শিবাংশু
সরস্বতী ছিলো একটি নদীর নাম। তার পর নামটি ঘিরে একজন দেবীকে কল্পনা করা হলো। তারও পরে কোনও একদিন বৌদ্ধ তন্ত্রের দুর্গম দেবতা। শেষে বাঙালির বসন্ত পঞ্চমীতে সন্ত ভালেন্তিনের নারী অবতার। আধুনিকতম ভিজ্যুয়ালটি শুক্লা, শুভ্রা, মহাশ্বেতা, বীণাবাদিকা এক কোমল তরুণী। বটতলার ক্যালেন্ডারে শাদা শাড়ি, শাদা ব্লাউজ, ক্ষীণতটী, গোলাপি পদ্মাসনা। শিবাকাশির ক্যালেন্ডারে সবুজ শাড়ি, মেরুন ব্লাউজ, পূর্ণ দেহিনী, গুরু নিতম্বিনী এক দ্রাবিড় সুন্দরী। কিন্তু শ্যামলা মেয়েদের দেশে য়্যাপারথেইডের প্রতীক হয়ে এই দেবীমূর্তির কল্পনাটি পৌরাণিক যুগ থেকে পাব্লিক বেশ খেলো। শাদা নাকি জ্ঞানের রং, শান্তির প্রতীক, স্বস্তির ধারক। যাদের গায়ের চামড়া শাদা, তাদের নাকি এসব থাকে, যেমন আমাদের গৌরী দেবীটি। এহেন দেবীমূর্তির কল্পনা যাঁরা করেছিলেন, ধরে নিই প্রাক পৌরাণিক যুগের 'আর্য'রা, তাঁরা কিন্তু দেবতাদের পোষাক আশাক বিষয়ে বেশ সাম্যবাদী ছিলেন। পুরুষ বা নারী দেবতার আবরণ কিন্তু অধোবাসেই সীমাবদ্ধ থাকতো। উত্তরীয়ের কল্পনা পরবর্তী কালের নাগরিক রাষ্ট্রের সময় এলেও, দেবতামূর্তির কল্পনায় তার কোনও ভূমিকা ছিলোনা। আর যদি সমান্তরাল ভাবে চলা প্রকৃতিপূজা ও সেই ধারার কল্পিত দেবীদের কথা ভাবি, তবে তো দেখবো, 'বিশ্বে মায়ের রূপ ধরেনা, মা আমার তাই দিগ্বসন', এই তত্ত্ব দু-তিন হাজার বছর ধরে চলেছে। তাই যখন সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্রে দেবীর য়্যানাটমির নিবিড় প্রশংসা আবৃত্তি করে ছাত্রছাত্রীরা অঞ্জলি দেয়, তখন জ্ঞানের দেবী ( যদি কেউ থেকে থাকেন, মিনার্ভা?) হয়তো নিভৃতে পুলকিত হন। এ জীবনে এখনও পর্যন্ত যতো সরস্বতীর রূপকল্প দেখেছি, ক্ষীণ, প্রায় অপ্রকাশ্য নীবিবন্ধে প্রতীকী বসন ব্যতিরেকে কোনও আবরণ কখনও দেখিনি। সেদিন থাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বর মন্দিরে ( একাদশ শতক) আর মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরে (পঞ্চদশ শতক ) সরস্বতীর মূর্তি খুব যত্ন সহকারে দেখলুম। রক্ষণশীল দ্রাবিড় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ তীর্থেও আর্য সভ্যতার নন্দনতত্ত্বকে অবিকল অনুসরন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এই প্রসঙ্গ কেন? প্রসঙ্গটি, আমি ও আমার মতো অসংখ্য ভারতীয়ের কাছে বহুদিন ধরেই অবসন্ন পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনে। আচ্ছা, ব্রাহ্মণ মানে কি 'হিন্দু' জাতির অংশ একটি গোষ্ঠী? হয়তো না, অন্তত যখন 'ব্রাহ্মণ' শব্দ বা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তখন 'হিন্দু' নামে ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠী তো ছিলোনা। তখন 'সারস্বত' সাধনা যে সব মানুষের জীবনচর্যা ছিলো তারা সবাই ছিলো ব্রাহ্মণ। সেভাবে কি পান্ধারপুরের জন্ম নেওয়া সেই মুসলমান সারস্বত সাধকটিকে 'ব্রাহ্মণ' বলা যায়? জানি, এই প্রশ্নের উত্তরে এদেশে স্বল্প হলেও কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে বলবে 'না'। এই সব হাতের মালিক ভান্ডারকরের জাদুঘর ভাঙ্চুর করে, মিরা নায়ারের সিনেমা সেটে আগুন লাগায়, হুসেনের ছবি ছিঁড়ে ফেলে। মেরুদন্ডহীন সরকারের সঙ্গে আমাদের মতো নপুংশক দেশবাসী শুধু খবর কাগজ পড়ি, টিভিতে দেখি আর মকবুল ফিদা হুসেন কাতারের নাগরিক হয়ে যান সাতাশি বছর বয়েসে। ছবির জগতে হুসেনের সঙ্গে তুলনা করা যায় গানের জগতে ভীমসেনের। হুসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জে জে আর্ট স্কুলে, কিন্তু তা নিতান্তই প্রারম্ভিক। আসল শিক্ষা প্রতি বর্গফুটে চার আনা পারিশ্রমিক হিসেবে সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু হয়। জীবনের এই পর্বেই তিনি বুঝতে পারেন ছবি মানে ভিজ্যুয়াল, ছবি মানে আগের চোখের পরীক্ষায় পাস করা , ছবি মানে আমি যা দেখতে চাই কিন্তু দেখতে পাইনা, ছবি মানে কল্পনার শেষ ঘোড়া যাতে আমি বাজি ধরতে চাই , ছবি মানে এক ধরনের ইল্যুশন যাকে বেদান্ত খুঁজেছিলো। এই সব অধরা মাধুরীকে (লিটারালি!!) ধরতে লাগে অসম্ভব প্যাশন, অন্তর্লীন আকুলতা। এই প্যাশন পুথিপত্রে নেই, স্কুল কলেজে নেই, সভাপর্বে, স্ফটিকস্তম্ভে নেই , আছে শুধু নিজের শিল্পের প্রতি তীব্র আকর্ষণের মধ্যে, জৈব লিবিডোর সীমা বিচূর্ণ করে, সর্বনাশের শেষ দেখতে চাওয়ার মধ্যে। যাকে কোনও মধ্যবিত্ত মননে বাঁধা যায়না, একেবারে তৃণমূলস্তরে প্রকৃতিসঞ্জাত আবেগের ফলশ্রুতি এইসব সিদ্ধি। একালে যা আমরা পেয়েছি হুসেন ও ভীমসেনের দাক্ষিণ্যে। এই সব সৃষ্টির মৌল লক্ষণ হচ্ছে এর সারল্য, ভনিতাবিহীন সৃজনশীল শ্রমের কারুকার্য, যা চোখের কাছে, কানের কাছে, সহস্রার মূলাধারের কাছে আমাদের পার্থিব অস্তিত্বকে আঘাত করে সেই সব অশ্রুত অব্যক্ত সার্থকতার কাছে পৌঁছে দেবে, যখন কোনও মধ্যবিত্ত বুজরুকি না করেও বলতে পারবো, ' রূপসাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপরতন আশা করি'। উৎকেন্দ্রিকতার বিচারে হুসেন সালভাদোর দালিকেও মাৎ করে দেবেন। নিজের উৎপাদিত ফসল, শ্রমের মূল্যের নিরিখ তিনি এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, যেখানে সব চেয়ে সেয়ানা বেনিয়াও মাথা ঝুঁকিয়ে সেই দাম চুকিয়ে দেবে। তিনি আগে শ্রমিক, পরে শিল্পী। প্রথমে আর্টিজান, পরে আর্টিস্ট। বাংলা ঘরানার মার্জনা, লালিত্য তাঁর জন্য নয়। পি এ জির বাঁধনও তিনি অস্বীকার করেন। মাটিতে ক্যানভাস ফেলে নীচের দিকে তাকিয়ে ছবি আঁকেন। কীভাবে ঐ সব বিশাল পটে স্থানিকতা, বর্ণিকতা, আলোছায়ার ফ্ল্যাট বিভঙ্গকে লম্বা তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে নথিবদ্ধ করেন, বিস্ময়ে মাথা নত করা ছাড়া কিছু করার নেই। তাঁর তুলি যেন ভীনসেনের গমক তান, হলক উৎসার, চাবুকের মতো কানে, ক্যানভাসে আছড়ে পড়ে। মানুষের ছবি আঁকার আদি প্রয়াস রেখাভিত্তিক ড্রইং থেকে শুরু হয়েছিলো, তাই হুসেন মানেন ড্রইংই ছবির মেরুদন্ড। তাঁর সমসাময়িক সব বড়ো শিল্পীরা রেখার ড্রইং আঁকতে দ্বিধাবোধ করতেন। হয়তো ভাবতেন রেখাভিত্তিক তেলরঙের ছবির মধ্যে যথেষ্ট সফিস্টিকেশন আনা যাবেনা। কিন্তু শ্রমজীবী শিল্পী হুসেন মনে করতেন ইতরযানী রেখার ছবিই মানুষের কাছে সব থেকে সহজে পৌঁছোয়। যেমন ভীমসেন চিরদিন অপ্রয়োজনীয় তানকারি থেকে নিজেকে নিরস্ত রেখেছিলেন। প্রচুর নিরেস ছবি এঁকেছেন, ছবি নিয়ে অকারণ বাণিজ্য করেছেন। যা কিছু করেছেন তার মধ্যে সতত অল্পবিস্তর 'শক ভ্যালু' আরোপ করেছেন। মানুষকে চমকে দিয়ে শিশুর মতো উপভোগ করেছেন। যাবতীয় ভারতীয় দর্শন ও পুরাণশাস্ত্রে অগাধ বিদ্যা অর্জন করেছিলেন। বস্তুত তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি সব ভারতীয় পুরাণের মিথস্ক্রিয়ার ফসল। কিন্তু তিনি জন্মসূত্রে মুসলিম। সরস্বতীর 'লজ্জা নিবারণের দায়িত্ব তাঁর জন্মগত কর্তব্য। তিনি কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মতো স্বপ্নে দিগম্বরী দেবীমূর্তি দর্শন করার অধিকারী নন। তাঁর জন্য এরকম কল্পনা করাও পাপ। তিনি তো ব্রাহ্মণ নন, 'হিন্দু'ও নন। এই সব ধৃষ্টতা যদি করে ফেলেন তবে তাঁর বিচার করবে কয়েকজন দুর্বৃত্ত, যাদের 'শিল্প' শব্দটি বানান করার যোগ্যতা নেই। তারা চোখ পাকিয়ে, কোমরে হাত দিয়ে বলবে, আঁকো তো দেখি পয়গম্বরের ছবি, আঁকো দেখি মা ফতিমাকে নির্বসন করে। হেঁ হেঁ বাবা , আমরা অত্যন্ত সহিষ্ণু, অহিংস্র সভ্য জনতা। শুধু ছবিগুলো ছিঁড়েই ছেড়ে দিলাম। নয়তো.... তিনি স্বেচ্ছায় ফেরারি হন। কিন্তু বুকের ভিতর রাত্রিদিন জেগে থাকে ভারতবর্ষ। কখনও অভিযোগ করেননা তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সতত বলেন তিনি স্বেচ্ছায় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দেশ থেকে দূরে রয়েছেন। চলে যাবার আগের দিন বোম্বাইয়ের কুলফি ফালুদা খেতে চান। মহার্ঘ সাহেবি আইসক্রিম প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের সৃষ্টির পঙ্কিল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কোনও জবাবদিহি করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ তিনি জানতেন এই সব নির্বোধের সংখ্যা তাঁর গুণগ্রাহীদের তুলনায় নগণ্য। হুসেন এবং ভীমসেন চিরকালীন ভারতীয় সাব অল্টার্ন সংস্কৃতিচেতনার এ যুগের পুরোধা। ব্রাহ্মণ্য ছুঁতমার্গের বিরুদ্ধে প্রাংশু প্রতিবাদ। এই লেখাটি লেখার সময় ভীমসেনের পুরিয়া কল্যান শুনছিলাম ক্রমাগত, ' বহুত দিন বিতে, অজহুঁ ন আয়ো... ' ফেরারি আর ফিরবে না। বহুকাল আগে একটা পদ্য লিখেছিলুম। কেউ কেউ হয়তো বা অন্যত্র দেখেছেন এই অকিঞ্চিৎকর রচনাটি। মার্জনা চেয়ে পুনরাবৃত্তি করলাম, হুসেন ও ভীমসেন ------------------------------ হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় পঞ্চমে সামনে অনেক গ্রাহী, অনেক ফরাসি স্বেদ, ঠোঁটের উজ্জ্বল লাল জরি, জড়িমায় ধৃত চিত্তকোষ ছবি চলে জ্বলন্ত স্ট্রোভ কোটালের স্রোত বেয়ে তারা তো ছবিই চেয়েছিলো শুদ্ধ, কোমল, মৌল রঙের দাপট সুরের লপক তুলি যেই ছন্দে ক্যানভাসে, কানে, কর্ণপটে চোখের অমলভ্রান্তি, জোড় থেকে সমে হুসেন ও ভীমসেন ছবি আঁকে তেলরঙে গারায় , পঞ্চমে....
Ranjan Roy
জনৈক কাপুরুষের কিস্সা ---------------------------- ১) শনিবারের বারবেলা। দেবাংশু এসব মানে না। কিন্তু বৌ-মেয়ে মানে। তাই ঘর থেকে বেরোনোর সময় চেপে গেল। এই দক্ষিণ দিল্লির আস্তানা থেকে কোথাও একচক্কর ঘুরে আসতে গেলে শত বাধানিষেধ। মেয়ে আর বৌয়ের রে-রে করে যুগলবন্দী শুরু হয়ে যাবে। --তুমি একা বেরোবে না। তুমি অন্যমনস্ক থাক। রাস্তা পেরোনোর সময় তোমার মাথায় ভাবের ঘুঘু ডাকতে থাকে। কোন দিন অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।একা একা কোত্থাও ঘুরবে না। এটা তোমার কোলকাতা না। --শনিবার বেরোবে। আমাদের সঙ্গে, ড্রাইভার নিয়ে। অটো বা মেট্রো নয়। হাঁটু নিয়ে সমস্যা হতে কতক্ষণ? বয়েসের হিসেবে চল। বিরক্ত হয়ে ও চুপ করে যায়। -- দেখ বাবা, আমরা তোমার ভালর জন্যেই বলছি। -- বটেই তো! -- সারাজীবন নিজের ইচ্ছেমত চলে আমাদের অনেক জ্বালিয়েছ, এখন মেয়ের অফিসে টেনশন চলছে। তুমি আর নতুন করে কিছু--। --না না; ঠিক আছে। শনিবার রোববার ছাড়া বেরোব না আর তোদের সঙ্গেই বেরোব। ঠিক আছে? -- বাবা , মনখারাপ কর না। তোমার জন্যে অ্যামাজন এ নতুন দুটো বই আনতে দিয়েছি। আর শনিবার একটা মলে যাব। ওখানে তোমার জন্যে এইচ অ্যান্ড এম থেকে তোমার কিছু জামাকাপড় কিনে দেব। এগুলো সব পুরনো আর জ্যালজেলে হয়ে গিয়েছে। আর বিগ চিল বলে একটা রেস্তোরাঁয় দারুণ লাঞ্চ খাইয়ে দেব। খুব এনজয় করবে, দেখে নিও। বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে গেল। দেবাংশু অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়ে মেয়ের ঘরে বইয়ের তাক হাটকাচ্ছিল। হটাৎ চোখে পড়ল বেণীমাধব শীলের হাফ পঞ্জিকা, নতুন এডিশন। --এ আবার কী? তোকে এইবয়সেই এসব রোগে ধরেছে? --বাজে বোকো না তো! ঠাম্মি এইটা খুব মানত। অসুস্থ অবস্থায়ও আমাকে বলেগেছে যে আমি যেন প্রতিবছর এটা কিনে ঘরে রাখি। আর বাড়ি-টাড়ি কেনার সময় যেন দিনক্ষণ দেখে নেই। তাই গাড়িটা কেনার সময় দেখে নিয়েছিলাম। তিনবছর হল একবারও অ্যাকসিডেন্ট হয় নি, গাড়িতে একটা মাইনর স্ক্র্যাচও লাগে নি। আর ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির সময়ও দিন দেখেই গেছলাম। ঠাম্মির সবকথা হালকা ভাবে উড়িয়ে দিও না। তখনই কৌতুহলের বশে আজকের দিনের সময় দেখতে গিয়ে দেখল দ্বিপ্রহর আড়াই ঘটিকা হইতে সাড়ে চার ঘটিকা পর্য্যন্ত বারবেলা। শনিগ্রহের অবস্থান হেতু এই সময় বিদেশ যাত্রা নববস্ত্রপরিধান , মৎস্য, মাংস ,অলাবু, বার্তাকু ও স্ত্রীসম্ভোগ নিষিদ্ধ। খেয়েছে! ও তো কোলকাতার বাসিন্দে। ওর কাছে তো গোটা দিল্লিই বিদেশ। আর মেয়েটা এত মাছ-মাংস খেতে ভালবাসে, এখন এইসব পঞ্জিকা থেকে পড়ে শোনালে ওর আনন্দ মাটি হবে ,। চাই কি, দেবাংশুর ঘর থেকে বেরোনো রদ হয়ে যেতে পারে। একেবারে হাতে হ্যারিকেন কেস। ড্রাইভার নামিয়ে দিয়ে পার্কিং প্লেসে চলে গেছে। দেবাংশুর চোখ আটকে যায় বড় একটি রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে-- লেবানীজ অ্যান্ড অ্যারবিয়ান কুইজিন। -- আঃ বাবা! অমন হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না। পেছনে অটো হর্ন দিচ্ছে। চল, আমার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাটা পেরোও। আচ্ছা, আমি ব্যাগ চেক করিয়ে আসছি। তুমি মেল চেকিং এর দিক দিয়ে ঢুকে যাও। এবার ওরা কোস্টা কফির সুন্দর খাবার জায়গা পেরিয়ে চলমান সিঁড়ির কাছে যায়। এখনও দেবাংশু প্রথম স্টেপ ফেলার আগে একটু ইতস্ততঃ করে। মেয়ে-বৌ দু'ধাপ ওপরে উঠে যাচ্ছে। ওপরে গিয়ে দেবাংশুর মনে হল যেন কোন অচেনা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে। চারদিকে এত আকর্ষক পণ্যসম্ভার। পোষাক, জুয়েলারি, জুতো, ঘর সাজানোর জিনিস, ইলেক্ট্রনিক্স-- খুব চমৎকার সাজানো। আর খাবার জিনিস কতরকম। -- বাবা, তোমার কি পছন্দ বল? আজ মা'র কথা শুনবো না। উইক এন্ডে আমার কথামত চলবে তোমরা। এখন বিগ চিল এ নম্বর লাগিয়ে আমরা জামাকাপড় কিনতে এইচ এন্ড এম এ ঢুকবো। তারপর খেয়েদেয়ে বাকি মার্কেটিং করে নীচে কফি খেয়ে তবে বাড়ি ফিরবো। কী পছন্দ হল? -- আরে একদম পয়সা উশুল! ওর স্ত্রী মুখ বাঁকায়, মেয়ে হেসে ওঠে। জামাকাপড়ের দোকানে ও হতভম্ব হয়ে যায়। কার সঙ্গে কী ম্যাচিং হবে সেটা নিয়ে এত কথা? ওর নীরস লাগে। মেয়ে যা ওকে ট্রায়াল দিতে বলে সেটাকেই ও হ্যাঁ করে। কিন্তু ট্রায়াল রুমে গিয়ে দেখে ট্রাউজারগুলো বড় ঢলঢলে। একটু কাটিয়ে নিতে হবে। এমন সময় মেয়ের মোবাইল বেজে ওঠে। একটু কথা বলেই ও বলে-- চল, চল। টেবিল খালি হয়ে গেছে। খেয়ে দেয়ে এসে তারপর এই কেনাকাটা গুলো ফাইনাল করব। ওরা বেরিয়ে আবার চলমান সিঁড়ি ধরে আর একটা ফ্লোরে ওঠে। দেবাংশুর একটু হাঁফ ধরেছে। মা মেয়ে এগিয়ে গেছে টেবিল দখল করতে । ও ধীরে সুস্থে হাঁটতে থাকে। ওর চোখ যায় এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনী ও তার সঙ্গীর দিকে। হাঁটুর নীচে অবধি ঢোলা প্যান্ট ও চোখে চশমা পুরুষটির মাথায় টাক। কিন্তু স্বর্ণকেশীকে দেখতে একেবারে মোনিকা বেলুচ্চি। ওর পাশ দিয়ে একটি অল্পবয়েসি মেয়ে মোবাইলে চোখ রেখে আঙ্গুল চালাতে চালাতে হাঁটছে। ও সরে গিয়ে মেয়েটিকে এগিয়ে যেতে দিল। ওর মেয়ে বিগ চিলের দরজায় পৌঁছে গেছে, স্ত্রী ওকে ইশারায় তাড়াতাড়ি করতে বলে মেয়ের পেছন পেছন ঢুকে গেল। ও আবার দেখছে মোনিকা বেলুচ্চিকে। ওরা ব্যালকনির রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে পরে নিজেদের মধ্যে হাত-পা নেড়ে কথা বলছে। দেবাংশু দাঁড়িয়ে পরে। কী ভাষায় বলছে ওরা? ইতালিয়ান ? ও কান পাতে। না, ও ইতালিয়ান জানে না। তবু দেখতে চায় ওরা ইংরেজি না বলে অন্য কিছু বলছে কি না। মনে মনে বাজি ধরে। এরা নিশ্চয়ই ইংরেজ বা আমেরিকান হবে না। ও একটু ওদের দিকে এগিয়ে যায়। এমন সময় ওর পেছন থেকে কেউ ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। ভয়ানক চমকে উঠে পেছন ফিরতেই দেখে সেই মোবাইলে চোখ রেখে চলা অল্পবয়েসি মেয়েটি। -- ইডিয়েট! হাউ ডেয়ার ইউ? ও যারপরনাই অবাক হয়। --হোয়াট? -- আর য়ু ড্রাংক অর হোয়াট? হাউ কুড য়ু? -- এইসা কিঁউ বোল রহে আপ? ম্যায়নে ক্যা কিয়া? --- শর্ম আনা চাহিয়ে আপ কো! উম্র কো দেখিয়ে। আমি আপনার মেয়ের বয়েসি হব। আপনার একটুও লজ্জা করেনি? কী রকম নোংরা বুড়ো আপনি? দেখতে দেখতে ভিড় জমে যায়। -- ক্যা হুয়া রে রেশমি? হোয়াট হ্যাপেন্ড? -- সী! দিস ওল্ড হ্যাগার্ড! দিস স্টাফড মাংকি অফ অ ম্যান টাচড্ মি! টাচড্ মি ইন অ্যান অফুল ওয়ে! দেবাংশুর হাত পায়ে জোর নেই। ও ব্যালকনির রেলিং ধরে ফেলে। এক লহমায় দেখে যে মোনিকা বেলুচ্চিরা ওর দিকে কৌতুহলের চোখে তাকিয়ে আছে। ও ভাঙা ভাঙা আওয়াজে বলার চেষ্টা করে যে এরকম কিছুই হয় নি। একটি যুবক তেড়ে ওঠে! -- ক্যা রেশমি ঝুঠ বোল রহীঁ হ্যাঁয়? তরিকে সে বাত কর বুডঢে! নহীঁ তো দুঁ ক্যা--? একজন সিকিউরিটির লোক এগিয়ে আসে। মেয়েটির উত্তেজিত কথা শুনে ও শান্ত নির্বিকার মুখে দেবাংশুর কাঁধের কাছটা খিমচে ধরে। এবার মরিয়া দেবাংশু উঁচু গলায় বলে--শুনিয়ে! জরুর কুছ গলতি হুই। ম্যায় তো আপকে আগে আগে জা রহা থা। আপ তো মোবাইল দেখতে দেখতে চল রহী থী। সবাই মেয়েটার বয়ান শুনতে চায়। মেয়েটি জানায় যে ও মোবাইলে ওর বন্ধুকে টেক্স্ট করতে করতে হাঁটছিল। সেই সময়ে হটাৎ ও ওর ডানদিকে বাম এ একটা পিঞ্চিং টের পায়। চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর পাশে এই বুড়োটা ভালমানুষের মত মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। --দেখুন, ও নিজেই বলল যে আমাকে মোবাইলে টেক্স্ট করতে ও খেয়াল করেছে। তার মানে ও অনেকক্ষণ ধরে আমাকে স্টক করছিল। তারপরে কাছে এসে সুযোগ নিয়েছে। ও বোধহয় হ্যাবিচুয়াল স্টকার না ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। দেবাংশু শুধু ছানাবড়া চোখে এর ওর ও মেয়েটির মুখের দিকে পালা করে দেখতে থাকে। এবার ওর কাঁধের উপর সিকিউরিটির চাপ বাড়ে। --চলিয়ে আংকল। নীচে ম্যানেজমেন্টকে অফিস মেঁ। আপ ভী আইয়ে ম্যাডাম। আপকো কম্প্লেইন মেঁ সাইন করনা হোগা। ভীড় থেকে একটা সমর্থনসূচক চাপা উল্লাস বেরিয়ে আসে। --এক মিনিট।ম্যাডাম, আপ জব ইন কো দেখে তব ইয়ে আপ কে কিস তরফ খড়ে থে? টু ইয়োর লেফ্ট অর রাইট? একটা মেয়েলি কিন্তু ভারী আওয়াজ শুনে সবাই ঘুরে তাকায়। -- টু মাই রাইট, ইয়েস। --আর য়ু শিওর? --ইয়েস, আ অ্যাম। নো ডাউট অ্যাবাউট ইট। -- দিদ ওল্ড ম্যান ইজ ক্যারিয়িং ওয়ান আমব্রেলা -- এ ফোল্ডেড ওয়ান ইন হিজ লেফ্ট হ্যান্ড। -- ইয়েস , হি ইজ। --ওয়জ হি হোল্ডিং দ্য সেম আমব্রেলা অ্যাট দ্যাট টাইম? ডু ইউ রিমেম্বার? অর ওয়জ হি সাম আদার পারসন? -- নো নো; দ্য সেম, স্টিল হোল্ডিং দ্য সেম পিংক রিডিকুলাস লেডিস আমব্রেলা। -- প্লীজ ম্যডাম, যদি ও বাঁহাতে ছাতা ধরে ছিল তো কী করে আপনার ডান বামে হাত দিল। -- কেন? ডান হাত দিয়ে! -- ভেবে দেখুন; ও আপনার ডান দিকে ছিল। তাহলে ওর বাঁ হাত আপনার দিকে ছিল। সেখানে আপনার ডান বামে ও কী করে ডান হাত দিয়ে ছোঁবে? একটা চাপা গুজগুজ ফুসফুস আওয়াজ ভিড় থেকে শোনা গেল। এবার প্রশ্নকর্ত্রী মেয়েটি নিজের ব্যাগ থেকে একটা কার্ড বের করে মেয়েটিকে বলে-- আমি প্রফেশনাল অ্যাডভোকেট। এতে আমার ফোন নম্বর আছে। বলছি-- আপনার কোন মিস্টেক হচ্ছে। যে হাত চালিয়েছে। সে সম্ভবতঃ বাঁ দিক থেকে ডান হাত চালিয়ে কেটে পড়েছে। এইসব লোকগুলো খুব ধূর্ত হয়। এই বুড়ো ভদ্রলোক আমার পড়শি। ইনি একটু ভ্যাবলা গোছের। কিন্তু এসব করতেই পারেন না। আমি এঁকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। আপনি যদি এর বিরুদ্ধে পুলিশে কপ্লেইন করতে চান তবে একবার আমাকে ফোনে কন্ট্যাক্ট করে নেবেন। আগে আমার কথাগুলো ভাল করে ভেবে দেখুন। তারপর মেয়েটি সিকিউরিটির কবল থেকে দেবাংশুকে ছাড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলে-- বাবা, আমরা এখন সোজা বাড়ি যাচ্ছি। ২) সারা রাস্তা কেউ কোন কথা বলছিল না। দেবাংশু ড্রাইভারের পাশে উসখুশ করছিল। ড্রাইভার একবার আড়চোখে দেখে বাঁহাত বাড়িয়ে সীটবেল্টটা ঠিক করে লাগিয়ে দিল। তখন ও মুখ খুলল-- মিনু, ভাগ্যিস তুই সাথে ছিলি। আমাদের কোলকাতা হলে এরকম হত না। কী করে যে আমার নামে এমন--। ওর কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই পেছনের সীট থেকে সী-শার্পে মেয়ের গলা-- প্লীজ, এ নিয়ে গাড়িতে আলোচনা না করাই ভাল। দেবাংশু যেন আচমকা একটা থাবড়া খেল। বাড়ি ফিরে ও ঘরে ঢুকে সোফায় বসে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল। মেয়ে একটু পরে ড্রাইভারের থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দরজা লক করল। দেবাংশু একটু অবাক। এখন তো মাত্র বিকেল গড়িয়েছে। আর লাঞ্চ হয় নি। যা ঝক্কি গেল! এখন এই অ্যাপার্টমেন্টের চার দেওয়ালের মধ্যে অনেক নিশ্চিন্ত লাগছে। তাই খিদেটাও অনেকটা চাগিয়ে উঠেছে। --বিগ চিলে খাওয়া তো হল না। ঘরে ওবেলার জন্যে যা আছে তাই এখন খেয়ে নিই? অবেলায় বেশি খাওয়া যাবে না। রাত্তিরে হালকা খেলেই হবে। কী বলিস মিনু? মিনু উত্তর না দিয়ে এই ডুপ্লে অ্যাপার্টমেন্টের দোতলায় নিজের কামরায় যেতে যেতে মায়ের উদ্দেশে বলে-- তোমরা খেয়ে নাও মা; আমি খাব না। ইচ্ছে করছে না। --সে কী রে! শরীর খারাপ লাগছে? ডঃ জ্বর জ্বর করছে নাকি? মেয়ে কোন উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। স্ত্রী চুপচাপ কিচেন থেকে দুটো প্লেট নিয়ে এসে ঢাকা খাবার খুলে বেড়ে দেয়। দেবাংশু টিভি চালু করে রিমোট নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। স্ত্রী ঘন্টাদুই পরে এসে বলে -- আজ আর আমার কিছু রাঁধতে ইচ্ছে করছে না। রান্নার মেয়েটি অনেকটা মাশরুম স্যুপ বানিয়ে গেছে। তাই খানিকটা করে খেয়ে নিয়ে শুয়ে পর। --মিনু যে দুপুর থেকে না খেয়ে রয়েছে? -- সে তোমায় ভাবতে হবে না। বৌয়ের গলার আওয়াজটা কি একটু বেশি চড়া? না কানের ভুল? ঘুম ভেঙে গেছে। তলপেটে প্রস্রাবের তীব্র চাপ। দেবাংশু তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকল। ইদানীং এই হয়েছে এক জ্বালা! সব পরীক্ষা-টরিক্ষা করে ডাক্তার বলেছেন এটা নাকি প্রস্ট্রেট গ্রন্থি বেড়ে যাবার সমস্যা। এই বয়সে অনেকেরই হয়। দেবাংশু ঘাবড়ে গেছল। ও প্রস্ট্রেটের ব্যাপার্রটা জেনেছিল তসলিমার নাসরিনের লেখা পড়ে।উনি তো ডাক্তার।বলেছেন এটা বেড়ে গেলে পুরুষাঙ্গের আপাত দৃঢ়তা ও উৎত্থান নাকি অনেকের মত কিছু বুড়ো মৌলবীদের মনেও দ্বিতীয় যৌবনের ভ্রান্তি এনে দেয়। অনেকে এই অকালযৌবন বেদনায় অস্থির হয়ে নাতনীসমা মেয়েদের বিয়ে করে বসেন। তারপর এই বসন্তের মরীচিকা অল্পদিনেই হটাৎ বিনা নোটিসে পাতা না ঝরিয়েই গায়েব হয়ে যায়। তখন নবপরিণীতাটির দুর্দশার একশেষ। ওর মনে পড়ে যেত স্কুলবয়েসে ওদের নেতাজীনগর পাড়ায় এক পন্ডিতমশাইয়ের ওই ভাবে নকল কোকিলের কুহুডাকে উতলা হয়ে বিড়ম্বনা ডেকে আনার ছ্যাবলা গল্পটি। না;, ও জানে যে ওর অমনটি হবে না। ও মরীচিকার পেছনে ছুটে বেড়ানোয় বিশ্বাস করে না। তাই বিএসসি পাশ করে একটি ব্যাংকের পরীক্ষা দিয়ে ক্যাশিয়ার হয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিল। ইঞ্জিনিয়ারি`ডাক্তারি এসব পড়ার কথা ভাবেই নি। কোন টিউটোরিয়ালে ভর্তি হয় নি। আলাদা করে কোথাও কম্পিউটারও শেখার চেষ্টা করে নি। ইউনিয়নে চাঁদা দিয়েছে। স্ট্রাইকের সময় সবাই যোগ দিলে নিজেও যোগ দিয়েছে, কিন্তু মিছিলে না হেঁটে বাড়ি চলে গেছে। কোনদিন বদলি হওয়া নিয়ে কোথাও আবেদন নিবেদন করেনি। বিয়ে হলে বৌকে একবার পুরী নিয়ে গেছল। ব্যাংকের হলিডে হোম এ ছিল, ব্যস্। ভালভাবেই জীবন কেটেছে, মেয়ে হওয়ার বছরে প্রমোশন পেয়ে হেড ক্যাশিয়ার হয়েছিল। পয়মন্ত মেয়ে। তবে মায়ের ধাত পেয়েছে। জেদী, অ্যামবিশাস। মেয়েটার পাঁচবছর ন্যাশনাল ল' ইউনিভার্সিটিতে পড়ার খরচা শুনে ও আঁতকে উঠে বলেছিল --কী করে হবে? মেয়ে খিল খিল করে হেসে উঠেছিল,-- ড্যাড্, এত ভয় পাও কেন? এডুকেশন লোন নেবে? -- লোন সাত লাখ? আমায় কে দেবে? বৌ ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল,-- তোমার ব্যাংক দেবে! সবাইকে দিচ্ছে তোমায় দেবে না? কী লোক তুমি? ---- কে শোধ দেবে? --- আমি শোধ দেব বাবা। কোন চিন্তা কর না। পাশ করার একবছরের মধ্যে একটা ঝিনচ্যাক চাকরি জোগাড় করব, কোন বড় ল' ফার্মে। দিল্লি-মুম্বাই বা লুরুতে। ---কেন কোলকাতা কী দোষ করল? এখানে বাড়িভাড়া যাতায়াত কত শস্তা। -- উঃ বাবা! কোলকাতায় সব শস্তা কারণ এখানে খুব কম লোকের হাতে পয়সা আছে। এখানে মাইনেও কম, কাজও কম। বৌ খুব রেগে গেছল। রাগলে ওকে বেশ সুন্দর লাগে দেবাংশুর। তাই ও বৌকে শান্ত করার খুব একটা চেষ্টা করে না। --শোন, কোলকাতা হল রিটায়ার্ড লোকেদের জন্যে আদর্শ শহর। কারও কোন তাড়া নেই। সব ব্যাটাছেলে দুপুরে মাছভাত খেয়ে দোকান বন্ধ করে ঘুমোয়। তুমি তখন কোলকাতায় থেকো। মেয়ে আমার আজকালকার , ওকে দিল্লি-পুণে- মুম্বাই যেতে দিও। পাছু ডেক না। ওর জীবন, ও ঠিক করবে। দেবাংশু পেছনে হটে । ও ঠিকই জানে আসলে কে ঠিক করবে। ঘরে ফিরে আলো নেভাতে যাবার আগে ও জলের বোতল আনতে খাবার ঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। অবাক কান্ড! ওপরে মেয়ের ঘরে কথা বলার আওয়াজ। প্রায় ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর আভাস। ভাবল, বোধহয় কোন বন্ধু বা কলিগের সঙ্গে ফোনালাপ চলছে। এদের কখন যে দিন হয় আর কখন রাত, তা ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু অন্য স্বরটি যে ওর স্ত্রীর। আজকে তো মিতালি ঘুমোতেই আসেনি। এত রাত অব্দি ওরা জেগে? মেয়েটা খেয়েছে তো? বোধহয় ওকে ওর মা ওর বিছানাতেই খাইয়ে দিচ্ছে। এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু ঘরে ফিরে আসতে গিয়ে ওর পা মাটিতে সেঁটে যাচ্ছে যে! মা-মেয়ের চাপাগলায় উত্তেজিত কথা বার্তা শান্ত রাতে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। -তুই বিশ্বাস করিস না যে মেয়েটি মিথ্যে কথা বলছে? তোর বাবা অমন লোক নয়। এতদিন ধরে তো দেখছি। -- মা, ও বাবাকে চেনে না। ওর বাবার সঙ্গে কোন ইস্যু নেই, কেন মিথ্যে কথা বলবে? ওর কী লাভ? -- হয়ত অন্য কারও লাভ। কেউ হয়ত ওকে লাগিয়েছে, হয়ত পয়সা দিয়েছে। মেয়েটাকে দেখেছিস্? কেমন বেহায়ার মত একটা ছেঁড়া জিনের হাফ বা কোয়ার্টার প্যান্ট পরে হাজারো লোকজনের সামনে মলে ঘুরে বেড়াচ্ছে! -- মা, তুমি থামবে? কী সব বলছ? এক, এই দিল্লিতে বাবাকে কেউ চেনে না। বাবা একজন সাধারণ লোক। ভীড়ের মধ্যে একজন।পেছনে লাগতে কার বয়ে গেছে? আর ওটা ছেঁড়া খাটো প্যান্ট নয়, ওটাকে বলে-- --তুই আর ওসব ফ্যাশনের ব্যাপার শেখাতে আসিস না। প্যান্ট ইচ্ছে করে ছিঁড়ে ফ্যাশন হচ্ছে! --- আমাকে বলতে দাও। দুই, মেয়েটা মিথ্যে কথা বলেনি। -- সেকি? তুই যে তখন বললি? -- মা , ও ভুল বলেছে। মিস্টেক। তিন, মিথ্যে আর ভুলের মধ্যে তফাৎ আছে। একটা হল জেনে শুনে অসত্য স্টেটমেন্ট দেওয়া--অ্যাক্ট অফ ইনটেনশন অ্যান্ড ভলিশন। এখানে মেয়েটা যা বলেছে সেটা ও সত্যি বলে বিশ্বাস করে, তাই বলেছে। ---- তাঁর মানে তুই মনে করিস ওর অভিযোগটা ফ্যাক্ট। -- ওইটুকু , অর্থা`ৎ কেউ ওর বাটকে পিঞ্চ করেছে। কোন ভিড়ের মধ্যে হাত চালানো পাবলিক। মিতালির গলা উত্তেজনায় চড়ে যায়। --- আর তুই এটাও বিশ্বাস করিস যে ঐ ভিড়ের -মধ্যে -হাত-- চালানো পাবলিকটি তোর বাবা? --- মা, আমি বিশ্বাস করতে চাই যে ওই পারভার্ট লোকটি আমার বাবা নয়, অন্য কেউ। -- বিশ্বাস করতে চাই? এটা আবার কী বললি? এক মিনিট কেউ কিছু বলে না। তারপর মিনু বলে-- মা, টেকনিক্যালি দেখলে সেখানে ওই মেয়েটির কাছে আর কাউকে দেখা যায় নি তো! ---- তবে তুই যে তখন বললি? ওইসব কোন হাতে ছাতা না কি যেন ছাতার মাথা যুক্তি? সেগুলো সত্যি নয়! --- আমি তা বলছি না। আসল সত্যিটা কী সেতো আমরা কেউ জানিনা। আর দেখ, বাটক পিঞ্চিং এমন ব্যাপার যে তখনি মেয়েটি চমকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর বাবা ছাড়া কাউকে দেখতে পায় নি। সারকামস্ট্যান্শিয়াল এভিডেন্স দেখলে-- আদালত কিন্তু মেয়েটির অভিযোগকেই সত্যি বলে মেনে নেবে। আমি যা বলেছি সেটা কোর্টরুম প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞ্তা থেকে। দরকার হলে কোর্টেও তাই বলব। -- বলছিস কী মিনু? এটা কোর্টে উঠতে পারে? --কেন নয়? ওই মেয়েটি আমি হলে আমিই কোর্টে যেতাম, বুড়ো মানুষ বলে রেয়াৎ করতাম না। আগেকার দিন গেছে। মিতালির গলার স্বর বদলে যায়। --তুই মেয়ে হয়ে বাবাকে কাঠগড়ায় তুলবি? এই তোর বুদ্ধি? এই তোর শিক্ষা? তাই মেয়েটাকে কার্ড দিয়ে এলি? ওর হয়ে বাবার বিরুদ্ধে তুই--! --- আঃ মা! এবার থাম। ভয়ের চোটে মাথাটা গেছে। আমি তো ওকে ধমকে এলাম। চাইবে এ নিয়েআর কোথাও যেন কোন কথা না ওঠে। আমার একটা সম্মান একটা পরিচিতি আছে না? বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। --তোর ক্ষতি ? আর তোর বাবার? --ছাড় তো! তুমি আমার মুখে কথা বসাচ্ছ। --- শোন, একটা আইডিয়া এসেছে। ওখানে সিসিটিভি আছে। ওর ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে তোর বাবা নির্দোষ। এও দেখা যাবে কে দোষী বা আদৌ কিছু হয়েছিল কি না। হতে পারে সবটা মেয়েটার কল্পনা, তুই তো বড় ফার্মের অ্যাডভোকেট। চেনাজানা আছে। একটু চেষ্টা করে দেখ না , যদি সেই সময়ের প্রিন্ট পাওয়া যায়! --মা, এটা আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও। প্রিণ্টে কী দেখা যাবে আমরা কেউই জানি না। তাই এসব দোধারি তলওয়ার নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই ভাল। দেবাংশুর হাত থেকে জলের বোতল শব্দ করে পড়ে যায়। --- কে? কে ওখানে? মিতালি সিঁড়ির বাঁকে এসে দাঁড়ায়, তারপর চমকে ওঠে। --তুমি? কেন উঠে এসেছ? রাত একটা বাজে। যাও জল খেয়ে শুয়ে পড়। মিনুর ঘরের বাতি নিভে যায়। ৩) কয়েক দিন গড়িয়ে গেছে। দেবাংশু অনেকটা নিশ্চিন্ত। রোজ তন্ন তন্ন করে স্থানীয় পত্রিকার পাতা উল্টেছে। কোথাও কোন মলে কোন মেয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের খবর নেই। কিন্তু মেয়ের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন নেই। কেন নেই? একটা ঘটনা ঘটেছিল, বড় জোর দুর্ঘটনা। তাতে ওর কোন হাত নেই। তবু মেয়ের রাগ পড়েনি। এটা কি বাড়াবাড়ি না? মায়ের আশকারায় মেয়েটা মাথায় চড়েছে। তক্ষুণি ওর মনে পড়ল । আরে সেদিন মলে এইচ অ্যান্ড এম এ'র শপে ওর গোটা তিনেক প্যান্ট পছন্দ করে ফিটিং এর জন্যে ছেড়ে আসা হয়েছিল। কথা ছিল বিগ চিল এ লাঞ্চ করে তুলে নেবে। তারপর যা ঘটেছিল! ওরা তো সোজা বাড়ি ফিরে এল। প্যান্টগুলো? নতুন আর বেশ পছন্দের । শিনো না কি যেন ! অন্য রকম কাটিং, অন্য রকম কাপড়ের টেক্সচার। কিন্তু সেগুলোর কী হল? আজ মেয়ে অফিসে যাওয়ার সময় ও জিগ্যেস করেই ফেললঃ হ্যাঁরে মিনু! সেদিনের প্যান্টগুলো ? নিতে যাবি না? মেয়ে জবাব না দিয়ে ল্যাপটপের ব্যাগ তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার সত্যি অপমান লাগছে। কেন মরতে বলতে গেল? ও নেবে না ওইসব কেতাদুরস্ত পোষাক। কোলকাতায় ফিরে গিয়ে পাড়ার দর্জিকে দিয়ে বানিয়ে নেবে মাপমত। কিনে নেবে কাটপিস, যেমন এতদিন করেছে। ও বেরিয়ে যেতেই মিতালী চায়ের কাপ এনে সোফায় বসল। খবরের কাগজ খুলে মুখের সামনে মেলে ধরে বিড়বিড় করে বলল-- ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। মেয়ে ফোন করে ওগুলো ক্যানসেল করে দিয়েছে। যাচ্চলে! যতই রাগ হোক, বেশ পছন্দ হয়েছিল তো! তারপর ভাবল আপদ গেছে। ওই মলে আর কোনদিন পা রাখবে না। আর দিল্লির মেয়েগুলো যেন কি! সত্যি সেদিন কী হয়েছিল? দেবাংশু নিজের মনে ঘটনাটি রি-ওয়াইন্ড করে স্লো -মোশনে চালিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্যান্ট পছন্দ করে ট্রায়াল দিয়ে লেংথ দেড় ইঞ্চি কম করতে দিয়েছে কি খাবার জায়গা থেকে টেবিল খালি হওয়ার খবর এল। ওরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে চলমান সিঁড়ি ধরে একটা তলা উঠল। দেবাংশু পিছিয়ে পড়েছিল। বৌ-মেয়ে প্রায় রেস্তোরাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু ও হাঁ করে এক স্বর্ণকেশী বিদেশিনি ও তার সঙ্গীকে দেখছিল। অনেকটা মোনিকা বেলুচ্চির মত দেখতে। কিন্তু মেয়েটা তখন কোথায় ছিল? ওর খেয়াল নেই। শুধু এইটুকু মনে পড়ছে যে একটু আগে মোবাইল চোখ এবং কানে হেডফোন মেয়েটিকে ও সাইড ছেড়ে এগুতে দিয়েছিল। তাহলে কি মেয়েটি এগিয়ে যায় নি? কথা বলতে বা টেক্স্ট করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল? তা নাহলে ওর সঙ্গে বডি-কনট্যাক্ট হল কী করে? বডি-কনট্যাক্ট? কন্যাসম মেয়েটির সঙ্গে? কী বিচ্ছিরি শব্দ? ওর মনে এল কেন? না, আসতেই পারে। এটাই তো অভিযোগ। বাটক পিঞ্চিং! একরকমের বডি কনট্যাক্ট তো বটেই, তবে স্বেচ্ছাকৃত। উঁহু; সেসব কিছু হয় নি। কোন ধাক্কা বা বডি কনট্যাক্টই হয় নি। হলে ওর মনে পড়ত। আর চিমটি কাটা? জীবনে কোন মেয়েকে করেনি, নিজের বৌকেও না; আর আজ! মনে পড়ে গেল; ও করে নি। কিন্তু বৌয়ের খেমচানো চিমটি কাটা এসব অভ্যেস ছিল। বিয়ের প্রথম দিকে, মানে মিতালি সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছে তখন। কোন কিছু জোর দিয়ে বলতে গেলেই ও দেবাংশুকে চিমটি কাটত। জবলপুরে বড় হওয়া প্রবাসী বাঙালী মেয়ে, হিন্দি শব্দটাই বলত, চিকোটি কাটনা। শব্দ করে হেসে ফেলল দেবাংশু। হাসির শব্দে সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে বিরক্ত মুখে তাকাল মিতালি-- এত হাসির কী হল? -- না, মানে এমনিই। --এমনিই? সব কিছু তোমার এমনিই হয়ে যায়? -- কী বলতে চাইছ? -- ঠিকই বুঝেছ কী বলছি। মলে কয়েকশ' লোক। তার মধ্যে মেয়েটি বেছে বেছে এমনিই তোমার নামে কম্প্লেন করল? -- আমি কি করে জানব কেন করল? -- এমনিই। তোমাকে টাইটেলও দিয়ে দিল-- "ভীড়ের মধ্যে-হাত-চালানো-পাবলিক"! এমনিই। --- উঃ! সব কিছুরই একটা সীমা আছে। ওটা একটা দুর্ঘটনা। রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার মত। অন্যের দোষেও হয়। আমি নিজেই বুঝতে পারছি না যে কেন এমন হল। সেদিন মেয়ে নিজেই ওকে বলেছিল যে ওর ভুল হচ্ছে।আসল অপরাধী ভীড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছে। মানছি; ও তখন স্ট্যান্ড না নিলে আমাকে হয়ত থানায় যেতে হত। তারপরও তোমরা মা মেয়ে আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছ যেন--! আর আমিও একটা মানুষ। সব কিছুরই একটা সীমা আছে। প্লীজ, ওই টাইটেল-ফাইটেল আর বলবে না। ভাল লাগছে না। --আমাদের ভাল লাগছে? ওই মুখরোচক টাইটেলটি যে এখন অনেকের ছ্যাবলা কমেন্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। --- মানে? -- শোন। সেদিনের ঘটনাটা সেদিন কেউ মোবাইলে তুলে নিয়েছিল। তারপর ফেসবুকে আপলোড করে দেয়। দেবাংশুর হাত থেকে খানিকটা চা চলকে টেবিলে পড়ে । মিতালি বলতে থাকে। ---- ওই ক্লিপটি এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। প্রথমে যে পোস্ট করেছিল তাতে বলেছিল কেমন করে আজকের প্রজন্মের একটি মেয়ে এক বুড়ো ভদ্রলোককে গ্রেফতার হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।আ ব্রেভ গার্ল , আ মডার্ন পোর্শিয়া! একগাদা লাইক পড়ে। অনেকেই বলে আজকালকার বুড়ো শকুন উকিলেরা যখন গরীব ক্লায়েন্টের পচামাংসে ঠোকরায় তখন এই ব্যতিক্রমী অ্যাডভোকেট মেয়েটি আমাদের ভরসা । কিন্তু এর পরে অনেকের সুর বদলায়। কথা ওঠে --ওই কানে হেডফোন মেয়েটি তিলকে তাল করছে। একটু ছোঁয়া লাগলেই কম্প্লেইন? অমন ছুঁতমার্গ তো ঘরে বসে থাকলেই পারে। কেউ বললে অনেক মেয়ে আজকাল বড্ড অ্যাটেনশন সিকিং, আর আইনগুলো একতরফা, মেয়ে ঘেঁষা। ব্যস্, জেন্ডার-ইস্যু শুরু হয়ে গেল। মোবাইল আর হেডফোনের অতি-ব্যবহারের ফলে কত অ্যাকসিডেন্ট হয় তার ডেটা আর লিংক এসে গেল। কিছু মেয়ে বলল-- ভদ্রলোক কে আদৌ ধোয়া তুলসীপাতা মনে হচ্ছে না। কারও মোবাইলে ধরা পড়েছে এমন ছবি যাতে মনে হয় বুড়োটা স্টকার। একাগ্র হয়ে এক বিদেশিনি জোড়াকে হ্যাংলার মত দেখছে। কেউ কেউ বলল--মেয়েটির উচিত মহিলা থানায় কম্প্লেইন করা। তাহলে পুলিশি তদন্তে সত্যিটা ঠিক বেরিয়ে পরবে। পাল্টা এল-- সেই জন্যেই তো করছে না, করলে শেষে মিথ্যে অভিযোগের জন্যে ভদ্রলোকের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দিতে হবে, তাই। দেবাংশু উত্তেজিত। -- একদম ঠিক।করুক, কম্প্লেইন। আমি তৈরি। ও না করলে আমিই করব। তুমি মেয়ের সঙ্গে কথা বল। ডিফেমেশন ফাইল করে মোটা টাকার কমপেন্সেশন চাইব। আজকে রাত্তিরে ফিরে আসুক, আজকেই কথা বল। আমি রাজি। কোথায় যেতে হবে? তিসহাজারি কোর্টে? ---ছটফট কর না তো! মেয়ে রাজি নয়। হয়েছে কি, ওর অফিসে কেউ কেউ ক্লিপিং এর মধ্যে তোমাকে চিনে ফেলেছে। ওর বন্ধুরা! বলেছে-- আরে, ইয়ে তো আংকল জ্যায়সা দিখ রহা হ্যায়। ওরা প্রশ্ন তুলেছে যে তাহলে মিনু কেন বলছে ভদ্রলোক আমার চেনা, প্রতিবেশী? কেন পিতৃপরিচয় গোপন করল? তবে কি ও অভিযোগটি নিয়ে নিঃসন্দেহ নয়? কাজের জায়গায় দলাদলি, জেলাসি থাকেই। কেউ কেউ ওই "'ভীড়ের মধ্য হাতচালানো পাবলিক" টাইটেল নিয়ে ন্যাকা সেজে নানান অছিলায় ওর কানের পাশে কথা ছুঁড়ে দিচ্ছে। ওর এখানে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, মাথার ঠিক নেই। তুমি এটা যে কী করলে? --- আমি করলাম? এ'কথা তুমি বলতে পারলে? এত বছর একসঙ্গে থেকে আমাকে এই চিনেছ? পঁয়তিরিশ বছর! কোনদিন এতটুকু বাজে কথা উঠেছে? সুযোগ দিয়েছি? এমনকি তোমার দুইবোনকে নিয়েও কখনও কোন শালী-জামাইবাবু গোছের ইয়ার্কি করিনি। সুবোধদার বৌ আমার সমবয়সী; একই ব্যাচে এইচ এস পাশ করেছি। এত ঘনিষ্ঠতা, দু-বাড়িতেই। তবু বৌদি বলেই ডেকেছি। আর সম্পর্কের সম্মান বজায় রেখেই মেলামেশা করেছি। সব তুমি দেখেছ, তবু বলছ-- হাত চালানো পাবলিক? একদমে এতগুলি কথা বলে দেবাংশু হাঁফাতে থাকে। মিতালি তীক্ষ্ণ চোখে ওকে দেখতে থাকে। ফুলে উঠছে নাকের পাটা, চোখের তারা বড় বড়, চোখের কোণায় লালচে ভাব। ও উঠে যায়, ভেতর থেকে একটা প্রেশারের ট্যাব্লেট ও একগ্লাস জল এনে দিয়ে বলে-- মাথাগরম করে লাভ নেই।আমি যা সবাই বলছে তাই বলেছি, নতুন কিছু বলিনি। তারপর ভেতরে চলে যায়। দেবাংশু বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বেরিয়ে এসে অন্যমনস্ক ভাবে আগের দিনের গেঞ্জি ও পাজামা পরে ফেলে। খেতে বসে চুপচাপ খায় আর ভাবে --এর শেষ কোথায়? মিতালির চোখে ধরা পরে গেছে ওর বাসিকাপড়। একসেট ধোয়া কাপড় বিছানায় রেখে দিয়ে প্রায় আদেশের সুরে বলে-- খেয়ে উঠে কাপড় বদলে নিও। আর ছাড়া কাপড়গুলো বাস্কেটে ফেলে দিও। দেবাংশু জানে যে আজ ও কী করবে। খাবার পর ও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে । তারপর জামাকাপড় না বদলে একটি পূজোসংখ্যা হাতে নিয়ে বিছানায় লম্বা হয়। পাতা উল্টে যায়, কিন্তু কোন লেখাই মনে ধরে না। এভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়ে সেটা ও নিজেও জানে না। ৪) আজ মাসের প্রথম রোববার। দুপুরের খাবার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে মা-মেয়ে মাসের বাজার করতে রিল্যান্সের একটি দোকানে যাবে। ফিরতে বেশ দেরি হবে। এই কয়েক ঘন্টা দেবাংশু বাড়িতে একাই থাকবে। তাতে কোন অসুবিধে নেই। পূজো সংখ্যা আছে গোটা তিন। এছাড়া রিও অলিম্পিকের কিছু খেলা। সময় টের পাওয়া যাবে না। আর বিকেলে রান্নার মেয়েটি এসে রাত্তিরের রুটি-তরকারি করার আগে আংকলকে চা করে দেবে, নিজেও খেয়ে নেবে। কিন্তু বেরোনোর সময় মিতালি বলল-- দুকাপ চা করে ফ্লাস্কে রেখে গেলাম। সময়মত খেয়ে নিও। দরকার হলে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিও। -- খামোকা কষ্ট করলে কেন? বিকেলে সন্ধ্যা আসবে তো, ওই বানিয়ে দিত। --না, ও আজ আর ওবেলায় আসবে না। মিনু বলে দিয়েছে আজ বিকেলে না আসতে। আমরা বেরোচ্ছি তো! -- তোমরা বেরোচ্ছ, আমি তো থাকছি। কথাটা এবার দেবাংশুর কানেই কেমন বেখাপ্পা লাগল। মিতালি কিছু না বলে বাজারের লিস্ট আর পার্স তুলে নিল। সন্ধ্যের মুখে মিতালির ফোন এল যে ওরা আসছে , আর পনের মিনিটের দূরত্বে আছে। জোরে বেল বেজে উঠল। কে এল আবার? কাজের মেয়ে তো এত জোরে কখনও বাজায় না। আর মিতালি কখনো এমন করে না। দরজা খুলে দেখল অনামিকা। মিনুর কলিগ ও বন্ধু। ও একগাল হেসে বলল--গুড ইভনিং, অন্দর আও বেটি। কিন্তু বরাবরের হাসিখুশি মেয়েটির আজ কী হল? অন্যান্য দিনের মত হেসে 'নমস্তে আংকল' না বলে সোজা জিগ্যেস করল মিনু ঘরে আছে কি না! ফেরেনি? এক্ষুণি আসবে? ঠিক আছে , আমি ফোন করে একটু পরে আসছি। এত কিসের তাড়াহুড়ো? আজ আবার অফিসে নতুন কিছু হল নাকি? খানিকক্ষণ পরে দরজা ঠেলে ঢুকল মিনু, অনামিকা । ওরা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা মিনুর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। একটু পরে হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে এল মিতালি, পেছনে বাজারের তিনটে ভারি ব্যাগ নিয়ে ড্রাইভার ছেলেটি। মিতালি সব দরজা জানলার কবাট টানা আছে কি না দেখে নিয়ে এসি অন করল। -- বড্ড হিউমিড ক্লাইমেট। গরম কমেছে, কিন্তু উমস্ বেড়ে গেছে। দেবাংশু এক গ্লাস জল এনে দেয়। মিতালি বাজারের জিনিসপত্র নামিয়ে লিস্টির সঙ্গে মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। --- চা খাবে? ফ্লাস্কে কিছুটা আছে, গরম করে দিই? --ব্যস্ত হয়ো না। সে আমি করে নেব। একটু জিরিয়ে নিই আগে। একটু সময় কেউ কোন কথা বলে না। শেষে দেবাংশু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলে-- কী হয়েছে বল দেখি? অনামিকা ঘরে না ঢুকে চলে গেল। তারপর মিনুর সঙ্গে এসে হুড়মুড়িয়ে সোজা ওপরে। আগে কখনও হয় নি। সিরিয়াস কিছু? তুমি টের পেলে? মিতালি খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর রিলায়েন্সের দোকান থেকে আনা একটা সুগন্ধি মুখশুদ্ধির শিশি খুলে গোটা কয়েক দানা মুখে পোরে। --- ও দিল্লি ছাড়ছে। --কে? --আমাদের মেয়ে, মিনু। --অ্যাঁ? কী ব্যাপার? --আর ব্যাপার! সেই ভাইরাল মোবাইল ক্লিপিং! এ নিয়ে অফিসে একজন সিনিয়রের সঙ্গে মিনুর জোর একরাউন্ড হয়ে গেছে। শেষে ও রাগের মাথায় রেজিগনেশন লিখে দেয়। ল' ফার্মের পার্টনার ওকে অনেক বোঝান, কিন্তু ও গোঁ ধরে থাকে। ওকে তো জান। শেষে একটা রফা হয়েছে। আপাততঃ ওকে ওদের পুণে অফিসে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে। দু'বছরের জন্যে। ফার্ম চাইছে ওকে ধরে রাখতে। আশা করছে দিল্লি থেকে কিছুদিন সরে থাকলে ওর মন পাল্টাবে। অনামিকা মেয়েটি সেই জন্যেই এসেছে। -- কী জন্যে? -- মিনুকে দশদিনের মধ্যে পুণে অফিস জয়েন করতে হবে। ততদিন ছুটিতে থাকতে পারে। সেই সব দরকারি চিঠিপত্র, প্লেনের টিকিট--ও নিয়ে এসেছে। -- আমরাও পুণে যাচ্ছি? --- না, আমরা পরশু সকালের ফ্লাইটে কোলকাতা যাচ্ছি। --ঠিক কথা; আগে ও পুণেতে গিয়ে থিতু হয়ে বসুক, তারপর আমরা যাব। দিল্লি পচে গেছে। এখানে আর কিছু দেখার নেই। পুণে গেলে লোনাবালা, খান্ডালা, পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বর --সব ঘুরে দেখব। -- না। মেয়ে বলে দিয়েছে একবছর যেন আমরা পুণে না যাই। ওর একটু সময় চাই-- এতবড় ধাক্কাটা সামলে উঠতে হবে তো, অন্ততঃ একটা বছর। -- অনামিকা কি আমাদের টিকিটও নিয়ে এসেছে? --হ্যাঁ; অফিস থেকেই করে দিয়েছে। -- তাহলে আমি যখন দরজা খুললাম কিছু বল না তো? --বলবে না। ওই ক্লিপিংটা ও দেখেছে যে! দেবাংশুর মাথা ঘুরে ওঠে। গোটা ঘর দুলতে থাকে। ও সোফা থেকে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ে। --আরে কী হল? --কিছু না; মাথাটা একটু ঘুরছিল। এখন ঠিক হয়ে গেছে। না, কোন ওষুধের দরকার নেই বৌ হ্যান্ডব্যাগ থেকে ওকে একটা ক্যপসুল বের করে দেয়। ও হাত নেড়ে বারণ করে। ওর ভেতরে একটা চন্ডাল রাগ গরম কালের আঁধির মত পাক খেয়ে উঠছে। -- কী হল? -- মেয়েকে বল টিকিটি ক্যানসেল করতে। আমি ওদের অফিসের টিকিটে যাব না। নিজের পয়সায় রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকিট কাটব, নয়াদিল্লি-শেয়ালদা। --- এ আবার কি? --শোন, আমি কবে যাব, কোথায় যাব, কীভাবে যাব--এটা অন্য কেউ ডিক্টেট করতে পারে না। --- আচ্ছা পাগল! কে ডিক্টেট করছে? ওকে এখান থেকে সব গুছিয়ে গাছিয়ে পুণে যেতে হবে, বাড়ি খুঁজতে হবে। তার সাত-সতের নানান ফ্যাকড়া। আমাদের আগে কোলকাতায় শিফ্ট না করে ও এসব কাজ--! -- একটা কথা জিগ্যেস করি? তুমিও কি আমাকে দোষী ভাব? বা একটু-আধটু সন্দেহ? মিতালি চুপ করে থাকে। দেবাংশু এগিয়ে গিয়ে ওর দু'কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে থাকে। -- স্পষ্ট করে বল? হ্যাঁ কি না? আমায় অবিশ্বাস কর--হ্যাঁ কি না! -- হ্যাঁ, তোমায় বিশ্বাস করি। জানি তুমি নির্দোষ। -- তাহলে কোলকাতা যাবার আগে একটা কাজ করতে হবে। কাল তুমি আমার সঙ্গে চল। --কোথায়? --ওই মলে। তুমি আর আমি। কাউকে বলার দরকার নেই। কারও অনুমতি চাই না। গিয়ে সেই এইচ অ্যান্ড এম শপে যাব। পছন্দের তিনটে প্যান্ট কিনব। আমার ডেবিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করব। সেদিনের সেই সিকিউরিটির লোক বা ম্যানেজমেন্টের লোক যদি কিছু বলে তো ডিমান্ড করব সিসিটিভি'র প্রিন্ট আউট বের করে দেখে তবে কথা বলুক। অনেক সহ্য করেছি, আর চুপ করে থাকব না। কী হল? চুপ করে আছ যে? -- শুনছি। একটু চা গরম করে নিয়ে আসি। যা আছে দুজনে ভাগ করে নেব। চা খেতে খেতে মিনিট পাঁচ ওরা চুপ করে থাকে। দেবাংশু ব্যগ্র হয়ে বৌয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। একজন ওকে বিশ্বাস করে। একজন অন্ততঃ ওর সঙ্গে আছে। -- এবার বল? কাল যাবে আমার সঙ্গে? প্যান্ট কিনতে? -- বলছি; তোমার হয়ত ভাল লাগবে না। বললাম না যে তোমাকে বিশ্বাস করি। কারণ আমি জানি অমন কাজ তুমি করতে পার না। (দেবাংশুর মুখে হাজার ওয়াটের হ্যলোজেন।) কেন? তুমি হচ্ছ ভীতুর ডিম। আসলে ওইরকম অসভ্যতা করতেও একধরণের সাহস লাগে। ধরা পড়ার, মার খাওয়ার, অপদস্থ হওয়ার। ওইরকম জোখিম নেওয়ার লোক তুমি নও। তুমি সারাজীবন সেফ সাইডে খেলেছ। ( দেবাংশুর ফিউজ উড়ে গেছে!) কাজেই আর হিরো হতে যেও না। ইউ আর নট কাট ফর দ্যাট। তুমি নিজে কখনও কোন ডিসিশন নাও নি। ভর্তি হতে চাইতে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজে, বাবার ধ্যাতানি খেয়ে গেলে পাড়ার কলেজে বিএসসি পড়তে। পাশের বাড়ির মন্দিরা চেয়েছিল তুমি যেন ওর বাবাকে গিয়ে বল। তুমি পারলে না। বিয়ের পর শ্বাশুড়ির অন্যায় সব হুকুম ও নজরদারি দেখেও দেখ নি। বললে এড়িয়ে গেছ, বলেছ নিজেরা মিটিয়ে নাও। এখন শেষ বয়সে আর নতুন করে নিজেকে বদলাতে পারবে না। তাই মেয়ের কথা মেনে কোলকাতা ফিরে চল। সেখানে আমরা নিজেদের চেনা সার্কেলে নিরাপদে থাকব। (৫) পরদিন সকালে চা খাবার পর দেবাংশু বাথরুমে যায়। দুদিন দাড়ি কামানো হয়নি। কাঁচাপাকা খোঁচাখোঁচা দাড়ি এখন কামিয়ে না ফেললে চেহারাটা অসুস্থ অসুস্থ দেখাবে। গালে সাবান লাগিয়ে রেজার হাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মিতালি ডাকল একবার সম্ভবত। ব্রেকফাস্ট রেডি বা ঐধরণের কিছু বলছে, ঠিকমতো শুনতে পায়নি দেবাংশু কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পায়। দাড়ি কামিয়ে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখে টোস্টেড ব্রাউন ব্রেড, ফল, রোজকার ওষুধ রাখা রয়েছে খাবার টেবিলে। মিতালি মনে হয় আবার ঢুকে গেছে কিচেনে। মিনুর কোনো সাড়াশব্দ পায় না। বেডরুমে গিয়ে সে বাইরের পোশাক পরে নেয়, রিস্টওয়াচ গলিয়ে নেয় হাতে, চুল আঁচড়ানো হয়না, যদিও আঁচড়ানোর মতো তেমন চুল অবশিষ্ট নেই মাথায়। বেডরুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফের ফিরে যায় সেখানে। ওয়ালেটটা ভুলে গেছল নিতে। এবার পায়ে জুতো গলিয়ে মোবাইলটা নেবে কি নেবেনা দুবার ভেবে নিয়েই নেয় সঙ্গে। দরজা খুলে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। ঘন্টাখানেক পরে তাকে দেখা যায় শপিং মলটার বাইরে। মল সবে খুলছে। চেকিং পেরিয়ে সে ঢুকে যায় ভেতরে। না। কেউ তাকে কিছু বলেনি। কেউ বাধা দেয়নি। চিনেও ফেলেনি। এইচ অ্যান্ড এমের দোকানে ঢুকে সে খুঁজতে থাকে সেদিনের পছন্দ করা ট্রাউজার্সগুলো। একটা ছিলো কালো রঙের, আরেকটা খাকি। তিননম্বরটা গ্রে রঙের কিন্তু ওর সাইজেরটা পাওয়া যায় না। আজ আর ট্রায়ালরুমে গিয়ে পরে দেখবার দরকার নেই। একটা কটনের কালো টিশার্ট পছন্দ হয় কলারওয়ালা। মাপ দেখে মনে হচ্ছে গায়ে হয়ে যাবে। ক্যাশে গিয়ে ডেবিট কার্ড দিয়ে দুটো প্যান্ট আর একটা টিশার্টের দাম মিটিয়ে দেয় সে। একটু ঘোরে মলের ভেতরে। সকাল সকাল বলে এখনো সেরকম ভিড় নেই। একটা কাফেটেরিয়াতে বসে এক কাপ কাপুচিনো খায় সে। চিনি দিয়ে। আজ সকালে শুগারের ওষুধ প্রেশারের ওষুধ আরো গোচা দুয়েক ওষুধ খাওয়া হয় নি। নতুন কেনা শার্টপ্যান্টের প্যাকেট সঙ্গে করে মল থেকে বেরোনোর পরে সে বাইরে একদণ্ড দাঁড়ায়। এবার খেয়াল হয় পকেটে মোবাইলটা বাজল যেন। বের করে দেখে চারটে মিসড কল। চারটেই মিতালির। মোবাইলের ভলিউম কমানো ছিল তাই শুনতে পায় নি সে। এই কলটাও সে রিসিভ করবার আগেই কেটে গেছে। ফোনে চার্জ খুব কম। চব্বিশ পার্সেন্ট। কাল রাতে চার্জে বসিয়ে রাখতে ভুলে গেছল কি? ফোনে দেখাচ্ছে কিছু ভয়েস মেসেজ রয়েছে। মিতালিকে কল ব্যাক করে দেবাংশু। -- কী ব্যাপার? তুমি ব্রেকফাস্ট না খেয়ে কোথায় বেরিয়ে গেছো? আমরা বারবার কল করছি, ধরছিলে না কেন ফোন? -- শুনতে পাই নি, ভলিউম কমানো ছিল। --কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই তোমার? অত ইম্পালসিভ হলে চলে? চলে এলো বাড়ি। মিনু এমনিতেই টেনশনে রয়েছে। আর টেনশন বাড়িও না। দেবাংশু চুপ করে থাকে। কোনো কথা বলে না। মিতালির সবকটা কথা তার কানে গেছে বলেও মনে হয় না। --কী হলো? হ্যালো, হ্যালো। তুমি কোথায় এখন? শুনতে পাচ্ছ? --হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। --তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। দেবাংশু ফোন কেটে দেয়। সে এখন ফিরবে না। অটো হোক কি ট্যাক্সি, সে এখন নিউদিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাবে। সেখান থেকে ট্রেনের টিকিট কেটে যাবে কোথাও একটা কাছে পিঠে হোক কি দূরে। মোবাইলের চার্জার তার সঙ্গে নেই। আস্তে আস্তে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়িতে জানাতে পারে না, গুছিয়ে বলবার মত ভাষা তার নেই। দুটো প্যান্ট একটা টিশার্ট এবং ওয়ালেট সঙ্গে করে কাপুরুষ দেবাংশু রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। (শেষ)
মিতা
আজ শোনাই সত্যি গল্প, ফুলকুমারীর l এরকম ঘটনা হয়তো অনেকই হয়, তবে কাছ থেকে দেখা ঘটনার অভিঘাত অনেক বেশি l তার নাম আমি রেখেছিলাম ফুলকুমারী, মনে মনে ! আজ জানি না সে কোথায় আছে, কেমন আছে l এই বিষাক্ত দুনিয়ায় ফুলকুমারীরা কি ভালো থাকতে পারবে ? অনেক দিন আগের কথা, তখন আমি জুনিয়ার রেসিডেন্সি করি মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে l সে সময় আমাদের হাসপাতালে সব ডিপার্টমেন্টে শুধুই মহিলা পেশেন্ট ভর্তি হতো l ওয়ার্ড ডিউটি থাকলে সকালে গিয়ে ভর্তি হওয়া সব রুগীদের দেখে নোটস লিখে রাখতে হতো চার্টে, সিনিয়ররা রাউন্ডে আসার আগে l সেদিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি একটা বেডে ফ্রক পরা ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে বসে আছে, দেখে মনে হলো বেশ ভাল ঘরের (সরকারি হাসপাতালের রুগীদের তুলনায়) তবে বয়স বছর দশেকের বেশি মনে হলো না l আমি অবাক হয়ে ভাবলাম এই বাচ্চা মেয়েটা এখানে কেন, ওর তো পিডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে থাকার কথা l কার ভুল হল ! আমি মেয়েটির কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার কি হয়েছে? ও তার সারল্য মাখা চোখ তুলে জবাব দিলো 'আমি জানি না' l ওর পাশে এক মহিলা দাঁড়ানো ছিল, ভাবলাম মেয়েটির মা, তাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমার মেয়ের কি হয়েছে, এখানে কেন? সেই মহিলা বললো 'আমি ওর চাচী হই, আমিও জানিনা না ওর কি হয়েছে, বোধহয় পেটে ব্যাথা, ওর কাগজে লেখা আছে' l আমার একটু রাগ ই হয়ে গেলো, মহিলাকে বললাম তুমি কেমন চাচী, বাচ্চাটাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছো, আর জান না ওর কি হয়েছে l আসে পাশের বেডের রোগিনীরাও আমাদের কথা শুনছে, মাথা নাড়ছে l মেয়েটার চার্ট ওর বেড এ ছিল না, মহা বিরক্ত হয়ে আমি নার্সিং স্টেশন এ সিস্টারদের বলতে গেছি চার্ট বেডে নেই কেন - সিস্টার আমাকে ওর চার্ট টা দিয়ে বললো, কারণ আছে l চার্টের প্রথম পাতায় নাম, বয়স, ভর্তির তারিখ, ইত্যাদির সাথে একটা ডায়াগনসিস ও লেখা থাকে, কিন্তু এর চার্টে দেখলাম নাম, বয়স ১৩ বছর, কোন ডায়াগনসিস নেই.. একটু কনফিউসড হয়ে পাতা উল্টে দেখবো, তখন সেই চাচী এসে দাঁড়ালো, বললো 'আমি সবার সামনে আপনাকে বলতে চাই নি, ওর পেটে বাচ্চা আছে' l আমি মহা অপ্রস্তুত! ভাবতেই পারি নি এরকম কিছু l চাচী পুরো কাহিনী বলে গেলো, শুনতে শুনতে আমার মনে হলো এ তো ফুলকুমারী ! ফুলের মতো নিষ্পাপ, সরল একটা বাচ্চার সাথে এরকম যারা করে তারা পশু বলার ও যোগ্য নয় l শুনুন ওর গল্প: ফুলকুমারী জন্মাবার সময় কোন কারণে ওর ব্রেইনে অক্সিজেন কম গিয়েছিলো, তাই ওর মানসিক বৃদ্ধি অসম্পূর্ণ l তিন বছর পর তার ভাই জন্মালে মা পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে যায়, ঘর সংসার কিছুই দেখতে পারতো না l চাচা চাচী ও এক বাড়িতে থাকে, তাদের এক ছেলে সবার ছোট l চাচী স্কুলে পড়ায় l ফুলকুমারীর বাবা ব্যবসায়ী, বাবার কারখানা আছে বাড়ির নীচতলায় - সেখানে লোকজনের আসা যাওয়া চলে অবিরাম l দিনের বেলা ভাইরা স্কুলে যায়, ফুলকুমারী পড়ে চাচির কাছে সন্ধ্যের পর, দিনে সে থাকে আপন মনে l ফুলকুমারীর বয়স বাড়ে, মনের বিকাশ হয় না, মা থেকেও নেই, কার কু নজরে পড়ে ফুলের মতো মেয়েটি l কিছু দিন আগে চাচী খেয়াল করে ফুলকুমারীর দৈহিক পরিবর্তন - জেরা করতে থাকে কে করলো তার এই সর্বনাশ l সরলা বালিকা বলে 'সে (কারখানার কোন কর্মী) আমায় গলা টিপে মেরে ফেলবে বলেছে যদি আমি কাউকে কিছু বলি, আমার এতো ব্যাথা লাগে, তবুও আমি কাউকে কিছু বলিনি' l বাবা সেই জানার পর থেকে উন্মাদ প্রায় l সংসারে কলঙ্কের ভয়ে, কথা জানাজানি যাতে না হয়, তাই চাচা চাচী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছে চুপিচুপি, পাপ মুক্ত করাতে l ফুলকুমারী সত্যিই জানে না তার কি হয়েছে, কেন সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে l ওরা তাকে সেটা বলতেও চায় না পাছে ও লোকের সামনে বলে ফ্যালে l আমি চার্ট খুলে দেখলাম ও গাইনি ডিপার্টমেন্ট এর পেশেন্ট, ওদের অনুরোধে এখানে রাখা হয়েছে, তবে যেটা আরো খারাপ ব্যাপার তা হল ওর এমটিপির সময় সীমা অনেক দিন পার হয়ে গেছে, ওকে ইন্ডিউস করতে হবে, অর্থাৎ ড্রিপ চালিয়ে ডেলিভারি করাতে হবে, মনটা খুব ই খারাপ হয়ে গেলো l দুপুরের দিকে ওকে গাইনি ওয়ার্ডে পাঠাতে হলো প্রিপারেশনের জন্য l আমার এক বন্ধু ছিল সেখানে, তাকে বলে দিলাম বাচ্চা মেয়েটাকে খেয়াল রাখতে l আমার বন্ধুর ও খুব খারাপ লেগেছিলো, সেও চেষ্টা করেছিল মেয়েটাকে কিছু বুঝতে না দিতে, কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না l ইন্ডিউস করার পর ব্যাথা শুরু হয়, ওকে লেবার রুমে পাঠাতে হয় l আমরা পরদিন গিয়ে জানতে পারি রাত্রে ওর ডেলিভারি হয়েছিল, ফিটাস টা আয়ারা ওকে নাকি দেখিয়েছিলো, বলেছিলো 'দেখ তোর বাচ্চা' (মানুষের না বুঝে করা নিষ্ঠুরতা অনেক সময় সীমা হীন) l আমার আর দেখা হয় নি ফুলকুমারীর সাথে, আমার বন্ধু বলেছিলো সে ওয়ার্ডে ফেরার পর নিজেই বলছিলো 'পেট মে বাচ্চা থা, মর গিয়া' l
Sarita Ahmed
হাল্লারানীর রাজত্বে নাকি সেদিন কে 'ম্যাও' ডেকেছে । এই নিয়ে রানী তার উদোমুখো, হুঁকোমুখো ও ল্যাদারু দের সভায় এনকোয়ারি কমিশন বসালেন । কি ব্যাপার ? না, হাল্লা সাম্রাজ্যের বিশ্বাস 'টিকটিকি গায়ে হাগলে / পড়লে তা বেজায় অলুক্ষুণে ।' এতে কারু কোনো দ্বিমত নেই । দিব্যি সবাই টিকটিকিকে ভয়ভক্তি করে, মান্যিগন্যি করে চলে । এরই মাঝে 'ম্যাও' ডাক -- " টিকটিকি গায়ে পড়লে যদি এতই অকল্যাণ হয় , তবে দেশ থেকে টিকটিকি সরিয়ে ফেললেই হয় ।" ব্যাস ! হাল্লারানীসহ সব্বাই চটে গেল । 'উদোমুখো কোতোয়াল' খবর নিল ওটা 'ম্যাও' ছিল না , ছিল 'হালুম' । একদল বাঘের বাচ্চা 'টিকটিকি তত্ত্বে' বিশ্বাস রাখে না তাই বেজায় মাথা খাটিয়ে প্রচলিত 'কেতাব' কে প্রশ্নটশ্ন করে তারা আজব আজব তত্ত্বের অবতারণা করেছে এবং দেখিয়েছে , টিকটিকি না থাকলে প্রজাদের ভাত-কাপড়ের অভাব তো হবেই না, উলটে সব্বাই নির্ভয়ে জীবন কাটাতে পারবে । এত তো ভারি আজব কথা ! এদ্দিন দেশে কেউ এভাবে ভাবেনি । সব্বাই ধূপ ধুনো দেখিয়ে টিকটিকি র প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি দেখিয়ে এসেছে আর এখন এরা এমন 'হালুম' ডাকল , যে না শুনে পারাও যাচ্ছে না। ফলে দলে দলে কিছুজন সাহস দেখিয়ে বাঘ নাকি বিড়ালের সভায় যেতে টেতে লাগল , বুঝতে লাগল। হাল্লারাজ্যে অলক্ষ্যেই একটা ঢেউ উঠল , মাথা খাটানোর ঢেউ । সত্যিই তো , অমঙ্গল যদি টিকটিকির কারণে হয় তাহলে গা বাঁচিয়ে না থেকে টিকটিকি তাড়ালেই মিটে যায় । কিন্তু এমনভাবে মাথার ব্যায়ামের চর্চা দেখ, হুঁকোমুখো জল্লাদরা কি বসে থাকবে ? এদ্দিনের মান্যিগন্যির ব্যবসা সামান্য ম্যাও ডাকে লাটে উঠতে দেওয়া তো যায় না । ব্যাস, 'ল্যাদারু-দপ্তরে' খবর গেল ম্যাও না হালুম যাই হোক তাদের সভায় যোগ দিয়ে গোপন খবর নিয়ে এস । এরা দলে দলে হুকুম তামিল করতে ছুটল এবং অনলাইনরাজ্য নামক আজবদেশ থেকে খবর আনল চশমা আঁটা পণ্ডিত পণ্ডিত বাঘের বাচ্চারা প্রমান করে টিকটিকি তত্ত্বের বারোটা বাজাচ্ছে । দেশে আর টিকটিকি মেলাই দুস্কর হবে যদি ম্যাও ডাক ছড়িয়ে পড়ে । এই শুনে জল্লাদের দল চিল্লে উঠল "যারা যারা টিকটিকিতে বিশ্বাস করবে না তাদের গর্দান যাবে ।" হাল্লারানীও সায় দিয়ে বললে , 'হতে পারে ওরা বাঘের বাচ্চা , তাই বলে টিকটিকি কি ফেলনা নাকি ! রাজ্যে যখন 'টিকটিকি তত্ত্ব' আছে, তখন সবাইকে মানতে হবে ।' এই রায়কে সায় দিয়ে 'হুক্কাহুয়া-কাজী'র দলও বলল, ' টিকটিকিকে রাজ্যে খুবই প্রয়োজন । রাজ্যে বাঘ না থাকলেও চলবে , কিন্তু টিকটিকি না থাকলে রাজ্য রসাতলে যাবে । জল্লাদদের আমরা ঠেকাতে পারব না । কারণ জল্লাদরা মনপ্রাণ দিয়ে টিকটিকির রক্ষা করে এসেছে এতকাল , তাই তো আমাদের কারু গায়ে টিকটিকি হাগে নি ও অমঙ্গল হয় নি । সুতরাং সমাজে জল্লাদ আর টিকটিকি থাকা খুবই দরকার ।বাঘ না বিড়াল নিজের রাস্তা নিজেরা মাপুক ।' হালুম বাহিনী পাত্তাই দিল না; ফলে দলের বেশ কিছুজনের গর্দান গেল । এই নিয়ে পাশের রাজ্য ও তার পাশের রাজ্য সবেতেই একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল , সত্যি তো , দেশে কার বেশি প্রয়োজন ? টিকটিকি , জল্লাদ, ল্যাদারু নাকি বাঘ ! ব্যাপার হল, কেউই বুঝে উঠতে পারল না , যাকে নিয়ে এত হৈচৈ , যার সুরক্ষার জন্য এত হুকুম তামিল সেই টিকটিকি স্বয়ং কই ? টিকটিকি তত্ত্বের জনক রক্তচোষাকে পাওয়া গেছে । কিন্তু... রক্তচোষার বিচার তো হতে দেওয়া যায় না । 'হুঁকোমুখো জল্লাদ' বাহীনি 'রক্তচোষা' -ব্রাঞ্চের হুকুম তামিল করে মাত্র , তাদের হুকুম তামিল করে 'উদোমুখো কোতোয়াল' , তার হুকুম তামিল করে 'হুক্কাহুয়া কাজী'র দল তারা আবার পরামর্শ দেয় মহান 'হাল্লারানী'কে । সেইজন্য এদের সবার কথা মেনে তবে রাজ্যপাট চালাতে হয় রানীকে । এটা একটা 'চুইঁয়ে পড়া নীতি' মানা সাম্রাজ্য । যেখানে টিকটিকি কে কেউ না দেখলেও তার জনক রক্তচোষাকে আলবাত দেখেছে । তার ক্ষমতা নিয়ে কারু কোনো প্রশ্ন নেই । আরো বড় ব্যাপার হল রক্তচোষা ব্রাঞ্চের সাথে জল্লাদ বাহীনি ও সাঙ্গপাঙ্গদের আঁতাত সেই পুরাকাল থেকে । শুধু তাই না , এরা দলগত ভাবে ভীষন বলিষ্ঠ ও সঙ্ঘবদ্ধ । ফলে কেউ যদি এদের না মেনে একলা স্বাধীন শিকারি বাঘ নাকি বেড়াল কে মান্যি করে তবে মূর্খ্যটা কে ? আশপাশের রাজ্যগুলোতেও তাই হুক্কাহুয়া কাজীর থেকে নোটিশ গেল , --- " 'টিকটিকি তত্ত্বে'র গ্রহণযোগ্যতা কতদূর অটুট আছে তা সরজমিনে দেখতে 'হুঁকোমুখোজল্লাদ' রা ইনভেস্টিগেশনে যাচ্ছে । তাদের আটকাতে যেহেতু আমরা পারিনি ও আপনারাও পারবেন না তাই এতদ্বারা ম্যাও-ডাকা বাহীনির মুখে সেলোটেপ বা কন্ডোম পরাতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে । যদিও ম্যাও বাহীনির প্রসব রেট রক্তচোষার রেটের চেয়ে বেশি নয়, তবু যাতে তাদের গর্দান সালামত থাকে তাই এই কন্ডোম তত্বের নোটিশ । আপনারা এরম 'ম্যাও' ডাক শুনলেই জল্লাদ বাহীনিকে খবর দিন , নয়তো নিজ হাতে বেড়ালডাকা বাঘ বন্দী করুন ও টিকটিকি রক্ষা করুন ।" নোটিশে সই করলেন স্বয়ং হাল্লারানী এবং তার উদোমুখো -হুঁকোমুখো -ল্যাদারু সামন্তরা । এই ভাল ... হয় , স্বাধীনচেতা বাঘের একলা বাঁচার সুযোগ নিয়ে জল্লাদবাহীনি একযোগে ঝাঁপিয়ে গর্দান নিক , অথবা , বাঘ স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় বিদেশে পাচার হোক । যাই হোক না কেন টিকটিকিকে বাঁচাতে হবে ম্যাও বাহীনির থেকে । আর কে না জানে, রাজতন্ত্রে সকলের তরে সকলে আমরা ... সুতরাং 'টিকটিকির জয়' গাইতেই হবে । নোটিশ ছড়াতেই আশপাশ থেকে তুমুল রবে হাল্লারাজ্যের জাতীয় সঙ্গীত শোনা গেল ... 'ক্যায়া হুয়া ... হুক্কা হুয়া ...' বহিরাগত আমি ল্যালাকান্ত এতক্ষণ এই রাজসভায় আড়ি পেতেছিলাম । কে জানে দেওয়ালের কান আছে বলেই হয়তো, এদের বিজাতীয় সঙ্গীতকে একবার শুনলাম ' নারায়ে তকবির ...' তো পরক্ষণেই " জয় শ্রী রাম !" এসব পাঁচমেশালি ধ্বনির সাথে আমার কর্নপটহে খুব জোরে ভেসে এল টিকটিকির হাঁচি ... ঠিক ঠিক ঠিক ! ল্যালাকান্তের কানের আর কি বা দোষ ! পুনশ্চ : -- তারপর নাকি কেটে গেছে বছর দশেক। অত:পর জানা গেল, হাল্লারাজ্য এখন টিকটিকির রক্ষাকর্তাতে ভরে গেছে, বাঘসুমারি এখন বন্ধ তাই ম্যাও ডাক শোনা যায় কিনা কেউ জানে না। আর টিকটিকি? সে আদৌ কারু গায়ে এখনো অবধি হাগল কিনা সেটাও কেউ স্বীকার করে না। সবাই এখন সেদেশে ফিসফিস স্বরে টিকটিকির নাকি সাপের ভাষায় কথা বলে। ------------------------------------------------- ( বিধিমত সতর্কিকরণ : উক্ত ঘটনার সাথে হালফিলের 'সিক্কুলারিজমে'র কোনো আঁতাত নেই । সুতরাং বাদুরিয়া, বসিরহাট, বাংলাদেশ অথবা আশেপাশের অধিবাসীগণ চিন্তামুক্ত থাকুন । মেলা ব্রেন খাটিয়ে ম্যাও ডাকবেন না যেন ! টিকটিকির জয় হোউক । )
শিবাংশু
<একশো বছরের উপর হয়ে গেলো। ১৯০৫ সাল। জাজপুরের এসডিও চক্রবর্তীসাহেব বেরিয়েছিলেন জঙ্গলমহাল সরজমিন ঘুরে দেখতে। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে গভীর বনের মধ্যে কিছু ভাঙাচোরা পাথরের ভাস্কর্য। সঙ্গীদের কাছে জানতে চা'ন এই জায়গাটার নাম কী? তারা বলে নালতিগিরি। ঘন গাছ-বনস্পতির আলোছায়ার মধ্যে দেখা যাচ্ছে উঁচুনিচু টিলা আর লালমাটির রং। জাজপুরে ফিরে এসে তিনি ব্যাপারটা একেওকে জানান। কিন্তু তা নিয়ে কেউ বিশেষ গুরুত্ব দেননি।শেষে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাদুঘরের পণ্ডিত রমাপ্রসাদ চন্দ মশাই এখানে এসে নিদর্শনগুলি পরীক্ষা করেন। তার ফলশ্রুতি হিসেবে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের দলিলে নালতিগিরি জায়গা পেয়ে যায়। ক্রমাগত খোঁজাখুঁজির সুবাদে ১৯৩৭ সালে সরকার স্থির করেন এই পুরাবশেষটিকে সংরক্ষিত তকমা দেওয়া দরকার। কিন্তু তার পরেও কোনও ব্যবস্থা হলোনা। কেটে গেলো আরো চল্লিশ বছর। ১৯৭৭ সালে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয় আর পুরাতত্ত্ব বিভাগের আয়োজনে খোঁড়াখুঁড়ির কাজে কিছুমাত্রায় গতি দেখা গেলো। তাও যথেষ্ট নয়। অবশেষে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ মধ্যে পাওয়া নানা নিদর্শন দেখে পণ্ডিতেরা বুঝতে পারলেন এই নালতিগিরিই প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখিত ললিতগিরি'র গরিমাময় বৌদ্ধবিহার। ললিতগিরি ছিলো প্রবাদপ্রতিম পুষ্পগিরি বিহারের একটা অংশ। পৃথিবীতে প্রাচীনতম বৌদ্ধসংস্কৃতির নিদর্শনগুলির মধ্যে একটি প্রধান পীঠ। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টিয় দশম শতক পর্যন্ত এখানে ছেদহীনভাবে বৌদ্ধসভ্যতার বৈজয়ন্তী উড়েছিলো। অনেকে বলেন ললিতগিরি উত্তরমৌর্যযুগ থেকে তেরোশতক পর্যন্ত পূর্বভারতে বৌদ্ধধর্মের নিরন্তর তীর্থভূমি হয়ে থেকেছে। ------------------------- খননকাজের পর এখানে ছোটো পাহাড়ের চূড়ায় একটি বিশাল স্তূপ আত্মপ্রকাশ করে। এই স্তূপটির গভীর থেকে একটি খোণ্ডালাইট পাথরের বাক্স পাওয়া যায়। প্রথম বাক্সটির ভিতরে আরেকটি স্টিয়াটাইট পাথরের কৌটো। তার ভিতর প্রথমে রুপোর ও তারও ভিতরে একটি সোনার কৌটো। এই সোনার কৌটোর ভিতরে ছিলো শাক্যমুনি বুদ্ধের দেহাস্থি। ------------------------- এই স্তূপটি ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরানিদর্শন রয়েছে ললিতগিরিতে। পূর্বমুখী উপবৃত্তাকার চৈত্যগৃহ। ৩৩X১১ মিটারের ইঁটের নির্মাণ। যার দেওয়ালগুলি ১১ ফিট চওড়া। এর কেন্দ্রে আছে একটি বৃত্তাকার স্তূপ। তার উপর কুশান ব্রাহ্মী লিপিতে খোদিত শিলালেখ। এটি এবং আনুষঙ্গিক পুরা নিদর্শনগুলি দেখে মনে করা হয় এগুলি পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে, অর্থাৎ গুপ্তযুগের নির্মাণ। -------------------------- ললিতগিরি গড়ে উঠেছিলো বিভিন্নপর্বে তৈরি হওয়া চারটি বৌদ্ধবিহারকে কেন্দ্রে রেখে। প্রথম বিহারটি বৃহত্তম ও দশম-একাদশ শতক নাগাদ নির্মিত হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিহারটি পরবর্তীকালে, যখন বৌদ্ধধর্মের দিন ফুরিয়ে আসছিলো এদেশে। তৃতীয় ও চতুর্থ বিহারগুলি আগে পরে তৈরি হওয়া। এখানেই একটি নবম-দশম শতকের পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া যায়। তার উপর উৎকীর্ণ ছিলো "শ্রী চন্দ্রাদিত্যবিহার সমগ্র আর্য ভিক্ষু সঙ্ঘস্য।" এই উল্লেখটি থেকেই ললিতগিরির পরিচয়টি পণ্ডিতেরা জানতে পারেন। ------------------ ওড়িশার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বহুকথিত স্বর্ণিম'ত্রিভুজের প্রাচীনতম বিন্দুটি এই ললিতগিরি। কটক থেকে পারাদিপের পথে জগৎসিংপুর জেলায় রাজপথ থেকে একটু ভিতরদিকে এই পুরাবশেষটি দেখতে পাওয়া যাবে। মূলস্রোত থেকে একটু দূরবর্তী হওয়ার জন্য রত্নগিরি বা উদয়গিরির মতো জনসমাগম এখানে দেখতে পাওয়া যায়না। কিন্তু ললিতগিরির গুরুত্ব অবিসম্বাদী এর প্রাচীনত্বের কারণে। এখানে মহাযানী সংস্কৃতির নানা পুরা নিদর্শন পাওয়া গেছে। সোনারুপোর অলংকার, শিলাপট্ট, নানা শিলমোহর ছাড়াও অবলোকিতেশ্বর, তারা, হারীতি, অমিতাভ, মহিষমর্দিনী, গণেশ, বুদ্ধ, বোধিসত্ব, জম্ভলা ইত্যাদি মূর্তি প্রধান। এইসব ভাস্কর্যে গান্ধার ও মথুরা শৈলির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। শেষ পর্যায়ে এখানে বজ্রযানী তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রও গড়ে উঠেছিলো। -------------------------- মহাস্তূপের উপর থেকে নিচে তাকালে আদিগন্ত সবুজের সমারোহে উজ্জ্বল উৎকলের সমভূমি। রোমাঞ্চ লাগে, যখন ভাবি হাজার হাজার বছর আগে আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষারা নিজেদের কর্মভূমি, তপোভূমি হিসেবে এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের স্মরণ করাই আমাদের তর্পণ। আলোয় ছায়ায় নিরন্তর আসাযাওয়া। আমার ভারতবর্ষ।>
Stuti Biswas
গাড়ী পারকিং করে টিকিট ঘরের কাছে যেতেই দেখি লম্বা লাইন । মনটা দমে গেল । তুফান জানাল আমরা এসেছি রামাদান (ইদ )ছুটীর মরসুমে । এখন এখানে সাত দিন ধরে ছুটি চলছে তাই এত ভীড় । তবে বিদেশীদের জন্য আলাদা গেট । ফাঁকা । টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম । চোখ জুড়িয়ে গেল । আগ্নেয়গিরির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারই পদতলে সবুজের ভাসাভাসি । নিকটেই মাউন্ট মেরাপি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি । শেষ ২০১০ এ জ্বলন্ত লাভা উগড়ে দিয়েছিল । সবুজের বাগানে নীল আকাশের নীচে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ব্রহ্মা, বিষ্ণু মহেশ্বর মন্দির । ভাবতে অবাক লাগে সেই প্রাচীন কালে ঝড়ঝঞ্জা জয় করে সাতসমুদ্র তেরো নদী অতিক্রম করে হিন্দুধর্ম পৌছেগেছিল ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ পুঞ্জে । আর আজ আমরা হিন্দুধর্মের উৎস তেই তাকে বজায় রাখার জন্য নানা ছলছুতো করতে থাকি । ইন্দোনেশিয়ায হিসাব করা মহা ঝকমারী ।মুদ্রার নাম রুপয়া । শুরু ১০০০ নোট থেকে । হোটেল থেকে মালিবু রোড রিক্সা ভাড়া চাইল ৩৫০০০ রুপয়া । আকাশ থেকে পড়লাম ।একিরে ভাই …কোন দেশে এলাম রিক্সাওলাও হাজার ছাড়া কথা বলে না । ডাব খেলাম । এত জল ,এত জল যে পেট ফুলে জয়ঢাক হবার জোগাড় । দাম চাইল ১৫০০০ রুপয়া ।কোন কিছু হিসাব করতে গেলেই শূন্যরা মাথার মধ্যে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিচ্ছিল। শূন্যের আধিক্যে মাঝে মাঝে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলাম । আচ্ছা এই লক্ষ ,কোটিপতি রিক্সাওলা, ডাবওলা এরপর এরা কি পতি হবে!!!!!!!!!!!! এই দেশের জন্যই মনে হয় ক্যাল্কুলেটর এখনো বেঁচে আছে কমপ্লেক্সে ঢুকতেই আমাদের স্বাগত জানাল বল্লমধারী সান্ত্রীরা ।এগোতে গিয়েও পিছিয়ে এলাম দেখি রাক্ষস খোক্কস ঘোরাফেরা করছে । ক্যামেরা হাতে নিতেই তারা পাশে এসে দাঁড়াল ।চললো নানা ভঙ্গিমায় ফটো সেসন । পেরেম্বানানে ছয়টি মূল মন্দির ছাড়াও আরো ছোট ছোট ২৩৫ টি মন্দির ছিল । বেশীরভাগই ধবংস হয়ে গেছে ।স্থানীয় লোকেরা পরিতক্ত পাথর নিয়ে কাজে লাগিয়েছে । এখন অবশ্য সবই সংরক্ষিত ।মন্দিরগুলি ধূসর কালচে রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর দিয়ে তৈরি । সংস্কারের পর কয়েকটি মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে । তারমধ্যে সবচেয়ে বড় শিবগৃহ । তার দুইপাশে অপেক্ষাকৃত ছোট ব্রহ্মা ও বিষ্ণু মন্দির । এই তিন মন্দিরের সামনে বাহন নন্দী, গারুদা ও হংস মন্দির । এ ছাড়া দুর্গা ও গনেশের আলাদা মন্দির । ব্রহ্মা ও শিব মন্দিরের গায়ে পাথরের ব্লকে খোদাই করা রামায়ন গাথা । বিষ্ণু মন্দিরের গায়ে খচিত শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা কাহিনী । অন্যান্য মন্দিরে র গায়ে ভগবত পুরাণের কাহিনী বর্ননা করা আছে । প্রত্যেক মন্দিরে উঠতে হল পাথরের উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে । মন্দিরের কারুকার্য সত্যি দেখার মত । সংরক্ষণের এত বন্দোবস্ত করলেও আশ্চর্য লাগল দেখে যে মন্দিরের ভিতরে কোন আলোর বন্দোবস্ত নেই । ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভিড়ে দম বন্ধ হবার যোগার । আলো না থাকায় পাথরের মুর্তির ভাল করে ফটো তোলা গেল না । পাথরের গায়ে খোদাই করা কারুকার্য দেখতে দেখতে পৌঁছেগেছিলাম সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে ।খেয়াল করিনি কখন সূর্য পশিম গগনে হেলে গেছে ।।কমপ্লেক্সটি বিরাট বড় । ভাল করে দেখতে হলে পুরোদিন হাতে করে যেতে হবে । ছুটির মরসুম হওয়ায় বেশ ভীড় ছিল । তবে প্রায় সবই লোকাল লোকজন । বিদেশী খুব একটা নজরে এল না । ফিরতে মন চায় না। দেখার তৃষ্ণা মেটেনা ।কিন্তু ফিরতে হবেই । ফেরার পথে কমপ্লেক্স সংলগ্ন মার্কেট থেকে কিছু কাঠের জিনিষ কেনা হল । ভালই দরাদরি চলে । যখন গাড়ীতে চড়লাম তখন চারিদিকে গোধূলির কমলা আলোর মায়াময়তা ।পাখিরা ডানায় ক্লান্তি মেখে ফিরছে । কমপ্লেক্স পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরলাম । ম্লান আলোয় দূরের গ্রামগুলি ছায়াছায়া হয়ে জেগে উঠছে । পেরেম্বানান রহস্যের সীমা নেই । খননের ফলে এখনো বেড়িয়ে আসছে অনেক মন্দিরের নির্দশন । সম্প্রতি ১৩ মিটার আগ্নেয়গিরির ছাইর নীচে চাপা পরা মন্দির আবিস্কৃত হয়েছে । সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রচুর মূল্যবান নির্দশন লুকিয়ে আছে এখানে । বিদায় পেরেম্বানান …। আর কোনদিন হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে না । এই ভাবেই শতাব্দী ধরে ইতিহাসের পাতায় তুমি বেঁচে থাকবে ।
Srijita
ছোটবেলায় গল্প লেখার চেষ্টা করতাম যদিও সেগুলো খুবই শিশুসুলভ ছিল‚ তবুও লিখ্তাম| সব খাতার পিছনের পাতা খুলে দেখলেই আমার কীর্তি নজরে পড়ত| একটু বড়ো হওয়ার পর অবশ্য সেসব ইচ্ছা চলে গেল‚ কেন? তা বলতে পারব না| তবে এরই মধ্যে স্কুল-ম্যাগাজিনে দুটো লেখা বেড়িয়ে ছিল| তারপর সব বন্ধ| অনেক বছর পর বাংলাআড্ডার খোঁজ পেলাম|এখানে ভূতের গল্প প্রতিযোগীতা দেখে মনে হল একবার চেষ্টা করেই দেখি| কিন্তু লিখতে বসে সব গুলিয়ে যেত‚ অনেক কিছুই মনে আসতো কিন্তু ঠিক করে লিখতে পারতাম না‚ একটু লিখেই আবার সব মুছে দিতাম‚ অবশেষে অতি কষ্টে একটা ছোট গল্প লিখলাম‚ তাও শেষটা ঠিক মনের মতো হল না| তবু অনেকদিন পরে লিখে বেশ ভালোলাগল| দুদিন আগে আবার হঠাৎ লিখতে ইচ্ছা হল‚ লিখতে বসলাম| দেখলাম এবারে বেশ লিখতে পারছি‚ আগের বারের মতো গুলিয়ে যাচ্ছেনা| যাই হোক মনে যা এল লিখলাম| কেউ কেউ লাইক দিল‚ কম্যান্ট করল| ইচ্ছাটা ডেলিপ্যাসাঞ্জার হয়ে যাক এমন wish পেয়েছি| ইচ্ছা তো ডেলি না হলেও প্রায়ই জেগে উঠছে| প্যাসাঞ্জার নিয়ে ট্রেন কতদূর যাবে জানি না‚ তবে ষ্টেশনে রোজই আসা হয় এটা বলতে পারি| <img class="emojione" alt="☺" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/263A.png?v=1.2.4"/> সবই বাংলাআড্ডার দৌলতে| ধন্যবাদ|
Ramkrishna Bhattacharya Sanyal
(প্রকাশিত লেখা) ================== বঙ্কিমচন্দ্র ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন – ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দে আর প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ তে । “ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনী কান্ত দাসের সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসের যে সংস্করণ প্রকাশ করে তাতে ‘ঐতিহাসিক ভূমিকা’ লেখেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার । ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘দেবী চৌধুরানী’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছেন:- ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভাণ করি নাই । ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসটিরও ‘আনন্দমঠের’ ন্যায় ঐতিহাসিক মূল্য আছে । যদিও এই উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা না করিলে বাধিত হইবো ।” দেবী চৌধুরাণীর আসল নাম ছিল শ্রী দুর্গা দেবী চৌধুরাণী । ব্রাহ্মণ জমিদারের বংশ। পরে, তিনি পারিবারিক কারণেই সরে দাঁড়ান আর তাঁর বজরা ভেঙে ফেলা হয় । প্রায় দুশো উনত্রিশ বছর আগে এই বাংলা ও বিহারে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলে বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র গেরিলা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল বাংলার ফকির, সন্ন্যাসী, তাঁতী, কৃষক ও জেলেদের মধ্যে। এক পর্যায়ে বর্তমান বাংলাদেশের রঙপুরে কৃষকদের এক বিদ্রোহ হয়। এই সংগ্রামের সময়ের এক কিংবদন্তীর নায়িকা ছিলেন রংপুরের দেবী চৌধুরাণী, যাঁর সত্য কাহিনীর উপর ভিত্তি করে বঙ্কিম তাঁর “দেবী চৌধুরাণী’’ উপন্যাস রচনা করেছিলেন। দেবী চৌধুরাণী ছিলেন এই সংগ্রামের এক পুরোধা ভবাণী পাঠকের সহযোগী। এরা দুজনই আবার ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বিখ্যাত মহানায়ক মজনু শাহের সাথী। বৃটিশ সেনাবাহিনীর লেফটেনান্ট ব্রেনান (লেফটেনান্ট ব্রেনানের কথা স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রও লিখেছিলেন উপন্যাসে ।) ডায়েরীতে- তাঁর কাছে ১৭৮৭ এ লেখা রুংপুরের কলেক্টরের চিঠিতে দেবী চৌধুরাণীর ঐতিহাসিক সত্য লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। দেবী চৌধুরাণীকে বৃটিশেরা দস্যু রাণী হিসেবে দেখলেও আসলে দেবী চৌধুরাণী বৃটিশদের অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিপীড়নমূলক নীতির দরুণ গরীব জনগণের দুঃখ কষ্টের প্রতিবাদেই মূলত তাঁর এই বৃটিশ বিরোধী আক্রমণ চালাতেন এটা পরিস্কার। ময়মনসিংহ ও রংপুর জেলায় ইংরেজ ও তাদের অনুগত বণিকদের পণ্য পাঠানোর নৌকাগুলোকে বার বার আক্রমণ করে লুঠ করতেন । (সেকালে অবশ্য জমিদারেরা লুঠপাঠ করতেন, রাজস্ব আদায়ের জন্য ।) অন্তত তিনটি আলাদা ঘটনাকে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে অভিহিত করা হয়। যার একটি মূলত সম্মিলিত হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম মাদারী এবং ধার্মিক ফকিরদের বৃহৎ গোষ্ঠী যারা পবিত্রস্থান দর্শনের উদ্দেশ্যে উত্তর ভারত থেকে বাংলার বিভিন্নস্থান ভ্রমণ করতেন। যাওয়ার পথে এসব সন্ন্যাসীগণ গোত্রপ্রধান,জমিদার অথবা ভূস্বামীদের কাছ থেকে ধর্মীয় অনুদান গ্রহণ করতেন যা তখন রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত ছিল। সমৃদ্ধির সময়ে গোত্রপ্রধান, জমিদারগণও এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ও অনুগত ছিলেন কিন্তু যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দেওয়ানী ক্ষমতা লাভ করে তখন থেকে করের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় ফলে স্থানীয় ভূস্বামী ও গোত্রপ্রধানগণ সন্ন্যাসী এবং ইংরেজ উভয়কেই কর প্রদানে অসমর্থ হয়ে পড়ে। উপরন্তু ফসলহানি,দুর্ভিক্ষ যাতে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রাণ হারায় যা তৎকালীন বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, সমস্যাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয় কারণ আবাদী জমির বেশিরভাগ থেকে যায় ফসলশুন্য । সেটা ছিল ১৭৬৯ -১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর । ১৭৭১ সালে, ১৫০ জন ফকিরকে হত্যা করা হয় দৃশ্যত বিনা কারণে। এটি ছিল অনেকগুলো কারণের একটি- যা ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং এ ক্ষোভ পরবর্তীকালে রূপ নেয় সংঘাতে বিশেষত নাটোরে, রংপুরে যা এখন আধুনিক বাংলাদেশের অন্তর্গত। এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে – এই ভবানী পাঠক কে ছিলেন ? যদুনাথ বাবু লিখছেন – ভবানী পাঠক ভোজপুরী অর্থাৎ আরা জেলার ব্রাহ্মণ । এদিকে ঐতিহাসিক – অমলেন্দু দে বলছেন, ভবানী পাঠক সেই সিরাজের সেনাপতি মোহন লাল । আদতে যিনি কাশ্মিরি হিন্দু কায়স্থ । লালা থেকে লাল । তাই মোহনের পদবী ছিল লাল । এঁরা বংশানুক্রমে করণিক বা কেরাণীর কাজ করতেন । এই খানেই লাগে খটকা । কারণ আরেক ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় ভবানী পাঠককে ‘ বাংলার বিদ্রোহী নায়ক’ বললেও – তিনি যে মোহনলাল ছিলেন, সেটা লেখেন নি। আঠারো শতকে মোহনলাল কাশ্মীর থেকে মুর্শিদাবাদে আসেন। সঙ্গে ছিল বড়ছেলে শ্রীমন্ত লাল আর ছোটছেলে হুক্কালাল । আর ছিল বোন । স্ত্রীর উল্লেখ কোথাও নেই । আর তিনি কেন এই সুদূর বাংলাতে এসেছিলেন – তার কোনো কারণ পাওয়া যায় নি । হতে পারে, তিনি যুদ্ধতে পারদর্শী ছিলেন বলে – এই বাংলাতেই আসেন, হয়তো দিল্লির দরবারে সেরকম পাত্তা নাও পেতে পারেন ভেবে কারণ সেই সময়ে মোগল শাসন ভারতে দুর্বল হতে আরম্ভ করেছে । বাংলায় আলীবর্দী খান জাঁকিয়ে বসা, তাই একটা হিল্লে হতে পারে ভেবে আসা – তবে সবটাই অনুমান । মোহলালের বোনের প্রকৃত নাম ছিল মাধবী। তাকে আদর করে হীরা ডাকা হতো। মোহনলালের সঙ্গে সিরাজের সখ্যতা থাকায়, সেই সূত্রে হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা হয়। এর ফলে হীরার গর্ভে সিরাজের এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আকিকার (নামকরণ অনুষ্ঠান) নাম জানা যায় না । সিরাজ, দাদুর ভয়ে ছয় বছরের এই সন্তানকে ঘোড়ার ওপর চাপিয়ে বেঁধে, ঘোড়ার পেছনে তির মারার ফলে – ঘোড়া ছুটতে থাকে । সিরাজের আশা ছিল – কেউ না কেউ ছেলেটিকে উদ্ধার করবে । হীরা জানতে পেরে দাদা মোহনলালকে সব বলেন । তিনি গিয়ে উদ্ধার করেন, কিন্তু সিরাজের ওপর রেগে গিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন । নবাব আলীবর্দি খাঁ জিজ্ঞেস করেন – কারণটা কি ? হীরার সঙ্গে সিরাজের অন্তরঙ্গতা ও সন্তানের খবর জানতে পেরে নবাব আলীবর্দি খাঁ খুবই বিচলিত হন। তিনি ঘটনাটি জানবার পর ইমামের সঙ্গে আলোচনা করে মীমাংসার সূত্র বের করেন, হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়। হীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আর তার নতুন নাম করণ করা হয় আলেয়া (উচ্চবংশজাত) । মোহনলালের একমাত্র জামাই ছিলেন ধর্মে মুসলমান। নাম:- বাহাদুর আলী খান। এই খান সাহেবও সিরাজের বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন। “মোহনলালের বোন যে সিরাজের স্ত্রী ছিলেন সে কথা নিখিলনাথ রায় উল্লেখ করেন। তবে তার নাম বলেন নি।” সিরাজ হেরে যাবার পর – মোহনলাল মুর্শিদাবাদ গোপনে ছেড়ে চলে যান, ভাগ্নেকে নিয়ে, কিন্তু হীরার কি হলো, সেই ইতিহাস আর মেলে না । মোহনলালের সঙ্গে ছিলেন , তাঁরই দুজন বিশ্বস্ত অনুচর । নাম – বাসুদেব আর হরনন্দ । ক্লাইভ ও মিরজাফর গুপ্তচর পাঠিয়ে তাদের ধরবার চেষ্টা করছে, এই খবর পেয়ে মোহনলাল ময়মনসিংহের বোকাই নগরে চলে গেলেও- সেখানে নিরাপদ মনে করেন নি। বোকাই নগর আছে এখনও এবং এটুকু জানা যায় – বোকা নামের এক কোচ জাতীয় লোকের নামে এই বোকাই নগর । মোহনলাল যে পলাশীর যুদ্ধে মারা যান নি, সে কথা ঐতিহাসিক এবং অধ্যাপক অমলেন্দু দে জোরের সঙ্গে এবং যথেষ্ট প্রমাণ সহকারে এটা লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণার বই- “ সিরাজের পুত্র এবং বংশধরদের সন্ধানে” (পারুল প্রকাশনী) বইতে । মোহনলালের বিশ্বস্ত সঙ্গী বাসুদেবের কাকা বিনোদ রায় আমহাটি গ্রামে বাস করতেন। মোহনলাল সিরাজের পুত্রকে সেই বাড়িতে রেখে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। মোহনলাল সিরাজ পুত্রকে দত্তক রাখার জন্য ময়মনসিংহের জমিদার কৃষ্ণকিশোর চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সম্মতি দান করেন। কারণ তাঁর ছোটভাই কৃষ্ণগোপাল দুবার বিবাহ করেও নিঃসন্তান ছিলেন। কৃষ্ণকিশোর ও কৃষ্ণগোপাল কেউই জানতেন না যে তারা সিরাজ পুত্রকে দত্তক নিচ্ছেন। তারা জানতেন যে বাসুদেবের কাকা আমহাটির বিনোদ রায়ের দ্বিতীয় ছেলেকে তারা দত্তক নিচ্ছেন। যথারীতি অনুষ্ঠান করে কৃষ্ণগোপাল এই পুত্রকে দত্তক নেন এবং তার নামকরণ করা হয় যুগল কিশোর রায়চৌধুরী। এই দত্তক পুত্র কৃষ্ণ গোপালের পিণ্ডাধিকারী ও উত্তরাধীকারী হন। এই ভাবে সিরাজ ও আলেয়ার ছেলে ভিন্ন নামে পরিচিত হন। এই তথ্য মোহনলাল ও তাঁর দুই সঙ্গীছাড়া কারও জানা সম্ভব ছিলোনা। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর জীবন বৃত্তান্ত ও তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথের কাছে ব্যক্ত করেন। যুগল কিশোর রায় ও নিজের প্রকৃত বংশ পরিচয় জানতে পেরে প্রাণকৃষ্ণ বিস্মিত হন। ব্রিটিশ শাসন কালে এই তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা সর্ম্পকে তিনি বিশেষ ভাবে সচেতন ছিলেন। এটুকু পরিচয় দিয়ে – আসল বিষয়ে আসি । ১৭৯০ সালের পর সিরাজ পরিবারের ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়নি। অর্থাৎ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী মারা যাবার পর সিরাজ পরিবারের ধারাবাহিক ইতিহাস সংরক্ষণ হয়নি। হয়ে থাকলেও ইংরেজরা, মীরজাফর, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, সিরাজ-উদ-দৌলাসহ সমকালীন ইতহাস বিনষ্ট করে দেয়। ১৭৯০ সালটা একটু অদ্ভূত ঠেকে আমার কাছে । এই সালেই ভবানী পাঠক মারা যান ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে । কেন এই সমাপতন ? কি উদ্দেশ্যে ! আমার মনে হয় – এই কারণেই মোহনলালের সাথে ভবানী পাঠকের সম্বন্ধ ঠাহর করতে পারেন নি পরবর্তী ঐতিহাসিকরা । মোহনলালের এই ছদ্মনাম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়, কারণ তিনি শাক্ত ছিলেন । অনেকেই বলেন – ভবানী পাঠক, ভোজপুরী ব্রাহ্মণ ছিলেন । কিন্তু সমকালীন ইতিহাস যদি আমরা ভালো ভাবে দেখি – তা হলে এটা সত্যি নয় , ওপরে বলা একই কারণে । এবারে বঙ্কিমচন্দ্র – দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসটি রচনা করার উপকরণ কোথা থেকে পেলেন ? প্রাণকৃষ্ণনাথ রায় চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল ১২ বছর বয়সে মারা যায়। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হলো শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। শৌরীন্দ্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলেন নিজেকে সম্পৃক্ত করায় ব্রিটিশ প্রশাসকদের কাছে তিনি সন্দেহভাজন ছিলেন। কৃষ্ণনাথ রায় তাঁর পিতার ও বংশ পরিচয় শৌরীন্দ্র কে খুলে বলেন। এই কারণে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে সমস্ত পরিবার বিপন্ন হয়ে পড়বে। গোপনীয়তা রক্ষা করে তারা দীর্ঘদিন ধরে চলছেন। শৌরীন্দ্র পারিবারিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি দুবার নাম পরিবর্তন করে এই অবস্থা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন এবং পড়াশোনায় নিমগ্ন হন। শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী প্রথমে হন প্রসন্ন চন্দ্র রায় চৌধুরী পরে নাম পরিবর্তন করে হন প্রসন্ন কুমরা দে। শৌরীন্দ্র প্রসন্ন রায় চৌধুরী নামে কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জুনিয়র স্কলারশিপ লাভ করেন। এই কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। এই হিন্দু কলেজ পরবর্তিতে প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়। উল্লেখ্য, শৌরীন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, প্রসন্নচন্দ্র রায়চৌধুরী ও প্রসন্ন কুমার দে একই ব্যক্তি ছিলেন। প্রসন্ন কুমার দে হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সী) পড়েন আর বঙ্কিম সেই কলেজেরই ছাত্র । সিরাজের বংশধর বলে 'পরিচিত' প্রসন্ন কুমার দে হিন্দু কলেজের (পরে প্রেসিডেন্সি) ছাত্র ছিলেন, বঙ্কিমও তাই। যদিও, প্রসন্ন বাবুর সঙ্গে বঙ্কিমের সরাসরি পরিচয় ছিল বলে, প্রমাণিত নয়। প্রসন্ন বাবু বঙ্কিম প্রয়াত হবার পর তাঁকে নিয়ে ইংরেজিতে কবিতা লিখেছিলেন। এটাতেও কিছুই প্রমাণ হয় না। কল্পনা করছি, প্রসন্ন বাবু বঙ্কিমকে তথ্য দিলেও, নানা কারণে, সেটা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন, তখন ইংরেজ শাসন চলার ফলে। ঔপনিবাসিক শাসনের কারণেই এই গোপনীয়তা । মোহনলালকে ভবানী পাঠক বানানোর পেছনে, বঙ্কিমবাবু কি শুধুই, মিথের সাথে কল্পনা মিশিয়েছেন? যদিও বঙ্কিমবাবু, মোহনলালের নাম কোথাও লেখেন নি। কিন্তু ভবানী পাঠকের চরিত্রের সাথে মোহনলালের মিল প্রচুর । হয়তো – সেই সময়ে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মোহনলাল আর মীরমদনের বীর্যগাথা গানের আকারে প্রচলিত ছিল – কিন্তু ইংরেজদের ভয়ে সেগুলোর চর্চা হতো না, ফলে সব হারিয়ে যায় কালক্রমে । বঙ্কিমচন্দ্র এই সব শুনে থাকলেও , শুনে থাকতে পারেন । এটা তো ঠিক - জলপাইগুড়ি থেকে রংপুর যাওয়া যেতো, তিস্তা নদী দিয়ে । জলপাইগুড়ি থেকে রংপুর, তিস্তা নদী দিয়ে দেবী চৌধুরানীর ক্ষিপ্র গতির বজরা যেতো। মানুষ তখনই একজনকে দেবতা হিসেবে মানে, যখন তারা অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচে কারও হাত থেকে । বাংলাদেশের রংপুর জেলার- পীরগাছা উপজেলা কার্যালয় ও পীরগাছা রেলওয়ে স্টেশনের অনতিদূরে এ জমিদার বাড়ি এখনও আছে। পীরগাছার স্থানীয় লোকজন মন্থনার জমিদার বাড়িকে রাজবাড়ি বলে ডাকে। রাজবাড়ির চারি দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দৃষ্টি নন্দিত ছোট বড় অনেক পুকুর । বাড়ির পিছনে ইতিহাসের কালের সাক্ষী হয়ে কোনমতে বেঁচে আছে দেবী চৌধুরানীর খনন করা ঢুসমারা খাল অর্থাৎ হঠাৎ বা অকষ্মাৎসৃষ্টি খাল। দেবী চৌধুরানী এ খাল দিয়ে নৌকাযোগে নদী পথে বিভিন্ন গোপন অবস্থায় যাতায়াত করতেন । বিশাল এলাকা নিয়ে ছড়ানো ছিটানো এ রাজবাড়ির অসংখ্য দালান আজ ধ্বংসপ্রায়। দালানের ইট,পাথর ও সুড়কি খুলে পড়েছে । দেয়ালের জীর্ণতা ও শেওলার আঁচড়ে পরগাছার রমরমা । ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজবাড়ির নাট্য মন্দির ও কাচারী ঘরটি বর্তমানে বাংলাদেশের পীরগাছা উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজবাড়ির ভিতরে নির্মিত প্রাচীন মন্দিরগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে। জমিদার জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ রায় বানিয়েছিলেন অপূর্ব কারুকার্য মন্ডিত দেড় শতাধিক বছরের পুরানো দৃষ্টি নন্দিত ত্রিবিগ্রহ মন্দির । এখন ধ্বংসের অপেক্ষায় দিন গুনছে । না হলে, আজও দেবী চৌধুরাণী এবং ভবানী পাঠক পূজিত হতেন না জলপাইগুড়ির শিকরপুর চা বাগানে । মন্দির থেকে এটা অন্তত বোঝা যায়, বঙ্কিমের উপন্যাস দেবী চৌধুরানী গল্প নয়, হতে পারে কল্পনার মিশেল আছে। সে ভবানী পাঠক – মোহনলাল হন চাই নাই হন । নিজামতের ( সরকারী দপ্তর) প্রায় সব দলিলই ইংরেজরা নিয়ে গেছিল, বিলেতে আর সেগুলোর পাঠোদ্ধার একরকম দুঃসাধ্য , কারণ এতই জরাজীর্ণ অবস্থা ছিল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে । ইংরেজরা ইচ্ছে করেই এসব মূল্যবান দলিলের এই অবস্থা করে। The Office of Indian Records being unfortunately in a damp situation, the ink is daily fading, and the paper moldering into dust- Preface to Stewart’s History of Bengal, 1813. ১৮১৩ সালেই যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তবে ২০১৭ তে কী অবস্থা হয়ে আছে, দুর্ভাগ্যবশত সেটা কেউ জানে না । তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস মোহনলালই ভবানী পাঠক । প্রমাণ করা এখন অসম্ভব । ================================ তথ্যঋণ :- প্রয়াত ঐতিহাসিক অমলেন্দু দের লেখা, 'সিরাজের পুত্র এবং বংশধরদের সন্ধানে' এবং নেটের বিভিন্ন সাইট ।
দীপঙ্কর বসু
বাই উঠলেই বাঙালির কটক যাবার একটা চালু রেওয়াজ আছে । আমাদের ও হল তাই । তবে কটক এখান থেকে মেলাই দূর । আর যাতায়াতের হাঙ্গামও কম নয় । কাজেই হাতে রইল পেন্সিল । অর্থাৎ কিনা ডায়মন্ডহারবার । তাই বা মন্দ কি ? মনোজদা ফোনে জিজ্ঞাসা করলেন “রবিবার ফ্রী আছেন? আমরা ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি – যাবেন? ভাইব্যা দ্যাহেন”। দলে টানবার ইনসেন্টিভ হিসেবে যাবার পথে আমাকে তুলে নেবার প্রস্তাব ও দিয়ে রাখলেন । ভাববার অবশ্য বিশেষ কিছু ছিলনা । বিশুদ্ধ বেকার একটি লোকের আবার অত ভাবার কি আছে । কাজ বলতে তো শুধু সারাটা দিন হয় , ইন্টারনেট নিয়ে খুটুর খুটুর করে কী বোর্ড ঠ্যাঙান ,নয় গানের গুঁতোয় পাড়ার লোকজনের কান ঝালাপালা করে দেওয়া । তার চেয়ে মুখ বদলের খাতিরে একটা দিন নিছক ছুটে চলার আনন্দে বেরিয়ে পড়লে দোষ কি । হালের এই ডিজিটাল জমানায় বোধ হয় এরেই কয় লঙ ড্রাইভে যাওয়া। মনোজদা একটা লাল টুকটুকে গাড়ি ভাড়া করে ফেললেন ,আমিও সাত সকালে গিয়ে হাজির হলাম একাডেমী অফ ফাইন আর্টস এর সামনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছুটা আগেই। ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছি শুনে এক পড়শি প্রশ্ন করেছিলেন “ডায়মন্ডহারবারে আবার দেখার কি আছে ? একাডেমী অফ ফাইন আর্টসের সামনে একটা ভাঙ্গা চাতালে বসে এক ভাঁড় চা সহযোগে পড়শির প্রশ্নের একটা জুতসই পদ্যের ছন্দে গাঁথা জবাবের খসড়া মনে মনে তৈরি করছিলাম । নিবেদন করি – পড়শি ক’ন মুচকি হেসে “ বেড়াতে যাবার জায়গা পেলেন শেষে কিই বা দেখার আছে এমন ডায়মন্ডহারবারে” আমি বলি “আরে ! বিশাল একটা নদী আছে ,কূল নাই তার কিনারা নাই সামনে আছে অকুল পাথার ,আরও বেশি চাই ? আবছায়াতে মিশে গেছে অপর পারের গ্রাম হলদিয়া তার নাম ডাইনে বাঁয়ে আর কিছু নেই, নেইকো কোনও শেষ শেষের শেষে আছে জানি অজানা এক দেশ …”।। নাহ । শেষ করা গেলনা । আমাকে তুলে নিতে পৌঁছে গেছেন মনোজদাদের দল । শিকেয় উঠল আমার পদ্যের খসড়া । একদিক দিয়ে ভালোই হল । আমার এই অনাচারের কথা যদি কবিদের ,বিশেষ করে শিবাজি বা দৃষ্টি ম্যাডাম - এঁদের কানে যায় তা হলে আর দেখতে হবেনা । কবিদের আমি বেজায় ডরাই । কোত্থেকে কোন চুন খসে পড়ে তা কে বলতে পারে !! ---------------------------------------------------------- কিন্তু , কি রাস্তা রে ভাই এই ডায়মন্ডহারবার রোড !! ধানক্ষেতও বোধ হয় হার মানবে খানাখন্দে ভরা ডায়মন্ডহারবার রোডের কাছে । নাচতে নাচতে ,দুলতে দুলতে চলেছে গাড়ি আর তার ভেতরে আমরা থেকে থেকেই একে অপরের ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি । “লালমোহনবাবু” সে গাড়িতে থাকলে হয়ত “বেহাল বেহালা” নামে একটা রহস্য উপন্যাসের প্লট ছকে ফেলতেন । তার ওপরে মাথার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছেমেট্রো রেলের নির্নিয়মান ফ্লাইওভার । ঠিক সরল রৈখিক নয় তার গতিপথটি । বরং অনেকটা বিসর্পিল গতি তার । গাড়ির কোটরে বসে ভারি সুন্দর দেখতে লাগছিল ফ্লাইওভারটাকে । মনে মনে তারিফ করছিলাম যে পরিকল্পনাকার এর গড়নটির রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির । সাপের উল্লেখ যাদের মনে বিবমিষা উদ্রেক করে তাদের জন্য না হয় এঁকেবেঁকে তিরতির করে বয়ে চলা একটি ছোট্ট নদীর উপমা দিই ,অথবা নৃত্যপরা কোন তন্বীর দেহবল্লরীর ! গাড়ির সামনের আসনে চালকের পাশে বসে এই সব কাব্যকথা মাথায় খেলে যাচ্ছে তখনি একটা কাপুরুষজনোচিত ভাবনাও যে মনের কোনে উঁকি মেরে যায়নি তা নয় । দুই একবার মনে হয়েছিল যদি এই ফ্লাইওভারের একটা অংশ হঠাৎ করে ভেঙ্গে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ে …তা হলেই চিত্তির। দুপুরের মধ্যেই ব্রেকিং নিউজ হয়ে যাব। আমার এই “পান্তাফ্যাচাং মার্কা” থোবড়াখানা(মনোজদার ভোকাবুলারি থেকে ধার করা বিশেষণ) ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কাছে মূল্যহীন হলেও চ্যাপটান দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ির মধ্যে থেকে বের করে আনা দেহখানা বেহদ দামি বিবেচিত হবে নিশ্চিত । তাও এই পলিটিক্সের ডামাডোলের বাজারে !! ------------------------------------------------------------------- আলতু ফালতু কথা ছেড়ে এবার “পতে কি বাত কিয়া যায়” মনোজদা কে বলেই রেখেছিলাম যাবার পথে জোকায় স্বামীনারায়ন মন্দির এ মিনিট পনেরোর জন্যে হলেও একবার থামব । এর আগে দুই একবার এই পথে যেতে মন্দিরটা আমার নজর কেড়ে ছিল । সময় ও সুযোগের অভাবে মন্দিরটা ভালো করে দেখা হয়ে ওঠেনি । এবার সেই সাধ পূর্ণ করে নেব । আসলে মন্দির দেখাটা একটা আছিলা মাত্র । দুর থেকে দেখে আমার চোখ বলেছিল এই মন্দিরের ছবি বেশ ভালো উঠবে । আমার মতলবটাই ছিল ছবি তোলা । আর বীথি বৌদি এবং তস্য বান্ধবী শিপ্রাদিদির পেয়েছিল চায়ের তৃষ্ণা । দেবালয় গমনের বিচিত্র কারণ বটে । Ladies first । অতয়েব পার্কিং লট এ গাড়ি থেকে নেমে আমরা গুটিগুটি পায়ে মন্দিরটাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখে নিয়ে রওয়ানা দিলাম খাবার ঘরের দিকে । পেল্লায় সাইজের একটা হলঘরে নানাবিধ খাবার মেলে ১৭টাকা পিস বেসন কা লাড্ডু , ১৮ টাকা প্রতি পিস আর একটা বেসন আর ঘি এর চটকানো পিণ্ডি সাজান সেখানে শো কেস এ । বৌদিদের সখ হল ধকলা খাবেন চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে । কিন্তু তাদের সে জ্যাগারিতে পড়ল স্যান্ড ।মানে , ধোকলা নেই । পরিবর্তে একটু অপেক্ষা করলে মিলবে স্বামীনারায়নের ভোগ । নানান সবজী দিয়ে বানানো খিচুড়ি । চা খেতে খেতে মনোজদা চুপি চুপি জানালেন তিনি নাকি গাড়ি থেকে নেমেই মন্দিরের ছবি তুলতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন গার্ডের কাছে । এই মন্দির প্রাঙ্গণে নাকি ছবি তোলা নিষিদ্ধ । প্রথম ধাক্কায় একটু দমে গেলেও মনের মধ্যে নিষেধ নামানা সত্বাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । মনে মনে নিজেই দুবার জপলাম “শ্লা । ইয়ার্কি পায়া হ্যাঁয় ? (কোনও কারণে রাগ হলেই দেখেছি আমার হিন্দিতে কথা বলতে ইচ্ছে করে) এখানে ছবি আমি তুলবই”। চা এবং খিচুড়িভোগ খেয়ে এবার নামলাম আসরে । গুটিগুটি পায়ে হেঁটে একটা পাথরে বাঁধান চাতালে গিয়ে দাঁড়ালাম মন্দিরের ঠিক সামনে । বিশাল আয়তনের মন্দিরটা সত্যিই সুন্দর দেখতে । আবছা মনে হচ্ছিল ঠিক এই রকম আর একটা কোন বিখ্যাত মন্দির যেন কোথাও দেখেছিলাম – অক্ষয়ধাম মন্দির কি ? কি জানি । আবার একটু খুটিয়ে দেখতে গিয়ে মিল খুঁজে পেলাম খাজুরাহোর মন্দির নির্মান শৈলীর সঙ্গে । সেই অসংখ্য চুড়া , কোনটা গম্বুজাকার কোনটা বা সুচাগ্র বর্শার ফলার মত ।আয়তাকার থামগুলো একে অপরের সঙ্গে শৃঙ্খলে বাঁধা । সেই সেকলের চেহারা দেখে মনে পড়ে যায় খাজুরাহো মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের কথা । মন্দিরের চত্বরের চার পাশে অনেকগুলি বারান্দা – থাম দিয়ে সাজান । খেয়াল করে দেখলাম থামগুলি বেশ সুন্দর পরিকপনা করে বসান ।কোন একটি দালানের সামনে দাঁড়ালে দুপাশের থামের সারির মাঝে লম্বা দালানগুলি বেশ রোমাঞ্চকর লাগল দেখতে । ইতি মধ্যে ক্যামেরায় বেশ কিছু ছবি তুলে ফেলেছি বিনা বাধায় । এবারে একটি বিশেষ কোন থেকে মূল মন্দিরের ছবিটা তুলতে গিয়ে প্রথম আপত্তির মুখে পড়লাম । মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী জানালেন মন্দিরের ছবি তোলায় নিষেধ আছে । হিন্দিতে সে যা বলল তার মর্মার্থ হল আমি যেন ক্যামেরাটা ব্যাগে রেখে মোবাইলে ছবি তুলি । মন্দিরে নাকি ক্যামেরায় ছবি তোলা বারণ থাকলেও সে নিষেধাজ্ঞায় মোবাইলের কোন উল্লেখ নেই । নিয়মের বহর দেখে আমার সত্যিই হাসি পেল । তবে সুখের কথা ,কর্মীটির দায়িত্ব যেন আমাকে নিষেধাজ্ঞার কথাটি জানিয়ে দিয়েই সারা হয়ে গেল । কারণ সে নিষেধাজ্ঞাটা বলবত করায় তার বিশেষ আগ্রহ দেখলামনা । আমি মুচকি হেসে তাকে বললাম খুড় একটু ওদিক পানে চাও দেখি – আমি সেই ফাকে গোটা কয় ছবি তুলে নিই । আপাতত সেই ছবি কিছু আপনাদের দেখতে দিয়ে আমি অন্য কাজে যাই । ফিরে এসে যদি দেখি আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি আমার বকবাকানিতে তা হলে না হয় ডায়মন্ডহারবারের কিসসার কথা পাড়া যাবে পরের পর্বে
ঝিনুক
ভূতের গল্পের প্রতিযোগিতায় উমা থুড়ি মুনিয়া একটা দারুণ গল্প লিখেছিল| অল্প কথায় গল্পটার সারমর্ম হল...... একটা বাচ্চা মেয়ে‚ গর্ভপাতের বেশ কয়েক বছর পরেও মেন্ট্যাল ট্র্যমা থেকে মুক্তি পেতে পারে নি| তার অবচেতনে অপরাধবোধ কুড়ে কুড়ে খায় তাকে আর তার থেকেই তৈরী হয় এক সাংঘাতিক ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা| উমার সেই গল্পে শ্রীর কমেন্ট পড়ে সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারি নি| তার পরিপ্রেক্ষিতেই লিখেছিলাম এই পোস্টটা‚ আজ m-এর অনুরোধে আলোচনার সুবিধার জন্য ব্লগে নিয়ে এলাম পোস্টটা| আশা করি সবাই অংশ নেবে/ন এই আলোচনায়| অ্যাবরশনের বিপক্ষে অনেকেই খুব সরব জানি‚ I’m not a fan either…. কিন্তু আবেগ দিয়ে ফ্যাক্টস গুলিয়ে ফেলা বোধ হয় খুব একটা কাজের কথা নয়| গুজবে কান না দিয়ে তথ্য একটু যাচিয়ে দেখলে কেমন হয়? নিজের শরীরে ধারণ করা আর একটা শরীরকে স্বেচ্ছায় উপড়ে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া কি এত সোজা? কেউই সখ ক'রে করে না সে কাজ| দায়ে না পড়লে কে আর সেধে এই পথে হাঁটতে চায়? উমার গল্পেও শ্রেয়সীর অবচেতনে অপরাধবোধ‚ অজাত ভ্রূণের প্রতি মমতা এতটাই গভীরে প্রোথিত যে এতগুলো দিন পরেও তাকে সেই ভূত তাড়া করে ফেরে| অনেকদিন এই ফিল্ড মানে ফিসিওলজির থেকে অনেক দূরে‚ কোনরকম কোন পড়াশোনাই প্রায় নেই| ইন্টারনেট ঘাটলেই অনেক তথ্য পাওয়া যাবে‚ যায়| কিন্তু ইন্টারনেটে চোখ বন্ধ করে সব বিশ্বাস করার মত naivety আর নেই| তাই নেটের সাথে সাথে একটু পড়াশোনাও করতে হল| বহু যুগ বাদে ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে কয়েকটা সন্ধ্যে কাটালাম (ভূতেদের সাথে‚ আগেই তো বলেছি লাইব্রেরিতে ভূত থাকেই থাকে) নির্ভেজাল পড়াশোনা করে| এখানে ইউনিভার্সিটিতে গেলে আমার আর ফিরতে ইচ্ছা করে না| ইচ্ছে হয় আবার ফিরে যেতে সেই দিনগুলোতে‚ নতুন করে লেখাপড়া শুরু করতে| এত আয়োজন‚ এত ব্যবস্থা যে শুধু পড়াশোনার জন্য সম্ভব ….. চোখে না দেখলে কোনদিন জানতেই পারতাম না| যাগ্গে‚ এসব ই-বই আমাদের কালে ছিল না| স্পেশ্যাল রিক্যুইসিশন ভরে কিছু ই-পুস্তক চেক আউট করলাম এক সপ্তাহের জন্য| নেশা ধরে গেছে| সন্তানধারণ একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া| আর সেই খোদার উপরে খোদকারির নাম হল অ্যাবরশন| মানুষের gestation period কমবেশি ২৮০ দিন‚ মনে ৪০ সপ্তাহ| স্ট্যাস্টিস্টিকসের হিসাবে বেশির ভাগ স্বেচ্ছাকৃত অ্যাবরশনই ঘটে থাকে গর্ভধারণের ১২ থেকে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে| প্রেগন্যান্সি কনফার্ম হয়ে ডিসিশন নিয়ে‚ মানসিক ভাবে তৈরী হতে হতে এই টাইম ল্যাপ্সটা খুবই স্বাভাবিক| প্রথম সাত সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ খেয়ে গর্ভপাত সম্ভব| তার পরে ক্লিনিক ছাড়া গতি নেই| রিসার্চ বলছে‚ ২৪ সপ্তাহ পার হয়ে গেলে সেই ভ্রূণ মাতৃগর্ভের বাইরেও survive করতে পারে‚ provided the same environment as the mother’s womb …. কাজেই ২৪ সপ্তাহের পরে অ্যাবরশন বিলকুল বেআইনী and is considered ‘intent to murder’‚ যদি না অন্য কোন গুরুতর কারণ থাকে| এবার আসি শ্রীর ঐ বিশেষ কমেন্ট যার পরিপ্রেক্ষিতে এই গরুখোঁজা শুরু হল| ভ্রূণের কি বেদনাবোধ থাকে? বিজ্ঞান বলছে‚ ৫ সপ্তাহের পরে হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করতে শুরু করে‚ ১৩ থেকে ২০ সপ্তাহের মাথায় নড়াচড়া‚ হাত-পা ছোঁড়া শুরু হয়‚ কিন্তু বেদনা বা ব্যাথা অনুভব করার জন্য মস্তিষ্কের যে বিকাশ প্রয়োজন তা ভ্রূণের গড়ে ওঠে না third trimester-এর আগে| এই third trimester শুরু হয় ২৭ সপ্তাহ থেকে| মোটামুটি ৩০ সপ্তাহ লাগে গর্ভস্থ শিশুর সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম নিয়ে প্রথম জেগে উঠতে| তবে বেদনাবোধ বা মস্তিষ্ক তৈরী না হলেও রিফ্লেক্স কাজ করতে পারে| একটা উদাহরণ দিই‚ যেমন আমাদের হাঁটু‚ ডাক্তারবাবু রাবারের হাতুড়ি দিয়ে হাঁটুর মালাইচাকিতে এক ঘা দিলে ব্যাথা লাগে না তেমন কিন্তু পাটা তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে‚ ওটা রিফ্লেক্স| ১৯ সপ্তাহের আশেপাশে‚ যখন স্পাইন্যাল নার্ভ টিস্যু তৈরী হতে শুরু করে তখন থেকে ভ্রূণের মধ্যে এই রিফ্লেক্স দেখা যায়‚ ছুঁতে গেলে সরে যাওয়া সেটারই প্রমাণ| কিন্তু তার মনে এই নয় যে তার কোন ব্যথা (চলিত বাংলায় যার নাম কষ্টবোধ) আছে| প্রচুর জ্ঞান দিয়ে ফেললাম‚ অনেক ডাগদারবাবু/নী আছেন এখানে‚ কিছু ভুল হলে মাথা কাটবেন না যেন‚ দয়া করে মাপ করে শুধরে দেবেন| এবার সবশেষে একটা প্রশ্ন ছিল| এই বিষাক্ত পৃথিবীতে কোত্থাও আর একটা শিশুও জন্মানো উচিত বলে আমার মনে হয় না| আমাদের কপালপোড়া দেশমাতৃকার কথা আর নাই বা তুললাম| সেসব বড় বড় ব্যাপারও নয় বাদ থাক| যখন কোন মেয়েকে এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিতে হয় (আমি রিতাদের ধরছি না এই হিসাবে) কোন কারণে বাধ্য হয়ে‚ কেন আমরা তার পাশে থাকতে পারি না? সব রিসার্চ‚ সব বিজ্ঞান নস্যাত করে দিয়ে যদি ধরেও নিই যে অ্যাবরশনের সময় ভ্রূণের কষ্ট হয়‚ তাহলেও এক অবাঞ্ছিত জীবনের লম্বা যন্ত্রনার চেয়ে কয়েক মুহূর্তের কষ্টই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত নয় কি? আমি হলে তো দ্বিতীয়টাই বেছে নেব আমার অজাত সন্তানের জন্য| আড্ডা কি বলে? উঠুক না‚ আজ একটু ঝড় উঠুক এই নিয়ে| চুপচাপ পালিয়ে তো অনেক বাঁচলাম সারা জীবন আমরা সব্বাই (হ্যাঁ‚ সব্বাই)| আজ একটু শুনি না সব মায়েদের কাছ থেকে‚ সব মেয়েদের কাছ থেকে‚ পক্ষেই হোক বা বিপক্ষে|
Sarita Ahmed
ছোটবেলায় 'বাপুরাম সাপুড়ে ' নামের একটা কবিতা ছিল ,খুব আউড়াতাম আর খিল খিল কাটাতাম মেয়েবেলা । বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখলাম, তখন খেয়াল করে দেখলাম বাপুরামের নিতান্ত নির্বিষ 'ভালো মানুষ' সাপেদের মতই আমাদের সমাজ মেয়েদের দেখতে চায় , পেতে চায় , ছুঁতে চায় । বর্তমান ইঁদুর দৌড় সমাজে বেশীর ভাগ মধ্যবিত্তের নিউক্লিয়ার পরিবার । একটা বা দুটো সন্তান । তাদের বাবা মা কিন্তু মোটামুটি সমতা রেখেই ছেলে বা মেয়ে 'মানুষ' করেন । মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তির লাইন দিতে রোদে পুড়ে জলে ভিজে চাতকের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন পিতামাতা । এটা খুব স্বাভাবিক ছবি । শিক্ষা, যে কোনো জাতির উন্নতির প্রধান ও একমাত্র চাবিকাঠি , যার কোনো ব্যতিক্রমী রাস্তা বা শর্টকাট হয় না । একটা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে যেমন কঠোর পরিশ্রম করে , মেধার পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতায় চাকরি পায় , জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ; একটা মেয়েও ঠিক তেমনিভাবেই জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে নিজের পরিচয় বানায় । বরং মেয়েদের চলার , হাঁটার বা দৌড়ানোর পথটা কাঁটায় মোড়া থাকে বেশী করে । হয়তো তাকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে অত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় না , কিন্তু মূল বাধাগুলো পেরোতে হয় বাড়ির বাইরে । কর্মভূমিতে । শিক্ষার্থির ক্ষেত্রে শিক্ষালয়ে , চাকুরিরতার ক্ষেত্রে চাকুরিস্থলে । কখনো তা অসাধু ফাঁদের হাতছানি হিসেবে আবার কখনো প্রতারণা বা শারিরীক হেনস্তা হিসেবে একটা কর্মঠ মেয়ের জীবনে আসে । এ পর্যন্ত সবই চেনা ছক প্রায় সব শ্রেনীর, সব ধর্মজাতির ক্ষেত্রে। কিন্তু ছকটা একটু বদলায় , মুসলিম সমাজে । মেয়ের ২৩+ বয়েসের পরে । উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর শিক্ষায় একের পর এক যোগ্যতা প্রমান দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে, নিজের পায়ের তলার জমি পেতে একটা ছেলের ঠিক যতগুলো বছর সময় লাগে , একটা মেয়েরও ঠিক ততগুলো বছরই লাগে । এতগুলো পথ পেরিয়ে সমাজে উভয়ই সমানপদের পরিচিতি পায় সম্পূর্ণ নিজ মেধা-শ্রম ও কর্মের যোগ্যতায় । আজকের তারিখে দুজন এডাল্ট সহাবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলে তাতে উভয়েরই সমান অবদান ( contribution) লাগে , মানসিকভাবে, শারিরীকভাবে এবং আর্থিকভাবে । শেষেরটা কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গ , একে অস্বীকার করা যাবে না । কিন্তু ভারতের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে মুসলিম পরিবারে উচ্চশিক্ষায় যত মেয়েদের অংশ বাড়ছে তত কমছে তাদের ভবিষ্যৎ ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর আশা । কেন ? কারণ , আজও ভারতের শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম পরিবার, ছেলের বৌ হিসেবে পাত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নামাজ শিক্ষা- কোরান জ্ঞান- রোজা রাখার অভ্যাস - ইসলামিক রীতিনীতি ইত্যাদিকে । সম্প্রতি হায়দ্রাবাদে এক ঘটক ( city match maker ) শাহিদ ফারুকি-র অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে ২৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে বয়েস এমন উচ্চশিক্ষিত ( M.A, B.Ed , M.Ed, M.Com, B.Tech , M.Tech ) পাত্রীদের জন্য যোগ্য সুপাত্র মিলছে না । তাঁর কথায় , " it's become a herculean task to find these educated women, equally qualified grooms. Seven out of 10 women seeking alliances these days are well educated. Given that several men aren't still particularly interested in a girl's education (many aren't qualified themselves) and pay more attention to her looks and financial status, it's getting difficult to find these prospective brides an appropriate match." আর এজন্য এই সব মেয়েদের একটা "compromise" করতে হচ্ছে । কি সেটা ? তা হল, উচ্চশিক্ষিত এইসব মেয়েদের বিয়ে করতে হচ্ছে স্কুল ড্রপ আউট , ১২ ক্লাশ ফেল , আন্ডার গ্রাজুয়েট ছেলেদের । যাদের হয়তো পরিচিতি এলাকার ছোটখাট ব্যবসাদার হিসেবে। এক ডাক্তার মেয়ে নানা বিবাহ সংক্রান্ত ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে সন্ধান চালাচ্ছেন যোগ্য পাত্রের এবং হতাশ হচ্ছেন । ভারতের বিখ্যাত ম্যারেজ সাইট Shaadi.com এর একজন আধিকারিক যোগীতা তাঁর অভিজ্ঞতায় বলছেন , ""If a man earns well, families overlook his qualification. Mostly, it's the women who end up compromising." Osmania University র অধ্যপক এবং নানা শিক্ষাবিদরা এটাকে মেয়েদের উত্থান বা একটা 'সাইলেন্ট রেভ্যুলিউশন' নামে ডাকছেন । এ বিষয়ে একদল তদন্তকারী জানাচ্ছেন এটা এমন একটা দ্বন্দ্ব যাকে বলা যায় "transitional issue" ! তাদের ভাষায় ""Thanks to schemes like free education and fee reimbursement, there are an increased number of girls who are enrolling for higher studies now. Even the drop-out rate among them has lowered. While this has narrowed the educational gap between boys and girls, such issues (related to marriage) have cropped up." জালিশা সুলতানা ইয়াসিন , member of the Muslim Women Intellectual Forum বলেন : "There was a lot of insecurity among women until a few years ago and they took to education to support themselves. But that brought along a lot of practical problems which we need address to correct this imbalance. Parents need to push male children to study to resolve this " অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না । যেখানে ভারতে পুরুষ এবং নারীর লিঙ্গানুপাত = পুরুষ : নারী > ১০০০ : ৯৪০ ( ২০১১ আদমসুমারী অনুযায়ী ) আর শিক্ষাক্ষেত্রে যেখানে মাত্র ৭৪% ভারতবাসী শিক্ষিত , তার ৬৫.৫% হল নারী এবং ৮.৫% হল পুরুষ । ( ২০১১ রিপোর্ট ) এ যেন এক উলোট পুরাণ !! মুসলিম সমাজের হাল আরও খারাপ , বলাই বাহুল্য । কিন্তু সবই কি শুধুমাত্র 'পিছিয়ে পড়া জাতি' বলেই ? নাকি পিছিয়ে পড়া মানসিকতার জন্যও অনেকটা । বস্তুতই মুসলিম সমাজ প্রতিদিন ১০০ বছর করে পেছোচ্ছে দাড়ি- টুপি, হিজাব, বোরখা আর জেহাদের কট্টরতায় । একটা গোটা সমাজ মূলধারার শিক্ষার আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নানা রাজনৈতিক ধার্মিক নিম্নগামীতার কারণে । কাগজের বিজ্ঞাপণে দেখা যায়, শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চাকুরিজীবি মুসলিম যুবাদের একটা বড় অংশ স্ত্রী হিসেবে আজও কামনা করে ১৮- ২৩ এর পুতুল পুতুল শো-কেস বেবি ,যার জীবন কাঠি থাকবে অন্তত ১০ বছরের বেশী বড় স্বামী নামক কর্তার হাতে । সেই জীবন চাবি ঘুরিয়ে যখন খুশী দম দিয়ে স্ত্রীটিকে উঠানো -বসানো -শোয়ানো -বাচ্চা বিয়ানো ইত্যাদি নানা জৈবিক কাজ করানো যাবে , ইসলাম সম্মত ভাবে। অথবা, আরেকদল শিক্ষির 'মডারেট' শ্রেনীর চাহিদা অনুযায়ী এমন পাত্রী চাই যে হবে, চাকরীওয়ালা -নামাজি -চটপটে ইংলিশ বলা-হিজাবী এক আজব 'অল-রাউন্ডার' ! যার টাকা উপার্জনের ক্ষমতা থাকবে নিজ যোগ্যতায় ; কিন্তু খরচের অধিকার থাকবে স্বামীর আয়ত্বে । ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হবে জয়েন্ট; কিন্তু ATM , Pin থাকবে স্বামীর জিম্মায় । এক অদ্ভূত মিথোজীবিয় পরজীবিতা ! বাবুরাম সাপুড়ে-র কাছে ঠিক যেমন এক নির্বিবাদি সাপের আশায় ছড়া লেখা হয়েছিল , এও যেন ঠিক তেমনি চাওয়া । মেয়ে ছাড়া যেহেতু বাচ্চা হবে না , তাই বংশবিস্তারও সম্ভব না । সেহেতু বিয়ের জন্য পাত্রী চাই । কিন্তু ওই... যে পাত্রীর চোখ-কান খোলা নেই , কোথাও সে ছোটে না , ইচ্ছেমত হাঁটে না , সাত চড়ে রা-কাটে না , সেই মেয়ে জ্যান্ত ... গোটা চার আনত । ( মুমিন গনের চারবিবাহ ইসলাম সম্মত তাই !) ব্যতীক্রম কিছু নিশ্চয় আছে । এইসব শিক্ষিত 'মডারেট' মুসলিম 'ব্যতীক্রমী'রা, উদারমনা মেয়েদের চক্ষুলজ্জা ও সামাজিকতার খাতিরে ফেলতেও পারে না , গিলতেও পারে না । তাই একটা সেফ দুরত্ব বজায় রেখে উপর উপর বাহ বাহ , প্রশংসা করে । কিন্তু জীবন সঙ্গী বানানোর ক্ষেত্রে ঢোক গিলে ক্ষমা চায় । এদিকে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রত্যেকেই জানে বছর বছর সমীক্ষাগুলোও বলছে এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই সিরিয়াসলি পড়াশুনাটা করছে । খানিকটা স্বভাবগত বাধ্য সন্তান হওয়ার কারণে , আর খানিকটা বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের পরিচিতি খোঁজার তাগিদে । রেজাল্ট মাধ্যমিক হোক বা উচ্চমাধ্যমিক পাতা খুললেই ডেটা হাজির । অস্বীকার করার উপায় নেই । কিন্তু বিয়ের জন্য এইসব উচ্চ শিক্ষিত মেয়েদের জুড়িদার পেতে 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়' দশা । এখন অনেকেই বলতে পারেন , এত প্যাঁচাল পেড়ে লাভ কি ! বিয়ে না করলে কি মেয়েদের চলে না ? আজীবন অবিবাহিত থেকে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানকে কাঁচকলা দেখাও , ল্যাঠা চুকে যায় । নিশ্চয় যায় , আলবাত চুকে যায় । কিন্তু কথা হল , তাহলে কি ধরে নেওয়া হবে , যেহেতু তুমি আত্মসম্মানী মেয়ে এবং উচ্চশিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত চোখ কান খোলা সুতরাং তোমার জন্য বিয়ে-সংসার নিষীদ্ধ । এতে শিক্ষিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গর্বের শতকরা হার কি বেড়ে যাবে ? দেখুন, একটা সরল উদাহরণ দিই । একটা পথ কঠিন , কাঁটা বিছানো বলে সেটাকে এড়িয়ে চলে যাওয়া তো সবচেয়ে সোজা কাজ । সবচেয়ে সরল পথ । এর মধ্যে মহত্ত্ব নেই । বরং সেই কাঁটা পথকে নির্মল করে সবার জন্য যাতায়াতের উন্মুক্ত ব্যবস্থা করাটাই উন্নতির পরিচায়ক । সব শিক্ষিত নারীই যে অবিবাহিত হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এমন তো কোনো মানে নেই । ছেলেরাও যেমন একটা সুন্দর সুস্থ বিবাহিত জীবনের বাসনা রেখে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক সেই একই কথা কি মেয়েদের বেলায় খাটে না ? নাকি , মেয়ে বলেই তার জন্য সর্বদা আলাদা নিয়ম হবে ? যদি নিয়ম না মেনে স্বাধীনচেতা হয় তবে সুস্থ সুন্দর সমাজ তার আশাতীত হবে ? তার জন্য রুদ্ধ হবে সব স্বাভাবিক দ্বার ? এটা কি কোনো উন্নত দেশের একটা জাতির সামাজিক মানচিত্র হতে পারে ?
শিবাংশু
হুগলি বাঁশবেড়িয়ার শ্রীধর ভট্টাচার্য জন্মে ছিলেন ১৮১৬ সালে। বিখ্যাত কথক লালচাঁদ বিদ্যাভূষণ ছিলেন তাঁর পিতামহ। পিতা পণ্ডিত রতনকৃষ্ণ শিরোমণি। বাড়ির শিক্ষা ছিলো উচ্চকোটীর। তার উপর ভাগবতের পাঠ নিয়েছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে। তরুণ বয়সে সঙ্গীসাথিদের নিয়ে পাঁচালি আর কবিগান গেয়ে বেড়াতেন। বহরমপুরে সেকালের বিশিষ্ট কথক কালীচরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা হবার পর তিনি কথকতার প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট হ'ন। এই শিল্পটিতে তাঁর লোকপ্রিয়তা সেকালে আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছিলো। নামকরা কথক হয়ে উঠেছিলেন অল্প বয়সেই। লোকে শেষ পর্য্ন্ত তাঁকে ডাকতো শ্রীধর কথক নামেই। তাঁর রচিত মাতৃসঙ্গীত জনপ্রিয়তায় রামপ্রসাদের সঙ্গে এবং টপ্পা স্বয়ং নিধুবাবুর সঙ্গে পাল্লা দিতো। শ্রীধরের বহু গান এখনও নিধুবাবুর নামে চলে। অতি সমাদৃত "ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে" গানটি তাঁরই রচনা, যা অনেকে নিধুবাবুর গান বলে জানেন। শুধু বাংলা নয়। তাঁর গভীর সারস্বতচর্চার ছাপ তাঁর হিন্দি, ফারসি, এমন কি আরবি ভাষায় রচিত টপ্পার মধ্যেও পাওয়া যায়। এখনও পর্যন্ত তাঁর ১৬৯টি গান উদ্ধার করা গেছে। এছাড়া তাঁর রচিত বেশ কিছু পদাবলী কীর্তনেরও সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর রচিত টপ্পার চালটি নিধুবাবুর থেকে কিছু আলাদা। আরো সাবলাইম আর প্রেমসংলাপকেন্দ্রিক। উল্লেখিত দুরূহ টপ্পাটি গাওয়ার প্ররোচনা এড়িয়ে যেতে পারিনি। যদিও তার প্রতি সুবিচার করা সঙ্গতভাবেই আমার আয়ত্বের বাইরে। ১৯০৩ সালে গওহর জান এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু টপ্পা হিসেবে গা'ননি। এহেন একটি গান গাওয়ার ধৃষ্টতাকে বামনের চন্দ্রাভিলাষ অবশ্যই বলা যায়। দেড়শো বছরেরও অধিক পুরোনো একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলা গান আগ্রহীদের সঙ্গে ভাগ করে নেবার লোভ এড়ানো দুষ্কর বোধ হলো।
Sarita Ahmed
সে অনেককাল আগের কথা । ন’ঘরিয়া গ্রামে ছিল আমার দাদুর বাড়ি । দাদুরা ছিলেন চারভাই। সেটা বৃটিশ আমল । বেশ অবস্থাপন্ন জমিদারবাড়ি সেটি ,যদিও জমিদারি ছিল না তখন তবু কেতা ছিল ষোল আনা । আশেপাশে জ্ঞাতিজনদের নিয়ে বিশাল এক যৌথ পরিবারের বাস ছিল সেই গ্রামে। শোনা যায়, গোলাপ খাঁ নামের এক জমিদারের বাড়ির উনুন কোনও সময় নেভানো হত না , এত বড় ছিল সেই উনুন এবং তার উপর চাপানো হাঁড়ি যে গোটা গ্রামের মানুষ একসাথে পাত পেড়ে খেতে পারতেন । সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা মোহাম্মদ খাঁ ছিলেন একজন জাঁদরেল সাহেব । ‘সাহেব’ উপাধি পাওয়ার কারণ ওনার চামড়ার রং আর সাহেবী মেজাজ – ঘোড়ার পিঠে চড়ে হান্টার ঘুরিয়ে পথচলতি জনতাকে ভীত সন্ত্রস্ত করা ছিল ওনার এক উগ্র রসিকতা । সেই বৃটিশ আমলে বেশ কিছু জমিদার গজিয়ে ওঠে গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে ।তাদের মধ্যে যারা ইংরেজদের বদান্যতায় নানা দপ্তরে অথবা জমিদারিতে চাকরি পান, তাদের জীবনযাত্রা এবং মেজাজেও সেই ধার–করা-সাহেবী-কায়দার ছাপ পড়ে । কতকটা সেরকমই ছিল এই পরিবার । আমাদের দাদুর পরিবার ছিল এই গোলাপ খাঁয়ের জ্ঞাতি । সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি তার উপর যৌথ পরিবার ; সুতরাং আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি খানদানি চটক ছিল দেখার মত – গোলাভরা ধান, প্রচুর গরু, ছাগল, মুরগী, লোকলস্কর, চাকর বাকর ইত্যাদিতে ভরা । অন্দরমহল গমগম করত স্ত্রীলোক এবং পুত্রকন্যাদের উচ্চকিত হর্ষে । তবে পর্দাপ্রথার চল থাকায় সেসব শব্দ বাইরে খুব একটা যেত না । এহেন বনেদি খান বাড়ির সামনেই ছিল একটা মসজিদ আর তার পাশেই ছিল একটা খানদানি কবরস্থান । তাঁদের চার ভাইয়ের মধ্যে আমার দাদু ছিলেন একটু আলাভোলা গোছের মানুষ । চাষবাস করে সংসার প্রতিপালন করতেন আর রাত কাটাতেন মসজিদ চত্ত্বরে । নিরীহ ধার্মিক মুসলমান বলতে যা বোঝায় ইনি ছিলেন ঠিক সেরকম একজন । স্বাধীনতার ক’বছর পরের কথা । সেদিন ছিল জানুয়ারির এক শীতের রাত । তখনকার দিনে গ্রামের মানুষেরা বেশি রাত জাগত না । সন্ধ্যে ৭ টার পরেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের আয়োজন শেষে লম্ফ নিভিয়ে দেওয়াই ছিল রেওয়াজ । তখন কত রাত খেয়াল নেই, মেজ দিদিমার ঘুম ভেঙ্গে গেল । পাশে হাত পড়তে টের পেলেন মেজদাদু বিছানায় নেই । বাইরে কোথাও শৌচে গেছেন হয়তো ভেবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন । কিন্তু তিনি ফিরলেন না । দিদিমা বাইরে এলেন। পাশাপাশি সব ভাইয়ের ঘর । এত রাতে কার ঘরে টোকা মেরে জাগাবেন ঠাহর করতে না পেরে তিনি হ্যারিকেনের শিখা বাড়িয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে বাইরের মসজিদের দিকে চললেন । বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়েই আমার দাদুকে ঘুম থেকে তুলে মেজদাদুর হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যাওয়ার কথা বলতেই , দাদু স্মিত হাসলেন । -“ মেজ ভাই ঠিক আছে, আপনি ঘরে যান । ঘুমিয়ে পড়েন ভাবি, দেখবেন ভাই ভোরের দিকে ঠিক চলে আসবে।” ছোট দেওয়ারের এমন হেঁয়ালিতে কিছু বুঝতে না পারলেও এটুকু ধরা গেল যে মেজভাইয়ের উধাও রহস্যটা উনি জানেন । সে রাতে তাঁর ঘুম এল না। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল , কিন্তু পাশ ফিরতেই উনি টের পেলেন কত্তা শুয়ে আছেন পাশে । ধড়মড় করে উঠে বসে তিনি ধাক্কা দিয়ে জাগালেন ওনাকে তারপর শুনলেন সবটা । -“ আহা, অত চিন্তা কেন কর ? আজ ওদের ডাক এসেছিল যে ! সন্ধ্যে থেকেই পোলাও মাংসের সুবাস পেয়েই বুঝেছি রাতে যাওয়া লাগবে।” -“মানে ? কাদের কাছে গিয়েছিলেন ? কারা ডেকেছিল ?” -“শশহহ ... সবটা বলা বারণ । তবু তুমি স্ত্রী । তাই বলছি । মসজিদের পেছনে পীরপুকুরে যেতে হয়েছিল । জ্বিন পরিদের বে’ ছিল যে ! আমার না গেলে চলবে কেমনে , বিয়ে পরাতে হবে না! সারারাত ভোজ চলল, ভোরবেলা ওরা দিয়ে গেল বাড়িতে ।” মেজদিদিমা এ কথার কোনো মানে বুঝতে পারেন নি । তবে যখন দেখলেন প্রতি মাসেই দু একদিন করে এমনভাবে মেজদাদু রাত্রে উধাও হয়ে যান আর ভোরবেলা ফিরে আসেন – তখন ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিলেন । কারণ এ ঘটনার প্রধান সাক্ষী ছিলেন আমার দাদু । জ্বিনপরিদের নিয়ে বেশ কিছু গল্প ওই অঞ্চলে চালু আছে , বেশিরভাগ মানুষ তাতে বিশ্বাসও করেন । আর দাদুদের বংশে জ্বিনদের নাকি বরকত ছিল । এই নিয়ে বহু ঘটনা ঘটেছে , সেগুলো অলৌকিক কিনা বলতে পারব না, তবে লৌকিক তো মোটেই না । মেজদাদু মানুষ হিসেবে সৎ ছিলেন । মূলত মেজদাদুই ছিলেন আমার দাদুর প্রধান সহচর ও বন্ধু । তা সেই মেজদাদু যখন মারা গেলেন তখন বাড়ির অবস্থা খানিক করুণ – জমিদারি তো অনেকদিন আগেই গেছে, এখন গৃহস্থ বাড়ির সেই জৌলুসও অস্তগামী হতে চলল । তবু বিপদ আপদে বেশ কিছু অদ্ভুত সুরাহা মিলতে লাগল । এক বর্ষার সন্ধ্যেবেলা মেজদাদুর আদরের নাতি মানে আমার মামাতো ভাই – আনিস, হারিয়ে গেল। বাচ্চাটি উঠোনে বসে খেলছিল , আশেপাশে তাকে ঘিরে ছিল মামারা এবং অন্যান্য সদস্যরা । বাড়ির মহিলারা তখন রাতের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত , হঠাৎ ছোট মামির খেয়াল হল আনিস নেই । নেই তো নেই । আমার ছোট মামা বরাবরই ডাকাবুকো ধরণের । তিনি তখন গ্রামের কিছু লোক জড়ো করে লাঠি সোঁটা নিয়ে গেলেন খুঁজতে । রাত বাড়তে লাগল কিন্তু নাহ, কোনও খোঁজ মিলল না। ছাদ, চেনা পরিচিতের বাড়ি, মসজিদ, পুকুর তলা, কোত্থাও তার চিহ্ন নেই । রাত দশ’টা নাগাদ সবাই বিফল হয়ে ফিরে এল । বাড়িতে তখন কান্নাকাটি, শোরগোল। অত শান্ত ছেলে যে কিনা রাতের খাবার খেয়েই ঘুমে ঢলে পড়ে, সে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে যাবে ?আর কেনই বা! এইসব চিন্তায় যখন সবাই উদ্বিগ্ন, তখন আচমকা এক কান্ড ঘটল । মাঝ উঠোনে এক্কেবারে আকাশ থেকে একটা চক পড়ল আর তারপর গোটা উঠন জুড়ে সেই চক আপন মনে ঘুরে ঘুরে উর্দূতে লিখতে থাকল “ কী করিস তোরা ! একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারিস না ! আজ আমি ছিলাম বলে জানতে পারছিস নইলে এ জন্মে ছেলেকে আস্ত পেতিস না । যা, গ্রামের শেষে বাঁশঝাড়ে গিয়ে খোঁজ । ঠিক মাঝখানে একটা শিশুগাছের পাশে যে জোড়া বাঁশ গজিয়েছে তার ফাঁকে দেখ – ছেলে বসে আছে । যাহ তোরা এক্ষুনি।” লেখা শেষ হতেই বিদ্যুৎ চমকালো সাথে কড়কড় করে বাজ পড়ার শব্দ । বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ার সাথে সাথেই সেই লেখা যেন ভোজবাজির মত উবে গেল । ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই যেন থম মেরে গেলেন । মামারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন , মামিরা ভয়ে আশঙ্কায় গুমরাতে লাগলেন – কিন্তু এতটাই অবিশ্বাস্য ছিল সেই ব্যাপার যে কেউ চিৎকার করারও সাহস পেলেন না । শেষমেশ ছোট মামা সাহস করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন । সেজ মামা এবং সেজদাদুর এক পাইট-কে ( যারা কৃষিকাজে গৃহস্থের ফাইফরমাশ খাটে) সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গেলেন । কি আশ্চর্য – সত্যি সত্যিই ছেলে দুই বাঁশগাছের মাঝে বসে বসে ভিজছে -দুই হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে । টর্চের আলো পড়তেই ছেলে একটু নড়ে উঠল , কিন্তু উঠল না। ছোট মামা তার গায়ে হাত দিয়ে “কিরে , এখানে বসে আছিস যে বড় । চল বাড়ি চল।” যেইনা বলেছে অমনি ছেলে মুখ তুলল । ঘন ঘন বিদ্যুৎ আর টর্চের জোরালো আলোতে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে সবাই এক পা পিছু হটল - তার দুই চোখ যেন ভাঁটার মত জ্বলছে । লাল গনগনে চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় চোস্ত উর্দূতে সে বলেই চলেছে “ দায়িত্ব নেই, বাচ্চার দায়িত্ব নেই কোনো ! আমি না থাকলে কে বাঁচাত?” কোনো রকমে তাকে বাঁশঝাড় থেকে বের করতেই সে ছেলে মূর্ছা গেল । টানা সাতদিন সে বিছানায় ছিল , জ্বরের ঘোরে মাঝেমাঝেই ভুল বকত । ডাক্তার বদ্যি করেও যখন জ্বর ছাড়ল না তখন মামি তাকে নিয়ে গেল এক গুনীনের কাছে । সমস্তটা শুনে সে বলল ‘বাড়িতে কোনো ইবাদতওয়ালা বুজুর্গের ইন্তেকাল ঘটেছে ?’ মামি তখন মেজদাদুর মৃত্যুর কথা বললেন । সবটা শুনে গুনীন জানালো ‘কোনও ভয় নেই । এই বাচ্চার মধ্যে ওনার আত্মা ভর করেছিল সেদিন । আপনারা বড় ভাগ্যবান ,এমন ভালামানুষের ইবাদত ছিল বলেই ওকে ফিরে পেয়েছেন । নইলে সে রাতে শেয়াল কুকুরের পেটে যেত ছেলে । বাড়ি যান আর আপনাদের মেজবাবার নামে মসজিদে দোয়া করুন ।সব ভাল হবে।” তারপর বেশ কিছুকাল সব ভালোই কাটল । তবে একবছর বাদে আবার নতুন উপদ্রব শুরু হল । বাড়ির সর্বক্ষণের চাকর মনি উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে কী যেন দেখে হঠাৎ ঝাড়ু ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে মসজিদে দাদুর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল । ‘কিরে, কি হয়েছে? কি হয়েছে ? অমন করছিস কেন?’ – উত্তরে সে সবাইকে উঠোনের ধারে নিয়ে গিয়ে যা দেখালো তাতে কারু মুখে কোনো কথা সরল না । উঠোনের ওপাশে যেখান থেকে কলতলা শুরু হয়েছে সেখানে চাপ চাপ রক্ত ! সেই রক্তের ধারা কোথাও সরু, কোথাও মোটা হয়ে পড়েছে । রক্তের ধারা অনুসরণ করে পৌঁছানো গেল পুরোনো রান্নাঘরের দিকে । সেখানে দাওয়ায় রক্ত, দেওয়ালে রক্তের ছিটে । এমন এমন জায়গায় রক্তের দাগ যেখানে কোনও কাটা স্থান থেকে রক্তপাত হতেই পারে না । এই পুরোনো রান্না ঘরটা বহুকাল থেকে বন্ধ । রান্নাবান্না সেই গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই চুকে গেছে । পরে চাকর পাইটদের থাকার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। তবে গৃহস্থের অবস্থা পড়তির দিকে হওয়ার পর সেই ঘর পুরোপুরি তালা বন্ধই ছিল এতদিন । আজ সেখানে এমন রক্তের দাগ ! ছোটমামা ভেতরে ঢুকে দেখার পরামর্শ দিলেও কেউ সাহস করল না , এদিকে এতদিনের ব্যবধানে এঘরের তালায় জং ধরেছে, চাবিও গেছে খোয়া ! শেষমেশ দরজা ভেঙ্গে ঢুকে দেখা গেল ঘরের ভেতর কিচ্ছু নেই ! দরজার সামনে চৌকাঠ অবধিই দাগ , ভেতরে মাকড়সার জাল, ভাঙা আসবাব, ক’টা তুলো বের হওয়া তোষক আর ইঁদুর ছুঁচোর বিষ্ঠার গন্ধ ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই । সেদিনের ঘটনাকে সত্য প্রমান করে ক’দিন বাদে আবারও একই ঘটনা ঘটল । এবার সবাই নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু গুনীনের কথায় সবার বিশ্বাসও হল না । শেষে গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষ সাইদুল ডাক্তারের কাছে শোনা গেল আসল খবর। নামের সাথে ‘ডাক্তার’ জুড়ে থাকলেও ১০১ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ ছিলেন গোলাপ খাঁয়ের খাস হাকিম । গাছ গাছড়া থেকে কবিরাজি পথ্য তৈরি করে বহুবছর সেবা করে এসেছেন খান পরিবারের । তাঁর কাছেই জানা গেল আসল তথ্য । সেইসময় প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের জন্য খাজাঞ্চী নিয়োগ হত । গোলাপ খাঁয়ের ছোট ছেলে মির্জা ছিলেন সেই ব্যক্তি যার উপর ন’ঘরিয়া গ্রামের খাজনার দায় বর্তায় । এমনিতেই তিনি ঘোড়ায় চড়া হান্টারবাজ দামাল লোক, তার উপর সাহেবী মেজাজ এবং অজস্র বদঅভ্যাস ও কুকীর্তির জন্য বিখ্যাত । প্রজারা আক্ষরিকই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত । এক দুপুরে গ্রামের পথ দিয়ে আসার পথে তার নজর গেল এক বেদেনীর মেয়ের উপর । সে এবং তার এক প্রেমিক সাইকেল ঠেলে যাচ্ছিল । এদিকে মির্জার মনে কামনার আগুন । জোরপূর্বক সে মেয়েটিকে ঘোড়ায় তোলে এবং জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় । কিশোর প্রেমিক ভয়ে দ্বিধায় খানিক দোলাচলে থাকলেও পরে ছুটে যায় প্রেয়সীকে বাঁচাতে । কিন্তু নিয়তি তাদের জন্য অন্যকিছু লিখেছিল । মির্জার হাতে খুন হয় দুইজন । তাদের দেহ কেটে এই জমিতে পুঁতে দেওয়া হয় । তখন এখানে পতিত জমি, দাদুরা সবাই ছোট ছোট । কেউই সেই লাশদুটোর হদিস পেল না। এদিকে সেই কিশোরীর বেদেনী মা, যার উপর মাঝে মাঝে ওলাই-পীর ভর করত, তার নিঁখোজ মেয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে দোরে দোরে ঘুরেও কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হয় । তবে মরার আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায় ‘যে লোক তার মেয়ের সর্বনাশ করেছে, যার জন্য তার মেয়ে বেপাত্তা হয়ে গেল সে নির্বংশ হবে এবং যদি কেউ বেঁচেও যায় তো তার জ্ঞাতিপুরুষের ভিটায় রক্তস্রোত বইবে, সাপ নাচবে’ ইত্যাদি । কাকতালীয় ভাবে তার মৃত্যুর মাস কয়েকের মধ্যেই মির্জা খাঁ ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান । তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪২ বছর । বৃদ্ধ সাইদুল কাশতে কাশতে যখন পুরো বৃত্তান্ত শেষ করলেন তখন আকাশে চাঁদ উঠেছে ,প্রতিপদের পরের চাঁদ । সবাই ফিরবে বলে উঠতে যাচ্ছে তখনই আবার ঘড়ঘড়ে গলায় সাইদুল বলে উঠলেন, ‘তোদের সবাই ঝাড়ে বংশে শেষ হয়ে যাবি। খুব শিজ্ঞির।পাপ ঢুকেছে, পাপ।’ পাপ সত্যি ঢুকেছিল । মাস ছয়েক বাদে আচমকা বড় দাদু মারা গেলে তার ছেলেরা জমিবাড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি আরম্ভ করল । সেজদাদু যদিও ছিলেন নিঃসন্তান তবু জমির ভাগ নিয়ে লড়াই ছাড়লেন না। শেষে বাপারটা এমন গড়াল যে জ্ঞাতি ভাইরা আপন ভাইদের মিথ্যে অপবাদ দিতে, এমনকি মারামারি করতে অবধি পিছপা হল না । মেজদাদুর ছেলেরাও পিছিয়ে রইল না, নকল কাগজপত্র বানিয়ে জমিদখল করতে তারাও উঠে পড়ে লাগল । এইসব শরিকি বিবাদে যখন ন’ঘরিয়ার বিখ্যাত খানদান ছারখার হয়ে যেতে লাগল তখন ঘটল এক অভুতপূর্ব ঘটনা । আমাদের দাদুবাড়িরটা ছিল দেড়তলা । পেছনে ছিল বাগান আর পুকুর পাড় । উপরের ছোট ঘরটা ছিল ছোটদিদার । তবে মেজদাদু মারা যাওয়ার পর থেকে মেজদিদা ছোটদিদার সাথেই সেঘরে শুতেন । কিন্তু যেটুকু সময় তাঁরা থাকতেন না ,ওই ঘর থাকত তালাচাবি বন্ধ । দাদু তো বারোমাস মসজিদবাসী , ঘরে শুধু স্নান-আহার আর দরকারি কাজের জন্য থাকা । বাকিটুকু সময় হয় জমিতে, নয় মসজিদে । সেইরাতেও সবাই রাতের খাবার খেয়ে শুতে যাওয়ার পরে দাদুও মাদুর বালিশ নিয়ে গেলেন মসজিদে । নামাজ শেষে ওখানেই ঘুমাবেন নিয়মমত । তবে সেইদিন মেজদিদার শরীর খারাপ থাকায় ছোটদিদাও আর উপরে গেলেন না, নিচের একটা ঘরেই সেই রাত কাটাবেন বলে ঠিক করলেন যাতে জল , বাথরুম ইত্যাদি হাতের কাছে থাকে । এদিকে মসজিদে গিয়ে দাদুর নামাজ তো শেষ হল , কিন্তু ঘুম হল না, মনের ভেতরটা সমানে আনচান করছে যেন। মসজিদের বারান্দায় মাদুর পেতে গায়ের জোব্বাখানা খুলে মাথার কাছে রেখে ‘আল্লাহ মালিক’ এর নাম নিয়ে সবে শুয়েছেন , কিন্তু কী যেন একটা শিরশিরে অনুভূতি তাকে স্থির থাকতে দিল না । রাত তখন বেশ গভীর । হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানিতে তিনি চোখ খুলতে বাধ্য হলেন । মসজিদের বারান্দা থেকে দেড়তলার ঘর স্পষ্ট দেখা যায় । সেদিক থেকেই যেন আলোটা আসছে ! চাঁদনী রাতের ফকফকে জ্যোৎস্নায় চোখ মেলে তিনি যা দেখলেন তাতে বিস্ময়ে ,ভয়ে বোবা হয়ে গেলেন । একটা সোনার রথে চড়ে প্রায় দশ বারোটা জ্বিন পরি একসাথে সেই ছাদে নামল । তাদের রথ এবং গায়ের রং থেকে ঠিকরে পড়ছে সফেদ আলোর ঝলকানি । চাঁদনী রাতে সেদিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না , চোখে ধাঁধা লাগে । দাদু কোনোরকমে দেখলেন, তারা সবাই দেড়তলার ওই ঘরের ছাদে নামল আর তারপর সোনার ঘড়া থেকে রাশি রাশি মোহর ঢেলে দিতে লাগল ছাদের উপরে । সেগুলোর ঝনঝন শব্দ দাদুও শুনতে পেলেন যেন । ভয়ের চোটে তিনি কলমা পড়তে শুরু করলেন , কিন্তু তাকে হতবাক করে দিয়ে এক জ্বিন উড়ে এল যেন তার সামনে । হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তার দিকে একমুঠো মোহর দেখালো আর হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল ‘আয় , নিবি ? আয় আয়...’ দাদু চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাস উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন , ‘তোমরা যেই হও, ফিরে যাও। আমার এসব লাগবে না কিছু। আমার যা আছে তাই দিয়ে ভাল আছি । তোমরা যেখান থেকে এসেছ সেখানেই ফিরে যাও, আমাদের ক্ষতি কর না, বাবারা । ফিরে যাও, আমার এসব চাই না... কিছু চাই না ...’ কতক্ষণ তিনি ওভাবে চোখ বুঝে বিড়বিড় করেছিলেন জানা নেই, তবে একটা বিকট শব্দে তার চোখ খুলল আবার । দেখলেন জ্বিন নয়, রথ নয়, মোহর নয়- রাশি রাশি মৌমাছির ঝাঁক আকাশ কালো করে উড়ে যাচ্ছে ‘বোঁওওও’ শব্দে । দেড়তলার ওই ঘরের চালে চারটে বড় বড় চাক ছিল ডাঁশ মৌমাছির । সেইসবক’টা চাক থেকে মৌমাছির দল উড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ঘটল আরেক কাণ্ড । দেড়তলার ওইপাশটা পুরোটা একসাথে ধ্বসে পড়ল । তার শব্দ অবশ্য শুধু দাদু নয় সবাই পেল । শেষরাতের ঘুম ভাঙতে দেরি হল যাদের তাদের আর ঘুম ভাঙল না । বড়দাদুর পরিবার যেদিকটায় থাকতেন সেটা একেবারে চাপা পড়ে গেল । চিৎকার, কান্না, গোঁঙানির শব্দে সেইরাতের বাতাস ভারি হয়ে জানান দিল অশরীরিদের দাপট কেমন হয় । ভোরের আলো ফুটলে আশপাশের গ্রাম থেকে সবাই ছুটে এসে দেখল খানবাড়ির ধ্বংসস্তুপ । শুধু এক পাশে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের দাদুর বাড়িটাই, ছাদহীন অবস্থায় । অবিশ্বাস্যভাবে সে বাড়ির কারুর গায়ে আঁচড়টিও লাগে নি । এরপর কিছু জ্ঞাতিভাইয়েরা পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশ চলে যায় । কিছুজন রয়ে যায় সেই গ্রামেই তবে বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্যত্র বাসা বেঁধে। কিন্তু আমার দাদু এবং মামারা কেউ ওই ভিটা ছাড়তে পারেন নি । নাহ, তারপর থেকে অলৌকিক এমন ঘটনা না ঘটলেও দিদা মাঝে মাঝে টের পেতেন ঝুমঝুম আওয়াজে সে যাচ্ছে । জ্বালানীর স্তুপ থেকে পাটকাঠি হাতে ঠকঠক করতে দেখেছি আমরা তাকে । যদিও আমাদের বয়স তখন খুবই কম, তবু মনে আছে । -‘কি করছ দিদা , কি তাড়াচ্ছ ?’ -‘শশহহ... ও যাচ্ছে । হেই হেই, যেখানে যাচ্ছিস যা। এদিকে আসিস না।’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে বলতেন ‘বেদেনীর অভিশাপ বিফলে যায় নি বেটা । বাস্তুসাপ হয়ে সে এখনো এই ভিটায় ঘুরে বেড়ায়। ক্ষতি করে না, আগলে রাখে -সে আমি খুব জানি ।’ আমরা আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেতাম না ।
মনোজ ভট্টাচার্য
ভুতুড়ে বিজনেস ! আমাদের বাড়িটা হল সাড়ে তিনতলা । মানে তিনতলা প্লাস চার তলার ছাদে একটা ঘর । দোতলা তিনতলায় আমাদের হোল গুষ্ঠি থাকে ! আর এই ঘরটা – আমার আর বিভুর । – আমাদের নিজস্ব ঘর – কি অপার শান্তি – কোন ঝামেলা নেই । বিশ্বকর্মা পুজোর দিন কয়েকজন আসে ঘুড়ি ওড়াতে – পাশের বাড়ি থেকেও ঘন্টুদা আসে ঘুড়ি ওড়ায় – কেটে যাওয়া ঘুড়ি নিয়ে যায় । এই বাড়ির দুদিকে দুটো বাড়িই তিনতলা । কিন্তু তাদের ছাদটা – আমাদের পাঁচিলের পাশেই । মাঝে একটা আড়াই ফুটের গ্যাপ – ওখান দিয়ে মেথর-ধাঙ্গড়রা নাকি যাতায়াত করত ! এখন তো বন্ধ থাকে । পাঁচিল টপকে এ বাড়ি ওবাড়ি করা কোনও ব্যাপারই নয় ! এই বাড়িটা যখন কেনা হল – শুনেছিলাম – কে একটা মেয়ে নাকি মারা পড়েছিল ওই পাঁচিল থেকে পড়ে গিয়ে । সে কিভাবে পড়ে গেলো কে জানে ! তাই তো এই ছাদে বিশেষ কেউ আসে না ! কলকাতার গণ্ডগোলের সময়ে বাবা আর জ্যেঠু আমাকে দিল্লিতে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিল ! তখন প্রায়ই দেখতুম কেউ না কেউ খুন হছে এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ! আমি তো কোনোদিন ওসবের মধ্যে ছিলুম না ! বিভু নীচে বাবা-মার ঘরে শুতো । ফলে এই ঘরটা প্রায় বন্ধই থাকতো ! কিন্তু ছাদে ঘন্টুদা নাকি রোজই আসতো ! ঘন্টুদাকে তো চিনিস – পাশের বাড়িতে থাকতো – মাস্তানি করে পাড়ায় । সবাই বলে – ঘন্টুদা নাকি ওয়াগন-ব্রেকার । বাবা কিছু বলত না । তবে ছাদের দরজাটা বন্ধ রাখত ! ঘন্টুদা এই ছাদে কেন আসতো জানিস ? – হুঁ হুঁ ! পাশের বাড়ির টুম্পাদিও আসতো । দুজনে প্রেম করত । - ঘন্টুদা তো আর কোথাও যেতে পারত না ! ওদের নাকি হিস্যার গণ্ডগোল হত । দলের লোকেরাই ঘন্টুদাকে মেরে দিত । ঘন্টুদা তো পকেটে এই বড় একটা স্প্রিঙ্গের ছোরা রাখত ! বিভু নাকি নিজের চোখে দেখেছে ! আরে - সে তো হল – এ সবের সঙ্গে ভুতের কি সম্পর্ক ! – অনেকক্ষণ পরে আমি না জিজ্ঞেস করে আর থাকতে পারলাম না ! বলছি ! শোন মন দিয়ে । - প্রায় ফিশ ফিশ করে একটু অন্য সুরে বলল ! ভুতের গল্প লেখার ব্যাপারে আমি খুব একটা পারদর্শী নই ! নিজে তো ভুত দেখতেই পাই না – শুধু আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে মাঝে মাঝে একটু ভয় পাই ঠিকই ! তবে কত লোকে কত রকম অশরীরি ঘটনার কথা বলে বটে ! এই রকম একজন ছিল – শিবেন – আমার বন্ধু ! ও আগেও খুব রহস্য করে বাতেল্লা মারত । আজও যে কি বলবে – কে জানে ! ও-ই আমাকে একদিন ওর সাথে দেখা করতে বলেছিল । কি একটা রহস্যময় ব্যাপার আছে! এই পুরো ঘটনাটা তারই বলা একটা কাহিনী ! গণ্ডগোলের কলকাতা থেকে ওকে সুদুর দিল্লিতে মামার বাড়িতে রেখে পড়াশুনো করাচ্ছে ওর বাবা মামা । সম্প্রতি কিছুদিন এখানে এসেছে । আবার দিল্লিতেই চলে যাবে ! এরই মধ্যে একদিন দিল্লিতে বসে শুনতে পেলাম – টুম্পা নাকি আমাদের বাড়ির পাঁচিল থেকে পড়ে মারা গেছে ! তুই তো জানবিই ! – সেই নিয়ে জ্যেঠুকে খুব হুজ্জৎ পোয়াতে হল ! – জ্যেঠু বলল – আমাদের কেউ ছাদে আসে না । আর ছাদের দরজায় তালা দেওয়া থাকে ! কিন্তু আমার এতদিন ধারনা ছিল – ঘন্টুদাই টুম্পাদিকে মেরেছে ! এখানে এসে অনেকেই সেই কথা বলল ! – টুম্পাদি নাকি প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছিল ! আমি শিবেনকে থামালাম । - দাঁড়া দাঁড়া! কই আমরা তো এসব শুনিনি ! আর হাসপাতালেও তো পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট দিয়েছে । তাতে তো প্রেগনান্সির কথা নেই ! ও । বিভুও অবশ্য সেই কথা বলল ! কিন্তু সবাই এরকম রটালো কেন তাহলে ! শিবেন বেশ আশ্চর্য ভাবে বলল ! – তাহলে তো পুলিশ ঘন্টুদাকে অ্যারেস্ট করত ! তাই না ! তাহলে কে এসব কথা রটায় – কে জানে ! এবার তোকে একটা খুব সিরিয়াস কথা বলবো – কাউক্কে বলবি না ! ঘন্টুদা আমার কাছে পরশুদিন রাত্তিরে এসেছিল । শিবেন গলাটা খুব চেপে বলল । সে কী ! কেন ? ঘন্টুদা বলল – ও মেরেছে ? না-না ! তা নয় ! তবে ঘন্টুদা খুব কাঁদল ! কাঁদল কি রে ! – আমি তো অবাক ! ঘন্টুদা কি সত্যি মার্ডার করেছে নাকি ! তা জানিনা – তবে ঘন্টুদা একটা আশ্চর্য কথা কথা বলল ! শোন ! ইন্টারাপ্ট করবি না ! পরশুদিন রাতে – বিভু তখন ঘুমিয়ে পরেছে – ঘরে আলো জ্বলছে দেখে ঘন্টুদা পাঁচিল টপকে এসেছে । আমি তো খুব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি ! – সত্যি কথা বলতে কি একটু ভয়ও পেয়েছি । অনেকদিন কথা বার্তা নেই ! – ঘন্টুদা আমার হাতদুটো ধরে বেশ খানিকক্ষণ কাঁদল । তারপর বলে কিনা – শিবু, টুম্পাকে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরেছে কে জানিস ? ওই মাঙ্কু ! মাঙ্কু ! মাঙ্কু কে ? মাঙ্কু – আগে এই বাড়িতে থাকতো ! সুইসাইড করেছিল । ওর ইচ্ছে ছিল – ধ্রুবদাকে বিয়ে করবে । কিন্তু ধ্রুবদা ওর হাত থেকে বাঁচতে জার্মানি চলে গেছিল ! – সেই রাগে মাঙ্কু এখানে পাঁচিল থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল ! সুইসাইড নোটও লিখেছিল ! ধ্রুবদাদের বাড়িতে সবাই অবাক ! কেউ কিছুই জানে না ! আর ধ্রুবদা তো তার আগেই জার্মানি চলে গেছে ! সে তো কিছুই জানেনা ! ও কেস টেঁকে নাকি ! আমি আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম – কিন্তু সেই মাঙ্কু তো আগেই মরে গেছে ! সে আবার মারবে কি করে ? – ভুত হয়ে এসেছিল ? হ্যাঁ – ঠিক তাই ! – ওর মধ্যে একটা প্রতিহিংসার ইচ্ছে ছিল ! এই বাড়িতেই ও থাকতো কিনা ! – ঘন্টুদা কিরকম অবলীলাক্রমে বলে যাচ্ছে আমাকে । - আমি আগেও খেয়াল করেছি – আমি আর টুম্পা একসঙ্গে হলেই মাঙ্কু তোদের এই দরজার পাশে এসে দাঁড়াত । একদৃষ্টে দেখত আমাদের ! তখন কিছু বল নি মাঙ্কুকে ? সে কেন এভাবে এসে দাঁড়ায় ? না ! বলিনি কারন টুম্পা যদি ভয় পেয়ে যায় ! – জানিস তো মেয়েদের মধ্যে একবার ভুতের ভয় ঢুকলে – কি রকম শকড হয়ে যায় ! – আর টুম্পা চলে গেলেই মাঙ্কুকেও আর দেখতে পেতাম না ! কি হিংসুটে ছিল না ! কিন্তু তুমি কি করে শিওর হলে যে মাঙ্কুই টুম্পাদিকে ধাক্কা মেরেছে ? শোন – টুম্পাকে আমি পাঁচিলের ওপর বসিয়ে কথা বলছি – হঠাৎ টুম্পা চেঁচালো – ঘন্টুদা আমাকে ফেলে দিচ্ছ কেন ? – আমি তো ওকে দুহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছি – কিন্তু মাঙ্কুই ওকে জোর করে টানছিল ! – তারপর চোখের সামনে দেখলাম টুম্পা গলিতে পড়ে গেল – মাথাটা নীচের দিকে ! – ও শিবু – আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে টুম্পাকে ফেলে দিল ! – আমি কিছুই করতে পারলাম না ! – ঘন্টুদা আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল ! তারপর ? আমি তো হতভম্ব হয়ে গেছি ! তারপর আমি পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়িতে গিয়ে নীচে গিয়ে দেখি লোকে চ্যাঁচামেচি আরম্ভ করে দিয়েছে ! – চেচামেচির চোটে জ্যেঠু ও কাকু নীচে গিয়ে পেছনের দরজা খুলে দিতে লোকে টুম্পাকে বার করে রিক্সয় করে – টুম্পার বাবাকে ডেকে নিয়ে আর জি কর হাসপাতালে নিয়ে গেল ! – তখনই তো টুম্পা অলরেডি ডেড ! তারপর পুলিশ আসে নি ? হ্যাঁ – পুলিশ এসেছিল । আমাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করলো । আমি সত্যি কথা বললেও তো ওরা বিশ্বাস করত না ! তাই আমি বলে দিলাম – আমি ছিলাম না ! চিতপুরে গেছিলাম ! - পুলিশ তো জানে আমি কি করি ! - শিবু - তুই অন্তত বিশ্বাস কর – মাইরী বলছি - আমি টুম্পাকে ধাক্কা মারি নি ! বিরাট নিঃশ্বাস ছেড়ে শিবেন আমাকে জিজ্ঞেস করলো – কিরে – কিছু বুঝতে পারলি! আমার তো মনে হয় - এ ক্লিয়ার কেস অব - - ! শিবেন কদিন বাদেই আমেরিকা বিলেত জার্মানি কোথাও চলে যাবে ! – ঘন্টুদাকেও আজকাল দেখছি – কিরকম পাগলা পাগলা ভাব ! – লোকে বলে টুম্পার দুঃখে নাকি ওর মাথাটা গেছে ! আজকাল পাড়াতেই বেশি থাকে – চিতপুর ইয়ার্ডের দিকে যায় না ! – এখন আর এসব কথা বলে লাভ কি ! এর তো কোনও সঠিক প্রমানও নেই ! তার চেয়ে বলা ভালো – এ ক্লিয়ার কেস অব মিষ্টিরিয়াস – ভুতুড়ে বিজনেস ! মনোজ #ভুতের_গল্প
Swadesh Manna
#দেওয়াল_লিখন ©স্বদেশ মান্না ************* সুমন্ত লাহিড়ীর সঙ্গে আমার আলাপ ডাক্তারি পড়তে গিয়েই। ইনফ্যাক্ট সুবিশাল মেডিক্যাল কলেজটায় প্রথম দিন অন্যদের তুলনায় একটু আগেই চলে গিয়েছিলাম। কেউই প্রায় এসে পৌঁছায়নি। একা একা অপেক্ষা করছি। এমন সময় মাঝারি হাইটের, চশমা চোখে জিন্স আর টি শার্ট পরে খুব সাধারণ চেহারার আমারই মত একজন এগিয়ে এসেছিলো আমার দিকে। ইতস্তত করতে করতে আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম। হাত বাড়িয়ে বলেছিলাম হাই আমি সুরেশ। ফার্স্ট ইয়ার। আমি সুমন্ত, সেম। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল। প্রথম আলাপেই বুঝিয়ে দিয়েছিল ছেলেটা খুব অন্তর্মুখী ধরনের। আমিও খুব বেশি ঘাঁটাইনি। তারপর আস্তে আস্তে একসাথে ক্লাস করা, হোস্টেলের ছাদে আড্ডা মারা, আরসালানে বিরিয়ানি খেতে যাওয়া হতে হতেই কখন দুজনে কাছাকাছি এসে পড়ছিলাম। পড়াশোনায় দুজনেই মাঝারি মানের ছিলাম। পাশ করে যেতাম। থার্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়ে সুমন্ত একটু একটু পাল্টে যেতে লাগলো। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকতো। জিগ্যেস করলে উত্তর পেতামনা। ওর নাকি রাতে ঘুম হয়না। করা নাকি ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে! আমি অনেক বুঝিয়েও ওকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। আসলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের যে রুমটাতে ও থাকে সেই রুমটার একটু বদনাম আছে। সচরাচর কেউ বেশিদিন থাকতে পারেনা ওখানে। কারনটাও সবার জানা। পাশেই মর্গ। গন্ধ তো আছেই। কিন্তু কেউ কেউ বলে রাত্তির হলেই মাঝে মাঝে অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসে, যেগুলো ঠিক জাগতিক নয়। অস্বাভাবিক ধরনের। শুরুতে সুমন্ত এসব পাত্তা দেয়নি। আমরাও না। একা একাই ওই রুমে ও থাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। ছেলেটা চোখের সামনে কেমন যেন একটা হয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়েই আমিও পরীক্ষার কিছুদিন আগে ওই রুমে শিফট করলাম। দুই বন্ধু এখন দুই রুমমেট। আর চিন্তা নেই। আমি সুমন্তকে আশ্বস্ত করেছিলাম। ও কিন্তু খুব একটা ভরসা পায়নি। ভয়টা কাটছিলোনা ওর। বরং আরো বেড়ে যাচ্ছিল। আমি অবশ্য নতুন কিছু ব্যাপার দেখিনি এখানে আসার পর। সবটাই ওর মনের অসুখ বলে ধরে বেঁধে সাইকিয়াট্রিস্ট ও দেখলাম একবার। কিন্তু নিয়মিত ওষুধ খেয়েও ওর মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন এলোনা। বরং মাঝে মধ্যেই বলতো দেখিস একদিন তুইও প্রমান পাবি ওদের। ওরা আছে, আশেপাশেই। ওরা পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনা অতো সহজে। যথারীতি ওর কথাগুলো আমি বা আমরা হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ওকে বোঝানো যেতনা। সেদিন ছিল শুক্রবার। পরীক্ষা শেষ। সবাই বাইরে খেতে যাওয়ার প্ল্যান হলো। সুমন্ত গেলোনা।বেরোনোর সময় বললো ভীষন মাথা ধরেছে। ঘুমাবে।জোর করলামনা। বরং একটু ঘুম দিলে যদি সুস্থ হয় ছেলেটা। ফিরতে ফিরতে একটু রাতই হয়েছিল সেদিন। রুমে ঢুকে দেখি আলো নেভানো। সুমন্ত ঘুমাচ্ছে। আমিও আর বিরক্ত করিনি ওকে। অন্ধকারের মধ্যে আমার বিছানাটা খুঁজে নিয়ে শরীরটা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। গত পনেরদিনের রাতজেগে পড়া, আর পরীক্ষার ধকলে নিমেষে ঘুমের জগতে তলিয়ে গিয়েছিলাম। খুব গাঢ়ই ঘুম হয়েছিল সেরাতে। ভেঙেছিল একটু বেলা করেই। ঘুমের ঘোর কাটতেই চোখ গিয়েছিলো ওর বিছানার মাথার দিকের সাদা দেওয়ালটায়। রক্ত দিয়ে এলোমেলো ভাবে সেখানে লেখা ছিল -'ভাগ্যিস রাতে আলোটা জ্বালিসনি'। দেওয়ালের কাছে মেঝের উপর সুমন্তর রক্তাক্ত দেহটা পড়েছিল। আর হ্যাঁ হাতের লেখাটা সুমন্তর নয়! ©স্বদেশ মান্না (সব চরিত্র কাল্পনিক) #ভুতের_গল্প
মিতা
এই সাইট টি খুব ভাল লাগলো| কিছুদিন ধরে এ পাতায় আসছিলাম‚ নীরবে| ভূতের গপ্প লেখার আমন্ত্রন দেখে কিছু লিখতে ইচ্ছে হল| এবারে শোনাই সেই ভূতের গল্প: সময়্টা ১৯৯০র সামার| আমরা ইংল্যান্ড বেড়াতে গেছি| লন্ডন থেকে ভাসুরের বাড়ি এডিনবরা যাবো গাড়িতে‚ নানা জায়্গায় থামতে থামতে‚ আর রাত্তিরে থাকবো পথে পড়ে দাদার বন্ধু কুশলদার বাড়ি ব্র্যাড্ফর্ড নামে একটা ছোট শহরে| সেই সময় সেল ফোন ছিল না‚ লন্ডন থেকে বেরোবার আগে কুশলদাকে ফোন করে জানানো হল আমাদের প্ল্যান‚ কুশলদাও খুব সোৎসাহে রাজি| যা হোক‚ সকালে লন্ডন থেকে বেড়িয়ে কেমব্রিজ ইত্যাদি ঘুরে সন্ধ্যের পর আমরা পৌঁছুলাম সেই শহরে| এটি একটি পুরোনো ছোটো শহর‚ রাত্তিরে আর বিশেষ কিছু দেখা গেল না| কুশলদার বাড়ি গিয়ে শুনি ওঁর বৌ ও ছেলে দেশে গেছে গরমের ছুটিতে‚ আর আমাদের সেটা জানান নি‚ পাছে শুনে আমরা না আসি| উনি নিজেই রান্না করে রেখেছেন আমাদের জন্য‚ তবে আমাদের দেরি দেখে একাই পান পর্ব শুরু করে দিয়েছেন এবং সেটা মোটামুটি মনে হোল অনেক ক্ষন ধরেই চলছে| আমাদের বলে দিলেন ওপরে আমাদের জন্য বেড রুম রেডি করা আছে| আমার জায়ের কাছে আগেই শুনেছিলাম বৌদি মানে কুশলদার স্ত্রী সুগৃহিনী‚ এবার তার পরিচয় পেলাম| বাড়িটি পুরোনো কিন্তু খুবই রুচি সম্মত সুসজ্জিত| কুশলদাও অত্যন্ত সুদর্শন‚ আলাপী‚ বন্ধু বত্সল এবং রোমান্টিক| আমার নাম জিগেস করে আমার বর কে বললেন 'এর তো নাম শুনেই বুকে ধাক্কা লেগে যায়'| আমি আমার বর কে ইশারায় ওঁর পানীয় গ্লাস দেখালাম| যাই হোক‚ আমরা ওপরে গেলাম‚ আমাদের ঘরে ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার করবো| দেখি ও পাশের একটি ঘর থেকে সালোয়ার কামিজ পরা এক মহিলা বের হয়ে এসে আমাদের 'নমস্তে' বললেন| মহিলাকে দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত‚ চল্লিশোর্ধ পাঞ্জাবি মহিলা মনে হল| আমাদের হতভম্ব ভাব দেখে মহিলা বললেন 'ও তোমাদের কুশল বলে নি বুঝি আমার কথা! ড্রিংক করতে শুরু করলে ও সব ভুলে যায়| আমার নাম কবিতা অরোরা‚ আমি ওদের বন্ধু হই| সুনিতা (কুশলদার স্ত্রী) দেশে তো‚ তাই আমি কুশলের খবর নিতে আসি মাঝে মাঝে‚ আর আজ তোমরা আসবে বলে ওকে একটু সাহায্য করছিলাম| যাও তোমরা চেঞ্জ করে খেতে এস‚ আমি সব রেডি করছি' বলে মহিলা নীচে চলে গেলেন| আমদের একটু অবাক লাগলেও মহিলার ভদ্র ব্যবহার ও কথা বার্তা শুনে খুব ভাল লাগলো| পরে নীচে খেতে গিয়ে দেখলাম পরিপাটি করে টেবিল সেট করা‚ খাবার গরম করা সব হয়ে গেছে| কবিতাজী খুব যত্ন করে খাওয়ালেন আমাদের‚ তবে কুশলদা অলমোস্ট ড্রান্ক থাকায় বিশেষ কিছু খেলেন না| উনিও দেখলাম কিছু বললেন না কুশলদা কে| ডিনারের পর কবিতাজী বললেন 'তোমরা তো এবারে বাঙলায় আড্ডা দেবে‚ আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি‚ রাত জাগতে পারি না একদম' বলে আমাদের গুড নাইট জানিয়ে ওপরে চলে গেলেন| আমাদের আড্ডা চলেছিল রাত তিনটে অব্দি‚ কুশলদা আড্ডাবাজ‚ আমুদে লোক‚ গল্প করতে করতে নেশার ঘোর ও কেটে গেছিল ওঁর| কত রকম গল্প শোনালেন আমাদের| আড্ডার শেষে হঠাৎ আমার বর কে জিগেস করলেন 'এই বাড়িটার বয়স কত বল তো? দেয়াল টা ধরে দেখ'| আমরা ধরে দেখলাম দেয়াল গুলো পাথরের‚ ঠান্ডা - আমি বাহাদুরি করে বললাম‚ মনে হয় একশো বছরের পুরোনো বাড়ি| কুশলদা হেসে বললেন 'আর ও পঞ্চাশ যোগ কর| কত ভূত থাকতে পারে ভাব এই পুরোনো বাড়িতে!' শুনেই তো আমাদের গা শিরশির করতে লাগলো| রাত তিনটে তে দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ির ভূতের গল্প শোনার চাইতে ঘুমিয়ে পড়াই ভাল মনে হলো| কুশলদা সত্যিই ভালো হোস্ট‚ এত রাতে ঘুমিয়েও সকালে আমরা তৈরী হয়ে নীচে নামতে নামতে চা‚ জলখাবার সব রেডি করে ফেলেছিলেন| কবিতাজী কে নীচে না দেখে কুশলদা কে জিগেস করলাম উনি চা খাবেন না? কুশলদা খুব অবাক হয়ে বললেন 'কার কথা বলছো?' এবারে আমাদের অবাক হবার পালা‚ সে কি? কবিতাজী কাল আমাদের এত যত্ন করলেন ডিনারের সময়‚ আর সকালে কি উনি চলে গেলেন আমরা নামার আগেই? কুশলদা খানিক্ক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে রইলেন‚ তারপর বললেন 'কবিতার উপস্থিতি আমিও মাঝে মাঝেই টের পাই‚ বিশেষত সুনিতা বাড়িতে না থাকলে'| তারপর শোনালেন তাঁদের কথা| কুশলদা দিল্লিতে পড়াশোনা করেছিলেন ইকোনমিক্স নিয়ে‚ সেখানে তাঁর সহপাঠিনি ছিলেন কবিতা অরোরা| দুজনের ভালবাসার সম্পর্ক হয়েছিল গভীর| এরপর লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ দুজন মাস্টার্স করে এবং বাড়িতে জানায় তারা বিয়ে করে সেটল করতে চায়| গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের এক মাত্র ছেলে পাঞ্জাবি মেয়ে বিয়ে করবে শুনে মায়ের হার্ট এটাক হয়ে যায়‚ মৃত্যু শয্যায় মাকে কথা দিতে হয় কবিতাকে বিয়ে করবে না| দু জনে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে না করার| কবিতা দিল্লির কলেজে পড়ানোর চাকরী পেয়ে চলে যায়‚ কুশল থেকে যায় ইংল্যান্ডে| দুজনের যোগাযোগ কমে আসছিল| ইতিমধ্যে বাবা পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তাঁর বন্ধুর মেয়ে সুনিতা কে পুত্রবধূ করে আনতে চান‚ কুশলকে রাজি হতে হয়| বিয়ের পর আর যোগাযোগ ছিল না কবিতার সাথে| ঘটনা চক্রে কয়েক বছর বাদে কবিতার সাথে দেখা হয় একটা কনফারেন্সে| কুশল তাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে| কুশলের স্ত্রী‚ পুত্র‚ সংসার দেখে কবিতা বলে ‚ 'ভালই করেছ আমাকে বিয়ে না করে‚ সুনিতার মত এত ভাল গৃহিণী আমি কখনো হতে পারতাম না'| সুনিতা সব ই জানতো‚ কবিতাকে ওর ও ভালো লেগে যায়| এর পর কয়েক বছর কবিতা ইংল্যান্ডে আসলেই কুশল সুনিতার সাথে কয়েক দিন কাটিয়ে যেত| কখনো সুনিতা যদি নাও থাকতো তবুও আসতো‚ তাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছিল কবিতা| বছর দুই আগে কুশলরা খবর পায় কবিতার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে‚ তাও বেশ এড্ভান্সড স্টেজ| ওরা দিল্লি গিয়েছিল‚ কিন্তু কবিতা অনুমতি দেয় নি হাসপাতালে ওদের দেখা করতে দিতে‚ নিজের ক্যান্সার ক্লিষ্ট চেহারা ওদের দেখতে দিতে চায় নি| কবিতার চলে যাবার খবর জানিয়েছিল তার এক কলীগ| কুশলদা বললেন গত দেড় বছরে ওঁর মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে কবিতা এসেছে‚ কিন্তু স্বপ্নের মত অস্পষ্ট| আমরা যেরকম দেখলাম‚ কথা বললাম‚ সেরকম কিছু হয় নি| আমদের তখন মানসিক অবস্থা অভিভূত ...কিন্তু নাহ ভয় করে নি| এটি স্বপ্ন ও ভূতের মিলিত গল্প‚ ভূতকে সব সময় ভয় পেতে হবে এরকম কোন কথা নেই| অনেক সময় ত্ঁারা মনুষের চাইতেও বেশি ভদ্র সভ্য হন| #ভুতের_গল্প #ভুতের_গল্প
শিবাংশু
বর্ধমানের বাঁধমুড়া গ্রামে ১৮০৬ সালে ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছিলেন এই ধীমান মানুষটি। পীরগ্রামে মামা'র কাছে বাংলা আর ইংরেজি শিখে অল্প বয়সেই নীলকুঠির কেরানি হয়েছিলেন তিনি। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু যখন কবিগানের নেশায় আকা বাইয়ের দলে যোগ দিলেন, বাড়ির লোক তাঁকে ত্যাগ করলো। এ কী ব্রাহ্মণের যোগ্য কাজ? ব্রাত্যজনের নেশা এই সব। তাও ছাড়েননি কবিগান। কিন্তু যখন কবিয়াল রামপ্রসাদ স্বর্ণকার তাঁকে আসরের মধ্যে তিরস্কার করলেন, তখন তিনি কবিগান ছেড়ে পাঁচালিরচনা শুরু করলেন। সেও সেই ১৮৩৬ সালে। এ পাঁচালি সাবেক লক্ষ্মী বা মনসার পাঁচালি নয়। সম্পূর্ণ নতুন ধরণে সমাজসচেতন, 'লোকশিক্ষে'র মাধ্যম ছিলো সেই সব গান। নবদ্বীপের উন্নাসিক পণ্ডিতসমাজ সেই পাঁচালিগানের নতুনত্ব দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্বয়ং রাজা রাধাকান্ত দেব ও বর্ধমানরাজের মতো দিগগজরা মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। ১৮৫৭ সালে তিনি গত হ'ন। পাঁচালিকার হিসেবে বিখ্যাত হলেও তাঁর বিভিন্ন রকম বাংলাগানে গভীর ব্যুৎপত্তি ছিলো। মাতৃসঙ্গীত, বৈঠকী গান বা কীর্তন, বাংলাগানের সব শাখাতেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। তাঁর একটি টপ্পাঙ্গের গান, অক্ষম প্রয়াস করেছিলুম, সহিষ্ণু বন্ধুদের জন্য এখানে রাখ্লুম। দাশরথির ট্রেডমার্ক উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাশ এতো ছোটো পরিসরেও শুনতে পাচ্ছি আমরা.... কৃষ্ণের আক্ষেপ, " লিখিতে শিখিলাম আমি কই...."
James
পর্ব-২ ভারত ভ্রমণ| তা প্রায় এগারো বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে| এই তো সেদিন ২০০৬ সালে‚ মধ্যেকার বৎসর‚ মাস যেন ঝড়ের বেগে চলিয়া গেল| এইসব পশ্চিমী দেশে সময় যেন বড় দ্রুতবেগে ধায়| প্রাণ রাখিতেই প্রাণান্ত| একে তো অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তদুপরি গৃহকর্ম| দেশের ঝি চাকর পরিবৃত পিতা কণ্বের সংসারে লালিত‚ ননীর পুতুলের ন্যায় ছিল তাহার শরীর| রবি বর্মার চিত্রের ন্যায় শকুন্তলার গোলগাল‚ চিকনি চামেলী শরীর আজি শুকাইয়া কাঠ| তার উপর লন্ডনের এই আবহাওয়া! এখানে নবজাতরা ক্যাঁ করিয়া উঠিতেই নার্স তাহাদের হাতে একটি করিয়া ছাতা ও এক বাক্স নাক ঝাড়িবার টিস্যু ধারাইয়া অভ্যর্থনা করেন| 'বাছা‚ এই তো শুরু| বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া| সারাজীবনের সঙ্গীর সহিত পরিচিতি লাভ করহ|' জিয়েফসির ধাক্কায় দুষ্যন্তের চাকরী নট| আয় নাই অথচ তাঁর সেই রহিসি মেজাজ রহিয়া গিয়াছে| পাবে যাতায়াত অব্যাহত| পাইঁট কে পাইঁট আইরিশ বীয়র আকন্ঠ পানের অভ্যাস তাহার; কে যোগাইবে তাহার খরচ| অগত্যা লন্ডনের রাস্তায় ট্যাক্সি চালকের আসনে উপবিষ্ট হইয়া তাহার দিন কাটে| হায় রে কোথায় গেল‚ সেইসব সোনালী দিন| কলিকাতায় বুনি উঠিতে না উঠিতে তাহার মোটরবাইকে শহর পরিক্রমা‚ ছিপলি দেখিলেই হিড়িক মারা‚ সকলই গন উইথ দ্য উইন্ড| রয়্যাল এনফিল্ডের ভট ভট ভট‚ ডুব ডুব শব্দে শকুন্তলার সদ্য যৌবনা মস্তক থাউজ্যান্ড আরপিয়েমে ঘুরিবার ফলশ্রুতিই তো বকখালিতে গমণ| হায়রে যৌবন বড় ক্ষণস্থায়ী‚ 'জীবন প্রবাহ বহি কালসিন্ধু পানে' অতীব তাড়াতাড়ি ধায়| কবি গাহিয়াছেন‚ মহা বিশ্বে সবকিছু ধায়িছে টাইপের কিছু| শকুন্তলা কি অতশত জানেন‚ পালিত পিতার গৃহে গৌতমী মাতা ও পিতা কণ্বের আদরের দুলালী‚ অতি কষ্টে বি.এ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন‚ ভাগ্যিস| সেই সাদা মাটা বিএ তাহার সাথ দিতেছে এখন| একটি খুচ খাচ বি এড ডিপ করিয়া তিনি এখন একটি কিন্ডারগার্টেনের টীচার| এদেশে অবশ্য মিস বলিয়া সম্বোধনের চল নাই‚ ম্যাডাম অথবা স্যারও অপ্রচলিত‚ শুধুই মিসেস বসু| পশ্চিমী দেশ‚ ফরেন দূর হইতেই অতীব সবুজ মনে হয়‚ হীথরো'র ইমিগ্রেশন কাউন্টার পার হইবার পরই বুঝা যায়‚ হাউ মেনি প্যাডি মেকস হাউ মেনি রাইস! দুইজনে রোজগার করেন‚ নতুবা সংসার আজি কোথায় ভাসিয়া যাইতো ! মিনসের তো কাজে মন নাই‚ তাহার ইচ্ছা ডোল এ বসিয়া খাইবেন‚ পাবে ফুটা মস্তানী করিবেন; কথায় বলে স্বভাব যায় না ম'লে| এদেশে আসিবর পর দুষ্যন্ত ট'বাবুর স্টীল মিলে বেশ কয়েক বৎসর আরামে কাটাইয়াছেন| মেকানাইজড মিল‚ তাহার তো কোন টেকনিক্যাল কোয়ালিফিকেশন কোন জন্মেই ছিল না‚ স্টোরস ক্লার্ক| স্টীল মিলের স্টোরস বলে কথা‚ আদতে একটি বিশাল ফ্যাকটরি বলিলে অত্যুক্তি হয় না| কিন্তু সুখ সহিলো না তাহার কপালে| ঐ চাইনীজ ব্যাটারা যে সুলভ মূল্যে ইস্পাত সারা বিশ্বে সাপ্লাই করিবে কে জানিত| তাহার কলিকাতাতুত ভ্রাতা পিত্তলের দুনিয়াও টলোমলো চৈনিক আগ্রাসনের মুখে| সবার দিন কি একই ভাবে যায়! দুষ্যন্ত'র মাঝে মধ্যেই দেয়ালে লিখিত চেয়ারম্যানের বাণীর কথা মনে পড়ে‚ ঐ লোকটির কি অমোঘ দূরদৃষ্টি; বলো বলো ‚ বলো সবে চিল চিৎকারে কি জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন মেলে? শুধু কথায় কবেই বা চিঁড়া ভিজিয়াছে| উন্নতির নিমিত্ত চাহি পরিশ্রম‚ নিয়মানুবর্তিতা| তো ট'বাবুর ইস্পাত কারখানা হইতে রিডান্ডান্সি বাবদ কিছু থোক টাকা হাতে আসিয়াছিল| তাহা লইয়া দুষ্যন্তের ফুটানি কে দেখে! অসৎসঙ্গ তাহার ভূষণ| কয়েক সপ্তাহ নিরুদ্দেশ- টাকা ফুরানো অবধি থাইল্যান্ডে এসকর্ট পরিবৃত হইয়া হলিডে বানাইয়া ফিরিলেন| শকুন্তলা প্রথমে আন্দাজ করিতে পারেন নাই| ভাবিয়াছিলেন‚ বেচারীর চাকুরী নাই‚ আশিয়ান টাইগারদের দেশে ফোকসওয়াগনের নতুন কারখানা খুলিয়াছে‚ তথায় তাহার পতিদেবতা নিজ ভাগ্য ফিরাইবেন আর তিনিও তল্পি তল্পা গুটাইয়া ট্রপিকসে প্রস্থান করিবেন| ভরতকে লইয়া চিন্তা নাই কোনও বোর্ডিং স্কুলে দিলেই হইলো| আহা ট্রপিকস| পাপায়া‚ আম কাঁঠাল গাছ এমনকি নিম গাছ দেখিতে যে এত নয়নাভিরাম‚ তাহা কে জানিতো| চারি ঘন্টার উড়ানে এনেসসিবিআই ইয়ানী দমদম এয়ারপোর্ট‚ এমন দিন কি কভূ আসিবে| কিন্তু হায় রে শকুন্তলার কপাল| দুষ্যন্ত সেখানে মৌজ মস্তির নিমিত্ত গিয়াছেন তাহা শকুন্তলা আন্দাজও করিতে পারেন নাই| ঐসকল দেশে‚ পাব এ ‚ ডান্স বার এ বসিতে না বসিতে‚ ' উইল য়ু বাই মি এ ড্রিঙ্ক?'| ওয়ান থিং লীডস টু অ্যানাদার| বারওয়ালারা সম্যক অবহিত‚ কে কাস্টোমার আর কে ছেলেধরা| তাহাদের ব্যবসায় তো এই| জল ভিজাবো না ব্যবসায়ে অচল| আসল মুনাফা তো ঘন্টাপ্রতি ঘর ভাড়ায়| এসবের পরিণতি যাহা হইয়া থাকে‚ বাহ্ট ফুরাইতেই ঘরের ছেলে ঘরে| এবং দিনরাত গঞ্জনা ও পাব এর খরচ জুটাইতে এই ট্যাক্সি চালনা| শকুন্তলা নীরবে অশ্রুপাত করেন| ওসমান সাহেবের গৃহে অবস্থানের দিনগুলির কথা মনে পড়ে| শেষ বয়সে তাঁহার সিলেটে যাইবার ইচ্ছা বলবৎ হয়‚ সেখানেই তাহার ইন্তেকাল হয়; বাপ দাদা চাচাদের পাশেই মাজারে তাহার শেষ শয্যা| মার্গারেট পতির সহিত যাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে বিচক্ষণ ওসমান তাহাকে নিবৃত্ত করেন| সেখানে মার্গারেট কখনই মানাইতে পারিবেন না ইহা তিনি সম্যক জ্ঞাত ছিলেন; কোথায় রানিং ওয়াটার আর কোথায় বা বাথরুম শাওয়ার? টিউকল তলায় ঘ্যাটাং ঘাটাং করিয়া গোশলের পানি আর দীঘিতে স্নান‚ মার্গারেটের কভূ সহ্য হইবে না| বরং স্মৃতিটুকু থাকুক| মার্গারেট এখন এক বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক| রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ের সঞ্চয়ের কিছু পাউন্ড ওসমান সাহেব সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ডে নিয়মিত জমা করিতেন; তাহাই ফুলিয়া ফাঁপিয়া মার্গারেটের খরচে লাগে| তিনি দয়াশীলা‚ শকুন্তলাকে নিজের কন্যার নায় আশ্রয় দান করেন‚ ঈশ্বর তাহার প্রতি কৃপা বর্ষণ করিয়াছেন‚ তিনি কাহারও দয়ার প্রতি নির্ভর নন| (চলিবে) ৩৪২১৯৬১৭
দীপঙ্কর বসু
সান্থালিখোলা পরের দিন সকাল নটায় একটা টাটা সুমোয় চেপে আমরা রওয়ানা হলাম সামসিং সান্থালিখোলার পথে । অবাক কান্ড , গাড়ির চালককে প্রথম দর্শনে আমার পছন্দ হলনা । রোগা টিং টিঙে চেহারা,গালে কয়েকদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি ,আর নাকের নিচে ফুলঝাড়ুর মত ঝুলন্ত বিচ্ছির একজোড়া গোঁফ ! তবে চালকবাবুর চেহারা যতই আমার মনে বিরূপতার জন্ম দিক না কেন ক্রমশ প্রকাশ পেল রায়চৌধুরি লোকটি অত্যন্ত ভদ্র – কিছুটা বেআক্কেলে হয়ত বা ।কিন্তু সে কথা পরে হবে । আপাতত আমরা দ্রুতবেগে চলেছি ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে । আমাদের দুপাশে ঘন সবুজ বন ।বেশ কিছুদূর চলার পর ডাইনে বাঁয়ে কয়েকটা মোচড় মেরে আটকে গেলাম একটা লেভেল ক্রসিং এ । গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আর সৌম্য নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে । যদিও রায়চৌধুরি মৃদু আপত্তি জানিয়েছিল আইনের দোহাই দিয়ে । এই বনাঞ্চলে নাকি পায়ে হেটে চলাফেরা করায় নিষেধ আছে ! পথের দু পাশে লম্বা লম্বা গাছের সবুজ বন । গাছগুলোর কালচে বাদামি গুড়ির ফাঁকে সবুজ পাতার ফাঁকফোকর গলে এসে পড়ছিল সকালের নরম রোদ্দুর । ভারি মায়াময় আলোআঁধারির সৃষ্টি হয়েছিল ।সেই সঙ্গে সবুজ ক্যানভাসের এখানে ওখানে লাল ,বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোঁয়া ! এমন অপার্থিব দৃশ্য দেখে স্থির থাকা যায় ? গাড়ির মধ্যে নিজেকে আটকে রাখা যায় ? ইতিমধ্যে প্রচুর হাঁকডাক সহকারে ঝমাঝম করে উপস্থিত হল একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন । ট্রেন পার হয়ে যাবার পর গেট খোলার উপক্রম হচ্ছে দেখে রায়চৌধুরি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছেন দেখে আমরাও ঝটপট ফিরে এলাম যে যার আসনে । রায়চৌধুরির কাছে সংবাদ পেলাম কিছু দিন আগেই এই লেভেল ক্রসিঙের কাছেই লাইন পার হতে গিয়ে কয়েকটি হাতি নাকি ট্রেনের ধাক্কায় মারা পড়েছিল । মনে পড়ে গেল ঘটনাটা খবরের কাগজে বেশ আলোড়ন জাগিয়েছিল । তারপর থেকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সমস্ত ট্রেন চলে ধীর গতিতে – প্রচুর শোরগোল তুলে । বেড়াতে বেরিয়ে সময় বা দূরত্বের হিসেব করতে যাওয়া বৃথা ।স এহিসেব আমি রাখিও না,তাই লেভেল ক্রসিং থেকে ছাড়া পাবার পর কতক্ষণ চলেছি বা কত দূর গিয়েছি মনে নেই।মনে আছে সমতল পথে চলতে চলতে গাড়ি সহসা একটা বাঁক নিয়ে চড়াই ভেঙ্গে উঠতে লাগল ওপরের দিকে । গাড়ি টিলার ওপরের দিকে যেমন যেমন উঠছে নিচের দিকে সমতলের ঘরবাড়ি ,রাস্তাঘাট ,গাছপালা সবই ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে । বেশ কিছুটা চড়াই পথ অতিক্রম করে গাড়িটাকে একটা পাঁচিল ঘেরা পার্কার গেটের সামনে দাঁড় করালেন ।সুন্দর করে গোছান পার্কটা একেবারে খাদের গায়ে । আমরা সটান চলে গেলাম খাদের ধার ঘেঁষা পার্কের রেলিং এর কাছে ।সেখান থেকে দেখলাম অনেকটা নিচে ফেলে আসা জনপদ যেন ওপরের দিকে মুখ তুলেয়ামাদের দিকে হাত নাড়ছে। এখান থেকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে জনপদটাকে । তার খানাখন্দ , নালানর্দমা – এক কথায় যা কিছু অসুন্দর তা যেন প্রকৃতি একটা সবুজ চাদরে মুড়ে দিয়েছে । সে চাদরের জায়গায় জায়গায় বেগুনি রঙের ছোপ । মিনিট পনেরো কুড়ির বিরতির পর আবার আমাদের চলা শুরু হল । রাস্তার দুপাশে এখন পরের পর চা বাগান ।কোনটা ডানকান ,কনটা বা গুডরিক বা টাটা টি । দুই একটি চা বাগানের মাঝে বাংলো , দুই একটা টি প্রসেসিং প্ল্যান্টও দেখা গেল ।যদিও তার কোনটিতেই কোন কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়লনা । প্রায়ই শোনা যায় উত্তরবঙ্গে চা শিল্পের সঙ্কটেতর কথা ।হয়তো সেই সঙ্কটের জেরেই প্রসেসিং প্ল্যান্টগুলোর এমন ভুতুড়ে দশা । সে সব পিছনে ফেলে আমরা একটা জনাকীর্ণ বাজারের বিকিকিনি ছাড়িয়ে একটা সঙ্কীর্ণ গলি পথে ঢুকলাম ।পথের দুপাশে টিনের চালের ছোট ছোট বাড়ির সার । প্রতি বাড়ির সামনে একচিলতে কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দা ।দুএকটা বাড়ির সামনে দেখলাম অল্পবয়সী যুবকরা জটলা করছে ,আবার কোন কোন বারান্দায় বসেছে মেয়েলি গল্পের আসর । খাঁদা নাক , খর্বাকৃতি এ মেয়েদের পরনের বেশবাস চোখে পড়ার মতই রংচঙে । আমার মনে হল যেন বেগুনি আর আকাশী নীল রঙের প্রতি বেশ কিছুটা পক্ষপাতিত্ব আছে এদের । প্রতি বাড়ির বারান্দায় ছোট ছোট টবে নানা রঙের ফুলের গাছ সাজান রয়েছে ।তবে পোশাক আষাকে কিম্বা গৃহসজ্জায় যতই রঙের বাহার থাকুক না কেন বাড়িগুলো বেজায় নোংরা আর পাড়াটার দশা তথৈবচ । আমার মনোভাব আঁচ করেই রায়চৌধুরি মন্তব্য করে “ব্যাটারা মাসে একদিন চান করে কিনা সন্দেহ । কাছে যায় কার সাধ্য ।গায়ের গন্ধে ভুত পালায়”। বেলা এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম সান্থালিখোলায় একটা মোটামুটি সমতল জায়গা দেখে গাড়ি থামালেন রায়চৌধুরি । এর আগে কোন টুরিস্ট গাড়ির ই যাবার অনুমতি নেই । গাড়ির ভিতর থেকে মাটিতে পাদিয়েই চোখে পড়ল একটা ঘন সবুজ পাহড়ি টিলার দিকে । টিলার গায়ে ঝাঁকে ঝাঁকে লম্বা লম্বা গাছ গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে হঠাৎ আমার পিতামহ ভীষ্মের শরশয্যার কথা মনে পড়ল । গাছগুলো ঘন সবুজ পাতায় মোড়া আর তাদের মাথার ওপরে ঘন কুয়াশার ওড়না বিছান ।টিলার গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন উচ্চতায় কয়েকটা বেশ সুন্দর বাংলো টাইপের বাড়ি চোখে পড়ল । মনে মনে ভাবলাম ওই রকম একটা বাংলোতে কয়েকটা দিন কাটাতে পারলে বেশ হত। এমনি কতশত ইচ্ছাই ত অপূরণ রয়ে গেল এ জীবনে । অনেকক্ষণ সেদিক থেকে আর চোখ সরাতে পারিনা । কিন্তু শুধু ওই টিলার দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবেনা এই চত্বর থেকে একটা ঢালু রাস্তা সর্পিল পথে নেমে গেছে বেশ অনেকটা নিচুতে । সবাই দেখলাম সেই দিকেই চলেছে ।সে পথের প্রান্তে কি আছে তা না জেনেই আমিও চললাম সবার পিছু পিছু । নিচের দিকে নামতে নামতে ভাবছি ফেরার সময়ে এই পথেই আবার চড়াই ভেঙ্গে উঠতে হবে পায়ে হেঁটে ।কাজটা খুব সহজ হবে না জানি ,কিন্তু কেমন জানি মনে একটা রোখ চেপে গেল । যা থাকে কপালে বলে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে নামতে লাগলাম সর্পিল পথ ধরে। তবে পথের কষ্ট ভোলানোর জন্যে প্রকৃতি দেবী তার রূপের পশরা সাজিয়ে বসেছেন পথের ধারে । পথের ধার ফিটে আছে অজস্র বনফুল ,কত যে লতা গুলম ,ফার্ন গাছ কোথাও আবার পাথরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছে শীর্ণ জলধারা ।চলার পথটাই এত সুন্দর যে পথের ক্লান্তির কথা মাথায় থাকেনা । নামতে নামতে অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম দুপাশের পাহাড়ের মাঝে বয়ে চলা এক খরস্রোতা নদীর তীরে । নদীর নাম সান্তালি খোলা । খোলা নাকি স্থানীয় ভাষায় নদীর প্রতিশব্দ ।অপরের দিক থেকে নেমে আসা পথটা শেষ হয়েছে নড়বড়ে একটা কাঠের সেতুর মুখে ।আমরা সেই সেতু পেরিয়ে এসে দাঁড়ালাম নদীর ধারে । খরস্রোতা নদী গর্ভে পড়ে আছে অজস্র বোল্ডার । সে সব বোল্ডারে নদীর স্বচ্ছ হাল্কা নীলাভ জল বাধা পেয়ে জায়পগায় জায়গায় ফেনিল আবর্ত তৈরি করছে । বেড়াতে আসা লোকেদের মধ্যে অল্পবয়সীদের ভিড় ই বেশি । বিশেষ করে দুই এক জোড়া দম্পতির হাবভাব দেখে মনে হল তারা হয়তো সদ্য বিবাহিত । তারা নিজেদের মধ্যেই বিভোর হয়ে আছে । এক জোড়া দম্পতি দেখলাম নদীরও জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে পাশাপাশি খুব ঘন হয়ে ।তাদের ভাব দেখে মনে হল সমাজ সংসার মিছে সব ...। ফেরার ভাবনাটা মনকে পীড়া দিচ্ছিল বলে কিছুক্ষণ সেই নদীর ধারে কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম । জানি এবারেই কথন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে এই চড়াই ঠেলে ওঠার। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলাম আমার ভগিনীটি কি এক অদ্ভুত কৌশলে সিকিউরিটি সার্ভিসের এক জীপের চালককে কিছু অর্থের বিনিময়ে রাজি করিয়ে ফেলেছেন আমাদের মত বয়স্ক লোকেদের তার জীপে করে ওপরে যেখানে আমাদের গাড়ি আছে সেখান অবধি পৌঁছে দিতে । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । তবে এই পর্বের ওপরে যবনিকা টানার আগে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে নদীর খাত থেকে ওপরে উঠে এসে একটি দোকানে র টেরেস এ বসে মৌজ করে বীয়ার খাওয়া আর সঙ্গে অতি উপাদেয় চিকেন মোমোর চাট – সর্বক্লান্তি হরা । অমন স্বাদ আমি কলকাতায় কোথাও মোমো তে পাইনি । আর সঙ্গের ঝাল সস – সেও তুলনা রহিত ।
Kaushik
অল্প আঁকিবুকি| শব্দের| শিক্ষকের জীবন| দুজনারই| নেহাত মন্দ নয়| অল্প সম্মান‚ অল্প অর্থ‚ অল্প আরাম| এই সব অল্প‚ অল্প-অল্প করে মিলে - অ-নেকটা সুখ| তা অনেকটাই| লেখাপড়া-গবেষণার সময় চুরি করে অল্প লেখালিখি| অল্পই| বেশ লাগে| দশদিকে চিৎকৃত ভোগবাদের হাতছানি| কিন্তু অর্থের ভাঁড়ারে যে টুকু আছে‚ তা দিয়ে খেয়ালি পোলাও ভিন্ন অন্য রান্না চলে না! তবু আছি| বেশ আছি| দুটো ফুল| চারা গাছ বললেই হয়ত সঠিক উপমা হয়| যত্ন করতে হবে| লালন ও| পরিনত করতে হবে মহিরুহে যাতে কিনা অপরকে ছায়া দিতে পারে| ছায়া দিতে পারাটা জরুরি| বাবা একবার বলেছিলো - বট গাছের মতন হবি‚ তোদের ছায়ায় যেন অপরে আশ্রয় পায়| কিন্তু বাবা‚ আশ্রিত যদি আমারই দাড়ি ওপড়ায় - তখন? আমি তো অত মহান নই‚ বাবা! তবু চাইব‚ আমার সন্তানেরা যেন বট গাছের মতই হয়| শিক্ষিত হয়| তোমার মতন অঙ্কে দড় হয়| সংস্কৃত হয়‚ কৃতি হয়| এবং - সর্বোপরি‚ খুব খুব খুব ভালো মানুষ হয়! হয়ত অনেকটাই বেশি চাওয়া| তবু চাইব - মন থেকে চাইব - আমার সন্তানেরা যেন এরকমই হয়| লক্ষ্মণগড়‚ ৭/২/১৪ (কেবিনে আপন মনে| বেলা ১:১৫)
James
শ'টকে সংক্ষিপ্তসার| (১১) এই তো নয়| সে সব তো গত জন্মের কথা| প্রাইমারীতে কোনদিন দ্বিতীয় হইনি| ক্লাশ টু থেকে মনে আছে| ওয়ান থেকে মানে চাটাই থেকে বেঞ্চিতে টু'তে ওঠবার সময় কি বা কেন এখন আর মনে নেই| ফাইভ থেকে অন্য গ্রামে হাই স্কুলে| আমাদের ঐ একটাই হাই| সাত গ্রামের সব ছেলে মেয়ে ঐখানে| চাষীপ্রধান গ্রাম‚ অনেকেই ঝরে পড়তো| তবু সব নতুন‚ বিভিন্ন স্কুলের দিকপাল একত্র| কমপিটিশান তো ছিলই| কুঁয়া থেকে দীঘিতে| আমার আবার প্রতিদ্বন্দিনী! বুঝুন কান্ড| সেসব শটকে'তে লিখেছি| চললো ক্লাশ এইট অবধি‚ ইয়েস প্রতিবারই রোল নং ওয়ান| তবে স্বীকার করি‚ আমার বরাবরই গৃহশিক্ষক ছিলেন| হয়তো আধা কৃতিত্ব তাঁদের প্রাপ্য| তারপর দীঘি থেকে খরস্রোতা নদীতে মানে মহকুমার স্কুলে‚ হোস্টেলে| বলে নিই‚ সর্বদা পিতাশ্রীর উপদেশ কাম খাঁড়া মাথার উপর- কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| মহকুমার স্কুলে ক্লাশ নাইনে| গিয়েছিলাম কমার্স পড়তে‚ আমার গৃহ্শিক্ষক রোল মডেল| তিনি বি কম| (পরে অবশ্য এম কম করে কে: স: চা: হন)| সাদা ধুতি জামা পরে বেলা দশটায় স্কুলে আসবো‚ হাটবারে রামপদ'র চায়ের দোকানে আড্ডা‚ এসবই লক্ষ্য| অবশ্য সুপ্ত ইচ্ছা ব্যবসায়ী হবো‚ বাপ দাদাদের ন্যায়| মুদীখানা‚ হার্ডওয়ার‚ কবিরাজী‚ অ্যালোপ্যাথিক সব মিলিয়ে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর! ছিল‚ কাপড়ের দোকানও ছিল তবে বাজারের অন্যদিকে‚ ছিলেন মুহুরীমশায়‚ পাকিস্তান থেকে আসতেন| থিয়েটারে শাহজাহান‚ কি উদাত্ত কন্ঠ্স্বর! ব্যবসায়ী হবো‚ ক্যাশবাক্সের পেছনে টাকা গুনে রবার ব্যান্ড দিয়ে গোছা করার আনন্দই আলাদা; স্বর্গীয় প্রায়| এইসব ক্যাশ রেজিটারের টিং করা till? ধ্যুস‚ তুলনা হয় নাকি! হয়নি‚ কোন আশাই পূর্ণ হয়নি| কাজের কথায় ফিরি| শহরের স্কুলে হেডমাষ্টার ইন্টারভিউ নিলেন| একটু ধরা করা ছিল‚ স্কুলের প্রেসিডেন্ট উকিলবাবুর মক্কেল আমার পিতাশ্রী| হেডমাষ্টার স্যার খুশী হয়ে বললেন‚ ঠিক আছে| পাশেই অ্যাস হেড বলে উঠলেন‚ কমার্সে নয় একে সায়েন্সে ভর্তি করুন| ব্যাস‚হয়ে গেল| কোথায় যাবো দুর্গাপুর তার বদলে ভাইজ্যাগ| সারাটা জীবন কাঁধে জোয়াল চেপে বসলো| নাইন‚ টেন অমানুষিক পরিশ্রম করেছি‚ কি না ফার্ষ্ট হতে হবে| হলামও| কি সব কান্ড‚ সদ্য বুনি ওঠা হোস্টেলমেটরা যখন‚ লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যায়‚ সন্ধে হবো হবো টাইমে ফুটবল মাঠে চক্কর কাটে‚ বিশালাক্ষীরাও(নামটা মনে আছে‚ অক্ষমের আর কি থাকে?) ঘুরঘুর করতো‚ তখন আমি 'নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো' র ব্যাখ্যা আয়ত্ত করতে বাইনোমিয়াল সিরিজের চক্করে সর্ষের ফুল দেখতে ব্যস্ত| কালীদা‚ ডেবিট ক্রেডিট মিলিয়ে কি হলো? সুড়ুৎ করে ফাঁক দিয়ে জীবনটাই চলে গেল| এখন হাতে শুধুই হেরিকেন‚ সামনে অপার অন্ধকার! আছে‚ সেই ক্লাশ ফাইভ থেকে সব মার্কশীট এখনও এতযুগ বাদেও মাষ্টার অফ ইঞ্জিনীয়ারিং এর সার্টিফিকেটের ফাইলে গুছিয়ে রাখা| সেসব বিবর্ণ সবুজ কাগজের নম্বর গুলো কেবল আছে‚ হারিয়ে গেছে জীবনটা কোন ফাঁকে! বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা‚ এগারো'র টেষ্ট পরীক্ষা অবধি জয়েন্ট এনট্র্যান্স সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম না| আমারই এক সহপাঠী তার কলকাতাস্থ কাকার এনে দেয়া ফর্মে হেডস্যারের কি সই টই বা তেমন কিছুর প্রসঙ্গে প্রথম জানকারী| আমি বরাবরই লেট লতিফ‚ অলস; বালিতে মুখ গোঁজা পার্টি| চল‚ চল চল| আরও দুই বন্ধু মিলে শিবপুরে ফর্ম নিতে| নাহ‚ ক্যাম্পাস দেখে লোভ হয়নি যে তা নয়| কিন্তু বড় শহর‚ কত কমপিটিশান- পাবো তো? পরীক্ষা দিতে কলকাতায় হেয়ার স্কুলে| সবই আঁখ ফাড়কে দেখার বস্তু| বড় বড় হোর্ডিং পাঁচমাথার মোড়ে; নিঝুম সন্ধ্যায় এর যুগ তখন| কোচিং বলে তখনকার দিনে কিছুই ছিল না; একখানা শ'দুই আড়াই পাতার বই কিনেছিলাম গত কয়েক বছরের প্রশ্নাবলী ও উত্তর| অঙ্ক ছাড়া বাকী উত্তর সব অখাদ্য| সেই কালে আবার আলাদা আলাদা কলেজে (প: ব: তে মোটে পাঁচটা ঐ জয়েন্টের আওতায়) এক পাতার ফর্ম উইথ ৫ টাকার পোষ্টাল অর্ডার দিয়ে ভরতে হতো| তখন বুঝিনি‚ কেবল শিবপুরেই ভরেছিলাম| সেটা বড় বেশী রিস্কি হয়েছিল| চোখ ফুটতে তো অভিজ্ঞতা লাগে‚ তাই না? আই আইটি'র তো প্রশ্নই আসে না‚ সময় পেরিয়ে গিয়েছিল বা কি একটা কারণে অ্যাপ্লাই করা হয়ে ওঠেনি| (না ‚ দাবী করছি না যে করলে পেতাম!) যাইহোক‚ পিঙ্ক ২৩ বাই ৫ খামে বার্তা এলো| একটু মশলা দিই‚ ভুলেই গিয়েছিলাম| পরীক্ষা বোধহয় ভালই হয়েছিল কারণ ভাইভা'তে ভূপাল কোথায় জিজ্ঞেস করাতে‚ বেশ মনে আছে‚ ' স্যার‚ নেপাল‚ ভূপাল!' ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল| বাকীটা পরে কোনদিন|
ঝিনুক
বলেছিলাম লিখব স্বপ্নশত্রুদের কথা| তারা কারা? এই ধরুন খুব একটা রোহমর্ষক‚ বা কনফিউসিং বা মন খারাপের স্বপ্ন দেখে শেয়ার করতে গেলেন কার সাথে আর সে বলা শুরু করল ঐ শুরু হল তোমার স্বপ্নের গল্প| মাথা নেই‚ মুণ্ডু নেই‚ নিশ্চয় পেট গরম| তাই না? এদের কাছে স্বপ্ন জিনিসটা একটা হাবিজাবি কিছু‚ অর্থহীন যাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই‚ আলোচনা করার কিছু নেই| সত্যি কি তাই? স্বপ্ন মানেই অর্থহীনতা না স্বপ্নের মধ্যে থাকে সম্ভাবনা? চলুন‚ আজকে দেখি কেন স্বপ্ন দেখি আমরা| বোঝার চেষ্টা করি স্বপ্নের বিজ্ঞান কে| কিন্তু তার আগে একটা গল্প হয়ে যাক‚ কেমন? এই গল্পের নায়ক আইনস্টাইন| কিশোর বয়্সে একদিন একটা স্বপ্ন দেখলেন| একটা মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর সেই মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে পালে পালে গরু| সামনেই একটা বিশাল বড় তার‚ যেমন থাকে কাঁটাতারের বেড়া সেইরকম| কিন্তু এই তার আবার বৈদ্যুতিক তার| গরুগুলো এগিয়ে আসছে তারের দিকে‚ একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন আর তারের ঐ পারে গরুদের মালিক‚ ফার্মার| হঠাৎ কি যে মাথায় আসল ফার্মারের‚ দুম করে টিপে দিল সুইচ‚ বিদ্যুত বয়ে গেল তারের মধ্যে দিয়ে আর সব গরু গুলো একই সাথে ঝটকা খেয়ে পিছিয়ে চলে এল| অনেকটা synchronised aerobatics যেমন হয়| কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেই আইনস্টানের মনে হল উনি যা দেখলেন ফার্মার সেটা দেখেন নি| ফার্মার এর চোখে একেকটা গরু একসাথে না‚ একের পর এক করে পরপর ঝটকা খেয়েছে| মানে একটা গরু উঠছে পড়ছে‚ তার পরে আর একটা এই রকম| সেই ফুটবল খেলাতে স্টেডিয়ামে লোকে যেমন ওয়েভ বানায় সেইরকম| আইনস্টাইনের মনে হল ঐ ওয়েভ ফর্মেশন দেখবে বলেই ফার্মার গরুগুলোকে শক দিল| এবারে তো স্বপ্ন ভেঙে গেল| অন্য কেউ হলে ধুরছাই কি দেখেছি বলে কাটিয়ে দিত‚ ফ্রয়েড হলে ভাবতে শুরু করত নিশ্চয় আমার মনে মনে প্রচুর গরুর মাংস খাওয়ার শখ তই এমন দেখেছি কিন্তু আইনস্টাইন তো আইনস্টাইন| উনি সবকিছুতেই ফিজিক্স দেখতেন‚ ভাবলেন এ স্বপ্ন যখন দেখেছি এরমধ্যে নিশ্চয় কোন ফিজিক্সের প্রবলেম আছে যেটা আমাকে সলভ করতে হবে আর এই ভাবেই তৈরী হয়ে গেল! কি ? ঠিক ধরেছেন "Theory of Relativity"‚ যেহুতু উনি আর ফার্মার object এর থেকে ভিন্ন দূরত্বে‚ তাই আলো এসে পৌঁছবে ভিন্ন সময়ে ‚ তাই হতেই পারে দুজনে একই জিনিস দেখবেন না| এবারে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে কি? মনে হচ্ছে কি শুধুই পেট গরম বলে স্বপ্নকে অগ্রাহ্য না করাটাও একটা অপশন| থাকতে পারে স্বপ্নের কোন মানে‚ খুলে দিতে পারে কোন সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি অথবা হয়ে উঠতে পারে কোন যুগান্তকারী আবিষ্কারের জনক? চলুন‚ দেখি আমরা স্বপ্ন দেখি কেন| আজকের এই পর্ব এই নিয়েই| স্বপ্ন দেখি কেন আমরা? {/x2} {x3} ১) আকাঙ্খা পূরণ এই থিয়োরি ফ্রয়েড সাহেবের| ওনার মতে যা কিছু অপূর্ণ আকাঙ্খা‚ সেগুলোকেই আমরা স্বপ্নে দেখি| খুব করে বিরিয়ানি খাচ্ছেন স্বপ্নে‚ বা গপাগপ রসগোল্লা মুখে পুরছেন? তার মানে আপনার অনেক্দিন থেকে ওগুলো খাওয়ার খুব সখ| হঠাৎ স্বপ্নে দেখলেন পাখির মত উড়ে চলেছেন? ওটাও মনের অপূর্ণ আকাঙ্খা আপনার যেটা কোনদিনই পূর্ণ হওয়ার না| কোন সুন্দরী মহিলা (বা পুরুষ) এর সাথে স্বপ্নে ঘুরছেন বা আরো কিছু দুষ্টুমি করছেন? ঐ একই ব্যপার| এতদূর অবধি তো ঠিক ছিল| কিন্তু লোকে ছাড়বে কেন? তেড়ে এল ফ্রয়েড সাহেবকে | তাহলে আমি স্বপ্নে কেন দেখলাম আমার মা মারা গিয়েছে? তুমি কি বলতে চাও আমার মনের ইচ্ছে আমার মা মরে যাক? কি ঠিক কিনা? এরকম স্বপ্ন তো আমরা অনেকেই দেখি‚ মন খারাপ করি‚ ফোন করে মায়ের খবর নেই সব ঠিক আছে কিনা| মা মরে যাক এতো কেউ চাই না? তবে? ফ্রয়েড সাহেব বললেন - আরে মরে যাক চাও না ঠিকই কিন্তু মায়ের অস্তিত্বের সাথে কোথাও তোমার কনফ্লিক্ট আছে| এমন কোন সমস্যা আছে তোমার যেটা তুমি ভাবছ মা না থাকলে সমাধান হয়ে যাবে ‚ তাই এই স্বপ্নটা দেখেছ| কিন্তু কে মানবে বলুন এটা? তো এবারে আসরে নামলেন আরো একজন‚ তার নাম কার্ল জাং| উনি একটু অন্যরকম বললেন| বললেন এই সব অম্পূর্ণ আশা আকাঙ্খার গল্প ভুল‚ আসলে প্রতিটা স্বপ্নই আমাদের একটা সমস্যা যার কোন সমাধান নেই তার দিকে ইঙ্গিত করে| স্বপ্ন গুলো বোঝায় আমাদের কি দুস্চিন্তা বা কি আবেগজনিত সমস্যা বা কি ভয়| যেমন ধরুন দেখলেন চাকরীটা চলে গিয়েছে তার মানে আপনার মনের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে আপনাকে ছাড়াও কাজটা হয়ে যেতে পারে‚ আপনি essential নন| এই যে আপনার মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ধারণা আছে‚ সেটাকে এবার জাগিয়ে তুলল স্বপ্ন| এবারে আপনি না বসে থেকে সেটা নিয়ে কাজ করুন| নিজের স্কিল আপডেট করুন বা বসকে তেল দিন বা নতুন চাকরী খুঁজুন| অথবা ধরুন স্বপ্নে দেখলেন আপনার বিবাহিত প্রেমিক চুটিয়ে বৌ এর সাথে প্রেম করছে| ওমনি তার উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে নিজেকে জিগ্যাসা করুন| কি এমন করেছেন আপনি যে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন? হয়ত উত্তর পেয়ে যাবেন‚ শুধরে নেবেন নিজেকে| {/x3} {x4} ২) অ্যাক্টিভেশন - সিনথেসিস থিয়োরি এটা বোঝার আগে চলুন বুঝি আমরা ঘুমাই কি করে| আমরা সব সময় কিন্তু গভীর খুব ঘুমাই না| ঘুমের একটা ফেজ থাকে যাকে বলে REM স্টেজ অর্থাৎ কিনা rapid eye movement ফেজ| এইসময় চোখের পাতা পিটপিট করে| এই REM ফেজ আপনার পুরো ঘুমের প্রায় এক চতুর্থাংশ সময় জুড়ে চলে কিন্তু একটানা নয়| কখন আপনি গভীর ঘুমে ‚ তারপরে REM‚ আবার গভীর ঘুম‚ REM এই রকম| মোটামুটি ৪-৬ বার রাতের ঘুমে আপনি REM ফেজে থাকেন| এবারে দেখা গিয়েছে যে REM ঘুমের সময় কাউকে ডেকে তুললে প্রায় ৯৫% কেসে তারা বলে স্বপ্ন দেখছিল কিন্তু গভীর ঘুম থেকে ডেকে তুললে মাত্র ১০-১৫% কেসেই লোকে বলে স্বপ্ন দেখছিল| সেই থেকে ধারণা করা হয় যে আমরা স্বপ্ন দেখি REM এর সময়েই| কিন্তু কি হয় এই REM stage এ? এই সময় আমাদের ব্রেন কিন্তু ঘুমিয়ে থাকে না| সজাগ থাকে ব্রেনের কিছু অংশ যেগুলোর নাম amydala আর hippocampus| এদের কাজ আপনার অনুভূতি‚ আবেগ‚ স্মৃতি এগুলো নিয়ে| এবারে হচ্ছে কি আপনার সেই চোখ পিটপিট ঘুমের সময় এরা কাজ করে চলেছে‚ এরা যখন সিগন্যাল দিচ্ছে ব্রেন তো চুপ করে বসে থাকতে পারে না‚ ব্রেন সিগন্যালগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে‚ কিছু একটা মানে দেওয়ার চেষ্টা করে আর সেগুলই আপনার স্বপ্ন হয়ে আসে| কিন্তু পুরো ব্রেনটা তো কাজ করছে না‚ করছে দুই তিনটে পার্ট‚ বাকি পার্টগুলো ঘুমিয়ে‚ সুতরাং এই যে ব্রেন একটা গল্ম্প বানাচ্ছে সেটা কিরকম গল্প হবে? একদম ঠিক ধরেছেন‚ জগা খিচুড়ি গল্প| একের সাথে অন্যের সম্পর্ক নেই - উদ্ভুতুরে| হয়ত বাড়ির মধ্যে বাঘ চলে এল‚ কিংবা সাহরা মরুভুমিতে আমাজন বয়ে চলেছে এইরকম আর কি| অর্থাৎ কিনা এই থিয়োরি যদি মানেন তাহলে স্বপ্ন নিয়ে এক্দম ভাবনা চিন্তার দরকার নেই‚ all trash| কিন্তু কিন্তু পেট গরমের জন্য স্বপ্ন দেখছেন না কিন্তু| কি গরম হয়েছে বলুন তো? হু‚ ঠিক - amydala আর hippocampus| ৩) স্মৃতি থেকে আবর্জনা তাড়ান এই থিয়োরীতে যারা বিশ্বাস করেন তাঁরা ঐ স্বপ্নশত্রুদের দলভুক্ত| এদের মতে সারাদিন আমাদের ব্রেন অনেক কিছু পিক করে যার অনেকটাই আবর্জনা| অনেকটা কম্পিউটারের মত| যখন পিক টাইম নয় তখন যেমন কম্পিউটারের consolidation jobs গুলো চালান হয় ‚ যে তথ্যগুলো আর জরুরী নয় সেগুলোকে ঝেড়ে ফেলা হয়| এই থিয়োরীর মতে এই ভাবেই আমাদের স্বপ্নগুলো হচ্ছে সেইসব অপ্রয়োজনীয় তথ্য যেগুলো নিয়ে ব্রেনের আর কোন কাজ নেই| ব্রেন একের পর এক informaiton process করে‚ আর বাজে information গুলো discard করে‚ আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| অর্থাৎ কিনা‚ স্বপ্ন মানেই বাজে ‚ আবর্জনা - ব্রেন যেগুলোকে মাথা থেকে বের করে দিচ্ছে - সেগুলো নিয়ে একটুও মাথা ঘামাবেন না| {/x4} {x5} ৪) মেমরি কনসোলিডেশন এই মতে যারা বিশ্বাসী‚ তাদের মতেও আমদের ব্রেন কম্পিউটারের মত কাজ করে এবং ঘুমিয়ে পড়লে শুরু হয় ব্রেনের consolidation এর কাজ| কিন্তু এরা বিশ্বাস করেন না‚ স্বপ্ন মানে অপ্রয়োজনীয় তথ্য| এনাদের মতে স্বপ্ন হল ব্রেনের সেই প্রসেস যখন ব্রেন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যগুলোকে consolidate করছে আর জমিয়ে রাখছে permanent storage এ| অর্থাৎ কিনা‚ সারাদিনে যে সমস্ত টুকরো টুকরো তথ্য আমাদের ব্রেনে জামা পড়েছিল‚ সেগুলৈ আরো প্রাসারিত হয়ে জমা পড়ছে আর তারই এক ঝলক আমাদের স্বপ্ন| যেমন ধরুন ট্রমার রোগীরা| এনারা ঘুমালেই ট্রমার স্বপ্ন দেখেন‚ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন‚ তাই ট্রমার রোগীদের জোর করে জাগিয়ে রাখা হয়| ঘুমিয়ে পড়লেই ব্রেনের consolidation job শুরু হয়‚ ট্রমার টুকরো টুকরো ছবির ডট গুলো connected হয়ে তৈরী হতে থাকে পুরো ঘটনাটা‚ play করতে শুরু করে স্বপ্নে আর তাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন রোগীরা| এই থিয়োরী বলে‚ তাই স্বপ্ন আমাদের শেখায়‚ যা কিছু active stage এ আমরা বুঝতে পারি না বা সময় পাই না‚ REM stage এ সেই তথ্যগুলোর মানে বুঝি আমরা যাতে আগামী দিনে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ করতে পারি| {/x5} {x6} ৫) রিহার্সাল এবং সিমুলেশন একটু ডাইগ্রেস করি‚ কেমন? কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম ১৭ লাখ টাকা ক্যাশে বিছানার উপর রেখে‚ ঘর বন্ধ করে কোথায় যেন একটা গিয়েছি| ফিরে এসে দেখি‚ কি একটা কারণে সোসাইটির সেক্রেটারি ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকেছিল| আর টাকা? সে একটাও নেই| ভদ্রলোকের নাম নাকি সম্বিত পাত্র| এই নাম জীবনেও শুনি নি| তাকে গিয়ে বারে বারেই বলছি টাকাগুলো কি করলেন‚ ফেরত দিন আর সে বলছে সব স্টক মার্কেটে লাগিয়েছি - লস হয়ে গিয়েছে| ধনে প্রাণে শেষ ভেবে আতঙ্কে কেঁপে উঠতে উঠতে একটা সময় যখন বুঝলাম - এটা স্বপ্ন‚ তখন ওঠার সময় হয়ে এসেছে| উঠেই দেখি ফেসবুকে সম্বিত পাত্র নামে বিজেপির একটা লোককে নিয়ে খুব খবর| সে নাকি NDTV নিয়ে কিসব ফেক খবর দিয়েছে‚ তাই নিয়ে জোর আলোচনা| অদ্ভুত না? লোকটার নামও শুনিনি এর আগে| সে যাক গে‚ এই রকম টাকা চলে গেল বা কেউ আপনাকে মারতে আসছে আর অপনি ঊর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছেন আর ওরা এগিয়েই আসছে কিংবা ট্রেন ধরতে ছুটছেন আর কিছুতেই ট্রেন ধরতে পারছেন না -এইরকম স্বপ্ন দেখেন তো? খুব কমন এই রকম স্বপ্ন| বছরে প্রায় ৩০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে নাইটমেয়ার দেখি আমরা| এখান থেকেই এলো থ্রেট সিমুলেশন থিয়োরী| এই থিয়োরীর মতে আমরা সবসময়েই কিছু ভয়‚ আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাই| এই যদি আমাকে কেউ খুন করে ফেলে? বা কেউ যদি আমার টাকা পয়্সা হাতিয়ে নেয়? বা ট্রেন বা প্লেনটা যদি মিস করি? তা এইসব থ্রেট গুলো সত্যি যদি আমাদের সামনে এসে পড়ে কি করব? বাঁচার জন্য কি হবে স্ট্র্যাটেজি? সেগুলোর একটু practice চাই তো যাতে সত্যিকারের ঘটনার সামনে হতভম্ব না হয়ে পারি? আপনার দেখা স্বপ্ন গুলো আর কিছুই না‚ ব্রেনের সেই practice| যা যা কিছু আপনাকে ভীত করে‚ আতঙ্কিত করে - সেই গুলোর বিরূদ্ধে রক্ষা পাওয়ার স্ট্র্যাটেজি যখন ব্রেন প্র্যাকটিস করে‚ তাই নাইটমেয়ার হয়ে আসে| ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালান হয়েছে‚ তাদেরকে REM stage এ ঘুমতে না দিয়ে| দেখা গিয়েছে এইসব ইঁদুরেরা আক্রান্ত হলে বেসিক প্রতিরক্ষা করারো চেষ্টা করে না‚ পুরো পাজলড হয়ে যায়| বুঝতে পারছেন তো এবার নাইটমেয়ারও ফেলনা জিনিস না? ৬) প্লেয়িং ডেড ছোটবেলায় আপনারা সবাই বোধহয় শুনেছেন| কি বলুন তো? হঠাৎ করে সামনে যদি ভালুক এসে পড়ে কি করবেন? হুম‚ একদম মরার মত শুয়ে থাকবেন তো? ভালুক এসে গন্ধ শুঁকে চলে যাবে? যদিও ভালুকের ব্যপারটা পুরোটাই গল্প animal world এ আত্মরক্ষার্থে এই মরা সাজার ব্যাপরটা চলে আর কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন অনেক অনেক বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদেরও এই টেকনিকটা ব্যবহার করতে হত| সেই থেকেই এটা আমাদের মজ্জাগত‚ তাই আজও ঘুমিয়ে পড়ে ব্রেন সেই মরা সাজার প্র্যাকটিস করে‚ যখন শরীরের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্থির‚ শুধু কাজ করে চলেছে ব্রেন| {/x6} {x7} ৭) ইমোশনের সিম্বোলিক অ্যাশোসিয়েশন এটা দিয়েই শেষ করব| স্বপ্নের দার্শনিক ত্বত্ত এটা| এর মতে আমাদের সকলের জীবনের যে দু:খ‚ হতাশা চরমতম ব্যথার যে অনুভূতি সেগুলোকে আমরা একটা বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে‚ একটা দার্শনিক অর্থের সাথে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করি‚ যাতে আমাদের কষ্টের লাঘব হয়| যেমন ধরুন প্রেমিক খুব বড় ধোঁকা দিয়েছে‚ বুক ভেঙে যাচ্ছে‚ নিজেকে বোঝালেন একা এসেছি‚ একাই তো যেতে হবে‚ কে কার| এই যে দার্শনিক তথ্য আপনার মনের মধ্যে আসছে এর মাধ্যমে আপনি মানসিক যন্ত্রণার উপশম খুঁজছেন| রেপ ভিক্টিমদের একটা স্বপ্ন নাকি বারে বারে আসে| এক সমুদ্রের ধারে বসে আছেন‚ একটা বিশাল ঢেউ এসে তাকে ডুবিয়ে দিয়ে গেল| উনি কিন্তু ওনার ট্রমাটা দেখছেন নে‚ দেখছেন সেই দু:খ কষ্টের একটা সিম্বোলিক ছবি‚ একটা বৃহত্তর জীবন দর্শন যা তাঁকে ট্রমা ভুলে থাকতে সাহায্য করছে| সোজা কথায়‚ স্বপ্ন মানসিক যন্ত্রণায় থেরাপির কাজ করে| এবারে আর একটা বিখ্যাত স্বপ্নের গল্প বলে ছুটি নেব| ব্যাণ্ডের নাম - Beatles গান - Yesterday| লেখক - McCartney| উইম্পল স্ট্রীটে গার্লফ্রেণ্ডের বাড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন আর স্বপ্নেই এল এই গানের সুর| তাড়াতাড়ি বসে গেলেন পিয়ানো তে সুরটা তুলতে যাতে ভুলে না যান| তারপরও কিছুতেই বিশ্বাস হয় না| বারে বারেই মনে হচ্ছে নিশ্চয় এই সুর কোথাও শুনেছেন‚ তাই স্বপ্নে এসেছে - এখন এই সুর বাজারে ছাড়লে তো লোকে চোর বলবে| জনে জনে সেই সুর শুনিয়ে জিগ্যেস করেন কেউ শুনেছে কিনা‚ কেউ বলতে পারে না| তারপর মাসখানেক যাওয়ার পরও যখন কেউ এগিয়ে এল না‚ তৈরী হল গানের লিরিকস‚ তৈরী হল Yesterday| শুনুন তাহলে গানটা? {/x7} {x0i}dream0.jpg{/x0i} {x1i}dream1.jpg{/x1i} {x2i}dream2.jpg{/x2i} {x3i}dream3.jpg{/x3i} {x4i}dream4.jpg{/x4i} {x5i}dream5.jpg{/x5i} {x6i}dream6.jpg{/x6i} {x7v}https://www.youtube.com/watch?v=Ho2e0zvGEWE{/x7v}
Subarna
Bদেশ আমার কাছে আলুনি, Aদেশের তুলনায়। নেচারটুকু, আর সিস্টেমস, আর পরিচ্ছন্নতা বাদ দিলে পুরো মিয়ানো মুড়ি, ধুত্তেরি! সেখানে সবকিছুই কেমন খাপে খাপ! বেনিয়মের জায়গা নেই। ভালো লাগে? আর আমার দেশে? যেদিকে চোখ-কান যাবে, সেদিকেই কিছু না কিছু ছাই-চাপা পরশপাথর। তারপর আছে নাইটির সাথে গামছা, স্কিনটাইট প্লে-বয় টিশার্ট আর কেপ্রির সাথে খোঁপা অথবা টিপ, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় স্টিলেটো। আরো কত কত বেনিয়ম! দুচোখ ভরে দেখি আর ধপাস ধপাস প্রেমে পড়ে যাই। তবে পরশপাথরের ব্যাপারই আলাদা! পেটে কেমন বুড়বুড়ি করছে। বলেই ফেলি। ** পরশপাথর ১ ** দুই বুড়ো। বয়স আনুমানিক সত্তরের উপরে। এক সুপারহিট সমুদ্রতীরের সৈকতসরণী ধরে খানিক এগোলেই দেখা পাবেন। অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় দুজনে ব্যস্ত হয়ে গুছাচ্ছেন। অপটু হাত। জিনিসপত্র সাজিয়ে গুছিয়ে হাজার এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে অসম যুদ্ধে নেমে পড়বেন একটু পরেই। একজন একটু দুর্বল বয়সের ভারে। আর একজন সতেজ। কিন্তু একটা ব্যাপার দুজনের এক। চোখে মুখে উৎসাহের হাসি। বাচ্চার নতুন খেলনা পেলে যেমন করে, পসরা নিয়ে তাঁরাও ঠিক তেমনই। নজর অন্য কোনদিকে নেই। একাগ্রচিত্ত। এনারা হকার। ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। জানি না, হয়ত সংসারে নিজেদের দায় এখনো নিজেরাই বইতে চান, হয়ত সাহায্য করতে চান, বা হয়ত নিছক বিনোদনের জন্য এনারা গর্বের সাথে হকারি করেন। ** পরশপাথর ২ ** সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ দেখছি। অনুভব করছি, সব মানুষের উচিৎ মাঝেমাঝেই এরকম জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকা। এই অসীম ব্যাপ্তির সাথে থাকতে থাকতে মনের ফ্ল্যাট কখন টুবেড থেকে থ্রিবেড হয়ে ফোরবেড হয়ে যাবে, টেরও পাওয়া যাবে না। বাসযোগ্য হয়ে যাবে ধরাধাম। পাশে এসে বসল এক বৃদ্ধা। সবুজ ডুরে সস্তা শাড়ি। পেতে আঁচড়ানো তেল দেওয়া চুল। আধখাওয়া সামনের দাঁত। হাতে পুঁতির সস্তা গয়নার অল্প আয়োজন। "নেবে মা?" কথা বলার মুডে ছিলাম না। মাথা নেড়ে না বললাম। মহিলা গেলেন না। হাতের ছোট ট্রে সামনে নামিয়ে রাখলেন। ওসবে উৎসাহ বিশেষ নেই, তবু কি মনে হল, নেড়েচেড়ে দেখে তিন-চারটে জিনিষ পছন্দ করলাম। মহিলা প্যাকেটে ভরে, দাম বললেন। এরপরেও বাঙ্গালী কথা বলবে না, হয়? একদম দরদাম করতে পারি না। বেশ লজ্জা লজ্জাই লাগে। তাই, একটু হেসে দশটাকা কম বললাম। যদিও পুরো টাকাটাই ব্যাগ থেকে বার করেছি। এরপরেই অপ্রত্যাশিতভাবে ঝটকাটা এলো। মহিলা আমার দুই গাল টিপে আধখাওয়া দাঁত বের করে হেসে বললেন, "ক'টাকা আর লাভ রে মা?" এই বুড়ো বয়সে তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর কমে ঝট করে কোন এক ভালোলাগার কৃষ্ণগহ্বরে চলে গেলাম নিমেষে, যেখানে গাল টিপে কেউ হয়ত আদর করত কখনো। চলে গেলেন পয়সা নিয়ে, আমাকে আজন্ম ঋণী রেখে। পিছনে। ** পরশপাথর ৩ ** বাসে যাচ্ছি। পিছনে বসে এক দম্পতি, কোলে বাচ্চা। সে বাচ্চা বকে বকে মাথা খেয়ে ফেলার জোগাড়। তখনই এক ঝলক ঝোড়ো হাওয়া। বাস লেকটাউনে। মহিলাঃ দ্যাখো! কি সুন্দর বানিয়েছে, না? পুরুষঃ হ্যাঁ, লন্ডনে আছে এরকম। আইফেল টাওয়ার। দম্পতির অলক্ষ্যে কপাল চাপড়ালাম। ইশ! এতো কম জানে! ওটা আইফেল টাওয়ার?!!! পরক্ষণেই ভাবলাম, আমি তো কত্ত জানি! কি লাভ হল? সেই তো একই বাসে চড়ে, সিট পাব কি পাব না-র লটারিতে যোগ দিচ্ছি। আইফেল টাওয়ার যে জার্মানিতে, আর লেকটাউনের মোড়ে ওটা যে লন্ডনের LTP, তা জেনে আমি কি তীর মারলাম জীবনে? (যারা LTP বুঝল না, তাদের জন্য - ওটা লিনিং টাওয়ার অফ পিসা রে বাবা!!) :P
দীপঙ্কর বসু
রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কিত আমার বর্তমান অলোচনার সূত্র ধরে উঠে এসেছে রবীন্দ্রোত্তর যুগের এক শক্তিমান গীতরচয়িতাসুরকার সলিল চৌধুরী রচিত এবং সুরারোপিত “মরি হায় গো হায়” গানের সুরের প্রসঙ্গ| সলিল চৌধুরীর এই গানএর সুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের সুরের কিছুটা সাজুয্য খুঁজে পান কেউ কেউ ‚বিশেষত সলিইল চৌধুরীর তিন স্তবকে রচিত গানটির অন্তরা দুটির শেষ লাইন গুলিতে বরে বারেই রবীন্দ্রনাথের তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী গানের বহিয়া যায় বা চৌদিকে মোর প্রভৃতি অংশের সুরের সুস্প্ষ্ট আবির্ভাব ঘটতে দেখা যায়|সলিল চৌধুরীর আলোচ্য গানটির মৌমাছিরা পরাগ দলে দলে বা ছিন্ন পালে ভাঙা হালে অংশগুলির সুরে| কান পেতে শুনলে গানের আরো কিছু কিছু সুরের মিল পাওয়া যেতে পরে|নিশ্চিত ভাবে বলতে পারিনা তবু মনে হয় সলিল চৌধুরী অলোচ্য গানের সুরের প্রেরনা হয়ত পেয়েছিলেন পূর্বসুরির গানের সুর থেকে|যদিও‚ যে অসামান্য নৈপুণ্যে মরি হয় গো হায় গানটিকে সুরের জলে বেঁধেছেন এবং রবীন্দ্রনাথের সুরের আদলের সঙ্গে কিছুকিছু মিল সত্বেও নিজের গানের সুরে নিজস্বতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তা সলিল চৌধুরীর সুরসৃজন ক্ষমতারই সাক্ষ্য বহন করে| গানদুটির সুরের বিশ্লেষন করার আগে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে‚ তুমি কেমন করে গান কর হে এবং মরি হায় গো হায় দুটি গানই মিশ্র খাম্বাজের সুরে নিবদ্ধ|কাজেই খাম্বাজ রাগের স্বর কাঠামোর( যাকে উল্লিখিত বন্ধু combination of notes বলে উল্লেখ করেছেন) আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা| আবার‚ যে কোন রাগেরই স্বরকাঠামোর মধ্যেই থাকে অসংখ্য স্বরগুচ্ছ বা combination of notes সম্ভাবনা|আর সেই সব স্বরগুচ্ছের কুশলী প্রয়োগের ফলেই একই রাগে নিবদ্ধ বিভিন্ন গানের সুর এ আসে বৈচিত্র| আলোচ্য গানদুটির সুরবৈচিত্রের মূলেও আছে এই প্রথমিক সংগীতত্বটিই| তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী আমি অবাক হয়ে শুনি ‚কেবল শুনি এগানে যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে সেই অনাহত সঙ্গীতের প্রতি গীতিকার রবীন্দ্রনাথের ভক্তি মিশ্রিত বিমুগ্ধতা মিশ্র খাম্বাজের সরলরৈখিক সুরে ধরা দিয়েছে|পক্ষান্তরে সলিল চৌধুরীর গানটিতে প্রেমাস্পদকে কাছে পাওয়ার আনন্দের সঙ্গে তাকে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্যের ডালি সাজিয়ে বরণ করে নিতে না পারার আর্তি | স্বভাবতই সে আর্তির সুরের মেজাজ আলাদা| মরি হয় গো হয় এলে যখন আমার ভাঙাঘরে শুন্য আঙিনায়. যেমন গানের প্রথম লাইনেই হায় শব্দটির দুই অক্ষরের মাঝে দীর্ঘ চোদ্দো মাত্রারব্যপী সুরের প্রবাহে গানের কোন কথা নেই |ফলে গনের সুরে অনেকটই স্পেস তৈরি হয়েছে যে স্পেসে মা ধা - ণা | সরসা ধা ণা পা |ধা - - -| স্বর গুলি যেন ভারহীন শরতের মেঘের মত সুরের আকাশে ভেসে চলেছে| সুরের এই পরিকল্পনার ছাপ গানটির অন্যত্রও পাওয়া যায় ‚যেমন অন্ত্রার ধরতাইটাকে লক্ষ্য করা যক| "যখন আমার ঝরা মালায়" অংশের সুরে ঝরা মালা শব্দ দুটিকে গাঁথা হয়েছে পা সা সা গা পা স্বরগুচ্ছে| শুধু গা ও পা স্বরদুটির মাঝে মধ্যম স্বরটির অনুপস্থিতি যেন ভিন্নতর কোন রাগের ছায়পাত মুহুর্তের জন্য ঘটিয়ে আবার মিলিয়ে যায় | এও এক অপূর্ব সৃষ্টিলীলা | এই রকম সুরের বৈচিত্রের সমাবেশে সুরটি নিজস্ব স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে | একই সুরের কাঠামোয় নতুন ধরনের চলন আমদানি করে সুরের প্রকৃতিতে নতুনত্বের সংযোজন করার কৌশলটি রাবীন্দ্রনাথের নিজের গানেও বহু বার ব্যবহার করেছেন |উদাহরন স্বরূপ তিনটি গানের উল্লেখ মাত্র করে এ পর্বে যবনিকাটানি| বিস্তারিত আলোচনা আবার কখনও হবে|যে তিনটি গানের কথা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে সেগুলি হল আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় ‚ গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ এবং বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা |
শিবাংশু
দুচার দিন আগের কথা। দুপুরবেলা, নিউ দিল্লি ইশটেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম। অরবিন্দ মার্গে জ্যামের ঠিক নেই তাই ছত্তরপুর থেকে সময়ে পৌঁছোবার তাড়ায় বেশ খানিকটা আগেই চলে আসা। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে চুয়াল্লিশ। কিন্তু হাওয়া বইছে টাটার পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেস ছোঁয়া। বাতানুকূল অপেক্ষাশালার দোরগোড়ায় এক ভদ্রলোক বিপন্নমুখে খাতা নিয়ে বসে আছেন। পি এন আর নম্বর দিতে গেলে তিনি ম্লান হেসে বলেন, দরকার নেই। -কেন? -ভিতরে ঢুকতেই পারবেন না... উঁকি মেরে দেখি ভিতরে ১৯৪৭শের সেপ্টেম্বর মাসে শিয়ালদহ প্ল্যাটফর্ম। এতোজন মানুষ, তাদের লটবহর, ঘামক্লান্তিদীর্ঘশ্বাস কী করে ধরে রেখেছে ঐ ঘরটা? বিস্ময়। শ্বাসরোধী ভিড় আর অবর্ণনীয় আর্দ্র তাপে ফুটছে চারদেওয়াল। ঢুকিনা। প্ল্যাটফর্মেও কোথাও বসা দূরস্থান, দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। মেঝেতে কাগজ পেতে সপরিবার যাত্রীরা কুকুরকুণ্ডলী হয়ে পুড়ে যাচ্ছেন রোহিলাখণ্ডের তপ্ত বাতাসে। এদিকওদিক চোখ চালিয়ে দেখি একটি দেওয়াল সংলগ্ন সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটি পরিবার বসে আছেন। স্বামীস্ত্রী আর দুটি শিশু। মাঝখানে আরেকটি বসার জায়গা আছে। সেখানে কয়েকটি খালি জলের বোতল ফেলে রাখা আছে। ব্রাহ্মণী বলেন তিনি বোতলগুলি সরিয়ে সেখানেই একটু বসছেন। আমি গিয়ে কতো নম্বরে আমাদের গাড়ি আসবে ইত্যাদি, যেন দেখে আসি। আমি প্যাঁটরাগুলি সেখানে রেখে খোঁজ করতে বেরো'ই। মিনিট পনেরো পরে গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে অকুস্থলে এসে দেখি সেই পরিবারের কর্তাটি আমার ব্রাহ্মণীর উপর প্রচণ্ড চেঁচামিচি করছেন এবং ঐ খালি জলের বোতল গুলো সরিয়ে বসতে চাওয়ায় তাঁকে প্রায় মারতে যান আর কী? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে ঐ বোতলগুলো নিয়ে তাঁর 'বাচ্চারা খেলছে'। তাই তিনি জায়গা থাকা সত্ত্বেও কাউকে বসতে দেবেননা। জাতবিহারি হিসেবে এসব ছিঁচকে দাদাগিরি'র ওষুধ আমি জানি। কিন্তু সেই ভদ্রলোক চেঁচাচ্ছিলেন বাংলাতে। হ্যাঁ, মোদের গরব, মোদের আশা। চারদিকে বাংলা শুনতে পাবো বলেই তো সারা দেশ ছেড়ে এই মূহুর্তে আমার বঙ্গদেশে থাকতে আসা। তখন কিন্তু সেই ভাষাই আমাকে রীতিমতো বিমর্ষ করে ফেললো। তবে বিশেষ অবাক হলুম না। সত্যি কথা বলতে কি, সারাদেশে অবিরত ঘুরে বেড়াবার অভিজ্ঞতা আমায় শিখিয়েছে ভালো করে বিচার না করে তথাকথিত 'বাঙালি'দের সঙ্গে তৎকাল বাংলায় কথা বলাটা অনেক সময়েই বিড়ম্বনা ডেকে আনে। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আমার ব্রাহ্মণী তাঁকে বাংলাতেই বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন এবং তিনি ততোধিক উত্তপ্তভাবে তাঁকে প্রায় শারীরিকভাবে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন আমাকেও আসরে নামতে হলো। বাংলাতেই। তাঁর বক্তব্য হলো তিনি গত চারঘন্টা ধরে ঐ বেঞ্চিটিতে বসে আছেন। তাই তিনি আর কাউকে কিছুতেই বসতে দেবেননা। এই বলে নিজে অকারণ সম্প্রসারিত হয়ে যথাসম্ভব জায়গা অধিকারের চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এসব ক্ষেত্রে আমরা মুখের থেকে হাতের ব্যবহারে অধিক বিশ্বাসী। নির্বাচিত ভোজপুরি খিস্তিসহ চতুর্দশ পুরুষের ঘুমভাঙানো যেসব ক্রিয়াকলাপে আমরা অভ্যস্ত, সেই মুষ্টিযোগ তো কদাপি কোনও 'বাঙালি'র প্রতি প্রয়োগ করিনি। জানিওনা কীভাবে করবো? ব্রাহ্মণী আমার সেই রূপ দেখেছেন অনেক। চোখের ইশারায় অনুরোধ করলেন রিয়্যাক্ট না করতে। সামলে নিলুম। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। তাঁদের সামনে লোকটিকে সমুচিত শিক্ষা দেবার ইচ্ছে বলপূর্বক সম্বরন করতে হলো। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বইটিতেই মনোনিবেশ করলুম। আধঘন্টাটাক পরে তাঁদের গাড়ির সময় হলো। আমাদের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি হানতে হানতে বিদায় হলেন তাঁরা। ঐ চত্বরে যতো বসার জায়গা ছিলো, সবগুলিতেই অগণিত মানুষ আসছেন, বসছেন, উঠে যাচ্ছেন। কোনও রকম গা'জোয়ারি, জবরদস্তির দৃশ্য নেই। সারাদেশের লোক রয়েছেন সেখানে। পঞ্জাবি, বিহারি, রাজস্থানি। তথাকথিত গোবলয়ের 'অসংস্কৃত', 'অমার্জিত' লোকজন সব। কিন্তু ন্যূনতম ভদ্রতার ব্যাঘাত নেই কোথাও। 'বাঙালি'য়ানার এই রূপটি প্রবাসী হিসেবে আমাদের খুব অচেনা নয়। এরকম একটি অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা আমার ব্রাহ্মণীকে বেশ অপ্রতিভ করেছিলো। আমাকে বললেন, -তুমি ঠিকই বলো! এই ভুল আর করবো না। -মানে? -বাঙালি দেখলেই আগ বাড়িয়ে বাংলা বলা....
মানব
ব্যাজার মুখ করে কত কাজ করিয়াছি, দুঃখের সাথে মাথার উপর থেকে ঘাম শুধু ঝরে পড়ে পায়ের উপরে পাত্তা দিইনা আমি, নিজেরেই কষিয়াছি সজোর সপাটে স্বামী থেকে আসামী, সই ও তো করিয়াছি ডিভোর্স পেপারে হয়ে গেছি নির্বোধ এক, ওনারা যে মজাই লোটেন বুঝতে পারিনি তাই ছুটে রোজ যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন সেখানেই গেলে ভাবি খুঁজে পাব পথের দিশা যাহা বলে শিরোধার্য, যেমতি বাপের চাকর পুরনো মনিবের হোক কেন যতই দুর্দশা পালাতে না পারে তবু বাবুদের করে দিয়ে পর তেমনি দেখি সেথা বারে বারে, বর্বরতা, ভাবি "বাবুরা তো এম'নি চলেন" পরদিন সব ভুলে তাই চলে সেই যাই, আমাদের হাঁদারাম লেন। দিনশেষে সন্ধ্যা আসে ঘটেনাকো অঘটন কেন যে; ওনাদের মনোভাবে পড়েনাকো খিল রাত হয় বেড়ে চলে ঘ্যাঁটঘ্যেঁটে শরীরের ওজন খোলা চোখ হয়ে পড়ে বড়ই কাহিল সবাই ঘুমাতে যায়, আমাকেও যেতে হবে ছেড়ে, এই খাতা পেন শুধু পড়ে রবে, একা এই ভবে, বিধাতার হাঁদারাম লেন।
মনোজ ভট্টাচার্য
এক পেয়ালায় হাজার দিন ! তুং সান শহরে তি শী নামে এক শুঁড়ি ( মদ্য প্রস্তুত কারক ) নানা ধরনের মদ তৈরী করতে পারত ! তার মধ্যে থাকত নানারকম আয়ুর্বেদ মিশ্রিত এক ধরনের মদ - যেটা কিনা এক পেয়ালা খেলে এক হাজার দিন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে ! ওই অঞ্চলেই আরেকপ্রান্তে শুয়ান শী নামে এক পাঁড় মদ্যপ থাকত l সে তিএর তৈরী সেই বিশেষ মদ পান করার জন্যে দোকানে গেল l এক পেয়ালা চাইল পান করতে l ' - এই মদ তো এখনো জ্বাল দেওয়া হয় নি ! ' - দোকানদার তি বলল : ' এই অবস্থায় একটুও তোমায় দেওয়া উচিত হবে না !' ' – আরে - যা হয়েছে তারই অন্তত এক পেয়ালা দাও' - লিউ কাতর ভাবে অনুরোধ করলো l লিউএর ঐরকম বায়নায় - তি নিরুপায় হয়ে এক পেয়ালা সেই বিশেষ মদ দিল l ' - আহ ! দারুন হয়েছে ! আর একটু দাও !' ' - এখন দয়া করে কেটে পড়ো - বাড়ি যাও - আবার কোনো একদিন এস ' - তি খুব ধমক দিয়ে তাকে বারণ করলো l ' - যে এক পেয়ালা তুমি খেয়েছ - তারই জেরে এক হাজার দিন তুমি বুঁদ হয়ে থাকবে ' ! ধমক খেয়ে লিউ দোকান ছেড়ে চলে গেল l ও'র মুখের রং ইতিমধ্যেই বেশ ফ্যাকাশে মেরে গেছে l বেসামাল পায়ে টলতে টলতে - বাড়িতে গিয়েই লিউ প্রচন্ড মাদকতায় - মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়ল l ঘুম তো ঘুম ! - কদিন পরেও যখন ওর ঘুম ভাঙল না - পরিবারের লোকেরা ওকে মদ খেয়ে মরে গেছে ভেবে খুব কান্নাকাটি করলো ও যথা নিয়মে সমাধিস্ত করলো l আড়াই বছর পরে, দোকানদার তি'র মনে পড়ল লিউর কথা : - ' এবার তো লিউর জেগে ওঠার সময় হলো ! যাই, একবার ওর বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসি ! ' খোজ করে করে লিউএর বাড়ি এসে পৌছালো তি l -' লিউ কি বাড়ি আছে ?' লিউর বাড়ির লোকেরা খুব অবাক হয়ে গেল তি এর কথা শুনে l ‘ - লিউ তো অনেক দিন হলো মারা গেছে ! ওর অন্তেস্টিও হয়ে গেছে '! শুনে তি'র তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া ; ও বলে উঠলো -' আরে না না ! ও মরবে কি ! আমি যে মদ ওকে করে খাইয়েছি, সেটা খুবই কড়া - সেই এক পেয়ালার মৌতাতে ওর এক হাজার দিন ধরে ঘুমোবার কথা ! ও হয়ত আজ-কালই ঘুম ভেঙ্গে উঠবে !' তি তখন জোর করে লিউর পরিবারের সবাইকে নিয়ে কবরখানায় গিয়ে মাটি খুঁড়ে কফিন ভাঙ্গতে বলল I ওই কবর থেকে সুমিষ্ট গন্ধ আসতে লাগলো l কফিন খুলতে দেখা গেল লিউ চোখ পিট পিট করে চেয়ে রয়েছে ও - ওকে যে সবাই ডাকছে তা শুনতে পারছে ! ' - নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকতে যে কি ভালো লাগে !’ লিউ বলে উঠলো ; আর তি কে জিজ্ঞেস করলো -' তুমি কি মিশিয়ে এই মদ তৈরী করেছ বাবা , যে খেয়ে একেবারে বুঁদ হয়ে গেছি ! - খুব কি বেলা হয়ে গেছে !' একথা শুনে সবাই খুব জোরে হেসে ফেলল l লিউর মুখ থেকে মদের ভীষণ মিষ্টি গন্ধ আসতে লাগলো - যা নাকি আড়াই বছর ধরে লিউকে বুঁদ করে রেখেছে ! মনোজ
শিবাংশু
পঁচিশে বৈশাখ সকালে খগেন ভাবলো অফিসে যাবেনা। কারণ ঐ দিন 'পঁচিশে বৈশাখ'। সরকারি পাব্লিক হলে একটা ছুটি পাওয়া যেতো, নিখরচায় I তার কপালে নাই। তার এও মনে হলো কোনও জোড়াসাঁকো বা রবীন্দ্র সদনে শনিপুজোর ভক্তদের মতো হাত জোড় করে বসে না থেকে কিছু অন্য কাজ করলে হয়তো বাবার আত্মা বেশি খুশি হবে। হ্যাঁ, খগেন অনেক বাঙালির মতো রবিবাবুর স্বঘোষিত সন্তান। তার এই স্বোপার্জিত পিতা সম্পর্কে আজকাল লোকজন কী ভাবছে সেটা নিয়ে একটা ওপিনিয়ন পোল করা যেতে পারে। সহজ কাজ অথচ বেশ স্টিমুলেটিং। গলির মোড়ের গাছতলাটা বেশ ছায়া... কিছুক্ষণ দাঁড়ানো যায় সেখানে। লোকজনেরও আসাযাওয়া আছে। -এইযে নমস্কার, আপনার নামটা একটু বলবেন... -ক্যানো... -এই একটা কথা জানার ছিলো... -আমার নামে কোনও কথা নেই, অমলেন্দু রঞ্জন হালদার...বলুন, - আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? -কে কোবি রবীন্দ্রনাথ? কিস্যু ভাবিনা। ভাবার কী আছে? কতো লোক ভাবছে... আর ভাবতে পারিনা... ওসব পদ্য টদ্য পড়ে হবেটা কী? তবে জানেন বিয়ের পরে একদিন বৌকে ইম্প্রেস করতে একটা কোবিতা বলতে গেসলুম, বাংলা অনার্স কি না.. তা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে... বুঝলুম ও লাইনে হবেনা। তার পর কোবিতা-টোবিতা মায় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। - ইয়ে...ঠিক আছে, ধন্যবাদ... -আপনার নামটা একটু যদি বলেন... - রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের নাম জিগ্যেস করাটা বেশ ভালো কাজ, তবে একটু ডেঞ্জারাস ... - না, না আমি একটা প্রশ্ন করতুম শুধু... - কোথায় থাকি? বলবো না... আর কিছু.... - না না তা নয়, আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন? - বাহ, আপনার টেকনিকটা বেশ ভালো... - না না আমি সত্যি শুধু এইটুকুই জানতে চাই... - সুদক্ষিণা মজুমদার, - দারুণ... - ঠিক ধরেছি , মতলবটা খারাপ... -আরে না না খারাপ নয়, মতলব মানে শুধু রবীন্দ্রনাথ... -বেশ, তবে বলি... -আজ্ঞে হ্যাঁ - দেখুন রোবীন্দ্রনাথ হলেন গিয়ে রোবীন্দ্রনাথ, মানে রোবীন্দ্রনাথই সেই রোবীন্দ্রনাথ, অর্থাৎ কি না যে রোবীন্দ্রনাথ আমাদের সব কিছু। মানে আমার নামটা দেখছেন এবং আর অন্য যা কিছু, সব কিছুই ঐ রোবীন্দ্রনাথ। বুজলেন... - হ্যাঁ জলের মতো, অনেক ধন্যবাদ... ছেলেটির চেহারা বেশ উজ্জ্বল। এরা কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে? দেখা যাক, -এই যে ভাইটি, আপনার নামটা একটু বলবেন? -কোন নাম? আমার বহু নাম আছে... পদ্য লেখার নাম? গদ্য লেখার নাম? ফেসবুকের নাম? প্রেমিকার দেওয়া নাম? মাস্টারের দেওয়া নাম? আমারি নাম বলবো, আমি বলবো নানা ছলে....(সুরে) - আপনার বাবার দেওয়া কোনও নাম আছে কী? - আছে, তাও আছে, তবে সেটা তেমন ভালো নয়, চিন্ময় কর... - আপনি নিশ্চয় কবিতা লেখেন - অবশ্যই, দুহাতে লিখি, কেন? - এই রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আপনি কী ভাবেন, এই একটু কৌতূহল আর কি? - (চোখ বুজে) ভরণী নক্ষত্র থেকে ঝরেছে দু এক বিন্দু জল, বিশাখায়, সে কোন তিয়াসায়, দিবাকর রশ্মি যেন, মার্গদর্শী রাজপথে লুপ্ত হলো বিভোর বিভাবরী.... - সাংঘাতিক... - সাংঘাতিক !!! মানে? - মানে ফাটিয়ে দিলেন আর কি... - তাই বলুন... কী যেন জানতে চাইছিলেন? - ঐ রবীন্দ্রনাথ... - ওনার সম্বন্ধে আমি বাংলায় তেমন কিছু বলতে পারিনা, ইংরিজি চলবে... - আমি আবার তেমন বুঝিনা ওটা.... - ধ্যুস মশায় , ওয়েস্টিং মাই টাইম... - নিশ্চয়, নিশ্চয়.... অনেক ধন্যবাদ... এই মেয়েটিকে খুব স্মার্ট লাগছে, কলেজ থেকে ফিরছে বোধ হয়... - নমস্কার, কলেজ ফেরত নাকি? - আপনি কে মশায়, বেশ অসভ্য তো... - আজ্ঞে না না আমি একটু রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে মানুষের ধারণা বোঝার চেষ্টা করছি... - ও, তাই বলুন। আমি কলেজ থেকে ফিরছি না , ছেলেকে স্কুল পৌঁছিয়ে আসছি, - সে কী আপনার এতো বড়ো ছেলে ? - হ্যাঁ যথেষ্ট ধেড়ে ছেলে আমার... - বাহ বাহ, এদিকেই থাকেন না কি? - দেখুন, এই তাপসী চ্যাটার্জির রাগ তারাতলা থেকে আমতলা সব লোক জানে... সমঝে চলে... - ওহ সরি, রাগবেন না প্লিজ, আমি ঐ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে দু চারটে কথা, মানে আপনার কথা জানতে চাইছিলাম... - দেখুন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আমি একটু ভাবালু হয়ে পড়ি। চোখে-টোখে জল এসে যায়, একটু নিশ্বাসের কষ্টও হয়... - তবে থাক থাক... - তবে ওনার লেখা গল্প থেকে যতো সিন্মা হয়েছে সেগুলো আমি চান্স পেলেই দেখি। তবে ভাববেন না আমি কবিতা বুঝিনা, একবার কাম্পুচিয়াতে মানুষের হাড়ের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে "ভগবান তুমি যুগে যুগে" পড়েছিলাম... - বাহ বাহ শুনলেই কম্পো হয়.. তা আপনি ওদিকেও যান নাকি... -আরে মশাই আমি তো ওদিকেই থাকি... - আচ্ছা আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ... এছেলেটি মনে হয় কিছু ভাবছে, একটা ভাবুক ব্যাপার আছে চেহারায়... - নমস্কার, আমি খগেন ... আপনার নামটা জানতে পারি - পারেন। শত্রুদমন চক্রবর্তী। - এমন নাম বিশেষ শুনিনি... - কী জানেন আপনি পৃথিবীর? বহু কিছু জানা বাকি আছে... - ইয়ে তাতো বটেই।।এদিকেই থাকেন নাকি? - আমি স্থলপথে থাকি চুয়ান্ন নম্বরে, তবে বেশির ভাগই জলপথে থাকতে হয়... (উদাসিন) - ও বুঝেছি, নেভিতে আছেন নাকি? - না আমি সরকারি বৈজ্ঞানিক... - আচ্ছা আচ্ছা ... আসলে আমি একটু কৌতূহলী আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কী ভাবেন, এই নিয়ে? আসলে আপনাকে একটু অন্যমনস্ক দেখছি .... বাড়িতে সবাই ভালো তো? - না ঠিক অন্যমনস্ক নই, মন্দাক্রান্তা এখন একটা পদ্য লিখছে ঘরে বসে আমি তার শব্দগুলো অনুমান করার চেষ্টা করছি... - ঘরে বসে পদ্য, শব্দ এখানে? আপনার বান্ধবী বুঝি? - ধুর মশাই.. আপনি একটি যন্ত্র... মন্দাক্রান্তা একজন কালজয়ী কবি , আমি তার ভক্ত... - তবে রবীন্দ্রনাথও আপনি পড়েছেন? - পড়েছি, কিন্তু ওনার পদ্যগুলো ফুরাতে চায়্না... ক্লান্ত হয়ে পড়ি, কখনো দেখা হলে পরের জন্মে একটু ছোটো কবিতা লেখার রিক্যুয়েস্ট করবো। আসলে লেখার নেশায় এতো আজে বাজে লিখেছেন ... কে পড়বে এতো... তবে এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা হয়না.. সন্ধের পর নিম্তলাঘাটে আসবেন, তখন কথা হবে, জলপথে... - য়্যাঁ.. বেঁচে থেকে? - ইয়েস । কেলো আর পঞ্চা অনেক ক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিলো খগেনকে। ওরা পেশায় প্রায় 'সমাজবিরোধী' আর নেশায় রাজনৈতিক কর্মী। - এই খগা। অনেক্ষণ থেকে দেকচি তুই এর পিছনে ওর পিছনে ঘুরচিস, ব্যাওড়াটা কী... - আরে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লোকেদের কাছে জানতে চাইছি... - কোন রবি? ঐ পাংচারওয়ালা? - আরে না না , কবি রবীন্দ্রনাথ... - কোবি ড়োবিন্দনাত...!!! - হ্যাঁ ঠিক তাই.. - কোতায় থাকে সালা.. - আরে ছি ছি অমন বলিস না - তবে খুঁজচিস ক্যানো? - এমনিই.... - কাদের পাট্টি ছিলোরে? এবার পঞ্চা তার ক্ষুরধার বুদ্ধি জাহির করে, - বুয়েচি বুয়েচি, ঐ দাড়িওয়ালা বুড়োটা... ভোটের সময় ওর কোবতেগুলো বলেচিলো দেওয়ালে লিকতে...ওর পুজোয় অ্যাকন ছুট্টি দ্যায়.... দ্যাক খগা, ও বুড়ো আমাদের পাট্টি, তুই ভোটার ভাগাবার চক্কর কোরিস না, পাড়ার ছেলে তাই এবার ছেড়ে দিলাম... এখন ফোট, নয়তো বাবার নাম... যাহ তুই তো স্লা নিজেই খগেন, তোর বাপের আর নাম কী হবে.....?
Kaushik
- তুই তার মানে প্যান্ডেলের পারমিশন নিতে যাবি না? - কাম অন গীতু! সত্যি করে বল তো - এই সব হুজুগের কি কোনো দরকার আছে? - এতে হুজুগের কি দেখলি? আর দরকারটাই বা নেই কেন? - আরে‚ নতুন বছর নিয়ে এই আদিখ্যেতার মানে কি! সেই তো পৃথিবী সূর্যর চারিদিকে পাক খাবে আর লাট্টুর মতন ঘুরবে; দিন-রাত হবে আর তার থেকেই একটা দিনকে "নতুন বছর" বলে তোরা লাফাবি; কিছু লোক পার্ক স্ট্রীটে আর কিছু জোড়াসাঁকোতে গিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করবে| এই তো? - তাই নাকি! তবে তো রবীন্দ্র জয়ন্তীতেও কোনো অনুষ্ঠান না করলেই হয়| আর প্রতি বছর ৭ই নভেম্বরেই বা গলার শিরা ফুলিয়ে‚ হাত মুঠো করে কি প্রমাণ করতে চাস? - যে উদাহরণ দুটো দিলি‚ তার সাথে এই কেসটার পার্থক্য আছে - সেটা বুঝতে শেখ! দুটো কেস এক নয়| - নেচারটা অবশ্যই এক নয়‚ কিন্তু ডিগ্রীটা একই! - তোকে বলেছে! যা বুঝিস না‚ তা নিয়ে কথা বলতে আসিস না| - ঝগড়া করবি না| লজিকে আয়! - আবে‚ কিসের লজিক! যে ক্যালেন্ডার মেনে সারা বছর একটাও কাজ করিনা‚ সেই ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনে উদ্বাহু হয়ে নাচা আমার পোষাবে না! - সে তো ধ্রুপদি মার্ক্সিজিম মেনে দুনিয়াতে একটাও দেশ চলে না; তাতে কি ব্যাপারটা মিথ্যে হয়ে যায়‚ নাকি তার জন্য তোরা রাজনীতি করা ছেড়ে দিয়েছিস? - ধুর! এটা কোনো লজিকই নয়! ১লা বৈশাখ‚ ২৫ শে বৈশাখ‚ ২২শে শ্রাবণ - এই তো দৌড়! এর বাইরে একটা তারিখও কেউ মনে রাখে না| তাই বাংলা নতুন বছর নিয়ে আদিখ্যেতা আমার কাছে অন্তত ভাবের ঘরে চুরি! - তা নয় রে চাঁদু! গত বছর সেমিস্টারের পরে বাবার সাথে একটা সরকারি অনুষ্ঠানে গেছিলাম| অরুণাচলের লোহিত ডিস্ট্রিক্ট| ওখানকার মিশমি জনজাতীর মানুষদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান ছিলো| ডায়াসে বসা সব ডেলিগেটরা মিশমিদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়েছিলো| তাই এই বাংলা নববর্ষ উদযাপনটাকেও একই ভাবে দেখতে কি তোর খুব অসুবিধে হচ্ছে? - বুঝলাম| মানে‚ একটা endangered ক্যালেন্ডারকে বাঁচানোর ঠেকা নিতে হবে| তাই তো? - ঠেকা নেওয়ার তুই-আমি কেউ নই রে চাদুঁ! প্রতি বছর নীলার সাথে যে ঢুলতে ঢুলতে ডোভার লেনে গিয়ে বসে থাকিস - কেন থাকিস? ওই ধরনের গান বাজনায় তো তোর কোনো উৎসাহ নেই‚ তবু কেন যাস? ওর ভালো লাগবে বলেই তো যাস|! সে ভাবেই ভাব না ব্যাপারটাকে| - মানে? কার ভালো লাগার জন্য নববর্ষ উদযাপন করতে যাবো? তোর? - আমার ভালো লাগা নয় রে গাধা! নববর্ষ উদযাপনের সাথে অনেক মানুষের ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে| আমরা পয়লা বৈশাখের একটা অনুষ্ঠান করলে কিছু মানুষ যদি খুশি হয় - সে টুকু বুঝবি না| - আরে‚ তার জন্য আমরা কেন? ইউনিভার্সিটি কেন? পাড়ায় পাড়ায় তো হচ্ছে ম্যারাপ বেঁধে অনুষ্ঠান| লোকে সেখানে গেলেই তো পারে! - বোকা বোকা লজিক দিস না! তা হলে তো সারা কলকাতার দূর্গা পুজো কমিয়ে একটাতে নামিয়ে আনলেই হয়! সকলে সেখানে গিয়েই ঠাকুর নমো করে আসবে না হয়! - প্রচন্ড বোকা বোকা ব্যাপার! ধুর শালা‚ এই জন্য তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না| - যাক! মেনে নিয়েছিস তা হলে| যা‚ এবার সোনা ছেলের মতন ভিসির কাছে পারমিশন নিতে যা| - ফোট‚ তোর ওই সব ঢপের লজিক কোনো লজিকই নয়! তোর ওপর দয়া করে যাচ্ছি কথা বলতে - বুঝলি! - তাড়াতাড়ি যা - ভিসি বেড়িয়ে যাবেন নইলে| আরে চাঁদু‚ শুনে যা! - কি? - শুভ নববর্ষ!
সুচেতনা
আমার ঘুম বড় অদ্ভুত। ঘুমের মধ্যে জ্ঞান থাকে। হিসেব করতে পারি। ঘুমের মধ্যেই নিজেকে বলি মনে মনে যখন এত কিছু পারছি, তখন নিশ্চয়ই আমি জেগে আছি, ঘুমিয়ে নেই। ঘুম থেকে ওঠার পরেও ঘুমের মধ্যে কী কী দেখেছি, কী কী ভেবেছি সব ছবির মত মনে থাকে। শুধু সময়জ্ঞানটা থাকে না। স্থানকাল খেয়াল থাকে না। সেদিন ভরসন্ধ্যেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেঁড়া ঘুম। যতবার আধোঘুমে চোখ মেললাম, সব অন্ধকার, নিশ্চুপ দেখে ঘুমের মধ্যেই ভাবছিলাম রাত দুটোতিনটে হবে। ছেলে যখন দরজায় চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকছিল, তখন সেই আওয়াজে ঘুমের মধ্যেই মনে হল - এত রাতে চোরই নিশ্চয়ই চাবি ঘুরিয়ে ঢুকছে ঘরে, ঘুমের মধ্যেই "কে কে" বলে এমন চেঁচালাম, ছেলে দরজা খুলে ভয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেল, প্রতিবেশিনী ছুটে এলেন। ঘড়িতে তখন মোটে সন্ধ্যে আটটা। আজকাল নতুন উপসর্গ হয়েছে। ঘুমের মধ্যে অতীতভ্রমণ। ফেলে আসা সময়গুলো ছবির মত দেখতে পাই। বড় জ্যান্ত ছবি, নিজেকে সেই ফেলে আসা মুহুর্তটাতেই দেখতে পাই। দুপুরবেলায় বড় ঘুম পায় আজকাল, ঘুমোতে তো আর পাই না দুপুরবেলায়। অথচ বছর তিরিশেক আগেও মা বৃহস্পতিবারের দুপুরে আর রবিবারের দুপুরে, তারপর গরমের ছুটির দুপুরে রোজ সাধ্যসাধনা করত, একটু ঘুমিয়ে নিতে। আমার সেই ঘুমটুকুরও সময় হত না তখন। সেই পাপেই মনে হয়, এখন দুপুরবেলা এত ঘুম পায়। বিয়াল্লিশবছরের ফেলে রাখা ঘুম শোধ তুলতে চায়। তাই হয়তো রাতের বেলায় আজকাল আমাকে নিয়ে গিয়ে ফেলে তিরিশ-বত্রিশ বছর আগেকার দুপুরগুলোয়। তখন সুবিধেমতন দশবছরের বা বারোবছরের মেয়ে হয়ে যাই। বিয়াল্লিশবছরের বুড়িটা গালে হাত দিয়ে দেখে নেয় সেই উমনোঝুমনোটাকে। যেসব দুপুরবেলাগুলো আজকাল রাতেরবেলায় হানা দেয়, তেমন কয়েকটা লিখে রাখলাম। ভাগ্যিস ঘুমের মধ্যে ফেলে আসা দুপুরগুলো দেখতে পাচ্ছি, তা নয়তো স্মৃতিশক্তির যা অবস্থা হয়েছে আজকাল! কত কিছুই যে জমে থাকে ছাই! থাকুক তবে জমে। #জমানোদুপুর-১ আমার সেই পুরনো ঘরের সরু খাট। বালিশের উপর শিউলিবাড়ি। বইয়ের আদ্ধেক অব্দি পড়ে চোখ বন্ধ করে উপুড় হয়ে দেখছি - রুক্ষ পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে বেয়ে একটা লোক উপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। চওড়া পিঠ, বড়সড় কাঠামো। উঁচু পাথর, ঝোপঝাড় কিচ্ছু মানছে না। ঝোপের গাছ মুঠো করে খাবলে ধরে দিব্যি টপাটপ পাথর চড়ছে, তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। লোকটার পিঠের সাদা পিরাণটা খোঁচা লেগে ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। বহু দূর থেকে ঝপঝপ করে জল পড়ার আওয়াজ হয়েই চলেছে। আওয়াজটা থামছে না। কোথা থেকে জল পড়ছে, দেখাও যাচ্ছে না। আমিও দেখতে পাচ্ছি না, লোকটাও পাচ্ছে না। আমি জানি লোকটা কোথায় যাচ্ছে। একটা নদীর উৎসমুখ খুঁজতে। লোকটার কাছে ম্যাপ নেই, কম্পাস নেই, কিচ্ছুটি নেই। #জমানোদুপুর-২ এখন আসলে আর দুপুর নেই। কখন যেন দুপুর গড়িয়ে আলতো অন্ধকার আসি আসি করছে। মায়ের বড় খাটে মধ্যিখানে জোড়া হাতি আঁকা জয়পুরি চাদর। মা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু মায়ের হাতে এখনো আলগোছে ধরা 'ফাঁসির মঞ্চ থেকে'। আমার হাতে মোটা একটা বই - প্লাস্টিকের জ্যাকেট পরা অপু। প্লাস্টিকের জ্যাকেটের ধারগুলো ছিঁড়ে এসেছে। আমি বসে আছি সতুদের বাগানে। বসে বসে দেখছি - রাণুদি কাজলকে ভাত আর মাছ মেখে গরাস পাকিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের শোওয়ার ঘরের কোনে কে ওটা দাঁড়িয়ে আছে? আমি তো বাগানে ছিলাম, আমাদের ঘরের ভিতরটা দেখতে পাচ্ছি কী করে? শাড়ি পরে টিপ পরে দাঁড়িয়ে আছে। গুনগুন করে কী যেন বলছে! আমাকে বর চাইতে বলল কি? কিন্তু আমি তো ভালো মেয়ে নই। তবে? #জমানোদুপুর-৩ শীতকাল। গায়ে হাল্কা গোলাপি রঙের উলের চাদর জড়িয়ে একটা কমলালেবু রঙের দুপুরে মায়ের পাশে মাদুরে বসে আছি। আমার হাতে গালিনা দেমিকিনার বনের গান। আর মায়ের হাতে দেশ। আমার হাল্কা গোলাপি রঙ বড় প্রিয় বলে দিদা নিজের হাতে এত বড় উলের চাদর বুনে দিয়েছে। বাবার ছাই রঙা শালটা বড় আরাম, ওটা গায়ে জড়ালে মনে হয় বাবার কোলে বসে আছি, তাই ওটা জড়িয়ে থাকতাম সবসময় শীতকালে। সোয়েটার পরলে আমার গা কুটকুট করে। তাই দিদা আমাকে উলের চাদর বুনে দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে রোদ আসে না বলে মা শীতের দুপুরবেলায় বাড়ির সামনের মাঠে বসে রোদ পুইয়ে নেয়, আমিও মায়ের পাশে বসি তখন। বনের গান বইটা আমার বড় প্রিয়। তিনটে গল্প আছে। কিন্তু শেষের গল্পটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় - আমার কাপ্তেন। পেতিয়া নামের একটা ছেলে হাঁটতে পারে না, তার গল্প। হর্তাকর্তা মিনসে তাকে খবরের কাগজ কেটে হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দিয়েছিল। ওটা বনবনদি ফিরছে না কলেজ থেকে? ছোট্ট ছোট্ট হলুদ কল্কা বসানো বাদামি রঙের শাড়ি পরে! দৌড়ে গিয়ে বনবনদির হাত ধরি, বনের গান খুলে দেখাই, "বনবনদি আমাকে এরকম হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেবে?" বনবনদি কখনো কাউকে "না" বলে না। বলতেই জানে না। বনবনদির হাত ধরে জেঠিমার বাড়ি। জেঠু-জেঠিমাও খবরের কাগজের তাড়া নিয়ে আসে, বনবনদি হাসিমুখে বসে বসে আমাকে এত এত হাতধরা মানুষের মালা বানিয়ে দেয়। বাবাইদাদা দেখে মুচকি হেসে বলে, "দাঁড়া, আমিও তোকে একটা মালা বানিয়ে দিই।" বাবাইদাদাও খবরের কাগজ ভাঁজ করে করে তার উপর কী যেন আঁকে, দেখতে দেয় না। কাঁচি দিয়ে কেটে যখন মালা বানিয়ে দেয়, দেখি লেজে লেজে জোড়া লাগানো, বসে থাকা বাঁদরের মালা। আমি ঠোঁট ফোলাই, সবাই হাসে। জেঠিমা হাসিমুখে বাবাইদাদাকে চোখ পাকায়। বাবাইদাদা তখনো হাসতে থাকে। আমি রেগে গিয়ে বাবাইদাদাকে বলি "আর কক্ষনো তোমার সঙ্গে কথা বলব না।" বাবাইদাদার উপর শুধু ঘুমের মধ্যেই আজকাল রাগ করতে পারি। কখনো দেখা হয়ে গেলে সামনাসামনি ঝগড়া করার উপায় বাবাইদাদা আর কোনোদিনের জন্য রাখে নি। রাখে যে আর নি, সে খবর তো আমিই মাকে দিয়েছিলাম ফেসবুক থেকে জানতে পেরে। তার মানে আমি এখন ঘুমিয়ে আছি। বাবাইদাদা ঘুমের মধ্যেই থেকো তবে।