঘুরিয়ে দিলাম । রিসেপশানে এখন অরবিন্দ আছে - দেখেছি । ' - অরবিন্দ - এখুনি একবার আমার ঘরে আসবে ? আমার ঘরে একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে । জামা খুলে ফেলেছে আর আমাকে ভয় দেখাচ্ছে পুলিশের ! অরবিন্দ 'এখুনি আসছি' বলে ফোন নামিয়ে রাখলো । আমার এই তৎপরতায় মেয়েটা ঝিমিয়ে পরেছিল - তাড়াতাড়ি জামাটা পরে ফেলল - কিন্তু একভাবে বসেই রইল ! খানিক্ষনের মধ্যেই অরবিন্দ একজন স্প্যানীশ সঙ্গীকে নিয়ে ওপরে চলে এলো ! - মেয়েটাকে দেখেই অরবিন্দর সঙ্গী বোধয় চিনতে পেরেছে - এই মারে কি সেই মারে।- আমার কাছে সব শুনে নিয়ে মেয়েটাকে পুলিশের ভয় দেখালো । ও এখানে উঠে এলো কি করে ! পাশের ঘরের দরজা খোলা কেন ? পরের দিন শুনলাম - মেয়েটিকে কোনো একজন বোর্ডার ডেকেছিল - কিন্তু সে নেই ঘরে ! তাই মেয়েটি চেষ্টা করেছিল যদি কোনো খদ্দের পেয়ে যায় ! ঘটনার পরে আমার মনে হয়েছিল - আমি তো ওকে দুটো টাকা দিতেই পারতাম ! বলেছিল সারাদিন খাওয়া হয় নি ! যদিও সেটা সত্যি নয় - কারণ ওদের যাবতীয় খরচ আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই হয় ! - কিন্তু আমিও বৃহত্তর বিপদের ভয় পেয়ে গেছিলাম । কাগজ - টি ভি – পুলিশ-কারাবাস ! ওরে বাবা ! আমি ওসবে নেই ! - আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নী-নিষ্ট বাঙ্গালি ভদ্রলোক ! মনোজ অনেক দিনের পুরোনো একট লেখা দিচ্ছি ! ব্লগের দিকটা খুব খালি খালি দেখাচ্ছে !
Ranjan Roy
< নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা—একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া [এটি সন্মাত্রানন্দ রচিত “ নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা- অতীশ দীপংকরের পৃথিবী” উপন্যাসটির পুস্তক সমালোচনা নয়, সে যোগ্যতা আমার নেই, -- বড়জোর এক মুগ্ধ পাঠকের প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। ] পাতা ওল্টাতেই বিস্ময়। দর্শনের গুঢ় এবং কূট প্রশ্ন ও কয়েক শতাব্দী আগে জন্মানো এক ক্ষণজন্মা বাঙালী মেধা অতীশ দীপংকরকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন প্রথম জীবনে রামকৃষ্ণ মিশনে সেবাব্রতী এক সন্ন্যাসী! এই পাঠকের মিশনের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক তাতে ওখানকার সন্ন্যাসীরা গৌতম বুদ্ধকে জয়দেব গোস্বামীকৃত দশাবতার স্তোত্রের বেঁধে দেয়া ভূমিকা অনুযায়ী বিষ্ণুর এক অবতার --‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেয়রহযাতম, সদয়হৃদয়দর্শিতপশুঘাতম’ হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত। কিন্তু ‘অনাত্মবাদীন’ ‘ক্ষণিকবাদীন’ বৌদ্ধদর্শনের অভিঘাত মিশনের জীবনে কোন অভিঘাত সৃষ্টি করে না । কারণ রামকৃষ্ণদেব ও বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক মানসভূমি বেদান্ত এবং ধর্মাচরণের বাহ্যিক দিকটি শাক্তমত ও তন্ত্র আশ্রিত। ঠাকুরের ভৈরবীসাধনা ও বেলুড়ে কালীপূজোর রাতে পশুবলি জনসাধারণের গোচরে। অথচ বইটি ইতিহাসের গবেষণাপত্র নয়, কোন দার্শনিক পাত্রাধার-কি-তৈল কিংবা তৈলাধার-কি-পাত্র বিচারে কণ্টকিত গ্রন্থ নয় । এটি আদ্যন্ত নিটোল একটি উপন্যাস। ইহাতে কল্পনার যাদুমিশ্রণ, প্রেম-প্রত্যাখ্যান-বিরহ-বলিদান-প্রতিহিংসা-জয়-পরাজয় সবই আছে। উপন্যাসটি লিখলেন সন্মাত্রানন্দ! প্রথমেই সংশয়। একজন গার্হস্থ্যজীবন পরিত্যাগী মানুষ কী করে ফুটিয়ে তুলবেন ষড়রিপুর তাড়নায় জ্বলেপুড়ে খাক হওয়া মানুষের ছবি? যিনি এই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শের জগতকে অবিদ্যাজনিত মিথ্যাত্বের সাময়িক সৃষ্টি বলে মেনে নিয়েছেন তাঁর কলমে কী করে ফুটবে এর সৌন্দর্য ও কন্টকিত রূপ? এই পূর্বাগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। অবশ্য সন্ন্যাসীর সাহিত্যচর্চা একেবারে কালাপাহাড়ি কিছু নয়। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন ‘সখার প্রতি’ ও ‘দি কাপ’ এর মত কবিতা। অতি আধুনিক বাংলায় ছোট ছোট বাক্যবন্ধে ‘প্রবাসে’র মত জার্নাল। পন্ডিচেরির নিশিকান্তের কবিতাও স্মরণীয়। তবে সেসব আধ্যাত্মিক স্টেটমেন্টের কাব্যরূপ। কবিতার শৈলীর আবশ্যকীয় অ্যাবস্ট্রাকশন সেই স্পেস দেয় । কিন্তু গদ্যরচনা? বিশেষ করে উপন্যাস? এখানে তো চরিত্ররা রক্তমাংসের, সময় অতীতচারী হয়েও ছুঁয়ে যাবে সমকালের যন্ত্রণাকে, নইলে তা পর্যবসিত হয় জাদুঘরের দ্রষ্টব্যে। উপন্যাস লেখার এ’সব ঝামেলার সঙ্গে সন্মাত্রানন্দ সম্যক অবহিত। তাই বইটির প্রস্তাবনায় তিনি অকপট—“ – অতীশ দীপংকরের জীবনেতিহাস এ উপন্যাসের আশ্রয়, কিন্তু বিষয় নয়।– শাশ্বত মানবীসত্তাই ‘নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু। কখনও সে-নারীসত্তার নাম কুন্তলা, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনো –বা জাহ্নবী”। গজব রে গজব! এই সংশয় শুধু আমার নয়। বইটি পড়ে জানতে পারলাম যে মিশন কর্তৃপক্ষ ও একই দোলাচলে ভুগেছেন সন্মাত্রানন্দের সাহিত্যকৃতি নিয়ে, অবশ্য আমার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। তাই একদিন তাঁকে নিজের ঝোলা কাঁধে তুলে মিশন থেকে বেরিয়ে আসতে হল। শ্রেয় ও প্রেয়র দ্বন্দ্বে উনি কলমকেই বেছে নিলেন আর আমরা পেলাম এই উপন্যাসটি। এই ঘটনাটি, এই নির্ণয় তাঁর মানসে এক অমিট ছাপ ফেলেছে। তাই বইটির কথক হিসেবে নিজের জীবনের আদলে বর্ধমান থেকে কোলকাতায় এসে সোনারপুরের হোস্টেলে থেকে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে স্ট্যাটিস্টিক্সে এম এস সি করে সন্ন্যাসী হওয়া এবং সাহিত্যচর্চার তাগিদে মিশন থেকে বেরিয়ে এসে লেখক হওয়া শাওন বসু চরিত্রটির নির্মাণ। তাই ভিক্ষু মৈত্রীগুপ্ত বিক্রমশীলা বিহারে সঙ্ঘনির্দিষ্ট আচারবহির্ভূত আচরণের জন্যে অতীশ দীপংকরের আদেশে সঙ্ঘ থেকে বহিষ্কারের মুখোমুখি হয়েও অবিচলিত শান্ত ও নির্বিকার থেকে যান । এবার আসি মূল বইটির কথায়। এর ‘কথনশৈলী’ আদৌ একরৈখিক নয় । এতে সময় তিন খন্ডে বিভক্ত—দশমের শেষ থেকে একাদশ শতক,ত্রয়োদশ শতক ও একবিংশ শতক। কিন্তু এই ত্রিস্তর কালখন্ডগুলো বিচ্ছিন্ন (ডিস্ক্রিট) নয়; বরং ‘ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বস্তুত একই সমতলে অংকিত পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের মতন। এর পর আরও জটিল গঠন চোখে পরে । যেমন, “ওই তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দুগুলোর মধ্য দিয়ে কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে এক যুগের চরিত্রগুলোর সঙ্গে অন্য যুগের চরিত্রদের’ দেখা হয়ে যায়, বিনিময়ও হয়। একে কী বলব? বাঙলাভাষায় লেখা প্রথম যাদু-বাস্তবতার উপন্যাস? জানি না । সেই নান্দনিক বিচারের ধৃষ্টতা আমার নেই । তবে আমি বলব যে এই প্রচেষ্টায় লেখার প্রসাদগুণ, কালোপযোগী ভাষার পরিবর্তন ও লেখার টান আমাকে বাধ্য করেছে সারারাত জেগে একটানা পড়ে উপন্যাসটি শেষ করে পরের দিন দুপুরে পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখে ফেলতে। কারণ, দেরি করলে সেটা হবে সুচিন্তিত এক সমীক্ষা; আতসকাঁচে ধরা পড়া অনেক ফাঁকি-ফোকর। কিন্তু উপে যাবে আমার তাৎক্ষণিক ভালো লাগা, পূর্বাগ্রহ কাটিয়ে মুগ্ধতায় ভেসে যাওয়া। কেন মুগ্ধতা? প্রথম কারণটি সন্ন্যাসীর কলমে প্রকৃতি ও নারীর রূপবর্ণনা, তাও একজন সাধারণ পঞ্চেন্দ্রিয়তাড়িত পুরুষের রূপমুগ্ধতার দৃষ্টিতে। কোথাও কোথাও দুই এক হয়ে গেছে। কাহিনীর আশ্রয় বাঙ্গালাদেশের ঢাকা- বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মানো রাজপুত্র চন্দ্রপ্রভ কেমন করে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আচার্য ধর্মকীর্তির কাছে পাঠশেষ করে বিক্রমশীলা মহাবিহারের আচার্য অতীশ দীপংকর হয়ে উঠলেন। কিন্তু মূল সুরটি হল প্রতিবেশী কিশোরী কুন্তলার বিফল কামনা, ও তন্ত্রসাধনার মধ্য দিয়ে কখনো স্বয়ংবিদা কখনও অন্যরূপে অতীশকে পাওয়ার প্রয়াস। এইভাবে এবং একবিংশ দশকে সেই বজ্রযোগিনী গ্রামে কৃষক অনঙ্গ দাসের কন্যা জাহ্নবীর মধ্যেও সেই চিরন্তন নারী হৃদয়ের আকুতির প্রকাশ। আর কালচক্রের পরস্পরছেদী তিন বৃত্তের ঘুর্ণনে চিরন্তন নারী কখনও ইয়ংচুয়া, কখনও স্বয়ংবিদা, কখনও বা জাহ্নবী। বাৎসল্য, প্রেম ও দাম্পত্যের মধ্যে নারীর তিন রূপের প্রকাশ। তাই তারাদেবীর ও তিনটি মূর্তি,--কাঠের, পাথরের ও ব্রোঞ্জের। এবার একটু তিব্বতী শ্রমণ চাগ লোচাবার চোখে স্বয়ংবিদার রূপ দর্শন করা যাক। ‘শ্বেত রাজহংসের মত দৃঢ়পিনদ্ধ শুভ্র কঞ্চুলিকা, সুনীল উত্তরী পীনোন্নত বক্ষদেশকে আবৃত করে স্কন্ধের উপর বিলম্বিত ও দীর্ঘিকার মন্দবাতাসে উড্ডীন। ----- ‘স্বয়ংবিদা প্রশ্ন করলেন, “কী দেখছ লামা? একে রূপ কহে। এই রূপসমুদ্র অতিক্রম করতে পারলে সন্ন্যাসী হবে। আর যদি অতিক্রম করতে অসমর্থ হও, যদি এতে নিমজ্জিত হও , তবে কবি হবে”। (পৃ- ১২৭) ‘অশ্রুর প্লাবনের ভিতর অপরূপা রমণীর দৃঢ় কুচাবরণ কঞ্চুলিকা শিথিল হ’ল। শিহরিত চাগ দেখলেন, সেই সুবিপুল কনককলসবৎ স্তনকুসুমের যুগ্ম কুচাগ্রচূড়া অনাবৃত বিস্ময়ে তাঁরই দিকে উন্মুখ হ’য়ে তাকিয়ে রয়েছে। --- আহ! এ কী জ্বালা! রমণীর চুম্বনে এত বিষ , এত ব্যথা! ‘(পৃ- ১৩৬) আর চুয়াল্লিশটি অধ্যায়ে বিবৃত ও প্রায় ৩৫০ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত এই উপন্যাসটিতে ধ্রুবপদের মত ঘুরেফিরে আসে একটি বৌদ্ধ তান্ত্রিক দোঁহা—‘ যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস/ নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধুলিকালীন মেঘ/ পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে/ আর পালতোলা নৌকো ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতোধারায়---/ সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে—আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালা;/ তখন –কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব ---‘। দ্বিতীয় মুগ্ধতা সন্ন্যাসী লেখকের সমকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের প্রতি সজগতা ও সংবেদনশীলতা। বিশ বছর পরে কলকাতায় ফিরে এসেছে স্বামী শুভব্রতানন্দ, পূর্বাশ্রমের শাওন বসু হয়ে। দেখছে এই কোলকাতাকে সে চিনতে পারছে না । ‘উড়াল পুলের ঘোমটা আর বাইপাসের ওড়না পরেছে কল্লোলিনী।--- কলকাতার নিজস্ব সম্মান ছিল তার কৃষ্টিতে, তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, এখন ব্যবসায়ীদের হাতে বিকিয়ে গেছে। ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে মানুষ, কেমন খিঁচিয়ে কথা বলে আজকাল সবাই। কেউ কাউকে একটু সরে বসে জায়গা দিতে রাজি নয়’। আবার দেখুন রাজনীতির ক্ষেত্রে ‘ আদর্শ কিছু নয় ক্ষমতাই সব। --- কেন্দ্রে সমাসীন এই ধর্মধ্বজীরা যাকে হিন্দুধর্ম বলে মানে, সেটা পৌরাণিক হিন্দুধর্মেরও একটা অবক্ষয়িত রূপ। এবং তারা নিজেদের সবথেকে বড়ো দেশপ্রেমিক বলে মনে করে। অহিন্দুরা কি ভারতীয় নয়?’ জে এন ইউয়ের কানহাইয়া কুমারের ঘটনায় বিচলিত প্রাক্তন শিক্ষক সন্মাত্রানন্দ লেখেন—‘ গ্রেপ্তার হয়ে গেল ছাত্রটি। বিচারের আগেই দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা ছেলেটির ওপর প্রচন্ড প্রহার চালাল। ---- ‘ছাত্ররা কি রাজনীতি করবে? নাকি, ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ? (আহা! কী অভিনব চিন্তা!)বিচারের আগেই আইনজীবীরা কি আইন নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারেন? তাঁদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে না কেন কেউ? এসব বহু তাত্ত্বিক আলোচনার অন্তে ছাত্রটি যখন ছাড়া পেল, তখন রাজনৈতিক দলগুলি এই যুবক ছাত্রটির মধ্যে তাদের মেসায়াকে খুঁজে পেতে লাগল’।(পৃ-১৪৩)। তৃতীয় কারণ, পৃ-১৫৬তে মতবাদ ও সত্যের আপেক্ষিকতা নিয়ে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যাটিঃ ‘মানুষ সত্যের এক-একটি রূপ কল্পনা করে মাত্র। আর সত্যের উপর আরোপিত বা কল্পিত সেই সব রূপকেই ‘মতবাদ’ কহে। অধিকারীবিশেষে প্রতিটি মতবাদই প্রাথমিকভাবে উপকারী, কিন্তু কোনও মতবাদই সত্যকে সাক্ষাৎ দেখিয়ে দিতে পারে না । যুক্তি প্রয়োগ করলে সমস্ত মতই অন্তিমে খন্ডিত হয়ে যায়’। বিতর্কসভায় দীপংকরের মুখে এই বাক্যটিতে এক লহমায় ধরা পরে সমস্ত ‘বাদ’, --হিতবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, জাতীয়তাবাদ থেকে সমাজবাদ ও মার্ক্সবাদ—এর উপযোগিতা ও সীমাবদ্ধতা। জীবন চলমান আর সমস্ত ‘বাদ’ দেশ ও কালে আবদ্ধ। তাই স্থবির। মুগ্ধতার শেষ কারণটি একটু ব্যক্তিগত। পৃষ্ঠা ৮৬ থেকে পাচ্ছি অতীশ দীপংকরের ভাবনাবিশ্ব। এখানে পৌঁছে চমকে গেলাম। প্রাক্তন বৈদান্তিক সন্ন্যাসী কত সংক্ষেপে ও সহজ করে দীপংকরের অনুভবের মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করছেন বৌদ্ধদর্শনের সার। বিশেষ করে এই দুটো তত্ত্ব--তার ‘ল অফ কজালিটি’ বা কার্য-কারণ সম্পর্ এবং নির্বাণ বলতে কী বোঝায়। আর বৌদ্ধদের মধ্যেও সেই ধারণাগুলির বিবর্তন। প্রতি বিষয়ে প্রাচীন সর্বাস্তিবাদী ও সৌত্রান্তিক( মোটা দাগে হীনযানী) এবং শূন্যবাদী ও বিজ্ঞানবাদীদের ( মহাযানী) মধ্যে কোথায় তফাৎ ইত্যাদি। এই প্রসঙ্গে তুলে ধরেছেন মহাযান ও হীনযান নামের উদ্ভব ও সার্থকতা। উঠে এসেছে আদি বুদ্ধিজম ও পরবর্তী সংশোধনের যাথার্থ্য নিয়ে বিতর্ক। অনেকটা যেন ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট প্রভেদ, বা কম্যুনিস্ট শিবিরের গোঁড়া মার্ক্সবাদী ও সংশোধনবাদীদের বিতন্ডা। আমি কয়েকবছর আগে কাংড়ার ধর্মশালায় তিবেতান ইন্সটিট্যুট এর বারান্দায় এক তরুণ লামাকে চেপে ধরে বৌদ্ধদর্শনের কার্য-কারণ তত্ত্ব (পতীচ্চসমুৎপাদ) বোঝার চেষ্টা করি। এঁরা নাগার্জুনের মাধ্যমিক দর্শন বা শূন্যবাদের অনুগামী। তারপর দিল্লির টিবেট হাউসে অধ্যক্ষ লামার দর্শন ক্লাসে যাই ও ‘গতে গতে পারাগতে’র ব্যাখ্যা শুনি যা এই উপন্যাসে দীপংকরের ভারতে গুপ্তভাবে গ্রন্থ পাঠানোর প্রয়াসে কোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারপর মন না ভরায় কোলকাতায় থেরবাদীদের প্রধান ভিক্ষু সুমনপালের কাছে যাই। উনি মিলিন্দ-পঞহো অর্থাৎ রাজা মিনান্দার ও ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পড়তে বলেন। কিন্তু এখানে এই বারো নম্বর অধ্যায়ে সন্মাত্রানন্দ সংক্ষেপে সুন্দর বুঝিয়েছেন। “ ইতি ইমস্মিং সতি, ইদং হোতি। ইমসসুপ্পাদা, ইদং উপজ্জতি।–যদি এই কারণটি উপস্থিত থাকে, তবে এই ফল হবে। কারণ উৎপন্ন হলে কার্যও উৎপন্ন হবে। ইতি ইমস্মিং অসতি, ইদং ঞ হোতি। ইমস্ম নিরোধা, ইদং নিরুজ্ঝতি। -- যদি এই কারণ না থাকে তাহলে এই ফলও থাকবে না । কারণটির নিরোধ হলে কার্যটিও নিরুদ্ধ হয়ে যাবে”। (এখানে কি লেখক এই ধারণাটির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা ‘ডিপেন্ডেন্ট অরিজিনেশনে’র পক্ষে?) তারপর এসেছে এই কার্য-কারণ শৃংখলার বারোটি কড়া বা নিদান; যথাক্রমে অবিদ্যা, সংস্কার, বিজ্ঞান, নামরূপ, ষড়ায়তন, স্পর্শ, বেদনা, তৃষ্ণা, উপাদান, ভব, জাতি ও দুঃখ। এর একটি থাকলেই অপরটি থাকবে, একটি চলে গেলেই অপরটিও নির্বাপিত হবে। আর এই চক্রাকারে আবরতনের নাভি হল তৃষ্ণা। তাই নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যে জয় করতে হবে সমস্ত তৃষ্ণাকে, এমনকি নির্বাণের তৃষ্ণাকেও! কোথাও কি এলিয়টের নাটক ‘মার্ডার ইন ক্যাথিড্রাল’ এ রাজদন্ডে মৃত্যুর আগে বিশপ অফ ক্যান্টারবেরির কাছে শহীদ হওয়ার লোভ ত্যাগের প্রস্তাবের কথা মনে পড়ছে! তারপর এল পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মত করে এল এই নির্ণায়ক কথা যে রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বা আত্মচেতনার প্রবাহ –এই পঞ্চস্কন্ধ মিলেই ‘আমি’। এর বাইরে আর কোন জ্ঞেয় বস্তু নেই । তারপর বিতর্কসভার মধ্য দিয়ে আমরা হীনযান ছেড়ে মহাযানে পৌঁছালাম, আরও বলতে গেলে অসঙ্গ –বসুবন্ধুর বিজ্ঞানবাদে। এখানে সন্মাত্রানন্দ কি মহাযানের পক্ষে একটু টেনে খেলিয়েছেন? কারণ আলয়বিজ্ঞান ও বিজ্ঞপ্তিমাত্রতার ধারণার সঙ্গে (জ্ঞাতা-জ্ঞেয় অভেদ) যে অদ্বৈত বেদান্তের (অহং ব্রহ্মোস্মি) বেশ মিল! আর উপন্যাসকারের সে স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু সতর্ক লেখক ধরিয়ে দেন যে বৌদ্ধমতে সকলই ক্ষণিক, নিয়ত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে উপনিষদের কথিত ‘আত্মা’ জীবের অপরিবর্তনীয় সত্তা। আমার পরিচিত অনেকের কাছে এই অধ্যায়টি বাহুল্য এবং কাহিনীর গতিরোধক মনে হয়েছে। আমার তা মনে হয় নি। উপন্যাসে কাহিনীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশ-কাল-চরিত্রকে এবং তাদের মধ্যের সংঘাতকে তুলে ধরা। তাই ভাল উপন্যাসে একটি ডিসকোর্স থাকবেই। আর এই দার্শনিক অভিঘাতের মধ্যেই রয়েছে দীপংকর চরিত্রের অনীহার বীজ যা তাকে সংসার , ঐশ্বর্য এবং নারীর প্রেমের আহবানকে প্রত্যাখ্যান করতে প্রেরিত করে। আমার মুগ্ধতার চতুর্থ কারণ, আচার্য ধর্মকীর্তির চরিত্রচিত্রণ ও তাঁর সঙ্গে অতীশ (চন্দ্রগর্ভ) এর আলোচনায় বৌদ্ধদর্শনের নির্বাণ ও বোধিলাভের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিক ও সামাজিক জীবনে অবিচার ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার অনুসন্ধান করা। ধীমান আচার্য ধর্মকীর্তি বুদ্ধিষ্ট লজিকের বিরাট ব্যক্তিত্ব, ‘প্রমাণবার্তিকে’র মত গ্রন্থ লিখেছেন। আর একদিকে সহজ সরল ও বালকের মত কৌতুক ও পরিহাসপ্রিয়। ছবিটি মিলে যায় পঞ্চাশ বছর আগে কোলকাতায় প্রকাশিত অবন্তীকুমার সান্যাল ও জয়ন্তী সান্যাল সম্পাদিত ‘হাজার বছরের প্রেমের কবিতা’সংকলনে ধর্মকীর্তির রচনা বলে প্রকাশিত একটি চার লাইনের কবিতায়। যার সারাংশ হচ্ছেঃ নারীকে দেখেই আমি বুঝেছি ভগবান বুদ্ধের কথাটি যথার্থ যে এই বিশ্বের স্রষ্টা কোন ঈশ্বর হতে পারে না। কারণ, তাহলে নারীকেও ঈশ্বরই সৃষ্টি করতেন। তারপর কি তিনি তাঁর এই অপরূপ সৃষ্টিকে ছেড়ে দিতেন! উপন্যাসের ১১০ পাতায় সংশয়দীর্ণ ধর্মকীর্তি শিষ্য অতীশ দীপংকরকে প্রশ্ন করেনঃ পীড়িত জনতা আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। তারা নির্বাণ চায় না, বাঁচতে চায় । তারা চায় দূঃখ-অতিক্রমী আনন্দময় জীবনযাপনের কৌশল। তাদের এই চলমানতার দর্শন যদিও কী বৈদিক, কী শ্রামণিক শাস্ত্রদ্বারা সমর্থিত নয়, তবু আস্তিক, নাস্তিক, লোকায়ত, উপাসনাকেন্দ্রিক সকল প্রকার চিন্তাকেই তা আত্মস্থ করে নিয়ে সমাজজীবনে স্থান দিয়েছে। ‘আমি তাই ভাবি, বস্তুত আমাদের ধর্মদেশনা কি লোকসাধারণের উপকার করে? অথবা, আমরাই লোকসাধারণের দ্বারা উপকৃত হই?’ এ সংশয় একেবারেই ঘটমান বর্তমানের সংশয়। আমাদের সবার মনেই অহরহ এ প্রশ্ন ওঠে, নানাভাবে। আবার তরুণ অতীশ বলেন— যে কোনও যুগেই পরপীড়ক রাজশক্তি লোকসাধারণের ওই দারিদ্র্যবিজয়ী দুঃখজয়ী জীবনীশক্তি শোষণ করে নিতে চায়, কিন্তু তা নিবিয়ে দিতে পৃথিবীর তাবৎ নৃপতিই অসমর্থ। এ যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ওরা কাজ করে’ পড়ছি বা শুনছি ‘জরুরী অবস্থার’ দিনে ফক্কড় কবি বাবা নাগার্জুনের লেখা দুটি লাইনঃ ‘সুকখী ঠুট পর বৈঠ কর কোয়েলিয়া কর গই কুক, বাল বাঁকা না কর সকী শাসন কা বন্দুক।“ অস্যার্থঃ শুকনো ডালে বসেও কোয়েল দিচ্ছে কুক, ঠেকাতে পারল কই তাকে ক্ষমতার বন্দুকন তাহলে এই পরীক্ষামূলক আঙ্গিকে লেখা উপন্যাসটি কতদূর সার্থক? আমার কাছে এ প্রশ্ন অবান্তর। অনেক সমীক্ষকের মতে দার্শনিক বিতর্কের মধ্যে কোথাও মাঝখানে দাঁড়ি টেনে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ষড়দর্শনকে প্রতিযোগী করে না দেখিয়ে একই মননের বিভিন্ন ভাবের প্রকাশ হিসেবে দেখানো যেন একটু জোর করে হয়েছে। আর এক সমীক্ষকের মতে ভাষায় কোথাও কোথাও সমস্যা আছে। কিছু শব্দের তদ্ভবীকরণ যেন ঠিকমত দাঁড়ায় নি। এহ বাহ্য। চারদিকে সিরিয়াল-গন্ধী উপন্যাসের প্লাবনের মধ্যে এই আখ্যানটি এক আনন্দদায়ক ব্যতিক্রম। আজকের এই অসূয়া-হিংসা- অনাচার- মদগর্বী পশুতার দিনে ভারতে বুদ্ধের বাণী, মাত্র শান্তিজল ছিটানো নয়, হিংসার অসারতা, অনিত্যতা ও আত্মঘাতী প্রবণতাকে বোঝা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। চাইব, এই বইটি আরও লোকে পড়ুক, আলোচনা করুক। ==========================================>
মনোজ ভট্টাচার্য
বন্ধুগন, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চাই – আশা করি আপনারা সাহায্য করবেন । মানেকা গান্ধী কয়েকদিন আগে হায়দ্রাবাদে একটা সভায় পশুবহনকারী মানুষদের গণপিটুনি ও গণ-হত্যার প্রতিষেধক হিসেবে – এক ‘ল্যাব-মিট’ বা ‘ক্লীন মিট’ এর নাম করেছেন । - আজ সেই বিষয় জানতে গিয়ে এই সময়ের এক প্রতিবেদন পড়ে খুব কৌতূহল জাগল । লিখেছেন - মৃন্ময় চন্দ । অবশ্য সমস্ত লেখাটাই নেওয়া হয়েছে পল শ্যপিরর --- Clean Meat: - বইটা থেকে ! এই প্রতিবেদনে এমন অনেক কিছু তথ্য আছে – যা আমার মত নিরেট মাথায় ঢুকতে পারছে না ! সোজা বুদ্ধিতে যেটা মনে হচ্ছে – এই প্রক্রিয়াও সেই ক্লোনিং পদ্ধতি ! গৃহপালিত বা খামারজাত পশুর স্রেফ একটি কোষ থেকেই উৎপন্ন অঢেল মাংস ! জৈব প্রযুক্তি ! আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনবিস্ফরিত বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য সমস্যা মেটাবে ! আমেরিকার ‘ফনালিটিক্স’ নামে এক সংস্থার উদ্যোগে এক সমীক্ষা হয় । তাতে দেখা যায় – ৬৬% মানুষ চায় পরিচ্ছন্ন মাংস বা ক্লীন-মিট । যদিও মাত্র ২৫% মানুষ ক্লীন মিটের কথা শুনেছে ! এমন কি ৪০% মানুষ ক্লীন মিটের জন্যে ২৫% বেশি মুল্য দিতেও চায় ! এরা কিন্তু সবাই অবহিত – যে ক্লীন মিট বা ল্যাব মিট মানেই সয়াবিন জাতীয় কোন খাদ্য নয় । এটা প্রকৃত মাংসই । যার পুষ্টিগুন চিরাচরিত জবাই করা মাংসের চেয়ে অনেক বেশি । - মানেকা গান্ধী কতটা কি জানে- জানি না । - কিন্তু শ্যপিরো পশুপ্রেমী, কমপ্যাশন ওভার কিলিং এর প্রতিষ্ঠাতা, হিউমেন সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্টও বটেন ! তার মতে – মানুষ গৃহপালিত পশুকে খাদ্য বানিয়েছে । তবে এবার গরু বা মুরগির একটা কোষ থেকে অফুরন্ত মাংসের আমদানি হবে ! আমরা যদিও তত জ্ঞাত নই – কিন্তু পাশ্চাত্যে এই ক্লীন মিট প্রক্রিয়া বেশ পুরনো । একটা মুরগির ডানা বা একটা স্টেক খেতে – আস্ত পশুকে মারার দরকার নেই । সেই অঙ্গগুলো পৃথকভাবে ল্যাবে কালচার করে পাওয়া যাবে । যেসব পশুর চেরা খুর ও যারা জাবর কাটে – তাদের মাংসেই ক্লীন মিট বলা হয়েছে । ক্লীন মিট প্রস্তুতকারী সংস্থাও তাই ধরে নিয়েছে । সুতরাং গরু মোষ ষাঁড় ছাগল ভেড়া কৃষ্ণসার ও অনেক পশুই ক্লীন মিটের পর্যায়ভুক্ত । গবেষণাগারে ক্লিন মিট তৈরি করতে একটা মাত্র কোষ প্রয়োজন ! – কি প্রক্রিয়ায় কিরকম বা কিসের মাংস তৈরি হয় ইত্যাদি দেওয়া আছে ! ক্লিন মিট পরিবেশ-বান্ধব । উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চেয়ে – ডাল, সয়াবিন ইত্যাদির তুলনায় – গোমাংস ইত্যাদির প্রোটিন প্রায় কুড়ি গুন বেশি ! ২০১৩র আগস্টে নেদারল্যান্ডের মাস্ত্রিখটি ইউনিভার্সিটির ডক্টর মার্ক পোষ্ট লন্ডনের সাংবাদিক সন্মেলনে প্রথম ক্লিন মিটে তৈরি বিফ বার্গার ভক্ষণ করেন । ২০০০০ মাংসতন্তু থেকে তৈরি বার্গারের খরচ পরেছিল – তিন লাখ ডলার । সাড়ে তিন বছর পড়ে সেই বার্গারের খরচ পরেছে ১১.৩৬ ডলার । - এখন এই খরচ নেমে এসেছে সাধারন বার্গারের সমতুল ! বর্তমানে বানিজ্যিক ক্লিন মিট তৈরি করছে মেম্ফিস মিট, মডার্ন মিড, হ্যাম্পটন ক্রিক, ইত্যাদি । বিশ্ব খাদ্য সূচকে ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০০ নম্বরে ! ভারত ও নেপালও ভারতের আগে ! তাই আমাদের ক্লীন-মিটের প্রয়োজন বৈকি ! এই সম্বন্ধে আমরা ওয়াকিবহাল হলে আগামি দিনে আমরা ক্লীন-গো-মিট খাবো কিনা – গো-সন্তানদের কাছে পারমিসান নিতে হবে কিনা – সব জানা জরুরী কি না ! - কিন্তু গো-মুত্র বা গো-ময় ক্লীন মিটের পর্যায় পড়ে কিনা – সেটাও তো জানা দরকার ! মনোজ
শিবাংশু
কানে মর্চে ধরে গেলে যে দুয়েকজনের গান শুনে সেটা পরিষ্কার করে নিই। ইনি তাঁদের মধ্যে একজন। একটা লেখা নিয়ে বসেছিলুম। সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়। আমার মুদ্রাদোষবশত বিষয়টি বেশ জটিল। তিন চারটি রেফারেন্স যা পেলুম কেউ এক কথা বলছে না। আমিও রীতিমতো বিড়ম্বনায়। ধ্যুৎ, কিছুক্ষণের বিরতি লাগবে। ইতোমধ্যে আমার ডেস্কে অবিরাম বেজে চলা গানের স্রোতে কখন যে এঁর গান শুরু হয়ে গেছে, খেয়ালই করিনি। বাইরে কখনও বৃষ্টি পড়ছে, কখনও থামছে। ভাদুরে ভেজা তপ্ত কলকাত্তাই অসহ্য আবহাওয়া। আমাদের মতো বহিরাগতদের জন্য বড্ডো চাপ। কিছুক্ষণ আগে পালুসকর সাহেবের সুরদাসী মল্হার শুনছিলুম। একটু বাতাস লাগছিল প্রাণে। কিন্তু লেখা আটকে গেলে বড়ো বিরক্তি। মন'টা সমে পৌঁছোতেই চাইছে না। সেসময়ই কানের মর্চে ছাড়ানো এই গান। তাঁর নাম জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, প্রথম শুনেছিলুম আমার পিতামহের কাছে। তিনি মুক্তকণ্ঠে বলতেন তাঁর গানের দাপটের কথা। বিষ্ণুপুরের মানুষ বলে হয়তো দাদুর কিঞ্চিৎ শ্লাঘাও ছিল। বয়সে পাঁচ'ছ বছরের কনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু দাদু 'রাধিকা গোসাঁইয়ে'র ভাইপো ও শাগির্দ 'জ্ঞান গোসাঁইয়ের ফুরিয়ে যাওয়াটা কিছুতেই তিনি মেনে নিতে পারতেন না। জ্ঞান গোসাঁই মুক্তকণ্ঠ হয়ে গান গেয়েছেন বড়ো জোর চার-পাঁচ বছর। তার মধ্যেই অফুরন্ত মণিমুক্তো। বাবুদের বৈঠকখানায় গান শোনাতে তাঁর ছিল বিপুল অনীহা। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে "‘ওখানেই আমি থাকবো আর রাধামাধবের কাছে গান করবো" বলে যে কলকাতা ত্যাগ করে বিষ্ণুপুর চলে গেলেন, আর থাকতে ফিরে আসেননি। বছরে মাত্র একবার সরস্বতীপুজোর দিন গোকুল মিত্রের বাড়ি এসে তাঁদের বাড়িতে বিষ্ণুপুরের মদনমোহন বিগ্রহকে গান শুনিয়ে যেতেন। শালপ্রাংশু, সুদর্শন, শক্তিমান, দাপুটে, বাঙালির গর্ব এই শিল্পী চলে গেলেন মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে। কেন গেলেন, কোথায় গেলেন, কে জানে? যাঁরা এই লেখা পড়বেন, তাঁরা সবাই তাঁর গান প্রাণ ভরে শুনেছেন। আজ তাঁর গাওয়া ছোট্টো 'মিয়াঁ কি মল্হার' শুনতে শুনতে ভাবছিলুম মর্চেধরা স্নায়ুগুলোকে কীভাবে তিনি সুরের বৃষ্টিতে ধুয়ে সাফ করে দিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই অনুপম বয়ানটি মনে পড়ে, "বেঁচে থাকার অনেক আশা, প্রিয়তমা বধূ আমার তোমাকে ভালোবাসার মত একান্ত বেঁচে থাকা ...." https://www.youtube.com/watch?v=h4-Qe88SqNY
মনোজ ভট্টাচার্য
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলাম না ! অনেকদিন পর্যন্ত আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না ! বিদেশে যাবার আগে তো শুনতাম – গাড়ি চালাতে না জানলে – ওখানে জীবন অচল ! দুধ কিনতে পর্যন্ত যেতে হয় গাড়ি চালিয়ে যোজনখানেক দূরে ! অমরনাথ যাবার আগে খুব শুনতাম – পহেলগামের পর থেকেই নাকি শুধু বরফ ! এপাশে ওপাশে বরফ ! সবাই গল্প শোনাত চন্দনবারি – থেকে – পিশু চড়াই – সব তুষারাচ্ছন্ন – রাস্তা দেখাই যায় না ! – এদিকে আমার তো স্নো-বুট পর্যন্ত নেই । আমি কি তাহলে যেতে পারব না ! একদিন ভয়ে ভয়ে অমরনাথ গেছে এমন একজনকে জিগ্যেসই করে ফেললাম – অমরনাথের রাস্তায় কি পাথর টাথরের রাস্তা নেই ? গাড়ি টারি চলে না! লোকে যায় কি করে ! – তাড়াতাড়ি সে বলে ফেলল – হ্যাঁ হ্যাঁ – রাস্তা থাকবে না কেন ! মাঝে মাঝে বরফ পড়ে রাস্তা ঢেকে যায় ! – যাক ! নিশ্চিন্ত হয়ে অমরনাথ ঘুরে এলাম ! বরফ টরফ আছে বটে – তবে রাস্তাও আছে ! আর সেটাই প্রধান ! ঠিক তেমনি – ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া ভিসা হয় - প্লেনে চড়তেও দেয় – এমন কি ওদেশে ঢুকতেও দেয় ! আমাদেরও দিল ! অস্বীকার করবো না – গাড়ি ছাড়া অসুবিধে হয় । বিশেষ করে শহরতলি অঞ্চলে । পাবলিক বাস টাস না থাকলে অসুবিধে হয়ই ! – তবে জীবন স্তব্ধ হয়ে যায় না ! – শহরে বাস ও মেট্রো রেল খুব সুবিধের । বরং গাড়ির বিপদ হল – পার্কিং ! পার্কিং এর এত অসুবিধে । পরে যাদের গাড়ি ছিল না – তাদের দেখে সুখী মনে হত ! এদিকে গাড়ি কেনার প্রথম ক্রাইটেরিয়া হল – ড্রাইভিং লাইসেন্স ! – ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েই প্রথম চান্সেই ফেল ! – দোষটা ঠিক আমার ছিল বলে মনে হয় না । জীবনে গাড়ি চালাই নি । গাড়ি যেমন সোজা চলে – তেমনি এদিক ওদিক ঘোরাতেও হয় ! – আমি তো বুঝতেই পারি নি – গাড়ি ডানদিকে না বাঁদিকে যাচ্ছে ! ট্রেনার থামাতে বলতে – যেই থামিয়েছি – দরজা খুলেই উল্টোদিকে দৌড় ! – বুঝলাম ট্রেনারের তাড়া আছে - গাড়ির আগে পৌছতে চায় ! – ফে-ই-ল ! – একগাদা টাকা নষ্ট ! কি করা যায় ! এদিকে কেউ কেউ বুদ্ধি দিল – মোটর ভেহিকল ডিপার্টমেন্টকে টাকা দেওয়ার মানে হয় না ! বাইরে থেকে লাইসেন্স বার করতে হবে ! বাইরে থেকে মানে ? সুপার মার্কেটে কি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় ? কাগজে টি ভিতে দেখি কত জায়গায় লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে ! মানে নকল লাইসেন্স ! তা আসল না পেলে নকলই সই ! – এই সময় বাংলাদেশী বন্ধুরা পথ দেখাল । সবাই বলল – এমন কিছু নেই যা বাংলাদেশে নকল হয় না ! লাইসেন্স তো কিছুই নয় ! দরকার হয় গ্রিন কার্ড পর্যন্ত – বার করে দেবে ! সবই হবে নিউ ইয়র্কে বসেই ! শুধু ডলার ফেলো ! – সেই সময়ে নাগাদ প্রচুর - ভিসার ডুপ্লিকেট – ট্রিপ্লিকেট বের হচ্ছিল । পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বের হচ্ছিল ! আমরা স্বচক্ষে দেখেছি – মাথা কাঁটা পাসপোর্ট ! – রাম খানের পাসপোর্ট – তাতে ভিসা সাঁটা আছে । রাম গিয়ে থানায় রিপোর্ট করলো – তার পাসপোর্ট হারিয়ে বা চুরি হয়ে গেছে ! থানা থেকে এফ আই আর এর রিপোর্ট নিয়ে – সেটা পাঠিয়ে দিল দেশে । দেশ থেকে আরেকটা পাসপোর্টের ডুপ্লিকেট বার হয়ে গেল – ছবিটা গলার থেকে পালটানো – অর্থাৎ রাম ভরোশার ! রাম ভরোশার নিউ ইয়র্কে পা রাখার এক দু সপ্তাহের মধ্যে যথারীতি দ্বিতীয় পাসপোর্টটাও চুরি হয়ে গেল এবং এফ আই আর হয়ে গেল । এইভাবে এবার আবির্ভাব হচ্ছে – রাম বাবার ! – এইভাবে এক ভিসার জোরে রাম খান ধরে রাখল – আসল পাসপোর্ট, দ্বিতীয় পাসপোর্ট রইল – রাম ভরসার আর তৃতীয় পাসপোর্ট রইল রাম বাবার ! নাম একটাই – রাম খান ! আবার এ তো সবাই জানে – রহিম খানের স্ত্রী রসিদা বানুর ভিসা হয়ে যাবার পর প্লেনে করে এসে পৌঁছল কাদের খানের স্ত্রী নাসিম বানু ! একদিন দাই-হাট-স্যু পড়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনের অফিশে ঢুঁ মারলাম । - খুব ভিড় হয় সেখানে – লাইন দিয়ে অনেক পরে দেখা পেলাম জনাব জাফর আলি সাহেবের সঙ্গে ।বেশ বেঁটে মতন চেহারা । - জানিনা অফিশে আসার আগে তার স্ত্রী ফোন করেছিল কিনা – অথবা দেশের সরকার আবার পাল্টালো কিনা – ভদ্রলোকের মেজাজ একেবারে তিল-তিরিক্ষে হয়ে ছিল ! কি নাম? নাম বলার পরেই – আপনি কোথাকার বাসিন্দা ? ভারত না বলে আমি বললাম – কলকাতার ! – উনি প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন – আপনি ইন্ডিয়ার বাসিন্দা হয়ে বাংলাদেশের লাইসেন্স পাবেন কি করে ? – খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা ! আমি আরও মাখন গলায় বলি – আপনি তো বাঙালি – সবাই বলল – বাঙ্গালিদের সাহায্য করেন ! বাংগালি নয় বলুন বাংলাদেশী ! আমরা বাংলাদেশী ! আর আমরা একজন ইন্ডিয়ানের জন্যে বে-আইনি কাজ করবো কেন ? ওসব ইন্ডিয়াতে হয় – এখানে নয় ! – এমনভাবে দাঁত-মুখ খেঁচালো যে খোদ কিস্কিন্দার বাসিন্দারাও লজ্জা পাবে । আমারও জাত্যাভিমান এমন চেগে উঠল যে – যে কারনে এসেছি – সেইটাই উড়ে গেল ! বেশ দু-চার কথা শুনিয়ে বেরিয়ে এলাম ! বাড়ি ফেরার পর আমার প্রতিবেশীরা সব শুনে খুবই অবাক ! – এহ – দাদা ! এটাও পারলেন না ! – ওরা তো ফেক লাইসেন্স করে দেয় ! – আপনাকে কেন দিল না ! বোঝো কান্ড – আমাকে কেন দিল না – তাও আমাকে বলতে হবে ! – এ তো বলা যায় না যে আমি বাংলাদেশী নয় বলে দেয় নি ! – তবে এও ঠিক সেই প্রথম শুনলাম বাঙালি আর বাংলাদেশী আলাদা ! ওদের সেই জনাবের ব্যবহার সেদিন এত খারাপ লেগেছিল – যে মনে মনে ওকে অনেক শাপ দিয়েছিলাম ! কিন্তু ঐ ভদ্রলোকই আইনত ঠিক ! – সে যাইহোক, আর কখনও সেই অফিশে যাওয়ার সুযোগ হয় নি ! শেষ পর্যন্ত বার কয়েক পরীক্ষা দেবার পর লাইসেন্স পেয়েছিলাম ! মনোজ
শিবাংশু
শুধু আমি নই, গোয়া আমাদের সবার কাছেই অতি প্রিয় একটা ছোট্টো স্বর্গ। ভুলিয়ে দেওয়া, হারিয়ে যাবার অনন্ত ঠিকানা। বহুদিন ধরে সারাদেশ থেকে, সারা পৃথিবী থেকে কতশত মানুষ ভিড় জমিয়েছে এখানে। কতরকমের কালচার জড়াজড়ি করে রয়েছে এখানে। অবসরের পর ভেবেছিলুম কয়েকবছর এখানে থাকবই। পোস্টিঙের সুযোগ হয়নি বটে। কিন্তু তখন আর ছেড়ে দেওয়া যায়না। আগের মজলিশে আমাদের এক প্রিয়জন প্রিয় গোস্বামীর একটি ঠেক আছে ওখানে। বছরে একবার স্যামচাচার দেশ থেকে কয়েকমাসের জন্য আয়েশ করতে আসেন এখানে। প্রিয়দাকে বহুবার কথা দিয়েও রাখতে পারিনি। তাঁর উদার আমন্ত্রণ অকারণ উড়ে গেছে আরব সাগরের পাগলা হাওয়ায়। তা গোয়ার চ্যালাচামুণ্ডারা মাণ্ডবীর উত্তরে একটা দু'চার বছর থাকার মতো ঠেকও ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। কিন্তু ঐ যে... যাহা চাই, ইত্যাদি... গোয়ায় একটি নাচের ঘরানা আছে, 'দেখন্নি'। সব চেয়ে বিখ্যাত দেখন্নির গানটি কম্পোজ করেছিলেন কার্লোস ইউজেনিও ফেরেরা, ১৮৮৭ সালে। সাকিন, কর্জ্যুয়েম, আলডোনা। তাঁর ভাই এডুআর্ডো ছিলেন পিয়ানোবাদক। ১৮৯৫ সালে পারীতে 'কোঙ্কনী ব্যালাড' নামে এই সুরটি বাজিয়ে খ্যাত হয়েছিলেন। অনেক পরে, ১৯২৬ সালে তিপোগ্র্যাফিয়া র্যা ঞ্জেল গানটিকে আবার গোয়ায় ফিরিয়ে আনেন। দেখন্নি'কে নৃত্যপরা বালিকাদের গানও বলা হয়। একটি মেয়ে বন্ধুর বিয়েতে যাবে নদীর ঐ পারে। মাঝি কিন্তু রাজি নয়। খুব দরাদরি করছে। মেয়েটি তাকে ফুল দিলো, অলংকার দিলো, কিন্তু মাঝি রাজি নয়। সে মেয়েটির থেকে একটি চুম্বনের প্রার্থী। তা না নিয়ে সে আর ছাড়বে না। ফেরার পথে আবার একই দুর্যোগ। মাঝি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেনা। তার আরো বেশি কিছু চাই। মেয়েটি তার আরাধ্য দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করে। হামলাবাজ দুর্বৃত্তকে আঘাত করে নদীতে নিক্ষেপ করে। নিজেই নৌকো বেয়ে ঘাটে পৌঁছে যায়।ভোরবেলা ক্লান্তপায়ে বাড়ির পথে ফেরা। বিষন্ন একলা মেয়েটির আকুতি এই গানে.... লোককথাটির পিছনে ইতিহাসের একটা বিষাদ-অধ্যায়ও লুকিয়ে আছে। সেকথা থাক এখন। এই সুরটি অবিকল অনুসরণ করে লক্ষ্মী-প্যারে সেই অবিস্মরণীয় গানটি বেঁধেছিলেন আমাদের জোয়ান বয়সে। এই গানের সঙ্গে পা মেলায়নি এমন ছেলে-মেয়ে ছিলনা সেকালে। হঠাৎ সেদিন আবার গানটি শুনে মনে পড়ে গেলো পুরোনো কথা। মূল গানটিও শুনলুম গোনজাগা কুটিন্হোর কণ্ঠে। সিনেমার গানের জাঁকজমক নেই তাতে। কিন্তু সেই একলা মেয়েটির আকুতিটি সমান ভাবে বরকরার। ট্রাম্পেটেও তার সুর এখনও নেশা ধরায়। আর মান্না'দার গলায় আমাদের কিশোরবয়সের স্বপ্নের গানটা না শুনলে তো ঠাকুর অনিঃশেষ পাপ দেবেন। তা কী আর সহ্য হয়....? ভিভা লা গোয়া... https://www.youtube.com/watch?v=eC2O1RnnQ0g
James
জেমস বন গয়া রাঁধুনী| @ভোঁদড় @ স্যার| Monk fish এর নাম শুনেছেন? আমার সাম্প্রতিক আবিষ্কার- প্রোডাক্ট অফ নিউজিল্যান্ড| Costco তে পাবেন মনে হয়| ব্যাটারা যদি আপনাদের দেশের মাছ ‚ হ্যালিবাট (ডু নট কনফিউজ উইথ ডিক চেনীর কোম্পানী - হ্যালিবার্টন) রাখতে পারে এখানে বেচবার জন্যে তাহলে আপনাদের ওখানে মঙ্ক ফিশ কেন নয়| আপনার পুরাতন বাবুকে জিগিয়ে দেখুন‚ পুয়োর ম্যানস লবস্টার| এমনই তার সোয়াদ! কি প্রকারে রন্ধন করিলাম? এই নিয়ে মম তৃতীয় প্রয়াস| প্রথমবার নো রিস্ক কালিয়ার রেসিপি মোতাবেক| দেখুন: https://www.fishex.com/seafood/recipes/rinas-fish-kalia একটু কনফি পেতেই ইম্প্রোভাইজেশান; সেসব প্রচেষ্টা কি এখানে উল্লেখ করা শোভন অথবা সাহসিকতার পরিচয় হবে‚ নামী দামী সকল Chefনীর এর ভিড়ে? (১) নো মোর ভাজা ভাজি| অতি নরম এই মাছ| একটু গ্রিল করে নিলেই হবে‚ আট থেকে দশ মিনিট @ ১৮০ সেলসিয়াস| (আমার ওভেন এর মাপে)‚ একটু জল বেরোয়‚ অফ করে শুকোতে দেবেন‚ বেশী আঁচে শক্ত ও বাদামী হয়ে যায়‚ ঐ স্যামনের মতো ই| আপনি তো আবার সাহেব| তাহলে একটু গোলমরিচের গুঁড়ো‚ এ ড্যাশ অফ লাইম‚ একটু সী-সল্ট আর ঐ সাদা থকথকে সস কি যেন নাম‚ তার্তার দিয়ে টুং টাং‚ কাঁটা চামচে উইথ বেকড পোট্যাটো‚ পাম্পকিন‚ রাঙাআলু দিয়ে মেরে দিতে পারেন| সঙ্গতে যথাযোগ্য সোমরস| নো ফ্যাট‚ নো গিল্টি ফীলিং| (২) ফিশ ফ্রায়েড রাইস ও হতে পারে| হয়ে ও ছিল! বক চয়‚ ব্রকোলি‚ মাশরুম‚ হ্যানা তানা; সয় সস‚ অয়েস্টার সস দিয়ে ঘুঁটে ছোট ছোট পুন্নি রাইস (আন্ধ্রা রাইস) দিয়ে মন্দ হয়নি| পেঁয়াজের কথা আর বললাম না‚ সে তো থাকবেই| (৩) আর আজকেরটা? স্যার‚ এক্কেবারে যা তা! পিয়োর পরীক্ষা নিরীক্ষা| না উতরোতেও পারতাম| ইন ফ্যাক্ট কেঁচিয়ে ফেলেছিলাম| উপকরণ ও পদ্ধতি নিম্নরূপ: গ্রিলড মঙ্ক ফিশ| ও বলতেই ভুলে গেছি‚ ফিলেট (আমি ফিলে বলে আঁতলামি করতে অপারগ‚ প্যারিস ইজ নট প্যারী যেমন চন্দনগর ইজ নট চন্দা'র নাগর)| বাঙলা গাদা'র মতো করে টুকরো করে কেটে নেবেন| পেঁয়াজ আর অল্প লাল ক্যাপসিকাম ভেজে- অবশ্যই কুচি কুচি‚ কালো জিরে‚ একটু পাঁচফোড়নের ছিটে‚ লঙ্কার গুঁড়ো এবং? বলেই ফেলি| লাহোরি ফিশ মশলা আর কোফতা মশলা দিয়ে নাড়াবেন‚ সামান্য আদাবাটা ও রসুনও| (কেন এই মশলা? আমি রন্ধন সম্রাট‚ মশলার হারেমে সকল প্যাকেট সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে‚ এই দুটো দেখে মনে ধরলো‚ বেছে নিলাম)| প্যাকেট থেকে সোজা কড়াই তে| এটাই এখানেই কেলো করে ফেলেছি‚ বেশী ঢালা হয়ে গেছে| তার উপর বড় বড় শেফ লেবুর rind ঘষে ঘষে দেয় দেখেছি‚ ঐ কর্মটি করে আমি আরও কেঁচিয়ে ফেলিতং| বেশ একটু হালকা তেতো| (লেবু কচলানোর মেটাফর আমা পানে কতবার যে বর্ষিত হয়েছে| বাট হু কেয়ারস!) একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা তো করতেই হয়| এই ধরুন মহকুমা সদরের ইশকুলে গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ গ্রামের মাল বি এ বি কমই শুধু জানতাম‚ সায়েন্স কি বস্তু‚ ফিজিক্স‚ কেমিষ্ট্রির নামই শুনিনি| অঙ্ক- ইয়েস| তো হেডস্যার ইন্টারভিউ নিয়ে বললেন সায়েন্সে ভর্তি হতে| সেই শুরু হলো ইমপ্রোভাইজেশনের‚ সারাটা জীবন ঐ করেই কাটালাম| ওহ ভাজা ভাজা হয়ে গেলে‚ গরম জল ঢালুন আন্দাজ মতো| এই বার মনে পড়েছে‚ আজ দই দিতে ভুলে গেছি| ঐ তেতো ভাবটা কেটে যেত| আমি ম্যানেজ করতে চেষ্টা করেছি‚ ট্যোমাটো পেষ্ট দিয়ে‚ ভাঁড়ারে diced টিনও ছিল না| সব উলটো পাল্টা হয়ে যাচ্ছে| একটু ফুটে এলেই নামিয়ে গামলায় (যাকে আপনারা মিক্সিং বাউল বলেন) ফেলে ফুররররর; মানে stick grinder দিয়ে ঘুঁটে নিলাম| এইটে কিন্তু খুব কাজের| পুরো ফ্লেভারটা মিশে যায়‚ ডুমো ডুমো ট্যোমাটো‚ পেঁয়াজ ঝোলে ভাসে না| এমনি যে কোন ঝোলে‚ ঝালে ব্যবহার করে দেখতে পারেন‚ ব্রথ টা সমান কনসিস্টেন্সির হয়‚ আর রঙও খোলে| তারপর আবার কড়াইতে (কড়াই= নন স্টিক পাত্র)| আন্দাজ মতো জল ঢেলে দিন| নুন মিষ্টি ‚ এই একটু সামান্য‚ অতি সামান্য চিনি ছড়িয়ে দিলেই হবে| এইবার চেখে দেখা| মশলা একটু বেশীই দিয়ে ফেলেছি‚ বেশ কড়া হয়েছে মালটা| আলু সেদ্ধ থাকলে ডুমো ডুমো করে দিলে টেনে নিতো; স্লাইসড কচুর মুখী handy ছিল‚ তাইই সই| টেনে নিল| একা একাই খেলাম‚ গৃহিণীর আজ নিরামিষ আহার‚ শ্রাবণের সোমবার কিনা | তা ভাল‚ তিনি খেলে কপালে দু:খ ছিল| আর‚ নিজের রান্না কি কখনও বিস্বাদ লাগে? দেড়খানা রুটি দিয়ে মেরে দিলাম| ওহ‚ ইয়েস‚ পুরো এক কিলো ফিলেট‚ খুবই মেহঙ্গা মাছ এটা‚ ২৭ ডলার কিলো| বাকীটা ফ্রীজায়িত‚ ফির কাভি| যেদিন খুব ক্ষিধে পাবে (আপনারা কাব্য করে বলবেন‚ অতীতের তীর হতে বহিবে বাতাস ) ফ্রিজ ফাঁকা‚ সেদিনের জন্য তোলা রইলো| জয়রামজীকী| ডি: উপরোক্ত পদ্ধতি আদৌ কোন স্বীকৃত রন্ধন প্রণালী নহে| মালের (সরি মাছের) দায়িত্ব আরোহীর!
ঝিনুক
"দিন চলে যায়, সবই বদলায় শুধু যে আমার এ মন যা ছিল থাকে তেমন পুরনো হয় না কত কি শোনা কথা, কত সুখ কত ব্যথা, হারানোর দলে লেখে নাম শুধু তুমি যে নাম লিখেছো মোছা যায় না ……" গাড়ি গান শোনায়, শুনতে শুনতে পার হয়ে যাই ব্যানফ ন্যাশন্যাল পার্কের চেনা পাহাড়, চেনা জঙ্গলে ঘেরা অতিচেনা পথ। এযাত্রা গন্তব্য চেনা গণ্ডি ছড়িয়ে অচেনা Yoho Valley.... আমাদের রাজ্য আর পাশের রাজ্যের সীমানায় রকির Yoho National Park... ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের একটা। আমাদের স্পর্শ, গন্ধ, পদধ্বনি তো বোধ হয় মুখস্থ হয়ে গেছে এই পাড়ার রকি আর তার জঙ্গলের। সারা বছরে কতবার যে হানা দিই পাহাড়ে তার কোন লেখাজোখা নেই, বিশেষ করে সামারের প্রায় কোন উইকএণ্ডই বাদ যায় না সম্ভব হলে। ইয়োহো পার করে, পাহাড় ডিঙিয়ে কেলৌনা, কামলুপস, ভ্যাঙ্কিউভার, সেও গিয়েছি একাধিকবার। কিন্তু পাহাড়ের এই দিকটাতে অনেকদিন ধরেই যাই যাই করেও যাওয়া আর হয়ে ওঠে নি। অবশেষে সেই ইয়োহো- প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আমাদের এই শহর থেকে, রওনা দিতে দিতে শুক্কুরবার বিকেল প্রায় সাতটা বেজে গেল। পৌঁছোতে পৌঁছোতে আলো কমে যাবে, তার ওপর যাত্রাপথের শেষটুকু খুবই খাড়াই আর অপ্রশস্ত, এক্কেবারে অপরিচিতও বটে। তাই সেই শুক্রবার রাতটা পথে একটা ছোট্ট ডিট্যুওর করে আইসফিল্ড পার্কওয়েতে mosquito creek-এর একটা লজে বুক করা ছিল। শহর ছাড়ার আগেই ডিনার তুলে নিলাম, আহ, সারাদিনের কাজের শেষে হীটেড সীটে আরাম করে পা মুড়ে বসে রিল্যাক্স করে খেতে খেতে পছন্দের গানের সাথে পাহাড়ের পথে, এমন কেন রোজ হয় না আহা!! কুচকুচে কালো মেঘ, অঝোর বৃষ্টি সারাটা পথে, পাহাড়ে বৃষ্টির প্যাশনই অন্যরকম, অন্যরকম তার ঝরার ধরণ। খুব poor visibility, হেডলাইট হাই বীমে দিয়েও সামনেটা প্রায় ঘষা কাঁচের মত, তার মধ্যে দিয়েই চলা। স্পীড লিমিটও কমিয়ে ৯০ করে দিয়েছে আজকাল পার্কের সীমানায় ঢুকতেই। যা হোক, ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা ঝরোঝরো বর্ষা নীচে ফেলে আরো ওপরে উঠে গেলাম, পরের আধা ঘন্টা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘের মধ্যে দিয়ে চলা। জানালার কাচ নামিয়ে দিলাম, কৌতূহলী মেঘেরা ঢুকে পড়ল জানালা খোলা পেয়ে (যারা দার্জিলিঙের ঘুম স্টেশনে বা অন্য কোন শৈলশহরে মেঘে ভিজেছেন তারা বুঝবেন কি বলতে চাইছি)। গাড়ির ড্যাশে দেখাচ্ছে ৭ ডিগ্রী, তবু ভীষণ ভাল লাগে চোখে মুখে গলায় মেঘের ভেজা ঠোঁটের ছোঁয়া। এই লজে আগে কখনো থাকি নি। লজের সাইন মিস করে টার্নটা পার করে চলে গেলাম বেশ কিছুদূর। সাড়ে দশটা বাজে, অন্ধকার হয়ে যেতে শুরু করেছে ততক্ষণে। পাহাড়ে জঙ্গলে আঁধার একটু যেন আগেই ঘনায়, তার ওপর আকাশ ভরা মেঘ। এই সব পাহাড়ি হাইওয়েতে একবার কোন টার্ন মিস করে গেলে আবার ঘুরে আসার জন্য বেশ খানিকটা রাস্তার ধাক্কা। গাড়ি ঘুরিয়ে লজের পার্কিঙে যখন পৌঁছোলাম, তখন এমন ঝুপঝুপে নিকষ অন্ধকার যে নিজের হাতখানাও আর ঠাহর হচ্ছে না। গাড়ি থেকে নামতেই জঙ্গল যেন কথা বলে উঠল ঝিঁঝিগুঞ্জনে। খুব কাছেই কোথাও বয়ে যাওয়া কোন ঝোরা বা ক্রীকের মৃদু কিন্তু একদম নির্ভুল আওয়াজ ভেসে আসছে। ঝিকমিক জোনাকির লক্ষপ্রদীপ জ্বলছে স্বাগত জানাতে। পায়ের কাছে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই সরু পায়ে চলা পথটা ধরে। একটু দূরে ছায়ার মত একটা বাড়ির আদল। সামান্য আলোর রেখা চুঁইয়ে আসছে বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে। ঘনঘোর জঙ্গলের মধ্যে গাছ কেটে এক খাবলা জমি খালি করে এই কাঠের লজটা বানানো হয়েছে, মোট চারটে বাংলো, প্রত্যেকটায় দুদিকে দুটো করে ঘর। বিজলি আছে, মুঠিফোনও কাজ করছে, তবে নো রানিং ওয়াটার। ভুল বললাম, রানিং ওয়াটারও আছে, তবে সেটা কলের জল নয়, বাংলোর পাশ দিয়েই কুলুকুলু বয়ে যাওয়া ক্রীক, মসকিউইটো ক্রীক। কি যেন একটা তড়বড় করে সরে গেল পায়ের কাছ থেকে,ভাবি খরগোস হবে হয়তো। আলো ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি একটা শেয়াল, দুই চোখে হলুদ আলো জ্বেলে সন্তর্পণে আমাদের জরিপ করছে। 'স্যরি বেটা', ওকে ওর মত থাকতে দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। শুধু শেয়াল কেন? ভালুক, নেকড়ে, ক্যিউগার সবই আছে এই জঙ্গলে। শুধু এই অন্ধকারে আহ্লাদ করতে না এলেই কাফি। টুপটাপ জল ঝরছে আমাদের উপর বৃষ্টিভেজা গাছগুলো থেকে। লজের সামনে পৌঁছোতেই মোশন সেনসর অ্যাক্টিভেটেড বাইরের আলোটা জ্বলে উঠল। গোটা উঠোনটা ভরে গেল ফ্যাটফেটে সাদা প্রাণহীন আলোয়। শহুরে মনটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, অন্য মনটা গিলটি কনসেন্সে মাথা নীচু করে, কি অন্যায্য উপদ্রব এমন একটা মেঘমেদুর বৃষ্টিধোয়া রোম্যান্টিক জঙলা রাতে! এই অনধিকার চর্চার জন্য মনে মনে ক্ষমা চাই নিভৃতচারী অরণ্যের বাসিন্দাদের কাছে। চেক ইন করে রাতের মত থিতু হওয়া গেল। কেয়ারটেকার বারবার বলে দিয়েছেন, রাতে ওয়াশরুমে যেতে হলে একা একা না যেতে। ভালুকের খাসতালুকের আঙিনায় লজটা। কাজেই এই চেতাবনি খুবই স্বাভাবিক। ও, ভুলেই গেছি বলতে, ওয়াশরুমগুলো সব বাঙলোর পিছনদিকে আলাদা আউটহাউসে। গোটা উঠোনটা পেরিয়ে যেতে হবে। এমনিতেই ঘুমের সঙ্গে আমার ভাসুর-ভাদ্রবৌ সম্পর্ক, অনেক সাধ্যসাধনায় তেনার দেখা মেলে। তায় অচেনা বিছানা (সে যতই আরামের হোক না কেন), মেঘবাদল সজল এমন পাইনগন্ধী রাত, রিমঝিম সুরে বহতা ঝোরার নুপুর বাজছে সমানে মাথার দিকে জানালার ওপারে। ঘুম কি আর আসে? সে আজ তেপান্তর পার করেও আরো কয়েক যোজন দূরে। সমানে উসখুস করতে থাকি, অন্ধকারেই জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করি। উফফ, কি কালো যে হতে পারে অন্ধকার!! কিচ্ছু দেখা যায় না। ঝিল্লিমুখর, শুনশান বাইরেটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। খুব ইচ্ছে করতে থাকে ক্রীকটার পারে গিয়ে বসতে। কিন্তু শোয়ার আগে আজ প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছে বাপ বেটা দুজনের কাছেই, কোন কারণেই আমি একা একা বেরোব না আজ রাতে অভিসারে। কাজেই একবার এপাশ, একবার ওপাশ। বিছানা থেকে নেমে ফায়ারপ্লেসে আগুনটা উসকে দিই, আর এক টুকরো কাঠও গুঁজে দিই। ঢকঢকিয়ে জল খাই বেশ কয়েকবার। একটা, দুটো, আড়াইটে, সময় আর এগোতে চায় না। এই ‘সময়’ ব্যাপারটাকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না, যখন তাড়া থাকে, সময় দৌড়োতে থাকে, শত চেষ্টাতেও তার সাথে তাল রেখে উঠতে পারি না। আর এই না-ঘুম রাতে সময়ও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে বাকি পৃথিবীটার সাথে! অবশেষে তিনটে প্রায় বাজে বাজে, কর্তা নড়ে চড়ে উঠলেন। আমিও তড়াক করে এক লাফে উঠে চেয়ারের উপর থেকে শালটা টেনে জড়িয়ে নিলাম ভালো করে। বাইরে পা দিতেই অবাক কাণ্ড, মেঘ-বৃষ্টি সব উধাও, চাঁদও পলাতক, কৃষ্ণা চতুর্দশীর নিবিড় রাত, আকাশটার নির্ভেজাল কালো বালুচরী আঁচলের প্রতি ইঞ্চিতে অযুত রুপালি তারার জরিন নক্সা আর একদম ঠিক মাঝ বরাবর থিরথিরে আলোর ঢেউয়ের মত ছায়াপথ, ঠিক যেন স্বর্গের সিঁড়িটি, মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে হলেই বুঝি হাত বাড়িয়ে ছোঁওয়া যায়। রাতের আকাশের রূপ জঙ্গলে যেমনটি, তেমন আর কোত্থাও সম্ভব না। জঙ্গলের অনেক আকর্ষণের মধ্যে এটা একটা মূখ্য কারণ। জঙ্গলে জঙ্গলে বহু রাত মাটিতে চিত হয়ে আকাশ দেখেছি, তারা গুণেছি। আমার জন্য অন্য লোকজন ঘুমোতে যেতে পারে নি, কিন্তু আকাশগঙ্গাকে এমনভাবে এর আগে আর কখনো দেখি নি, so up, close and personal.... "পুবদিগন্ত দিল তব দেহে নীলিম রেখা", সকাল হল একরাশ মুগ্ধতায়। সত্যি সত্যিই "শ্যামল সঘন নববরষার কিশোর দূতের" মতই ঠেকতে লাগল সদ্যস্নানসারা ঝিলমিলে জঙ্গলটাকে। রাতের রহস্য যত, দিনের আলোয় সব ঢাকা পড়ে গেছে। এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ালাম জঙ্গলের মধ্যে কিছুক্ষণ। সেই নাম লিখলাম একটা গাছে যত্ন করে। ঝোরাটায় পা ডুবিয়ে জল ছপছপিয়ে একটা কাঠবিড়ালিকে বেজায় চমকে দিলাম। বেচারা হকচকিয়ে পালাতে গিয়ে মুঠোর বাদামটা হাতছাড়া করে ফেলল। ক্ষতি পোষাতে আমার এক কামড় দেওয়া আপেলের যেটুকু বাকি ছিল সেটা ছুঁড়ে দিলাম। জলটা যথারীতি কনকনে ঠাণ্ডা। একটু পরেই পায়ের পাতা অসাড়। গ্লেসিয়ারের বরফগলা জলের কারণেই এই তল্লাটের যত নদী, ঝরনা, লেক, সবই এমনতরো ঠাণ্ডা। ক্রীকটার অন্যপারে একটা ক্যাম্পগ্রাউণ্ড। ঘুম ভেঙে উঠে লোকজন দিন শুরু করছে। কিছুক্ষণ বসে বসে দেখলাম তাদের প্রাতঃকালীন আড়মোড়া ভাঙা, হাই তোলা, স্টোভ জ্বালানো, কফির জল বসানো। একদম সোজাসুজি উল্টোদিকের টেন্টটা থেকে অল্পবয়সী দুটো ছেলেমেয়ে বেরিয়ে এল। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আদর করল, তারপর হাত ধরাধরি করে চলে গেল, সম্ভবত ওয়াশরুমের অভিমুখে। একটা টলোমলো বাচ্চা ছেলের হাত ধরে উস্কোখুস্কো তরুণ বাবাটি এসে বসল উল্টোদিকের পারে, স্মিত হেসে আমায় সুপ্রভাত জানালো। আমিও প্রত্যভিবাদন জানালাম। বাচ্চাটার চোখে তখনও ঘুম, কেমন বোধিগ্রস্ত চোখে ঝুম হয়ে বসে রইল বাবার পাশে। একটু পরে মা এল, হাতে ব্রাশ-পেস্ট। আমি উঠে পড়লাম। চা খেয়ে রেডি হয়ে নিলাম। আবার যাত্রা। লেক লিউইসে গিয়ে একবারে ব্রাঞ্চ সেরে আবার হাইওয়েতে পড়ার পরিকল্পনা। পথে ক্রোফুট গ্লেসিয়ার দেখতে ভিউপয়েন্টে দাঁড়ানো হল। সীমিত ফোটোসেশন, গাণুশের সাথে একটু ছোঁয়াছুয়িও খেলে নিলাম এক ফাঁকে। কতদিন পরে ছেলেটা সাথে এসেছে এবার! বড় হয়ে যাওয়া গাণুশ আমার আজকাল তো আর আমাদের সাথে সাথে বেড়ায় না সর্বত্র। তাই যতটা পারি উপভোগ করে নিই প্রত্যেকটা মিনিট। খাওয়াদাওয়া সেরে প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ আবার শুরু হল চলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেরিয়ে গেলাম রাজ্যের সীমানা। আধাঘন্টার মধ্যেই ইয়োহো পার্কের দুয়ারে। মধ্যে একটা স্টপ স্পাইর্যাল টানেল দিয়ে ট্রেন যাওয়া দেখতে। এই স্পাইর্যাল টানেল ব্যাপারটা শুধু কানাডাতেই নয়, সারা বিশ্বেই একটা ঐতিহাসিক পরিকাঠামো। কানাডার অ্যাটলান্টিক প্রান্ত থেকে প্যাসিফিক, কোস্ট ট্যু কোস্ট দূরত্ব ছ'হাজার কিলোমিটারেরও বেশি, আগাগোড়া ট্রেনলাইনে যুক্ত, যার নাম কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেইল। একটু আন্দাজ দিতে চেষ্টা করি, নিউ ইয়র্ক থেকে লণ্ডন সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার আর লণ্ডন থেকে কলকাতা প্রায় আট হাজার কিলোমিটার। বলাই বাহুল্য যে এই কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেল কানাডার ব্যাবসায়িক মানচিত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় দেশটা গোটা পার করে এসে এইখানে রকি পাহাড়ের মত একটা দুর্লঙ্ঘ্য বাধাকে ডিঙিয়ে যেতে হয় সেই ট্রেনকে। সে বড় সহজ কাজ নয়। এই রেলললাইন যখন প্রথম পাতা হয়েছিল, এই খাড়া পাহাড় পেরোন ছিল খুব ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ আর কষ্টসাধ্য যাত্রা। আগে পিছে এক্সট্রা ইঞ্জিন, শয়ে শয়ে অতিরিক্ত কর্মচারী লাগতো ট্রেনগুলোকে এই খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠাতে, ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে spur line লাগতো। ১৮৮৪ সালে প্রথম যে ট্রেনটা এই লাইনে রওনা দিয়েছিল, সেটা ডিরেইল হয়ে তিনজন কর্মচারী মারা গিয়েছিলো, তারপরে স্পার লাইন পাতা হয় ডিরেইলমেন্ট ঠেকাতে। সেই স্মৃতিতে স্মারক আছে ঐ স্পটে, যার নাম ছিল বিগ হিলস সেই যুগে, আছে পুরনো সেই স্পার লাইনগুলো আর ডিরেইল হয়ে যাওয়া একটা পুরনো লোকোমোটিভ। ১৯০৯ সালে ভ্দ্রস্থ গ্রেডের স্পাইর্যাল টানেল দুটো (লোয়ার টানেলটা ৮৯১ মিটার, গ্রেড ১৫ মিটার আর আপার টানেলটা ৯৯১ মিটার, গ্রেড ১৭ মিটার) তৈরী হয় এই খাড়াই পাহাড় নিরাপদে পেরনোর জন্য। It's an engineering marvel.... এই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ খুবই চ্যালেঞ্জিং, আজকের দিনেও। থেকে থেকেই পাহাড়ে পাথরের ধ্বস নামে, বৃষ্টি বেশি হলে মাডস্লাইড শুরু হয়, আর শীতে তুষারধ্বস তো আছেই। তবু সব বাধা অতিক্রম করেও মানুষ ঠিক পথ কেটে নেয়, ট্রেন যায়, ট্রেন আসে টানেল ধরে পাতা লাইন বেয়ে। টানেলের গল্প এখানেই শেষ করবো, যদি আরো জানার ইচ্ছে হয়, গুগলজ্যেঠুকে শুধালেই পাতাকে পাতা ইনফো পেয়ে যাবেন এই জোড়া টানেলের ব্যাপারে। জেট থেকে রকেটের গতিতে উত্তরিত হোক জীবন, চাই কি আলোর গতিতেই চলুক না, তবু ট্রেন ব্যাপারটা আদ্যন্ত রোম্যান্টিক হয়েই থেকে যাবে বলে আমার মনে হয়। কু-উ-উ-উ-উ-উ ঝিকঝিক করতে করতে ট্রেনটা টানেলে ঢুকে আবার বেরিয়ে চলে গেল পাহাড়ের অন্য পারে। যেতে যেতে প্রতিধ্বনি ফেলে গেল পিছনে পাহাড়ের দেওয়ালে দেওয়ালে। অজস্র স্বপ্ন ভিড় করে এল দুই চোখ ভরে আমার। সেই স্বপ্ন মেখে আবার রওনা দিলাম। ইয়োহো ন্যাশন্যাল পার্ক বলতে বেশির ভাগ দর্শনার্থীই এমারেল্ড লেক, ওয়াপ্টা ফলস বা বার্জেস শেল ফসিল বেড বোঝেন। কোনটাই ফেলনা নয়, কিন্তু ইয়োহো ভ্যালির সৌন্দর্য বা গরিমা কোন বর্ণনার অতীত। সাধারণত ক্যাম্পিং বা ব্যাকপ্যাকিঙের জন্যই লোকে ইয়োহো ভ্যালিতে হানা দেয়। চটজলদি ভেকেশনারদের ভিড় তাই বিশেষ নেই এই পথে। ভীষণ খাড়াই পাহাড়ি পথ ধরে একটার পর একটা switch back (hairpin bend) road বেয়ে আমরা এবার উঠে যেতে থাকি আমাদের Yoho Valley-র গন্তব্যে। এই সুইচ ব্যাকগুলোতে শুধু গাড়িটাই উঠতে পারে, গাড়ির লেজে বেঁধে ট্রেইলর নিয়ে যাওয়া যায় না, একচুল এদিক থেকে ওদিক হলেই পাশের খাদে ঠিকানা লেখা। শহুরে স্বাচ্ছন্দ্য বাদ দিয়ে একটি বেলাও বাস করা প্রায় অসম্ভব বলেই যাদের মনে হয়, আমরাও প্রায় সেই দলভুক্ত। কাজেই জঙ্গলে খোলা আকাশের নীচে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে ভালুক, হরিণ, ক্যিউগারের সাথে একটা রাতও কখনো ভাগ করে নেওয়া হয় নি। যতদূর অবধি গাড়ির চাকা গড়াতে পারে, দিনশেষে মোটামুটি চলনসই হোটেলের বিছানা একটা পাওয়া যায় গা এলিয়ে দিতে আর একটা পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, সেই পর্য্যন্তই অভিযান থমকে থেকেছে এতকাল। এই প্রথম জঙ্গল-পাহাড়ের এমন এক উপত্যকায় পৌঁছে গেলাম, যেখানে পথটা সত্যি সত্যি ফুরিয়ে গেল, কালো একটা সাপের মত আঁকাবাঁকা অ্যাসফল্টের রাস্তা শেষ হয়ে গেল একটা তকতকে পার্কিং লটে এসে। এর পরে যা কিছু সব পদব্রজে জঙ্গলের মাঝটি দিয়ে, পাহাড় ভেঙে। থাকার জন্য ক্যাম্পগ্রাউণ্ড রয়েছে গোটা চারেক, একটা লগকেবিন হস্টেল, আর আরো বেশ খানিকটা হাইক করে উপরে উঠে গেলে অ্যালপাইন ক্লাবের একটা ব্যাককানট্রি হাট। এই ভ্যালিতে সব থাকার ব্যবস্থাই সামার ওনলি। জুনমাসের মাঝামাঝি বা শেষ থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরু (ওয়েদার পারমিটিং), গ্রীষ্মের এই কটা দিনই খোলা থাকে ব্যকপ্যাকিঙের অতুলনীয় স্বর্গ, দুর্গম এই ভ্যালি। শীতের সময়ে নিত্য এভাল্যাঞ্চ থুড়ি তুষারধ্বস উপেক্ষা করেও কোন দুঃসাহসী যদি জমে যাওয়া ইয়োহো নদী বেয়ে স্কি করে উজিয়ে আসতে পারে তো বরফে ঢাকা এই গোটা ভ্যালি, পাহাড়্চূড়া, জঙ্গল, স-অ-অ-অ-ব একা তার। তণ্বী প্রপাতটির নাম Takakkaw falls... এটা বোধ হয় কানাডার সবচেয়ে উঁচু ফলসগুলোর একটা, প্রায় হাজার ফুট উঁচু থেকে উদ্দাম, উচ্ছ্বল কলহাসিতে মাতোয়ারা মরণপণ ঝাঁপ দিয়ে ঝরছে, সামার আর ফল-এর সমস্ত দিনরাত মুখর করে। দেখেই ছোটবেলার একটা ভুলে যাওয়া গান মনে পড়ে গেল..... "এখানে নেই কারো মুখে মুখোস কোন এখানে সবাই তো সহজ সরল, নেই তো মনে কারো গরল এসো-ও-ও, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, দূ-উ-রে কেন এসো পাশে, ঝর ঝর ঝরে ঝিলমিল ঝরনা, খিলখিল হাসি, ও খিলখিল হাসি...." Takakkaw.... শব্দটা আদতে ক্রী ভাষা থেকে এসেছে ('ক্রী' হল কানাডার সবচেয়ে বেশি কথিত বা প্রচলিত নেটিভ ভাষা) যার মানে হল magnificient ....... Yoho শব্দটাও ক্রী, মানে awesome, wonderful.... সার্থকনামা, কোন সন্দেহ নেই। পা ফেলা মাত্র সত্যি সত্যিই এই শব্দগুলোই মনে আসবে। Takakkaw falls-এর ঠিক পায়ের তলায় জঙ্গলের মধ্যে দুধারে ছড়ানো ক্যাম্পগ্রাউণ্ড, না বিজলিবাতি, না আছে কোন শহুরে আরামের আয়োজন। তবু কত মানুষ যে জঙ্গলের সঙ্গে সময় কাটাবার নেশায় তাঁবু খাটিয়েছে! পার ছুঁয়ে বয়ে চলেছে নিদারুণ খরস্রোতা হিমশীতল দুধসাদা ইয়োহো নদী। আক্ষরিক অর্থেই দুধের মত সাদা নদীটা, সুপারমিহি গ্লেসিয়াল পলির সাসপেনশন এত বেশি নদীর জলে। দূরে পাহাড়ের চূড়ায় ইয়োহো গ্লেসিয়ার নীলচে সাদা স্তব্ধতায় থমকে রয়েছে। না তাঁবু খাটিয়ে থাকি নি আমরা, আমরা ছিলাম জঙ্গলের মধ্যে হস্টেলিং ইন্টারন্যাশন্যালের সেই লগ কেবিনে, বাহুল্যবর্জিত অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু ছিমছাম বন্দোবস্ত হাতে গোণা অল্প কয়েকজন লোকের জন্য, সারা দিন হাইকিঙের শেষে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে রাতের মত বিশ্রাম নেবার একটা ঠেক। এই প্রথম অনেক অপরিচিত মানুষের সাথে একসাথে থাকার অভিজ্ঞতা হল। নটা সাড়ে নটা নাগাদ সূর্যটা পাহাড়ের পিছনে চলে যেতেই সমস্ত ভ্যালিটা এক অদ্ভুত আলোয় ভরে গেল। এমন মায়াগোধুলি আগে দেখি নি কোনদিন। পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ঢেকে ফেলল গোটা উপত্যকা, রাত নামার বেশ খানিকটা আগেই। পাহাড়ের পিছন থেকে তখনও অস্তসূর্যের আভা ঠিকরাচ্ছে, চূড়াগুলোতে সব আগুন ধরে গেছে বলে মনে হতে থাকে। অন্ধকার হয়ে গেলে গ্যাসের বাতি জ্বালানো হল সব ঘরে, সামনের টানা বারান্দায়। রান্নাঘরে স্টোভও সেই গ্যাসেই জ্বলে, স্নানের জলও সেই গ্যাসেই গরম হয়। নো মাইক্রো-ওয়েভ, নো টিভি, নো নেট, নো ফোন। না, সেল থুড়ি মোবাইলও অকেজো, কোন সিগন্যাল নেই। শান্তি, অপার শান্তি, জলপ্রপাতের কলধ্বনি, আর আদিম, অকৃত্রিম জঙ্গলের একান্ত আপনার ভাষা। হিডেন লেক অবধি, খুব ছোট্ট করে একটা হাইকিংয়ে গিয়েছিলাম আমরা দুপুরবেলা পৌঁছেই, যাওয়া আসা মিলিয়ে ছয় কিলোমিটারের কিছু বেশি। মানুষের ভিড় কম, পশুপাখিই বেশি। হাইকিং ট্রেইলে পাশাপাশি দুজন হেঁটে যাওয়া যায় না, এত সঙ্কীর্ণ আর তেমনি খাড়াই। ঘোরতর জঙ্গল। সবুজ লেকটার পারে বন্যজন্তুদের পর্যাপ্ত পায়ের ছাপ, হ্যাঁ, এমনকি ভালুকেরও। বোঝা গেল, এই লেকের জল খুব প্রিয় তাদের সবার। হরেকরকমের কাঠবিড়ালিদের কথা বাদই দিলাম, সেই দিনেদুপুরে আমাদের পরোয়া না করেই হরিণ, এলক, মাউন্টেইন গোট, বিগহর্ণ ভেড়া দিব্যি পাশে পাশেই চরে বেড়ালো। একটা হেলানো গাছের গুঁড়ির ওপর বসে চানাচুর, ক্যাণ্ডি, কোলা দিয়ে উদযাপন করা হল। ইয়োহো গ্লেসিয়ার অবধি আর যাওয়া হবে না এই যাত্রা, কারণ সেটা গোটা একটা দিনের মামলা। আমরা তো দিন অর্ধেক খচ্চা করেই এসে পৌঁছেছি। কাজেই রয়ে সয়ে লেকটাকে প্রদক্ষিণ করে আবার ফেরার পথ ধরা। সেই প্রদক্ষিণের পথে আমি আমার রিচ্যুয়াল সেরে ফেলি গাছের গায়ে প্রিয়নামটি লিখে ফেলে একফাঁকে। হাঁসফাঁস করতে করতে পাহাড়ে চড়াটা অবতরণের চেয়ে সহজ বলেই আমার মনে হয় সবসময়। এত খাড়াই বেয়ে নামা ভারি কঠিন কাজ। আর আগের রাতের বৃষ্টিতে সমস্ত পথটাই পিছল, জায়গায় জায়গায় দিব্যি ক্ষীণকটি ক্ষণিকের ঝোরা বয়ে চলেছে পথের মধ্যে দিয়ে। আমার গাণুশের জন্য তেমন কিছু অন্তরায় নয়, সে তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে লাফাতে অবলীলায় নেমে যেতে থাকে, কিন্তু আমার মত ভাঙাচোরা মানুষের জন্য সে বড় সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার পদস্খলন হল। আছাড় খেতে খেতে আমি যত না ভয় পাই, আমার মালিক তার চেয়ে দ্বিগুণ ত্রস্ত। এই বৃদ্ধ বয়সে এমন একটি নোকরানি বেঘোরে হারালে কি মনোমত আর একটি খুঁজে পাওয়া যাবে? কিন্তু সখা কোথায় পাই এই ঘোর অরণ্যে যে হাত ধরে নিয়ে যাবে আমায়? অগত্যা আমার গাণুশই ত্রাতার ভূমিকায় আমার হাত ধরে নামতে সাহায্য করে। হস্টেলে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রায় ছ'টা বেজে গেল। স্নান সেরে কম্যিউন্যাল রান্নাঘরে সাপার বানালাম অন্য বোর্ডারদের সাথে স্টোভ শেয়ার করে, গল্প করতে করতে, চিকেন ন্যুডল স্যুপ আর সসেজ ভাজা। শেষ পাতে চীসকেক। বাইরে উঠোনে পাতা কাঠের টেবিল চেয়ারে বসে সাপার। ওয়াইন দিয়ে আচমন, স্কচ দিয়ে মুখশুদ্ধি, আমার গাণুশের জন্য ওর পছন্দের বিয়ার। জঙ্গলের মধ্যে বসে খাবার স্বাদই কুছ অলগ হ্যায়, সে যত সামান্য খাবারই হোক না কেন। ডিসপোসেবল প্লেট, গ্লাস, কাটলারি নিয়ে গিয়েছিলাম। খেয়ে উঠে বাসন ধুতে আমার বিস্তর অ্যালার্জি.... আজ এতগুলো বছর পরেও। গার্বেজ ডিসপোস করে স্কচের গ্লাস রিফিল করে গ্লেসিয়ারের দিকে মুখ করে আরাম করে এলিয়ে বসলাম, ডানদিকে রইলো পাগলির মত খিলখিল করে হাসতে থাকা টাকাক্ক ফলস। প্রাকসন্ধ্যের আলো আঁধারিতে একটা ক্যিউগার দেখা করতে এল। হেলো, হাই, এমনকি একটা মিনি ফোটোসেশনও হল। একটা সজারুও এল। কিন্তু ক্যিউগারটার মত অমন স্পোর্টসম্যানশিপ থুড়ি স্পোর্টসক্যিউগারশিপ তার নেই কো মোটেই, আমাদের দেখেই এক ছুট্টে পালিয়ে গেল। ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘিরে এল। এল জোনাকিরা। শুরু হল ঝিঙুরের মেহফিল। হুল্লাট একটা ক্যাম্পফায়ার জ্বেলে দিল হস্টেলের কেয়ারটেকার। আমরা কয়েকজন গিয়ে গোল হয়ে ঘিরে বসলাম। কোমরে বাঁধা হাল্কা জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে নিলাম, হুডটা মাথায় তুলে দিলাম। সূর্য ডুবতেই হিম পড়তে শুরু করেছে। মোট চারটে গ্রুপ আগুন ঘিরে আমাদের বাদ দিয়ে। কেয়ারটেকার আর তার বান্ধবী, আর একটা কাপল লোক্যাল। জনাপাঁচেকের দল স্টেটস থেকে, আর সবচেয়ে বড় দলটা ইউরোপ থেকে, মূলত ফ্র্যান্স, তিনজন বেলজিয়ামের আর একজন বোধ হয় জার্মানি থেকে এসেছে। বেশির ভাগই তরুণ তুর্কি। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে গল্প জমে উঠল। মারশমেলো আগুনে সেঁকে খাওয়া হল সবাই মিলে। মাথার উপর তারায় বোনা অমানিশার তীব্র কালো আকাশের চাঁদোয়া, পিঠে বাতাসের হিমেল স্পর্শ, পায়ের কাছে প্রথম প্রেমের মত উষ্ণ আগুন, সে এক সুররিয়্যাল রাত। সেই তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে, আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে আনমনা হয়ে যেতে থাকে মন, নিরুচ্চারে বার বার বলতে থাকি, "ভালোবাসি ভালোবাসি"। ফরাসী একটি মেয়ে গান গাইতে শুরু করলো। আমার ফ্রেঞ্চ হিন্দির চেয়েও করুণ। কথা কিছু বুঝলাম, বেশিটাই বুঝলাম না। কিন্তু সুরটা মন ছুঁয়ে গেল। এর পরে সেই কেয়ারটেকার ছেলেটি আর তার বান্ধবী, মেয়েটাই গাইছিল, ছেলেটাও মাঝে মাঝে গলা মেলাচ্ছিল। আমার খুব প্রিয় গানটা, তাই আমিও গুণগুণ করি সাথে সাথে...... The embers of a fire still burning as they die Stay bright to keep us side by side Baby, there's no better time No better time, baby, we can't find Oh-whoa-whoa, oh-whoa-whoa With eternal love, the stars above All there is and ever was I want it all, I want it all I want it all, I want it all A blade of grass, a grain of sand The moonlit sea, to hold your hand I want it all, I want it all I want it all, I want it all..... ব্যাকগ্রাউণ্ডে ফলসের কলকল মিউসিক, শণশণ হাওয়া আর গাছেদের ফিসফিস সঙ্গত, সবাই মিলে কোরাসে গলা মেলায়, বার বার ফিরে ফিরে একটাই লাইন I want it all, I want it all.... মনে হচ্ছিল যেন জঙ্গলের গাছগুলোও সেই একই গান গাইছে ফিসফিসিয়ে, I want it all, I want it all.... দেখতে দেখতে বারোটা বেজে গেল। সকলে সমস্বরে হ্যাপি বার্থডে গেয়ে উঠল, একইসাথে ইংরেজি আর ফ্রেঞ্চে। আমিও গলা মেলালাম। ওদের দলের একটি মেয়ের ২৫ বছর হল এই রাতে। মুখে অনেক শুভেচ্ছা জানালাম, জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঘষে আদরও করলাম নিয়মমাফিক, কিন্তু মনে মনে অনেক ঈর্ষা দিলাম মেয়েটাকে, আমার যে পঁচিশ, আরো যত অভাগিনীর যত পঁচিশ ভেসে গেছে বা যাবে পচা পানাপুকুরে, তাদের তরফ থেকে। আগুন নিভিয়ে বিছানায় যাবার সময় হল। আমার জেন্টলম্যান বাবি সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে চলে গেল। সোজাসুজি বারান্দার পানে না গিয়ে আমি একটু ঘুরপথে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে রওনা দিই। মিত্তিরমশাই না পারেন ফেলতে, না পারেন গিলতে। শেষে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আর মধুবচন শোনাতে শোনাতে সেই পিছনে পিছনেই এলেন পৈতৃক প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। বললাম, "একটু ফলসটার কাছ থেকে ঘুরে আসি, চলো না".... উত্তর কি হবে জানাই ছিল। তাই আর কথা না বাড়িয়ে ওনার পিছু পিছু বাধ্য মেয়ের মত ঘরে গিয়ে দোর দিই। কেন যে মানুষ অকারণে এত ভয় পায় জঙ্গলকে! মানুষের থেকে ভয়ঙ্কর কোন জীব বিধাতা আজও গড়তে পেরেছেন কি? পরের দিনের সকাল তো বিদায়ী সকাল, মনখারাপের সকাল। পাহড়, জঙ্গল ছেড়ে ফিরে আসতে আদ্যন্ত জংলী আমার একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু তবু ফিরতে হয়। ব্রেকফাস্ট সেরে সব গুছিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিই। বাড়তি যা কিছু শুকনো খাবার সাথে ছিল, সব কাপবার্ডে রেখে দিলাম। এই ফেসিলিটি শুধুই গ্রীষ্মের অভিযাত্রীদের জন্য। কিন্তু এই রান্নাঘরটাতে কোন তালাচাবির ব্যবস্থা নেই। রান্নাঘরে যে কারো অ্যাকসেস সারা বছর যে কোন সময়ে। এক কাপ গরম জল কি দু'তিন প্যাকেট শুকনো স্ফ্যাগেটি বা ন্যুডলস, টিনের টুনা, সার্ডিন, হ্যাম, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, কফি, চাই কি খানকতক টি-ব্যাগ সারা বছরই মিলবে যে কোন সময়ে। যদি কেউ নিদারুণ অসময়ে এসে পড়ে সেইজন্য এইটুকু অতিথিসেবার ব্যবস্থা। পার্কিং লটে পৌঁছে দেখি, গাড়ির ডানদিকের পেছনের চাকা বসে গেছে। ভাগ্যি গাণুশ ছিল সেদিন সাথে। নাহলে যে কি হত ...... মিনিট পনেরোর মধ্যেই ফেঁসে যাওয়া চাকা পাল্টে স্পেয়ার লাগিয়ে ফেলল ও। জিনিষপত্র সব লোড করে ফলসের দিকে হাঁটা দিলাম কারো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই। দশ মিনিটের ছুটি মঞ্জুর হল যাবতীয় পাগলামি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। এক ছুট্টে একদম তার পায়ের কাছটিতে গিয়ে দাঁড়াই। আর সব প্রপাতের মতই তুমুল অবতরণের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে ছিটকে আসা জলের ছিটে আর বাষ্পের সম্মিলিত সমাহারে ভালোমত স্নান হয়ে যাবার যোগাড়। ভিজতে আমার চিরকালই ভালো লাগে। তাই থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভিজি কয়েক মুহূর্ত, মনে মনে চোখ বন্ধ করে কারো বুকে মাথা রাখলাম কি অজস্র চোখের দৃষ্টি উপেক্ষা করেই? তারপর আরো দুই পা এগিয়ে যাই, বিশাল এক শতাব্দীপ্রাচীন স্প্রুস গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে আমি এক পাগলি আর এক পাগলির একদম মুখোমুখি চুপ করে দাঁড়াই। তারপর জিন্সের পকেট থেকে আমার ছোট্ট ছুরিটা বার করি। খুব যত্ন করে খোদাই করি আমার প্রিয়নাম গাছটার পুরু বাকল খোদাই করে। খুব মৃদু স্বরে বলি, "মনে রেখো".... মানুষের দরবারে আমার যে দাবি কোনদিন কখনো নেই, জঙ্গলের কাছে কেন যে সেটাই চেয়ে মরি প্রতিবার, জানি না। তারপর ফেরার পথ ধরি, একটিবারও পিছু না ফিরে.....
সিনথিয়া আফরিন
James
পার্ট ২/২| এই দোকানী নিজে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় নির্জন মরুভূমিসম স্থানে খনন করিতেন‚ মূল্যবান gemstone এর খোঁজে বিশেষত: ওপাল| ওপালের বাঙ্গালা কি তাহা জানি না তবে বড়ই সুন্দর‚ নীল‚ সাদা বিভিন্ন রঙের ঝিলিক মারে| কিছু কিছু আবার সবুজায়িত শ্লেষ্মার ন্যায় দেখিতে| জেম-প্রসপেক্টিং অতীব কষ্টদায়ক ও আনন্দদায়্কও বটে| সংক্ষেপে সারি| এবারে দোকানীর সনে যাইবার প্রয়োজন দুই| গৃহিনীকে কে যেন বলিয়াছেন‚ পান্না ধারণ করিলে সংসার সুখের হইবে‚ অগাধ ধনরত্নের অধিকারী হইবো‚ কোলেস্টেরল কমিবে এবং পা ঘামিবে না! অনেক কষ্টে পান্নার ইংরাজী খুঁজিয়া পাইয়াছি| পিটার অর্থাৎ দোকানী একটি শস্তা পান্নার কুচি খুঁজিয়া দিয়াছেন| নম্বর দুই| রাধানগর বীচে তোয়ালে পরিহিত স্বয়ং আমি যখন ভ্রমণ করিতেছিলাম| কিঁউ তোয়ালে? একটি মাত্র হাফ পেন্টলুন লইয়া মূল দ্বীপ পোর্ট ব্লেয়ার থিকা হ্যাভলকে| কাছের সমুদ্রে ভিজিতং এবং শীতের রোদে নো ড্রাই| সঙ্গী সাথী সমভিব্যহারে গাড়ীতে তোয়ালে পরিহিত অবস্থায় ভ্রমণ| হু কেয়ারস! যবতক হ্যায় ক্রেডিট কার্ড‚ তবতক নো প্রবলেম| এমতবস্থায় বীচে ঘুরিবার সময় একটি লকেট খুঁজিয়া পাই| উহা কি এতবধি সন্দেহ ছিল‚ তবে ইহা কাচ নয় তাহা আন্দাজ করিতে পারি| পিটার বলিল‚ ইয়া মুনস্টোন| বাঙ্গালায় কি বলে? জোতিষীকে জিগাইতে হবে‚ ইহাধারণ করিলে আমার প্রাত:কৃত্য সুসম্পন্ন করিতে সুবিধা হইবে কি না| ডি: এযাবৎ এই দেবকান্তি অঙ্গে কুনো প্রকার অলঙ্কার মায় বিবাহের অঙ্গুঠী ধারণ করি নাই‚ ঠাকুরের ন্যায় গা চিড়বিড়াইয়া উঠে| আভি এই emerald কা কেয়া হোগা| পূর্বে গ্রামাঞ্চলে ধীবর সম্প্রদায়ের নাদান বাচ্চাদের কোমরে ঘুনসি দিয়া ফুটা পয়সা বাঁধা থাকিত‚ সেইরূপ কোন উপায়? (১৯)
মনোজ ভট্টাচার্য
এও এক একাকীত্ব ! আমার স্বামী কাজ থেকে এখনও ফিরল না কেন ? এত রাত হয়ে গেল ! – হাসিদির কথা শুনে প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে – এ ওর মুখের দিকে তাকায় । খানিক বাদেই আবার বললেন – ও, সে তো অনেকদিন হোল মারা গেছে – আসবে কি করে ! হিরুবাবু সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন । পড়ানো ছাড়া ওনার বেশ কতগুলো বাংলা ভাষার ওপর বই বাজারে প্রকাশ পেয়েছে । সেগুলো অধ্যাপক মহলে খুব আলোচ্য হয়েছে ! – তাছাড়া আশী ও নব্বইয়ের দশকের বাংলা সাহিত্যে প্রকাশিত ছোটগল্পের ওপর একটা সঙ্কলনও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল ! ওনার বত্রিশ পাতার সম্পাদকিয় লেখাটাও খুব ভালো হয়েছিল ! সেই হিরুবাবু কলেজ থেকে অবসর নিতে প্রায় বাধ্য হন । তার মাথার একটু গণ্ডগোল দেখা দিতে থাকল । মাথার গণ্ডগোল মানে যে পাগলামি তা নয় কিন্তু । স্নায়বিক দুর্বলতার জন্যে নানারকম সমস্যা দেখা দিতে থাকল । ক্রমশ ওনার একটা ধারনা হয়ে গেল – গাড়িগুলো যেন ওনাকে চাপা দিতে আসছে । প্রথমে ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতেন কলেজে যেতে । ক্রমশ রাস্তায় বেরতেই ভয় পেতে লাগলেন । শেষপর্যন্ত রাস্তায় বেরনো বন্ধই করে দিলেন ! - তাই কমপ্লেক্সের মধ্যে পরিচারকের হাত ধরে একেবারে ধার ঘেঁসে চলা ফেরা করতেন ! তখন আমি বিদেশ থেকে প্রায়ই যাতায়াত করতাম ! আমার সঙ্গে খুব আলাপ হয়ে গেল । ওনার ফ্ল্যাটে বসে আমাদের খুব আলোচনা হতো । মজার কথা আমি নান্দিকার ও কয়েকটা নাট্য গোষ্ঠীর যাদের চিনতাম – তাদের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল । এমন কি যাকে আমি চিত্তদা বলতাম – সেই চিত্তরঞ্জন ঘোষের সঙ্গে ওনারও আলাপ ছিল ! উনি যে সাহিত্য গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন – তাদের অনেকের সঙ্গে আমারও অল্প বিস্তর পরিচয় ছিল ! সেইসব আলোচনা খুব পরিস্কার ভাবেই হতো । গলায় কোন জড়তা ছিল না ! হিরুবাবুর সঙ্গে কথা হয়ে গেছিল – একদিন গাড়ি ভাড়া করে কলকাতায় কোথাও কোথাও ঘুরবো । - কিন্তু যেদিনই বলতাম – উনি বলতেন – আজ না ! আরেক দিন যাবো ! অর্থাৎ তার সেই স্নায়বিক দুর্বলতা কাটাতে পারছিলেন না ! তার পরের বছর – আমরা কলকাতায় এসে দেখলাম উনি খুবই অসুস্থ । শেষ পর্যন্ত – মারাই গেলেন ! – ওনার নিজস্ব কোন ছবি ছিল না বলে – আমার ফোনের কামেরায় তোলা ছবি এনলারজ করে শেষকৃত্যে ববহার করা হোল ! এসব চার বছর আগের কথা । তারপর হাসিদি আমাদের ফ্ল্যাটে এসেছেন বা আমরাও ওনার ফ্ল্যাটে গেছি ! দিব্যি কথাবার্তা ! কখনও অস্বাভাবিক মনে হয় নি তার ব্যবহার ! কিছুদিন পরে শুনলাম হাসিদি দুজন আয়া রেখেছেন দিনে-রাতে । প্রতিদিন ওদের আলাদা করে বাজার করতে দেন – যাতে কেউ না অসন্তুষ্ট হয় ! – আমরা ভাবলাম – দারুন বুদ্ধিমতী তো ! দুজন আয়াকেই খুশি করছেন ! – কথায় বলে লোভের হাত লম্বা হয় ! শুনলাম – হিরুবাবুর অনেক বই ছিল নানারকমের – সেগুলো নাকি চুরি হচ্ছে ! আবার হাসিদি কার কাছে অভিযোগ করেছে – ওনার গয়নাও সরে যাচ্ছে । ক্রমশ একতলার প্রতিবেশীরা অভিযোগ করা শুরু করল – ওদের কাছে গিয়ে হাসিদি অভিযোগ করে – আয়ারা চুরি করছে । আবার আয়ারাও অভিযোগ করে – হাসিদি নাকি তাদের চোর বলে । প্রায় রোজই চেঁচামেচি হয় ! আমি ও আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই ওনাকে দেখতে যাই । ওনার ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক ছিল তখনো । এরপর একদিন আমাকে বোঝাতে লাগলেন – উনি যে ঘরে থাকেন – সেই ঘরে নাকি কোন নকশাল ছেলেকে ছুরি দিয়ে মারা হয়েছে ! যতই বলি – এখানে কোন ফ্ল্যাট ছিল না – একটা কাগজ কল ছিল । ততই উনি বোঝাতে থাকেন – ঠিক কিভাবে ছেলেটিকে মারা হয়েছিল ! শ্যামবাজারে উনি যেখানে থাকতেন – সেখানে বেশ নকশাল ছেলেদের কংশালরা মেরেছিল । –অথচ শ্যামবাজারের বাড়িতে সুনীলবাবু শক্তিবাবুরা এসে কিভাবে ঘর নোংরা করে দিত । বিশেষ করে শক্তিবাবু ! শ্যামবাজারের কথা সঠিক ভাবে মনে করতে পারেন। হাসিদিকে একবার বলেছিলাম কাছের বৃদ্ধাবাসে থাকতে চান কিনা । তাতে উনি প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী বৃদ্ধাবাসের ওপর অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন । - আমরা কিন্তু বুঝতে পারছিলাম – ওনার কাছে কোন আয়াই কাজ করতে চায় না ! – হাসিদির এক ভাইয়ের সাথে আমার আলাপ হয়ে গেছিলো । কত করে তার ফোন নাম্বার চেয়েছি । কিন্তু পাই নি। একদিন রাতে ফেরার সময়ে দেখি হাসিদি – হাতে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সিকিউরিটির কাছে বলছে – একটু মুড়ি এনে দিতে । বাড়িতে খাবার কিছু নেই । শুনে খুবই খারাপ লাগে ! আপনার আয়া কোথায় ? ও তো মোড়ের মাথায় গেছে মেলা দেখতে ! আপনাকে বলে গেছে ? না । ওরা তো বলে যায় না । - আমি তো জানলা দিয়ে দেখতে পেলাম ! সে কী ! আপনি জানলা দিয়ে অত দূরে দেখতে পেলেন ? হ্যাঁ – এখান থেকে দেখা যায় তো ! - আপনি বিশ্বাস করেন না ! আপনার ভাইরা কোথায় থাকে ? আমার সঙ্গে দেখা করে না কেন ? ওরা তো ছাদের ঘরে থাকে – নম্বর জানি না ! অসংলগ্ন কথাবার্তা সবাই বুঝতে পারছে – অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে । অথচ ওনার এক আত্মিয় নাকি এই কমপ্লেক্সেই থাকে । এখানে এলে কারুর সঙ্গে কোন কথাই বলেনা ! – আর আমি তো বুঝতেই পারিনা – কখন আসে ! ওপর থেকে আমার স্ত্রী এক বাটি মুড়ি আর মিষ্টি দিল – তাই দিয়ে এলাম ! কি জানি সত্যি রাতে কিছু খাবার ছিল কিনা ! পরের দিন – হঠাৎ সন্ধে বেলায় লিফটে উঠে এসে আমাদের ঘরের বেল টিপেছে । আমি দরজা খুলতে – বলে – আপনি বলেছিলেন আমার আয়াকে বলবেন ! এখন ও এসে আমাকে কি অপমান করছে । খুব চেঁচামেচি করছে – বলেছে আমার হার খুলে দিতে । কেন ? – আপনার কাছে টাকা পায় ? বোধয় পায় ! এখনো তো মাস শেষ হয় নি ! – আমার কাছে তো টাকা নেই এখন ! আপনি আসবেন একবার ? ওর সঙ্গে একটু কথা বলবেন ? আপনার কথা শুনবে ! আমি তাড়াতাড়ি ওনাকে নিয়ে লিফটে করে একতলায় এসে দেখি । ওনার ফ্ল্যাট খোলা । কিন্তু কেউ নেই । ভেতরেও কেউ নেই ! বললাম – কই – কোথায় আপনার আয়া ? ভেতরে নেই ? তাহলে আপনার ভয়ে পালিয়ে গেছে ! – আবার আসবে কাল ! এলেই আপনি আমাকে বা যাকে হোক ডাকবেন ! – আর গেট বন্ধ করে রাখবেন ! কদিন পরে শুনলাম হাসিদি নাকি খাটের কাছে পড়ে গিয়ে মাথায় কেটে গেছে - ফুলে গেছে – ডাক্তার বলেছে সিটিস্ক্যান করতে । গিয়ে দেখি – এসব সত্যি । পরিচারিকার ওপর রাগ করে মুড়ির কৌটো ছুড়েছেন । আর সেই সময়েই জলের গেলাশ পড়ে ভেঙ্গেছে । - দেখে খারাপ লাগলো । ওনাকে বলে এলাম – ওনার একজন ভাইজি নাকি আসে –দেখতে ও পরিচারিকাকে নির্দেশ দিয়ে যায় । এবার এলেই যেন আমাদের সঙ্গে দেখা করে । কিন্তু সে যে কখন আসে – আমরা টেরই পাই না ! অন্তত তার সঙ্গে কথা বলেও তো কিছু করা যায় ! – এভাবে অসহায় অবস্থায় – যে কোনোদিন কিছু হয়ে যেতে পারে ! মনোজ
শিবাংশু
আমি ভারতবর্ষের মূল ভূখন্ডের বাইরে কখনও থাকিনি। আবার কলকাতা শহরেও বসবাস করার কোনও অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে আমি যেখানেই থাকিনা কেন, আমি একজন মূল স্রোতের ভারতীয় এবং শতকরা দুশো ভাগ বাঙালি। এই সত্ত্বাটিই আমাকে অন্য দেশবাসীর অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম করে। ---------------------- যে কোনো আলোচনার দুটি সমান্তরাল সমীকরণ থাকে। একটি আবেগসম্পৃক্ত আর অপরটি নিরাবেগ। আমাদের যাবতীয় জৈবিক বা আত্মিক সিদ্ধান্তগুলি আমরা এই দুটি পরিপ্রেক্ষিত থেকেই গ্রহণ করি। ------------------------- আবেগগ্রস্ত একটি অতিশয়োক্তি, যেমন, ' দেশের কুকুর ধরি, ফেলে বিদেশী ঠাকুর' আবার অপরপক্ষে ক্যাথেরিন মেয়োর চশমা পরে ভারতকে দেখা, যাকে গান্ধি বলেছিলেন 'Drain Inspector's Report', দুটো ই সমানভাবে ত্যজ্য। ------------------------------- আমার পিতৃকূলের পূর্বপুরুষ মোকাম কলকাতা থেকে পাশ দিয়ে ভারতের প্রথম শিল্পশহরে জীবিকাসন্ধানে এসেছিলেন। আবার মাতৃকূলের পূর্বসূরি তৎকালের সুদূর মাদারিপুর, ফরিদপুর থেকে এসে একই শহরে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের যা শিক্ষাদীক্ষা ছিলো তাতে তাঁরা অনায়াসেই কলকাতা বা ঢাকায় সম্মানসূচক বৃত্তি গ্রহণ করে থাকতে পারতেন। কিন্তু প্রায় একশো বছর আগে তাঁরা যেহেতু সেকালের হিসেবে সুদূর 'প্রবাসে' এসেছিলেন, তাই তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম ভারতবর্ষকে অনেক বেশি সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে চিনতে পেরেছে। তবে 'বাড়ির' টান তাঁদের মধ্যে এতো প্রবল ছিলো যে তাঁরা চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ' বেহারে আর থাকবো না', এমত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের 'চোদ্দ পুরুষের ভিটে'তে প্রচুর অর্থব্যয় করে বিশাল অট্টালিকা ও ভূসম্পত্তি ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। এপার বাংলায় আমাদের যে বিপুল ভদ্রাসন ছিলো, সেখানে বসবাস করার মানুষ না থাকার জন্য তা এখন আর আমাদের নেই। আবার ওপার বাংলায় তাঁদের অর্জিত যেসব ভূসম্পত্তি ছিলো, একটি সুন্দর সকালে তা সব বেহাত হয়ে যাবার শোকে সন্ন্যাসরোগে আমার মাতামহ অকালে কালগতি প্রাপ্ত হন। -------------------------------- আমাদের অনেকেরই ইতিহাস প্রায় একরকম। মানুষের শিকড়টা যে কোথায়, সেটা খুঁজতে খুঁজতেই তো আমাদের খোঁজাটা ফুরিয়ে যায়। -------------------------------------- কলকাতা তো একটা ভুঁইফোড় জায়গা। একশো বছর আগেও কোনও কলকাতার নাগরিককে 'বাড়ি কোথায়' প্রশ্ন করলে উত্তর আসতো বাঁকুড়া বা বরিশাল। কলকাতাকে 'বাড়ি' হিসেবে সাবর্ণ রায়চৌধুরি বা বৈষ্ণব চরণ শেঠের বংশধর জাতীয় লোকজন ছাড়া আর কেউ স্বীকার করতো না। এভাবেই নিজের 'বাড়ি' আমার কাছে একটা এনিগমা হয়ে থেকে গেছে। --------------------------- কৌটীল্য বলেছিলেন 'অপ্রবাসী' ও অঋণী' মানুষই সুখী। এই 'প্রবাস' একটি আবেগমাত্রিক অনুভূতি আর 'ঋণ' হলো নিরাবেগ হিসেবনিকেশ। 'প্রবাস' একটি শারীরিক অবস্থানজনিত মানসিক অপূর্ণতার অনুভূতি। যখন মানুষের জন্ম বা সামাজিক পরিচয়, তার আত্মমর্যাদা বা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যকে মর্যাদা দেয়না, তখনই সে প্রবাসী। 'ঋণ' একটি ঐহিক অপূর্ণতা, যেখানে তার ভৌত সুখস্বাচ্ছন্দ্য ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা বা অবকাশ থাকে। আমাদের শারীর বা মানসিক বেঁচে থাকায় উভয়েরই অন্তহীন প্রভাব আছে। কোনটিকেই অস্বীকার করার প্রচেষ্টা মূর্খতা মাত্র। ------------------------------------ নিজস্ব অভিজ্ঞতাপ্রসূত আমার একটা তত্ত্ব আছে। যতোদিন কর্মজীবনে মানুষ ওতোপ্রোত থাকে ততোদিন তার মনে 'শিকড়' বা 'অবস্থান' নিয়ে প্রশ্নগুলি তেমন প্রবল থাকেনা। কিন্তু তার পরে যখন তার সত্যিই একলা হবার সময়, তখন এই সব প্রশ্নই অমোঘ হয়ে ওঠে। কিন্তু যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকাটা চিণ্ময় জগতে, মৃণ্ময় জগতের মায়া কাটিয়ে ওঠাটাই শ্রেয়। মানুষ যতোক্ষণ বেঁচে আছে, মানুষের কাছেই আশ্রয় চায়, তার পর তো অনন্ত মাটিতে মিশে যাওয়া ছাড়া কোনও ব্যতিক্রম নেই। সেই মনের মানুষেরা যেখানে থাকবে সেটাই আমার সব পেয়েছির জগত। সেটা পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তেই হতে পারে। -------------------------- ছবির দোচালা বাড়িটি রাঢ়বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক-দেড়শো বছর আগে আমাদের ভদ্রাসন ছিল। আমার পিতামহ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গত শতকের প্রথম দশকে কলকাতা চলে যান। সেখান থেকে চাকরি নিয়ে প্রথমে উত্তরভারতে, তার পর জামশেদপুর। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে শিকড় ছিল বহুদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার ভয়ে আমার পিতৃদেবের বাল্যকালে কিছু সময় এই বাড়িতে কেটেছিল। তার পর তিনি আর আসেননি। খুব বিচিত্রভাবে সম্প্রতি আমরা দু ভাই এবং আমার ছোটকাকা রীতিমতো স্বর্ণসন্ধানীদের মতো অভিযান করে এই বাড়িটি 'তেলেনাপোতা আবিষ্কার' করেছি। সে গল্পও লেখার মতো। ইতিহাস, ভূগোল, সমাজতত্ত্ব, স্মৃতিকথা আর অন্তঃস্রোত যাপনের ইতিকথা। শিকড়ের সন্ধানে মানুষের অনিঃশেষ আকুলতা যেন। যেখানে আমাকে হাসপাতাল বা শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য মানুষকে ডেকে আনতে হবেনা, যেখানে তারা নিজেরাই অনাহূত, রবাহূত হয়ে এগিয়ে আসবে, সেটাই তো 'আমার সাড়ে তিন হাত ভূমি'। হাসনরাজার ঘর।
James
(১) বিষয়- Bigotry “একটা জাতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে "কালুয়া" "বাঁধাকপি" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন তখন তা রেসিস্ট বিহেভিয়র ই হয় । এমন শব্দ ব্যবহার করার পিছনে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান দেওয়া দুরের কথা -মানুষ এর প্রতি বিদ্বেষ ই পোষণ করা হয় । “ --- “যাইহক দেখেশুনে এক বাঁধাকপির ( সর্দারজী ) দ্বারস্থ হলাম আমরা ।“ “ছো: - কে যাবে তেতুলদের আড্ডায়? “ --- “আমার মতে কোনো মানুষকে জাতি‚ ধর্ম এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে ফেলে তার চরিত্র বিচার করা অত্যন্ত অসহনুভূতিশীল কাজ|”” “লাখ কথার এক কথা । আরো অনেক অনেক লাইক দিতে পারলে তাই দিতাম ।“ --- “নাক চ্যাপ্টা‚ চোখ সরু‚ পীতবন্নো‚ মানুষের মত দেখতে‚ মানে দুটো হাত‚ দুটো পা| সি-কারান্ত‚ C- দিয়ে শুরু------ এর জন্য মানেবই যদি লাগে‚ বলতে হবে‚ তুই খুব লাকি যে এই ভয়ানক জীবগুলোর সঙ্গে তোকে কোথাও কখনো ডিল করতে হয় নি| কিপ ইট দ্যাট ওয়ে………..-“ --- “ওহ - বুঝেছি এইবার| আরে কি বলছ” --- “আমার একটাই জিজ্ঞাস্য - নিউ জার্সী প্রভৃতি জায়গায় কি বিহারী বা উত্তর প্রদেশের ঐ অসভ্য লোকগুলো পৌছেছে ! - পশ্চিম বঙ্গে যেরকমভাবে ভিন প্রদেশের অসভ্য মানুষের আগমন‚ ও অসংস্কৃত আচরন … ================================================" (২) বিষয়- দেশকর্তব্য ABP অমর্ত্য সেন| এদেশের হাল হকিকত, ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এ দেশে এসে চব্বিশ ঘণ্টা অষ্টপ্রহর বসবাস করতে হবে। নব্য ভারতের নতুন ফরমান পেয়েছেন বস্টন নিবাসী ভারতচিন্তায় মগ্ন সেন মহাশয়। ………………………… তিনি নিয়মিত ছুটে যান গ্রাম-ভারতে। সম্যক বোঝার চেষ্টা করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের হালহকিকত, প্রতিনিয়ত আলাপ আলোচনা করেন সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষাবিদ, সবার সঙ্গে। মহাসাগরপ্রমেয় জ্ঞানের সঙ্গে প্রখর অন্তর্দৃষ্টি মিলিয়ে লেখেন, কথা বলেন, এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন। ……………………………………. অমর্ত্য সেনের এমনধারা আচরণ অনুচিত। অনুচিত, কারণ তিনি বিদেশে থাকেন! অর্থাৎ, জানা গেল, চিন্তার ভৌগোলিক গণ্ডি আছে, দর্শনেরও আছে কাঁটাতারের বেড়া! ………………….. Source: https://www.anandabazar.com/editorial/do-we-have-to-accept-this-stupid-intolerance-1.834584?ref=strydtl-state-topnav -------------------------------------------------------------------------------------- "এই রে দেশের প্রতি কোন কর্তব্য না করেই আপনি এমন লিখলেন যে? একেবারে একশো শতাংশ খাঁটি কথা । স্বাধীনতার পর থেকে আজ এই আবধি যেটুকু এগিয়েছে দেশ তা এ দেশের লোকেদের দ্বারাই সম্পাদিত হয়েছে । আমাদের এক এক জনের সমষ্টিই তো "দেশের লোক" সেখান থেকে আজ এই টেলিফোন জমানায় এসে পৌঁছনো গেছে‚ সে তো এমনি এমনি নয়| দেশের প্রতি সম্পাদিত কর্মের হাত ধরেই|" ---------------------------------------------------------------------------------- ডি: প্রফেসর সেনের পদরেণু যদি সমুদ্রের জলে মেশানো হয় তার এক বিন্দুরও যোগ্য নই|
চঞ্চল
(১৪) সুর্য অস্তাচলের দিকে| আর সময় নেই| রুকমণি তৈয়ারি হয়ে বেড়িয়ে পড়ে কিলার পিছনের টিলার উদ্দেশ্যে‚ হাতে একটা প্যাঁটরা আর একটা থলে| পালিওয়ালদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার খবর সলিমকে নিশ্চয় খবরীরা দেয় নি| কারণ ওরা জানতে পারেনি নিশ্চিত| তাহলে সলিম আজ এত সেজেগুজে বিয়ে করতে যেত না| তাও সাবধান হওয়া ভালো‚ যেমন করেই হোক বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আজই রাতের অন্ধকারে এই রাজ্য ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে হবে| সলিমকে সে খুব ভালো করে চেনে‚ সেই ছোট থেকে দেখছে| নিজের ঈপ্সিত জিনিস না পেলে যে সলিম কতখানি নৃশংস হতে পারে তা আর জানতে বাকি নেই তার| টিলার পাশে মেয়েটা একটা ছোট পুঁটলি বুকের কাছে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| মেয়েটাকে এই প্রথম দেখল রুকমণি| সত্যি সুন্দরী| মেয়েটার মুখে বিষাদের ছায়া দেখে রুকমণির কষ্ট হয়| কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করে ‚' কিছু ভাবিস না বহন‚ আমি তো আছি তোর সাথে| আমি বেঁচে থাকতে কেউ তোর বাল ভি বাঁকা নহি কর পায়েগা|' লিলা কোনদিন বাপুসা আর মাসাকে ছেড়ে একা কোথাও থাকেনি‚ রুকমণির আশ্বাস পেয়ে লিলার রুকমণিকে বড় কাছের মানুষ মনে হল | সেও আঁকড়ে ধরল রুকমণিকে| একটা উটের গাড়ি আগে থাকতেই তৈয়ার হয়ে অপেক্ষা করছিল| ওরা দুজনে উঠে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল গ্রামের দিকে| একটা চিন্তা রুকমণির মনকে নাড়া দিচ্ছে‚ ঐ শয়তানটা গ্রামে গিয়ে কাউকে না পেয়ে‚ না জানি কি উৎপাত করছে? গ্রামে তো বাপুসারা আর পন্ডিত ছাড়া কেউ নেই| কার ওপরেই বা অত্যাচার করবে? মনে মনে হঠাৎ বেশ একটা কৌতুক অনুভব করে সে| বাপুসারা তো সলিমের খবরী‚ তাই বাপুসাদের নিশ্চয় কিছু করবে না| রইল পন্ডিত‚ কিন্তু পন্ডিতজী যথেষ্ঠ বলিষ্ঠ মানুষ‚ সলিম তাকে বেশ ভয় করেই চলে| গাড়ি ছুটে চলেছে পাকা রাস্তা ধরে| আজ যেন নিজেকে হঠাৎ করেই বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে রুকমণির| অবশ্য হভেলীতেও সে স্বাধীনই ছিল| তবু কেন এমনটা মনে হচ্ছে? হয়ত মেয়্কাতে যখন মেয়েরা যায় এমনটাই সবারই মনে হয়| তারও যদি বিয়ে হয়ে যেত‚ তাহলে এই রক্ষাবন্ধনে সেও যেত ভাইকে রাখী বাঁধতে| আরে কালই তো রক্ষাবন্ধন ছিল| 'একবার রোকনা'‚ রুকমণি উটওয়ালাকে বলে গাড়ি থামিয়ে কাছেই কিছু খোলা দোকানের একটায় ঢুকে রাখি চাইল‚ 'ভাই এক রাখি দেনা?' 'রক্ষাবন্ধন তো কাল ছিল?'‚ দোকানী অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে| গতদিনের বিক্রি না হওয়া রাখি থেকে কয়েকটা রুকমণির দিকে এগিয়ে দিল| রুকমণি তার মধ্য থেকে একটা ভালো রাখি বেছে নিল| 'হা ভৈয়া‚ কাল তো যেতে পারিনি ‚ তাই আজ যাচ্ছি'‚ পয়সা দিতে দিতে রুকমণি উত্তর দিল| দোকানী হাসিমুখে পয়সা নিয়ে গল্লাতে রাখল| রুকমণি গাড়িতে উঠে উটওয়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল‚'ভৈয়া‚ থোড়া জলদি চলাও না|' সারা রাস্তাতেই লিলা চুপচাপ বসেছিল গাড়িতে| এখনও রুকমণির রাখি কেনা দেখেও কিছু বলল না| অন্ধেরা হয়ে এসেছে‚ গাড়ি পাকা রাস্তা ছেড়ে এবার কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছে| বালির ওপর উটের গাড়ির চাকার ঘসঘস আওয়াজ আর উটের গলার ঘন্টির আওয়াজ ছাড়া বাতাবরণে আর কোন আওয়াজ নেই| দুরে গ্রামটাকে আবছা দেখা যাচ্ছে বটে‚ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না তো| আগেও রাতের দিকে গ্রামে এসেছে রুকমণি‚ দুর থেকেই গ্রামের আলো চোখে পড়ত‚ আজ কিন্তু কোন আলো দেখা যাচ্ছে না| গ্রামের দিকে তাকিয়ে লিলা ফুঁপিয়ে উঠল| রুকমণি লিলাকে কাছে টেনে নিল| 'কাঁদিস না রে বহন‚ কালই তো তুই তোর মাসা আর বাপুসাকে দেখতে পাবি| এখন চুপটি করে বোস| আমি চট করে আমার বাপুসা আর ভাইকে নিয়ে আসি| | ভয় পাবি না তো একলা থাকতে?' লিলা ঘাড় কাৎ করে জানালো যে সে ভয় পাবে না| গাড়িটা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছুতেই সে দাঁড় করিয়ে দিল| এখানে থেকে হেঁটে গেলে একশো কদম মত লাগবে| তা লাগুক কিন্তু গাড়ি এখানে দাঁড় করিয়ে রাখাই ভালো| রক্ষীর তো এখানেই থাকার কথা| গেল কোথায় লোকটা? হঠাৎ করেই রুকমণিকে চমকে দিয়ে সামনে হাজির হল সেই রক্ষী| 'কি খবর?' রক্ষীর কাছে জানতে চাইল রুকমণি| 'এক গড়বড় হয়ে গেছে'‚ রক্ষী ইতঃস্তত করে বলল‚'সলিমজী এখনও নদীর পাড়ের খেমাতেই আছে|' 'সেকি‚ ও এখনও এখানে কি করছে?'‚ রুকমণি ঘাবড়ে যায়| 'ঐ মেয়েটিকে না পেয়ে পুরা পাগল হয়ে গেছে| আর তার উপর কে যেন বলেছে পালিওয়ালরা বাড়ির ভিতরে মাটির নীচে ধন-সম্পত্তি সব পুঁতে রাখে ‚ পালাবার সময় নিশ্চয় সব সম্পদ নিয়ে যেতে পারে নি| সেই শুনে‚ শহর থেকে কিছু লোক আনিয়ে সব বাড়ির ফর্শের খুদাই চলছে|' রুকমণি ভয় পেয়ে যায়‚ কিছু কিছু করে অনেক সঞ্চিত ধনই সে বাড়িতে সরিয়ে এনেছে| এই খুদাই করতে গিয়ে না‚ তার বাবার বাড়িতে নজর পড়ে| একটাই ভরসা যে তারা পালিওয়ালী না | সলিম শুধু পালিওয়ালীদের বাড়িগুলোতেই ধনের খোঁজ করবে | 'আমার বাপুসা আর ভাই কোথায়?' অধীর হয়ে জানতে চায় রুকমণি| রক্ষী কোন জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল| রুকমণির মনটা কু ডাকল‚ দৌড়লো নিজের বাড়ির দিকে| বাড়িটা গ্রামের বাইরে‚ প্রায় নদীর কাছে| হাতে নিয়ে নিল কোমরে গোঁজা খ্ঞ্জরটা| বেসুধের মত দৌড়ে সে নিজের বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালো| একটু শ্বাস নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা দুহাট হয়ে গেল| মশাল নিয়ে সেই রক্ষীও রুকমণির পিছু পিছু এসে দাঁড়িয়েছে| খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে এসে মশালটা উঁচু করে ধরতেই আঙ্গনের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখল বাপুসা আর ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ| এই দৃশ্য দেখে রুকমণি মেঝেতে বসে পড়ল| হাঁ করে চেয়ে রইল দেহগুলোর দিকে| তার জীবনের শেষ আশা-ভরসা সব শেষ হয়ে গেল| বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে‚ চোখ জ্বালা করছে‚ তবু চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না সে| চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল তার| চিৎকার করে কাঁদতে পারলে হয় তো এই জ্বালা কিছুটা মিটতো| এবার কি করবে সে? কোথায় যাবে সে ? তার তো সব আশা স্বপ্ন শেষ হয় গেল ? 'কে খুন করেছে এদের ? সলিম না আরও কেউ ?' রুকমণিগলার আওয়াজ সাপের হিসহিসানির মতো শোনালো | ‘হ্যা জি , এ হত্যা সলিমই করিয়েছে | তোমার বাপুসা ওর পা ধরে ওর জুতি মাথায় নিয়ে অনেক বলেছিলো যে তোমার ভাই কে ছেড়ে দিতে কিন্তু শয়তানটা কোনো কথা শোনেনি ওর', মাথা নিচু করে পুরো ঘটনাটা শোনায় রক্ষী| নাহ‚ এইভাবে শোক করে বসে থাকলে হবে না এখন‚অনেক কিছু করা বাকি এখনো| ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে‚ তারপর ধীর পায়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে| বাইরে বেড়িয়েই প্রথমে চোখ গেল মন্দিরের দিকে| কে যেন একটা মন্দিরে ঢুকছে না? কে ও? অন্ধকারে ঠাহর হয় না‚ তবু মনে হল লিলাই হবে| দৌড়ালো মন্দিরের দিকে| 'ওকে বলেছিলাম না গাড়ি থেকে না বের হতে‚ বেরলো কি করে ?' মেয়েটা ভারী অবাধ্য তো ! রুকমণি বার বার মানা করেছিল ওকে যে, উটের গাড়ি থেকে যেন না নামে| মনে মনে প্রশ্নগুলো করতে করতেই লিলার চিৎকার কানে ভেসে এল| পড়িমরি করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরের ভিতরে ঢুকল| রক্ষীও রুকমণিকে অনুসরণ করে মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছিল| আবার সেই একই দৃশ্য‚ পন্ডিতজী মেঝেতে পড়ে আছেন রক্তাক্ত শরীরে| রক্তে ভেসে গেছে ওঁনার চারপাশ| চোখটা বিগ্রহের দিকে‚ ঠোঁটে মৃদু হাসি লেগে রয়েছে| লিলা মেঝেতে বসে কাঁদছে‚ তার পাশেই রুকমণি ধপাস করে বসে পড়ে| শয়তানটা এঁনাকেও ছাড়েনি? কেন মারল পন্ডিতকে? কি দোষ ওঁনার? আর সহ্য করতে পারছে না রুকমণি| দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন| যতই শক্ত মেয়ে হোক রুকমণি, এতো মৃত্যু এক সাথে দেখে আর যেন সহ্য করতে পারছে না সে | এতো শয়তান ও কেউ হতে পারে? 'লিলাকে লে যাও গাড়ি মে| খেয়াল রেখো আমি ফিরে না আসা অব্দি ও গাড়ির থেকে কিসি ভি হালত মে যেন না নামে| আমি আসছি এখনি'‚ কঠিন ভাবে নির্দেশ দিলো সে রক্ষীকে| 'কিন্তু বাইসা আপনি একলা কি করবেন ? আমিও আসছি আপনার সাথে' রক্ষী কিছুতেই একলা ছাড়বে না রুকমণিকে. 'আমার জন্য ভেবো না | আমার কেউ ক্ষতি করতে পারবে না, তুমি যাও ওকে নিয়ে| আমি ঠিক ফিরে আসবো, চিন্তা করো না |' রক্ষী রুকমণির দৃঢ় কঠিন স্বর কে উপেক্ষা করতে পারলো না | অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে লীলা কে নিয়ে গ্রামের বাইরে চলে গেল | ওদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো | ওরা গ্রামের রাস্তায় অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই সে ভাবতে শুরু করলো এবার সে কি করবে | কয়েক মুহূর্ত ভেবে সে দৌড়ালো সৈন্যদের খেমার দিকে| খেমার পঞ্চাশ গজ দুরে সে দাঁড়িয়ে পড়ল| ভেতরে তখন খুব হৈচৈ চলছে| খুদাই করে যা কিছু পাওয়া গেছে তার ভাগ-বাঁটোয়ারা চলছে কুত্তাদের মধ্যে| সলিমের গলার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে| চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে| .... শালারা কুকুরের মত কামড়াকামড়ি করছে লুটের মাল ভাগ-বাঁটোয়ারা করার জন্য| লুট করে যা পাওয়া গিয়েছে তা সলিমের কাছে কিছুই না| এসব কোন কাজেই আসবে না| পালিওয়ালরা দামী কিছুই তেমন ছেড়ে যায়নি| তবুও খুদাই চলছে‚ দামী কিছু পাওয়া যাবে এই আশা করে| অনেক আগে থাকতেই খবর ছিল যে পালিওয়ালরা একটা যৌথ সঞ্চয় রাখে বিপদ-আপদে ব্যবহার করার জন্য| এখনও পর্যন্ত খুদাই করে তেমন বড় কোন গর্ত চোখে পড়েনি‚ সবই ছোটখাটো গর্ত বাড়ির মধ্যে| কোথাও না কোথাও তো হবেই সেই খজানা| যদি সেই খজানা ওরা নিয়ে গিয়েও থাকে তাও তো বড় গর্তটা পাওয়া তো যাবেই| এখনো যখন পাওয়া যায়নি‚ তাহলে পাওয়া যাবে আশা করতে ক্ষতি কি? এই ভরসাতেই য়ার-দোস্তরা মজুরদের দিয়ে খুদাই চালু রেখেছে| তা যা ইচ্ছে করুক ওরা‚ তার মনে শুধু একটাই কষ্ট আর অপমান যে লিলাকে সে পেল না| যেমন করেই হোক লিলাকে পেতেই হবে| সলিমের ইজ্জত দাঁও পে লেগে আছে| দুপুর থেকে অনেক দারু হয়ে গেছে| একটা অবসাদ যেন শরীর-মনকে কাবু করে রেখেছে| এদের চেঁচামিচিতে মাথা ধরে গেছে| একটু বাইরের তাজা হাওয়া লাগলে হয়ত ভালো লাগবে| নেশায় চুর সলিম টলমল পায়ে খেমার বাইরে বেড়িয়ে এল| নদীর ঠান্ডা হাওয়াটা ভালো লাগছে এখন| বুকভরে শ্বাস নিল সে| একটা চেনা ইত্ররের গন্ধ নাকে এসে লাগল‚ খুবই চেনা গন্ধটা| মনে করার চেষ্টা করল গন্ধটা কোথায় যেন পেয়েছে| গন্ধটা মনে হচ্ছে পিছনদিক দিয়েই আসছে| ঘুরে দাঁড়াতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠল সে| কে যেন দাঁড়িয়ে আছে| 'কৌন হ্যেয় রে তু?'‚ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল সে| ' আমি রুকমণি'‚ বলেই আর অপেক্ষা না করে| ঝাঁপিয়ে পড়ল খঞ্জরটা নিয়ে সলিমের ওপর| তারপর পাগলের মত এলোপাথাড়ি চালাতে থাকলে সলিমের পেটে‚ বুকে| রুকমণির এই আচমকা আক্রমণ সামলাতে পারে না সলিম‚ পড়ে যায় মাটিতে| কিন্তু রুকমণি থামে না‚ খঞ্জরের প্রতিটি বিষবিন্দু সলিমের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে চায় সে| প্রতিটা আঘাতের সাথে চেঁচাতে থাকে‚ ' বল বল কেন মেরেছিস আমার বাপুসা আর ভাইকে? কি ক্ষতি করেছিল ওরা তোর?' সলিম চিৎকার করে ওঠে আঘাত খেয়ে‚ তার চিৎকার শুনে খেমার থেকে কিছু সৈনিক বেড়িয়ে আসে| তারা সলিমের ঐ অবস্থা দেখে ঘাবড়ে যায়‚ বাকি সৈন্যদের চিৎকার করে ডাকতে থাকে| কিন্তু কেউই রুকমণির? ঐ ভয়ঙ্কয় রূপ দেখে এগোবার সাহস পেল না| 'বাইসা ‚ অব বস করো| উঠে এসো তুমি|' পিছনে কার একটা গলার আওয়াজ পেয়ে সম্বিত ফিরে পেল রুকমণি| হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়ালো| কেউই টের পায়নি‚ সেনাপতি হুকুম সিং তার সৈন্যদের নিয়ে কখন যেন রুকমণির পিছনে এসে নিঃস্তব্ধে দাঁড়িয়েছে| একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে‚ সেনাপতি নিজের সৈন্যদের আদেশ করল খেমার মধ্যে যে বাগি সৈন্যরা আছে তাদের বন্দী করতে| মহারাওলের এটাই আদেশ| মাটিতে পড়ে তখনও বিষের জ্বালায় ছটফট করছে সলিম আর রুকমণি পাথরের দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে| যেন সে সলিমের মৃত্যুটা উপভোগ করতে চাইছে | 'আপ যাইয়ে বাইসা| আমরা আছি এখানে| এই শয়তানের শেষ দেখেই আমরা যাব'‚ সেনাপতি হাতজোড় করে বললেন| দু-তিনবার অনুরোধ করার পর যেন সেনাপতির কথা রুকমনির কানে ঢুকলো | সম্বিত ফিরে পেয়ে সে এবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিলো | নিজের আলুথালু পোশাকটা ঠিক করে, যেন কিছুই হয় নি সে ভাবে আস্তে আস্তে সে গ্রামের দিকে রওনা দিলো | এখনো তো অনেক কাজ বাকি | সেনাপতি এক রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন রুকমণিকে তার গাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্য| রুকমনি হাত তুলে মানা করলো সৈন্য কে তার সাথে না আসতে | ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল | রুকমণি এসে দেখল লিলা চুপচাপ গাড়িতে বসে| এই বয়সেই মেয়েটা অনেক কিছু সে দেখে ফেলল| তার দদ্দুর এই নৃশংস মৃত্যু সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না| রুকমণিকে দেখে তার জন্যও চিন্তা হল| সে না হয় এই রুকমণি বাইসার সাহায্যে বাপুসা- মাসার কাছে পৌঁছে যাবে‚ কিন্তু ইনি কি করবেন ? 'এবার তুমি কি করবে বাইসা?' লিলা জানতে চায়| এই প্রথম সে কথা বলল| এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল রুকমণি| সত্যি তো এবার সে কি করবে? চমকে ওঠে লিলার প্রশ্নে| 'জানি না রে|' অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল সে| তারপর লিলার দিকে তাকিয়ে বলল‚ ' পন্ডিতজীকে কথা দিয়েছিলাম‚ তোকে তোর পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দেব| সে কথা আমি রাখব| তুই চিন্তা করিস না|' বলে লিলার পিঠে আশ্বাসের হাত রাখল| তারপর উটওয়ালাকে আওয়াজ দিল‚ ' চলো ভৈয়া চলো‚ বহুত দের হয়ে হয়ে গেছে|' হঠাৎই চারপাশ থেকে একটা গুমগুম শব্দ উঠল| মাটি দুলে উঠল জোরে| উটটা বিকট চিৎকার করে উঠল| উটওয়ালা জোরে আওয়াজ দিল‚ 'আপলোগ গাড়িসে উতর যাইয়ে‚ জলদি|' রুকমণি আর লিলা নেমে পড়ল গাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি| মাটিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যাচ্ছেনা‚ এত জোরে নড়ছে| দুরে আর্ত চিৎকার আর পাথরের বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ যেন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে| একটু পরেই থেমে গেল সব| কিছু লোকের আওয়াজ বাদ দিয়ে আর কোন আওয়াজ নেই| আধো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে গ্রামের একটা বাড়িও আর আস্ত নেই| শুধু মন্দিরের চুড়োটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে| ওটাই একমাত্র ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাইনি| 'চলো ভৈয়া চলতে হ্যেয়| এখানে আর কার জন্য দাঁড়াবো আমরা|' হতাশ হয়ে বলল রুকমণি| গাড়িওয়ালা আর অপেক্ষা করল না| চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে দিল| আস্তে আস্তে অদ্ধকারে হারিয়ে গেল ওদের গাড়ি| পিছনে পড়ে রইল ভুমিকম্পে ধংস হয়ে যাওয়া কুলধারা গ্রাম, অনেক রহস্য আর গল্প বুকে নিয়ে| ………………. ক্রিং! ক্রিং! অফিস পিয়ন কে ডাকার জন্য বেলটা বাজালেন অমিতেশ স্যার | অমিতেশ নন্দী, নামকরা এক পাবলিশিং হাউসের এডিটোরিয়াল ডিরেক্টর | পাবলিশিং হাউসের মালিকের অত্যন্ত প্রিয় লোক | হবেন নাই বা কেন ? বইয়ের জগতের একজন নামকরা লোক তিনি | নামী- অনামী লেখকেরা এঁনার আশেপাশে ঘুরঘুর করেন | এঁনার কৃপা দৃষ্টি যার উপর থাকবে সে লেখক বা লেখিকা এক আধটা অ্যাওয়ার্ড যে পেয়েই যাবে সে ব্যাপারে সবাই এক মত | এই হাউস তো এঁনার নামেই চলছে | 'একটু সান্যাল বাবুকে ডেকে দাও তো !' ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন | একটু পরেই দরজায় টোকা পড়লো | 'আসতে পারি স্যার ?' 'আসুন ভেতরে, বসুন' শান্ত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | ' এটা কি ? ' হাতের ফোল্ডারটা সান্যাল বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন | সামনের চেয়ারে বসতেই প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন সান্যাল বাবু, সিনিয়র এডিটর | 'মানে স্যার ?' 'এটা কোন দিক দিয়ে গল্প লেগেছে আপনার?' একটু রাগত গলায় বললেন অমিতেশ স্যার | 'দেখুন রেকমেন্ড করছেন সে ঠিক আছে| কিন্তু একটা গল্প তো হওয়া উচিত নাকি? এই বাজারে রাজা রানীর গল্প কে পড়ে মশাই? আর এই ধরনের গল্প ছাপতে গেলে তো এই পাবলিশিং হাউস লাটে উঠবে ?' 'হ্যাঁ স্যার ' মিনমিন করেই বললেন সান্যাল বাবু 'আসলে স্যার, আমার খুব পুরোনো বন্ধু, সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে | গল্প লেখার খুব শখ ওর | খুব ইচ্ছে যে ওর নামে একটা বই বেরোক | তাই এনেছিলাম আপনার কাছে স্যার | যদি কিছু করে দেন |' 'আপনার কি মাথা খারাপ হয় গেল সান্যাল বাবু ? আমি এই বই ছাপাবো? তাও যদি একটু পদের হতো তাহলে না হয় আপনার কথা ভেবে দেখতাম | এ তো বাচ্চাদের বই, বড়োজোর টিভি সিরিয়াল হতে পারে এই গল্প থেকে, তার উপর না আছে, মানে ওই গরম করা কিছু ঘটনা, না আছে কথার খেলা, কোন দিক থেকে এইটাকে উপন্যাসের পর্যায় ফেলা যায় আপনিই বলুন না ? না না সান্যালবাবু আপনি বর্ষীয়ান স্টাফ এখানকার, আপনাকে অনেক সন্মান করি , কিন্তু সরি, আমি আপনার অনুরোধ রাখতে পারবো না | আমাকে তো এই হাউসের রেপুটেশনের কথা ভাবতে হবে না কি ?' বিরক্ত হয়েই বললেন | না না এ ছাপা যাবে না সান্যাল বাবু | আপনি বলে দিন ওঁনাকে, তবে ভবিষ্যতে যদি ভালো কিছু ওঁনার কলম থেকে বেরোয় তখন না হয় ভাবা যাবে |' 'ঠিক আছে স্যার, আমি বলে দেব ওঁনাকে, আমি যাই তাহলে ' একটু ক্ষুন্ন হয়েই বললেন সান্যাল বাবু | 'হ্যা, ঠিক আছে, আপনি বরং বিকেলে ছুটির পর ম্যানুস্ক্রিপ্টটা নিয়ে যাবেন আমার কাছ থেকে... আর হ্যাঁ, একটু পর সাগরদা আসবেন, ওঁনার জন্য ওঁনার পছন্দের নরম সন্দেশ আর ডাব আনিয়ে রাখতে ভুলবেন না যেন |' 'হ্যাঁ স্যার, আমি জানি উনি আসছেন, আমি আগের থেকেই আনিয়ে রেখেছি | কিন্তু স্যার এবারের উপন্যাসটা উনি আমাদের না দিয়ে সরস্বতী প্রেস কে দিয়ে দিলেন |এইটা কি উনি ঠিক করলেন?'কাজের কথায় এলেন সান্যাল বাবু | 'তা কি আর আমি ভাবি নি ভাবছেন? আসলে টাকা টাকা, বুঝলেন না? খাঁইটা ওনার বেড়েছে যে! আমি খোঁজ নিয়েছি, বেশ ভালোই টাকা দিচ্ছে ওরা | আমাদের ও কিছু ভাবতে হবে | আপনি বরং ওঁনার আগের বারের চেকটা তৈরী করিয়ে রাখুন | কিছু অ্যাডভান্স ও ওতে জুড়ে রাখবেন | দেখি কি করতে পারি' বেশ চিন্তাতেই আছেন যে স্যার বোঝা যাচ্ছে | 'ঠিক আছে, আমি রেডি করে রাখছি কিন্তু স্যার দেখবেন এবার পূজার লেখাটা যেন আমরাই পাই ' বলে কেবিনের দরজা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেলেন উনি | মনটা খারাপ হয় গেল একটু, গল্পটা এমনিতে এতো খারাপও ছিল না | কিন্তু বড্ডো মুষড়ে পড়বে শেখর | অনেক আশা করেছিল ও, এবারেরটা ঠিক বেরোবে ছাপা বই হয়ে | ওকে বরং বলবো অন্য কোনো পাবলিশিং হাউসের সাথে কথা বলতে | 'নমস্কার সান্যালদা , কেমন আছেন?' একদম সামনেই দাঁড়িয়ে সাগর, মানে সাগর ভৌমিক. বাংলার সবচেয়ে নামী-দামী লেখক | শুধু বাংলা কেন, বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও ওঁর গল্প নিয়ে বেশ কয়েকটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে | দাম তো হবেই ওঁর | 'আরে সাগর এস এস , স্যার তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন, যাও ভেতরে যাও' বলে, স্যারের ঘরের দরজাটা খুলে এক পাশে সরে দাঁড়ালো সান্যাল বাবু | 'আপনিও না সান্যালদা, দরজা খোলার কি দরকার আমি তো যাচ্ছিলামই ওঁনার ঘরে ' সংকুচিত হয়েই বললো সাগর | এই সম্মানটা সবাই করে সান্যালবাবুকে, উনিও তো কম দিন হলো না এই ইন্ডাস্ট্রিতে | সান্যালবাবু আর প্রেসের দিকে গেলেন না| কি জানি কোনো কিছুর দরকার হতেই পারে | উনি অ্যাকাউন্টস সেক্শনে গিয়ে পেমেন্ট রেডি করার নির্দেশ দিয়ে ফিরে ওখানেই একটা চেয়ারে বসে পড়লেন | এখন থেকে অমিতেশ স্যারের ঘরের দরজা দেখা যায় | দরকার পড়লে যেতে অসুবিধা হবে না | কিছুক্ষণ পর স্যারের ঘরের বেল বেজে উঠলো | পিয়ন ভেতরে গিয়ে একটু পরে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে এলো | 'কি রে, ওটা কি?' এমনিই অভ্যেসবশতঃ জিজ্ঞেস করলেন সান্যাল বাবু | 'স্যার বললেন ফটোকপি করিয়ে আনতে' পিয়ন কোনো রকমে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে বাইরের দরজার দিকে দৌড় লাগলো| 'বাইরে যাচ্ছিস কোথায়? ফটোকপি মেশিনে তো ওদিকে!' অবাক হয় বললেন উনি | ' না, স্যার যে বললেন বাইরে থেকে তাড়াতাড়ি করে করিয়ে আনতে, আমি তো বললুম যে এখানকার মেশিন থেকে করিয়ে দি? তাতে উনি বকা দিলেন আমায়, বললেন যা বলা হচ্ছে তাই করো, বেশি মাথা চালাতে হবে না তোমার !' সেও বোধহয় একটু অবাক হয়েই ছিল |নিজের মনে বকতে থাকে সে | প্যাকেটটা ওর হাত থেকে নিয়ে খুলে দেখলেন শেখরের হাতে লেখা ম্যানুস্ক্রিপ্ট| কোনো কথা না বলে প্যাকেটটা পিয়নকে আবার দিয়ে দিলেন সান্যালবাবু |হাত নেড়ে ওকে যেতে বললেন | বুঝতে তো আর কিছু বাকি ছিল না তার | আস্তে আস্তে উঠে উনি প্রেসের দিকে এগোলেন | পা আর চলতে চাইছে না তার | বিকেলে গিয়ে উনি কি বলবেন শেখরকে? এই খেলা তো উনি সারাজীবনই দেখে এসেছেন কিন্তু আজ নিজের বন্ধুর সাথে হওয়াতে বোধহয় বুকে বেশি করে লাগলো | শেষ|
শিবাংশু
নীরবতাই ভাষা সেখানে।শব্দ মানে ট্রেসপাস। দেবীর রাজত্ব। যতোদূর চোখ যায়। শাল, সেগুন, গামার, সিসু, কেঁদ, কদম, পলাশ, শিমুল। দেবতারা সারি সারি বনস্পতি সেজে দাঁড়িয়ে আছেন। লালমাটির পথ ওঠে পড়ে। বের, করমের ডাল গায়ে এসে পড়বে এদিকওদিক করলেই। দেবরিগড় অভয়ারণ্যের পথ চলে গেছে চউরাসিমল পর্যন্ত। একুশ কিমি। বড়াখাণ্ডিয়া আর চউরাসিমলের মাঝেই দেখা যাবে জঙ্গলসংসারের ছোটো তরফ, বড়ো তরফ। বাইসন, সম্বর, বুনো শুয়োর, জংলি কুকুর। হয়তো চিতাও দেখা দিয়ে দেবে মর্জি হলে। জায়গাটা হিরাকুঁদ বাঁধের উল্টোদিক। সম্বলপুর হয়ে যেতে হয়। মহানদীকে বেঁধে রাখা জলসাম্রাজ্য দেশের প্রথম নদীবাঁধ। তার বিপুলতা আর তো কোথাও দেখিনি। মহানদী নিজেই তো এক মায়ার প্লাবন। নিজেকে বারবার নতুন করে সাজায়। তার জন্মপ্রপাত ছত্তিসগড়ের সিহাওয়া পাহাড় থেকে ধামতারি, দণ্ডকারণ্যের মাঝখান দিয়ে ঢুকে যায় ওড়িশার পশ্চিম সীমান্ত। সম্বলপুর শহরের ধাত্রী মহানদী। সেখান থেকে পূর্বদিকে সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘপথের দুধারে সাজিয়ে রেখেছে সবুজের সাম্রাজ্য, জলের রাজতরঙ্গিনী। দেবরিগড়ের বনবাংলো একটা রূপকথার দেশ। অনন্ত জলের পারে, অরণ্যঘেরা একটা নীরবতার চুপসাকিন।তাই তার নাম 'নির্বাণ'। দিনের বেলা নীলজলের দিকে তাকিয়ে চোখের তরী বাওয়া। সাঁঝ ঢললেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নেইদেশের সীমাপার। দূর থেকে জলের শব্দ, বনের শব্দ, বনবাসীদের মেজাজে ডাকাডাকি। বাতি নিভিয়ে চুপ করে নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চাঁদ নিজের বাড়ি ছেড়ে পথে নেমে আসে। রাতে বেরোনো সখত মনা। কিন্তু ভোরবেলা উঠতে পারলে দেবী উজাড় করে দেন তাঁর অক্সিজেন আর ক্লোরোফিলের ভাণ্ডার। এমন একটা দিকশূন্যপুরের বনবাংলো, কিন্তু সেখানে এসি আছে, গিজার আছে, আছে নিরামিষ পদের ভোজ্য। জঙ্গলে আমিষ খাওয়া মানা যে। খরচটা হয়তো একটু বেশিই লাগে। সরকার বলেন বনভোজনে আসা উদ্দণ্ড জনতাকে আটকাতে নাকি এই ব্যয়বাহুল্য। যে যাই বলুক দেবরিগড় না গেলে কিছু ছেড়ে যায়। আবার ঘুরে আসতেই হবে...
শিবাংশু
জগন্নাথের প্রচলিত রূপটি হয়তো আর্যদের বিশেষ পছন্দ ছিলোনা। তাই একটি গল্পের অবতারণা করতে হয় তাঁদের। ভেসে আসা নিমকাঠটি থেকে দেবমূর্তির রূপ দেবার জন্য পিতামহ ব্রহ্মা'র ইচ্ছায় স্বয়ং বিষ্ণু এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে অবতীর্ণ হ'ন। তাঁর শর্ত ছিলো যতোদিন না কার্যসমাধা হবে, কেউ তাঁকে বিরক্ত করবে না। বেশ কিছুদিন পরেও যখন কাজটি সম্পূর্ণ হলোনা, তখন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পত্নীর অনুরোধে মন্দির কক্ষের দরজা বলপূর্বক খুলে দেখেন সেই ব্রাহ্মণ কোথাও নেই আর কিছু 'অর্ধসমাপ্ত' দারুমূর্তি রাখা আছে। আর্য অহমের একটি প্রকাশ এখানে পাওয়া যাবে। অনার্যদের কল্পিত জগন্নাথবিগ্রহ তাঁদের বিচারে 'অর্ধসমাপ্ত'। কারণ সেটি নান্দনিক বিচারে আর্য উৎকর্ষের নির্দিষ্ট স্তর স্পর্শ করেনা। আসলে এখন বিস্ময় লাগে, কীভাবে জগন্নাথবিগ্রহ স্তরের একটি সার্থক পরাবাস্তব শিল্পবস্তু সেই পুরাকালের শিল্পীদের ধ্যানে রূপ পেয়েছিলো। নিজেদের ধ্যানধারণা থেকে বহুক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদ বাধ্য হয়েছিলো জগন্নাথদেবকে নিজেদের বিষ্ণুকেন্দ্রিক প্যান্থিয়নে সসম্মানে স্থান করে দিতে। তার মূল কারণ দেশের এই প্রান্তে জগন্নাথের প্রশ্নহীন বিপুল লোকপ্রিয়তা। যেভাবে পূর্বভারতে প্রচলিত নানা শিব ও শক্তিভিত্তিক দেবদেবীদের জন্য ব্রাহ্মণ্যধর্মকে দরজা খুলে দিতে হয়েছিলো, সেভাবেই জগন্নাথও বিষ্ণুদেবতার সমার্থক হয়ে আর্য-অনার্য নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। এখনও জগন্নাথদেবের মূলপূজারী অব্রাহ্মণ, সাবর্ণ হিন্দুগোষ্ঠীর বাইরের মানুষ। সত্যিকথা বলতে কি সারা দেশে অন্ত্যজ, নিম্নবর্গীয় মানুষজনদের জন্য জগন্নাথমন্দিরের মতো এই পর্যায়ে 'শাস্ত্র'সম্মত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা আর কোথাও দেখিনি। কবি যখন বলেন, " জগন্নাথের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই...", একটি আর্ষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এহেন একজন ইতরের দেবতা, স্রেফ লোকপ্রিয়তার জোরে সর্বগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্যকে জিতে নিয়ে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্র 'জগতের নাথ'। হয়তো একটু অন্য রকমভাবে ভাবার দাবি তিনি রাখতেই পারেন। ব্রাহ্মণ্য অধ্যাত্মজগতে সম্ভবত এটিই একমাত্র সাম্রাজ্য যেখানে মুখ্য পূজারী দৈতপতির দল অনার্য শবরদের বংশধর। জগন্নাথ সৃজনের স্বীকৃতি হিসেবে অনার্যদের রাণী গুন্ডিচা, যিনি লোককথা অনুসারে একাধারে রাজা 'ইন্দ্রদ্যুম্নে'র মহীষী ও জগন্নাথ রূপকল্পের মুখ্য ধাত্রী, তাঁর গৃহে জগন্নাথকে বছরে মাত্র সাতদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হলো। সঙ্গে এলো কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের রথযাত্রার আয়োজন। যেহেতু 'ভগবানে'র মা কোনও মানবী হতে পারেন না, তাই তাঁকে মায়ের ভগ্নী মাসিমা হিসেবে সম্বোধন করা হয়। জগন্নাথ ধারণাকে ভ্রূণ থেকে সাবালকত্ব পর্যন্ত প্রতিপালন করার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান সমস্ত কৌম অনার্য মায়েদের গরিমান্বিত করে। 'গুন্ডিচা' শব্দটি মনে হয় দ্রাবিড়িয় ভাষা থেকে এসেছে। বীরত্বের সঙ্গে শব্দটির যোগাযোগ আছে। তিনি একজন অনার্য গ্রামদেবী। লোককথায় ইন্দ্রদ্যুম্নের রাণী । এভাবেই গুন্ডিচা'কে নিয়ে আর্য বৈষ্ণব দুনিয়াকে আপোস করতে হয়েছিলো। এই নারী বা দেবী জগন্নাথের কাছে যাননা, জগন্নাথ তাঁর কাছে আসেন রথে চড়ে। যাবতীয় ঐশী অহংকারকে তাকে রেখে। --------------------------------------- অনেকেই বিশ্বাস করেন জগন্নাথ আরাধনার ঐতিহ্য বৌদ্ধ মহাযানী পূজার্চনার বিবর্তন হিসেবে এসেছে। আগে উল্লেখ করেছি, বেশ কিছু পণ্ডিত জগন্নাথের নবকলেবরে 'ব্রহ্মস্থাপন'কে বৌদ্ধস্তূপের অন্দরে বুদ্ধের দেহাবশেষ রক্ষণ করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। চতুর্থশতকে ফাহিয়েন কলিঙ্গবাসকালে দন্তপুর নামক স্থানে বুদ্ধের দেহাবশেষ নিয়ে শোভাযাত্রা দেখেছিলেন। বর্তমানে এই আচারটি শ্রীলংকার ক্যাণ্ডিতে অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত যেমন উইলসন, ফার্গুসন বা কানিংহামসাহেব জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে বৌদ্ধ ত্রিরত্ন বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের সমতুল বলে মতপ্রকাশ করেছিলেন। বৈদিকধর্মে দেবালয় নির্মাণের কোনও প্রথা ছিলোনা। যাবতীয় জ্ঞান ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিলো মুনিঋষিদের আশ্রম বা অরণ্যকুটীরগুলি। বৌদ্ধধর্ম ও লোকাচারে উপাসনার কেন্দ্র হিসেবে স্তূপ বা চৈত্যের নির্মাণ প্রথম শুরু হয়। পরবর্তীকালে এই পথ অনুসরণ করে তন্ত্রমতে শিব বা শক্তির নামে দেবমন্দির তৈরি হতে শুরু করে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে অনেকেই তন্ত্রমতে নির্মিত বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য রত্নসিংহাসনের ভৈরব বা শ্রীচক্রের উপস্থিতি ছাড়াও মন্দিরের গায়ে মিথুনমূর্তি বা প্রচলিত দেবদাসীপ্রথা তন্ত্রচর্চার সঙ্গে সম্বন্ধিত লোকাচার। জগন্নাথের রথযাত্রাও বস্তুত অনার্যসমাজের প্রাচীন প্রথা। সনাতনধর্মে এর অনুপ্রবেশ বৌদ্ধরীতির হাত ধরেই। নাস্তিক্যবাদও জগন্নাথ ও বুদ্ধের মধ্যে একটা প্রধান যোগসূত্র। সনাতনধর্মে শৈব ও বৈষ্ণবদের মধ্যে দেবতা জগন্নাথকে নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে গত হাজার বছর। প্রাথমিকভাবে পূর্বভারতে অনার্য ও নিম্নবর্গীয় জনতার দেবতা শিব বুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। পিয়দস্সি অশোক ও মৌর্যশাসনের পর বৌদ্ধসংস্কৃতির নাভিকেন্দ্র যখন সম্রাট কণিষ্কের রাজত্ব , অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে সরে যায় তখন দেশের এইপ্রান্তে অন্ত্যজ, অনার্য মানুষজনের কাছে শিব বা মহাদেব ও বুদ্ধদেবের ভাবমূর্তির মধ্যে ব্যবধান প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো। যুক্তিগতভাবে সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু কুমারিলভট্ট, মণ্ডন মিশ্র এবং আদিশংকরের ক্রমাগত প্রয়াসে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারার পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিষ্ণুপূজক, বর্ণাশ্রমবাদী শক্তিগুলি আবার মানুষের অধ্যাত্মিক স্পেসটি দখল করে নেয়। মধ্য গুপ্তযুগে রচিত হরিবংশ বা শ্রীমদ্ভগবতগীতায় বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে বুদ্ধের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু পরবর্তী পুরাণযুগে, অর্থাৎ সনাতনবাদী পুনরুত্থান ঘটে যাবার পর সংকলিত পদ্মাপুরাণে লেখা হয় বিষ্ণু বুদ্ধশরীর গ্রহণ করেছিলেন। অগ্নিপুরাণেও বলছে বিষ্ণু শুদ্ধোদনপুত্র হয়ে জন্ম নিয়ে ছিলেন 'মায়ামোহ' নামক দানব প্রবৃত্তিগুলি নাশ করার জন্য। এছাড়া গরুড়পুরাণ, ভাগবতপুরান ইত্যাদি সংকলনে কোথাও বিষ্ণুকে জিনপুত্র (জৈনমতে) বা মোহনাশক বুদ্ধের অবতারে বর্ণনা করা হয়েছে। মোদ্দাকথা, বিষ্ণুপূজকরা পূর্ণ প্রয়াস করেছেন বুদ্ধকে নবম অবতার হিসেবে প্রতিপন্ন করতে। ওড়িশায় বিষ্ণুর নবম অবতার হয়ে এসেছেন জগন্নাথ। পুরীর মন্দিরে মূল প্রবেশদ্বার, সিংহদ্বারের শীর্ষে বিষ্ণুর দশ অবতারের মূর্তি রয়েছে। সেখানে হলধর ও কল্কি অবতারের মাঝে নবম অবতার হিসেবে জগন্নাথের প্রতিকৃতি দেখা যাবে। এছাড়া ভিতরে জগমোহনের সামনে গরুড়স্তম্ভের পাশের দেওয়ালেও দশাবতারের নবম সদস্য হিসেবে জগন্নাথকে দেখা যাচ্ছে। ওড়িশার সনাতনধর্মীয় ভক্তবৃন্দ বুদ্ধ ও জগন্নাথকে এক করেই দেখে এসেছেন পুরাণযুগ থেকে। ('নীলমাধব: একটি বিকল্প নিমপুরাণ' থেকে কিছু অংশ "দেবতার সন্ধানে-একটি অনার্য অডিসি")
শিবাংশু
তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে মননশীলতা লাগে। তথ্য নিয়ে কাজ করতে সতর্কতা। গত দুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তির তুমুল উত্থান এবং মধ্যবিত্ত মানুষের একটা বৃহৎ অংশের পেশা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা, আমাদের অভিনিবেশের দুনিয়ায় বিরাট ফারাক এনে দিয়েছে। বিশ্বের কোনও কিছুই এখন কল্পনা করতে হয়না। নিরন্তর ঘটনার ঘনঘটা টিভি বা নেটের মাধ্যমে শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছে। এই বিড়ম্বনা আমাদের অভিনিবেশকে কেন্দ্রিত হতে দেয়না। যা কিছু ঘটছে চারদিকে, তার সব কিছুই যে আমাকে জানতে হবে তার মানে নেই। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় না জানলে পিছিয়ে পড়বে। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষের কাছে 'পিছিয়ে পড়ার' চেয়ে বড়ো অভিশাপ আর কিছু নেই। সর্বদা সতর্ক থাকতে থাকতে সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্ট অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যায়। গুরু বলেছেন, সৃজনশীলতা উদ্বৃত্তের ফসল। যার জীবনে উদ্বৃত্ত সময় নেই, উদ্বৃত্ত প্রেম নেই, উদ্বৃত্ত আশা নেই, সে কিছু সৃষ্টিও করতে পারেনা। পড়াশোনা করা, গানবাজনায় রুচি রাখা, বাক্সের বাইরের জীবনকে ভালো বাসা, তার জন্য কিছু দিতে হয়। There is always a price tag। খুব কম মানুষই এখন পেশাগত জীবন আর আত্মগত জীবনের মধ্যে ছন্দটি বজায় রাখতে পারেন। সামাজিক জীবন বলতে সোশ্যাল মিডিয়া। জীবনের সার্থকতা-বিপন্নতা মাপা হয় লাইকের সংখ্যায়। সবাই 'আমাকে দেখুন' রোগে মুহ্যমান। Attention span শূন্য। শরীরটাই শুধু 'মানুষে'র রয়ে গেছে। এই জন্যই তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের একটা দারুণ পরিভাষা দিয়েছে, Body shopping। এর মধ্যে 'মননশীলতা' কোথায় ঢুকবে? 'মন'কে নিয়ে একটু ভাবার সময় কজনের কাছে আছে? নিজেদের সংস্কৃতিবান ভাবার বাঙালির একটা অহেতুক শ্লাঘা আছে। গভীর পড়াশোনা বা শিল্পচর্চা চিরকালই মুষ্টিমেয় কিছু লোকই করেন। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সেই সব লোকেদের সংখ্যা এখন বেড়েছে বই কমেনি। তাঁরা কদাপি লাইক সংস্কৃতির অংশ ছিলেন না, এখনও নেই। তাঁদের নিজস্ব সেরিব্রাল দুনিয়া চিরকালই ছিল, এখনও আছে। বুগু-স্মরণজিতের সূচক তাঁদের জন্য নয়। নীহাররঞ্জন রায়ের নাম আজ কজন জানে। আজ কেন? তাঁর নিজের সময়ও নীহাররঞ্জন বলতে লোকে 'গুপ্ত'কেই জানতো। তাতে হয়েছেটা কী? বাঙালিজাতি এখন সংখ্যায় অনেক বেড়েছে। তাঁদের বৃহদংশ বাংলা ভুলে গেছে। অস্তিত্বের যাবতীয় শিকড় উপড়ে ফেলে স্রোতের শ্যাওলা হয়ে গেছে। আর কী চাই? টিকে থাকার জন্য তাঁদের কাছে আর কোনও বিকল্প নেই। অবশ্য কেউ যেন মনে না করেন আমি তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের হেয় করছি। তাঁরা একটা সামাজিক পরিবর্তনের মুখ। তার মধ্যে ভালোমন্দ নেই। সেটা ঘটনা। একটু আগেই একটি সঙ্গীতবিষয়ক ওয়েবপত্রের কর্ণধার আমার কাছে জর্জদার উপর একটি লেখা চাইলেন। তাঁরা সুদূর বিদেশে থেকে সবরকম গানের সঙ্গে বাংলাগানেরও চর্চা চালিয়ে যান। আমি জানতে চাইলুম, কত শব্দের মধ্যে হতে হবে? তিনি জানালেন শব্দসংখ্যার সীমা নেই। আমার ধারণা থেকে বলি, কে পড়বে? এখন বাঙালি একাসনে বসে একশোশব্দের বেশি পড়তে পারেনা। তিনি জানান যাঁরা পড়তেন, তাঁরাই পড়েন এবং তাঁরাই পড়বেন। আমার লেখার উপর তাঁদের আগ্রহ আছে। বিশ্বাস করলুম। এখন যে বইটি নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত আছি তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুপাক। প্রকাশককে বলেছি, কে পড়বে এসব বই?এতো খরচ করে তিনি আমার বই প্রকাশ করেন। ব্যবসায় লোকসান হয়ে যাবে। তিনি জানালেন এই কথা আমি আগের বইটি সম্বন্ধেও বলেছিলুম। কিন্তু সে বই নাকি বইমেলার দশদিনে একশো কপির বেশি বিক্রি হয়েছে। প্রবন্ধের বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা নাকি একটা রেকর্ড। হয়তো তার দ্বিতীয় মুদ্রণও হতে পারে। বিশ্বাস করতে হলো। একাধিক অন্য প্রকাশকও যোগাযোগ করেন বই প্রকাশের প্রস্তাব নিয়ে। এটাও তো ঘটনা। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি যাঁরা মননশীল পাঠক বা শ্রোতা, তাঁদের সংখ্যা কমেনি। কমেছে লেখকশিল্পীদের ধৈর্য। তাৎক্ষণিক ফল না পেলে তৎকাল হতাশ হয়ে পড়েন। সমস্যা আমাদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে। অন্য কোথাও নয়।
সৃজিতা
আজ আড্ডার জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে অভিনন্দন জানানো ছাড়াও কিছু তো লেখা উচিত; এই ভেবে কাল রাতে লিখতে বসলাম। বসলাম বললে ভুল হবে, কারণ লেখার কাজটা আমি শুয়ে শুয়ে করছিলাম। এমনিতেই খেলা দেখে শুতে দেরী হয়ে গেছে। শুয়ে শুয়ে ভাবছি কি লেখা যায়। গত বছরের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গত বছর এই সময় আমি আড্ডায় এসেছিলাম। জন্মদিন উপলক্ষে ভূতের গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। ফেসবুক মারফত সেই খবর জানতে পারি। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই এই পাতায় আসা। তার আগে কোনো আইডিয়া ছিল না আমার যে এরকম একটা পাতা আছে। গল্প ভালো লিখতে পারিনি কিন্তু এই পাতা আমার মন টেনেছিল। রয়ে গেলাম সদস্য হয়ে। একবছর কেটে গেল। তাই ভাবলাম একটা ভুতের গল্প লিখি, আগেরবার ভালো লিখতে পারিনি। কিন্তু লিখবো বললেই তো আর লেখা যায় না। গল্পের একটা বিষয়বস্তু থাকা চাই, যেটা গল্পের আকারে সাজাতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ কে যেন জোরে ধাক্কা দিল। ঘুম ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। খাটের সামনে বিশাল একটা পর্দার মত কিছু আছে, অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, কে! কে ওখানে? ----আমি আড্ডা। -----আড্ডা কারো নাম হয় নাকি! সবাই তো আড্ডা মারে। -----আমি বাংলা আড্ডা। আড্ডা ঘরের সদস্য হয়ে আমাকে চিনতে পারছো না! -----ও তুমি। কিন্তু তুমি এরকম আকার ধারণ করেছ কেন? ভূতের মতো! ------সদস্যরা যদি আমাকে ভুলে যায় তাহলে আমার মৃত্যু ঘটবে। আর আমি ভূত হয়ে যাব। তাই তো সদস্যদের কাছে আমার অনুরোধ আমাকে বাঁচাও। ------অ্যাডমিনদের কাছে যাও। পুরোনো সদস্যরা থাকতে আমার মতো নতুনের কাছে কেন! ------নতুন বলে কি কোন দায়িত্ব নেই! যখন আড্ডায় প্রথম এসেছিলে সবাই আপন করে নিয়ে ছিল। এখন অন্যদের সব দায় চাপিয়ে নিজে সরে যেতে চাইছো! পুরোনোদের সাথে নতুনরা দায়িত্ব না নিলে পাতা এগোবে না। ------এটা তো ভেবে দেখিনি! কথা দিচ্ছি সবাই মিলে বাংলা আড্ডা কে এগিয়ে নিয়ে যাব। ছায়াটা মিলিয়ে গেল। জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। একটা নতুন দিনের শুরু হল। আড্ডা তিন পেরিয়ে চারে পা রাখলো। এইভাবে এগিয়ে চলবে। আড্ডাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখবোই।।
দীপঙ্কর বসু
মকবুল মিয়াঁর গরু হারিয়েছে । শান্তশিষ্ট গরুটা ভারি আদরের ছিল মকবুল মিয়াঁর ।গরুর কপালে একটা অর্ধচন্দ্রাকৃতি সাদা দাগ দেখে নাম রেখেছিল চাঁদকপালি ।আজ তিনদিন হতে চলল খোঁজ নেই চাঁদদকপালির । আর পাঁচটা দিনের মতই পরশুদিন খুকির মা অর্থাৎ মকবুলের বিবি ,সকালে গরুটাকে নিয়ে গিয়ে বাড়ির অদূরে খিড়কি পুকুরের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় খুঁটিতে বেঁধে রেখে এসেছিল ।ওখানেই গরুটা আপন মনে খুঁটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘাস পাতা খায় ,আবার মাঝে মাঝে গাছতলায় শুয়েবসে জাবর কাটে সারাটা দিন । তারপর বেলা পড়ে এলে খুকির মা ঘরের কাজকর্ম সেরে গরুটাকে ফিরিয়ে আনে ঘরে।কিন্তু পরশু বিকেলে গরু আনতে গিয়ে খুকির মা দেখে গরুটা গাছতলায় নেই ।কোথায় গেল সে ! আসেপাশে কোথাও তার চিহ্নমাত্র নেই ।ছুটতে ছুটতে বাড়ি এসে খুকির মা মকবুলকে খবরটা দেয় – চাঁদকপালিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা । পাড়াপড়শী কেউ বলতে পারলনা কিছুই ঘরের মাটির দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে আকাশপাতাল ভাবছিল মকবুল কি হল গরুটার কোথায় গেল সে !মকবুলের ভাবনায় বাধা পড়ল ।রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে গিয়ে মকবুলকে অমন অবস্থায় বসে থাকতে দেখে সাইকেল থামিয়ে মেহের আলি সামনে এসে দাঁড়ায় মকবুলের । “কি হল মিয়াঁ ,অমন হতভম্ব হয়ে বসে বসে কি অত ভাবছ ?” মকবুলএর মুখে গোটা বৃত্তান্ত শুনে গম্ভীর হয়ে যায় মেহের আলি । স্বগতোক্তি করার মত চাপা গলায় বলে ওঠে “হুমমম” তারপর একটু চিন্তা করে নিয়ে মকবুলের কাছে জানতে চায় “তা মিয়াঁ ,সব জায়গায় ত খুঁজে দেখলে কিন্তু একবারটি ইয়াকুব ভাই এর গদিতে খোঁজ নিয়েছ কি ? অই যে গ কালিতলার ইয়াকুব বালচাকা র গদিতে গ” ইয়াকুব বালাচাকা নামটা কানে যেতেই চমকে ওঠে মকবুল ।তাই তো ,ইয়াকুব বালাচাকার কথাটা তার মাথায় আসেনি তো !! অথচ গ্রামের আর সবার মতই মকবুলও জানে তেজারতি কারবার ছাড়াও ইয়াকুব বালাচাকার একটা চোরা কারবারের কথাও লোকের মুখে মুখে ফেরে ।কারবারটা আর কিছু নয় – সহজ কথায় গরুচুরি। তার চাঁদকপালির মতই গ্রামের এক আধটা গরু মাঠে ঘাটে চরতে চরতে হঠাৎ ই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়ে ঠাঁই পায় ইয়াকুবের কোনও এক গোপন খোঁয়াড়ে ।তারপর লোকমুখে কানাঘুষোয় সে খবর ঠিক পৌঁছে যায় গরুর মালিকের কাছে ।তার গরু ইয়াকুব ভাই এর হেপাজতে নিরাপদেই আছে ।অনতিবিলম্বে ইয়াকুব ভাইয়ের দাবি অনুযায়ী মুক্তিপণ বাবদ টাকা মিটিয়ে দিয়ে মালিক যেন নিজের গরু ফিরিয়ে নিয়ে আসে ।নচেৎ......। সে পরিণামের কথা মাথায় না আনাই ভাল । সেই হারিয়ে যাওয়া গরু হয় সুন্দরবনের খালবিল নদীনালা পেরিয়ে ভিন দেশে পাচার হবে নয় জবাই হবে । লোকে বলে মানুষ তো নয় ইয়াকুব বালাচাকা –সাক্ষাত নরপিশাচ একটা ।তা, লোকে যা বলে বলুক, তাতে ইয়াকুবের হবে কচু । মকবুলকে চুপ করে থাকতে দেখে মেহের আলি বলে “বলতো আমি খবর নিতে পারি ।আমি যাচ্ছি কালীতলাতেই। মনে হচ্ছে মন্দ কপাল তোমার ।এখন দেখ যদি কিছু খচ্চাপাতি করে গরু ছাড়িয়ে আনতে পার ।” বিকেলবেলাতেই খবর নিয়ে আসে মেহের আলি ।ঠিকই অনুমান করেছিল মেহের আলি ।মকবুলের গরু আছে ইয়াকুব ভাই এর খোঁয়াড়ে । মেহের এর অনুরোধে ইয়াকুব ভাই মকবুলের গরু ফেরৎ দিতে রাজি ,তবে তার জন্যে মকবুলকে দিতে হবে এক হাজার টাকা । “এক হাজার টাকা !!” মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মকবুলের । “কোথায় পাব ভাই এত টাকা” মেহের আলি সখেদে জবাব দেয় “কি আর করবে ভাই , গরু ফেরৎ পেতে হলে দুই একদিনের মধ্যে টাকাটা মিটিয়ে দিতে হবে ইয়াকুবের গদিতে” মকবুল হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে তার অল্প যে কটা টাকা সঞ্চিত আছে তা এবার বুঝি গেল গরুটার পেছনে ।কিন্তু ইয়াকুব যে ধরণের লোক তাতে তাকে কি বিশ্বাস করা যায়? ধর, টাকাটা পাবার পর ইয়াকুব যদি আবার নতুন কোন বায়নাক্কা ধরে তখন ?তখন কি হবে? তখন গরুতো গেলই আর টাকা কটাও মাঠে মারা গেল!” মকবুলের সন্দেহের কথাটা শুনে এবার মেহের আস্বস্ত করে ।“সে তুমি চিন্তা কোরনা গদিতে টাকা দিতে যাবার পথে বেদোখালির মাঠ পড়বে ,সে মাঠে যাতে তুমি তোমার গরুকে দেখতে পাও সে ব্যবস্থা নাহয় আমি করে দেব ইয়াকুব ভাই কে বলে । উপায়ান্তর না দেখে পরদিন মকবুল টাকাকড়ি নিয়ে হাজির হয় কালীতলায় ইয়াকুব বালাচাকার গদিতে ।পথে বেদোখালির মাঠের পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ে “ওই তো ,ওইতো তার আদরের চাঁদকপালি !কেমন নিশ্চিন্তে মাঠের মাঝখানে আপন মনে ঘাস খাচ্ছে ! বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে মকবুলের । মনে মনে কসম খায়,আজ চাঁদকপালিকে না নিয়ে বাড়ি ফিরবেনা । মকবুলকে ঘরে ঢুকতে দেখে ইয়াকুব বলে ওঠে “আরে মকবুল মিয়াঁ যে ,তা কি মনে করে ...? মকবুল মরীয়া ।সরাসরি কাজের কথায় আসে – “হুজুর আমার গরুটা কদিন হল হারিয়ে গেছে ।কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছিনি ,সেই অবস্থায় মেহের আলির কাছে শুনলুম আমার গরুটা নাকি হুজুরের হেপাজতে আছে ।মেহেরই বললে মকবুল শিগগির যা ইয়াকুব বাবুর পায়ে গিয়ে পড় । দয়ার শরীল বাবুর ।দেখবি ঠিক তিনি তোর দুঃখ ঘুচিয়ে দেবেন” । মকবুলের নিবেদন কানে যেতে ইয়াকুব এবার তার ছদ্মব্যস্ততা ছেড়ে টান টান হয়ে বসে ।নিজের নামের সঙ্গে বাবু ডাক শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে ইয়াকুব বালাচাকা । এত দিন ধরে জেনে এসেছে গাঁয়ের লোকে তাকে আড়ালে পিচাশ বলে ,সেই তাকেই কেউ মানী লোকদের মত বাবু বলবে এ তার স্বপ্নের অতীত । আগ্রহ চেপে রাখতে পারেনা ইয়াকুব । মকবুলকে জিজ্ঞাসা করে “কি বললে মেহের ? মেহের আমাকে বাবু বললে, বাবু ?তুই ঠিক শুনিচিস তো আমাকে ইয়াকুব বাবু বলেচে?” মকবুল মিনমিন করে অবাব দেয় “আজ্ঞে ,সেই কথাই ত বললে মেহের ।বললে বাবুর দয়ার শরীল । সামান্য কিছু টাকা বাবুকে নজরানা দিলেই ইয়াকুব বাবু তোর হারিয়ে যাওয়া গরু ফিরিয়ে দেবেন” “আরে থাক থাক ,তুই গরীব মানুষ ,তোকে আর টাকা দিতে হবেনা । বাবু বলেচে আমায় ! যা ওই বেদোখালির মাঠে তোর গরু চরছে ।আমার লোক আছে সেখানে ।তাকে গিয়ে বলবি ইয়াকুব বাবুর হুকুম হয়েছে তোকে গরুটা ফেরৎ দিয়ে দেবার।তা, হ্যাঁ রে তুই ঠিক শুনিচিস তো মেহের আমাকে বাবু বললে?” “আজ্ঞে আমি ঠিকই শুনেছি বাবু ,এবার তবে আমি আসি বাবু ? বেলা হয়ে এল ।এর পর গরুটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দিন কাবার হয়ে যাবে” ইয়াকুবের গলায় যেন মধু ঝরে পড়ে – “হ্যাঁ হ্যাঁ আর দেরি করিসনি ।জলদি যা ...। আমায় বাবু বললে !!”
মনোজ ভট্টাচার্য
ডন – তাকে ভালো লাগে ! চেতনা ! একটি উপাখ্যান ! ডন ছি হতে - একটি ফ্যান্টাসি নাটক হতে পারে ! কিন্তু আমি যা লিখছি – সেটা সত্যি ! এমনকি একাডেমী চত্বরে পাথরের দিব্যি ! কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে অন লাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে আটকে গেলাম ! এখানে আমি এখনও ক্রেডিট কার্ডে রপ্ত হতে পারিনি ! – তা হাল ছেড়ে দিয়ে ভেবেছিলাম – একাডেমীতে গিয়ে টিকিট কাটবো ! দুপুরে ফোন এলো । একাডেমী থেকে – আমরা কি অন লাইনে টিকিট কাটতে চাইছি ? – বললাম কোথায় আটকাচ্ছে ! একজন আছেন চ্যাটার্জি – উনি বললেন আরেকবার চেষ্টা করতে । যথারীতি হল না ! তখন আমার স্ত্রী ফোন তুলে সেই চ্যাটার্জিকে অনুরোধ করলো – আমাদের জন্যে টিকিট রাখতে । প্রথমে গাইগুই করে রাজি হল ! স্ত্রীর বক্তব্য – অরুন মুখোপাধ্যায়ের থিয়েটার আমরা প্রথম থেকে দেখছি ! -সিনিয়র সিটিজেন হওয়ার জন্যে ডিস্কাউন্ট দিচ্ছেন না ! একটা সুবিধে তো করবেন – টিকিট রেখে দিন ! আমরা গিয়ে নিয়ে নেবো । - যদিও অসুবিধে কি – ওদের - বুঝতে পারিনি – পরে দেখলাম রাজি হয়ে গেল ! – আধ ঘণ্টা পরে – টিকিটের নাম্বারও দিয়ে দিল ! পিকচার আভি ভি বাকি হায় ! একাডেমীতে আমরা আগেই পৌঁছে টিকিট পকেটে পুরে ঘুরতে লাগলাম ! থিয়েটারের কলা কুশলীদের মোটামুটি আমরা চিনি । এটা আগেও ওরা করেছে ! এখন চেতনা গোষ্ঠীর পরিচালনায় । এই শোটা এগারোতম । দেখলাম অনেক বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এসেছেন । অনেকে সিরিয়ালে করেন ! এবং ব্রেকের সময় দেখলাম সৌমিত্রবাবুকে । - দাঁড়িয়ে নমস্কার করলাম – উনিও যথারীতি তাই করলেন ! নাটক আরম্ভ হোল ! সুজন ও সুমন – দুজনেই আছে । গল্পটা আমাদের মনে ছিল না । - সেই ডন কুইক্সট বলতাম ছোটবেলায় ! স্পেনের লা মাঞ্চা অঞ্চলের এক মাঝ বয়েসী আদর্শবাদী মানুষ ! একজন সহকারী - সাংকো পাঞ্জাকে সঙ্গে করে পৃথিবীর জঞ্জাল সাফ করতে বেরিয়ে পড়ল । চোখে তার স্বপ্নের নায়িকা – মহীয়সী নারী আলডনসাঁ বা ডুলিসিনিয়া ! – প্রচুর কলাকুশলী ! এখনকার প্রত্যেকেই বেশ ভালো অভিনয় করে ! মঞ্চ আলো শব্দ ইত্যাদি খুব দক্ষতার সঙ্গেই ব্যবহার করে । নাটকে প্রধান যা দরকার – গতি – এই নাটকের সেই গতিই নাটককে দাঁড় করিয়েছে । জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ উন্মাদ - না - উন্মাদ শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী - মুল বক্তব্য অর্থাৎ ডনের আদর্শবাদী ভাবনা – তাও কিন্তু ক্রিয়াশীল ! কোনও অভিনেতাকে নিশ্চুপ দেখিনি ! বিশেষ করে ডন বা সাংকো পাঞ্জা ! সারাক্ষণই মঞ্চ জুড়ে নেচে যাচ্ছে ! আরও একজন ডনের সেই মহীয়সী নারী – ডুলিসিনিয়া ! – অপেরাধর্মী হওয়ার ফলে দর্শকদের একেবারে বোর হতে দেয় নি! নীলের কথায় জানা গেল – এরপরের অভিনয় হবে আগস্ট মাসে ! বেশ অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা নাটক দেখা হোল ! মনোজ
শিবাংশু
বাবার অটোগ্র্যাফ খাতায় আচার্য সুনীতিকুমার লিখে দিয়েছিলেন তুলসীদাসের একটা দোঁহা| " যদ্যপি জগ দারুণ‚ দুখ নানা‚ সব তেঁ কঠিন জাতি অপমানা . প্রায় চুয়াত্তর বছর আগের কথা| লাটসাহেবের বাড়িতে তখনও ইউনিয়ন জ্যাক উড়তো| তাঁরা ভেবেছিলেন একদিন আমরা 'জাতি-অপমানা' জয় করবো| ব্যস‚ ইউনিয়ন জ্যাকটা নামিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা| জ্ঞান হবার সময় থেকে লেখাটি দেখেছি| 'জাতি-অপমানা যে কী ব্যাপার সেটা জানতে হাত ধরেছি কবির| সারা পরিবার আদ্যন্ত রবীন্দ্রনিমজ্জিত| সেই মানুষ যাঁর মননে আন্তর্জাতিকতা একটা ভিন্ন মাত্রা ছিল| তাঁর যা কিছু সিদ্ধি সব কিছুর মধ্যে দেশের উপরে জেগে থাকতো তাঁর আন্তর্জাতিক মানবতাবোধ| গান্ধিজির মতো মানুষও বুঝে উঠতে পারেননি কবির স্বভাবের এই দিকটি| 'Religion of Man' লিখে এদেশে ওদেশে সব মূঢ় জাতীয়তাবাদীদের থেকে নিন্দার ভাগী হয়েছিলেন| কিন্তু 'জাতি অপমানা'র বেদনা তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে| জালিয়াঁওয়ালাবাগ নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া তো সবাই জানে| 'প্রবাসী' হওয়া 'অপরাধ' নয়| তার জন্য কোনও যথার্থীকরণও নিষ্প্রয়োজন| কোনটা যে 'দেশ' সেটাই তো সবসময় বুঝে ওঠা যায়না| চামড়ার রং নিয়ে পক্ষপাত তো এদেশেও রয়েছে পুরো মাত্রায়| রয়েছে জন্মগত জাতি নিয়ে কটাক্ষ| সে তো ব্যক্তি আমি পারিবারিক ভাবে দেখতে গেলে নিজের দেশেই 'প্রবাসী' চার পুরুষ| আমার যে বিপুল পরিমাণ আত্মীয়-বন্ধু ছড়িয়ে আছেন য়ুরোপ বা আমেরিকায়‚ তাঁদের সঙ্গে যখনই সাক্ষাৎ হয়‚ জানতে চাই 'জাতি অপমানা' কেমন লাগে| নবীন প্রজন্মের মানুষেরা হয়তো ততোটা স্পর্শকাতর ন'ন| কিন্তু চল্লিশ পেরোনো আত্মীয়রা নিজেদের অস্বস্তি ঢাকেন না| একই স্তরের‚ হয়তো উচ্চ স্তরেরও যোগ্যতা‚ কুশলতা নিয়েও শুনেছি শাদা চামড়াদের থেকে অনেক অধস্তন থাকার বেদনা সইতে হয়| আমার এক ভাই‚ সে এম আই টি ও হার্ভার্ডে উচ্চ শিক্ষিত| দীর্ঘদিন বস্টনে থাকে| হঠাৎ সেদিন বললো কোথাও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল| হঠাৎ দু-চারজন শাদা চামড়া স্রেফ ধাক্কা দিয়ে তাকে লাইন থেকে বার করে নিজেরা দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানে| বললো‚ পিছনে গিয়ে দাঁড়াও| আমি বলি‚ কী করলি তখন? সে বললো‚ কী আর করবো? পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম| বলি‚ কেউ কিছু বললো না? না দাদা‚ কেউ কিছু বলেনা| আমার এক ভায়রাভাই আরো লক্ষ মানুষের মতো 'মূলধন' জমিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিল| কারণ তখনও তার গায়ের চামড়াটা একটু মিহি থেকে গিয়েছিল| কিন্তু এখন সে আরো লক্ষ মানুষের মতো সব পেয়েছির দেশের অংশ হয়ে গিয়েছে| এগুলো হয়তো নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা| অন্যরকম উদাহরণও হয়তো রয়েছে ভূরি ভূরি| উপার্জনের মাত্রা‚ যাপনের স্থিরতা‚ সাহেবি অনুশাসনের স্বাচ্ছন্দ্য‚ এককালের 'সচেতন' ভারতীয়দের জাতি-অপমানা ভুলিয়ে দেয়| সেদেশে একটা সরকার পাল্টায় | কিছুদিন উদ্বেগে থাকে| আবার মানিয়ে নেয়| ভারতীয়দের মতো 'মানিয়ে' নেবার ক্ষমতা শুধু চিনদেশের মানুষদেরই থাকে| পুরোনো সভ্যতার পুণ্য| মানুষের রক্তে জাতিহিংসা রয়েছে| কেউ তাকে লালনপালন করে আনন্দ পায়| কেউ লুকিয়ে রাখে| কিন্তু বিষ থেকেই যায়| কী এদেশে‚ কী ওদেশে| কখনও মনে হয় তুলসী কি সুনীতিকুমার কী এক অলীক দেশের মানুষ? যাঁদের জন্য শুধু রাখা থাকে আমাদের ব্যর্থ নমস্কার|
উদাসী হাওয়া
সাতকাহন ১ অমল ধবল পাবেনা বৃষ্টি পাবে শ্যাওলা পরা ছাদ দুটো চ্যাংড়া চড়ুই তুড়ি মেরে আসে জড়সড় আরও দুটো কাঁধ। পাগল হুট করে ছলাত্ ছল গায়ে-পড়া ছিটবেই জল ভিজে শাড়ি ভিজে বি-ফ্ল্যাটে কিছু শুকনোর সাথে ইচ্ছেদের ভুলভাল মেলে ধরে রাতে। ছুঁড়ে দিলি উড়ো মস্তান বল হাত ধুলি নিঙাড়ি আঁচল তারপর ময়দানে, মনকথা, পুরাকথা, মাটিমুখ দাঁতচিপে যত্নে রাখিস উথলি অনর্গল। সেনরিটার বেসুরো বীণ কেঁদে ফেলে বর্ষার দিন ঝাঁপিয়ে আছড়ে বকা ‘তুম বিন যাউ কাঁহা’, বোকা, ফের ফোনে যদি বলে উঠিস, পাগল! চুপ-পায়ে চিলেকোঠা! বাঁধা ছিল অর্গল! ২ সাবেকী রঙ্গমঞ্চ পুরোটাই জানে প্লিজ, নিয়ে যাবি? প্রিয় নাটক টানে! ভাবিনি আসবিনা, বসবিনা, অনাম্নীই হাঁটু-মুড়ে পাশে, গা ঝেড়ে ভুলপথ ঠিক পথেই মোটামুটি উল্লাসিনীর অবজ্ঞার হুতাসে। এরপর ধুম জ্বর বিকেল নামে প্রলাপের আঁচে সন্ধে হল, কথা আঁকি ভুল ছিল, জলঘসা কাঁচে গুঁড়ো গুঁড়ো অস্বীকার আচমকার ইতিহাসে। ৩ অবিমৃষ্যকারি বিচ্যুতি প্রবেশিকা বৃষ্টিকে ভাল খবর ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিল। বাজপাখি নিঃশব্দে আরও ভাল ছিল! বুদ্ধিমতী ঠোঁট তোর আগুন ছুঁয়েছিল চুড়িদারে চক্রযানে তোর গজদন্ত হাসি কে আর দলামোচা সাতকাহন শেষ রেশ রাখে! ৪ বিদেশী ফিনকি হাওয়ায় হাওয়ায় আরও ভাল কৃতকার্য্য পাওয়ায়! বাজে, ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া খামচিঠিরা বৃষ্টিতে নৌকারা ছন্দবদ্ধ উল্টাতে থাকে। ৫ এখন আনন্দজালে রাতপোকা তোলে মাতোয়ারা সূর্য চাঁদ হইচই পৃথিবীরা ঝলমল দেয়ালে দেয়ালে ডুব দিলি পানকৌটি জল ঝেড়ে ডানা মেলিস হুল্লোড় আড়ালে ফেসবুকে ছশো মিতা তোর অন্তরীক্ষে নৌকা ভাসায়। ৬ শহরতলি কেঁদে যাবে, জমবেই জল সোনা রুপা খুঁজে যাবে জানে পাবেনা তল উৎসাহী জমকালো কত ভালোর ভিড়ে ‘অবগুন্ঠন যায় যে উড়ে’ তলে তলে নৌকা কাঠ শুকায় ডাঙায়। ৭ কি করিস! যত্নে থাকিস! সুন্দর মোবাইল হাতে যতই ফিরে থাকিস, সাকুল্যে পাড়ার বেঞ্চটা কাঁদে ‘অনেক হয়েছে লেনাদেনা’ যত্নে রাখি অসুখ আর গান লিখে যাবো কিছু প্রশ্নের জানাবো না কিসের আশায়।
শিবাংশু
পুরী একটা খুব রহস্যময় জায়গা। কতদিনের পুরোনো জানা নেই। কিন্তু এর ইতিহাস-বর্তমান সব কিছুই আলোছায়াময়। বাস্তব আর পরাবাস্তব হাত ধরাধরি করে চলেছে এখানে হাজার দুই বছর। চৈতন্য মৃত্যুরহস্য হয়তো নেতাজি মৃত্যুরহস্যের থেকেও বাঙালি বেশি খেয়ে থাকে।বাঙালিরা ভাবে পুরী তাদের খুব চেনা জায়গা। কিন্তু অচেনা পুরী, চেনা পুরীর থেকে অনেক বড়ো। হিসেব নেই, কিন্তু মনে হয় এ শর্মা জ্ঞান বয়েস থেকে অন্তত বার পঞ্চাশেক তো গেছেই। বিশেষ করে চাকরিজীবনের শেষ পাঁচ বছর প্রতি দেড়-দুমাসে একবার পুরীর খেপ হয়েই যেত। কিন্তু স্বীকার করি এখনও সব চিনিনা। দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে নিয়ে লেখাটা লিখতে গিয়ে দেখলুম ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার কিংবদন্তি এড়ানো যায়না। নীলাচলের আদি শবর রাজা, যাকে নিয়ে আর্য বিষ্ণুবাদী আর অনার্য প্রকৃতিবাদীরা লড়ে আসছে অন্তত হাজার দেড়েক বছর ধরে, তার কোনও চিহ্ন তো পুরীতে থাকা উচিত। খোঁজ করতে পাওয়া গেল একটি সরোবর। ইন্দ্রদ্যুম্নের নামে। জায়গাটার নাম মাকুবন। গুণ্ডিচাবাড়ি থেকে যেতে হয়। এই সরোবরটির সৃষ্টিকথা শুনলে গোমাতার ভক্তরা অনুপ্রেরিত হবেন। কিংবদন্তি বলছে এই স্থানটিতে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সত্যযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। সেই যজ্ঞে সমবেত ব্রাহ্মণদের প্রত্যেককে এক হাজারটি গাভীদান করা হয়েছিল। সেই সব গাভীদের পদক্ষুরাঘাতে এখানে বিপুল গহ্বর সৃষ্টি হয়। সেই গহ্বর পূর্ণ হয়ে যায় পবিত্র গোমূত্রে। সেই সুবাদে এই পাঁচ একরব্যাপী সরোবরটি তীর্থের মর্যাদা লাভ করে। স্কন্দপুরাণের মতে এটি শ্রেষ্ঠ তীর্থের মধ্যে পড়ে। জগন্নাথের চন্দনযাত্রা আর শীতলস্থলী উৎসব এই জলাশয়টিতেই পালন করা হয়। এতোদূর পর্যন্ত পুরাণের এলাকা। কিন্তু ইতিহাসেও এই সরোবরটির বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুর কল্যাণে। তিনি নিজে ছাড়া তাঁর প্রধান অনুগামীরা এই জলাশয়টিকে বৃন্দাবনের যমুনা জ্ঞানে জলকেলি করতেন। সেই সব নামের মধ্যে রয়েছেন অদ্বৈত আচার্য, নিত্যানন্দ, স্বরূপ দামোদর, বিদ্যানিধি, মুরারি গুপ্ত, বাসুদেব দত্ত, শ্রীবাস ঠাকুর, রাঘব পণ্ডিত, গদাধর পণ্ডিত, সার্বভৌম ভট্টাচার্য, গোপীনাথ আচার্য মায় রামানন্দ রায়। অর্থাৎ গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সব দিগগজেরা এখানে বালকের মতো জলখেলায় অংশগ্রহণ করতেন। তাঁদের এই জাতীয় প্রগলভতা দেখে মহাপ্রভু নাকি তাঁদের ছদ্ম ভর্ত্সনাও করতেন। এই সরোবরে মহাপ্রভুর ইচ্ছেতে অদ্বৈত আচার্য শেষনাগ বাসুকীর মতো শায়িত থাকতেন আর চৈতন্য তাঁর শরীরের উপর শেষসায়ী বিষ্ণুর মতো লম্বিত হতেন। রথযাত্রার আগের দিন মহাপ্রভুর নেতৃত্বে এই সরোবর থেকে জল নিয়ে গিয়ে গুণ্ডিচাবাড়ি ধোয়াধুয়ি করা হতো। এই মূহুর্তে এখানে একটি মন্দির ইন্দ্রদ্যুম্নের নামে, একটি সাক্ষীগোপালের নামে ও একটি নীলকান্তেশ্বর শিবের নামে উৎসর্গিত। ইন্দ্রদ্যুম্নের মূর্তিটি অবশ্য কষ্টিপাথরের। তাঁকে অনার্য বলে স্বীকার করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আর রয়েছে নেমে যাওয়া ঘাটের সিঁড়ি। পুরোনো জটাজুটধারী বটের ছায়াছন্ন ছমছমে আবহ। চিরাচরিত ওড়িশার মন্দিরের মতো ঘি-কর্পূরের গন্ধে ভারি পরাবাস্তব পুরাণজগতের ইশারা যেন। কিছুক্ষণের জন্য টাইমমেশিনে সওয়ার হওয়াই যায়। বিশ্বাসী বিলাসের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যথোচিত পুণ্যফল পিপাসায়...
Kaushik
পর্ব ৬। ডালিম গাছটায় ফল এসেছে। ছোটো ছোটো ডালিম ফলেছে গাছ জুড়ে। আর মাসখানেকের মধ্যেই পেড়ে খাওয়ার মতন হবে ফল গুলো। তবে হনুমানের যা উপদ্রব এখানে, ততদিন ফল গুলো থাকলে হয়! নবদ্বীপে আসা ইস্তক এ জিনিস দেখে আসছেন ছবি - কারোর বাড়ীতে একটু বাগান করার জো নেই! ফুলের গাছ, ফলের গাছ - কিছুই রক্ষা পায় না ওদের হাত থেকে। নতুন বাড়ীটায় আসা ইস্তক এক চিলতে জায়গাটায় কর্তা কিছু না কিছু লাগাতেন নিয়ম করে। কিন্তু ছবির ওসবের প্রতি কোনোদিন কোনো উৎসাহ না থাকায়, কোনোটাই বেশি দিন আগলে রাখা যেত না ওই হনুমান বাহিনীর হাত থেকে। তবে ডালিম গাছটা কি করে যেন বেঁচে গেছিলো। আর যবে থেকে ডোডোটা একটু বড় হয়েছে, তবে থেকেই ছবির নিজের ভেতরেই একটা চাড় এসেছে গাছের ফল গুলো কে হনুমানের হাত থেকে রক্ষা করার। ডোডো নবদ্বীপে এলে ওকে নিজের হাতে গাছটা থেকে ডালিম পেড়ে খাওয়ানোর মধ্যে একটা পরিতৃপ্তি পান ছবি। বাজারে এর চাইতে ভালো ডালিম পাওয়া গেলেও ডোডোকে তা খাইয়ে মন ভরে না ছবির। নিজেদের গাছের ফল বলে কথা। হোক না ভাড়া বাড়ী, কিন্তু গাছটা তো কর্তার নিজের হাতে লাগানো! এই সব সেন্টিমেন্ট ছবির আগে কোনোদিন ছিলো না। আসলে ছবির ছোটোবেলাটা অত্যন্ত শহুরে, অত্যন্ত সাহেবি হওয়ার দরুন, কোনোদিন বুঝতে পারেননি "নিজের" গাছের ফল-সবজির স্বাদ কেনো সেরা। বেয়ারা-বাবুর্চি যা সাজিয়ে এনেছে, ভালো লাগলে তাই খেয়েছেন আর না লাগলে ফেলে দিয়েছেন। ভোজ্যের সাথে জিহ্বার অতিরিক্ত মনেরো যে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তা ধারনা তেই ছিলো না কোনোদিন। কর্তারা পাবনার ভূস্বামী ছিলেন। বিয়ের পরে যে ছ'টি বছর পবনায় ছিলেন, তখন খাবার জিনিষ মাত্রেই নিজেদের এস্টেটের উপজ। দেশভাগের পর থেকে নবদ্বীপেই। তখন শুরুর দিকের কিছু বছর দেখেছিলেন কর্তার হা-হুতাশ - পটল গুলার কোনো স্বাদ নাই, বা শালগেড়িয়ার বড় পুকেরের মতন আর মাছ খাইলাম না! সত্যি বলতে কি, কথা গুলো শুনলে তখন গ্রাম্য-মধ্যবিত্ত আদিখ্যেতা বলেই মনে হত ছবির। কিন্তু এই যে আজ তিনি দুপুরে জেগে আছেন হনুমান তাড়ানোর জন্য, এর মধ্যেও কি সেই একই গ্রাম্য ও মধ্যবিত্ত আদিখ্যেতা নেই? তবে বোধহয় গ্রাম্যই হয়ে গেছেন ছবি। বিত্ত তো সেদিনই হারিয়েছেন যেদিন রাতারাতি পাবনা ছেড়ে দুটো সুটকেস নিয়ে নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন। আর বিয়ের আগের বছর গুলো বাদ দিলে শহরে থাকা আর হয়নি ওঁনার। হিসেব করলে তেতাল্লিশ বছর দাঁড়ায়, যবে থেকে উনি কলকাতা ছাড়া। তেতাল্লিশ বছরের সংসার করা হয়ে গেলো ছবির। বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে পাবনায় থাকতে অসুবিধে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে অসম্মান ছিলো না। সাঁইত্রিশ বছর ধরে এই নবদ্বীপের জীবনটা মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু প্রতি পদে গায়ে লেগে থেকেছে অপমান। দারিদ্রের অপমান। মধ্যবিত্ত যে আসলে একটা মানসিকতা, একটা জীবনধারার নাম - সে কথা ছবি বুঝেছেন বিয়ের পরে পরেই। স্থাবর অ-স্থাবর সম্পত্তি খুব কম ছিলো না কর্তাদের - হয়ত বা বাপের বাড়ির থেকে বেশি কিছুই ছিলো। কিন্তু চলতি ভাষায় যেটাকে বলে পালিশ; তা ছিলো না। গ্রাম্যতা তো ছিলোই, সৌখিনতার অভাবো বিদ্যমান ছিলো পুরো মাত্রায়। খাওয়া দাওয়া ভিন্ন আর তেমন কোনো বিলাসিতা ছবি দেখেননি শ্বশুর বাড়ীর লোকেদের মধ্যে। কর্তার বই কেনার নেশা বাদ দিলে আর কোনো নেশা ছিলো না। শার্ট ধুতি যা পড়তেন তা সবই শালগেড়িয়া টাউনের বাজার থেকে কিনে আনা। বাড়ীর অন্য লোকেদের তো কথাই নেই! তাঁদের সকালে উঠেই প্রথম চিন্তা - জলখাবারে কি রান্না হবে। ঠাকুর ঘি দিয়া ভালো কইরা লুচি ভাজবা কিন্তু! তা সেই লুচি খেয়ে উঠে আঁচাতে না আঁচাতেই আবার হাঁক ডাক শুরু হয়ে যেত - নিতাইয়ের মা কুমড়া গুলা ডুমো ডুমো কইরা কাটবা আর মাছের পেটি বাইর কোইরো না! সে খাবারটা হজম হতে না হতেই আরেক চিন্তা - রাত্রে পাঁঠার মাংস রান্ধন করলে কেমন হয়? কর্তার কথা অবশ্য আলাদা। সারা জীবন জ্ঞান চর্চায় কাটানোর ফলেই হয়ত একটা সহজাত পরিমিতি বোধ ওঁনার জীবনধারায় দেখতে পাওয়া যায়। তখনো দেখা যেত। আসলে মানুষটা আলাদা মাটি দিয়ে তৈরি। খাওয়া দাওয়া বাদ দিলে বাড়ীর লোকেদের আলোচনায় খালি ফিরে ফিরে আসতো জমি জমার কথা - এবার ধানের ফলন আগের বারের থিক্যাও ভালো হইবো বা পাট গাছ গুলায় আঁশ কম। যদিও পাবনায় থাকতে সংসারে কোনো কায়িক শ্রম দান করতে হয়নি ছবিকে, কিন্তু সর্বক্ষণ এহেন স্থুল সাংসারিক কথাবার্তায় দম বন্ধ হয়ে আসতো ওঁর। রাত্রে সকলে ঘুমিয়ে পড়লে গ্র্যান্ড পিয়ানোটা বাজাতেন একা একা। ফিরে যেতে চাইতেন নিজের ফেলে আসা অতীতের কাছে। কার্সিয়াঙের সিস্টার ভেরনিকার কাছে, রবি কাকার কাছে, মিসেস ও'ব্রায়ানের কাছে। ছবির নিজের জীবনের প্রিয়তম মানুষ বাবা। সেই বাবার কাছে কিছুতেই ফিরতেন চাইতেন না ছবি। পাবনার ওই ডানা ভাঙা ছবিকে দেখলে বাবা কষ্টই পেতেন। আর কারুর কাছে কি ফিরে যেতে চাইতেন ছবি? না। তার কাছে আর যে ফেরা যায় না। দেখতে দেখতে প্রায় চোদ্দোটা বছর কেটে গেলো এই বাড়ীতে, তবু এটাকে এখনো মনে মনে "নতুন বাড়ী" বলেই ডাকেন ছবি। বিশ্বনাথের সাথে শোভার ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর থেকেই এই বাড়ীতে চলে আসা। শোভা আর বিশ্বনাথের বিয়ের পরেই অবশ্য ছবি চলে আসতে চেয়েছিলেন আগের বাড়ীটা ছেড়ে - বেয়াই বাড়ীতে ভাড়া থাকলে সম্মান থাকে না - কিন্তু কর্তার মাথায় এ সকল সাংসারিক সমীকরন কোনোদিনই ঢোকে না। সেদিনও ঢোকে নি। আজো কি ঢুকেছে? এই যে সুধাটার বিয়ে হলোনা এখনো, তা নিয়ে ওঁনার কোনো তাপ উত্তাপ আছে বলে তো মনে হয়না। ছবির রাগ হয়, কিন্তু কর্তার ওপরে রাগ প্রকাশ করার কোনো অধিকার ছবির নেই। যে মানুষটাকে খুশি করতে পারেননি, তার ওপরে রাগ করবেন কোন অধিকারে? এতগুলো বছরে কর্তার কোনো অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ হয়নি যে উনি অখুশি; ওঁনার স্বভাবই সেরকম নয়। কিন্তু ছবি নিজে তো জানেন! মানুষটাকে সম্মান করেছেন চিরকাল, কিন্তু ভালোবাসতে যে পারেননি, সে কথা নিজের থেকে গোপন করবেন কী ভাবে? সন্তানদের জন্যই বা কী করতে পেরেছেন ছবি? শোভাটাকে নিজের মনের মতন করে মানুষ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন কোথায়? লেখাপড়া শেষ করার আগেই বিয়ে করলো। অল্প বয়সে সন্তানের জন্ম দিলো। বিয়েটাও ভেঙে গেলো। তবে শোভার চেয়েও সুধাটার কথা ভাবলে বড় কষ্ট হয় ছবির। শোভা নিজের জীবনের পথ নিজে বেছে নিয়েছে। সে অধিকার ওর ছিলো, আছে। কিন্তু সুধা? ঊনচল্লিশ বছর বয়সেও যে ও অনূঢ়া, সে লজ্জা কি ছবির নয়? সুধার মতন গুণী মেয়ের জীবনে কেউ এলো না, এটা মেনে নিতে পারেন না ছবি। আসলে সুধাই আসতে দেয়নি কাউকে ওর কাছে। জানেন ছবি। ভেবেছে বাবা-মা'কে দেখবে কে? বিয়ের পর থেকেই খোকন গোমোতে। তার নিজের সংসার আছে। কর্তার রিটায়ারমেন্টেরও বিশেষ দেরি নেই। এ সব ভেবেই মেয়েটা বিয়েই করলো না। মুখে না বললেও ছবি জানেন এটাই আসল কারন। মা হিসেবে এর চেয়ে বেশি লজ্জার আর কিছু কি থাকতে পারে ছবির কাছে? ঈশ্বর বোধহয় ওঁনার কপালে নানাবিধ লজ্জাই লিখেছেন। ভালোবাসা হারানোর লজ্জা, দারিদ্রের লজ্জা, সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালন করতে না পারার লজ্জা। লিপি আর কিরণ অবশ্য নিজেদের জীবনে সুখি। ভালো বিয়ে হয়েছে দু'জনারই। এইটুকুই বা কম কি! এইটুকুই যদি ঈশ্বর ছবির কপালে লিখে থাকেন, তাই সই। বিকেল হয়ে এল। কর্তার ফেরার সময় হয়ে এসেছে। সুধার ও। চায়ের জলটা উনুনে চড়িয়ে দিতে উঠে পড়লেন ছবি।
Ranjan Roy
<কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কে নিয়ে আমার দুটি কথা ============================== না; আমি আধুনিক কবিতা বা চিত্রকলা বুঝি এমন অপবাদ আমার অতি বড় শত্তুরেও দেবে না। তবে সব বঙ্গসন্তানই বড় হয়ে 'জল পড়ে পাতা নড়ে' আর ' বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর' শুনে। আর গোঁফ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে পদ্য লেখে , পাশের বাড়ির রাইকিশোরী মেয়েটির প্রেমে পড়ে। আমিও ব্যতিক্রম নই। অন্যদের মত আমারও রবি ঠাকুরের কিছু পদ্য, জীবনানন্দের 'বনলতা সেন', 'রূপসী বাংলা' থেকে কোটেশন চুরি করে চিঠিতে গুঁজে দেওয়ার অভ্যেস ছিল। কিন্তু এর পরের কবিরা? সত্যিই বুঝতে পারি নি, মানে বেশির ভাগই কিরকম ক্যালকুলাসের অংকের মত লেগেছে। কিন্তু সব নিয়মেরই ব্যতিক্রম আছে। যে দু-একজন কবিদের কবিতা সেই প্রথম যৌবনেও ভাল লেগেছিল নীরেন্দ্রনাথ তাঁদের অগ্রগণ্য। কেন ভাল লেগেছিল? বুঝতে পারতাম বলে। ভুল বললাম,-- কবিতা তো বুঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে। হ্যাঁ, ওঁর কবিতায় বুকের মধ্যে কিছু একটা বেজে উঠত। শব্দের মায়া ছাড়িয়ে মনে হত এত আমার কথা বলছে। আমার কথা? না, শুধু আমার কথা নয়। আমাদের কথা। মানে ষাটের দশকের শেষের দিক থেকে সত্তরের দশকের বছরগুলোতে হাওয়াই চটি পায়ে কোলকাতা চষে বেড়ানো ছেলেগুলোর কথা। ঠিক তাও না, গুছিয়ে বললে ওদের চোখে দেখা সেই সময়ের কোলকাতার কথা। আস্তে আস্তে নীরেন্দ্রনাথ এর কবিতা সেই সময়ের কোলকাতার চালচিত্র হয়ে উঠলো। সেই কোলকাতায় বড় বড় মল ছিল না, ফ্লাই ওভার ছিল না। ঝাঁ চক্চকে রাস্তা, এত গাড়ি, আইনক্সে সিনেমা -- কিছুই ছিল না। আর চাকরিও ছিল না। আমরা ছিলাম দিশাহীন। আমরা ছিলাম উচ্ছন্নে যাওয়া। কিন্তু আমরা ভালবাসতাম, কেরিয়ারকে নয়---নারীকে, আসলে কোলকাতাকে। সেই কোলকাতা জীবন্ত হয়ে আছে নীরেন্দ্রনাথের কবিতায়। কিন্তু উচ্চকিত নয়, শ্লোগান মুখরিত মুষ্টিবদ্ধ হাত নয়। তাঁর কবিতা সেতারের আলাপের মত আন্তরিক, মৃদু উচ্চারণের। এই কবিতাটি দেখুনঃ কোলকাতার যীশু। একহিসেবে ওঁর সিগনেচার কবিতা। কলকাতার যিশু ----------------------- লালবাতির নিষেধ ছিল না, তবুও ঝড়ের-বেগে-ধাবমান কলকাতা শহর অতর্কিতে থেমে গেল; ভয়ংকর ভাবে টাল সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ট্যাক্সি ও প্রাইভেট, টেম্পো, বাঘমার্কা ডবল ডেকার 'গেল- গেল' আর্তনাদে রাস্তার দুদিক থেকে যারা ছুটে এসেছিল- ঝাঁকামুটে, ফেরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার- এখন তারাও যেন শিল্পীর ইজেলে স্থিরচিত্রটির মত লগ্ন হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে, টালমাটাল পায়ে রাস্তার এক-পার থেকে অন্য-পারে হেঁটে চলে যায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি শিশু। খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গীপাড়ায়। এখন রোদ্দূর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মত মেঘের হৃৎপিন্ড ফুঁড়ে নেমে আসছে ; মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর। স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে। ভিখারী মায়ের শিশু, কোলকাতার যিশু, সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ। জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নেই; দু-দিকে উদ্যত মৃত্যু,তুমি তার মাঝখান দিয়ে টলতে টলতে হেঁটে যাও। যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেতে চাও হাতের মুঠোয়। যেন তাই টালমাটাল পায়ে তুমি পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য কিনারে চলেছ। ----------------- দেখতেই পাচ্ছেন, কিভাবে কবিতাটি সেই সময়ের কোলকাতার দৈনন্দিন জীবনের একটি ঘটনার থেকে শুরু হয়ে এক মহত্তর আবেদনে পৌঁছে গেছে। ১৯৬৯ এর দুটি শারদীয় সংখ্যায় উনি দুটি কবিতা লেখেন । একটি উল্লিখিত 'কলকাতার যিশু' অন্যটি 'চতুর্থ সন্তান'। এর প্রেক্ষিত নিয়ে দুটো কথা বলি। আমার প্রজন্মের মানুষজনের মনে পড়বে যে পরিবার নিয়ন্ত্রণের শুরুর দিকে সরকারী শ্লোগানগুলো অন্যরকম ছিল। প্রথমে, ' দো ইয়া তিন,ব্যস্'। এর পরে এল ' হম দো, হমারে দো'। তো নীরেন্দ্রনাথের কবিতা সেই' তিন পর্য্যন্ত' ফরমানের দিনে লেখা। সেখানে কোন পরিবারে জন্ম নেওয়া অবাঞ্ছিত "চতুর্থ সন্তান" অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বসে। নীরেন্দ্রনাথের সংবেদনশীল কবিমন বলে ওঠে ' কে তোমাকে চায়'! ওঁর কলমে ফুটে ওঠে ঋষির মতন অমোঘ সত্যবচন-- যে পৃথিবী এই চতুর্থ সন্তানকে ওর ইচ্ছের অপেক্ষা না রেখে জন্মদিয়ে এখন 'দুর ছাই' করছে, কাল সে নিজে অভিমানে প্রতিশোধ নিতে পারে এই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে! চমকে উঠে টের পাই-- ওই অবাঞ্ছিত শিশুটি তো আমি বা আমরা! যাদের চাকরি নেই, পাড়ায় পরিবারে সম্মান নেই, আমরা যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই-- আমরাই তো এক বৃহত্তর অর্থে শহর কোলকাতার চতুর্থ সন্তান। আমাদের মধ্যে রয়েছে নিজেকে ধ্বংস করার প্রবণতা। উনি চমকে দিলেন আবার, সত্তরের গোড়ায়। আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় সাময়িকীতে নিয়মিত লিখলেন "কবিতার কথা",--- কবিকঙ্কণ পেন- নেম নিয়ে। প্রথমে আমাদের অভিজ্ঞ মাস্টারমশাইয়ের মত ধৈর্য ধরে বোঝালেন -- কবিতা কাকে বলে। অর্থাৎ কী কী থাকলে একটি লেখা কবিতা হয়ে ওঠে। আবার সেগুলো না থাকলে শুধু মাত্রা গুণে ছন্দ মিলিয়ে অন্ত্যমিল দিলেও সেটা কবিতা হয় না। উদাহরণ দিলেনঃ " সূর্য ব্যাটা বুর্জোয়া যে দুর্যোধনের ভাই। গর্জনে তার তূর্য বাজে তর্জনে ভয় পাই"। কিন্তু পরে একটি বেস্ট সেলার বই হয়ে বেরনো 'কবিতার কথা' আসলে বাংলা ছন্দের কথা। এখানে আমরা পেলাম ছান্দসিক নীরেন্দ্রনাথকে। এই লেখাগুলোর মাঝে প্রখ্যাত ছান্দসিক প্রবোধ চন্দ্র বাগচীর সঙ্গে ওঁর মত বিনিময় আমাদের মত হরিদাস পালদের জন্যে অত্যন্ত স্বাদু শিক্ষণীয় পাঠ হয়ে উঠল। আমরা ধীরে ধীরে শিখে নিলাম যে বাংলা ছন্দ মূলতঃ তিনরকম--অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত। উনি এগুলোকে চেনার এবং মাত্রাগোণার পদ্ধতি দেখালেন, বাদ গেল না বাংলা ছড়ার ছন্দের মাত্রাও ( যোমনাবতী সরস্বতী কাল যোমনার বে')। "কবিতার ক্লাস" এর মধ্যে মধ্যে বিশুদ্ধ হাস্যরসের চৌপদীও থাকত। একটি নমুনাঃ "ছন্দের গুঁতো খেয়ে পোড়োদের হায়, চোখ থেকে অবিরল অশ্রু গড়ায়। কহে কবিকঙ্কণ কান্না থামাও, ক্লাস থেকে মানে মানে চম্পট দাও"। কবি নীরেন্দ্রনাথ পরবর্তী কবিতাগুলোয় আরও মিতবাক হলেন। অসহ্য দমবন্ধ পরিবেশ বোঝাতে তিনি বলেন--" দু-পায়ে ভেতরে ঢুকলে মনে হয় চারপায়ে বেরিয়ে যাই।" এমনসময় এল বাংলা বানান সংস্কারের আন্দোলন। সংস্কৃতের অন্ধ নকল ছেড়ে বাংলা বানান মুখের কথার কাছাকাছি আসতে চাইল। আরও সহজ হয়ে উঠল। অনেক র-ফলার পরে যুক্তাক্ষরকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করা হল। অনেক বিতর্ক কমিটি বাদানুবাদ শুরু হল। নীরেন্দ্রনাথ লিখলেন--"কী লিখবেন, কী লিখবেন না"। যাঁরা আজকের আধুনিক বাংলা লিখতে চান তাঁদের কাছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বইটি বাইবেলের মত। কোলকাতার বাঙ্গুর এভিনিউয়ের বি-ব্লকে কাকিমার বাড়িতে গেলে চোখে পড়ত দীর্ঘদেহী ছিপছিপে পাকাচুলের নীরেন্দ্রনাথ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে বাজারের থলি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন,-- আদ্যন্ত সুভদ্র নম্রকন্ঠ এক সংবেদনশীল বাঙালী কবি।> ================================
দীপঙ্কর বসু
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা গ্রাম মঠদিঘী । গ্রামের একধারে স্বচ্ছ টলটলে মিষ্টি জলের একটা বেশ বড়সড় একটা দিঘী ,আর তারই পাড়ে ঝোপজঙ্গলে ঘেরা পাঁচ ছটা খুপরি ওয়ালা একটা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ।জনশ্রুতি বাড়িটা নাকি একসময়ে কোন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের মঠ ছিল । সেই মঠ আর দিঘীই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ছোট্ট গ্রামটা পরিচয় ।গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছিল মঠদিঘী । কয়েকঘর অবস্থাপন্ন চাষি যাদের নিজস্ব ধানি জমিজিরেত আছে , দু-ঘর বামুন ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ লোকই মুসলমান ক্ষেতমজুর শ্রেণীর। তাদের না আছে জমি জমা না আছে কোন স্থায়ী উপার্জন । ছাষবাসের কয়েকটা মাসই শুধু তারা কাজ পায় ক্ষেতমজুর হিসেবে ।সেই সময়গুলোতে হাতে আসে সামান্য কিছু অর্থ যা দিয়ে কটাদিন একটু মানুষের মত খেয়ে বাঁচে ,ঘরের ছেলেপুলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারে ।বছরের বাদবাকি সময়টা কাটে অর্ধাহারে ,মণিব-বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে আনা ভাতের ফ্যান আর বুনো শাকপাতা সিদ্ধ খেয়ে ।সেটুকুও না জুটলে দিনের পর দিন চলে উপবাস ।ছেলে মেয়েগুল তাদের কঙ্কালসার শরীর আর স্ফীত উদর নিয়ে ধুকতে থাকে বা পড়ে থাকে ঘরের মধ্যে নির্জীবের মত । তবে ওদের মধ্যে সবাই শুধু পড়েপড়ে ভাগ্যের মার সহ্য করতে নারাজ । খিদের জ্বালায় উপায়ান্তর না দেখে কেউ করে ডাকাতি কেউ সিঁদ কাটে সম্পন্ন গৃহস্তের ঘরে । পেটের দায় কখনো কখনো খুন খারাপিও ঘটে যায় । যে সময়ের গল্প বলতে বসেছি সেটা ছিল উনিশশো ষাটের শেষ ভাগ ।এই উনিশশো ছেষট্টি কি সাতষট্টি হবে ।দেশ জুড়ে চলছে তীব্র খাদ্য সঙ্কট – প্রায় দুর্ভিক্ষের মতই অবস্থা । সরকার লেভি ধার্য করেছে ক্ষেতের ফসলের ওপরে । ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ সরকারের ভান্ডারে দিতে হবে ।তাই দিয়ে চলবে শহর গঞ্জের মানুষদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা । সরকারের নজর কৃষকের ঘরে মজুদ করা উদ্বৃত্ত ফসলের দিকে আর কৃষকে নজর সরকারের শ্যেন দৃষ্টি এড়ানো ।তাই তারা ফন্দি এঁটে কিছু কিছু ধানচাল বোঝাই বস্তা গরীব ক্ষেত মজুরদের ঘরে লুকিয়ে রাখা । এমতাবস্থায় মঠদিঘী গ্রামের ওস্তাদ সিঁদেল চোর বড়কচি স্যাঙাত আয়নুদ্দিন দপ্তরীর মাধ্যমে খবর পায় মন্ডল্ বাবুদের কয়েকবস্তা চাল নাকি গচ্ছিত রাখা আছে তাহের আলির ঘরে । সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বড়কচি “আজ রাতে তাহের আলির ঘরে সিঁদ কেটে দু বস্তা চাল যে করে হোক বের করে আনতেই হবে।অনেকদিন হয়ে গেল পেটে একদানা ভাত পড়েনি।” উল্লসিত আয়নুদ্দিন আনন্দে মাতোয়ারা । -“কদ্দিন পরে ঘরের ছেলেপিলেগুলোর মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে পারব ভাবদিকি ওস্তাদ” তার আর তর সয়না । গ্রামে গঞ্জে সুজ্জি ডুবলেই নিশুত রাত ।তাও বেশ রাত করে সাগরেদ আয়নুদ্দিনকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বড়কচি সিঁদ কাটে তাহের আলির ঘরে । অন্ধকারের মধ্যেই বড়কচির চোখে পড়ে দুপাশে রাখা বেশা কয়েকটা চালের বস্তার মাঝখানে একপাল অনাহারক্লিষ্ট আন্ডাবাচ্চা সহ তাহের আলি আর তার বিবি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে । দেরি করেনা বড়কচি । একবস্তা চাল দুজনে মিলে ধরে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসে সেই সুড়ঙ্গ ধরে ।তার পর চালের বস্তা মাথায় নিয়ে দ্রুত পদে হাঁটা দেয় ন্যাড়ামাঠের দিকে ।পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে আয়নুদ্দিন তার উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারেনা ।লোভে তার চখদুট চকচক করতে থাকে ।কেবলি বলে চলে “উফফফ কতদিন পরে দুমুঠো ভাত খাব বলতো ওস্তাদ ।ছেলেমেয়েগুলো কি রকম আহ্লাদ হবে একবার ভাব দি’নি ওস্তাদ!” স্যাঙাতের ঘ্যানঘ্যানিতে বিরক্ত হয়ে এক সময়ে চলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বড়কচি ।ধমক লাগায় আয়নুদ্দিনকে –“অ্যাই ,থাম তো দেহি ।সেই থেকে সেই এক কতা ঘ্যানঘ্যান করে চলেচে কানের কাছে । ইদিকে আমি ভাবচি অন্য কতা” “কি কতা ওস্তাদ”? উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করে আয়নুদ্দিন । ক্লিষ্ট স্বরে বড় কচি জবাব দেয় “দেখ ,আমরাতো এই চাল ফুটিয়ে ভাত খাব ।ওদিকে তাহের আলির হেনস্তার কতাটা একবার ভাবতো ।কত্তাদের গচ্ছিত চাল তাহের আলির হেপাজত থেকে খোয়া গেলে তাহের আলি নিস্তার পাবে ? কত্তারা খোয়া যাওয়া মালের খেসারত আদায় করবেনা তাহের আলির কাছে থেকে ?হয়ত তাহের আলির মজুরি থেকে লোসকানের উসুলি করবে কত্তারা ।এমনিতেই খেতে পায়না তার ওপর মজুরি কাটা গেলে কি হবে তাহের আলির? ওর ঘুমন্ত ছেলেপিলে কটার মুখগুলো বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে আসচে ।চল বস্তাটা তাহের আলিকে ফেরৎ দিয়ে আসি গে” আকাশ থেকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে আয়নুদ্দিন । বল কি ওস্তাদ মুখের গেরাস মুখে না তুলে ফেরৎ দিয়ে আসবে তাহের আলিকে !! পারবে ফেরৎ দিতে?” মাঠের মধ্যে দুজনের এই কথাপোকথনের মধ্যে তাদের চোখে পড়ে দূর থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে দ্রুতবেগে ছটে আসছে একটা ছায়া মূর্তি ।পালানর ভাবনা মাথায় আসার আগেই কাছে এসে পড়গে ধাবমান ছায়া মূর্তি ।অন্ধকারের মধ্যেই চেনা যায় তাহের আলিকে ।ঘুমের মধ্যেই খুটখাট আওয়াজে সে জেগে ওঠে । ঠিক কি কান্ড হটেছে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে তার ।তার পরেই পাগলের মত ছুট লাগায় মাঠের দিকে । তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ই তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে হাজির করে বমাল সমেত চোরেদের সুমুখে । হাতের লাঠিটা তুলে ধরে চোর নিধনের জন্যে ।ঠিক সেই সময়েই ধপ করে তাহেরের পায়ের কাছে মাটিতে চালের বস্তাটা নামিয়ে রাখে বড়কচি । কাতর কন্ঠে তাহের আলিকে উদ্দেশ্য করে বলে “বড় ভুল করিচি রে বাপ । চালের বস্তাটা নে’ যেতে যেতে দেকতে পাচ্ছিলুম তোর কচিকাচাগুলানের মুখগুলো ।ফেরৎ নে যা ভাই তোর চালের বস্তা ।ও চালের ভাত আমার পেটে সইবেনি রে”
মনোজ ভট্টাচার্য
ভিয়েনা একটি জনপদ ! ভার্জিনিয়া প্রদেশের ছোট একটা জনপদের নাম ভিয়েনা ! যদিও ওয়াশিংটনের থেকে খুব কাছেই – কিন্তু উত্তর ভার্জিনিয়ার এই শহরটার নাম বিশ্বের খুব বেশি মানুষ শুনেছে বলে মনে হয় না ! তবু আগেকার দিনের গোল্ড রাশের মত না হলেও - ওয়াশিংটনের কাছে এই ছোট শহরটার গুরুত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে । বিশেষত ভারতীয়দের জন্যে ! আই টি অফিস ছাড়াও বিভিন্ন পেশাধারী মানুষ এসে এখানে ভিড় করেছে । বিরাট বিরাট অফিশ বাড়ির আশেপাশে শুধু তিন চার লেনের বড় বড় রাস্তা । এরই আশেপাশে - ভিয়েনার একটা ট্রেলওয়ে পথ এখন আমাদের লক্ষ্য । ঘুরতে ঘুরতে যেভাবে হোক এখানে এসে পড়েছি । - আমার সাথে রয়েছে ছজন কাউবয় ! প্রত্যেকের পরনে র্যাং লার জিনস – কোমরে লং হর্ন বেল্টে বাঁধা কোল্ট পিস্তল ! দুজনের গায়ে আবার ভ্যকেরো ধরনের জ্যাকেট ! – সবাই চলেছি এই অচেনা ট্রেইলওয়ে ধরে । - জন্তু- জানোয়ারের চেয়ে বেশি আমাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে অন্য কোন ইয়াঙ্কিদের ! ওদের হাতেও এই বন্দুক আছে ! আমাদের এখানে আসার একটা কারন আছে । - সেটা হল এই ভার্জিনিয়ান ট্রেলওয়ে ধরে কোনও যান চালানো যায় কিনা – ব্যাপারটা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা । এই পথটা কতটা নিরাপদ ও কতটা পাহাড়ি – বা এখানে অন্য যান চালানো কতটা ব্যবসায়িক ভাবে সাফল্য পাবে – সেটাও দেখা ! ঘোড়া দিয়ে বড় ওয়াগন নিয়ে যাওয়া বেশ অসুবিধেকর । ছোট ছোট রেল পেতে ট্রেন নিয়ে গেলে কেমন হয় ! – বেশ কদিন ধরেই এখানে যাতায়াত করছি। আমাদের রিপোর্টের ওপর এখানে কি ধরনের যান চলাচল করবে – সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ! অবশেষে ১৯০২ সালে আঞ্চলিক কয়েকজন ভূস্বামী ও ব্যবসায়ী সমবেতভাবে জন রোল ম্যাকলীনের নেতৃত্বে প্রথমে তৈরি হল গ্রেট ফলস ও ওল্ড ডোমিনিয়ন রেলরোড মাত্র পনেরো মাইল । দুদিকে জঙ্গল ও পটোম্যাক নদীর ওপর দিয়ে দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে ওয়াশিংটন চলে যাওয়া যেত ! পরে আবার ওয়াশিংটন রেলরোডের সঙ্গে মিলে আরও পথ বেড়ে গেল । কিন্তু ক্রমশ ভাড়া বৃদ্ধি ও যাত্রীর অভাবের জন্যে এই রেল পথ শেষ পর্যন্ত উঠে গেছিলো । তখনও কিন্তু আমরা দক্ষিণের কাউবয়রা এখান দিয়েই ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ! রেল লাইনের পাশ দিয়ে – বাঁদিকে একটা মিল নতুন তৈরি হয়েছে । এখন বাইক নিয়ে যায় এখানকার সাধারন লোকেরা আর ছেলে-মেয়েরা জগিং করে ! অবশ্য বাইরের কেউই এসবের খোঁজ রাখে না ! অনেকদিন হল রেল চলে না এখানে – তবু পুরনো রেল লাইন পাতা আছে । একটা ট্রেনের কামরাও সাজিয়ে রাখা আছে । ভিয়েনা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম আছে বেশ সাজানো গোছানো । টিকিট কাউন্টার – আর ওয়েটিং এরিয়া । আর আছে অতি পুরনো একটা চা ঠাণ্ডা পানীয় খাবার স্টল ! আমাদের মতো দুরন্ত কাউবয়দের পানীয় জোগান দিতে ! ওখানে পানাহার সেরে চলে যেতাম পটোম্যাক ধরে ওয়াশিংটন শরের দিকে ! এখন আমরা আর ঐ পথ দিয়ে ঘোড়া নিয়ে যাইও না ! মনোজ
উদাসী হাওয়া
তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া যায়! তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া যায়। ভাবা যায়! এই বাজারে! কার আর নজরে পড়বে! আমার মতই কিছু হতচ্ছাড়া, কোমরে লাঠির বাড়ি মারা কোনও জীবন্মৃত বেড়ালের বা মেয়ের ভগ্নাংশের না পারা অন্ত্যাধুনিক সরলের ভুল উত্তর তরল হয়ে ফুটবে। অথবা জুটে যাবে যত ছোটখাট ভালবাসি তাই গাই - গিটারের দল, ট্রেনে চেপে, বাঁধা রাখা সাইকেলে চেপে রোজ বাড়ি ফেরে যারা, আজও যারা সাদাকালো মোবাইলের পাশে, দশ টাকার টপ-আপ আছে! রিংটোনে শুধু পিংপিং বাজে গীত গাতা চল। হবে সেই রকম কিছু সাপ, ব্যাঙ, আর মানুষের চিৎকার - হয়ত দরকার আছে! কিছু কবিতা এই নিয়েই বাঁচে। ঠিক খুঁজে নেয় দুঃখ বিলাসী কবিকুল অন্তরীক্ষ ঝলমল। কারখানা বন্ধ হলেই ভোরবেলা শপিং মল। আদার ব্যাপারী দু তিনটে জাহাজের বোঝা নিয়ে ঘরে ফিরে ঝোলা ঝেড়ে দেখে কোন কনফিডেন্স নেই একচুয়ালি কবিতা লেখে সেইই। ইদানিং মেরুদণ্ডহীন ডিভিডির ফাইলটুকু পেন-ড্রাইভে মেপে, স্রেফ গাঢ় নীল আপেক্ষিক আসে শারীরিক যন্ত্রণা প্রশমনের জীন। আজও আসে রীতিমত। চুপচাপ, এ শহরে কুদেখা আজও নেকুপুশু – পাপ! এখনও মোঘলাই অনুগত বটতলাকে ঠেসে বলে, ভীষণ জেদের বশে, বাৎস্যায়নী ব্যাঙের ছাতা করে নেব জয়- তাই, রাতে বাড়ি ফিরতেই না ফিরতেই আঠালো ভয় যাই হোক কিছু একটা ডিকেডেন্স চায় মাথার ভিতর নগ্ন বনিতা ঘোরে, ঘড়ির কাঁটায় সুখ শ্রান্তি কমে বাড়ে। মর্ষিত প্যানাসিয়া রোজকার মত ট্রাম-বাস ট্রেন থেকে, শত শত রিকশা থেকে, হঠাৎ ট্যাক্সি থেকেও নামে ওরা খালবিল পার হয়! পায়েল-কোয়েলের নতুন গান হয়ে আসে কিছুক্ষণ আপনমনে ভাসে। বাথরুমে দৌড়ে যায় সাইবার ক্যাফে ইউটিউবের নির্যাসে। যদি কিছু পায়! ওপারে পুরানো বাড়িটা বিক্রি হবে সস্তায় দামি মাল পাওয়া যদি যায়! ওদের নজরে পড়বেই, জানে, ধোপে টিকতে পারবে না পারবেনা কিছুই কিনে নিতে, পয়সা নেই, জোর নেই, টিকে থাকার ইচ্ছেও নেই ওরা শুধু আছে কিছু জ্যান্ত লাশ, নিস্তরঙ্গ শৌখিন প্লাস্টিকের আর রবারের চটি সকাল এখানে বিকেল ওখানে রুজিরুটিরা চায়ের দোকানে বসে সিওপিডিরা কাশে, শুধু তাকিয়ে থাকতে ভালবাসে। হঠাৎ, দুপুরে বাসি কাগজ পড়তে এসে ফসসাপনা মেয়েটির স্পর্শ পেয়ে যায়। কেউ কেউ নাকি জাদুটোনাও জানে, বউদিরা কেউবা হাত ধরে টানে বিকেল গোল হয়ে বসে সবাই মিলে হাসে। কিছু জ্যাম, ডিম-পাঁউরুটি, চাউমিন নিয়ে ড্যালহাউসির মধ্যবিত্ত দিন দুশো বছর পার হয়ে সোঁদা গন্ধের নামই মূত্রাশয় জানবার পর, যারপরনাই চিৎকার শহর তুমি কার! এইতো আমি সান্যালদা! তোমার অলিখিত বেয়াদব ঋণ। তারপরই বাৎসরিক দুর্গা পূজার ঝঙ্কার, থেকে থেকে কাশফুল হুটোপাটি করতেই থাকে কোনও ভুলভাল কলকাতার পাশে হাওয়া লিখে দেয় শরতের ক্লিশে রূপকের নগণ্য আশীর্বাদী রাস্তার ফুলমালার বকুনি, শুকিয়ে যায় তখুনি। একচ্ছত্র অধিপতি মনটা পড়ে থাকে একটা হারু পাগলার রকে। নানাবিধ ক্যাশমেমো, ক্রেডিট কার্ডের মুখরিত জ্বলা আনন্দে উড়ে যাবে, ‘বাবা আরেকটা বেলুন কিনে দেবে? ভেসে যাব বেশ আরও কিছুদিন’। ‘আরে বলোনা, কি কি কিনতে হবে আর নিউ মার্কেটই যেতে হবে তারপর কিন্তু প্লিজ হালকা একটু নেব, কপাট দিয়ে দ্বারে রোজকার মধুচন্দ্রিমার খোল সেখানেই তোমার গল্পের গরু তালগাছে পাবে সঙ্গোপনে নতুন ক্যরেক্টার রোল’। এইভাবে ভোর হয়, সন্ধে হয়, রাত্রি ক্ষয়ে আবার লোহার পেটাই খাটে শোবে এইভাবেই তাদেরও ছেলেমেয়ে, যেদিন প্রথম সূর্য গিলতে ছুটেছিল হনুমানের দল মানে, ওই অতিকৃত কাল জানে না কাটবে কিনা পার হবে তবু লাঙলের ফলায় অনেকদিনই প্রেরণা জবুথবু। বাইরে ঘরে নান্দনিক আতঙ্ককে শুনে পদধ্বনি গোনে। সেন্সেক্স পড়ে যাচ্ছে নাকি ঠিক তালে তালে ওই আসে বা এসে গেছে প্রায়। অসভ্যতার মাপা চাপা ধ্বনি শোনাতে চায় - মর্ত্যের স্বর্গ থেকে পাতালের জঠর থেকে আকাশের ছায়াপথ থেকে ক্রন্দসী আলোর জাটিঙ্গা নিজেই আসছে ধেয়ে আবশ্যিক ভৈরবী ডমরুর শব্দ নিয়ে ভাবতেও ভাল লাগে আমরা একসাথেই মরব তবে! বোকা, ওরা চাঁদে চলে যাবে! তারপর তোমাকেই আবার বলি, ‘মধুবংশীর গলি বজ্রনিনাদে তোমাকেও ডেকে বলি’ কালের শতচ্ছিন্ন মলিন কাঁথায় নকশা কাটে রাস্তার ধারে বসে থাকা কুকুর, প্লাস্টিকে ভরা পুকুর। জীবনযাত্রায় কোথাও কোথাও একই রকম দারিদ্র চলাফেরা কিছু কিছু রাস্তার কোনে অবিক্রীত, বিকৃত সম্ভার অগুন্তি তিরস্কার -- কানমলা, কিল চড়, লাথি মর তোরা মর। পুড়ে যাওয়া মুখ ভাঙ্গা আয়নার কাঁচে, আর কোথাও ঘুঁটে ভরা উনুনের আঁচে, অন্যমনস্ক এই শহরের আনাচে কানাচে ভর্তি থাকে কাক, চড়ুই, চিল, কলতলার ভিড়। জল নিতে দৈনিক ঝগড়ার সাথে মেলবন্ধন, পুরান জিনিস বেচবার আর নতুন, প্লাস্টিক গামলায় দুদিনেই চিড়। প্রতিদিন কাছে দূরে -- তবু বিক্রি হতে থাকে হরেক মাল তিরিশ টাকা আজকাল। ভোর হয়, এখনও কোথাও নাকি সন্ধেবেলা গান গায়, রাত্রি মিলে যায় বিছানায় পেতে রাখা মাদুরে মানব মানবীর শান্তির জল। কাঁচের মত দানব টাকার মায়া নিজেদের ইচ্ছাভৃত ছায়া, যত চায় সব পেয়ে যায় অমরাবতীর ফ্যান্টাসি জাপ্টে ধরে ওদের এই নতুন শহর বারে বহরে বাহারে। তারা আজও কোজাগরীর প্রসাদ পাবে, কেউ অবসন্ন অপসৃত নয়, তারা কবিতা লেখে না, তারা গান শোনে না তারা কেনে, তারা বেচে, অব্যর্থ সাইলকের সন্ততির মতিগতি ঠিক ফুলের দেশে, অবশেষে কংক্রীটই লেটেক্স, সেক্সিকীট যারা দামি, যারা অস্বাভাবিক, যারা ধ্বংস করে, যারা তৈরি করে, যারা ঘরে ফেরে ব্যুগাতি চড়ে, যারা সস্তায় স্তুপাকার বাবার প্রিয়তমা কারখানার মর্ত্যভুমি কেনে, কারনে, অকারনে তাদের জন্য রাখা থাকে অন্যরকম ছায়াপথ তাদের ডিসাইনার চশমার ফ্রেমে ফুটবে নতুন আরেক শহরের নতুন ফুল। ঐ যে শিশির মার্কেট, ঐ যে সংশয়বিদ ঐ যে জিন্সের নিচে সাবাল্টার্ন চাপ, আরেকটু সালাট দাওনা, সালাড, মুড়ি আর লঙ্কার চপ হে এলোমেলো মুখের উপরে কমটে থাকা চুল তিনশো টাকায় পাঁচশ কবিতা পাওয়া বড়সড় ভুল!