শিবাংশু

'তুমি যে শিব তাহা, বুঝিতে দিও'...

শুভ বিজয়া, একবার বন্ধুদের বলেছিলুম, যদি কখনও সিনেমা তৈরি করি, তবে সেটা অতুলপ্রসাদের জীবনকাহিনীর ভিত্তিতে করার কথা ভাববো। একালের একজন মানুষের যে এমন মহাকাব্যিক নায়কদের মতো ট্র্যাজেডি আতুর যাপন থাকতে পারে, তা না জানলে বোঝা যাবেনা। আজীবন 'এক-নারী' অনুগত একজন খ্যাতিমান শিল্পী, স্রষ্টা, বৃত্তিজীবী, আদৃত মানুষ অতুলপ্রসাদ সেন। কিন্তু তিনি আমৃত্যু জীবনের ‘একমাত্র’ নারীর থেকে সামান্য শান্তির আকাঙ্খা, 'দুয়েক মুহূর্তের ভিক্ষা' পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অশান্তিকাতর জীবন থেকে অব্যাহতি পেতে আকুল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। লখনউয়ে তুমুল সফল আইন ব্যবসা ছেড়ে তিনি কলকাতায় ফিরে এলেন ১৯১৫ সালে। কলকাতায় সবার কাছে আদৃত হয়েও আবার পারিবারিক টানাপোড়েনের চাপে ১৯১৭ সালে ফিরে গেলেন লখনউ । ১৯২৩ সালে তাঁর গুরু রবীন্দ্রনাথ লখনউ গেলেন অতুলপ্রসাদের আতিথ্য নিয়ে। তাঁর আগমনের খবর পেয়ে বহুদিন পর স্ত্রী হেমকুসুম পুত্রকে নিয়ে ‘ফিরে এলেন’ অতুলপ্রসাদের কাছে । উচ্ছ্বসিত অতুলপ্রসাদের মনে হলো তাঁর দুঃখের দিন শেষ হলো বুঝি। একসঙ্গে গুরু এবং সঙ্গিনী দুজনেই তাঁর গৃহে এসেছেন। পরম তৃপ্তিতে তিনি গুরুকে শোনালেন অনেক গান। গুরুও মুগ্ধ। গুরু যাবেন বোম্বাই। তাঁকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এসে দেখেন হেমকুসুম আবার বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। গান ছাড়া অতুলপ্রসাদের জীবনে আর কোনও সম্বল বাকি ছিলো না। এই ঘটনার কিছু দিন পরেই, ১৯২৪ সালের মে'মাসে পেলেন নিদারুণ শোক। পরমপ্রিয় ভাগনি বুলবুলের অকস্মাৎ মৃত্যু তাঁকে অবসন্ন করে দিয়েছিলো। গভীর শোকের সেই মুহূর্তে রচনা করেছিলেন গানটি। শুনিয়ে ছিলেন প্রিয় মানুষ দিলীপকুমার রায়কে। গাইতে গাইতে একটু থেমে বলেছিলেন, 'দিলীপ, এ গানটি কিন্তু যার তার কাছে গেয়ো না; এ গানটি আমার বড় ব্যথার দিনে লেখা...আমার জীবনের এক দারুণ দুঃখের সময় - যখন মনে হয়েছিল - যাক সে কথা।' (সুরেলা- দিলীপকুমার রায়) বিজয়াদশমীর দিন মনে পড়লো গানটি। এক আশ্চর্য দশমী এবার। আগমনী ছাড়াই বিসর্জন যেন। দুঃখের দিন মানে তো তাইই। সেই মিশ্র ভৈরবী রাগিণী। অতুলপ্রসাদের গুরু যা নিয়ে বার বার সাজিয়ে গেছেন তাঁর অপার সৃষ্টির সাম্রাজ্য। অতুলপ্রসাদের গানকে যে ভাবে জেনেছি, সে ভাবেই কিছু অক্ষম প্রয়াস। যাঁরা সময় নষ্ট করে শুনবেন, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে নিলে বাধিত হবো। https://www.youtube.com/watch?v=_FHZ3uvwL1E&t=336s

11

0

Stuti Biswas

খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ

লকডাউনের একঘেয়েমি কাটাতে সেদিন বেড়িয়ে পড়েছিলাম । ঢেউ খেলানো পথে খানিক হেঁটে এলাম । রঙিন গুল্ম আর সবুজ ঘাসের প্রান্তরে বসে প্রকৃতিকে উপভোগ করলাম । । খোলা হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নিলাম । আকাশের পুঞ্জীভূত মেঘ , শরতের ডাক সারি সারি পাতাবাহারের হিল্লোল দেখে মনটা সত্যি অনেকদিন পর নেচে ঊঠল । অনেকেই কপাল কুঁচকে ভাবছে করোনা পরিস্থিতিতে আবার বেড়াতে যাওয়া কিসের । খুব বেশী দূরে যাই নি গেছিলাম দিলওয়ালের হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে লোদী উদ্যানে । গাছে গাছে উড়ছে সবুজ টিয়ার ঝাঁক ।শালিকরা স্বভাবসিদ্ধ ঝগরায় সরগরম করছে চরাচর ।এক জোড়া বক জাতীয় পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘাসে । ছোট্ট জলাশয়ে পানকৌড়ি ডুব সাঁতার কাটছে । মরশুমী ফুল ফোটানোর চলছে আয়োজন । সদা ব্যস্ত শহর । সময় নেই সময় নেই । চারিপাসের রাস্তায় দ্রুত লয়ে ছুটছে গাড়ী । মাঝে মাঝে সাইরেন বাজিয়ে পুলিশ কনভয় । কোন নেতা বা আমলা যাচ্ছেন কোথাও । এসবের মাঝে সুউচ্চ গাছের সারিতে ঘেরা শান্ত নিরিবিলি লোদী গারডেন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে । নব্বই একর জমির ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সৈয়দ আর লোদী বংশের স্মৃতিসৌধ , সমাধি ও মিনার  । সৌধগুলির স্থাপত্য , ছাদে পাথরের কারুকার্য সত্যি দেখার মত । রাজেশ পাইলট মার্গের দিকে সিকান্দর লোদীর সমাধি টি আয়াতকার চারিদিকে মিনার । আকবরের সময় মান মন্দির ও নথি সংরক্ষণের গ্রন্থাগার হিসাবে ব্যবহৃত হত । পঞ্চদশ শতাব্দীর পর জায়গাটিকে কেন্দ্র করে খয়েরপুর নামে একটী গ্রাম গড়ে উঠেছিল । ১৯৩৬ সালে তদানীন্তন ভাইসরয়ের স্ত্রীর ইচ্ছায় গ্রামবাসীদের সরিয়ে স্মৃতিসৌধ ও মসজিদের চারিপাশে উদ্যান গড়ে তোলা হয় । উদ্যানটির নাম করন হয় লেডি ওয়েলিংটন পার্ক । ১৯৬৮ সালে আবার উদ্যানটীর সংস্কার হয় । নামকরা ব্রিটিশ স্থপতির নকশায় সেজে ওঠে বাগান । বিভিন্ন ধরনের গাছ দেশ বিদেশ থেকে এনে লাগান হয় । নামকরণ হয় লোদী উদ্যান । একসময় লোদী গার্ডেন বলিউডের খুব পছন্দের জায়গা ছিল । পুরানো হিন্দী সিনেমায় অনেক গানের সুটিং হয়েছে এখানে । আশপাশে মন্ত্রী সরকারী আমলাদের বাংলো । লাকি হলে দেখবেন আপনার সাথে তেনারাও জগিং ট্র্যাকে পা মেলাচ্ছেন । দেশের স্বাস্থ্য ভাল হোক না হোক নিজের স্বাস্থ্য ভাল রাখা আগে দরকার ।

40

5

শিবাংশু

এ তরী বাইবে বলে…

এ তরী বাইবে বলে… ----------------------- সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা। ব্যারিস্টার সেন-সাহেবের (এরকমই বলতো লখনউয়ের লোকে) আজ থেকে দেড়শো বছর পূর্তির উৎসব শুরু হবে। আজ জন্মদিনে তিনি নিজে না থাকলেও আমরা তো আছি। যে যেখানে তাঁর গান শুনে যায়, সেতো আমাদেরই শোনা। যখনই বাংলাগান, তখনই তিনি আসবেন। তাঁকে আমরা দেখিনি কখনও। কিন্তু তাঁর কক্ষপথের সঙ্গী এক সান্যাল-সাহেবকে চিনতুম। তাঁর দৌলতেই আমাদেরও সেন-সাহেবকে চিনতে শেখা। দুঁদে প্রবাসী বাঙালি দ্বিজেন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন সেকালের গ্লাসগোর ইঞ্জিনিয়র। ইংরেজ আমলে অবিভক্ত উত্তরপ্রদেশের চিফ ইঞ্জিনিয়রের দায়িত্ব সামলাতেন। ছিলেন লখনউয়ের ম্যরিস কলেজে প্রথম যুগের ছাত্র। দ্বিজু সান্যাল, ছোটো ভাই পাহাড়ি সান্যালের সঙ্গে পণ্ডিত রতনজনকারের শাগির্দ। সেন-সাহেবের একজন ঘনিষ্টতম নবীন চেলা। এ দেশের অতুলপ্রসাদ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আদি উস্তাদ। তাঁর কাছে অতুলপ্রসাদের রচনা করা প্রতিটি গানের বিশ্বস্ত ইতিহাস-ইতিবৃত্ত পাওয়া যেতো। আর পাওয়া যেতো অতুলপ্রসাদের নিজের গান গাওয়ার ধরনটি কেমন ছিলো তা নিয়ে নানা সূত্র। তিনি ছিলেন উচ্চকোটির গায়ক। আমি তাঁকে যখন দেখি বা শুনি, তখন তিনি আশির অনেক উপরে। কিন্তু কী কণ্ঠ ছিলো তাঁর! দরাজ, নিবিড় জমজমা আর তাসির। শেষ জীবনে প্রায়ই জামশেদপুর আসতেন। মায়ের গান খুব পছন্দ করতেন। প্রতিবার এসে মায়ের সঙ্গে গান নিয়ে বিনিময়। নতুন কিছু শিখিয়ে যেতেন। আমি তখন বালক মাত্র। এটা বুঝতুম, কলকাতার জনপ্রিয় গায়ক-গায়িকাদের গাওয়া অতুলপ্রসাদের গান তিনি পছন্দ করতেন না। অভিযোগ করতেন সবাই 'রবীন্দ্রসঙ্গীতে'র মতো সুর লাগিয়ে অতুলপ্রসাদের গান করেন সেখানে। অতুলপ্রসাদের গানে সুর লাগানো, মিড়, গিটকিরি বা জমজমার কাজের রকম নাকি আলাদা। এমন কি তাঁর বাউলাঙ্গ বা কীর্তনাঙ্গের গানেরও গাইবার ধরন আলাদা হবে। তিনি যখন মা'কে শেখাতেন , আমরা শুনতুম। পরে মায়ের গাইবার ধরন নকল করে গাইতে গাইতে কিছুটা বুঝেছিলুম। গাইতে তো শিখিনি। তবে অতুলপ্রসাদের গান যে রবীন্দ্রনাথের গানের ঢঙে গাওয়া ঠিক নয়, এটুকু বোঝা গিয়েছিলো। এই গানটি বহুশ্রুত, বহুগীত। সবাই গেয়ে থাকেন। কিন্তু আমি ছোটোবেলায় যেমন শুনেছিলুম, সেভাবে গাওয়ার একটা চেষ্টা করলুম। জানিনা কেমন হলো? ভরসা একটাই, সেনসাহেব নিজে কখনও রাগ করতেন না। বস, অওর ক্যা চাহিয়ে? (যাঁদের শোনার ইচ্ছে হবে, ইয়ারফোনের অনুরোধটা রইলো'ই) https://www.youtube.com/watch?v=vHNYwxA4JEY&t=133s

53

3

জল

বিগত সময়ের তরী বেয়ে

বিয়ে শেষ হতে হতে রাত গভীর| বরযাত্রীরা বিয়ে শেষ হতে রাতেই বাড়ি ফিরে গেছে| বরের দু-চার জন বয়স্য থেকে গেছে| তাদের জাত-গোষ্ঠীতে বাসর জাগার রেওয়াজ যদিও নেই‚ তবু এত লোকজনে ভর্তি বাড়িতে কেউই আর সেইভাবে ঘুমোতে যায়নি| বর-কনেও একরকম রাতে জেগেই কাটিয়েছে বন্ধু-আত্মীয়দের সাথে| ঘুম আসেনি মেনকার চোখেও| মেয়েটা পর হয়ে গেল‚ যদিও মেয়েদের বলে পরের ধন‚ সে তো কথার কথা‚ মায়ের মন কি আর মানে| মাঝে মাঝেই চোখের কোন ভিজে উঠছে| মেয়েটাকে বিয়ের পর একবার দেখেছে সে‚ একমাথা সিঁদুরে যেন রাজেন্দ্রানী| চোখ ফেরাতে পারেনি| নজর লেগে না যায়‚ লোকে বলে মায়ের নজর বড় খারাপ| জোর করে চোখ সরিয়ে নিয়েছে| ঘুম নেই অম্লানধরের চোখেও| গত কয়েকদিনের ক্লান্তিতে মাঝে মাঝে ঝিমুনি আসছে বটে‚ কিন্তু সেটাকে ঠিক ঘুম বলা যায় না| মনটা তারও বেশ আর্দ্র হয়ে আছে| প্রথম মেয়ে বলে কথা‚ তিন ছেলের কোলে যখন এই মেয়ে হল বড় আনন্দ হয়েছিল‚ সেইসব পুরোনো ক্থা মনে পড়ে যাচ্ছে| মেয়েটা যেন সুখী হয়| রূপেশ্বরের জীবনে যেন সুবেশাই হয় একমাত্র নারী| ইষ্টদেবতার কাছে কায়মনোবাক্যে সেই প্রার্থনাই করেন| মনের ভিতরে একটা কাঁটা বিঁধে থাকার যন্ত্রণা কাউকে টের পেতে দেননি তিনি| একা যন্ত্রণা সহ্য করছেন| যন্ত্রণা আরও একজন সহ্য করছে| গভীর রাতে গঙ্গাধর বাড়ি ফিরেছে| সবাই যখন বর-কনেকে নিয়ে ব্যস্ত সেই ফাঁকে সে নিস্তব্ধে নিজের একতলার ঘরে সেঁধিয়ে গেছে| সারারাতই সে কিছু খায়নি| বোনের বিয়ের খাবার তার মুখে রুচবে না| মা অবশ্য একবার এসেছিল খাবার নিয়ে আর একরাশ অভিযোগ নিয়ে‚ কিন্তু সে কিছুই খায়নি‚ কোন অভিযোগের জবাবও দেয়নি| দুরে কোথাও বেশ কয়েকটা কাক একসাথে ডেকে ওঠে| ক্রমশ অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে| গঙ্গাধর উঠে পড়ে| বেড়িয়ে পড়তে হবে| সকালে আরও কিছু স্ত্রী আচার আছে| সন্ধ্যায় বর-কনে বিদায়| এই পুরো সময়টাই সে গতদিনের মত বাইরেই কাটিয়ে দেবে| পরিস্থিতির সন্মুখীন সে কিছুতেই হতে পারছে না| কিন্তু পালিয়ে থেকে তো অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটানো যায় না| এ সবই সে বোঝে‚ জানে কিন্তু তবু পালিয়ে যাচ্ছে| .... 'নিচে বানঠাকুর এসে গেচে সুবা‚ তোদের হল?' তাড়া দেয় মেনকা মেয়ে-জামাইকে| আজ সুবচনী পুজো| তারপর কড়ি খেলা‚ মোনামুনি ভাসানো| পুজোটা না হলে মেয়ে-জামাইকে কিছু খেতে দিতে পারবে না| মেয়ের জন্য নয়‚সে তো নিজের ঘরের লোক‚ কিন্তু জামাই তো পরের ছেলে‚ তার আতিথেয়তায় ত্রুটি হলে বাড়িতে গিয়ে বলবে| রান্নাঘরের সকালের জলখাবার তৈরী হচ্ছে| আজ সকালে ঘরযোগেই সব খাবে দাবে| মেয়েটাকে পেট ভরে খাইয়ে দিতে হবে‚ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে আজ আর সে কিছু খেতে পাবে না বাপেরবাড়ি থেকে পাঠানো মিস্টি ছাড়া| আর ও বাড়িতে যদি বামুনবাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে তবে তা খেতে পারবে| কিন্তু সে আশা তো করা যায় না| আগামীকাল ভাত-কাপড়ের অনুষ্ঠান হলে তবেই সে খেতে পাবে শ্বশুরবাড়ির খাবার| মেয়ে-জামাইকে জোড়ে বসিয়ে পুজো শুরু হয়| গোল হয়ে বসে আত্মীয়-স্বজনরা পুজো দেখার সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে গল্পও করে নিচু গলায়| সব গল্পই বিয়েকে ঘিরে| সবচেয়ে বেশি ফিসফিসানি চলে সুবেশা কপাল করেছে বলেই না এমন বড়লোকের বাড়ির বউ হতে পারল| কারও কথার মধ্য দিয়ে ঈর্ষার আভাস মেলে| কেউ কেউ আবার মেয়ের ভাগ্যে খুশিই হয়| এসবই মেনকার কানে আসে| পুজো শেষে বাকি স্ত্রী আচার শেষ হলে মেয়ে-জামাইকে ওপরের ঘরে নিয়ে গিয়ে মেনকা থালা সাজিয়ে খেতে দেয়| জামাইকে তো এখনও অবধি বেশ ভালো মনে হচ্ছে| বেশি কথা বলে না| একটু লাজুক কি? নাকি স্বভাব গম্ভীর| বুঝে উঠতে পারে না মেনকা| মেয়েকে পছন্দ হয়েছে তো? সুবেশার সাথে কি কিছু কথা হয়েছে? যদি একটু জানা যেত| কিন্তু মা হয়ে এসব কথা কি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা যায়? ... সর্বেশ্বর মল্লিক এবার খানিক নিশ্চিন্ত| চার হাত শেষ অবধি এক করাতে পেরেছেন| এবার ছেলেটার একটু মতিগতির পরিবর্তন হলে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেন| তবে কালকে বৌমাকে দেখার পর তো ছেলের মুখের ভাবের পরিবর্তন তার চোখ এড়ায়নি| দেখে তো মনে হল বৌমাকে মনে ধরেছে| রাধাকৃষ্ণজীঁউ যেন সব ঠিক করে দেন| এক মস্ত সত্য লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন ছেলের‚ অবশ্য এমন যে তিনিই প্রথম ঘটালেন তা নয়‚ এমন তো ভুরিভুরি হয়‚ কিন্তু তবু মনের মাঝে একটা কাঁটা বিঁধে আছে| কাঁটা আরও বিঁধেছে‚ কালকের বিয়ের অনুষ্ঠানে একবারও গঙ্গাধরকে দেখলেন না| সেই তো সুত্রধর তার বোনের বিয়ের‚ তবে সে থাকল না কেন? সে কি জেনে গেছে রূপেশ্বরের ব্যাপারে? অম্লানধরবাবুকেও একটু নিষ্প্রভ লাগল| অত লোকজনের মাঝে কোন কথাই জানবার সুযোগ হয়নি| অবশ্য বিয়েটা হয়ে গেছে আর তো কিছু করার নেই| এবার তার দায়িত্ব যাতে বৌমার সাথে কোন অন্যায় না করতে পারে রূপেশ্বর| যাই হোক না কেন‚ তিনি কোনভাবেই বৌমার সাথে অন্যায় হতে দেবেন না| দরকার পড়লে রূপেশ্বরের ভাগের অংশ তিনি বৌমাকেই লিখে দেবেন| অবশ্য এসবই মনে মনে ভেবে রেখেছেন তিনি| একটা খুব ভালো খবর গতকাল অমিয়ভুষণ যেভাবে বৌমাদের বাড়ির প্রশংসা করেছেন তাতে বড়বৌ-এর যেন একটু পরিবর্তন ঘটেছে| আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার তিনি লক্ষ্য করছেন‚ এতদিন জ্ঞাতিদের মধ্যে একটা যে মনকষাকষি ব্যাপার ছিল সেটা যেন হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে| সবাই বেশ আসছে‚ যাচ্ছে‚ খাচ্ছে‚ গল্পগাছা করছে এমনটা শেষ কবে দেখেছেন মনে করতে পারেন না| তিনি তো মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন‚ এ সবই বৌমার ভাগ্যে সম্ভব হয়েছে| বড় পয়মন্ত মেয়ে বৌমা| বেশ ভালো লাগছে তার| .... সন্ধ্যা হতে বেশি দেরী নয়‚ যদিও বেশি দূরে ছেলের শ্বশুরবাড়ি নয়‚ তবুও ইন্দুমতীর যেন তর সইছে না| জ্ঞাতিবাড়ির কর্তারা সকলেই খোকার শ্বশুরবাড়ির প্রশংসা করেছে| তাদের বাড়ির গিন্নীরা সকাল থেকেই এ বাড়িতে| একেবারে বউকে মুখ দেখে আর্শীবাদ করে রাতে খেয়ে দেয়ে নিজেদের মহলে ফিরবে| মহলই বটে‚ নিজে যখন বিয়ে হয়ে এসেছিল‚ তখন তো একটাই মস্ত বাড়ি রাস্তার এ প্রান্ত থেকে অপ্রান্ত| এক এক কর্তার এক একটা মহল| একটাই সিংহদ্বার| তারপর তো শুরু হল ভাগ-বাটোয়ারা| একটা সিংহদ্বার ভেঙ্গে যার যার মহল তার তার মহলের দরজা তৈরি হল| মুখ দেখাদেখি বন্ধ হল| সেসব যেন হঠাৎ করেই মুছে গেছে| সবাই যে এভাবে খোকার বিয়েতে আসবে ভাবেনি সে| স্পষ্টতঃই খুশী সে| তা ছাড়া বড়লোক কুটুমবাড়িকে কিভাবে মান দিতে হয় তা যে তারা জানে সেটা জেনে একটা পরম স্বস্তি হয়েছে তার| অমিয় অবশ্য সকালে গায়েহলুদের তত্ত্ব দিয়ে এসে ফলাও করে বলতে শুরু করেছিল| ভাইকে বিশ্বাস করতে পারেনি‚ পেটুক ভাইটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে দিলেই সে জল| কিন্তু বাড়ির কর্তারা এসে যখন বাড়ির গিন্নীদের বলেছে তখন তো আর সেকথা ফেলে দেওয়া যায় না| কর্তা তো শুনে অবধি বলে চলেছে‚ 'কেমন পয়মন্ত বৌমা এবার বুঝছ তো‚ কম বলনি তো'| উত্তরে কিছুই বলেনি সে| এখন ছেলের মতিগতি ফিরলে হয়| ... সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মধ্যে বর-কনে বিদায়| মেনকা আসন পেতে মেয়ে জামাইকে রুপোর থালা -গ্লাসে খেতে দিয়েছে| মেয়েটাকে পেট ভরে খাইয়ে দিতে চান| থেকে থেকে চোখের জল যেন উপচে উঠছে| ওদিকে ও বাড়ি থেকে লোক-জন এসে হাজির হয়েছে বর-কনেকে নিয়ে যাবে বলে| বরের বয়স্যরাও তৈরি‚ মেনকা চিত্তকে দিয়ে সবাইকেই জলখাবারের মত করে পাত সাজিয়ে খাবার পাঠিয়েছে| কুটুমবাড়ি বলে কথা‚ এটুকু না করলে যে নিন্দে রটবে| বড় গিন্নী ধান-দুব্বো-মিস্টি সাজিয়ে বসে আছে| খাওয়া শেষ হতেই জোড়ে আর্শীবাদ| একে একে বড়রা সবাই আর্শীবাদ করার পর মেনকা আর্শীবাদ করে| নিচুস্বরে জামাইকে বলে‚ ' মেয়েটা আমার বর ভালো বাবা‚ ওর বুক ফাটে তো মুক ফোটে না| ওকে দেকে রেকো‚ তোমার হাতে সঁপে দিলুম‚ ওকে কষ্ট পেতে দিও না বাবা'| চোখে জল উপচে পড়ে| জামাই কি সন্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল? ঝাপসা চোখে তা আর চোখে পড়ে না| সবার শেষ অম্লানধর ও বাড়ির অমিয়ভুষণের হাতে সঁপে দেন তাদের বাড়ির ছেলে আর নিজের প্রথমা কন্যাটিকে| সেইসাথে লিস্ট ধরে মিলিয়ে মিলিয়ে গহনা একটার পর একটা বুঝিয়ে দেন| আজ সুবেশার পরণে বাপের বাড়ির গহনা| মেনকা সাধ মিটিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী মাথার বাগান থেকে শুরু করে চিরুনী‚ বাজু‚ রতনচূড়‚ কানপাশা‚ নথ‚ মল‚ সাতনলী হার সবই দিয়েছে| মেয়েটা যেন সুখী হয়| এক পা এক পা করে এবার এগোনোর পালা‚ ঘড়ির কাঁটা যেন বড্ড দ্রুততালে চলছে আজ‚ ও বাড়ি থেকে বার বার তাড়া দিচ্ছে| মেনকা শাড়ির আঁচল পাতে| বড় গিন্নী ছোট একটা থালা চাল সুবেশার হাতে তুলে দিয়ে শিখিয়ে দেয়‚ 'বল মা‚ তোমার কাছে আজ অবদি যা খেয়েচি তার রিণ শোধ করে গেলাম'| মেনকা মুখ লুকায়‚ সুবেশার গলা দিয়ে স্বর বের হয় না‚ এক মুটো চালে কি মায়ের ঋণ শোধ হয়| ' বল মা‚ দেরি হয়ে যাচ্চে যে'| কোনরকমে উচ্চারণ করে চালটা মায়ের আঁচলে ঢেলে দিয়ে আর তাকায় না সুবেশা| গলির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে| গলিতে গাড়ি ঢোকে না‚ পথটা হেঁটেই যেতে হয়| সুবেশার যেন পা উঠতেই চায় না| অম্লানধর ধীর গতিতে পিছন পিছন আসে| শেষকাজ বাকি| গাড়িতে মেয়ে উঠলে ধুতির খোঁট দিয়ে পাটা মুছিয়ে দেয়|' আয় মা‚ ভালো থাকিস'| শাঁখ বেজেই চলে‚ গাড়িখানা ছেড়ে দেয়| ধীরে ধীরে গাড়ি গতি তোলে| অম্লানধর‚ বিদ্যেধর‚ দামোদর গাড়িটা মিলিয়ে যাওয়া অবধি দাঁড়িয়ে থাকে| ঘরে তখন মেনকা দইয়ের হাঁড়ির মধ্যে হাত ডুবিয়ে বসে| চোখে অঝোর ধারায় জল ঝরে| সন্ধ্যের অন্ধকারে সবার অলক্ষ্যে অনেকটা দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই বিদায় দৃশ্য দেখে গঙ্গাধরও| মনটা হু হু করে ওঠে| 'সুখী হোস বোন| শেষ

1258

94

ঝিনুক

বিশের বাঁশি......

"ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি– মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই সে কথা যে যাই পাশরি আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসি".... হুড়মুড় দুদ্দাড় করে পার হয়ে গেল তিনটে চঞ্চল পাখনা মেলা সপ্তাহ| ঘাটশিলা থেকে ফেরার পরের দিনটা স্রেফ বিশ্রামের জন্য ধার্য হল| রোদ আর মেঘের লুকোচুরি‚ সাথে মাঝে মাঝে হাল্কা ছাঁটের বৃষ্টি‚ ভারি রোম্যান্টিক গোছের দিন একটা| নিরম্বু ল্যাদ‚ পর্যাপ্ত ভুরিভোজন এবং নিরালা গল্পগাছায় কেটে গেল ঢিমে তেতালা একটা গোটা দিন| পরের দিন সকাল সকাল উঠে রওনা হয়ে গেলাম হীরাবন্দরে| উদ্দেশ্য খেজুরের গুড় কেনা| সদ্য আহৃত খেজুর রস খড়ের আঁটির ঢিমে আঁচে জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে যে ঝোলা গুড় তৈরী হয়‚ আহা তার সমতুল কিছু সারা গ্যালাক্সি ঢুঁড়েও মিলবে না| নিদেনপক্ষে তার কেজি দু'য়েক অন্তত নিয়ে যাবার বড়ই বাসনা| আর বোনের তো কথাই নেই‚ বড় বড় বোতল‚ ক্যান সব সাথে করে নিয়েই যায় ও প্রতি বছর‚ একা নিজে খাবার জন্য নয় শুধু‚ আত্মীয়পরিজন‚ পাড়া-প্রতিবেশী সকলকে দেবার জন্যও বটে| গাঙের হাওয়া খেতে খেতে নদীর পারে খেজুর গাছের নীচে দাঁড়িয়ে‚ বসে‚ এন্তার ছবি তুলে গুড় জ্বালানো হল‚ শেষমেশ কেজি দশেক ঝোলা গুড় আর আট কেজি পাটালি নিয়ে যখন ফেরার জন্য রওনা দিলাম‚ তত্ক্ষণে সূর্য মাথার ওপরে প্রায়‚ বাস ভ'রে ভ'রে পিকনিক পার্টিরা সব এসে ভরিয়ে ফেলেছে নদীর পার‚ শুরু হয়ে গেছে কর্ণবিদারী গানবাজনা| দুপুরের মেন্যুতে চাইনিস লেখা ছিল সেদিনের পাঁজিতে‚ খাওয়াদাওয়া সেরে ঘরে ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেলের কাছাকাছি| পরের দিন আমার বহু কাঙ্খিত স্বপ্নপূরণের পথে যাত্রা| ট্যুর বুকিং এজেন্ট ভদ্রলোক কথা দিয়েছিলেন গাড়ির যাবতীয় ডিটেইলস-- মানে গাড়ির নম্বর‚ ড্রাইভারের নাম-পাতা-ফোন নম্বর সব জানিয়ে দেবেন আমাদের যাবার এক সপ্তাহ আগেই| কথা দিতে কারো দুবার ভাবতে হয় না কলকাতায়‚ তবে সেই কথা শেষ তক রাখার দায় অবশ্য কথা দেনেওয়ালার নয়| অর্থাৎ কিনা‚ কথা রাখাটাই বেনিয়ম‚ কথা দিয়ে ভুলে যাওয়াটাই ঠিকঠাক নিয়ম| ঐ কথা রাখার ওপর যদি আপনার কোনরকম মরাবাঁচা নির্ভর করে‚ তাহলে কথা রাখানোর দায় আপনার| ফোন ক'রে ক'রে হোক‚ সশরীরে হানা দিয়ে হোক‚ কিভাবে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করবেন‚ সে দায়িত্ব আপনার এবং একা আপনারই| আমার হুড়ুদ্দাম স্কেডিউলের ধামাকায় সেই পবিত্র দায়িত্ব ভেসে গেছে বুড়ি গঙ্গার জলে| এখন যাত্রার পূর্বমুহূর্তে গোছগাছ ফাইন্যাল করতে গিয়ে মনে পড়ল‚ এই সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা বিলকুল ঝুলে রয়েছে| ওদিকে সব ঠিকঠাক চললে আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবার কথা জলগাঁওতে| স্টেশনে গাড়ি না থাকলে সব বানচাল হয়ে যাবে| অগত্যা ফোন এবং যথারীতি তেনাকে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না| যাবার কথাও না‚ টাকাপয়সা সব তো আগামই মিটিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে দুইমাস আগে| কাজেই এই দেহখানি তুলে ধ'রে রওনা দিতে হয়‚ চললাম আমি আর বোন গড়িয়াহাটে ট্র্যাভেল এজেন্টের দোকানে| আরে না না‚ অত ঘাবড়ে যাবেন না‚ যা ভাবছেন তেমন কিছু নয়‚ আফটার ওল‚ কলকাতা আমার পরকীয়া| হলই না হয় একতরফা‚ আমি না হয় একাই ভালোবেসেছি ...... "তোও-মায় যত গল্প বলার ছিল, সব পাপড়ি হয়ে গাছের পাশে ছড়িয়ে রয়ে ছিল, দাওনি তুমি আমায় সেসব কুড়িয়ে নেওয়ার কোনো কারণ"..... "মনে পড়লেও আজকে তোমায় মনে করা বারণ"..... তবু ..... শূন্যে ভাসি রাত্রি এখনো গুণি‚ তোমার আমার নৌকা বাওয়ার শব্দ এখনো শুনি ....... গড়িয়াহাট হল একটা যাদুবাজারের নাম| ছুটে যাওয়া গলার হারের ঝালাই থেকে শুরু করে বেনারসি-আনারসি‚ কানের দুলের গুছি‚ পুঁতির মালা‚ চুলের ফিতে‚ পানমশলা‚ হজমিগুলির যোগান‚ কিসের আয়োজন যে নেই সেখানে! খুঁজলে বোধহয় পরশপাথরও পাওয়া যেতে পারে| তাছাড়া আমার আর সময় হবে না অজন্তা থেকে ফিরে এসে‚ এলামই যখন‚ একেবারে সেরেই যাই আমার প্রয়োজনীয় কেনাকাটা| টুকটাক বাজার দোকান করে‚ এক রাউণ্ড ফুচকা খেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আটটা বেজে গেল| গোছগাছ মোটামুটি সব করাই ছিল‚ তবু আবার নতুন করে এক রাউণ্ড কি যে গোছানো হল কে জানে! কোথাও যাবার আগে যে জল্পনা-গল্পনা‚ তাতে যেন যাত্রার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চ| আর এ তো যে সে যাওয়া নয়‚ সেই স্কুলবেলার ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে এই যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু| ছেলেমানুষী উত্তেজনায় ঘুম আসতে চায় না চোখে| কত বছর? বাইশ? পঁচিশ? সুদীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি পার করে আবার গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস| এত বছরের ব্যবধান পেরিয়েও সেই একই প্ল্যাটফর্মেই দেখা হল আবার| আজও সেই একই যাযাবরী মুগ্ধতা ভিড় করে এলো চিরচঞ্চল আমার দুই চোখ জুড়ে| আমাদের তিনজনকে ট্রেনে তুলে দিয়ে রানা নেমে গেল| ওর কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবার ট্রেন ছাড়বে শেয়ালদা থেকে| গুছিয়ে বসতে চেষ্টা করি তিনজনে| সহযাত্রী ভদ্রলোক জানতে চাইলেন কতদূর যাব‚ নিছক সৌজন্যের খাতিরেই প্রতিপ্রশ্ন ওনাকেও করতে হল| উনি জানালেন উনি রায়পুরে নামবেন রাত দুটোর সময় এবং তিনি পেশায় প্রফেসর‚ স্কুলে অঙ্কের ক্লাস নেন‚ এম-এ‚ বি-এড| ভানজের বিয়েতে কলকাতা এসেছিলেন‚ ফিরে যাচ্ছেন| উনি আর ওনার মিসাস এই এসি ডাব্বায় আর বাকিরা সকলে আশেপাশের দুতিনটে কামরায়| ওপাশের জানালার আড়াআড়ি লোয়ার সীটে ওনার মেটে সিঁদুর‚ একঝুড়ি কাচের চুড়ি আর রূপার ইয়াম্মোটা পাঁয়জোরে শোভিতা সহধর্মিণী এবং লেজবিহীন এক দশমবর্ষীয় নাতি| বলাই বাহুল্য ওনার এম-এ‚ বি-এডের সিলেবাসে দশ বছরের নাতির জন্য ট্রেনের টিকেট কাটার চ্যাপ্টারটা ছিল না| কিন্তু টিটির তো আর এম-এ‚ বি-এড সাট্টিফিকেট নেই (আমারও নেই)‚ তিনি কিছুতেই মানতে চাইলেন না (আমিও মানতে পারছিলাম না‚ মুখ্যু হলে যা হয় আর কি!) যে দশ বছরের ছেলে ঠাকুমার কোলে চেপে যাবে এই এত দূরের পথ| রফা হতে বেশ অনেকটা সময় লেগে গেল| ট্রেন ততক্ষণে খড়্গপুর পৌঁছে গেছে| ঝালমুড়ি খেতে খেতে তামাশা দেখি| কিন্তু তামাশা বিরক্তিতে পৌঁছে যেতে বেশিক্ষণ লাগল না| টিটি চলে যেতেই প্রফেসর সাহেব ফোন করে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন আর ওনার ভাই-ভাতিজা-প্রতিবেশী যে যেখানে ছিল ওপাশের জেনার‌্যাল কম্পার্টমেন্টে তারা সকলে একজন দু'জন করে দেখা করতে চলে আসতে শুরু করল ওনার আমন্ত্রণে| আর এসেই যখন পড়েছে‚ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তো আর গল্পগাছা সম্ভব না‚ কাজেই বসতে দিতে হয়| ওনার আপার বার্থের একটা সীট‚ আমাদের তিনটে‚ একটু চেপে বসলেই তো তিরিশজনের ঠাঁই হয়ে যায়| ঐ যে কথায় বলে না 'যদি হয় সুজন'..... কিন্তু সুজন বলে কোন সুখ্যাতি আমার কস্মিনকালেও নেই| এদিকের সীটের দুই প্রান্তে আমরা দুই বোন অর্ধশায়িত‚ ওদিকের সীটের মাঝামাঝি আমার পানের বাটা‚ খাবারের ব্যাগ দিয়ে সীমানা দাগিয়ে দিয়ে সাফ সাফ জানিয়ে দিলাম এর ওপাশে কোনরকম জবরদখল চলবে না| এ হেন বদতমিজ আচরণে এম-এ‚ বি-এড যারপরনাই অসন্তুষ্ট হলেন‚ কিন্তু প্রতিবাদ কিছু করলেন না| ভিড়ও আস্তে আস্তে পাতলা হতে শুরু করল| সবার পরামর্শ‚ উপদেশ অগ্রাহ্য করে প্লেনের বদলে ট্রেন বেছেছি‚ সময়ের নিদারুণ আকালের বাজারে দু' দু'টো গোটা দিন এক্সট্রা লাগবে জেনেও ট্রেনেই উঠেছি‚ বিনাটিকেটের যাত্রীদের সাথে সীট ভাগ করে গা ঘষার জন্য নয়‚ অত উদারতা আমার নেই| এই পর্যন্ত প'ড়ে অনেকেই মুখ বাঁকিয়ে‚ চোখ ঘুরিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করবেন‚ মনে মনে অথবা গলা ছেড়েই গালিও দেবেন জানি| কিন্তু আমি নিরুপায়| সেই সব দুর্ভাগা ছাত্রছাত্রীদের জন্য দু:খ হচ্ছিল‚ এমন এম-এ‚ বি-এড যাদের প্রফেসর| আমি পরবাসী‚ আমি প্রিভিলেজড‚ আমি মাত্রাতিরিক্ত প্যাম্পারড (বাংলা?)‚ অনেক হিসাবই আমি বুঝি না| তবু যে মুহূর্তে দেশের মাটিতে পা দিই‚ আমার নিত্যদিনের সব সুখী সুখী বদভ্যাস কুলুঙ্গিতে তুলে রাখি তালা দিয়ে| জানি‚ প্রাইভেট স্পেস নামে কোন শব্দবন্ধ ভারতবর্ষে নেই| স্পেস ব্যাপারটাই যেখানে আকাশকুসুম‚ প্রাইভেট স্পেস তো সেখানে কদলির তালসত্ত্ব| তবু এই ধরণের সুবিধাবাদী বেআইনী চালিয়াতি অসভ্যতা মেনে নিতে অসুবিধা হয়| মনটা তেতো হয়ে যায়| বোনের সাথে জায়গা বদল করে জানালার পাশে চলে যাই| পর্দা একদম সরিয়ে দিয়ে বাইরে চোখ মেলে ধরি ..... "অবুঝ চোখের তারায়, অন্ধ কাজল হারায়, এক ফালি হাত বাড়ায়, শান্ত চরাচরে, সোনার কাকন, কোন সে আপন, মুখ লুকায় প্রান্তরে.... আমার ভিতর ঘরে".... খড়্গপুর ছাড়ার আধা ঘন্টার মধ্যেই ঝাড়গ্রাম চলে এল| ভাবা যায়? এক সপ্তাহের মধ্যে তিন তিনবার ঝাড়গ্রামের উপর দিয়ে যাওয়া! দেখতে দেখতে গিধনি‚ চাকুলিয়া‚ ধলভূমগড়‚ ঘাটশিলা‚ গালুডি‚ রাকা মাইনস‚ একের পর এক ঝিকুর ঝিকুর মাদলের দেশ পেরিয়ে গেলাম ঝমঝম করে| যে যাই বলুক‚ ট্রেনের মত এমন মোহময়‚ এমন সুরেলা‚ এমন ছন্দিত চলন আর কারো পক্ষে সম্ভবই নয়| আমাদের মুখ চলছে তো চলছেই সমানে| ট্রেনে উঠলে কি বেশি বেশি করে ক্ষিদে পায়? এসে গেল টাটানগর‚ "চায় বোলিয়ে" ...... বোলিয়ে তো বটে‚ কিন্তু ক্যামনে বোলেগা? কালো চা যে অমিল| বাংলার সীমানা ছাড়ালে কালো চা আর পাওয়া যায় না বোধহয়| প্যান্ট্রির ছেলেটা দয়াপরবশ হয়ে চিনি ছাড়া কালো চা বানিয়ে এনে দিল‚ আয়েশ করে চুমুক দিতে দিতে দেখি সামনের আকাশ সূর্যাস্তের লাজরাঙানো আলোয় স্নান করছে‚ মাঠ-ঘাট-দীঘি-পুকুর সব কেমন মনকেমনিয়া রঙে ছোপানো..... "নয়ন কালো, মেঘ জমালো, ঝিনুকের অন্তরে.... আমার ভিতর ঘরে, কোমল ধানের শিষে দুঃখরা যায় মিশে, সুখ পাখি কার্নিশে, হারায় অগোচরে".... চক্রধরপুর পৌঁছতে পৌঁছতে ঘনঘোর আন্ধকার হয়ে গেল| পর্দা টেনে এলিয়ে বসি| পরের স্টপ রাউরকেল্লা| ঠিক হল রাউরকেল্লা ছাড়লে রাতের খাওয়া সেরে নেব| খাবার বাড়ি থেকে করেই এনেছে বোন‚ পরোটা‚ আলুভাজা‚ চিকেন কষা‚ স্যালাড‚ আর অপরিমাণ মিষ্টি| খেয়েদেয়ে শোয়ার প্রস্তুতি করতে করতে ঝাড়সুগুডা চলে এল| আমি চিরকালই ট্রেনে ওপরের বিছানায় শুতে পছন্দ করি| উঠে পড়লাম আমার ব্যাগ‚ ওষুধ-বিষুধ‚ বই‚ ফোন‚ গান সব নিয়ে| হায় শাক্যমুনি‚ আমায় সেই মুহূর্তে দেখলে তুমি তাজ্জব হয়ে যেতে‚ কত কিছু যে আমাদের লাগে এক রাতের যাত্রায়! কানে গান গুঁজে আরাম করে হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ি| তেরে কেটে ছম ছম করে ট্রেন ঘুঙুর বাজিয়ে চলতে থাকে‚ দোল দোল দুলুনিতে চোখ মুদে আসে ধীরে ধীরে| ঘুম ভাঙলো তুমুল হাঁকাহাঁকি‚ ডাকাডাকি‚ হট্টগোলে ---- রাত দু'টো পনেরো‚ রায়পুরে ঢুকছে ট্রেন‚ এম-এ‚ বি-এড নামবেন সপরিবারে| উঠে বসি| বোনেরও ঘুম ভেঙে গেছে‚ শুধালাম‚ "হ্যাঁরে‚ উলু দেব"? উত্তর পেলাম না| ওনারা নেমে গেলেন‚ কোলাহল থামলে আবার চাদর চাপা দিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করছি| দেখি আমার উল্টোদিকের আপার বার্থের পরের ক্ষেপের সহযাত্রীরা চলে এসেছে‚ বেঁটে‚ মোটা একজন লোক‚ সাথে বারো তেরো বছর বয়সের একটা ততোধিক শীর্ণকায় ছেলে| ছেলেটা কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা উঠে গেল ওপরে‚ আড়চোখে আমায় একবার দেখেই চাদরে মাথা থেকে পা অবধি মুড়ে শুয়ে পড়লো একেবারে কোন ঘেঁষে| লোকটা এম-এ‚ বি-এডের মিসাসের খালি করা আড়াআড়ি লোয়ার বার্থে পা ঝুলিয়ে বসল| ভাবলাম উনি ঐ সীটের প্যাসেঞ্জার‚ কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুল ভাঙলো‚ সেই সীটের আসল দাবীদার এসে পড়ল| আশ্চর্য হয়ে দেখলাম‚ লোকটা জুতো খুলে গুটি গুটি সিঁড়ি বেয়ে ওপাশের ওপরের বার্থে উঠে ছেলেটার পাশে শুয়ে পড়ল‚ যেদিকে ছেলেটার পা‚ সেদিকে লোকটার মাথা‚ মস্ত ভুঁড়িটা বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে রইল বিছানার সীমা পার করে| ঝুঁকে নীচে তাকিয়ে দেখি বোনও এক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য দেখছে| আমার চোখে চোখ পড়তে বললো‚ "শুয়ে পড়‚ সকালে বুঝিয়ে দেব"| বললাম‚ "না আর বোঝাতে হবে না‚ বুঝে গেছি আমি সব একদম জলের মত"| পাজিটা উত্তর দিল‚ "বাহ‚ এই ত্তো‚ আস্তে আস্তে বুদ্ধি শুদ্ধি গজাচ্ছে"| ট্রেন আবার চলতে শুরু করে‚ বিভিন্ন স্বরগ্রামে বাঁধা সমবেত নাসিকাধ্বনিও আবার শুরু হয়ে যায়| আমি আবার কানে গান গুঁজে শুয়ে পড়ি‚ কিন্তু ঘুম আর আসতে চায় না| ভাবি‚ ভাবতে থাকি‚ এই এক রাতের পরিসরে এই চারটে সীটে দুই দু'জন বিনা টিকিটের যাত্রী| সারা ট্রেনে তাহলে আজ কত লোক ভাড়া ফাঁকি দিয়ে চলেছে? কত টাকা রোজ এইভাবে ক্ষতির খাতায় লেখা হয় রেল কম্প্যানির? ট্রেনের দোলানিতেই বোধহয় চোখ লেগে এসেছিল আবার| কিন্তু সেই তন্দ্রা ছুটতে বেশিক্ষণ লাগল না| শুনি‚ জোনাক "মা মা" করে ডাকছে| ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি সেই হোঁতকা লোকটা আর ঝুলে থাকতে না পেরে ওপর থেকে নেমে পড়ে জোনাককে ধাক্কা দিয়ে তুলেছে‚ ভোর হয়ে গেছে‚ সাড়ে পাঁচটা বাজে‚ সে বসবে তার সীটে| ওপরে ছেলেটা তখন অদৃশ্য কম্বল আর চাদরের তলায়| আমি নেমে গিয়ে জোনাককে ওপরে আমার বিছানায় তুলে দিলাম| Long story short... টিটি যখন এলেন‚ বোন কিছুতেই বলতে দিল না ওপরে লুকিয়ে থাকা ছেলেটার কথা| উল্টে আমায় ঊনসত্তরবার শোনালো‚ "চড়বি না তোর সাধের ট্রেনে? চড়‚ ভালো করে চড়| আহা‚ কি রোম্যান্টিক! সুখে থাকতে ভূতে কিলায় তো তোকে"| চুপচাপ বকুনির সাথে চা-জলখাবার খাই| জানালার বাইরে নতুন দিন‚ ঝকঝকে সূর্যস্নাত অন্যরকম দৃশ্যপট‚ আখের খেত‚ ভুট্টার খেত| ওয়ার্ধা স্টেশনে ট্রেন ঢুকল‚ এক বয়স্ক বাঙালী দম্পতি নামলেন| ছেলে অপেক্ষায় ছিল প্ল্যাটফর্মে| মালমোট বলতে একটা মিনি কেবিন ব্যাগেজ (চাকা লাগানো) আর ভদ্রমহিলার হাতের ব্যাগ| তুমুল কৌতুকের সঙ্গে দেখতে থাকি শক্ত সমর্থ তাগড়া জোয়ান ছেলে কুলি ডেকে সেই পুঁচকে বাক্সটা তার মাথায় তুলে দিয়ে বীরগর্বে আগে আগে হাঁটতে শুরু করলো‚ গর্বিত বাবা-মা পিছে পিছে| আমার গাণুশের মুখটা ভেসে উঠল মনের চোখে| গাণুশ কেন? আমার জোনাকও ওর থেকে অনেক বড় ব্যাগ‚ বাক্স নিজেই টেনে নেয় আমাদের হাত থেকে কেড়ে| হে মোর দুর্ভাগা দেশ....... যাগ্গে‚ ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে‚ প্রাণভরে বাইরের দৃশ্য দেখি| জানুয়ারি মাসের চব্বিশ তারিখে মাঠের পর মাঠ যে এমন সবুজ হয়ে থাকতে পারে‚ ভুলেই গেছিলাম| শুধু আমারই জানুয়ারির রঙ সাদা| ঝিকঝিক করতে করতে পার হয়ে গেল পাঁচটা ঘন্টা| ট্রেন একদম কাঁটায় কাঁটায় চলছে ঘড়ির সাথে| ভুসাওয়াল ছাড়তেই ব্যাগ-বাক্স গুছিয়ে রেডি হয়ে নিই| শেষের মিনিট পনেরো দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কেটে গেল| অবশেষে জলগাঁও স্টেশন| ড্রাইভার স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন গাড়ি নিয়ে| কম কথার মানুষ‚ কাজের মানুষ| কোথায় যাব‚ কি চাই বলে দিলে উনি বিনি বাক্যব্যয়ে সেখানে পৌঁছে দেন| অকারণ আবোলতাবোল প্রশ্নের উত্তর দেন না| স্টেশন থেকে বেরিয়েই দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম‚ আলুর পরোটা‚ ভেণ্ডি ভাজা আর চিকেনের ঝোল| ভ্যানে করে সবেদা বিক্রি হচ্ছিল‚ কিনলাম‚ একটা বেকারির দোকানে খাকরা না কি যেন একটা ঐ গোছের নাম‚ বেশ মুচমুচে নিমকির মত‚ সেও কিনলাম| তারপর সোজা অজন্তা| পথ বেশি নয়‚ মাত্র ৫৫-৬০ কিলোমিটার| কিন্তু রাস্তার দুরবস্থা বর্ণনাতীত| সত্যি বলতে কি রাস্তা বলতে কিছু নেই‚ চষা ক্ষেতের মত হাল‚ তার মধ্যে দিয়ে ধুলোর ঝড় তুলে পুরো ধেই ধেই করতে করতে যাওয়া‚ হাড় কখানা যে সব খুলে আলাদা হয়ে যায় নি শরীরের সে শুধু পূর্বপুরুষের আশীর্বাদে| পথের দুধারে আখের ক্ষেত‚ ছোলা ক্ষেত‚ ভুট্টা ক্ষেত| আখের ক্ষেতের পাশে একটু থামার অনুরোধ জানিয়েছিলাম‚ কিন্তু তা নাকচ হয়ে গেল| বোন মনে করলো‚ "দিদি ভুলে গেছিস বর্ধমানের কথা? তোর তো কোন মানসম্মান নেই‚ গিয়েই ছোচার মত এটা কি‚ ওটা কি‚ ইসস কি সুন্দর ---শুরু করবি‚ এখন যদি এক গোছা আখ তুলে তোর হাতে ধরিয়ে দেয়‚ কি করবি ওগুলো নিয়ে? মাথায় ক'রে নিয়ে যাস| কিছুতেই তোকে আর গাড়িতে উঠতে দেব না আমি"| এমনকি গুরুগম্ভীর ড্রাইভারসাহেবও হেসে ফেললেন সেই দৃশ্যকল্প মনশ্চক্ষে দেখে| ব্যর্থমনোরথ হয়ে দুখী দুখী মুখ ক'রে শুধু চোখ ভ'রেই দেখি জানালা দিয়ে‚ ছুঁয়ে দেখা আর হল না| বিকেল পাঁচটার পর গিয়ে পৌঁছোলাম অজন্তায়| এম টি ডি সির বাংলোয় বুকিং এক রাতের জন্য| ব্যবস্থা মোটামুটি মন্দ নয়‚ বাগানটা ভারি সুন্দর‚ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন‚ বাচ্চাদের জন্য দোলনা‚ টিটার-টটার‚ স্লাইড| শেষ বিকেলে বয়স ভুলে দোল খেলাম মাসি-বোনঝিতে মিলে‚ ছোঁয়াছুঁয়ি খেললাম‚ টিটার-টটার চড়লাম| তারপর একপাক ঘুরে এলাম অজন্তার গেট থেকে| পরের দিন একদম সক্কাল সক্কাল রেডি হয়ে দিন শুরু হওয়ার আগেই অজন্তার দুয়ারে| বাসের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়ালাম| বাস এল‚ একদম প্রথম বাস সেদিনের‚ টিকেট কেটে উঠে জানালার ধারে বসলাম| জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সুন্দর পথ চলে গেছে অজন্তার একদম চরণোপান্তে| নেমে টিকেট কেটে উঠতে শুরু করলাম‚ রোদ প্রচণ্ড‚ তবু তার মধ্যেই আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে সেই স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায়| কতদিনের স্বপ্ন আমার! স্বপ্ন যখন সত্যি হয়ে যায়‚ সে অভিজ্ঞতা ঠিক কোন ভাষায় লেখা যায়?....."ওগো, বাতাসে কী কথা ভেসে চলে আসে, আকাশে কী মুখ জাগে। ওগো, বনমর্মরে নদীনির্ঝরে কী মধুর সুর লাগে। ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো জড়ায়ে ধরিছে গলে- আমি এ কথা, এ ব্যথা, সুখব্যাকুলতা কাহার চরণতলে দিব নিছনি".... এম টি ডি সির গাইড নিয়েছিলাম‚ তিনি ঝড়ের গতিতে ওনার পছন্দসই খান কয়েক (মানে ওনার মতে যেগুলো দেখার উপযুক্ত আর কি) গুহা দেখিয়ে কেটে পড়ার তালে ছিলেন| কিন্তু ভদ্রলোক জানতেন না কার পাল্লায় পড়েছেন| আমার চাপে পড়ে সবগুলোতেই ঢুকতে হল (যেগুলো বন্ধ সেগুলো বাদ দিয়ে)| উনি যে আমাকে গোটা দিনটা দিতে পারবেন না‚ সে তো জনাই ছিল| তাই ওনার কাছ থেকে ঐ আড়াই তিন ঘন্টার মধ্যেই যতটা সম্ভব শুনে নিলাম‚ কিছু নোটও নিলাম| ২৬ নম্বরে পৌঁছে কোনক্রমে শেষ করে উনি পালিয়ে বাঁচলেন| যাবার আগে জানিয়ে গেলেন যে ওনার বড্ড ক্ষতি হয়ে গেল‚ এত সময় কেউ নেয় না‚ এতক্ষণে উনি অন্তত আরো দু'তিনজন দর্শনার্থীদের ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিতে পারতেন| বিরক্ত হয়ে কিছু টাকা বেশি দিয়ে দিলাম| খটখটে রোদ্দুরে তেতে গেছে পাহাড়ের পাথর ততক্ষণে‚ দমবন্ধ করা গরম| আমরা একটু জল টল খেয়ে‚ মিনিট পনেরো জিরিয়ে আবার নতুন ক'রে শুরু করলাম| বাকি দিনটা ধ'রে মন ভ'রে দেখলাম যতটা পারা যায় শেষ থেকে শুরু করে প্রথম অবধি| সত্যিই কেমন একটা ঘোর লেগে যায় ঐ গুহাগুলোর মধ্যে কিছুক্ষণ কাটালে! ছবি আমি খুব ভালো বুঝি না| কিন্তু ছবি যদি জীবন্ত হয়‚ তাহলে? বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে‚ তবু যেটুকু আছে‚ তা অবিশ্বাস্য| শুধু চোখের আরাম‚ মনের শান্তি নয়‚ এ যেন এক অন্যরকম উপলব্ধি‚ এক নিমেষে পিছিয়ে যাওয়া হাজার হাজার বছর‚ হাত দিয়ে‚ গাল দিয়ে ছুঁয়ে দেখা ইতিহাসকে| একি কোন ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব? নাহ‚ অজন্তার গুহাচিত্র‚ ভাস্কর্য কোন কিছু নিয়েই কিছু লেখার কোন যোগ্যতা আমার নেই| ভুলেও সে চেষ্টা করব না কোনদিন| কিন্তু মুগ্ধতাটুকু তো ভাগ করে নেওয়াই যায়‚ নাকি? গুহাগুলির মধ্যে চার দেয়াল‚ থাম‚ খিলান আর ছাদ জুড়ে সে এক অন্তবিহীন পরমাশ্চর্য সৃষ্টি| শুধু পিছনে আর পাশে ভিক্ষুদের থাকার ঘরগুলি নিরাভরণ‚ শূন্য‚ এবড়োখেবড়ো পাথরের চৌখুপি| সেই ঘরের ঠিক মাঝটিতে দাঁড়িয়ে কেন যেন ইচ্ছা হয় পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতে| মনে হয় আমিও ছিলাম সেই সহস্র বছরের ওপারে এই গুহাগৃহে‚ তথাগতর পায়ের কাছটিতে বসে পরমার্থের সন্ধানে সাধনায় নিমগ্ন| বাইরে অবিরাম ধারাবর্ষণ আর এই গুহার ভিতরে নরম প্রদীপের আলোয় আমি তুলি হাতে প্রাণ দিচ্ছি কোন অপ্সরার দীঘল টানা চোখের তারায় অথবা ছেনি হাতে একটু একটু করে পাথরের বুকে ফুটিয়ে তুলছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির ধ্যানস্নিগ্ধ মূর্তিখানি| প্রথম থেকে শেষ‚ শেষ থেকে প্রথম‚ দেখতে দেখতে শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল‚ এই সৃষ্টি যে শিল্পীদের হাতে হয়েছিল‚ তাঁরা সকলেই ছিলেন সংসারত্যাগী অর্হত| অথচ কি অসামান্য তাঁদের দেখার চোখ! মানবশরীরের প্রতিটি ভাঁজ এমন নিখুঁত ক'রে আঁকা সম্ভব‚ তাও পাথরের গায়ে‚ অত সামান্য উপকরণে! অথবা হয়্ত সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচিত হলেই এমন ক'রে দেখা যায় আর রঙ-তুলিতে আঁকা যায় বা পাথর খুদে এমন ক'রে গড়া যায়| গুহার মধ্যে কোন আলেখ্যর সামনে দাঁড়িয়ে যখন দেখি‚ তখন দেখি এক বাঙ্ময় স্থিরচিত্রটি| যতবারই চলতে শুরু করি‚ মনে হয় ছবির মানুষ-মানুষী‚ পশুপাখি‚ দেবদেবী‚ অপ্সরা-কিন্নরী‚ সকলে যেন নড়েচড়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে| ঐ অত উঁচু উঁচু ছাদে কিভাবে কেউ আঁকে অমন ক'রে? কিভাবেই বা বিশদে খোদাই করে পাহাড় কেটে অমন সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম সব নক্সা আর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূর্তিগুলো? অতি ক্ষুদ্র মানবী আমি‚ আমার ততোধিক ক্ষুদ্র মননের সাধ্য কি এর কোন তলকূল পায়? সাধনা বুঝি একেই বলে| জাতকের গল্পগুলো‚ বোধিসত্ত্ব‚ চারটে হরিণের একটা মাথা‚ আরশি হাতে অঙ্গনার ঝকমকে কন্ঠহারটি.... এক এক দিক থেকে এক এক রকম দেখায়‚ হাজার হাজার বছর আগে আধো অন্ধ্কার গুহার মধ্যে কেমন করে সৃষ্টি করলেন সন্ন্যাসী শিল্পীরা এমন সব থ্রী ডাইমেনশন্যাল ছবি? আর একটা ট্রেণ্ড চোখে পড়ল| চিত্রিত অপ্সরারা অনেকেই কৃষ্ণাঙ্গী| So black lives really did matter then? দেখতে দেখতে দিন ফুরিয়ে এল‚ ফিরে যেতে হবে| মনে হল কিছুই দেখা হল না‚ এক বিশাল সমুদ্রের সামনে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি‚ মুঠোর ফাঁক গলে পড়ে যাচ্ছে সব জল‚ রয়ে গেছে শুধু কয়েক দানা ঝিকমিকে বালুকণা| ঠিক কত দিন ধ'রে দেখলে যে সব ঠিকমত ভালো ক'রে দেখা যায়‚ কে জানে? আসার আগে খানিকটা পড়াশোনা ক'রে এসেছিলাম‚ সব যে বৃথা গেছে তা বলতে পারব না‚ দেখতে‚ বুঝতে অনেক সুবিধা হয়েছে| না হলে অন্ধের হস্তীদর্শন ক'রেই ফিরে যেতে হত| বুঁদ হয়ে এসে দাঁড়াই শেষবারের মত ১ নম্বর গুহার সেই ছবিটার সামনে‚ যেটা নিয়ে তুমুল কৌতুহল জেগেছিল বর্ণনা প'ড়ে..... ঊর্ধ্বমুখী রাহুল আর যশোধরার সামনে তথাগত বুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন মাথা ঝুঁকিয়ে‚ হাতে ভিক্ষাপাত্র‚ পরনে উজ্জ্বল কাষায় বর্ণের চীবর| আগেই বলেছি‚ ছবির ব্যাপারে আমি নিতান্তই নিরেট গবেট| তবে এটুকু বুঝি‚ ছবি আসলে রেখায় আর রঙে লেখা গল্প| সব ছবির মধ্যে দিয়েই শিল্পী কোন একটা বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিতে চান দর্শকের কাছে| তথাগত তো বড়ই‚ অনেক বড়‚ এত বড় যে কোন মাপেই মাপা যায় না তাঁকে| আর রাহুল না হয় শিশু‚ কিন্তু যশোধরা? তিনি কি এতই ক্ষুদ্র? গৌতমের সহধর্মিনী একেবারে হেলাফেলার মত কোন তুচ্ছ মানবী ছিলেন কি? তাঁর শরীরের মাপটি এত ছোট ক'রে কেন আঁকলেন শিল্পী? খুব স্বাভাবিক ভাবেই এইসব শিল্পী শ্রমণদের হৃদয়ে তথাগত বুদ্ধের চেয়ে বড় আর কেউ ছিলেন না| গুহাগুলোর অসাধারণ বুদ্ধমূর্তিগুলো তার প্রমাণ| তিনি সব মাপ ছাড়িয়ে| কিন্তু এই শিল্পীদের আঁকা ছবির অন্যতম বিশেষত্ব মনে হচ্ছিল মাত্রা আর সমানুপাতিকতার (is it even a word?) আন্দাজ| শুধু এই ছবিটা অন্যরকম‚ সে কি ছবিতে সম্বুদ্ধর অধিষ্ঠানের জন্যই?? নাকি‚ এই দৃশ্যভাবনা‚ এই আনুপাতিক অন্যমাত্রাটি গোপার মনের চোখে দেখতে চাওয়া? সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাবার আগে একবার পিছু ফিরে চাই‚ আলো সরে গেছে পাহাড়ের পিছনে‚ গুহামুখে এক মায়ালি আঁধার থিতু হচ্ছে আস্তে আস্তে‚ মনের মধ্যে অনেক দূরে ঘন্টা বাজে‚ ভেসে আসে প্রার্থনা ধ্বনি‚ "নমো তস্স ভাগবতো অরহতো সমা সম্বুদ্ধস্স‚ নমো তস্স‚ নমো তস্স‚ নমো তস্স‚ নমো তস্স"| অনেক নীচে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে ছোট্ট নদীটি| কি যেন নদীটার নাম? ওয়ঘুর নাকি বাঘুর..... এই প্রত্যেকটা গুহার সামনে থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নাকি কাটা ছিল ঐ নদীর কাছে নেমে যেতে| ধ্বস নেমে সেসব হারিয়ে গেছে‚ দু'এক জায়গায় দেখলাম সেই সিঁড়িমুখ জাল দিয়ে ঘিরে বন্ধ করে দেওয়া রয়েছে‚ সম্ভবত আমার মত আছাড়বিলাসিনীদের অধোগতি সামাল দিতে| সামান্য একটু খেয়ে নিয়ে পার্কিঙে ফিরে গাড়িতে যখন উঠলাম এক অদ্ভুত প্রশান্ত ক্লান্তিতে ছেয়ে গেছে সমস্ত শরীর| ভারি পূর্ণ দিনটি আজ‚ ভারি সার্থক‚ এমন দিন কালেভদ্রে জীবনে আসে| কিন্তু ড্রাইভারসাহেব ব্যাজার মুখে বললেন‚ "বড্ড দেরি করে ফেললেন‚ পাঁচ ঘন্টার বেশি রাস্স্তা সামনে"| শুনে আমি বিষম খাই আর কি| "পাঁ-আ-আ-চ ঘন্টা? ১০০ কিলোমিটার যেতে পাঁচ ঘন্টার বেশি লাগবে"? "জী‚ রাস্তা বহোত খারাব হ্যায়"| খারাব যে কত খারাপ হতে পারে সে তো আগের দিন আসার পথেই দেখেছিলাম| সত্যি সত্যিই এগারোটা বেজে গেল ইলোরাতে হোটেলে পৌঁছোতে| দশটার পরে হোটেল থেকে ফোন| তাদের আশ্বস্ত করা হল "আসছি‚ আসছি‚ এই ত্তো পৌঁছে গেলুম বলে"| রাতের খাবারও ফোনেই অর্ডার দিয়ে দেওয়া হল| অত রাতে অচেনা শহরে কোথায় আর যাব খেতে? পথে মিনিট চল্লিশের জন্য একটা স্টপ‚ বিবি কা মকবরায়| হ্যাঁ‚ ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেই ঝড়ের গতিতে যতটুকু দেখা যায় বিবি কা মকবরা‚ দেখে নিলাম| শুধু আমরাই নয় দিনশেষের দর্শনার্থী‚ আরো অনেক লোক দেখলাম সন্ধ্যার অতিথি| বেশ ভিড়‚ মনে হল কোন স্কুল থেকে বেশ বড়সড় একটা দল এসেছে| তারপর সোজা হোটেলে ঢুকে স্নান-খাওয়া সেরে বিছানায়| সারা রাত স্বপ্নে ফিরে ফিরে গেলাম অজন্তার গুহা থেকে গুহায় আমার ভুলে যাওয়া পূর্বজন্মের কাছে| জ্ঞানী‚ গুণী জনেরা যেমন পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই মত সকাল সকালই আবার বেরিয়ে পড়লাম| অর সবার মতই কৈলাস মন্দির দিয়ে ইলোরা শুরু করলাম| তবে সকাল সাড়ে সাতটাতেই বেশ ভিড়| আজ আর গাইড নিই নি| বুঝতেই পেরেছিলাম সব দেখা সম্ভব হবে না| তাই প্রথমেই ঠিক করে নিলাম কোনগুলো দেখব| আগের দিনের ঘোরই তখনও কাটে নি চোখ থেকে| ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে ১৬ নম্বর দেখলাম| বিস্ময়ে বাক্যি হরে যায় আমাদের মুখ থেকে| কি অসাধারণ শৈলী‚ হাতিগুলো যেন জীবন্ত| পাথর খোদাই ক'রে মুখের ভাবে অমন আনন্দ‚ ক্রোধ ফুটিয়ে তোলা যায়! সাতটি যে পৃথিবীর বিস্ময়‚ তার কোনটার চেয়েই কোন অংশে কম কি এই স্থাপত্য‚ এই ভাস্কর্য! চাইলে মানুষ কি না পারে? তারপর ১৫ নম্বরের নটরাজ‚ ১৪ নম্বরের দুগ্গাঠাকুর দেখে ১২‚ ১১‚ ১০ আর ৫| তাতেই কম্মো কাবার| ১৫‚ ১২ আর ১১-তে ইয়া উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে দোতলা‚ তিনতলা উঠে নেমে হাঁটু পুরো চচ্চড়ি| ১০ নম্বর চৈত্যটাতে সম্বুদ্ধের পায়ের কাছে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে| আর উঠতে ইচ্ছা করছিল না| ভিড় তেমন নেই‚ কি যে শান্তি..... এই অবধি দেখতেই চড়চড়ে রোদ মাথার ওপর‚ দুপুর বারোটা‚ ক্ষিদেও পেয়ে গেছে| খেতে খেতে অনেক হিসেব-নিকেশ ক'রে দেখা গেল‚ দিন একটা কম পড়িতেছে| বাকি হিন্দু বা জৈন মন্দিরগুলো দেখতে গেলে দৌলতাবাদ দুর্গে একটু টুকি দেওয়াও সম্ভব হবে না| তার উপর আবার জলগাঁওতে ফিরতে হবে রাতে| অন্ততপক্ষে আর একটা দিনের প্রয়োজন ছিল| অগত্যা ভোজনান্তে দৌলতাবাদের পথেই যাত্রা| রাস্তায় পইঠানি শাড়ির দোকান একের পর এক| বোনকে বললাম "কিনবি? চল দেখি একটু"| কিন্তু বোন রাজি হল না| আর আমার তো শাড়ির সঙ্গে খুব একটা সুহৃদ কোনকালেই নেই‚ আমিও শাড়িকে এড়িয়ে চলি‚ শাড়িও আমার থেকে দূরে থাকলেই সম্মান বজায় থাকে তার| পরের স্টপ দৌলতাবাদ দুর্গ| মানুষে মানুষে ছয়লাপ‚ প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটি যে| চাঁদিফাটা রোদ্দুর আর ভ্যাপসা গরম‚ অথচ লোকে তারই মধ্যে দিব্যি জ্যাকেট‚ কম্ফর্টার‚ সোয়েটার‚ শাল গায়ে‚ মাথায় চাপিয়ে ঘুরছে| আবারও সেই একই আফসোস‚ তিন চার ঘন্টায় কতটুকু আর দেখা সম্ভব? চাঁদ মিনারে চড়া হল না| আন্ধেরি থেকে বেরিয়েই দম শেষ‚ সময়ও শেষ‚ টিলার মাথায় আর যাওয়া হল না| তবু কিছু তো হল‚ বেরিয়ে একটু ডাবের জল খেয়ে গাড়িতে ফিরে যাই| আবার যাত্রা শুরু| অওরঙ্গাবাদ শহরটার সারা শরীরে ইতিহাসের জারদৌসি গন্ধ মাখা| ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেখি‚ থমকে থাকি তার কাছে সেই গন্ধ বুক ভ'রে নিতে| কিন্তু আমি ভিনদেশি পঞ্ছী‚ আমার সময় মাপা‚ বেহিসাবি ওড়ার ছুটি কিসমতে তো লেখা নেই| তাই শুধু দুই চোখ মেলে দেখি গাড়ির জানালা নামিয়ে দিয়ে| আবার সেই খানা-খন্দ‚ ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে পাঁচ-ছ ঘন্টার ওয়াস্তা| শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার পরে আর দ্রষ্টব্য কিছু নেই‚ সামনে-পিছনে শুধু আখবোঝাই লরি আর ম্যাটাডোর‚ আর দুপাশে ক্ষেতি-জমি| সন্ধ্যা তখন ঘন হয়ে এসেছে‚ হাইওয়ের পাশেই একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম| চায়ের তেষ্টা বা প্রয়োজন যত না তার চেয়েও ঢের বেশি প্রয়োজন একটা ওয়াশরুম বা টয়লেটের| কিন্তু ভারতবর্ষে এই একটা বেসিক প্রয়োজন এত অবহেলিত‚ বিশেষ করে মেয়েদের জন্য..... আসলে শিবঠাকুরের আপন দেশে মেয়েদের তো ওসবের বালাই থাকতে নেই‚ ওসব নিয়ে কিছু বলাটাও ভারি লজার ব্যাপার| কিন্তু আমি তো সেসব হায়া লজ্জা ত্যাগ দিয়েছি বহুকাল| আধাচেনা‚ অল্পচেনা সাথীদের সাথে পাহাড়-জঙ্গল মেপে বেড়াই দিনের পর দিন| দলের মধ্যে যে কেউ প্রয়োজন হলেই বিনি দ্বিধায় পি পি স্টপ চাইতে পারে| তার জন্য লজ্জায় অধোবদন হতে হয় না‚ সব প্রাকৃতিক প্রয়োজন ডাক্ট টেপ সেঁটে বন্ধ করে পথে বেরোতে হয় না‚ মেয়েমানুষ হলেও নয়| চায়ের অর্ডার দিয়েই তাই সটান শুধালাম ওয়াশরুমটা কোন দিকে| দোকানদাদা মধুর হেসে দোকানের পিছনে দিকনির্দেশ করলেন| তিনজনে হাত ধরাধরি ক'রে রওনা দিলাম সেদিক পানে| টিনের দরজা আধাখোলা অন্ধকার গা-ছমছমে বীভৎস এক ব্যাপার সে| পাশে তিন ফুটের মধ্যেই আখের ক্ষেত| দেখেই আমার জংলী স্বভাব মাথা চাড়া দিয়ে উঠল| মাথার উপরে তারার ছিটে লাগা অন্ধকার আকাশ‚ চারধার ঘিরে মাথা ছাড়ানো আখের গাছের আব্রু‚ এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কি হতে পারে এই দিকশূন্যপুরের মাঝমধ্যিখানে? বোনকে বললাম‚ "ঐ রাজকীয় ওয়াশরুমে আমি যাচ্ছি না‚ আমি চল্লুম ঐ দিকে আখের বনে"| এক এক করে তিনজনেই প্রকৃতির নিজের হাতে বানানো সেই আনোখি টয়লেটেই হাল্কা হলাম| সব বেশ গোঁফ মুচকে হাসছেন তো এই কাহিনী প'ড়ে? আর ভাবছেন‚ কি বেহায়া রে বাবা! হাসুন আর যা খুশি ভাবুন‚ এই কাহিনীটুকু না লিখলে আমার চলত না| এ যে নিজেকে হারিয়ে খোঁজার গল্প আমার| জলগাঁও পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত দশটা বেজে গেল| একেবারে স্টেশনের অদূরেই হোটেল আমাদের‚ বেশ সদরসই এলাকায়| আশেপাশে দোকানপাট‚ অটো‚ রিক্সা‚ গাড়ি‚ লোকজন‚ জমজমাট রাত দশটা পার করেও| হোটেলে রুম সার্ভিসে খাবার অর্ডার দিয়ে একে একে স্নান সারি সবাই| পরের দিন সকাল সাড়ে দশটায় কলকাতা ফেরার ট্রেন| খুব সকালে ওঠার কোন তাড়া নেই| শুয়ে শুয়ে গল্পে গল্পে রাত নিশুত হয়ে যায়| কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল দুটো দিন! সেই ঘোরের রেশ চোখে নিয়েই শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম| ঘুম ভাঙলো আটটা বাজিয়ে| গোছগাছ মোটামুটি অগের রাতেই সব করা ছিল| চটপট রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে নটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম স্টেশনে| প্ল্যাটফরম নম্বর তখনো ঘোষণা হয় নি| কাজেই ওভারব্রিজে উঠে মাঝামাঝি জায়গায় ব্যাগ-বাক্স নামিয়ে অপেক্ষা করি‚ শুরু হয় আমার ফেভারিট পাসটাইম‚ মানুষ দেখা| একটি বাচ্চা মেয়ে‚ সম্ভবত নবপরিণীতা‚ হাতে গাঢ় মেহেন্দি‚ সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর‚ কপালে টুকটুকে বিন্দি‚ বারবার সরে যাওয়া অনভ্যস্ত ঘোমটা‚ দুই হাত ভর্তি চুড়ি‚ নাকে ঝিকমিকে নথলিয়া‚ পায়ে রুমঝুম পায়েলিয়া‚ ঝলমলে শাড়ি-ব্লাউস‚ তার চেয়েও ঝলমলে মুখের সলাজ হাসিটি| একটু ওপাশে চোদ্দ পনেরো জনের মস্ত একটা দল‚ মনে হল বিয়েবাড়ি ফেরত‚ বেশ মোটাসোটা থপথপে সব মহিলা পুরুষ‚ চলন-বলন‚ পোষাক-আশাকে বিত্তের ছাপ বেশ স্পষ্ট| সাথে জনা তিন চার জিন্সশোভিত কিশোর-কিশোরী‚ একটা বাচ্চাও রয়েছে একজনের কোলে| সবার হাতেই একটা করে ছোট গিফট ব্যাগ‚ তাতে লেখা‚ Avi Weds Rekha... বোনের শ্যামের বাঁশিটি থুড়ি ফোনখানা বেজেই চলেছে কয়েক মিনিট পর পর‚ অন্যপ্রান্তে ওর চিন্তাকুল পতিদেবতা| ওদিকে ক্যামেরা চলছে‚ জোনাকের‚ "এদিকে তাকাও‚ অমন করে নয়‚ একটু হাসো"..... ট্রেন এল‚ মিনিট পনের দেরি করে‚ আহমেদাবাদ এক্সপ্রেস| আবার দেখা হল তেইশ বছর পরে| কিন্তু না হলেই বোধ হয় ভালো হত| পুরনো প্রেম স্মৃতিতেই থাকা ভালো| ট্রেনে উঠে সীট খুঁজে বসে পর্দা সরিয়ে দেখি জানালার কাচ ধুলায় ধুসর হয়ে পুরো ঘষা কাচ হয়ে গেছে‚ কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না বাইরে| বৃটিশ আমলে বোধহয় শেষবারের মত ধোয়া-মোছা হয়েছিল এই কামরাটা| তার সাথে বাথরুম থেকে ঝাঁঝালো অ্যামোনিয়ার বদবু‚ প্রত্যেকবার দরজা খোলাবন্ধ হবার সাথে সাথে| আগের মত জঘন্য ব্যবস্থা কিন্তু আর নেই ট্রেনের ওয়াশরুমে| বায়ো-টয়্লেটে পর্যাপ্ত জলের ব্যব্স্থা রয়েছে‚ লিক্যুইড সোপ রয়েছে হাত ধোবার জন্য‚ নির্দেশ বিধি লেখা রয়েছে একাধিক ভাষায়| তবু মানুষ এত নোংরা যে কেন? একটা ফ্ল্যাশ করতে এত অসুবিধা কিসের? ইচ্ছে হচ্ছিল ট্রেনশুদ্ধু সব্বাইকে ঐ টয়লেটে নিয়ে গিয়ে ফ্ল্যাশ করে দিতে‚ দুনিয়ার আপদ যত....নাকে রুমাল বেঁধে ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষা করি| ট্রেন ছাড়ার পরে যথাবিহিত শুরু হয়ে গেল নাটকের পরের পর্বগুলো| সেই অভি এবং রেখার বিয়ে খেয়ে ফেরা চোদ্দজনের দলের বারোজন যাত্রী পাশের লাগোয়া ছয়টি সীটে| টিটির সঙ্গে ধুন্ধুমার বেঁধে যায় তাদের| মাঝরাতে বিলাসপুরে নেমে যাবেন তেনারা‚ কাজেই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ায় ছয়খানা সীটে ভাগজোগ করে বারোজন চলে যাবার হক তেনাদের ষোল আনা আছে| প্রভূত ঝামেলার শেষে সেই মূল্য ধরে দিয়ে উতরে যাওয়া| এর মধ্যে এসি বন্ধ হয়ে গেছে‚ গরমের চোটে দম বন্ধ হয়ে যায় আর কি| অ্যাটেন্ড্যান্টকে ধরে জানা গেল‚ কোন এক সহযাত্রীর ঠাণ্ডা লাগার ধাত| কাজেই তার অনুরোধে এসি কমিয়ে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে| বাদানুবাদে না গিয়ে সোজাসুজি আমার মাসতুতো বোনের বরকে ফোন লাগালাম| তিনি ভারতীয় রেলের কেষ্টুবিষ্টু কর্মচারী| একটি ফোনেই এসি সমস্যা মিটে গেল বাকি পথের জন্য| হুঁ হুঁ বাবা‚ when you are in Rome.... ভগ্নীপতি সাবধান করে দিল‚ "দিদি প্যান্ট্রি থেকে খাবার যদি কিছু অর্ডার করেন‚ রিসিট ছাড়া এক পয়সাও দেবেন না কিন্তু"| এই সাবধানবাণীর মর্মার্থ বুঝলাম পরের দিন দুপুরে কলকাতায় ঢোকার আগে| বিল চাইতে কত হয়েছে মুখে মুখে হিসেব ক'রে দিল প্যান্ট্রিভাইডি| টাকা দিতে যাচ্ছি‚ এমন সময় বোন মনে করালো‚ "দাঁড়া‚ রিসিটটা নিয়ে আসুন তো"| ব্যস‚ সে গেল তো গেলই‚ আর আসে না| অনেক ডাকখোঁজ করে আরেকজনকে ধরে যখন রিসিট পাওয়া গেল হাতে‚ দেখলাম তাতে পঁচানব্বই টাকা কম রয়েছে হিসেবে| রিসিট রহস্য উন্মোচিত হল| আবার একবার মনটা তেতো হয়ে গেল| কেন মানুষ নিজেকে এভাবে ছোট করে? একশো টাকা তো টিপস হিসেবে এমনিতেই এক্সট্রা দেব‚ ভেবে রেখেছিলাম..... নাহ!! "হয়েছে? সাধ মিটেছে? মন ভরেছে? কি রোম্যান্টিক! আর চড়বি না ট্রেনে?"......বোন শুধায়| হয়তো আর ট্রেনে চড়বো না| কিন্তু সাধ কি মেটে? সাধ কি মেটার? উট তাহলে কাঁটা খায় কেন? "বিদ্যুচ্চমকে দেখা যায় -- অর্ধেক মানুষ আজ মরে আছে আমার স্বদেশে। মরে আছে, তবু তারা কথা বলে, বাসে ওঠে, বাস থেকে নামে, পরস্পরের দিকে থুতু ছুঁড়ে হো হো ক'রে হাসে এত গাঢ় অন্ধকার, প্রথমে কিছুই চোখে পড়ে না সহজে। কিন্তু যদি দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ করা যায়, শরীরে সমস্ত রক্ত এক জায়গায় জড়ো হয়, তা'হলে বুকের ভেতর থেকে ঠেলে-বাইরে-চ'লে-আসা বিদ্যুৎ-চমকে দেখা যায় -- অন্তত অর্ধেক লোক মরে আছে আমার স্বদেশে ।"....

381

19

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

বাগান নিয়ে আরো একটু লিখব ভাবছিলাম‚ তার আগেই মনে হল সদ্য শেষ করা বইটা সম্পর্কে দুই চার লাইন লিখে রাখি| কিজানি কালকে লেখার জন্য ফেলে রাখলে এইসব ভাবনাগুলো হারিয়েও গেলেও যেতে পারে| ভোর সকালে ‘A Burning’ পড়ে শেষ করার পর থেকে মনে মনে জাবর কেটে চলেছি| উপন্যাসে বর্ণিত কাল্পনিক ঘটনাগুলির সাথে আজকের পরিস্থিতির ‌অনেকটাই মিল। লেখিকা‚ মেঘা মজুমদার‚ কলকাতায় বড় হয়েছেন‚ আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে সে দেশেই বাসস্থান গড়েছেন| কিন্তু তাঁর উপন্যাসের ক্ষেত্র কলকাতা শহর। আর কলকাতার পটভূমিকায় লেখা বলেই বইটিতে একাত্ম হতে কোনো অসুবিধে হয়না| উপন্যাসটি সহজ-সরল ইংরেজিতে লেখা‚ তাই বারবার অর্থ খোঁজার বিড়ম্বনায় রসভঙ্গ ঘটেনি| কিছু কিছু জায়গায় মেঘা সরাসরি বাংলা শব্দ ইংরেজিতে লিখেছেন‚ যেমন চায়ে ফুঁ দিয়ে খাওয়া| উনি phoo শব্দটি অপরিবর্তিত রেখেছেন| পড়ে বাঙালি বলেই যেন আরো বেশি তৃপ্তি পাই| প্রায় তিনশোপাতার সংক্ষিপ্ত উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একটি উগ্রপন্থী হামলার ঠিক পরে পরেই তিনটি মূল চরিত্রকে কেন্দ্র করে| জীভন‚ এক অল্পবয়সী মুসলিম মেয়ে‚ লাভলি‚ একজন হিজরা আর পি টি স্যার‚ একটি স্কুলের শিক্ষক| এই তিনজনে গরীব এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ কেমন করে নিজেদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করার প্রবল চাহিদায় বিবেক- নীতিবোধ বিসর্জন দেয় তাইই হল উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। কিন্তু প্রশ্ন হল অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর পরে চরিত্রেরা কি বাকি জীবন ভারহীন সুখ‚ আরাম‚ জনপ্রিয়তা উপভোগ করতে পারে? মূল গল্পের সাথে সাথে লেখিকা সঙ্গত কারণেই নানান সামাজিক স্পর্শকাতর বিষয়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছেন। দুর্নীতি-দুরাচার‚ হিজরাদের প্রতি শঙ্কিত ভীতি‚ ইসলাম ধর্মাবালম্বীদের প্রতি ঘৃণা‚ সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধকার দিক‚ দুর্বলের প্রতি অন্যায়-অবিচার এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা ক্ষেত্র| উপন্যাসটি পড়তে পড়তে চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল এখানকার দিনের এই নিষ্করুণ সমাজের যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত নানাবিধ মুখ আর তাদের সাথে হয়ে চলা অসংখ্য বাকরুদ্ধ করা নিষ্ঠুর ঘটনা। “MOTHER DO YOU GRIEVE? Know that I will return to you. I will be a flutter in the leaves above where you sit, cooking ruti on the stove. I will be the stray cloud which shield you from days of sun. I will be the thunder that wakes you before rain floods the room. When you walk to market, I will return to you footprint on the soil. At night, when you close your eyes, I will appear as impress on the bed.” পড়া শেষ করে মনে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের সাথে এবং চারিপাশে প্রতিনিয়ত যে এত অন্যায় অবিচার হয়ে চলেছে; তারমধ্যে একটি মানুষকেও এতটুকু সুবিচার দেবার সাধ্য কতটুকু আমাদের? সুবিচার তো দূরের কথা, অনিচ্ছা সত্বেও প্রতিদিন যে সমস্ত রকম ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী থেকে যাই, তার দ্বারা প্রভাবিত না হওয়ার, নিজেদের চিন্তা ভাবনার স্বচ্ছতা বজায় রাখার, কোনোরকম ভাবে নিজ নিজ আত্মা-বোধ-বুদ্ধি কলুষিত করতে না পারার ক্ষমতা বজায় রাখা সত্যিই কতটা সম্ভব আমাদের পক্ষে? তাই মনে করছি‚ কাউকে সুবিচার দেওয়ার ক্ষমতা নাইবা রইলো‚ শুধু যা মনে ধ্রুব সত্য বলে মানি‚ তার সাথে বাস্তবিক ঘটনার সম্পর্ক ঠিক কতটুকু‚ তা প্রতিনিয়ত খতিয়ে দেখার বিবেচনা শক্তি যেন নিজেদের মধ্যে গড়ে নিতে পারি| এইটুকু পারলেই অনেকটা পারা হবে|

3472

207

Joy

দুর্গাপুজো- অনেক ভাললাগা‚ কিছু স্মৃতি (প্রথম পর্ব)

(দ্বিতীয় পর্ব): দশমীর বিসর্জনের বাজনা ফিকে হতে না হতেই দ্বাদশীর দিন সকাল সকাল আমরা পৌঁছে যেতাম বড় জ্যেঠুর বাড়ী| সিঁথির কাছে পালপাড়া ফাঁড়িতে| আমরা ছাড়াও আমার নকাকু‚ কাকিমা‚ ফুল কাকু‚ কাকিমা‚ সেজো পিসি‚ পিসোমশায় ও দাদা‚ ভাই‚ দিদিরা‚ বোনেরা| এতজন মিলে গমগম করত পালপাড়া ফাঁড়ির ছোটো বাড়িটা| আমার বড় জ্যেঠু ও জ্যেঠিমা দুজনেই স্কুল টিচার ছিলেন| দুজনের কেউই খুব রাগী ছিলেন না| শান্ত অথচ এক নিপুন আভিজাত্য যা সকলের সম্ভ্রম আদায় করে| বাবা‚ কাকারা গল্প‚ তাসখেলা‚ আড্ডা মেরে সময় কাটাতেন| মা‚ জ্যেঠিমা ও কাকিমারা গল্প ও তার সাথে রান্না-বান্নায় মেতে উঠতেন| জ্যেঠিমা কাউকে রান্নার দিকে যেতে দিতেন না| তিনি নিজেই সব রান্না করতেন| কিন্তু সব জা রা মিলে হই-হই করে কাটত দুপুরবেলা| আমার সব পিসিরাই খুব স্নেহপ্রবন ছিলেন| তার মধ্য আমাদের সেজপিসি খুব ভাল মানুষ| তিনি মা আনন্দময়ীর কাছে দীক্ষিত ছিলেন| পিসোমশায় খুব রাজসিক ব্যক্তি ছিলেন| চৌরঙ্গীর বিখ্যাত সেনগুপ্ত বাড়ির পুত্র| ডা: নলিনী রঞ্জন সেনগুপ্তের বাড়ি| পিসোমশায় সঙ্গে কথা বললে সব জিনিষের ভিতরে তিনি ঢুকে যেতেন| সেই ব্যাপারে বিস্তারিত খবর নেবার পর আমাদের ছাড় ছিল| আর কাকা‚ জ্যেঠুর সামনে পড়াশোনা ও অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন শুরু হলেই আমাদের ঘাম আসতে শুরু হত| পিসি‚ পিসোমশায়ের দৌলতে সেই যাত্রায় আমরা রক্ষা পেতাম| পিসি বলতেন তোমরা আজকেও ওদের একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না| যা রে তোরা খেল| আমারা তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচাতাম| আমর দুই জ্যেঠতুতো দাদা আমাদের থেকে অনেক বড় ফলে তাদের থেকে আমরা একটু দুরত্ব রেখেই চলতাম| কোনও কোনও সময় আমারা দুপুরে খাবার পর বাবা‚ কাকাদের মুখে আমাদের দেশের বাড়ির গল্প শুনতাম| নদীয়া জেলায় মুড়াগাছায় অনেক বড় বাড়ি ছিল আমাদের| অনেক রকম আম গাছ ছিল| আর ছিল জাম‚ কাঁঠাল‚ পেয়ারা‚ বেদানা ও নানান রকম ফুলের গাছ| আমরা বেশ কয়েকবার দেশের বাড়ি বেড়াতে গেছিলাম| চৈত্র মাসে চড়কের সময় খুব বড় করে পুজো হত আমাদের বাড়ির দালানে| গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যায় উচ্ছ্বল গঙ্গা| বেশ চওড়া নদীটি| আমরা দেশে গেলে গঙ্গা স্নান করতে যেতাম| বাবার মুখে শোনা বাবা‚ কাকারা সাঁতরে গঙ্গা পার হতেন| দেশের বাড়ির গল্প বলতে বলতে বা‚ কাকারা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন| কাকিমারা বলতেন তোদের কাকুদের সেই একই গল্প| কত বড় বাড়ি‚ পুকুর| কত গাছ‚ কত মাছ ধরা হত| এত বড় বাড়ি‚ জমি কিছুই তো আর রাখতে পারলে না| সব তো ওপার বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তুরা দখল করে নিয়েছিল| চুপ করে যেত বাবা‚ কাকারা| তখন জানতাম না নিজের বাড়ি‚ নিজের ভিটে মাটি হারানোর দু:খ কি হয়| খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই যখন একটু জিরিয়ে নিত তখন আমরা ভাইরা ছাদে চলে যেতাম| শুরু হত দুষ্টুমি| ছাদের কার্নিশে হাঁটা| আমাদের ছাদে থেকে গা ঘেঁষা বাড়িগুলোর ছাদে যাওয়া| একটু বড় হলে আমাদের মধ্যে বড়রা লুকিয়ে সিগারেট নিয়ে আসত| সবারই চোখ এড়িয়ে ছাদে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটা যুদ্ধ জয়ের থেকে কোন অংশে কম ছিল না| এই সিগারেট প্লাস্টিক প্যাকেটের মধ্যে মুড়ে লুকিয়ে ছাদে নিয়ে আসা হত| সেই সিগারেটের অবস্থা তখন আর ভাল থাকত না| কোথাও চিড় খেয়েছে তো কোথাও মচকে গেছে| যাইহোক তখন এই মহা মূল্যবান বস্তুটি পেয়ে সব ভাইরা মিলে একটা টান দেওয়া হত| ছোটরা আমাদের কাছে আসার সাহস পেত না| ওদের আবার একটা আলাদা গ্রুপ| ছোটদের কাজ ছিল সিঁড়ির কাছে পাহাড়া দেওয়া| বড়রা কেউ এলেই আওয়াজ করে আমাদের সতর্ক করে দিত| একটা টান দিতেই খক খক কাশি| সবার কাছেই নতুন এক অভিজ্ঞতা| কলেজে পড়ার সময় কোন মেয়েকে কার ভাল লেগেছে তার গল্প| কেউ বা ক্লাস ফাঁকি মেরে সিনেমা যাওয়ার গল্প| অথবা কখনো ভাই বোনেরা মিলে অন্তাক্ষরী খেলে বিকেলটা কেটে যেত| তখন ভিসিপি‚ ভিসিআর এর খুব প্রচলন ছিল| যেকোন প্রোগ্রামে‚ বিয়েবাড়ী বা পাড়ায় শিবরাত্রিতে ভিসিপি‚ ভিসিআর নিয়ে আসা হত সিনেমা দেখার জন্যে| বড় বড় সিনেমার ক্যাসেট থাকত| বড়দা ভিসিপি‚ ভিসিআর ভাড়া করে নিয়ে আসতেন| সিনেমা দেখা হবে সন্ধে থেকে শুরু করে সারা রাত| আমরা সবাই জ্যেঠুর বাড়ী থেকে রাতজেগে সিনেমা দেখে পরদিন বাড়ি আসব| মা‚ কাকিমারা বড়দাকে বলতেন খোকন ভাল বাংলা সিনেমা নিয়ে আসিস বাবা| আমরা যারা উদ্ভিন্ন যৌবনের দল আমাদের পছন্দ অন্যরকম| বড়দা বেশ ভালভাবে সবাইকে সন্তুষ্ট করতেন| আমাদের বলতেন তোরা আমার সঙ্গে আয়| বড়দা খুব দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন| আমাদের সবাইকে রোল অথবা আইসক্রীম খাওয়াতেন| সঙ্গে দু একজন লাগতই বড় বড় ভিসিপি‚ ভিসিআর মেসিন আর বেশ কয়েকটা বড় বড় ক্যাসেট আনতে| বড়দা আমাদের বলতেন তোরা কি সিনেমা দেখতে চাস? আমাদের মনের ভিতর দিয়ে তখন তরতর করে খুশির স্রোত বইছে| হিন্দি সিনেমা‚ প্রেমের সিনেমা বলতে ইচ্ছে করে| কিন্তু বড়দাকে আমরা সম্মান করতাম তাই ঢোক গিলে বলতাম কিছু ভাল ইংরাজী আর কিছু হিন্দি সিনেমা থাকলে দেখো| বড়দা তখন তার জ্ঞানের ভান্ডার উপুড় করে দিতেন| চল আজ তোদের ভুতের ইংলিশ সিনেমা দেখাবো| তখন টিভিতে সপ্তাহে সর্ব সাকুল্যে দুটি সিনেমা সম্প্রচারিত হত| শনি ও রবিবার একটি হিন্দি ও একটি বাংলা| তাও কয়েকজনের বাড়িতে সাদা কালো টিভি| চিত্রহার‚ চিত্রমালা ও শনিবার‚ রবিবারের বহু কাঙ্খিত সিনেমা দেখার জন্যে আশে পাশে বাড়ি থেকে প্রতিবেশীদের ভিড়| খোলা জানালাতেও বাচ্চা-কাচ্চাদের টিভি দেখার উঁকি-ঝুঁকি| কেউ খারাপ মনে করত না| বরং যাদের বাড়িতে টিভি আছে তারা মনে মনে আনন্দিত হত বলে আমার মনে হয়| এর অনেক পরে ডিডি২ চ্যানেল আসে| তাও সবসময় আমাদের দেখা হত না| পড়াশোনা‚ কোচিং না হলে মা‚ বাবার থেকে পারমিশন না পাওয়া| এই ভাবে মনের দু:খেই কাটত আমাদের কৈশোর| ফলে এই দিন জ্যেঠুর বাড়িতে একসাথে এতগুলো সিনেমা দেখতে পাওয়া র আনন্দ অপরিসীম ছিল| আজ মুক্তির আনন্দ| কিন্তু বাবা‚ কাকারা আবার হিন্দি‚ ইংলিশ সিনেমা নিয়ে আপত্তি করবেন না তো| বড়দা আমাদের আশ্বস্ত করতেন| কিছু হবেনা আমি তো আছি| বড়দার এই আশ্বাসে আমাদের মনে জোর আসত| মনে মনে ভাবতাম ঠিকই তো আমরা তো বড় হয়ে গেছি আর কেন এত নিষেধ| মনে মনে বিদ্রোহ করে উঠতাম মানব না আর মানব না| একগাদা ক্যাসেট আর মেশিন নিয়ে আমরা হাজির| একটু পরেই ভিসিপির দোকানের এক কর্মচারী আমাদের বাড়ি এসে সব সেট করে দিয়ে যেত| সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ শুরু হত সিনেমা পর্ব| আমাদের ক্যাসেটের সংগ্রহে যেমন বাংলা সিনেমা থাকত‚ তেমনই ইংলিশ Jaws‚ Benhur‚ Mackenna's Gold‚ The Evil Dead‚ The Exorcist‚ হিন্দির মধ্যে পুরোনো সিনেমা যেমন শোলে‚ শক্তি‚ সাহেব বিবি অউর গুলাম| তেমনি নতুন সিনেমার মধ্যে হম‚ তেজাব‚ পরিন্দা‚ কেয়ামত সে কেয়ামত তক‚ মোহরা‚ মাচিস আরও অনেক সিনেমা| এখানেই কমল হাসানের আপ্পু রাজা দেখেছিলাম| অবাক হয়েছিলাম কি ভাবে একটা লম্বা চওড়া লোক এত বেঁটে ও আবার এত লম্বা হয়ে যায়| প্রথমে মা‚ কাকিমাদের জন্যে পুরোনো বাংলা সিনেমা সেটা ভানু‚ জহরের হাসির সিনেমা বা উত্তম কুমারের বিখ্যাত কোন সিনেমা দিয়ে শো শুরু হত| এর পর শুরু করা হত হিন্দি সিনেমা| ভিসিআর-এ আমার প্রথম দেখা সিনেমা হল শোলে| জীবনে প্রথম হিন্দি সিনেমা দেখা| হিন্দি সিনেমা দেখতে দেখতে খাবার ডাক আসত| মাঝে কোনও কোনও সময় সবার খাওয়া পর্ব শেষ হলে বড়দের সবারই দাবীতে আবার বাংলা সিনেমা শুরু করা হত| প্রসেনজিত‚ তাপস পালের সিনেমা| মা‚ কাকিমাদের কান্নাকাটি‚ আবেগ নিয়ে সিনেমাটি শেষ হত| মাঝ রাতে শুরু হত ভূতের ইংলিশ সিনেমা| তখন বড়রা প্রায় সবাই ঘুমাতে চলে গেছেন| আমরা সিনেমা দেখতেই ঘুমের ঢুলুনি আসত| কেউ কেউ ঘুমিয়েও পড়ত| কেউ কেউ আবার কিছুক্ষন পরে জেগে উঠে বলত কি হল রে? রাত গভীর থেকে গভীরতর হয় কাছকাছি পুজোর প্যান্ডেলে বেজে ওঠা গান থেমে গেছে| এবার বেশ জোর ঘুম এসেছে আমরা আর শেষ করতে পারতাম না| সকালে ভিসিআর এর দোকানের ছেলেটি হাজির| মেশিন‚ ক্যসেট নিয়ে চলে যেত| আমরা দেরী করে ঘুম থেকে উঠে খাওয়া দাওয়া করে বাড়ি ফিরতাম| এভাবেই আমাদের পুজো কেটে যেত| ৯০' এর শেষ পর্যন্ত আমাদের এই প্রথা চালু ছিল| তারপর আমাদের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা ও বিভিন্ন কারনে ব্যস্ত হওয়ার জন্যে দ্বাদশীর দিন সবার একসাথে জ্যেঠুর বাড়ি আসা হত না| আগে পরে হয়ে যেত| জ্যেঠু মারা যাওয়ার পর সেই আনন্দ‚ মজা কমে গেল| এরপর ফোনে বিজয়া সেরে নেওয়ার উপায় বের হল| তাড়াতাড়ি ফোনে প্রনাম ও আশীর্বাদ নেবার পালা শেষ হলেও সেই উন্মাদনা‚ মজা‚ হৈ চৈ কোথায়| কোথায় সেই লুকিয়ে ছাদে গল্প| ভিসিআর‚ ভিসিপির চারপাশে আমাদের ভিড়| এখন প্রত্যেক ঘরে বড় টিভি‚ অনেক অনেক চ্যানেল| হাতে মোবাইল ফোন| তবুও আমরা একা| কয়েক বছর আগে বড়দাও চলে গেছেন অনন্তলোকে| সময় আমাদের অনেক কিছু নতুন নতুন উপহার দিয়েছে| কিন্তু কেড়ে নিয়েছে তার থেকেও অনেক বেশী| চোখ বন্ধ করলে আজও দেখতে পায় ঘর ভর্তি লোক সবাই সিনেমা দেখছে| আমি ঘরে এসে দেখি শোলের সেই বিখ্যাত ট্রেনের সিনটা চলছে| গব্বরের দলের ডাকাতদের ট্রেন লুঠ‚ গোলাগুলি| তারপর কত বার সিনেমাটা দেখেছি| কিন্তু ছোটবেলার সেই প্রথম দেখা সিনটা আমার এখনও মনে পড়ে| ক্রমশ...

109

8

জল

লকডাউন ডায়েরী

এল্রিল ২০২০ গতকাল আমাদের কাজের বউটি ফোন করেছিল‚ সে কাজে আসতে চায়| মাসকাবার হয়ে গেছে| কিন্তু আমরা তাকে কাজে আসতে বারণ করি| কোন বাড়িতেই কোন কাজের লোককে আসতে দিচ্ছে না| আমাদের খুব স্পষ্ট ধারনা লাইনপাড়ে ওরা যেখানে থাকে সেখানে জনবসতি বেশ ঘন| তারওপর মানামানির ব্যাপারটা ওদের মধ্যে একেবারেই নেই| তাই করোনা ওদেরই বেশি হবার চান্স| তাই পাড়ায় এক-আধবাড়ি বাদ দিলে সব বাড়িতেই কাজের লোক আসতে মানা| এদিকে রোজই সংখ্যা বাড়ছে কোভিডে আক্রান্ত রোগীর| টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষন শুনে কেমন যেন বদ্ধমূল বিশ্বাস আমাদের যে এই লকডাউন করেই আমরা কোভিডকে হারাতে পারব| উড়তে উড়তে খবর আসে কাছাকাছি এলাকায় কারও বাড়ি হয়েছে| তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা পাড়ায় চলে| আতঙ্ক বাড়ছে| কিন্তু শুধু কি আতঙ্ক? না আতঙ্ক বাদ দিলে আমরা বেশ উপভোগ করছি এই লকডাউন| পুরোদস্তুর গৃহবধুর জীবন| রাঁধার পর খাওয়া আর খাওয়ার পর রাঁধা জীবন| আগে চার পদ রাঁধা হলেও এখন আট পদ রেঁধে ফেলছি| নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাজার খোলা থাকে| আনাজপাতি তেমন নেই বাজারে| দামও আকাশছোঁয়া| এই সুগোগে অলুর খোসা‚ পটলের খোসা ‚ঝিঙের খোসা রান্না করে ফেললাম| রোজ একরকম নয়| ছোটোবেলায় মা আলুর খোসা‚ আলুকুচো আর ছোলা দিয়ে কাঁচা লঙ্কা-পাঁচফোড়ন দিয়ে এক আধবার তরকারী করেছিলেন‚ স্মৃতি হাতড়ে আমিও রাঁধলাম| শাউরি বললেন পিঁয়াজ দিয়ে খোসা ভেজো ভালো লাগে‚ সেও একদিন করা গেল| বড়বৌদি একদিন আমার কাছে পটলের খোসা চাইলেন| পটলের খোসা বাটা করবেন| আমিও তড়িঘড়ি রান্নাটা শিখে নিজেই রেঁধে ফেল্লাম| এছাড়া তো লাউয়ের খোসা ভাজা আমাদের প্রায়দিন শাউরি করেন| পাড়া দিন হেঁকে যায় সারাদিন নানা বাজারওয়ালা| বিরাটির বাজার নাকি বন্ধ পুরোপুরি| ওখানে ব্যাপকহারে ছড়িয়েছে করোনা| শীতের সব্জি এখনো বেশ আসছে| দামও সাধ্যের মধ্যে| বেশ কয়েকবার মোমো বানিয়ে ফেল্লাম| চাকরি বাকরি না থাকলে নিদেন এটা ওটা করে দু পয়সা রোজগার হবে এই নিয়ে আমাদের এ বাড়ি ও বাড়ি হা হা হি হি কদিন চলল| গরমটা এখনও তেমন নয়| অন্য অন্য বছর বৈশাখের গরমে মাথাখারাপ হবার জোগাড় হয় এবার তেমনটা নয়| পাড়া দিয়ে যা আসে তাই কিনি| নিরাপদ দুরত্ব রেখেই কেনাকাটা চলে| হিসাব কষে দেখি এমনি মাসে আমাদের যা খরচ হয় তার প্রায় অনেক বেশি খরচ বেড়েছে| বেকার জীবন হলেই যা হয়| দুপুরে মোবাইলে এটা ওটা দেখি‚ কখনও হালকা ঝিমুনি আসে আবার কখনও বা শুয়ে শুয়ে পাখিদের ডাক শুনি| এত পাখির ডাক আগে কখনো শুনেছি কি? নিস্তব্ধ দুপুরে তাদের কলকাকলি মনটাকে বেশ ভালো করে দেয়| ভোরবেলাও এদের ডাক শোনা যায়| মাঝে মাঝে মনে হয় প্রকৃতির মাঝে আছি বুঝি| ১ লা বৈশাখ আজ পয়লা বৈশাখ| মনেই ছিল না| হোয়াসাপে উপচে পড়া মেসেজ দেখে মনে পড়ে| আমি কাউকেই শুভেচ্ছা জানাই না| একটু একটু করে এই গৃহবন্দী জীবনে ক্লান্তি আর বিরক্তি আসছে| কবে আবার অফিস যাব মনে মনে ভাবি| এই কটা দিন কেমন যেন স্থবির মনে হয়| মনে হয় এই কটা দিন যেন একটা যুগ কাটিয়ে ফেলেছি| এই প্রথম মনে হয় থোড় বড়ি খাড়া জীবনটাই আমাদের সেরা জীবন| এবার পয়লা বৈশাখে গনেশ পুজো হয় না| ফুল মালা‚ মিষ্টি কিছুই কেনা হয়নি‚ মনেই তো ছিল না| নতুন জামা থাকলেও আর পড়তে ইচ্ছে হয় না| গুল্লুটার জন্য বেশি আফশোষ হয়| ওর একটা নতুন জামা কেনা হল না| সৃজনী বলে ‚ আন্টি পুজোতে পড়ব নতুন জামা| অনন্দ তো ওদের| একটু মনখারাপ লাগে| অনেকবছর আমারও নতুন জামা হয়নি পয়লা বৈশাখে সেটা অর্থনৈতিক কারণে| কিন্তু এবার তো কারণ সম্পুর্ণ আলাদা| সন্ধ্যায় নিয়ম করে একে ওকে ফোন| সবার কুশল নেওয়া| আজ ফ্ল্যাটে গেছিলাম| রোজ যাই না| কাই একা থাকে‚ আমার দায়িত্ব আমি এড়াতে পারি না| রোজ দুবেলা ফোন করি| মাঝে মাঝে যাই‚ কাইয়েরও ভালো লাগে| কি জানি কতদিন চলবে এইভাবে|

183

11

মনোজ ভট্টাচার্য

কিছু লেখার কথা ভেবেছিলাম !

এই ডামাডোলের বাজারে- সব ব্যাপার স্যাপার দেখে মুখ থেকে আর কথা সরছে না ! এর চেয়ে মুক ও বধির হলে ভালো হতো । লোকে বলে – মারা গেলে তার কু গুলো বলতে নেই । সবই তার সু ছিল । তিনি অবশ্যই শ্রেষ্ঠ সন্তান হবেন ! – কিন্তু যাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে – আর এত দুর্বলশ্রেণী যে কোনোদিন প্রতিবাদও করতে পারবে না – তাদের বেলা ? আজও যদি না প্রকাশ করি – তবে ইতিহাসে ভুল ব্যাখ্যা হবে ! আমার জানা দুই স্বনামধন্য বাঙ্গালী – যারা নিজেকে ছাড়া আর কারুকে কখনো সাহায্য করে নি । লিখতে সঙ্কোচ হলেও এটা সত্যি ! লিখলে সবাই আমাকে তুলোধোনা করবেন – জানি । এক তো পঙ্কজ রায় – যিনি কিনা নিজের ভাইপো – অম্বর রায়কেও শুনেছি সেভাবে ব্যাক করেন নি ! – এটা একটু দুরের ব্যাপার – সত্যি মিথ্যের দোলাচলে থাক ! আর একজন - স্বনামধন্য কিছুদিন আগেই মারা গেছেন ! স্বনামধন্য প্রনব প্যাটেল ! দুঃখিত আমি – কিন্তু এটাই তার নাম ছিল ! নেহেরু পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ – হয় মন্ত্রী নয় রাষ্ট্রপতি ! এটা আমার রাগ নয় । এটা আমার অসহায়তা ! অনেক কিছু জেনেও - অনেক অনেক থুতু গিলে ফেলতে হয়েছে ! – কত কত আমাদের মতো নিরীহ শ্রমিক কর্মচারী মানুষের যে সর্বনাশ হয়েছে – তার ইয়ত্তা নেই ! আগে কোনটা বলি ! অন্তত দুটো ঘটনার কথা বলি । বাগবাজারের যুগান্তর অমৃতবাজার পত্রিকার কথা সবাই জানেন । পত্রিকাভবনে – সংকীর্তনের নামে সাত দিন ধরে হাজার হাজার লোকের খাওয়া দাওয়া চলত । সারাক্ষণ চলত সেই সংকীর্তন ! প্রচুর পয়সার উৎসব হতো ! সেই পত্রিকাভবনে শুধু বাগবাজার নয় – কলকাতার প্রচুর লোকের চাকরি ছিল ! সেই বেছে নেওয়া – অ-বামপন্থী কর্মচারীরা কিছু দাবি-দাওয়া পেশ করেছিল ! কে জানত ঘোষেরা তখন এলাহাবাদে – ওটাই বোধয় ওদের ডেরা – ঠিকানা পাল্টাচ্ছে ! পত্রিকার বিক্রি কমে গিয়েছিল – অমৃত পত্রিকা আগেই বন্ধ হয়ে গেছিলো । - সেই সময়েই এই আন্দোলন ! তাও কংগ্রেসি ইউনিয়নের আন্দোলন ! একেবারে নির্ভেজাল গান্ধীবাদী আন্দোলন ! – সেটা সিদ্ধার্থ রায়ের আমল ! – রাতারাতি পত্রিকা অফিশ থেকে মেশিনারিগুলো পাচার হয়ে গেল এলাহাবাদে ! যেহেতু কংগ্রেসি ইউনিয়ন – তাই ইউনিয়নের প্রে্সিডেন্ট পুরো ব্যাপারটা নিয়ে গেল কেন্দ্রে । এবং সবাই ধরে বসল মন্ত্রী প্রনব প্যাটেল কে ! উনি খুব আশ্বাস দিলেন – ব্যাপারটা অবশ্যই দেখবেন । সবাই নিশ্চিত ছিল – প্রনবের ম্যাডাম ছিলেন খুব উদারপন্থী ! অমৃতবাজার এতদিনকার কাগজ – স্বাধীনতা-আন্দোলনের ছাপ আছে – নিশ্চয় ফেরত আসবে । কেন্দ্রীয় সরকার আন্ডারটেকও করতে পারে । - প্রনবদা – ওনার আরেকটা কি নাম আছে – ভুলে গেছি – ম্যাডামকে একটু বললেই - - ! ভদ্রলোকের এক উত্তর – বলবো বলবো – নিশ্চয়ই বলবো ! দেখছেন তো ম্যাডাম কিরকম ব্যস্ত ! ম্যাডাম তো টেঁসেই গেলেন ! সবাইর আশা হল – এইবার পলুদা প্রধানমন্ত্রী হবেন ! তা হলে নিশ্চয়ই - - ! সে গুড়ে বালি দিয়ে – রাজীবকে উড়িয়ে নিয়ে এসে রাজা বানানো হল ! তার আগে থেকে আমাদের কম্পানিতে ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হল – এক কংগ্রেসি দাদা । ওনারও গুরু পলুদা – মানে প্রনব প্যাটেল ! আমাকে অনেকেই সাবধান করেছিল । কিন্তু ভোটের মাধ্যমে জেতা সবাই ঐ পাল্টু দত্তকে প্রেসিডেন্ট বানালেন ! – যথারীতি আমাদের অফিশে কংগ্রেসি আন্দোলন আরম্ভ হলে – অর্ধেক দিন উনি আসতেন না ! বিশেষ করে যেদিন মিটিং বা মিছিল হতো – সেদিন ওনার অনেক কাজ পরে যেত ! আমার ওপর রাগ মেটাতে – আরও সাতজনকে মিশিয়ে সাসপেন্ড করলো ম্যানেজমেন্ট ! পালটু দত্তের কংগ্রেসি নীতিতে একটাও ঘেরাও হল না অফিশে ! একদিনের জন্যেও স্ট্রাইক হলনা ! অফিশের সবাই স্বেচ্ছায় পে-বয়কট করবে । পাল্টু দত্তের এক কথা – ম্যানেজমেন্ট রেগে যাবে – সবাইকে সাসপেন্ড করবে ! আমি অন্তত এই পরিস্থিতে কখনো পড়বো – ভাবিনি ! – সমানে প্রনবদাকে দেখিয়ে গেল ! – সেই প্রনবদা কিন্তু একটা আঙ্গুলও নড়ালেন না ! এন্ড্রু ইউলের নাম যে শোনেন নি – তাও নয় ! কারন তার সাথে ম্যানেজমেন্টের আগেই প্রেম-পিরিতি হয়ে আছে ! সেই সাস্পেনশান চলল – প্রায় চার মাস ! সবাই খুব দুরবস্থার মধ্যে পড়লো । ইউনিয়ন থেকে আদ্ধেক মাইনে দিয়ে গেল ! – আমরা প্রত্যেক দিন অফিশের সামনে দাঁড়িয়ে, সমানে কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করেই যাচ্ছি ! অফিশের প্রত্যেকে এসে মৌখিক সমর্থন জানিয়ে যেত ! – ফেডারেশান থেকে আমাকে ধমক ধামক করে যায় – এ কি রকম আন্দোলন ! কেন এই লোকটাকে প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে । যার মেরুদন্ড নেই । অবশেষে প্রায় পাঁচ মাস পরে একটা এনকোয়ারি কমিশন বসানো হল । বেশ কিছুদিন লোক-দেখানো শুনানি হবার পর – আমরা সবাই দোষী সাব্যস্ত হলাম ! হেরে যাওয়া মনোভাব নিয়ে অফিশে ফিরে এসে ওয়ার্ম ওয়েলকাম পেলাম । কদিন বাদেই সেই পাল্টু দত্ত হেরে গেল ! – আর প্রনব প্যাটেলের নামে যে কি ধিক্কার হতে থাকল ! ওনাকে এমনিতেই বাংলার লোকেরা কখনো খুশী ছিল না ! – কারন উনি বাংলার জন্যে কিচ্ছু করেন নি ! নিজের ছেলেকে পর্যন্ত ঠিক-ঠাক বসাতে পারল না ! সেদিন আমরা মাথা নিচু করে সব অপমান সহ্য করেছি । আমাদের তো কিছু করার ছিল না ! অসহায়ের আস্ফালন ছাড়া কি আছে ! তার কিছুদিন পরে নিউ ইয়র্কের মন্টরোজে এক ভদ্রলোক আমাকে চিনতে পেরে আলাপ করলেন ! তিনিও পাল্টু দত্ত ও প্রনব প্যাটেলের সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে গেলেন ! হাওড়ার একটা বিখ্যাত কোম্পানির তুলে দেওয়ার পেছনের কাহিনী ! সেই একই ব্যাপার ! যখনই কোন ব্যাপারে দেখা করতে গেছেন – একই জবাব ! নিশ্চয় দেখবেন । ম্যাদামের একটু সময় হলেই - ! মন থেকে ভুলে যাবার চেষ্টা করেছি – সেসব ঘটনা ! কিন্তু মাঝে মাঝে সেই সব অসহায় অপমানের ঘটনাগুলর কথা মনে পড়ে ! কত লোকের যে সর্বনাশ হয়েছে – শুধু প্রশ্নহীন আনুগত্যের জন্যে ! – আমার মুখ দিয়ে কখনো যদি বেরয় ‘তার আত্মার শান্তি হোক’ – সেটা হবে সেদিনকার কমরেডদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ! মনোজ ভেবেছিলাম এটা নতুন ব্লগ করবো - কিন্তু ব্লগে পোস্ট হচ্ছে না | অগত্যা এখানেই দিচ্ছি |

160

5

Joy

হ্যাপি টিচার্স ডে...

ক্লাস ফাইভের ক্লাসে প্রথম দিন| নতুন স্কুল‚ নতুন বন্ধু| তখনও বড় স্কুলে একটু নয় বেশ ভালই আড়ষ্ট| ক্লাসে ঢুকলেন এক হৃষ্টপুষ্ট চেহারার এক ভদ্রলোক| পুরোনো ছাত্ররা ফিসফিস করে উঠল মুখার্জী বাবু স্যার এসে গেছেন| বেশ রাশভারি চেহারা| মোটা পুরুষ্ট গোঁফ| পড়া না করলে নাকি খুব মারেন| আমার তো বেশ ভালই লাগত মুখার্জী বাবুর ক্লাস করতে| ইতিহাস পড়াতেন আমাদের| হাতে সবসময় স্কেল রাখতেন| মাঝে মাঝেই পড়া ধরতেন| সব স্কুলের মতন আমাদের ক্লাসের অমনোযোগী ও দুষ্টু ছেলেরা পিছনের বেঞ্চে বসত| স্যার ক্লাসে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন| তারপর কোনোদিন পড়া ধরা ও কোনও দিন পড়া বুঝিয়ে দেওয়া| মারধর স্টার্ট করলে আর থামতে চাইতেন না| আবার পড়া শুরু করলে সেই একই অবস্থা| ক্লাসের অমনোযোগী ও দুষ্টু ছেলেরা প্রতিদিন মার খ্তে| ওরা পড়া করার থেকে মার খাওয়াতাইঅ বেশী পছন্দ করত| কিন্তু স্যার ক্লাসের প্রত্যেকটি ছেলের নাম জানতেন| পিছনের পড়া শোনা না করা ছেলেটি কোনদিন না এলে খোঁজ খবর নিতেন| আজ অশোক বা সুশান্ত কেন আসেনি রে? কেউ বলল স্যার ওর শরীর খারাপ | স্যার বলতেন কে অশোকের বাড়ী চিনিস রে? আজ বাড়ী যাওয়ার সময় একবার দেখা করে যাব| নীলু বাবু স্যার আমাদের আমাদের জীবন বিজ্ঞান পড়াতেন| কত রকম জীব বিজ্ঞান এর কত গল্প শোনাতেন| কাউকে কোনদিন মারধর করতেন না| ছোটবেলায় আমি অত্যাধিক দুষ্টু ছিলাম| এই জন্যে মা বাবার থেকে মার খাওয়াটা দৈনিক ব্যাপার ছিল| এই নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন আফশোস ছিল না| একবার কথা প্রসঙ্গে নীলু বাবু স্যারকে বলেছিলাম আমার বাবা খুব রাগী| নীলুবাবু আমার বাবাকে একবার স্কুলে ডেকে বলেছিলেন ওকে একদম মারপিট করবেন না ও খুব ভাল ছেলে| বাবা বলার চেষ্টা করেছিলেন বাড়ীতে আমার দুষ্টুমির কথা কিন্তু স্যার সেই কথায় আমল দেননি| প্রভাস বাবু ভৌত বিঞ্জান পড়াতেন| ওনার পড়াতেই ভৌত বিঞ্জান সব জটিল তত্ত্ব সোজা মনে হত| ক্লাসে খুব বদমাশ ছেলেদের ডাস্টার ছুড়ে মারার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন অমিয় বাবু| কখনও কখনও বেতও নিয়ে আসতেন| মারার পর আবার ছেলেদের কাছে ডেকে নিয়ে বলতেন তোরা একটু পড়াশোনা তো করতে পারিস| তোদের মারতে আমার খুব খারাপ লাগে| আমাদের সময় মা বাবারাও স্যার‚ ম্যাডামদের বলে যেতেন ওদের শুধু মেরে ফেলবেন না বাকি মানুষ করার জন্যে পিঠে বেত ভাঙ্গতে পারেন| স্যাররাও তাদের দ্বায়িত্ব পালন করত| আশ্চর্য কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়িতে গিয়ে মা বাবার কাছে শিক্ষক-শিক্ষকার সম্বন্ধে কিছু রিপোর্ট করতে পারত না| করলে আবার মার| কারন মা বাবাদের ধারনা ছিল শিক্ষক-শিক্ষকারা কোনদিন ভুল করতে পারেন না| অগত্যা চুপ করে থাকাই ভাল| এত মার খেলেও কোন ছাত্রের মধ্যে স্যারের প্রতি কোন অভিযোগ বা অসম্মান ছিল না| ইংরাজী ক্লাস নিতেন ভট্টাচার্য বাবু| পুরো নাম অসীম ভট্টাচার্য| আমি পড়াশোনাই খুব খারাপ ছিলাম না| সে জন্যে স্যারদের থেকে কোনদিন মার বা বকুনি খেতে হয়নি| আর ভট্টাচার্য বাবুর স্যারের ছেলের সঙ্গে আমার মুখের বেশ মিল ছিল| এতা কোনও ভাবে শিক্ষক মহলে ও ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল| তোকে তো স্যার মারবেন না‚ বকবেন না| সত্যিই তাই ক্লাস ফাইভ থেকে টেন অবধি কোনোদিন স্যার আমাকে মার তো দূরেরে কথা কোনোদিন বকাও দেননি| পড়া শোনা করলেও দুষ্টুমিতে আমি কিছু কম ছিলাম না| কেউ আমার নামে স্যারকে নালিশ করলে স্যার আমাকে ডেকে আমাকে বলতেন কি রে তুই কিছু দুষ্টুমি করেছিস| আমি বলতাম না| স্যার ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলতেন দিব্যেন্দু দুষ্টু করেনি| ও ভাল ছেলে| আমার চাপ বাড়তে থাকল| ভট্টাচার্য বাবুর কাছে কোন নালিশ যাওয়া মানে আমার খুব খারাপ লাগত| স্যারের ইংরাজী পড়ানো ছিল ছবির মত| ক্লাস সিক্সে আমার খুব শরীর খারাপ হল| হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম একমাস| তখন ভট্টাচার্য বাবু ও মুখার্জী বাবু আমাকে দেখতে এসেছিলেন আমাদের বাড়ীতে| আমাদের অঙ্কের ক্লাস নিতেন নিতাই বাবু| ধুতি ও পাঞ্জাবি পরে আসতেন| অঙ্কের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই খুব খারাপ| আমার বাবা অঙ্কে পন্ডিত ছিলেন| কে সি নাগের সব বিভৎস অঙ্ক গুলো মুখে মুখে সমাধান করে দিতেন| অঙ্কের জটিল তত্ত্ব আমার নিরেট মাথায় যতই ঢোকানোর চেষ্টা করে যেতেন কিন্তু আমাই তো শুধু মাথা নাড়াতাম| কিন্তু আমার মাথায় কিছুই ঢুকত না| ফলে বাবার হাতে মার খাওয়াটা আমার কাছে প্রতিদিনের ডাল ভাত খাওয়ার মত ছিল| কেন যে চৌবাচ্চার ফুটো থাকে| কেন যে জল বেরিয়ে যায়| লাভ-ক্ষতি‚ ট্রেনের অঙ্কের ট্রেনের দৈর্ঘ্য‚ প্ল্যাটফর্মের দৈর্ঘ্য কেন যে এত ঝামেলা করে অঙ্ক করা হয়| বাবা বলতেন তুই সব বিষয়ে ভাল নম্বর পাবি কিন্তু অঙ্কের জন্যে ফেল করবি রে গাধা| ফেল করিনি| অঙ্কটা টেনে টুনে পাশ মার্কস দিয়ে অন্য সাবজেক্ট গুলোতে মেক আপ করতাম| বীজগনিত আসার পরে একটু স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললাম| এর মাঝে অনেক শিক্ষক পেয়েছি| তার মধ্যে নাম না করলেই নয় তিনি হলে অঞ্জন স্যার| সবাই দাদা বলত| আমরাও অঞ্জনদা বলতাম| অঞ্জনদার কাছে বাংলা আর ইংলিশ পড়তে যেতাম| প্রতিদিন বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরাজী গ্রামারের চর্বিত চর্বন করে দুটো বিষয়েই বেশ পারদর্শী হলাম| ক্লাস নাইনের প্রথমে বাবা আমাকে নিতাই বাবুর কোচিংএ ভর্তি করে দিলেন| নিতাই বাবু আর ভট্টাচার্য বাবু একসাথে কোচিং করাতেন| ওখানে আশীষও পড়ত| নিতাই বাবু আমার অঙ্কের জ্ঞান সম্পর্কে খুব ভালই ওয়াকিবহাল ছিলেন| ওনার মৃদু হাসি সবসময় মুখে লেগে থাকত| আমাকে উনি একদিন জিজ্ঞেস করলেন কি রে কোন সাবজেক্টটা তোর সব থেকে ভাল লাগে? আমি তো উৎসাহ নিয়ে বললাম স্যার আমার প্রিয় সাবজেক্ট জীবন বিজ্ঞান আর ইতিহাস| স্যার একটু হেসে বললেন আর ভৌত বিজ্ঞান? আমি বললাম হ্যাঁ খারাপ লাগেনা| বাংলা‚ ইংরাজী‚ ভূগোল সব ভাল শুধু অঙ্কটা ছাড়া| স্যার আমাকে বললেন তুই অঙ্ককে একটুও ভালোবাসিস না? আমি বললাম না| একদম না| একদম না| স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তাহলে তুই কি করে আশা করিস অঙ্ক তোকে ভালবাসবে? তুই বীজগনিত দিয়ে শুরু কর| আমিতো বীজগনিত ভালবাসি| যখন বীজগনিতে বেশ পারদর্শী হয়ে গেলাম| তখন স্যার বললেন এবার একটু ত্রিকোনোমিতিটা শুরু কর| ত্রিকোনোমিতি করতেই খারাপ লাগে না| মাঝে মাঝে টেস্ট পেপার থেকে আমাদের পরীক্ষা চলত| আশীষ ও যারা অঙ্ক পারত তাদের সামনে খুব নিজেকে ছোট মনে হত| কিন্তু স্যারও বন্ধুদের সহযোগিতায় আস্তে আস্তে কিছুটা হলেও অঙ্ক ভাল লাগতে শুরু করল| ক্লাস নাইন-টেন থেকে আমরা কয়েকজন একটু এচোঁড় পাকা হয়ে গেলাম| আমরা মানে আশীষ আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়| শঙ্কর‚ আমি‚ তাপস আরও কয়েকজন| উত্তর কলকাতায় থাকার সুবাদে হাতিবাগানটা ভালই চিনতাম| হাতিবাগান মানেই তখন সিনেমা পাড়া| এক গাদা সিনেমা হল| সবসময় বড় বড় ব্যানার ঝুলছে| কোন কোনটাতে আবার হাউসফুল লেখা| লম্বা লাইন| ব্ল্যাকারদের দু কা চার বা পাঁচ কা দশ এই আওয়াজ গুলো সিনেমা হলের কাছে গেলেই শোনা যেত| আমরা স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতাম| দু-একবার বাবার হাতে ধরাও পড়লাম| মার মার| কিন্তু আমার পড়াশোনার কোন খামতি ছিল না| বাবা আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন তুমি যা করছো তাতে তোমার পড়াশোনার যদি কোন ক্ষতি হয় বা মাধ্যমিকের রেজাল্ট খারাপ হয় তবে আর বাড়িতে থাকা চলবে না| এটা যে ভুয়ো কথা হতে পারে সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি| কারন আমার বাবাকে আমি ভালই জানতাম| তিনি খুব রাগী ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন| ফলে রাত জেগে পড়াশোনা চলত| একদিন ভট্টাচার্য বাবুর কোচিং ক্লাস ডুব দিয়ে আমি আর কয়েকজন বন্ধু সিনেমা দেখতে গেলাম| সেদিন আশীষ যায়নি| দূর্ভাগ্যক্রমে সেদিন বাবা কোন ভাবে জানতে পারলেন আমি আজ কোচিং ক্লাস ডুব দিয়ে সিনেমা দেখতে গেছি| বাবা সেদিন আমাকে স্যারের ফিস দিয়ে পাঠিয়েছিলেন| আমিও বাবার কাছে স্বীকার করছিনা যে আমি সিনেমা দেখতে গেছিলাম| বাবা পরের ক্লাসে ভট্টাচার্য বাবুর কাছে আমার নামে নালিশ করলেন| স্যারের টাকা থেকে কিছু টাকা আমার খরচ হয়ে গেছিল| সেটা খুব সামান্য টাকা| আমি সেটা আমার টিফিন খরচ বাঁচিয়ে দিতে পারতাম| কিন্তু ভট্টাচার্য বাবু সেদিন খুব আঘাত পেয়েছিলেন সেটা তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝেছিলাম| তিনি শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন দিব্যেন্দু তোর কাছ থেকে আমি এটা আশা করিনি| লজ্জায়‚ আমি কুঁকড়ে গিয়েছিলাম| মনে হচ্ছিল মাটিতে মিশে যাই| এর থেকে বাবার মার অনেক ভাল ছিল| এর পরে আমি আর কোনোদিন কোচিং ক্লাস কামাই করে সিনেমা দেখতে যাইনি| তবে ভট্টাচার্য বাবু ও নিতাই বাবুর আমার প্রতি স্নেহ ভালবাসা কোনদিন কম হয়নি| মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করার পর দুই স্যারকে প্রনাম করতে গেছি| দুইজনের চোখে জল| মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন এবার বড় ক্লাস হল| কলেজে যাচ্ছিস আর ফাঁকি মারিস না| দীপক বাবু ভূগোল পড়াতেন| দীপক বাবু স্যার মাউন্টেনিয়ারিং করতেন| সব স্লাইড দিয়ে স্কুলের বড় পর্দায় দেখাতেন| স্কুল শেষ হলে ইলেভেনে সায়েন্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম| কিছুটা বাড়ির চাপেই| আবার সেই অঙ্কের সাথে সহবাস| ফিজিক্স‚ কেমিস্ট্রি আর সঙ্গে অঙ্ক| এবার তপন স্যারের কোচিংএ ভর্তি হলাম| স্যারের কোচিং মানে হরি ঘোষের গোয়াল| একগাদা স্টুডেন্ট| আশীষও ঐ কোচিং পড়ত| তখন আমরা সল্টলেকে চলে এসেছি| ওখান থেকেই ক্লাস করতে যেতাম| ক্লাসের পর কলেজ শেষ করে বাড়ি| তখন সল্টলেক মানেই ফাঁকা ফাঁকা| প্রচুর মাঠ‚ কাশবন‚ কোয়ার্টার| গুটি কতক বাস| বেশ ভাল লাগত| কিন্তু তপন স্যারের ক্লাসে কিছু বুঝতে না পারলে ভয়ে ও লজ্জায় কিছুই বলতাম না| আস্তে আস্তে না বোঝার বোঝাটা বেশ ভারী হয়ে উঠল| একদিন কি কারনে যেন স্যার আমার খাতা দেখতে চাইলেন| আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ| কি করব| ভাবছি আমি স্যারের থেকে খুব বকা খাব| আর স্যার যদি ফোন করে বাবাকে বলে দেয় তো আরো একস্ট্রা ঝামেলা| স্যার খাতা দেখে কি বুঝলেন কি জানি| আমাকে বললেন তুই ক্লাসের পর আজ থাকবি‚ সবাই চলে যাবে| কি আর বলব| সবাই চলে গেল| স্যার আমাকে বলল কি রে কিছু বুঝতে পারিসনা আমাকে বলিস না কেন? মনে মনে বলি আপনাকে বলি আর সবার সামনে বকা খায়| স্যার বললেন এবার কি কি সমস্যা আছে বল| আমি বললাম স্যার আমি অনেক সকালে সল্টলেক থেকে বেড়িয়ে এসেছি| আপনার কাছে ক্লাস করে কলেজে যাব আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে| স্যার ভালই বুঝেছিলেন আমার সমস্যা| বললেন তুই একটু বস| আমি আসছি| আমি ভাবছি স্যার নিশ্চয়ই আমার বাবাকে ফোনে সব অভিযোগ করছেন| কিছুক্ষণ পরে স্যার ফিরে এলেন| আমি দেখে তো অবাক| দেখি একটা শাল পাতার ঠোঙায় কচুরী আর তরকারি নিয়ে স্যার হাজির| আমাকে ঠোঙায় এগিয়ে দিয়ে বলল নে খেয়ে নে‚ তোর তো খুব ক্ষিদে পেয়েছে বললি| কিন্তু ফিজিক্সের প্রবলেম গুলো সলভ করে যাবি| প্রায় প্রতিদিনই একা একা বসে প্রবলেম শেষ করে কলেজে যেতে পারতাম| প্রথম প্রথম খুব রাগ হত| তরপর এটা মানিয়ে নিলাম| উচ্চমাধ্যমিকে রেজাল্টের দিন কলেজে খুব টেনশনে অপেক্ষা করছি| কিছুক্ষণের অবসান আমি সেকেণ্ড ডিভিশনে পাশ করেছি| বন্ধুদের হৈ চৈ| কলেজের বন্ধুরা জেদ ধরল চল একটা সিনেমা দেখে বাড়ি যাব আজকে| আমার তো আনন্দে শুধু মনে হচ্ছে এখনই দৌঁড়ে তপন স্যারের কাছে যায়| পরদিন স্যারকে গিয়ে প্রনাম করলাম| স্যার আমাকে বুকে টেনে নিলেন বললেন কি রে কার বেশি আনন্দ হচ্ছে| বললেন অনেক বড় মানুষ হবার চেষ্টা করিস| বিএসসি গেল এরপর সাহা ইন্সটিটিউটে শিক্ষনবীশ হিসেবে চান্স পেলাম| ওখানে পরিচয় হল প্রফেসর গৌতম ভট্টাচার্য‚ প্রফেসর বিকাশ চক্রবর্তী‚ প্রফেসর দীপক দাশগুপ্ত| প্রফেসর অসিত দে আরও অনেক প্রফেসারদের সঙ্গে| তাদের অমায়িক ব্যবহার| কম্পিউটারের প্রতি আমার উৎ্সাহ ছিল| তখন কম্পিউটারের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না| আমাদের বাড়ীতেও ছিল না| প্রফেসর গৌতম ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে আসার পর আমার কম্পিউটারের প্রতি কৌতুহল তিনি জানলেন| আমাকে বললেন তোমার ট্রেনিং শেষ হবার পর বা অবসর সময়ে আমার ল্যাবরেটরিতে এসে তুমি যখন খুশি কম্পিউটার শিখতে পারো| আমার লাইব্রেরী কার্ড নিয়ে তুমি কম্পিউটারের বই নিয়ে এসে প্র্যাকটিস কোরো| চলত প্র্যাকটিস আর নানা রকম কম্পিউটারের আলোচনা| আমার তিন বছরের ট্রেনিং শেষ হয়ে যাবার অনেক দিন পর্যন্ত আমার সাহা ইন্সটিটিউটে আসা যাওয়া ছিল| পরের দিকে মেন গেটে বেশ কড়াকড়ি হল| গৌতম স্যার আমাকে বলেছিলেন তোমাকে গেটে সিকিউরিটি আটকালে আমাকে ফোন করবে আমি ওদের বলে দেব| তাই করতেন এত নামী দামী সব প্রফেসররা কিন্তু কারও মধ্যে কোনও দিন কোন দাম্ভিকতা দেখিনি| বৈশাখী খাল পারে কখনো গৌতম স্যার বা প্রশান্ত স্যারকে দেখে বলতাম স্যার ভালো আছেন? আমাকে দেখে এক মুখ হাসি ছড়িয়ে বলতেন কোথায় যাচ্ছ‚ এখন কি করছ সব খবর জিজ্ঞেস করে তবে ছাড়তেন| স্কুল জীবন শেষ করার অনেক পর প্রায় বছর দশেক তো হবে পুরোনো পাড়ায় এক ফাংশানে আমি গেছি| ক্যুইজ‚ ডিবেট ও নানান রকম প্রতিযোগিতা হবে| আমিও সেখানে প্রতিযোগী| দেখি ডিবেটের বিচারকের আসনে আমাদের স্কুলের হেডস্যার বসে আছেন| স্যারকে দেখে প্রনাম করে বললাম স্যার ভালো আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন স্যার? স্যার আমাকে বলল তোকে চিনতে পারব না তুই তো দিব্যেন্দু| চমকে উঠেছিলাম এতদিন পরেও স্যার আমার নাম মনে রেখেছেন| ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক কতটা আন্তরিক হলে এটা সম্ভব| জীবনে অনেক শিক্ষক পেয়েছি| খেলার মাঠে ফুটবল খেলার টেকনিক শিখে ছিলাম যে বন্ধুটির থেকে সে আমার জীবনে কিছু কম নয়| আবার আমার এক বন্ধুর দাদা আখড়ায় ব্যায়াম করত| তখন ক্লাস ইলেভেন পরি| সে ব্যায়ামের সব টেকনিক শিখিয়েছিল| ভুল করলেই খুব বকত| কিন্তু ছেড়ে যায়নি কখনও| আমার বাবার থেকে আমার সিনেমা ও সাহিত্যের প্রতি ভালবাসা| শত ব্যস্ততার মধ্যেও কখনো তাকে পড়াশোনা নিয়ে কোন জানার থাকলে উত্তর দিতে কোনদিন বিরক্ত হতে দেখিনি| আরও অনেক শিক্ষক পেয়েছি কম্পিউটারের মাল্টিমিডিয়া শিখতে গিয়ে| তাদের সবাইকে আজ শিক্ষক দিবসের শ্রদ্ধা জানাই| যখন আমি টিউশন দিয়ে আমার রোজগার শুরু করলাম প্রথম প্রথম খুব ভয় পেয়েছিলাম| ভেবেছিলাম আমি পারব তো| কিন্তু আন্তরিকতা দিয়ে দেখলাম সব পারা যায়| পরে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার কাজ করেছি প্রচুর স্টুডেন্টের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পেয়েছি| স্কুল লেবেলের ছাড়াও কম্পিউটারের প্রচুর স্টুডেন্ট পড়িয়েছি ও এখনো পড়াই| এই সুবাদে সব বয়সি স্ত্রী‚ পুরুষ নির্বিশেষে ক্লাস করিয়েছি| একটা জায়গায় দেখেছি সবাই একা শুধু তাকে একটু সহযোগিতা করতে হবে| কেউ বোকা বা মাথা মোটা হয় না| স্টুডেন্ট কখনো খারাপ হয়না| একটু ভালবাসা‚ একটু সহযোগিতা‚ একটু ধৈর্য এইটুকু দিতে পারলেই হল| আমার স্কুলের স্যাররা আজ অনেকেই আর এই পৃথিবীতে নেই| যারা আছেন তারাও অসুস্থ| সময়ের সাথে সাথে তারাও একদিন এই পৃথিবীতে ছেড়ে চলে যাবেন এটাই নিয়ম| কিন্তু রেখে গেলেন কাজের প্রতি তাদের নিষ্ঠা‚ স্টুডেন্টের প্রতি ভালবাসা| শিক্ষকের মত পেশা আর কিছুই হয় না| যারা সমাজ তৈরী করেন| ডাক্তার‚ ইঞ্জিনিয়ার‚ উকীল‚ সাহিত্যিক‚ খেলোয়াড় সবই এদের সৃষ্টি| এই সব শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আমার অন্তর থেকে প্রনাম জানাই| আপনারা যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন| সব যুগে সব সময়ই এই ছাত্রদরদী‚ কর্মনিষ্ঠ মানুষগুলো ছিলেন| রাতের আকাশের ধ্রুবতারার মত| অন্ধকারের বাধা পেরিয়ে যারা আলোর পথের সন্ধান দিয়েছেন|

121

5

শিবাংশু

মাটি তাই রক্তে মিশেছে

ছোটোবেলা থেকে মায়ের মুখে শুনে গেছি। রক্তে মিশে গিয়েছিলো। আলাদাভাবে ভাবিনিই গানটিতে আদৌ কিছু শোনার মতো গভীর বার্তা রয়েছে কি না। বয়সের সঙ্গে সব কিছুই পাল্টে যায়। জানা হয়ে যায় বহু কিছু। বোঝাও হয়ে যায়। এ জানা, ডিস্কভারি চ্যানেলের 'জানা' নয়। গুরু যাকে বলেছেন, 'আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না'। এই বিপন্ন, বিষন্ন সময়ে, যখন কোন নতুন সকালই আলো নিয়ে আসছে না। আনছে না কোনও আশা, আশ্বাস। পাগলের মতো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি সুসংবাদের সামান্যতম কুটোটিকে। মানুষের মৃত্যুভয়, ধ্বস্ত মানবিকতা ভুলিয়ে দিচ্ছে যা কিছু শিখেছি সারা জীবন ধরে। আশাকে আঁকড়ে ধরার তীব্র তৃষ্ণা ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা সত্ত্বায়। গান ছাড়া আর কীই বা শুশ্রূষা এনে দেয় এই সংকটে? সকালে ঘুম থেকে উঠেই এই গানটা তাড়া করে বেড়াচ্ছিলো সারা দিন। কখনও এভাবে ভাবিনি তাকে নিয়ে। রেওয়াজ করতে বসে নিজেকেই শোনাচ্ছিলুম তার শব্দগুলি। এই আত্মকথন শান্তি দিলো। স্বস্তি দিলো। এক পশলা বৃষ্টির মতো সেই সুখহীন কবি ঝরে পড়লেন সারা সত্ত্বায়। সব মন্ত্রই কি আর ঋক? আরও মহোত্তম কিছু রয়ে গেছে চেনা পথের যাত্রায়... https://www.youtube.com/watch?v=n3IbJrWDBHY&fbclid=IwAR3G7zVAOmWKHiYx1NgC_bOXVONpfeXzHfYqOuaPzou19IgcVPh3DER9JyM

167

3

Stuti Biswas

ছত্রধর

চঁদিফাটা রোদ ব্রহ্মতালু গরম হয়ে ফুটিফাটা হবার জোগাড় ...। এই বুঝি মগজের ঘিলু বা গোবর গলগল করে বেড়িয়ে এল কিন্তু দিল্লির লোকজন ছাতা মাথায় দেবে না । টুপি পরবে, সানগ্লাস পরবে , মেয়েরা ডাকাতিনীর মত মাথায় ফেট্টি বাঁধবে কিন্তু ছত্রধর হবে না । অন্যদিকে ্ছাতা ব্যবহার করা বাঙালীদের খানিকটা অভ্যাসের মত । গ্রীষ্ম বর্ষা তো বটেই পারলে শীত কালেও তারা ছাতা নিয়ে বেরোয় । আর এই অভ্যাস স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে বজায় রাখে । দিল্লিতে ছাতা মাথায় রাস্তায় কাউকে দেখলে আমি বুঝি এ নির্ঘাত বাঙ্গালী । এখন শুনছি বর্ষা এসে গেছে । টি ভি তে দেখছি অনেক জায়গায় বৃষ্টি প্রায় বন্যার আকার নিয়েছে । আমরা সেরকম কিছু অনুভব করছি না । দিল্লিতে বর্ষা সে ভাবে আসে না যে ছাতা মাথায় দিতে হবে । যেটুকু আসে তাতে মানুষ বৃষ্টিতে ভিজেই আনন্দ পায় ।তাই ছাতারা আলমারির কোনায় শুয়ে কুম্ভকর্ণ ব্রত পালন করে ।সেদিন বাজারে বেরতে গিয়ে দেখি টুপ্টাপ বৃষ্টি পরছে । সুখনিদ্রারত ছাতাকে বের করে চড় থাপ্পর মেরে ঘুম ভাঙালাম । অসময়ে সুখনিদ্রা ভঙ্গ হওয়ায় ব্যাটা গেল বেজায় চটে । শুরু করলো উতপটাং কাণ্ডকারখানা । পুটুস করে সুইচ টিপতে ছাতা কিছুতেই খোলে না । সুযোগ বুঝে সুইচ ব্যাটা গোসা করে গর্তের মধ্যে ঢুকে বসে থাকল । কিছুতেই বেরবে না । ছাতাও গোয়ারের মত হ্যাণ্ডেল আকরে থাকল ।ঝাড়াই পেটাই করতে শিকে শিকে খানিক ঠকাঠুকি করে বিরষ বদনে তিনি আমার মাথায় ছাতা মেলে ধরলেন । রিমঝিম বৃষ্টি একটু জোরে হাওয়া রাস্তা দিয়ে হাটছি দুলকিচালে । শুরু হল ছাতার খেল । তিনি হঠাত উল্টে আকাশের দিকে মুখ করলেন । বন্ধ করে আবার খুললাম আবার ঊর্ধ্বমুখী । বেশ কয়েকবার চড় থাপ্পর খাবার পর তিনি পথে এলেন । ছাতা কে কবে কোথায় আবিস্কার হয়েছিল সে নিয়ে নানা মুনির নানা মত । ছাতা ব্যবহার শুরু হয় প্রখর সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার জন্য । ছাতার প্রচলন প্লেটো , সক্রেটিসের যুগ থেকে চলে আসছে । কিন্তু জনপ্রিয়তা সেরকম ছিল না । ছাতাকে মেয়েলি ফ্যাসানের অঙ্গ হিসাবেই গণ্য করা হত। ভূমধ্যসাগরের সমুদ্র সৈকতে অলিভ পাকানো রোদে ছাতা মাথায় দিয়ে মিশর , গ্রীস , রোমান সুন্দরীরা ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াত । রোমের সুদিন চলে যেতেই মাথা আবার ছাতা হারা হল । সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগাল থেকে ইংল্যাণ্ডে প্রথম ছাতা নিয়ে আসেন পারস্য পর্যটক ও লেখক জোনাস হ্যানওয়ে । মূলত তিনি ই ইংল্যাণ্ডের পুরুষদের মধ্যে ছাতার প্রচলন করেন । উনবিংশ শতাব্দীতে ছাতা ফিরে এল অভিজাত মহিলাদের পোষাকের অংশ হিসাবে ।সে ছাতার কি কেতা ... হাতলে মণিমানিক্য বসানো , ঝালোর লাগানো সিল্কের কাপড় । বৃষ্টি প্রতিরোধের জন্য ছাতার ব্যবহার শুরু করে চাইনিজরা । আবিষ্কারের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছাতার অনেক বিবর্তন হয়েছে । মান্ধাতা যুগের কাঠ বা তিমি মাছের কাঁটা দিয়ে বানানো শিক । আর দেড় মিটার লম্বা হাতল ওলা বিরাট ভারি ছাতার থেকে আজকালকার পুটুস করে সুইচ টেপা ডিজাইনার ছাতা । আমাদের হাতে থাকে ছাতা আর সাহেবদের হাতে থাকে আম্ব্রেলা । ল্যাটিন আমব্রাতে একটু র‍্যালা যোগ করে আমব্রেলা । আমব্রা মানে ছায়া । হাতে ধরা হাতলের মাথায় চাঁদি বাঁচানোর গোল ছায়া ( এক সাহিত্যিকের উক্তি ) । রঙবেরঙের ফোল্ডিং ছাতা আসার আগে কাঠের বাঁকানো হাতল ওলা দেশী ছাতা সবাই ব্যবহার করত। আমাদের বাড়ীতে এরকম একটা ছাতা ছিল ।কালো লোহার শিকের ওপর কালো কুচকুচে মোটা কাপড় । । ছাতা ঝপাং করে খুলত বন্ধ হত । ছাতাকে বন্ধ করলেও কিছুতেই সুবিন্যস্ত হত না । অবাধ্য ছেলের মত ছেতরে থাকত । আর বন্ধ করার সময় মাঝে মাঝেই আঙ্গুল চিমটে দিত । সে ছাতা ছোটবেলায় আমাদের অনেক রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা করেছে । এখন সে সব ছাতা অবলুপ্তির পথে । দেশী ছাতার বহুমুখী প্রতিভা । সে ছাতা মাথায় দিয়ে ঠিকাদার মজুর খাটাতো , ঠাকুরমশাইরা ছাতা বগলদাবা করে যজমানের বাড়ী যেত । স্কুলে মাস্টারমশাই ছেলেদের ছাতা পেটা করতেন । বেনারস হরিদ্বারে গঙ্গার ধারে এরকম ছাতা মাথায় দিয়ে ব্রাহ্মণরা বসে থাকত। অং বং চং করে মন্ত্র পরে চন্দনের টিকা লাগিয়ে দিত কিছু দক্ষিনার আশায় । আর তালিমারা ছাতা নিয়ে রাস্তার ধারে বসে থাকত মুচি । নেড়ী কুত্তাকে ভয় দেখানো যেত । প্রচণ্ড ভীড় বাস ফুটবোরডে এক চিলতে জায়গা নেই । ছাতার বাঁকানো বাঁট দিয়ে কয়েকজনকে টেনে ফেলে দিন তারপর বাসে উঠে পড়ুন । ছাতার প্রতিভা থাকলেও ছাতার ভাগ্য খুব খারাপ । ওর কুষ্টিতে যদি দেখেন ,দেখবেন লেখা আছে জন্মলগ্ন - হারানো । ছাতা হারায়নি এমন লোক ভূভারতে খুঁজে পাওয়া ভার । যত ছাতা হারাবেন তত ঝানু ছত্রধারী হবেন । আর ছাতার শিক তার ধর্ম হল যেখানে সেখানে ফুটুস করে আটকে যাওয়া আর তক্কে তক্কে থাকা সুযোগ পেলেই অন্যের মাথায় খোচা মারা । আজকাল অবশ্য অনেক সুদর্শন ছাতা ঘুরে বেড়ায় লোকের হাতেহাতে। সেসব ছাতা ভাজ করলে এত ছোট হয়ে যায় যে পকেটে করে ঘুরতে পারবেন । তবে এই ছাতাগুলি খোলা বেশ ঝকমারি । প্রথমে খাপ খোল তারপর ফিতে খোল , লক খোল । কায়দা করে ভাঁজ খোল । ডাণ্ডি টেনে লম্বা কর তারপর এক ঝটকায় ছাতা খুলে ফেল । একটু ভুলভাল হলেই ছাতা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে থাকবে ।বৃষ্টি এলে ছাতা খুলবেন ভাবলে এইসব অটোমেটিক ছাতারা বাঁশ দেবেই দেবে ।যদি বৃষ্টিতে ভিজতে না চান তবে আকাশে মেঘ দেখলেই ছাতা খুলে ফেলবেন । তবে ছাতার সুদৃশ্য বাঁটকে সামলে হ্যাণ্ডেল করবেন । কারন বেগতিক দেখলেই সে ছাতাকে ডিভোর্স করে কেটে পরতে পারে । রেগে গেলে আমরা বলি ধুর......ছাতা । আবার কিছু বুঝতে না পারলে বলি ছাতার মাথা । কেন বলি ? আসলে ছাতা হল একটী ছড়ানো বস্তু কিন্তু থাকে বেশ ভদ্রসভ্য ভাবে গুটীয়ে । # স্তুতি বিশ্বাস

181

4

মনোজ ভট্টাচার্য

দালালির ভাগাভগি !

দালালির ভাগাভাগি - ! কিছু কিছু জিনিস আছে – যা মানুষকে বলে বিশ্বাস করানো যায় না । আগে সে সব বেশি পরিমান ছিল – এখন খানিকটা শিক্ষার ফলে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে পালটেছে পালটাচ্ছে ও পালটাবে বা পালটাবে না । যেমন এখনও এক কে সি পালের রাস্তায় রাস্তায় লিখে রাখা – সূর্য পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ! – সে তার কাজ করেই যায় । আমাদের মনে হয় – সত্যিই কি ভদ্রলোক বিশ্বাস করেন ! – কিম্বা এখনও অম্বুবাচীর উপোষ করা হয় ! আমাদের ঠাকুরমা বা দিদিমারা তো এক সময় বিশ্বাস করতেনই মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয় ! – জানিনা বিয়ে না হলে কিকরে বিধবা হয় ! অথবা বিধবা হওয়ার পরে লেখাপড়া শিখলে কি হয় ! আমার এক পিসেমশাই গত শতাব্দীতে কালাপানি পেরিয়ে বিলাতে গিয়ে – তাঁর মায়ের কোপে পড়ে ত্যজ্যপুত্র হয়েন । তার ফলে - তাঁর কোন ক্ষতি কিছুই হয় নি । কিন্তু মেম-সাহেব নিয়ে ফিরে এসে সবার বাড়িতেই সমাদর পেয়েছিলেন । - আর সেই মায়ের দাপটে তাঁর চেয়েও উচ্চশিক্ষিত আরেক পুত্র দেশেই বন্দী হয়ে রইল ! গ্রহনের দিন আগেকার রান্না সব ফেলে দিতে হয় নাকি । আগে একবার বড়বাজার দিয়ে আসার সময় দেখছিলাম – কত বাড়ি থেকে রান্না করা সব খাবার – ভিখিরিদের দান করে পুণ্য অর্জন করছে ! একদিকে ভিখারিদেরই লাভ ! - এ ব্যাপারে আমার এক আত্মিয়া একেবারে অবাক করে দিয়েছে । গত গ্রহনের দিনে নাকি করোনা ভাইরাস দেখা দিয়েছিল – তাই এই গ্রহনের পরে করোনা ভাইরাস শেষ হয়ে যাবে ! তাই ঐ সময়ে রান্না করায় নি । গ্রহন তো শেষ হয়ে গেছে – অথচ করোনা রোগ তো কমে নি ! কে দেবে তাঁর উত্তর ! আমার গুরু – তিনি আবার একশো-তেত্রিশ কোটি মানুষের দেবতাও বটেন – বলেছিলেন – বাইরের জগত দেখতে হলে – অন্তত জানলাটা খুলতে হবে ! বৃষ্টি হচ্ছে কিনা জানলা দিয়ে দেখে তবেই বলা যাবে ! – আমি আন্দামানে গেলাম না – স্রেফ গুগুল দেখেই বলে দিলাম – আদিবাসীরা এখনও মানুষ খায় – উলঙ্গ হয়ে থাকে ! – পর্যটকেরা খুব লুব্ধ হয়ে ক্যামেরা বাগিয়ে বিভিন্ন দ্বীপে গিয়ে সেসব কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশ হল ! যেন আন্দামানে কেবলমাত্র জারোয়াদের দেখতেই যাওয়া হয় ! নানান জনের নানান মতামত তো হয়েই ! কিন্তু সেটাই যে একমাত্র ধ্রুব সত্য – তা নয় ! আমি ছা-পোষা গরীব ঘরের – পাতি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র ছিলাম । নামী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মতো বাছা বাছা শব্দ ব্যবহার করতে পারিনা । তাতে ভাষার উৎকর্ষতা বাড়ে বলে মনে হয় না ! আমারও কোন মানহানি হয় না ! তাই আমি মনে করি কোন জাতি সম্পর্কে বা তার ভাষা সম্পর্কে কোন মন্তব্য করলে আর কারুর নাহক – নিজের ব্যক্তিত্বের নীচতা প্রকাশ পায় । আমার সুযোগ হয়েছিলো – আমেরিকা যাওয়ার ও চীনদেশে যাওয়ারও ! সারা দেশ বা সমস্ত জাতিকে দেখার সুযোগ হয় নি । তবু যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে – তার কথা এখানে লিখেওছি । দু-দেশের মধ্যে চীনদেশ হল সবচেয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ! না দেখেছি কোন ভবঘুরে-ভিখারি, না দেখেছি রাস্তায় কোন জঞ্জাল ! এই কথা পড়েই তো কয়েকজন অনেক তথ্য আউরে গেলেন - । আমাদের নাকি সেসব যায়গায় নিয়েই যাওয়া হয়নি ! আমাদের পর্যটন ব্যবস্থা তো চিন সরকার করেনি ! করেছে এক ইন্দো-আমেরিকান কোম্পানি । তাই যা দেখেছি তারই ছবি তুলেছি । ধর্ম আছে ! দেখেছি মন্দিরে মোমবাতি জ্বালাতে বা প্রার্থনা করতে ! আগে তো জানতাম কমিউনিস্ট দেশে ধর্ম থাকে না ! – সম্প্রতি মুসলিম ধর্মীয় বাড়াবাড়ি রীতির ওপর বেশ হ্রাস টেনেছে ! – বাজারে নকল জিনিসের দোকানগুলো সব সীল করে দিয়েছে । বন্ধ গেটের ওপর খদ্দেরদের জন্যে সাবধানবানী সাঁটা আছে ! চিরকাল শুনে এসেছি – পিকিংএর রাস্তায় শুধু সাইকেল আর সাইকেল । এ নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে । কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি দামি দামি গাড়িও চলছে আবার ছোট ছোট মোপেড ভর্তি । সে পঙ্গপালের মতো । রাস্তা ফুটপাথ – পারলে বিল্ডিঙের থামের নিচ দিয়ে ফুরুত ফুরুত করে যাচ্ছে ! মোপেডের জন্যে অবশ্য ট্র্যাফিক জ্যাম হয় না ! আমাকে তো চৌষট্টি সালের পর থেকে চিনের দালাল বলে – লাঠি মেরেছে – মাথা ফাটিয়েছে যুব কংগ্রেস । তাতে আর কি এসে গেল । আমি যে পাতি ভারতীয় ছিলাম – তাই আছি । আবার এখন নাহয় কেউ কেউ সেই একই কথা বলে তাদের ইস্কুলে শেখা বাছা বাছা বিশেষণ – মানে বুঝুক বা নাই বুঝুক – প্রয়োগ করে তাদের পরিচয় দেবেন ! কিন্তু আমাদের চেয়ে কম সময়ে উন্নতি কোথায় যেতে পারে – সেটা সত্যিই বিস্ময়কর ! শুধু কটা বড় বড় অট্টালিকা দেখেই অবাক হবার কিছু নেই ! উন্নতির প্রথম সোপান হল অর্থনীতি – সেটা নিশ্চয় স্বীকার্য ! সেই অর্থনীতির পাখনা দেখা যাবে আমাদের কেরালার ব্যাক ওয়াটার অঞ্চলে গেলে । যুদ্ধে যে কোন দেশের জয় বা পরাজয় হয় – কেউই তা বিশ্বাস করেনা । শুধু প্রানহানি, অর্থহানি আর ট্যাক্স চাপানো ! কদিন প্রচুর মিডিয়ার আস্ফালন – নেতাদের বিবৃতি নিয়ে । এমন কি স্টুডিওতে রণাঙ্গন তৈরি করে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা পেশ করা হয় ! – তারপর হয় মার্কিন দাদার নয়ত রুশ-দাদার হাত ধরে একটা থোড় বড়ি খাড়া চুক্তি করে মুখ রক্ষা হয় ! – তার চেয়ে ঢের উপকৃত হয় দেশের মানুষ – যদি একটা স্কুল – একটা চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি হয় ! – বিগত পনের বছর ধরে একটা ইশকুলও তৈরি হয় নি । বরং গ্যারেজে গ্যারেজে ইংরিজির কারখানা তৈরি হয়েছে লাখ খানেক ! আমার মতে কোন দেশকে - তার বাসিন্দাদের সম্বন্ধে উল্টোপাল্টা বিশেষণ না দিয়ে, বরং বোঝার চেষ্টা করলে – নিজেদের মর্যাদা দেওয়া হবে ! নিজেদের মধ্যে দালালি ভাগাভাগি না করাই মনে হয় সন্মানজনক ! মনোজ

162

3

শ্রী

না হয় পকেটে খুচরো পাথর রাখলাম

মনে থাকা মুখ্গুলো এই মুখ গুলোর কোনটাই বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য মুখ একেবারেই নয়| বর্ং কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি পাথর..যার না আছে ঔজ্জ্বল্য না আছে কোন দাম| তবু কেন যে ছটি দশক পরেও মনে আছে তার কোন কারণ খুঁজে পাই নি| ল্ক্ষ্মীর মা - লক্ষ্মীর মা ছিল আমদের ঝি | শব্দটা আজকাল উঠেই গেছে কিন্তু তখনকার দিনে এটাই ছিল তাদের পরিচয়| তবে ঝি বলে কাউকে কখনো উল্লেখ করতে শুনি নি| অমুকের মা তমুকের ঠাকুমা এই বলেই তারা পরিচিত ছিল | তা আমাদের এই লক্ষ্মীর মা ছিল কুচকুচে কালো তবে মুখটা ছিল বেশ ঢলঢলে| কপালে বড় একটা সিঁদুরের টিপ পরত| নাকে ছিল একটা সাদা পাথরের নাক্ছাবি | সব্সময় ঘোমটা থাকত মাথায় | তার একটা স্ব্ভাব ছিল ঘর মুছতে মুছতে কেউ যদি ঘরে না থাকত তবে আয়্নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোমটা সরিয়ে চুল ঠিক করা| কখনো কখনো গুন গুন করে গানও নাকি করত|বাড়িতে এটা নিয়ে বেশ হাসাহাসি চলত| একদিন ওকে বলতে শুনেছিলাম কাকীমা আপনাকে আমি ঘেরতকুমারীর পাতা এনে দেব আমাদের বাড়ীতে আছে | ঘেরতকুমারী কি বস্তু তা তখনো জানতাম না .| বহুদিন পরে যখন ঘৃতকুমারী কি তা জানলাম তখন মনে পড়ত এই ঘেরতকুমারী তথা লক্ষীর মার কথা| বুড়ো মুচি ‚ পরামাণিক সাদা গেন্জী খাটো ধুতি শীত গ্রীষ্ম বুড়ো মুচির ছিল এই এক পোষাক | একটা কাঠের বাক্সে সাজ সরঞ্জাম আর কাঁধে থাকত একটা ‚ কি বলি‚সেটার নাম ত আজ অব্ধি আমি জানি না‚ তিন বাহু ওয়ালা একটা জিনিস‚ সব জুতো সারাইওয়ালাদেরই থাকে| বিহারে দেশ ছিল বছরে একবার করে যেত|জুতো পালিশ করা‚ চটি ছিঁড়ে গেলে পেরেক ঠুকে ঠিক করা ছাড়া আরেকটা কাজ ছিল সোল ক্ষয়ে গেলে হাফসোল লাগানো| এটা এখন উঠেই গেছে তবে ভ ঙ্গ প্রেমের ব্যাপারে এই হাফসোল কথাটা আজকাল শুনি| একবার দেশ থেকে আমাদের জন্য আম নিয়ে এসেছিল| সোজা কথা নাপিত না বলে তাকে সব সময় পরামাণিক কেন বলা হত তা জানি না| আশুতোষ মার্কা গোঁফ| কাঁচা পাকা চুল নিয়ে সে আসত বাবার চুল কাটতে| বারান্দায় একটা টুল পেতে বাবা বসতেন| একটা খবরের কাগজের মাঝখানের জোড়া পাতার মাঝখানটা কেটে মাথা গলিয়ে দিতেন শুরু হত চুল কাটা সঙ্গে গল্প গুজব | ও ক্ষুর চালাচ্ছে আর চুল ঝরে ঝরে পড়ছে.. আমার বেশ মজা লাগত দেখতে| আমাদের পাড়ার জাভেদ হাবিবের দোকানের সামনে দিয়ে যখন যাই এই দৃশ্যটা আমার মনে পড়ে‚ ও আর একটা কথা..|কাগজে মাঝে মাঝে পড়ি গুণ্ডা বদমাশ দের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে আর এক জন আর এক্জনের গায়ে ক্ষুর চালিয়ে দিল..কিছুতেই ভেবে পাই না ঐ নিরীহ দর্শন ক্ষুর কি করে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে তপন দা- সাদা শার্ট সাদা প্যাণ্ট নীল চোখ টকটকে গায়ের র্ং ‚ছ ফুটের -মত লম্বা---- এই হলেন তপন দা ‚ আমাদের সম্মিলনী আসরের মধ্যমণি| ২৬শে জানুয়ারী আর ১৫ ই অগস্টের ভোর এ ঘুম ভাঙত ওনার বিউগল এর আওয়াজে | প্রত্যেক গলির মোড়ে গিয়ে বিউগল বাজিয়ে সেই রাস্তার সবাইকে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে তিনি মাঠে গিয়ে প্রভাত ফেরী র তোরজোড় শুরু করতেন | আমরা হাজির হতাম অনেক পরে| উনি কিন্তু আমাদের অঞ্চলের লোক ছিলেন না | আসতেন দূর থেকে সাইকেলে..তপন দা আসেন নি এমন কোনদিন হয় নি| একটা অদ্ভুত গান শিখিয়েছিলেন একটা লাইন মনে আছে ...এক সময়ে বর্ষাকালে‚ ইস্কুল থেকে পালিয়ে‚ যাচ্ছে ও কে পুকুর ধারে আস্তে আস্তে এগিয়ে| ও ভাই কান্ত ও ভাই কান্ত ..|কান্তর উত্তর টা আর মনে নেই জানো কেউ এই টা? আসরের প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ের ভালোমন্দের দিকে সজাগ দৃষ্টি ছিল | যে কোন দরকারে‚ সে পরীক্ষার সময় স্কুলে পৌঁছে দেওয়া‚ দ্র্কারে ডাক্তার ডাকা‚ ওষুধ আনা ইত্যাদি যে কোন কাজে সব সময় হাজির| উপলব্ধি - তখন অতশত বোঝার বয়স হয় নি| তা ছাড়া তখন মোটামুটি ভাবে "সকলের তরে সকলে আমরা" গোছের একটা ব্যাপার ছিল|এই প্রান্তবেলায় এসে যখন দেখি ডাক্তার হাসপাতাল করার লোকের খুব অভাব তখন তফাৎ টা বুঝি| তপন দার মত লোক এখনও আছে তবে কিনা তখন ছিল " মন্দ যদি তিপ্পান্ন/ ভালোর স্ংখ্যা তিনশ তিন" ( কি জানি বাবা উদ্ধৃতিটা ঠি হল কিনা.|)অনুপাত টা এখন উল্টে গেছে এই আর কি ছোটবেলার সঙ্গী রা -- পাশের বাড়ী সেন লজ এ কাজ করত আঙুরের মা | বেশ মনে পড়ে সেন লজের মস্ত উঠোনের এক কোণে কলতলায় বাসন মাজছে আঙুরের মা আর উঠোনে কুমীর ডাঙা খেলা চলছে আমাদের ‚মানে আঙুর ‚ওর খুড়্তুতো দুই বোন লিচু আর খুকি‚ সহ পাড়ার আরো অনেক বাচ্চা দের| কত আর বয়স হবে তখন আমাদের এই ৮/৯ কি বড় জোর ১০| উলি ঝুলি চুলের‚ ছেড়াঁ খোঁড়া জামা পরা আঙুর আর তার বোনদের কখনো বেমানান মনে হয় নি আমাদের সেই খেলার দলে| আর একটু বড় হতে ‚একটু পা বেড়েছে তখন‚ খেলার জায়্গা পাল্টে গেল | কুমীর ডাঙার মত নাবালক দের খেলা ছেড়ে তখন বড়দের কাটা ব্যাডমিন্টন কোর্টে গাদি ‚হা ডুডু এই সব খেলা হত| নতুন অনেক সঙ্গীও এ দিক ও দিক থেকে জুটল| এদের মধ্যে ডাকাবুকো ছিল দু জন‚ উমু আর ভুলু| দু জনে যদি এক দলে পড়ল তাহলে উল্টো দলের সেদিন খেলায় জেতার কোন সম্ভাবনা থাকত ন| আবার যদি দু জনে দু দলে পড়ত তাহলে বেশীর ভাগ দিন তুমুল ঝগড়া ঝাঁটিতে শেষ হ্ত খেলা |একদিনের কথা মনে আছে| সে দিন দল তৈরী হবার আগে তুমুল ঝগড়া বেধেছে উমু আর ভুলুর মধ্যে| যে যার নিজের পছন্দের জনকে দলে টানার চেষ্টা করত| তার জন্য নানারকম কৌশল ও ছিল| সে দিন ঝগড়া এমন পর্যায়ে গেল যে খেলা ভেস্তে যাবার উপক্রম হয় আর কি| বাদবাকি সকলের চেষ্টায় যাই হোক খেলা শুরু হল তবে সকলেরই আশঙ্কা এর পরে ওদের হয়তো জন্মের মতো আড়ি হয়ে যাবে | খেলা শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই উঃ বলে ভুলুমাটিতে পড়ে গেল| মনে হয় কিছুতে হোঁচট খেয়েছিল‚ হতবুদ্ধি আমরা....উমু সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে বসে পড়ে ওর পা টা কোলে তুলে খানিক হাত বুলিয়ে দিল‚ মালিশ ‚ ঐ আর কি‚ করল আমাদের বলল যা প্রভাত জ্যাঠাদের বাড়ি থেকে গাঁদা ফুলের পাতা নিয়ে আয়| কে বলবে খানিক্ষণ আগেই ওর সঙ্গেই তুমুল ঝ্গ্ড়া হয়েছিল এদের সঙ্গেই কেটেছে আমার ছোটবেলা খোলামেলা আর অবারিত পরিবেশে..যার খুব অভাব দেখি এখন| উমু অকালে ইহলোকের মায়া কাটিয়েছে আর সব সঙ্গীরা যে কোথায় হারিয়ে গেল কি জানি .. কবেই বা বড় হয়ে গেলাম হারিয়ে গেল সেই সোনালী বিকেল গুলোর ছোটবেলা

2435

148

ঋক

ঋকানন্দের দিনকাল

ভুটে_আর_ছোটকা 'আ আ এইভাবে, যেরকম বাজিছে সেভাবে গলা মেলা। না না অত চড়ায় ধরলে তো তারপরে আর ধরে রাখতে পারবিনা। আচ্ছা আবার শুরু কর। ' মা যত্ন করে গান শেখান, ভুটের শিখতে ভুল হয়ে যায় কেবলই। ভুটের গলায় সুর নেই, চড়ায় গেলে ভেঙে যায়। রাগ করে দুম দাম করে পালায়। ছুট ছুট ছুট। কোথায় যাস রে ভুটে। থাকবো না এখানে, আমি পারছিনা। পালালেই পারবি বুঝি? ভুটে তাও পালায়। অস্থির ভঙ্গীতে ঝাঁপায় পুকুরে, গান না হয় নাই হল, আজ ডুব সাঁতারে অভিকে হারিয়ে দেবে। 'ভুটে ওঠ,উঠে আয় শিগগিরই, লজ্জা করেনা, মাস্টারমশাই এসে বসে আছেন, এতক্ষন ধরে চান করতে হয়! জ্বর বাধিয়ে বোসে থাকবি আর পরীক্ষায় ধ্যারাবি তাই ইচ্ছে বুঝি।' আবার ছুট ছুট ছুট। বাজনা থেকে শুরু করে ইউটিউব হয়ে পালাচ্ছে ভুটে। অ্যাই ভুটেদা খেলবে আমাদের সাথে? ভুটে ফুটবলে শট মারতে পারেনা, স্কোয়ার কাট দূরে থাক ভুটে জানেনা কেমন করে বল এলে আটকাতে হয়। দৌড় দৌড় দৌড়, দাঁড়াও ভুটে। দৌড়ে তো কোথাও পালানো যায় না.... ধড়মড় করে উঠে বসে ভুটে। স্বপ্ন দেখছিল। ঘেমে নেয়ে গেছে। বিকেল হয়ে গেছে সেই কখন। ঘুম থেকে উঠে এক মুহূর্ত বুঝতে বেভুল হয় সকাল না সাঁঝ কোথায় আছে সে। কেন এমন স্বপ্ন দেখলো সে। অস্থির লাগে।জানলার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো মাখা আকাশ দেখা যায়। ছোটকাকে খুঁজতে হবে। বুকের মধ্যে কেমন ছটফট লাগছে। -ছোটকা? - বল। এমন অসময়ে যে ভুটে সর্দার। কী ব্যপার? - ছোটকা অস্থির লাগছে। একটা স্বপ্ন দেখলাম। ভারী অদ্ভুত জানো। নানার দৃশ্য সব, আমি ছুটছি, কে যেন বলছে ছোটো, পালাও, আর কে যেন ছুটতে নিষেধ করছে। এ কেমন স্বপ্ন ছোটকা? হাসছো তুমি? তুমি জানো কেন এমন হয়? - না রে ভুটে অত জানলে আমি তো বিরাট কেউকেটা একজন হতাম। - তুমি আমায় ছোট ভাবো তাই জানোনা, আমি জানি, তুমি আসলেই কেউকেটা। সবাই যখন ভালো ভালো চাকরি নিয়ে দূর দূর দেশে চলে গেল, তুমি কোন দূরে বসে বসে ফসল ফলালে, স্কুল খুললে সেই স্কুলে আবার যারা পড়ে তাদের কাউকে তুমি সিলেবাসের পড়া পড়ালে না, ইতিহাসে গল্প বললে সে এমন গল্প আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়ও অত জানেনা। দেশ বিদেশের গল্প বললে, তারা চেনালে, গাছপালা চেনালে, পাখির ডাকের পার্থক্য শেখালে ঋতু ভেদে, অংক কষতে শেখালে। আমার তো ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার স্কুলেই চলে যাই। - না রে পাগলা। এদের গাছপালা আমি চেনাবো কি, এরা বেশীরভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে এসব চেনে, এরা আমার চেয়ে বেশী ভালো পাখি চেনে।কোন ফুলের মধুতে কোন কেমন গন্ধ কেমন স্বাদ সব চেনে। আমি খালি আমাদের পুরোনো বইপত্র খুঁজে কোন ওষধিতে কী কাজ হয়, সে সব বলেছি। দেখ এদের তো তোদের পড়া পড়ে লাভ নেই। তাই এসব পড়াই। - কেন লাভ নেই? - মাথা খাটাও ভুটেবাবু। আমাদের দেশে এত লোক, সবাই থোড়াই চাকরি পাবে? বরং এরা যা জানে সেই শিক্ষার সাথে আমাদের শিক্ষার মিশেল দিলে এরা এখানেই অনেক বেশী ভালো থাকবে। ছাড় এসব শক্ত শক্ত কথা।তোকে আমার কলেজের গল্প বলি শোন। আমার কলেজটা একটা জঙ্গলের মধ্যে বলেছিলাম তোকে। আমার তখন তেমন বন্ধু বান্ধব নেই। সবাই প্রেম টেম করছে, যারা করছেনা তারা খেলাধূলা করছে। মোদ্দা কথা ভয়ানক একা পড়ে গেছিলাম। আমার সে সময় কেন জানিনা পালাতে ইচ্ছে করতো খুব। - কেন ছোটকা? - ঠিক জানিনা। খুব দুর্বল ছিলাম, ফিট করতাম না ঠিক সবার সাথে তাই হয়ত। কিংবা ওই উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে আমার ঘরের মধ্যে থাকতে ভালো লাগতো না। কিংবা নিজেকে নিজে সইতে পারতাম না, আমি ঠিক জানিনা। - কোথায় পালাতে ছোটকা? এখন আর পালাও না কেন? - পালাতাম, মানে আশেপাশেই, পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে। ছোট ছোট গ্রাম, নদী, শুষ্ক প্রান্তর। পথ হারিয়ে কত সময় হয়েছে অচেনা কারোর বাড়ি পৌঁছে গেছি।ওখানকার গ্রামের মানুষজন খুব গরীব জানিস, তাও তারা আমায় ঝকঝজে মাজা ঘটিতে জল খেতে দিত। কেউ কখনো রিফিউজ করেনি। খেয়ে যেতে বলত। আমরা বলিনা কিন্তু। যাইহোক সেসব দারুণ সময় ছিল বুঝলি। আবার ভয়ানক সময় ছিল। - এ কেমন কথা। দারুণ সময় আবার ভয়ানক কেন? - দারুণ মানে ওই রকম পালিয়ে পালিয়ে ঘুরে বেড়াতে দারুণ লাগতো তো। ফিরতে ইচ্ছেই করত না। আর ভয়ানক কারন নিজেকে নিজের পোষাতো না। - কেন? - সে ম্যালা কারন আছে। কিন্তু কথা হল অমন পালিয়ে পালিয়ে কিন্তু সমস্যার সুরাহা হল না। তাই শেষমেষ পা বাড়িয়েই দিলাম যা করতে হবে তার দিকে। - কিন্তু তাতে তো ভয়ানক সমস্যা আসতে পারে। - সে তো পারেই। কিন্তু কী জানিস, পড়ব পড়ব ভয়, পড়লে কিছু নয়। একবার সাহস করে নিজের পথে হাঁটতে শুরু করলে দেখি রাস্তা তৈরী হতে সময় নেয় না। তখন সমস্যা গুলোকেও ফেস করার জোর চলে আসে। কেন জানিস? কারন তুই নিজের মতো চলছিস। - সত্যি এমন হয়? - হয়, ভুটেরাম হয়। কাল তো স্ট্রীম চুজ করার দিন, একবার সাহস করে ঘুরে দেখই না, সত্যিই ভয় পাবার কিছু আছে না স্রেফ কলাগাছকে পূর্নিমায় পেত্নী ভাবছিস। ছোটকা তো আছেই তারপর। কিন্তু ভুটেবাবু নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হয়, বাকিরা বড়জোর সারথি হতে পারে। - থ্যাংক ইউ ছোটকা। -থ্যাংক ইউ কিরে ব্যাটা। এই শনিবার দুজনে মিলে নলেনগুড়ের আইস্ক্রীম খেতে যাব বুঝলি?

287

29

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের জন্যে সঞ্চয় !

জীবনের জন্যে সঞ্চয় ! আবার মাথায় কিছু লেখার তাগিদ চেপেছে ! – কিছু কিছু মানুষের সব সময়েই নিজেকে প্রতিপন্ন করার তাগিদ মাথায় চেপেই থাকে । ঐ যে বলে না – আশি বছেরেও বুদ্ধি পাকে না ! সেই রকম – কেউ পড়ে না – আপনি মোড়ল ! মনে আছে – দেবানন্দ শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগের সপ্তাহেও স্টুডিয়োর ঘরে এসে বসে পরবর্তী কোন মুভির চিত্রনাট্য লিখতেন ! – শোনা কথা ! - কিন্তু এটা নিজের চোখে দেখা – একটা এ্যাওয়ার্ড শো তে - সয়েফ আলিকে কথা দিয়েছিলেন – ওনার পরবর্তী ছবিতে একটা সুযোগ দেবেন – নিশ্চয় ! – বেচারি সইফ ! আমাদের “অর্পণ” গড়ার সময় পুলিশের সঙ্গে মিটিঙে – আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম – ইচ্ছুক লোকেদের নিয়ে সামাজিক কোন কাজ করানো যায় কিনা ! যেমন সিভিক ভলান্টিয়ার বা ঐ ধরনের কিছু ! কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম – সেটা এদেশে সম্ভব নয় । এর বিভিন্ন যুক্তিযুক্ত কারণও আছে । সে আলোচনা করে কোন লাভ নেই ! – তাছাড়াও আমরা সাধারনত গ্রহন করতে যত আগ্রহী – প্রদান করতে তত নয় ! আমাদের অবসর পত্রিকায় লেখার জন্যে – প্রবীণদের জন্যে বিষয় খুঁজতে আরম্ভ করলাম । দেখলাম নানান দেশে স্বেচ্ছাশ্রম ব্যাপারটা খুব পরিচিত ও প্রচলিত ! – স্কুল থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা ‘সময়’ নিয়ে কোন হাঁসপাতালে গিয়ে প্রবীণ রোগীদের কাছে গিয়ে বসে ! শুধু প্রবীণ রোগীই নয় – শিশু রোগীদের কাছে গিয়েও নানা রকম ছবি আঁকার কাগজ রঙ পেন্সিল দিয়ে তাদের উৎসাহ দেবার চেষ্টা করে ! লাইব্রেরীতে গিয়ে অন্যদের সাহায্য করে । গির্জায় গিয়ে প্রার্থনাসভায় কিছু সাহায্য করে । এখানে মন্দির বা মসজিদে অবশ্য সে সুযোগ একেবারেই না-না ! পান্ডাদের কাজে হস্তক্ষেপ করলে ধর্ম-বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী ! ছাত্ররা যে গিয়ে অন্যত্র স্বেচ্ছাশ্রম করে – সেটা কিন্তু পয়সার বিনিময় নয় ! কিন্তু বিনা স্বার্থে নয় ! তাদের স্কুলের পরীক্ষায় এই স্বেচ্ছা-শ্রমের বদলে ক্রেডিট দেওয়া হয় ! আবার হাসপাতালে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দিলে যে ক্রেডিট দেওয়া হয় – সেই ক্রেডিট কলেজে – বিশেষ করে মেডিকাল পড়তে খুব সাহায্য করে ! এছাড়াও হাসপাতাল-গুলোর অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক শিক্ষার কাজে লাগে ! অনেক দেশে এই স্বেচ্ছাশ্রম বা স্বেচ্ছা-সেবা দেবার রেওয়াজ আছে । অনেক ইচ্ছুক মানুষে হাঁসপাতাল বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরিষেবা দেয় । অনেকে আবার প্রবীণ মানুষদের বাড়িতে গিয়েও পরিষেবা দেন । - মানে আয়ার কাজ বা স্রেফ সঙ্গ দেওয়ার জন্যে পরিষেবা । দোকান বাজার করে দেওয়া বা ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত কাজ ইত্যাদির জন্যে । তারজন্যে এরা টাকা নেয় না । তবে একেবারে নিঃস্বার্থেও নয় ! এনারা প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে যে পরিষেবা দেন – তাঁর বিনিময় এনাদের একটা ‘টাইম-কার্ড’ এ যত ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়া হয় তা ক্রেডিট হিসেবে জমা থাকে । আর এই ক্রেডিট জমতে থাকে ততদিন পর্যন্ত – যতদিন না উনি নিজেই কারুকে আয়া বা সঙ্গী হিসেবে ভাড়া করতে পারেন ! পরিষেবক এতদিন যত ঘণ্টা পরিষেবা জমিয়েছেন – সেই পরিষেবা উনি পাবেন – তাঁর নিজের বা স্পাউসের জন্যে । এবং সেই পরিষেবা হবে বিনা পয়সায় ! তিনি ইচ্ছে করলে নিজের বাড়িতে বা বৃদ্ধাবাসে কাউকে সঙ্গী বা আয়া হিসেবে ডাকতে পারেন ! অতি সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের একটা সামাজিক বার্ধক্য পরিষেবার কথা দেখতে পেলাম । সুইজারল্যান্ডে এই ধরনের একটা পরিষেবা চালু আছে । পরিষেবা প্রদানকারীর নিজস্ব সোশ্যাল সিকিউরিটি পদ্ধতি মারফত তাঁর প্রদত্ত পরিষেবা পার্সোনাল টাইম কার্ডের একাউন্টে জমা থাকে । আর তিনি তাঁর বার্ধক্যে সেই জমা পরিষেবা সেই টাইম কার্ড মারফত ব্যবহার করতে পারেন । প্রকৃতপক্ষে ইউরোপীয় অনেক দেশেই প্রবীণ মানুষদের জন্যে বেশ কিছু কল্যাণকর ব্যবস্থা চালু আছে । তারমধ্যে খুব ভালো পেনশান ও সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার পদ্ধতি । এই বার্ধক্যে সেবা প্রদানকারী প্রকল্প সেখানে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে । কারন হিসেবে বলা যায় – এর ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ কম পড়ে ! আমরা কি এই স্বেচ্ছা-শ্রম টাইম-কার্ড এখানে – এদেশে প্রচলন করতে পারিনা ! উত্তর খুব স্বাভাবিকভাবেই হবে – রীতিমাফিক না ! – কারন ‘ না’ শব্দটাই সবচেয়ে সহজ উত্তর ! এ ছাড়াও বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক বাধা আছে ! – আছে বর্তমান চাকরিজীবীদের চাকরির ভয় ! আছে – জন্মগত নেতিবাচক একটা শব্দ – ‘না’ ! এই একটা ক্ষেত্রে অন্তত ‘আমার কি লাভ’ – কথাটা টিকবে না ! কারন পুরো ব্যাপারটাই তো আমার ভবিষ্যতের জন্যে ! আমি আমার কর্মজীবনে যত ঘণ্টা স্বেচ্ছা-শ্রম প্রদান করবো কাউকে বা কোন প্রতিষ্ঠানে – অর্থাৎ কোন সরকারি বে-সরকারি হাসপাতালে বা অন্য কোথাও – সেটা তো আমার টাইম কার্ডে জমা থাকবেই – হয়ত বোনাস-ঘণ্টাও জমা হবে ! – বার্ধক্যে আমার অসুখের সময়ে – আয়া বা নার্স দরকার হলে সেই টাইম-কার্ড দেখিয়ে আমার খরচ বেঁচে যাবে । হয়ত খুব সামান্য ব্যয় হবে ! এখানে ব্যাঙ্কে টাকা রাখার মতো সুদের ব্যাপার নেই ! তাই স্বেচ্ছা-শ্রমের বর্তমান আর্থিক-মুল্য ও ভবিষ্যতের আর্থিক-মুল্য তুলনা অবান্তর হবে ! প্রধান বাধা হবে – নার্স বা আয়া সেন্টারগুলোর উঠে যাবার আশংকা ! ওরা সবাইকে তাই বোঝাবে ! কিন্তু সত্যিই কি ওদের কাজ বন্ধ হবে ! মোটেই না ! ওদের ব্যবসা যেমন চলছে তেমনি চলবে ! কারন ওদের কাছ থেকেই নার্স বা আয়া ভাড়া করতে হবে ! হয়ত রুগীর সঙ্গে আয়া সেন্টারের আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার থাকবে না ! আমার মনে হয় এই স্বেচ্ছা-শ্রম টাইম-কার্ডের পদ্ধতি নিয়ে আমাদের একটু ভাবনা-চিন্তা করা উচিত ! স্বেচ্ছা-শ্রমও আমাদের একটা সঞ্চয় ! আমাদেরই জন্যে ! মনোজ

136

5

মনোজ ভট্টাচার্য

লকডাউনের গাথা !

লকডাউনের গাথা ! প্রথমে একটা উপক্রমণিকা - মানে ধ্যানাই পানাই - করে নিই ! আমার বাঁ চোখের অপারেশন হল আঠেরোই মার্চ । ফাইনাল চেক আপ করে পাওয়ার দেবে পচিশে মার্চ । সবই ঠিক । আচমকা লকডাউন শুরু হল তেইশে মার্চ । সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল ! চোখের হাসপাতাল, চশমার দোকান, বাস, গাড়ি, অটো-রিকশা, দোকান-বাজার, এমনকি রাত্তিরে রাস্তায় বেরনো পর্যন্ত ! আগে কখনো তো লকডাউন দেখিনি । তাই বুঝতে সময় লাগলো – লকডাউন কী ! মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা-সাক্ষাৎ, বাড়ি থেকে অ-দরকারে বেরনো – সব কিছু বন্ধ ! অর্থাৎ সামাজিক কারফিউ ! প্রথম কদিন তো দুধ ও কাগজও দেখতে পাই নি ! বাড়ির পাশেই দু-দুটো ব্যাঙ্ক – বন্ধ ! মেসিনে টাকা নেই ! লকডাউন - প্রথম কদিন একধরনের সর্বাত্মক হরতালের রূপ ধারন করলো । কিন্তু হরতালের মধ্যে যেমন একটা পুলিশী সন্ত্রাস ভাব আছে – সেসব নেই । নেইই বা বলছি কেন ! তাও তো হয়েছে । প্রথম দিকে পুলিশ কুলি-মজুরদের বেশ পিটিয়ে নিয়েছে । বেচারিরা তখনো পর্যন্ত বুঝতেই পারেনি – লকডাউনটা ঠিক কি ! – যুদ্ধের ব্যাপারটা সবারই অল্প-বিস্তর জানা আছে । সব সময়ে হয় চীনা নাহয় পাকিস্তান ভারাতের সঙ্গে যুদ্ধ করে – দেশে সন্ত্রাসী পাঠায় ! - কিন্তু এখন তো করোনা – তার সঙ্গে যুদ্ধ ! অস্ত্রশস্ত্র নেই – বিরুদ্ধ প্রোপাগান্ডা নেই – দেশাত্মবোধক গান – টি ভিতে হচ্ছে না ! শুধু রোজ কাগজে ও টি-ভি তে করোনাতে মৃত-মানুষের সংখ্যা বেড়ে যেতেই থাকছে ! তাহলে করোনা হল একটা সাঙ্ঘাতিক রোগ । - মহামারী বলতে বয়স্ক মানুষের কাছে এক প্লেগ রোগের ভয়াবহ স্মৃতি আছে । আমরা আবার সে সব শরৎচন্দ্রের গল্পে পড়েছি । কলকাতায় নাকি ভয়াবহ প্লেগের প্রাদুর্ভাব । রোগের ভয়ে লোকে কলকাতা ছেড়ে বিহার পালাচ্ছিল । বাড়িতে কারুর এই রোগ হলে – আত্মীয়রা তাকে ফেলেই পালিয়ে যেত ! একমাত্র শরত বাবুর নায়িকা বা নায়ক ছাড়া কেউই ধারে কাছে থাকত না ! তাহলে করোনা রোগ সম্বন্ধে পড়া বা জ্ঞাত হওয়ার চেষ্টা করা শুরু হল । গুগুল এ ডেলি-হান্টে, ফেস বুকে – যেখানে যাকিছু বেরয় – তাই দিতে থাকি নিজ নিজ ওয়েবসাইটে ! ভাবটা হল - আমরা কি কিছু কম জানি নাকি ! আজ কাগজে দেখি ১৯১৮ সালে একটা ভয়াবহ স্পানীশ ফ্লু রোগে মৃত প্রায় ৫০ মিলিয়ন – মানব সভ্যতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক মর্মান্তিক মহামারী ! – তারও পরে এসেছিল – সার্শ - কোভিড ২ । এই রোগের থেকে বাঁচার একটিই উপায় ছিল – সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং ! এখনও সেই সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং – বিখ্যাত বা কুখ্যাত সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব ! অর্থাৎ ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধু – ঐখানে থাকো ! তা তো হল ! আমাদের রোজকার জীবনে এসবের প্রতিফলন কি ! প্রথমেই যেটা বয়স্ক মানুষদের সন্মুখীন হতে হল – বাড়িতে গৃহ-সেবকদের আসা বন্ধ হল । আমরা ভেবেছিলাম বোধয় দু-চারদিন ! সবাই এত কষ্ট করছে – আর আমরা এক সপ্তাহ সহ্য করতে পারব না ! – হাসি হাসি মুখ করে রান্না ও বাসনমাজা ঘর ঝাঁট দেওয়া করা শুরু হল ! – ফলে কোমরে ব্যথা ! ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ ! ওষুধের দোকানে লা-ই-ন ! একদিন তৃণমূলের চার-পাঁচ জনের একটা দল এসে দুটো কাপড়ের মাস্ক ও আধ বোতল সোপ দিয়ে গেল – সঙ্গে বানী – কোন অসুবিধে হলেই ফোন করে দেবেন ! – ফোনের ওধারে ‘আপনি যাকে ফোন করছেন, তিনি এখন ফোনটি ধরছেন না ‘! হঠাৎ বাজারে খাবারের জিনিসে টান ধরল । পাউরুটি, বিস্কুট কমে গেল । আনাজ উধাও হয়ে গেল । সবচেয়ে আতঙ্কজনক – চাল নেই ! দোকান বন্ধ ! আমাদের কম্পাউন্ডের বাইরে একটা সুপারমার্কেট ‘মোড়’ – চব্বিশ ঘণ্টা খোলা । সেখানে ডাব্বাগুলো খালি ! কি - না গাড়ি বন্ধ – মাল আসছে না ! দুদিন পর থেকে দুধ আসতে আরম্ভ করল । কাগজও এলো – কিন্তু গেট পর্যন্ত । কাগজ-ওলারা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবে ! কিন্তু বাকি পৃথিবী রইল পড়ে – বিনায়কের বাইরে ! এক সপ্তাহের মধ্যেই – যত রিকশওলা, অটো-ওলারা কোথা থেকে আনাজপাতি এনে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাড়ির সামনে । গাড়ি তো নেই – তাই রাস্তায় একেবারে হাট বসে গেল ! তারপর এসে গেল রিকশ । লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে । বাজারে, সিঁথির মোড়ে, অন্যত্র ! মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে – কারুর কোন রোজগার নেই ! মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি এসে খুব হম্বি তম্বি করে ! ওরাও গোছাতে আরম্ভ করে – যেন এই উঠে যাচ্ছে ! কিন্তু ওঠা আর হয় না ! অভ্যেস অনুযায়ী একদিন রিকশাওলাদের বললাম – তোমরা মুখে মাস্ক পরছ না কেন ? পুলিশে ফাইন করে দেবে ! একজন এগিয়ে এসে বলল – কি হবে – পুলিশে ধরবে ? থানায় গেলে – খেতে তো দেবে ! - কি বলবো ! এর চেয়ে বাস্তব সত্যি আর কি আছে ! – কাগজে দেখি – এদের ব্যাংক একাউন্টে নাকি টাকা দেওয়া হচ্ছে, এদের রেশনে চাল-ডাল ইত্যাদি দেওয়া হয় ! এমন একজনকেও পেলাম না – যার একাউন্টে টাকা এসেছে । তবে পাঁচজনের পরিবারে সপ্তাহে পাঁচ কেজি চাল দেওয়া হয় । বাকি – চাল নেই ! কোথায় ডাল ! আলু তরি তরকারি ! – আমরা যেখান থেকে রেশন দিলাম – সেখানে তো চাল-ডাল-আলু-টমেটো-বিস্কুটের ছোট প্যাকেট-দুধ ! কমপ্লেক্সের বয়স্ক মানুষ বা মহিলাদের বাজার কিনে নিয়ে গেট থেকে নিজেদের ব্লকে হেঁটে যেতে কষ্ট । ম্যানেজমেন্টের কাছে কম্পাউন্ডের ভেতরে যাতায়াতের জন্যে একটা রিকশার বন্দোব্যস্ত করা গেল । সে কম্পাউন্ডের ভেতর থাকবে । বাসিন্দাদের হাতে করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে না । আমার সন্ধেবেলায় বাইরে বেরুনো অভ্যেস । কম্পাউন্ডের সামনে যাই । রোজই সিকিউরিটি আমাকে বাইরে যেতে বারন করে । ধুত-তেরি বলে বাইরে বেরুনো বন্ধ করে দিলাম । - ক্রমে ক্রমে আমাদের অর্জিত উদ্যানটি শূন্য মরূদ্যানের চেহারা পেতে লাগলো । কেউই আর সেখানে দেখা দেয় না ! এখন সব ফোনে ফোনে ! আর আমাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে কথা হয় । - বাজারে যাতায়াতে দু একজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয় । - আমাদের দিন যাপন খুব সঙ্কুচিত হয়ে গেল ! সন্ধেবেলায় এখন শুধু টি ভি । তবু আমাদের জিও নেওয়া আছে বলে – অনেক চ্যানেল বেশি পাই । বিভিন্ন চ্যানেলে পুরনো সিনেমা ও পুরনো সিরিয়াল দেখতে পাওয়া যায় । যেমন সুবর্ণলতা – প্রায় তিন শোর মতো এপিসোড – বিনা বিজ্ঞাপনে দেখতে আরম্ভ করলাম ! দেখতে দেখতে আমাদের সবাকারই জীবনের ধরন প্রায় এক হয়ে যেতে লাগল । সুদুর বিদেশে গৃহবন্দী ছেলে ও তাঁর বৌ যেমনভাবে দিন কাটাচ্ছে, এই আড্ডার বন্ধুরা যেভাবে দিন কাটাচ্ছে – আমরাও সেই একইভাবে দিন কাটাচ্ছি ! করোনার কারুণ্যে সবারই জীবনধারা একাকার ! রোজ কাগজের ও টি-ভির খবর দেখতে দেখতে নিজেদের ওপর ক্রমশ অবসন্ন ও হতাশ হওয়া ছাড়া কিছু রইল না ! মানুষের মানুষীপনার ওপর সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগলো ! হাসপাতাল থেকে নার্সেরা বাড়ি ফিরতে পারেনা ! রুগীদের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয় না ! সারা ভারতে ছড়িয়ে কর্মরত মানুষেরা ফিরবে – তাদের কাজ নেই, অতএব সেখানে আর থাকতে দেওয়া হবে না । তারা কি করে ফিরবে – তার কোন ব্যবস্থা হল না । রাস্তা দিয়ে, ট্রেন লাইন দিয়ে হেঁটে ফিরতে গিয়ে কত লোকের প্রান চলে গেল । লড়ি করে ফিরতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া হল । - উড়ো খইয়ের মতো ওদের প্রান চলে যেতে লাগলো । তখনো গেরুয়া সবুজের রাজনীতি ! – যারাও বা বাড়ি ফিরতে পারল – তবু বাড়ি ঢুকতে পারল না । তাদের কখনো স্কুল বাড়িতে, কখনো শ্মশানঘরে থাকতে হল ! এ কি কোরোনা-শাসিত সমাজের পত্তন হয়ে গেল আমাদেরই সংস্কারের মধ্যে ! এই কি আমরা শিক্ষিত সংস্কৃত বলি নিজেদের ! স্বেচ্ছাসেবী যারা ত্রান নিয়ে পরিযায়ী মানুষগুলোর কাছে যেতে চায় – তাদের হয় পুলিশে ধরছে – নয় লুম্পেন দিয়ে মারধোর করা হচ্ছে ! এই তথাকথিত মানুষেরা হাতিকে গরুকে বারুদ খাইয়ে হত্যা করে মজা পাচ্ছে ! একদিন এই কোরোনা-যুদ্ধ থেমে যাবে ! আবার মানুষে গাদাগাদি করে বাসে ট্রেনে যাতায়াত করবে ! কিন্তু যে মানুষের স্রোত ভেসে গেলো করোনা ঝড়ে – তাদের বাবা-মা-সন্তান-আত্মিয় স্বজন সেই পরিস্থিতি কিভাবে মেনে নেবে ! তবে আমাদের বর্তমান এত প্রবল – বাঁচবার তাগিদে – সবই একদিন দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে যাবে ! – নদীর জল যেমন প্রতিনিয়ত বয়েই চলে উজানে ! থেমে কোথাও রয়ে যায় না ! প্রতিদিনই ভাবি – আধা অন্ধ হয়ে এই দেখছি । যদি আর চোখে দেখতে নাই পাই, কোন অনুভুতিই আর না থাকে – এর চেয়ে কি খারাপ হবে ! - তখনো কি আকাশের দিকে মুখ করে কেনেস্তারা পেটাবো ? মনোজ

131

4

Nazmus Saquib

করোনা-An Evolution!

2060 পুরনো দিনের ডায়রি হাতাতে হাতাতে পেলাম Thanosএর বলা কিছু ডায়ালগ, যা যত্ন করে লিখে রেখেছিলাম কৈশোরে! "Little one, it's a simple calculus. This universe is finite, its resources, finite… if life is left unchecked, life will cease to exist. It needs correction." এখনো এসব পড়লে ২০২০ এর কথাই মনে পড়ে। কে ভুলতে পারবে ২০২০ সালের কথা?!?। যে সাল কেড়ে নিয়েছিল পৃথিবীর ১/৪ জনসংখ্যা, যা অব্যাহত থাকে ২০৪০ পর্যন্ত। এবং তার ধাক্কা কাটাতে কাটাতে লেগে যায় আরো ২০ বছর। কিন্তু পুরোপুরি কাটিয়ে নেয়া আর সম্ভব হয়নি। পৃথিবী এখন কোলাহলমুক্ত, সুজলা-সুফলা উর্বর ভূমি। মানুষ যখন লড়ছিল করোনার সাথে, পৃথিবী তখন নিজের ক্ষতচিহ্ন ভরাট করছিল নিজে নিজেই! করোনাক্রান্ত দিন দিন বাড়ছিল জ্যামিতিক হারে, মৃত্যও বাড়ছিল তালে তাল রেখে। সে সময়ের তরুণ প্রজন্মের চোখে দেখা সবচেয়ে স্পষ্ট এবং বৃহদাকার দূর্যোগ! করোনা ধীরে ধীরে বিবর্তিত হতে হতে ধারণ করতে থাকে আরো বিশাল এবং বিধ্বংসী আকার। মানুষের সাথে ছড়িয়ে পড়ে সকল প্রাণীর মাঝে। একসময় আমরা এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাই, এরই মাঝে দূর্বলরা ঝরে পড়ে, আর সারভাইভাররা হয়ে যায় বিবর্তিত, নতুনের সাথে খাপ খায়িয়ে নেয়া। এটাই Natural Evolution... একসময় এ পৃথিবীর বুকে Dinosaur ছিল, আজ নেই! একদিন আমরাও বিলুপ্ত হবো, পৃথিবীও বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত আমাদের বিবর্তন ঘটতে থাকবে! Marvel এর Thanos এর কথা মনে আছে?! He was real! So real! সে এসেছে। সে আসে প্রতিবারই, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার কাজটা করে আবার চলে যায়। শুধুমাত্র সে মুভির মত কোনো প্রাণীর রূপ নিয়ে আসেনা! কখনো এস্ট্রোয়েড হয়ে, কখনো ভূমিকম্প-সুনামি হয়ে, কখনো বা বিশ্বযুদ্ধ হয়ে কিংবা করোনা, ফ্লু, কলেরা, জলবসন্ত রূপে। হারিয়ে যায় ডায়নাসোর, হারিয়ে যায় এটলান্টিস, মাচু-পিচু, মোহেঞ্জো-দারো, ট্রয় নগরী। ধ্বংস হয়ে যায় ইনকা, ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় সভ্যতা! পৃথিবীর কোলাহল কমে যায় কিন্তু পিছিয়ে যায় বছরের পর বছর। Thanos এর ভাষায় Perfectly balanced as all things should be! মানুষ পেয়েছে তার পৃথিবীর প্রতি অবিচারের ফল, নিজেদের আধুনিকতার নামে ধ্বংসের প্রতিদান! লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এভাবেই সবকিছু চলে আসছে এবং চলতে থাকবে চক্রাকারে!

136

4

শিবাংশু

রিস্টার্ট, বাবিদা

এই যে ছবিটা। আমার বাড়ি গানের আড্ডায় বাবিদার গান গাওয়া। সম্ভবত আসরে গাওয়া ওঁর শেষ সোনার তরী। কারণ এর কিছুদিন পরেই পুজোর সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল। তার পর বারবার অচল হয়ে যাওয়া শরীরের গল্প। বাবিদাকে চিনি জ্ঞান বয়্স থেকে। তিনিও চিনতেন। আমার থেকে সাত-আট বছরের বড়ো । ওঁদের এবং আমাদের পরিবার বাঁধা ছিলো রবীন্দ্রডোরে, চিরকাল। বাবিদার বাবা পদ্মলোচন বসু এবং আমার পিতৃদেব ছিলেন ঘনিষ্টতম সুহৃৎদের দলে। বাবিদার একেবারে ছোটো বোন আমার সহপাঠী ছিলো। পারস্পরিক বিনিময়ের মাত্রাটি ছিলো নিত্যদিনের। প্রত্যহ লেগে থাকা সাহিত্যসভা, গানবাজনা, অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির সব দিক নিয়ে নাড়াচাড়া, আমাদের দেখা হয়ে যেতো। যতোদিন ছিলুম ঐ শহরে, ছেদ পড়েনি। মনে পড়ছে আমাদের 'বিসর্জন' নাটক। পদ্মজেঠু (ওঁর পিতৃদেবকে তাই বলে ডাকতুম আমরা) নির্দেশক। ওঁদের বাড়িতেই রোজ মহলা। একদিন বললেন সাত দিন বন্ধ থাকবে। কারণটি জানতুম আমরা। বাবিদার বিয়ে। সাতাত্তর সাল। সেদিন মনে হয়। প্রচুর খাওয়াদাওয়া হলো। মনে আছে চপটি খেতে ছিলো খুব সুস্বাদু। এক একটা স্মৃতি এরকমই। বৌদি ভারি মিষ্টি দেখতে। বাবিদা আমাদের শহরে সম্ভবত সব চেয়ে নিষ্ঠাভরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিলেন। যেরকম দেখতুম, মনে হতো তাঁর বাবার প্রিয় সন্তান ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে যাঁরা ওঁর গান শুনেছেন, তখন কণ্ঠস্বর অনেক খিন্ন হয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে, প্রথম থেকেই নিচু স্কেলে (সি-ন্যচরাল) গান গাওয়ার জন্য পরের দিকে ওঁর গলা ভারি হয়ে গিয়ে স্ফূর্তিটি হারিয়ে যায়। আর একটা কারণ ছিলো নিরবচ্ছিন্ন সিগারেট। দুটো নিয়েই আমি তাঁকে বলেছিলুম। তিনি স্বীকার করলেন। কিন্তু বললেন, আর ফেরা যাবেনা। শ্রোতা হিসেবে আমাদের ক্ষতি। নব্বই দশকের মাঝামাঝি চাকরিসূত্রে আমি দীর্ঘদিনের জন্য জামশেদপুর ছেড়ে দূরে চলে যাই। বছর আষ্টেক পর যখন ফিরে আসি দেখতে পাই একটা ছন্দপতন ঘটেছে। তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে। টেগোর সোসাইটিতে তখন আর গান শেখান না। কিছু মনান্তর ঘটেছিলো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অন্তত বিশ বছরের সম্পর্ক ছিলো সেটি। পারিবারিক জীবনেও সম্ভবত। ২০১৮ তে পুজোর সময় আমি জামশেদপুরে ছিলুম। দশমীর দিন ভোরবেলা একটা বার্তা পেলুম ফোনে। ‘আর পারছি না...'। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলুম। পেলুম না। কয়েকবার করার পর ধরলেন। বললেন অসম্ভব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অন্য লক্ষণগুলিও একেবারে ভালো নয়। থাকেন একটা পাণ্ডববর্জিত জায়গায়। সোনারপুর স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে একটা গ্রামীণ বসতিতে। একেবারে একা। পড়শিরাও কেউ নেই তখন। সবাই পুজোর ছুটিতে বাইরে। ওঁর ছোটো ভাই এখন কলকাতাবাসী হলেও সেই মুহূর্তে বিদেশে। ওঁর একমাত্র পুত্র তো দীর্ঘকাল বিদেশবাসী। আমি বলি, এক্ষুনি নিচে নেমে একটা অটো করে পিয়ারলেস হাসপাতাল চলে যান। তিনি বলেন, হাঁটতে পারছি না। অটো স্ট্যান্ড অনেকটা দূর। আমি তো তখন বহু দূরে। কলকাতাতেই নেই। এক অগ্রজ বন্ধুকে ঘুম ভাঙিয়ে ফোন করলুম। যাঁর সঙ্গে আমার বাড়িতেই বাবিদার যোগাযোগ হয়েছিলো। তিনি আশ্বাস দিলেন। আধ ঘন্টা পর ফোন করলুম। বাবিদা ধরলেন। তিনি কোনও ক্রমে রাস্তায় এসে একটা অটো ধরে হাসপাতাল চলেছেন। অন্য বন্ধু ততোক্ষণে পৌঁছে গেছেন হাসপাতালে। সে যাত্রা বাবিদা রক্ষা পেলেন বটে, কিন্তু জীবনযাত্রায় কোনও তফাত হলোনা। যাবতীয় পান, ধূম বা তরল, অথবা ভুতোর দোকানের 'বিরিয়ানি' কিছুতেই ক্ষান্তি নেই। মানা করলে একই উত্তর, চলে গেলেই বা কী হবে? তারপর থেকে ক্রমাগত অসুস্থতা। একবার এই হাসপাতাল বা অন্য জায়গায়। ততোদিনে ছোটো ভাই কলকাতা ফিরে এসেছেন। তিনিই সামলান যথাসাধ্য। শেষে অবস্থাটি গুরুতর থেকে গুরুতম। তেইশে মে তো শেষই হয়ে গেলো। আমি তখন সদ্য ফিরেছি কলকাতায়। গরমে হিট ফিভার নিয়ে। কেওড়াতলা পর্যন্ত যেতে পারিনি। আধ শতকেরও অনেক বেশি দিন যে পরিচয় তা শুধু শরীরের সঙ্গে চলে যায়না। মানছি, জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেক দিন আগেই। অতো অনিয়মিত জীবন শরীর নেয়না। স্বভাব 'দোষে' ঠিক 'সামাজিক' হয়েও থাকতে পারেননি। তাঁর অনেক পরে কলকাতা এসেও আমার বন্ধুবৃত্তের পরিধি হয়তো বেশ খানিকটা বড়ো। সেই বৃত্তে তাঁকে আনতে চেয়েছি। পারেননি। যে নির্বাসন মানুষের কাম্য নয়, সেই গহ্বরে শান্তি খুঁজতেন। গৃহস্থ মানুষের যা কিছু থাকলে সে পরিপূর্ণ বোধ করে, তা সবই ছিলো তাঁর। শুধু সেই যাপনটি তাঁর জন্য ছিলোনা। হয়নি। তবু ভাবি, যদি দেখা হতো, তবে বলতুম, বাবিদা, একবার রিস্টার্ট করে দেখবেন নাকি? জীবনটা? অনেক ভাইরাস নিজে থেকে মুছে গেলেও যেতে পারে। গুরু বলেছেন, আমারে তুমি অশেষ করেছো। তাঁকে আর একটা চান্স দিয়ে দেখুন না। নাহ, জীবন তাঁকে আর চান্স দিলোনা।

200

7

মনোজ ভট্টাচার্য

প্লট চুরির মুখবন্ধ !

প্লট চুরির মুখবন্ধ ! একটা দুর্দান্ত সাস্পেন্সিভ ও মজাদার উপন্যাসের প্লট চুরি করাতে পারি । ‘চুরি’ কথাটা খুব রুঢ় হয়ে গেল বোধয় ! আমি তো সেটা নিয়ে কোন উপন্যাস লিখছি না প্রকাশের জন্যে ! অবশ্য সে ক্ষমতা আমার কখনই ছিল না ও এখনও নেই । তবে কিনা একটা লেখা লিখে বাংলা আড্ডায় দেওয়া যেতেই পারে । অন্তত চারজন পাঠক/পাঠিকা তো পড়তেও পারে ! এক্ষেত্রে সেই চুরিকে অনুপ্রেরণা বলা যেতে পারে ! – তবু আগে ভাগে একটা মুখবন্ধ দিয়ে রাখলাম । যারা বা ধরে ফেলতে পারেন - তাদের যেন না মনে হয় – মনোজদা এটা অমুক শো থেকে ঝেড়েছে ! প্রায় দুঘণ্টা ধরে – বেশ কয়েকটা এপিসোড দেখে – কতবার একই বিজ্ঞাপন সহ্য করে দেখাটাও তো আমার অসীম ধৈর্য ও কৃতিত্ব ! – কিন্তু স্বীকার করতেই হবে এত সুন্দর গুছিয়ে রহস্যময় কাহিনী তৈরি করা খুবই কঠিন ! ইংরিজিতে অবশ্য এরকম কাহিনী দেখেছি ! মনে করা যাক – গুগুলধাম আবাসনের এক বাসিন্দা একটা তত নাম না করা পত্রিকার সাংবাদিক ফোকটলাল – কোন একজন দুখীরাম নামে দুঃস্থ লোককে তাঁর হাসপাতালে ভর্তি স্ত্রীর চিকিতসার জন্যে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল । যদিও সেই দুঃস্থ লোকটি ধার শোধ দেবার অঙ্গীকার করেছিল – তবুও ফোকটলাল সেটা সাহায্য হিসেবেই দিয়েছিল । - কিন্তু সেই লোকটি কৃতজ্ঞতাবশত তাঁর পকেটে থাকা কোন এক লটারির টিকিট ফোকটলালকে দিয়ে দিল ! – লটারির টিকিটের নম্বর – যেভাবে হোক আবাসনের সম্পাদক ভিদের মনে রইল – কারন নম্বরটা ওর মোবাইল নম্বরের সঙ্গে মেলে । পরদিন সকালে ভিদে পড়ার জন্যে কাগজ খুঁজতে – ওর স্ত্রী মাধবী সেটা এনে দিল । তিনি পাঁপড় তৈরি করেন – সাইড বিজনেস হিসেবে । তাই কাগজটা সেই কাজে লেগেছিল । কাগজটা পেয়েই ভিদের মনে পড়লো ফোকটলালের লটারির কথা । - লটারির পাতায় নম্বরে দেখতেই – দেখল সেই নম্বরটা হুবহু এক ! দুজনেই তো খুব উত্তেজিত ! ওদের আবাসনের একজন লটারি পেয়েছে – এক কোটি টাকা ! যেন ওরাই লটারি পেয়েছে ! ফোন করলো ফোকটলালকে । ফোকটলাল অনেক রাত পর্যন্ত খবরের কাগজের অফিশে কাজ করে । ফলে বাড়ি ফিরতে রাত হয় ! ফোন বন্ধ ! অথচ টিকিট তো তাঁর কাছে ! নম্বর মেলানো দরকার । দুজনে ঠিক করলো – ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে এই সুখবরটা জানানো – ও লটারি পেয়েছে ! ভিদে সস্ত্রীক ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েই দেখা হোল আরেক প্রতিবেশী বাল্লে বাল্লে সিং এর সাথে । প্রাতর্ভ্রমণে যাচ্ছে ! ওরা জানালো ফোকটলালের একটা সুখবর আছে । ওরাও সঙ্গী হোল । ক্রমে ক্রমে আবাসনের সব প্রতিবেশীরাই জানতে পারল ফোকটলালের একটা সুখবর আছে । সবাই ধরে নিল – ফোকটলালের পাত্রীর ব্যাপার । ভালো খবর । পরে যখন শুনল – ফোকটলাল এক কোটি টাকার লটারি পেয়েছে – সবাই নাচতে লাগলো । অনেকে অতি উৎসাহে একটা ছোট ব্যান্ড পার্টি নিয়ে এলো । সে এক তুমুল কান্ড ! নিচ থেকে সবাই ফোকটলালকে ডাকাডাকি করছে – একই সঙ্গে ড্রাম এবং বিউগলের আওয়াজ ! ফোকটলাল ঘুমোয় কি করে ! বারান্দায় এসে খুব বিরক্ত হয়ে বাজনা থামাতে বলল । নিচে এসে সবার কাছে জানতে পারল – ও এক কোটি টাকা লটারি জিতেছে ! – সেই আনন্দে সেও নাচতে লাগলো । খানিক নাচ হবার পর কেউ মনে করিয়ে দিল – টিকিটের কথা । - তাই তো লটারির টিকিটটা তো আনা দরকার, দেখা দরকার । সত্যি টিকিটের নম্বর মিলেছে কিনা ! তাই ফোকটলাল ওপরে গেল টিকিটটা আনতে । নিচে ব্যান্ড পার্টি চলতেই লাগলো । সেই হট্টগোলে সামিল – আবাসনের বাসিন্দারা – সস্ত্রীক ! এদিকে ফোকটলাল গেছে তো গেছেই । - একজন গেল ওপরে তাঁর খোঁজে । ওপরে এসে দেখে ফোকটলাল সমস্ত জামাকাপড় ওলট পালট করে ফেলেছে । সমস্ত কাগজপত্র ছত্রাকার করেছে । ঘরের মধ্যে প্রায় দৌড়োদৌড়ি করছে । কিছুতেই মনে করতে পারছে না – কোথায় সেই লটারির টিকিটটা রেখেছে ! ইতিমধ্যে নিচ থেকে অনেকেই ওপরে এসে গেছে – ও জানতে পেরেছে – টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না । একজন বলল – গতকালের সেই লোকটিকে টাকা দেবার ও লটারির টিকিট পাবার পর থেকে – মনে করতে – ফোকটলাল কি কি করেছিল বা কোথায় কোথায় গেছিলো । এইভাবে আচমকা মনে পরে গেল – কাল সন্ধ্যাবেলায় চা খাবার সময়ে – চা ছলকে পড়েছিল জামার ওপর । সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলল – কাল তুমি হলদে শার্ট পরেছিলে না ? – ব্যস – মনে পরে গেল – কাল রাত্তিরেই হলদে শার্টটা চায়ের দাগ তোলার জন্যে ধোপাকে দিয়েছে । এই যাহ ! সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসল । আর কি হবে ! এতক্ষণে তো ধোপার কাচা হয়ে গেছে নিশ্চয় ! – কেউ একজন বলে উঠল – আরে এত সকালে কি কাচা হয় ? ধোপার কাছে খোঁজ নেওয়া যায় না ? – ঠিক কথা ! সবাই চলল ধোপার লন্ড্রিতে । দোকান তো বন্ধ ! – কেন ? আজ তো বেস্পতিবার নয় ! – এদিক-ওদিক জিজ্ঞাসাবাদ করতে জানা গেল – ধোপা কাপড়-চোপড় দিতে গেছে ধোবীঘাটে । একটা হুডখোলা ট্রেকার গাড়িতে ছ-জন উঠে খুঁজতে বেরুল – কোথায় ধোবীঘাট –কোথায় কাপড় কাচা হচ্ছে – কোথায় তাদের ধোবীলাল কাপড় কাচাচ্ছে ! একজনের ঘরের সামনে গিয়ে পাওয়া গেল – ধোবীলালের ঘর । সেখানে তাঁর দুই ছেলে ধোবীলালের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে এলো । তিনি স্বীকার করলেন – ধোবীলাল কাচার কাপড় খুঁজে যা পায় –সব একটা ছোট মিট-সেফের ওপর রেখে দেয় । কিন্তু টাকা-পয়সা ছাড়া সব কাগজই তিনি বিক্রি করে দেন – কাগজওলাকে । কোথায় সেই কাগজওলা ? – ঐ তো সামনেই ! - কাগজওলা বলল – সে এইধরনের ছোট ছোট কাগজ – চানা-ওলাদের বিক্রি করে দেয় ! – সে কি একজন নাকি ! এই ছ-জন লোক কাছাকাছি পার্কের সব কজন চানাওলার কাছে গিয়ে দেখতে লাগলো – সেই হলুদ রঙের লটারির টিকিটখানি কারুর কাছে পাওয়া যায় কিনা ! চানা খেয়ে তো সবাই কাগজের টুকরোটা ফেলেই দেয় – জঞ্জাল ফেলার ঝুড়িতে । - সবাই খুঁজতে লাগলো – সব ঝুড়িগুলো । যদি পাওয়া যায় সেই টুকরো কাগজ ! ইউরেকা ! জেঠালাল ময়লা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেল – সেই লটারির টিকিটটা ! – বাবুসাব ! আপনারা এখানে কি খুঁজছেন ? আমার ঘরে গেছিলেন – খুঁজতে ? একী ! দুখীরাম – তুমি এখানে ? – তোমার বিবি কেমন আছে ? ভালো না সাব ! কাল ওকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে ! – তা আপনারা নাকি লটারির টিকিট খুঁজতে গেছিলেন ! আমার ছেলেকে জিগ্যেস করছিলেন ! - পেয়েছেন ? এইত পেলাম ! তোমার ছেলে কে ? ঐ তো চানা বিক্রি করছে ! যে ছেলেটির কাছে ওরা ছোট কাগজের টুকরোর খোঁজ করছিলো – সে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে । তাঁর কাছ থেকে পুরো ডালা ভর্তি চানা কিনে ওরা খেল – ভিড়ের সবাইকে দিল। সবাইর শুভেচ্ছা নিয়ে ওরা গাড়িতে উঠে বসল । কিন্তু ফোকটলাল কোথায় ? সবাই দেখল – ফোকটলাল দুখীরামকে কাছে ডেকে সেই লটারির টিকিটটা দিয়ে দিচ্ছে ! – দুখীরামও কিছুতেই নেবে না । সে তো টিকিটটা দিয়েই দিয়েছে ! ওটা তো আর তাঁর নয় ! কিন্তু ফোকটলাল ওকে বোঝালো – দুখীরামের দেওয়া টিকিট আবার ওর কাছেই ফিরে এসেছে । তাঁর মানে – সেটা ওরই ! সবাই বুঝতে পারল – ফোকটলাল কিপটে হতে পারে কিন্তু কতটা হৃদয়বান ! দুখীরামের স্ত্রীর অসুখ ও ওদের দুরবস্থা দেখে – ওকেই দিতে চাইছে । এর মধ্যেই সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো । ভিড়ের সবাই ফোকটলালকে বাহবা দিতে লাগলো ! দুখীরাম দীর্ঘদিন ধরে লটারির টিকিট কিনছে – কিন্তু এ পর্যন্ত কোন লটারি ওঠেনি ওর ! টিকিটটা দেখতে দেখতে ফোকটলালকে জড়িয়ে ধরে - হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল । এতদিনে ওর কি ভাগ্য ফিরল ! মনোজ

167

2

মুনিয়া

Tell me something good

তালা‚ সকাল থেকে কি যে বোর লাগছে! শোনো একটা ছোট্ট মিত্তি গল্প বলি| …………… সন ১৯৪৫| তেরো বছরের মাধবীলতার বাড়িতে সাজ সাজ রব| তাকে দেখতে ২৭ বছরের শিবশঙ্কর আসবে পরিজন পরিবার সমেত| মাধবীর ঠাকুমা নাতনিকে রূপসী প্রতিপন্ন করতে সকাল থেকে উঠে পড়ে লেগেছেন| কাঁচা হলুদ- দুধের সরবাটা অঙ্গে ডলে ডলে চিকন ত্বক উজ্জ্বল-মসৃণ হয়েছে| বেলেমাটি দিয়ে মাথা ঘষে ধূপের ধোঁয়ায় চুল শুকানো হয়েছে| তারপর ঠাকুমা এক বাটি চন্দন বেটে রেখেছেন| তাই দিয়ে পরতের পর পরত বসিয়ে মাধবীর বোঁচা নাক চোখা করা হবে| মেয়ের এই একটিই খুঁত| নাকটি বড়ই চাপা| দু দুটি সম্বন্ধ ভেঙে গেছে এই কারণে| ঠাকুমায়ের হাতের চাপে‚ চন্দনের প্রলেপে মাধবীর দমবন্ধ হয়ে যাবার জোগার| ঠাকুমায়ের কড়া হুকুম| সাজিয়ে গুছিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হবে| তারপর একদম যেন নড়াচড়া নয়| পাত্রপক্ষকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করারও কোনো দরকার নেই| বসে হাত জড় করলেই চলবে| যথাসময়ে পাত্রপক্ষের সামনে মাধবীকে সাবধানে ধরে এনে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন পিতামহ| তখন থেকে একটানা কাঠ হয়ে বসে আছে সে| খোঁপার ভারে মাথা টনটন করছে| জরির শাড়ি অঙ্গে জ্বালা ধরাচ্ছে| গা কুটকুট করছে তবুও ঠাকুমায়ের আদেশে পুতুলের মত বসে আছে| পর্দার ওপার থেকে ঠাকুমা কড়া চোখে চেয়ে আছেন‚ সে জানে| একটু এদিক ওদিক হলে পিঠে কিল পড়বে গোনাগুন্তি| ভয়ের চোটে এবার সে চোখও তুলছেনা| আগের সম্বন্ধের লোকজন যেদিন দেখতে এসেছিল সেদিন হবু শ্বশুরের মাথার পাশ থেকে ঘুরিয়ে আনা টাক ঢাকা চুল হাতপাখার হাওয়াতে কেমন ফাঁকা তেল চকচকে মাথার ওপর লুটোপুটি খাচ্ছিল সেই দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল সে! হিং এর কচুরি‚ আলুরদম ঠেলে ফেলে রেখে পাত্রপক্ষ নির্লজ্জ মেয়ের ব্যবহারে অতি রূষ্ট হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন সেদিন| তারপর মাধবীর যা দৈন্যদশা হয়েছিল ঠাকুমায়ের হাতে! সে কথা স্মরণ করে সে আর কোনো দিকেই চাইছেনা আজ| পাত্রপক্ষ বেশি সন্তুষ্ট নয়| পাত্রের পিসিমায়ের মতে গায়ের রঙ মনমত হলেও কন্যা বড়ই খাটো| ছেলের বুকের কাছাকাছি হবে| জিলিপিতে কামড় দিয়ে তিনি অপছন্দ জাহির করেন| মাধবীর মনটা ভারী হয়ে যায়| এবারেও বিয়ে স্থির হলনা বোধহয়! চোখে জল আসা রোধ করতে ভুল করে নাক মুছতে যায় সে| আর সেই মুহূর্তে তার হাতে চন্দনের চোখা নাক উঠে আসে| ভয়ে শিহরিত তার দুই চোখ এসে মেলে ঘরের অপরপ্রান্তে বসে থাকা এক যুবকের হাস্যজ্জল দুই চোখে! কৌতুকে সেই দুটি চোখ তার নকল নাকের দিকে চেয়ে চেয়ে হাসি বিচ্ছুরণ করে চলেছে| ঠাকুমায়ের আদেশ বিস্মৃত হয়ে শাড়ি লুটিয়ে‚ খোঁপা খসিয়ে এক দৌড়ে অন্দরমহলে পালায় সে| এরপরেও বিয়েটা কিন্তু হয়েই গেল| একমাত্রই পাত্রের জেদে| ব্রিটিশ সরকারকে লুকিয়ে চুপিচুপি চন্দননগরের এক বাগানবাড়িতে| আজকের মত স্বাধীনতা পূর্বের সেই সময়েও শাসক দলের নিষেধাজ্ঞা ছিল যে কোনো উপলক্ষ্যে যে কোনো জমায়েতের| বিয়ের পরেও অনেক বছর ধরে সে শাশুড়ির গঞ্জনা শুনেছে‚ বুঝলে বৌমা‚ তোমাকে একটা কথা বলি| কিছু মনে কোরোনা বাছা| আমরা গ্রামের মানুষ| আমাদের মুখে যা‚ মনে তাইই| তুমি বাপু‚ ভয়ঙ্কর রকমের খাটো| আমার ছেলের নখের যুগ্যি নও| ততোদিনে আত্মবিশ্বাসী চোদ্দ বছরের পাকা গিন্নি‚ বোঁচা নাকে নথ ঝিকমিকিয়ে কটকট করে তার শাশুড়িকে বলে উঠত‚ তবে আমায় নিয়ে এলে কেন‚ মা? আমার বাবাতো তোমাদের পায়ে ধরেনি! এই বলে তার শাশুড়ির বুক চাপড়ানো হাহুতাশ অগ্রাহ্য করে দুমদুম করে পা ফেলে অন্যত্র গিয়ে সে তার পুতুলদের সাজাতে বসত!

1506

101

Joy

অন্ধকার সরিয়ে আবার এক নতুন দিন আসবেই...

করোনা নামক ভয়াল মারণ ভাইরাসের কল্যানে আমরা কয়েকদিন গৃহবন্দী| লক-ডাউন রাজ্য তথা সারা দেশ জুড়ে| যদি ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে তাহলে হয়ত আরও কিছুদিন লক-ডাউনের সীমা বাড়তে পারে| এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভাইরাস সমগ্র পৃথিবীর কাছে ভয়ানক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে| এর করাল থাবায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে| আরও না জানি কত মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে| দু দুটো বিশ্ব যুদ্ধ‚ আরও অনেক ভয়ানক যুদ্ধকেও হার মানিয়েছে এই মাইক্রোস্কোপিক ভাইরাস| সমস্ত পৃথিবী এখন এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টায় নিমগ্ন| ডাক্তার‚ নার্স‚ স্বাস্থ্য কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন এই রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টায়| প্রচুর মানুষ আজ কর্মহীন‚ ঘরবন্দী| প্রচুর শ্রমিক‚ দিন মজুর যারা কাজের জন্যে‚ দুবেলা দুমুঠো খাবারের জন্যে‚ একটু ভালো ভাবে বাঁচার জন্যে দূর দেশে বা অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন| তাদের অনেকের কাজ নেই এখন| কারখানা বন্ধ| দোকান বন্ধ| হোটেল বন্ধ| গ্যারেজে কাজ করা শ্রমিকরা আজ বেকার| কেউ বা ভয়ে চলে আসতে চাইছেন তাদের নিজের বাড়ি| নিজের পরিবার‚ আত্মীয় স্বজনদের কাছে| লক ডাউনের ফলে গাড়ি‚ বাস‚ ট্রেন সব বন্ধ| সেই সব শ্রমিকরা অন্য রাজ্য থেকে খালি পায়েই হাঁটা শুরু করেছেন মাইল এর পর মাইল রাস্তা| শুনশান রাস্তায় শুধু শোনা যায় এই সব দরিদ্র মানুষের পায়ের শব্দ| শোনা যায় মায়ের কোলের শিশুর কান্না| ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে গড়িয়ে পরে ঘাম| পা কেটে রক্ত পরে| জিভ শুকিয়ে আসে জল তেষ্টায়| কিন্তু যেতে তাদের হবেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে| সেখানেও নেই কোন কাজের হদিশ| তবু বিদেশে না খেয়ে মরার থেকে দেশে নিজের মানুষের কাছে মরা ভালো| এই হাইওয়েতে মাঝে মাঝে আসে অত্যাবশ্যকীয় পন্যের বড় গাড়ি| গাড়ির ধাক্কায় পিষ্ট হন কিছু শ্রমিক| এরা জানে না একসাথে গা ঘেঁষে থাকলে করোনা ছড়িয়ে পড়ে| দিল্লির বাস স্ট্যান্ডে হাজার হাজার শ্রমিক ভিড় জমায়| যদি কিছু বাস বা গাড়ি পাওয়া যায় বাড়ি পর্যন্ত| কেউ বা হেঁটেই যেতে চেয়েছিল তার প্রিয়জনের কাছে| কিন্তু পারেনি রাস্তাতেই মারা গেছে| হয়ত এদের লক ডাউনের আগেই রাজ্যে ফেরার ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হত| যেমন বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ প্লেনে ফিরেছিলেন এদেশে| তবুও দিল্লিতে সরকার ও অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এইসব শ্রমিকদের খাবার ব্যবস্থা করেছেন বাড়ি ফেরার ব্যব্স্থা করেছেন| তাদের অনেক ধন্যবাদ| শুধু দিল্লি নয় সারা ভারতবর্ষেই অনেক শিল্পপতি‚ অভিনেতা‚ খেলোয়াড়‚ ক্লাব‚ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন| তাদের কুর্নিশ জানাই| এই সব ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরাই নয় আরও অনেক অসংগঠিত কর্মচারী‚ ছোট ব্যবসায়ী‚ বেসরকারী কর্মক্ষেত্রের কর্মচারীরাও সমস্যায় পরবেন লক ডাউনের ফলে| টাকা পয়সার সমস্যা যেমন হবে তেমন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনারও অনেক ক্ষতি হবে| কিন্তু কিছু উপায় নেই অপেক্ষা করা ছাড়া| কুর্নিশ জানাই সেই সব ডাক্তার‚ নার্স‚ সাফাই কর্মী‚ পুলিশদের যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের ভালো রাখার জন্যে| সেই সব ডাক্তার‚ নার্সরাও কখনো কখনো বাড়িওয়ালা‚ প্রতিবেশী দ্বারা অপমানিত বা বিতারিত হচ্ছেন| সেটা কখনই কাম্য নয়| শুধু ভারতবর্ষই নয় সমস্ত পৃথিবীই এই সমস্যায় আক্রান্ত| এর ভয়াবয়তা অনেক সুদূর প্রসারী হবে| অর্থনৈতিক মন্দা হওয়ার আশঙ্খা আছে| অনেকে মানুষ মারা যাবেন রোগে তার থেকেও বেশি মানুষ মারা যাবেন অনাহারে| এর প্রতিরোধের জন্যে আমাদের লড়াই করতেই হবে| আমাদের এক জোট থাকতেই হবে| যদি চেইন সিস্টেমকে ভেঙ্গে দিতে পারলেই করোনাকে আটকানো যায় তবে আমাদের একটু ধৈর্য ধরে তাই করতে হবে| যা ক্ষতি হবে আমরা সবাই মিলেমিশে ভাগ করে নেব| তবুও কাউকে যেন অনাহারে মরতে না হয় সে মানুষ হোক বা অবলা পশু| আমাদের যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন ভাবে মানুষ‚ সমাজ পরস্পরকে সাহায্য করতে পারি| এখানে কোন ধর্ম নেই‚ জাত নেই| গরীব নেই বড়লোক নেই| এখন আর দোষারোপের পালা নয়| রাজনীতির খেলা নয়| আমাদের সবাইকে এখন এক হয়ে লড়তে হবে করোনা ও করোনার পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্যে| জিততে আমাদের হবেই| যেমন এর আগে অনেক মারণ রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করে বৈজ্ঞানিকরা আমাদের সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়েছেন| আর দেরী নেই অন্ধকার পেরিয়ে আলো আসবেই| কিন্তু আমরা ছোট হলেও কিছু ভালো কাজ সমাজের জন্য করতে পারি| কিছু অসহায় মানুষের মুখের হাসির কারন হতে পারি| অন্ধকার বার বার আসবেই আবার নতুন সূর্যোদয় হবে| কিন্তু অন্ধকার কেটে যায় যদি আকাশে অনেক অনেক ছোট ছোট নক্ষত্র থাকে| এই অসংখ্য ছোট ছোট নক্ষত্ররা অন্ধকারে এগিয়ে যাবার সাহস যোগায়| দিব্যেন্দু মজুমদার

234

3

শিবাংশু

মেঘগিরির মায়াকানন

একটা ঝিল। ছায়াঘেরা, শালুকপাতা আর ফুলে ছেয়ে আছে সারাটা। পাশে দাঁড়ালেই একটা শান্তিকল্যাণের স্পর্শ লাগে প্রাণে। নাম তিস্স বেওয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজাধিরাজ তিস্সের নাম বহন করে এই সরোবর। বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। সেখান থেকে উত্তর দিকে তাকালেই রুয়ান ওয়েলিয়া স্তূপের চূড়া চোখে পড়বে। পৃথিবীর একটি আদিতম এবং বৃহত্তম বৌদ্ধ তীর্থ সেখানে। ঠিক তার সামনেই দৃশ্যের জন্ম হয়ে আসছে প্রায় ইতিহাসপূর্ব কাল থেকেই। ইসুরুমুনিয়া। পৃথিবীতে একেকটা জায়গা আছে, যেখানে ইতিহাস, পুরাণ, উপকথা সব জড়াজড়ি করে রয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে। এরকমই একটা নাম, ইসুরুমুনিয়া । সিংহলদ্বীপের আদি রাজধানী অনুরাধাপুরা মহাবিহারের কাছেই। উপকথা বলে, এই সেই জায়গা, যেখানে পুরাণের পুলস্ত্য ঋষি বসবাস করতেন। প্রবাদের স্বর্ণলংকার রাজা রাবণের জন্মস্থান ছিলো এই মাটিতে। ইতিহাস বলছে, সিংহলের আদিযুগের রাজা তিস্স দেবানামপ্রিয়, রাজধানী অনুরাধাপুরার পাশে নির্মাণ করেছিলেন বেশগিরি বিহার। কালক্রমে যেটি স্থানান্তরিত হয়ে যায় ইসুরুমুনিয়ার মন্দিরে। রাজা তিস্স ছিলেন মগধের রাজা পিয়দস্সি অশোকের সমসাময়িক (৩০৭-২৬৭ খ্রিস্টপূর্ব)। তাঁর সময়েই সম্রাট অশোক তাঁর সন্তান ভিক্ষু মহিন্দ এবং ভিক্ষুণী সংঘমিত্তাকে সিংহলে বুদ্ধের ধর্ম প্রচার করতে পাঠিয়েছিলেন। পঞ্চম শতকে সিংহলে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার জোয়ার আসে। উচ্চবর্ণের পাঁচশোজন সন্তান একসঙ্গে সদ্ধর্মের শরণ নিয়েছিলেন। তখন রাজা কস্যপ-১ (৪৭৩-৪৯১ খ্রিস্টাব্দ) নিজের ও দুই কন্যার নামে এখানে একটি বিহার তৈরি করে দেন। একটি গ্র্যানাইট টিলার ভিতরের গুহার সঙ্গে এই বিহারটি যুক্ত ছিলো। পাহাড়ে টিলাটির পাশে একটি ছোটো স্তূপও রয়েছে। স্তূপটি অবশ্য আধুনিক কালের। পাহাড়টির গোড়ায় রয়েছে একটি অদ্ভুত সুন্দর ছোট্টো সরোবর। সরোবরের জল যেখানে পাহাড়টিকে স্পর্শ করছে সেখানে পাথরে খোদাই করা এক ঝাঁক হাতির যূথ বাস রিলিফে। রানমাসু উয়ান (উদ্যান) ঘিরে আছে গোটা বিহার ও মন্দিরটিকে। প্রাচীন মন্দিরটি রয়েছে একটি গিরিগুহার মধ্যে। পাথরের স্তম্ভ গুলি কারুখোদিত। ভিতরে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি। এই মন্দিরে বুদ্ধের পূত দেহাবশেষ রাখা ছিলো একসময়। মন্দিরে উঠে যাবার সিঁড়ির দুপাশে সুচারু দুই মুরুগল। তাঁদের হাতে 'পুনকল' বা পূর্ণ কলস। পবিত্র প্রতীক। সামনে কারুকার্যময় 'সন্দকদ পাহান' (চন্দ্রপাষাণ) বা মুনস্টোনের পাদপীঠ। পাহাড়টির বৃহৎ শিলাগুলি মন্দিরের পাশের দেওয়ালের কাজ করছে। তার শীর্ষে বিখ্যাত 'মানব ও অশ্ব' নামক 'অর্ধ-উন্নত ভাস্কর্য ' বা বাস রিলিফটি দেখা যাবে। নবনির্মিত মন্দিরটি একটি উজ্জ্বল, রঙিন মূর্তিময় বৌদ্ধ গুহ উপাসনাগৃহ। সেখানে একটি বিশাল বুদ্ধের অনুপম মহাপরিনির্বাণ ভঙ্গির মূর্তি রয়েছে। রয়েছে গুহাকন্দরে ভিক্ষু মহিন্দের শিষ্যদের উপদেশরত একটি রচনা। তা ছাড়াও বুদ্ধ ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা মূর্তি দেখা যায়। মন্দিরের শেষপ্রান্তে একটি বোধিবৃক্ষ শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে ব্যপ্ত হয়ে আছে । এই বৃক্ষটি অনুরাধাপুরা বিহারের মূল বোধিবৃক্ষের অঙ্কুর জাত। 'ইসুরুমুনিয়া' নামটি এসেছে ঈশ্বরমুনি থেকে। বৌদ্ধমতে তথাগতই সেই ঈশ্বরমুনি। হিন্দুরা কেউ কেউ দাবি করেন এটি শিবের বিশেষণ। আবার অনেক পণ্ডিতের মতে শিলাভাস্কর্য অনুযায়ী এই মন্দিরটি সূর্য ও পর্জন্য (মেঘ) দেবতার মন্দির ছিলো। সরোবরটির জলে ক্রীড়ারত হাতিদের মূর্তিগুলি আসলে মেঘের প্রতীক। সেই জন্য এই ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের আদি নাম ছিলো মেঘগিরি মহাবিহার। তবে ধারাবাহিকভাবে এই দেবালয়টি বৌদ্ধ উপাসনার স্থান হিসেবেই গণ্য হয়েছে। শ্রীলংকার বৌদ্ধ ঐতিহ্যে এই মন্দিরটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। একটি অন্য কারণেও এই মন্দিরের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সিংহলি শিল্প-ইতিহাসে অতিখ্যাত 'ইসুরুমুনিয়া-যুগল' নামের একটি বাসরিলিফ মূর্তি একটু দূরের মূল বেশগিরি মহাবিহার থেকে এনে এই মন্দিরে রাখা হয়েছে। এই সৃষ্টির পটভূমি নানারকম কিংবদন্তি আশ্রিত। ভাস্কর্যটির সিংহলি নাম 'পেম-যুবল' বা প্রেমিকযুগল। একটা গল্প অনুযায়ী সিংহলের বিখ্যাত রাজা দুতুগেমুনুর (দূতগমন) পুত্র সালিয় (শল্য) প্রণয়াসক্ত ছিলেন অশোকমালা নামে এক শূদ্রদুহিতার। প্রেমের মর্যাদা দিতে গিয়ে তিনি সিংহাসনের অধিকার হারিয়েছিলেন। এই মূর্তিটি নাকি তাঁদের স্মরণ করেই তৈরি হয়েছিলো। আবার একটি ব্রাহ্মীলিপিতে উৎকীর্ণ শিলালিপি বলছে এই মূর্তি রাজা কুবের বৈশ্বরণ এবং তাঁর রানি কুনিদেবীর। রামায়ণের উল্লেখ মানলে এই রাজা, রাবণেরও আগে বেশগিরিতে অধিষ্ঠান করে লঙ্কাদ্বীপে রাজত্ব করতেন। ষষ্ঠ শতকের গুপ্তশৈলীতে নির্মিত এই মূর্তিটির সঙ্গে তামিল পল্লব ভাস্কর্যের মিল পাওয়া যায়। শ্রীলংকায় যে শৈলীর ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এর তফাত আছে। দেশে বিদেশে মাপে হয়তো বিশাল নয়, কিন্তু সৌন্দর্যে অনুপম,, অনেক শিল্পস্থাপত্যের নমুনা দেখেছি। কিন্তু মেঘগিরি বিহার বা বেশগিরি বিহার বা ইসুরুমুনিয়া মহাবিহারের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সবার মধ্যে মনে থেকে যায়। 'বিন্দুতে সিন্ধু' (সারদা বাঁচিয়ে) জাতীয় একটা অনুভূতি হতে পারে। ঘালিবের ভাষায় বলতে গেলে, অবশ্যই এর 'অন্দাজে বয়াঁ অওর' ...

183

4

শিবাংশু

শ্যামলছায়া, নাই বা গেলে ...

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আজকের তারিখে জন্মেছিলেন। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো সাতাশি। চলে গেছেন উনিশ বছর আগে। কোনও মানে হয়না। এই লেখাটির সঙ্গে অবশ্য তার কোনও যোগাযোগ নেই। আবার আছেও। কয়েকদিন ধরে তাঁর গল্পসংগ্রহটি ছাড়া ছাড়া ভাবে পড়ছি। তাঁকে নিয়ে একটা কিছু লিখবো সেই জন্য। একটু কম চার দশক আগে তাঁর সঙ্গে একটা মুঠভেড় হয়েছিলো এই অধমের। বাংলা গদ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলো না তা। যাকগে, সে রামও নেই, সে সুগ্রীবও নেই। আরও একটু সময় লাগবে হয়তো, ইচ্ছে হয়ে থাকা লেখাটি নামাতে । মনে থাকে, সাহিত্যের ন্যারেটিভকে বাঙালি একসময় সিনেমায় দেখে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতো। শ্যামল সেটা করতেন না। বলা ভালো পারতেন না। শব্দের আকুল ফ্রেমে বেঁধে নিজেকে উদ্ধার করে আনা ছাড়া আর কোনও চতুরতা স্পর্শ করতো না তাঁকে। গুপ্তধনের মতো। তার সিনেমা হয়না। আঁধার রাতে ক্যানিং লাইনের শেষ ট্রেন ধরে যখন চম্পাহাটিতে টুক করে নেমে গেলেন, তখন মনে হলো এইতো যাওয়া। আসলে তিনি তো 'কথক' ছিলেন না। কিন্তু তাঁর 'সময়'টা ছিলো কথকদের। বাঙালির সাইকিটি কথকতার। বাংলায় সফল লিখিয়েরা সবাই কথকঠাকুর। যেমন ধরা যাক, বিমল মিত্র। ভাষার উপর দারুণ দখল। প্লটের পর প্লট নিপুণভাবে গেঁথে যান। চরিত্রদের খেলাতে পারেন। অতো অতো লিখতে পারেন। আর রয়েছে সহজাত গল্প বাঁধার কৌশল। কিন্তু বাংলায় 'উপন্যাস' নামক নির্মাণটি, যেটা সম্ভবত বিলিতি নভেল থেকে ধার করা, চারিত্র্যে একেবারেই আলাদা। সেটা ওঁর আসেনা। তা বলে কি তিনি 'লেখক' ন'ন? তিনি একজন 'ট্রেন্ডসেটার',অবশ্যই। তাঁর লোকপ্রিয়তা অসাধারণ। কারণ, বাঙালির একটাই চাহিদা, 'গল্প ভালো, আবার বলো'। বড়ো সাহিত্যিকরা তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে এমনভাবে তৈরি করেন, অন্য কোনও শিল্পী তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কেউ কখনও 'ঢোঁড়াই'য়ের সিনেমা বানাতে পারবেন কি? চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোনও বড়ো ছবিকর হলে সতীনাথ নয়, তাঁর নিজের 'ঢোঁড়াই'কে তৈরি করবেন। সেটা কোনও অবস্থাতেই 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' হবেনা। হবে না 'কুবেরের বিষয়আশয়' বা 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'. বাঙালি লেখকরা গত একশো বছরের অধিককাল ধরে অপার-অনন্ত 'উপন্যাস' রচনা করে আসছেন। তার মধ্যে শারদীয়া প্রসাদ টাইপ বারোটি 'উপন্যাস' অথবা চোদ্দোটি 'উপন্যাসোপম' বড়ো গল্প ইত্যাদি লেখালেখি পঁচানব্বই ভাগ। আট-দশফর্মা এলোমেলো 'মশলাদার' 'উপন্যাস' প্রকাশকরা নিয়মিত ছেপে যেতেন। একটা লেখা, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'। লেখাটার 'জঁর'টা যে কী, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। কিন্তু মানিকবাবুর হাতে পড়ে তার ভোল পাল্টে গেলো। ঐ ছবিটাকে কি 'সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ' বলা যাবে? জানিনা। 'সাহিত্যমূল্যে' লেখাটি ঠিক কোথায় থাকবে, এতোদিন পরেও তা স্পষ্ট নয়। সুনীলবাবু পছন্দ করেননি মানিকবাবুর কাজটি। শ্যামলের লেখা ‘সিনেমা’ করা নিয়ে তো কেউ ভাবেইনি। আমাদের কালে সেই একজন ছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। পাড়ার লাইব্রেরিতে বসতুম। তাঁর বইয়ের হাই ডিমান্ড। যেমনভাবে আমরা ছ-সাত ক্লাসে 'কঠোরভাবে কলেজ স্টুডেন্ট দের জন্য' স্বপনকুমারের 'বিশ্বচক্র সিরিজ' গুনে গুনে পড়তুম। তেমনই লোকে নিমাই ভট্টাচার্য পড়তেন বই গুনে গুনে। তাঁর ম্যাগনাম ওপাস 'মেমসাহেব'। 'মেমসাহেব'কে 'সাহিত্য' বলতে বাঙালিই পারে। এককথায় একটা তৃতীয় শ্রেণীর টলি-চিত্রনাট্য। আমাদের সময়েই সাত কেলাস পেরোবার পর ওসব পড়া চাপ ছিলো। আমাদের গ্রামে দেখেছি 'মেমসাহেব' ও 'মুকদ্দর কা সিকন্দর' দেখে বিপুল সংখ্যায় বাষ্পাকুল মহিলারা দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নটরাজ ও করিম টকিজ থেকে বেরিয়ে আসছেন। আমরা অভিভূত হয়ে পড়তুম। এখন কী হয়, জানিনা। এমন নয় যে লোকের মোটা মোটা বইয়ের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ছিলো। যেমন ছিলেন 'বনফুল'। বিখ্যাত লিখিয়ে। অনেক লিখেছেন। ওঁর বিশেষত্ব বিচিত্ররস। ঘষাদুনিয়ার বাইরের ঘটনা, ভূগোল, লোকজনকে নিয়ে কারবার। একসময় জনপ্রিয়ও ছিলেন। 'অধৈর্য' পাঠকদের রাজা। তাঁর লেখা সবসময় মাপে হ্রস্ব। এখনকার পার্ল্যান্সে 'ফেবু' লেখক। 'স্থাবর' বা 'জঙ্গম' ব্যতিক্রম। ঐ লেখাগুলি এখন কেউ পড়েন কি না, জানিনা। তাঁর বেশ কিছু লেখা ছবি হয়েছে। হাটেবাজারে, অগ্নীশ্বর, অর্জুন পণ্ডিত, ভুবন সোম। 'অগ্নীশ্বর' একজন সত্যিকারের ডাক্তারের জীবন নিয়ে লেখা। যদ্দূর মনে পড়ছে তিনি শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের বড়দা ছিলেন। ভুল হতে পারে। মানুষটি ও উপন্যাসের চরিত্রটি একরকমই ছিলেন বলে শুনেছি। বাকি ছবির চরিত্রগুলিও বাস্তব মানুষদের আদলে লেখা। এঁরা ছিলেন আদর্শবাদী, স্বদেশসচেতন, আত্মসম্মানী, নির্লোভ, অনেক গুণ সম্পন্ন । সাধারণ বাঙালি দর্শক এমন মানুষদের ভালোবাসেন । কিন্তু নিজেরা হয়ে উঠতে পারেননা। হিরো ওয়রশিপে বাঙালি বঙ্গবিভীষণ পাবার যোগ্য। অগ্নীশ্বর, অধিকলাল বা অর্জুন মণ্ডল বনফুলকে জনপ্রিয় করতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের বিচারে কালজয়ী করতে পারেনা। তাঁদের নিয়ে 'বই' তৈরি হতে থাকে। কিন্তু 'সিনেমা'র ভিতর দিয়ে তাঁকে চেনা যায় না। বনফুলের স্বভাবসিদ্ধ ভাষা আর ট্রিটমেন্ট ছবির ভাষায় আনা যায়না। বড়ো ছবিকর হলে সম্পূর্ণ অন্য একটি সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে 'সাহিত্যে'র কোনও সম্পর্ক থাকবে না। কোনও লেখা থেকে ছবি তৈরি হওয়ার খবর থাকলে সেই সব বই খুব বিক্রি হতো একসময়। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন দিতেন, ছবি দেখার আগে বইটি পড়ে যান। এই সব ছেলেমানুষি এখনও হয় কি না জানিনা। বছর পঁচিশ হলো নতুন বাংলা ফিকশন পড়ার প্রয়াস নিইনি। 'বাংলাসাহিত্য' থেকে 'বই' কি এখন তৈরি হয়? ঠিক জানিনা। সিনেমার ভিতর দিয়ে ভারি ভারি কথা বলার ধরনটি এখন আর দেখা যায়না। যাপনের গরমিল থেকে উঠে আসা দুঃখযন্ত্রণার রূপকথা এখন ক্যানভাস পাল্টেছে। সময়ের প্রাসঙ্গিক মাত্রাগুলি বড্ডো পাল্টে গেছে গত দু দশকে। 'বই' থেকে আর 'বই' তৈরি হয়না। সেই সব রীতি ধরে নতুন ছবি করা যায়না। গল্পের টানে ছবির গুন আর টানা যায়না। সিনেমা সাবালক হয়েছে। তার ভাষা আর বইয়ের ধার ধারেনা। ম্যাটিনি শো'তে 'বই' দেখতে যাওয়া লোকজনও তো এখন সানসেট ব্যুলেভার্ডের পথিক। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়দের এখন জেগে ওঠার সময় হয়েছে।

194

2

Stuti Biswas

শ্যামলী নদীর খোঁজে পাঁচমারীতে...

পর্ব- ৩ বেড়ানো কারও শখ , কারো নেশা কারও কাছে জীবন । আমার কাছে বেড়নো মানে শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখা বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া নয় । রোজকার একঘেয়ে জীবন থেকে বেড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে আয়েস করে কয়েকটা দিন কাটানো । কয়েকদিন একটু অন্য ভাবে যাপন করলে মন হালকা হয় । জীবনের গাড়ী চালানোর জন্য তাজা হাওয়া ভরে নেওয়া যায়। সকালে ঘুম ভাঙ্গল টিয়াপাখির কলরবে । বেরিয়ে দেখি ঝলমলে রোদ । আজ উঠতে একটু দেরী হয়ে গেছে । বারান্দার পাসের ঝাঁপাল গাছের সারিতে পক্ষীকুল সমাগত প্রাতরাশের জন্য । কাছেই চার্চ । প্রাতভ্রমনে বেড়িয়ে ওদিকেই গেলাম । রাজভবনের সামনে দিয়ে রাস্তা । গভর্নরের গ্রীষ্মকালীন বাসভবন ।পাশেই সরকারি আমলার বাংলো । সুন্দর বাগান দিয়ে সাজানো বাংলোগুলি  । পাহাড়ের কোলে শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে ছোট্ট ছিমছাম চার্চ । হোটেলে ফিরে স্নান সেরে ডাইনিং রুমে যাবার পথে ম্যানেজারকে বললাম জীপ ঠিক করে দিতে । বুফে ব্রেকফাস্ট , একটা করে ঢাকনা খুলছি আর পিছিয়ে যাচ্ছি । সেই ঘিসাপিটা ব্রেড ,ডিম , ইডলি, ধোসা । লাস্টের ঢাকনা খুলতেই মন আনন্দে ডগমগ করে উঠল । ফুলকো লুচি পাশেই আলুর দম । আহা আর কি চাই । ম্যানেজার ফিসফিস করে বলে গেল ওগুলো নেবেন না গরম গরম আসছে । সকালে ঠিক করেছিলাম হালকা ব্রেকফাস্ট করব কারন তারপরই বেড়ব ফলস দেখতে । চড়াই উতরাই পথে ওঠা নামা করতে হবে । সব প্ল্যান মাথায় উঠল বেশ কখানা লুচি খেয়ে ফেললাম । তৈরি হয়ে বেড়িয়ে দেখি বিশাল ভুড়িওলা ড্রাইভার হুডখোলা জীপ নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।আমাদের দেখেই বিরাট নমস্তে করল । মন যতই নাচানাচি করুক শরীর মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় অত তরবর করো না  । জীপে চড়তে একটু বেগ পেতে হল । চাকার ওপর পা দিয়ে তড়াং করে লাফিয়ে জীপে উঠতে গিয়ে পপাতধরনীতলে  । তবে আসপাসের লোকজন বেশ ভদ্র আমায় দেখে হো হো করে কেউ হাসেনি । অবশেষে সিঁড়ী বেয়ে হাঁকুপাঁকু করে চড়লাম । যাত্রা সুরু। ছোটবেলায় পড়াশুনা না করার জন্য বকুনি খেলেই , মাঝে মাঝে প্রবল ইচ্ছা জাগত বনে গিয়ে কুঁড়ে বানিয়ে থাকব ।গাছে উঠে ফল পারব। ছিপ দিয়ে মাছ ধরব । কি মজা হবে । কেউ পড়তে বলবে না । তখন তো জানতাম না জঙ্গলে যাবার অনেক হ্যাপা  । পারমিশন নিতে হয় , টিকিট কাটতে হয় । অনিচ্ছাস্বত্বেও গাইডকে বগলদাবা করতে হয় । সংসারে বিরক্ত হয়ে যারা ভাবে বনে গিয়ে স্বাধীন জীবন কাটাবে তারাও বোধহয় বনে যাবার হ্যাপা সম্বন্ধে অবগত নয় । ইতিহাসের পাতা উল্টে নিই । ১৮৫৭ সাল , সিপাহী বিদ্রোহের দামাম বেজে উঠেছে । বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশরা হিমশিম খাচ্ছে । হঠাত খবর এল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা তাঁতিয়ে তোপী সাতপুরা পর্বতে লুকিয়ে আছে । ক্যাপ্টেন জে ফোরসিথ তাঁতিয়ে তোপীকে ধাওয়া করতে করতে আকস্মিক ভাবে পৌঁছে যান ঢেউ খেলানো মালভূমিতে  । একদল বাইসন সাহেবের পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় ।মিশন অসফল হওয়ায় সাহেব বিমর্ষ  । কিন্তু মালভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ সাহেবের মন কেড়ে নেয়  । অভিভূত ক্যাপ্টেন জায়গাটিকে বসবাস যোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা করেন । ফোরসিথ ১৮৬২ সালে সর্বপ্রথম এখানে বাড়ী বানান  । বাড়ীটির নাম দেন বাইসন লজ । পরবর্তীতে পাঁচমারীতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান মিলিটারী বেস গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাইসন লজে সরকারি টিকিট কাউন্টার । জঙ্গলে ঘুরতে হলে ওখান থেকেই টিকিট কাটতে হয়  ।নিজের গাড়ীতে ঘুরলে ৬০০টাকা টিকিট । লোকাল জিপসী ভাড়া করলে ৩০০টাকা । জঙ্গলে একা ঘুরতে দেবে না গাইড গুজে দেবেই । সব মিলিয়ে হাজার টাকা , গাড়ীভাড়া আলাদা ( ড্রাইভারের ইচ্ছা অনুযায়ী ) । নিজ গাড়ী নিয়ে গেলে জংগলের গেটের থেকে ২কিমি দূরে পারকিং , গাড়ী দাঁড় করিয়ে দেবে । তারপর হন্টন । জীপসি হলে ভেতরে বেশ কিছুটা যাবে । মানে হরেদরে জিপসী ভাড়া করতেই হবে । ড্রাইভার গেল টিকিট কাটতে আমরা মিউজিয়ামে  । মিউজিয়ামে পাঁচমারীর ম্যাপ , জঙ্গল , প্রানী ও উদ্ভিজ জগত সম্পর্কে কিছুটা ধারনা হল । বেড়িয়ে দেখি ড্রাইভার একটি লোকের সাথে খোস গল্পে মেতেছে । আমাদের দেখে লোকটি এগিয়ে এসে বলল সে আমাদের জংগলে পথ দেখাবে । গাইড  । গাড়ীর হ্যাণ্ডেল শক্ত করে ধরে বসে আছি । উতরাই রাস্তা । গাড়ী হু হু করে নামছে জঙ্গলের পথে  । শহরের যেটুকু চিহ্ন ছিল , অল্প চলার পরই তা পিছনে পরে রইল । ইষ্ট নাম জপতে জপতে ভাবছি যদি একবার হাত ছেড়ে যায় , জীবনের ঘূর্ণিপাক থেকে ছিটকে কোথায় গিয়ে পরব কে জানে । তবে বাঘের লাঞ্চ/ ডিনার টেবিলে শোভা পাব না এটা নিশ্চিত । গাইডকে যাতে বাঘ দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি না করি তাই সে প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছে সাতপুরা ন্যাশনাল পার্ক খোলার পর মাস দুয়েক বাঘ দেখা গেছিল । পরে( বোধহয় সেরকম দর্শক না পাওয়ায় )বাঘেরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেছে । মাঝে মধ্যে চিতা , লেপার্ড রাজত্ব ঠিক আছে কিনা এসে দেখে যায় । তবে বন আমাদের হতাশ করেনি । সোনালি লেজওলা একদল বাঁদর গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে অভিনন্দন জানাল । গলা ছেড়ে গান ধরল রংবেরঙের পাখিরা  । অজানা ঠিকানা থেকে উড়ে এসে নাচতে শুরু করল রঙিন প্রজাপতির দল । জঙ্গল বাড়তে লাগল । পাতাঝরা বন । মাঝে মাঝে বাঁশের ঝাড় ,শালের জঙ্গল তলায় পাতার স্তুপ । হাওয়া দিলেই হুড়হুড়ি পরে যাচ্ছে বনে। বড় বড় বহেড়া , কুহমি গাছ নীরব প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে । সারি সারি । ,চিরহীদানা (চিরঞ্জী ) গাছে ফুল এসেছে  । অরন্যের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে গম্ভীর স্বরে কুবো পাখি ডেকে উঠছে কুব কুব............ । কানে আসছে অস্পষ্ট জলের শব্দ । বি-ফলসের কাছাকাছি এসে গেছি । জিপসিতে আমাদের সহযাত্রী পরিবারটি তে দুটী বাচ্চা  । তারা আগেই জানিয়ে দিল ঝরনার নীচে যাবে না  ।গাড়ী থেকে নামার সময়ই গাইড জানতে চাইল আমরা ঝরনার নিচে যেতে ইচ্ছুক কিনা । হ্যা বলাতে গাইডের মুখখানা কেলো হাঁড়ির মত হয়ে গেল । পাথরের ফাঁক দিয়ে শান্ত জল্ধারা বয়ে চলেছে খানিকটা । তারপরই খাড়া পাহাড়  । কয়েকশ ফুট নীচে ঝাঁপিয়ে পরছে পাহাড়ী ঝোঁড়া  । ভিঊ পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে গাইড নানা টালবাহানা কথা বলে নীচে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের নিরস্ত করতে লাগল । কিন্তু আমরা বদ্ধপরিকর । ও বোধহয় এমন নাছোড়বান্দা বুড়োবুড়ী আগে দেখেনি । নীচে নামার সিঁড়ি দেখিয়ে ব্যাজার মুখে পাথরের ওপর বসে রইল । একপাশে খাঁড়া পাহাড় অন্য দিকে ঝরনা । মাঝখান দিয়ে পাথরের সিঁড়ী । পাথরের ফাঁকে ফাঁকে কত গাছ , রঙিন বুনো ফুলের ঝাঁরে অচেনা পাখির কিচিরমিচির । পাথরের ফাঁক দিয়ে চেনা আকাশটা আশ্চর্য সুন্দর দেখাল । নিচে নেমে দেখি প্রবল জলরাশি ঝাঁপিয়ে পরছে স্ফটিকের মত ছোট্ট জলাশয়ে। তারপর পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ছুটে চলছে । জলে পা ডুবিয়ে বসে মৌমাছির গুনগুনানির মত জলোচ্ছ্বাসের শব্দ শুনলাম  । সাহেবরা ঝরনার নাম দিয়েছে বি-ফলস । স্থানীয় লোকেরা বলে যমুনা প্রপাত । একসময় এই প্রপাত ছিল শহরের পানীয় জলের উতস। অনেকেই দেখলাম স্নান করছে । পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আমরাও কিছু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করলাম । ফেরার সময় সিঁড়ী দিয়ে উঠতে প্রান বেড়িয়ে যাবার উপক্রম । মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর উঠলাম। ওপরে উঠে এসে দেখি গাইড হন্তদত্ন হয়ে পায়চারী করছে । ভাবছে বোধহয় আমরা নিচেই সংসার পেতে ফেলেছি । আমাদের দেখে আশ্বস্ত হয়ে গাড়ীতে গিয়ে বসল । ড্রাইভার ঝিমাচ্ছে । হঠাত ঝিমুনি ভেঙে আমাদের দেখে কি করবে বুঝে না পেয়ে এমন সাবাসি দিতে লাগল , মনে হল এই বয়সে আমরা যেন এভারেষ্ট জয় করে এসেছি । গাড়ী স্ট্রাট করল । গাড়ী সেকেন্ড গীয়ারে চলছে । রাস্তা বলতে কিছু নেই বনের পথ । প্রচুড় ঝাঁকুনি । নির্জন পাহাড়ী চড়াই ভেঙে দুই পাহাড়ের মাঝে বিরাট খাঁজে এসে দাঁড়ালাম । প্রকৃতি নিপুন হাতে বানিয়েছে এম্পিথিয়েটের  । চারিদিকে পাথরের দেওয়াল ওপরে নীল আকাশ । মুখে হাত দিয়ে ইকো করতেই সবুজ মেঘের মত এক ঝাঁক টিয়া তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে ডাকতে উধাও হয়ে গেল । বাইরে সূয্যিমামা বেশ জ্বলিয়ে পুড়িয়ে দিলেও ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে ঠাণ্ডা ।জায়গাটির নাম রিচগড় । রিচগড় একসময় ভালুকের আস্তানা হলেও বর্তমানে পর্যটকদের দখলে । বনের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী সুন্দর এক গাছের সাথে পরিচয় হল । কুসুম গাছ । পাতলা গোলাকার পাতা । পাতাতে সবে লাল রঙ ধরেছে। বসন্তশেষের বনে হোলিখেলার আমন্ত্রন জানাচ্ছে । হাওয়ার ঢেউয়ে কম্পমান পাতা , জলের শব্দ, পাখির ডাক কেমন যেন আনমনা করে দেয় । বিকালের কাঁচপোকা রোদে সঙ্কীর্ণ উতরাই পথে নিচে নামতা থাকি । গাছের ফাঁক দিয়ে রজত প্রপাতের সফিন জলরাশি চোখে পড়ছে । ভিউ পয়েন্টে এসে দাঁড়াই । কয়েকশ ফুট উঁচু থেকে সগর্জনে আছড়ে পরছে গভীর খাদে । অপূর্ব দৃশ্য । নিস্তব্দতারও ভাষা আছে ।সে ভাষা গুঞ্জরিত হয় পাচমারীর বনে পাহাড়ে আকাশে বাতাশে । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা পাহাড়ের সাথে , প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা পাগলা ঝোড়া , রহস্যময় গুহা , গভীর খাদের সাথে । বাতাসে ভেসে বেড়ায় পুটুস ঝোপের কটু গন্ধ । গায়ে লুটিয়ে পরে সোণালী ধূ ধূ ঘাসের বন  । গাছের পাতায় সওয়ার হাওয়া ইলিবিলি কাটে দিনরাত । নির্জন বনে হাঁটাতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় গোন্দ আদিবাসীদের সাথে । নির্জনতা আর এডভেঞ্চারের অদ্ভুত মিলন বাধাঁ পরেছে সাতপুরার রানীর আঁচলে । শেষ বিকালের গন্ধ মেখে ফিরে এলাম হোটেলে । রাতে খাওয়ার পর চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসলাম । লনে আগুন জালানো হয়েছে । তাকে ঘিরে অল্প বয়সী কয়েকটি ছেলে গীটার বাজিয়ে গান গাইছে। হাওয়ায় পিঠে চড়ে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পরছে পাহাড়ে জঙ্গলে । রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী চলে গেল  । টেল লাইটের আলোটা মিলিয়ে গেল জঙ্গলের পথে । একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাক , বনের শিশির , কুয়াশা চাঁদের আলোর সাথে মিলেমিশে এক স্বপ্নরাজ্য তৈরি করেছে । জংগলে যতবারই আসি কি যে ভাল লাগে । কত গন্ধ , শব্দ , দৃশ্য । জীবনের টানাপোড়েন ভুলে মেতে উঠি এক অদ্ভুত আনন্দে ।

290

10

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

তুমি কী মরীচিকা না ধ্রুবতারা? "কী নিবিড় কী নিবিড় সমুদ্রসবুজ আমার অপেক্ষার রঙ। ডুবে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে নিজের দু'হাতে বেড় দিয়ে থাকি। পায়ের তলা থেকে সাঁতার সরে সরে যায়। ওই রঙ আমার জন্মাবধি প্যানিকের দিন আনি দিন খাই সংসার। মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে তোমার সঙ্গে ইমাজিনারি প্রেম অবধি পুরোটাই ক্রমশ খুব চাপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে গো।আমাকে ওষুধ বলে দাও। শুশ্রূষা দাও। একবার তাকাও। কী নিস্তব্ধ কী নিস্তব্ধ তোমার চাহনি। অথচ গড়নটা বাঙ্ময়। কার সঙ্গে কথা বলো কার সঙ্গে হেসে ওঠো মেঘ মেঘ দুপুরের মতো। পপলারে বসন্ত লাগার মতো। আমি তো সারাজীবন বসন্তের অপেক্ষা করে করে উবু হয়ে বসে আছি সমুদ্রসবুজ ম্যানিক ডিপ্রেসিভ সাইকোসিসের ধারে। সঙ্গে ধর্মতলার সভ্যতা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া একটা রোদ চশমা। কাজেই বুঝতেই পারবে না আমার চোখে ঢুলে আসা স্বপ্নের ফিউনারেল। তা সে না বুঝতেই পারো। তোমার জন্যে, শুধু তোমার জন্যেই আমার মরণোত্তর দেহদান। এরপর যা যা হবে তা খুবই নিয়মমাফিক, আর সমুদ্রসবুজ রঙটা ক্রমশ একটা বিস্তীর্ণ কালশিটে হয়ে যাবে। যেন একটা ফুটে উঠতে থাকা ক্যাকটাসের ফুল। এত কিছু, এত কিছুর পর বসন্ত আর ভাল্লাগে না সত্যি । একা একা পরিত্যক্ত বাসস্টপে সিগারেট ধরাই। কী অসম্ভব ছড়িয়ে পড়ে তার সমুদ্রসবুজ ধোঁয়া। যেন তার মধ্যে দিয়ে তোমার ধারালো একা থাকা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে তিনটের রাত্তিরে। নির্বাক ইমাজিনারি বসন্তে, অন্ধকার শিমুলে পলাশে।"....মন্দাক্রান্তা সেন তোমায় দিলাম| কি ভীষণ বরফ যে পড়ছে‚ ভাবতে পারবে না| তেমনি ঝোড়ো বাতাস সাথে| আর আমার সময়ের ঘরে তো সর্বদাই মা ভবানী| তবু আজ সব ঝড়‚ সব দুর্যোগ‚ সব ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও চুয়াচন্দনে লাজাতে বসলাম তোমার বরণের এই মালা| সারাদিন উন্মনা আজ তোমায় ভেবে| তোমার পলাশ‚ তোমার কোকিল‚ তোমার রোদ্দুর‚ তোমার উষ্ণ শ্বাস‚ তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা স্মরণের বাতায়ন খুলে জড়িয়ে নিচ্ছে সকলের অলক্ষ্যে| আনমনে গুনগুন করেই যাচ্ছি "গন্ধে উদাস হাওয়ার মতো উড়ে তোমার উত্তরী, কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী, তরুণ হাসির আড়ালে কোন্‌ আগুন ঢাকা রয়- এ কি গো বিস্ময়..." ভালো থেকো গো আমার ফাগুন সংক্রান্তি| আবার কথা হবে আগামী ১৪-ই মার্চে| ভালোবাসা‚ পাগলি-

1936

108

শিবাংশু

চড়ুই পাখি ও ভোরের রোদ্দুর

মেয়েরা বড়ো হলে মায়ের বন্ধু হয়ে ওঠে । একটু বড়ো হলেই তাদের পরস্পর কলকাকলির মধ্যে বাবা যেন বেশ বেমানান । বাবা কি মেয়েদের 'বন্ধু' হয়ে উঠতে পারে । বোধ হয় না । বাবার সঙ্গে অনেক কথা বলা যায়, কিন্তু 'বন্ধুত্ব'..........? সেটার স্তর আলাদা । পাহাড়ের সঙ্গে কি বন্ধুত্ব হয় । পাহাড় মেঘ দেয়, ছায়া দেয়, সবুজের শান্তি এনে দিতে পারে । কিন্তু তার তো নদীর ভাষা জানা নেই । সে শুধু প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দিতে পারে । মা আর মেয়েরা সেই ভাষা জানে, নিজের মতো করে জেনে ফেলে । তারা সবাই তো পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতস্বিনী, পাহাড়ের ছায়ায় স্বচ্ছন্দ, সাবলীল, স্বতস্ফূর্ত । তাদের প্রেম, স্নেহ, কলহ, অভিমান যে মাত্রায় খেলা করে যায়, সেই চতুর্থ মাত্রাটির নাগাল পাওয়ার ক্ষমতা প্রকৃতি বাবা'দের দেয়নি । ------------------------------ আমার মেয়েরা যখন পড়াশোনার জন্য বা জীবিকার খোঁজে বাড়ির চেনা চৌহদ্দি থেকে দূরে চলে যায় তখন তাদের 'বাড়ি' বলতে দিনের শেষে মায়ের সঙ্গে ফোনে আড্ডা । সেটা কখন শুরু হয়, কখন শেষ হয় , কেউ জানেনা । আদৌ 'শেষ' হয়কি? জানিনা । শুধু আমি বাড়ি এলেই শুনতে পাই মায়ের সংলাপ, তোর বাবা এসেছে, এখন রাখছি । যখন একজন বাইরে ছিলো, তখন তার জন্য রাখা থাকতো নির্দিষ্ট সময়, ফোন করার অছিলায় । অপরজন ঈর্ষাতুর তাকিয়ে থাকতো, মা শুধু দিদির সঙ্গে গল্প করে । তার পর দু'জনেই যখন বাইরে গেলো, তখন সময় ভাগাভাগি নিয়ে তাদের কোন্দল । দু'জনে একবাড়িতে থাকে, বহুদূরে কোনও এক শহরে, কিন্তু মায়ের সঙ্গে কথা বলবে আলাদা করে, এক্স্ক্লুসিভ । মা'কে প্রায় স্টপওয়াচ নিয়ে কথা বলতে হবে । কারো সময় কমবেশি হওয়া চলবে না । যেদিন বাবা'র কানে যায় সেসব আলাপ প্রলাপ, বাবা বেশ বিস্মিত থাকে । নির্বিষয়, নির্গুণ, নির্নিমেষ কথা, শব্দবিনিময় । শব্দের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা সেই সব মেয়ের, শব্দই তাদের মায়ের আঁচল, গায়ের ঘ্রাণ । তার মধ্যে বাবা কোথায় ? একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে যায় । বাবা যেন একটা বিদ্যুত প্রকল্প, শহর থেকে সর্বদা একটু দূরে থাকে । কিন্তু শহরের সব বাতি ঝলমল জ্বালিয়ে রাখার জন্যই তার বেঁচে থাকা । --------------------------------------- মা'য়ের সঙ্গে আমার কথা, যার মধ্যে বিশ্বচরাচর ছেয়ে থাকে । সংসার, অসার, শুদ্ধসার, বিষয়ের কোনও অভাব নেই । কিন্তু মা আমার 'মা', বন্ধু নয় । বন্ধুর তো অভাব নেই কোনও। ভালোবাসতে জানলেই শত বন্ধু হাত বাড়িয়ে দেয় । কিন্তু বাবা-মা তো একটাই । তারা পায়ের তলার মাটি, মাথার উপর আকাশ । তারা নির্ভরতার শেষ দেবতা । অন্য কেউ কি সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারে ? না, পারেনা । তাই মায়ের কাছে বলে যাওয়া কথা, যেন নদীকে শুনিয়ে যাওয়া গান । বাবার কাছে দুদন্ড বসে থাকা, তপ্ত আগুনরোদের থেকে চুরি করে আনা একটুকরো ছায়ার বৃত্ত । -------------------------------- অনেক সময় দেখেছি, সন্তানের সঙ্গে অসম্ভব জড়িয়ে থাকা মায়েরা কেমন একা, অসহায় হয়ে যায় । পৃথিবীর কক্ষপথে সাবলীল নিজস্ব অবস্থান খুঁজে পাওয়া সন্তানেরা হয়তো জানতেই পারেনা তাদের মায়েদের নিতল নি:সঙ্গতা । পোস্ট পার্টাম সিনড্রোম ? একমাত্র সন্তান কন্যাটির বিয়ে হয়ে যাবার আমার এক আত্মীয়াকে বলতে শুনেছি, সব কাজ ফুরিয়ে গেলো । এবার গেলেই হয় । তখন তাঁর বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স । মানুষ কি একফলা গাছ । প্রসূত ফলটির নিজস্ব বীজবিস্তার করা হয়ে গেলেই কি গাছের শিকড় ঢিলে হয়ে যাবে ? একেবারে না । পৃথিবীর থেকে অনেক দেনাপাওনা তাঁর এখনও বাকি থেকে গেছে । এই নি:সীম আনন্দযজ্ঞে শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত অগ্নিহোত্রের কাজ করে যাওয়াই তো আমাদের ভবিতব্য । ------------------ ছেলেরা কি মা'কে কম চেনে ? মায়েদের সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্বটা কি ছেলেদের বেশি হয় ? মনে হয় , উত্তরটা নেতিবাচী । শারীরিক বৃত্তে হয়তো মেয়েরা মায়েদের বেশি কাছে থাকে, কিন্তু মানসিক বৃত্তে সেরকম কোনও বিচ্ছিন্নতা নেই । এই নৈকট্যের একমাত্র সূত্র বোধের সংবেদনশীলতা । দু'জন সংবেদনশীল মানুষ, মা ও তাঁর সন্তান, সহজ নিয়মেই পরস্পরকে স্পর্শ করে থাকতে পারে । শারীর দূরত্ব বা লিঙ্গভেদ তেমন কোনও তাৎপর্য রাখেনা । শুধু মানসিক দূরত্বই সম্পর্কের শেষ চন্দ্রবিন্দু । --------------------------- চড়ুই পাখিদের শুধু চাই অলিন্দের একটা কোণ । ঝড় থেকে, জল থেকে, বিপর্যয় থেকে আড়াল করে রাখবে যে । বাবার মতন । মা হলেন ভোরের প্রথম রোদ , যার ডাক পেয়ে তারা কথা বলতে শুরু করবে অনর্গল, অনিবার, অফুরন্ত ...... নির্জন প্রাণঝরণার অবিরাম ছাপিয়ে যাওয়া মাটির কলস আর তাদের নির্মল কলস্বর ... জিন্দগি ইসি কা নাম হ্যাঁয় ......

206

4

মনোজ ভট্টাচার্য

চলোনা দীঘার সৈকত - - !

চলোনা দীঘার সৈকত - - ! কী লিখি ! কিছু একটা লিখবো বলে চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু স্মৃতির অ্যালবাম খুলে দেখি – ছবিগুলো শুধু ধুসরই হয়নি – স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের মতো চুন-বালি খসে খসে পড়ছে ! দুরছাই বলে চলেও যেতে পারিনা – আবার দেখতে দেখতে চোখ জ্বালাও করে ! এ এক নৈর্ব্যক্তিক যন্ত্রণা ! সবার আগে একটা বাংলা বা হিন্দি ছবির ক্লিপিং দিই । - ট্রেনে আমাদের সামনের সীটে বসা কয়েকজন লোকের আলাপ হচ্ছিলো । সাধারনত এসব আলোচনা ট্রেনের গতির কাছে হেরেই যায় । কিন্তু কান সচকিত হয়ে গেল । ওরা কেবলই বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছে । - আরে এতদিন তো জানতাম - বাগবাজার কেবল আমাদেরই সম্পত্তি ছিল – তার মধ্যে অন্যেরা আসে কোত্থেকে ! সহ্য করি ধৈর্যের সঙ্গে । ট্রেনের শেষ স্টপ এসে গেল । - আমরা তো সবার শেষে নামবো – তাই নামার যাত্রীদের দেখি । আমাদের সামনের সীটের যাত্রীরা উঠে দাঁড়াতেই আমার স্ত্রীই জিগ্যেস করলো – আপনারা খুব বাগবাজার শ্যামবাজারের নাম করেই যাচ্ছেন ! আপনারা কি ওখানে থাকেন ? হ্যাঁ – আমরা তো বাগবাজারেরই বাসিন্দা । - সে কি বাগবাজারে কোথায় থাকেন ? তারপর যা বর্ণনা দিল – সেটা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের বাড়িটা – মিত্তিরদের বাড়ি ! – আর যার নাম বলল – সে আমার বন্ধু ভদ্রেশ্বর । অথচ আমাদের চেনে না ? যেন আমি ওখানে রোজই থাকি । তিরাশি সাল থেকে আমরা সেখানে থাকি না । আমরা উদ্বাস্তু হয়েছি আইনত ২০০০ সাল থেকে ! ঐ মিত্তিরবাড়িটা আমার ধারনা মতে আমার মাতামহের বাড়ি ছিল । কিন্তু আগেকার ব্যবসাদার মানুষ – বরং দেওঘর শিমুলতলায় বাড়ি কিনে রেখেছে – কিন্তু নিজেদের একটা বাড়ি করতে পারেনি -কলকাতায় । ঐ মিত্তিররা তাদের মামলায় হারিয়ে নিজের বাড়ি দখল করে নিয়েছে । আর দেওঘর শিমুলতলা – মালিদের গহ্বরে গেছে ! আর ঐ বাড়িতেই আমার জন্ম ! হ্যাঁ – ঐ বাড়িটাই আমার মামার বাড়ি ! তখন ঐ বাড়িটায় অনেক অনেক লোক থাকত । আত্মিয়-স্বজন – রঘুনাথ - কাঠের মিস্ত্রি – আনন্দ সিং - রান্নার ঠাকুর – ইত্যাদি ইত্যাদি ! তো এসব লিখতে গেলে আরেকটা সাহেব-বিবি-গোলাম হয়ে যাবে ! আপাতত থাক – পরের জন্মে চেষ্টা করা যাবেখন ! ক্ষিধে , হোটেলে ঢোকা, ইত্যাদি কারনে মিত্তিরদের সবাই এগিয়ে গেল । আমরা দুজন বের হলাম – দীঘার প্ল্যাটফর্ম যে অত বড় – কখনো খেয়াল করিনি – কিন্তু আমাদের জন্যে অন্তত একজন অটোওলা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল । সেই আমাদের যত্ন করে সৈকতাবাসে পৌঁছে দিল । আমাদের কোন অগ্রিম বুকিং নেই । জানি – দুজনের একটা ঘর হবেই । - না – সব ঘরই আগে থেকে বুক করা । তাবলে আমরা ছাড়বো কেন ? এখানেই তো বারবার উঠেছি – প্রচলন থেকেই তো অধিকার জন্মায় । একটু জানাশোনা তো হয়েছেই ! অগত্যা ম্যনেজার একটা ঘর দিতে বাধ্য হল । একটা তিন বেড ওলা ঘর দিল । আবার দোতলায় উঠতে কষ্ট হবে বলে একতলাতেই দিল । কে বলে ভদ্রতা সৌজন্য সব উঠে গেছে ! বাঙ্গালীদের তিনটে জায়গা - দীপুদা – দীঘা পুরী আর দার্জিলিং – বড্ড ক্লিশে হয়ে গিয়েছে । যতবার ভাবি এই জায়গা-গুলোতে আর আসবো না – ঠিক ঘুরে ফিরে এই তিনটে যায়গায়ই এসে পড়ি । আগে দীঘায় প্রায় মাসে দুমাসে আসতাম । তখন খড়গপুর থেকে বাসে করে আসতে হত । - এখন অবশ্য সরাসরি ট্রেনে আসা যায় ! – ট্রেনে রিজার্ভেশানও পাওয়া যায় । - এর আগে ছ-জন এসেছিলাম । আমরা দিন সাতেক ছিলাম । এবারই প্রথম আমরা দুজন এলাম । - কিন্তু দেখলাম আমরা একা নয় – প্রচুর লোকের সঙ্গে আলাপ হতে লাগলো । সবই অচেনা । প্রত্যেকেই জেচে পরে এসে আমাদের খোঁজ খবর করতে লাগলো । খুব সম্ভবত কলকাতায় খবর হয়ে গেছে – দুই বুড়ো-বুড়ি কলকাতা থেকে উধাও হয়ে গিয়ে দীঘাতে আশ্রয় নিয়েছে ! “চলনা দীঘার সৈকত ছেড়ে ঝাউবনের ছায়ায় ছায়ায়- - শুরু হোক পথ চলা- “ পিন্টু ভট্টাচার্যের এই গানটা এক সময়ে আমাদের প্রায় জাতীয় সঙ্গীত হয়ে গেছিলো । আর একটা গান “ - - ঐ ডাকছে - ঐ ডাকছে নীল সমুদ্র ডাকছে- চলো চলো চলো চলো - বেড়িয়ে পড়ি - “ বোধয় অমল মুখোপাধ্যায়ের । - ঝাউবনই বা কোথায় - কোথায়ই বা ঝাউবনের লুকোচুরি খেলা ! – যারা সম্প্রতি দীঘা যাননি – তাদের প্রতি সতর্কীকরণ – যাবেন না – নিজেদের ছেলেবেলার স্বপ্ন ভাঙ্গতে । - কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে – ! যতটা অঞ্চল ঝাউয়ের বন ছিল – সবটাই ভর্তি হয়েছে হোটেলে । এমন কি ‘ও-ওআই-ও’ মার্কা হোটেল ! - আর মল - ! সারা কলকাতায় যত দোকান আছে দীঘাতে বোধও তার চেয়ে বেশি স্টল - এমনকি অনেক অনেক স্টলে কোন বস্তু পর্যন্ত নেই – বন্ধ ! কিন্তু সব ছোট স্টলে ভরাট ! সেখানেও নানা দিদি-বৌদির রেস্টুরেন্ট । এখানেও এখন সেই ধর্ম সঙ্কট ! আগে তো এখানে কোথাও কোন বাবা-মা-বটঠাকুর ছোট-ঠাকুরের মন্দির দেখিনি ! এবার দেখলাম – কোন এক ভবা পাগলার মন্দির । আরও বেশ কতগুলো ছোটবড় মন্দির ব্যবসা ফেঁদে বসেছে । বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী ! কিন্তু লক্ষ্মীর বদলে – কালী ! – মানে বন্দুক অধিকারি ! একপক্ষে ভালোই হয়েছে – আমাদের যৌবনের দীঘা – আমাদের বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে প্রৌঢ় হয়ে যাচ্ছে । তবে আমরা যখন থাকবো না – দীঘা কিন্তু তখনো থাকবে ! দীঘার ওপর দিয়েও তো কম ঝড় ঝাপটা যায় নি ! সুনামি, আইলা – আরও কত কি ! শেষাশেষি যে আইলা দীঘাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল – তারপর তো দীঘা পুনর্গঠন করলো দীঘা উন্নয়ন বোর্ড – যার সর্বময় কর্তা হোল অধিকারীরা । প্রত্যেক স্টলের জন্য সর্বনিম্ন দুলাখ টাকা ধার্য হোল – এখনও অনেকেই সেই ইন্সটলমেন্ট দিয়ে যাচ্ছে । রাজ্য সরকারকে না – দীঘার সরকারকে । অনেকেই তাই দীঘা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র । ও, আমাদেরও অবশ্য জিজিয়া কর দিতে হচ্ছে – মাথা-প্রতি দশ টাকা । তার কোন রসিদ বা প্রমাণ নেই । কিন্তু প্রত্যেক হোটেল-ওলাই নিচ্ছে । নেহাত দশ টাকা – তাই এব্যাপারে কেউ উচ্চ-বাচ্চ্য করে না । আগে জানতাম – সৈকতাবাস সরকারী ভবন । গতবার দেখেছিলাম সৈকতাবাসের পুনর্গঠন হচ্ছে । এবারে সেকাজ প্রায় শেষ । কিন্তু এবার শুনলাম – এটা সরকারী নয় – তবে কার মালিকানা – কেউই বলল না । মুল সৈকতাবাস এখন পেছনে অনেকটা বেড়েছে – মুখ্যমন্ত্রীর জন্যে ‘দিঘী’ হয়েছে । আবার রেস্টুরেন্টের আগেই ছোট্ট একটা সুন্দর দেখতে বাড়ি – অন্য রঙের – কেউ বলল না সেটা কার ! তবু বলবো – দীঘার সবটাই অন্ধকার নয় । অন্তত এক মাইল মতো রঙিন আলো । খুব সুন্দর রাস্তা । সমুদ্রতটের বিরাট বিরাট পাথরের স্ল্যাব । বসার জন্যে – কিন্তু খুব বেশি লোকে সেখানে বসছে না । তট বরাবর সুন্দর পাঁচিল দিয়ে বাঁধানো । - আর আছে চা, ঝালমুড়ি, খেলনা ইত্যাদির ফিরিওলারা । আগে আগে ঘোড়ায় চড়ার বদলে – ব্যাটারির টয় বাইক ও গাড়ির চালানোর ভিড় । বাচ্ছা বাচ্ছা ছেলেরা ঐ গাড়ি নিয়ে পর্যটকদের ভাড়া খাটাচ্ছে । পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী । নগরের উন্নয়ন তার সঙ্গেই জড়িয়ে । আমরাও কয়লার ইঞ্জিন থেকে ডিজেল – ইলেকট্রিক হয়ে এখন ম্যাগনেটিক ট্রেনে চরছি । কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধেই হয় মেনে নিতে । তবু তো মেনে নিতেই হয় ! কারন উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি মাথা চারা দেয় বৈকি ! তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি ! কিছুদিন আগে ভার্জিনিয়া বীচে গেছিলাম । - দীঘা সে তুলনায় ছোট হলেও - খানিকটা তারই দেশী সংস্করণ ! মনোজ

289

4

Joy

ভালবাসার কোন দিন হয় না...

আজ কি শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার ভালোবাসার দিন| ভালোবাসার কি কোন নির্দিষ্ট দিন হয়| হয়ত হয়| কার্ড‚ চকোলেট‚ গিফ্ট‚ আর ভালোবাসার মানুষের মিঠি স্পর্শ| আর যারা ভালোবাসার মানুষ বা নারীকে কাছে পেল না| তাদের কাছেও থাকে ভালোলাগার ও ভালোবাসার অনুভূতি| সব ভালো কিছুই কি পেতেই হয়| দূরেই থাক না তার না জানা গরিমা নিয়ে| কিছু কলুষিত না হয়েও তো কাছে থাকা যায়| ভালোবাসা তো অমর| এর মৃত্যু নেই‚ শেষ নেই| হয়ত বা কোন এক নতুন বেশে আসবে অন্য নাম নিয়ে| ভালোবাসার জন্যে সব ত্যাগ করা যায়| আমরা যারা ৮০-৯০ দশকের জীবাশ্মরা যারা পুরোনো আর নতুন দুটোর মেলবন্ধন| আমাদের সময় এত জাকিয়ে ভ্যালেন্টাইন ডে পালন হত না| লুকিয়ে চিঠি দেওয়ার চল ছিল| রাস্তার পাশে‚ মেয়েদের স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলগোছে মেয়েটির দিকে তাকানো ছিল| অথবা কোন বিয়ে বাড়ি| বাসর জাগা‚ গানের লড়াই| আর ভালো লাগার জনকে কিছু না বলতে পারা| সে কি জানতে পারত আমাদের মনের কষ্ট| হয়ত পারত‚ কিন্তু বাড়ি‚ সমাজের ভয়ে আবার কোনো বিয়ে বাড়ির প্রতীক্ষা| দূর্গা পুজোর প্রতীক্ষা| প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে গিয়ে তাকে খোঁজার চেষ্টা| স্কুল‚ কলেজ যাবার সয়ম বাস স্টপে আলতো হাসি| বাস মিস| কিছু কথার বর্ণমালা| ছিল খোলা খামের মধ্যে সুন্দর গন্ধ মাখা একটা ছোট্ট চিঠি| অথবা অনেক গল্প| হয়ত তার বিয়ে ঠিক হওয়ার গল্প| অব্যক্ত কান্না| কিছু তো করার ছিল না কারন ছেলেটি তখনও চাকরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছে| কি ভাবে সে আসবে তার ভালালাগার নারীটির কাছে| তার বাড়িতে হাত ধরার অঙ্গীকার নিয়ে| সানাইএর সুর আর ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| না ভ্যালেন্টাইন ছিল না| আর যারা প্রেমের জন্যে‚ মনের কাছের মানুষটির জন্যে বাড়ির সঙ্গে‚ সমাজের সঙ্গে লড়াই করেছেন তাদের সময় তো ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| পরিবারে রক্ষনশীলতার বেড়া ভেঙ্গে যারা পাশে পেতে চেয়েছে তাদের পছন্দের নারী বা পুরুষটিকে| কেউ বা অনার কিলিং এ হারিয়ে গেছেন চিরতরে| না তখন ভ্যালেন্টাইন ডে ছিল না| প্রেমের কোন দিন হয় না| ভালোবাসার দিনটি কেন শুধু প্রেমিক‚ প্রেমিকার জন্যেই সংরক্ষিত থাকবে| বন্ধুত্বও তো এক অমলিন ভালবাসা| ভালোবাসা তো বন্ধুত্বের আর এক নাম| বিশ্বাসের নাম| এর কোন চাওয়া নেই‚ পাওয়ার চাহিদা নেই| আছে বিশ্বাস‚ পাশে থাকার অঙ্গীকার| মন খারাপ হলে বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে পারার মত বিশ্বস্ত জায়গা| যে পুরুষটি সারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তার স্ত্রী-সন্তানের জন্যে‚ তাদের খুশি করার জন্যে| বাড়ি‚ সন্তান‚ স্বামীর সেবায় মুখ বুঝে‚ সব সুখ ভুলে সংসারে হাসি ফুটিয়ে তোলা সেই নারীটি তারা ভ্যালেন্টাইন ডে জানে না| হয়ত জানবার দরকারও পরে না| পরস্পরের সঙ্গে‚ দু:খ‚ কষ্ট‚ সুখ‚ কর্তব্য ভাগাভাগি করেই জীবনের সব ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়| আজ একটু তাড়াতাড়ি এসো| কাজের ফাঁকে ফোনে করে খাওয়া হয়েছে তোমার? জমানো টাকায় কোথায় দু দিনের বেড়াতে যাওয়া| ক্লান্ত শরীরটা বাড়িতে বয়ে নিয়ে গিয়ে একটু মৃদু বকুনি সাথে গরম চা আর পকোড়া| কত না বলা ভালো বাসা| ভালবাসা বিশ্বাস‚ সম্মান‚ আত্মমর্যাদার এক নাম| এর কোন দিন হয় না| প্রতিটি দিন ই হোক ভ্যালেন্টাইন ডে| থাকুক ভালোবাসা‚ বিশ্বাস‚ মর্যাদা| যেখানে থাকবে না কোন ঘৃনা বা অভিমান| কাউকে যাদি ভালো বাসতে না পারেন তাকে তার যোগ্য সন্মান না দিতে পারেন তবে এই দিনগুলোর কোন মূল্য নেই| তার থেকে অনেক ভালো দূর থেকেই ভালবাসা| যে কোন দিন আপনার কাছে হয়ত আসবে না‚ কিন্তু তার চোখে আপনি সম্মানের সঙ্গেই বেঁচে থাকবেন| সেই খোলা খাম‚ নীল ইনল্যান্ডের চিঠি| না বলা কথা| সেই বুকে তোলপাড় করা অন্তাক্ষরীর সুর| বাস স্ট্যান্ডের বাস মিস করা মেয়েটিকে এক ঝলক দেখা| রাস্তায় পাশের জানালায় খোলা চুলে কমলা লেবুর কোয়ার মত ঠোঁট দুটিতে স্মিত হাসি| বেঁচে থাকুক সেই ভাললাগা| ভালোবাসার তো কোন দিন হয় না|

188

4

Aloka

যা দেখি যা শুনি

নতুন ট্রেণ্ড ??? অনেকদিন পর সেদিন বেরোলাম আমার আজ্ন্মকালের চেনা গণ্ডী ছাড়িয়ে চারপাশটা একটু দেখতে | হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা চলে এসেছি..|কিছ্ছু চিনতে পারছি না | আমাদের অঞ্চলের পূর্ব দিক দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি রয়েছে রাস্তা -----যশোর রোড| তারপরে আগে ছিল বেশ খানিকটা চওড়া আর গভীর একটা নালা | নালা বললাম বটে তবে তাতে কোন দিন জল দেখিনি| তার পরে ছিল বিশাল বিশাল সব বাগান বেশীর ভাগই আম গাছ | মোট কথা বেশী ঘরবাড়ী ছিল না |পাড়া থেকে যশোর রোডে সোজা ওঠার রাস্তা ছিল একটাই | এখন সেখানে ঘর বাড়ীতে ভর্তি.. নালা কবেই উধাও যশোর রোডে ওঠার জন্য ৩/৪টে রাস্তা তৈরী হয়েছে| স্বাভাবিক ভাবেই ঘরবাড়ী লোকজন বাড়ার ফলে তৈরী হয়েছে রাস্তা আর ড্রেন | একটা ড্রেন এর পাশেই দেখি একটা বোর্ড..|তাতে লেখা কাউন্সিলরের বহুদিনের উপেক্ষা সত্বেও নর্দমাটি তৈরী করে দেবার জন্য ---------মহাশয়কে ধন্যবাদ | উল্টোদিকে ঠিক তার মুখোমুখি আর একটা বোর্ড...তাতে লেখা মিথ্যা প্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না.....এই নর্দমাটি কাউন্সিলরের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় তৈরী হয়েছে| মজাটা হল যাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়েছে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান | পর পর দু বার| সন্দেহ নেই খুব ই কাজের লোক .|এলাকায় অনেক কাজ করেছেন এব্ং করছেন| তবে তিনি ঐ ওয়ার্ডের বাসিন্দা/ কাউন্সিলর নন| আর অন্যজন ঐ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর | মহিলা| ঐ ওয়ার্ডটি গত বার মহিলাদের জন্য স্ংরক্ষিত ছিল| | যে সামান্য ২/৩ জন বিরোধী ( সঠিক স্ংখ্যাটা জানি না) দলের কাউন্সিলর আছেন ইনি তাঁদের একজন |এখন আমার ধন্দ/আপত্তি/ প্রশ্ন যাই বলি না কেন তা হল ওয়ার্ডের দায় দায়িত্ব ত কাউন্সিলরেরই থাকার কথা একটা ওয়ার্ডের তুচ্ছ একটা নর্দমাও কি চেয়ারম্যান করে দেবে.নাকি এটা সেই রাজ্য কে এড়িয়ে কেন্দ্রের সরাসরি D.M এর সন্গে কথা বলার মত ব্যাপার..| তবে এই জিনিসটা বেশ কিছুদিন হল লক্ষ্য করছি....কোন ওয়ার্ডে হয়্ত কিছু একটা কাজ -----কোন রাস্তার অংশবিশেষ সারানো/ নর্দমা তৈরী করা বা যা কিছুই হোক সন্গে সন্গে স্ংশ্লিশ্ট কাউন্সিলরকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যানার টানানো হয়ে যাবে| মনেই থাকবে না তিনি কাজটি নিজের টাকায় করছেন না...করছেন ট্যাক্সের টাকায় ‚ যার মধ্যে আমারও দু পয়্সা অব্শ্যই আছে| শুধু তাই ই নয় এই সব কাজ করার জন্যই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন .. | আমাদের অঞ্চলে এই জিনিসটা আমার খুব চোখে পড়ে.. জানি না অন্য কোথাও এ রকম হয় কি না ..নাকি এটাই এখনকার ট্রেণ্ড

483

13