মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

দেশের ডায়েরি- ৩ এইবার সচেতনভাবে একটি জিনিস লক্ষ্য করলাম। আমার যাতায়াতের পরিসীমানায় ব্যাপ্ত মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে সকলের বাড়ি, দোকানে একটি দুটি হলেও গাছের বাহার। হয়ত দারুণ কুলিনজাতীয় গাছ কিছু নয়। ভাঙা মাটির টবে, তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের মগে, একটি দুটি নয়নতারা, শেফালি ফুলের চারা ‌‌অথবা ধূলিধূসরিত মলিন কারিপাতা! ব্যাপারটা রীতিমত চমৎকৃত করল। স্যালুট টু দেম, যাঁরা জীবনযাপনের ট্র্যাপিজের খেলায় সদাবিব্রত হওয়া সত্বেও মানসিক সৌকুমার্য ধরে রেখেছেন। সেই সব দেখে চাঙ্গা হয়ে গাছ লাগাবার সংকল্প করলাম। মায়ের শোবার ঘরের জানালার সামনে, বাগানে। মায়ের চোখের সামনে তারা দিনে দিনে বড় হবে, ফুল ফোটাবে, সেই আশায়। নার্সারিতে গিয়ে দিশা পাইনা। কি কি নেব! ‌অথবা বলা ভালো সবই কেন নেবনা! শেষে চিন্তা ভাবনা করে খানচারেক জবা, গোটা দুয়েক বোগেনভিলিয়া, ডবল পাপড়ির রজনীগন্ধা। যাদের থেকে আশা যে সবচেয়ে কম যত্ন পেয়েও যারা নিজেদের কর্মসমাধা করবে। শেষোক্তটি বাজারে মাটিতে চাদর পেতে বসে বিক্রি করছিলেন একজন। সাথে ছোট ছোট প্যাকেটে কিছু কিছু বীজ। একহাত জায়গায় দোকানের পরিধি। এইকটা জিনিস বিক্রি করে পেট চলে! তাঁর দোকানের সবকিছু কিনে নেওয়া যেত হয়ত এককৌটো স্বাস্থ্যকর পানীয় কেনার পয়সায়। তুমুল ইচ্ছে থাকলেও নিজেকে বিরত করলাম। একদিন স্বপ্ন দেখিয়ে লাভ কি মানুষটিকে? তেমনি যিনি আনারস নিয়ে বসেছেন অথবা আলু কিংবা কলা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ওই এক জিনিস নিয়ে দিন শুরু এবং সমাপ্ত করেন। দিনান্তে, বেচাকেনা সাঙ্গ করে চট গুটিয়ে, সেফটিপিন আটকানো চটি ফটফটিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেন; তাঁদের একদিন আচমকা খুশি করে দিলে বাকি দিনগুলি যদি বিবর্ণ হয়ে ওঠে! ফেরার পথে দেখলাম গরমে হাক্লান্ত আনারস বিক্রেতা, কলা-ওয়ালির লাল টুলে বসে গামছা নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে সুখ দু:খের গল্প জুড়েছেন। কানে এল, মেয়ের ঘরের নাতি সাইকেল চেয়েছে, কিন্তু কিনে দিলে হয়ত বউমা ভালো চোখে দেখবে না। বুঝলাম, মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্য নিশ্চিতরূপে থাকে কিন্তু তার বাইরে প্রিয়জনকে ঘিরে দিনযাপনের ছোট বড় সুখ দু:খগুলো সমাজের সকল স্তরের মানুষকেই প্রায় একই রকমভাবে ভাবায়, কাঁদায়, আনন্দ দেয়। কথা বলতে বলতে কলা ব্যবসায়ী, কাকা, খেয়ে নেন, বলে চট থেকে একটা কলা তুলে প্রতিবেশী বিক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিলেন। অপরপক্ষও কৃতজ্ঞতা বা ধন্যবাদ জানানোর তোয়াক্কা না করে, চিন্তাগ্রস্ত মুখেই তার খোসা ছাড়িয়ে তা গলাধ:করণে মনযোগ দিলেন। মনে এল- “Be a friend. You don’t need money: Just a disposition sunny; Just the wish to help another Get along some way or other; Just a kindly hand extended Out to one who’s un befriended; Just the will to give or lend, This will make you someone’s friend....”

1444

58

শিবাংশু

বাইশ বেলা

কোথা যে উধাও হলো পরস্বপর শ্রাবণ বায়োস্কোপ অপেক্ষায় আদুল গায় রাত কাটলো পথে সারা জনম বাইশ বেলা ও মোর দরদিয়া .... https://www.youtube.com/watch?v=2TfkSI2WAqs&fbclid=IwAR3Oyr_B-EweQJA7uD26bRNnkFv_-i4sNb4yyIBiK5jkAGS1T5EpBuWlqYc

58

3

Aloka

যা দেখি যা শুনি

দায়্টা কার ? অসময়ে বেল....এখন আবার কে এলো.....ভাবতে ভাবতে দরজা খুলি| "বাড়িতে সবাই সুস্থ..কারুর জ্বর হয় নি.....কোথাও জল জমে নেই"...| তারা জিজ্ঞাসা করার আগেই বলি | তারাও হাসে আমিও হাসি | এই তারা হল দুটি অল্প বয়সী মেয়ে ‚একজন বিবাহিত আর এক্জন অপেক্ষাকৃত কম বয়েস অবিবাহিত| মিউনিসিপালিটি থেকে এসেছে | মাসে একবার করে আসে বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার উপায় হিসেবে এই খোঁজ খবর নেওয়া মিউনিসিপালিটির উদ্যোগ| উদ্দেশ্য সাধু সন্দেহ নেই তবে কতটা ফলপ্রসূ সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে| ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় হিসেবে সরকারী প্রচারে অন্যান্য নানা করণীয় র মধ্যে বাড়ীতে জল জমতে না দেওয়া এমন কি ফুলদানীর জল রোজ পাল্টানো ‚ এমন বিধি ও আছে| এখানেই আসে সচেতনতার প্রশ্ন | এই কাজগুলো ত এমন কিছু কঠিন না ‚ সময় বা পরিশ্রমসাধ্যও নয় শুধু দরকার একটু সদিচ্ছা বা সচেতনতা | গভর্ণমেণ্ট এর পক্ষে একা এর মোকাবিলা করা কখনই সম্ভব নয় | এই যে মেয়েদুটি এসেছিল তাদের পক্ষে ত ঘরে ঘরে ঢুকে দেখা সম্ভব নয় | অথচ আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের মধ্যে এই সচেতনাতার খুব অভাব একমাত্র উপায়| খুব ছোট থেকে এই গুলো ই ছোটদের মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে দেওয়া | বিশেষ করে এখন পরিবেশ দূষণ রোধে ছোট ছোট কাজ অনেক কিছু করতে পারে | প্রশনটা হল তাদের শেখাবে টা কে ? সম্প্রতি দুটো ঘটনায় কথাটা আরও মনে হল ঘটনা ১ বাসে করে যাচ্ছিলাম |হঠাৎই কানে এল সামনের সিটে বসা একটি বাচ্চা ‚ কতই বা বয়্স হবে ৬/৭ বছর হয়্ত‚ হাতে একটা লজেন্স এর মোড়ক জাতীয় কিছু ধরা.পাশে বসা মহিলাকে বলছে মা এই কাগজ টা কোথায় ফেলব ? মোবাইলে মগ্ন মায়ের উত্তর...ফ্যাল না এখানেই ফ্যাল ঘটনা ২ একদিন সন্ধের মুখে পাড়াতেই বেরিয়েছিলাম |বৃষ্টি এল |সন্গে ছাতা ছিল না | দাঁড়ালাম বড় রাস্তার ওপরেই একটা দোকানের শেডের নীচে| দোকান তখনো খোলে নি |শেডের নীচেটা বেশ খানিকটা বাঁধানো পরিষ্কার পরিচ্ছ্ন্ন বেশ ছিমছাম| ফাঁকা| দুটি ছেলে এলো | কি আর করি গল্প জুড়লাম তাদের সাথে| জানলাম দুজনেই ক্লাস ইলেভেন এ পড়ে |টিউশন থেকে ফিরছে | এক্জন রোল জাতীয় কিছু খাচ্ছিল| খাওয়া শেষ হতেই কাগজ টা ছুঁড়ে ফেলল ওখানেই| হাসতে হাসতেই বল্লাম এটা কি হল ? ( বুঝে গেছিলাম দুর্বিনীত নয়..|বলা যায় ) একটু ক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে ব্যাপারটা বুঝল বোধ হয়...|কাগজ টা তুলে নিল..বৃষ্টি থেমে গেছিল তারা চলে গেল ঘটনা দুটো খুবই তুচ্ছ...কিন্তু প্রশ্নটা হল শিক্ষা বা বোধের এদের শেখাবে কে ....দায়্টা কার ?

157

8

Ranjan Roy

আগুনখাকী ঃ ছোটগল্প রঞ্জন রায়

আগুনখাকী (১) কিছুদিন হল ছত্রিশগড়ের এই শিল্পনগরীর স্কুল নাম্বার সেক্টর ফোর এ বদলি হয়ে এসেছি। এমনি এমনি নয়, রীতিমত প্রমোশন নিয়ে। চারবছর আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম, প্রথম পোস্টিং প্রোজেক্ট এরিয়ার স্কুল নাম্বার নাইনে । অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার । দায়িত্ব প্রাইমারী লেভেলে ইংরেজি পড়ানো। কাজটা ভালো লাগত। বাবার আপত্তি ছিল । উনি এই স্টিল প্ল্যান্টেই রোলিং মিল ম্যানেজার। পিতা-পুত্রী একই অরগানাইজেশনে চাকুরি করিবে, ইহা কেমন কথা? আসলে বাবার ভয় ছিল যে ওঁর আদরে বাঁদর হওয়া বেয়াড়া মেয়েটি চাকরি করতে গিয়ে এমন কিছু বখেড়া খাড়া করবে যে হাই লেভেলে কম্পপ্লেন হবে আর পিতৃদেবকে জবাবদিহি করতে হবে। আমি চটে গিয়ে বলেছিলাম যে ফর্মে বাবার নাম না লিখে মা’র নাম লিখব। বাবা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন যে কোন লাভ নেই । কারণ সবকটা সার্টিফিকেটে বাবার নাম লেখা আছে । বাবার রিটায়ার হতে এখনও বছর পাঁচ দেরি আছে। ওহ, দিস প্যাট্রিয়ার্কি! আমাদের কোয়ার্টার সেক্টর ফোরে, বেশ বড় বাগান। বাগানে দোলনা, ফেন্সিংয়ে সবুজ গাছ ও লতাপাতা। নিয়মিত মালী আসে; এককোণায় সার্ভেন্ট কোয়ার্টার; সামনে অফিসের জীপ দাঁড়িয়ে থাকে। আর আমি এই সেক্টর ফোরের স্কুল থেকেই হায়ার সেকন্ডারি পাশ করেছিলাম। গ্র্যাজুয়েশনের পরে মাস্টার্স না করে বি এড করলাম, আমি টিচার হতে চাই। বাবা-মা’র মতে মেয়েদের জন্যে সেটাই নাকি সবচেয়ে ভালো জীবিকা; মার মতে নিরাপদও বটে। সে যাই হোক, খুব খাটতে লাগলাম। আমার প্রাক্তন টিচার খোসলা ম্যা’ম আমাকে কাজ শেখাতে লাগলেন-- লেসন প্ল্যানিং, ইউনিট ভাগ করে টাইম লাইন সেট করা, ইউনিট টেস্টের কোশ্চেন পেপার বানানো, তাতে মার্কস ডিস্ট্রিবিউশন এই সব। ধীরে ধীরে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল হোমটাস্কের খাতাগুলো চেক করে দেওয়া—শুধু আমার ক্লাসের নয়, খোসলা ম্যামেরও। ছ’মাস কেটে গেল। উদয়াস্ত খাটি, প্রশংসা পাই, মন গর্বে ভরে ওঠে। আমার সঙ্গে জয়েন করেছিল আরও দু’টি মেয়ে। জয়তী ঘোষ ও রোজালিন লাল। জয়তী বাঙালী আর রোজালিন স্থানীয় ক্রিশ্চান। জয়তী ছটফটে, মুখে একটা আলগা হাসি,রোজালিন শান্ত, খুব কম কথা বলে। জয়তী বাচ্চাদের ক্লাসে খুব পপুলার, ও যখন ক্লাস নেয়, বাচ্চাদের হৈচৈ দুটো ক্লাস দূর থেকে শোনা যায়। আর রোজালিনের ক্লাসে টিচার আছে কি নেই , তাই বোঝা মুশকিল। তবে হরদম ওর ক্লাস থেকে কিছু বাচ্চা বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে দেখতে পাই। আমরা তিনজন একসাথে লাঞ্চ করি। আমি জয়শ্রী বেদুলা তেলুগু ব্রাহ্মণ--ভেজিটেরিয়ান। আর বাঙালী জয়তী এবং ক্রিশ্চান রোজালিনের লাঞ্চবক্সে ডিম বা চিকেনের পিস থাকেই, কখনও বা ফিশ। তা থাকুক গে, আমার কোন অসুবিধে হয় না । জয়তীর মুখে নন-ভেজ জোকস ও অন্য টিচারদের নিয়ে নানান খাট্টা-মিঠা মন্তব্য লেগে থাকে। আমি মুচকি হাসি, রোজালিনের মুখে কোন ভাব খেলে না । রোজালিন বিবাহিত, ওর হাজব্যান্ড জোসেফ স্টিল প্ল্যান্টে চার্জম্যান গ্রেড ওয়ান। একদিন কুমারী মায়ের গর্ভধারণ নিয়ে জয়তী কিছু বলতেই রোজালিন কাতর মুখে হাত তুলল। --প্লীজ ঘোষ, লীভ গড এ্যালোন ! ইয়ু ওন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড। - আরে, এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন? আমাদের হিন্দুদের পুরাণেও কুমারী কুন্তীর সন্তান হওয়ার কথা আছে। তার ফলে মহাবীর কর্ণ জন্মাল। তেমনি জোসেফ বোধহয় ইম্পোটেন্ট ছিলেন, তাই কুমারী মেরির সন্তানের উনি পিতা। এতে আশ্চর্যের কী আছে? -- লীভ জোসেফ ট্যু! --হোয়াই? আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল। আমি না হেসে গম্ভীর মুখে বললাম—বিকজ, জোসেফ ইজ দ্য নেম অফ হার হাজব্যান্ড। --ইজ ইট? ইজ ইট! সরি রোজালিন, এক্সট্রিমলি সরি । আই ডোন্ট ইন্টেন্ড টু বি পার্সোনাল। ঘোষ হেসে গড়িয়ে পড়ে । এবার রোজালিনও হাসে। --ইট’জ অলরাইট; নো অফেন্স টেকেন। বিকজ আই হ্যাভ নট ওয়ান বাট টু বিউটিফুল চাইল্ড ফ্রম মাই জোসেফ। জয়তী ঘোষ চোখ গোল গোল করে নকল বিস্ময়ে ওকে দেখে। --তুমি দুই বাচ্চার মা ? এই বয়সেই? পেটে পেটে এত! দেখলে তো মনে হয় ভাজামাছটি উলটে খেতে জান না। রোজালিন লজ্জায় লাল। আমি বলি—এবার ওকে ছাড়ান দাও। দেখছ না ও ওর বরকে কত ভালবাসে ! জয়তীর ছ্যাবলামি থামে না । --তার মানে ওরা সব ভালবাসার ফসল, জোর-জবরদস্তির নয়। হাউ লাকি ইয়ু আর ! উত্তরে রোজালিন হাতজোড় করে। এবার ঘোষ আমাকে নিয়ে পড়ে । বলে আমি নাকি হদ্দ বোকা। সিনিয়র টিচার খোসলা নাকি আমাকে ইমোশনালি এক্সপ্লয়েট করছেন। কাজ শেখানোর নামে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস নিজের হোমটাস্ক চেকিংয়ের বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজে মজা মারছেন। আমার এসব কথা আদৌ ভাল লাগে নি। রেজিস্টার তুলে নিয়ে লাঞ্চরুম থেকে বেরিয়ে যাই। একদিন মিসেস আলুওয়ালিয়া, মানে আমাদের হেড মিস্ট্রেস রাউন্ডে বেরিয়ে ক্লাসের সামনে বাচ্চাদের বারান্দায় এক্কাদোক্কা খেলতে দেখে ওদের নিয়ে ক্লাসে ঢুকে দেখলেন রোজালিন ওর টেবিলে ঝুঁকে একমনে খাতা চেক করছে। পাতা ওল্টাচ্ছে আর লাল পেন্সিলে দাগ দিয়ে চলেছে। ক্লাসরুমের পেছন দিকের জানালার ওপর তিনটে বাচ্চা চড়ে বসে গল্প করছে। লাস্ট বেঞ্চ ও দেয়ালের মাঝের খালি জায়গায় দুটো বাচ্চা জাপটা -জাপটি করে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে , বাকিরা হাততালি দিয়ে দুই খুদে কুস্তিগীরদের উৎসাহ দিচ্ছে। রোজালিন শশব্যস্ত হয় উঠে দাঁড়াল এবং কিন্তু কিন্তু করে জানাল যে বারান্দার বাচ্চারা সবাই ওর পারমিশন নিয়ে ছোট- বাইরে সারতে গিয়েছিল। আলুওয়ালিয়া ম্যাম ঠান্ডা গলায় বললেন -- এতগুলো বাচ্চাকে একসঙ্গে বাথরুমের জন্যে ছুটি দেওয়া? আর ওরা ক্লাসে ফিরে এলো কি না সেটা কে দেখবে? উনি এটাও বললেন যে খাতা ফ্রি-পিরিয়ডে চেক করাই ভাল এবং লোয়ার ক্লাসগুলোতে টিচারের স্থান চেয়ারে নয়, বাচ্চাদের মাঝখানে। রাইটিং টাস্ক কম করে সঙ ও রাইমের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে ভাল হয়। উনি যখন পরের ক্লাসরুমে, মানে মিস ঘোষের ক্লাসে পৌঁছুলেন ততক্ষণে জয়তী সবাইকে শান্ত করে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ কোরাস গাইতে লাগিয়ে দিয়েছে। ব্যস, হেডমিস্ট্রেস হাইলি ইম্প্রেসড। তারপর আমার ক্লাস। আমি মন দিয়ে তিন ডিজিটের নাম্বারকে দুই ডিজিট দিয়ে মাল্টিপ্লাই করা শেখাতে ব্যস্ত ছিলাম। উনি কখন ঢুকেছেন টের পাইনি। কিন্তু গোটা ক্লাসের একসঙ্গে উঠে দাঁড়ানোর শব্দে ফিরে দেখি চশমার ফাঁক দিয়ে ওঁর চোখ হাসছে। উনি দাঁড়ালেন না, তবে ‘ক্যারি অন’ বলে বেরিয়ে যাবার আগে আমার দিকে ফিরে বললেন ক্লাসের পরে ওঁর চেম্বারে যেতে। দশ মিনিট কাটল। বেল বাজতেই আমি হ্যান্ডব্যাগ তুলে তাড়াহুড়ো করে বারান্দা পেরিয়ে ওঁর চেম্বারে ঢুকলাম। ম্যামের সামনে টেবিলের উপর রাখা কিছু খাতা দুটো আলাদা ভাগ করে রাখা। একটা খাতা তুলে উনি আমার দিকে মেলে ধরলেন, -- তোমার সিগনেচার? তোমার হ্যান্ড রাইটিং ? --ইয়েস ম্যাম। এনিথিং রং ? এনি মিস্টেক ম্যাম? উনি উত্তর না দিয়ে অন্য ভাগের থেকে আরেকটি খাতা তুলে বললেন—দিস রাইটিং অলসো সিমস টু বি ইয়োরস; ইজন’ট ইট? আমার গলা শুকিয়ে গেছে। শুধু ঘাড় কাত করি। --বাট ইট বিলংস টু ক্লাস এইট। সো? আমি কিছু বলি না । উনি চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখেন। তারপর বলেন, ‘শোন, একটা বেনামী কমপ্লেইন এসেছে। তোমাকে নাকি এক্সপ্লয়েট করা হচ্ছে। একজন সিনিয়র টিচার জোর করে তোমাকে দিয়ে ওঁর হোমটাস্কের খাতা চেক করাচ্ছেন। তুমি কিছু বলবে? --ম্যাম, আমি মিসেস খোসলার পুরনো স্টুডেন্ট। উনি আমাকে কাজ শেখানোর জন্যে কপি চেক করাচ্ছেন। কোন জোর-জবরদস্তি না । আমি হ্যাপিলি এই দায়িত্ব নিয়েছি। আমার লাভ হয়েছে। আলুওয়ালিয়া ম্যাম আমাকে কড়া চোখে জরিপ করে বললেন-বেশ, মনে হচ্ছে তুমি নতুন নতুন দায়িত্ব নিতে ভালবাস। তোমাকে একটা নতুন দায়িত্ব দিতে চাই; এগজামিনেশন ইনচার্জের। দু’মাস পরে হাফ ইয়ার্লি এগজামের সময়। আর ইউ ওকে? রেডি টু টেক দ্য রেস্পন্সিবিলিটি? ইনভিজিলেশন ডিউটি এলটমেন্ট, কোশ্চেন পেপার ডিস্ট্রিবিউশন, ওভার অল প্ল্যানিং, সিকিউরিটি এন্ড সিক্রেসি—এভরিথিং উইল বি ইওর রেস্পন্সিবিলিটি। আমি শ্লথপায়ে বেরিয়ে আসার সময় উনি পেছন থেকে বললেন—আর তোমাকে অন্য ক্লাসের খাতা চেক করতে হবে না । নোটিস বেরোনোর পর স্টাফরুমে হৈ চৈ পড়ে গেল। কয়েকজন এসে আমাকে কংগ্র্যাটস বলে গেল। তিনজন সিনিয়র টিচার আমাকে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ফিরে গেলেন। খোসলা ম্যাম হেসে বললেন –দেখলে তো! আমার কথা শুনে চলে কেমন লাভ হল? আমিই তোমার নাম রেকমেন্ড করেছিলাম। দুজন টিচার বললেন কাজটা কঠিন। কোন অসুবিধে হলে বলবে, আমরা আছি । বিকেলে ফেরার পথে জয়তী বলল—কাল আমার জন্যে সাম্ভার-বড়া আর উত্তপম ঘর থেকে বানিয়ে আনবি। আন্টিকে বলবি যে রসম আর সাম্ভার যেন উনিই রান্না করেন। --- কিস খুশি মেঁ? ---- পুছো, পুছো! হ্যায় কোই বাত। কনফিডেনশিয়াল। মাইরি বলছি। বলব, কিন্তু তোদের আগে দিব্যি গালতে হবে যে কথাটা পাঁচকান হবে না । আমি বললাম ঠিক আছে, কিন্তু রোজালিন কিছু না বলে কেমন অবোধ গরু-গরু চোখে তাকিয়ে রইল। --কী রে রোজালিন? কসম খেতে কোন অসুবিধে আছে? -- কিসের দিব্যি? -- তোর প্রাণপ্রিয় জোসেফের। -- দ্যাখ, গড, ভার্জিন মেরি, ক্রশ, স্বামী, বাচ্চা –এদের নিয়ে কসম খাওয়া ঠিক নয়। এই যে তুমি মাইরি বললে ওটাও আসলে ‘ মা মেরি’র কসম থেকে এসেছে। এসব আমার পছন্দ নয়। --উঃ , এমন মাদার তেরেসাকে নিয়ে যে কী করি! আচ্ছা, কোন কসম নয়, শুধু আমার গা ছুঁয়ে কথা দে; তাহলেই হবে। আমরা দুজনেই জয়তীকে ছুঁয়ে ওর চোখের দিকে তাকালাম। সে চোখে দুষ্টুমি নাচছে। --দ্যাটস ইট; ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান। আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। --হয়েছে , হয়েছে। সেই গোপন কথাটি কী? -- যে সিক্রেট কমপ্লেইন এর জোরে তোর খোসলা ম্যামের বেগারি থেকে ছুটকারা হল, কপাল খুলে গেল, সেটা আমিই পাঠিয়েছিলাম। ভাইয়ের কম্প্যুটার থেকে টাইপ করে আর পাড়ার আউটলেট থেকে প্রিন্ট আউট বের করে। আমাদের গলা শুকিয়ে গেছে। যদি ধরা পড়ত! ও আমাদের নীরব প্রশ্ন অনুমান করে বলল -- ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । সব প্রিকশান নিয়েছি। চিঠিটা একফাঁকে হেডমিস্ট্রেসের টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম। জয়তী কোন কাজে আগুপিছু না ভেবে এগোয় না – সে বেনামী চিঠিই হোক বা ডেটিং । আমাদের দুষ্টু হাসিতে রোজালিন যোগ দিল না । (২) একটা অ্যাকাডেমিক ইয়ার পেরিয়ে গেল। আমাদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের দোস্তি বরকরার রয়েছে এবং আরও পাক্কি হয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা গোটা স্কুলের নজরে এসেছে। আমার পরীক্ষার ইনচার্জ হওয়া নিয়ে একটা আঁধি উঠেছিল। প্রথম তিনদিনের পরীক্ষার পর কিছু বান্ডিল থেকে দুটো-তিনটে করে আন্সারশীট গায়েব হয়ে গেছল। আমার হাত-পা ঠান্ডা হবার জোগাড়। এদিকে সমস্ত ক্লাসরুম থেকে সব ইনচার্জ সাইন করে পুরো বান্ডিল জমা দিয়েছিলেন, সঙ্গে অ্যাটেন্ডেস শীট। আমি নিজে চেক করেছিলাম। জয়তী বলল, ঘাবড়াও মৎ, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি –সব ঠিকঠাক হ্যায় । --সে তো না হয় বলে দেব, তারপর? -- ম্যাঁয় হুঁ না ? দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেয়ালেরও বোধহয় কান আছে, অন্ততঃ আমাদের স্কুলবাড়ির দেয়ালের। হেড মিস্ট্রেস একদিন ডেকে পাঠালেন। কড়া চোখে জানতে চাইলেন খাতাপত্তর সব ঠিক আছে কী না । আমি আশ্বস্ত করলাম যে শেষ দিনের পরীক্ষার পর ওঁকে সব বুঝিয়ে দেব। আর মাত্র দু’দিন বাকি। খাতার বান্ডিলের হিসেব মিলছে না । কী যে করি! চেপে ধরলাম জয়তীকে। কী হল মুশকিল আসানের? ওর ভরসায় তো ছিলাম। এবার জয়তীর মুখেও দেখছি চিন্তার ছাপ। বলল—আভি ভী খেল বাকি হ্যায়। হাতে আছে দু’টো দিন। ভরসা রাখ। আরও একটা দিন কেটে গেল। বিকেলে ও আমাকে বলল—আমার উপর ভরসা আছে তো? তোর ড্রয়ারের ডুপ্লিকেট চাবিটা দে। কোন ভয় নেই। পরের দিন একটু আগেই স্কুলে গেলাম। লাঞ্চের পর প্রিন্সিপাল আলুওয়ালিয়া ম্যামের কাছে গিয়ে সমস্ত আন্সারশিটের বান্ডিল তার ট্যালি লিস্ট শুদ্ধু জমা দিতে হবে। ড্রয়ার খুলে চোখ ছানাবড়া! সমস্ত গায়েব শিটগুলো আমার ড্রয়ারে হাজির; সঙ্গে সাবজেক্ট, পরীক্ষার তারিখ ও ক্লাসের নাম লেখা স্লিপ লাগানো। যথাসময়ে সবকিছু ঠিকঠাক জমা হয়ে গেল। অনেক জেরা করেও জয়তীর কাছ থেকে ‘উত্তরপত্র অন্তর্ধান রহস্য’ ভেদের গোপন ফর্মূলা জানতে পারি নি। ও বলত কিছু কিছু ব্যাপার গোপন থাকাই ভাল। আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কোন বাংলাগানের এক কলি গুনগুনিয়ে উঠত—আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলংকভাগী। অনেক পরে আমাকে বলেছিল—একটা টিপস দিচ্ছি। স্কুলের ফোর্থ গ্রেড স্টাফের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখবি, হোলি-দিওয়ালিতে মিষ্টির বাক্স দিবি। মাঝে মাঝে ওদের পরিবারের কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করবি। দেখবি, অনেক প্রবলেম সল্ভ হয়ে যাচ্ছে। তারপর ফিল্মি কায়দায় বলল—ডোন্ট আন্ডার- এস্টিমেট দ্য পাওয়ার অফ কমনম্যান! ৩) অ্যাকাডেমিক সেশন শেষ হবার মুখে। আমি অ্যানুয়াল এগজামিনেশন পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়াতে এবার কেউ কোন প্রশ্ন তুলল না। যেন এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু পরীক্ষার প্রথম দুটো দিন যেতে না যেতেই একটা সমস্যা মাথা চাড়া দিল। রোজালিন স্কুলে দেরি করে আসছে। এমনটা হয় না। আমি প্রত্যেক ক্লাসে দু’জন করে ইনভিজিলেটর দিয়েছি। ওর ক্লাসে আরেকজনকে প্রথম দশ মিনিট, মায় অ্যাটেন্ডেন্স ও কোশ্চেন পেপার দেওয়া অবধি দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে। রোজালিন লাল। আমাদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের সবচেয়ে নির্বিবাদ সবচেয়ে শান্তশিষ্ট সদস্য। আমাদের মধ্যে ও কেমন যেন বেমানান। ওকে ঠিক যোদ্ধা বলা যায় কি? জয়তী ড্যাম গুড ফাইটার। ও জানে যে এই দুনিয়াটা একটা লড়াইয়ের ময়দান, আর বেশির ভাগ পুরুষ হল হারামির হাতবাক্স। এই অসম লড়াইয়ে জিততে হবে। তাই ও জানে ‘হাউ টু ফাইট ডার্টি’! আমি অন্যভাবে বড় হয়েছি। যতদূর সম্ভব ফেয়ার প্লে আর পারদর্শিতায় বিশ্বাসী। রোজালিন বিশ্বাসী পরম করুণাময় ঈশ্বরের ন্যায়বিচারে। ওর কাছে মাতা মেরী, হোলি ট্রিনিটি এবং ওর স্বামী জোসেফ সমস্ত সমালোচনার উর্দ্ধে। ওর জীবনযাত্রা আমাদের চোখে একটু একমেটে, একঘেয়ে। তা হোক গে, ও নিজের মত করে ‘হ্যাপি’ আছে। সেটাই কি যথেষ্ট নয়? ও আমার কাছে একটু খোলামেলা। নিজের ঘরের অনেক কথা বলে। কোন সমস্যা হলেও আমাকে বলে, জয়তীকে নয়, যদিও জয়তী আমাদের আসল মুশকিল আসান। হয়ত ও জয়তীর প্রগলভতাকে ভয় পায়। কখনও যদি ওর বিশ্বাসের আগল ভেঙে যায়! এভাবেই জানতে পেরেছিলাম যে ওর স্বামী জোসেফ অসুস্থ, চারমাস ধরে ডিউটি যেতে পারছে না। ছুটি অনেকদিন হল শেষ হয়ে গেছে। লীভ উইদাউট পে! টানাটানি বাড়ছে। আমার থেকে একটু একটু করে ধার নিয়েছে রোজালিন; প্রথম প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দিয়েছে, এখন আর পারছে না। তবু আমি দিচ্ছি, দিতে হচ্ছে। আমার তো কোন সাংসারিক দায়িত্ব নেই। আর জোসেফ সেরে উঠে কাজে যোগ দিলে সবটা রোজালিন শোধ করে দেবে। এখন যে ওর বড় দরকার। আর আমি ওকে বড্ড ভালবাসি। ওর সরল বিশ্বাস, ওর এই অসহায় ভাব—সব আমাকে টানে। আমি ওকে আগলে রাখতে চাই। ইদানীং ওর কপালে ভাঁজ, পোষাকে অযত্ন আর চোখের কোনে কালি আমাকে ভাবাচ্ছে। অনেক করে বলায় জানলাম যে ওর ছোটবোন সিলভিয়াকে ও বিলাসপুর থেকে এখানে আনিয়ে নিয়েছিল। সিলভিয়া খুব কাজের মেয়ে, চটপটে। অসুস্থ জামাইবাবুর সেবাযত্ন, দিদির দুই ছোট বাচ্চাকে সময়মত নাইয়ে খাইয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে স্কুলে পাঠানো –সব সুন্দর করে করছিল। জোসেফ সেরে উঠছে, তবে এখনও ডিউটি যাবার মত হয় নি। রোজালিন ওর বোনকে একটা স্থানীয় কোচিং ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছিল। যাতে ও আগামী সেশনে উচ্চ মাধ্যমিক দিতে পারে। কিন্তু কাল ওই কোচিং থেকে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিল। সিলভিয়া গত দেড়মাস ধরে টিউটোরিয়ালে যায় নি। অথচ ও তো রোজ তৈরি হয়ে প্রায় রোজালিনের সঙ্গে একই সময়ে কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে যেত। কোথায় যেত? সিলভিয়া কোন উত্তর দেয় না, খালি কাঁদে। মুখ খুলল জোসেফ। সিলভিয়াকে বকতে হবে না। ওকে নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ও টিউটোরিয়ালের টিচিং ফলো করতে পারছিল না। তাই আমি ওকে পড়াচ্ছি। দেখবে, ও ঠিক পাশ করে যাবে। তাই? তাহলে আমাকে বলিস নি কেন সিলভি? খামোকা কোচিং এর জন্যে কিছু টাকা বরবাদ হল । সিলভিয়া দিদিকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদে। দিদি গো, তুমি খুব ভাল। আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি বকবে বলে। বকব কেন? না, মানে জোসেফ জীজাজির শরীর ভাল নয়। ওঁর উপর বেশি চাপ না পড়ে! রোজালিন নিশ্চিন্ত হল; সত্যিই হল কি? আজকে ছিল ম্যাথসের পেপার। রোজালিনের দেখা নেই। আমি গিয়ে ওর ক্লাসে হাত লাগালাম। পরীক্ষা শুরু হল । প্রায় আধঘন্টা পরে রোজালিন এল। এ কি চেহারা! চোখের পাশে নীল হয়ে ফুলে উঠেছে। ফোলা ঠোঁটে রক্তের দাগ! আমি বললাম, রোজালিন, তুমি আজ ছুটি নাও। এই চেহারায় ডিউটিতে নিতে পারব না। বাড়ি যাও। বাড়ি যাওয়ার কথায় চমকে উঠল রোজালিন। প্রাণপণে মাথা নাড়তে লাগল। --ঠিক আছে, ওয়াশ রুমে গিয়ে নিজের চেহারা ঠিক করে নাও। আর স্টাফ রুমে গিয়ে বস। পরীক্ষার পর আমরা কথা বলব। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলে আমাকে ডেকে পাঠালেন প্রিন্সিপাল ম্যাম। --দিস কান্ট গো অন। তোমার বন্ধু, কিন্তু এ ভাবে ডিউটি করা যায় না। আই ওয়ন্ট অ্যালাউ। আমরা ওকে শো-কজ করব। --ম্যাম, একটা চান্স দিন। ওর একটু ফ্যামিলিতে প্রবলেম চলছে। আমি নিজে কথা বলব। -- লাস্ট চান্স। উই অল হ্যাভ সাম প্রব্লেমস। বাট ইফ শী ডাজ’ন্ট মেন্ড হার ওয়েজ, ওয়েল , ইউ নো। স্টাফ রুম থেকে ওকে ডেকে নিলাম। বাড়ি যাবার পথে সব শুনব । এই সময়ে কোত্থেকে হাজির জয়তী। আমি একটু অপ্রস্তুত; খেজুরে করে বললাম যে আজ রোজালিনের সঙ্গে একটু কথা আছে। --ননসেন্স ! ‘অল ইজ ফর ওয়ান, ওয়ান ইজ ফর অল’,--ভুলে গেলি! -- না মানে ওর কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা— ঝাঁঝিয়ে উঠল জয়তী। --যে কথাটা ওর গোটা পাড়া জানে সেটা প্রাইভেট এন্ড কনফিডেন্সিয়াল! দিস ইজ হাইট! -- মানে? -- মানে শী ইজ এ সেন্টিমেন্টাল ফুল! সেইজন্যেই ভুগছে, ঠকছে। চিটেড। -- কে চীট করেছে? -- পতিদেব অউর বহন। গ্রেট জোসেফ এন্ড সিলভি। ভেঙে পড়ে রোজালিন, দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুলে ফুলে কাঁদে। আমি শকড, রোজালিন খালি কাঁদে; জয়তী একটু একটু করে খোলসা করে। সিলভিয়া প্রেগন্যান্ট। এখন অ্যাবর্শন সম্ভব নয়, দেরি হয়ে গেছে। গোঁড়া রোমান ক্যাথলিক রোজালিনের চোখে অ্যাবর্শন পাপ। তাই জোসেফ ওকে বিয়ে করে নেবে বলেছে। এদিকে জোসেফের চাকরি চলে গেছে। ওর ডিপার্টমেন্ট থেকে চিঠি এসেছিল যে ওকে আর ছুটিতে থাকতে হলে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে হাজির হয়ে ওদের রেকমেন্ডেশন পেতে হবে, নইলে ডিউটি জয়েন করতে হবে। জোসেফ কোনটাই করল না। এই নিয়ে আজ সকালে কথা কাটাকাটি, জোসেফ রোজালিনের গায়ে হাত তোলে—দুই বাচ্চা ও বোনের সামনে। রোজালিনের ইডেন গার্ডেনে এখন স্যাটানের রাজত্বি। জয়তী জোর করে আমাদের দু’জনকে নিয়ে রোজালিনের বাড়ি যায়। দুটো বাচ্চা দৌড়ে এসে ওদের মাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর আমাদের দেখে সরে গিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। জয়তী সোজা ওদের বেডরুমে ঢুকে পড়ে। ঠেট হিন্দিতে জোসেফকে বলে যে রোজালিনের গায়ে যদি আরেকবার হাত তুলেছে তো ওর ঠাঁই হবে শ্রীঘরে। আর তাতে নাবালিক শালীকে রেপ এর চার্জ আনা হবে। জোসেফ বুলি ও কাওয়ার্ড। প্রথমে শের হবার চেষ্টা করলেও ভেতরের শেয়াল সহজেই বেরিয়ে এল। হাত জোড় করল, রোজালিনকে চুমো খেয়ে আমাদের কথা দিল যে এমন ভুল আর হবে না। পরের দুটো সপ্তাহ ভাল ভাবে কেটে গেল। রোজালিন অনেক ধন্যবাদ দিল জয়তীকে। বলল জোসেফ প্রপারলি বিহেভ করছে। প্রিন্সিপাল শো-কজ দেন নি। ঈশ্বরের দুনিয়ায় সব ঠিক ঠাক চলছে। আমি জয়তীকে বললাম-অংক কী সোজা রে ভাই! তারপর আজকের দিন। আবার রোজালিন আসে নি। কোন ফোনও নয়। শরীর খারাপ হোল নাকি? আমার ডানদিকের চোখের পাতা নাচছে কেন? জয়তী বলল যে এত ভাবার কী আছে? আমরা না হয় লাঞ্চ ব্রেকের সময় স্কুটিতে করে ওর বাড়ি ঘুরে আসব। কিন্তু সেকেন্ড পিরিয়ড শেষ হবার আগে একটা পুলিশের জীপ এসে স্কুলের কম্পাউন্ডে ঢুকল। দুজন অফিসার প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে বসলেন আর আমাদের দুজনের ডাক পড়ল। আমাদের এক্ষুণি ওদের সঙ্গে রোজালিনের বাড়িতে যেতে হবে। কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ওর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দূর থেকে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখা গেল। ভেঙে পড়েছে লোকজনের ভিড়। আমরা দুজন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। প্রথমে পুরো ব্যাপারটা ফোকাসে আনতে একটু সময় লাগল। বেডরুম ও তার গায়ে লাগা রান্নাঘরের আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু এখনও কালো ধোঁয়া উঠছে। দমকলের একটা গাড়ি বাগানের ফেন্সিং ভেঙে ভেতরে গিয়ে হোস পাইপ দিয়ে আগুন সামলেছে। এখন মাত্র দুজন একটা কোণায় জল স্প্রে করে চলেছে। কোয়ার্টারের লাগোয়া বাগানের জমি জলে ভেসে কাদা হয়ে রয়েছে। প্রথমে পাড়াপড়শির দল বোধহয় নিজেরা আগুন নেভাতে চেষ্টা করেছিল। কিছু কিছু বালতি এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। রোজালিন ও বাচ্চারা কোথায়? বাড়ির দরজাটা ভাঙা হয়েছে, জানলা ও দরজার পোড়া কাঠ থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। বারান্দায় সাদা কাপড়ে ঢাকা দুটো শরীর। একটা অ্যাম্বুলেন্স রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে। বাড়ির উঠোনে একটা গাছের নীচে সিমেন্টের বাঁধানো চাতালে বসে আছে রোজালিন, পাশে দুজন মহিলা পুলিশ। এরমধ্যে পুলিশ অফিসার আমাদের খানিকটা ব্রিফ করেছেন। রোজালিন নিজেই থানায় ফোন করে। ওঁরা ফোর্স নিয়ে এসে দেখেন দুটো ঘর থেকে আগুন জ্বলছে। কিন্তু বেডরুমের দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ। আঙিনায় রোজালিন তার দুইবাচ্চাকে আঁকড়ে ধরে ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে। বাচ্চাগুলো থরথর করে কাঁপছে। কে তালা লাগিয়েছে? চাবি কার কাছে? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলে ওরা কেঁদে উঠে মাকে দেখায়। রোজালিন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ভেতরে কে আছে? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের বাবা কই? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলে ওরা তালাবন্ধ ধোঁয়া ওঠা ঘরের দিকে আঙুল দেখায়। অনেক কষ্ট করে দরজা ভাঙা হয়, কিন্তু আগুনের হলকা ও ধোঁয়ার চোটে ভেতরে ঢোকা যায় নি। দমকল এসে আগুন নেভায়, তখন ভেতর থেকে আধপোড়া দুটো শরীর বের করা হয়। ওরা আগেই দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে। রোজালিন কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল না। অনেকবার জেরার পর জানা গেল যে দরজায় তালা ওই লাগিয়েছিল। দরজা জানলায় স্কুটারের জন্যে রাখা এক জেরিকেন পেট্রল ছিটিয়ে দিয়ে ওই আগুন লাগিয়ে দেয়। কেন? কোন উত্তর নেই। বাচ্চারাও কিছু বলতে পারে নি। শেষে রোজালিন পুলিশ অফিসারকে বলে স্কুল থেকে ওর দুই বন্ধু জয়শ্রী ও জয়তীকে আনিয়ে নিতে। ওদের কাছে ও সব খুলে বলবে। আমরা গিয়ে ওর পাশে বসে ওর হাতে হাত রাখি। কিন্তু ওর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। ও যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। মহিলা পুলিশ আমাদের বলে – বন্ধুর থেকে জলদি জলদি কথা বার করুন। তারপর ওকে কালোগাড়ি করে থানায় নিয়ে যাব। ক্যা খতরনাক অউরত! অপনে হাথোঁ সে পতি অউর বহনকো জ্বলা দী! জয়তী ওকে হাত তুলে থামায়। তারপর বলে আপনারা একটু সরে বসুন। আমাদের কাজ করতে দিন । আমরা কোন কথা বলি না। শুধু দুদিক থেকে ওর দু’হাত ধরে বসে থাকি। আস্তে আস্তে হাত বোলাতে থাকি। ভাবি, সব তো ঠিক চলছিল, হটাৎ কী হল? রোজালিন যেন আমার অনুক্ত প্রশ্নটি শুনতে পায়। ধীরে ধীরে নীচুগলায় প্রায় বিড়বিড় করে বলতে থাকে। আজকে আমি যখন স্কুলে আসার জন্যে তৈরি হচ্ছি তখন ভাবলাম দুধ গরম করে সিলভিকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে আসি। রান্নাঘর থেকে দুধের কাপ হাতে নিয়ে ওর নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। বাইরে এসে দেখি জোসেফ ওর হাত ধরে টানতে টানতে বেডরুমে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম—এ কী! হাউ কুড ইয়ু? বিফোর মাই ওন আইজ! জোসেফ ফিরে আমাকে দেখল, তারপর ওকে বেডরুমের ভেতর নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আমার মাথাটা ঘুরে উঠল। কখন গেটের তালাটা নিয়ে দরজায় লাগিয়ে দিয়েছি, কখন পেট্রোলের জেরিকেন এনে মাচিস মেরে দিয়েছি—কিছুই মনে নেই। বাচ্চাদুটোর চিৎকারে আমার হুঁশ ফিরল। তখন বন্ধ ঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভেতর থেকে জোসেফ ও সিলভির চিৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু আমার কিছুই মনে হোল না। একটু পরে ওদের চিৎকার বন্ধ হয়ে গেল। পাড়াপড়শীর দল আসতে শুরু করল। তখন পুলিশে ফোন করলাম। রোজালিনের মাথা নুয়ে পড়ল, বিড়বিড় করতে লাগল—হাউ কুড হী? বিফোর মাই ওন আইজ? কালোগাড়িতে ওঠার আগে আমাদের বলল—প্রমিস, ইয়ু উইল লুক আফটার মাই কিডস? প্রমিস, দে উইল বি কেয়ারড? ==============================================

89

7

মনোজ ভট্টাচার্য

হারাধনের একটি ঋদয় !

একটা মজার ঘটনা বলি । মজার মানে কতটা মজার – বলতে পারবনা । কিন্তু মুনিয়া আমাকে বলেই দিয়েছে – শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলার কাহিনী চলবে না ! অথচ বৃদ্ধদের তো দীর্ঘশ্বাসই সঙ্গী । আমাদের এখানে এক চৌধুরী মশাই আছেন । তার বয়েসের নম্বর হোল চুরাশি । আড্ডায় প্রায়শই কেউ না কেউ কিছু-মিছু আনে । সবাই মিলে খাওয়া-টাওয়া হয় । তা আমার হাতে কিছু পড়লে দেড় সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না মুখে যেতে । কিন্তু চৌধুরীবাবুর তা নয় । কোন খাবারই মুখে যায় না ! তবে সেটা অদৃশ্য হয় । কিন্তু কিছু-মিছুটা অদৃশ্য হতে সময় লাগেনা ! – তাহলে যায় কোথায় ? এই চৌধুরীদা – আপনি খেলেন না ? কেউ হয়ত জিগ্যেস করলো । – আমি তো এখন খাই না । ওনার উত্তর । - তাহলে নিলেন কেন ? - বাড়িতে বুড়ি আছে – তার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি ! - একদম অকপট স্বীকারোক্তি । এমন কি তৈলাক্ত বা রসালো কিছু হলেও প্লাস্টিকের প্যাকেটে করে ঢুকে যায় হাতে কাপড়ের থলেতে । - এই নিয়ে নানানজনের নানা রকম অভিমত । কেউ ওনার দাম্পত্য প্রেম নিয়ে ঠাট্টা করে । উনি স্রেফ নির্বিকার চিত্তে বসে থাকেন । আর সাড়ে আটটা বাজলেই – আমার ওপরে যাবার সময় হোল – বলে উঠে পড়ে – মানে পাঁচ তলায় যেতে হবে । বুড়ি অপেক্ষা করছে ! সক্কাল বেলায় একজন ফোন করে জানালো চৌধুরীবাবুকে ও ওনার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এ্যাম্বুলেন্সে করে । পাশাপাশি বেডে শোয়ানো হয়েছে । কিছুদিন আগেই কাছাকাছি একটা নার্সিং হোমে চৌধুরীবাবুকে ভর্তি করা হয়েছিলো । শরীর খুব খারাপ লাগছিল । দেখা গেল – ওনার হৃদয় বেশ চোট হয়েছে । পেস মেকার বসানো হবে । - তা ঐ নার্সিং হোমে তো হবে না । ওনার মেয়ে-জামাই তিনদিন বাদে সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল । আগের দিন আমি গেছিলাম ওনাকে দেখতে । লিফট খারাপ দেখে ফিরে এসেছিলাম । আমি কিন্তু পাঁচতলায় হেঁটেও উঠি । সেদিন আর উঠলাম না । খুব আফশোষ হতে লাগলো । - কেন কাল দেখা করলাম না ! যাই হোক, খবর নিয়ে জানলাম - এবার ওদের এক আত্মিয়র সুপার-স্পেসালিটি হাসপাতাল আছে – রাজারহাটের শেষে – সেখানে পেস মেকার বসানো হবে । - পরের দিন আমরা কজনে – ঐ প্রচন্ড রোদে-গরমে ট্যাক্সিতে করে আট শো টাকা ভাড়া দিয়ে – হাজির হলাম। লোটাস হাসপাতালটা খুব ছোট – সবে তৈরি হচ্ছে । কিন্তু দেখেই বোঝা যায় – এক কালে রোগীদের ভিড়ে ঠাসাঠাসি হবে । ডাক্তার স্বামী-স্ত্রী মিলে তৈরি করছে । ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি – চৌধুরীবাবু ও তার স্ত্রী দুটো বেডএ শায়িত । আগে বলি চৌধুরী বাবুর কথা । ভদ্রলোক এমনিতেই খুব লম্বা । বয়েসের চাপে হয়ত দু-এক ইঞ্চি কমে গেছে – একটা ছোট হাফ প্যান্ট পড়ে বেডের ওপর বসে যেন লুডো খেলবেন ! খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে । আজকেই নাকি লাঞ্চে সবটুকু খেয়েছেন । একদম সেরে গেছেন । আমার আর কোন সমস্যা নেই – একদম ফিট । পেস মেকার বসানোর দরকার নেই ! বুড়িকেও দু একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেবে বলেছে । পরশুই বুড়িকে নিয়ে বাড়ি চলে যাবো ! – আমরা গেছি বলে খুব খুশী ! উনি ভাবতেই পারেন নি – আমাদের দেখতে পাবেন ! = আমারও না দেখতে পারার আফসোসটা মিটে গেল । আমরা কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম – সোমবার পেস মেকার বসানো হবেই । ওনার মেয়ে-জামাই থাকবে । সোমবার সন্ধ্যাবেলায় ফোন করতে ওনার মেয়ে জানালো – পেস মেকার বসানো হয় নি । কেন ? – বাবা রাজি হয় নি । আর ডাক্তাররা রোগীর অমতে কোন অপারেশান করবে না । - খুব স্বাভাবিক ! - দুদিন পরেই ওনারা হাসপাতাল থেকে ফিরে আসছেন । - তবে এখানে নয় । চৌধুরীবাবুর মেয়ের বাড়িতে । - কাছাকাছি – পালপাড়ায় । হারাধনের একটি ছেলে সারাতে গেল হৃদয় – পুরনো হৃদয় নিয়েই চলে গেল পালপাড়ায় ! মনোজ

98

3

Kishore Karunik

ছি:

ছি: কিশোর কারুণিক কান পাতলেই শুনতে পাই কান্নার আওয়াজ শিশুর কান্না, নারীর কান্না নির্যাতিত মানুষের কান্না। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি বাজারে পকেটে পাঁচটাকা কয়েন মন অশান্ত, শরীর অশান্ত অশান্ত সমাজ প্রিয়স্বদেশ।

61

1

জল

গল্প

তরোয়ালের খাপ .... গন্ডগোলটা ভালোমতই পেকে উঠেছে সেটা বেশ টের পাচ্ছে শীল| কোম্পানী ভিতরে ভিতরে যে বেজায় চাপে আছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই| তবু ওপরে ওপরে দেখাচ্ছে সব ঠিক আছে| আসলে হঠাৎ করেই যে এইভাবে নতুন কার্তুজটাকে ঘিরে আগুন জ্বলে উঠবে তেমনটা ভেবে উঠতে পারেনি কোম্পানী| আগাম একটা উত্তাপের আঁচ টের পেলেও সেটা যে এইভাবে ছড়িয়ে পড়বে সেটা আন্দাজ করে উঠতে পারে নি| চারিদিকে একটা অসন্তোষ টের পাচ্ছে সে| ভালো লাগছে না‚ এই দূর প্রদেশে পড়ে থাকতে তার| ঘরে ছোট ছোট বাচ্চা‚ বয়স্থ মা‚ বউকে ছেড়ে এই দূরদেশে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না| কটা টাকাই বা কোম্পানী মাইনে দেয়? কথায় কথায় গালি -গালাজ‚ অথচ এরা নাকি সভ্য আর শিক্ষিত জাত| মাঝে মাঝে এই সিপাহীদের মত তার মাথাতেও আগুন জ্বলে ওঠে| কিন্তু কি বা সে করতে পারে? তার ক্ষমতাই বা কতটুকু| পরিবার আছে‚ সামান্য বিরোধিতাও এরা সইবে না‚ মাঝখান থেকে যে কটা প্রাণ তার ওপর নির্ভর করে আছে সেগুলোর চরম ক্ষতি হয়ে যাবে| 'শীল শীল সেভ মি?' শীলের ভাবনায় ছেদ পড়ে| জেমস সাহেবের গলা না? কি হল? শীল দ্রুত পায়ে এগিয়ে দেখতে পায় বেশ কিছু সিপাহী জেমস সাহেবের কোয়ার্টারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে|শীল ছুটে যায়| জেমস সাহেবের সর্বক্ষণের কর্মী সে| জেমস সাহেবের জান চলে গেলে তার জানও থাকবে না| সাহেবের কোয়ার্টারের পিছনেই তার ঘর| পিছন দিয়ে সে দ্রুত বাড়ির ভিতরে পৌঁছে যায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে| 'শীল‚ কাম‚ ডু সামথিং ‚ সেভ মি'‚ প্রতাপী জেমস কেন্নোর মত গুটিয়ে যাচ্ছে দেখে শীলের একটু কি আনন্দ হয়| কিন্তু সেই ভাবনা মাথায় আসতে না দিয়ে দ্রুত চিন্তা করে কি করে জেমসকে বাঁচানো যায়| কিন্তু মাথাটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে| পিছনের দিকে আগুন যেতে এখনো কিছুটা বাকি| ঐ পথে জেমসকে এখান থেকে বের করে নিয়ে গেলেও সিপাহীরা ছাড়বে না| 'শীল টেক দিস অল‚বাট সেভ মি‚ মাই ওয়াইফ... ইজ ওয়েটিং‚ সি ইজ সি ইজ ' শীল এত কথা সে বুঝতে পারে না‚ এত ইংরেজি সে জানেও না‚ কাজ চালাবার মত কয়েকটা বাদ দিলে| শুধু এটুকু সে বুঝেছে সাহেবের বউ-এর কিছু একটা ব্যাপার আছে‚ যার জন্য সাহেব এত উতলা হয়ে সবকিছুর বিনিময়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইছে| কোমর থেকে খুলে দিয়েছে সোনার তরোয়ালের খাপ| এক একটা খাপে কম সোনা নেই| চোখ চক চক করে ওঠে শীলের| কিন্তু কিভাবে বাঁচাবে সাহেবকে? ..... 'তারপর কি করে বাঁচালো সাহেবকে?' প্রশ্নটা করে অভি| একটা থ্রিলার যেন সে ভিস্যুয়ালাইজ করছিল এতক্ষণ| 'সেটা জানা যায় না| তবে সাহেব দেশে ফিরে যেতে পেরেছিল|' জানায় অদ্রি| 'যাহ তাহলে তো গল্পটা মাঠেই মারা গেল?' অভি হতাশ হয়| 'না রে গল্পটা এখান থেকেই শুরু হয়| শীল মানে আমার সেই পূর্বপুরুষ ফিরে আসে নিজের ভিটেটে| তারপর খুব অল্পদিনেই পরিবারের অবস্থা ফিরে যায়‚ কি করে সেসব অবশ্য আমি জানি না|' 'কি করে আবার? ঐ সোনার তরোয়ালের খাপটা বিক্রি করে নিশ্চয়|' হাসে অদ্রি| 'কিছুদিন পরে একটা চিঠি আসে সেই জেমস সাহেবের কাছ থেকে আর আসে বেশ কিছু টাকা| কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সাহেব পাঠান সেই টাকা. সাথে শীলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশও করেন| শীল জেমসকে বাঁচায় কিভাবে তা জানা যায়নি‚ কিন্তু সে ঐ আগুনে পুড়েই মারা যায়|' 'কিসব আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছিস মাইরি? শুরুটা ভালই করেছিলি কিন্তু খেই হারিয়ে ফেললি|' অভি ফোঁস করে বলে ওঠে| 'ঐ চিঠিটা পাবার পর আর শীলকে কেউ দেখেনি কোনদিন| কিন্তু তরোয়ালের খাপটা থেকে যায় একটা ছোট সিন্দুকের ভিতর| আজও সেটা সেইভাবেই আছে|' 'দেখাতে পারবি?' 'আয়'| অভি‚ অদ্রির বন্ধু| এই ঘরে বহুবার এসেছে| কিন্তু কোনদিন কোন সিন্দুক দেখেনি| আজও দেখল না| অদ্রি এগিয়ে গেল যে দেওয়ালে খাট আছে সেই দেওয়ালে টাঙানো ওয়ালপেপারের দিকে| ওয়ালপেপারটা নামাতেই একটা ছোট কড়ামত কিছু চোখে পড়ল| সেট ধরে টানতেই খুলে গেল একটা ছোট্ট সিন্দুক| তার ভিতরে চকচক করছে সেই তরোয়ালের সোনালী খাপটা|

2471

188

Kishore Karunik

চলছে চলবে

ক্লান্তচোখে তাকাতেই হাসিমাখা মুখটি ভেসে উঠলো অট্টরলে সমীরণে আদর দিলো পাখি গাইলো গান নির্ঝর শব্দমালা গুঁমরিয়ে উঠলো অপলক ঝরে পড়া আলোর দিকব্দিক ছুটাছুটি শুরু হলো।

83

1

Joy

আন্দোলন‚ নিরাপত্তা আর আমরা সাধারন মানুষ...

কয়েকদিন ধরে NRS হাসপাতাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে| চিকিৎসা ব্যবস্থা শিকেয় উঠেছে| হাসপাতালে সব পরিষেবা বন্ধ| হাজার হাজার রোগী ও তাদের পরিবার সমস্যায় জর্জরিত| শুরুটা হয়েছিল এক মুমুর্ষু বৃদ্ধ এক রোগীর মৃত্যু কে কেন্দ্র করে| হাসপাতাল ভাঙচুর| জুনিয়র ডাক্তারকে মারধর করা| ঘটনাটা খুবই দু:খজনক ও ঘৃণ্য| এ বিষয়ে কোন দ্বিমত থাকতে পারেনা| হাসপাতালে ভাঙচুর করা ও ডাক্তারকে মারধর কোন সভ্য মানুষ করতে পারেন না| আমাদের রাজ্যে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ আসেন চিকিৎসা করাতে| এদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই খুব গরীব ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা| কেউ শহরে আসেন আত্মীয়দের বাড়ি বা ঘর ভাড়া করে থাকেন| প্রিয়জনদের জন্যে রাত জেগে বসে থাকেন| ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে অধীর অপেক্ষায় বসে থাকেন| এদের কেউ হিন্দু‚ কেউ মুসলিম‚ কেউ ক্রীশ্চান‚ কেউ বা আদিবাসী| সুস্থ হয়ে পরিবারের লোকজন বাড়ি ফেরার সময় হলে আনন্দে চোখদুটো ছল ছল করে উঠে| মনে মনে ডাক্তারদের দীর্ঘায়ু কামনা করেন| আশীর্বাদ আর দোয়া দিয়ে চলে যায় দূর দেশে| এত লোক-এত রোগী দেখতে দেখতে মাথা ঠিক রাখাটা খুবই কঠিন| তরপর অপারেশন‚ তদ্বির‚ পার্টি-পলিটিক্স তো আছেই| চিকিৎসায় ভুল অবশ্যই হয়| হাজার- লাখ রোগীর মধ্যে কিছু রোগী বাঁচেন না| হয়ত তাদের অনেক দেরীতে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল| আবার কিছুটা অবহেলা ও ভূল চিকিৎসায় কিছু রোগী মারা যান| সেটাও কাম্য নয়| আমার মা মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে সামান্য অসুস্থায় ভর্তি হন| চার দিন পর তার মৃত্যু হয়| ভুল চিকিৎসায়| পিয়ারলেস হসপিটালে নিউরোলজি বিভাগে আমার বাবা ভর্তি ছিলেন| নার্স-ডাক্তাররা কেউ জানতেন না বাবা কদিন ধরে খাবার খাচ্ছেন না| আমি ডাক্তার এর সঙ্গে দেখা করার জন্যে ৪ ঘন্টা ধরে হসপিটালে বসে থেকে বাজে ব্যবহার পেয়েছি| প্রচুর পেসেন্ট দের বাড়ির লোকেদের সঙ্গেই এটা হয়| কেউ মুখ বুজে চলে আসে| কেউ বা প্রতিবাদ তার সঙ্গে প্রাইভেট হসপিটাল গুলোর ভুতুড়ে মেডিক্যাল বিল| সেই গলা কাটা বিল না মেটালে মৃত রোগীর বডি ছাড়া হয় না| তখন সেই মানবিক ডাক্তার গুলিই অমানবিক হয়ে যান| আমার মায়ের মৃত্যুতে আমি বা আমরা ডাক্তারদের অপমান বা হাসপাতালের কোন আসবাব-পত্রের ক্ষতি করিনি| এতে কিছু রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন| আমি এটাকে কখনই সমর্থন করি না| ডাক্তার এক বিশ্বাসের নাম| সেবার নাম| আমরা কেউ ভগবানকে দেখিনি‚ কিন্তু ভগবান রূপী ডাক্তারকে দেখেছি| প্রতিটি হাসপাতলে ডাক্তাররা আজ কর্ম বিরতি করছেন| কেউ পদত্যাগ করছেন| কয়েকদিনে হয়ত এই সমস্যাটা মিটেও যাবে| কিন্তু মারা যাবেন অনেক মুমূর্ষু রোগী| চিকিৎসা পাবেন না অনেক গরীব মানুষ| রাজনীতির যাঁতাকলে পরে পিষবেন এরা| আমি হাত জোড় করে ডাক্তার স্যার-ম্যাডামদের অনুরোধ করছি আপনারা দয়া করে এদের দেখুন| সব পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে| অন্দোলন করুন| আপনাদের অন্দোলনকে আমি সমর্থন করি| কিন্তু সব স্তব্ধ করে নয়| আমার একান্ত অনুরোধ মুখ্যমন্ত্রী কে আপনি দয়া করে একবার জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলুন| আপনি তো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী| আপনি একটু নরম হলেই অনেকটা কাজ হবে| যারা বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে হাসপাতাল ভাঙচুর করে| ডাক্তারদের নিগৃহীত করে তাদের কঠোর হাতে শাস্তি দিন| এর মধ্যে কিছু পলিটিকাল পার্টি ও গুনী মানুষরা ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে গেছেন| কিন্তু আপনি সব নোংরা রাজনীতির বাইরে থাকুন দিদি| আপনি সেই লড়াকু নেত্রী| সবসময় মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকতেন| এত মানুষ আপনাকে আজও ভরসা করেন সেই আগের মতই| আপনি-ই পারেন সব সমস্যার সমাধান করতে| ডাক্তারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করুন| ডাক্তার বাবুরা-দিদিরা আসুন না আবার সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনি| আপনারা আমাদের চোখে ভগবানই থাকুন| দিব্যেন্দু মজুমদার

111

2

kishore karunik

চলছে চলবে

চলছে চলবে -কিশোর কারুণিক জীবনের টার্নিংপয়েন্টে দাঁড়িয়ে লাভক্ষতির হিসাব নিকাশে দুর্নীতিদমনে উভিযোগ করেও ফলাফল হলো শূন্য। আলোর হাতছানিতে আধাঁরের উপেক্ষা ভাললাগার সময়ে ভালবাসার লম্ফঝম্ফ কী দরকার ছিল সবুজের কথামালা কী দরকার পাশাপাশি, হাসাহাসি! আলোকবর্ষের পর আলোকবর্ষ কষ্টের পর কষ্ট, চাহিদার পর চাহিদা নির্ঝর মায়াবেশে কল্পনার হামাগুরি তবুও সবকিছু চলছে চলবে!

79

2

মানব

ব্রহ্মা কা রেখ

১ “যেইখানে কল্কাপেড়ে শাড়ি পড়ে কোন এক সুন্দরীর শব চন্দন চিতায় চড়ে – আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা; সেই খানে সবচেয়ে বেশি রূপ – সবচেয়ে গাঢ় বিষন্নতা...” জীবনানন্দের এই লাইনগুলো অজান্তেই বেরিয়ে আসে মুখ ফুটে। ওদিকে চিতা থেকে নামিয়ে আনা মেয়েটির মুখ অবিকৃত, অমলিন, আরামের অনন্ত নিদ্রায় শায়িত। আর কোনও জাগতিক দুঃখ-শোক ওর ওই মুদিত নয়ন দুটি থেকে বের করে আনতে পারবে না অশ্রুধারা, ওই প্রায় গোলাপী ঠোঁট দুটি আর কেপে উঠবেনা কোনও আবেগে উচ্ছাসে, ইহজগতের সব কাজ ওর শেষ। আজ এই গঙ্গার তীরের নির্জন জায়গায় একটু আগেই যে ঘটনাটা হয়ে গেল, তার জন্য দায়ী আমিই। হয়ত এর জন্য মেয়েটির বিদেহী আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারবেনা। ওই মায়াভরা সুন্দর মুখ আমাকে টানছে এক আদিম আকর্ষণের অদৃশ্য রশি দিয়ে। তার বিবস্ত্র শরীরে কি নির্মম প্রশান্তি, দেখে হিংসা হয়। সংসারের হাজারটা চাহিদা, সপ্তাহে ছয়দিন মালিকের দোকান দেখভালের কাজ শেষে একটা দিনের জন্য বাড়ি ফেরা, এইটাই হয়ে উঠেছে এখনকার দৈনন্দিন অভ্যাস। তারই মাঝে একটু গঙ্গার হাওয়া খেতে সন্ধ্যের দিকটায় এইদিকটায় আসি মাঝে মধ্যে। মনটা জুড়িয়ে যায়। তবুও বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকার জন্য এই যে মালিকের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছি, এতে কোনও শান্তি আছে কি! এটাই তো নরক। মাইনে অতটাও নয় যে স্ত্রী-পুত্রকে এখানে এনে রাখব। সপ্তাহের শেষে একটা দিন, একটা মাত্র দিন ছেলেটার মুখটা দেখতে পাই, আবার পরের দিন সবার ঘুমন্ত মুখের দিয়ে চেয়ে ভোরবেলা রওনা হই শহরে। এইভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনকাল, হঠাৎ একদিন শুনলাম, এক অঘোরী সাধু এসে আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। ওনারা নাকি স্বয়ং ভগবানের ভৌত প্রকাশ, এ ধারণাটা আমার মনে বদ্ধমূল ছিল আগে থেকেই। তাই এই দুঃখের কথা বলে সামান্য সহানুভূতি আদায় করতে পারলেই কেল্লাফতে, এই ছিল আশা। সেদিন দোকানে খুব একটা ক্রেতা ছিলনা, তাই তাড়াতাড়িই বন্ধ করে রওনা দিয়েছিলাম গঙ্গাপাড়ের দিকে। একটু এগিয়েই চুনীলালের দোকান। খুব ভাল পনীর পকোড়া ভাজে এখানে। তবে দামটা বড্ড বেশী, আর একদিন ওদিকে যাওয়া যাবে। তারচেয়ে অনেকদিনের চেনা সবিতামাসির দোকানে দুটো আলুর চপ আর মুড়ি একটা ঠোঙায় নিয়ে চিবোতে চিবোতে চললাম। ভাবখানা এমন যেন আমিই রাজা। নদীপাড়ে পৌঁছনোর পর আজ একটু ভয় ভয় করতে লাগল, কিজানি কি ভয়ঙ্কর মানুষের পাল্লায় পড়তে হবে। দেখতে কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে একটু ধারণা তৈরী করেই নিয়েছিলাম আগেভাগে। - আ বেটা আ। তেরা হি ইন্তেজার থা। চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে যাঁকে দেখলাম, যেকোন সাধারণ মানুষই সে দৃশ্য দেখে টাল সামলাতে পারতেন না হয়ত। কিন্তু আমি বেপরোয়া। শক্ত করে ধরে রাখলাম নিজেকে, এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না মোটেও। যেকোনভাবে ওনাকে তুষ্ট করতে পারলেই কেল্লাফতে... জটাজুট, দাড়ি-গোঁফে ঢাকা, সাদা ছাইমাখা সেই মুখের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিসটা হল চোখ। কি গভীর সে চোখের দৃষ্টি, নিঃসংকোচ, উজ্জ্বল। প্রথমে ভয় পেলেও একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, - আপনি, আপনি জানতেন আমি আসব? - কখনও কখনও জানতে পারি দরকার হলে, এই যেমন এখন বুঝতে পারছি তোর আমাকে খুব দরকার। হ্যাঁ তোকে আমি সাহায্য করব। হঠাতই প্রচণ্ড ভক্তিভাব পেয়ে বসল আমায়।সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বসলাম একখানা। - শোন তোকে আমি সাহায্য করব, কিন্তু আমার একটা কাজ আগে করে দিতে হবে তোকে। - কি কাজ বলুন, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে আমি বললাম। - চেষ্টা নয়, বল করব। আমাকে বিশ্বাস করলে আমিও তোকে সাহায্য করতে পারি। বাকীটা তোর ব্যাপার। এবার ছিলিমটা বের করলেন উনি। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, - দেশলাই আছে? ধোঁয়ায় নেশা আমার কোনওকালেই ছিলনা। তবে এই এলাকায় মাঝে মাঝেই কারেন্ট চলে যায়। তাই একটা গ্যাস লাইটার পকেটে রাখা ছিল। বের করে বললাম, - এতে হবে? ততক্ষণে উনি ছিলিমের ভেতর মশলা পুরে বেশ কায়দা করে মুখের কাছে ধরেছেন। আমি বোধহয় বুঝতে পারছি আমাকে কি করতে হবে। লাইটারটা জ্বেলে যে ছিদ্রটা ওনার মুখের দিকে আছে তার উল্টোদিকেটায় ধরলাম। সেসব গ্রাহ্য না করে প্রথমে চোখ উপরে তুলে ভক্তিভরে একটা প্রণাম সেরে নিলেন তিনি। তারপর আবার মুখের কাছে ধরলেন। দ্বিতীয়বার আবার লাইটারটা জ্বেলে নিলাম। ফসফস করে কয়েকটা টান দিলেন। যেটুকু ধোঁয়া আশপাশ দিয়ে আমার নাকে ঢুকেছে তাতেই আমি ভক্তির উর্ধ্বে পৌঁছে গেছি। মনে মনে ভাবছি ভোলেবাবা সামান্য বেলপাতাতেই তুষ্ট হোন, ইনিও সামান্য আগুনেই তুষ্ট হলেন। কেমন মনের সুখে ছিলিমে টান দিয়ে চলেছেন। যেন মহাবিশ্বের অধিকর্তা স্বয়ং আমার সামনে বসে ছিলিমরূপী বিশ্বলোকের সাথে খেলা করে চলেছেন। - কিরে একটা টান দিবি নাকি? ছিলিমটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি জোড়হাত করে বললাম, - আমার ওসব চলেনা। - আচ্ছা, তাহলে থাক। এই বলে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন উনি। প্রায় ন’টা বাজে। আমার অবশ্য তেমন তাড়া নেই। একটু দেরী হয়ে গেলে হানা দেবো লালুদার ধাবায়। সারারাত দোকান খোলা থাকে। রাতবিরেতে হাইওয়ে দিয়ে প্রচুর মালবাহী লরি যায়। রাত্রে তাদের কারও কারও খিদে পেলে ওখানেই হানা দেয়। তেমন সুস্বাদু বা পরিচ্ছন্ন না হলেও দামটা বড্ড কম। কয়েকদিন আগে মালিকের দোকানের পাশের একটা বড় রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল, খেতে গিয়ে দেখি নুন নেই। সে নিয়ে নালিশ করলে বলে, - আপনি তো নুন অর্ডার করেননি স্যার। কতটা লাগবে একটু বলবেন। একে খিদের জ্বালা, তার উপর এরকম আচরণ, মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। তবুও নিজেকে অনেকটা কন্ট্রোল করে নিয়ে বৃদ্ধা তর্জনী আর মধ্যমাকে একত্র করে বললাম, - এইটুকু। অতটুকু নুনের জন্য এক্সট্রা পনের টাকা যোগ করেছিল। তারচেয়ে আর কিছু টাকা দিলে আমার পুরো নৈশভোজটাই হয়ে যায় ওই ধাবায়। গরীবের আবার পরিচ্ছন্নতা! - হ্যাঁ বেটা, তোকে আমার একটা কাজ করতে হবে। - কি কাজ বলুন। এতক্ষণ মনে মনে ভাবছিলাম কখন আমার দাবীটা পেশ করব। আবার কাজ করতে বলায় একটু ঘাবড়ে গেলাম। উনি বললেন, - তোকে কিছু ক্ষমতা নিশ্চয়ই দেব, যাতে তুই নিজের পেট চালিয়ে নিতে পারিস। আমার জন্য তোকে একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে হবে। একটা মৃতদেহ জোগাড় করে দিতে হবে, অপঘাতে মৃত। আর একটা কথা, অপঘাতে হলেও যেন কোন বড় রকমের খুঁত না থাকে সে দেহে, যেমন ধর হাত নেই, কানা... ওসব চলবেনা। - ঠিক আছে বাবা। আমায় কয়েকদিন সময় দিন। আমার কাজ হবে তো? - আগে থেকে বলি কি করে। তবে তোর কিছু একটা হিল্লে নিশ্চয়ই করে দেব। আমাতে বিশ্বাস রাখ। প্রণাম জানিয়ে সে রাত্রের মত বিদায় নিলাম। মনে মনে বললাম, এ তো ‘কর্পোরেট পাল্টিবাজি’। কয়েকদিন আগে একটা সিনেমায় এই টার্মটা শিখেছি। এরকমভাবেই একজন কর্পোরেট বস তার অধীনস্থ কর্মচারীকে হেনস্তা করছিল। ছেলেটা সারাবছর কাজ সেরে বৎসরান্তে বসের কাছে যেত প্রোমোশনের প্রত্যাশী হয়ে। আর তখনই হাসিমুখে বস বলতেন, - অসাধারণ কাজ করেছ, কিন্তু অন্যেরা তোমার চেয়ে আরও ভাল করেছে। এই বছরটা থেকে যাও, পরের বার নিশ্চয়ই ভাল হবে, মন দিয়ে কাজ করো। ততোধিক উদ্যমে কাজ করত ছেলেটা। কিন্তু বছর শেষে আবার সেই এক গল্প। আমার ক্ষেত্রেও অঘোরীবাবা যদি এমনটা করেন... ২ দুদিন ধরে শ্মশানঘাটের আশেপাশে ঘুরছিলাম। অনেক মৃতদেহই আসে, কিন্তু কোনটা মনোমত হয়না, কোনটা আবার পছন্দ হলেও সুযোগ পাইনা। কিন্তু এবার বোধহয় সুযোগ এল। একটা ছোট ট্রাকে করে দশ বারোজন এল। কিন্তু ওরা শ্মশানের দিকটায় না গিয়ে একটু দূরে ফাঁকা জায়গায় এল। হয়ত বিনা পয়সায় শবদাহ করে পালানোর ইচ্ছায়। আমিও মোটামুটি দুরত্বে থেকে ওদের দেখতে লাগলাম। সকলে একসঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে একটা মৃতদেহকে নামিয়ে আনল। ওদেরই মধ্যে একজন বেশ কয়েকটা পতাকা হাতে নিয়ে নেমে এল। কয়েকটার রঙ হলুদ, কয়েকটার আবার গোলাপি। সে এসে পতাকাগুলো বিতরণ করে দিল সবার মাঝে। এরপরে যে রঙ্গ দেখতে পেলাম তা আগে কখনও ভাবতেই পারিনি। মানুষ এভাবেও ভাবতে পারে! মুহূর্তের জন্য ভূলে গেলাম আমি কে, কোথা থেকে এসেছি কিংবা আমার জীবনে কী দুঃখ কষ্ট। বিভোর হয়ে দেখতে থাকি ওদের রঙ্গ। বিবস্ত্র মৃতদেহকে কাঠের চিতা সাজিয়ে তার উপর রাখা হল। যাদের হাতে হলুদ পতাকা তারা একদিকে সরে গেল, যাদের হাতে গোলাপি তারা অন্যদিকে।এবার পতাকাবাহী ছেলেটি গাড়ি থেকে বের করে আনল ক্যামেরা। প্রথমেই ক্যামেরা তাক করা হল গোলাপি বাহিনীর দিকে। মৃতদেহকে সামনে রেখে রেকর্ডিং শুরু হল। একজন শুরু করল স্লোগান, - হলুদ তাড়াতে লাগবে জোলাপ। অন্যেরা ধ্বনি তুলল, - গোলাপ চাই গোলাপ। আবার, - হলুদ তাড়াতে লাগবে জোলাপ - ভোট ফর গোলাপ ভোট ফর গোলাপ। এরপর গোলাপি দলের ওই কর্মীটির মৃত্যু যে হলুদ দলের হাতে হয়েছে তার বিবরণ দিলেন বক্তাগণ, এবং তা রেকর্ড করা হল। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এদিকের রেকর্ড হওয়ার পর সেই একই ধরণের বিবরণ রেকর্ড করা হল হলুদ পতাকাবাহী দলের পক্ষে এবং গোলাপীর বিপক্ষে। কিছুটা অনুমান করতে পারলাম, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে কিভাবে একই জিনিস অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়। হলুদ দলের স্লোগান ছিল, - আমরা নইকো কাঁচা মোটেও - অভিজ্ঞতায় হলুদ। - জনগণের পাশে আছি - ভোট ফর হলুদ। না, এবার আমাকে মাঠে নামতে হবে। কাজটা হাসিল করতে গেলে প্রথমেই ওদের ক্যামেরাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া দরকার। ক্যামেরা বন্ধ হল দু-দলের ভাষণ শেষে। দু-দলই ক্লান্ত হয়ে বসে বিড়ি ধরিয়েছে। এবার কিভাবে সৎকার করা হবে, কে জ্বালাবে আগুন, তারই আলোচনা চলছে। একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে, - কিরে মড়া নিয়ে রাজনীতি করছিস? তোদের একটাকেও আমি ছাড়বনা। একটু চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। দেখতে পেলে আমার চামড়া তুলে নেবে এই ভেবে যতটা সম্ভব আরও আড়ালে চলে এলাম আমি। লাল শাড়িটা ভাল করে টেনে বাঁধলাম। দোকান থেকে ভাড়া করে আনা জটাটা জড়িয়ে বেশ যোগিনীর বেশ ধারণ করে আর একবার চিৎকার করে উঠলাম, সম্পূর্ণ মহিলাকণ্ঠে, - তোদের সবকটাকেই শেষ করব আমি, বাঁচতে চাস তো পালা। একসময় পাড়ার যাত্রাদলে শূর্পনখার পাঠ করে কাঁপিয়ে দিতাম। এখন অবশ্য কাজের চাপে সেসব করা হয়ে ওঠেনা। তবুও গলার সেই জোরটা রয়ে গেছে। সবাই ভয়ে গাড়িতে উঠে বসল। এবার আমি আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলাম হাতে ত্রিশূল নিয়ে আর বেপরোয়া চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে। মুখে ততক্ষণে মেখে নিয়েছি আশেপাশের পড়ে থাকা সাদা ছাই। আজ দারিদ্রের বিরুদ্ধে আমার মরণ-বাঁচন লড়াই। এ লড়াইয়ে মরতে হলে মরব, কিন্তু হার মেনে নেওয়া চলবেনা। অঘোরীবাবার আশীর্বাদ আমার সঙ্গে ছিল হয়ত। একটু ত্রিশূল বাগিয়ে তাড়া করতেই প্রচণ্ড বেগে গাড়ি চালিয়ে রওনা দিল ওরা, পালিয়ে গেল বলাই ভাল। পড়ে রইল কয়েকটা পতাকা, আর সেই শবদেহ। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। অজান্তেই বেরিয়ে আসতে লাগল কবিতা, চোখ থেকে দুফোঁটা জলের ধারাও নেমে এল। ওদের কথা শুনে বুঝেছিলাম, এটা রাজনৈতিক হত্যা। কোন দলের মেয়েটি এবং কারা হত্যা করেছে তা বোঝা না গেলেও এটুকু বোঝা গিয়েছিল যে ঘাড়ের কাছে লাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাতের ফলেই এই মৃত্যু। এ বিষয়ে খুব একটা ধারণা না থাকলেও মনে হল, খুব কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে, তাই আতঙ্কের চিহ্নমাত্রও নেই তার চোখেমুখে, বরং রয়েছে অনন্ত প্রশান্তি। আশেপাশে ভাল করে দেখে নিলাম। নাঃ, ওদের ফিরে আসার আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। জটাটা খুলে নিলাম। পরনে জামা প্যান্ট ছিল, তাই শাড়িটা বের করে জড়িয়ে দিলাম মেয়েটির গায়। দেহটি কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটা দিলাম অঘোরীবাবার আশ্রয়ের দিকে। ৩ উনি খুব করে বলে দিয়েছিলেন ওনাকে এসেই ডাক না দিতে। হয়ত বিভিন্ন ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকেন সেই ভেবে আমিও আর বিরক্ত করলাম না। বাঁশের বেড়া দেওয়া খড়ের ঘরটির পাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। তার উপরে শুকনো পাতার ইতস্তত আস্তরণ। সেখানেই শবদেহটিকে শুইয়ে দিয়ে বসে পড়লাম। মিনিট দশ কি পনের হবে, একটু চোখ লেগে এসেছিল। শুকনো পাতার মর্মরধ্বনিতে চোখ খুলে গেল। অনেক মৃতদেহ দেখে দেখে আমার স্নায়ু এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। এসবে আর ভয় লাগেনা। কিন্তু যে দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল তাতে আমার হৃদযন্ত্রের উপর আর কোনও নিয়ন্ত্রণ রইল না। শরীরে উপর থেকে কাপড় সরিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র সেই মৃতদেহ উঠে বসল আমার সামনে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। একবারের জন্য হৃদয়ের গোপন কোণে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল বটে, হয়ত আমার মন থেকে উৎসর্গ করা প্রেমের প্রবল টানে মেয়েটি ফিরে এসেছে। পরক্ষণেই প্রচণ্ড ভয় এসে গ্রাস করল আমাকে। দুটো চোখেরই একপাশ থেকে অন্যপাশে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ, যেন কালচে লাল রঙ দোয়াত থেকে ছিটকে এসে পড়েছে সে চোখে। হাত পা কাঁপছে। হৃদযন্ত্রটা বুকের খাঁচা থেকে খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে। অনেক চেষ্টায়ও তাকে দমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। এটাই কি তবে মৃত্যুর যন্ত্রণা, নাকি আরও কিছু... আমাকে বাঁচতেই হবে। মনে জোর এনে উঠে দাঁড়ালাম। পিছনে ফাঁকা মাঠ, আর সামনে মেয়েটির পিছনে অঘোরবাবার ঘর। অঘোরবাবার কাছে পৌঁছতেই হবে। পাশ কাটিয়ে দৌড়ে ঢুকে গেলাম সে ঘরে, কিন্তু একি... তাঁর নিথর শরীরটা পড়ে আছে মাটিতে, আর সে শরীরের রক্তমাংস দিয়ে বনভোজন সারছে পিঁপড়ের দল। দৌঁড়ে বাইরে বেরোতে যাব, দেখি সেই শরীর, দরজা ঘিরে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর বোধহয় এ জীবনটা রইল না। জ্ঞান হারিয়েছিলাম কতক্ষণ জানিনা। অনেকটা রাত হয়েছে বুঝতে পারলাম। চোখ খুলল জলের ঝাপটায়। কিন্তু চোখ খুলেই দেখি সেই মেয়েটির মুখ, অপার স্নেহভরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। - না না বেটা, ভয় পাস না। আমিই অঘোরী কমলানাথ। অবাক হলেও নিজেকে সামলে নিলাম। কথা বলার ধরণ, নিঃসঙ্কোচ চোখের দৃষ্টি সেই এক, শুধু দেহটা আলাদা, আর নারীকণ্ঠ। - কিন্তু কিভাবে... আপনাকে তো দেখলাম ভিতরে। - ওটা আমার দেহ ছিল মাত্র। অনেক দিন ধরে বুঝতে পারছিলাম এ শরীর আর বেশিদিন টিকবেনা। কিন্তু সূক্ষ্মশরীরটার আরও প্রায় চারশ বছর আয়ু আছে। ততদিন স্বর্গে গিয়ে আরও উর্ধ্বলোকে যাওয়ার জন্য ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে এ জগতের জন্য কিছু করে যাই ভাবলাম। তাই তোকে এই কাজটা করতে বলা। বুঝতে পারলামনা নারীদেহ ধারণ করার পরও তিনি অঘোরীবাবা-ই থাকবেন নাকি কমলা মা বলে ডাকতে হবে ওনাকে। - কমলা তো ঘরে থাকে, আমি কমলানাথ নাম কিকরে নিয়েছি ভাবছিস তো? আসলে তন্ত্র সধনায়ও আমাদের লক্ষ্মীদেবীর পুজো করতে হয়। সে লক্ষ্মীদেবীর রূপ আলাদা, আরাধনাও। তাছাড়াও অনেকগুলো নাম নিতে হয়েছে আমাকে এক এক সময়ে। মনে ভাবলাম, ওনার তাহলে অনুমান করার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। আমার কাজ আদৌ হবে তো? মুখে বললাম, - কিন্তু একবার দেহ ত্যাগ করলে কি আর অন্য দেহ ধারণ করা যায়? এ তো ভগবানের ইচ্ছাবিরুদ্ধ কাজ! - ভগবানের একটা নিয়ম থাকে, সেটাকে প্রশ্ন করতে পারে একমাত্র সেই মানুষ যে পরোপকারী, নিঃস্বার্থ অথবা ফকির। ফকির ব্রহ্মা কা রেখ পর মেখ মারতা হ্যায়। আর আজ আমি জন্ম থেকে বয়ে আনা দেহটাকেও ত্যাগ করেছি। এ জগতে আর নিজের বলতে কিছুই রইল না। এখন যা। সপ্তাহখানেক পরে আবার আসিস। এই দেহটাকে আমাকে বুঝে নিতে হবে, শুদ্ধ করতে হবে, অনেক কাজ। কৃষ্ণা অষ্টমীর চাঁদ তখন নদীর ওপারে ঢলে পড়েছে, রওনা দিলাম ঘরের দিকে। ৪ সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফিরলাম। রবিবারের রাত। সপ্তাহে একদিন বাড়ির খাবার পাই, অসাধারণ লাগে তার স্বাদ। সহজলভ্য হলে যত ভালো জিনিসই হোক, একঘেয়ে লাগবেই। কিন্তু এখন, হয়ত ছয়দিনের ব্যবধানে খেতে পাই বলেই, এই রান্না আমার কাছে অমৃত। তেমন কিছুই না, সামান্য মসুর ডাল আলুপোস্ত আর ভাত। খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেকুর উঠল। ঢেকুর উঠলে তবেই না খাওয়া শেষ। কিন্তু এরপর আর একটা জিনিস বাকী ছিল, এক গ্লাস গরম দুধ। সেটা খেয়ে বেশ খানিকটা ঘুম ঘুম ভাব এল। নীলাও ক্লান্ত। একা বাড়িতে সবদিক সামলানো, ছেলেকে তৈরী করে স্কুলে পাঠানো, বাড়ির দেখভাল করা, গোরু দুটোর যত্ন নেওয়া এইসব করতে করতে আমাদের ভালোবাসা কখন যে শুধুমাত্র জীবনযাপন-এ পরিণত হয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ছেলে ঘুমিয়েছে অনেকক্ষন। - কইগো, অনেক রাত হল। আমি ঘুমোতে চললাম। ঘুমোতে ডাক দিয়ে নীলা মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ল। গরম বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মশাও। বাড়িতে এলে ঘুমোতে ইচ্ছা করে না। মনেহয়, যেটুকু সময় এখানে আছি, বেঁচে আছি। তাই ঘুমিয়ে সময়কে নিজের হাতে খুন করে ফেলতে পারিনা। কিন্তু শরীর তো, তার ক্লান্তি আছে, খিদে আছে, আছে আত্মিক চাহিদা, আছে ঘুম। বারান্দায় অনেকক্ষণ বসে থেকে মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে শোবার ঘরের দিকে রওনা দিলাম। খাটের একপাশে রিজু আর মাঝখানে নীলা শুয়ে আছে। রিজু আমার ছেলে, সবে স্কুলের পড়াশোনা শুরু করেছে। সরকারি স্কুল বলে তাও খরচটা এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। যত বড় হবে প্রাইভেট টিউশনের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হবে। নীলাকে একটু মাঝের দিকে ঠেলে দিয়ে জানান দিলাম আমি এসেছি। কোনও হেলদোল দেখাল না সে। তখনই আমার সন্দেহ গভীর হল সে জেগে আছে। হয়ত অভিমানে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। একরকম জোর করেই মুখটা ঘুরিয়ে নিলাম আমার দিকে। মুখে তার একরাশ অভিমান। তবে কি ও কিছু টের পেয়েছে? অসম্ভব নয়, অন্ততঃ সেদিনের গঙ্গাপাড়ের ওই ঘটনার পর আর কোন কিছুতেই আশ্চর্য লাগেনা আমার। মেয়েরা নাকি অনেক কিছু আগে থেকে টের পায়, আর মহিলাঘটিত কিছু হলে তো কথাই নেই। চোখের কোণে তার দুফোঁটা জলের ধারা। বুঝলাম, এ অভিমানই বটে। কপালে এঁকে দিলাম ভালোবাসার চুম্বন। ****************************** ভালোবাসার সুতীব্র আক্রমণে ভেঙে গেছে অভিমানের বাঁধ। আমার অবস্থা তখন যুদ্ধজয়ী আলেকজাণ্ডারের মত। চোখের জল, ভবিষ্যতের চিন্তা - সবকিছুকে আজ ছুটি দিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। জিরো পাওয়ারের নীল বাল্বটা জ্বলছে। নীলা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ। ছেলেটাও অঘোর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু আমার মনের নির্জন প্রান্তে কিসের যেন চিন্তা লেগে আছে। সে চিন্তা থেকে মুক্তির কোনও উপায়ই আমার জানা নেই। অন্ধকারটা ততক্ষণে চোখ সয়ে গেছে। এখন পুরো ঘরটা অনেকখানি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি নীলার অভিমানী মুখ প্রাপ্তির আনন্দে পূর্ণ। মশারীর বাইরে তৃষ্ণার্ত মশার দলের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। আমারও মায়া বেড়ে যায়, হাতটা বাড়িয়ে দিই মশারীর দিকে। একটু রক্ত খেয়ে ওরা যদি বেঁচে থাকে। নিজের আজব খেয়ালে নিজেই অবাক হলাম, কিন্তু হাত বাড়িয়ে দিলাম মশারির দিকে। ঠিক তখনই, আবার নীলার দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। একি! এ যে অবিকল সেই মৃতা রমণীর মুখ, চোখের একপাশ থেকে অন্য দিকে জমাট বেঁধে যাওয়া রক্তের ছিটে, যেন কোন শিল্পী অবহেলার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে তার প্রিয় চিত্রের উপর। তীক্ষ্ণ সে চোখের দৃষ্টি সরাসরি আমার দিকে। প্রথম দর্শনে অঘোরী কমলানাথকেও একরকম ভয়ঙ্করভাবে তাকাতে দেখিনি। তবে কি সে এসেছে? এ কি কমলানাথ, নাকি কমলানাথের বর্তমান দেহের প্রয়াত মালকিন? আমার চোখ দুটো চুম্বকের মত আটকে আছে তার চোখের দিকে। চিৎকার করতে গিয়ে গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোয় না। তার দুটো হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আমার দিকে। আজই কি তবে শেষ রজনী? আজই কি তবে শেষ... গলাটা চেপে ধরার আগেই এক ঝটকায় সরিয়ে দিলাম সেই হাতদুটো। টাল সামলাতে না পেরে মশারিসুদ্ধ পড়ে গেলাম খাটের নিচে। সেইসঙ্গে হুড়মুড় করে খুলে গেল খাটের সঙ্গে লাগানো মশারী টাঙানোর কাঠগুলো। - কি হয়েছে? কি হয়েছে? চিৎকার করে উঠল নীলা। কেঁদে উঠল রিজু। ছেলেকে ভোলানোর চেষ্টা করতে করতেই সে দেখতে পেল আমাকে মশারী গুটিয়ে পড়ে থাকতে। বিশদে বললে আরও ভয় পেয়ে যাবে এই ভেবে আর কিছুই বললাম না। আবার মশারি টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই মিলে। একটু হাসির পাত্রও হলাম বৈকি নীলার কাছে। সে রাত্রে আর তেমন কিছু ঘটল না। ৫ ভোরে উঠে রওনা দিলাম শহরের দিকে। আনমনা ছিলাম, তাই ভুল করে ট্রেনের ভেন্ডর কামরায় উঠে পড়েছিলাম। ছানার জলের পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল। পরের স্টেশনে বদলে নিলাম কামরা। একটাও সিট নেই। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের একপাশে চারজন দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক কায়দা করে কনুইয়ের উপরে রুমালের খুঁট বেধে নিয়ে শুরু করেছে তাসের আসর। ভালই জমে উঠেছে সে খেলা। ভিড় থেকে বাঁচাতে ব্যাগটা হাতে নিলাম। ঠিক তখনই পায়ের উপর ঈষদুষ্ণ তরলের মত কি যেন একটা পড়ল। ভিড় আলতো করে ঠেলে পায়ের দিকে তাকাতেই দেখি লাল রঙের পিক, কেউ গুটখা বা পান চিবিয়ে ভিড়ের মাঝে ছেড়ে দিয়েছে। নাঃ, দিনটা সত্যিই খারাপ যাচ্ছে। এরই মাঝে খাওয়াদাওয়ার প্রাচুর্য অতুলনীয়। ভিড় ঠেলে ঠেলে ঝাঁকা মাথায় হকাররা বজায় রেখে চলেছে তাদের বিক্রী। প্লাস্টিক হোক বা কাগজের ঠোঙা, সবারই ব্যবহারের পর জায়গা হচ্ছে তাদেরই পায়ের নিচে কিংবা চেয়ারের তলায়। কি নেই সেখানে, রয়েছে কমলালেবুর খোসা, ডিমের কুসুমের অংশ, বিড়ির টুকরো, মুড়ি, পাঁপড়ের গুঁড়ো, খৈনীর প্যাকেট এরকমই আরও অনেক কিছু। ট্রেনের দেওয়ালে আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষ, তন্ত্র, বশীকরণ, সুলভে এলাকার বন্ধু বা বান্ধবীর সন্ধান এমনই অতি প্রয়োজনীয় সব পোস্টার। এরকমই আরও অনেক দুর্ভোগের পর সময় করে মালিকের বাড়ি পৌঁছলাম। কলিং বেল। দেখে কেমন ভয় ভয় করে। মনে হয় যেন স্বপ্নের জগতে পৌঁছে গেছি। ভক্তিভরে সুইচটা টিপে দিলাম। দোতলার বারান্দায় গ্রিলের ফাঁক গলে একটা থলি নেমে এল। বেশ সুন্দর একটা হাত, মালকিনের। হয়ত পর্দার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখছে। মাথা নামিয়ে নিলাম। তাকাতে সাহস হয়না। থলি থেকে চাবিটা নিয়ে কাঁধের ব্যাগ থেকে ঘিয়ের শিশিটা বের করে থলিতে রাখলাম। পাঁচু ঘোষের খাঁটি মোষের দুধ থেকে তৈরী ঘি। এনারা খুবই পছন্দ করেন। মালিকের কাছে পরে অবশ্য দামটা নিয়ে নেব। সপ্তাহের শুরুতে অনেক কাস্টমার। সেসব সেরে ঘরে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। মালিকেরই দেওয়া একটা ছোট্ট ঘর। আর এক কর্মচারী কেশব থাকে পাশের ঘরে। দুটো ঘরের মধ্যে একটা লাগোয়া দরজা আছে। ঘরটায় যেদিন আমাদের থাকতে দিয়েছিলেন মালিক, আমাদের বলেছিলেন, - ছোটবেলায় আমরা এই বাড়িটায় থাকতাম। এখনও ওই মাচায় ছোটবেলার অনেক কিছু আছে। এক একটা জিনিস এক-একটা স্মৃতি। - সে তো নিশ্চয়ই। এই বাড়িটা তো অনেক দিনের পুরনো মনে হয়। আমি আগ্রহ সহকারে বললাম। - হ্যাঁ, আমার দাদু বানিয়েছিলেন। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখবে যে পরপর প্রতিটা প্রজন্ম কিন্তু বাড়ি বানায়না, বানাতে পারেনা। একজন বানালে তার পরের প্রজন্ম সেটা ভোগ করে, তার পরের প্রজন্ম আবার বাড়ি বানায়। খেয়াল করে দেখলাম, আমার বাবা বাড়ি বানাতে পারেননি, তারমানে আমার কাছে একটা সুযোগ নিশ্চয়ই আছে। এইসব চিন্তা মাথায় আসতেই অঘোরবাবার মৃত মুখটা ভেসে উঠল স্মৃতিতে। বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠল। এখন তো আর তাঁকে দেখতে পাবনা, এখন তার স্মৃতি সম্বল আত্মাটা ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্য কারও শরীর বয়ে নিয়ে। আজ আর বাইরে খাওয়া নয়। শরীরের যত্ন নেওয়া উচিৎ, সেই সঙ্গে পকেটেরও।ঘরেই রেঁধে খেয়ে নিলাম। বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমও এসে গেল। কানের কাছে একটা ফিসিফিসানির শব্দ। দেওয়ালের রেডিয়াম ঘড়িটা জ্বলজ্বল করে জানান দিচ্ছে দুটো দশ। কালও তো এরকম সময়েই ঘটনাটা ঘটেছিল না? শিড়দাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল অজানা আশঙ্কায়। ফিসফিস শব্দটা মশারির উপরের দিক থেকে আসছে আন্দাজ করে টর্চটা জ্বালালাম। কিন্তু ওটা কি? কাল রাত্রে যা দেখেছিলাম তার থেকে অনেক অনেক ভয়ঙ্কর। জ্বলজ্বল করছে তার দুটো চোখ। চোখের তীব্র চাহনিতে গিলে ফেলতে চাইছে আমাকে। সেইসঙ্গে মশারির উপরে এক প্রান্ত থেকে আর প্রান্তে ভেসে বেড়াচ্ছে। যেটুকু করুণা বেঁচে ছিল মেয়েটির প্রতি, তা আর রইলনা। তার বদলে চেপে বসল তীব্র ভয়। ভয় পেলে চলবেনা। দাঁতে দাঁত চেপে লাইটটা জ্বেলে রইলাম আর ঘোরাতে লাগলাম তার গতি লক্ষ্য করে। মিনিট দুই পরেই সেই উড়ন্ত মুর্তি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লাইটের তেজ সহ্য করতে পারেনি ভেবে একটু খুশীই হলাম। ****************************** তবে কিছু একটা যে হচ্ছে এবার ভালই বুঝতে পারছি। আগের রাতের অভিজ্ঞতায় ততটা নিশ্চিত না হলেও, আজকের এই ঘটনাটাকেও তুচ্ছ মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে পারলাম না। সারাদিন কাজ করতে করতেও একটা খটকা রয়েই গেল। কিন্তু সপ্তাহখানেক না হলে অঘোরবাবার কাছে যেতেও মন চাইল না। উনি বলেছেন, - আমাতে বিশ্বাস রাখ। ৬ পরের রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের রাত। সেই একই সময়, রাত দুটো দশ। ফিসফিসানি নয়, এবার আর্তনাদ, - কেন করলি? আমি তোর কি ক্ষতি করেছিলাম? এই একই কথা বারংবার বলে যেতে লাগল সেই উড়ন্ত বায়বীয় মূর্তি। আমি কি করেছি তার একটা আন্দাজ অবশ্য আছে। তাও সাহস করে বললাম, - কি চাও তুমি? আমার সমস্ত চেতনায় কাঁপুনি ধরিয়ে প্রচণ্ড চিৎকারে সে বলে উঠল, - তোকে, তুই আমার শরীর নিয়েছিস। তোর শরীর চাই আমি। মরিয়া হয়ে মশারি থেকে বেরিয়ে পরলাম আমি। খাটের নিচে হাতড়ে খুঁজে পেলাম একটা ঝাঁটা। সেটাই ঘোরাতে শুরু করলাম চারিদিকে। আমি কি এবার পাগল হয়ে যাব! নাকি হয়ে গেছি। ওই ভয়ংকরী প্রেত ঘুরঘুর করতে লাগল আমার চারিদিকে। সুযোগ বুঝে কি তবে আক্রমণ করে বসবে আমাকে? নাকি ভয়ের চোটেই আমার মৃত্যু হবে? আমার দেহটা হয়ত ভোগ করবে ওই প্রেত। আমার দিকে এগিয়ে আসতে গেলে বারবার ঝাঁটার আঘাতে তাকে সরিয়ে দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সেটাও আর কাজ করল না। সেই মায়াবী চোখ তীব্র, ভয়ঙ্করের রূপ নিয়ে গ্রাস করতে এল আমাকে। ঠিক সেই সময় দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা। বাঁচার শেষ আশা দেখে লাফিয়ে গিয়ে পড়লাম দরজার উপর। মুখে লাগল প্রচণ্ড একটা ধাক্কা। সেসব অগ্রাহ্য করে দরজাটা খুলে দিতেই একটা ত্রিশূল শাঁই করে আমার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সেই বায়বীয় মূর্তিসমেত অন্যপ্রান্তের দেওয়ালে গেঁথে গেল। মূর্তি অদৃশ্য হল। - তাড়াতাড়ি। খুব কম সময় আছে হাতে। ওটাকে কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় করে রেখেছি। - ক্কী? কী করতে হবে আমাকে? হতচকিত হয়ে প্রশ্ন করে বসলাম। - মাছ কাটার ছুরি... তখন আমার কিচ্ছু ভাবতে ইচ্ছা করছেনা। স্টোভের পাশ থেকে মাছ কাটার ছুঁড়িটা এনে দিলাম। কিচ্ছু বোঝার আগেই উনি নিজের ডান হাতের কড়ি আঙুলটা কেটে ফেললেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লেও মুখে দেখলাম না কোনও বেদনার ছাপ। - স্টোভটা জ্বাল। মনে অনেক প্রশ্ন এলেও সেদিনের সেই এক কথায় উনি আমাকে দমিয়ে রেখেছেন, - আমাতে বিশ্বাস রাখ। তিনি বললেন, - একটু কেরোসিন। এতক্ষণ পরে মনে পরতে ঘরের লাইটটা জ্বালালাম। ওনার চলনে-কথায় সেই অঘোরী কমলানাথের ছাপ, শরীরে-পোষাকে তিনি অনেকটাই কমলানাথে পরিণত হয়েছেন লক্ষ্য করলাম। শুধু ... - কিরে এত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখার কি আছে? এখনও এই শরীরটাকে ভুলতে পারিসনি না? নিবি নাকি এটাকে? ছিঃ! মরার সময় পর্যন্ত তোদের কাণ্ডজ্ঞান হবেনা রে? একটু লজ্জা পেলাম। নিজের প্রতি ঘেন্নাও হল বৈকি একটু। ঘরে আলাদা করে কেরোসিন ছিলনা, তবুও স্টোভের তেল ভরার জায়গাটা খুলে খানিকটা কেরোসিন তাঁর উপদেশমত কাটা আঙুলটায় ঢেলে দিয়েই জ্বালিয়ে দিলাম লাইটারটা। জ্বলছে কাটা কড়ি আঙুলটা। - কি হচ্ছে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন? - হ্যাঁ তুই বলেই বলছি, আর কাউকে বলতামনা। মন দিয়ে শোন। মাটিতে বসে ছিলিমটা বাগিয়ে একটা প্রনাম সেরে নিলেন গুরুদেব। আমিও নিজের কর্তব্য সারলাম। হ্যাঁ, আমার জন্য যা করলেন তাতে এখন থেকে ওনাকে গুরুদেব বলেই ডাকব আমি। হোক না তাঁর শরীর আলাদা। মানুষের ভিতরটা কি আর শরীর দিয়ে বিচার করা যায়? তাই কমলানাথ কমলানাথই, কমলা মা নন। উনি শুরু করলেন, - মৃত্যুর পর কয়েকদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে সূক্ষ্মশরীর। তারপর তার ঘুম ভাঙে, একটু একটু করে সে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ঊর্ধ্বলোকে যাত্রার এটা প্রাথমিক পর্যায় বলতে পারিস। এই সময়ই, যাদের কামনা-বাসনা প্রকট, বা তীব্র প্রতিহিংসা যাদের তারা একটু একটু করে অধোগামী হয়ে পড়ে। এই মেয়েটির ক্ষেত্রে, ঠিক কি ঘটেছে তা হয়ত বলা সম্ভব নয় এই সদ্যপ্রস্ফুটিত সাধনমস্তিষ্ক নিয়ে। তবে এটুকু বলতে পারি, প্রথম খোলস ছাড়ার পরই সে দেখতে পায় তার শরীর অন্য কেউ ভোগ করছে। আমি জানতে পেরেছি বিগত কয়েকদিন ধরেই রাত্রে তোকে ভয় দেখাচ্ছে সে। ঠিক ওইসময়টাতেই ওর মৃত্যু হয়েছিল। অবশ্যই রাজনৈতিক হত্যা। মানুষ তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য কত কিছুই না করে। ততক্ষণে ত্রিশূলটা দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে, আঙুলটাও প্রায় পুড়ে শেষ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, - কিন্তু আঙুলটা পোড়ালেন কেন? ইস খেয়ালই হয়নি। দিন দিন ওষুধ লাগিয়ে দিই। - এসব আমাদের লাগেনা। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। আর কথা বাড়ালাম না। - একটা খুঁত না হলে ওই আত্মা সবসময় এই দেহের লোভে ঘুরঘুর করত। আর দাহকার্যের পর এখন সে শান্তিতে অমৃতলোকের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু এই খুঁত নিয়ে আমার কি আর সাধনা হবে... - নিশ্চয়ই হবে। শরীরে কি আসে যায়? - বাঃ বেটা, অনেক কিছু শিখে গেছিস এই কয়দিনে। আমি এখন আসি। আর শোন, তোর মাথায় সাক্ষাৎ সরস্বতীর হাত আছে। সরস্বতীকে তুষ্ট কর, মা কমলাও তার পরপরই ধরা দেবেন তোর কাছে। সকালে কেশবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, - কিরে রাত্রে কিছু টের পাসনি? - না ভাই, ট্যাব মেরেছিলাম খান দুয়েক। সুতরাং সেসব নিয়ে আর কথা বাড়াইনি তার সাথে। ************************************** নমস্কার বন্ধুরা। আমি আর. জে. ময়ূখ, আর আপনারা শুনছেন রেডিও ভাগীরথী। এতক্ষণ শুনলেন আমার জীবনের গল্প অকপটে। সেই রাত্রের পর থেকে আমি আমার গুরুদেবকে আর কোনওদিন খূঁজে পাইনি। কিন্তু তিনি দিয়ে গেছেন আপনাদের মত মন ভাল করে দেওয়া প্রিয় শ্রোতাদের। অনেকের কাছে সরস্বতীর মানে হয়ত অন্য অন্য হতে পারে, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম আমার গলার স্বরকে। তারপর থেকে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করি, আর আজ আমি আপনাদের এই স্টুডিওতে বসে গল্প শোনাচ্ছি। আজকের গল্প এই পর্যন্তই, আপনাদের জন্য রইল সন্নাসী রাজা সিনেমা থেকে এই গানটি। “কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ সংসারোহয়মতীববিচিত্রঃ। কস্য ত্বং বা কুতঃ আয়াতঃ তত্ত্বং চিন্তয় তদিদং ভাতঃ।। ...”

106

3

মনোজ ভট্টাচার্য

বন্গ্শ-লতিকা !

বংশ-লতিকা ! অনেকের বাড়িতে দেখেছি – তাদের দেওয়ালে একটা ফ্রেমের মধ্যে তাদের বংশ-লতিকা টাঙ্গানো আছে । কাঁচের ওপর যথেষ্ট ধুলোর আস্তরন ! – ভয় হয় – ফট করে যদি একটা মাকড়শা বেড়িয়ে আসে আর জিগ্যেস করে – আমি কার পিতা বলত ? - এটা বেশ একটা সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কের মতো ! অঙ্কের মতই তলা থেকে ওপরে যেতে হবে । সর্ব প্রথম আমি ও আমার বাবাকে খুঁজে বার করতে হবে ! আজকাল মায়েদের স্থান থাকলেও – আগে আগে মায়েদের খুব একটা প্রাধান্য দেওয়া হত না ! সাধারনত একটা ফ্রেমেই বংশ-লতিকাটা করার চেষ্টা হয় ! সেটার লেখাগুলো এত অপরিস্কার ও ছোট হয় – যে প্রায় পড়াই যায় না ! হয়ত এসব পড়ার জন্যে নয় – শুধু দেখানর জন্যে ! কারন একটা ফ্রেম দেখেছিলাম মধ্যিখানে ফাটা ! আবার এক জায়গায় দেখি – পর পর পাশাপাশি তিনটে ফ্রেমে বাঁধানো ! তিনটে ফ্রেম মানে যে কত পুরুষের – তা জানি না ! বংশ-লতিকা মানে বংশ পরম্পরা – মানে সোজা কথায় আমি কোথা হইতে আসিয়াছি – তার প্রমান ! বা বংশ মর্যাদা ! আমার বাবা কে ছিলেন ! পিতামহ কে ? প্রপিতামহ অতি বৃদ্ধ পিতামহ ইত্যাদি ইত্যাদি ! অবশ্যই একজন সজ্জন কেওকেটা ছিলেন ! – এ পর্যন্ত কোন চার্টে দেখিনি – কারুর বাবা চোর জোচ্চোর ডাকাত কিছু ছিলেন ! আমি যদিও বাল্মিকি হইতে আসিয়াছি – কিন্তু রত্নাকরের সংগে কোন সংস্রব নাই ! একবার কি কৌতূহলে – এক উপাধির ইতিহাস দেখতে গিয়ে দেখি – তারা নাকি জলদস্যুর জাত ! সে আবার কি ! তারা কি সপরিবারে জলে ডাকাতি করত নাকি! না তাদের পেশা ছিল জলে ডাকাতি করা ! –এটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। কারন তাদের সাহস । একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকোয় কজন লোক রাত্তিরে তীব্রগতিতে এগিয়ে আসছে – একটা বজরার লোকেদের লুঠপাট করার জন্যে ! দেবি চৌধুরানী ! আবার এ তো অনেকেরই জানা – আগেকার জমিদাররা প্রথম জীবনে ডাকাত ছিল । দস্তুর মত ডাকাতে কালীর পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে যেত ! – পরে টাকা-কড়ি নিয়ে জমি জমা কিনে জমিদারী করছে ! পরে তারা খুবই বনেদী পরিবার বলে খ্যাত হয়েছে ! এই প্রসঙ্গে আবার ট্রেজার আইল্যান্ড মনে পড়ে যায় ! আরে লিখতে চাইছি – বংশ-লতিকা , চলে গেলাম ডাকাতি করতে ! তা আগেকার লোকেদের একটা প্রবনতা ছিল – নিজেদের একটা বংশ-তালিকা তৈরি করার ! এটা যথেষ্ট শ্রম-সাধ্য প্রয়াস । কিছু লোকের হয়ত উদ্বৃত্ত কিছু সময়ের সদ্ব্যবহার হত । তবে বেশির ভাগ লোকেরই এখন চোখের জলে নাকের জলে অবস্থা ! কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম ! কোনোক্রমে নিজের প্রপিতামহের নামটাই মনে করতে পারি । - অথচ আশ্চর্য – মুঘলদের পুরো বংশ এখনো মনে আছে ! রিটায়ার করার পর - আমার বড় সম্বন্ধির মাথায় চাপল – তাদেরও একটা বংশ-লতিকা বানায় ! তা সবচেয়ে সোজা পিতামহের নাম পর্যন্ত তৈরি করা গেল ! কারন ইতিমধ্যে সমসাময়িক সব ওপরে চলে গেছে ! এমনকি অপরদিকে স্বনামধন্য এমন কাউকে পাওয়া গেল না – যাকে ভিত্তি-পুরুষ বলা যেতে পারে ! যেমন একজনের ভিত্তি-পুরুষ হল বশিষ্ঠ ! এটা একটা জবরদস্ত ভিত্তি ! সেরকম কিছু না পেয়ে অগত্যা সম্বন্ধিকে মাঝপথেই ক্ষমা দিতে হল ! একজনের অফিশে গিয়ে দেখি – একটা ঐরকম ছবি । এত ছোট লেখা যে পড়াই যায় না । তার একটা ছবি তুলে এনে বড় করে দেখি – ওরে বাবা ! কে নেই সেই চার্টে – মন্ত্রী থেকে নামকরা এক গুন্ডা ! বেশির ভাগই আইনজীবী ! ও যথেষ্ট নামকরা ! – তারাও হয়ত গুন্ডা আত্মিয়দের স্বীকার করে না ! ও, আচমকাই মনে পড়ে গেল – কিছুদিন আগে হঠাৎ জহরলাল নেহরুর বংশ তালিকা দেখতে গিয়ে চমকে গেছি । ওপরে চার পুরুষ পর্যন্ত তো ঠিক-ঠাক ! তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেল ! সেটা সিপাহি বিদ্রোহ দমনের পরবর্তী সময়ের কথা ! ব্যস ! আমার বংশ-লতিকা লেখার কথা মাথায় উঠল ! মনোজ

117

4

মনোজ ভট্টাচার্য

দীপঙ্কর পরিক্রমা !

দীপঙ্করবাবু ! বাংলা লাইভের চ্যাটরুমে চ্যাট করতাম বটে – কিন্তু অত দ্রুত টাইপ করতে পারতাম না । তাই চ্যাটরুম আমার পছন্দ ছিল না ! তবে শুনেছি – দীপঙ্করবাবু ওখানে অনেক চ্যাট-ফ্রেন্ড করেছিলেন ও খুব চ্যাট করতেন । - আমার সঙ্গে খুব ই-মেলিং করতেন । এই মজলিশ থেকেই ও ই-মেল থেকেই আমাদের সখ্যতা তৈরি হল ! – কেউ কারুকে চিনতামও না ! টাইম স্কোয়ারের প্রায় শেষ গেটের এস্কেলেটরে দিয়ে উঠে আসতে দেখেই ঠিক চিনতে পারলাম । সেই কিন্তু প্রথম দেখলাম । উনি এলেন নিউ জার্সি থেকে । আমি এলাম কুইন্স থেকে । তারপর ম্যানহাটানের সেন্ট্রাল পার্ক ঘুরতে ঘুরতে – একেবারে দম হয়ে বিকেলে আবার টাইম স্কোয়ারে ফেরত । - ছবি আমরা দুজানেই তুলেছিলাম । তবে ওনার হল প্রফেশানাল হাত আর ক্যামেরা ! এটা হুল ২০১৪ ঘটনা । এরপর একদিন হাডসন নদী পেরিয়ে গেলাম নিউ পোর্ট – ওনার ছেলের বাড়ি । সেখানে আবার নিনা ও অমিতবাবু এলেন , উনি ও দিব্যকল্যান - সেটা বেশ ভালই মিনি-মজলিশ হল ! পরে আরও একদিন ম্যানহাটান । সেদিন অনেক কিছু দেখা হল ! উনি আমেরিকান স্থাপত্য দেখে একেবারে বিমোহিত ! তারপর তো কলকাতায় । কতবার যে একাডেমী অঞ্চলে আসা । সোমাদের প্রদর্শনীতে যাওয়া ! অনেকবার সুদীপবাবুও এসেছেন । এরই মাঝে ডালহৌসির লাইমলাইট রেস্টুরেন্টে অনেকবার দুপুরে খাওয়া ! লাইমলাইট রেস্টুরেন্টে আমার স্ত্রীর পুরনো বন্ধুরা এসে মিলত । খাওয়া দাওয়া – হিহি-হাহা-হোহো – তারপর যে যার বাড়িফেরা । - যতদূর মনে পড়ে – এখানেই দীপঙ্করবাবু বার দুয়েক এসেছিলেন । হঠাৎ আমরা বকখালি গেলাম – আমরা পাঁচজন মিলে – দীপঙ্করবাবুও ছিলেন । সেখানে রাত্তিরে উনি গান গাইলেন । - পরেরদিন সকালেই সূর্যোদয় – ক্যামেরাসহ ! আরেকবার গেলাম ডায়মন্ড হারবার - গাড়িতে । ফেরার সময়ে জোকার মান্দির । এই যে অজস্রবার এক সংগে যাওয়া আসা – এর মধ্যে দিয়েই তো আমরা কাছাকাছি আসতে পেরেছি ! উনি শুধু আমার নয় – আমাদের সঙ্গেই মিশে গেলেন ! এরই মধ্যে আমি বৃদ্ধাবাসের ব্যাপারে আমার নবলব্ধ অভিজ্ঞতাগুলো ওনার কাছে বলতাম । - এমন কি ওনার একা থাকার ব্যাপারে উদ্বেগ দেখিয়েছি -! স্বার্থপরের মতো সেই ধ্যাদ্ধেরে সোনারপুর থেকে উত্তর কলকাতায় চলে আসার জন্যে বলতামও ! সেটা যদিও সম্ভব হত না ! – উনি কিন্তু বৃদ্ধাবাস সম্বন্ধে খুব একটা পরিস্কার ছিলেন না । বরং বেশ সন্দিহান ছিলেন । আমাকেও সাবধান করেছিলেন ! – ও, আরও একটা কথা বলতেন – যা হবার – তা হবে - আমি ওসব নিয়ে ভাবি না ! কিছুদিন আগে দিনাজপুরে ওনার বাল্যকালের বন্ধু অরিন্দমবাবুর স্কুল থেকে ঘুরে আসার পর খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন । প্রায় ঠিকই করে ফেলেছিলেন – ওখানেই মাঝে মাঝে গিয়ে কাটাবেন । - তারই পর একবার ওনার বাড়ি সোনারপুরে গেছিলাম । মনে হয়েছিল – উনি মানসিকভাবে অস্থির ! – ওনার একটা সি ডি বেরুবার কথা চলছিল । খুব সম্ভবত বেরয় নি । এটা হয়ত একটা কারন হতে পারে । - যাই হোক, তারপর অনেকবার ভেবেছি – একবার যাই সোনারপুর ! সেটা আর হয়ে ওঠেনি ! হয় দুর্জয় গরম, নয় প্রচণ্ড বৃষ্টি ! – আর তার প্রয়োজনও নেই ! সোনারপুরের মিশনপল্লির মোড় আমার কাছে এখন অবান্তর ! অচেনা হলে আরও ভাল হত ! মনোজ

167

5

ইরা চৌধুরী

লেহ লাদাখ

লেহ-লাদাখ ভ্রমন ডায়েরি এক দিল্লী থেকে লেহ বিমানযোগে লাগে এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট ।ভোর পাঁচটায় দিল্লী থেকে রওয়ানা হয়ে যখন লেহ র ঘন কালো পাহাড় ঘেরা কুশক বাকুলা রিনপোছে বিমানবন্দরে নামলাম তখন আকাশ ভরা আলো ।বিমান থেকে নেমে মাটিতে পা রাখা মাত্র Public Address system এ ঘোষনা কানে এল ।সমুদ্রতল থেকে সাড়ে এগারো হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত লেহ অঞ্চলে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম হওয়ায় অনভ্যস্থ যাত্রীদের শ্বাস কষ্ট ছাড়াও অন্যান্য সম্ভাব্য শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে ।অতয়েব নিজেদের শরীরের প্রতি যাত্রীদের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে । সতর্কবার্তার মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেল অল্প ক্ষনের মধ্যেই – শুরু হল মাথার যন্ত্রণা । শুধু রক্ষে লেহ তে আমাদের প্রথম দিনে কোন কার্যক্রম ছিলনা ।বিমানবন্দর থেকে চমৎকার মসৃন পথে ধরে ভ্রমন সংস্থার গাড়িতে হোটেল লা সো তে ডেরা বাঁধার পর থেকে গোটা দিনটা বরাদ্দ ছিল আমাদের সম্পূর্ণ বিশ্রামের মধ্যে থেকে পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের “এক্লেমাটাইজ” করে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়ার জন্য । নতুন জায়গায় আসার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কিছুটা থিতিয়ে এলে মনে হল এ কোন দেশে এসে পড়লাম রে ভাই।কোথায় মনের সুখে ডানা মেলে উড়ে বেড়াব তা নয় ,শরীর একটা বোঝা হয়ে ঘাড়ে চেপে বসে আছে । দুই একদিন টানা বিশ্রামের পর একটু ধাতস্থ হবার পর শুরু হল আমাদের পথ চলা। উত্তরে দিগম্বর কারাকোরাম আর দক্ষিনে ঘন নীল হিমালয়ে ।এই দুই বিস্তৃত পর্বতমালার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌছে গেলাম তিব্বতী দ্রকপা সম্প্রদায়ের মনাস্ট্রী হেমিস গু্মফা ।একশ আশি ধাপ উঠে এই তিব্বতী মনেস্ট্রীর দালান ।ভিতরে আছে বুদ্ধের ধ্যানস্থ মূর্তি ,আছে একটি সংগ্রহশালা ।সংগ্রহশালায় বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাক্রমের বহু চিত্র ছাড়াও রয়েছে অনেক তৈজসপত্র , আর নানান আকারের ধাতব পাত্র । জানা গেল জুন মাসে নাকি এখানে পালিত হয় বর্ণাঢ্য উৎসব । হেমিস গুম্ফা থেকে বেরিয়ে আর চল্লিশ কিমি পথ পার হয়ে এসে পৌছলাম থিকসে নামে অপর একটি গুম্ফায়।সেখানে দেখা মিলল বিশাল এক বুদ্ধমূর্তির ।তার চোখে মুখে ছড়িয়ে আছে অনাবিল শান্তি আর স্মিত হাসি । সুউচ্চ পাহাড়চুড়ায় অবস্থিত গুম্ফাটি মনে শ্রদ্ধা জাগায়। থিকসে গুম্ফাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলি ।কিছুদুর যেতে না যেতেই দেখা হয়ে যায় সিন্ধু নদের সাথে ।রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি ।এই সেই সিন্ধু নদ যার তীরে একদা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা । তিব্বতের মানস সরোবর এর কাছাকাছি এর উৎস । সেখান থেকে তার সুদীর্ঘ চলার পথে এসে মিলেছে অসংখ্য শাখা নদী বিভিন্ন জায়গায়। দুর্গম পাহাড়ি পথে চলতে চলতে চোখে পড়ে কত বিভিন্ন আকৃতির পর্বতমালা কত রঙের বাহার তাদের ! কোথাও সে গেরুয়া কোথাও ঘন নীল । খুব আশ্চর্য লাগে সম্পূর্ণ গাছপালাবিহীন ন্যাড়া পাহাড় গুলোকে দেখে ।সামান্যতম সবুজের আভাস মাত্রও চোখে পড়েনা কোথাও । গাছগাছালি অনুপস্থিত কাজেই পাখির কুজন কাকলীও শোনা যায়না কোথাও ।মাথার ওপরে গাঢ নীল আকাশ আর পায়ের তলায় ,আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়ের পর পাহাড় !এ স্তব্ধ প্রকৃতি যেন এক মৃত্যু উপত্যকা । অবশ্য তারই মধ্যে জায়গায় জায়গায় চোখে পড়ে নীল আকাশের বুকে খন্ড খন্ড সাদা মেঘের দল অলস ভঙ্গীতে ভেসে চলেছে আবার কোথাও পাহাড়ের মাথা আলতো করে ছুঁয়ে । অবাক চোখে মেলে সেই সবদেখতে দেখতে একসময়ে পৌঁছে যাই চাংলা পাস । এই রাস্তা পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মোটর চলাচলের রাস্তা । গাড়ি থামার পর মাটিতে নেমে অনুভব করি শ্বাস কষ্ট ।কিন্তু সেটুকু কষ্ট উপেক্ষা করেই ধীরে ধীরে হেঁটে চারপাশটা দেখেনিই । কিছু দৃশ্য হয় ক্যামেরাবন্দী চাংলা পাস থেকে গাড়ি আমাদের নিয়ে এবারে ঢালু পথে ঘুরপাক খেতে খেতে চলল নিচের দিকে ।গন্তব্য প্যাংগং লেক । তিন সমুদ্রতল থেকে ৪৩৫০মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একশো পঁয়ত্রিশ কিমি দীর্ঘ প্যাংগং লেক এর চারভাগের তিনভাগই চীনের ভূখন্ডের অন্তর্গত ।শুনেছিলাম সুউচ্চ পাহাড়ের পায়ের তলে লুটিয়ে থাকা লেকের জল সূর্যালোকে থেকে থেকে রঙ বদলায় । কিন্তু আমাদের বিধি বাম ।লেকের জলে সেই নয়নাভিরাম রঙের খেলা দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিলনা ।তাই হঠাত কোথা থেকে কাল মেঘ এসে আকাশকে ঢেকে ফেলল ।শুরু হয়ে গেল রিমঝিম বৃষ্টি । প্যাংগং লেকের জলে রঙের মেলা দেখা হলনা ।অতয়েব ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে । পরের দিন নুব্রাভ্যালি যাবার পথে পড়ল খারদুংলা পাস ।নানা দিক দিয়ে এই গিরিবর্ত্ম টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । একসময়ে এই পথ দিয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চলত বানিজ্য । ঘোড়া ও উটের পিঠে পন্যসামগ্রী বোঝাই করে এই পথ দিয়ে চলত ক্যারাভ্যান । তা ছাড়াও সামরিক দিক দিয়েও এই গিরিবর্ত্ম ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । সিয়াচীন হিমবাহে প্রহরারত ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহ হয়ে এই পথেই । খারদুংলা পাসের উচ্চতা নিয়ে কিছুটা ধন্দ আছে।শুনেছিলাম খারদুংলা পাস নাকি দুনিয়ার সর্বোচ্চ মোটর চলাচলের পথ ।সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা ১৮৩৬০ফুট ।তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী উচ্চতাটা আসলে সাড়ে সতেরহাজার ফূটের মত । খারদুংলায় পৌঁছনর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল তুষারপাত । চারিদিক আবছা হয়ে এল ।আমাদের ঘিরে থাকা পাহাড়গুলো পাতলা বরফের আলপনা আঁকা চাদর গায়ে দিয়ে সেজে উঠল ।আগের দিনের প্যাংগং লেকের হতাশা ঝেড়েফেলে নিজেদের বয়স ভুলে মেতে উঠলাম মাটি থেকে বরফের তাল কুড়িয়ে একে অপরের দিকে ছুঁড়ে মারার খেলায় ।খেলার ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম কুয়াশার মত অস্পষ্টতা আমাদের ঘিরে ধরেছে । সেই আধোআঁধারিতে চারপাশের কারাকোরাম পর্বতমালা কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠল ।ছেলেমানুষী খেলা ভুলে মোহাবিষ্টের মত তাকিয়ে থাকি সেই দিকে । তবে এবারে ভ্রমন সংস্থার গাইডের তাড়নায় ফিরে আসতে হল গাড়ির গর্ভে । আবার চলা । পথ চলতে চলতে একজায়গায় পৌছে দেখি সার দিয়ে সব গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে । কি ব্যপার , না সামনের রাস্তায় পাহাড়ি ধ্বস নেমেছে । ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা রাস্তা সাফ করে চলাচলের উপযোগী করে তোলার কাজ চালাচ্ছে । সুখের কথা মাত্র ঘন্টাখানেকের প্রচেষ্টায় রাস্তা খুলে গেল । গাড়ি সচল হবার পর অল্পক্ষণের মধ্যে পৌছলাম নুব্রাভ্যালিতে।চারিদিকে পাহাড় আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে শায়ক নদী ।এই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে পড়বে সিয়াচীন হিমবাহ ।ভারত-চীন Actual Line of control .সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে যাবার জন্য নুব্রাভ্যালি আসার পথে একটি চেক পোস্টে আমাদের বিশেষ পারমিট সংগ্রহ করতে হয়েছিল । যদিও সে কাজে বিশেষ জামেলা পোহাতে হয়নি। আমাদের ভ্রমন সংস্থার লোকজনই সব কাগজপত্র সাজিয়ে নিয়ে পারমিট সংগ্রহ করে এনেছিল । তবে আমরা সিয়াচীন হিমবাহের দিকে গেলামনা –গেলাম ন্যুরা ভ্যালির হোটেলে । নুব্রাভ্যালির হোটেলে পৌছে দেখা মিলল সবুজ গাছপালা আর পাখি ।হোটেলের বাগানে গাছে গাছে আপেল এপ্রিকট খুবানী আর আঙুর ফলেছে ।অবাক হলাম এখানে চড়ুই পাখি দেখে । লাঞ্চ সেরে নিয়ে আমরা চললাম হুন্ডার কোল্ড ডেজার্ট দেখতে । সেখানে দেখা পেলাম দুই কুঁজ ওয়ালা রোমশ এক নতুন ধরণের উটের । ভ্রমনার্থীরা প্রায় সকলেই সেই উটের পিঠে চড়ে কোল্ড ডেজার্ট ঘুরে দেখছেন দেখে আমারও সখ হল উটের পিঠে চড়ার । কিন্তু কি কুক্ষণেই যে আমার অমন দুর্মতি হয়েছিল তা ঈশ্বরই জানেন । প্রথমতঃ শত কসরত সত্বেও আমি কিছুতেই চড়তে পারিনা উটের পিঠে –ডান প্যাঁ তুলে উটের পিঠে চড়ার চেষ্টা চালাই কিন্তু হা হতোস্মি। পারিনা কিছুতেই ।সে এক বিদ্ঘুটে অবস্থা ।আমার সহিস তো হালই ছেড়ে দিল। আমি নাছোড়বান্দা। শেষেএকলাফ দিয়ে উটের পিঠে সওয়ার হওয়া গেল ।উট আমাকে পিঠে নিয়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ানর সময়ে এমন বিকট আওয়াজ করল যে তাতেই আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম হল । তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল ,কিন্তু উটের চাল ভারি অদ্ভুত রকমের ।উটের একএকটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর এমন ভাবে তরঙ্গ দোলায় দুলতে আরম্ভ করল যে ভয়ে মরি কখন বুঝি উটের পিঠ থেকে আছাড় খেয়ে একেবারে “পপাত চ মমার চ” অবস্থা হয় আমার । এদিকে উটের সহিস ক্রমাগত চেঁচিয়ে আমাকে উপদেশ দিচ্ছে সোজা হয়ে না বসে শরীরটাকে একটু পেছন দিকে হেলিয়ে বসতে ।কিন্তু আমার কি আর তখন সে সব শোনার মত অবস্থা আছে? ফলে উটের পিঠ থেকে পড়লামনা বটে কিন্তু উটের সওয়ারির শেষে উটবাবাজি আমাকে পিঠ থেকে নামানর জন্য যেই না তার সামনের পাদুটো মুড়ে বসতে যাবে অমনি আমি টাল সামলাতে না পেরে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম উটের পিঠের ওপরে। উটের কুঁজে বিশ্রিভাবে আমার মুখটা গেল ঠুকে ।উটএর সহিস তখন তারস্বরে চেঁচিয়ে আমাকে বকেই চলেছে । আমি ততক্ষণে এক লাফে মাটিতে। চার ন্যুব্রা ভ্যালির হোটেলে এক রাত কাটিয়ে পরের দিন ফিরে এলাম লেহ ‘র হোটেলে এ ।সেখান থেকে অন্য একটি রাস্তা ধরে এবারে যাব কারগিল এ। একেবারে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যবর্তী Line of control অবধি ।সকালে ঘুম থেকে উঠেই কারগিল এর কথা টা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করি ।আমার ধারণা কারগিল যুদ্ধের স্মৃতি প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের মনে একই রকমের উত্তেজনার জন্ম দেবে ।বিশেষ করে যে জায়গায় ভারতীয় ফৌজ মরণপণ সংগ্রাম করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল সেই যুদ্ধক্ষেত্রে আমি সশরীরে হাজির হব সেই ভাবনার রোমাঞ্চ লিখে বোঝাই এমন সামর্থ আমার নেই । সকালবেলা ছটা নাগাদ চা ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসি । এখান থেকে কারগিল প্রায় দুশো কুড়ি কিলমিটার ।আগেরদিন প্যাংগং লেক এর রাস্তাছিল খুবই খারাপ ।গাড়িতে যেতে যেতে ঝাঁকুনিতে কোমর আর পিঠে ব্যথা হয়ে গিয়েছিল তার উপরে উটে চড়ার অভিজ্ঞতাটা ও শরীরের পক্ষে মোটেই সুখকর হয়নি ।তাই দীর্ঘ পথ গাড়িতে যাবার কথা চিন্তা করে কিছুটা ভাবনা হচ্ছিল বটে,কিন্তু দেখলাম কারগিলে যাবার সড়কটি ভারি চমৎকার ।মসৃণ রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে আর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে সিন্ধু নদ ।হাজার হাজার বছর ধরে সিন্ধু নদ এই ভাবেই নিঃশব্দে বয়ে চলেছে ।পথের দুপাশে সৌন্দর্য অপরূপ । এক নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে চলতে চলতে পৌছলাম দ্রাস নামে একটি নদীর ধারে গড়ে ওঠা একটি ছোট্ট পাহাড়ি শহর দ্রাসে । উচ্চতা জনিত কারণে শ্বাস কষ্ট ত ছিলই ,সেই সঙ্গে এবার যোগ হল প্রচন্ড ঠান্ডার কামড় । তবে এখানে আপাতত আমরা থামলামনা ।যদিও গাইড জানালেন কারগিল থেকে ফেরার সময়ে এই দ্রাসে একটি অদ্ভুত জিনিষ দেখতে পাব ।কিন্তু অদ্ভুত জিনিষ যে ঠিক কি তা কিন্তু তখনই ভাঙতে চাইলেননা । এই পথেই পড়ল লামায়ুরু নামে একটি গ্রাম – মুনল্যান্ড অফ লাদাখ বলে যার খ্যাতি ।এ গ্রামকে ঘিরে থাকা চারপাশের পাহাড়্ গুলি যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোকিত । বেশ কয়েকটি মনাস্ট্রী আর গোম্ফা আছে এখানে।তবে আমরা সেগুলিতে যাবনা । পাঁচ কারগিলে পৌঁছতে বেলা বেড়ে লাঞ্চের সময় হয়ে গিয়েছিল ।তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে নিয়ে আমরা ছুটলাম কারগিলের যুদ্ধক্ষেত্রে । কারগিল এর যুদ্ধে যে সব বীর ভারতীয় জওয়ান নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তাদের স্মৃতিতে কারগিল পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত হয়েছে কারগিল শ্রদ্ধাঞ্জলি বেদি । বেদির মাঝখানে একশো ফুট উঁচু দন্ডের শীর্ষে উড়ছে ভারতের জাতীয় পতাকা ।অহর্নিশি জ্বলছে অমর জ্যোতি ।শ্রদ্ধাঞ্জলি বেদির একপাশে ফুলের বাগানে কারগিল যুদ্ধে যে সব সৈনিক শহীদ হয়েছেন তাদের নাম খোদাই করা অসংখ্য প্রস্তর ফলক রয়েছে ।বাগানের দুই পাশে রাখা আছে কারগিল যদ্ধে ব্যবহৃত বোফর্স কামান ,সাথে আছে একটি ছোট ফাইটার প্লেন । কাছেই একটি সংগ্রহশালায় কারগিল যুদ্ধে ব্যবহৃত নানান জিনিষ । এবার পালা আমাদের কারগিলে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে line of control যেখানে ,সেই জায়গায় যাবার। যে গাড়ি চেপে আমরা কারগিল এসেছিলাম সে গাড়ি সামনের সঙ্কীর্ণ পথে যেতে পারবেনা। তাই গাড়ি বদল হল। এবার আমরা ছোট গাড়িতে ।সে গাড়ি যতই পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে থাকে ততই দেখি সংকীর্ণ পথের দুই পাশে খাদ গভীরতর হতে থাকে। প্রায় ঘন্টা তিনেক পাকদন্ডী পথ অতিক্রম করে পাহাড় চুড়ায় পৌঁছে দেখতে পেলাম আমাদের অবস্থান থেকে অনেকটা নিচে প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের গ্রাম – তার ঘরবাড়ি মসজিদ ...।কথায় কথায় জানতে পারলাম Line of control এর এপারে দাঁড়িয়ে আমরা যেমন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাটাকে দেখছি তেমনি ওপারের পাকিস্তানী সেনাও সতর্ক নজরদারিতে রেখেছে আমাদের ।এ ভারি রোমাঞ্চকর ও শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতা । কারগিল যুদ্ধের ক্ষত শুকিয়ে গেছে কিন্তু ক্ষতচিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে যায়নি ।জানাগেল এখনও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পোঁতা বহু মাইন ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ।সামান্য অসাবধানতায় মুহূর্তের মধ্যে ডেকে আনতে পারে ভয়ঙ্কর বিপদ । ১৯৯৯সালের হানাদারির পুনরাবৃত্তি রুখতে তাই এখন এত বছর পরেও ওই রকম দুর্গম জায়গায় অকরুণ প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে ভারতীয় সেনাবাহিনী সদাজাগ্রত প্রহরায় মোতায়েন রয়েছে ।Line of control এর এ পারে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর তৈরি করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখা হল ।ওই এলাকায় ছবি তোলা নিষিদ্ধ তা না জেনেই কিছু ছবিও তুলেছিলাম –যদিও সে ছবি প্রকাশ্যে দেখান অনুচিত কাজ হবে বলেই সেগুলি আড়ালেই থাক । কারগিল থেকে লেহ’তে ফেরার পথে পাহড়ের গায়ে মেঘ আর রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে বেশ কিছু দূর চলার পর গাড়ি এসে থামল এমন একটি জায়গায় যেখান থেকে অনেকটা নীচে পাহাড়তলিতে জান্সকার আর সিন্ধু নদের সঙ্গম স্থল টি ভালোভাবে দেখা যায় । আমরা বিমুগ্ধ হয়ে দেখলাম দুপাশের পাহাড়ের খাঁজে জান্সকার নদীর নীলচে জল গিয়ে মিশে গেছে সিন্ধু নদের ঘোলাটে জলধারার সঙ্গে । গোটা পরিবেশটা যেন কোন নিপুণ শিল্পীর তুলিতে আঁকা । কারগিলে যাবার কালে পথে দ্রাসে একটি চমকপ্রদ জিনিষ দেখতে পাব বলে জেনেছিলাম আমাদের গাইডের কাছে । এই বারে আমরা সেই জায়গায় পৌঁছলাম ।গাইড মজা করার মত করে বললেন কারগিলে যাবার সময় আপনাদের একটা চমকপ্রদ জিনিষ দেখাব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ।এবারে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার পালা । আমরা এবার দেখব ম্যাগনেটিক হিল এর ম্যাজিক ।কথাগুলি বলতে বলতে ড্রাইভারকে কিছু ইঙ্গিত করলেন। গাড়ির চালক অমনি ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে ,ব্রেকের ওপর থেকে সরিয়ে নিল তার পা । অবাক কান্ড !!সাধারণত এমন অবস্থায় ঢালু পথে গাড়ি নিচের দিকে গড়িয়ে যাবার কথা ।কিন্তু আমাদের সবাইকে আশ্চর্য চকিত করে দিয়ে গাড়ি পিছনের চড়াই পথে পিছু হটতে শুরু করল । পরে গাইড আমাদের বোঝালেন যে এই অঞ্চলে পাহাড়ের নিচে আছে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র যার আকর্ষণে আমাদের ধাতব গাড়িটি নিচের দিকে গড়িয়ে না গিয়ে ঢালের বিপরিতে ওপরের দিকে আকর্ষিত হয়েছিল ।সত্যিই এটা এমনই একটা চমকপ্রদ ঘটনা যে স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । ম্যাগনেট হিল এর ম্যাজিক দেখে লেহ তে হোটেলে ফিরে এলাম ।পরের দিন সকাল সাতটায় লেহ বিমানবন্দর থেকে উড়ে চললাম ফিরতি পথে – দিল্লীর দিকে ।আর কোনদিন এখানে ফিরে আসব এমন দুরাশা করিনা ।তাই কিছুটা বিষন্ন দৃষ্টিতে প্লেনের জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি হিমালয় আর কারাকোরাম পর্বতমালা। মনে হল তারা যেন আকাশের দিকে হাততুলে আমাদের বলছে অলবিদা ...।

129

4

মনোজ ভট্টাচার্য

ইদিপাস থেকে বেটি এম্বেরেকো !

ইডিপাস কমপ্লেক্স কি শুধুই একটা ফ্রয়েডিয়ান মনোজগতের বিশ্লেষণ – একটা লিগাসি । শুধুমাত্র পুরুষদের ক্ষেত্রেই কি এটা সীমায়িত থাকে । নাকি নারী পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই এর দেখা মেলে ! সোফোক্লিশের গ্রীক ট্র্যাজেডি প্রায় খৃষ্টপূর্ব সাড়ে চার সো বছর আগেকার কাহিনি ও এর অনেক মনোস্তাত্তিক বিশ্লেষণ হয়েছে । গ্রীক পুরানের রাজা ইদিপাস বা আউদিপাউস কে নিয়ে এই কাহিনী কি শুধু বিয়োগান্ত নাটক ? এর কি কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই ! এমনও হতে পারে – এই ইদিপাস কমপ্লেক্স কেবল বাস্তবের কিছু বিকৃত মনোস্কামনার প্রতিফলন ! আমি কিন্তু দেখেছি এক বাস্তব কাহিনী – বন্ধুর মাকে নিয়ে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে । সেটা অবশ্য নিজের গর্ভধারিণী মা নয় ! - হয়ত এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে । আমরা জেনেও ঘাড় ঘুরিয়ে থাকি। কিম্বা বিতর্কিত বিষয়ের দিকে যেতে চাই না ! অতি সম্প্রতি জিম্বাবুয়েতে ৪০ বছরের বেটি এম্বেরেকো নামে এক মহিলা তার ২৩ বছর বয়সী ছেলের সাথে যৌনমিলনে ছ মাসের সন্তান সম্ভাবনা হয়েছে । আর তাই তারা কোর্টে পরস্পরকে বিয়ে করবে বলে অনুমতি চেয়েছে । বেটি বারো বছর আগে স্বামীহারা হয়েছে । তারপর দেওররা তাকে বিয়ে করতে চাওয়া সত্ত্বেও সে কাউকে বিয়ে করতে চায় নি । - তখন তার ছেলেকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম করেছে । ছেলেকে স্কুল ও কলেজে পড়িয়েছে । - এই সময়ে স্বভাবতভাবে দুজনে দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে । বেটি যখন কোর্টে বলে – যেহেতু ছেলেকে বড় করেছে কলেজে পড়িয়েছে – তাই তার ছেলের প্রতি তার অধিকার রয়েছে । তাই ছেলে অন্য বান্ধবীকে বিয়ে করার আগেই সে ছেলের সঙ্গে যৌনতায় মিলিত হয়েছে ও তার বাচ্চার মা হতে চলেছে । তাই সে ছেলেকে বিয়ে করার অনুমতি চাইছে ! – এই খবরে সেখানে খুব তোলপাড় শুরু হয়েছে । এখানে ব্যাপারটা নিয়ে বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায় – রাজা অদিপাউস যুদ্ধে জিতে পিতাকে হত্যা করে তার স্ত্রীয়ের দখল নিল । সে কিন্তু তখনও জানত না – নিহত রাজা ও তার স্ত্রী - তারই জন্মদাতা পিতা ও মাতা ! – তাই তাদের মিলনে চার সন্তান হয় ! এক মেয়ের নাম অ্যান্টিগোনে ! সেই প্রতিবাদিনী মেয়ে অ্যান্তিগনে ! তখন তো থীবেস শহরে বিরাট আন্দোলন পড়ে গেছে ! – সে তো গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী ! কিন্তু জিম্বাবয়ের ঘটনায় বেটি সজ্ঞানে ও অকপটভাবে দাবি করছে – সে তার দেওরদের বিয়ে না করে ও ছেলের বান্ধবীর হাত থেকে অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে বিয়ে করতে চায় ! বেটির এই দৃঢ়তার জন্যে সেখানকার আদালত তাকে বিয়ের অনুমতি দিতে বাধ্য হচ্ছে ! মনোজ

88

1

শিবাংশু

দুর্গগুড়ির মিথুনমূর্তিরা

পশ্চিমি চালুক্যরা মন্দিরটি যখন নির্মাণ করেছিলেন, অর্থাৎ সপ্তম-অষ্টম শতকে, তখন দেশে গুপ্তযুগের শানশৌকতের স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়নি। উত্তরভারতের প্রতাপী রাজারা ছিলেন কনৌজে যশোবর্মণ, কাশ্মিরে ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়। ওড়িশায় ভৌমকার বংশের শিবাকর উন্মত্তকেশরী তখন সিংহাসনে। দুর্গগুড়ির সমসাময়িক উল্লেখযোগ্য মন্দির অবশেষ আমি দেখেছি ভুবনেশ্বরের পরশুরামেশ্বর মন্দিরে। এই দুই মন্দিরে স্থাপত্য বা ভাস্কর্যের উৎকর্ষ নিয়ে কোনও মন্তব্যই হয়তো যথেষ্ট নয়। তবে সেই সময়ের মন্দির স্থাপত্যে মিথুন বা যুগলমূর্তির প্রচলন তেমনভাবে দেখতে পাওয়া যায়না। কিন্তু পশ্চিমি চালুক্যদের দুর্গাগুড়িতে দেবদেবীনিরপেক্ষ যুগল ও মিথুন মূর্তির সুলভতা একটু অবাক করেছে। এর পিছনে তৎকালীন জনজীবনে বৌদ্ধ তন্ত্র বা শৈব তন্ত্রের প্রাবল্য প্রতিফলিত হয়। পাথরে খোদিত এসব কবিতা তেরোশো বছর কালের কবলে থাকার পরেও আমাদের চমকে দেয়। বুন্দেলখণ্ডি বা কলিঙ্গ মিথুনকাল্ট তখনও দু-তিনশো বছর দূরে। অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে থেকে কয়েকটি নমুনা এখানে থাকলো। তৎকালীন পোষাক-আশাক, সাজসজ্জা, প্রসাধন-শৃঙ্গারের প্রামাণ্য আভাস পাওয়া যায় এইসব ভাস্কর্যে। আপনাদের জন্য,

84

3

Ranjan Roy

গুপী গাইন বাঘা বাইন পঞ্চাশ বছর পর

<গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখে কোন সার্থক শিল্পে এমন কিছু উপাদান থাকে যা স্রষ্টার নিজের কালখন্ড পেরিয়েও দর্শক / পাঠকের মনে ঢেউ তুলতে পারে। দর্শক নিজের পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে সেখানে সম্পর্ক খুঁজে পায়, তার মনে হয় এ তো আমারই কথা । এই অভিঘাত সবসময় শিল্পী বা স্রষ্টার অভিপ্রেত নাও হতে পারে। কিন্তু তাতে কি আসে যায়! এক শতাব্দী আগের এক রাত । রাশিয়ায় নতুন ধারার নাটকের দল মস্কো আর্ট থিয়েটার করছে ইবসেনে’র ‘এনিমি অফ দ্য পিপল’ ( সত্যজিতের চিত্ররূপ ‘গণশত্রু’)। শহরের রাস্তায় তখন শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলিত জনতা গড়ে তুলছে ব্যারিকেড, দমন ও সংঘাত চলছে। স্তানিস্লাভস্কি লিখেছেন যে সেদিন বিভিন্ন নাট্যমুহুর্তে এবং ডায়লগে দর্শকেরা যেভাবে সাড়া দিচ্ছিল তা অভুতপূর্ব। স্তকমান যখন একটা ছেঁড়াশার্ট নিয়ে কিছু বললেন দর্শক উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। কারণ ঘোড়সওয়ার পুলিশের হামলায় ‘ছেঁড়া শার্ট’ সহজেই দর্শককে আবেগে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নাটক দেখে অনেকেরই আবার ব্যারিকেডে ফিরে যাওয়ার কথা । এসব কথা বলার একটাই কারণ। অর্ধশতাব্দী পরে সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ দেখে সেটা আজ ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হওয়া। ১৯৬৯ সালে যখন ছবিটি মুক্তি পায় তখন শহর কোলকাতায়ঃ ‘স্কুল কলেজে খিল, রাস্তায় মিছিল। ক্র্যাকারের শব্দে কাঁপে রাজপথ কিনু গোয়ালার গলি। হীরের টুকরো ছেলেরা সব অশ্বমেধের বলি।‘ সেইসব দিনে আঠের-উনিশ বছরের ছেলেদের চোখে এই ফিল্মটি তার যোগ্য মর্যাদা পায় নি । মনে হয়েছিল যে রূপকথার মোড়কে এটি একটি শান্তিবাদী ফিল্ম। এই ফিল্ম ন্যায় ও অন্যায় যুদ্ধের মধ্যে কোন ফারাক করে না । বাস্তবজীবনের প্রতিনিয়ত হিংসা ও অন্যায়কে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে শিখিয়ে আসলে এটি স্থিতাবস্থার পক্ষে ওকালত করে । তারপর গত পঞ্চাশ বছর ধরে গঙ্গা – যমুনা-নর্মদা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আজকে সত্তর বছরের বুড়িছোঁয়া চোখে এই ফিল্ম আবার দেখলে মনে হয় এর কমিউনিকেশনের সুর অনেক সূক্ষ্ম তারে বাঁধা। এর আবেদন মানুষের প্রাকৃতিক শুভবুদ্ধির কাছে। কারণ মানুষ জীবনকে উপভোগ করতে চায়—একা একা নয় , মিলে মিশে। মানুষ পেট ভরে খেতে চায়, আনন্দে বাঁচতে চায়, ভালবাসতে চায়। উলটো দিকে ক্ষমতার লোভে মদমত্ত মন্ত্রী ও বরফি জাদুকরের দল প্রজাদের বোবা করে রাখতে চায়, হিংসার বিষবাষ্পে ওদের চেতনায় জাগিয়ে তোলে পড়শি দেশের জন্যে ঘৃণা ও রক্তের স্বাদ পাবার ইচ্ছে। হাল্লা যখন নিজেকে ভুলে যুদ্ধোন্মাদ হয়ে বর্শা হাতে নিয়ে বীরবিক্রমে বেয়নেট চার্জের অভ্যাসে মেতে ওঠে ও সবাইকে এই কুচকাওয়াজে বাধ্য করে , তখন আমরা চমকে উঠে যেন শুনতে যেই ‘দুশমনকে ঘর ঘর মেঁ ঘুসকর মারেঙ্গে।‘ যে রণদামামা এই ভোটের বাজারে প্রতিনিয়ত বেজে চলেছে এ যেন তারই প্রতিধ্বনি। গান ও নাচ চলে ‘সকলে মিলিয়া শুনহ তোমরাহাল্লা চলেছে যুদ্ধে’। জনতা উন্মাদনায় মেতে উঠছে। ভুলে যাচ্ছে শুণ্ডি ও হাল্লা --দুটি রাজ্যই একসময় অভিন্ন ছিল, শুধু পরে দুইভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে দুটো আলাদা রাজ্য হয়েছে। খিদেয় কাতর গুপ্তচর চিন্ময় রায় লোভী দৃষ্টিতে মন্ত্রীর ভুরিভোজনের দিকে তাকিয়ে ধমক খায়। শোনে –এখন প্রতিবেশি রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে তখন কি খিদের কথা শোভা পায় ? চিন্ময় মেনে গুটিয়ে যান। আমরাও মেনে নিই যে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রশ্নই বড়। এখন কি চাষির আত্মহত্যা, বেকারত্ব, বাড়তি দাম নিয়ে কথা বলা উচিৎ? তাহলে কেমন দেশপ্রেমী আমরা? আমরা মেনে নেই আমরা প্রজা; দেশ চালাচ্ছেন রাজারা। তাঁদের প্রশ্ন করা চলবে না । এও দেখি যে শাসক শিল্পরসিক, সে দুর্বল। তাকে যে কেউ আক্রমণ করতে পারে। তাই শুন্ডি নয় আমাদের চাই হাল্লা রাজা। সে আমাদের সুরক্ষা কবচ। শুন্ডির তো ঘোড়া নেই, হাতি নেই, উট নেই। এমন দেশে থাকব কেন ? আমাদের মিগ চাই , অগাস্টা হেলিকপ্টার চাই , রাফেল ফাইটার প্লেন চাই , তবে আমরা নিশ্চিন্ত। কিন্তু গুপী ও বাঘা যে উলটো গায়ঃ ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল! মিথ্যে অস্ত্রশস্ত্র ধরে প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে রাজ্যে রাজ্যে হানাহানি সবার অমঙ্গল! এমন অলুক্ষুণে কথা ! মানছি, সীমান্ত থেকে কাশ্মীর থেকে মাঝে মধ্যেই কফিন আসছে। পতাকায় মোড়া বডি, গান স্যালুট, পদক সবই হচ্ছে। সবই সত্যি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে সরকারি চাকরির, কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের। কথা নিশ্চয়ই রাখা হয়, আমরা জানতে পারি না । এহ বাহ্য। ভাল হত না যদি কোন গ্রামেই কোন কফিন না যেত? না এপারে, না ওপারে।সব সৈনিক ছুটিতে বাড়ি ফিরতে পারত—কফিনে না শুয়ে? আমরা কি গুপীর গানের প্রতিধ্বনি করছি? এটা কি রাষ্ট্রবিরোধী ফিল্ম? শুরুতেই দেখুন ঝামেলা। রাজার পছন্দ হয় নি গুপীর বেসুরো গান। তাই উলটো গাধায় চড়িয়ে গাঁ থেকে ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। উল্লাসে ফেটে পড়ছে আমোদগেঁড়ে জনতা। দূর থেকে কাপড়ের খুঁটে চোখ মোছে গুপীর বাবা কানু কাইন। ও তো আগেই ছেলেকে মানা করেছিল রাজার কাছে গিয়ে গান গাইবার বোকামি না করতে! শুনলে তো? হ্যাঁ, আমরাও শিল্পীর লাঞ্ছনায় চোখের জল লুকিয়ে মুছে ফেলছি। যখন আজকালকার রাজা সায়েবের রুচির বিরুদ্ধে বলে গাইতে দেওয়া হচ্ছে না গজল গায়ক পাকিস্তানের গুলাম আলীকে, কেরালার এক গায়ককে। আমরা চোখ মুছেচি আগেও যখন বুড়ো বয়সে শিল্পী হুসেনকে হেনস্থা করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হল। বাহাদুর শাহের মতনই তাঁরও হিন্দুস্তানে ‘দো গজ জমিন’ নসীব হল না । আমির খান, নাসিরুদ্দিন শাহকে বারে বারে পাকিস্থান যেতে বলা হল। এমনকি বরখা দত্ত, নাসির ও আরও কয়েকজনকে দেশের আভ্যন্তরীণ শত্রু আখ্যা দিয়ে ঘরে ঢুকে টেনে বের করে মারার নিদান দেওয়া হল, প্রকাশ্যে। এই রূপকথার ফিল্মে হিংসা হেরে যায়, প্রত্যাশামত । মন্ত্রী মশাই ষড়যন্ত্রীমশাই এবং বরফি যাদুকরের দল হাওয়ায় মিলিয়ে যায় । দুই পড়শি দেশ মোহমুক্ত হয়ে কোলাকুলি করে । এই ভোরের স্বপ্ন কি আমাদের জীবনে সত্যি হবে? ততদিন আমরা শুনব গুপীবাঘার সেই গান যা সবাই গাইতে পারে নিজের মত করে আর যে গানের দুনিয়ায়‘উঁচা -নীচা-ছোট-বড় ভেদ নাই’।>

86

7

মনোজ ভট্টাচার্য

গন্ধ নিয়ে কটা কথা !

এ নামটা শুনে কিরকম - শিবরাম চক্রবর্তীর গন্ধ চুরির মামলা ধরনের মনে হচ্ছে না ? পয়সার অভাবে স্রেফ ভাত খেত গন্ধের সঙ্গে মাখিয়ে ! - কিন্তু শুধুমাত্র পাঠকরাই বুঝতেই পারবেন – চুরি বা চৌকিদারি – এসব কিছু নয় ! আমি তো আর গল্প লিখতে পারিনা – বানাতেও পারি না । যেগুলো লিখি সেগুলি নেহাতই অন্য কারুর লেখার ওপর খানিকটা কেরদানি মারা ! অর্থাৎ কিনা কারুর কোন লেখার গুনকীর্তন করা । - আবার এত ভাল ভাল লেখা চোখে পড়ে – যে সেই সব লেখার প্রশস্তি লিখতে হলে আমাকেই ভাল লিখতে হবে ! গন্ধের ব্যাপারে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে যে গন্ধটা সেটা হল নতুন বইয়ের গন্ধ ! সেটা অবশ্য শুধু গন্ধই নয় – দর্শনও বটে ! নতুন বইয়ের ঝক-ঝকে মলাট আর কাগজের গন্ধ ! – কোন নতুন বই কিনতে পারলে – মনে হয় আমি লেখককে প্রকাশককে আর দপ্তরিকে একসঙ্গে কিনে ফেলেছি ! ইচ্ছে করেই কদিন হাতে করে ঘুরে বেড়াই – সবাই দেখুক ! - সঙ্গে সঙ্গে আবার চিন্তা – কেউ চেয়ে বসলেই মুস্কিল । চিরকাল শুনে এসেছি – বই আর বউকে নাকি কাউকে ধার দিতে নেই ! – কেউই ফেরত দিতে চায় না ! আজকাল অবশ্য বউকে ধার নেয়ও না কেউ । দ্ৰৌপদিকে নিয়ে যা ক্যাচাল হয়েছিল ! একটা সময় ছিল যখন কলেজ থেকে বেড়িয়ে কফি হাউসে যেতাম – হাতে থাকত লোলিটা বা লেডি চ্যাটারলিজ লাভার ! নিজে বুঝি বা না-বুঝি - মনে ভাবতাম অন্যে বুঝবে না ! কিন্তু লোলিটার একটা উত্তাপ ছিল – প্রত্যেকেই একবার হাতে নিয়ে দেখত ! এ ছাড়া গন্ধ - - ! আমার পিতামহর বইয়ের আলমারিতে অনেক ইংরিজি সাহিত্যের বই ছিল । তাঁর মধ্যে ডফিন দ্য ম্যরিয়ের একটা বই ছিল । বইটা চুরি করে পড়তাম ও সবাইকে দেখানর জন্যে হাতে নিয়ে ঘুরতাম । পড়ার পর দেখলাম গল্পটা শুধু রগরগেই নয় – বেশ গুরুতর ধরনের ! মানে সত্যি করেই যাকে বলে - অ্যাডাল্ট ! না - গন্ধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি । - একদিন সকালে বাজারে যাচ্ছি – হঠাৎ নাকে ভেসে এলো ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ ! – আরে ! এত সকালে ইলিশ-মাছ ভাজে কে ! ইলিশ-মাছ ভাজা যে আমার খুব প্রিয় – তা নয় ! তবু পয়লা বৈশাখে নাকি পাঁচ হাজারে মাছ বিক্রি হয়েছে ! পড়ে বেশ একটা – আঙ্গুর ফল টক গোছের আত্মশ্লাঘা বিধ করি ! - নিজেকে সান্ত্বনা দিই – কারুর হয়ত সকাল সকাল কাজে যেতে হয় ! – পরের দিন আবার গরম ভাতের ওপর মুশুর ডালের গন্ধ ! এটা আমার প্রথম জীবনের খাদ্য ছিল । খুব সকালে কাজে যেতে হত ! সে গন্ধ ভুলি কি করে ! আর এই গন্ধটা মনে হলেই পেটের মধ্যে একটা গুড়গুড় ভাব হতে থাকে ! – কিন্তু রোজ রোজ এমন গন্ধ নাকে আসেই বা কোত্থেকে ! পরে জানতে পেরেছিলাম – কোন একটা ফ্ল্যাটে সকাল সকাল রান্না করে দোকানে সাপ্লাই করতে হয় ! এই কমপ্লেক্সের চারদিকে প্রচুর সোনা কারবারিদের বসবাস এবং তারই সঙ্গে সোনা পরিশোধনের অ্যাসিড প্রয়োগ - ফলে সক্কাল সক্কাল আমরা সোনার স্বপ্ন দেখিনা বরং সোনা পরিশোধনের গন্ধ নিশ্চয় পাই ! সে কি দুর্গন্ধ ! সকালে প্রাতর্ভ্রমণ করতে আজকাল ডাক্তাররা বারন করে । বাতাসে নাকি অক্সিজেনের বদলে দূষিত কার্বন ভেজাল আসছে ! – এটা ঘুম-কাতুরে মানুষদের পক্ষে খুব ভাল অজুহাত ! গন্ধের কথা উঠলোই যদি – তবে বলি রবার্ট ব্লেক আর ইন্সপেক্টর স্মিথ, কিরীটী রায়- সুব্রত এবং ফেলুদা-তোপসের কথা খুব মনে আসে । - কোন খুনের দৃশ্যে গিয়েই কিরকম শুঁকতে শুরু করে । সেই দৃশ্যে তো মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই শোঁকার মতো নয় । অথচ ভাবখানা যেন – খুনী খুন করার আগে ড্রেসিং টেবিলে বসে সেন্ট মেখে খুন করেছে ! – এইসব মনে এলেই মনটা খুব উদাস হয়ে যায় । অনেকদিন পর্যন্ত আমার খুব ইচ্ছে ছিল – ডিটেকটিভ হবার । - হাসবেন না যেন – সেই উদ্দেশ্যে গ্লোব ডিটেকটিভ কোম্পানিতে গেছিলামও ! – কিন্তু মুস্কিল হল – ওরা কোন পয়সা দেবে না ! পয়সা না পেলে ডিটেকটিভদের চলে কি করে ! – তা সেই ভাবনাও ছাড়তে হল ! ডিটেকটিভ হওয়া আর হল না ! এবার বলি একটু বিদেশের কিছু কথা । বেশ কিছুদিন বিদেশে থাকার ফলে ওখানকার রাস্তায়-ঘাটে গাড়িও চালাতে হত । আর হাইওয়েতে স্পীড লিমিট পঁয়ষট্টি মাইল হওয়া সত্ত্বেও – কখন যে পায়ের চাপে নব্বই একশ হয়ে যেত - বোঝাই যেত না । - চিক চিক আলো আর ওঅ্যাঁও ওঅ্যাঁও আওয়াজ পাশে এসে গেলেই গাড়ি থামাতে হত । - সুদর্শন ইনস্পেক্টর এসে আগেই জানলা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে শুঁকতে থাকে । প্রথম প্রথম বুঝতেই পারতাম না । কি শোঁকে ! গাড়িতে যদি জন্মদিনের পোশাক পড়ে কেউ থাকে – তাতে ওরা তাকিয়েও দেখবে না । - পরে বুঝেছি ওরা ড্রাগ বা অ্যালকোহলের গন্ধ খোঁজে । - কোনোক্রমে একটু গন্ধ পেলেই – গাড়ি থেকে নামাবে – নাকের সামনে ইনহেলার ধরবে- তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে মেরী ক্রিসমাস বলে – টিকিট ধরিয়ে দেবে ! – শুনেছি ওদেরও মাসিক কোটা থাকে টিকিটের । একটা গন্ধ – কেউ সেটা পছন্দ করবে না । তাই সেটা আর লিখছি না ! মনোজ

97

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা !

কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা ! আচ্ছা – জন্মভূমি বললে কি কেবল শস্যশ্যামলা ধানক্ষেত, পুকুরের মাছ, আর দৃষ্টি সীমান্তে রেল লাইন – যেখান দিয়ে কু-ঝিক ঝিক ট্রেন যাচ্ছে । সেই পথের পাঁচালির অপু-দুর্গার সিল্যুয়েট বোঝায় ! – আমার মতে জন্মভূমির মধ্যে শহর আসে – তার মধ্যে শতাধিক বছরের পুরনো বাড়ি – সেখানে বাড়িওলা ভাড়াটেরা থাকে – বাইরে রাস্তা দিয়ে ফিটন ল্যান্ডো গাড়ি, গরুর গাড়ি –দুপুরে ভিস্তিওলার জল দিয়ে রাস্তা ভেজানো । সেই জল সামলে কোনক্রমে ট্রামের সেকেন্ড ক্লাশের যাত্রী হয়ে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে আড়াইটে নাগাদ নেমে পড়া – এবং রুপালি পর্দার হাতছানি । - উদয়ের পথে! আচ্ছা – এটা কি হতে পারে – চিত্রা হলে আমি প্রথমে মহাপ্রস্থানের পথে দেখেছি ? উনি বললেন – আমার তা মনে নেই – তবে উদয়ের পথে চিত্রায় রিলিজ হয়েছিলো ! আমার প্রশ্ন – আগে তো চিত্রা নাম ছিল – কবে থেকে মিত্রা হল ! – উত্তরটা একটু জটিল । কারন ১৯৩১ সালে - চিত্রা হলটা তৈরি করেছিল স্বয়ং বীরেন সরকার ! প্রকৃতপক্ষে বীরেন সরকারের হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র-জগৎ তৈরি হয়েছিলো ! – সেই হেন বীরেন সরকারকে আইনের মামলায় হেরে যেতে হয়েছিল । - সেটা অবশ্য ওদের পারিবারিক ঘটনা । আইনের ছাত্র দিপেন মিত্তির পরিবারকে বাঁচাতে এসে হাল ধরলেন মিত্রার ১৯৬৩ সালে । তখন থেকে এক নাগাড়ে এই হলটাই ওনার ঘরবাড়ি হয়ে গেল । অথচ প্রথম দিনেই গেটের দরোয়ান ঢুকতে দিতে চায়নি – মালিককে চেনেনা বলে ! বাবার নাম বলতে ঢুকতে পারে । একাদিক্রমে চালিয়ে - ছেচল্লিশ বছরের সন্তানকে মৃত ঘোষণা করা খুবই কঠিন ! তবু সতেরজন সহকর্মীর যথাসম্ভব বন্দোব্যস্ত করে – ও একমাত্র ভাইপোর ঘাড়ে ওদের দায়িত্ব দিয়ে রেহাই চান । কারন ওনারও শারীরিক অবনতি হচ্ছে ! এই হলটা যতটা আপনার – ততটাই আমাদেরও । কারন খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা এই হলে আসছি, লাইনে দাঁড়িয়ে মারপিট করেছি নিকাশিপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে । - পাঁচ আনা থেকে শুরু করে কত যে পয়সা দিয়েছি ! – তাই যত রক্তক্ষরণ হচ্ছে আপনার হৃদয় – তত রক্ত আমাদেরও গেছে – লাইনের মারামারিতে ! তবু মনটা হু হু করে ওঠে যখন – সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ে - খোলা হলের ভেতর তাকাই । বিরাট প্রেক্ষাগৃহের ভেতরটা শুধু অন্ধকার নয় – বাংলা সিনেমার ইতিহাসও জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে বিরাট মুখব্যাদন করে আছে । – মনে করার চেষ্টা করি শেষবার সিনেমা দেখতে এসে কোথায় বসেছিলাম । যতদূর মনে পড়ে – আগে চিত্রা হলে হিন্দি সিনেমাই রিলিজ হত । - কিন্তু পরের দিকে বাংলা হিন্দি এমনকি ইংরিজি সিনেমাও রিলিজ হয়েছে ! ভেতরের দেওয়ালের কারুকাজ মোটামুটি একই ছিল । কিন্তু সিটের অবস্থান বদল হয়েছে । - অতি সম্প্রতি আরও একবার পালটানো হোল । যদি আরও দর্শক আনা যায় ! – কিন্তু – পতনোন্মুখ পাথরের গতি কে আটকাতে পারে ! সবাই এখন আইনক্স-গামী ! এই প্রসঙ্গে লিখি – আমেরিকাতেও ঠিক একইভাবে প্রেক্ষাগৃহের শেষ অবস্থা হয়েছিল । টেলিভিশন শিল্পের উন্নতির ফলে – সিঙ্গল স্ক্রিনের হলগুলোর প্রায় সমাপ্তি ঘটছিল । কিন্তু চলচ্চিত্র-শিল্পের অবনতি হয় নি ! – ক্রমে আইনক্সের টিকিটের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে আবার পুরনো হলেই ফিরে এসেছে দর্শকেরা । - একই সঙ্গে আইনক্সও চলছে সিনেমা হলও চলছে ! – এই কারনে আমি খুবই আশাবাদী ! – পুরনো হলগুলো এখনই মল বা ফ্ল্যাটবাড়িতে রূপান্তরিত না করাই সমীচীন হবে ! – কারন আমাদের সিনেমা-শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে ! দর্শক আবার ফিরে আসবেই ! এ-কথা ও-কথা সে-কথার আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে কেটে গেল প্রায় দুঘণ্টা । তার পর যখন ফেরার কথা বলেছি – তখনই আগামি সাক্ষাতের দিনটাও ঠিক করে নিতে চান । - খুবই মিশুকে খোলামেলা দর্জিপাড়ার মিত্তিরদের এই ভদ্রলোক । অথচ হলের ভার সামলাতে সামলাতে – না কোথাও ঘুরেছেন না কোন সামাজিকতা রক্ষা করেছেন। বিশ্বাস করুন – নিজের বিয়েটাও করে উঠতে পারেন নি ! যাইহোক, আমাদের তুলে দিতে এসে – দেখলাম তাঁর জনপ্রিয়তা । ওপার থেকে অনেকে এপারে এসে দাঁড়িয়েছে ওনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে ! – আমাদের গাড়িটা আসতে দেরি হচ্ছিল । ততক্ষণ ঐ প্রতিবেশী ও মিত্রার সহকর্মীরা আমাদের একটা ব্যারিকেড মতো করে ভিড়ের থেকে আটকাচ্ছিল ! – গাড়িটা সামনে আসতে আমরা উঠে পড়ি । পেছন ফিরে দেখি অনেক লোকের মধ্যেও কিরকম একাকী – ভীষণ একাকি একটা ফাঁকা সিনেমা হলের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের শেষ বাদশা ! মনোজ বেশ কিছুদিন আগে এনাকে নিয়েই একটা লেখা দিয়েছিলাম - আরেক সিনেমাওয়ালা ! তখনও মিত্র্রাকে রক্ত দেওয়া হচ্ছিল | তখনও চিন্তা করছিলাম - হয়ত বেঁচে যাবে এবার ! কিন্তু এবার মালিকই যে বিপন্ন ! কে কাকে বাঁচাবে ?

111

4

শিবাংশু

পুরিয়াধনাসি

সুখের গান একদিন থেমে যায়, শুধু গুঁড়ো গুঁড়ো সুখস্মৃতি ধুলোর সঙ্গে মাখামাখি হয়ে ছড়িয়ে যায় চরাচরে। কিন্তু বিষাদ সঙ্গীত কখনও ফুরোয়না। মিড় গমক মূর্চ্ছনার ধরন হয়তো পাল্টে যায় অনাগত প্রজন্মে, কিন্তু আরোহ অবরোহের স্বর একই থাকে। সেই গান যখন শুনি মিহির সেনগুপ্ত বা তপন রায়চৌধুরির মতো ওস্তাদদের থেকে তখন তার ঝলক হয়তো উজ্জ্বলতর, কিন্তু অন্যরাও যখন সেই রাগই ধরেন নিজস্ব ধরনে, চুপ করে শুনতে হয়। মার্সিয়া, কাফিয়ার কি কোনও জাত আছে? এই অলেখাটি তিন বছর আগে লিখেছিলুম। হঠাৎ ফিরে এলো আজ । আবার এমন একটা সময়ে যখন আমাদের নিজের দেশকে যেন অচেনা লাগতে শুরু করেছে। আমরা এপারের লোক। এই যে ছবিটা নীচে। এটা আমার প্রপিতামহের গ্রাম। কামারপুকুর থেকে গড়বেতার পথের ধারে। কিছুটা হুগলি, কিছুটা মেদিনীপুর। টাটার বড়োসাহেব পিতামহ প্রাসাদ হাঁকিয়েছিলেন গড়বেতায় রাধানগরে। স্টেশনের পাশে বর্ধিষ্ণু আধাশহর। কিন্তু আমাদের মামাবাড়ি ওপারে। দাদামশাই মাদারিপুর, দিদিমা চাঁদসি। দ্যাশে সম্পন্ন গৃহস্থ, উচ্চমধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী ছিলেন জামশেদপুরে। অনাড়ম্বর জীবন কাটাতেন খোট্টাদের দেশে আর প্রতিমাসে রোজগারের সিংহভাগ মনিঅর্ডারে যেতো দ্যাশে দাদার কাছে আরও জমি কেনার ইচ্ছায়। দাদার পোস্টকার্ড মাঝেমাঝেই, অমুকের zমি সস্তায় পাইলাম। মনে মনে বেড়ে উঠতো অবসরের পর দ্যাশে গিয়ে আদিগন্ত নিজের জমি দেখতে দেখতে একটু অম্বুরি তামাকের স্বপ্নবিলাস। পাঁচ মেয়ের বাবা। অন্য লোকে তাঁর জন্য দুশ্চিন্তা করলে নাকি বলতেন, আমার টাকা খায় কে? আরও অনেক অনেক লোকের মতো বিশ্বাসই করতে চাননি একদিন বুলবুলি ধান খেয়ে যেতে পারে। যখন সত্যিই বুলবুলি ধান খেয়ে গেলো, সাত মাসের মধ্যে সেরিব্রাল ও পক্ষাঘাত। প্রাণোচ্ছল, উচ্চপদাসীন মানুষটি নির্বাক, শয্যাশ্রয়ী হয়ে আরও বছর খানেক জীবনটিকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। ডাক্তার বিধান রায় দিদিমাকে বলেছিলেন, এঁর চিকিৎসার পিছনে আর খরচ কোরোনা, যা খুদকুঁড়ো বেঁচেছে তা দিয়ে মেয়েদের বিয়ে দাও। তার পর আরও কোটি মানুষের মতো শুধু লড়াইয়ের গল্প। মাদারিপুর আর কামারপুকুরের দিগন্তরেখা মিশে যায় মানুষের কান্না-ঘাম-রক্তে। মানুষগুলি আলাদা, কিন্তু গল্পগুলি সব একরকম। আমাদের দেশও তো এরকমই। কিন্তু সবার গল্পই মনে হয় যেন আরো শুনি। আমাদের পরের প্রজন্মে এর কোনও ছাপ থাকবে না, জলের আল্পনার মতো মিলিয়ে যাবে। কিন্তু যতোক্ষণ আমরা আছি এতো ফুরোবার নয়। কিন্তু ভোটছাপের রাজারা তো শোনেনা আমাদের গল্প। তারা বলে ভালোবাসা অলীক বস্তু। "...যুদ্ধ শেষ হ’য়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দীরোল; মানুষের লালসার শেষ নেই; উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু ক্ষণ অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ অপরের মুখ ম্লান ক’রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই। কেবলি আসন থেকে বড়ো, নবতর সিংহাসনে যাওয়া ছাড়া গতি নেই কোনো। মানুষের দুঃখ কষ্ট মিথ্যা নিষ্ফলতা বেড়ে যায়।" ব্যাধের জাল থেকে পাখি উড়ে যাওয়ার গল্পের মতো। কিন্তু কোন আকাশে যাবে পাখি? সিরিয়া থেকে সারাজেভো, কুর্দিস্তান থেকে পাকিস্তান.... কোথাও কি আকাশ বেঁচেছে কিছু?

130

6

Joy

ভোটের রঙ্গ-তামাশা ও আমরা দ্যাশবাসী...

আসব আসব করে এসেই গেল এবারের লোকসভা নির্বাচন| ভোট এলেই প্রতিবারের মত এবারেও অলোচনা‚ চর্চা‚ ভোট প্রচার‚ দেওয়াল লিখন‚ মীটিং‚ মিছিলের ভোট রঙ্গ| তিনটি দল বা সম্মিলিত শক্তি এবারের মুখ্য ভুমিকায়| কংগ্রেস‚ বিজেপি-এনডিএ এবং আঞ্চলিক দলগুলির জোট| জোট না ঘোট সেটা সময়ই বলবে| তবে এই জোট উত্তরপ্রদেশে এসপি-বিএসপি‚ পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস‚ ওড়িশায় বিজেডি‚ অন্ধ্রে টিডিপি‚ বিহারে আরজেডি এই দলগুলো বিজেপিকে কড়া টক্কর দেবে মনে হয়| পশ্চিম বঙ্গে বিজেপি দুটো-তিনটির বেশি আসন পাবে বলে মনে হয় না| এখানে সারদা-রোজভ্যালির মত আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে| পুলিশ-প্রশাসনেও দুর্নীতি| যা আগের সরকারের আমলেও ছিল‚ কিন্তু এখন অনেক বেশী হয়েছে| পাড়ায় পাড়ায় সিন্ডিকেট রাজ মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়েছে| এখানে সবাই রাজা| মস্তানদের আবার অনেক শাখা-প্রশাখা| যদিও দিদির ও দাদাদের কথায় কন্যাশ্রী‚ যুবশ্রী‚ সবুজসাথী আর নীল-সাদায় রং এ শ্রী ফিরেছে রাজ্যের| মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তা কমলেও আসনের কোনো হেরফের হবে বলে মনে হয় না| চারদিকে ফ্ল্যাগ‚ পোস্টার‚ দেওয়াল লিখন শুধু তৃণমূলের দখলে| ৯০% আর কোনো দলের প্রচার নেই| এককালের প্রভাবশালী সিপিএম পার্টির কয়েকজন সদস্যের দু:খ করে বলছিলেন সব দেওয়াল ওরা দখল করে নিয়েছে‚ আমরা কোথায় লিখব‚ বলুন তো? মনে পরে গেল কয়েক বছর আগের পুনরাবৃত্তি| সেই সময় সব দেওয়াল সিপিএম এর দখলে থাকত| পাড়ায় পাড়ায় ফ্ল্যাগ-ফেস্টুনে ভরে যেত| শুধু রংটা বদলে গেছে‚ বাকিটা একই আছে| বরং আরও খারাপই হয়েছে| পশ্চিম বঙ্গে একটা ট্রেন্ড অনেক দিন ধরেই দেখে আসছি এখানে যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা অনেকদিন ধরে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকে| আর সেই সময় বিরোধী দলগুলো খুব নগন্য বা গুটিয়ে থাকে| প্রতিপক্ষ দল ভালো না হলে যা হয় একছত্র আধিপত্য‚ স্বজন পোষন‚ দুর্নীতি ইত্যাদি| যা গনতন্ত্রের জন্যে মোটেও ভালো নয়| দিল্লিতেই একই অবস্থা| মোদী সরকারের প্রতিপক্ষ দল বলতে কংগ্রেস| সেই বিজেপির কাছে খুব কম শক্তিশালী| তবুও রাহুল গান্ধী আগের তুলনায় এখন অনেক পরিনত| গত পাঁচবছরে বিজেপি শাসিত মোদী সরকারের সুফলের প্রচার খুব ভাল ভাবে প্রচার হলেও অনেক প্রশ্ন থেকেই যায়| বিগত কয়েক বছরে রাহুল গান্ধী দেশের প্রতিটি প্রান্ত চষে ফেলেছেন| যেভাবে তিনি অনিল আম্বানীর কোম্পানীর রাফাল বিমান কেনা-বেচার মত ভয়ংকর দুর্নীতি নিয়ে প্রচার‚ চৌকিদার চোর হ্যায়‚ নোটবন্ধীর অসাফল্য জনমানসে কতটা প্রভাব ফেলে সেটা ভোটের বাক্সেই প্রমান হবে| আর ভোটের প্রচারে বোন প্রিয়ংকা গান্ধী বঢ়রাকে নিয়ে এসে কিছুটা চমক তো দিয়েছেন সেটা বলতেই হবে| কিন্তু প্রিয়ংকা গান্ধী শুধু ভোট প্রচারে না এসে ভোটে প্রতিদ্বন্বিতা করলে হয়ত ফলাফলটা অনেকটা অন্যরকম হত| প্রিয়ংকার চলাফেরা‚ দেখার সঙ্গে তার ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধীর অনেক মিল আছে| কিন্তু স্বামী রবার্ট বঢ়রার দুর্নীতির তদন্তের কারনেই মনে হয় তিনি পিছু হটলেন| পাঁচ বছর আগের মোদী আর এখন মোদীর অনেকটাই পার্থক্য আছে| তখন দেশের মানুষ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের বদলে বিজেপিকে কে চাইছিলেন| পরিবর্তন চেয়েছিলেন| মানুষের আশা-আঙ্খাখা অনেক ছিল| কিন্তু এই কয়বছরে তাদের সেই আশা ভরসা বেশির ভাগই পূরণ হয় নি| জাতীয়বাদে দেশবাসীকে আপ্লুত করে দিয়েছে বিজেপি ও তার সরকার| উরি ও তরপর সার্জিক্যাল আক্রমন হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে| কতটা সফল হয়েছে সেই অভিযান সেটা তর্ক সাপেক্ষ| প্রাচার প্রচুর হয়েছে| আমার দেশবাসী জাতীয়তাবাদে গদগদ হয়ে গেছি| এর আগে কোন যুদ্ধই হয়নি পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে আমাদের| এই প্রথমবার| তবে এর আগে এত প্রচার হয়নি|এত আক্রমনের পরেও পাকিস্তাএর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মোদী তথা বিজেপি সরকারের প্রতি সমর্থন জানানো গট আপ খেলা নয় তো? কে জানে রাজনীতিতে কত কিছুই তো হয়| বিজেপি এলে রামমন্দির হবেই হবেই| লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হবে| হিন্দুত্বদের দিকে আমরা আর ধাপ এগিয়ে যাব| গরুর মাংস খাওয়া| গরুর নাম করে খাসির মাংস ভক্ষনকারীদের পিটিয়ে মারা হবে| ভোটের জন্যে নগ্ন সাম্প্রদায়িকতাকে জিইয়ে রাখব| এখন ফেসবুকে হঠাৎ করে দেখি প্রচুর দেশভক্ত মানুষজন| যারা কিছু বিকৃত ভিডিও দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে| উস্কে দেয় সাম্প্রদায়িকতাকে| পুলওয়া হামলার পর পাড়ায় পাড়ায় বাকইধারী কিছু উটকো যুবকদের বন্দেমাতরম আর বিজেপির শ্লোগান খটকা লাগে এরা কারা| যত দেশভক্তি কি বিজেপির ই আমদানী? আমাদের প্রতিবেশী বেশিরভাগ দেশগুলির সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো নয়| এটা কি বিজেপি সরকারের ব্যর্থতা নয়| আমেরিকা সুপার পাওয়ার একটি দেশ কিন্তু শুধু আমেরিকাকে সন্তুষ্ট রাখলেই হবে না| মানুষ গরীব থেকে গরীবতর হয়েছে| এই সরকারের আমলেও অনেক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে| পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলির মত কেন্দ্রেও সেই রকম ইস্যু গুলো কেউ সেই ভাবে তুলে ধরতে পারেনি| রাহুল গান্ধী কিছুটা চেষ্টা করেছেন| তবে উত্তরপ্রদেশে সপা-বসপা এর সঙ্গে জোট বেঁধে যদি কংগ্রেস ভোটে লড়াই করত‚ তবে বিজেপির আসন অনেক কম হত| যদিও প্রচার ও অর্থ ক্ষমতায় বিজেপি লোকসভা ভোটের লড়াইতে অনেকটা এগিয়ে থাকবে| কংগ্রেস সব রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে ভালো ভাবে জোট বন্ধন করতে পারেনি| তবে এবারে বিজেপির আসন সংখ্যা আগের বারের থেকে কমবে তা বলাই বাহুল্য| আর পরে থাকে মমতার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক দলগুলির জোট বন্ধন| এরা ঠিকভাবে একইসুত্রে বেঁধে ভোটে লড়াই করলে এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা অন্যরকম হতেই পারে| তবে এই জোট কতটা ভালো দেশের জন্যে| আর কতদিন ঠিক থাকবে এই জোটের বন্ধন সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়| জোট মানেই জোট বদ্ধ সব পার্টির নিজের নিজের পার্টির ও নেতা-নেত্রীর অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে| দেশ অনেক পরে| তার মধ্যে অনেকেই আবার দুর্নীতিগ্রস্থ| পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দুটো-তিনটে আসন পেলও অনেক পাওয়া বলা যাবে| মুর্শিদাবাদে অধীরের দুর্গে ভাঙ্ন ধরেছে| আর অধীরের সেই একছত্র আধিপত্য আর নেই| মালদা আর রায়গঞ্জে কংগ্রেস কি করে দেখা যাক| সিপিএম তথা বামফ্রন্টের একটি আসনও পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিনা| যদিও রাজ্যে কংগ্রেস-সিপিএম জোট হত তাহলে দুপক্ষেরই কিছু লাভ হত| কিন্তু না হওয়াতে দিদির পোয়াবারো| দেওয়ালে দেওয়ালে তৃণমূলের শ্লোগান বিয়াল্লিশে-৪২| কোনো বিরোধী নেই| ভ্য় হয় সুস্থ গনতন্ত্র থাকবে তো?? লেখাটা কোন দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়| ভোটের আগে এই রকম আলোচনা হওয়া উচিত বলেই আমার মনে হয়| তাহলে আমরা অনেক সচেতন ভাবে ভোট দিতে পারি| আলোচনা চলুক| আপনাদের মূল্যবান মতামত দিয়ে ব্লগটি সমৃদ্ধ করুন| যে কেউ এখানে অংশ গ্রহন করতে পারেন| তবে কোন ব্যক্তি আক্রমণ বা কুৎসা নয়| যুক্তি‚ তথ্য সমৃদ্ধ হোক আপনার আলোচনা| অপেক্ষায় থাকলাম| দিব্যেন্দু মজুমদার

156

3

জল

দীঘা ডায়েরী

31/03/19 - ভোর পাঁচটা ................| মনটা বেশ খারাপ| কখন থেকে উঠে বসে আছি‚ অথচ আকাশের মুখ ভার| আজও সানরাইজ দেখা হবে না| থোকা থোকা মেঘ আকাশের বুকে ইতি-উতি উড়ে চলেছে| দেখা যখন হবেই না‚ তখন না হয় একটু পরেই যাব মনে করে আবার গড়াবার প্ল্যান করি| কিন্তু একবার উঠে পড়লে হাজার চেষ্টা করেও আমি আর গড়াতে পারি না| অতএব ঘুমুন্ত গুল্লুর কানে কানে বলি 'সমুদ্রে পা ভেজাবি তো চল"| মন্ত্রের মত কাজ হয়ে‚ যাকে তোলাটাই বেশ কষ্টের‚ নিমেষে উঠে রেডি হয়ে নেয়| এত সকালেই চায়ের দোকানে ভিড় উপচে পড়েছে| বেশ কিছু পর্যটক এসে অপেক্ষা করছে রাস্তার মোড়ে চেক ইন করবে বলে| চেক ইন টাইম সকাল দশটা| সব হোটেলেই এটাই এখন নিয়ম| এবারে একটা জিনিস নজরে পড়ল যে আগের কয়েকবার একেবারেই লক্ষ্য পড়েনি‚ সেটা হল প্রচুর মুসলিমরা দীঘাতে আজকাল বেড়াতে আসছে| এত সকালেই রাতে মোমো‚ চাউমিন দিনে কচুরির দোকানে কচুরি ভাজার প্রস্তুতি চলেছে| অন্যান্য খাবার দোকানেও প্রস্তুতি চুড়ান্ত| আমরা আজ সরাসরি সমুদ্রপাড়ে না গিয়ে‚ সমুদ্রপাড় ধরে নিউদীঘার দিকে হাঁটতে থাকি| আমাদের মতই অনেকে হাঁটছে| এখনও গতদিনের বর্জ্য পুরোপুরি পরিস্কার হয়নি‚ ঝাড়ু চলেছে কোথাও কোথাও| পাড়ে বাঁধানো থানের ওপর অনেকেই ব্যাগ মাথায় দিয়ে শীতল হাওয়ায় ঘুমোচ্ছে| মেয়ে-পুরুষ দুই আছে| মেঘলা আকাশ সকালের হাওয়ায় হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে| অনেকটা হেঁটে চলে যাই| এবার আবার ফিরতি পথে হাঁটা| যারা এতক্ষণ ব্যাগ মাথায় দিয়ে ঘুমোচ্ছিলো‚ তারা এখন সমুদ্রে নেমে পড়েছে| সম্ভব্ত স্থানীয় লোক| সমুদ্রে স্নান করে‚ সুলভ শৌচালয়ে বাকি কাজ সেরে আশে পাশে ঘুরে‚ হোটেলে খেয়ে সন্ধ্যায় হয়ত ফিরে যাবে| এখন তো সুলভ শৌচালয় এতগুলো যে সেখানেই স্নানসহ প্রাত্যহিক কাজ অনায়াসেই সেরে নেওয়া যায়| আজকের সমুদ্র বেশ উত্তাল| অনেকটা ওপর অবধি জল উঠে আসছে| শেষবারের মত পা ভিজিয়ে নেওয়া| রোদের আতস এখনো তেমন নেই| আলোর রেখা মেঘ থেকে মেঘে চুঁইয়ে গেলেও রোদের দেখা নেই| সূর্য লুকিয়ে মেঘের আড়ালে| সাতটা বাজতে চলেছে| হোটেলে ফিরি‚ সেই কচুরির দোকানে মস্ত ভিড়| এত সকালেই গরম গরম কচুরি পাতে পাতে| স্নান করে নিচে নেমে চা খেয়ে আমরা সমুদ্রপাড়ের সেই কচুরির দোকানেই চলে আসি| সকালের প্রাতরাশটা একটু বেশিই করে নিতে হবে‚ কারণ দুপুর বারোটার আগে কোন হোটেলেই ভাত মিলবে না| আমাদের হোটেল রেঁস্তোরাতেও নয়| এখন রেলওয়ে সময় মেনে চলে হোটেলগুলো| প্রচন্ড ভিড় দোকানে| ছ থেকে সাতজন হিমশিম খাচ্ছে| কেউ বেলছে‚ কেউ পুর ভরছে‚ কেউ ভাজছে‚ কেউ খেতে দিচ্ছে‚ কেউ ধুচ্ছে আর ভিতরে মস্ত ডেকচিতে চলেছে ময়দা মাখা| ৬ টা কচুরি কুড়ি টাকা| দু প্লেট নেওয়া হল| সত্যি খেতে ভালো কচুরি আর তরকারী| তরকারী ভালো না হলে কচুরি খেয়ে মজা নেই| কিন্তু এত বাতাসার সই কতক্ষণ থাকবে পেটে কে জানে? কচুরি গুল্লুও খেল খাবো না খাবো না করে| কেউ কেউ আবার প্যাকও করে নিচ্ছে| কচুরি খেয়ে আরও মিনিট কুড়ি বসি‚ রোদ এখন চড়চড় করে বাড়ছে| শুধু শুধু সকালটা মেঘে ঢেকে রাখল| আর সময় নেই| সকাল সাড়ে নটায় চেক আউট| গ্রেস টাইম আধঘন্টা| তারপরেও থাকতে হলে ওয়েটিংরুমে ওয়েট করা| আমাদের সব গোছানো একরকম‚ তাও শেষপর্যায়ের পাড়ে থাকা জিনিস সব গুছিয়ে নি| ঠিক দশটায় রিসেপশনে ফোন করতেই ওদের লোক এসে সব দেখে নেয়| রুটিন ব্যাপার| আমাদের হোটেল থেকে অটোস্ট্যান্ড একটুখানি| অটো ভর্তি না হলে ছাড়বে না| এইসব অটো উদয়পুর যাবে‚ উদয়পুর মাথাপিছু পঞ্চাশ| ল্যাগেজের জন্যও ভাড়া দিতে হল| নেমে গেলাম বাসগুমটিতে| পরপর বাস ছাড়ছে| ট্রেন না পেয়ে বেশিরভাগই বাসে ফিরছে| ট্রেনে ওয়েটিং চলছে ৩৫০| অতএব বাসই ভরসা| আমাদের বাস ১১-০০ টায়| এখন সাড়ে দশটা| বসি| আমাদের বাসের কোন খবর হয় না| তার মাঝেই পরের বাস বেড়িয়ে যায়| তাত বাড়ছে| এবার যেন মন ফেরার জন্য উদগ্রীব| মন সত্যিই বিচিত্র| একটু আগেই খারাপ লাগছিল এখন আবার ঘরে ফেরার টান| ১১-২০ তে বাসের খবর হয়| মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে বাস ছেড়ে দেয়| যতদূর দেখা যায় সমুদ্র চোখে পড়ে| হঠাৎ করেই চোখে পড়ে কোকলা হাউস| এতবার এসেছি‚ কোনদিন তো দেখিনি‚ এবার প্রথম চোখে পড়ল| আমার মায়ের পিসতুতো দাদার বাড়ি| এ বাড়ির কিছু অন্য গল্প আছে| এই কোকলা আর কোকের মধ্যে মিশিয়ে ফেলার একটা সমস্যা ছোটবেলাতে ছিল| কিন্তু দুটোর কোন মিলই নেই| কোকলা ছিল একটা হেয়ার ওয়েলের কোম্পানী| মায়ের পিসেমশায় মাথায় করে ফেরি করতে করতেই একসময় মস্ত কোম্পানী খুলে ফেলেছিলেন| সেই তেল বিক্রি করে কিনে ফেলেছিল কলকাতায় আরপুলি লেনে মস্ত বাড়ি| ঠিক এই বাড়ির গায়েই আমার পিসিমণি বাড়ি কিনেছিলেন| এখনও আছে| পরে মায়ের পিসতুতো ভাইরা ব্যবসা আরও বড় করে ফেলে| অন্যান্য অনেক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে| অর্থ সমাগম জলের মত হতে থাকে| এসবই মায়ের কাছে শোনা| মা এসবই দাদামশায়ের কাছে শুনেছিলেন| কারণ তখন তো মা জন্মাননি| পরে মা'ও কিছু কিছু দেখেছিলেন|প্রসঙ্গ্ত আরপুলি লেনের কোকলা বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়| সেখানেই ভাড়া নিয়ে আমার বিয়ে হয়েছিল| সে যাই হোক‚ একটা বাড়ি থেকে একাধিক বাড়ি‚ সম্পত্তি হয়| এই পারিবারিক ইতিহাস খুবই আকর্ষণীয়| তবে এর বেশি এ স্থলে আর বলা সম্ভব নয়| তাদেরই একটা বাড়ি কোকলা হাউস| এখন মনে হয় ভাড়া দেওয়া হয়| বাসটা খুব ভালো চালাচ্ছেন| আসার দিনে ঠিক যতটা উৎসাহ থাকে ফেরার দিনে কিন্তু ততটা থাকে না| গুল্লু তো গাড়ি দীঘা ছাড়ার আগেই ঘুমে কাদা হয়ে গেছে| আমাদেরও ঝিমুনি আসছে| কনটাই পৌঁছেই বাসের ভিড় দেখে কে? যেখান থেকে যতলোক যেন এই বাসেই উঠেছে| চারিদিকে ধানের খেতে সোনালী ধান‚ কোথাও কোথাও আবার সুড়কির সরু রাস্তার ওপর পলিথিন পেড়ে শুকোনো হচ্ছে ধান| সেই ধানের ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছে সাইকেল| ক্ষেতে চাষ চলছে| শহর আর গ্রাম যেন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে| চন্ডীপুর পেরিয়ে যায় বাস| দুপুর একটা বেজে গেছে| গুল্লু উশফিশ করে| তুলে দি ঘুম থেকে| সেই সকাল নটা'র আগে বাতাসার মত হালকা কচুরি কি আর এতক্ষণ পেটে থাকে? বিস্কুট দি| খিদে পেয়েছে‚ খেয়ে নেয়| আমিও শুকনো মুখে বসে থাকি না| বেচারা দীপঙ্কর এমন ম্যানিয়াগ্রস্থ যে খালি পেটের ভয়ে জল বাদে আর কিছুই খায় না| দুপুর ২-২০ ... বাস এখন কোলাঘাটে| দশ মিনিটের ব্রেক| পা ছাড়াতে নিচে নামি| চাঁদিফাটা রোদ কাকে বলে| শশা কিনতে বলি| টুকটাক লজেন্স‚ বাদাম এসবও কিনি| এখনো দুঘন্টার জার্নি| বাস ছাড়ে| একাধিক কোম্পানীর সিমেন্ট ফ্যাক্টরী চোখে পড়ে| চেনা নাম‚ চেনা লোগো| একই দৃশ্য| মাঝে মাঝেই কীর্তনের বোল ভেসে আসে| দূরে কটা পানের বরোজ চোখে পড়ে| বালিপাথুরে মাটি পানচাষের উপযুক্ত| ঝন্টু বলেছিল‚ পান চাষ করে কেউ রাজা আবার কেউ ফকির হয়ে যেতে পারে| ধুলাগড় পেরিয়ে গেছি| আর যেন তর সইছে না| পিছনের সিটে বসে থাকা বাচ্চাটা আর পারছে| গুল্লুও না| 'কখন নামব মামমাম?' 'এই তো সাড়ে চারটের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাব|' আবার সেই বকবকানি| দোতলা বাস দেখব বলে চোখ মেলে বসেছিলাম‚ কিন্তু বাসটা অন্য রাস্তা নিয়েছে মনে হয়| বালির নতুন ব্রিজটা দিয়ে চলে এলাম খুব সহজেই| বিকেল ৪-২০‚ আমাদের স্টপেজে নেমে পড়ি| বাকি রাস্তা গুল্লুই ল্যাগেজ ব্যাগটা টেনে বাড়ি ফেরে| আবার সেই থোরবড়ি জীবনে ফিরে আসা| অথ দীঘা ডায়েরী|

246

24

মুনিয়া

আঁকি-বুকি

বিগত কয়েক মাস ধরে অপেক্ষার পরে অবশেষে সপ্তাহ দুয়েক আগে হাতে পেয়েছি মিশেল ওবামার আত্মজীবনী‚ ‘Becoming’| আমার আগে হাজারখানেক খানেক লোকের লাইন ছিল‚ আমার পরেও হাজারখানেক লোক পড়ার আশায় বসে আছে| পড়ার সময় সীমা তিন সপ্তাহ‚ যার মধ্যে সপ্তাহ দুই এখনই অতিক্রান্ত! অথচ অর্ধেকও শেষ হয়নি| তাই জলে‚ স্থলে‚ জঙ্গলে একে সাথে নিয়ে ঘুরছি আর যখনই সময় পাচ্ছি‚ গোগ্রাসে গিলছি| সত্যি খুব ভালো লাগছে| আত্মজীবনী পড়তে এমনিতেই ভালোবাসি| আর পছন্দের ব্যক্তির আত্মজীবনী হলে তো কথাই নেই! ষাটের দশকের আমেরিকার শিকাগো শহরের এক কালো‚ অর্থনৈতিক দিক থেকে নিম্ন শ্রেণীর‚ কিন্তু কৌলিন্যে ধনী পরিবারের কথা জানতে পারছি| দ্রুত পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মাঝে মধ্যেই থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে কোনো কোনোখানে| নিজেদের কৃষ্টি‚ কালচারের সঙ্গে তুলনা এসেই যায়| আমাদের সংস্কৃতি‚ চিন্তা-ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গির কত পার্থক্য‚ ভাবতে বাধ্য হই| যেমন বাবার কথায় একজায়গায় তিনি লিখেছেন..| তার আগে জানাই‚ মিশেল ওবামার ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা Multiple sclerosis রোগে অসুস্থ থাকতেন| কিন্তু কোনোদিনও ডাক্তারের কাছে যাননি| কেউ কেমন আছেন জানতে চাইলে সংক্ষেপে ভালো থাকার বার্তা জানিয়েই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি অন্য প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতেন| অনেক বছর পরে‚ মিশেল ওবামা যখন ল ফার্মে চাকরি করেন‚ এমন একদিন‚ ওঁর মা বেরিয়ে গেছেন কাজে‚ বাবা নিচের তলায় আর মিশেল ওপরের তলায় কাজে যেতে প্রস্তুত হচ্ছেন| তখন তাঁর বাবার চলাফেরা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল| বহু সময় নিয়ে‚ শারীরিক বেদনা নিয়ে তিনি স্বপ্ল দূরত্ব অতিক্রম করতেন| কিন্তু নিজের কষ্ট এবং যন্ত্রণার কথা ভুলেও কারুর কাছে উল্লেখ করতেন না| যাইহোক‚ সেইদিন পেছনের দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেয়ে মিশেল দোতলা থেকে বুঝলেন যে তাঁর বাবা এইবারে কাজে বেরিয়ে গেলেন| খানিক পরে নীচে রান্নাঘরে এসে তিনি দেখতে পেলেন বাবার শূন্য ওয়াকারটা‚ যার আশ্রয় নিয়ে তিনি ঘরের মধ্যে চলাফেরা করেন‚ সেটা পেছনের দরজার পাশে রাখা আছে| কি মনে হওয়াতে‚ মিশেল পেছনের দরজার কাচের peephole দিয়ে গ্যারাজে দিকে উঁকি দিলেন| তিনি নিশ্চিত ছিলেন দেখবেন যে বাবা‚ তাঁর নিজস্ব ভ্যান গাড়িটা চালিয়ে এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে গেছেন| কিন্তু তারবদলে তিনি দেখলেন‚ ভ্যানটা এখনো সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে আর তাঁর বাবা সিঁড়ি দিয়ে খানিক নেমেই ব্যথায়‚ ক্লান্তিতে সেখানেই বসে রয়েছেন| “…he looked just too weary to carry on. It seemed clear he was trying to summon enough strength to turn around and come back inside.” তিনি লিখেছেন‚ “Seeing my dad on the stoop, I ached in a way I never had. My instinct was to rush outside and help him back into the warm house…” মিশেল কিন্তু সেদিন শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাকে দমন করে রেখেছিলেন| চেষ্টা করে নিজের কষ্টকে সরিয়ে রেখে তাঁর বাবার জুতোয় পা রেখে ঘটনাটির তাৎপর্য চিন্তা করে দেখেছিলেন| বুঝেছিলেন‚ তাঁর বাবার যেরকম আত্মসম্মান জ্ঞান তাতে করে ঐ অবস্থায় দৌড়ে গিয়ে যদি তিনি বাবাকে সাহায্য করেন তবে “… it would be just another blow to his dignity.“ তাই সেদিন দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে ধীরে ধীরে তিনি দরজা থেকে সরে গিয়ে আবার ওপরের তলায় চলে গেছিলেন| এই ব্যাপারটা আমাকে খুব নাড়া দিয়ে গেল| আপনারা ভেবে দেখুন‚ আমরা হলে কি করতাম? বাবার সম্মানের‚ আত্মবিশ্বাসের কথা ভেবে মিশেলের মত বাবাকে সময় দিতাম নাকি তাঁকে অমন অবস্থায় দেখে কেঁদে কঁকিয়ে ছুটে যেতাম? তাঁকে উদ্ধার করে পরম যত্নে-মমতায়-ভালোবাসায় অথবা প্রচন্ড বকাবকি করে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসতাম না কি? ভালো কি মন্দ জানিনা‚ কিন্তু নিজের দুর্ভাবনা‚ কষ্টকে নিজের ভেতরে রেখে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঘটনার বিচার করে এইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া‚ যতই কাছের‚ যতই ঘনিষ্ট সম্পর্ক হোক না কেন‚ নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রেখে অপর ব্যক্তি কি চাইছে বা সে কিসে স্বচ্ছন্দবোধ করবে তাতে প্রাধান্য দেওয়া‚ এই অভিনব ব্যাপারটা এদেশে এসে প্রথম উপলব্ধি করি| সেইজন্যে আগে নিজের যে সমস্ত কাজকে অন্যের সুবিধার্থে করছি ভেবে মনে মনে সন্তুষ্টিবোধ করতাম‚ তা সত্যিই কতটা নিজের কথা ভেবে ( যে সে কষ্টে থাকলে আমারো কষ্ট বা গিল্টি হবে)‚ আর কতটা অন্যের ইচ্ছে অনিচ্ছে উপলব্ধি করে‚ নিজেকে সেই প্রশ্ন করি বারে বারে| মিশেল ভেবেছিলেন খানিক অপেক্ষা পরে বাবা যখন নিজের ক্ষমতায় ঘরের ভেতরে উঠে আসবেন‚ তখন তিনি এগিয়ে গিয়ে বাবার জন্য করণীয় যা কিছু ব্যবস্থা নেবেন| পাঁচ মিনিট‚ আরো পাঁচ মিনিট‚ আরো খানিক অপেক্ষা করার পরেও মিশেল যখন দেখলেন বাবা আসছেন না| তখন তিনি আবার নীচে নেমে এলেন| দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখলেন‚ অসম্ভব শরীর খারাপ হওয়া সত্বেও তাঁর বাবা কখন যেন সিঁড়ি থেকে উঠে গাড়ি চালিয়ে কাজে বেরিয়ে গেছেন| দশকের পর দশক ধরে প্রচন্ড শরীরের কষ্ট সহ্য করেও তিনি একদিনও তাঁর কাজে অনুপস্থিত থাকেন নি|

2578

168

দীপঙ্কর বসু

অরণ্যবাসী এক শিল্পীর সঙ্গে কয়েকঘন্টা

পূর্ণেন্দু মাহাতো –অরণ্যচারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই শিল্পীর নামটাই শুধু শুনেছিলাম জামশেদপুরে থাকা কালে। কিন্তু পরিচয় ছিলনা – সে সূযোগ ও পাইনি এতকাল । এবারে দৈবক্রমে সেই দুর্লভ সূযোগ পেয়ে গেলাম । সিংভুমের বসন্ত বনে ক্ষ্যাপা হাওয়ার মত এলোমেলো ছুটে বেড়ানোর এক ফাঁকে গিয়ে উপস্থিত হলাম পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা শিল্পীর টালির চাল ওয়ালা বাড়িতে । চমৎকার পরিশীলিত ইংরিজিতে আমাদের অভ্যর্থনা করলেন পূর্ণেন্দু মাহাতো এবং তাঁর স্ত্রী রচনা মাহাতো । কর্মব্যস্ত ইস্পাত নগরীর কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে প্রায় নির্জন পাহাড়ের কোলে বসে পূর্ণেন্দু পেতেছেন তাঁর খেলাঘর । ছোট্ট বাড়িটিকে ঘিরে রয়েছে বিশাল বাগান - সেখানে ইতস্ততঃ ছড়ানো শিল্পীর গড়া কিছু মূর্তি ।নজর কাড়ল আদিবাসী সম্প্রদায়ের দুই শ্রদ্ধেয় পুরুষ – বিরসা মুন্ডা ও নির্মল মাহাতোর আবক্ষ মূর্তি দুটি । তাছাড়াও পাহাড় জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কাঠের টুকরো ,গাছের ডাল সংগ্রহ করে যে ভাবে অসাধারণ নৈপূন্যে তাদের মধ্যে সুপ্ত রূপকে ভাষা দিয়েছেন ,তা মনে করিয়ে দেয় অবনীন্দ্রনাথের “কুটুমকাটাম”দের কথা। কিন্তু সে সবই পূর্ণেন্দু মাহতোর খন্ডিত পরিচয় মাত্র । বরোদার MS Univarsity র কলা বিভাগের ছাত্র হিসেবে গ্রাফিক্স বিষয়ে পঠন-পাঠন চলা কালে এবং পরবর্তী সময়ে সাইকেল চেপে ভারতবর্ষ তথা ইউরোপ পরিভ্রমন করার কালে শিল্পী তাঁর নিজস্ব মাটি,সিংভুম তথা সংলগ্ন এলাকা গুলির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন । যে ভাবে ইউরোপের ক্ষুদ্রতম শহরে বা গ্রামে ও বিভিন্ন সংস্থা কী বিপুল উদ্যমে স্থানীয় শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং প্রচারের সুচারু ব্যবস্থা করেছেন তা পূর্ণেন্দুর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে আজও । অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পূর্ণেন্দু স্বীকার করেন British Museum এর Curator of Indian Antiquities বিভাগের Richard Blurton এর দিগদর্শনের ঋণ । Richard Blurton পূর্ণেন্দুকে তাঁর নিজভূমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সে বিষয়ে অবশ্য পাঠ্য বইয়ের একটি তালিকাও তৈরি করে দেন । ১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে দেশে ফিরে পূর্ণেন্দুর মনযোগ আকর্ষণ করে চান্ডিল এ সুবর্ণরেখা নদী বাঁধ নির্মান প্রকল্পের এলাকাভুক্ত দুলমি ,ইচাগড় ও তৎসংলগ্ন কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চিরদিনের মত জলের অতলে তলিয়ে হয়ে যাবার বিষয়টি । আসন্ন বিপদের মুখে শুধু এলাকার বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হবার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ প্রত্নতাত্বিক সম্পদও নিশ্চিতভাবে চিরকালের মত অবলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়ে ছিল । ঠিক এই অবস্থায় সময় অপচয় না করে পূর্ণেন্দু তাঁর প্রিয় বাহন সাইকেলে চেপে গোটা এলাকাটা ঘুরে ওই অঞ্চলের একটি রিপোর্ট তৈরি করে ফেলেন এবং তারই ভিত্তিতে ভারতীয় পুরাতত্ব বিভাগকে রাজি করান এলাকাটিতে অনুসন্ধান ও খননএর কাজে নামতে ।অবশ্য এ কাজে তিনি আরো বহু মানুষের সক্রিয় সহায়তা পেয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলেন পূর্ণেন্দুর শিক্ষক সহপাঠী ,টাটা স্টীল এর রুসি মোদি । একই সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষনের কাজে পাশে পেয়ে গেলেন ছৌ শিল্পী রমেশ সিং মুন্ডা,স্থানীয় গ্রাম প্রধান সীতারাম মাহাত এবং তাঁর অপর এক সহযোগী আনন্দী মাহাতো কে ।এদের সহায়তায় তৈরি হল Aborigins’ society for art and recreation –সংক্ষেপে ASAR ।সংস্থাটি র তত্বাবধানে চান্ডিল নদীবাঁধের কাছেই রয়েছে “পাতকুম সংগ্রহশালা যেখানে সংরক্ষিত হয়েছে স্থানীয় এলাকাগুলি থেকে উদ্ধার করা বহু প্রত্নতাত্বিক বস্তু যার মধ্যে বেশ কিছু ভাস্কর্য দ্বাদশ –ত্রয়োদশ শতকের পাল ও সেন রাজত্বকালের সমসাময়িক। সংগ্রহশালার সামনেই তৈরি হয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ বা Amphitheater . যেখানে ASAR এর ব্যবস্থাপনায় চান্ডিল নদী বাঁধ নির্মাণের ফলে বাস্তুচ্যুত আদিবাসী জনসমুদায় ,যারা অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা একত্রিত হয়ে প্রতিবছর বিদাই-মিলন উৎসব পালনকরে ওই মুক্তমঞ্চে ।দুর্ভাগ্য ক্রমে পঁচিশ তিরিশ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সংগ্রহশালাটি স্বচক্ষে দেখে আসার মত সময় আমাদের হাতে ছিলনা ।সেটি পরবর্তী কোন এক সময়ে দেখতে যাবার মনবাসনা মনে রেখেই ফিরতে হল আমাদের ।

122

8

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

চান্নিপসর চান্নিপসর আহা রে আলো কে বেসেছে কে বেসেছে তাহারে ভালো..... পাগলি‚ খুব অবাক হয়ে গেলে তো এই চিঠি পেয়ে? আমিও কম অবাক হই নি লিখতে শুরু করে| কি জানি কেন‚ হঠাৎ লিখতে ইচ্ছে হল আজ| আসলে চাঁদটা দায়ী‚ জানো…… উদ্দাম হোলি খেলে স্নান সেরে সন্ধ্যে না হতেই রানীর মত সেজেগুজে আকাশে তারাদের সভা আলো করে জাঁকিয়ে বসেছে চাঁদটা আজ| সুখটান দিতে ছাদে উঠতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল একেবারে| আবীরের রঙ সবটা ওঠে নি গাল থেকে‚ লালচে আভা উঁকি দিচ্ছে জোছনার ওড়নার আড়াল থেকে| চোখ ফেরাতে পারছিলাম না‚ নির্লজ্জের মত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই রইলাম আর ঐ চাঁদ দেখতে দেখতেই হঠাৎ তোমার মুখটা মনে পড়ল‚ তোমার উস্কোখুস্কো চুল‚ ধেবড়ে থাকা কাজল‚ তোমার কলকল হাসি…… তোমার আকাশেও কি আজ এমন চাঁদ? এমন ফাগে রাঙা‚ এমনি উছলযৌবনা? যদি জানতে চাই কেমন আছো‚ খুব কি রাগ করবে? থাক তাহলে‚ জানতে চাইবো না| মনে মনে ভেবে নেব‚ তুমি ভালো আছো‚ খুব ভালো আছো‚ তোমার গেরস্থালি নিয়ে‚ বাগানের গাছ-ফুল-ভোমরা নিয়ে‚ কবিতার খাতা নিয়ে‚ গুনগুন গান নিয়ে| গানের কথায় মনে পড়ল‚ "আজ যেমন করে গাইছে আকাশ" ….. গানটা একবার হলেও শুনো আজ| কার গলায় -সে কি আর নতুন করে বলে দিতে হবে তোমায়? জানো-ই তো ঐ গান একমাত্র বিক্রমই গাইতে পারেন অমন করে সবটুকু নিংড়ে দিয়ে| শুনো কিন্তু‚ চাঁদের আলোয় নাইতে নাইতে শুনবে| আমি ঠিক জানি‚ এমন চাঁদরাতে এই মোম জোছনায় না ভিজে আজ থাকতে পারবে না তুমি| ভেজো‚ খুব করে ভেজো আর কান-মন-প্রাণ ভরে শুনতে শুনতে গুনগুন কোর…… "আজ হাওয়া যেমন পাতায় পাতায় মর্মরিয়া বনকে কাঁদায়‚ তেমনি আমার বুকের মাঝে কাঁদিয়া কাঁদাও গো……" দোল খেললে আজ? আবীর মেখেছো? যে রঙ চেয়েছিলে তা দেওয়া হয় নি| দিতে কি পারতাম না? হয়ত পারতাম‚ কিন্তু মন:স্থির করে উঠতে পারি নি‚ পারি না| জানো-ই তো আমাকে‚ চিরটাকাল এই দোলাচলেই কাটল‚ দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের জটিল অন্তরায় পেরিয়ে সহজের হাত ধরে হাঁটা ---- সে আর হল কই জীবনে? হল না কিন্তু তাই বলে তো তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা মিথ্যে হয়ে যায় না| 'ডুবতে রাজি আছি‚ আমি ডুবতে রাজি আছি' বলে গলা ছেড়ে গান গাইতে পারি‚ কিন্তু নদী কাছে আসতে চাইলে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাই‚ ভীতুর ডিম আমি‚ ডোবা আর হয় না| সাগরে নাইতে গিয়ে দ্বীপের চড়ায় বাঁধা পড়ে যাই‚ পাহাড় খুঁজতে বেরিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে মরি| তোমার মত পাগলপন কি সবাইকে সাজে? না রে পাগলি‚ সবার দ্বারা সব সম্ভব নয়| তাই তো এড়িয়ে থাকি| পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি‚ চিঠি পড়তে পড়তে ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হাসছো| অ্যাই‚ একদম ঐভাবে ঠোঁট কামড়াবে না| নাহ হাসো‚ জানো-ই তো ঐ হাসি আমার কত প্রিয়…... চর্মচোক্ষে দেখতে না পেলেও মনে মনে ঠিক দেখছি| ধুসস‚ জিজ্ঞাসা করেই ফেলি‚ কেমন আছিস পাগলি আমার? জানতে চাইবি না আমি কেমন আছি? হাঁদারাম.....

1520

99

দীপঙ্কর বসু

একটি কথপোকথন

দুপুর বেলা। লেখালেখি ,ছবি এডিটিং ইত্যাদি সব কাজ সেরে কম্পিউটার বন্ধ করে খেতে বসব - তখনই ফেসবুকের মেসেঞ্জারে এক বন্ধুর মেসেজ এল। - কী ভালো গাইছ বস । শোনা যায় প্রশংসায় দেবতাও গলে যান ,তা আমি তো কোন ছার। পিছিয়ে দিলাম দ্বিপ্রাহরিক আহার পর্ব । বন্ধু বলে চলেন আমি শ্রোতা ।কেবল বাক্যালাপটাকে চালু রাখার খাতিরে দুই একটা মন্তব্য করছিলাম মাত্র। সাধারণভাবে দুজন মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা জনসমক্ষে নিয়ে আসাটা শোভন নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু আলাপচারিতার বিষয়টা গান -যে বিষয়ে সাধারণের য়াগ্রহ থাকতে পারে। সেই জন্যেই মনে নানান দ্বিধা দ্বন্দ থাকা সত্বেও মেসেঞ্জারের কথপোকথনটাকে কপি করে এখানে সাঁটিয়ে দিলাম । বিশেষ কারণ বশত বন্ধুর পরিচয়টা আপাততঃ গোপনই রাখছি ।শুধু এই টুকু জানাই যে বন্ধু কলকাতার অন্যতম নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা এবং ইনি একসময়ে দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী ছিলেন । কী ভালো গাইছ! বস। Thank you 1:07 PM আজ আবার শুনলাম। পাতারা ঘিরে তারে কানে কানে বলে -- না না না আচ্ছা জানো চোখে জল ভরে এল। এত ইমোশনাল তো আমি নই! বাহ।খবরটা আমাকে আপ্লুত করল বরকে শোনালাম। সে কোনও পাত্তা দিল না। হা হাহা নাকি ওই জায়গাটা ভালো হয়নি কোন জায়গাটা যে তার ভালো লাগল না তা কে জানে তাই? আমিও ওর কথাকে পাত্তা দিলাম না যাই যাই যাই ভালো হয়নি? চোখে জল আসার কারণ হল তুমি মনের আনন্দে থাকো আর গান করো <img class="emojione" alt="👍" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44D.png?v=1.2.4"/> 1 সেভাবে কী আর রেয়াজ করো? কিন্তু এত ভালো গাইছ এখনও। একে বলে আনন্দাশ্রু। সবার ভাল লাগা কি আর এক রকম হ নাহ আর রেয়াজ করার ধৈর্য নেই তোমার সব গান কি প্রতিদিন এত ভালো লাগে আমারও? সেটা সম্ভব নয় তোমার গায়নরীতি আলাদা। পরিস্থিতিও কিছুটা সাহায্য করেছে। শরীর খুব খারাপ ছিল কাল। সব গান ভাল লাগবে সে দুরাশা রাখিনা খুব আরাম লাগল। আলাদা গায়ন রীতিটার জন্য ই জর্জ দার চোখে পড়েছিলাম তবে তোমার একটা জিনিস সর্বদাই লক্ষ্য করি টেনে রাখা। কি কেটে না দেওয়া। না না না হয়তো সকলেই টেনে রাখবে। কিন্তু তাই তাই তাই এর শেশ তাই কেটে দেবে দম দেবার জন্য। সেটা ই তো দরকার <img class="emojione" alt="👎" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44E.png?v=1.2.4"/> 1 হ্যাঁ ও প্রসঙ্গত বরকে জিগেস করলাম কার মত? বলল দেবব্রত বিশ্বাস। হি ইজ নট আ ফ্যান পুরোদস্তুর দেবব্রত ফ্যান নয়। আমি অসুস্থ হবার পর সিগারেট ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।দমটা তাই বেড়েছে ও তাই বলো। লিখতে যাচ্ছিলাম ক্রমশ যেন আরও ভালো গাইছ। আমার গানে জর্জ দার কিছু প্রভাব তো আছেই <img class="emojione" alt="👍" src="//cdn.jsdelivr.net/emojione/assets/png/1F44D.png?v=1.2.4"/> 1 ধরা পড়ে না। আমার মনে হয় তুমি নিজের মত গাও। সে প্রভাব ভেতর থেকে ইন্সপায়ার করে আমাকে সেটা ই তো জর্জ দার নির্দেশ ছিল আমার প্রতি সাধে কি তোমার লেখাটা আমাকে এত টেনেছিল? আমার গান নিয়ে একটা শংসাপত্র লিখে দাও আর তো তেমন স্বীকৃতি পেলামনা আমার শংসাপত্রের কোনও মূল্য নেই সেটা আজ বুঝলাম তোমার মত এত ভাল শ্রোতা আর পেলাম কই একজনকে বলছিলাম সে ফোন করেছিল কেন কি বলেছিলে সবই বললাম। তোমার লেখা থেকে শুরু করে আলাপ ও তুমি কেমন আলুর চপ খাও আচ্ছা হাহাহা তাকে স্পর্শ করল না যে আমারও চোখে জল এসেছে। এটার মূল্য খালি আমি জানি নাই বা করল চোখের জলের মত মূল্যবান আর কিছুই নয় কথাটা খুব সত্যি। You made my day আমার তো হিংসে হওয়ার কথা ছিল। কিচ্ছু হিংসে হয়নি এটা আমার পরম প্রাপ্তি এবার আমি যাই। ভালো থাকো। আমিও যাব খেতে তুমি ও টাটা। Chat Conversation End Type a message... Chat (66) More stories loaded.

160

3

জল

বিগত সময়ের তরী বেয়ে

(১৪) 'এই মানতাশার জোড়াটা বিদ্যার অসুখে বাঁধা রাখতে হয়েচিল‚ ভেবেচিলাম তোর বাবু একসময় ছাড়িয়ে নেবে‚ কিন্তু সে সুজোগ পেলাম না| বিদ্যা সেরে উঠতে না উঠতেই গঙ্গাটা পড়ল| বিক্রি করে দিতে হল' | মেনকা গয়নার বাক্সটা খুলে কোন কোন গয়না ভেঙ্গে কি বানাবে বা কোনটা পালিশ করেই দিয়ে দেবে সেই নিয়েই সকাল থেকে বসেছে মেয়েদেরকে নিয়ে| কর্তা বিয়ে পাকা করে এসেছেন| এদিকটাও তো গুছিয়ে রাখতে হবে আর কাকে কি দেবে সে এখন থেকেই ঠিক করে রাখা ভালো| কিন্তু সুবাকে একটু বেশিই দেবে সে‚ প্রথম মেয়ের বিয়ে বলে কথা| একটা মানতাশা তো আর দেওয়া যায় না‚ ওটা ভেঙ্গেই কিছু গড়িয়ে দেবে| গয়নাগুলো আজকাল আর পড়ে না সে| শেষ কবে পড়েছিল ঠিক মনে পড়ে না| আসলে ছেলে-পুলে বড় হবার আগেই তো রঙীন শাড়ি পড়ার শখ ছেড়ে দিতে হয়েছে| কানের ঝোলা ঝুমকো‚ গলার কলার‚ নেকলেস‚ রতনচুড়‚ আমলেট‚ সোনার বাগান সবই আলমারীতে তুলে দিতে হয়েছে| ছেলেপুলে বড় হলে যে মা'কে অনেককিছু ত্যাগ করতে হয়| সেইসব গয়নার বদলে গলায় গোটচেন বা মটরমালা হার‚ হাতে হাঙরমুখী বালা বা শুধু সোনার চুড়ি| এর বেশি কিছু পড়লে যে সমাজে নিন্দে হয়| মেনকাও আর পড়েনি| এখনও যেন নতুন গন্ধ লেগে রয়েছে| 'মা‚ দাদা আর ভাই-এর কি হয়েছিল?' সুবেশা প্রশ্ন করে| 'তোর বড়দা ছোটতে তো একবার জলে ডুবে গেছিল ‚ যে দেখতে পেয়ে তুলেচিল ‚ সে কোনকিচু না পেয়ে মাথার চুল ধরে টেনে তুলেচিল| সে থেকে এমন ঘা হয়েচিল যে যায় যায়| কিচুতেই সারে না‚ তখন অন্য ডাক্তার দাকা হল| ডাক্তার কনক বড়াল‚ তখনই তার ভিজিট অনেক ট্যাকা| তখন যে জারমান ওষুধ দিয়েচিল তা কলকাতার দেশ মেদিকেল ছাড়া কোথাও মেলে না| ওষুধের দামও অনেক| ওষুধই বা কে আনবে? সে এক দিন গেছে| ডাক্তারের্র ভিজিট দেব না ওষুধ আসবে| তোর বাবু তো তখন অসুস্থ| অফিসে মাইনে পায় না| অফিস বের হতে পারে না| চাকরী চিল এই যা| আমিই বা কি করি‚ একা মেয়েমানুষ‚ ঘরে তেমন ট্যাকাও নেই‚ যা জমানো চিল তাইতে সংসার চলচিল‚ তার মাঝেই এই কান্ড‚ ভেবে দেকলাম গয়নাগুলো কি চিবিয়ে খাবো‚ আমার ছেলের চেয়ে পিয় তো নয় সেগুলো‚ তার একটা বের করে দিলাম তোর বাবুকে| তা তিনিও বেশিদুর যেতে পারেন না‚ আলসারে তার পেটেও এমন ঘা‚ চলতে গেলে লাগে‚ তা পারায় একজনের কাছে মানতাশাখানা বাধা রেখে দেশ মেদিকেল থেকে জার্মান ওষুধের মিকচার এল| তারপর তো অনেকদিন চিকিচ্ছা করে সারল| আর তোর ভাইকে একন যেমন দেকিস‚ তেমনটা মোটে চিল না‚ খুব দুরন্ত ছিল| একদিন ইস্কুল থেকে ছেলে আর ফেরে না‚ আমি তো ভেবে ভেবে মরি| পরে একজন এসে খবর দিল ‚ যে গঙ্গা নাকি গাড়ি চাপা পড়েচে| বাড়িতে কান্নাকাটি পরে গেল| ওমা খানিক পরে দেকি সে ফিরেছে‚ মুকে হাসি| জিগ্যেস করতে বলল‚ গাড়ি আমায় চাপা দেবে কি করে‚ আমি তো গাড়ির তলায় শুয়ে পড়েছিলাম আর গাড়িটা তো দারিয়ে চিল| ভাগ্গিস দাড়িয়ে চিল‚ না হলে কি হত| তকনও জানি না আরও কান্ড করে এসেছে সে| ফেরার পথে মেডিকেলের মর্গে মরা দেকতে গেচিল| তকন তো কিচু বোঝেনি‚ সেই রাতেই এল মারাত্মক জ্বর| সে জ্বর আর নামে না‚ হুঁশ নেই| আবার ডাক্তার কনক বড়ালকে ডাকা হল| তিনি চিকিচ্ছা করলেন| তোর ভায়ের রঙ তোরা দেকিসনি সুবা| সাহেববাচ্চার মত রঙ‚ বাদামী চুল‚ সব গেল সেই নিমোনিয়াতে| যাক ছাড়‚ এসব তো কতবার শুনেচিস|' 'ভালো লাগে মা শুনতে|' সুবার সাথে বাকি দুই বোন সুকেশী আর সুন্দরীও গলা মেলায়| 'তোমরা কেউই ভুগতে বাকি রাখোনি| যার যখনি কিচু হয়েচে সবই সাঙ্ঘাতিক হয়েচে আর আমার একখানা করে গয়না বিসর্জন গেচে| যাগকে সে দুক্খু করি না| নাও এবার দেখ কোনটা কে নেবে? কাজ তো আমার কম কিচু নেই‚ সারাদিন ঐ কবে কি হয়েচে মনে করে বসে থাকলে চলবে?' মুখে বলে বটে‚ তবে স্মৃতিচারণা করতে তারও মন্দ লাগে না| মনে হয় এই তো সেদিনকার কথা‚ সব কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল| সুবাকে কানের ঝুমকোজোড়া দেবে নাকি মিনে করা কানপাশা দেবে? হাতে বাউটি আর বালা‚ হাত যেন খালি খালি না লাগে| ট্যায়রাটা দেবে সুবাকে ‚ সুকিকে সোনার চিরুনী আর বাগান আর সুন্দরকে টিকলি| মনে মনেই এইসব ঠিক করতে থাকে সে| 'মা দিদিকে যা দেবে দাও‚ ঝুমকোজোড়া কিন্তু আমার রেখো'‚ সুকেশী বলে| 'হ্যাঁ মা তাই ওর জন্যই রাখো|'‚ সুবেশাও সায় দেয়| 'বেশ‚ তবে এই মিনে করা কানপাশাদুটো তুই পড়িস|' 'হ্যাঁ মা ওখানা দিদিকে খুব মানাবে‚ কানের পাটাদুটো চওড়া তো|' সুকেশী বলে| দোতলায় যখন এইসব চলছে‚ ঠিক তখনই নিচ থেকে কথা কাটাকাটির আওয়াজ ভেসে আসে| মেনকা গয়নাগুলো চটপট আলমারীতে তুলে চাবি দিয়ে নিচে নেমে আসে| কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনে বোঝে সদরের বাইরে দামোদর আর সদন দত্তের মধ্যে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটি চলছে| দামোদর স্বভাব আলস্যে| খায় দায় আর বনের মোষ তাড়ায়| কাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে‚ কাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ছাড়াতে হবে ‚ লালপার্টির মিছিলে যেতে হবে এইসব করে বেড়াচ্ছে| সে তো বাড়ির কোন ব্যাপারে থাকেই না‚ তার সাথে কি নিয়ে গন্ডগোল ভেবে পায় না মেনকা| বেরিয়ে যে দেখবে সেও তো শোভা দেবে না| চিত্তিরটাও নেই‚ দিনকয়েকের জন্য দেশে গেছে| উঠোনে নেমে গিয়ে দরজায় কান পাতে কি কথা হচ্ছে তা শোনার জন্য| কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না| 'দামু‚ কি হয়েচে? দরজার বাইরে দারিয়ে কার সাথে কথা বলচিস?' মেনকা হাঁক পাড়ে| 'মা এই সদন দত্তের বড় দেমাক হয়েছে‚ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে|' দামোদর ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠে|' আসলে আমি বুঝি না ভেবেছেন না‚ বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে বড় ঘরে তাই সহ্য হচ্ছে না? জন্ম হিংসুটে লোক মশাই আপনি?' দামোদর ছোবল মারে| 'দেখ দামু‚ ছোট মুখে বড় কথাই কইবি না| ক্ষমতা নেই আবার বড় বড় কথা| বড় ঘরে তোর বোনের বিয়ে হচ্ছে বলে আমার কেন হিংসে হবে শুনি? দিয়ে দেখা দিকি‚ ভিখিরি তো তোরা| বড়ঘরে দেবার মত কি আছে তোদের? বর নিয়ে ফেরত চলে যাবে এই বলে দিলাম|' কথাগুলো গায়ে যেন সূঁচের মত বেঁধে| ও বাড়ির বারান্দা থেকে কয়েকটা মুখ উঁকিঝুঁকি মারে| একে বলে শত্রুহাসানো| সদন দত্ত ওঁৎ পেতে বসেছিল দামোদরকে পাকড়াও করে কথাগুলো বলবে বলে| লোকটা কারও ভালো দেখতে পারে না কেন কে জানে? এদিকে শ্বশুরের পয়সায় ফুলে কলাগাছ হয়েছে‚ দেমাকে পা মাটিতে পরে না| মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না| অন্য ছেলেরা গুরুত্ব দেয় না‚ কিন্তু এই ছেলেকে কিছু বললেই সে উত্তর দেবেই| ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা! 'ভিতরে আয় দামু| কেন শুদু শুদু মুখ লাগাচ্চিস? লোকটাকে তো আজ দেকচিস না| ভিতরে আয়|' স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে মেনকা দরজাটা খুলে দাঁড়ায়| 'আপনিও যান| নিশ্চিন্ত থাকুন আপনার কাচে হাত পাততে যাবো না| ভিকিরির মেয়ের বিয়েতে পাত পেড়ে খেয়ে যাবেন আর তকন না হয় আরও চাট্টি নিন্দে করে যাবেন| একন বললে আর কজন শুনবে?' মেনকা ঠান্ডা স্বরে কথাগুলো বলেই দেখতে পায় একটু দুরেই ছোট গিন্নী দাঁড়িয়ে| 'তোমাদের বাড়ি আসচিলাম ছোটবৌ| ঘাটের মরা লোকটাও যে একানে মরতে এসেচে জানব কি করে? একদিকে ভালো হয়েচে‚ না এলে তো শুনতেও পেতাম না| দেকেচ তো ইটটি মারলে পাটকেলটি কেমন খেতে হয়| তবু তোমার শিখ্যে হবে না‚ কোনকালে হবে না‚ তুমি ঐ কুকুরের বাঁকা লেজের মত| ' ঝামটা দিয়ে ওঠে সদন দত্তের বৌ| মেনকা আর দামোদর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে| একটাও কথা বলে না| 'মুরোদ থাকলে ওমন একখানা ঘরে তোমায় মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দেখাও দিকি? পারবে? তবে বুঝব তুমি একটা কাজের কাজ করলে| তা না‚ লোকের বাড়িতে এসে ভ্যাংচাতে এসেচ? ' জ্বলে ওঠে সদন দত্তের বৌ| ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকে সদন দত্ত| এই একটা মানুষকে ভালোবেসেও পেল না‚ হ্যাঁ কয়েকটা সন্তানের মা করতে পেরেছে ঐ পর্যন্ত‚ আজও মন বুঝে উঠতে পারল না| মনে স্থান পেল না| সদন দত্ত ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়| ''কিচু মনে করো না ছোটবৌ‚ এই লোকটার হয়ে আমি তোমার কাচে ক্ষমা চাইছি| আমার আর কিচু বলার যে মুখ নেই ছোটবৌ'‚ থমথমে গলায় কথাগুলো বলে সে| কদিন ধরে তারও যে মন ভালো নেই‚ যবে থেকে শুনেছে সুবেশার বিয়ে সর্বেশ্বর মল্লিকের ছেলের সাথেই স্থির হয়েছে| হিংসে নয়‚ নিজের মেয়েটাকেও যদি এমনই একটা ঘর-বরে দেওয়া যেত‚ তাহলে সমাজে মান যেত বেড়ে| এমনিতে তো নিজে বড় ঘরে পড়েনি‚ বাপের পয়সা ছিল তাই বাপ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জামাইকে| না হলে ঐ কালো মুষন্ড লোকটাকে কে বিয়ে করত| এখনকার কাল হত বেঁকে বসত সে| সবই কপাল! 'ভেতরে এসো ছোটগিন্নী|' ডাক দেয় মেনকা| 'না আজ আর যাব না‚ মনটা বিগড়ে গেল| পরে আসব ভাই| তুমি কিচু মন করো না|' বলে সদন দত্তের বৌ মেনকার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে| তারপর বেরিয়ে যায়| মেনকা সদর দরজা ভেজিয়ে দেয়| কিন্তু তখনি ওখান থেকে চলে আসতে পারে না| উঠোনেই দাঁড়িয়ে থাকে| সদন দত্ত কি যেন বলে গেল‚ বর তুলে নিয়ে যাবে| বিয়ের আগে ভাঙচি দিতে পারে আবার বিয়ের দিনকে কিছু ঘটাতে পারে| ও মানুষকে বিশ্বাস নেই|ঈর্ষাকাতর মানুষের পক্ষে সবকিছু করাই সম্ভব| ছোটগিন্নীকে যা ভরসা করা যায়| লোকটা বৌকে যমের মত ভয় পায়| সেদিন যদি না আসে তবে ভালো হয়| কিন্তু ছোটগিন্নীও কিসব বলল‚ 'যে ঐরকম ঘরে বিয়ে দিয়ে দেখাও'| ছোটগিন্নীও কি ঠিক খুশী নয়‚ নাকি কোথাও একটা চাপা ঈর্ষা কাজ করছে| আসলে অনেকসময়ই তো সবকিছু ছাপিয়ে স্বার্থটাই প্রধান হয়ে ওঠে| খুব একটা বেশি দোষ দেওয়া যায় না তার জন্য| আর মেয়ের মা বলে কথা| সেও তো চাইবে মেয়ে ভালো ঘরে পড়ুক| চারহাত এক না হওয়া অবধি নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না| ...|ক্রমশ|

665

79

মানব

ওপারের ডাক

১ তখন আহত বোধিসত্ত্ব কে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। মঙ্গলাশ্বরূপী বোধিসত্ত্ব রাজাকে বললেন, ‘আমি আর আমার সওয়ার আজ যে কাজ করলাম তার পুরস্কার এই সাত রাজাকেই দিন। এদের হত্যা না করে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিন যেন এরা আর কখনও হিংসা না করে। সেই সঙ্গে আপনিও অহিংসা ও শান্তির পথে চলবেন।’ আহত মঙ্গলাশ্বটির সাজ পোষাক খুলে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হল। রাজা যথাযখ সম্মানের সঙ্গে তার অন্তিম কাজ সমাধা করলেন। তারপর ওই সাত রাজাকে অহিংসার পথে চলবার অঙ্গীকার করিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিলেন। *** তাহলে এই জাতকের থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? সমবেত ছাত্ররা এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে পন্ডিত আনন্দভট্টের কথাগুলো শুনছিল। শুধু একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সর্বদা অহিংসার পথে চলা উচিৎ?’ ‘প্রথমত, প্রশ্ন করবে না, উত্তর দেওয়ার সময় দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দেবে। বসে পড়ো। খুব ভালো প্রচেষ্টা। আসলে এই জাতক আমাদের এই শিক্ষা দেন যে, জ্ঞানী বিপদের মধ্যেও দিশেহারা না হয়ে কর্তব্য পালন করেন, এমনকী প্রাণ দিয়েও। আজ তোমাদের এখানেই ছুটি। আর হ্যাঁ, এই সমস্ত পাঠগুলো যেন শুধুমাত্র গল্পেই সীমাবদ্ধ না থাকে। দৈনন্দিন জীবনেও এগুলো মেনে চলবার চেষ্টা করবে।’ ছাত্ররা চলে যাওয়ার পরে আনন্দভট্ট একটু বিশ্রামকক্ষে যাবেন বলে যেই দরজার বাইরে পা দিয়েছেন, দেখেন এক অদ্ভুত কান্ড। সাদা জোব্বা পরিহিত এক ভদ্রলোক মাটিতে পদ্মাসনে বসে তাঁরই দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়তেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, 'আপনার পাঠদান শুনছিলাম। অপূর্ব আপনার কন্ঠ আর তেমনই অপূর্ব আপনার শিক্ষাদান।' হতচকিত হয়ে আনন্দ ভট্ট প্রশ্ন করে বসলেন, ' আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। আপনার নিবাস কি এই দেশেই?' এইবার ভদ্রলোকটি উঠে দাঁড়ালেন, সরিয়ে ফেললেন তার মাথা ও মুখে জড়িয়ে থাকা চাদর। কি অপূর্ব সে রূপ। সদ্য জাগ্রত রবি কিরনের রূপচ্ছটা কেও হার মানিয়ে দিচ্ছিল সে রূপ। তার উপর গলায় পরিহিত রক্তরুদ্রের মালা তাঁকে করে তুলেছে অপূর্ব জ্যোতির্ময়। হঠাৎ আনন্দভট্ট খেয়াল করলেন ভদ্রলোকের কপালে সুস্পষ্ট তৃতীয় নয়নখানি, আর তৎক্ষণাৎ তিনি করজোড়ে বসে পড়লেন তাঁর পদতলে। ‘হে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অধিকর্তা মহাকালেশ্বর, আপনাকে আমি চিনতে পারিনি মার্জনা করবেন।’ এই বলে যেই তিনি ওনার পা দুখানি জড়িয়ে ধরতে যাবেন অমনি আনন্দভট্টকে দুহাতে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। তারপর স্নেহভরে বললেন, ‘আর্য, আমি আপনার ব্যবহারে অত্যন্ত আহ্লাদিত। কিন্তু আমি যে ভগবান নই, সেই তথ্যও আপনার নিকট পরিবেশন করা আমার কর্তব্য।’ ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন, হে প্রভু, আপনার দর্শনে আমি ধন্য। আমার কুটিরে এমন ধন নাই যা দিয়ে দেবতার আপ্যায়ন করি। কিন্তু আমি এও জানি যে নিষ্কাম ভক্তিতেই আপনি সন্তুষ্ট হোন। তাই দয়া করে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।’ এইবার একটু ইতস্ততঃ হয়ে ভদ্রলোকটি বললেন, ‘এমন ভক্তিতে ভগবান সন্তুষ্ট না হয়ে থাকতেই পারবেন না। কিন্তু এও সত্য যে আমি ভগবান নই। আমার বাসস্থান এই পৃথিবীলোক থেকে পাঁচ আলোকদিবস দূরের একখানি গ্রহে, যার নাম উচ্চভূ। এখানে এসেছিলাম আপনাদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য। কিন্তু পাছে আমার তৃতীয় নয়ন দেখে আপনারা ভয় পান তাই এই চোখখানি ঢেকে রাখি। আপনার গ্রহে আসতে আমি ভয়ই পেতাম। কিন্তু এখন আপনার আচরণে আমি যথেষ্ট আনন্দিত।’ ‘তাই যদি হয় তাহলে গরীবের কুটিরে পদার্পন করে কিছু আহার্য গ্রহণ করুন প্রভু।’ ‘প্রভু নয়, আমাকে আমার নিজের নামেই ডাকবেন। আমি মনাকদ্ম। আমরা মনুষ্য নই, আমরা কদ্ম।’ ‘কদ্ম অর্থে কি কোনও উচ্চ আত্মিক স্তরের...’ ‘ঠিক তেমনটি না, আমরাও আপনাদের মতই ভিন্ন প্রজাতির জীব। আত্মা ভেবে ভুল করবেন না। চলুন আপনার গৃহে কিছু আহার্য গ্রহণ করি। এমনিতেও বেশ ক্ষুধার্ত আমি।’ আশ্রমের এই দিকটায় বড় একটা কেউ আসেনা। রাজা মহীপালের বঙ্গদেশে স্বামী স্ত্রী মিলে বেশ শান্তিতেই এই বিহারের দায়িত্ব সামলে আসছেন বিগত কয়েক বছর ধরে পণ্ডিত আনন্দভট্ট। সুস্বাদু দুগ্ধদ্রব্যের সঙ্গে পরিবেশিত হল অল্প মিষ্টান্ন। খেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হলেন সদ্য প্রৌঢ়ত্বপ্রাপ্ত মনাকদ্ম। ‘আচ্ছা আপনি কি এই প্রথমবার পৃথিবীতে এলেন?’ আনন্দভট্ট তখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলেন না যেন, তাঁর পাশে ভোজনরত মানুষটি, না মানুষ নয়, কদ্মটি এসেছেন অনেক দূরের কোনও এক জগৎ থেকে যার নাম উচ্চভূ। যে গ্রহের দিকে লক্ষ্য করে আলো নিক্ষেপ করলে সেই আলোরও যেতে সময় লাগে পাঁচ দিন। ‘হ্যাঁ এর আগেও এসেছিলাম, প্রায় একশ বছর আগে। ধর্মগুরু যীশুখ্রীষ্ট জন্মালেন যেবার।’ ‘কিন্তু সে তো বহুকাল আগের কথা, প্রায় হাজার বছর... ’ ‘হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গেছি, আমাদের গ্রহের এক বছর মানে আপনাদের গ্রহের দশ বছর। আর আমরা কদ্মরা আমাদের গ্রহের হিসাবে বাঁচি প্রায় পাঁচশ বছর। কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে তো!’ ‘এখন আপনার বয়স...’ ‘তিনশ বছর...আমাদের হিসাবে।’ ‘তিন হাজার বছর বেঁচেছেন আপনি... তাহলে তো এই মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সাক্ষী আপনি। আপনাকে ভগবান ছাড়া আর কিই বা বলা যায় বলুন। আমাদের মত তুচ্ছ মানব প্রজাতি যারা কিনা আশি নব্বই বছর বাঁচলেই বিশ্বের ক্লান্তির বোঝা এসে ভর করে, সেখানে তিন হাজার বছরেও আপনি ভিনগ্রহে ভ্রাম্যমান!’ মনাকদ্ম একটু ইতস্ততঃ করলেন। প্রশংসা শুনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে বুঝে আনন্দভট্ট চুপ করলেন। ‘হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, সেবারে নেমেছিলাম মিশর দেশে। অগাস্টাস নামে এক রোমদেশীয় রাজা সেখানকার শাসনকার্য চালাতেন। ঠিক চালাতেন বললে ভুল হবে, জোর খাটাতেন। রোমান এবং গ্রীকরা সেখানে প্রাধান্য পেলেও মিশরীয়দের সেখানে রাখা হয়েছিল সবচেয়ে নিম্নশ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। আমি আমার দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, এই বঙ্গদেশের দশাও একদিন ওইরকম হতে চলেছে। কালের চক্রের উপর আমার কোনও হাত নেই। শুধু মাঝে মাঝে চোখের সামনে অনেক দৃশ্য ভেসে ওঠে। সেসব থেকেই বলতে পারি, এখন থেকেই যদি নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনারা সচেতন না হোন, অথবা আপনাদের থেকে একটু অন্য ধরণের সুঠাম দেহবল্লরীবিশিষ্ট মানুষ দেখলেই ভগবান ভগবান করে মাথায় তুলে নাচতে থাকেন... এই যেমন আমায় করলেন, তাহলে আপনাদের পতন কেউ বাঁচাতে পারবেনা। অতিথিদের ভগবানরূপে সেবা করলেও সে যাতে আপনার দুর্বলতার সুযোগ না নিতে পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখুন।’ *** সেবারে আরও অনেক অনেক কথা হয়েছিল আনন্দভট্টের সাথে। আজ পৃথিবীর বুকে একবিংশ শতাব্দী। সেযুগের সাথে এযুগের কত পার্থক্য। কত কত ভিনদেশী এল আর গেল, অবশেষে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়ে একখণ্ড রয়ে গেছে ভারতের সাথে, আর একখণ্ড নিজেকে স্বাধীন দেশ হিসাবে ঘোষণা করেছে। ভাবতেও মনটা কেমন ভার হয়ে আসে মনাকদ্মের। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন তিনি, কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের জন্য এই বঙ্গে ঘুরতে এসে যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন তা আর কোথাও পেয়েছেন বলে মনে পরে না। সেবারে নিজ গ্রহে ফিরে যাওয়ার সময় তো তিনি দুগ্ধদায়ী গাভী ও একটি ষাঁড়কেও নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক অনেক প্রজন্মের বিস্তারে সেখানে রীতিমতো এক বৃহৎ গোশালাও গড়ে উঠেছে। দুগ্ধদায়ী গাভীকে ঘরে রেখে দেওয়া যায়, কিন্তু ষাঁড়ের সংখ্যা অত্যধিক হলে তাদের বসে বসে খাওয়াতে মোটেই ভাল লাগে না। আবার ছেড়ে দিলেও শষ্যের ক্ষতি সাধন করে। একবার তো তিনি ভেবেছিলেন এই ষাঁড় সমস্যার সমাধানে এক বড় মহাকাশযানে চড়িয়ে সমস্ত ষাঁড়কে তুলে এনে পৃথিবীর মাটিতে ছেড়ে দেবেন। তারপর নিজেরই মায়া হল, এমনিতেই এখানে মানুষের খাবার জোটেনা, আবার পশু বাড়লে নাজানি কি গোলমাল হবে... এই এত বছরের অভিজ্ঞতা... পৃথিবীর হিসাবে যা প্রায় চার হাজার বছর... সেই বৃদ্ধ মনাকদ্মের আত্মা আজ তান্ত্রিক শ্রীঅংশুমানের মায়াজালে বন্দি। ২ উচ্চভূ গ্রহ থেকে পৃথিবীলোকে মাত্র তিপ্পান্ন দিনে পৌঁছতে দিতে যে কি ভীষণ উচ্চশক্তিসম্পন্ন যানের এবং তার জন্য যে কি বিশাল পরিমানে জ্বালানি বা শক্তির প্রয়োজন হয় তা বুঝেই কর্মাদ্মক একটা নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রহের জ্বালানি ছেড়ে সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে চালানোর নতুন প্রযুক্তি আমদানি করেছেন। অবশ্য এ প্রযুক্তি তার বাবা মনাকদ্মের রেখে যাওয়া পুঁথিগুলো ঘেঁটেই পাওয়া গেছে। তিপান্ন দিন অর্থাৎ পৃথিবীর হিসাবে যা হবে পাঁচশ তিরিশ দিন। মহাকাশযান ‘অলক্ষ্য’ আবার বহুকাল পরে তার কাজ পেল। আবার পৃথিবীতে পাড়ি দিল সে। তবে এবার বাবা নয়, ছেলের সাথে। সাত দিন কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরে ছিল সে। তারই মধ্যে ঘটে গেছে এই অদ্ভুত ঘটনা। বাবার শরীর থেকে আত্মা উধাও। এমনিতে বাবা ধ্যানের উচ্চস্তরে পৌঁছে গেলে ফিরে আসেন প্রায় দুদিন পরে। আত্মিক স্তরে পৌঁছে বিভিন্ন দেশ, গ্রহ ইত্যাদিতে ঘুরে বেড়ানো তাঁর শখ। এই জিনিসটা কর্মাদ্মক এখনও রপ্ত করতে পারেনি। কর্মস্থানের চাপ শেষ করে মানসিক স্তরের খুঁটিনাটিগুলোর অনুসন্ধানের মেজাজ আর থাকেনা। ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। তৃতীয় নয়নে একটু ক্লান্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ অনুসন্ধানী মন আত্মিক স্তরের নিচে আর কাজ করবেনা। বাবা গল্প করতেন, তাদের এই তৃতীয় নয়ন এক সময়ে সম্পূর্ণ রূপে কর্মক্ষম ছিল। এত ক্লান্তি আসতনা, যেকোন সময়ে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সুস্পষ্ট ছবির মত দৃশ্যমান হয়ে উঠত ইচ্ছা করলেই। এমনকি মনঃশক্তি দ্বারা অনেক কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। তারপর এল বিধাতার পাঠানো বিষন্নতা-ভয়-ক্রোধ। সেই সমস্ত চাপ তাদের তৃতীয় নয়নের দৃষ্টিকে আবছা করে তোলে ধীরে ধীরে। যদিও দীর্ঘ চর্চায় সেই ক্ষমতা ফিরে পাওয়া সম্ভব, যেমনটি হয়েছে তার বাবার ক্ষেত্রে। দিদি যদি তিন চারদিন আগেও বলত তাহলে বাবাকে খুঁজে বের করা সহজ হত। অতিরিক্ত উত্তেজনায় আর চিন্তায় মন কাজ করছে না। এখন সাহায্য নিতে হবে যন্ত্রের। ‘অলক্ষ্য’ নিয়ে বেরোবার সময় গোষ্ঠী থেকে সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, এবং আরও কয়েকজনকে সাহায্যের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে সুস্পষ্টরূপে দৃশ্যমান হিংসাকে লক্ষ্য করেই কর্মাদ্মক তাদেরকে সঙ্গে নিতে রাজী হননি। পরশু রাত্রেই তো, ধ্যানে বসেছিল কর্মাদ্মক। হঠাৎ অনুভব করল অনেক দূর থেকে বাবা যেন বলছেন, ‘আমার ঘরের সিন্দুকটা খুলে দেখবি ১৩ তম তাকের একদম ভেতরের দিকে একটা যন্ত্র দেখতে পাবি। ওটা হল আত্মার অবস্থান নির্ণায়ক। ওটা দিয়ে আমার মুখের একটা ছবি তুলে ‘সন্ধান করুন’ এ স্পর্শ করবি। আমি যেখানেই থাকি, খুঁজে পেয়ে যাবি। এখন আমি এক তান্ত্রিকের জালে বন্দী। সে আত্মাকে সম্মোহিত করে মানুষের জীবন মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে, হতে চাইছে ত্রিকালদর্শী, এমনকী সে আত্মা বিক্রীর ব্যবসাও ধরেছে। মনুষ্য সমাজের অনেক ক্ষতি সে করেছে। নাম শ্রীঅংশুমান।’ ধ্যান ভেঙ্গে যায়, কথাগুলো শুনে প্রথমেই রাগে উত্তেজনায় মনুষ্যজাতিটাকেই শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবে সে। মাথা ঠাণ্ডা হলে মনে হয়, একজন মানুষের জন্য সমস্ত মানুষজাতিকে মেরে ফেলে কি লাভ! তারপর যখন ঐ তান্ত্রিকটাও মানুষেরই ক্ষতি করছে... হোক না সে মানুষ, কিন্তু মনুষ্যবিরোধী। তাই সে ঠিক করল, সে একাই ওর অপরাধের শাস্তি দেবে। দীর্ঘ পথ, কখনও আলো, কখনও অন্ধকার। সুর্যের রশ্মি না থাকলে সঞ্চিত শক্তিতে কাজ চালাতে হয় অবশ্য সেটাও সৌররশ্মি থেকেই সংগৃহীত। কোমরবন্ধক টা খুলে নিয়ে শীতল ঘরটার দিকে গেল সে। পাশেই বাবার দেহটা ঘুমিয়ে আছে এক অসীম তৃপ্তিতে। এখন কি উচ্চভূ তে দিন, নাকি রাত? ঘড়িটা দেখতেও ইচ্ছা করেনা তার। খাবার বা শক্তির অপচয় এখন আর করা উচিৎ হবেনা। আর একটা কাঁচের বাক্সের মধ্যে ঢুকে গেল সে। নরম বিছানায় শরীরে নেমে এল এক অসীম তৃপ্তি, আলো নিভে এল। যেন অনেক দূর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। চোখ বুজে এল। ৩ ‘শ্রীঅংশুমান বাবু, কিংস ভ্যালি থেকে লিখছি। আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় বেশ কয়েকটি পিরামিডের প্রাথমিক খননকার্য আটকে দিয়ে সেখান থেকে চোরাপথে আমাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বের করে নিতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এটাও সেরকমই আর একটা প্রয়াস। কয়েকদিন আগে মুস্তাফা ফিরেছে। ওর কাছেই শুনলাম আপনি অসুস্থ, তাই আপনার সুস্থতা কামনা করি এবং আপনি আপনার সময়মত উত্তর দেবেন এই কামনা করি। আপনি যে এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে যথাশীঘ্র জানাবেন সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট আস্থা আছে। তারপরই আপনার টিকিট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বন্দোবস্ত করে ফেলা হবে। - ওমর’ মেলটা চোখে পরতেই চোখ চকচক করে ওঠে শ্রীঅংশুমানের। আবার অনেকগুলো টাকা। তাছাড়া শুধুমাত্র টাকাই বা বলি কেন, আবার একরাশ ক্ষমতার অধিকার... একটা আত্মাকে বন্দী করা হবে আবার। তারপর তাকে দিয়ে ইচ্ছামত... একেকটা আত্মার একেকরকম গুণ, সম্মোহিত করে যা খুশী করিয়ে নেওয়া যায় তাদের দ্বারা। এই যে পরের জৈষ্ঠে এক হাজার বছর বয়স অতিক্রম করবে সে, সে আয়ু কি আর এমনি এমনি এসেছে! একেকটা আত্মার থেকে অল্প অল্প করে আয়ু জমিয়ে কখন যে এতদিন হয়ে গেছে, সে নিজেও বোঝেনি। শুধু তার মা যদি এতদিন বেঁচে থাকত, সন্তানের এই সাফল্যে কতই যে খুশী হত ভাবতেও মন খারাপ হয়ে যায়। তবে এখন পিছন ফিরে তাকানোর সময় নয়। তার সাধনা বড়ই গোপন। তাই প্রায়ই স্থান ও বেশ বদল করতে হয় তাকে। হাজার বছরের একটা মানুষের কথা জানতে পারলে কেউ কি আর ছেড়ে দেবে? খবরের চ্যানেলে ইন্টারভিউ, এখানে সেখানে ডাকাডাকি... নিজের সাধনাটাই হয়ত মাটি হয়ে যাবে। তারপর বেশী হিতৈষী হলে হয়ত মেরে ফেলে শরীরের অঙ্গগুলিকে পরীক্ষা করে দেখতে আর বুঝে নিতে চাইবে এই দীর্ঘজীবনের রহস্য। তার চেয়ে এই অজ্ঞাতবাসই ভালো। অবশ্য ছোটোখাটো কিছু পার্টি ধরে এই ধরণের কাজগুলি সে বহুদিন ধরে পেয়ে আসছে। এতে পেট যেমন চলে, তেমনি সংগ্রহে বাড়তে থাকে একের পর এক আত্মা। এইতো সেদিন, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বেইমান আত্মা হঠাৎ সুপ্তাবস্থা থেকে জেগে উঠল। বাধ্য হয়ে তাকে একটা কাজ দিতেই হল। কাজ না পেলে আবার রেগেমেগে অন্যান্য আত্মাদের আক্রমণ করতে পারে... এ ব্যাটা বেশ শক্তিশালী। অনেকদিন ধরে বাইরের দেশের এক জঙ্গীর অর্ডার এসে পড়ে আছে। তাকে নাকি এমন এক আত্মা ভাড়া দিতে হবে যে আত্মঘাতী হামলা করতে যাওয়া ব্যাক্তির মগজ ধোলাই করবে তার উপর ভর করে। ভোররাত্রে জঙ্গী হামলায় আক্রান্ত হল বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু... এ জিনিস বিশ্ব ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়না। অংশুমানের দৃঢ় বিশ্বাস, যত বেশী মানুষের আয়ু সে তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে পারবে, ততই একটু একটু করে পূর্ণ হয়ে উঠবে তার আয়ুর পাত্রটি। হচ্ছেও, তা নাহলে কি আর পরে জৈষ্ঠে সে হাজার বছর অতিক্রম করতে পারত! একটু একটু করে এগিয়ে গেল সে সামনের টেবিলে কাঁচের জারে রাখা পুতুলটার দিকে। এই পুতুলটা এখন তার বড্ড প্রিয় হয়ে উঠেছে। হবে নাই বা কেন! অন্যান্য সব আত্মাকে সে বন্দী করেছে জীবিত অবস্থায়, আর এটা একটা জীবিত প্রাণীর আত্মা... নিজেকে কেমন যেন ভগবান ভগবান মনে হতে লাগল তান্ত্রিক শ্রীঅংশুমানের। পরণে রক্তবস্ত্র, কপালে লাল তিলক। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওই জারেরই পাশ থেকে তুলে নিল সেই পাথরের বাক্সটা... যেটা নাহলে হয়ত এই আত্মাকে বন্দী করা তার পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব হতনা। ব্যবহৃত জিনিস থেকে স্মৃতিকে বের করে আনার বিদ্যা সে গুরুর কাছেই পেয়েছে বহু বছর আগে। অবশ্য এখনও চাইলেই সে গুরুর কাছে উপদেশ নিতে পারে। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি প্রকাশ পেল তার, তারপর দৃষ্টি গেল ঘরে পূর্ব দেওয়ালে তাকগুলোয় রাখা বয়ামগুলোর দিকে। সবারে উপরে তাকে মাত্র একটা বয়াম, যেটায় সকাল সন্ধ্যে পূজো হয় যথাবিহিত সম্মান সহকারে। সেখানে সিঁদুরের অক্ষরে লেখা আছে, “ওঁ অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্। তৎপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।" ৪ টিঁক টিঁক টিঁক করে বেজেই চলেছে অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রটা। গত কয়েক ঘন্টার মধ্যে অনেকখানি অবস্থান বদল করেছে আত্মাটা পৃথিবীর পশ্চিমে। এই দেখে স্বয়ংক্রিয় চালকও হতভম্ব হয়ে পড়েছে তাকে ঠিক কোথায় যেতে হবে... তাই বাধ্য হয়েই শীতল অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলা হল কর্মাদ্মক কে। পর্দায় জ্বলজ্বল করে ফুটে উঠেছে, ‘আপনি কি গন্তব্যস্থল পরিবর্তন করতে চান?’ ‘হ্যাঁ’ তে স্পর্শ করে এবার নিশ্চিন্ত হয়ে বসল সে। এ যন্ত্র যে ভুল করতেই পারেনা সে সম্পর্কে একটা ধারণা ধীরে ধীরে বহুজনের মন্তব্যে গড়ে উঠেছে তার। আজও তার কেরামতি সে দেখতে পেল এইভাবে। এই ভিনগ্রহে একা একা ঘুরতে আসতে যে সাহসের প্রয়োজন হয় তার অনেকটাই এই মহাকাশযানের ভরসায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবীর অভিকর্ষ সীমায় প্রবেশ করবে তার যান। তাই সোজা পথ ছেড়ে এবার কৌণিক ভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীর পরিধি বরাবর ঘোরার ভান করতে করতে অভিকর্ষ বলকে ফাঁকি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে সে। সেই উদ্যোগ ‘অলক্ষ্য’ অনেক আগেই নিতে শুরু করেছে বুঝতে পারল কর্মাদ্মক। তাই কোমরবন্ধকটা বেঁধে নিয়ে বসে পড়ল সে। কানের পর্দায় চাপের তারতম্য কম বোধ করেই জানলাটা খুলে দিল সে। রৌদ্রে চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। তার উপর সাদা সাদা মেঘের রাশির উপর আলোর প্রতিফলন। হ্যাঁ আর বেশী দূরে নয় অভিপ্রেত জায়গাখনি, যেখানে পাওয়া যাবে তার বাবার আত্মাকে। তারপর সসম্মানে সে আত্মাকে দেহে প্রতিষ্ঠা করে নিয়ে যাবে নিজের গ্রহে, যেখানে তার বোন অপেক্ষা করে আছে বাবার নিজের হাতে তৈরী গোশালার দুগ্ধ দিয়ে তৈরী নানা সুস্বাদু খাবার হাতে, নতুন গ্রহের রোমাঞ্চকর ঘটনার কাহিনী শুনবে বলে। বাবা বাড়িতে না থাকলে যে কারওরই মুখে খাবার রোচে না। কাঠের মেঝেতে গোল হয়ে বসে খাবার পিঁড়িটায় সবাই মিলে খেতে বসার আনন্দ আবার কবে ফিরে পাবে... ভাবতেই দুচোখ ছলছল করে উঠল অশ্রুর প্লাবনে। অনেকক্ষণ সাদা মেঘের রাজ্যে বন্দী থাকার পর এবার দেখা পাওয়া গেল ভূপৃষ্ঠের। কিন্তু এ জমি এত রুক্ষ কেন? সবুজের লেশমাত্র নেই। শুধু ধুসরতার ভরা প্রান্তর... আর মাঝে মাঝে কালো কালো ছায়া, এত উপর থেকেও যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তাদের কোনটা সাদা মেঘের, কোনটা কালো... কোনটা আবার কমলা রঙের মেঘের থেকে সৃষ্ট। ‘ই ওয়ে’... চমকে পাশ ফিরে তাকাল কর্মাদ্মক এক অচেনা নারী কণ্ঠে। বালিপাহারের মাঝে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হল যে জায়গাটা সেখানে মহাকাশযানটা রেখে ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করছিল সে। ডাক শুনে ঘুরে তাকিয়ে এমন হতভম্ব হয়ে গেল যে দেখতেই পেলনা হাতঘড়িটার পর্দায় তখন ফুটে উঠেছে “এই কথার অর্থ হল ‘আপনাকে স্বাগতম’। এর উত্তরে আপনাকে বলতে হবে ‘এম হোতেপ’।” মেয়েটির আরও দুবার ডাকে সম্বিত ফিরল তার। ইশারায় মেয়েটি তার সঙ্গে যেতে বলে হাঁটা লাগাল। অবুঝের মত পিছু পিছু এগিয়ে চলল সে। অদূরেই একটা ঘেরা জায়গা যেখানে রয়েছে শয়ে শয়ে মেষ। তারই ভিতরে একটা খাটিয়ায় বসতে দিল মেয়েটি। চোখে মুখে তার বড্ড মায়া। দেখেই বুঝেছে ছেলেটি ক্ষুধার্ত। একটা পাত্রে কিছু খেজুর আর বদনা ভর্তি গরম তরল এনে রাখল ছেলেটির সামনে। তারপর একটা পেয়ালায় ঢেলে দিল পানীয় আর একটায় নিজে খেয়ে দেখিয়ে দিল কিভাবে খেতে হয়। দেখাদেখি কর্মাদ্মকও বেশ কয়েকবার পান করল সে পানীয়, কয়েকটা খেজুর মুখে দিয়েই বুঝল তার অপূর্ব স্বাদ। বঙ্গদেশের মানুষের আতিথেয়তার গল্প সে শুনেছে বাবার মুখে, কিন্তু এই ধরণের আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা, অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রের ঘন সবুজের বদলে বালুরাশির মধ্যে নিয়ে আসা - সব যেন কেমন অন্যরকম মনে হতে শুরু করল তার। চোখ বুজে এল। সন্ধ্যার পর গরম বালুরাশি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। আকাশের গায়ে টিমটিম করে জ্বলছে রাতের তারারা। ওদের অনেকেই হয়ত আজ আর বেঁচে নেই, তবুও বেঁচে আছে ওদের আলো, যেমন করে মৃত্যুর পর রয়ে যায় স্মৃতিগুলো। তারাদের বিশাল আয়তনের জন্যই হয়ত ওদের স্মৃতিগুলো এত দীর্ঘস্থায়ী। আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবছিল কর্মাদ্মক। এরই মাঝে কাঁপতে শুরু করল থলিতে রাখা আত্মার অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্রটা। কিন্তু কোথায় সেই মেষপালিকা আর কোথায় তার পালিত ভেড়াগুলির শব্দ-গন্ধ অথবা অনুভূতি? শুধু একটা খাটিয়ার উপরে সে, আর চরিদিকে ঘন অন্ধকার। হাতঘড়িটা দুবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে আলো জ্বালল সে। না, পাথুরে বালি আর নির্জনতা ছাড়া কিচ্ছু চোখে পড়ছেনা। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল সে। ৫ অনেকক্ষণ চলার পরে হঠাৎ রাস্তা গেল থেমে। সামনে বিরাট এক বেলেপাথরের দেওয়াল। কিন্তু দিক নির্দেশ করা আছে এদিকেই। অতএব এগোতে হবে... কিন্তু কিভাবে। ঠিক এইসময় ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। হাতের আলোটা গেল নিভে। তার বদলে দেওয়ালের গা বরাবর দেখা গেল একটা ফাটল, তার ভিতর থেকে হালকা আলোর রেখা চোখে পড়ছে। ফাটলে কান পাতল সে। ‘কিন্তু আমার ছেলেকে আমি কেন মারব?’ এ তো বাবার গলা, হতচকিত হয়ে উঠল সে। ‘কারণ নাহলে আপনার উপর যে অত্যাচার হবে তা আপনি সহ্য করতে পারবেন না শ্রী মনাকদ্ম। মনে পড়ে সেই রাতের কথা? যখন পণ্ডিতমশাইয়ের আতিথেয়তার সুযোগে তার বাড়িতে কাজ করতে আসা ছোট্ট মেয়েটাকে ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে... ছিঃ ধিক আপনাকে। না না, পালানোর কথা মনেও আনবেন না। বয়ামের মধ্যে দুটো কুঠুরি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন, সাদা দিকটায় আপনার ভালো সত্ত্বাটাকে মন্ত্রবলে আটকে রেখেছি, যে অংশটাকে কাজ করতে পাঠাব সেটা কালো দিক অর্থাৎ আপনার খারাপ সত্ত্বা। তাই পালিয়েও আপনি সম্পুর্ণ নিজেকে কখনওই ফিরে পাবেন না, বাকী অর্ধের টানে বারে বারে এই পাত্রে আপনাকে ফিরে আসতেই হবে।’ এটাই কি তবে সেই তান্ত্রিক, বাবা যার কথা বলেছিল! কিন্তু ও কে? ফাটলের মধ্যে দিয়ে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে যে জিনিস চোখে পড়ল তাতে পা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হল কর্মাদ্মকের। একটা কারুকার্য করা একটা বাক্সে নানারকম খোদাই করা। তারই মাঝখান থেকে উঠে বসেছে এক নারীমুর্তি, যেন অর্ধেক শক্তি অর্ধেক শরীর। ধীরে ধীরে সে সম্পূর্ণ নারীমুর্তির রূপ পেল। তারপর তান্ত্রিককে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘এবার আমাকে মুক্তি দিন, আমি আপনার কথামত ছেলেটির আত্মাকে এনে হাজির করেছি এই গম্বুজের বাইরে, আপনার উপহার গ্রহণ করে আমায় ছেড়ে দিন। আর উপহার হিসাবে রেখে দিন এই প্রাসাদ, আপনার সাধনার গৃহ হিসেবে। সারাজীবন।’ আত্মা? কি বলছে মেয়েটা? হঠাৎ করেই নিজেকে প্রাসাদসম বাক্সের ভিতরে আবিষ্কার করল সে। ডানপাশের বয়ামটায় বাবার আত্মা ভীষণভাবে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আর বাঁদিকেরটায় সেই অর্ধেক শক্তি আর অর্ধেক শরীর মেয়েটা, যে খিদের সময় তার হাতে তুলে দিয়েছিল খাদ্য, পানীয়, আর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল কয়েক ঘন্টার শান্তির ঘুমের। ‘তাহলে আজ কটা হল তান্ত্রিক মশাই?’ এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন মশালের আলোয় আলোকিত গম্বুজটার ভিতরে। ‘আরে মুস্তাফা, এসো এসো। তা খান দুয়েক হল বুঝলে আজ। ভেতর থেকে এই কন্যাকে পাওয়া গেল, আর ফাউ হিসাবে এটা।’ পাশাপাশি রাখা মেয়েটা আর কর্মাদ্মক এর বয়ামগুলোর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করল তান্ত্রিক। ‘এবার আসুন অন্যান্য জিনিসপত্রগুলো ভাগ বাটোয়ারা করে রাত্রের মধ্যেই সরে পড়া যাক।’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ চলো, সেই বরং ভালো।’ *** ‘আচ্ছা বাবা, আমরা কি আর কখনওই গ্রহে ফিরে যেতে পারবনা?’ ‘আমি তোমার দেহটাকে তোমার আকাশযানের ভেতরের শীতল ঘরে রাখিয়ে দিয়েছি। যতদিন না লোকের নজরে পড়ছে আর সৌরশক্তির যোগান আছে, তোমরা দুজন জীবিতই থাকবে। হয়ত কোন একদিন আবার আকাশের ওপার থেকে তোমাদের ডাক আসবে, তোমরা ফিরে পাবে তোমাদের আত্মীয় স্বজন, কাছের মানুষদের।’ বহুকাল আগের মমি থেকে বেরিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া মেয়েটির আত্মা বলে উঠল। ‘আমার ভুলের জন্য তোকেও... পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা।’ হতাশ মনাকদ্মের গলা ধরে এল। *** দেশে ফিরে গুরুদেবের তাকের উপরে আর একটা তাক বানাল শ্রীঅংশুমান, শুধুমাত্র মনাকদ্মের জন্য। সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখানো হল, ‘‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ। পিতোরি প্রিতিমা পন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ।।’’ বাকী দুজনের ঠাঁই হল অন্য আত্মাদের পাশে।

140

4

অপন

যে শারদীয়া বেরোয়নি

বৃদ্ধাশ্রমে'র কথা ডালিয়া মুখার্জী .............. এ লেখা আমি যখন বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করতুম মানে স্বেচ্ছাসেবিকা ছিলুম তখনকার। আমাদের বৃদ্ধাশ্রমে সোমবার দুপুরটা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের নিয়ে খেলাবার দুপুর। এখানে আমার নিজেরও একটা খেলার গ্রুপ আছে। বেশ কয়েক বছর ধরে এই খেলানোর কাজটা করছি। তাই আমার গ্রুপের সকলকেই আমি ভাল ভাবেই চিনি। এই গ্রুপে এক মহিলা আসেন, হুইল চেয়ারে বসা। তার স্বামী তাকে এনে আমার গ্রুপে বসিয়ে দেন। ভদ্রমহিলার হাতে তত জোর নেই। তবু নিজের মত খেলে চলেন। এরমধ‍্যে তিনমাস দেশে চলে গেছিলুম। ফিরে এসে আবার এই কাজে যোগ দিলুম। সেদিনও গেছি খেলাতে। অনেকদিন পরে উক্ত মহিলাকে আবার আমার গ্রুপে দেখতে পেলাম। জিভটা বেরিয়ে আছে, বাকশক্তি রোহিত। দেখে চমকাবারই কথা। নার্স কে জিজ্ঞেস করলাম ‌কি হয়েছে ওঁনার। নার্স উত্তর দিলেন স্রেরিবাল অ্যাটাকে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। কি আর করা যাবে। খুবই কষ্টের ওঁনাকে বোঝা। ভাবলুম সত‍্যি কি আর করা যাবে। যে মহিলাকে হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখে এসেছি অনর্গল কথা বলতেন, আজ ভগবান তার কথা বলার শক্তিটুকুও নিয়ে নিলেন। ব‍্যাথায় বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠলো। একি শাস্তি মহিলার ! কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু কেউই যে তার কথা বুঝতে পারছে না। মনে হল এই কি ছিল তার শেষ বয়সের প্রাপ্তি! বিধির কি নিষ্ঠুর পরিহাস। জিজ্ঞেস করলাম. ‘ম‍্যাডাম চা কফি কিছু খাবেন।?’ গলা দিয়ে শুধু ঘরঘর শব্দ বের হোলো। কিছুই বুঝতে পারলুম না। নার্স বললেন চা, কফি উনি খেতে পারবেন না। আস্তে আস্তে হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এলুম টেবিলের সামনে। হাতে যতটুকু জোর ছিল তাই দিয়েই ঘুঁটিগুলো ফেলতে লাগলেন। কিন্তু হাতের জোরটুকুও বোধহয় ভগবান কেড়ে নিয়েছেন। আস্তে আস্তে তবু কি অক্লান্ত পরিশ্রমই না ভদ্রমহিলা করে চলেছেন একটি ঘুঁটি ঘরের ভেতর ঢোকাবার জন‍্যে। মাঝে মাঝে মহিলাকে পিঠ চাপড়ে বলতে লাগলুম খুব ভাল খেলছেন। এটা সকলকেই বলতে হয়। তাহলে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা খুব খুশি হন। মনে মনে মহিলার প্রশংসা না করে পারলুম না। খেলা শেষে পয়েন্ট যোগ করে দেখলুম ভদ্রমহিলার ১২০ পয়েন্ট হয়েছে। যদিও এটা খুব একটা বেশি নয়। তবু মহিলাকে বলতেই একটু যেন হাসার চেষ্টা করলেন। আজ অত‍্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে এসেছি বাড়িতে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেবলই ভদ্রমহিলা জিভ বার করা মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একজনের মুখে শুনেছিলুম শারীরিক কষ্ট ওষুধে লাঘব করা যায়, কিন্তু মানসিক কষ্টের লাঘব নেই। আজ ভাবছি সত‍্যিই কি তাই? আমার গ্রুপে আরও একজন মহিলা ছিলেন যার সঙ্গে তার মেয়ের বত্রিশ বছর কোন সম্পর্ক নেই। দু'বছর আগে স্বামী মারা গেছেন , মেয়েকে খবরও দিতে পারেননি। মেয়ে কোথায় আছে জানেন না। আমার সঙ্গে বসে মাঝে মাঝে কথা বলতেন , মেয়ের কথা আর কাঁদতেন। তখন আমারও খুব কষ্ট হোত। এখন এই শারীরিক অসুস্থ মহিলাকে দেখে দুজনের মধ্যে তুলনা করতে শুরু করেছি। বত্রিশ বছর মেয়ের সঙ্গে দেখা নেই মেয়ের মুখটাও বোধহয় তিনি ভুলে গেছেন। তবু প্রতি সোমবারেই তাকে দেখি খেলতে আসেন। আর এই বাকশক্তি রোহিত মহিলাও আসেন খেলতে। একজন যুদ্ধ করছেন মনের সঙ্গে। অন‍্যজন শরীরের সঙ্গে। কার কষ্টটা তবে বেশি? জানি না কোনদিন এর উত্তর আমি পাব কি না, তবু মনে মনে সেই বিরাট শক্তির কাছে মাথা নত করলুম।বললুম এদের দুজনের কষ্টই তুমি লাঘব কর প্রভু। আজ এই মহিলারা আমার মনে যে দাগ কেটে গেলেন তা কি আমি কোনদিন ভুলতে পারব ? আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মনে হয় যে বিরাট শক্তি সারা বিশ্বকে চালাচ্ছেন কখনও তিনি মানুষ কে বসান সোনার সিংহাসনে, কখনো বা মানুষের জন‍্যে রাখেন কন্টক শয‍্যা। কি অদ্ভুত তার বিচার।!তবু এই বিরাট শক্তি কে প্রণাম না করে পারি না।

565

65

মনোজ ভট্টাচার্য

অবশেষে – আদ্রার বৃদ্ধাবাস !

‚ মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে এসেছিলেন ও থেকেছেন – এ তথ্য জানতাম না ! এদেরই পত্রিকা পূর্বাশা ২০১৮ সংখ্যায় শ্রী অমিয় কুমার সেনগুপ্তর একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে এই ইতিহাস দেওয়া আছে । আমি চেষ্টা করছি একটু সংক্ষেপে লিখতে । ১৮৭২ সাল । তখন পুরুলিয়ার রাজনৈতিক ম্যাপ অন্যরকম ছিল । কাশিপুর পঞ্চকোট রাজ্যের সম্পত্তি সারা পুরুলিয়া জুড়েই ছড়িয়ে ছিল । পঞ্চকোট রাজ্যের অধিপতি ছিলেন নীলমণি সিংহদেও । সিপাহি বিদ্রোহের তাণ্ডবের জেরে ও মামলা মোকদ্দমার ফলে ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে তার কারাবাস হয় একাধিকবার । এইসময় নাগাদ পুরুলিয়ার আদালতে একটা মামলার সুবাদে মাইকেল মধুসূদনকে আসতে হয় । যদিও তার এই আগমনের বিষয়টাকে খুব গোপন রাখা হয়েছিলো । ফলে তিনি কার পক্ষে – কী মামলায় লড়তে এসেছিলেন – সঠিকভাবে কিছুই জানা যায়নি । তবে আদালতে সওয়াল জবাবের সময়ে অবশ্য একথা আর গোপন রাখা যায় নি । ঐদিনই তাকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছিল – তা হল গসনার ইভানজেলিক লুথেরান চার্চ । মাইকেলের পুরুলিয়ার আসার খবর ঐ চার্চের দুই পুরোহিতের কানে যাওয়ার সাথে সাথে সাথে তারাও তাকে মিশনারিদের পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা দেবার মনস্থ করে । কিন্তু মাইকেল আগে থেকে তৈরি ছিলেন না । তাঁর কলকাতায় ফেরার কথা ছিল । তা স্বত্বেও তিনি চার্চ কর্তৃপক্ষর অনুরোধ ফেরাতে পারেন নি । - কবি তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিমায় গির্জার মাঠে সেই সন্মান গ্রহন করে খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছে কৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ হলেন । এ ছাড়াও আরেকটি অনুষ্ঠানে তাকে থাকতে হয়েছিলো । ঐ চার্চের অন্যতম সদস্য কাঙ্গালি চরন সিংহের পুত্র কৃষ্ণদাস সিংহের খৃস্টধর্মে দীক্ষা অনুষ্ঠানে ধর্মপিতার ভুমিকা পালন করতে হয় । এবং এদের অনুরোধে মাইকেল লিখলেন একটি সনেট – কবির ধর্মপুত্র । এরপর মধুসুদন কলকাতায় ফিরে যান । এদিকে ক্রমাগত ব্রিটিশ বিরোধিতার কারনে রাজা নীলমণি সিংহদেওকে বেশ কয়েকবার কারাবন্দী হতে হয়েছে । তারই মধ্যে আরও একটি মামলায় তাকে জড়িয়ে পড়তে হল। সেই মামলায়ও তিনি হেরে গেলেন । সেই সময় তিনি শুনলেন মধুসুদন দত্ত নামে এক কলকাতার ব্যারিস্টার-কবি পুরুলিয়া শহরে মামলার কাজ নিয়ে এসেছেন । তাকে নিয়ে আসার জন্যে লোক পাঠানো হলে – মাইকেল ইতিমধ্যে কলকাতায় ফিরে গেছেন। মহারাজ নীলমণি ঠিক করে ফেললেন – মধু-কবিকে চাকরি দিয়ে পুরুলিয়ায় আনবেন । মাইকেলের নাকি মনোগত ইচ্ছে ছিল কোন রাজ সভার সভাকবি হওয়া । তাঁর আর্থিক অবস্থাও তখন স্বচ্ছল যাচ্ছিল না । তিনি মহারাজার চাকরি গ্রহন করলেন ও ১৮৭২ সালের মার্চ মাসে পুরুলিয়ায় এলেন । কিন্তু মুলত যে মামলাটি লড়বার জন্যে মাইকেল এসেছিলেন – সেই মামলাটি তিনি হেরে যান । অর্থাৎ মহারাজারও হার হল । - তিনি ধরেই নিলেন তাঁর আর এই রাজদরবারে থাকার প্রয়োজন নেই - হয়ত তাঁর পক্ষে ক্ষতিকারক ও বিপজ্জনক হতে পারে । এই সময় মাইকেল মানসিকভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়েছেন । কলকাতায় তখন তাঁর বিপুল ধার-দেনা । - তবু এখানে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হল না । - নীলমণি মহারাজার হয়ে যে জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে তিনি মামলা লড়লেন – তাদেরই এক আত্মিয়র সাহায্যে মাইকেল রাজবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন । ১১ই সেপ্টেম্বর বা ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৮৭২ সালে তিনি জয়চন্ডী পাহাড়ের পাশ দিয়ে রঘুনাথপুর হয়ে তিনি চলে এলেন । এর পর মাত্র ন’মাস মধুসুদান বেঁচে ছিলেন – ২৯শে জুন, ১৮৭৩ । মাইকেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে খুব বথিত হৃদয় মাইকেলের বকেয়া মাইনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । - মহাকবির এই পুরুলিয়া-অধ্যায়টি বড়ই বিতর্কিত ও বিয়োগান্ত ! এর মধ্যে রাজার মামলা হেরে যাওয়া নয়, রাজসভার চক্রান্ত ও রাজার কন্যা চন্দ্রকুমারীর কাল্পনিক প্রেম সংক্রান্ত ঘটনা । মনোজ ( মাইকেলের পুরুলিয়া আসার এই অংশটা এখানে না দিলেও হত । কিন্তু এতো বড় একটা ঘটনা - না দিলে একেবারে না-জানা থেকে যেত !)

152

4