মনোজ ভট্টাচার্য

চলিতে চলিতে পথে - - !

চলিতে চলিতে পথে - - ! আগে যখন নিউ ইয়র্ক থেকে কলকাতায় যাতায়াত করতাম – সাধারনত এয়ার ইন্ডিয়াতেই আসা-যাওয়া করতাম । কিন্তু পয়সা বাঁচাবার জন্যে অন্যান্য এয়ার লাইন্সএও এসেছি । মনে আছে – আগে রুমানিয়ার তরাম নামে একটা এয়ার লাইনসেও চড়েছি । খুবই ছোট প্লেন - ডি সি ১০ । কিন্তু বুখারেস্ট এয়ারপোর্টে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হত । তারপর বোধয় বন্ধ হয়ে গেছিলো । জর্ডন এয়ারলাইন্সেও গেছি । আম্মানে অপেক্ষা করতে হত । ওটাও ছোট প্লেন ছিল । খুব টাল খেত । মাঝে মাঝে ব্রিটিশ এয়ারলাইনসে যেতাম । কিন্তু ওদের ব্যবহার ভারতীয়দের প্রতি অত্যন্ত অভদ্রোচিত ছিল । অনেকেরই হয়ত মনে আছে – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে রানু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কি দুর্ব্যবহার করা হয়েছিলো । - সে যাইহোক, ওদের ফ্লাইটে শেষবার আসার সময়ে লন্ডন এয়ারপোর্টে আমিও খুব ঝগড়া করেছি । আমি কি ওদের দেশে থাকতে গেছি ! - সেই থেকে আমিও আর ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে যাই না । - পরপর কবার তো এমিরেটসেই যাতায়াত করেছি । যাইহোক, যে কথা বলতে চাইছি – যাতায়াতের পথে – কত স্মৃতি যে আটকা পড়ে – তাঁর ইয়ত্তা নেই ! – একবার লুফথহান্সা ফ্লাইটে কলকাতায় যাবার সময়ে ফ্র্যাঙ্কফুট দিয়ে যাবার সময় দেখা হয়ে গেল – রুপঙ্করের সঙ্গে । ও কানাডা থেকে কোন প্রোগ্রাম করে ফিরছে ! - তার আগের বছরই রূপঙ্কর এখানকার পুজয় এসেছিল – গান গাইতে । - সে কি গান – ভাইরে ! রুপঙ্করের গলা এমনিতে আমাদের ভীষণ ভালো লাগে ! – কিন্তু যে কারনেই হোক – ওর ইচ্ছে হোল আমাদের হার্ড রক শোনাবে । সে যে কি বীভৎস – যে না শুনেছে – বুঝতে পারবে না ! গানটা ছিল - ও চাঁদ তোর জন্মদিনে ভদকা খাবো ! - শুধু নিজে খেলে এত তাণ্ডব হত না ! কিন্তু চাঁদকেও খাওয়াতে চায় যে ! মাইকের স্ট্যান্ড নিয়ে যে করিওগ্র্যাফি করছিলো – তা একমাত্র দক্ষযজ্ঞের পরে শিবই বোধয় সেই লন্ডভন্ড নৃত্য করেছিল ! – আমরা – বিশেষ করে যারা সামনের দিকে বসেছিলাম – তারা - তাকে শান্ত থাকার অনুরোধ করছিলাম । কে কার কথা শোনে । তখন ভদকা-নৃত্য চলছেই । খানিকক্ষণ শোনার পর আমরা উঠে পড়েছিলাম । - অথচ আগে ওর কয়েকটা গান শুনেছিলাম – খুব ভালো লেগেছিল । সে সব গান কেন গাইল না ! – পরে অবশ্য অনেক কিছুই শুনেছিলাম । সে আর এখানে লিখে লাভ নেই ! এখন তো রুপঙ্করের বেশ কয়েকটা গান প্রায়ই শুনি অন-লাইনে ! সত্যিই খুব ভালো লাগে । আমার এই হয়েছে মুস্কিল - কিছুতেই আসল কথায় আসতে পারছি না ! তা সেই রুপঙ্কর একটা বারমুডা পড়ে ওয়েটিং এরিয়ায় ঘুরছে । আমি পরিচয় দিলাম । আরও কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম ওর কলকাতায় বাড়ি নিয়ে । তা রূপঙ্কর সেগুলোর উত্তর দিয়েছিল । আমাদের সঙ্গে একটি মেয়েও জুটেছিল । প্লেনেই আলাপ হয়েছিলো । বেশ ছিম-ছামচেহারা ! সে নাকি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করে । তখন ব্যাপারটা ঠিক বুঝিনি । ওর বয়েসি একটা মেয়ে কি করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করে ! কারন আমার ধারনা – ইভেন্ট ন্যানেজমেন্ট তো বেশ বড় গোছের ব্যাপার ! মেয়েটিকে খুব একটা সুন্দরী দেখতে না হলেও – বেশ স্মার্ট কথাবার্তা । রুপঙ্করের সঙ্গে দেখলাম – আগে থেকেই আলাপ আছে । রূপঙ্কর ওর পরবর্তী ডেট সম্বন্ধে জেনে নিল । নাম পায়েল সেন । ওদের সবার পদবী কি সেন হয় ! ওর ফোন নম্বর ও ইমেল ঠিকানা দিল । কলকাতায় গিয়েই যেন ওর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করি । তাহলে আলাপ করা যাবে ! – প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি – এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমি একটু পরিচিত হয়েছি আগেই । অর্থাৎ তাদের হয়ত লেদার ব্যাগের বা অন্য ব্যবসা আছে । আমি যদি ওদের সাহায্য করতে পারি ! – আবার স্টেট ব্যাঙ্কের একটি ছেলে বলেছিল – তাদের একটা ব্যান্ড আছে । যদি এখানে ওদের আসার একটা বন্দোবস্ত করতে পারি । - ওরা যে কত বোকা – আমার এই ক্যাবলাকান্ত চেহারা দেখেও ওরা বুঝতে পারত না যে আমার দ্বারা ভালো কিছুই সম্ভব নয় ! কলকাতায় এসে আমরা ঝড়ের গতিতে সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, কেনাকাটা, ইত্যাদি ইত্যাদি সারতে সারতেই দেখতে পাই আমাদের ফেরার দিন – পরশুদিন ! একবার তো ফেরার টিকিটে সময় ছিল ০০-১৫ এ এম । আগামী কালের ডেট । অর্থাৎ কিনা আজকেই রাত বারোটা ! আমার সে কি আফসোস ! ফিরে যাবার আগের দিনটা কত ক্রিটিকাল হয় ! কত কাজ সেরে ফেলতে হয় ! এখানে কি পায়েল সেন আছেন ? কে পায়েল সেন ! ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট করেন ? না না মশাই, এখানে কোন পায়েল সেন কাজ করে না ! ল্যাপ টপ আনি নি । ইমেলও করতে পারিনি । তাই বাড়ি ফিরে গিয়ে ইমেল করি । তার কোন উত্তর আসেনি । মনোজ

34

3

মানব

ছাই

কৃতজ্ঞতাঃ গুপ্ত সাধক শ্যামা ক্ষ্যাপা ১ - তো মানস কো হি ভেজ দেতে হ্যায়। ক্যা বোলতে হো পাণ্ডেজি? সর্দারজি প্রশ্ন করলেন সরাসরি অশোক পাণ্ডের দিকে তাকিয়ে। অশোক পাণ্ডে আমার ডিপার্ট্মেন্টাল ম্যানেজার। মিটিং চলছে, কয়লার ছাই নিয়ে। ছাইয়ের মধ্যে অদগ্ধ কার্বনের পরিমাণ বেড়েই চলেছে, সম্পূর্ণ দহন না হওয়ার ফলে। এ বিষয়েই ডাকা হয়েছে মিটিং। আমি মানস সেনগুপ্ত, ‘খোপোলি ও এন্ড এম’ এর প্ল্যানিং ইঞ্জিনিয়ার। জীবনের প্রথম চাকরিতে জয়েন করার সবে দেড়বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু কাজের চাপ বেড়েই চলেছে। ‘ও এণ্ড এম’ – অর্থাৎ অপারেশন এণ্ড মেইন্টেনেন্স। বিভিন্ন কোম্পানির ক্যাপটিভ প্ল্যাণ্ট চালানো এবং তার রক্ষণাবেক্ষণই আমাদের কোম্পানির কাজ। এখন যে প্ল্যান্টে আছি তার প্রায় সবটাই এককালে সরকারী শেয়ারে ছিল, যা এখন কমে কমে পনের শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যাইহোক, কাস্টমারের তরফ থেকে টেবিলের ওপাশে প্ল্যান্ট হেড সর্দারজি, তাঁর পাশে মিঃ তিওয়ারী – অপারেশন হেড, মিঃ সরকার – মেইন্টেনেন্স হেড, এবং আরও দুজন ইঞ্জিনিয়ার। টেবিলের এপাশে আমাদের তরফ থেকে সবার প্রথমেই রয়েছেন মিঃ সিং – মানুষটির বয়েস প্রায় পঁচাত্তর, কিন্তু শখ ষোল আনা বজায় আছে। এই বয়েসে মাসে দেড় লাখের কাছাকাছি মাইনের লোভ ছাড়তে পারেননি, তাই বাচেলর অ্যাকোমডেশনেই রয়ে গেছেন। উনি অবশ্য বলেন, বাড়ি গেলেই ছেলে বউয়ের অধীনে থেকে যেতে হবে, সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তির জন্যই এখানে থেকে যাওয়া। তারপর রয়েছেন মিঃ পাণ্ডে, আমার ম্যানেজার, সংসারী মানুষ, দুটি মেয়ে – বড়টির জন্য পাত্র খুঁজছেন। আমাকে এই নিয়ে তিনবার জাতি, গোত্র ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে ফেলেছেন। তারপর রয়েছেন মিঃ ত্রিপাঠি – একটু নাদুস নুদুস গড়ন, আরাম আয়েসে থাকতে ভালোবাসেন। চুপিচুপি বলে রাখি, এই ত্রিপাঠিবাবুর মেয়ে আমাকে একবার ফ্রেন্ড রিক্যুয়েস্ট পাঠিয়েছিল, রিজেক্ট করেছিলাম। তার পর রয়েছি আমি। আমার পর একটা ফাঁকা চেয়ার। সিংবাবু বরাবরই ক্লান্ত থাকেন – বয়স তো হয়েছে, তাছাড়া সবসময় প্ল্যান্টের ভালোর কথা চিন্তা করলে ক্লান্তি তো আসবেই। তাই উনি মাঝে মাঝেই ঢুলে পড়ছেন, আর সর্দারজির গলা একটু উঁচু হলেই চোখ খুলে চমকে উঠছেন। ত্রিপাঠিবাবু আরাম আয়েসের মানুষ, আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে – অথচ আপনি জানতেই পারবেন না, উনি আসলে ঘুমোচ্ছেন। পাণ্ডেজি ওনাদের মাঝখানে বসে সর্দারজি ও অন্যান্য দুইজন হেড এর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। উনি সাহিত্যিক মানুষ, অন্য এক দুনিয়ায় থাকেন। ভাবের ঘোরে প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলে গিয়ে প্রায়ই তাকান আমার দিকে – এখন সর্বকনিষ্ঠ এই ছেলেটির উপর যদি এতবড় একটা কোম্পানি ভরসা করে থাকে, তাহলে আমাকেও ওনাদের ভরসার মর্যাদা রাখতে হয় বৈকি। পাণ্ডেজি আমার দিকে তাকালেন। আমিও ঘাড় নাড়লাম। পাণ্ডেজিও সর্দারজির দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন, - ঠিক হ্যায়, ভেজ দিজিয়ে। ২ এমনিতে আমার জেনারেল শিফট – আটটা থেকে পাঁচটার ডিউটি, অথচ পাঁচটায় বাড়ি গেলে কোম্পানির বাস আপনাকে ছাড়তে আসবেনা, কোম্পানির বাস টাইম হল বিকেল ৬ টায় – কেমন অরাজকতা বলুন দেখি। আপনি চান বা না চান, এক ঘন্টা এক্সট্রা আপনাকে ভিতরে থেকে যেতেই হয় - হেঁটে হেঁটে অতদূর যাওয়া পোষায় না। একদিনের অফিস না যাওয়ার আনন্দ, তার উপরে সকাল সকাল চিতোরগড়ের প্ল্যান্টে কয়লা আর ছাইয়ের স্যাম্পল পৌঁছে দিতে যাওয়ার নতুন অভিজ্ঞতা – সব মিলিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলাম। সময়মত ড্রাইভার চলে এল। ঠিক করা ছিল প্ল্যান্ট থেকে ফতেহনগর গিয়ে তারপর বাঁদিকে ঘুরে চিতোরের উদ্দেশ্যে যাওয়া হবে। লোকটার নাম সুলতান সিং, বেশ মিশুকে স্বভাব। কথায় কথায় অনেক কিছু আলোচনা হল। এই জায়গাটা আগে জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, গ্রামের মানুষের অর্থনীতিতে কিভাবে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে এই প্ল্যান্ট ইত্যাদি। প্রায় মিনিট দশ চলার পর হঠাৎ গাড়ি বাঁদিকে ঘোরালো সে। কেমন একটা খটকা লাগল, আমার দিকে তাকাতেই জিনিসটা টের পেয়ে সে বলল, - ইয়ে শর্টকাট হ্যায় সাব। - রাস্তা থাকলেই হল, চলো চলো। সেই একঘেয়ে পিচ রাস্তার থেকে কিছুটা নরম, কিছুটা পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে যেতে বেশ ভালোই লাগছিল। এ এক অন্য রাজস্থান। যেন কোন সুদূর অতীত রাজ্যে পাড়ি দিয়েছি, যেখানে মানুষের মনে না ছিল কোনও টেনশন, না ছিল কোনও তাড়া। কেউ গাছতলায় খাটিয়া পেতে আড্ডায় মশগুল তো কেউ এক-গোরুর গাড়িতে মালপত্র বোঝাই করে চলেছে বাজারের উদ্দেশ্যে। হ্যাঁ, এটাই তো জীবন, বাড়ি ছেড়ে সুদূরে, মাথায় একরাশ চাপ নিয়ে, কাঁচবন্ধ গাড়িতে যেতে যেতে অজান্তেই বেশ কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়লাম এই মানুষগুলোর প্রতি। এরপরের কথোপকথন যেহেতু কিছুটা চলতি হিন্দী, চলতি রাজস্থানী মিশিয়ে হয়েছিল, তাই সুবিধার জন্য সবটাই বাংলা করে বলি। - সাব, ওই যে পুকুরটা দেখছেন, ওটা আমাদের। ওই যে জমিটা, তারপর ওই যে শ্বেতপাথরের পাহাড়টা… - বলো কি! তাহলে এত বড়লোক হয়ে গাড়ি চালাতে এসেছ কেন? - সে আপনি ঠিকই বলেছেন, টাকাপয়সার খুব একটা অভাব নেই। কিন্তু বসে খেলে রাজার সম্পদও শেষ হয়ে যায়। কিছু তো একটা করতে হবে, না কি! রোজগারও খুব একটা কম হয়না এই গাড়ি চালিয়ে। - তা বেশ, তা বেশ। তা টাকাপয়সা কেমন পাও বলা যাবে কি? তারপর লোকটার মাসিক আয় শুনে আমার চোখ কপালে। এইরকম গ্রাম্য অঞ্চলে একটা গাড়িকে প্ল্যাণ্টে ভাড়া খাটিয়ে যা টাকা পায় তা আমার মাইনের প্রায় দ্বিগুণ। - সাব, পাঁচশো টাকা হবে? বাড়িটা পেরিয়ে এলাম, তখন আনতে ভুলে গেছি। ফেরার সময় এই পথেই ফিরব, তখন নিয়ে দিয়ে দেব। - তোমার বাড়ি এখানে? - হ্যাঁ, আবার পিছিয়ে যাব! আপনার লেট হয়ে যাবে। তাড়া আমার মোটেই ছিলনা। কিন্তু হাবভাব দেখাতে আমিও ছাড়লাম না। - ঠিক আছে, এই নাও। বলে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলাম। রাস্তার ধারে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সে দুখানা বোতল আনল – ঠাণ্ডা, ইংরাজীতে । - এই নিন, একটা আপনার, একটা আমার, একটা আপনার। - আরে নানা। ওসব আমি খাইনা। - তাহলে নেমে আসুন, কিছু খেয়ে যাবেন। - চলো দেখি, এমনিতেও সকালে কিছু খাওয়া হয়নি। ততক্ষণে প্রায় আধঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অবশেষে নেমে গিয়ে খাবার জন্য যেখানে ঢুকলাম, একটা তীব্র গন্ধ নাকে ঢুকতেই বুঝলাম, সেটা আসলে একটা মদের ঠেক। মদ্যাভ্যাস আমার নেই। একটা ডিমভাজা আর চা অর্ডার করতেই দোকানের মালিক রে রে করে তেড়ে এল। ভয় পেয়ে বেড়িয়ে এসে সুলতানকে জিজ্ঞেস করলাম, - এরকম হইচই করে উঠল কেন? - কী খেতে চেয়েছিলেন? - ডিমভাজা আর… - ওই তো, ঝামেলাটা এখানেই করে ফেলেছেন, এখানে নন ভেজ চলেনা। যান, অন্য কিছু অর্ডার করুন। অবশেষে, সামোসা আর চা খেয়ে উঠে পড়তে যাব এমন সময়, - সাব, মদ টদ তো খেলেন না। আমাদের অন্য কিছুরও কিন্তু ব্যবস্থা আছে, চাইলে রুমও ফ্রি হয়ে যাবে। একদম সেফ – কোনও ভিডিও ক্যামেরা নাই… - কত হয়েছে? টাকাটা নিন। দোকানের মালিকের এহেন কথায় কোনরকমে রাগ চেপে রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখি বাইরে খাটিয়ায় তখনও গ্লাসে মজেছে সুলতান। - আচ্ছা, এবার কি ওঠা যায়? অনেক তো দেরী হল। - হ্যাঁ সাব। চলুন, এই লাস্ট গেলাসটা শেষ করেই উঠছি। একটু ভয় ভয় করছিল বৈকি। সকাল সকাল এমন মদ গিলে গাড়ি চালালে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তার তো কোনও ঠিকানা নাই। তাছাড়া যেখানে যাচ্ছে, গেটে যদি কেউ এর মুখের গন্ধ শুঁকে ফেলে তাহলে ঢুকতে তো দেবেইনা, উলটে আমাকেও অপমান করে তাড়াবে। রাগে গজগজ করতে করতে তাকে ওঠালাম। যদি গাড়ি চালাতে পারতাম, তাহলে হয়ত ওকে চালাতেই দিতামনা, কিন্তু আমি নিরুপায়। অবশেষে, গাড়ি এগিয়ে চলল পাথুরে রাস্তা ধরে, আরও আরও ঝাঁকুনিতে মুখ দিয়ে শুধুই বেরিয়ে এল রাগ আর হতাশার মেলবন্ধন। মিনিট দশেক পর গাড়ি আবার থামল। - এটা আমার প্রেমিকার বাড়ি। চলুন একটু জল টল খেয়ে আসবেন, আলাপ করবেন। এই বয়েসে প্রেম! অবাকই হলাম। অবশ্য প্রেমিকাটিকে দেখে বুঝলাম, এ এক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। মহিলাটির কপালে চওড়া সিঁদুর। ততোধিক চওড়া টিকা নিয়ে পাগড়ি পরিহিত ভদ্রলোক যে তাঁর স্বামী, এ ব্যাপারে আগেই অনুমান করেছিলাম। ধীরে ধীরে কথাবার্তায় তার প্রমাণও পাওয়া গেল। - তা বাবু, এসেছেন যখন একটু চা জল খেয়ে যান। - আরে নানা, এইমাত্র খেয়ে এলাম। - তাহলে একটু ছাঁচ নিন। এতে না করবেন না। একটা পাত্রে জলসা টক স্বাদের এক গ্লাস সাদা তরল এল। সেটাকে মুখে নিয়ে না পারি ফেলে দিতে, না পারি গিলতে। অবশেষে নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরেই সবটুকু চোঁচোঁ করে গিলে ফেললাম। ছোটবেলায় ঘোল খেয়েছি, গুড় আর নুন মিশিয়ে, সে এক অপূর্ব স্বাদ। কিন্তু এই দুগ্ধজাত দ্রব্যটি যেন খানিকটা তার মত হয়েও অনেকটা আলাদা। ততক্ষণে সুলতান আর সেই ভদ্রলোকটি জুয়ার মত কিছু একটা খেলতে শুরু করেছে। দেখলাম, ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে বাজী রাখলেন, এবং হেরেও গেলেন। - আচ্ছা, ঠিক আছে, হিসেব রাত্রে হবে। এখন একটু তাড়া আছে, চলি কেমন? এই বলে সুলতান উঠে পড়ল, আমিও তার আগে আগে দরজার দিকে এগিয়ে এলাম, দরজার কাছে পৌঁছতেই পায়ে লেগে একটা ছোট্ট ধাতব কিছু ছিটকে গেল। সচেতনভাবেই সেদিকে না তাকিয়ে এগোতে যাচ্ছি, পিছন থেকে সুলতান বলে উঠল, - ও মশাই, আপনার আংটি পড়ে গেছে, এই দেখুন। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটা জ্বলজ্বলে আংটি। এ জিনিস সোনা না হয়ে যায়না। একবার তো নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু এই লোকটার এতক্ষণের আচরণে চক্রান্তের আভাষ পাওয়ায় সে হাত ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, - এ আমার নয়। দেখো ওদের বাড়ির কারও পড়ে গেছে হয়ত। - আরে নানা, এ তোমারই। আহা লজ্জা পাচ্ছ কেন নিয়েই নাও না। এই বলে প্রায় হাতে গুঁজে দিতে যাবে এমন সময়, এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিয়ে সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলাম। ৩ “এখনো সেই রাধারাণী বাঁশির সুরে পাগলিনী অষ্টসখী শিরমণি নব সাজে রে।। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।” ফোনের রিংটোন বাজছে, খেয়ালই করিনি। নতুন রিংটোন লাগালে এই হয়। মাঝে মাঝেই গান বাজছে, নাকি ফোন এসেছে, গুলিয়ে ফেলি। - হ্যালো। - আরে সুলতান বলছি, কোথায় আপনি। এতক্ষণ ধরে গেস্ট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, সব ফাঁকা। এতক্ষণের দেখা জনবসতি, শ্বেতপাথরের সারি সারি ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়, মানুষজন – সব চোখের নিমেষে হাওয়া। ফাঁকা প্রান্তে ফণিমনসা, তেশিরামনসা, বাবলার সারিরা শুধু জানিয়ে দিচ্ছে যে এটা পৃথিবীই, কোনও ভিনগ্রহ নয়। - কিসব যা তা ইয়ার্কি মারছ! আমি তো তোমার সঙ্গেই এতদূর এলাম, তোমার বাড়ি ছিল, শ্বেতপাথরের পাহাড় – প্রেমিকা – তারপর সব হাওয়া – কি যে হচ্ছে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। - কি বলেন স্যার, আপনিও? - আমিও মানে? - সে অনেক কথা। সামনে মন্দির দেখতে পাচ্ছেন কোনও। তার দাবী অনুযায়ী অনেকক্ষণ ধরে আশেপাশে ঘুরে ঘুরে, অনেক খোঁজার পরে দেখলাম, বহু পুরনো একটা মন্দির। কালের কবলে স্থানে স্থানে তার দেওয়াল ধসে পড়েছে, কিন্তু মূল কাঠামোটা রয়ে গেছে। - হ্যাঁ, একটা ভাঙাচোরা – - ব্যাস আর বলতে হবেনা, দশ মিনিটে আসছি। দশ মিনিট পরে সুলতান সিং এল। গাড়ির দরজাটা খুলে বলল, - ভিতরে এসে বসুন। ওঃ না না, এই কালো ঘোড়াটা ওই মন্দিরে রেখে আসুন। ভালই হবে, খারাপ কিছু হবেনা। ততক্ষণে আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কি করছি, কি হচ্ছে আমার সঙ্গে, কিছুই বুঝতে পারছিনা। মাটির ঘোড়াটা প্রনাম করে মন্দিরে রেখে এসে গাড়িতে বসতেই রওনা দিল সুলতান। - কি হচ্ছে বলতো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। - প্রথমে বলুন আপনার সাথে কী কী হল। সবকিছু আগাগোড়া তাকে বলতেই সে বলল, - খুব জোর বেঁচে গেছেন। এরকম আগে আরও দুজনের সঙ্গে হয়েছিল, তাদের একজন বউকে খুন করে জেলে আছে, আর একজন পাগল হয়ে গেছে। - কিন্তু কেন? কিছু আইডিয়া দিতে পারো? - যাকে আপনি দেখেছেন তিনি আর কেউ নন, সাক্ষাত কলি। আর যে যে জিনিসগুলোর প্রতি আপনাকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল সে সবেই কলির অবস্থান। কলির মন্দির মূলত চারটি জায়গায়, মদের ঠেক, যেখানে শরীর কেনাবেচা হয়, জুয়া খেলার জায়গা, এবং সোনায়। এই চারটি জিনিসের একটিতেও আপনি প্রলুব্ধ হননি, তাই এই প্রাচীন মন্দিরের সামনে আপনার পূজা চেয়ে গেছেন কলিদেব। এই ঘোড়াটা পুজো দিয়ে ওনার কাছ থেকে আপনি ওনার প্রভাব কাটালেন। আগের দুটো ঘটনাই আমার দেখা, তাই মন্দিরের নাম শুনেই ঠিক চিনে চলে এসেছি। - আচ্ছা, কত দাম ঘোড়াটার। - সে ঠিক চেয়ে নেব। চলুন চিতোরে নেমে তো কিছু খাওয়াদাওয়াও করতে হবে। সেসব নাহয় আপনি করালেন। জানেন, যে ভদ্রলোকটি তাঁর স্ত্রীকে খুন করেছিলেন, তাঁর সাথে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বড্ড সরল মনের মানুষ। ওনাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। অবশ্য ওই চারটি জিনিসের কোনও একটিতে অতিরিক্ত লোভ যাদের হয়, তাদের উনি ছাড়েন না। আপনার মত সরল মনের মানুষ পেয়ে উনি খুব চেষ্টা করেছিলেন বাগে আনার, ভাগ্যিস আপনি ড্রিঙ্ক করেন না! প্ল্যান্টে পৌঁছে স্যাম্পল জমা দিতে গেলে কেমিস্ট ভদ্রলোকটি বললেন, - এটা দেওয়ার জন্য আপনার আসার আবার কী দরকার ছিল। ড্রাইভারকে দিয়ে দিলেই তো পারতেন। মনে মনে ভাবলাম, তাহলে কি আর এমন অভিজ্ঞতা হত! *** হ্যাঁ, দেখেছেন, ভুলেই যাচ্ছিলাম। কলির প্রভাবে উনি যে আমার পাঁচশ টাকাটা ফেরৎ দিয়েছিলেন সেটা বলতেই ভুলে গেছি। ঘরে ফেরার সময় ফাঁকা বুকপকেটে কিভাবে যেন ফিরে এসেছিল সেই পাঁচশ টাকা। বিশ্বাস করুন, কলির ফেরানো টাকা বলে নোটবন্দীর সময়েও সে টাকা ভাঙাইনি। #মানব_নারায়ণ_সেন

46

3

জল

টুকটাক মনে পড়ে

ফেলা আসা সময়, সেই সময়ের জাগতিক আয়োজন মনের মধ্যে গেঁথে থাকে, ফিরে দেখা, তুলে ধরা স্মৃতির সরণি বেয়ে বয়ে চলাই হল টুকটাক মনে পড়া

1542

90

মনোজ ভট্টাচার্য

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও !

দুনিয়ার নির্যাতিত স্বামীরা - এক হও ! বাঁচাও ! কে আছো ! মরেছি যে স্বামী হয়ে - -! গত দুদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে – পুরুষদের সম্বন্ধে কিছু লিখি । তা দেখলাম কাগজেই সেই লেখা বেরিয়েছে । - পুরুষদের ওপর নির্যাতন ! বিশেষ করে বিবাহিত পুরুষ নামক অসহায় জীবটির প্রতি অত্যাচার । শারীরিক তো বটেই – মানসিক অত্যাচারও ! সেই অত্যাচারের ভার সামলাতে না পেরে – আমাকেও পুরানো লেখা থেকে এই লেখাটি বের করতে হোল । স্বামী নির্যাতন নাকি ৩৪% বেড়ে গেছে ! এতদিনে আরও বেড়ে গেছে নিশ্চয় ! – এদেশে তো বটেই এবং – অবশ্যই - চীনদেশে ! বেচারি স্বামী মহিলা কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন । তার স্ত্রী তাকে খেঁটে বাঁশ দিয়ে মেরেছে । ফলে তার মাথা তো বটেই পিঠে অনেক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে ! ঘটনাটা কী ! – এক ভদ্রলোক রোজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে – তাদের বাচ্চা মেয়েটির তত্ত্বাবধানের জন্যে । কারন তার শাশুড়ি নাকি সেই বাচ্চাটিকে কারনে অকারনে পেটায় । তাই বাচ্চাটির জন্যেই পিতাকে বাড়ি ফিরতে হয় । আর সেই কারনে তার শাশুড়ি তাকে নানানভাবে গালিগালাজ করে । আর স্ত্রী বাড়িতে ঢুকলেই তার নামে নালিশ করে চেঁচিয়ে গালাগাল দিয়ে । তার ফলে তার স্ত্রী রাগের চোটে বাঁশের খেঁটে নিয়ে তাকে প্রহার করে ! মহিলা কমিশন সারা দেশে তদন্ত করে দেখেছে – দেশে স্বামী নির্যাতন সত্যিই ৩৪% শতাংশ বেড়ে গেছে । এই স্বামী নির্যাতন নিয়ে তারাও খুব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ! তাই বলি – স্বামী সাবধান ! তখন নীচের গল্পটার কথা মনে পড়ল । আগেও একবার দিয়েছিলাম । এটা বিদেশি একটা রসিকতা থেকে নেওয়া ! তবে রসিকতা কেন – বোঝা যাচ্ছে ! এক শহরে এক বেচারি জন বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখে – বেশ বড় একটা মিছিল যাচ্ছে । মিছিলের একজনকে জিজ্ঞেস করলো – কিসের মিছিল ! শোক মিছিল । কে মারা গেছে ! মিস্টার থমসনের শাশুড়ি । - কিকরে ? থমসনের কুকুর কামড়েছে । তাই নাকি – সে কুকুর কোথায় ! – একদম সামনের গাড়িতে মাল্যভূষিত হয়ে বসে আছে । - ওই কুকুরটাকে কি ভাড়া পাওয়া যাবে ? – নিশ্চয় যাবে । লাইন দিন । জন লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে দেখে – লাইন প্রায় আধ মাইল দীর্ঘ ! জন ভাবতে থাকে এত লোক শাশুড়ির দ্বারা নির্যাতিত ! এখানেও অবশ্য একজন পুরুষপন্থী নারী নন্দিনী ভট্টাচার্য । তিনি সর্ব বঙ্গ পুরুষ সঙ্ঘের সভাপতি । পুরুষের ওপর অত্যাচার আগের চেয়ে কমেনি তো বটেই – বরং বেড়ে গিয়েছে । তিনি এটা বুঝতে পেরেই এগিয়ে এসেছেন ! - আগে তো পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতেও চাইত না লজ্জাবশত । - কারন নাকি পুরুষরা কাঁদে না ! একটা ইংরিজি সিনেমাও দেখেছিলাম - মেন ডোন্ট ক্রাই’ নামে – সেটা এখন থাক ! – এখন কিন্তু পুরুষরা নারীদের বিশেষ করে স্ত্রীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেন ! নিচে একটা ছবি দিলেই সন্দেহ নিরসন হবে ! – আমি কিন্তু একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ট ভদ্রলোক ! মনোজ

59

2

জল

বিগত সময়ের তরী বেয়ে

(১৭) রাধাকৃষ্ণ জীঁউয়ের মন্দিরে সর্বেশ্বর হিসাবনিকাশ নিয়ে বসেছে| শুধু খরচ খরচার নয়‚ সম্পর্কের হিসাবনিকাশ‚ সবকিছু উতরে যাবার হিসাবনিকাশ| নিমন্ত্রণ শুরু করে দিয়েছেন সর্বেশ্বর| প্রথমেই রাধাকৃষ্ণ জীঁউকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তারপর জ্ঞাতিদের সবাইকেই গলায় চাদর দিয়ে পান‚ সুপারী‚ রুপোর রেকাবী আর রাধাকৃষ্ণ জীঁউয়ের সিঁদুর লাগানো কার্ড দিয়ে সর্বেশ্বর মল্লিক নিমন্ত্রণ করেছেন| মৌখিকভাবে তো সবাই আসবে কথা দিয়েছে| এখনও অনেককেই নিমন্ত্রণ করতে বাকি| মল্লিক বাড়ির সর্বেশ্বর মল্লিকের প্রথম পুত্র বলে কথা| কাউকে বাদ দেওয়া চলবে না| আয়োজনের খামতিও থাকলে হবে না| শুধু যে নিমন্ত্রন সারলেই হবে তা নয়‚ খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্তও এক্দম যাতে পরিবারের সুনাম অনুযায়ী হয় সেদিকেও নজর দিতে হয়েছে| শ্যালক অচিন্ত্যমোহনও অবশ্য খুব করছে| এখন ভালোয় ভালোয় চারহাত এক হয়ে গেলে একটা লম্বা বিশ্রাম নেবেন সর্বেশ্বর মনে মনে ভেবে রেখেছেন| সবকিছু গুছিয়ে ভিতরবাড়ির দিকে রওনা হন| সেখানে এখন জোরকদমে চলেছে শাড়ি বাছাইয়ের কাজ| তাঁতীরা এসেছে কাপড়ের গাটরী নিয়ে| যদিও এসব মেয়েমহলের ব্যাপার কিন্তু সেখানেও তিনি ঠিক ভরসা রাখতে পারছেন না| হয়ত নিজের পুত্র বলেই কিম্বা পুত্রের কিছু খামতি আছে বলেই আড়ন্বরতায় মুড়ে দিতে চাইছেন সবকিছু| সে ছাড়াও তিনিই এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিয়ে দিচ্ছেন| তাই দায়িত্বটা স্বভাঃবতই কাঁধে বর্তায়| নিজেদের সময় হলে এসব কোন ব্যাপার ছিল না| বাড়ির বড়দের পছন্দই পছন্দ| টুঁ শব্দটি করার জো ছিল না| কিন্তু দিনকাল এখন বদলেছে| ঘরের কত্রীর পছন্দকেও মান দিতে হয়‚ দেওয়া উচিত সেটা অবশ্য তিনি মানেন| তবে এক্ষেত্রে যে বিষয়টা সেইভাবে ঘটছে না| ইন্দুমতী সন্তানের দোষ দেখছে না‚ তার কাছে সোনার আংটি বাঁকা হয় না| কিন্তু তিনি তো ঠিক সেইভাবে ভাবতে পারছেন না| একটা বোঝা মনের ওপর এমনিতেই চেপে বসে আছে‚ আড়ম্বরতা দিয়ে সেই খামতি পূরণের চেষ্টা করে চলেছেন| একটা ক্ষীণ আশাকে বুকের ভিতর লালন-পালন করে চলেছেন যদি বিয়ের পর রূপেশ্বর বদলায় তবে‚ তবে নাহ এর বেশি ভাবতে নেই| ইন্দুমতী একটা লাল চওড়া পাড়ের দুধসাদা খোলের বেনারসী নিজের জন্য পছন্দ করেছে| শুধু একটা শাড়ি হলেই তো হবে না‚ ছেলের মা বলে কথা| আইমুলি শাড়িও অবশ্য একটা পছন্দ করেছে| ঘিয়ে রঙের ধনেখালি খোলের ওপর কলকা পাড়| বেশ লাগবে| আইবুড়ো ভাতের দিনও তো আত্মীয়স্বজন কম আসবে না‚ একটা জমকালো শাড়ি না হলে হয়| বউভাতের শাড়িও একটা নিতে হবে| মেয়ের বাড়ি থেকে কনেযাত্রীরা আসবে সব‚ তাদের সামনে নিজের আধিপত্য না রাখলে বুঝবে কি করে কোন ঘরে মেয়ে দিলে তারা| সরলা‚ প্রমাময়ীও শাড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে| ' বড় বৌ নিজেদের জন্য তো শাড়ি পছন্দ করছ‚ তা বৌমার জন্য কোন শাড়িগুলো পছন্দ করলে?' সর্বেশ্বর ভিতরবাড়ির উঠোনে ঢুকতে ঢুকতে জানতে চাইলে| 'এই সবে বসলাম শাড়ি বাছাই করতে| তোমার আদরের বৌমার জন্য তোমার কি আমাদের পছন্দে পছন্দ হবে?' 'এটা লাখ কথার এক কথা বলেছ বড়বৌ| আসলে কি জান তো তোমার মনের কথা না জানলে তোমার পছন্দেই পা মেলাতাম| সে যাকগে| কই হে দেখাও দিকি একটা জব্বর সোনার সুতোর কাজ করা বেনারসী| আমার বড়বৌমার গায়ের রঙ কাঁচা সোনার মত| সোনার প্রতিমার গায়ে আমি সোনার সুতো দিয়ে বোনা বেনারসী পরাব|' সর্বেশ্বর শাড়ি বাছাই করতে থাকে| তাদের জাতগোষ্ঠীতে নমস্কারী শাড়ি নেওয়ার চল আছে ঠিকই তবে দেবার চল নেই| শুধু কনের জন্য খানকয় শাড়ি দেখে দেখে পছন্দ করে সর্বেশ্বর| 'বাবুমশায়‚ রতন স্যাঁকড়া এয়েচে'‚ রামা এসে খবর দেয়| 'এয়েচে তো ভিতরে নিয়ে আয়| ওপরের ঘরে বসা| আমি আসছি|' রতন স্যাঁকড়া সেই পুরোনো আমল থেকেই তাদের বাড়ির গহনা বানায়| এর আগে ওর বাবা গহনা বানাত| এখন রতন বানায়| হাতের কাজ দেখার মত| বড়বাড়ির পছন্দ তার মত কেউ জানে না| 'বড়বৌ শুনলে তো স্যাক্ড়া এসেছে| ওপরে চল আর্শীবাদী হারটা বার করে দেবে‚ পালিশ করতে দেব| আর যদি কিছু ভেঙ্গে গড়ানোর থাকে তাও দিও|' 'আর্শীবাদী হারটা তো তোমার সিন্দুকেই রাখা আছে| আমি আর গিয়ে কি করব? সবেতেই তো তুমিই হর্তা-কর্তা-বিধাতা| আমার কি কোন গুরুত্ব আছে? না তুমি গুরুত্ব রেখেছ? ' ইন্দুমতী তীক্ষ্মস্বরে অভিযোগ আনে| 'আ এখন আবার এসব কথা কেন? তোমাকে বাদ দিয়ে কোনদিন কিছু করেছি? ওপরে এস দেখি একবার|' সর্বেশ্বর নরম গলাতেই কথাগুলো বলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে| পিছু পিছু ইন্দুমতীও যায়| রতন তখন ওপরের বসার ঘরে বসে অপেক্ষা করছে| সাথে নিয়ে এসেছে বেশ কিছু নতুন ডিজাইনের গহনা লাল শালুতে মুড়ে| সর্বেশ্বর আর ইন্দুমতী হাতে গলার হারখানা নিয়ে ঢোকে| 'নাও হে রতন শাউরির আমাকে দেওয়া এই হারখানা পালিশ করে দিও| আর পালিশ করতে গিয়ে যেন সোনা নষ্ট কর না| আর একখানা মুক্তোর শেলি গেঁথে দিও দেখি| আমার সাদা বেনারসীখানার সাথে যাতে মানায়| কানে একজোড়া মুক্তোর গুছিও গেঁথো সেই সাথে|' একটু আগের অভিমান ভুলে ইন্দুমতী রতনকে নির্দেশ দেয়| সেইসঙ্গে রতনের আনা নতুন ডিজাইনের গহনা নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে| কয়েকটা নিজের জন্য আর কয়েকখানা নববধুর জন্যও পছন্দ করে| সর্বেশ্বর বাধা দেয় না| বেলা বয়ে চলে এইসব কাজ সারতে সারতেই| সন্ধ্যেবেলা অচিন্ত্যমোহন কোথা থেকে খবর সংগ্রহ করে আনে‚ 'মেয়ের ছোটভাই নাকি একরাত লকাপে কাটিয়েছে|' সর্বেশ্বর শোনে কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না| মনে মনে আশঙ্কিত হয়ে ওঠে এই কথা যদি জ্ঞাতিশত্রুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তবে অনেক লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে| এমনিতেই কোন ঘর থেকে মেয়ে আসছে‚ তাদের ঠিকুজি-কুষ্ঠি কি সেসব নিয়ে একপ্রস্থ সব বাড়িতেই ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে| এখন আবার তার ভাই কেন লকাপে একরাত কাটালো সে ব্যাখ্যা দিতে হলে এই বিয়ের আয়োজন না শেষ অবধি ভেস্তে যায়| তাহলে চিরকালের মত সর্বেশ্বর মল্লিকের মাথা হেঁট হয়ে যাবে নিজেদের সমাজে| 'বলি কি ভাবছ? বলেছিলাম না হা ঘরের মেয়ে এনো না| শুনলে না আমার কথা| আর এখন কি করবে? চুরি করেছিল না ছিনতাই কে জানে যে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছিল| জ্ঞাতিরা‚ আত্মীয়রা জানলে যে একঘরে করবে| ছিঃ ছিঃ মান-সম্মান সব ধুলোয়া মিশে গেল|' ইন্দুমতী প্রথমে ঝেঁজে উঠেও শেষটায় কেঁদে ফেলে| 'আঃ না জেনেশুনে বাজে কথা বলো না বড়বৌ|' 'আমি কিন্তু মিথ্যে কইছি না বোনাইবাবু| ঐবাড়িরই কাছের কেউ খবরটা দিয়ে গেল|' অচিন্ত্যমোহন জানায়| 'তা কেন লকাপে ছিল সেকথা সেই লোক বলেনি?' সর্বেশ্বর জানতে চায়| 'না বোনাইবাবু‚ মুখমাথা ঢেকে এয়েছিল‚ কথাগুলো বলেই চলে গেল|' 'আচ্ছা‚ আমি একবার খবর নিয়ে জানি তারপর নয় বাকি কথা হবে'| সর্বেশ্বর বেরিয়ে যায় ঘর থেকে মাথায় একরাশ চিন্তা নিয়ে| .... বেশ কদিনের নিরামিষ জীবন আর পোষাচ্ছে না রূপেশ্বরের| কদিন পরেই বিয়ে‚ আয়োজন চলছিল জোরকদমে‚ কিন্তু আজ বিকেল থেকেই কেমন যেন সব নিঝুম| মামাবাবুকেও ধারে কাছে দেখছে না| বিয়েটা কি তবে বানচাল হয়ে গেল? কেউ নিশ্চয় কনের বাড়িতে গিয়ে ভানচি দিয়ে এসেছে| এর আগেও বেশ কয়েকবার তো এমনটাই ঘটেছে| খুব একটা আশ্চর্য্য হয় না সে| বরং বেশ নিশ্চিন্ত আর খুশি লাগে তাকে| সর্বেশ্বর মল্লিক এত করেও আটকাতে পারল না তাহলে| তবে আর কি‚ এই ভর সন্ধ্যেবেলা কি কেউ আর বাড়িতে বসে থাকে? এইসব সন্ধ্যে রঙে আর রূপে ভরে নিতে হয়| কতদিন পারুলবালার আঁচলের সোহাগ মেলে নি‚ জীবনটা যেন মরুভুমি হয়ে উঠেছিল| চুনুট করা ময়ূরপাড় ধুতি‚ গিলে করা পাঞ্জাবী আর আতর ছড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে সে| কেউ বাধা দেয় না তাকে| ক্রমশ|

840

86

জল

গল্প

ডাক .... সূচনা .... 'চলে যা‚ সামনে থেকে চলে যা| কেন এসেছিস? আমি যাব না|' সরকারী হাসপাতালের চারতলার বার্ণ ওয়ার্ড| লাঞ্চ শেষ করে সবেমাত্র ওয়ার্ডে ঢুকছে আয়ামাসীরা‚ মাঝখানের কিউবিকলে কর্তব্যরত নার্স অর সিস্টাররা কাজ করতে করতে দু একটা কথা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে মৃদুস্বরে| বেশ কিছু পেশেন্ট ঘুমোচ্ছে‚ কেউ কেউ যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে| আচমকাই চিৎকার করে বলা কথাগুলো তীব্রবেগে সবারই কানে ধাক্কা মারে| কর্তব্যরত নার্স জনৈক আয়ামাসীকে ইশারায় সংশ্লিষ্ট পেশেন্টের কাছে যেতে বলে| 'কি হয়েছে আপনার? কে এসেছে?' 'দেখতে পাচ্ছো না কে এসেছে? ঐ তো‚ ঐ তো আমার খাটের ধার ঘেঁষে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল| এখনও দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে| দেখতে পাচ্ছো না?' 'কেউ নেই‚ আমরা ছাড়া এখানে কেউ আসতে পারবে না| এখন তো দুপুর| আপনি একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করুন|' আয়ামাসী বলে| 'মাসী ও আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে| বিশ্বাস কর আমার কথা|' 'আচ্ছা‚ আচ্ছা ঠিক আছে| আপনি একটু ঘুমোন এবার| আমি আছি আপনার কাছে'| আয়ামাসী বেডের পাশে রাখা টুলটায় বসে| গতকাল মধ্যরাতে এই মহিলা পেশেন্ট বার্ণওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে| মুখের বেশ কিছুটা‚ বুক আর পেটের কিছুটা পুড়ে গেছিল| পুলিশ কেস| মদ্যপ স্বামীর সঙ্গে বচসার জেরেই আত্মহত্যার চেষ্টা করে মহিলা| পেশেন্ট আনতে দেরী হয়েছে| আক্তারবাবুরা ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছে| কিন্তু বাহাত্তর ঘন্টা কাটবে বলে মনে হচ্ছে না| ভাতঘুমে ঢুলতে থাকে আয়ামাসী| 'এই এই এখনও যাসনি তুই? আমি যাব না তোর সাথে| চলে যা তুই|' আয়ামাসী চমকে জেগে ওঠে| 'শান্ত হও‚ কেউ নেই‚ কেউ তোমায় নিতে আসেনি|' 'না না ও আমাকে নিয়ে যাবে‚ ও আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছে| ঐ দেখো ওর ঠোঁটে হাসি| ও হাসছে‚ ও প্রতিশোধ নেবেই|' কর্তব্যরত নার্স এগিয়ে এসে একটা ইঞ্জেকশন চ্যানেলের মধ্যে পুশ করে| ঘুমিয়ে পড়ে পেশেন্টটি| ............... ঘটনা কিম্বা রটনা .................... 'মেসো ও মেসো দরজাটা খোলো প্লিজ' দুপুররাতে বারংবার দরজা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে যায় বসনের| ধড়মড় করে উঠে বারান্দা দিয়ে মুখ বাড়ায়| নিকষ কালো অন্ধকার চারিদিকে| রাস্তার আলোগুলো একটাও জ্বলছে না| 'কে চিঠি নাকি'? 'মেসো দরজাটা খোলো প্লিজ‚ সর্বনাশ হয়ে গেছে|' বসন নেমে এসে দরজা খুলে দেয়| চিঠি বসনের নতুন শালির মেয়ে| ছয় বোন তার বউরা| সবচেয়ে ছোট সপ্তপর্ণী ছিল বসনের বৌ| গতবছর ঠিক এইদিনেই বসনের বৌ সপ্তপর্ণী গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল| চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি| কোন পারিবারিক অশান্তি ছিল না| শুধু বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যবসাটা মন্দা যাচ্ছিল| ফলত সংসারের খরচ-খরচায় লাগাম টানতে বাধ্য হয়েছিল বসন| সপ্তপর্ণী সেটা মেনে নিতে পারেনি| হঠাৎ স্বাচ্ছন্দ্যে যেমন গা ভাসাতে পেরেছিল‚ তেমনি হঠাৎ আসা এই অস্বাচ্ছন্দ্যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি| তাই বেছে নিয়েছিল আত্মহ্ত্যার রাস্তা| অবশ্য সপ্তপর্ণীর মা বা বোনেরা কেউই বসনকে দোষী শাবাস্ত না করায় কেস কোর্ট অবধি পৌঁছায়নি| তবে নিন্দুকেরা অন্য কথা বলে| তাদের মত চিঠির মা‚ বিস্তীর্ণার সাথে একটা লুকোছাপার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বসনের| আর সেটাই মেনে নিতে পারেনি সপ্তপর্ণী| 'কি সর্বনাশ হয়েছে রে?' 'মা একটু আগে গায়ে আগুন লাগিয়েছে|' চিঠি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে পড়তে বলে| 'সেকি!!! তোরা জানতে পারলি কি করে?' 'রোজকার মত আজকেও মায়ের সাথে বাবার ঝগড়া হচ্ছিল| আমি বিরক্ত হয়ে ঘরে চলে গেছিলাম| আর তার খানিকক্ষণ পর মা চিৎকার করে ওঠে| আমি ছুটে যাই আর তখনি আমাকে দেখে মা বলে ওঠে 'চিঠি বাঁচা আমাকে|' আমি বাথরুম থেকে জলে এনে ঢেলে দি| কিন্তু অনেকটা পুড়ে গেছে মেসো| মা'কে বাঁচাও প্লিজ|' 'আর তোর বাবা কোথায়?' 'বাবার কোনো হুঁশ নেই মেসো| বাবার অপেক্ষায় থাকতে গেলে যে মা বাঁচবে না| প্লিজ মেসো কিছু একটা করো|' বসন ব্যস্ত হয়ে পড়ে| ঐ রাতে গাড়ি যোগাড় করাটাও সহজ হয় না| কাছাকাছি কোন নার্সিংহোম এই কেস নেয় না| সরাসারি সরকারি হাসপাতাল রেফার করে| ২০ কিমি দুরত্বও অতিক্রম করতে অনেকটাই যেন সময় চলে যায়| তারপর ফর্মালিটি‚ পুলিশ কেস সব মিলিয়ে রাত প্রায় শেষ হতে আসে| এই সবকিছুর মাঝে বসনের খালি সপ্তপর্ণীকে মনে পড়ে| ঠিক সেই রাত‚ সেই গাড়ি‚ সেই হাসপাতাল‚ শুধু তফাৎ একটাই বিস্তীর্ণা এখনও বেঁচে আছে আর সপ্তপর্ণীর দেহ ঠান্ডা হয়ে গেছিল| হাসপাতালে নিয়ে যেতেই ঘোষনা করেছিল মৃত| থানাতে বডি প্ল্যাস্টিকে মুড়ে বরফ দিয়ে বেড় দিয়ে আসতে হয়েছিল| পরদিন পোর্ষ্টমর্টেম| আর তারও পরদিন বডি ফেরত দিয়েছিল| বিস্তীর্ণা কি করল এটা| শুকদেবের সাথে মারামারি ঝগড়া তো রোজকার ঘটনা| গত উনিশ বছর ধরেই তো চলছে| কই কোনদিন তো এত অসহিষ্ণুতা দেখায় নি বিস্তীর্ণা| তবে আজ কেন? বিস্তীর্ণা তো আত্মহত্যা করার মত মানুষ নয়| বরং তারা তো অন্য একটা স্বপ্ন দেখছিল| শুকদেবের শারীরিক যা অবস্থা‚ তাতে বড়জোড় ছ'মাস| তারপর‚ তারপর তো ...মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে| ............... ঝিমুনি নাকি সত্যি? ........................... 'ওর সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই তাই না? সত্যি বলছিলে সেদিন? তবে সেদিন রাতে তোমরা দুজনে আমার ঘরে কি করছিলে?' বসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গেছিল| প্রশ্নটা এসে ধাক্কা মারে| খুব পরিচিত একটা কন্ঠ| কিন্তু চিনে উঠতে পারে না বসন| আশেপাশে কেউ তেমন নেই| শেষরাতের একটা কুয়াশা আস্তরণ ফেলেছে যেন চারিদিকে| আবছায়া মত ওটা কি? কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে| একটা অস্পষ্ট অবয়ব| খুব চেনা দাঁড়ানোর ভঙ্গী‚ গলার কাছে একটা কিছু যেন আটকে যেতে চায়| 'আমি চাই না‚ তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠুক| আমি সহ্য করতে পারি না| আমার ঐ খাটে তোমাদের দুজনকে দেখে আমার সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল জান| তুমি আমায় একদিন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে তাই না| কিন্তু আজ জানি তুমি আমাকে ভালোবাসোনি কোনদিন| তুমি দিদিকেও ভালোবাসো না| আসলে ভালোবাসো দিদির শরীরটাকে| দিদির জায়গায় অন্য কেউ হলেও তোমার চলবে| কিন্তু দিদির সথে তোমার এই সম্পর্কটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না| তাই তো চলে এলাম দিদিকে নিয়ে যেতে| সুযোগটা দিদিই করে দিল| কিম্বা দিদির নিয়তি| তোমাকে নিয়ে যাব ভেবেছিলাম ‚ কিন্তু ভেবে দেখলাম তোমাকে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই| তুমি একজন বিশ্বাসঘাতক| দিদিও তাই| তুমি তো আমাকে ভলোবাসোনি কোনদিন| তাই ওপারেও ভালোবাসবে এমনটা বিশ্বাস করি না| বরং দিদিকে তোমার থেকে সরিয়ে দেব আমি| এখন শুধু অপেক্ষা|' অস্পষ্ট অবয়বটা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে| সপ্তপর্ণী| কপাল থেকে মাঝবরাবর চেরা| চোখের মণি স্থির‚ ঘোলাটে‚ ঠোঁটে নেই কোন রক্ত| সাদা একটা রক্তশূন্য শরীর| অর্ধ‚ আবরণহীন একটা শরীর| বসন জ্ঞান হারায়| .................................................................................... শেষ অঙ্ক ................... 'সরি' ডাক্তার বলতেই মুখটা চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় কর্তব্যরত নার্স| বাহাত্তর ঘন্টা পার করেও চলে গেল বিস্তীর্ণা| ডাক্তার নির্দিষ্ট সময় পার করে দিলেও সেরে ওঠার কোন লক্ষনই দেখা যায়নি| তাই পেশেন্টের বাড়ির লোককে কোন আশাই দেয়নি ডাক্তাররা| যতটুকু সময় সে জেগে থাকত সেই সময়েই সে শুধু ‚'যা চলে যা‚ চলে যা‚ আমি তোর সাথে যাব না'‚ বলে চিৎকার করত| তারপর একটা সময় সে বলে উঠল‚ ' বেশ তবে নিয়ে চল| তোর প্রতিশোধ পুর্ণ কর| কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোর সংসার ভাঙতে চাইনি‚ তোকে দুঃখ দিতে চাইনি| তবু সবকিছু ঘটে গেল| নিয়ে চল‚ আর পারছি না‚ নিয়ে চল'| আয়ামাসীরাই ঠিক তারপর পেশেন্টের শারীরিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করে| তবে কি সত্যি করেই মৃত্যুপথযাত্রীদের ডাক আসে!!!

2708

196

শিবাংশু

সাঁঝ ঢলি

লোকে মরতে আসে বারাণসিতে, বাঁচতেও আসে সমান মাত্রার আবেগ নিয়ে। আর কোথাও কি এমন চক্রধর তেহাই বাজে মহাকালের হাতে? জানিনা... যে সব পুরাণকথার মধ্যে ভারতধর্মের মূল ছাঁদটি ধরা আছে তার একটি হচ্ছে রাজা হরিশ্চন্দ্রের কিংবদন্তি । মূল্যবোধের যে স্তরে যাযাবর আর্য উপজাতিরা এদেশে নিজেদের উন্নীত করেছিলো, তার একটি নিখুঁত নমুনা এই লোককথা। গপ্পোটা সবার জানা, তাই পুনরুক্তি নয়। কিন্তু পটভূমি হিসেবে বারাণসিকেই কেন নির্বাচন করা হয়েছিলো সেখানে? ভারতধর্মের শ্রেষ্ঠ পরীক্ষাগার বলে কি? সেই রূপকথার রাজার নামে একটা ঘাট আছে এখানে। হরিশ্চন্দ্র ঘাট। অনেক অন্ত্যেষ্টি হয় এই ঘাটে আর হয় মণিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানরক্ষক অর্থাৎ ডোমসম্প্রদায়ের সদস্যদের শেষ কৃত্য। তাঁরা নাকি মণিকর্ণিকায় নিজেদের শবদাহ করেন না। বারাণসির এটাই প্রাচীনতম শ্মশানঘাট, তাই আদি মণিকর্ণিকাও বলা হয় একে। ১৭৪০ সালে পেশোয়াদের গুরু নারায়ণ দীক্ষিত এই ঘাটটি সংস্কার করে পাকা করে দিয়েছিলেন। আমার একটা তেমন সুলভ নয় ব্যসন রয়েছে। সেটা শ্মশানঘাটে 'বেড়াতে' যাওয়ার নেশা। না সেখানে গিয়ে কোনও ঐহিক নেশায় রুচি নেই, শুধু দেখতে যাওয়ার নেশা বলা যায়। আমাদের গ্রামে সুবর্ণরেখার ধারে যে সুন্দর সাজানো ঘাট রয়েছে, ছুটির দিনে সেখানে মাঝে মাঝে খেপ মেরে আসার অভ্যেস আমার বেশ পুরোনো। এ যাওয়া কিন্তু কোনও চেনা মানুষকে এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য যাওয়া নয়, সেতো শতবার হয়ে গেছে, একে বলা যায় জীবনের শেষ স্টেশনের পথে ড্রাই রান। ভারতবর্ষে প্রাচীনতম যে দুটি শ্মশানঘাট রয়েছে, তার একটি পাটনার বিখ্যাত বাঁশঘাট। সেই বৌদ্ধযুগ থেকে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু জায়গা বদলেছে, কিন্তু ঘাটটি সগৌরবে রয়ে গেছে। তা পাটনা থাকাকালীন আমার দফতর আর বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায় ছিলো এই স্থানটি। আমার এক অগ্রজ সহকর্মী, তিনিও জামশেদপুরের লোক এবং এরকম একটি উদ্ভট নেশায় আমার সঙ্গী। প্রতি শনিবার বেলা থাকতে থাকতে যখন বাড়ি ফিরতুম, তখন বাঁশঘাটের পাশে গাড়িটি লাগিয়ে দুজন মিলে ও তল্লাটে একবার ঢুঁ মেরে আসার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। অনেকেই জানতো এই বিচিত্র নেশার কথা। কেউ অবাক হতো, কেউ পাগল ভাবতো, কেউ বা অন্যকিছু। তো বাঁশঘাট ছাড়া দেশের অন্য প্রাচীনতম আর ব্যস্ততম শ্মশানটি রয়েছে বারাণসিতে, সেটা একবার না দেখে তো ফেরা যায়না। কিন্তু যাবো রাতের দিকে, অন্ধকারে। সন্ধে হতেই দশাশ্বমেধে এসে আবার নৌকোয় চড়ে বসি। তরী এবার উত্তরবাহিনী। বাঁদিকে শ্মশানরাজ কালুডোমের বিশাল রাজপাট। ঘাট ছেড়ে নদীর দিকে উজানে বয় নৌকো। নদীর ঢেউয়ে দুলে যায় তীরের আলোকমালা। আসে মানমন্দির ঘাট, জয়পুরের রাজা নির্মিত অষ্টাদশ শতকের একটি মানমন্দির রয়েছে এখনও। তারপর ললিতা ঘাট বা নেপালি মন্দির ঘাট। নেপালি স্থাপত্যের একটি ভারি সুন্দর কাঠের মন্দির আছে সেখানে। মাঝির সঙ্গে গপ্পো জুড়ি, তার নাম দীপক মন্ডল। বলি দীপক নাম তো বাঙালিদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। সে বলে আমি তো কোলকাতার লোক। বাবুঘাটে নৌকো বাইতাম। বাবার তাড়নায় বনারস পালিয়ে আসি। ভোজপুরিতে সুখদুঃখের কথা হয়। প্রশ্ন করি, সব মাঝিই কেন শাড়ি মন্ডিতে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপিড়ি করে? সে জানায়, বনারসের সব ঘাটে যতো নৌকো আছে সবের মালিক মারওয়াড়ি শাড়ির ব্যবসায়ীরা। মাঝিরা ভাড়া খাটে দিনমজুরিতে। যা রোজগার হয় সব তুলে দিতে হয় মালিকের যে সব এজেন্টরা ঘাটে ঘুরে বেড়ায় তাদের হাতে। ভিড়ের মরশুমে বেশি কামাই হলেও মাঝির জন্য আলাদা কিছু নেই। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক কিছু গ্রাহককে রোজ মালিকের শাড়ির গদিতে নিয়ে যাবারও চাপ আছে। ব্যাংকারের মাথা কাজ করে। জিগাই, নিজে একটা নৌকো কেনোনা কেন? সে বলে এ রকম একটা নৌকোর দাম অন্তত নব্বই হাজার। কোথায় পাবো? আমাদের তো থাকারও একটা ঢঙের জায়গা নেই। বলি, ব্যাংক যদি দেয়? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সে নৌকো এখানে আমাকে কেউ বাইতে দেবেনা। নিরুত্তর, শূন্যপানে চাই। তখনই দূরে ভেসে ওঠে সারি সারি প্রজ্জ্বলিত চিতার আলো, সেই সব ভাগ্যবানের পঞ্চভূতে মিশে যাবার জাদু প্রতিবিম্ব, যারা অনেক পুণ্যে ঐ ঘাটে ঠাঁই পেয়েছে। এসে গেছে মণিকর্ণিকা। নৌকো একটু একটু করে ঘাটের কাছাকাছি যায়। একসঙ্গে ছ-সাতটি চিতা জ্বলছে পাশাপাশি। আবছা আলোয় দেখা যায় ঘিরে থাকা মানুষদের মুখ। প্রিয়তম স্বজনদের অগ্নিআহূতি দিতে জড়ো হয়েছে তারা। ডোমরা এসে চিতাকাঠ উল্টে দিয়ে যায়। সোনালি নীহারিকার মতো আগুনের ফুলকি সন্ধে হাওয়ায় উড়ে যায় কোন অজানার দেশে। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে প্রিয় কবির শব্দের সারি। আমার পিতৃদেব চলে যাবার কিছু দিন আগে এই কবিতাটি স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করে ফিতেবন্দি করে গেছেন আমাদের জন্য। চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা তার ওপরে আমাদের পলকা নৌকোর নিঃশ্বাস মুখে এসে লাগে মণিকর্ণিকার আভা আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না হাতে শুধু ছুঁয়ে থাকি পাটাতন আর দু'এক ফোঁটা জলের তিলক লাগে কপালে দিনের বেলা যাকে দেখেছি চণ্ডাল আর রাত্রিবেলা এই আমাদের মাঝি কোনো ভেদ নেই এদের চোখের তারায় জলের ওপর উড়ে পড়ছে স্ফুলিঙ্গ বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে ভস্ম পাঁজরের মধ্যে ডুব দিচ্ছে শুশুক এবার আমরা ঘুরিয়ে নেবো নৌকো দক্ষিণে হরিশ্চন্দ্রের ঘাট দুদিকেই দেখা যায় কালু ডোমের ঘর চতুর্দশীর অন্ধকারে বয়ে যায় গঙ্গা এক শ্মশান থেকে আরেক শ্মশানের মাঝখানে আমরা কেউ কারো মুখের দিকে তাকাই না । ( মণিকর্ণিকাঃ শঙ্খ ঘোষ) অনেকে দাবি করেন, কবিতা বুঝিনা। সত্যিই কি বোঝেন না? জানিনা.....

54

3

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের শেশ দৌড় !

(ছত্রিশ কোটি দেব-দেবীর – তারমধ্যে সর্বশ্রী অপনবাবু, অর্ণব, মুনিয়া, জলি ও খুশী ও আছেন – শ্রীচরনপদ্মে জলাঞ্জলি দিলাম । ভালো লাগিলে আমায় সাবাশ ও খারাপ লাগিলে উপরোক্ত দেবদেবীকে মন্দ বলিবেন ।) জীবনের শেষ দৌড় ! জীবন কাহিনীকে কয়েকটা পর্বে ভাগ করলে যা দাঁড়ায় সেটা হল শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য । আমার মতে এটা ঠিক নয় । শৈশবেরও দুটো পর্ব আছে - শৈশব ও এঁচোড়ে-পাকা শৈশব । সেটা ১৯৪০ সাল নাগাদ । আমার বাবা খুব কম বয়েসেই মেডিক্যাল পড়তে পড়তে বিয়ে করে ফেললেন – তাও আবার কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে ! সেই নিয়ে দু-বাড়ির মধ্যে ভীষণ তোলপাড় হয়েছিল ! – দাদু তো ক্ষেপে গিয়ে বাবাকে ত্যাজ্যপুত্র করে দিলেন । আবার মায়েদের দিকেও ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে মেনে নিতে পারল না । বাবা নতুন রাস্তায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে গেলেন । আমার পিতামহ ছিলেন ভাটপাড়ার ভট্টপল্লির প্রথম মানুষ যিনি পৌরোহিত্য না করে ডাক্তার হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন । ওনার বিয়ে হয়েছিলো নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের ডাক্তার সুরেশ ভট্টাচার্যের কন্যার সঙ্গে । যেহেতু প্রপিতামহের নাম ছিল কৃষ্ণগোপাল ও ঠাকুরমার নাম ছিল রাধারানী – তাই বিয়ের পরে এক সপ্তাহ-ব্যাপি ঝুলন-যাত্রা ! এসব শোনা কথা । উনি পর পর দুবার কাউন্সিলার হয়েছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের । - এদেরই প্রযত্নে আট-নটি কন্যা ও একটি পুত্র হয়েছিলো । পুত্রটি পৃথিবীতে বেশিদিন যাপন করতে পারেন নি । মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে সংসারে চার পুত্র-কন্যা রেখে চলে গেলেন । এদেরই মধ্যে একজন হলেন শ্রীমান আমি । পরে কোন কারনে আবার নিজেদের বাড়িতে তিনতলায় আমরা ভাড়াটে হয়ে ছিলাম । বাবা ছিলেন প্লাম্বার । মাথায় টুপি পড়ে ওড়িয়া মিস্ত্রিদের দিয়ে কাজ করাতেন । সেই সময়ে রাস্তার ওপর কোন কাজ করতে হলে প্রথমে কর্পোরেশনের অনুমতি লাগত । সমস্ত কাজ রাত্তিরের মধ্যেই করে ফেলতে হত । যদিও ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেছে – কিন্তু সিস্টেমগুলো অটুট ছিল । সে যাইহোক, তিপান্ন সালে বাবা টালিগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন বলে টালিগঞ্জে ভাড়া বাড়িতে চলে গেলেন । বছর ঘুরতেই আমরা পিতৃহীন হয়ে সবাই ফিরে এলাম – সেই দাদুর বাড়িতেই ! আর সেই দশই জুন আমাকে দেখে দাদুর সেই ভবিষ্যতবাণী – হয় ভালো হবো – নয়ত চোর-জোচ্চোর-ডাকাত – কিছু হবো নিশ্চয় ! বাবা যখন চুয়ান্ন সালে মারা যান তখন আমার বয়েস ছিল এগারো । সেই বছরেই আমি সুদূর টালিগঞ্জ থেকে একা হেঁটে বাগবাজারে চলে এসেছিলাম । কেউই বিশ্বাস করেনি । পকেটে একটা চারআনি ছিল । ফেরবার জন্যে রেখে দিয়েছিলাম । তখন টালিগঞ্জের ভাড়া বাড়িতে ফোন না থাকায় – আমার দাদা-মশাই সেদিন সন্ধ্যেয় আমাকে নিয়ে টালিগঞ্জে ফেরত নিয়ে এলেন । - দাদা মশাইয়ের সেই শেষ টালিগঞ্জে আসা । কারন তারপরই উনি শয্যাশায়ী হলেন । সেই ভাবে উনি অনেকদিন ছিলেন ও পরে মারাও যান । টালিগঞ্জের ভারতলক্ষ্মী স্টুডিওয় আমরা একটা সিনেমার ভিড়ের দৃশ্যে ছিলাম । রাজপথ জনপথ নামে ঐ সিনেমায় বসন্ত চৌধুরী, মিহির ভট্টাচার্য ইত্যাদি ছিলেন । কিন্তু সিনেমাটা রিলিজ হয়েছিলো কিনা জানি না । ওখানেই বাঙ্গুর স্কুলে মাইনে বেশি বলে আমরা একটা পাঠশালায় যেতাম । এখন সে যায়গাটার কি নাম তা মনে নেই । গল্ফ ক্লাব ডিঙ্গিয়ে যেতে হত । সেখানে নাকি একজন সাহেব গাড়ি করে টহল দিত । আর গলফের মাঠে কাউকে দেখলেই গুলি ছুঁড়ত । কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে – তা কে বলবে ! তবে কাঁটা তারের বেড়া ছিল । - তখন বেশ কটা গলফ স্টিক ও গলফ-বল ছিল আমাদের ! আর আমরা খেতে পেতাম না বটে – কিন্তু গলফ খেলতে শিখে গেছিলাম । এইখানে মাতামহের দিকে কিছুটা ফোকাস করি । প্রমাতামহ নাকি যশোর-জেলার সাব-জজ ছিলেন । এবং জমিদারি ইত্যাদি, প্রভৃতি । তারা কবে কলকাতায় এলেন জানা নেই । মাতামহের সঙ্গে হাটখোলা দত্ত-বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছিলো । - পরে যা দেখেছি – দিদিমার যথেষ্ট দাপট ছিল । - মাতামহের সেই সময় একটা ভালো ব্যবসা ছিল । ক্যানিং স্ট্রিটে অফিশ – বেঙ্গল মেরিন অ্যান্ড রেলওয়ে ইন্ডাস্ট্রি । গিলান্ডার ছাড়াও আরও অনেক কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা ছিল । রেল থেকে নৌকো বা লঞ্চের সমস্ত রকম সামগ্রী সাপ্লাই দিত । সেটা যুদ্ধের সময় ! পয়সার চেয়ে লোহা দামী ! তখনকার একটা দাম্ভিক উক্তি – পয়সার জোরে দুনিয়া ঘোরে ! এখানে বলি – সেকালের ধনি ব্যবসায়ীরা যত বাড়ি বিহারের শিমুলতলা মধুপুর দেওঘর এ বানিয়েছেন , তার কিয়দংশ যদি কলকাতায় নিজের বাড়ি বানাতেন – তবে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত হতে হত না। অনেককেই সেই সময়ে ভাড়া বাড়িতে থাকতে দেখেছি । যে বাড়িটা আমি জন্ম-ইস্তক জেনে এসেছিলাম মামার বাড়ি বলে, হঠাত একদিন দেখলাম – তাদের সব উৎখাত হতে হয়েছে ! – খাওয়া-দাওয়া ভোগ-বিলাস – মায়ে ল্যান্ডো ঘোড়ার গাড়ি প্রায় প্রতিদিন থিয়েটার-সিনেমা দেখা, সব সময়ে উৎসব উৎসব ভাব ! – কিন্তু নিজস্ব কোন বাড়ি ছিল না ! দেখেছি তখন সেই বাড়িতে কত আত্মীয়স্বজন । ধীরে ধীরে সেই ভিড় কমে গিয়ে রইল শুধু দাদু-দিদা আর দুই মামা । তার মধ্যে একজনের বৌ ত্যাগ করে চলে গেছে ও অন্যত্র বিয়েও করেছে । ফলত বড় মামার মাথা খারাপ হয়ে গেছে । আর একজনের লেখাপড়ার কোন ব্যাপারই নেই । পাড়ার বখাটে ছেলে । এই পর্বটিকে আমি এঁচোড়ে-পাকা শৈশব বলি । পাড়ার কিছু বখাটে ছেলের সঙ্গে মিশে যত উৎপটাং কাজ, রাতে থিয়েটার হলে গিয়ে কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢোকা অথবা ট্রামে টিকিট না কেটে ধর্মতলার সিনেমা হলে লাইন দিয়ে ইংরিজি সিনেমা দেখা । এই সময়ই রাস্তায় চাকা চালানো, ডাংগুলি খেলা , ইত্যাদি সব অপকর্মগুলো করার সুযোগ পেয়েছিলাম ! বৃন্দাবন পাল লেনের একটা বাড়িতে কয়েকজনে মিলে বোম বানানো ইত্যাদি ! কত দাদা-কাকা-জ্যাঠার কানমলা, গাট্টা খেয়েছি – তার ইয়ত্তা নেই । হয়ত সেটাই আমার যাযাবর মস্তিষ্কের শুরু । এর পর বেশ কয়েকবার পালাবার চেষ্টা করেছি, ও পালিয়েছিও বাড়ি থেকে ! বাবা মারা যাবার পর বাগবাজারে ফিরে এসেই আমাদের স্কুলে ঢোকানো হোল । তখন শৈলেন্দ্র সরকার ছিল প্রায় এক নম্বর। তখনকার জাতীয় শিক্ষক এই স্কুলেই ছিলেন । কিন্তু যেহেতু শৈলেন্দ্র সরকার স্কুল আমাদের পাড়ায় নয় – তাই বাগবাজার স্কুলেই যেতে হোল । কারন তার স্কুল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমার দাদু ! দাদুর টেবিলে একটা ইংরিজি বই – লন্ডনের ওপর – আমাদের পড়াতে বসালেই সেই বইটা থেকে পড়তে হত । লন্ডনের রাস্তা-ঘাট সম্বন্ধে আমি খুব ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলাম ! আমার পিসিদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন অবিবাহিতা ছিল, তার মাথায় ছিট ছিল । সে পরে খড়দহের এক স্কুলে মাস্টারি করত । মুলত তার অত্যাচারে মাকে দুই বোনকে নিয়ে মামার বাড়ি চলে যেতে হোল । মা একটা পেয়ারার জেলি তৈরি করত – তার বেশ চাহিদা ছিল । একই সঙ্গে মন্টেসরি স্কুলে চাকরি করত ও জেলির ব্যবসাটা চালিয়ে যেত । আমাদের কোন গৃহশিক্ষক বা কোচিং ছিল না । - সেই অবস্থায় কিভাবে যে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম – এমন কি গ্র্যাজুয়েট হলাম – কে জানে ! আবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার প্রথম দিনে সেই পিসি একটা বঁটি নিয়ে মারতে এসেছিল । এই ঘটনার কথা এখানে আগেই লিখেছি । পরবর্তী কালে সেই স্কুলের এক কম বয়েসী শিক্ষককে বিয়ে করে এখান থেকে চলে গেছিলো । কিন্তু একজনের কথা না লিখলে খুব অন্যায় হয়ে যাবে । সে আমার বন্ধু, দিদি বা মেন্টর যাই লিখি না কেন – ঠিক মিলবে না । কেয়া চক্রবর্তী ! তাকে দিদি বলে ডাকতাম না বলে খুব অভিযোগ করত । অনেক ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করত । সত্যি কথা বলতে কি ও-ই আমাকে মেয়েদের সম্বন্ধে জানতে শিখিয়েছে ! ওর জন্যেই আমি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছি – হয়ত কলেজে পড়াই হত না ! – আমি যেবার ক্লাশ এইটে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম – এবং ফিরেও এসেছিলাম সেই একই খাঁচায় – তখনো ও-ই একমাত্র আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল । আবার ও-ই আমাকে কফি হাউসের রাস্তা ও আড্ডা দেখিয়েছিল । ও-ই কোথায় ইংরিজি বই পাওয়া যায় কোন হলে ইংরিজি সিনেমা দেখানো হচ্ছে – জানান দিত তখন লাইট হাউসের ঠিক উল্টোদিকে ইংরিজি সাহিত্যের নতুন ও পুরনো বই পাওয়া যেত ও অন্যান্য বইও পাওয়া যেত । তখনকার দিনে খুব একটা সস্তাও ছিল না ইংরিজি বই । আর থিয়েটার সম্বন্ধে ধ্যান-ধারনা সবই প্রথমে কেয়া – তার পরে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় । - সেই সময়টায় আমি চুটিয়ে রাজনীতি, নাটক ইত্যাদি সব কিছু করার সুযোগ পেয়েছি । এই পর্যন্ত আমার শৈশব, এঁচোড়ে-পাকা শৈশব, কৈশোর কাল বলা যেতে পারে ! মনোজ ( ক্রমশ)

116

7

শিবাংশু

হেমন্তের দেবী

হেমন্তকালটার ঠিক কোনও নিশ্চিত লক্ষণ নেই। বৃষ্টি নেই, শীত নেই, রোদটাও নরম, ফুলও ফোটেনা। স্পষ্ট হয়ে কাছে আসেনা বলে তার আবেদনটা খুব রহস্যময়। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে যে ট্রেনটা তার একটা জানালায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকা একটি মেয়ের মুখ যেন। এক পলক মনে হয় তাকেই তো খুঁজছিলুম কতোদিন ধরে। দ্বিতীয়বার সে আর চোখে ধরা দেয়না। মনের মধ্যে রয়ে যায়। অস্পষ্ট, অধরা। শুধু টানটাই থেকে যাবে বহুদিন। একেই কি হেমন্তের পিছুটান বলে। পুরীতে তো সারাবছরই গ্রীষ্ম। কখনও জ্বলন্ত, কখনও ঘর্মান্ত। তার অন্ত নেই কখনও। কালীপুজোর সময় বারুদের হিমন্ত বাষ্পে ভারি হয়ে সন্ধে নেমে আসে বালুবেলায়। পুরী হোটেল থেকে স্বর্গদ্বার পর্যন্ত সারা রাস্তায় সরাইখানাগুলো নিজেদের সাজিয়ে রাখে ঝিকমিক জোনাকির ফোঁটা ফোঁটা আলোয়। কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা মধ্যবিত্ত বাঙালিরা দিনের বেলা বার্মুডা-নাইটি আর সন্ধে হলে পাঞ্জাবি-পাজামা , শলোয়ার-কামিজে ফুটপাথ ভরিয়ে রাজার মতো। মশলামুড়ি। দাদা-বৌদির দোকানে রুমালি রুটি দিয়ে চিলিচিকেনের অর্ডার দেয়। অদূরদর্শীরা স্বর্গদ্বার বাজারে চড়াইয়ের শেষে, খাজার দোকানের পিছনে সুরাসন্ধান করে। ঠিক পাশেই রয়েছে ওষুধের দোকান। লাইন দিয়ে হাঁপানি আর হজমের ওষুধ খোঁজা অবিরত চেনা মুখ।ঝলমলে শাড়ির দোকানে উপচে পড়া ওড়িশার ঐশ্বর্য। কাটাতেলের বিক্রম অটো ছিদ্রহীন ভিড়ের মধ্যে পথ করে ছুটে যাচ্ছে মন্দিরের রাস্তায়। বাজার সমিতির পুজোমণ্ডপে দেবী কালী পূজিত হবার অপেক্ষায় ঝলমলে সাজ পরে রেডি। বদনগঞ্জ-আরামবাগ থেকে আসা কম রেস্তোর রাতের পর্যটকেরা খাজা আর ছেনাপোড়ের সম্বল গুছিয়ে থানার কাছে পার্ক করা বাসের দিকে ধাবমান। এই অটো, কতো লেগা? দশ মিটার অন্তর ফুলঝুরি, তুবড়ি, রংমশাল নিয়ে বাচ্চারা, বাবারা, দাদারা বছরকার দিনে আলো দেখাচ্ছে অন্ধকার আকাশের তারাদলে। আমরা বেড়ুবেড়ু করতে করতে মহোদধির পার্কিঙে রাখা গাড়ি বার করে চলে যাই এক ও অদ্বিতীয় চাঙ-ওয়ায়। চক্রতীর্থের দিকে আলো জ্বলেনা ততো। রাতের বেলা রাস্তাও খালি। আজ আর দেবীর সঙ্গে নিশিজাগর নেই। ঢেউয়ের স্তিমিত শব্দের আবহে কার্তিক অমাবস্যার রাত ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে যায়।

87

6

ঝিনুক

এই মন্দ আঙিনায়.....

কেয়া তালাশ হ্যায়‚ কুছ পতা নহি ...... অনেকদিন পরে আজ শনিবার বাড়িতে| শনিবার সাধারণত আমার অভিসার ডে| নিদেনপক্ষে ছোটখাটো কোন হাইক| কিন্তু বন্ধু আছাড় খেয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছে (হুঁ হুঁ বাবা‚ একা আমিই কি আর আছাড়বিলাসিনী!) আর আমি তো কয়েকদিন ধরেই বেহাল| তাছাড়া কাল থেকে ওয়েদারও বজ্জাতি শুরু করেছে| রাতভোর একহাঁটু বরফ পড়েছে| শুধুই বরফ পড়লে অভিযোগের কিছু ছিল না| কিন্তু ঐ ৭০-৮০ কিলো স্পীডে বাতাস! কাল খবরে শুনলাম‚ হাইওয়ে থেকে একটা সেমিকে উড়িয়ে পাশে ডিচে নিয়ে ফেলেছে এই বাতাসদানো| বাব্বা বড্ড বেঁচে গেছি‚ ঝড় তুঙ্গে ওঠার আগেই কাল সাঁঝে ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম| উইণ্ড ওয়ার্নিঙ উঠে গেছে এখন‚ ঝড় খানিকটা মরে এসেছে‚ এমনকি রোদও উঁকিঝুকি মারছে বরফকুচির আশপাশ দিয়ে| একবার ভাবলাম চোগাচাপকান চাপিয়ে বেরিয়ে যাই‚ একটা চক্কর দিয়ে আসি নদীর পার থেকে| ভাবতে না ভাবতেই রোদ্দুর মরে গেল‚ ঝুপঝুপিয়ে তেড়ে বরফ পড়তে শুরু করলো আর বাতাসও আবার ফোঁসফোস করতে শুরু করলো| ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বল্লুম‚ "ওকে‚ ওকে‚ওকে| যাচ্ছি না কোত্থাও‚ এই কান ধরছি‚ নাক মলছি‚ আজ আর এক পাও ঘরের বাইরে রাখবো না"| আগে আগে দুর্জনেরা ভুরুভঙ্গিমা ক'রে‚ চোখ নাচিয়ে‚ মাথা নাড়িয়ে আমায় পাগল সাব্যস্ত করার চেষ্টা করত এই সব সময়ে..... যেন রোদ-বিষ্টি-বরফ এদের কান নেই‚ এরা শুনতে পায় না! মরুগ্গে‚ আকাশ কিন্তু শুনতে পেয়ে ফিক করে হেসে ফেলল| আমিও পাল্টা মুখ ভেঙালাম| কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি‚ এখন মুশকিল হল এই একটা গোটা দিন নিয়ে করিটা কি? মনের মধ্যে আনচান‚ আজ দেখা হল না‚ আবার এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে| এমন একটা কিছু করা দরকার যাতে এমন পড়ে পাওয়া সতেরো আনা দিনটার একটা সদগতি হয়| রেঁধে‚ বেড়ে‚ বাসন মেজে‚ ঘর মুছে‚ কাপড় কেচে এমন দিনটাকে ভোগে দেওয়া মোটেই ঠিক হবে না| তখনই ঠিক করলাম আজ ল্যাদ ডে| আজ শুধুই নিখাদ আলস্য| রান্না পর্যন্ত করি নি‚ কোনক্রমে কাল রাতের ফ্রিজিত ম্যাক অ্যাণ্ড চীস আর গোটা চারেক কমলালেবু দিয়ে লাঞ্চ সারলাম রোদ্দুরে পা মেলে বসে| এমন ভরভরন্ত দুক্কুরবেলা এমনিধারা চার হাতপা লেচে কবে যে শেষ এমন ল্যাদ উপভোগ করেছি‚ মনে পড়ে না| আহা‚ আরামে চোখ দুটো মুদে আসছে লা| হঠাত মনে পড়ে গেল মুনিয়ার রমাদির কথা| ওহ হো‚ একটা গল্প শোনাবো ভেবেছিলাম‚ কিন্তু আর লেখা হয় নি| সেটাই বরং লিখে ফেলা যাক আজ চতুর্দশীর বারবেলায় শুয়ে শুয়ে| সেও তো এক প্রেতিনীরই গল্প| ধরা যাক তার নামও রমাদি| তবে এই রমাদির কোন মুনিয়াবোন নেই| আর মুনিয়ার রমাদির মত অত সোজাসরল মানুষ নন এই রমাদি‚ চট করে কারো কাছে মন খুলে ধরার মানুষ ইনি নন| সেদিন ছিল পয়লা হেমন্ত| একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে ল্যাণ্ড করে গেছে কুলকুল ঠাণ্ডা বাতাস| পাতা ঝরছে‚ ঝরে পড়ছে আর ঘুরে ঘুরে উড়ছে..... হলুদ পাতা‚ কমলা পাতা‚ সোনালি পাতা| রঙ শুধু রঙ দিকে দিকে| হেমন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু‚ পূর্ণতার সংক্রান্তিতে এসে মেশা রিক্ততার এই মহালগ্ন এসে দাঁড়ালেই আমি যেন নিজেকে খুঁজে পাই তার মধ্যে| নিজের সবটুকু নিংড়ে বিলিয়ে দিয়ে শুধু শূন্যতা আঁচলে ভরে ফেরার পথ ধরা| তা সেই পয়লা হেমন্তের নরম কমলালেবু রোদ বিকেলে অফিস থেকে সোজা নদীর পারে| থিরথিরে হিমেল হাওয়ায় উড়ে উড়ে পড়া সোনালি হলুদ পাতা গায়েমাথায় মেখে পা ঝুলিয়ে বসেছিলাম একটা গাছের গোড়ায়| পশ্চিমে পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডুবছে| হঠাত মনে হল চেনা চেনা লাগছে তো! ঐ যে ভদ্রমহিলা এতক্ষন নীচে একদম জলের কাছটিতে বসেছিলেন| উঠে আসছেন আড়াআড়ি সোজা আমার দিকেই‚ আরে এ তো রমাদি..... দু'জনেই আমরা একটু হতচকিত‚ অপ্রস্তুত| বহু বছর দেখা হয় নি রমাদির সাথে| শুধু রমাদি কেন? এদেশের কোন বাঙালীর সাথেই আর কোনরকম যোগাযোগ আমার নেই আজ প্রায় সাত বছর হতে চললো| ইচ্ছে করেই রাখিনি কোন সম্পর্ক কারো সাথে আর| মুছে ফেলেছি সব অনুষ্ঠান‚ নববর্ষ‚ রথ‚ দোল‚ পুজো‚ বাদ দিয়ে দিয়েছি সে সবকিছু জীবন থেকে| তবু এভাবে মুখোমুখি পড়ে গেলে কথা তো বলতেই হয়| বিশেষ করে একেবারে হাতপা ছেড়ে মাটিতে থেবড়ে বসে থাকলে তো চট করে চোখ ফিরিয়ে অন্যপথে চলে যাওয়াও সম্ভব হয় না| পরিচয় আর অপরিচয়ের মাঝামাঝি সেই অস্বস্তিকর টলোমলো অবস্থানে দুজনেই থমকে রইলাম কয়েক মুহূর্ত‚ তারপর রমাদিই প্রথম হাসলো ইতস্তত ভাব কাটিয়ে‚ নাম ধরে ডেকে শুধালো‚ "কি গো কেমন আছো? একা যে‚ কর্তা আসে নি সাথে?" মাথা নাড়লাম‚ "নাহ‚ এই অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাত করেই চলে এলাম পয়লা হেমন্ত উদযাপন করতে| তুমি ভালো তো?" না আমার সেই কুশলপ্রশ্নের মধ্যে কোন প্রাণ ছিল না‚ ছিল না জানতে চাওয়ার কোন সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা| নেহাতই কথার পিঠে কথা‚ বলতে হয় কিছু‚ তাই...... কিন্তু আমার সেই আন্তরিকতাহীন‚ কৃত্রিম তোতাবুলির উত্তরে রমাদি সেদিন একটা অদ্ভুত গল্প শোনালেন| বছর দু'য়েক আগে তিরিশ বছরের দাম্পত্য ফেলে রেখে রমাদি একা হাঁটা শুরু করেছেন জীবনের পথে| এই দূর বিদেশে বন্ধু বলতে কেউ ছিল না‚ আজও নেই| শুধু এক মেয়ে‚ সে কাজ করে অনেক দূরের অন্য আর এক শহরে‚ ন'মাসে ছ'মাসে আসে এখানে| তবে মাকে সব রকমের মর‌্যাল সাপোর্ট সে দিয়েছে‚ আজও দিচ্ছে| বস্তুত সেই মেয়েই মাকে উদ্বুদ্ধ করেছে শেষ অবধি প্রতিদিনের সব অপমান আর অত্যাচারের স্ট্যাটাস ক্যুও ছেড়ে নতুন ক'রে জীবন শুরু করতে| মা-বাবা প্রয়াত‚ দেশে এক ভাই আর এক দিদি| ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক অনেকদিন থেকেই ক্ষীণ‚ একমাত্র দিদিই জানে রমাদির এই ড্র্যাস্টিক ডিসিশনের কথা| চলনসই চাকরি একটা ভরসা ক'রে নিজের জামাজুতো আর ছবির অ্যালবামগুলো দুটো বাক্সে ভরে চোখের জল মুছতে মুছতে বিশাল প্রাসাদ ছেড়ে এক বেডরুমের একটা ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে উঠেছিলেন দুইবছর আগে হ্যালো-উইনের রাতে| তারপর একটু একটু করে গুছিয়ে নিয়েছেন নিজের একার গেরস্থালি| তাতে বৈভবের ছোঁয়াটুকুও আর নেই‚ কিন্তু আছে দিনের শেষে শান্তির ঘুম| এখন মেয়ে আসলে মাঝেমধ্যে তার সাথেই ফিরে যান পুরনো বাসস্থানে‚ এক আধটা উইকএণ্ড কাটিয়ে আসেন ফেলে আসা ছাদের তলায়‚ রেঁধে-বেড়ে খাওয়ান স্বামী-সন্তানকে| তিরিশ বছর কি একদিনে হয়? যত অসহ্যই হোক‚ যত খারাপই হোক‚ তবু সেটাই তো অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল তিরিশ বছর ধরে| সেটাকেই তো নিজের বলে মেনে নিয়ে লালন করেছেন দীর্ঘ তিরিশটা বছর ধরে‚ একরাতে এককথায় সব নাকচ করে এইভাবে চলে যাওয়া কি এতই জলবৎতরলং? "ভালো আছো এখন? দু:খ হয় না ফেলে আসা সংসারের জন্য?" রমাদির জবানিতেই শোনাই খানিকটা ..... "ভালো আছি কিনা বুঝি না| দু:খ? ঐ ইঁট-কাঠ-পাথরে গাঁথা বাড়িটার জন্য? হ্যাঁ‚ চোখ উপছে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল সেদিন ঘর ছাড়ার সময়‚ আজও যখনি ফিরে আসার সময় হয়‚ মেয়ে গাড়িতে স্টার্ট দেয়‚ চোখ ভ'রে জল আসতে চায়‚ গাছপালাগুলো আয় আয় ক'রে ডাকতে থাকে| ঐ বাড়ির প্রতিটা কোণ যে নিজে হাতে সাজিয়েছিলাম‚ প্রতিটা ফার্নিচার‚ পর্দা‚ আলো সব নিজে পছন্দ করে কিনেছিলাম| বাগানের গাছপালাগুলো‚ একটু একটু ক'রে কত যত্নে‚ কত মমতায় ওদের বড় করেছি| তার জন্য মায়া তো থাকবেই‚ আমি তো সন্ন্যাসী নই| তাছাড়া মানুষটাকে একা ফেলে আসতে অপরাধবোধও হয় একটু| বুড়ো হয়ে গেছে‚ এই বয়সে এখন একা একা হাত পুড়িয়ে রেঁধে খেতে হচ্ছে|" কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন রমাদি| সূর্যটা পুরোটাই হারিয়ে যায় পাহাড়ের পিছনে‚ শুধু খানিকটা আলোর রেশ ছলকে যায় এপারের আকাশে| রমাদি ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করেন‚ "খুব কেঁদেছিলাম‚ জানো? অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যে করে ফেলেছি‚ তাতে কোন সন্দেহ তো নেই কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না ভুল ক'রে ফেললাম কিনা! জীবনে কোনদিন কোন ডিসিশন তো নিজে নিই নি আগে‚ তাই না? সপ্তাহের পর সপ্তাহ‚ অফিস ছুটি নিয়ে ঘরে বসে শুধু কেঁদেছি| তারপর একদিন চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়ে আবার একটু একটু ক'রে শুরু করলাম| এখন মনে হয় ভালো-ই করেছি| হয়তো ভালো-ই আছি‚ স্বাধীন জীবন‚ নিজের মত নিজে বাঁচতে পারছি প্রতিনিয়ত গালি না খেয়ে‚ প্রেশার‚ সুগার সব মোটামুটি কন্ট্রোলে‚ এ যদি ভালো থাকা না হয় তাহলে আর কি? কিন্তু কেন যেন মাঝে মাঝে সব বড় অর্থহীন বলে মনে হয়| বুঝতে পারি না কোথায়‚ কোন দিশায় যাত্রা এখান থেকে? কি আছে শেষে?" মিহি অন্ধকারে ঢেকে গেছে পৃথিবী| পাখিদের কলরব ফুরায়‚ শুধু জেগে থাকে ছলাত ছলাত নদী আর বাতাস ফিসফিস করতে থাকে‚ 'কি আছে শেষে‚ কি আছে শেষে?'

1649

105

Stuti Biswas

ঝটিকা সফরে আমেরিকা

কালকে লেখার সাথে ছবি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম হল না । আজ দেখি হয় নাকি

352

37

মনোজ ভট্টাচার্য

মিস মার্পলরা এখনো আছে !

মিস মার্পলরা এখনো আছে ! দিজ ইস প্রিলিমিনারি ওয়াটসন ! রুপা বলল – আত্মহত্যা করলে – মুখ-টুখ ফুলে যাবে না ? এটা কোন গোয়েন্দা কাহিনী নয় । অবশ্য নয়ই বা বলছি কেন ! খানিকটা মিস মার্পল ধরনের ঘটনা ! আমার স্ত্রী তো বলেই ফেলল – তুমি তো বেশ গোয়েন্দার মতো কাজ করেছো ! তোমার মাথায় এলো কি করে ! তবে পুরো ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক । জায়গার নাম বা চরিত্র গুলোর আসল নাম বলছি না – কারন এগুলো সত্যিকারের আদালতের ঘটনা । যদিও আগেই মীমাংসা হয়ে গেছে ! চন্দননগরের আশেপাশে কোন এক জায়গায় এক বৃদ্ধা তার দুই ছেলে হারান আর পরান কে- নিয়ে থাকতেন । রুপা – পরানের বৌ । পরানের মারা যাবার পর এক ছেলে কে নিয়ে কলকাতায় বাড়িভাড়া করে থাকে । কাজ করে বাড়ি বাড়ি । মাঝে মাঝে চন্দননগরে গিয়ে যায় । সেঝানে তো শাশুড়ি থাকে । একদিন রুপার ফোনে মেসেজ এলো – মা নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে । রুপা কলকাতা থেকে চন্দননগরে চলে গেল । দেখে কিনা ওরা মার দেহ দাহ করতে যাচ্ছে – ওরই জন্যে অপেক্ষা করছিল । ওখানে একজন ডাক্তারও হাজির । রুপা মার কাছে গিয়ে খানিক দেখে সন্দেহ হওয়ায় বলে দিল - মা তো আত্মহত্যা করে নি । মাকে তো খুন করেছে ! - বজ্রপাতের মতন শোনালো রুপার এই কথা । ডাক্তার বলল – তোমার কি করে মনে হল – এটা আত্মহত্যা নয় - খুন ? আত্মহত্যা করলে মার গলায় দাগ নেই কেন ? আর জিভ তো বেরয় নি ? আরে তুমি দেখছি সব জানো ! এটা আত্মহত্যার কেশ ! আগেই পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে ! এবারে চেঁচিয়ে উঠল রুপার ভাশুর হারান । বেশ একটা সোরগোল উঠল ! যারা দেখতে এসেছিল তাদের কেউ কেউ রুপাকে সমর্থন করল । - রুপা আর কি করে, সোজা চলে গেল থানায় । সব খুলে বলতেই বড়বাবু বলে উঠল – পোস্টমর্টেম হয়েছে যখন – তখন সব ঠিক আছে । রুপা যতই চেষ্টা করছে বলতে – মা খুব মোটাসোটা ছিল । নিজে নিজে সিলিঙ্গে দড়ি টাঙাতেই পারবে না । কেউ তাকে পাত্তাই দেয় না । তবু রুপা জেদ ধরে রইল । অবশেষে বড়বাবু বলে উঠল – তুমি কি কোন প্রমাণ দ্যাখাতে পারবে ? বাড়ি চলে যাও – যদি কোন প্রমান আনতে পারো – তখন ইনভেস্টিগেট করবো আবার । রুপা আর কি করতে পারে – এতবড় একটা মার্ডার কেস – অথচ পুলিশ ওর কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছেই না ! ও আর ওরই এক প্রতিবেশী বাড়ি থেকে শ্মশানে গেল । শ্মশানে গিয়ে দেখে – মার দেহ পুড়ছে আর হারান আর চার বন্ধু মিলে এক ধারে বসে – মদ গিলছে । আর টাকা পয়সা নিয়ে আলোচনা করছে । ওর প্রতিবেশির হাতে মোবাইল ফোন ছিল । তাড়াতাড়ি ভিডিও অন করে শুনতে লাগলো – কি কথা হচ্ছে । ওদের কথাবার্তা শুনে রুপা বুঝতে পারল – ওর মাকে কোমরে লাঠি দিয়ে মেরেছে – হারানের এক বন্ধু । আর ওর মা মরে যাবার পর আগে থেকে লেখা দলিলে সই করিয়েছে আরেক বন্ধু । এই দুই বন্ধু এখন বেশি হিস্যা চাইছে । আর ওর ভাশুর হারান ওদের পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে । তাই নিয়েই একটু গণ্ডগোল চলছে । রুপা খানিক বাদে ভিডিও বন্ধ করে দৌড়ল থানায় । গিয়েই বলল – প্রমাণ চেয়েছিলেন ! এই নিন প্রমাণ ! বড়বাবু দেখেই বুঝতে পারল – কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে সোজা শ্মশানে । দেহ ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। হারান আর ওর তিন বন্ধুকে পাকরাও করে নিয়ে এলো । আর যে বন্ধুটি দলিলে টিপছাপ নিয়ে ছিল – সে পালিয়েছে । পরে অবশ্য ধরা পড়েছিল । শেষপর্যন্ত বিচারে ওদের তিনজনের চোদ্দ বছর করে জেল হল – আর দুজনের কম সাজা হল । ছ বছর হয়ে গেছে । সেই বাড়িটায় এখন হারানের বৌ এক সন্তান নিয়ে থাকে । সেও বাড়ি বাড়ি কাজ করে খায় । তবে রুপাকে পাড়ার সবাই ওখানে যেতে বারন করেছে । কারন ওর নিজের লোককে জেল খাটাচ্ছে । এখানে প্রশ্ন জাগে অনেক ! কিন্তু আমি আর সেসব প্রশ্ন করিনি । আর এখানে রুপা অন্য নামে কাজ করছে । তবুও ওর সাহসের তারিফ করতেই হয় ! এই সংসারে এরকম কত রুপা আছে – যারা নীরবে সব সহ্য করে যায় ! মনোজ

112

6

শিবাংশু

দীন যে, দীনের বন্ধু…

তখন আমি তেরো। নয় ক্লাসে পড়ি। বিদ্যাসাগরের দেড়শোতম জন্মদিন পালনের আয়োজন শুরু হলো আমাদের শহরে। তখনও পর্যন্ত পড়ার বইয়ের বাইরে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষ চর্চা ছিলোনা। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক কিংবদন্তি, বাকিটা দেবতা। তেরো বছর বয়সে, বালকত্ব ও কৈশোরের মাঝামাঝি একটা সময়ে, বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বিশেষভাবে কৌতুহলী হওয়া আমাদের সময়েও বিরল ছিলো। এই সময়টিতে কলকাতার সাক্ষরতা সমিতি সুলভে বিদ্যাসাগর রচনাবলী প্রকাশ করেন। তিন খণ্ডে। অবিলম্বে সেগুলো ডাক মারফৎ আমার বাবার সংগ্রহের অংশ হয়ে যায়। ইতোমধ্যেই বাবার কাছে নানা সংস্থা, পত্রিকা থেকে অনুরোধ এসে গিয়েছিলো । বিদ্যাসাগরকে কেন্দ্র করে বহুমুখী লেখালেখি, ভাষণচর্চা ইত্যাদির প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়ে গেছে। বইগুলি আলমারিতে ওঠেনি। লেখার টেবিলেই রাখা থাকতো। তখনও ১৯৭০এর জুন আসতে কয়েকমাস বাকি। সকালের কাগজে কলেজ স্কোয়ারের ঘেরা জায়গাটায় তাঁর মুণ্ডহীন আবক্ষমূর্তির নিচে গড়িয়ে যাওয়া মাথাটির ছবি, বাবার শূন্যদৃষ্টিতে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকা,.... আরও কিছুদিন পরে। আমার বিদ্যাসাগরকে চেনা ঐ বয়স থেকে। 'শিশুপাঠ্য' বিদ্যাসাগরের জীবনী থেকে সোজা এসে পড়েছিলুম গোপাল হালদারে। ঐ রচনাবলীর সম্পাদনা করেছিলেন গোপাল হালদার। তিনটি খণ্ডেই তাঁর লেখা ভূমিকাগুলি বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বাংলায় লেখা সেরা আলোচনাগুলির মধ্যে পড়ে। তার পর খুঁজে পেতে বদরুদ্দিন উমর এবং বিনয় ঘোষ। অবশ্যই বিপিনবিহারী গুপ্তের 'বিবিধ প্রসঙ্গ'। ইশকুল ছাড়ার আগেই মোটামুটিভাবে 'ঈশ্বরলাভ' হয়ে গিয়েছিলো আমার। পরবর্তীকালে যথাসাধ্য সন্ধান চলেছে তাঁর পায়ের চিহ্ন খুঁজে। লেখালেখিও করেছি। সভাসমিতিতে আলোচনাও চলেছে এই অর্ধ শতক। একটাই লক্ষ নিয়ে এগোতুম। ভদ্রলোকের কিছু খুঁত বার করা বড্ডো প্রয়োজন। কিছুই পাওয়া যাচ্ছেনা। চারুবাবুর অনুগামীরা বলতেন সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে ইংরেজ সৈনিকদের থাকতে দিয়েছিলেন। তাই তিনি ইংরেজের দালাল। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগর বাঙালি 'ভদ্রলোক' কালচারের প্রধান আইকন। যে মানুষকে এই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজটি মান্য করে, তিনি ততোধিক প্রতিক্রিয়াশীল। আরও অনেক খুচরো অভিযোগ ছিলো। তর্ক-বিতর্ক-মতান্তর-মনান্তর ধারাবাহিক ভাবে চলেছে কতোশত লোকের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে জলের আল্পনার মতো মিলিয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁর প্রতি আমার অবস্থানটি এখনও বদলাবার কারণ পাইনি। একটা জীবনের জন্য আধ শতক অনেক সময়। তবু অপেক্ষায় থাকি, কোনওদিন এমন কোনও তথ্য আবিষ্কার হবে, যখন বলতে পারবো, ঈশ্বরচন্দ্র, আমি তোমার মাটির পা দেখে ফেলেছি। যতদিন না সেসময় আসছে, তাঁর ছবির সামনে দাঁড়াতে গেলে নিজের তুচ্ছতা, হীনতাগুলো চোরা হেসে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি চোখ ফিরিয়ে নিই। যদি বাকি দিনগুলোতেও তাই চলে, ক্ষতি কী? আমারও অন্বিষ্ট তাই....

136

7

মনোজ ভট্টাচার্য

হাওয়ায় ডলার ওড়ে !

হাওয়ায় ডলার ওড়ে ! ছিয়াশি সালের মাঝামাঝি – আমার মা আমার কাছে গেছিলেন ! ছেলে বিদেশে কি করে দিন কাটাচ্ছে তার সরেজমিন করতে ! চুরি-চামারি করে নাকি রাস্তায় ঝাঁট দেয় ! তখন এরকম শোনা যেত – ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হলে বিদেশে গিয়ে রাস্তাঘাট ঝাঁট দিতে হয় ! দীর্ঘদিন শীতের পরে শহরের আবহাওয়া বেশ বসন্তময় হয়ে থাকে ! একটু শিরশিরে হাওয়া ! আবার তখনো দিনের আলো রয়েছে ! এই আবহাওয়াতেই এই শহরের রূপ যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে ! – এই রকম সময়ে একদিন বিকেলে ! সাবওয়ে ষ্টেশন থেকে হেঁটে ফিরতে মন্দ লাগে না ! আট দশটা ব্লক হেঁটে গেলেই আমাদের বাড়ি ! সাতাত্তর স্ট্রিটের ওপর দিয়ে হাঁটছি । - আচমকা এক দমকা হাওয়ায় গাছের পাতা উড়ে পড়ল ! - এবং - - ! আমার মনে হল – আরও কিছু পড়ছে ! আমি হাওয়ায় দুহাত বাড়িয়ে দিলাম ধরবার জন্যে ! – কি জানিনা ! কিন্তু মনে হয়েছিল কাগজ জাতীয় কিছু ! কাগজ নয় - হাতের মুঠোয় ধরা পড়েছে – গোটা ছয় ডলার ! দু ডলারের ও এক ডলারের মিশিয়ে ছ ডলার ! সেই সময় ডলার কথাটার বেশ প্রেস্টিজ ছিল ! বাড়ি ফিরে মাকে দেখালাম – দেখো । এই শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে ! ধরতে পারলেই হল ! – ডায়ালগটা ছিল – শরৎচন্দ্রের ! এই শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে! ধরতে পারলেই বড়লোক হয়ে যায় ! না ধরতে পারলে ভিখিরি ! মা তো আমার হাতে সত্যি অতগুলো ডলারের নোট দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল ! – অবিশ্বাসীর মতো জিজ্ঞেস করলো – তুই সত্যি অতগুলো ডলার পেলি রাস্তায় ? হাওয়ায় ! আমি কেতা নেবার জন্যে কারেকশান করে দিলাম ! - রাস্তায় হাওয়ায় টাকা ওড়ে ! ধরতে পারলেই হল ! আমার মা – যে কিনা সারা জীবন প্রচন্ড কষ্ট করেছেন ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে – আমার রসিকতাটা সত্যি ভেবে বিশ্বাস করে নিলেন ! – কলকাতায় চিঠিতে তো লিখলেনই আর যে কেউ আমাদের বাড়িতে আসে – সবাইকেই বলেন ! মার দৌলতে মোটামুটি সবাই আমার ডলার-প্রাপ্তি জেনে গেল । আভি ভি পিকচার বাকি হায় গুরু ! বেশ কয়েক বছর পরে আমরা কলকাতায় এসেছি ! – কথায় কথায় আমার বোন সিরিয়াসলি বলে বসলো – তোদের তো ওখানে কাজ কর্ম কিছু করতে হয় না ! তার মানে ? আমাদের খাবার জোটে কি করে ! আমি তো সম্পূর্ণ অবাক ! ওখানে তো তুই হাওয়ায় ডলার পাস – তাইতেই তো চলে ! – আমার বোন সম্পূর্ণ নিরাসক্ত মুখে বলল ! হাওয়ায় ডলার পাই মানে ! কোত্থেকে শুনেছিস এসব কথা ! কেন – মা তো দেখেই এসেছে – তুই একগাদা ডলার পেয়েছিলিস হাওয়ায় ! আমার সব মনে পরে গেল ! – আমারই রসিকতা কি রকম বুমেরাং হয়ে আমারই দিকে ফিরে এলো ! – হাওয়ায় ডলার ওড়ে ! (এই ঘটনার কথা আগেই লিখেছি । কিন্তু এক ধরনের মজার বলেই আবার দিলাম! ) মনোজ

117

3

মনোজ ভট্টাচার্য

এবারের বিদেশ যাওয়া !

এবারের বিদেশ যাওয়া ! আমাদের তো নিউ ইয়র্ক আর ভার্জিনিয়া ছাড়া কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না । গত বছর তবু পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় নব বৃন্দাবন গেছিলাম । ভালোই লেগেছিল । নিউ ইয়র্কে এবারে একজন ছাড়া কাউকে জানানোই হয় নি – আমাদের যাবার কথা । এক বন্ধুর আত্মিয় বিয়োগ হওয়ার কারনে – তাদের জানাই নি । আরেক দম্পতি – অ্যারিজোনায় চলে গেছে । - এ ছাড়া একজনের বাড়িতেই একবার যেতে পেরেছিলাম । - বেশিরভাগ দিনই লা গোয়ার্ডিয়ার আকাশে এরোপ্লেন গুনতেই ব্যস্ত ছিলাম । তবে এবারে গেছিলাম ভার্জিনিয়া বীচে । একেবারে সমুদ্রের ওপরেই হোটেল-ঘর । ওরে বাবা ! সকালে জানলার পর্দা খুলবো কি ! সূর্য একেবারে এত রেগে কটমট করে তাকায় – যে তাড়াতাড়ি পর্দা টেনে দিতে হয় । সারাদিন ঘরে পর্দা ঢাকা আলো জ্বালা । - আর সন্ধ্যে হলেই – সমুদ্র যেন বাইরে থেকে হোটেলের ন তলায় ঢুঁ মারতে থাকে । - অনেক দূরে বিরাট বিরাট ঢেউ আর বড় বড় জাহাজ – ধূসর হয়ে যাওয়া ছবির মতন ! সকালে যেমন হোটেলগুলোর উল্টোদিকে ছায়ায় হেঁটে ঘোরা যায় । তেমনি সন্ধ্যেবেলায় তটভুমিতে হেঁটে ঘোরা যায় । - হ্যাঁ – কোন চা-ওলা, বা কোন ধরনের কোন ওলা আমাদের কাউকে বিরক্ত করতে আসে না । - তবে একধরনের চার সিটের চার জনেই প্যাডেল করতে পারে – এরকম গাড়ি সমানে যাওয়া আসা করে । - বাইকেও ছেলে-মেয়েরা সমানে ঘুরছে । - হোটেলের আলো – এদিকে থেকে ওদিকে ঝলমল করে । রাত দশটা বাজলে – সমুদ্রের ওপর নৌকো থেকে বাজী পোড়ানো আরম্ভ হয় । পনেরো থেকে তিরিশ মিনিট । সে কি আওয়াজ ! আর কি আলো – কত রকমারি বাজি ! – একেবারে যেন হোটেলের ঘরে এসে ধাক্কা মারছে ! ফেরার সময়ে এক ঘটনা ঘটল – যা আগে কখনো অভিজ্ঞতা হয় নি । আগের দিন রাত থেকেই পূর্বাভাষ ছিল – ঝড়-বৃষ্টির ! – আমরা তো দুপুর বারটা নাগাদ বের হলাম একদম শুকনো খটখটে । প্রায় দেড় ঘণ্টা পরেই আচমকা দেখি – একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী একেবারে রাস্তার ওপর প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়লো । কোথাও এক টুকরো মেঘও ছিল না ! – একেবারে রণ-দামামা বাজিয়ে ভীষণ ঝড় এসে পড়লো আমাদের ঘাড়ের ওপর । আগে পেছনে প্রচুর গাড়ি । আমাদেরই মতন কেউই কিছু বুঝতে পারেনি সেই হাওয়ার কুণ্ডলীর জোর । সমস্ত গাড়ি একেবারে এলোমেলো হয়ে রাস্তার ধারে চলে যাবার চেষ্টা করছে । সে কী বৃষ্টির জোর – সামনের কাচ যেন ভেঙ্গে যাবার জোগাড় ! ছেলে খুব সাবধানে গাড়ি নিয়ে চলল । কিন্তু যাদের গাড়ি ধাক্কা খেল বা লেন বন্ধ হোল – তাদের সেই বিরাট ট্র্যাফিকে পড়তে হবেই ! এটা আমি কখনো দেখিনি ও এর মধ্যে পড়িনি । আমি গাড়ি চালালে কি করতাম – জানি না ! – রাত নটা বেজে গেল বাড়ি ফিরতে ! ভার্জিনিয়ার রেস্টন অঞ্চলে আমার হাঁটার বেশ সুন্দর জায়গা আছে । - একটা ঐতিহাসিক পার্ক – যার মধ্যে সেই মিনি-পাব্লিক-লাইব্রেরি আছে, আছে একটা ছোট পুরনো মঞ্চ আর আছে একটা ট্রেলওয়ে । আর পড়ে আছে একটা ট্রেনের কামরা । - জায়গাটা বেশ রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় ! – রোজই লোকেদের সঙ্গে আলাপ হয় – হাই হুই করি । এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা দিব্যি কেটে যায় ! সব শেষে একটা কথা লিখি । শহরে পরিবর্তনের যে প্রভাব সোচ্চার স-বেগ – তা কিন্তু এইসব আধা শহর অঞ্চলে দেখা যায় না ! এখানে আমি বেশ কয়েকবার এসেছি । দ্রুত কোন পরিবর্তন দেখি নি । এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । এক ধরনের মানুষ আছেন – যারা – বাসস্থান অঞ্চলে বিশেষ উন্নতি চান না । উন্নতি মানেই বাইরের মানুষ ঢুকে পড়বে – সেই ভয় ট্রেন স্টেশন বা বাস স্টপেজ করার বিরোধিতা করেন । ফলে পাশেই টাইসন কর্নার । সেখানে পরিবর্তন কি সরব ও সোচ্চার ! আর এই ভিয়েনা কি শান্ত জায়গা ! – এক মোড়ের মাথায় দেখলাম লেখা – আমরা অঞ্চলের উন্নয়ন চাইনা – কারন তাহলেই অনাহুত মানুষের আগমন হবে ( কথাটা আনওয়ান্টেড এলিমেন্ট বাংলা মানে আপদ ! ) ! মনোজ প্রথম ছবিটা একটা ছোট্ট মঞ্চের - যেখানে থিয়েটার ইত্যাদি হতে পারে | দ্বিতীয় ছবিটা সেই বিখ্যাত স্বয়ংপরিচালিত লাইব্রেরী | বই নিন‚ বাড়ি নিয়ে যান - পড়ুন এবং ঐ খানে ঠিক ঠাক রেখে দিন |

132

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কেবুদার অন্তর্ধন !

কেবুদার অন্তর্ধান ! দোকানটার অবস্থান সম্বন্ধে একটু বর্ণনা দিই । আগেকার অনেক বাড়ির সামনের দিকে একতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত এইরকম লাগানো দোকান দেখা যেত । লম্বায় ছ থেকে আট ফুট - আর চওড়ায় দেড় ফুট - খুব সরু । বাইরের থেকে টিনের ঝাঁপ । কোনক্রমে একজনই দোকানে বসতে পারে । দেওয়ালে সাজানো সিগারেটের প্যাকেট । কত রকমের সিগারেট – ক্যাপস্ট্যান, লুক, পাশিং শো, সীজারস (কাঁচি ), উইলিশ, চারমিনার, ইত্যাদি । প্যাকেটগুলো অবশ্য সবই খালি । গোটা কুড়ি – পঁচিশ চলতি প্যাকেট ছোট্ট কাঠের কাউন্টারের ওপরেই আছে । আর আছে দেশলাই ও বিড়ি বাণ্ডিল খানেক । দোকানের এক পাশে বিড়ি ধরাবার দড়ি । এই হোল কেবু-দার দোকান । - আগেকার দোকানদারেরা আবার সাজা-পানও বিক্রি করতো । তার সঙ্গে আবার সোডার বোতলও থাকত । বায়রনের সোডা । - কেবুদার অত সামর্থ্য নেই – পান সাজার বা সোডার বোতল খোলার । পয়সাও নেই উৎসাহও নেই । কোনক্রমে সারাদিনে কিছু বিক্রি করতে পারলেই হতো। যাকে বলে কুঁড়ের বাদশা – একেবারে আবু-হোসেন স্টাইল ! ওদের পারিবারিক ব্যাবসা – গাড়ির ব্যাটারির কারখানা ও শো-রুম । বাজারে দারুন চালু ব্যাটারি । ওর দাদা সামলায় । মানে সামলাতে হয় । ভাইদের অনেক বলেছে – কারখানায় যেতে, দোকানে বসতে । কিন্তু লরির ড্রাইভারদের সঙ্গে কথাবার্তা করতে পারেনা । তাই বড় ভাইকেই সামলাতে হয় । কেবুটা হয়েছে খুব কুঁড়ে । অবশ্য শালাদের কিছুটা সাহায্য পায় । কেবু দাদার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে কোন ভাবে এই দোকানটা করেছে । সিগারেট বিড়ির দোকান । -অনেকটা সেই – নিচে পানকা দুকান উপর মাসিকা মুকান – ধরনের । - ও, হ্যাঁ ! দোকানের আবার একটা উপর আছে । ঐ সরু দোকানের ওপরে একটা তলা আছে । মানে সেখানে বিছানা-বালিশ পাতা আছে । সেখানে কেবুদা ঘুমোয় । যখন ঘুমোয় – এমন নাক ডাকে যে – পচা মোষ খা – চেঁচিয়েও ঘুম ভাঙ্গানো যায় না । নাক ডাকার শব্দে – দোকানটা থরহরি কম্প ! বাইরে থেকে বোঝা যায় – কেউ আছে ভেতরে । বিশেষ কোন কারনে আমরা – কেবুদাকে ক্ষ্যাপাতাম – কেবুদার জঙ্গলে বাঘ ঢুকেছে – বলে। - ওহ শুনেই কি খিস্তি দিত আমাদের ! কেবুদাকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলত ! আমরাও নেক কিছু জানতাম ! কেবুদা দোকান খুলত প্রায় এগারোটা-বারোটা নাগাদ । দুপুরে বাড়িতে খেতে যেত । আবার সন্ধে নাগাদ বসতো । হঠাৎ একবার হোল কি – সারাদিন কেবুদার কোন খবর নেই । বাড়ি থেকে ওর বোন একবার খোঁজ নিয়ে গেল । - মাঝে মাঝেই কেবুদা এরকম হাওয়া হয়ে যেত । উদ্দেশ্যমুলকভাবে যে কোথাও যেত তা না । - যেমন কোন কাজে হয়ত ট্রেনে যাচ্ছে । তা ট্রেনে ঘুমিয়েই পড়লো । ট্রেন পৌঁছে গেল শেষ ষ্টেশনে । - আবার পরের ট্রেনে ফিরে এলো – মধ্যে একটা দিন বয়ে গেছে । - একবার ধরা পড়ে গেছিলো পুলিশের হাতে । পুলিশের ফোন পেয়ে ওঁর দাদা গিয়ে টাকা পয়সা গুনাগার দিয়ে কেবুদাকে ফেরত আনে । আর আমরা ছিলাম – তার ওয়াচ-ডগ । কোথায় যায় – কি করে ইত্যাদি সব গোপন খবরা-খবর রাখতে হয় আমাদের ! – তা আমরাও কোন পাত্তা পাচ্ছি না । প্রতিবারের মতো সবাই ধরেই নিয়েছে – এবারও নিশ্চয় ট্রেনে করে কোথাও চলে গেছে । - সারাদিন চলে গেল কেবুদার কোন খবর পাওয়া গেল না । পরের দিন সকালে আমাদের একটু তৎপর হতে হোল । মোটামুটিভাবে ওর গন্তব্য আমাদের জানা ছিল । খোঁজ খবর নেওয়া হোল । না – কোথাও কোন খবর নেই ! – তাহলে নিশ্চয় এবারেও কলকাতার বাইরেই কোথাও ঘুমিয়ে চলে গেছে ! বাড়িতে ওর বৌদি ছাড়া বিশেষ কেউ ওর মতন কুঁড়ে লোকের কোন গা-করত না ! দুপুরে খেতেও এলো না ! পকেটে পয়সা কড়ি আছে কিনা কেউ জানে না ! - কোথায় গেলা ! বিকেলে হঠাৎ দোকানের ভেতর থেকে টিনের দরজা পেটানোর আওয়াজ এলো । - এ কী ! দোকানটাই আমরা দেখিনি ! কিন্তু দোকানে তো তালা লাগানো ! – অনেক কষ্ট করে ওপরের দরজাটা খোলা হোল বাইরে থেকে । - কেবুদা ঐ সরু দরজা দিয়ে উঁকি মারছে - । চোখ ফুলে গেছে । দেড় দিন ধরে ঘুমোচ্ছে ! খাওয়া দাওয়া নেই ! কিন্তু দেখা গেল – খুব জ্বর হয়েছে ! বেশ হৈ চৈ পড়ে গেল কেবুদার দেড় দিন ঘুম নিয়ে । এ যে কুম্ভকর্ণের ঘুম ! এরপর অবশ্য ঐ দোকান রাখার আর দরকার পড়লো না । ওর বৌদির জোরাজুরিতে ওর দোকানে যাওয়া বন্ধ হয়েই গেল ! – মধ্যিখান থেকে আমাদের একটা খোরাকও বন্ধ হয়ে গেল ! মনোজ

105

3

মনোজ ভট্টাচার্য

কিনু গোয়ালার ফ্ল্যাট !

কিনু গোয়ালার ফ্ল্যাট ! আমাদের বাড়িতে একতলায় একঘর ভাড়াটে ছিল । এক মহিলা – তার তিন ছেলেকে নিয়ে থাকতেন ।- তারা যে কিভাবে সংসার চালাত – তা আজ আর মনে নেই । কিন্তু ওদের ছোট ছেলে অনিল –আমাদের চেয়ে একটু বড় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বন্ধুই হয়ে গেছিলো । আর এখনও মনে আছে – আমাদের পাকানো বা বখানোর কাজটা ওরই । পরে অবশ্য নিজে থেকে নেভীতে নাম লিখিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলো । - পরে একবার নেভী থেকে এসেছিল – তখন আমাদের কাছে তার সে কী ফান্ডা ! – সে আর জেনারেল মানেক স প্রায় একই । - সেই শেষ – আর তার সঙ্গে কখনো দেখা হয় নি । অবশ্য এই গল্প ওকে নিয়ে নয় । ওর ওপরের দাদা সুনীলকে নিয়ে । সুনীল ছোট্ট একটা দোকান চালাত । বাচ্ছাদের জামা কাপড়ের দোকান । তার থেকে যে আয় হতে পারে – সহজেই অনুমান করা যায় ! সারা দিন দোকানে কাটিয়ে – রাতে শুধু ঘুমোতে বাড়ি আসা । তবু – হ্যাঁ তবু – সেই অকিঞ্চিৎকর স্বল্প-আয়ের মানুষ – একদিনের জন্যে সবার সামনে রাজা হয়ে গেল ! – না – সে কোন লটারি জেতেনি । অত গরীব মানুষ লটারির টিকিট কিনবে কি ! আর এ পর্যন্ত কোন হা-ঘরে মানুষকে লটারি জিততেও দেখিনি । - আসলে এত ছোট্ট মানুষদের ওপর – না ওপরতলা – না নীচ তলা – কারুরই দৃষ্টি পড়ে না ! তবু সে একদিনের জন্যে রাজা হোল ! সুনীল তার এক বন্ধুর বিয়েতে বর-যাত্রী হয়ে হাওড়া জেলার কোন এক রামচন্দ্রপুর না কোথায় গেছিলো । বিয়ের সন্ধ্যেতেই ওঁর বন্ধুর ভীষণ শরীর খারাপ হয়ে গেল । তাকে নিয়ে আরেক বন্ধু গেল – প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রে । বাকি রইল – সুনীল । সামনে লগ্ন-ভ্রষ্টা হতে যাচ্ছে এমন একটি বাংলাদেশের হতভাগ্য মেয়ে ! গ্রামের সব শুভাকাঙ্ক্ষী ও পাত্রীপক্ষ জোর করে সুনীলের গলায় তাকে ঝুলিয়ে দিল । - পয়সা কড়ি হয়ত কিছু পেয়েছিল ! আমাদের আরেকটা বাড়ি – সবটাই ভাড়ার – উঠোনের আরেক পাশে । সেখানে সুনীলদের জ্ঞাতিভাইরা থাকে । তারাও জামাকাপড়ের দোকানদারি করে । প্রত্যেক ঘরে তাদের সংসার ঠাসা । সকালে তারা ব্যস্ত থাকে – কলঘর নিয়ে উনুন-ধরানো নিয়ে ঝগড়া-কলহ নিয়ে । উনুনের ধোঁয়া, কলের জলে বাচ্চাদের কাপড় কাচা বউদের খেউর মিশিয়ে একেবারে কিনু গোয়ালার গলি হয়ে যায় – একতলার ফ্ল্যাট । এই হট্টমেলার মধ্যেও হঠাৎ কেউ আবিস্কার করে বসে – ওদিকের দরজার মুখে একটা ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া গলায় বর-মাল্য ও হাতে সেই রাজার মুকুট – পাশে একটি জড়সড় মাথা নত কলাগাছের মতো ছোট একটা বেনারসীর-পুঁটুলি ! – সে কী ! – আমাদের সুনীল বউঁ নিয়ে এসেছে ! ওরে শাঁখ বাজা - উলু দে ! বউকে বরণ কর । - বেশ শোরগোল পড়ে গেল ! কার কাছে ছিল শাঁখ, কে দিল উলু ! আলুথালু সব সম্পর্কিত বৌদিরা দৌড়ে চলে এলো । বেশ হই-চই পড়ে গেল ! হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল পরিবেশ ! বাচ্চারা উদোম গায়েই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । কান্নার কথা ভুলে গিয়ে - হয়ত একটা বাতাসার আশায় তাকিয়ে রইল । - কয়েক মুহূর্তের জন্যে একতলাটা উৎসব-মুখর প্রাঙ্গন হয়ে গেল ! ওপর থেকে পিতামহ ঘরের মধ্যে বলল – ছোঁড়াটা বিয়ে করলো কিরে – খাওয়াবে কি ? নিজেরাই খেতে পায় না । ভাড়া দিতে পারে না ! ঠাকুরমা বলল – আহা ! মেয়েটা একেবারে বাচ্চা ! এতটুকু মেয়ের বিয়ে দিল বাবা-মা ! এই সময়ে অনিল ট্রেনিংএ ছিল । বউ-সমেত সুনীলদের যে ঘরে ঢোকানো হোল – সেই ঘরে অনিল ও তার মা থাকত । আরেকটা ঘরের সামনে প্রায় উঠোনের ওপরেই ওদের রান্না হত । সেই উঠোনের পাশে চটের আড়াল তুলে মায়ের শোবার জায়গা হোল ! বেশ কিছুদিন পর – বোধয় তিনি কোথাও চলে গেছিলেন । তাকে আর দেখা যায়নি । পরে অপুর সংসারে দেখা গেল – সেই দৃশ্য – অপু অপর্ণাকে নিয়ে টালার বাড়িতে ঢুকছে ! সমানে ভাবছি – লিছু লিখি । কিন্তু কি লিখি ! ভেবে ভেবে – চুপচাপ বসে না থেকে টুকটাক মুখে – লিখেই ফেললাম ! কি লিখলাম – জানি না ! মনোজ

99

5

শিবাংশু

ভোর ভই...১

' ত আলল্লা বনারস চশমে বদ দূর বহিশ্তে খুর্রমো ফিরদৌসে মামুর ইবাতত খানএ নাকুসিয়াঁ অস্ত হমানা কাবয়ে হিন্দোস্তাঁ অস্ত" ( হে ঈশ্বর, বনারস কে অশুভ দৃষ্টি থেকে দূরে রেখো। কারণ এ এক আনন্দময় স্বর্গের মতো স্থান। এইখানে ঘন্টাবাদক জাতির( অর্থাৎ হিন্দুদের) পূজাস্থল। এ তো আসলে হিন্দুস্তানের কাবা।) এইভাবেই বলেছিলেন নজমুদ্দৌলা, দবির-উল-মুল্ক, নিজাম জং মির্জা অসদুল্লা বেগ খাঁ ওরফে মির্জা ঘালিব, বনারসের মহিমা প্রসঙ্গে। তখনও আলো ফোটেনি ঠিক। বেশ শিরশিরে হিমেল স্নিগ্ধতা ভোর হাওয়ায়। সরাইখানা থেকে বেরিয়ে আসি দুজনে।একটু এগিয়ে সিগরার তিমুহানির মোড়। এতো সক্কালে কি কিছু সওয়ারি পাওয়া যাবে। যাকগে না পাওয়া গেলে চরণদাস ভরসা। সারা শহর তখন যেন উৎসব শেষের শ্রান্তি গায়ে জড়িয়ে নিঝুম হয়ে শুয়ে আছে। হঠাৎ একটি অটো এসে দাঁড়ায়। কঁহা জানা হ্যাঁয় সাব? গোদৌলিয়া জাই? জাই, পর মোড় পর উতরনা পড়ি। কো-ই বাত নইখে হো, চলি। অটোতে হাওয়া বেশ শীতল লাগতে থাকে। রথযাত্রা মোড় পেরিয়ে বাঁদিকে গুরুবাগের রাস্তা ধরে। সেখান থেকে লাক্সা রোড। গড়াতে গড়াতে গোদৌলিয়ার মোড় এসে যায়। ডানদিকে সন্ত থমাস গির্জা। সামনে রাস্তায় পুলিস ব্যারিকেড। এই পথেই গোদৌলিয়া হয়ে বিকেল থেকে প্রতিমার শোভাযাত্রা যাবে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে। আলো ক্রমে আসিতেছে। আমরা হাঁটতে থাকি নদীর দিকে। সেই বহুশ্রুত গোদৌলিয়ার পূর্বমুখী পথ। বনারসের স্নায়ুকেন্দ্র। দুধারে উঁচু সৌধগুলি, ভরা আছে বিপনীসারিতে। তাদের কপাট তখনও খোলেনি, কিন্তু সবজিওয়ালারা বসতে শুরু করেছে রাস্তার ধারে। চায়ের দোকান, পানের দোকান সব নড়ে চড়ে বসছে। স্নানশেষে ফেরা লোকজন, আবার স্নানযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া মানুষের সারি, মন্থর ষাঁড়, অনাবিল আবর্জনা, আশেপাশের ছোটখাটো মন্দির থেকে ভেসে আসা ঘন্টাধ্বনি, স্পিকারে মারুতিনন্দনের ভজন.... আর একটু এগিয়ে যেতেই বনারসের চিরপরিচিত ঘাটের সিঁড়ি। দশাশ্বমেধ ঘাট, গঙ্গানদীর সব চেয়ে বিখ্যাত তীরভূমি, রঘু রাইয়ের ছবি থেকে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ভোরবেলা গঙ্গা থেকে দিন উঠে আসার দৃশ্যকাব্য এভাবেই দেখতে যাওয়া মির্জা ঘালিবের হাত ধরে। অনন্ত সোপানবীথি স্পর্শ করে থাকে জলের আশ্লেষ পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই। একের পর এক সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে জলের কাছে। সিঁড়ি, নদী ও মানুষ এবং দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বিবিধ প্রণালী, নানা অভ্যেস, যার অন্য নাম ভারতবর্ষ। উদ্যত সূর্য, কল্লোলিত জলরাশি আর শব্দের ঐক্যতান সাক্ষী রেখে আরেকটি দিন উঠে আসে অনন্ত মূহুর্তময় কালস্রোত থেকে। ভোর হওয়া বাকি আছে, তবুও কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়.... ভোর ভই বনারস মা .....

76

2

মানব

শ্রাবণীর বাঁকে

১ দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। বর্ষাকাল এখন, ধানের বীজতলাগুলো সবুজে সবুজ। প্রথম যখন ধান ছড়ানো হয়, এই বীজতলাতেই। তারপর একটু বড় আর ঘন হয়ে যখন এরা মনোমুগ্ধকর সবুজে ভরিয়ে দেয়, এদেরই তুলে নিয়ে গিয়ে লাগানো হয় সারা মাঠজুড়ে। কোথাও কোথাও সেই কাজ শুরুও হয়ে গেছে। গ্রামের নাম মনোহরা, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী শ্রাবণী। সারা বছর অল্পবিস্তর জল বয়ে গেলেও বর্ষাকালে, বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে এই নদী ধারণ করে মাতৃমুর্তি। সেই জলে সমৃদ্ধ হয় এপারের গ্রাম মনোহরা আর ওপারের স্বর্ণগ্রাম, যাকে সবাই সোনাগাঁ বলেই চেনে। একটু একটু করে দৃশ্যপটে ফুটে উঠছে এপারের গ্রামখানি, মনোহরাই বটে। যেমন তার রূপ তেমনি সবুজে সবুজ। নদীর পারে একখানি খেলার মাঠ। লম্বায় চওড়ায় একটা বড় আয়তনের ফুটবল মাঠের চেয়ে কোনও অংশে কম হবে না। আজ একটা বিশেষ দিন, যে কারণে এই মাঠে এত বেশি খেলোয়ার জড়ো হয়েছে। অন্য দিন দুই দলে পাঁচ-ছয়জন করে খেলোয়াড় জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হয়, আর আজ, পনেরজন করে খেলছে এক এক দলে। হবে নাই বা কেন। আজ যে এই গ্রামের গ্রাম্য দেবীর পূজো। গ্রামের ছেলেরা তো এসেছেই, আর এসেছে অতিথিরা। সারাদিনের পূজোর আনন্দ কাটিয়ে বিকেলটায় অল্প খেলাধূলা হবে। খিদেটাও বেশ বেড়ে যাবে এতে। সন্ধ্যেবেলার আহারটা ভালই জমবে। অল্প কাদায় খেলাটাকে দিয়েছে এক অন্য মাত্রা। এমন কাউকে দেখা যাচ্ছেনা যে কর্দমাক্ত হয়নি। তবুও সম্পূর্ণ উদ্যমে চলেছে সে খেলা। দুইপাশের গোলরক্ষক মনের আনন্দে বসে ঘাস চিবোচ্ছে, আর বল ঘুরে বেড়াচ্ছে মাঝমাঠে, বলা বাহুল্য বাকী সব খেলোয়ারকে ওই মাঝমাঠেই দেখা যাচ্ছে। এই ধরণের কাদা মেখে খেলার একটা সুবিধা আছে, অসুবিধাও বলা যায়। যেমন ধরুন আপনি বল দাবী করলেন অন্য দলের ছেলের কাছে, সেও নিজের দল ভেবে বল বাড়িয়ে দিল। এতে আপনার যেমন সুবিধা হল, যেকোন সময়েই আপনিও এই অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন, এটাই অসুবিধা। আরে মশাই, নিজের নিজের দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে এগারোজনের মাঠে বড় বড় খেলোয়াররা ভুল করে, আর এখানে তো... এই খেলায় যেহেতু নিরপেক্ষভাবে বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন, সেহেতু আমি মাঠের দুটো দিকের একটাকে গ্রামের দিক অর্থাৎ এদিক আর অন্যটাকে ওদিক বলে অভিহিত করব। ...খেলা শুরু হওয়ার দশ মিনিট অতিক্রান্ত, এখনও পর্যন্ত কোনপক্ষই কোন গোল করতে পারেনি। অবশ্য গোল হতে গেলে ন্যুনতম বলটার স্থিতাবস্থার গতিশীল অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া প্রয়োজন। দুএকবার বলটার গতি এলেও তা এসেছিল মধ্যরেখা বরাবর। হবে নাই বা কেন। সার দিয়ে দুপাশে দশজন করে দাঁড়িয়ে থাকলে কি করেই বা বল এদিক ওদিক যেতে পারবে। এপাশের ট্যারা দেয় ওপাশের ভুতোকে। ভুতো আবার দুম করে একটা শট নেওয়ার চেষ্টা করে সোজা এদিকের গোল বরাবর, কিন্তু সঠিক ভাবে পায়ে-বলে না হওয়ার কারণেই হোক আর অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণেই হোক বল সোজা না এসে নব্বই ডিগ্রি গেল বেঁকে। আবার মধ্যরেখা বরাবর এপারের দিলীপ, দিলীপের থেকে বল কেড়ে নিল এপারেরই নেপাল (চিনতে ভুল করে বোধহয়)। দেখা যাক সে হয়ত নতুন কিছু করবে, কিন্তু না, দৌড়ে এসে ওপারের দুজন প্লেয়ার একসাথে পা চালাল বলের উপর। এরা সম্ভবত এই গ্রামের নয়, পুজোর ভোজ খেতে এসেছে এ-গাঁয়ের কোনও আত্মীয়বাড়ি। নেপাল একটু বল কাটাতে জানত, তাই এপা-ওপা করে বলের উপর আসা ওপারের আঘাত বাঁচানোর চেষ্টা করতে গেল, আর তখনই দুর্ভাগ্যবশত সেই আঘাত গিয়ে লাগল তার নিজেরই পায়ে। বিপক্ষের জোড়া পায়ের আঘাতে ‘ওরে বাবারে’ বলে বসে পড়ল সে বলের উপরে। আরও দুচারটে লাথি কষিয়ে নেপালের থেকে বল কেড়ে নিল তারা। কি ভাবছেন? ফাউল? ওসব দাবি করে সময় নষ্ট করে না এ গাঁয়ের ছেলেরা। রেললাইনটা বেশ কিছুটা দূরে হলেও ট্রেন এলে দেখা যায়। তাই চারটের ট্রেন গেলে খেলা শুরু হয় আর ছ-টার ট্রেন এলে খেলা শেষ। এর মাঝে যদি কারও কিছু ইয়ে পায় তাহলে কাছাকাছি থাকা নিজের দলের যেকোন সদস্যের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেলেই হল। মোটকথা, কোন বিরতি এখানে দেওয়া হয়না। এইভাবেই অনেকক্ষণ ধরে মাঝমাঠে বল নিয়ে টানাহিঁচড়া করার পর এদিকে বল আসার একটা প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে এপারের রক্ষণভাগের শোভন জোরে একটা শট নিয়েই প্রচণ্ড বেগে ওপারের দিকে ছুটে গেল। যেহেতু সবাই মাঝমাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওপারে পৌঁছে বলও পেয়ে গেল সে। ওপারের গোলরক্ষক বিকাশ বেগতিক দেখে দৌড় দিল বলের পানে। এতক্ষণ পর মনে হল কিছু একটা হবে। গোলের প্রায় কাছাকাছি শোভন পৌঁছেও গেল। কিন্তু শেষ অব্দি বিকাশকে ছুটে আসতে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কিছুটা আগে থেকেই নিল প্রচণ্ড জোরে একটা শট। এপারের বাকী চোদ্দজনের সমবেত চিৎকার গোওওওওওল...; কিন্তু বল গোলের দশ হাত বাইরে দিয়ে বেঁকে হাওয়ায় অনেকটা সাঁতরে সোজা পৌঁছলো নদীর ওপারে। এবার বাঁধল গোল। কে যাবে নদীর ওপারে সেই নিয়ে। যদিও বেশিরভাগ ছেলেই সাঁতার জানে, এবং নদীটাও ততটা চওড়া নয়, কিন্তু কেউই বর্ষাকালে স্ফীত নদী ডিঙিয়ে ওপারে যেতে রাজি হল না। তাছাড়া বলটা গেছে পরিত্যক্ত জঙ্গলটার দিকে; নিতান্ত জরুরী দরকার না পড়লে সচরাচর কেউ সেদিকে যায়না। ওই গাঁয়ের রাখালদের হাঁক দিলে হয়ত বলটা খুঁজে দেবে, কিন্তু তেমন কাউকে আজ দেখাও যাচ্ছেনা। হয়ত নেমন্তন্ন খেতে এপারের বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে এসেছে কেউ কেউ সেতু পেরিয়ে। কিন্তু সে সেতু তো অনেক দূর। প্রায় আধ ঘন্টার রাস্তা। তাহলে কি আজ আর খেলা হবেনা? আর একটা বল অবশ্য ছিল, পরশু সেটাও লিক হয়ে গেছে। এই হয়েছে আজকাল বড় এক অশান্তি। লিক হয়ে গেলে তা সারাবার লোক পাওয়া যায়না। প্রথমে যাওয়া হয়েছিল সাইকেল সারাবার দোকানে। সে বলল, সেলাই করা বা বলের চামরা কাটা তার কাজ নয়। সে শুধু লিক সারিয়ে দেবে। অনেক কষ্ট করে একজন সেলাই করার লোক পাওয়া গেল, সে বলল সে নাকি ফুটবলে হাত লাগাবেনা। অনেক নোংরা জিনিস মিশে থাকে এর মধ্যে। আর একজন সেলাইয়ের লোক আছে, কিন্তু তাকে পাওয়া যাবে পরের হাটবারে, আরও তিনদিন পর। ততদিন এই এক্সট্রা বলটাই ছিল ভরসা, সেটাও গেল। একে তো পুজোর দিন, এই আনন্দ কি আর সারাবছর পাওয়া যায়! সুতরাং, যেকোন ভাবে বলটা এনে এখনি খেলার ব্যবস্থা করতেই হবে। কিন্তু পূজোর দিনে নদীতে নামতে কেউই রাজী নয়। তখন সবার নজর গেল ছোট্ট বিনুর দিকে। সে বেচারা রোজ খেলবার আশা নিয়ে আলপথ, মাঠ পেরিয়ে এতদূর ছুটে আসে খেলতে সুযোগ পাওয়ার আশায়। যেদিন ছেলে খুব কম থাকে সেদিন সুযোগ পেলেও সাধারণত বড়দের সঙ্গে খেললে হাতে পায়ে লেগে যাবে এই অজুহাতে তাকে খেলতে নেওয়া হয়না। তাই গোলের পিছনে বল গেলে, কিংবা মাঠের বাইরে বেরিয়ে গেলে বল কুড়িয়ে একটা দুটো শত মেরে মাঠের ভিতরে পাঠিয়ে দিয়েই সে খুশী থাকে। - এই বিনু তুই একটু ওপার থেকে বলটা এনে দিবি? খেলতে পাবি তাহলে আজকে। - ধুর, এই ভিড়ের মধ্যে তোরাই খেলতে পাচ্ছিসনা আবার আমি খেলব... বিনুর সোজা সাপটা জবাব। ছোট বড় নির্বিশেষে এই মাঠে সবাই সবাইকে তুই বলেই ডাকে। - চানাচুর চলবে? পঞ্চাশ? - একশ হলে বল। একশ গ্রাম চানাচুরের চুক্তিতে বিনু নদী পার হতে রাজী হয়ে গেল। কি অপরূপ দক্ষতায় স্রোতস্বিনী নদী পার হয়ে তরতরিয়ে সে ওপারে চলে গেল। তারপর ঝোপের দিকটায় গেল বল আনতে। ......................................................................................... ‘মিনিট পনের কেটে গেল, এখনও ছেলেটা ফিরলনা। একবার দেখে আসা দরকার নাকি রে?’ সন্তোষ বলল। শোভন বেশ খানিকটা হতাশ হয়ে বসেছিল, মনেহয় গোলটা না হওয়ার দুঃখেই। সে এবার মুখ খুলল, ‘দেখ ফাজলামি করছে হয়ত। একবার ডেকে দেখি চল।’ সবাই মিলে এক এক করে ডাক দিল তারা, কোন সাড়া নেই। কোন বিপদ হলনা তো? শেষ পর্যন্ত ওপারে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। সবাই যেতে রাজী না হলেও জন দশেক ছেলে সঙ্গে পাওয়া গেল। জঙ্গলে সত্যিই যদি কোনও বিপদ থেকে থাকে তখন সবাই মিলে থাকলে একটা আলাদা মনোবল পাওয়া যায়। সাঁতরে ওপারে পৌঁছে যেটা দেখা গেল তাতে সবাই স্তব্ধ। একজন যুবকের মৃতদেহ, কিছুদিনের পুরনোই হবে, উপুড় হয়ে পড়ে আছে। আর তার সামনে বসে ভিজে মাটিতে একটা কঞ্চি দিয়ে আঁক কেটে চলেছে বিনু। চারিদিক শান্ত, নিঃশব্দ। সাহস করে শোভন ডেকে বসল, ‘বিনু...বিনু...’ যে ক্রোধভরা হিংস্র দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাল বিনু, তাতে অনেকেরই হাড় হিম হয়ে গেল। চোখ মুখ লাল, দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, অথচ শরীর যেন অবশ, কারও ছোঁয়া লাগলেই পড়ে যাবে, এমন। তারপর উঠে দাঁড়াল সে। দিলীপ এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, কিরে বলটা কোথায়? অপ্রত্যাশিতভাবে, এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিল বিনু, আর দিলীপ ছিটকে গিয়ে পড়ল মাটিতে। কোমর ধরে বসে পড়ল সে। এরপর শোভন এগিয়ে গেলে, সামনে হাত বাড়িয়ে শোভনের বুকে সে এমন এক ধাক্কা দিল, হুড়মুড়িয়ে বাকি সবার উপর এসে পড়ল সে। তখন সবাই মিলে চেপে ধরে চেষ্টা করা হল বিনুকে শান্ত করার। কিন্তু ছোট্ট হাতের তখন সে কি জোর। সবাইকে ছিটকে ফেলে দেয় একসাথে। তারপর থরথর করে প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে থাকে আর বলে চলে একটাই ছড়া, ‘মুখ করে পূবপানে দাঁড়া মাঝখানে সোজা গিয়ে শেষকালে ঘোর তুই ডানে। এইভাবে কর আরও তিনেক বার জেনেও যেতে পারিস কিবা হবে আর।’ কয়েক বার চিৎকার করে এই ছড়া বলার পর মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। ওই ভয়ের মধ্যেও সবার মনের মধ্যে তীক্ষ্ণভাবে গেঁথে গিয়েছিল ছড়াটি। ছড়ার বয়ান অনুযায়ী পূর্বদিকে তাকায় সবাই। সেদিকে, মাটিতে কঞ্চির আঁচড়ে যে সংকেতটা আঁকা আছে, তা নিম্নরূপ, লে । চ । চা ছে । ভ । য র । ড়ি । বা পুলিশকে খবর দিতেই হল এবং তদন্তের সাহায্যার্থে পুলিশকে সবটা জানানো হল। সংকেত অনুযায়ী মাঝখানে আছে ‘ভ’, সেখান থেকে সোজা গেলে ‘ভচ’ তারপর ডানদিকে ঘুরে হয় ‘ভচচা’, তারপর আরও তিনবার ডানদিকে ঘুরে পাওয়া যায় ‘ভচচাযবাড়িরছেলে’। সোনাগাঁয়ে কোন ভট্টাচার্য পরিবার থাকেনা এবং মনোহরা গ্রামে একটি মাত্র পরিবার যেখানে মা আর ছেলে বাস করেন। পুলিশ তো এই সংকেত পেয়ে মহা খুশি এবং হাতেনাতে অলৌকিক শক্তির দ্বারা যে খুনি ধরা পড়ল, সর্বোপরি তাঁরাই যে গুপ্ত সংকেত-এর মানেটা উদ্ধার করেছেন সে খবর ফলাও করে ছাপা হল। তার ফলস্বরূপ ভট্টাচার্য বাড়ির একমাত্র ছেলেকে জেল খাটতে হল খুনের অপরাধে। ২ নমস্কার, আমি বিকাশ, এখন থেকে এই গল্পটি আমার বয়ানে পাবেন। কারণ আগের ঘটনাটি যিনি লিখেছিলেন, সেই নিশীথবাবু মারা গিয়েছেন দুদিন হল। স্থানীয় সংবাদপত্রে তার ডায়েরী থেকে উদ্ধার পাওয়া এই ঘটনাটি ছাপা হয়েছে জন সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। বিধির কি বিধান দেখুন! জনতাকে সচেতন করা হচ্ছে যাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে, উনি নিজেই এতটা অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রয়ে গেলেন অসচেতন এবং ঘোর মৃত্যু এসে গ্রাস করল তাঁকে। বিনুর উপর দিয়ে যাওয়া সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর প্রায় দুবছর কেটে গেছে। এখন আমার ইঞ্জিনিয়ারিং - দ্বিতীয় বর্ষ। ক্লাস চলছে ফ্লুইড মেকানিক্স এর। প্রোফেসর দিগন্ত দেব নিজের মনে ক্লাস নিয়ে চলেছেন। এদিকে আমি নিজের মত করে লিখে চলেছি ক্লাস ডায়েরী। লাস্ট বেঞ্চে বসার এই এক সুবিধা। সেসব যাক, বরং ডায়েরীতেই মন দিইঃ সেই সব দিন, পাশের বাড়ির গৌরী গেয়েই চলেছে সকাল থেকে সেই এক কর্ণপীড়াদায়ী লাইন, ‘তোড়া যে যা বলিসস ভাই, আমাড় সোনাড় হড়িন চাই’; ‘স’ এর উচ্চারণ যেখানে প্রকৃতই ‘স’ এর মত। এদিকে গ্রামের বখাটে ছেলেরা একটা ছড়া বানিয়েছে যেটা রাস্তায় ঘাটে নাকি প্রায়ই শোনা যায়, ‘ভচচায বাড়ির ছেলে/খুনের দায়ে জেলে।’ নিশীথবাবুর হঠাৎ করেই মৃত্যু হল সেই একই জায়গায়, দুবছর আগে যেখানে ওই ঘটনাটি ঘটেছিল। এত এত ঘটনা রোজ গ্রামে ঘটে চলেছে আর আমি এখানে বসে সময় নষ্ট করছি সামান্য পড়াশুনার পিছনে? যেগুলো আগেই লোকে আবিষ্কার করে গেছে, নতুন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা যেখানে নেই, থাকলেও অন্তত আমার দ্বারা যেটা সম্ভব নয়, সেই বিষয়ে পড়াশুনা করে আমি কি পাবো? - চাকরী... এই যে ক্লাসে বসে এইসব হিজবিজি লিখলে চাকরী তো দূরের কথা, পাশই করবে না। দেখি দেখি কী লিখেছ? এই বলে তিনি আমার খাতাটা কেড়ে নিলেন এবং দুচারলাইন যা লিখেছিলাম পড়লেন। তারপর খাতার ফাঁকে রাখা ভচচায বাড়ির ছেলের জেলে যাওয়ার খবরের জেরক্সটা দেখলেন এবং চুপিচুপি বললেন, ‘এটা কি ভৌতিক ঘটনা? আমি রাখতে পারি একদিনের জন্য?’ কেউ বাংলা লেখা চেয়ে পড়লে মনটা খুশীতে ভরে যায়। বললাম, ‘নিশ্চয়ই রাখবেন। হ্যাঁ, এটা সত্যি ঘটনা, এবং আমার নিজের চোখে দেখা।’ দিগন্তবাবুর চোখদুটো চকচক করে উঠল, অবশ্য সেটা বুঝতে না দিয়ে জেরক্সটা নিয়ে টেবিলে গেলেন এবং গম্ভীর মুখে পড়ানোয় মন দিলেন। ক্লাস শেষে ধমকের সুরে আমাকে বলে গেলেন, ‘টিফিনের পর দেখা করবে একবার আমার সঙ্গে।’ টিফিনের খাওয়াদাওয়া শেষে ভয়ে ভয়ে গেলাম টিচার্স রুমে। না জানি কি ধরণের ব্যবহার করবেন তিনি আমার সাথে। উনি তখন গল্পের শেষ পাতাটা পড়ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘আরে বিকাশ যে, এসো। হ্যাঁ হ্যাঁ, এই চেয়ারটায় বসো।’ পাশেই বসে ছিলেন সুচন্দ্রা ম্যাডাম। উনি আমাদের মধ্যে কোনও গভীর ব্যাপারে আলোচনা হবে আন্দাজ করে উঠে গেলেন। এই ফাঁকে সুচন্দ্রা ম্যাডামের ব্যাপারে একটু বলে নিই। উনি স্বভাবে শান্ত, নিরীহ। শাড়ির সাথে কেটস জুতো পড়ে অফিস আসেন, এবং যেকোন প্রশ্নের, তা সে যত সহজই হোক না কেন, উত্তর দিলেই সারা ক্লাসকে হাততালি দিতে উৎসাহিত করেন। কোন জটিলতার মধ্যে এবং অন্যের কথায় থাকেন না। তাই হয়ত এই মুহূর্তে তিনি বেরিয়ে গেলেন। এখন দিগন্তবাবুর গম্ভীর ভাবটা কমে এসেছে। তিনি অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা সত্যি নাকি? এখানে আবার তোমার নামও আছে দেখছি। তার মানে তুমি এই পুরো ঘটনাটা সামনাসামনি দেখেছো?’ ‘হ্যাঁ, এবং যিনি এই গল্পটা লিখেছিলেন, তিনিও ওই একইভাবে, একই জায়গায় গতকাল মারা গেছেন।’ আমি হতাশার সুরে বললাম। ‘তাহলে তো ‘ভচচায বাড়ির ছেলে’ অভিযোগটা ধোপে টেকে না? নিশ্চয়ই এরপর ছেলেটা জেল থেকে ছাড়া পাবে।’ দিগন্তবাবুর চোখে তখন উত্তেজনা ভরপুর। ‘সে তো আগেই পাওয়া উচিৎ ছিল। পোস্টমর্টেমে যখন বেরোল যে শ্রী গোবিন্দনারায়ণ চৌধুরী হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, তখন সেই পুলিশ অফিসারই পাল্টা অভিযোগ আনলেন, ‘হয়ত ও জঙ্গলে গিয়ে ভয় দেখিয়ে কিম্বা অন্য কোনভাবে হার্ট অ্যাটাক হতে বাধ্য করেছে। আর তাছাড়া গোবিন্দবাবুর আত্মা যখন ওই... কি যেন নাম ছেলেটার? ‘বিনু’, আমি ধরিয়ে দিলাম... ‘...হ্যাঁ যখন ও বিনুর মধ্যে ঢুকে তোমাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করল, তোমরাই তো বলেছ সবকিছু, সেসব কি মিথ্যা?’ এরপর আর কোনও ব্যাখ্যা চলেনা। তাছাড়া নিজে হাতে কেস সমাধা করার ক্রেডিট কেইবা হাতছাড়া করতে চায়। হয়ত বেশী কিছু বলতে গেলে ধরে ফাটকে ঢুকিয়ে দেবে। কিন্তু একটা খটকা আমাদের থেকেই গেল।’ ‘কি খটকা?’ ‘গোবিন্দবাবুর অশরীরী যদি বিনুর মধ্যে ঢুকেই থাকবে, তাহলে সোজাসুজি অপরাধীর নামটা বলে দিলেই তো পারতেন। এইরকম একটা বাজে ধাঁধাঁ তৈরী করে সনাক্তকরণের কি সত্যিই কোনও উদ্দেশ্য ছিল?’ ‘সেটা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা তুমি তো সেই সময় ওখানে ছিলে, ঠিক কি কি ঘটেছিল আর একবার বল তো। মানে এমন কিছু যা এখানে লেখা হয়নি...’ ‘মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বিনুর জ্ঞান ফেরানো হল। বিনু এবং আমরা তিন-চারজন বাদে বাকী সবাই ঘুরপথে বাড়ি ফিরে গেল। সাঁতার কাটার রিস্ক আর কেউই নিতে চাইল না। আমরা এতটাই হতভম্ব হয়েছিলাম যে শেষ পর্যন্ত দেখে যাওয়াই ঠিক করলাম। আমদের দুই গ্রামের থানা যেহেতু সোনাগাঁয়েই, তাই ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশ এল। অবশ্য তার কিছু আগেই আমাদের গ্রামের বেশ কয়েকজন এপারে পৌঁছে গেছেন সে দৃশ্য দেখতে; নিশীথবাবুও ছিলেন। অল্প অল্প পচনের গন্ধ আসছে, তবুও নাক চেপে থেকেও দেখার সে কি আগ্রহ। আমাদের কাছ থেকে সব শুনলেন তাঁরাও। নিশীথবাবু মৃতের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন এবং উপুড় হয়ে থাকা মৃতদেহকে সোজা করলেন। কি বীভৎস সে দৃশ্য। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কি এক তীব্র আতঙ্কে। বিনু বেশ ভয় পেয়েছে বোঝা গেল। যদিও ওই হঠাৎ শক্তির উদয় হওয়ার ব্যাপারে কিছুই বলতে পারল না।’ ‘আচ্ছা এই নিশীথবাবু লোকটি ঠিক কেমন?’ ‘উনি অঙ্কের টিউশনি করেন এবং শখের কবি। আমি কোনওদিন ওনার কাছে পড়িনি, কিন্তু শুনেছি বিষয়গত জ্ঞান অসাধারণ। তার বাইরে সাধারণ মুখ চেনা আর কি।’ ‘তুমি বলছ গ্রামের লোকেদের মধ্যে নিশীথবাবুই প্রথম ওনার কাছে গিয়েছিলেন। ওনাকে ঘটনাস্থল থেকে কোন জিনিস পকেটস্থ করতে দেখেছ কি?’ দিগন্তবাবুর কৌতূহল তখন চরমে। ‘না তেমনভাবে আমরা লক্ষ্য করিনি। তবে অন্যরা যেখানে নাক সিঁটকে দূরে গিয়ে পুলিশ আসার অপেক্ষা করছিলেন, নিশীথবাবু কিন্তু ওই গোবিন্দবাবুর দেহের পাশেই ঘুরঘুর করছিলেন অনেকক্ষণ ধরে।’ ‘হুঁ, যেটা আন্দাজ করেছিলাম।’ দিগন্তবাবু টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা খুলে নিজের ক্যালেন্ডারটা দেখে নিলেন। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা তোমাদের গ্রামে আমাকে একবার নিয়ে যাবে?’ ‘আপনি যাবেন স্যার?’ ‘হ্যাঁ তোমাদের ওই ভচচায বাড়ির ছেলের কেসটা একটু দেখতে হচ্ছে ভাই।’ ‘তা চলুন না আমাদের বাড়ি, কোনও অসুবিধা হবে না। কাল শুক্রবার, কাল বিকেলে তো বাড়ি যাবই।’ ‘না না কাল নয়, আজই। বিকেলের ট্রেনেই চলো বেরিয়ে পড়ি। এক কাজ করো, তুমি হস্টেলে গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। আমি ততক্ষণ প্রিন্সিপালকে বলে ছুটিটা নিয়ে আসি।’ এবার আমার একটু আমোদ লাগল, বললাম, ‘এইভাবে একজন ছাত্রকে কলেজ কামাই করতে উৎসাহ দিচ্ছেন স্যার?’ ‘সবে সেশন শুরু হয়েছে। একদিনের ক্লাসনোট তুমি অন্যদের কাছেও পেয়ে যাবে। কিন্তু একটা দিন পেরিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবেনা। বিশেষ করে যখন একজনের জেলে থাকা না থাকার প্রশ্ন চলে আসছে, যে করেই হোক সত্যিটা জানতেই হবে। যদি আমার কাছে এই ঘটনাটা এসে না পৌঁছাত তাহলে অবশ্য কোন ব্যাপার ছিলনা। কিন্তু যখন একবার আমার হাতে ভগবান কেসটা তুলে দিয়েছেন কিছু একটা তো করেই ছাড়ব।’ এমন যেচে ছাত্রের পড়া কামাই করিয়ে তারই বাড়িতে ঘুরতে যাওয়ার দাবী করা শিক্ষক এই প্রথমবার দেখলাম। দেখা তো দূরের কথা এমন ঘটনা আদৌ ঘটতে পারে সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিলনা। এ তো গেল কথার কথা। আসল কথা হল আমার ক্লাস নোট নেওয়া বা ক্লাস করার ব্যাপারে কোনও আগ্রহই ছিলনা। নেহাৎ বলতে হয় তাই... দূর্গাপুর থেকে ট্রেনে বর্ধমান এবং সেখান থেকে বাসে মনোহরপুর পৌঁছলাম। সন্ধ্যা সাতটা। বাস থেকে নেমেই বুঝলাম আগের সপ্তাহে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক খুনগুলো নিয়ে এলাকা বেশ অশান্ত। জায়গায় জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সাদা পোষাকের পুলিশদেরও চেনা যাচ্ছে মুখচোখ দেখে। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তুলে নিয়ে যাবে একেবারে হাজতে। পরিস্থিতি তেমন খারাপ বুঝলে গুলিও চলতে পারে যখন তখন। ধীরে ধীরে এই জায়গাগুলোয় রিক্সা উঠে যাচ্ছে। দুএকটা দেখা গেলেও আগের সেই প্রাচুর্য আর নেই। সেই জায়গা দখল করেছে ই-রিক্সা বা যাকে বাংলায় আমরা টোটোগাড়ি বলি। তাতে করেই বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছলাম। আজ বাড়িতে কেউ নেই। সবাই গেছে এক আত্মীয়ের বিয়েতে। ব্যাপারটা ভুলেই গেছিলাম, নাহলে স্যার আসার আগেই কথাটা তুলতাম। পাশের বাড়ি থেকে চাবি নিয়ে দরজাটা খুললাম। বাইরে মাইকে ঘোষণা করছে, আগামীকাল সন্ধ্যায় শ্রদ্ধেয় কবি ও লেখক নিশীথবাবুর স্মরণে এক কবি সম্মেলণের আয়োজন করা হয়েছে। ক্লাবঘরটায় আড্ডা জমেছে দেখলাম। একটু বাইরে পায়চারী করে নিয়ে বাড়ি এসে খিচুড়ি আর ডিমভাজা রেঁধে নিলাম। এ এমনই এক অমৃত যার কাছে স্বর্গসুখ তুচ্ছ। দুজনে খেয়ে উঠতে নটা বেজে গেল। রাস্তার ক্লান্তিতে ঘুমটাও এল খুব তাড়াতাড়িই। ......................................................................................... সকালে ঘুমটা ভাঙল ফোনের শব্দে। বিয়েবাড়ি থেকে আমাকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। আমার একেবারেই যে ইচ্ছা নেই তা নয়। কিন্তু এই অবস্থায় স্যারকে ফেলে যাই কেমন করে। তাই ঘটনাটা বেমালুম চেপে গেলাম। বারান্দায় বেরিয়ে দেখি স্যার একটা সিগারেটে সুখটান দিচ্ছেন আর রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ‘কি ভাবছেন স্যার?’ বলেই মনে হল যেন আমি একটা গভীর ভাবনার বিঘ্ন ঘটালাম। ‘আরে কিছু না, কখন উঠলে?’ হাসিমুখে স্যার বললেন। এই হাসিমুখটা যেন ক্লাসের সেই ক্লাস টিচার দিগন্তবাবুর গম্ভীর বদনটার থেকে অনেকটাই আলাদা। ‘এইমাত্র, ডাকতে পারতেন। বাড়িতে কেউ নেই, জানি আপনার অসুবিধা হচ্ছে, একটু মানিয়ে নেবেন প্লিজ। জানেনই তো হস্টেলে থাকি, সামাজিকতা থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেছি।’ ‘আরে এসব নিয়ে নো টেনশন। আমিও তো বছর পাঁচেক আগে হস্টেলেই থাকতাম না কি! কোনও অসুবিধা হবেনা।’ বলেই চট করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন দিগন্তবাবু, ‘যাবে নাকি জায়গাটায় একবার?’ উৎসাহ আমারও ছিল, যদিও ব্যাপারটা আতঙ্কের। রাজী হয়েই গেলাম। মাঠ দেখতে যাচ্ছি এমন হাবভাব নিয়ে রওনা দিলাম দুজনে। খেলার মাঠটা থেকে অনতিদূরেই আমাদের বিঘা পাঁচেক জমি। সেখানটা একবার ঘুরে এসেই খেলার মাঠে যাব ঠিক করলাম। ‘শোনা যায় আমার প্রপিতামহ এই জায়গাগুলো কিনেছিলেন খুব অল্প দামে। চাষাবাদের পক্ষে বেশ উঁচু আর রুক্ষ, পাহাড়ের মত ছিল এখানটা তখন। কিন্তু একটা গোপন অভিসন্ধি ছিল তাঁর। সেটা হল গুপ্তধন। তিনি বেশ আশাবাদী ছিলেন এই জায়গাটাতেই লুকিয়ে রাখা আছে চৌধুরী পরিবারের গুপ্ত ধনসম্ভার।’ আমি বেশ ঐতিহাসিক ভঙ্গীমায় বললাম। ‘তারপর কিছু বেরিয়েছিল?’ ‘হ্যাঁ শয়ে শয়ে সাপ। আর পাহাড় কেটে যে মাটি পাওয়া গেল তা দিয়ে একটা সাময়িক ইঁটের কারখানা করা হল। সেটাও বেশিদিন টিকলনা। অবশেষে এই জায়গাটায় চাষবাস করাই ঠিক হল। তারপর এখানে ফলল স্বর্ণালী শস্য। এটাই তো গুপ্তধন, বলুন।’ ‘তা যা বলেছ। এবার চলো ওদিকটায় যাওয়া যাক।’ উনি পা বাড়ালেন। আমিও পিছু নিলাম। কার্তিকের সকাল। শ্রাবণীর দুপাশে রাশি রাশি কাশের বুকে ঝরে যাওয়ার ব্যাথা। ধানের জমিগুলোতে একটু একটু করে স্বর্ণালী আভা লাগতে শুরু করেছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় মনে পরিয়ে দিচ্ছে সেই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের দিনগুলো। এই হাওয়ায় একটা আতঙ্কের পরশ বয়ে যেত শিরদাঁড়া বেয়ে, খালি মনে হত কিছুই তো পড়া হয়নি। স্যারকে এপার থেকেই সবকিছু দেখালাম পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সহ। আসলে ওপারে যাওয়ার মত সাহস তখনও করে উঠতে পারিনি। কবি সম্মেলনে যাওয়ার জন্য বিকেল থেকেই আগ্রহ বাড়ছে। আর কিছুক্ষণ পরেই আরম্ভ হয়ে যাবে সেই অনুষ্ঠান। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের থেকেও বেশী আকর্ষণীয় নতুন নতুন কবিদের কবিতাপাঠ। তাড়াতাড়ি পৌঁছে সামনের দিকে চট পাতলাম। শহরের মানুষ উনি, হয়ত একটু অসুবিধা হবে, তাও মানিয়ে নিতে হবে আর কি। এই সভাতেই প্রথমবার নিশীথবাবুর কবিতা শুনলাম। আসলে উনি তো লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন, সেগুলো কিনে পড়ার খুব একটা সুযোগ হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় কবির কবিতা পাঠের সময় গ্রামের প্রবীণ গোছের মানুষ শ্যামচরণবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমিও কিছু বলতে চাই ওনার সম্পর্কে। একেতো তিনি লুঙ্গি পরে এসেছেন, তার উপর খালি গা। তাই ওনাকে উঠতে দেওয়া হলনা। যাইহোক, অনুষ্ঠানের বেশিরভাগটা জুড়েই তাঁর স্মৃতিচারণ আর কবিতাপাঠ। তাঁর কবিতার ছত্রে-ছত্রে ফুটে ওঠে গ্রামের প্রতি প্রেম, নিবিড় টানের কথা। সবার শেষে তাঁরই ছেলে পাঠ করলেন তাঁর লেখা একটা কবিতা যার লাইনগুলো বেশ মন টানল। কয়েকটা লাইন যেমন, পা ধুয়ে নিই প্রবাহমানা জলে, ছলাৎ ঢেউ উথলে উঠে বলেঃ শুনবি নাকি আমার কথা চুপে? কেমনে বাঁচি ইতিহাসের স্তুপে? এই রকমের আরও কতকগুলি কথা যা সহজ সরল, কিন্তু মন কেড়ে নেয়। ফেরার সময় দিগন্তবাবু বললেন, ‘চলো, একবার থানাটা ঘুরে আসি।’ ‘এখন, মানে এই রাত্রে?’ আমি অবাক হলাম। ‘হ্যাঁ, সাইকেল দুটো বের করো।’ এই দুদিনে স্যারের উপর বেশ খানিকটা ভরসা জন্মেছে। মনে হচ্ছে এই ঘটনার কিছু কিনারা করতে উনিই পারবেন। অতএব বিনা বাক্যব্যয়ে সাইকেলে রওনা হলাম থানার উদ্দেশ্যে। থানার যত কাছে এগিয়ে আসি, বুক ঢিপঢিপ ভাবটা ততই যেন বাড়তে থাকে। মনে হয় একদিন এই ভূতের খপ্পরে নাহলে পুলিশের খপ্পরে ঠিকই আমি মারা পরব। ‘কি দরকার?’ বাইরের চেয়ারে বসে থাকা খাঁকি পোষাকের ভদ্রলোক বললেন। ‘একটু বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে।’ স্যারের উত্তর। ভদ্রলোক শাণিত দৃষ্টিতে একটু মেপে নিয়ে বললেন, ‘অ্যাপয়নমেন্ট নিয়েছেন?’ ‘সেটা কিভাবে নিতে হয়? ভিতরে গিয়ে?’ স্যারের এই প্রশ্নে আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বললাম, ‘বলুন ওই শ্রাবণীর পারের কেসটা নিয়ে কিছু বলতে চায়, একজন প্রত্যক্ষদর্শী এসেছেন।’ এরপরে আর কেইবা আপত্তি করে! তবুও রাগত স্বরে ভদ্রলোক বললেন, ‘ফোনে কথা বলে আসতে হয় আগে থেকে। দাঁড়ান এখানে, জিজ্ঞেস করে আসছি।’ ভদ্রলোক ফিরে এলে জানা গেল বড়বাবু ডেকেছেন। ‘আসুন, বলে ফেলুন কি চাই? আপনি নিশীথবাবুর মার্ডারটা সামনে থেকে দেখেছেন?’ বড়বাবু সোজাসুজি প্রশ্ন করলেন দিগন্তবাবুকে। ‘আমি। নিশীথবাবুর নয়, দুবছর আগের গোবিন্দবাবুর সময়ে আমরাই দেহটা প্রথম দেখেছিলাম স্যার। তারপরই তো বিনু... মানে ওই ছোট্ট ছেলেটার ওইরকম...’ আমি তোতলাতে থাকি। ‘এই গল্প আমার অনেকবার শোনা, নতুন কিছু থাকলে বলো।’ বড়বাবুর কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি। এবার হাল ধরলেন দিগন্তবাবু, ‘আসলে আমরা এই মৃত্যুটার প্যাটার্ন সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি। যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি এই তদন্তে খানিকটা সাহায্য করতে পারি।’ ‘পুলিশ নিজের মত করে তদন্ত করছে, তুমি আবার নতুন কি করবে?’ ‘দেখুন স্যার ভুল বুঝবেন না, তবে আমি হলফ করে বলতে পারি ওই তন্ময় ভচচায নির্দোষ। শুধুমাত্র কিছু তথ্য জানার অপেক্ষা। আমি কলেজে পড়াই, এই দেখুন আমার কার্ড। কথা দিচ্ছি কোনওরকম অসুবিধার সৃষ্টি করবনা আপনাদের। শুধুমাত্র একটা সাহায্য চাই আপনার কাছে।’ ‘বলে ফেলুন, আমি তো দানছত্র খুলেই বসে আছি।’ বিরক্তি হতাশা সবকিছু মিলেমিশে একাকার বড়বাবুর গলায়। ‘মৃত নিশীথবাবুর কাছ থেকে সন্দেহজনক কিছু কি পাওয়া গিয়েছিল? জাস্ট এমনি জিজ্ঞাসা আর কি।’ ‘কিসব হিজিবিজি কাটা ভাঁজ করা কাগজ। দেখে তো মনে হয় বেশ পুরনো দিনের একটা চিঠি, বাংলা হরফে লেখা। কিন্তু এরকমের লেখা এতবছরের চাকরিজীবনে কখনও দেখিনি। মানেও বোঝা যায়না। ভদ্রলোক হয় পাগল ছিলেন নাহয় গোপনে ডাকাতদলে ভিড়েছিলেন, বুঝলেন?’ বলতে বলতে ফাইল থেকে একজোড়া কাগজ বের করে দেখালেন। প্রথম কাগজটাতে একটু চোখ বোলালাম, একটা চিঠি বলেই মনে হল। শুরুটা অনেকটা এরকম, “য়উ ঐমঐড় চএড়এজএড়কঔ চড়এদএনমএ, ............................................................ইত্যাদি” বাপরে, এমন দাঁতভাঙা বাংলায় কোনওকালে মানুষ কথা বলত নাকি, মনে মনে ভাবলাম। তবুও হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না। এখানে বোধগম্য কিছুই নেই, এই ভেবে পরের পাতায় গেলাম। পরের পাতার একদম শেষে খুব ছোট্ট হরফে একটা ছড়া, ছড়া না বলে ধাঁধাঁ বলাই ভাল, কারণ শেষের লাইনে তার উল্লেখ আছে। ‘শ্রাবণীর বাঁকে বাঁকে বর্ণ পরিচয় চন্দ্রকে গ্রহ করে পঞ্চাশে তাই রয়। বলবৎ বল ছেড়ে বাদ দিয়ে দেবে তাহলেই এ ধাঁধার মানে খুজে পাবে।।’ অনেক কষ্ট করে রাজি করিয়ে কাগজদুটোর জেরক্স নিয়ে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। অবশ্য আমাদের পরিচয় এবং ছবি সবকিছুই থানায় রেখে তবেই আমাদের ছাড়া হল। দিগন্তবাবু কাগজদুটো পেয়ে অব্দি ওদিকেই আটকে রইলেন। রাত বারোটা নাগাদ রান্না শেষ হল। ভাত, ডালসিদ্ধ, আলুসিদ্ধ, আর ডিম ভাজা। সঙ্গে বাড়ির ঘি। খেতে খেতে ওনার প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, শ্রাবণী নদীটার কোনও ম্যাপ আছে তোমাদের বাড়িতে?’ ‘তা হয়ত দলিলের বাক্সে থাকবে, কিন্তু সে দিয়ে কি হবে?’ ‘এই দেখেছিস, এখানে বলেছে, শ্রাবণীর বাঁকে বাঁকে... তারমানে নিশ্চয়ই... থাক, কাল সকালেই দেখব।’ এই বলে লম্বমান হলেন তিনি। হঠাৎ স্যারের মুখে ‘তুই’ ডাকটা কেমন যেন ভালো লাগতে শুরু করল, মনে হল উনি তো আমাকে ‘তুই’ বলতেই পারেন। ‘তুমি’ ডাকটা কেমন যেন কৃত্রিম। পরদিন সেকথা বেমালুম ভুলে গেলাম ওনার একের পর এক দাবীতে। চা খেতে খেতে প্রথম প্রশ্নই হল, ‘মনে আছে, সেদিন যে লোকটাকে স্টেজে উঠতে দেওয়া হলনা? ওনার কাছে একবার যেতে হবে।’ ‘হঠাৎ? ওখানে কিন্তু স্যার কিছুই জানা যাবেনা।’ ‘কেন?’ ‘উনি বড় ভালো লোক ছিলেন। কিন্তু ছেলে আর বৌয়ের অত্যাচারে, এখন কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে গেছেন। মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে তেড়ে আসেন। কিছুটা বিকারগ্রস্তও বলা যেতে পারে।’ স্যারের চাপে রাজী হতেই হল। এদিকে বিয়েবাড়িতে ফোন করে জানলাম, ওদের জোড়াজুড়িতে মা-বাবা আরও একদিন থেকে যেতে রাজী হয়েছেন, অর্থাৎ রবিবারে ফিরবেন। আমাদের হাতে স্বাধীন আরও একটা দিন পাওয়া গেল। হাজির হলাম সেই বৃদ্ধ অর্থাৎ শ্যামচরণ চক্রবর্তীর বাড়ি। খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ঘর, ছোট্ট বারান্দায় মশারি টাঙানো। ভদ্রলোক সম্ভবত বেরিয়েছেন কোথাও। পাশেই দোতলা দালান ঘর। তাঁর ছেলের। সকালের মিষ্টি হাওয়া আর নরম আলোয় পুকুর পারের বাড়িটাকে সবে ভালো লাগতে শুরু করেছে এমন সময়ে শ্যামবাবু নিমের দাঁতন করতে করতে ফিরলেন। ‘নমস্কার। আমরা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’ ‘আপনারা? পুলিশের লোক তো নন মনে হচ্ছে।’ তারপর একটু অন্যমনস্ক হয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। দুটো চাটাই হাতে বেরিয়ে এলেন। আমাদের বসতে নিয়ে মশারিটা গোছাতে গোছাতে অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘আমি জানতাম একদিন কেউ না কেউ আসবে, আসবেই। আমাকে কেউ পাত্তা দেয়না জানেন। দিলে আমি কিছুটা উপকারে লাগলেও লাগতে পারতাম। কিন্তু...’ ‘আমরা পুলিশের লোক নই। শুধু জানতে এসেছি আপনি ওই মৃত্যুগুলোর ব্যাপারে যদি কিছু জানেন আর কি। বুঝতেই তো পারছেন, ভচচায বাড়ির ছেলে, তন্ময়, বিনা অপরাধে জেল খাটছে।’ ‘বিনা অপরাধে। হ্যাঁ সেই বটে। ওরা সবাই পূর্বপুরুষদের কর্মফল ভোগ করছে। তোমরা কিন্তু সাবধান। ওই লোভের ফাঁদে কখনও পা দেবে না।’ ‘কিসের লোভ?’ আমি প্রশ্ন করলাম। ‘তোমরা এটার জন্যই এসেছ তো?’ শ্যামবাবুর চোখে শাণিত চাহনি, হাতে একটা পুরনো দিনের জরাজীর্ণ ম্যাপ। নিচে লেখা শ্রাবণী-লিপি। ‘নিশীথবাবুও এসেছিলেন। কিচ্ছু উদ্ধার করে উঠতে পারেননি। শুধুমুধু প্রেতের হাতে প্রাণটা খোয়ালেন।’ ‘আপনি নিশ্চিত, এটা প্রেতেরই কাজ? মানুষের নয়?’ ‘হ্যাঁ, আর এও জানি একমাত্র আমিই পারব কিছু একটা সমাধান বের করতে।’ ‘তাহলে করছেন না কেন?’ সন্দেহের স্পষ্ট ছাপ দিগন্তবাবুর কণ্ঠে। ‘সেদিন স্টেজে আমাকে উঠতেই দেওয়া হলনা। এরকমই আরও কত কি হয় আমার উপর, তোমরা তার কোনও খবর রাখো? বরং এবার এসো তোমরা, নিজেরা যদি কিছুটা এগোতে পারো, তাহলে আবার এসো।’ ‘কিছু যদি মনে না করেন, এর একটা ছবি তুলতে পারি?’ ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ মোবাইলটা বের করে ছবি তুললেন উনি। তারপর সেই ছবির বেশ কয়েকটা প্রিন্ট করানো হল। দিগন্তবাবু এক-একটা প্রিন্ট নেন আর বিভিন্ন রকম আঁক কাটেন। স্কেল দিয়ে নানান মাপ করেন আবার রেখে দেন। এভাবেই দুপুরটা কেটে গেল। বিকেলের দিকে বললেন, এই দেখো বুঝতে পারছ কিছু?’ কাগজটা হাতে নিলাম। বললাম, ‘কিছুটা। তার মানে এই হল আমাদের শ্রাবণী লিপি, তাইতো?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘হ্যাঁ এই দিয়েই উন্মোচিত হবে যত রহস্য। কই সেই চিঠিটা দাও দেখি।’ তাক থেকে চিঠিটা আনলাম। প্রথম লাইনটা এরকম, “য়উ ঐমঐড় চএড়এজএড়কঔ চড়এদএনমএ,” ‘য়’ অর্থাৎ ৪৭ নম্বর, ওটার জায়গায় হবে ৪৪ নম্বর অর্থাৎ ‘হ’। তারপর কি আছে? ‘উ’ মানে হল গিয়ে ৫, তার জায়গায় হবে ৯ অর্থাৎ ‘এ’। এইভাবেই প্রথম লাইনটার মানে দাঁড়ালঃ ‘হএ আমআর পঅরঅবঅরতঈ পরঅজঅনমঅ’ অর্থাৎ ‘হে আমার পরবর্তী প্রজন্ম’। ‘ধুর এইভাবে কার্ভ দেখে দেখে হচ্ছেনা। একটা ছক করো দেখি যাতে সহজেই জিনিসটা ডিকোড করা যায়।’ স্যার বললেন। অতএব আমি পয়েন্টগুলো থেকে ছক বানাতে শুরু করলাম। ছকটা মোটামুটি এরকম দাঁড়ালঃ ১ অ → ৯ এ ২ আ → ১০ ঐ ৩ ই → ১১ ও ৪ ঈ → ১২ ঔ ৫ উ → ১ অ ৬ ঊ → ২ আ ৭ ঋ → ৩ ই ৮ ঌ → ৮ ঌ ৯ এ → ৫ উ ১০ ঐ → ৬ ঊ ১১ ও → ৭ ঋ ১২ ঔ → ৪ ঈ ১৩ ক → ২৩ ট ১৪ খ → ২৪ ঠ ১৫ গ → ২৫ ড ১৬ ঘ → ২৬ ঢ ১৭ ঙ → ১৭ ঙ ১৮ চ → ২৮ ত ১৯ ছ → ২৯ থ ২০ জ → ৩০ দ ২১ ঝ → ৩১ ধ ২২ ঞ → ২২ ঞ ২৩ ট → ৩৩ প ২৪ ঠ → ৩৪ ফ ২৫ ড → ৩৫ ব ২৬ ঢ → ৩৬ ভ ২৭ ণ → ২৭ ণ ২৮ ত → ১৩ ক ২৯ থ → ১৪ খ ৩০ দ → ১৫ গ ৩১ ধ → ১৬ ঘ ৩২ ন → ৩২ ন ৩৩ প → ১৮ চ ৩৪ ফ → ১৯ ছ ৩৫ ব → ২০ জ ৩৬ ভ → ২১ ঝ ৩৭ ম → ৩৭ ম ৩৮ য → ৪৪ হ ৩৯ র → ৪৫ ড় ৪০ ল → ৪৬ ঢ় ৪১ শ → ৩৮ য ৪২ ষ → ৩৯ র ৪৩ স → ৪০ ল ৪৪ হ → ৪৭ য় ৪৫ ড় → ৪১ শ ৪৬ ঢ় → ৪২ ষ ৪৭ য় → ৪৩ স ৪৮ ং → ৪৮ ং ৪৯ ঃ → ৪৯ ঃ ৫০ ঁ → ৫০ ঁ এবার বেশ সহজ হয়ে গেল চিঠিটা পড়া। চিঠিতে পেলাম, “হে আমার পরবর্তী প্রজন্ম, ১৩ই মে, ১৯৩৩ আমি অনন্তনারায়ণ চৌধুরী, পিতা ঁবসন্তনারায়ণ চৌধুরী, নিবাস মনোহরা, জমিদারবাটি। যে বিশেষ কারণে এই পত্রের অবতারণা তাহা হইল, আমাদের বংশ আজ অতি সঙ্কটাপন্ন অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে। দেশের যে ভয়াবহ অবস্থা তাহাতে যেকোন মুহূর্তে আমাদের নিকট হইতে সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইতে পারে, এই আশঙ্কা করিয়া পিতা যক্ষ কর্তৃক সম্পত্তি আগলাইবার ব্যবস্থা করিয়া যান। কুলপুরোহিত চক্রবর্তী মহাশয় তখন কোন এক অজ্ঞাত কারণে শহরে গিয়াছিলেন। অতএব ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ আসিয়া সেই আয়োজন সম্পন্ন করেন। কথিত আছে, গরীবের সন্তানকে যক্ষ বানাইলে তাহার মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটে, অথচ সেই যক্ষ সম্মান প্রদানের পূর্বেই বাগদী বালকটি প্রস্থান করিল সেই স্থান হইতে। সেই ক্ষণে আর একটি বালককে নদীতীরে দেখা যায় এবং তাহাকেই ভুলাইয়া নিবেদন করা হয় যক্ষ হিসেবে। উহাকে ভূতলে বন্দি করিবার পর দুই দিনকাল অতিবাহিত হয়। চক্রবর্তী মহাশয় আপন কার্য সমাধা করিয়া জানিতে পারেন উহার পুত্র নিখোঁজ। খোঁজ করিতে উনি জমিদার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হন। তাঁহার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী সেই বালকটিই ছিল চক্রবর্তী মহাশয়ের সন্তান, যাহাকে যক্ষপুরীতে রাখিয়া আসা হইয়াছে। তাহাকে না বলা হইলেও কোনও এক তান্ত্রিক মারফৎ তিনি এই সংবাদ পান, এবং সন্তানের উদ্ধারে সেই স্থানে পৌঁছান। পিতার এক বাক্য, একবার যাহাকে যক্ষপুরীতে পাঠানো হইয়াছে, মৃত হউক বা জীবিত, উহাকে বাহিরে আনা যাইবেনা। বেগতিক দেখিয়া এবং ইংরাজ পুলিশদের নিকট খবর পৌঁছাইলে কি হইবে তাহা চিন্তা করিয়া লাঠিয়াল কর্তৃক চক্রবর্তী মহাশয়কেও হত্যা করিয়া যক্ষপুরী নিকটস্থ ভূমিতে প্রোথিত করা হয়। মৃত্যুপূর্বে উনি অভিসম্পাত করেন যে, এই বংশের শেষ রক্তবিন্দু দেখিয়া তবেই তিনি মুক্তি লইবেন। যদি আমাদের বংশের কেহ ওই ভূমির কাছাকাছি পৌঁছান তাহা হইলেই তাহার মৃত্যু হইবে। এক চতুর প্রেতবিশারদের শরণাপন্ন হইয়া পিতৃদেব উহার আত্মাকে স্মরণ করেন এবং ব্যক্ত করেন যে, সেক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীকে অর্থ প্রদান না করিয়া ওনার সন্তানের মুক্তি হইবে কিভাবে? অনেক অনুনয়ের ফলস্বরূপ ব্রাহ্মণ মহাশয়ের প্রেত নিয়ম কিছুটা শিথিল করেন। বলেন, যদি কেহ ঐ অর্থ ভোগের আশা না করিয়া, কোন জনকল্যানে ব্যয় করিবেন স্থির করেন তাহাকেই ঐ অর্থের উত্তরাধিকারী বলিয়া স্থির করা হইবে এবং তাহার উপর কোন অপঘাত ঘটিবে না। সুতরাং যেই আমার এই পত্রখানি পাইয়া থাকো, ভোগ সংবরণ করিয়া শুদ্ধচিত্তে ওই অর্থ লহিয়া জনকল্যানে ব্যয় করিবে এবং বংশকে অভিশাপমুক্ত করিবে, ইহাই আমার অভিপ্রায়। শ্রাবণীর উপরিস্থিত ত্রিভূজভূমি স-হ-ড় তে উহার সন্ধান পাওয়া যাইবে।” চিঠি শেষ করে আমার মনে হল শ্যামচরণবাবুর বাড়িতে একবার যাওয়া দরকার। স্যারকে সে কথা বলতে দেখলাম উনি এককথায় রাজী। হয়ত উনিও একই কথা ভাবছিলেন। সন্ধ্যেবেলা। রাস্তায় যেতে যেতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা এই ছড়াটার মানে কিভাবে বের করলেন একটু বলবেন। বেশ কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি, কিন্তু পুরোটা নয়।’ স্যারের হালকা হাসির আভাস তাঁর কথাতেই পাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, ‘চিঠিটার তারিখ হয়ত খেয়াল করেছ। সাল ১৯৩৩। তারই আগের বছর অর্থাৎ ১৯৩২-এ বর্ণপরিচয়ের সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সেখানে ছিল ১২ টি স্বরবর্ণ এবং ৪০ টি ব্যঞ্জন বর্ণ। তার মধ্যে দুটিকে বাদ দিতে হল, ‘ব’ আর ‘ৎ’, ‘বলবৎ’ এর ‘বল’ রেখে দিতে বলা হয়েছে নিশ্চয়ই দেখেছ। তার মানে একটা ‘ব’ থাকল আর একটা গেল বাদ। এবার আসি গ্রাফটার কথায়। এক-এ চন্দ্র, আবার এক-এ আসে প্রথম বর্ণ ‘অ’, নয়-এ নবগ্রহ আবার সেইসঙ্গে নয়-এ হয় নবম বর্ণ ‘এ’। অর্থাৎ শুরুর বিন্দুটি হল (১,৯)। শেষের বিন্দুটি ‘পঞ্চাশে তাই রয়’ অর্থাৎ (৫০,৫০)। এবার এক থেকে শুরু আর পঞ্চাশে শেষ হলে সমান ঊনপঞ্চাশ ভাগে ভাগ করতে হয় শ্রাবণীর গতিপথকে। সেটাই করলাম, আর ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তাই মিলে গেল উত্তর।’ শ্য্যামবাবুর বাড়িতে কোনও দরজা নেই। দেখতে পেলাম একটা হ্যারিকেনের আলো-কে কমিয়ে রাখা হয়েছে, তার সামনে চোখ বুঝে বসে কি যেন সুর করে গাইছেন। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম। শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। চোখ খুলেই বলে উঠলেন, ‘চলো, বেরিয়ে পড়া যাক।’ এমন আকস্মিক দাবিদাওয়ার জন্য আমরা তৈরী ছিলাম না। তবুও বৃদ্ধের পথ ধরলাম। পথ ধীরে ধীরে পৌঁছচ্ছে শ্রাবণীর তীরে। নিশির টানে যেন আমরা এগিয়ে চলেছি রাত্রির বুক চিরে, আলপথ বেয়ে। ছোট্ট শিশু বিনুর সাথে যেমনটি হয়েছিল, ওর দেহে প্রবেশ করে কোন এক প্রেত সিদ্ধ করতে চেয়েছিল তার অভিপ্রায়, তেমনটি আমাদের সাথেও ঘটবে না তো। ওইরকম শিশু ছিটকে ফেলে দিয়েছিল দশজন তাগরা জোয়ানকে। তাও আবার যেমন তেমন ধাক্কা নয়, কারও হাতে যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল, কারও পায়ে, কেউ আবার হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল শ্রাবণীর জলে। কি মনে হতে নিজের হাতে প্রচণ্ড জোরে চিমটি কেটে নিজেই ‘আআআ’ করে উঠি। মানে এখনও সজ্ঞানেই আছি। আর এক সপ্তাহ পর কালীপূজো। আজ রাত্রের পর আর কোনও কালীপূজো আসবে কিনা সেই নিয়েই এখন দেখা দিয়েছে সংশয়। অমাবস্যা আসতে কয়েকদিন বাকী, তাই চাঁদের আলো এখনও পুরোটা নিভে যায়নি। দূরে অনবরত হুক্কাহুয়া স্বরে ডেকে চলেছে শিয়ালের দল। ঝিঁঝিরা গেয়েই চলেছে, এক সুরে। আর কি এক আদিম মোহে আমরা এগিয়ে চলেছি যক্ষপুরীর দিকে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে। আমরা সেতু ধরেই নদী পেরোলাম। রাত্রে অন্ততঃ নদী সাঁতরাতে হলনা। একটা ফাঁড়া থেকে তো রেহাই পেলাম। তারপরই সাঁই করে পিছন দিকে কে যেন চলে গেল মনে হতেই চমকে উঠলাম। স্যার বললেন, ‘কুকুর টুকুর হবে বোধহয়।’ আমরা পৌছে গেছি সেই জায়গায়, যেখানে বহু বছর ধরে বন্দি আছে এক ছোট্ট শিশুর আত্মা, অন্ধকারের গহবরে। এবার ঘটল আর এক ঘটনা, কাপড়ে জড়ানো একটা শাবল বের করে ফেললেন শ্যামবাবু। সেটা আমাকে দিয়ে একটা গাছের নিচে খুঁড়তে বললেন তিনি। ‘তার মানে আপনি সবটা...’ ‘হ্যাঁ, আমি সবটাই জানতাম। বাবাকে খুন করে যখন পুঁতে ফেলে, আমি তখন মায়ের পেটে। মা লুকিয়ে গিয়ে মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তারপর দীর্ঘ বারো বছরের সংগ্রাম। স্বাধীনতার পর আমরা আবার গ্রামে ফিরে আসি অবশ্য। তখন জমিদারদের ক্ষমতাও অনেকখানি কমে গেছে। আর পূর্বপুরুষদের কুকীর্তির খবর ওরা নিজেরাই বুঝতে পারেনি হয়ত। নাহলে সেদিন গোবিন্দবাবু যখন ওই লেখাটা নিয়ে আমার কাছে এল, আমি কি আর অভিশাপের কথাটা বেমালুম চেপে গিয়ে ওকে এখানে পাঠাতে পারতাম? চৌধুরী বংশের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমার বাবার মুক্তি দেখে যেতে পারতাম?’ ‘আর নিশীথবাবুর ব্যাপারটা? তাকেও কি আপনিই...’ ‘নিশীথবাবুও আমার কাছে এসেছিলেন এই একই প্রশ্ন নিয়ে। আমি ওকে পুরো ঘটনাটা বলি এবং অনুরোধ করি যাতে উনি না আসেন এখানে। নিজের জেদ আর লোভের কাছে পুরোপুরি হেরে গিয়েছিলেন অত ভালো মানুষটা। হয়ত ওনার দুর্বল হৃদয় বাবার আত্মাকে দেখে ফেলেছিল, আর ওনার লোভকে দেখে ফেলেছিলেন আমার বাবার আত্মা। অতএব...’ বুক ঢিপঢিপ করছে, ইতিমধ্যে হাঁটুসমান খোঁড়া হয়ে গেছে। এরপর মাটিতে শাবলের আঘাত পরতেই ধাতব ঝঙ্কার শোনা গেল। সঙ্গে-সঙ্গে কোথা থেকে যেন শোনা গেল এক শিশুর গগনবিদারী অট্টহাসি। স্যারের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম। ওনারও যে হাত কাঁপছে বোঝা গেল। দুজনেই তাকালাম শ্যামচরণ বাবুর দিকে। ওনার মুখে প্রসন্ন হাসি, ‘ও কিছু নয়। অনেকদিন পর মুক্তির আশায় শিশুমনে খুশীর জোয়ার এসেছে। হাত চালাও তাড়াতাড়ি।’ একে তো ঘামে ভিজে গেছে সারা গা ভয়ে আর ক্লান্তিতে, তার উপর বৃদ্ধের এরকম আচরণ। আর হাত চালাতে পারলাম না। দেখলাম এইবার স্যার শাবলটা নিয়ে খুঁড়তে শুরু করলেন। একটু পরেই পাওয়া গেল লোহার একটা ঢাকনা। প্রচণ্ড শক্তিতে দুজনে মিলে খুলে ফেললাম সেটা। টর্চ লাইট জ্বেলে দেখা গেল ভিতরে একটা সিড়ি। হ্যাঁ, চলো নামা যাক। সামনে শ্যামবাবু, তারপর আমি আর সবশেষে দিগন্তবাবু, এইভাবে নামতে শুরু করলাম। হাসির শব্দটা থেমেছে। অনেক মাকড়সার ঝুল, বাদুড়ের আক্রমণ পেরিয়ে নিচে পৌঁছে যা দেখলাম তা একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না। ছোট্ট একটা শিশু, অনেকদিনের না আঁচড়ানো জটবাঁধা চুল, দীর্ঘদিনের না খেতে পাওয়া হাড়সর্বস্ব শরীর, একদৃষ্টে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। চোখের পাতা পড়ছেনা একটুও, শুধু অবাক চাহনি তার দুচোখে। ‘দাদা... আমার দাদাটাকে ওরা এভাবে চাপা দিয়ে মারলে... না জানি কতদিন খেতে পায়নি, অন্ধকারে খিদের জ্বালায় ছটফট করেছে।’ কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধের গলা ধরে এল। শিশুটির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই গোপন কুঠুরীতেই আমাদের ঈশারা করে নিয়ে চলল কোন অজানার উদ্দেশ্যে। আমরাও সম্মোহিতের মত চললাম তার পিছু পিছু। একটু এগিয়ে গিয়ে উইয়ের ঢিবির মত জায়গায় পৌঁছে সেখানে উঠে গিয়ে শিশু অদৃশ্য হল। আন্দাজ যদি খুব একটা ভুল না হয়, হয়ত শিশুটির ইহজগতের কাজের এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু কপাল তো আর সবসময় আন্দাজমত চলে না। এদিকে লক্ষ্য করে দেখলাম শ্যামবাবু আমাদের সঙ্গে আসেননি। সিড়িতেই বসে আছেন হয়ত। আবার শাবলের কাজ শুরু হল। দুর্বল ঢিবি গুঁড়িয়ে ঝরে ঝরে পড়ল। এবং বেরিয়ে এল একটা পিতলের বাক্স। তালা ছিল না, তাই সহজেই খোলা গেল। ভিতরে যা দেখলাম... এত সোনা জীবনে কখনো দেখিনি। কিন্তু না। এ আমার নয়, এ আমাদের। গ্রামের স্বার্থে খরচ করতে পারলে তবেই এতগুলো মানুষের আত্মবলি সার্থক হবে। হঠাৎ সিড়ির দিক থেকে শব্দ এলো, ‘ইউ আর আণ্ডার আরেস্ট মিস্টার চক্রবর্তী। আজ তোমার সব গল্প আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। এবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে বুড়ো বয়সে যে তোমায় জেলের ঘানি টানতে হবে বাছা।’ এরকম একজন বয়স্ক মানুষকে বাছা বলার প্রতিবাদ করতে যাব ততক্ষণে ওনার ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ফেলেছেন বড়বাবু। কিন্তু ঘুরে তাকানোর বদলে বন্দুকের সামান্য স্পর্শেই শ্যামবাবুর নিথর দেহটা উপুড় হয়ে সিড়ি থেকে পড়ে গেল। এবার বন্দুকের নল ঘুরল আমাদের দিকে। শ্যামচরণ ভট্টাচার্যকে খুন করে গুপ্তধন হাতানোর অপরাধে তোমাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হচ্ছি... বলতে বলতেই চোখ পাকিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন বড়বাবু। ‘ইনিও কি তাহলে টপকে গেলেন নাকি?’ বললাম আমি। ‘পুলিশের হার্ট এত দুর্বল নয়। এত সহজে টপকাবে না। বাইরে নিয়ে গিয়ে জলের ঝাপটা দাও ঠিক হয়ে যাবে।’ শ্যামবাবুর গলা শুনে দুজনেই চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। শুধু একরাশ আদিম গন্ধ নাকের উপর আক্রমণ হানিয়ে জানিয়ে যায় তার অব্যক্ত যন্ত্রণা। জ্ঞান ফেরার পর বড়বাবু নিজের উদ্যোগে গ্রামের উন্নতিকল্পে কিভাবে সেই গুপ্তধন ব্যয় করা যায় তার উপদেশ দিতে শুরু করলেন। আমরাও ওনার এহেন পরিবর্তনে হতবাক। শুধু শ্যামবাবুকে আর বাঁচানো গেল না। প্রতিশোধের আগুনে আর দাদার মুক্তির আশায় তিনি আশিটা বছর কাটিয়ে দিলেন। একেই বোধহয় বলে ভ্রার্তৃপ্রেম। হয়ত তাঁর পুত্র-পুত্রবধু এখন গভীর ঘুমে মগ্ন, জানতেও পারলনা বাবার এইভাবে মৃত্যুর কথা। কিন্তু পুলিশ আছে যখন, নিশ্চয়ই জানাবে। হাজার-হোক, রক্তের টান তো ওনাদের সাথেই। আমরা তো ওনার কাছে দুদিনের সহচর মাত্র। ‘আচ্ছা সবই তো হল, আরও একটা খটকা...’ আমি বললাম। ‘আবার!’ দিগন্তবাবু হাসতে হাসতে বললেন। ‘হ্যাঁ, বলছিলাম ম্যাপে যে দেখাচ্ছে উল্লিখিত স্থানটি অর্থাৎ স-হ-ড় ত্রিভূজটি আমাদের গ্রামে অবস্থিত। এদিকে আমরা গুপ্তধন পেলাম স্বর্ণগ্রামে। ব্যাপারটা যদি একটু খোলসা করেন...’ ‘ভূগোলে নিশ্চয়ই পড়েছ যে নদীর এই ধরণের অতিরিক্ত বাঁক ধীরে ধীরে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদে পরিণত হয়, আর নদী ধীরে ধীরে ঘুরপথ ছেড়ে সোজাপথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। জঙ্গলের ওই পাশে জলাশয়টা খেয়াল করেছ? আচ্ছা এবার তোমাকে একটা টেকনিক্যাল প্রশ্ন করি।” ‘নিশ্চয়ই’, আমি বললাম। ‘আগের দিন ফ্লুইডের ক্লাসে লাগ্রেঞ্জিয়ান অ্যাপ্রোচ আর অয়লারিয়ান অ্যাপ্রোচ পড়িয়েছিলাম। বর্তমান ঘটনাটাকে তুমি এই দুটোর মধ্যে কোন শ্রেণীতে ফেলবে?’ এই চ্যাপ্টারের প্রথমে থাকা এই দুটো জিনিসই মাত্র আমি পড়েছিলাম। তাই উত্তর দিতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলনা। ‘নিঃসন্দেহে অয়লারিয়ান ভূত এগুলো। লাগ্রেঞ্জিয়ান হলে তো দেশে দেশে ঘুরে লোক মেরে বেড়াত।’ ‘একদম, প্রাক্টিক্যালে তোমার জন্য দশ নম্বর এক্সট্রা রইল।’ আনন্দে মনে মনে নেচে নিলাম খানিকটা। .......................................................................................... রবিবার সকাল। বাড়ির সবাই আজ দুপুরে ফিরবে। আমরাও এসপ্তাহের ছুটি শেষ করে ফিরে যাব কলেজ জীবনে। তার আগে একবার খেলার মাঠটা দেখতে এলাম। শ্রাবণীর ধারে বসে দিগন্তবাবু গুনগুন করে কি যেন বলছেন। ভালো করে কান পেতে শুনলাম, এ যে নিশীথবাবুর সেই কবিতাঃ ‘পা ধুয়ে নিই প্রবাহমানা জলে, ছলাৎ ঢেউ উথলে উঠে বলেঃ শুনবি নাকি আমার কথা চুপে? কেমনে বাঁচি ইতিহাসের স্তুপে?’ আমিও গলা মেলালাম তাঁর সাথে, ‘কতটা পথ পেরিয়ে এসেছো তুমি, আরও কতক পেরিয়ে যাওয়া বাকী; আমার ঘড়ি তোমার জলস্রোত, ইতিহাসের পরোয়া করে নাকি!’ {/x2} {x1i}3725e884-7b40-4395-bcb4-9ff01a880e05_srabonir.png{/x1i}

123

3

মুনিয়া

হপ্তা দুইয়ের গদ্য

দেশের ডায়েরি- ৪ আমাদের ছোটবেলায় কল্যাণী একটি প্রায়-গ্রামদেশ ছিল । আম, জাম, তেঁতুল, নিমের বৃক্ষ ছিল অগুনতি। দিগন্ত বিস্তৃত (তখন সেইরকমই লাগত) মাঠ আর নানাপ্রকারের সবুজের হাল্কা ঘন শেডের ফাঁকে ফোকরে ‌কোলকাতা শহর থেকে দুদিনের জন্য হাঁপ ছাড়তে আসা শৌখিন মানুষদের বাড়ি ছিল গোনাগুনতি। সুন্দর সুন্দর বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। কোনো বাড়ির ভিত কাটা হলেই কেমন করে যেন আমরা খবর পেয়ে যেতাম। যতক্ষণ না ইঁট, বালি, সুরকি, সিমেন্ট পড়ছে, ততক্ষণ সেই কাটা ভিতে, মাথা সমান মাটির গভীরে ঢুকে আমাদের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা চলতো সারা বিকেল। মাঝে মাঝে বাড়ির মালিকেরা কলকাতা থেকে এসে গাছের তলায় মাদুর পেতে বসে স্বপ্ন বিধুর চোখে, তদগত চিত্তে সেই খালি জমির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কখনো পুরোনো বাসিন্দাদের সাথে বাড়ি সংক্রান্ত আলাপ আলোচনায় মেতে উঠতেন। আমরা ছোট ছিলাম কিন্তু তবুও বুঝতে অসুবিধে হতনা যে বাড়ি ঘিরে তাঁদের কত শত স্বপ্ন! সামনে কেয়ারি করা এক চিলতে ফুলের বাগান হবে। পাঁচিলের পাশ ঘেঁষে সারি সারি দেবদারু গাছ বিকেলের রোদ মেখে লেকের থেকে আসা মিষ্টি হাওয়ায় পাতা নাড়বে মুহুর্মুহু। একদিকে শক্ত পোক্ত কোনো গাছের ডাল বেয়ে দোলনা ঝুলবে। বাড়ির গেট খুললেই লালচে সুরকি বেছানো পথের পাশে সম্ভ্রম জাগানো তুলসী মঞ্চ থাকবে। আর তাতে একটি বাচ্চা তুলসীগাছের ছোট্ট শীর্ষ দীপ্ত ভঙ্গিতে আকাশ ছুঁতে চাইবে। পেছনে কেয়ারটেকারের ঘরের ছাদের অ্যাসবেসটারের চাল বেয়ে লাউ, কুমড়োর লকলকে লতা লতিয়ে উঠবে একদিন। আর আজকের মধ্যবয়সের দ্বার ছুঁয়ে থাকা থাকা যুবক, কালকে প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে পৌঁছে, ধুলো ধোঁয়ার শহরের পাট চুকিয়ে সবুজের সমারোহে, সতেজ আবহাওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত অলস জীবন কাটাবার স্বপ্ন সাকার করতে এসে পৌঁছবে এই ঠিকানায়। যদিও তাঁদের স্বপ্নালু চোখ বিরক্তিকর কুঁচকে উঠতো যখন তাঁরা তাঁদের ভবিষ্যত স্বপ্নপ্রতীম বাসস্থানে আমাদের হুটোপাটা করতে দেখতেন। তবুও সত্যিই বকাঝকা খাইনি বিশেষ। হয়ত ভবিষ্যত অতি বিচ্ছু প্রতিবেশীদের বিগড়ে রাখবেন না এই সংকল্পে মুখখানা পেঁচোপনা করে নিজেদের বিরক্তি-ক্রোধ কোনক্রমে গিলে নিতেন। সেই সব মায়াবী দিনগুলোতে তাদের আগমন ছিল নিয়মিত। কিন্তু কখনো তারা ঘরের চৌহদ্দির ভিতরে পা বাড়াত না। দূরে, বাগানে আচমকা ঘন সবুজ পাতার আড়ালে আবডালে তাদের পোড়া মুখ নজরে আসত। অনেক সময় কিছু দেখা না গেলেও যখন সজোরে আম-জামগাছের ডালগুলো আচমকা উত্তাল হয়ে উঠত, তখন বোঝা যেত যে তারা এসেছে। আজ সেইসব বৃক্ষের দল অন্তর্হিত। একসময় যে তেঁতুলগাছটির মস্ত গুঁড়ির আনাচে-কানাচে, মাটির ওপর তীব্রভাবে উঁচু হয়ে জেগে থাকা শিকড়ের গলি ঘুপচিতে আমাদের কাল্পনিক পাঠশালা ছিল, এখন সেখানে ঝাঁ চকচকে অ্যামাজনের অফিস। কালবৈশাখীর তুমুল ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে দৌড়ে সবার আগে পৌঁছনোর তীব্র উল্লাস মনে নিয়ে যে কাঁচামিঠে আম দিয়ে জামার কোঁচড় ভরাতাম, সেই আমগাছের জায়গা এখন নিয়ে নিয়েছে আধুনিক বিউটি পার্লার। পুজো পার্বনে একছুটে দুর্বা নিয়ে আসা ঘাস জমিতে শান বাঁধানো সিমেন্টের প্রলেপ। প্রতিবেশী দেশের বহু মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে, রাশি রাশি কাঁচা টাকা সহ এদেশে এসে কল্যাণীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছেন। অকাতরে গাছের পরে গাছ কেটে, বস্তা বস্তা সিমেন্ট ফেলে তাদের জন্য কংক্রিটের খুপরি তৈরী হচ্ছে। বিধান রায়ের সুপরিকল্পিত ছোট্ট শিল্পাঞ্চলটিতে এমস আসছে। শুনলাম এয়ারপোর্টও নাকি তৈরী হবে। প্রতিদিন জ্ঞাতে অজ্ঞাতে কত যে পাপকর্ম সাধিত হচ্ছে আমাদের দ্বারা! বাপ-ঠাকুর্দার বয়সী, মা-দিদিমার মত, যারা জন্ম থেকে শুধু দিয়েই এসেছে, উন্নয়নের লোভে তাদের ওপর কুঠারের আঘাত হানছি নির্মম হস্তে। বোবা, তাই তাদের বিলাপ আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছোয় না, আর আমরা ‌এমন অন্ধ যে নিজেদের ভবিষ্যতও দেখতে চাইনা। নিজেরা খেয়ে পড়ে, ভালোভাবে শ্বাস নিয়ে এই জীবন হয়ত পার করে দেব। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? সেই নিয়ে কথা বলতে একদিন দেখা করতে গেলাম গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের সাথে। তাঁরাও যে ভাবছেন না তা নয়। এটা ওটা করছেন। তবে ভেবে আর আড্ডাপাতায় গদ্যরচনা করে তো কোনো লাভ নেই, কঠোর বাস্তবকে উপলব্ধি করে সুপরিকল্পিত কিছু ব্যবস্থাপনা চাই। এত বছরের পাপ ধুতে সামনের বহু বছরের একনিষ্ঠ কর্মযোগ চাই। দেখা যাক। যা বলছিলাম, এখনও হনুমানের দল মাঝে মাঝে আসে। আসলে আসে না, হানা দেয় বলাই সঙ্গত। পাঁচ সাতজনের মিলিত দল। মা হনুর কোঁখে সদ্যোজাত। চোখ ফোটা অবস্থা থেকেই তারা মায়ের বুকে লেগে থেকে থেকে দিব্যি চুরি- ছিনতাইয়ের থিওরিক্যাল অংশটি শেখে। উন্নয়নের জেরে তাদের খাদ্য সম্ভারে স্বাভাবিকভাবেই টান পড়েছে। তাই তারা এখন প্রচন্ড হিংস্র হয়ে উঠেছে। সোজাপথে খাবার না জুটলে, কেড়ে কামড়ে খাবার সংগ্রহ করতে একটুও দ্বিধা দেখায়না। ওদের দলনেতা প্রথম সুযোগেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে আসে। অপেক্ষারত বাকি সদস্যরা তখন পাঁচিলে ওপর সার সার বসে কিচকিচে ভাষায়, মুখ ভেঙচে একে অপরের সাথে আলাপচারিতায় মত্ত থাকে। আপনি হয়ত বারান্দায় বসে একমনে সকালের খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে গরমাগরম চায়ে গলা ভেজাচ্ছেন। হঠাৎ দেখতে পারেন, হনুনেতা খোলা সদর দরজা দিয়ে গটগট করে আপনার পাশ কাটিয়ে আপনারই ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল! আর খানিক পরে হতভম্ব আপনার দিকে দৃকপাতও না করে, ডাইনিংয়ের টেবিলের ওপরে রাখা ফল পাকুড় ছেড়ে ফ্রিজের ওপরে রাখা চকোলেটবা বিস্কুট নিয়ে ধীরে সুস্থে বেরিয়ে গেল। পছন্দের জিনিস তুলে ঘর থেকে বেরোবার পথে যদি আপনার প্রতিবাদের সম্মুখীন হয় তবে কি হতে পারে তার চাক্ষুষ প্রমাণও পেলাম। সত্যি মিথ্যা জানিনা, বাজারে দূর থেকে এক ভদ্রলোককে দেখানো হল। স্কার্ফ দিয়ে মাথা, মুখ পেঁচিয়ে ঢাকা। শুনলাম এক হনু তাঁর বাড়ির খাদ্যদ্রব্য ছিনতাই করে পালাবার পথে ভদ্রলোক তার সাথে সম্মুখ রণে অবতীর্ণ হন। ফল স্বরূপ হনুমানটি তাঁর ডানগালে এক মোক্ষম চাপাটি কষিয়ে এমন আঁচড় দিয়েছে যে তাঁর ডানগালে এখন নেই ভূমির মানচিত্র জ্বলজ্বল করছে। একটু পরে মাছ কিনতে গিয়ে তাঁর সাথে পাশাপাশি দেখা! ওজনে ঠকাচ্ছে সন্দেহে বয়স্ক মাছওয়ালাকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তুমুল বকাবকি করছেন। বুঝলাম, হনু শুধু গালে দাগ রেখে যায়নি, স্বভাবেও ছাপ ফেলে গেছে!

1576

61

শিবাংশু

বাইশ বেলা

কোথা যে উধাও হলো পরস্বপর শ্রাবণ বায়োস্কোপ অপেক্ষায় আদুল গায় রাত কাটলো পথে সারা জনম বাইশ বেলা ও মোর দরদিয়া .... https://www.youtube.com/watch?v=2TfkSI2WAqs&fbclid=IwAR3Oyr_B-EweQJA7uD26bRNnkFv_-i4sNb4yyIBiK5jkAGS1T5EpBuWlqYc

108

3

Aloka

যা দেখি যা শুনি

দায়্টা কার ? অসময়ে বেল....এখন আবার কে এলো.....ভাবতে ভাবতে দরজা খুলি| "বাড়িতে সবাই সুস্থ..কারুর জ্বর হয় নি.....কোথাও জল জমে নেই"...| তারা জিজ্ঞাসা করার আগেই বলি | তারাও হাসে আমিও হাসি | এই তারা হল দুটি অল্প বয়সী মেয়ে ‚একজন বিবাহিত আর এক্জন অপেক্ষাকৃত কম বয়েস অবিবাহিত| মিউনিসিপালিটি থেকে এসেছে | মাসে একবার করে আসে বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার উপায় হিসেবে এই খোঁজ খবর নেওয়া মিউনিসিপালিটির উদ্যোগ| উদ্দেশ্য সাধু সন্দেহ নেই তবে কতটা ফলপ্রসূ সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে| ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় হিসেবে সরকারী প্রচারে অন্যান্য নানা করণীয় র মধ্যে বাড়ীতে জল জমতে না দেওয়া এমন কি ফুলদানীর জল রোজ পাল্টানো ‚ এমন বিধি ও আছে| এখানেই আসে সচেতনতার প্রশ্ন | এই কাজগুলো ত এমন কিছু কঠিন না ‚ সময় বা পরিশ্রমসাধ্যও নয় শুধু দরকার একটু সদিচ্ছা বা সচেতনতা | গভর্ণমেণ্ট এর পক্ষে একা এর মোকাবিলা করা কখনই সম্ভব নয় | এই যে মেয়েদুটি এসেছিল তাদের পক্ষে ত ঘরে ঘরে ঢুকে দেখা সম্ভব নয় | অথচ আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের মধ্যে এই সচেতনাতার খুব অভাব একমাত্র উপায়| খুব ছোট থেকে এই গুলো ই ছোটদের মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে দেওয়া | বিশেষ করে এখন পরিবেশ দূষণ রোধে ছোট ছোট কাজ অনেক কিছু করতে পারে | প্রশনটা হল তাদের শেখাবে টা কে ? সম্প্রতি দুটো ঘটনায় কথাটা আরও মনে হল ঘটনা ১ বাসে করে যাচ্ছিলাম |হঠাৎই কানে এল সামনের সিটে বসা একটি বাচ্চা ‚ কতই বা বয়্স হবে ৬/৭ বছর হয়্ত‚ হাতে একটা লজেন্স এর মোড়ক জাতীয় কিছু ধরা.পাশে বসা মহিলাকে বলছে মা এই কাগজ টা কোথায় ফেলব ? মোবাইলে মগ্ন মায়ের উত্তর...ফ্যাল না এখানেই ফ্যাল ঘটনা ২ একদিন সন্ধের মুখে পাড়াতেই বেরিয়েছিলাম |বৃষ্টি এল |সন্গে ছাতা ছিল না | দাঁড়ালাম বড় রাস্তার ওপরেই একটা দোকানের শেডের নীচে| দোকান তখনো খোলে নি |শেডের নীচেটা বেশ খানিকটা বাঁধানো পরিষ্কার পরিচ্ছ্ন্ন বেশ ছিমছাম| ফাঁকা| দুটি ছেলে এলো | কি আর করি গল্প জুড়লাম তাদের সাথে| জানলাম দুজনেই ক্লাস ইলেভেন এ পড়ে |টিউশন থেকে ফিরছে | এক্জন রোল জাতীয় কিছু খাচ্ছিল| খাওয়া শেষ হতেই কাগজ টা ছুঁড়ে ফেলল ওখানেই| হাসতে হাসতেই বল্লাম এটা কি হল ? ( বুঝে গেছিলাম দুর্বিনীত নয়..|বলা যায় ) একটু ক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে ব্যাপারটা বুঝল বোধ হয়...|কাগজ টা তুলে নিল..বৃষ্টি থেমে গেছিল তারা চলে গেল ঘটনা দুটো খুবই তুচ্ছ...কিন্তু প্রশ্নটা হল শিক্ষা বা বোধের এদের শেখাবে কে ....দায়্টা কার ?

232

8

Ranjan Roy

আগুনখাকী ঃ ছোটগল্প রঞ্জন রায়

আগুনখাকী (১) কিছুদিন হল ছত্রিশগড়ের এই শিল্পনগরীর স্কুল নাম্বার সেক্টর ফোর এ বদলি হয়ে এসেছি। এমনি এমনি নয়, রীতিমত প্রমোশন নিয়ে। চারবছর আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম, প্রথম পোস্টিং প্রোজেক্ট এরিয়ার স্কুল নাম্বার নাইনে । অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার । দায়িত্ব প্রাইমারী লেভেলে ইংরেজি পড়ানো। কাজটা ভালো লাগত। বাবার আপত্তি ছিল । উনি এই স্টিল প্ল্যান্টেই রোলিং মিল ম্যানেজার। পিতা-পুত্রী একই অরগানাইজেশনে চাকুরি করিবে, ইহা কেমন কথা? আসলে বাবার ভয় ছিল যে ওঁর আদরে বাঁদর হওয়া বেয়াড়া মেয়েটি চাকরি করতে গিয়ে এমন কিছু বখেড়া খাড়া করবে যে হাই লেভেলে কম্পপ্লেন হবে আর পিতৃদেবকে জবাবদিহি করতে হবে। আমি চটে গিয়ে বলেছিলাম যে ফর্মে বাবার নাম না লিখে মা’র নাম লিখব। বাবা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন যে কোন লাভ নেই । কারণ সবকটা সার্টিফিকেটে বাবার নাম লেখা আছে । বাবার রিটায়ার হতে এখনও বছর পাঁচ দেরি আছে। ওহ, দিস প্যাট্রিয়ার্কি! আমাদের কোয়ার্টার সেক্টর ফোরে, বেশ বড় বাগান। বাগানে দোলনা, ফেন্সিংয়ে সবুজ গাছ ও লতাপাতা। নিয়মিত মালী আসে; এককোণায় সার্ভেন্ট কোয়ার্টার; সামনে অফিসের জীপ দাঁড়িয়ে থাকে। আর আমি এই সেক্টর ফোরের স্কুল থেকেই হায়ার সেকন্ডারি পাশ করেছিলাম। গ্র্যাজুয়েশনের পরে মাস্টার্স না করে বি এড করলাম, আমি টিচার হতে চাই। বাবা-মা’র মতে মেয়েদের জন্যে সেটাই নাকি সবচেয়ে ভালো জীবিকা; মার মতে নিরাপদও বটে। সে যাই হোক, খুব খাটতে লাগলাম। আমার প্রাক্তন টিচার খোসলা ম্যা’ম আমাকে কাজ শেখাতে লাগলেন-- লেসন প্ল্যানিং, ইউনিট ভাগ করে টাইম লাইন সেট করা, ইউনিট টেস্টের কোশ্চেন পেপার বানানো, তাতে মার্কস ডিস্ট্রিবিউশন এই সব। ধীরে ধীরে আমার ঘাড়ে এসে পড়ল হোমটাস্কের খাতাগুলো চেক করে দেওয়া—শুধু আমার ক্লাসের নয়, খোসলা ম্যামেরও। ছ’মাস কেটে গেল। উদয়াস্ত খাটি, প্রশংসা পাই, মন গর্বে ভরে ওঠে। আমার সঙ্গে জয়েন করেছিল আরও দু’টি মেয়ে। জয়তী ঘোষ ও রোজালিন লাল। জয়তী বাঙালী আর রোজালিন স্থানীয় ক্রিশ্চান। জয়তী ছটফটে, মুখে একটা আলগা হাসি,রোজালিন শান্ত, খুব কম কথা বলে। জয়তী বাচ্চাদের ক্লাসে খুব পপুলার, ও যখন ক্লাস নেয়, বাচ্চাদের হৈচৈ দুটো ক্লাস দূর থেকে শোনা যায়। আর রোজালিনের ক্লাসে টিচার আছে কি নেই , তাই বোঝা মুশকিল। তবে হরদম ওর ক্লাস থেকে কিছু বাচ্চা বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে দেখতে পাই। আমরা তিনজন একসাথে লাঞ্চ করি। আমি জয়শ্রী বেদুলা তেলুগু ব্রাহ্মণ--ভেজিটেরিয়ান। আর বাঙালী জয়তী এবং ক্রিশ্চান রোজালিনের লাঞ্চবক্সে ডিম বা চিকেনের পিস থাকেই, কখনও বা ফিশ। তা থাকুক গে, আমার কোন অসুবিধে হয় না । জয়তীর মুখে নন-ভেজ জোকস ও অন্য টিচারদের নিয়ে নানান খাট্টা-মিঠা মন্তব্য লেগে থাকে। আমি মুচকি হাসি, রোজালিনের মুখে কোন ভাব খেলে না । রোজালিন বিবাহিত, ওর হাজব্যান্ড জোসেফ স্টিল প্ল্যান্টে চার্জম্যান গ্রেড ওয়ান। একদিন কুমারী মায়ের গর্ভধারণ নিয়ে জয়তী কিছু বলতেই রোজালিন কাতর মুখে হাত তুলল। --প্লীজ ঘোষ, লীভ গড এ্যালোন ! ইয়ু ওন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড। - আরে, এত সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন? আমাদের হিন্দুদের পুরাণেও কুমারী কুন্তীর সন্তান হওয়ার কথা আছে। তার ফলে মহাবীর কর্ণ জন্মাল। তেমনি জোসেফ বোধহয় ইম্পোটেন্ট ছিলেন, তাই কুমারী মেরির সন্তানের উনি পিতা। এতে আশ্চর্যের কী আছে? -- লীভ জোসেফ ট্যু! --হোয়াই? আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল। আমি না হেসে গম্ভীর মুখে বললাম—বিকজ, জোসেফ ইজ দ্য নেম অফ হার হাজব্যান্ড। --ইজ ইট? ইজ ইট! সরি রোজালিন, এক্সট্রিমলি সরি । আই ডোন্ট ইন্টেন্ড টু বি পার্সোনাল। ঘোষ হেসে গড়িয়ে পড়ে । এবার রোজালিনও হাসে। --ইট’জ অলরাইট; নো অফেন্স টেকেন। বিকজ আই হ্যাভ নট ওয়ান বাট টু বিউটিফুল চাইল্ড ফ্রম মাই জোসেফ। জয়তী ঘোষ চোখ গোল গোল করে নকল বিস্ময়ে ওকে দেখে। --তুমি দুই বাচ্চার মা ? এই বয়সেই? পেটে পেটে এত! দেখলে তো মনে হয় ভাজামাছটি উলটে খেতে জান না। রোজালিন লজ্জায় লাল। আমি বলি—এবার ওকে ছাড়ান দাও। দেখছ না ও ওর বরকে কত ভালবাসে ! জয়তীর ছ্যাবলামি থামে না । --তার মানে ওরা সব ভালবাসার ফসল, জোর-জবরদস্তির নয়। হাউ লাকি ইয়ু আর ! উত্তরে রোজালিন হাতজোড় করে। এবার ঘোষ আমাকে নিয়ে পড়ে । বলে আমি নাকি হদ্দ বোকা। সিনিয়র টিচার খোসলা নাকি আমাকে ইমোশনালি এক্সপ্লয়েট করছেন। কাজ শেখানোর নামে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস নিজের হোমটাস্ক চেকিংয়ের বোঝা আমার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজে মজা মারছেন। আমার এসব কথা আদৌ ভাল লাগে নি। রেজিস্টার তুলে নিয়ে লাঞ্চরুম থেকে বেরিয়ে যাই। একদিন মিসেস আলুওয়ালিয়া, মানে আমাদের হেড মিস্ট্রেস রাউন্ডে বেরিয়ে ক্লাসের সামনে বাচ্চাদের বারান্দায় এক্কাদোক্কা খেলতে দেখে ওদের নিয়ে ক্লাসে ঢুকে দেখলেন রোজালিন ওর টেবিলে ঝুঁকে একমনে খাতা চেক করছে। পাতা ওল্টাচ্ছে আর লাল পেন্সিলে দাগ দিয়ে চলেছে। ক্লাসরুমের পেছন দিকের জানালার ওপর তিনটে বাচ্চা চড়ে বসে গল্প করছে। লাস্ট বেঞ্চ ও দেয়ালের মাঝের খালি জায়গায় দুটো বাচ্চা জাপটা -জাপটি করে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে , বাকিরা হাততালি দিয়ে দুই খুদে কুস্তিগীরদের উৎসাহ দিচ্ছে। রোজালিন শশব্যস্ত হয় উঠে দাঁড়াল এবং কিন্তু কিন্তু করে জানাল যে বারান্দার বাচ্চারা সবাই ওর পারমিশন নিয়ে ছোট- বাইরে সারতে গিয়েছিল। আলুওয়ালিয়া ম্যাম ঠান্ডা গলায় বললেন -- এতগুলো বাচ্চাকে একসঙ্গে বাথরুমের জন্যে ছুটি দেওয়া? আর ওরা ক্লাসে ফিরে এলো কি না সেটা কে দেখবে? উনি এটাও বললেন যে খাতা ফ্রি-পিরিয়ডে চেক করাই ভাল এবং লোয়ার ক্লাসগুলোতে টিচারের স্থান চেয়ারে নয়, বাচ্চাদের মাঝখানে। রাইটিং টাস্ক কম করে সঙ ও রাইমের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে ভাল হয়। উনি যখন পরের ক্লাসরুমে, মানে মিস ঘোষের ক্লাসে পৌঁছুলেন ততক্ষণে জয়তী সবাইকে শান্ত করে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ কোরাস গাইতে লাগিয়ে দিয়েছে। ব্যস, হেডমিস্ট্রেস হাইলি ইম্প্রেসড। তারপর আমার ক্লাস। আমি মন দিয়ে তিন ডিজিটের নাম্বারকে দুই ডিজিট দিয়ে মাল্টিপ্লাই করা শেখাতে ব্যস্ত ছিলাম। উনি কখন ঢুকেছেন টের পাইনি। কিন্তু গোটা ক্লাসের একসঙ্গে উঠে দাঁড়ানোর শব্দে ফিরে দেখি চশমার ফাঁক দিয়ে ওঁর চোখ হাসছে। উনি দাঁড়ালেন না, তবে ‘ক্যারি অন’ বলে বেরিয়ে যাবার আগে আমার দিকে ফিরে বললেন ক্লাসের পরে ওঁর চেম্বারে যেতে। দশ মিনিট কাটল। বেল বাজতেই আমি হ্যান্ডব্যাগ তুলে তাড়াহুড়ো করে বারান্দা পেরিয়ে ওঁর চেম্বারে ঢুকলাম। ম্যামের সামনে টেবিলের উপর রাখা কিছু খাতা দুটো আলাদা ভাগ করে রাখা। একটা খাতা তুলে উনি আমার দিকে মেলে ধরলেন, -- তোমার সিগনেচার? তোমার হ্যান্ড রাইটিং ? --ইয়েস ম্যাম। এনিথিং রং ? এনি মিস্টেক ম্যাম? উনি উত্তর না দিয়ে অন্য ভাগের থেকে আরেকটি খাতা তুলে বললেন—দিস রাইটিং অলসো সিমস টু বি ইয়োরস; ইজন’ট ইট? আমার গলা শুকিয়ে গেছে। শুধু ঘাড় কাত করি। --বাট ইট বিলংস টু ক্লাস এইট। সো? আমি কিছু বলি না । উনি চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখেন। তারপর বলেন, ‘শোন, একটা বেনামী কমপ্লেইন এসেছে। তোমাকে নাকি এক্সপ্লয়েট করা হচ্ছে। একজন সিনিয়র টিচার জোর করে তোমাকে দিয়ে ওঁর হোমটাস্কের খাতা চেক করাচ্ছেন। তুমি কিছু বলবে? --ম্যাম, আমি মিসেস খোসলার পুরনো স্টুডেন্ট। উনি আমাকে কাজ শেখানোর জন্যে কপি চেক করাচ্ছেন। কোন জোর-জবরদস্তি না । আমি হ্যাপিলি এই দায়িত্ব নিয়েছি। আমার লাভ হয়েছে। আলুওয়ালিয়া ম্যাম আমাকে কড়া চোখে জরিপ করে বললেন-বেশ, মনে হচ্ছে তুমি নতুন নতুন দায়িত্ব নিতে ভালবাস। তোমাকে একটা নতুন দায়িত্ব দিতে চাই; এগজামিনেশন ইনচার্জের। দু’মাস পরে হাফ ইয়ার্লি এগজামের সময়। আর ইউ ওকে? রেডি টু টেক দ্য রেস্পন্সিবিলিটি? ইনভিজিলেশন ডিউটি এলটমেন্ট, কোশ্চেন পেপার ডিস্ট্রিবিউশন, ওভার অল প্ল্যানিং, সিকিউরিটি এন্ড সিক্রেসি—এভরিথিং উইল বি ইওর রেস্পন্সিবিলিটি। আমি শ্লথপায়ে বেরিয়ে আসার সময় উনি পেছন থেকে বললেন—আর তোমাকে অন্য ক্লাসের খাতা চেক করতে হবে না । নোটিস বেরোনোর পর স্টাফরুমে হৈ চৈ পড়ে গেল। কয়েকজন এসে আমাকে কংগ্র্যাটস বলে গেল। তিনজন সিনিয়র টিচার আমাকে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ফিরে গেলেন। খোসলা ম্যাম হেসে বললেন –দেখলে তো! আমার কথা শুনে চলে কেমন লাভ হল? আমিই তোমার নাম রেকমেন্ড করেছিলাম। দুজন টিচার বললেন কাজটা কঠিন। কোন অসুবিধে হলে বলবে, আমরা আছি । বিকেলে ফেরার পথে জয়তী বলল—কাল আমার জন্যে সাম্ভার-বড়া আর উত্তপম ঘর থেকে বানিয়ে আনবি। আন্টিকে বলবি যে রসম আর সাম্ভার যেন উনিই রান্না করেন। --- কিস খুশি মেঁ? ---- পুছো, পুছো! হ্যায় কোই বাত। কনফিডেনশিয়াল। মাইরি বলছি। বলব, কিন্তু তোদের আগে দিব্যি গালতে হবে যে কথাটা পাঁচকান হবে না । আমি বললাম ঠিক আছে, কিন্তু রোজালিন কিছু না বলে কেমন অবোধ গরু-গরু চোখে তাকিয়ে রইল। --কী রে রোজালিন? কসম খেতে কোন অসুবিধে আছে? -- কিসের দিব্যি? -- তোর প্রাণপ্রিয় জোসেফের। -- দ্যাখ, গড, ভার্জিন মেরি, ক্রশ, স্বামী, বাচ্চা –এদের নিয়ে কসম খাওয়া ঠিক নয়। এই যে তুমি মাইরি বললে ওটাও আসলে ‘ মা মেরি’র কসম থেকে এসেছে। এসব আমার পছন্দ নয়। --উঃ , এমন মাদার তেরেসাকে নিয়ে যে কী করি! আচ্ছা, কোন কসম নয়, শুধু আমার গা ছুঁয়ে কথা দে; তাহলেই হবে। আমরা দুজনেই জয়তীকে ছুঁয়ে ওর চোখের দিকে তাকালাম। সে চোখে দুষ্টুমি নাচছে। --দ্যাটস ইট; ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান। আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। --হয়েছে , হয়েছে। সেই গোপন কথাটি কী? -- যে সিক্রেট কমপ্লেইন এর জোরে তোর খোসলা ম্যামের বেগারি থেকে ছুটকারা হল, কপাল খুলে গেল, সেটা আমিই পাঠিয়েছিলাম। ভাইয়ের কম্প্যুটার থেকে টাইপ করে আর পাড়ার আউটলেট থেকে প্রিন্ট আউট বের করে। আমাদের গলা শুকিয়ে গেছে। যদি ধরা পড়ত! ও আমাদের নীরব প্রশ্ন অনুমান করে বলল -- ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । সব প্রিকশান নিয়েছি। চিঠিটা একফাঁকে হেডমিস্ট্রেসের টেবিলে রেখে দিয়েছিলাম। জয়তী কোন কাজে আগুপিছু না ভেবে এগোয় না – সে বেনামী চিঠিই হোক বা ডেটিং । আমাদের দুষ্টু হাসিতে রোজালিন যোগ দিল না । (২) একটা অ্যাকাডেমিক ইয়ার পেরিয়ে গেল। আমাদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের দোস্তি বরকরার রয়েছে এবং আরও পাক্কি হয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা গোটা স্কুলের নজরে এসেছে। আমার পরীক্ষার ইনচার্জ হওয়া নিয়ে একটা আঁধি উঠেছিল। প্রথম তিনদিনের পরীক্ষার পর কিছু বান্ডিল থেকে দুটো-তিনটে করে আন্সারশীট গায়েব হয়ে গেছল। আমার হাত-পা ঠান্ডা হবার জোগাড়। এদিকে সমস্ত ক্লাসরুম থেকে সব ইনচার্জ সাইন করে পুরো বান্ডিল জমা দিয়েছিলেন, সঙ্গে অ্যাটেন্ডেস শীট। আমি নিজে চেক করেছিলাম। জয়তী বলল, ঘাবড়াও মৎ, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি –সব ঠিকঠাক হ্যায় । --সে তো না হয় বলে দেব, তারপর? -- ম্যাঁয় হুঁ না ? দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেয়ালেরও বোধহয় কান আছে, অন্ততঃ আমাদের স্কুলবাড়ির দেয়ালের। হেড মিস্ট্রেস একদিন ডেকে পাঠালেন। কড়া চোখে জানতে চাইলেন খাতাপত্তর সব ঠিক আছে কী না । আমি আশ্বস্ত করলাম যে শেষ দিনের পরীক্ষার পর ওঁকে সব বুঝিয়ে দেব। আর মাত্র দু’দিন বাকি। খাতার বান্ডিলের হিসেব মিলছে না । কী যে করি! চেপে ধরলাম জয়তীকে। কী হল মুশকিল আসানের? ওর ভরসায় তো ছিলাম। এবার জয়তীর মুখেও দেখছি চিন্তার ছাপ। বলল—আভি ভী খেল বাকি হ্যায়। হাতে আছে দু’টো দিন। ভরসা রাখ। আরও একটা দিন কেটে গেল। বিকেলে ও আমাকে বলল—আমার উপর ভরসা আছে তো? তোর ড্রয়ারের ডুপ্লিকেট চাবিটা দে। কোন ভয় নেই। পরের দিন একটু আগেই স্কুলে গেলাম। লাঞ্চের পর প্রিন্সিপাল আলুওয়ালিয়া ম্যামের কাছে গিয়ে সমস্ত আন্সারশিটের বান্ডিল তার ট্যালি লিস্ট শুদ্ধু জমা দিতে হবে। ড্রয়ার খুলে চোখ ছানাবড়া! সমস্ত গায়েব শিটগুলো আমার ড্রয়ারে হাজির; সঙ্গে সাবজেক্ট, পরীক্ষার তারিখ ও ক্লাসের নাম লেখা স্লিপ লাগানো। যথাসময়ে সবকিছু ঠিকঠাক জমা হয়ে গেল। অনেক জেরা করেও জয়তীর কাছ থেকে ‘উত্তরপত্র অন্তর্ধান রহস্য’ ভেদের গোপন ফর্মূলা জানতে পারি নি। ও বলত কিছু কিছু ব্যাপার গোপন থাকাই ভাল। আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কোন বাংলাগানের এক কলি গুনগুনিয়ে উঠত—আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলংকভাগী। অনেক পরে আমাকে বলেছিল—একটা টিপস দিচ্ছি। স্কুলের ফোর্থ গ্রেড স্টাফের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখবি, হোলি-দিওয়ালিতে মিষ্টির বাক্স দিবি। মাঝে মাঝে ওদের পরিবারের কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করবি। দেখবি, অনেক প্রবলেম সল্ভ হয়ে যাচ্ছে। তারপর ফিল্মি কায়দায় বলল—ডোন্ট আন্ডার- এস্টিমেট দ্য পাওয়ার অফ কমনম্যান! ৩) অ্যাকাডেমিক সেশন শেষ হবার মুখে। আমি অ্যানুয়াল এগজামিনেশন পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়াতে এবার কেউ কোন প্রশ্ন তুলল না। যেন এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু পরীক্ষার প্রথম দুটো দিন যেতে না যেতেই একটা সমস্যা মাথা চাড়া দিল। রোজালিন স্কুলে দেরি করে আসছে। এমনটা হয় না। আমি প্রত্যেক ক্লাসে দু’জন করে ইনভিজিলেটর দিয়েছি। ওর ক্লাসে আরেকজনকে প্রথম দশ মিনিট, মায় অ্যাটেন্ডেন্স ও কোশ্চেন পেপার দেওয়া অবধি দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে। রোজালিন লাল। আমাদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের সবচেয়ে নির্বিবাদ সবচেয়ে শান্তশিষ্ট সদস্য। আমাদের মধ্যে ও কেমন যেন বেমানান। ওকে ঠিক যোদ্ধা বলা যায় কি? জয়তী ড্যাম গুড ফাইটার। ও জানে যে এই দুনিয়াটা একটা লড়াইয়ের ময়দান, আর বেশির ভাগ পুরুষ হল হারামির হাতবাক্স। এই অসম লড়াইয়ে জিততে হবে। তাই ও জানে ‘হাউ টু ফাইট ডার্টি’! আমি অন্যভাবে বড় হয়েছি। যতদূর সম্ভব ফেয়ার প্লে আর পারদর্শিতায় বিশ্বাসী। রোজালিন বিশ্বাসী পরম করুণাময় ঈশ্বরের ন্যায়বিচারে। ওর কাছে মাতা মেরী, হোলি ট্রিনিটি এবং ওর স্বামী জোসেফ সমস্ত সমালোচনার উর্দ্ধে। ওর জীবনযাত্রা আমাদের চোখে একটু একমেটে, একঘেয়ে। তা হোক গে, ও নিজের মত করে ‘হ্যাপি’ আছে। সেটাই কি যথেষ্ট নয়? ও আমার কাছে একটু খোলামেলা। নিজের ঘরের অনেক কথা বলে। কোন সমস্যা হলেও আমাকে বলে, জয়তীকে নয়, যদিও জয়তী আমাদের আসল মুশকিল আসান। হয়ত ও জয়তীর প্রগলভতাকে ভয় পায়। কখনও যদি ওর বিশ্বাসের আগল ভেঙে যায়! এভাবেই জানতে পেরেছিলাম যে ওর স্বামী জোসেফ অসুস্থ, চারমাস ধরে ডিউটি যেতে পারছে না। ছুটি অনেকদিন হল শেষ হয়ে গেছে। লীভ উইদাউট পে! টানাটানি বাড়ছে। আমার থেকে একটু একটু করে ধার নিয়েছে রোজালিন; প্রথম প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দিয়েছে, এখন আর পারছে না। তবু আমি দিচ্ছি, দিতে হচ্ছে। আমার তো কোন সাংসারিক দায়িত্ব নেই। আর জোসেফ সেরে উঠে কাজে যোগ দিলে সবটা রোজালিন শোধ করে দেবে। এখন যে ওর বড় দরকার। আর আমি ওকে বড্ড ভালবাসি। ওর সরল বিশ্বাস, ওর এই অসহায় ভাব—সব আমাকে টানে। আমি ওকে আগলে রাখতে চাই। ইদানীং ওর কপালে ভাঁজ, পোষাকে অযত্ন আর চোখের কোনে কালি আমাকে ভাবাচ্ছে। অনেক করে বলায় জানলাম যে ওর ছোটবোন সিলভিয়াকে ও বিলাসপুর থেকে এখানে আনিয়ে নিয়েছিল। সিলভিয়া খুব কাজের মেয়ে, চটপটে। অসুস্থ জামাইবাবুর সেবাযত্ন, দিদির দুই ছোট বাচ্চাকে সময়মত নাইয়ে খাইয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে স্কুলে পাঠানো –সব সুন্দর করে করছিল। জোসেফ সেরে উঠছে, তবে এখনও ডিউটি যাবার মত হয় নি। রোজালিন ওর বোনকে একটা স্থানীয় কোচিং ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছিল। যাতে ও আগামী সেশনে উচ্চ মাধ্যমিক দিতে পারে। কিন্তু কাল ওই কোচিং থেকে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিল। সিলভিয়া গত দেড়মাস ধরে টিউটোরিয়ালে যায় নি। অথচ ও তো রোজ তৈরি হয়ে প্রায় রোজালিনের সঙ্গে একই সময়ে কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে যেত। কোথায় যেত? সিলভিয়া কোন উত্তর দেয় না, খালি কাঁদে। মুখ খুলল জোসেফ। সিলভিয়াকে বকতে হবে না। ওকে নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ও টিউটোরিয়ালের টিচিং ফলো করতে পারছিল না। তাই আমি ওকে পড়াচ্ছি। দেখবে, ও ঠিক পাশ করে যাবে। তাই? তাহলে আমাকে বলিস নি কেন সিলভি? খামোকা কোচিং এর জন্যে কিছু টাকা বরবাদ হল । সিলভিয়া দিদিকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদে। দিদি গো, তুমি খুব ভাল। আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি বকবে বলে। বকব কেন? না, মানে জোসেফ জীজাজির শরীর ভাল নয়। ওঁর উপর বেশি চাপ না পড়ে! রোজালিন নিশ্চিন্ত হল; সত্যিই হল কি? আজকে ছিল ম্যাথসের পেপার। রোজালিনের দেখা নেই। আমি গিয়ে ওর ক্লাসে হাত লাগালাম। পরীক্ষা শুরু হল । প্রায় আধঘন্টা পরে রোজালিন এল। এ কি চেহারা! চোখের পাশে নীল হয়ে ফুলে উঠেছে। ফোলা ঠোঁটে রক্তের দাগ! আমি বললাম, রোজালিন, তুমি আজ ছুটি নাও। এই চেহারায় ডিউটিতে নিতে পারব না। বাড়ি যাও। বাড়ি যাওয়ার কথায় চমকে উঠল রোজালিন। প্রাণপণে মাথা নাড়তে লাগল। --ঠিক আছে, ওয়াশ রুমে গিয়ে নিজের চেহারা ঠিক করে নাও। আর স্টাফ রুমে গিয়ে বস। পরীক্ষার পর আমরা কথা বলব। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হলে আমাকে ডেকে পাঠালেন প্রিন্সিপাল ম্যাম। --দিস কান্ট গো অন। তোমার বন্ধু, কিন্তু এ ভাবে ডিউটি করা যায় না। আই ওয়ন্ট অ্যালাউ। আমরা ওকে শো-কজ করব। --ম্যাম, একটা চান্স দিন। ওর একটু ফ্যামিলিতে প্রবলেম চলছে। আমি নিজে কথা বলব। -- লাস্ট চান্স। উই অল হ্যাভ সাম প্রব্লেমস। বাট ইফ শী ডাজ’ন্ট মেন্ড হার ওয়েজ, ওয়েল , ইউ নো। স্টাফ রুম থেকে ওকে ডেকে নিলাম। বাড়ি যাবার পথে সব শুনব । এই সময়ে কোত্থেকে হাজির জয়তী। আমি একটু অপ্রস্তুত; খেজুরে করে বললাম যে আজ রোজালিনের সঙ্গে একটু কথা আছে। --ননসেন্স ! ‘অল ইজ ফর ওয়ান, ওয়ান ইজ ফর অল’,--ভুলে গেলি! -- না মানে ওর কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা— ঝাঁঝিয়ে উঠল জয়তী। --যে কথাটা ওর গোটা পাড়া জানে সেটা প্রাইভেট এন্ড কনফিডেন্সিয়াল! দিস ইজ হাইট! -- মানে? -- মানে শী ইজ এ সেন্টিমেন্টাল ফুল! সেইজন্যেই ভুগছে, ঠকছে। চিটেড। -- কে চীট করেছে? -- পতিদেব অউর বহন। গ্রেট জোসেফ এন্ড সিলভি। ভেঙে পড়ে রোজালিন, দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুলে ফুলে কাঁদে। আমি শকড, রোজালিন খালি কাঁদে; জয়তী একটু একটু করে খোলসা করে। সিলভিয়া প্রেগন্যান্ট। এখন অ্যাবর্শন সম্ভব নয়, দেরি হয়ে গেছে। গোঁড়া রোমান ক্যাথলিক রোজালিনের চোখে অ্যাবর্শন পাপ। তাই জোসেফ ওকে বিয়ে করে নেবে বলেছে। এদিকে জোসেফের চাকরি চলে গেছে। ওর ডিপার্টমেন্ট থেকে চিঠি এসেছিল যে ওকে আর ছুটিতে থাকতে হলে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে হাজির হয়ে ওদের রেকমেন্ডেশন পেতে হবে, নইলে ডিউটি জয়েন করতে হবে। জোসেফ কোনটাই করল না। এই নিয়ে আজ সকালে কথা কাটাকাটি, জোসেফ রোজালিনের গায়ে হাত তোলে—দুই বাচ্চা ও বোনের সামনে। রোজালিনের ইডেন গার্ডেনে এখন স্যাটানের রাজত্বি। জয়তী জোর করে আমাদের দু’জনকে নিয়ে রোজালিনের বাড়ি যায়। দুটো বাচ্চা দৌড়ে এসে ওদের মাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর আমাদের দেখে সরে গিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। জয়তী সোজা ওদের বেডরুমে ঢুকে পড়ে। ঠেট হিন্দিতে জোসেফকে বলে যে রোজালিনের গায়ে যদি আরেকবার হাত তুলেছে তো ওর ঠাঁই হবে শ্রীঘরে। আর তাতে নাবালিক শালীকে রেপ এর চার্জ আনা হবে। জোসেফ বুলি ও কাওয়ার্ড। প্রথমে শের হবার চেষ্টা করলেও ভেতরের শেয়াল সহজেই বেরিয়ে এল। হাত জোড় করল, রোজালিনকে চুমো খেয়ে আমাদের কথা দিল যে এমন ভুল আর হবে না। পরের দুটো সপ্তাহ ভাল ভাবে কেটে গেল। রোজালিন অনেক ধন্যবাদ দিল জয়তীকে। বলল জোসেফ প্রপারলি বিহেভ করছে। প্রিন্সিপাল শো-কজ দেন নি। ঈশ্বরের দুনিয়ায় সব ঠিক ঠাক চলছে। আমি জয়তীকে বললাম-অংক কী সোজা রে ভাই! তারপর আজকের দিন। আবার রোজালিন আসে নি। কোন ফোনও নয়। শরীর খারাপ হোল নাকি? আমার ডানদিকের চোখের পাতা নাচছে কেন? জয়তী বলল যে এত ভাবার কী আছে? আমরা না হয় লাঞ্চ ব্রেকের সময় স্কুটিতে করে ওর বাড়ি ঘুরে আসব। কিন্তু সেকেন্ড পিরিয়ড শেষ হবার আগে একটা পুলিশের জীপ এসে স্কুলের কম্পাউন্ডে ঢুকল। দুজন অফিসার প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে বসলেন আর আমাদের দুজনের ডাক পড়ল। আমাদের এক্ষুণি ওদের সঙ্গে রোজালিনের বাড়িতে যেতে হবে। কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ওর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই দূর থেকে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখা গেল। ভেঙে পড়েছে লোকজনের ভিড়। আমরা দুজন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। প্রথমে পুরো ব্যাপারটা ফোকাসে আনতে একটু সময় লাগল। বেডরুম ও তার গায়ে লাগা রান্নাঘরের আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু এখনও কালো ধোঁয়া উঠছে। দমকলের একটা গাড়ি বাগানের ফেন্সিং ভেঙে ভেতরে গিয়ে হোস পাইপ দিয়ে আগুন সামলেছে। এখন মাত্র দুজন একটা কোণায় জল স্প্রে করে চলেছে। কোয়ার্টারের লাগোয়া বাগানের জমি জলে ভেসে কাদা হয়ে রয়েছে। প্রথমে পাড়াপড়শির দল বোধহয় নিজেরা আগুন নেভাতে চেষ্টা করেছিল। কিছু কিছু বালতি এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। রোজালিন ও বাচ্চারা কোথায়? বাড়ির দরজাটা ভাঙা হয়েছে, জানলা ও দরজার পোড়া কাঠ থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। বারান্দায় সাদা কাপড়ে ঢাকা দুটো শরীর। একটা অ্যাম্বুলেন্স রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে। বাড়ির উঠোনে একটা গাছের নীচে সিমেন্টের বাঁধানো চাতালে বসে আছে রোজালিন, পাশে দুজন মহিলা পুলিশ। এরমধ্যে পুলিশ অফিসার আমাদের খানিকটা ব্রিফ করেছেন। রোজালিন নিজেই থানায় ফোন করে। ওঁরা ফোর্স নিয়ে এসে দেখেন দুটো ঘর থেকে আগুন জ্বলছে। কিন্তু বেডরুমের দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ। আঙিনায় রোজালিন তার দুইবাচ্চাকে আঁকড়ে ধরে ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে। বাচ্চাগুলো থরথর করে কাঁপছে। কে তালা লাগিয়েছে? চাবি কার কাছে? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলে ওরা কেঁদে উঠে মাকে দেখায়। রোজালিন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ভেতরে কে আছে? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের বাবা কই? রোজালিন উত্তর দেয় না। বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলে ওরা তালাবন্ধ ধোঁয়া ওঠা ঘরের দিকে আঙুল দেখায়। অনেক কষ্ট করে দরজা ভাঙা হয়, কিন্তু আগুনের হলকা ও ধোঁয়ার চোটে ভেতরে ঢোকা যায় নি। দমকল এসে আগুন নেভায়, তখন ভেতর থেকে আধপোড়া দুটো শরীর বের করা হয়। ওরা আগেই দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে। রোজালিন কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল না। অনেকবার জেরার পর জানা গেল যে দরজায় তালা ওই লাগিয়েছিল। দরজা জানলায় স্কুটারের জন্যে রাখা এক জেরিকেন পেট্রল ছিটিয়ে দিয়ে ওই আগুন লাগিয়ে দেয়। কেন? কোন উত্তর নেই। বাচ্চারাও কিছু বলতে পারে নি। শেষে রোজালিন পুলিশ অফিসারকে বলে স্কুল থেকে ওর দুই বন্ধু জয়শ্রী ও জয়তীকে আনিয়ে নিতে। ওদের কাছে ও সব খুলে বলবে। আমরা গিয়ে ওর পাশে বসে ওর হাতে হাত রাখি। কিন্তু ওর কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। ও যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। মহিলা পুলিশ আমাদের বলে – বন্ধুর থেকে জলদি জলদি কথা বার করুন। তারপর ওকে কালোগাড়ি করে থানায় নিয়ে যাব। ক্যা খতরনাক অউরত! অপনে হাথোঁ সে পতি অউর বহনকো জ্বলা দী! জয়তী ওকে হাত তুলে থামায়। তারপর বলে আপনারা একটু সরে বসুন। আমাদের কাজ করতে দিন । আমরা কোন কথা বলি না। শুধু দুদিক থেকে ওর দু’হাত ধরে বসে থাকি। আস্তে আস্তে হাত বোলাতে থাকি। ভাবি, সব তো ঠিক চলছিল, হটাৎ কী হল? রোজালিন যেন আমার অনুক্ত প্রশ্নটি শুনতে পায়। ধীরে ধীরে নীচুগলায় প্রায় বিড়বিড় করে বলতে থাকে। আজকে আমি যখন স্কুলে আসার জন্যে তৈরি হচ্ছি তখন ভাবলাম দুধ গরম করে সিলভিকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে আসি। রান্নাঘর থেকে দুধের কাপ হাতে নিয়ে ওর নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। বাইরে এসে দেখি জোসেফ ওর হাত ধরে টানতে টানতে বেডরুমে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম—এ কী! হাউ কুড ইয়ু? বিফোর মাই ওন আইজ! জোসেফ ফিরে আমাকে দেখল, তারপর ওকে বেডরুমের ভেতর নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আমার মাথাটা ঘুরে উঠল। কখন গেটের তালাটা নিয়ে দরজায় লাগিয়ে দিয়েছি, কখন পেট্রোলের জেরিকেন এনে মাচিস মেরে দিয়েছি—কিছুই মনে নেই। বাচ্চাদুটোর চিৎকারে আমার হুঁশ ফিরল। তখন বন্ধ ঘর দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভেতর থেকে জোসেফ ও সিলভির চিৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু আমার কিছুই মনে হোল না। একটু পরে ওদের চিৎকার বন্ধ হয়ে গেল। পাড়াপড়শীর দল আসতে শুরু করল। তখন পুলিশে ফোন করলাম। রোজালিনের মাথা নুয়ে পড়ল, বিড়বিড় করতে লাগল—হাউ কুড হী? বিফোর মাই ওন আইজ? কালোগাড়িতে ওঠার আগে আমাদের বলল—প্রমিস, ইয়ু উইল লুক আফটার মাই কিডস? প্রমিস, দে উইল বি কেয়ারড? ==============================================

149

7

মনোজ ভট্টাচার্য

হারাধনের একটি ঋদয় !

একটা মজার ঘটনা বলি । মজার মানে কতটা মজার – বলতে পারবনা । কিন্তু মুনিয়া আমাকে বলেই দিয়েছে – শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলার কাহিনী চলবে না ! অথচ বৃদ্ধদের তো দীর্ঘশ্বাসই সঙ্গী । আমাদের এখানে এক চৌধুরী মশাই আছেন । তার বয়েসের নম্বর হোল চুরাশি । আড্ডায় প্রায়শই কেউ না কেউ কিছু-মিছু আনে । সবাই মিলে খাওয়া-টাওয়া হয় । তা আমার হাতে কিছু পড়লে দেড় সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না মুখে যেতে । কিন্তু চৌধুরীবাবুর তা নয় । কোন খাবারই মুখে যায় না ! তবে সেটা অদৃশ্য হয় । কিন্তু কিছু-মিছুটা অদৃশ্য হতে সময় লাগেনা ! – তাহলে যায় কোথায় ? এই চৌধুরীদা – আপনি খেলেন না ? কেউ হয়ত জিগ্যেস করলো । – আমি তো এখন খাই না । ওনার উত্তর । - তাহলে নিলেন কেন ? - বাড়িতে বুড়ি আছে – তার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি ! - একদম অকপট স্বীকারোক্তি । এমন কি তৈলাক্ত বা রসালো কিছু হলেও প্লাস্টিকের প্যাকেটে করে ঢুকে যায় হাতে কাপড়ের থলেতে । - এই নিয়ে নানানজনের নানা রকম অভিমত । কেউ ওনার দাম্পত্য প্রেম নিয়ে ঠাট্টা করে । উনি স্রেফ নির্বিকার চিত্তে বসে থাকেন । আর সাড়ে আটটা বাজলেই – আমার ওপরে যাবার সময় হোল – বলে উঠে পড়ে – মানে পাঁচ তলায় যেতে হবে । বুড়ি অপেক্ষা করছে ! সক্কাল বেলায় একজন ফোন করে জানালো চৌধুরীবাবুকে ও ওনার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এ্যাম্বুলেন্সে করে । পাশাপাশি বেডে শোয়ানো হয়েছে । কিছুদিন আগেই কাছাকাছি একটা নার্সিং হোমে চৌধুরীবাবুকে ভর্তি করা হয়েছিলো । শরীর খুব খারাপ লাগছিল । দেখা গেল – ওনার হৃদয় বেশ চোট হয়েছে । পেস মেকার বসানো হবে । - তা ঐ নার্সিং হোমে তো হবে না । ওনার মেয়ে-জামাই তিনদিন বাদে সেখান থেকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল । আগের দিন আমি গেছিলাম ওনাকে দেখতে । লিফট খারাপ দেখে ফিরে এসেছিলাম । আমি কিন্তু পাঁচতলায় হেঁটেও উঠি । সেদিন আর উঠলাম না । খুব আফশোষ হতে লাগলো । - কেন কাল দেখা করলাম না ! যাই হোক, খবর নিয়ে জানলাম - এবার ওদের এক আত্মিয়র সুপার-স্পেসালিটি হাসপাতাল আছে – রাজারহাটের শেষে – সেখানে পেস মেকার বসানো হবে । - পরের দিন আমরা কজনে – ঐ প্রচন্ড রোদে-গরমে ট্যাক্সিতে করে আট শো টাকা ভাড়া দিয়ে – হাজির হলাম। লোটাস হাসপাতালটা খুব ছোট – সবে তৈরি হচ্ছে । কিন্তু দেখেই বোঝা যায় – এক কালে রোগীদের ভিড়ে ঠাসাঠাসি হবে । ডাক্তার স্বামী-স্ত্রী মিলে তৈরি করছে । ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি – চৌধুরীবাবু ও তার স্ত্রী দুটো বেডএ শায়িত । আগে বলি চৌধুরী বাবুর কথা । ভদ্রলোক এমনিতেই খুব লম্বা । বয়েসের চাপে হয়ত দু-এক ইঞ্চি কমে গেছে – একটা ছোট হাফ প্যান্ট পড়ে বেডের ওপর বসে যেন লুডো খেলবেন ! খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে । আজকেই নাকি লাঞ্চে সবটুকু খেয়েছেন । একদম সেরে গেছেন । আমার আর কোন সমস্যা নেই – একদম ফিট । পেস মেকার বসানোর দরকার নেই ! বুড়িকেও দু একদিনের মধ্যে ছেড়ে দেবে বলেছে । পরশুই বুড়িকে নিয়ে বাড়ি চলে যাবো ! – আমরা গেছি বলে খুব খুশী ! উনি ভাবতেই পারেন নি – আমাদের দেখতে পাবেন ! = আমারও না দেখতে পারার আফসোসটা মিটে গেল । আমরা কিন্তু ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম – সোমবার পেস মেকার বসানো হবেই । ওনার মেয়ে-জামাই থাকবে । সোমবার সন্ধ্যাবেলায় ফোন করতে ওনার মেয়ে জানালো – পেস মেকার বসানো হয় নি । কেন ? – বাবা রাজি হয় নি । আর ডাক্তাররা রোগীর অমতে কোন অপারেশান করবে না । - খুব স্বাভাবিক ! - দুদিন পরেই ওনারা হাসপাতাল থেকে ফিরে আসছেন । - তবে এখানে নয় । চৌধুরীবাবুর মেয়ের বাড়িতে । - কাছাকাছি – পালপাড়ায় । হারাধনের একটি ছেলে সারাতে গেল হৃদয় – পুরনো হৃদয় নিয়েই চলে গেল পালপাড়ায় ! মনোজ

139

3

Kishore Karunik

ছি:

ছি: কিশোর কারুণিক কান পাতলেই শুনতে পাই কান্নার আওয়াজ শিশুর কান্না, নারীর কান্না নির্যাতিত মানুষের কান্না। দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি বাজারে পকেটে পাঁচটাকা কয়েন মন অশান্ত, শরীর অশান্ত অশান্ত সমাজ প্রিয়স্বদেশ।

99

1

Kishore Karunik

চলছে চলবে

ক্লান্তচোখে তাকাতেই হাসিমাখা মুখটি ভেসে উঠলো অট্টরলে সমীরণে আদর দিলো পাখি গাইলো গান নির্ঝর শব্দমালা গুঁমরিয়ে উঠলো অপলক ঝরে পড়া আলোর দিকব্দিক ছুটাছুটি শুরু হলো।

125

1

Joy

আন্দোলন‚ নিরাপত্তা আর আমরা সাধারন মানুষ...

কয়েকদিন ধরে NRS হাসপাতাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে| চিকিৎসা ব্যবস্থা শিকেয় উঠেছে| হাসপাতালে সব পরিষেবা বন্ধ| হাজার হাজার রোগী ও তাদের পরিবার সমস্যায় জর্জরিত| শুরুটা হয়েছিল এক মুমুর্ষু বৃদ্ধ এক রোগীর মৃত্যু কে কেন্দ্র করে| হাসপাতাল ভাঙচুর| জুনিয়র ডাক্তারকে মারধর করা| ঘটনাটা খুবই দু:খজনক ও ঘৃণ্য| এ বিষয়ে কোন দ্বিমত থাকতে পারেনা| হাসপাতালে ভাঙচুর করা ও ডাক্তারকে মারধর কোন সভ্য মানুষ করতে পারেন না| আমাদের রাজ্যে সরকারি হাসপাতাল গুলোতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ আসেন চিকিৎসা করাতে| এদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই খুব গরীব ও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা| কেউ শহরে আসেন আত্মীয়দের বাড়ি বা ঘর ভাড়া করে থাকেন| প্রিয়জনদের জন্যে রাত জেগে বসে থাকেন| ডাক্তারদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে অধীর অপেক্ষায় বসে থাকেন| এদের কেউ হিন্দু‚ কেউ মুসলিম‚ কেউ ক্রীশ্চান‚ কেউ বা আদিবাসী| সুস্থ হয়ে পরিবারের লোকজন বাড়ি ফেরার সময় হলে আনন্দে চোখদুটো ছল ছল করে উঠে| মনে মনে ডাক্তারদের দীর্ঘায়ু কামনা করেন| আশীর্বাদ আর দোয়া দিয়ে চলে যায় দূর দেশে| এত লোক-এত রোগী দেখতে দেখতে মাথা ঠিক রাখাটা খুবই কঠিন| তরপর অপারেশন‚ তদ্বির‚ পার্টি-পলিটিক্স তো আছেই| চিকিৎসায় ভুল অবশ্যই হয়| হাজার- লাখ রোগীর মধ্যে কিছু রোগী বাঁচেন না| হয়ত তাদের অনেক দেরীতে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল| আবার কিছুটা অবহেলা ও ভূল চিকিৎসায় কিছু রোগী মারা যান| সেটাও কাম্য নয়| আমার মা মেডিকা সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে সামান্য অসুস্থায় ভর্তি হন| চার দিন পর তার মৃত্যু হয়| ভুল চিকিৎসায়| পিয়ারলেস হসপিটালে নিউরোলজি বিভাগে আমার বাবা ভর্তি ছিলেন| নার্স-ডাক্তাররা কেউ জানতেন না বাবা কদিন ধরে খাবার খাচ্ছেন না| আমি ডাক্তার এর সঙ্গে দেখা করার জন্যে ৪ ঘন্টা ধরে হসপিটালে বসে থেকে বাজে ব্যবহার পেয়েছি| প্রচুর পেসেন্ট দের বাড়ির লোকেদের সঙ্গেই এটা হয়| কেউ মুখ বুজে চলে আসে| কেউ বা প্রতিবাদ তার সঙ্গে প্রাইভেট হসপিটাল গুলোর ভুতুড়ে মেডিক্যাল বিল| সেই গলা কাটা বিল না মেটালে মৃত রোগীর বডি ছাড়া হয় না| তখন সেই মানবিক ডাক্তার গুলিই অমানবিক হয়ে যান| আমার মায়ের মৃত্যুতে আমি বা আমরা ডাক্তারদের অপমান বা হাসপাতালের কোন আসবাব-পত্রের ক্ষতি করিনি| এতে কিছু রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন| আমি এটাকে কখনই সমর্থন করি না| ডাক্তার এক বিশ্বাসের নাম| সেবার নাম| আমরা কেউ ভগবানকে দেখিনি‚ কিন্তু ভগবান রূপী ডাক্তারকে দেখেছি| প্রতিটি হাসপাতলে ডাক্তাররা আজ কর্ম বিরতি করছেন| কেউ পদত্যাগ করছেন| কয়েকদিনে হয়ত এই সমস্যাটা মিটেও যাবে| কিন্তু মারা যাবেন অনেক মুমূর্ষু রোগী| চিকিৎসা পাবেন না অনেক গরীব মানুষ| রাজনীতির যাঁতাকলে পরে পিষবেন এরা| আমি হাত জোড় করে ডাক্তার স্যার-ম্যাডামদের অনুরোধ করছি আপনারা দয়া করে এদের দেখুন| সব পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে| অন্দোলন করুন| আপনাদের অন্দোলনকে আমি সমর্থন করি| কিন্তু সব স্তব্ধ করে নয়| আমার একান্ত অনুরোধ মুখ্যমন্ত্রী কে আপনি দয়া করে একবার জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলুন| আপনি তো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী| আপনি একটু নরম হলেই অনেকটা কাজ হবে| যারা বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে হাসপাতাল ভাঙচুর করে| ডাক্তারদের নিগৃহীত করে তাদের কঠোর হাতে শাস্তি দিন| এর মধ্যে কিছু পলিটিকাল পার্টি ও গুনী মানুষরা ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে গেছেন| কিন্তু আপনি সব নোংরা রাজনীতির বাইরে থাকুন দিদি| আপনি সেই লড়াকু নেত্রী| সবসময় মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকতেন| এত মানুষ আপনাকে আজও ভরসা করেন সেই আগের মতই| আপনি-ই পারেন সব সমস্যার সমাধান করতে| ডাক্তারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করুন| ডাক্তার বাবুরা-দিদিরা আসুন না আবার সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনি| আপনারা আমাদের চোখে ভগবানই থাকুন| দিব্যেন্দু মজুমদার

174

2

kishore karunik

চলছে চলবে

চলছে চলবে -কিশোর কারুণিক জীবনের টার্নিংপয়েন্টে দাঁড়িয়ে লাভক্ষতির হিসাব নিকাশে দুর্নীতিদমনে উভিযোগ করেও ফলাফল হলো শূন্য। আলোর হাতছানিতে আধাঁরের উপেক্ষা ভাললাগার সময়ে ভালবাসার লম্ফঝম্ফ কী দরকার ছিল সবুজের কথামালা কী দরকার পাশাপাশি, হাসাহাসি! আলোকবর্ষের পর আলোকবর্ষ কষ্টের পর কষ্ট, চাহিদার পর চাহিদা নির্ঝর মায়াবেশে কল্পনার হামাগুরি তবুও সবকিছু চলছে চলবে!

107

2

মানব

ব্রহ্মা কা রেখ

১ “যেইখানে কল্কাপেড়ে শাড়ি পড়ে কোন এক সুন্দরীর শব চন্দন চিতায় চড়ে – আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা; সেই খানে সবচেয়ে বেশি রূপ – সবচেয়ে গাঢ় বিষন্নতা...” জীবনানন্দের এই লাইনগুলো অজান্তেই বেরিয়ে আসে মুখ ফুটে। ওদিকে চিতা থেকে নামিয়ে আনা মেয়েটির মুখ অবিকৃত, অমলিন, আরামের অনন্ত নিদ্রায় শায়িত। আর কোনও জাগতিক দুঃখ-শোক ওর ওই মুদিত নয়ন দুটি থেকে বের করে আনতে পারবে না অশ্রুধারা, ওই প্রায় গোলাপী ঠোঁট দুটি আর কেপে উঠবেনা কোনও আবেগে উচ্ছাসে, ইহজগতের সব কাজ ওর শেষ। আজ এই গঙ্গার তীরের নির্জন জায়গায় একটু আগেই যে ঘটনাটা হয়ে গেল, তার জন্য দায়ী আমিই। হয়ত এর জন্য মেয়েটির বিদেহী আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারবেনা। ওই মায়াভরা সুন্দর মুখ আমাকে টানছে এক আদিম আকর্ষণের অদৃশ্য রশি দিয়ে। তার বিবস্ত্র শরীরে কি নির্মম প্রশান্তি, দেখে হিংসা হয়। সংসারের হাজারটা চাহিদা, সপ্তাহে ছয়দিন মালিকের দোকান দেখভালের কাজ শেষে একটা দিনের জন্য বাড়ি ফেরা, এইটাই হয়ে উঠেছে এখনকার দৈনন্দিন অভ্যাস। তারই মাঝে একটু গঙ্গার হাওয়া খেতে সন্ধ্যের দিকটায় এইদিকটায় আসি মাঝে মধ্যে। মনটা জুড়িয়ে যায়। তবুও বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকার জন্য এই যে মালিকের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছি, এতে কোনও শান্তি আছে কি! এটাই তো নরক। মাইনে অতটাও নয় যে স্ত্রী-পুত্রকে এখানে এনে রাখব। সপ্তাহের শেষে একটা দিন, একটা মাত্র দিন ছেলেটার মুখটা দেখতে পাই, আবার পরের দিন সবার ঘুমন্ত মুখের দিয়ে চেয়ে ভোরবেলা রওনা হই শহরে। এইভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনকাল, হঠাৎ একদিন শুনলাম, এক অঘোরী সাধু এসে আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। ওনারা নাকি স্বয়ং ভগবানের ভৌত প্রকাশ, এ ধারণাটা আমার মনে বদ্ধমূল ছিল আগে থেকেই। তাই এই দুঃখের কথা বলে সামান্য সহানুভূতি আদায় করতে পারলেই কেল্লাফতে, এই ছিল আশা। সেদিন দোকানে খুব একটা ক্রেতা ছিলনা, তাই তাড়াতাড়িই বন্ধ করে রওনা দিয়েছিলাম গঙ্গাপাড়ের দিকে। একটু এগিয়েই চুনীলালের দোকান। খুব ভাল পনীর পকোড়া ভাজে এখানে। তবে দামটা বড্ড বেশী, আর একদিন ওদিকে যাওয়া যাবে। তারচেয়ে অনেকদিনের চেনা সবিতামাসির দোকানে দুটো আলুর চপ আর মুড়ি একটা ঠোঙায় নিয়ে চিবোতে চিবোতে চললাম। ভাবখানা এমন যেন আমিই রাজা। নদীপাড়ে পৌঁছনোর পর আজ একটু ভয় ভয় করতে লাগল, কিজানি কি ভয়ঙ্কর মানুষের পাল্লায় পড়তে হবে। দেখতে কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে একটু ধারণা তৈরী করেই নিয়েছিলাম আগেভাগে। - আ বেটা আ। তেরা হি ইন্তেজার থা। চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে যাঁকে দেখলাম, যেকোন সাধারণ মানুষই সে দৃশ্য দেখে টাল সামলাতে পারতেন না হয়ত। কিন্তু আমি বেপরোয়া। শক্ত করে ধরে রাখলাম নিজেকে, এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না মোটেও। যেকোনভাবে ওনাকে তুষ্ট করতে পারলেই কেল্লাফতে... জটাজুট, দাড়ি-গোঁফে ঢাকা, সাদা ছাইমাখা সেই মুখের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিসটা হল চোখ। কি গভীর সে চোখের দৃষ্টি, নিঃসংকোচ, উজ্জ্বল। প্রথমে ভয় পেলেও একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, - আপনি, আপনি জানতেন আমি আসব? - কখনও কখনও জানতে পারি দরকার হলে, এই যেমন এখন বুঝতে পারছি তোর আমাকে খুব দরকার। হ্যাঁ তোকে আমি সাহায্য করব। হঠাতই প্রচণ্ড ভক্তিভাব পেয়ে বসল আমায়।সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বসলাম একখানা। - শোন তোকে আমি সাহায্য করব, কিন্তু আমার একটা কাজ আগে করে দিতে হবে তোকে। - কি কাজ বলুন, নিশ্চয়ই চেষ্টা করব। উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে আমি বললাম। - চেষ্টা নয়, বল করব। আমাকে বিশ্বাস করলে আমিও তোকে সাহায্য করতে পারি। বাকীটা তোর ব্যাপার। এবার ছিলিমটা বের করলেন উনি। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, - দেশলাই আছে? ধোঁয়ায় নেশা আমার কোনওকালেই ছিলনা। তবে এই এলাকায় মাঝে মাঝেই কারেন্ট চলে যায়। তাই একটা গ্যাস লাইটার পকেটে রাখা ছিল। বের করে বললাম, - এতে হবে? ততক্ষণে উনি ছিলিমের ভেতর মশলা পুরে বেশ কায়দা করে মুখের কাছে ধরেছেন। আমি বোধহয় বুঝতে পারছি আমাকে কি করতে হবে। লাইটারটা জ্বেলে যে ছিদ্রটা ওনার মুখের দিকে আছে তার উল্টোদিকেটায় ধরলাম। সেসব গ্রাহ্য না করে প্রথমে চোখ উপরে তুলে ভক্তিভরে একটা প্রণাম সেরে নিলেন তিনি। তারপর আবার মুখের কাছে ধরলেন। দ্বিতীয়বার আবার লাইটারটা জ্বেলে নিলাম। ফসফস করে কয়েকটা টান দিলেন। যেটুকু ধোঁয়া আশপাশ দিয়ে আমার নাকে ঢুকেছে তাতেই আমি ভক্তির উর্ধ্বে পৌঁছে গেছি। মনে মনে ভাবছি ভোলেবাবা সামান্য বেলপাতাতেই তুষ্ট হোন, ইনিও সামান্য আগুনেই তুষ্ট হলেন। কেমন মনের সুখে ছিলিমে টান দিয়ে চলেছেন। যেন মহাবিশ্বের অধিকর্তা স্বয়ং আমার সামনে বসে ছিলিমরূপী বিশ্বলোকের সাথে খেলা করে চলেছেন। - কিরে একটা টান দিবি নাকি? ছিলিমটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি জোড়হাত করে বললাম, - আমার ওসব চলেনা। - আচ্ছা, তাহলে থাক। এই বলে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন উনি। প্রায় ন’টা বাজে। আমার অবশ্য তেমন তাড়া নেই। একটু দেরী হয়ে গেলে হানা দেবো লালুদার ধাবায়। সারারাত দোকান খোলা থাকে। রাতবিরেতে হাইওয়ে দিয়ে প্রচুর মালবাহী লরি যায়। রাত্রে তাদের কারও কারও খিদে পেলে ওখানেই হানা দেয়। তেমন সুস্বাদু বা পরিচ্ছন্ন না হলেও দামটা বড্ড কম। কয়েকদিন আগে মালিকের দোকানের পাশের একটা বড় রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল, খেতে গিয়ে দেখি নুন নেই। সে নিয়ে নালিশ করলে বলে, - আপনি তো নুন অর্ডার করেননি স্যার। কতটা লাগবে একটু বলবেন। একে খিদের জ্বালা, তার উপর এরকম আচরণ, মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। তবুও নিজেকে অনেকটা কন্ট্রোল করে নিয়ে বৃদ্ধা তর্জনী আর মধ্যমাকে একত্র করে বললাম, - এইটুকু। অতটুকু নুনের জন্য এক্সট্রা পনের টাকা যোগ করেছিল। তারচেয়ে আর কিছু টাকা দিলে আমার পুরো নৈশভোজটাই হয়ে যায় ওই ধাবায়। গরীবের আবার পরিচ্ছন্নতা! - হ্যাঁ বেটা, তোকে আমার একটা কাজ করতে হবে। - কি কাজ বলুন। এতক্ষণ মনে মনে ভাবছিলাম কখন আমার দাবীটা পেশ করব। আবার কাজ করতে বলায় একটু ঘাবড়ে গেলাম। উনি বললেন, - তোকে কিছু ক্ষমতা নিশ্চয়ই দেব, যাতে তুই নিজের পেট চালিয়ে নিতে পারিস। আমার জন্য তোকে একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে হবে। একটা মৃতদেহ জোগাড় করে দিতে হবে, অপঘাতে মৃত। আর একটা কথা, অপঘাতে হলেও যেন কোন বড় রকমের খুঁত না থাকে সে দেহে, যেমন ধর হাত নেই, কানা... ওসব চলবেনা। - ঠিক আছে বাবা। আমায় কয়েকদিন সময় দিন। আমার কাজ হবে তো? - আগে থেকে বলি কি করে। তবে তোর কিছু একটা হিল্লে নিশ্চয়ই করে দেব। আমাতে বিশ্বাস রাখ। প্রণাম জানিয়ে সে রাত্রের মত বিদায় নিলাম। মনে মনে বললাম, এ তো ‘কর্পোরেট পাল্টিবাজি’। কয়েকদিন আগে একটা সিনেমায় এই টার্মটা শিখেছি। এরকমভাবেই একজন কর্পোরেট বস তার অধীনস্থ কর্মচারীকে হেনস্তা করছিল। ছেলেটা সারাবছর কাজ সেরে বৎসরান্তে বসের কাছে যেত প্রোমোশনের প্রত্যাশী হয়ে। আর তখনই হাসিমুখে বস বলতেন, - অসাধারণ কাজ করেছ, কিন্তু অন্যেরা তোমার চেয়ে আরও ভাল করেছে। এই বছরটা থেকে যাও, পরের বার নিশ্চয়ই ভাল হবে, মন দিয়ে কাজ করো। ততোধিক উদ্যমে কাজ করত ছেলেটা। কিন্তু বছর শেষে আবার সেই এক গল্প। আমার ক্ষেত্রেও অঘোরীবাবা যদি এমনটা করেন... ২ দুদিন ধরে শ্মশানঘাটের আশেপাশে ঘুরছিলাম। অনেক মৃতদেহই আসে, কিন্তু কোনটা মনোমত হয়না, কোনটা আবার পছন্দ হলেও সুযোগ পাইনা। কিন্তু এবার বোধহয় সুযোগ এল। একটা ছোট ট্রাকে করে দশ বারোজন এল। কিন্তু ওরা শ্মশানের দিকটায় না গিয়ে একটু দূরে ফাঁকা জায়গায় এল। হয়ত বিনা পয়সায় শবদাহ করে পালানোর ইচ্ছায়। আমিও মোটামুটি দুরত্বে থেকে ওদের দেখতে লাগলাম। সকলে একসঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে একটা মৃতদেহকে নামিয়ে আনল। ওদেরই মধ্যে একজন বেশ কয়েকটা পতাকা হাতে নিয়ে নেমে এল। কয়েকটার রঙ হলুদ, কয়েকটার আবার গোলাপি। সে এসে পতাকাগুলো বিতরণ করে দিল সবার মাঝে। এরপরে যে রঙ্গ দেখতে পেলাম তা আগে কখনও ভাবতেই পারিনি। মানুষ এভাবেও ভাবতে পারে! মুহূর্তের জন্য ভূলে গেলাম আমি কে, কোথা থেকে এসেছি কিংবা আমার জীবনে কী দুঃখ কষ্ট। বিভোর হয়ে দেখতে থাকি ওদের রঙ্গ। বিবস্ত্র মৃতদেহকে কাঠের চিতা সাজিয়ে তার উপর রাখা হল। যাদের হাতে হলুদ পতাকা তারা একদিকে সরে গেল, যাদের হাতে গোলাপি তারা অন্যদিকে।এবার পতাকাবাহী ছেলেটি গাড়ি থেকে বের করে আনল ক্যামেরা। প্রথমেই ক্যামেরা তাক করা হল গোলাপি বাহিনীর দিকে। মৃতদেহকে সামনে রেখে রেকর্ডিং শুরু হল। একজন শুরু করল স্লোগান, - হলুদ তাড়াতে লাগবে জোলাপ। অন্যেরা ধ্বনি তুলল, - গোলাপ চাই গোলাপ। আবার, - হলুদ তাড়াতে লাগবে জোলাপ - ভোট ফর গোলাপ ভোট ফর গোলাপ। এরপর গোলাপি দলের ওই কর্মীটির মৃত্যু যে হলুদ দলের হাতে হয়েছে তার বিবরণ দিলেন বক্তাগণ, এবং তা রেকর্ড করা হল। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এদিকের রেকর্ড হওয়ার পর সেই একই ধরণের বিবরণ রেকর্ড করা হল হলুদ পতাকাবাহী দলের পক্ষে এবং গোলাপীর বিপক্ষে। কিছুটা অনুমান করতে পারলাম, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে কিভাবে একই জিনিস অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়। হলুদ দলের স্লোগান ছিল, - আমরা নইকো কাঁচা মোটেও - অভিজ্ঞতায় হলুদ। - জনগণের পাশে আছি - ভোট ফর হলুদ। না, এবার আমাকে মাঠে নামতে হবে। কাজটা হাসিল করতে গেলে প্রথমেই ওদের ক্যামেরাটা বন্ধ হয়ে যাওয়া দরকার। ক্যামেরা বন্ধ হল দু-দলের ভাষণ শেষে। দু-দলই ক্লান্ত হয়ে বসে বিড়ি ধরিয়েছে। এবার কিভাবে সৎকার করা হবে, কে জ্বালাবে আগুন, তারই আলোচনা চলছে। একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে, - কিরে মড়া নিয়ে রাজনীতি করছিস? তোদের একটাকেও আমি ছাড়বনা। একটু চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। দেখতে পেলে আমার চামড়া তুলে নেবে এই ভেবে যতটা সম্ভব আরও আড়ালে চলে এলাম আমি। লাল শাড়িটা ভাল করে টেনে বাঁধলাম। দোকান থেকে ভাড়া করে আনা জটাটা জড়িয়ে বেশ যোগিনীর বেশ ধারণ করে আর একবার চিৎকার করে উঠলাম, সম্পূর্ণ মহিলাকণ্ঠে, - তোদের সবকটাকেই শেষ করব আমি, বাঁচতে চাস তো পালা। একসময় পাড়ার যাত্রাদলে শূর্পনখার পাঠ করে কাঁপিয়ে দিতাম। এখন অবশ্য কাজের চাপে সেসব করা হয়ে ওঠেনা। তবুও গলার সেই জোরটা রয়ে গেছে। সবাই ভয়ে গাড়িতে উঠে বসল। এবার আমি আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলাম হাতে ত্রিশূল নিয়ে আর বেপরোয়া চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে। মুখে ততক্ষণে মেখে নিয়েছি আশেপাশের পড়ে থাকা সাদা ছাই। আজ দারিদ্রের বিরুদ্ধে আমার মরণ-বাঁচন লড়াই। এ লড়াইয়ে মরতে হলে মরব, কিন্তু হার মেনে নেওয়া চলবেনা। অঘোরীবাবার আশীর্বাদ আমার সঙ্গে ছিল হয়ত। একটু ত্রিশূল বাগিয়ে তাড়া করতেই প্রচণ্ড বেগে গাড়ি চালিয়ে রওনা দিল ওরা, পালিয়ে গেল বলাই ভাল। পড়ে রইল কয়েকটা পতাকা, আর সেই শবদেহ। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটির দিকে। অজান্তেই বেরিয়ে আসতে লাগল কবিতা, চোখ থেকে দুফোঁটা জলের ধারাও নেমে এল। ওদের কথা শুনে বুঝেছিলাম, এটা রাজনৈতিক হত্যা। কোন দলের মেয়েটি এবং কারা হত্যা করেছে তা বোঝা না গেলেও এটুকু বোঝা গিয়েছিল যে ঘাড়ের কাছে লাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাতের ফলেই এই মৃত্যু। এ বিষয়ে খুব একটা ধারণা না থাকলেও মনে হল, খুব কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে, তাই আতঙ্কের চিহ্নমাত্রও নেই তার চোখেমুখে, বরং রয়েছে অনন্ত প্রশান্তি। আশেপাশে ভাল করে দেখে নিলাম। নাঃ, ওদের ফিরে আসার আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। জটাটা খুলে নিলাম। পরনে জামা প্যান্ট ছিল, তাই শাড়িটা বের করে জড়িয়ে দিলাম মেয়েটির গায়। দেহটি কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটা দিলাম অঘোরীবাবার আশ্রয়ের দিকে। ৩ উনি খুব করে বলে দিয়েছিলেন ওনাকে এসেই ডাক না দিতে। হয়ত বিভিন্ন ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকেন সেই ভেবে আমিও আর বিরক্ত করলাম না। বাঁশের বেড়া দেওয়া খড়ের ঘরটির পাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। তার উপরে শুকনো পাতার ইতস্তত আস্তরণ। সেখানেই শবদেহটিকে শুইয়ে দিয়ে বসে পড়লাম। মিনিট দশ কি পনের হবে, একটু চোখ লেগে এসেছিল। শুকনো পাতার মর্মরধ্বনিতে চোখ খুলে গেল। অনেক মৃতদেহ দেখে দেখে আমার স্নায়ু এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। এসবে আর ভয় লাগেনা। কিন্তু যে দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল তাতে আমার হৃদযন্ত্রের উপর আর কোনও নিয়ন্ত্রণ রইল না। শরীরে উপর থেকে কাপড় সরিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র সেই মৃতদেহ উঠে বসল আমার সামনে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। একবারের জন্য হৃদয়ের গোপন কোণে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল বটে, হয়ত আমার মন থেকে উৎসর্গ করা প্রেমের প্রবল টানে মেয়েটি ফিরে এসেছে। পরক্ষণেই প্রচণ্ড ভয় এসে গ্রাস করল আমাকে। দুটো চোখেরই একপাশ থেকে অন্যপাশে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ, যেন কালচে লাল রঙ দোয়াত থেকে ছিটকে এসে পড়েছে সে চোখে। হাত পা কাঁপছে। হৃদযন্ত্রটা বুকের খাঁচা থেকে খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে। অনেক চেষ্টায়ও তাকে দমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। এটাই কি তবে মৃত্যুর যন্ত্রণা, নাকি আরও কিছু... আমাকে বাঁচতেই হবে। মনে জোর এনে উঠে দাঁড়ালাম। পিছনে ফাঁকা মাঠ, আর সামনে মেয়েটির পিছনে অঘোরবাবার ঘর। অঘোরবাবার কাছে পৌঁছতেই হবে। পাশ কাটিয়ে দৌড়ে ঢুকে গেলাম সে ঘরে, কিন্তু একি... তাঁর নিথর শরীরটা পড়ে আছে মাটিতে, আর সে শরীরের রক্তমাংস দিয়ে বনভোজন সারছে পিঁপড়ের দল। দৌঁড়ে বাইরে বেরোতে যাব, দেখি সেই শরীর, দরজা ঘিরে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর বোধহয় এ জীবনটা রইল না। জ্ঞান হারিয়েছিলাম কতক্ষণ জানিনা। অনেকটা রাত হয়েছে বুঝতে পারলাম। চোখ খুলল জলের ঝাপটায়। কিন্তু চোখ খুলেই দেখি সেই মেয়েটির মুখ, অপার স্নেহভরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। - না না বেটা, ভয় পাস না। আমিই অঘোরী কমলানাথ। অবাক হলেও নিজেকে সামলে নিলাম। কথা বলার ধরণ, নিঃসঙ্কোচ চোখের দৃষ্টি সেই এক, শুধু দেহটা আলাদা, আর নারীকণ্ঠ। - কিন্তু কিভাবে... আপনাকে তো দেখলাম ভিতরে। - ওটা আমার দেহ ছিল মাত্র। অনেক দিন ধরে বুঝতে পারছিলাম এ শরীর আর বেশিদিন টিকবেনা। কিন্তু সূক্ষ্মশরীরটার আরও প্রায় চারশ বছর আয়ু আছে। ততদিন স্বর্গে গিয়ে আরও উর্ধ্বলোকে যাওয়ার জন্য ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকার চেয়ে এ জগতের জন্য কিছু করে যাই ভাবলাম। তাই তোকে এই কাজটা করতে বলা। বুঝতে পারলামনা নারীদেহ ধারণ করার পরও তিনি অঘোরীবাবা-ই থাকবেন নাকি কমলা মা বলে ডাকতে হবে ওনাকে। - কমলা তো ঘরে থাকে, আমি কমলানাথ নাম কিকরে নিয়েছি ভাবছিস তো? আসলে তন্ত্র সধনায়ও আমাদের লক্ষ্মীদেবীর পুজো করতে হয়। সে লক্ষ্মীদেবীর রূপ আলাদা, আরাধনাও। তাছাড়াও অনেকগুলো নাম নিতে হয়েছে আমাকে এক এক সময়ে। মনে ভাবলাম, ওনার তাহলে অনুমান করার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। আমার কাজ আদৌ হবে তো? মুখে বললাম, - কিন্তু একবার দেহ ত্যাগ করলে কি আর অন্য দেহ ধারণ করা যায়? এ তো ভগবানের ইচ্ছাবিরুদ্ধ কাজ! - ভগবানের একটা নিয়ম থাকে, সেটাকে প্রশ্ন করতে পারে একমাত্র সেই মানুষ যে পরোপকারী, নিঃস্বার্থ অথবা ফকির। ফকির ব্রহ্মা কা রেখ পর মেখ মারতা হ্যায়। আর আজ আমি জন্ম থেকে বয়ে আনা দেহটাকেও ত্যাগ করেছি। এ জগতে আর নিজের বলতে কিছুই রইল না। এখন যা। সপ্তাহখানেক পরে আবার আসিস। এই দেহটাকে আমাকে বুঝে নিতে হবে, শুদ্ধ করতে হবে, অনেক কাজ। কৃষ্ণা অষ্টমীর চাঁদ তখন নদীর ওপারে ঢলে পড়েছে, রওনা দিলাম ঘরের দিকে। ৪ সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফিরলাম। রবিবারের রাত। সপ্তাহে একদিন বাড়ির খাবার পাই, অসাধারণ লাগে তার স্বাদ। সহজলভ্য হলে যত ভালো জিনিসই হোক, একঘেয়ে লাগবেই। কিন্তু এখন, হয়ত ছয়দিনের ব্যবধানে খেতে পাই বলেই, এই রান্না আমার কাছে অমৃত। তেমন কিছুই না, সামান্য মসুর ডাল আলুপোস্ত আর ভাত। খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেকুর উঠল। ঢেকুর উঠলে তবেই না খাওয়া শেষ। কিন্তু এরপর আর একটা জিনিস বাকী ছিল, এক গ্লাস গরম দুধ। সেটা খেয়ে বেশ খানিকটা ঘুম ঘুম ভাব এল। নীলাও ক্লান্ত। একা বাড়িতে সবদিক সামলানো, ছেলেকে তৈরী করে স্কুলে পাঠানো, বাড়ির দেখভাল করা, গোরু দুটোর যত্ন নেওয়া এইসব করতে করতে আমাদের ভালোবাসা কখন যে শুধুমাত্র জীবনযাপন-এ পরিণত হয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ছেলে ঘুমিয়েছে অনেকক্ষন। - কইগো, অনেক রাত হল। আমি ঘুমোতে চললাম। ঘুমোতে ডাক দিয়ে নীলা মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ল। গরম বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মশাও। বাড়িতে এলে ঘুমোতে ইচ্ছা করে না। মনেহয়, যেটুকু সময় এখানে আছি, বেঁচে আছি। তাই ঘুমিয়ে সময়কে নিজের হাতে খুন করে ফেলতে পারিনা। কিন্তু শরীর তো, তার ক্লান্তি আছে, খিদে আছে, আছে আত্মিক চাহিদা, আছে ঘুম। বারান্দায় অনেকক্ষণ বসে থেকে মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে শোবার ঘরের দিকে রওনা দিলাম। খাটের একপাশে রিজু আর মাঝখানে নীলা শুয়ে আছে। রিজু আমার ছেলে, সবে স্কুলের পড়াশোনা শুরু করেছে। সরকারি স্কুল বলে তাও খরচটা এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। যত বড় হবে প্রাইভেট টিউশনের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হবে। নীলাকে একটু মাঝের দিকে ঠেলে দিয়ে জানান দিলাম আমি এসেছি। কোনও হেলদোল দেখাল না সে। তখনই আমার সন্দেহ গভীর হল সে জেগে আছে। হয়ত অভিমানে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। একরকম জোর করেই মুখটা ঘুরিয়ে নিলাম আমার দিকে। মুখে তার একরাশ অভিমান। তবে কি ও কিছু টের পেয়েছে? অসম্ভব নয়, অন্ততঃ সেদিনের গঙ্গাপাড়ের ওই ঘটনার পর আর কোন কিছুতেই আশ্চর্য লাগেনা আমার। মেয়েরা নাকি অনেক কিছু আগে থেকে টের পায়, আর মহিলাঘটিত কিছু হলে তো কথাই নেই। চোখের কোণে তার দুফোঁটা জলের ধারা। বুঝলাম, এ অভিমানই বটে। কপালে এঁকে দিলাম ভালোবাসার চুম্বন। ****************************** ভালোবাসার সুতীব্র আক্রমণে ভেঙে গেছে অভিমানের বাঁধ। আমার অবস্থা তখন যুদ্ধজয়ী আলেকজাণ্ডারের মত। চোখের জল, ভবিষ্যতের চিন্তা - সবকিছুকে আজ ছুটি দিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। জিরো পাওয়ারের নীল বাল্বটা জ্বলছে। নীলা ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ। ছেলেটাও অঘোর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু আমার মনের নির্জন প্রান্তে কিসের যেন চিন্তা লেগে আছে। সে চিন্তা থেকে মুক্তির কোনও উপায়ই আমার জানা নেই। অন্ধকারটা ততক্ষণে চোখ সয়ে গেছে। এখন পুরো ঘরটা অনেকখানি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি নীলার অভিমানী মুখ প্রাপ্তির আনন্দে পূর্ণ। মশারীর বাইরে তৃষ্ণার্ত মশার দলের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। আমারও মায়া বেড়ে যায়, হাতটা বাড়িয়ে দিই মশারীর দিকে। একটু রক্ত খেয়ে ওরা যদি বেঁচে থাকে। নিজের আজব খেয়ালে নিজেই অবাক হলাম, কিন্তু হাত বাড়িয়ে দিলাম মশারির দিকে। ঠিক তখনই, আবার নীলার দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। একি! এ যে অবিকল সেই মৃতা রমণীর মুখ, চোখের একপাশ থেকে অন্য দিকে জমাট বেঁধে যাওয়া রক্তের ছিটে, যেন কোন শিল্পী অবহেলার রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে তার প্রিয় চিত্রের উপর। তীক্ষ্ণ সে চোখের দৃষ্টি সরাসরি আমার দিকে। প্রথম দর্শনে অঘোরী কমলানাথকেও একরকম ভয়ঙ্করভাবে তাকাতে দেখিনি। তবে কি সে এসেছে? এ কি কমলানাথ, নাকি কমলানাথের বর্তমান দেহের প্রয়াত মালকিন? আমার চোখ দুটো চুম্বকের মত আটকে আছে তার চোখের দিকে। চিৎকার করতে গিয়ে গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোয় না। তার দুটো হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আমার দিকে। আজই কি তবে শেষ রজনী? আজই কি তবে শেষ... গলাটা চেপে ধরার আগেই এক ঝটকায় সরিয়ে দিলাম সেই হাতদুটো। টাল সামলাতে না পেরে মশারিসুদ্ধ পড়ে গেলাম খাটের নিচে। সেইসঙ্গে হুড়মুড় করে খুলে গেল খাটের সঙ্গে লাগানো মশারী টাঙানোর কাঠগুলো। - কি হয়েছে? কি হয়েছে? চিৎকার করে উঠল নীলা। কেঁদে উঠল রিজু। ছেলেকে ভোলানোর চেষ্টা করতে করতেই সে দেখতে পেল আমাকে মশারী গুটিয়ে পড়ে থাকতে। বিশদে বললে আরও ভয় পেয়ে যাবে এই ভেবে আর কিছুই বললাম না। আবার মশারি টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই মিলে। একটু হাসির পাত্রও হলাম বৈকি নীলার কাছে। সে রাত্রে আর তেমন কিছু ঘটল না। ৫ ভোরে উঠে রওনা দিলাম শহরের দিকে। আনমনা ছিলাম, তাই ভুল করে ট্রেনের ভেন্ডর কামরায় উঠে পড়েছিলাম। ছানার জলের পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল। পরের স্টেশনে বদলে নিলাম কামরা। একটাও সিট নেই। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের একপাশে চারজন দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক কায়দা করে কনুইয়ের উপরে রুমালের খুঁট বেধে নিয়ে শুরু করেছে তাসের আসর। ভালই জমে উঠেছে সে খেলা। ভিড় থেকে বাঁচাতে ব্যাগটা হাতে নিলাম। ঠিক তখনই পায়ের উপর ঈষদুষ্ণ তরলের মত কি যেন একটা পড়ল। ভিড় আলতো করে ঠেলে পায়ের দিকে তাকাতেই দেখি লাল রঙের পিক, কেউ গুটখা বা পান চিবিয়ে ভিড়ের মাঝে ছেড়ে দিয়েছে। নাঃ, দিনটা সত্যিই খারাপ যাচ্ছে। এরই মাঝে খাওয়াদাওয়ার প্রাচুর্য অতুলনীয়। ভিড় ঠেলে ঠেলে ঝাঁকা মাথায় হকাররা বজায় রেখে চলেছে তাদের বিক্রী। প্লাস্টিক হোক বা কাগজের ঠোঙা, সবারই ব্যবহারের পর জায়গা হচ্ছে তাদেরই পায়ের নিচে কিংবা চেয়ারের তলায়। কি নেই সেখানে, রয়েছে কমলালেবুর খোসা, ডিমের কুসুমের অংশ, বিড়ির টুকরো, মুড়ি, পাঁপড়ের গুঁড়ো, খৈনীর প্যাকেট এরকমই আরও অনেক কিছু। ট্রেনের দেওয়ালে আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষ, তন্ত্র, বশীকরণ, সুলভে এলাকার বন্ধু বা বান্ধবীর সন্ধান এমনই অতি প্রয়োজনীয় সব পোস্টার। এরকমই আরও অনেক দুর্ভোগের পর সময় করে মালিকের বাড়ি পৌঁছলাম। কলিং বেল। দেখে কেমন ভয় ভয় করে। মনে হয় যেন স্বপ্নের জগতে পৌঁছে গেছি। ভক্তিভরে সুইচটা টিপে দিলাম। দোতলার বারান্দায় গ্রিলের ফাঁক গলে একটা থলি নেমে এল। বেশ সুন্দর একটা হাত, মালকিনের। হয়ত পর্দার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখছে। মাথা নামিয়ে নিলাম। তাকাতে সাহস হয়না। থলি থেকে চাবিটা নিয়ে কাঁধের ব্যাগ থেকে ঘিয়ের শিশিটা বের করে থলিতে রাখলাম। পাঁচু ঘোষের খাঁটি মোষের দুধ থেকে তৈরী ঘি। এনারা খুবই পছন্দ করেন। মালিকের কাছে পরে অবশ্য দামটা নিয়ে নেব। সপ্তাহের শুরুতে অনেক কাস্টমার। সেসব সেরে ঘরে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। মালিকেরই দেওয়া একটা ছোট্ট ঘর। আর এক কর্মচারী কেশব থাকে পাশের ঘরে। দুটো ঘরের মধ্যে একটা লাগোয়া দরজা আছে। ঘরটায় যেদিন আমাদের থাকতে দিয়েছিলেন মালিক, আমাদের বলেছিলেন, - ছোটবেলায় আমরা এই বাড়িটায় থাকতাম। এখনও ওই মাচায় ছোটবেলার অনেক কিছু আছে। এক একটা জিনিস এক-একটা স্মৃতি। - সে তো নিশ্চয়ই। এই বাড়িটা তো অনেক দিনের পুরনো মনে হয়। আমি আগ্রহ সহকারে বললাম। - হ্যাঁ, আমার দাদু বানিয়েছিলেন। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখবে যে পরপর প্রতিটা প্রজন্ম কিন্তু বাড়ি বানায়না, বানাতে পারেনা। একজন বানালে তার পরের প্রজন্ম সেটা ভোগ করে, তার পরের প্রজন্ম আবার বাড়ি বানায়। খেয়াল করে দেখলাম, আমার বাবা বাড়ি বানাতে পারেননি, তারমানে আমার কাছে একটা সুযোগ নিশ্চয়ই আছে। এইসব চিন্তা মাথায় আসতেই অঘোরবাবার মৃত মুখটা ভেসে উঠল স্মৃতিতে। বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠল। এখন তো আর তাঁকে দেখতে পাবনা, এখন তার স্মৃতি সম্বল আত্মাটা ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্য কারও শরীর বয়ে নিয়ে। আজ আর বাইরে খাওয়া নয়। শরীরের যত্ন নেওয়া উচিৎ, সেই সঙ্গে পকেটেরও।ঘরেই রেঁধে খেয়ে নিলাম। বেশ তাড়াতাড়ি ঘুমও এসে গেল। কানের কাছে একটা ফিসিফিসানির শব্দ। দেওয়ালের রেডিয়াম ঘড়িটা জ্বলজ্বল করে জানান দিচ্ছে দুটো দশ। কালও তো এরকম সময়েই ঘটনাটা ঘটেছিল না? শিড়দাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল অজানা আশঙ্কায়। ফিসফিস শব্দটা মশারির উপরের দিক থেকে আসছে আন্দাজ করে টর্চটা জ্বালালাম। কিন্তু ওটা কি? কাল রাত্রে যা দেখেছিলাম তার থেকে অনেক অনেক ভয়ঙ্কর। জ্বলজ্বল করছে তার দুটো চোখ। চোখের তীব্র চাহনিতে গিলে ফেলতে চাইছে আমাকে। সেইসঙ্গে মশারির উপরে এক প্রান্ত থেকে আর প্রান্তে ভেসে বেড়াচ্ছে। যেটুকু করুণা বেঁচে ছিল মেয়েটির প্রতি, তা আর রইলনা। তার বদলে চেপে বসল তীব্র ভয়। ভয় পেলে চলবেনা। দাঁতে দাঁত চেপে লাইটটা জ্বেলে রইলাম আর ঘোরাতে লাগলাম তার গতি লক্ষ্য করে। মিনিট দুই পরেই সেই উড়ন্ত মুর্তি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। লাইটের তেজ সহ্য করতে পারেনি ভেবে একটু খুশীই হলাম। ****************************** তবে কিছু একটা যে হচ্ছে এবার ভালই বুঝতে পারছি। আগের রাতের অভিজ্ঞতায় ততটা নিশ্চিত না হলেও, আজকের এই ঘটনাটাকেও তুচ্ছ মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে পারলাম না। সারাদিন কাজ করতে করতেও একটা খটকা রয়েই গেল। কিন্তু সপ্তাহখানেক না হলে অঘোরবাবার কাছে যেতেও মন চাইল না। উনি বলেছেন, - আমাতে বিশ্বাস রাখ। ৬ পরের রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের রাত। সেই একই সময়, রাত দুটো দশ। ফিসফিসানি নয়, এবার আর্তনাদ, - কেন করলি? আমি তোর কি ক্ষতি করেছিলাম? এই একই কথা বারংবার বলে যেতে লাগল সেই উড়ন্ত বায়বীয় মূর্তি। আমি কি করেছি তার একটা আন্দাজ অবশ্য আছে। তাও সাহস করে বললাম, - কি চাও তুমি? আমার সমস্ত চেতনায় কাঁপুনি ধরিয়ে প্রচণ্ড চিৎকারে সে বলে উঠল, - তোকে, তুই আমার শরীর নিয়েছিস। তোর শরীর চাই আমি। মরিয়া হয়ে মশারি থেকে বেরিয়ে পরলাম আমি। খাটের নিচে হাতড়ে খুঁজে পেলাম একটা ঝাঁটা। সেটাই ঘোরাতে শুরু করলাম চারিদিকে। আমি কি এবার পাগল হয়ে যাব! নাকি হয়ে গেছি। ওই ভয়ংকরী প্রেত ঘুরঘুর করতে লাগল আমার চারিদিকে। সুযোগ বুঝে কি তবে আক্রমণ করে বসবে আমাকে? নাকি ভয়ের চোটেই আমার মৃত্যু হবে? আমার দেহটা হয়ত ভোগ করবে ওই প্রেত। আমার দিকে এগিয়ে আসতে গেলে বারবার ঝাঁটার আঘাতে তাকে সরিয়ে দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সেটাও আর কাজ করল না। সেই মায়াবী চোখ তীব্র, ভয়ঙ্করের রূপ নিয়ে গ্রাস করতে এল আমাকে। ঠিক সেই সময় দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা। বাঁচার শেষ আশা দেখে লাফিয়ে গিয়ে পড়লাম দরজার উপর। মুখে লাগল প্রচণ্ড একটা ধাক্কা। সেসব অগ্রাহ্য করে দরজাটা খুলে দিতেই একটা ত্রিশূল শাঁই করে আমার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সেই বায়বীয় মূর্তিসমেত অন্যপ্রান্তের দেওয়ালে গেঁথে গেল। মূর্তি অদৃশ্য হল। - তাড়াতাড়ি। খুব কম সময় আছে হাতে। ওটাকে কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় করে রেখেছি। - ক্কী? কী করতে হবে আমাকে? হতচকিত হয়ে প্রশ্ন করে বসলাম। - মাছ কাটার ছুরি... তখন আমার কিচ্ছু ভাবতে ইচ্ছা করছেনা। স্টোভের পাশ থেকে মাছ কাটার ছুঁড়িটা এনে দিলাম। কিচ্ছু বোঝার আগেই উনি নিজের ডান হাতের কড়ি আঙুলটা কেটে ফেললেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লেও মুখে দেখলাম না কোনও বেদনার ছাপ। - স্টোভটা জ্বাল। মনে অনেক প্রশ্ন এলেও সেদিনের সেই এক কথায় উনি আমাকে দমিয়ে রেখেছেন, - আমাতে বিশ্বাস রাখ। তিনি বললেন, - একটু কেরোসিন। এতক্ষণ পরে মনে পরতে ঘরের লাইটটা জ্বালালাম। ওনার চলনে-কথায় সেই অঘোরী কমলানাথের ছাপ, শরীরে-পোষাকে তিনি অনেকটাই কমলানাথে পরিণত হয়েছেন লক্ষ্য করলাম। শুধু ... - কিরে এত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখার কি আছে? এখনও এই শরীরটাকে ভুলতে পারিসনি না? নিবি নাকি এটাকে? ছিঃ! মরার সময় পর্যন্ত তোদের কাণ্ডজ্ঞান হবেনা রে? একটু লজ্জা পেলাম। নিজের প্রতি ঘেন্নাও হল বৈকি একটু। ঘরে আলাদা করে কেরোসিন ছিলনা, তবুও স্টোভের তেল ভরার জায়গাটা খুলে খানিকটা কেরোসিন তাঁর উপদেশমত কাটা আঙুলটায় ঢেলে দিয়েই জ্বালিয়ে দিলাম লাইটারটা। জ্বলছে কাটা কড়ি আঙুলটা। - কি হচ্ছে আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন? - হ্যাঁ তুই বলেই বলছি, আর কাউকে বলতামনা। মন দিয়ে শোন। মাটিতে বসে ছিলিমটা বাগিয়ে একটা প্রনাম সেরে নিলেন গুরুদেব। আমিও নিজের কর্তব্য সারলাম। হ্যাঁ, আমার জন্য যা করলেন তাতে এখন থেকে ওনাকে গুরুদেব বলেই ডাকব আমি। হোক না তাঁর শরীর আলাদা। মানুষের ভিতরটা কি আর শরীর দিয়ে বিচার করা যায়? তাই কমলানাথ কমলানাথই, কমলা মা নন। উনি শুরু করলেন, - মৃত্যুর পর কয়েকদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে সূক্ষ্মশরীর। তারপর তার ঘুম ভাঙে, একটু একটু করে সে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ঊর্ধ্বলোকে যাত্রার এটা প্রাথমিক পর্যায় বলতে পারিস। এই সময়ই, যাদের কামনা-বাসনা প্রকট, বা তীব্র প্রতিহিংসা যাদের তারা একটু একটু করে অধোগামী হয়ে পড়ে। এই মেয়েটির ক্ষেত্রে, ঠিক কি ঘটেছে তা হয়ত বলা সম্ভব নয় এই সদ্যপ্রস্ফুটিত সাধনমস্তিষ্ক নিয়ে। তবে এটুকু বলতে পারি, প্রথম খোলস ছাড়ার পরই সে দেখতে পায় তার শরীর অন্য কেউ ভোগ করছে। আমি জানতে পেরেছি বিগত কয়েকদিন ধরেই রাত্রে তোকে ভয় দেখাচ্ছে সে। ঠিক ওইসময়টাতেই ওর মৃত্যু হয়েছিল। অবশ্যই রাজনৈতিক হত্যা। মানুষ তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য কত কিছুই না করে। ততক্ষণে ত্রিশূলটা দেওয়াল থেকে খসে পড়েছে, আঙুলটাও প্রায় পুড়ে শেষ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, - কিন্তু আঙুলটা পোড়ালেন কেন? ইস খেয়ালই হয়নি। দিন দিন ওষুধ লাগিয়ে দিই। - এসব আমাদের লাগেনা। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। আর কথা বাড়ালাম না। - একটা খুঁত না হলে ওই আত্মা সবসময় এই দেহের লোভে ঘুরঘুর করত। আর দাহকার্যের পর এখন সে শান্তিতে অমৃতলোকের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু এই খুঁত নিয়ে আমার কি আর সাধনা হবে... - নিশ্চয়ই হবে। শরীরে কি আসে যায়? - বাঃ বেটা, অনেক কিছু শিখে গেছিস এই কয়দিনে। আমি এখন আসি। আর শোন, তোর মাথায় সাক্ষাৎ সরস্বতীর হাত আছে। সরস্বতীকে তুষ্ট কর, মা কমলাও তার পরপরই ধরা দেবেন তোর কাছে। সকালে কেশবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, - কিরে রাত্রে কিছু টের পাসনি? - না ভাই, ট্যাব মেরেছিলাম খান দুয়েক। সুতরাং সেসব নিয়ে আর কথা বাড়াইনি তার সাথে। ************************************** নমস্কার বন্ধুরা। আমি আর. জে. ময়ূখ, আর আপনারা শুনছেন রেডিও ভাগীরথী। এতক্ষণ শুনলেন আমার জীবনের গল্প অকপটে। সেই রাত্রের পর থেকে আমি আমার গুরুদেবকে আর কোনওদিন খূঁজে পাইনি। কিন্তু তিনি দিয়ে গেছেন আপনাদের মত মন ভাল করে দেওয়া প্রিয় শ্রোতাদের। অনেকের কাছে সরস্বতীর মানে হয়ত অন্য অন্য হতে পারে, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম আমার গলার স্বরকে। তারপর থেকে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করি, আর আজ আমি আপনাদের এই স্টুডিওতে বসে গল্প শোনাচ্ছি। আজকের গল্প এই পর্যন্তই, আপনাদের জন্য রইল সন্নাসী রাজা সিনেমা থেকে এই গানটি। “কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ সংসারোহয়মতীববিচিত্রঃ। কস্য ত্বং বা কুতঃ আয়াতঃ তত্ত্বং চিন্তয় তদিদং ভাতঃ।। ...”

162

3

মনোজ ভট্টাচার্য

বন্গ্শ-লতিকা !

বংশ-লতিকা ! অনেকের বাড়িতে দেখেছি – তাদের দেওয়ালে একটা ফ্রেমের মধ্যে তাদের বংশ-লতিকা টাঙ্গানো আছে । কাঁচের ওপর যথেষ্ট ধুলোর আস্তরন ! – ভয় হয় – ফট করে যদি একটা মাকড়শা বেড়িয়ে আসে আর জিগ্যেস করে – আমি কার পিতা বলত ? - এটা বেশ একটা সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্কের মতো ! অঙ্কের মতই তলা থেকে ওপরে যেতে হবে । সর্ব প্রথম আমি ও আমার বাবাকে খুঁজে বার করতে হবে ! আজকাল মায়েদের স্থান থাকলেও – আগে আগে মায়েদের খুব একটা প্রাধান্য দেওয়া হত না ! সাধারনত একটা ফ্রেমেই বংশ-লতিকাটা করার চেষ্টা হয় ! সেটার লেখাগুলো এত অপরিস্কার ও ছোট হয় – যে প্রায় পড়াই যায় না ! হয়ত এসব পড়ার জন্যে নয় – শুধু দেখানর জন্যে ! কারন একটা ফ্রেম দেখেছিলাম মধ্যিখানে ফাটা ! আবার এক জায়গায় দেখি – পর পর পাশাপাশি তিনটে ফ্রেমে বাঁধানো ! তিনটে ফ্রেম মানে যে কত পুরুষের – তা জানি না ! বংশ-লতিকা মানে বংশ পরম্পরা – মানে সোজা কথায় আমি কোথা হইতে আসিয়াছি – তার প্রমান ! বা বংশ মর্যাদা ! আমার বাবা কে ছিলেন ! পিতামহ কে ? প্রপিতামহ অতি বৃদ্ধ পিতামহ ইত্যাদি ইত্যাদি ! অবশ্যই একজন সজ্জন কেওকেটা ছিলেন ! – এ পর্যন্ত কোন চার্টে দেখিনি – কারুর বাবা চোর জোচ্চোর ডাকাত কিছু ছিলেন ! আমি যদিও বাল্মিকি হইতে আসিয়াছি – কিন্তু রত্নাকরের সংগে কোন সংস্রব নাই ! একবার কি কৌতূহলে – এক উপাধির ইতিহাস দেখতে গিয়ে দেখি – তারা নাকি জলদস্যুর জাত ! সে আবার কি ! তারা কি সপরিবারে জলে ডাকাতি করত নাকি! না তাদের পেশা ছিল জলে ডাকাতি করা ! –এটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। কারন তাদের সাহস । একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকোয় কজন লোক রাত্তিরে তীব্রগতিতে এগিয়ে আসছে – একটা বজরার লোকেদের লুঠপাট করার জন্যে ! দেবি চৌধুরানী ! আবার এ তো অনেকেরই জানা – আগেকার জমিদাররা প্রথম জীবনে ডাকাত ছিল । দস্তুর মত ডাকাতে কালীর পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে যেত ! – পরে টাকা-কড়ি নিয়ে জমি জমা কিনে জমিদারী করছে ! পরে তারা খুবই বনেদী পরিবার বলে খ্যাত হয়েছে ! এই প্রসঙ্গে আবার ট্রেজার আইল্যান্ড মনে পড়ে যায় ! আরে লিখতে চাইছি – বংশ-লতিকা , চলে গেলাম ডাকাতি করতে ! তা আগেকার লোকেদের একটা প্রবনতা ছিল – নিজেদের একটা বংশ-তালিকা তৈরি করার ! এটা যথেষ্ট শ্রম-সাধ্য প্রয়াস । কিছু লোকের হয়ত উদ্বৃত্ত কিছু সময়ের সদ্ব্যবহার হত । তবে বেশির ভাগ লোকেরই এখন চোখের জলে নাকের জলে অবস্থা ! কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম ! কোনোক্রমে নিজের প্রপিতামহের নামটাই মনে করতে পারি । - অথচ আশ্চর্য – মুঘলদের পুরো বংশ এখনো মনে আছে ! রিটায়ার করার পর - আমার বড় সম্বন্ধির মাথায় চাপল – তাদেরও একটা বংশ-লতিকা বানায় ! তা সবচেয়ে সোজা পিতামহের নাম পর্যন্ত তৈরি করা গেল ! কারন ইতিমধ্যে সমসাময়িক সব ওপরে চলে গেছে ! এমনকি অপরদিকে স্বনামধন্য এমন কাউকে পাওয়া গেল না – যাকে ভিত্তি-পুরুষ বলা যেতে পারে ! যেমন একজনের ভিত্তি-পুরুষ হল বশিষ্ঠ ! এটা একটা জবরদস্ত ভিত্তি ! সেরকম কিছু না পেয়ে অগত্যা সম্বন্ধিকে মাঝপথেই ক্ষমা দিতে হল ! একজনের অফিশে গিয়ে দেখি – একটা ঐরকম ছবি । এত ছোট লেখা যে পড়াই যায় না । তার একটা ছবি তুলে এনে বড় করে দেখি – ওরে বাবা ! কে নেই সেই চার্টে – মন্ত্রী থেকে নামকরা এক গুন্ডা ! বেশির ভাগই আইনজীবী ! ও যথেষ্ট নামকরা ! – তারাও হয়ত গুন্ডা আত্মিয়দের স্বীকার করে না ! ও, আচমকাই মনে পড়ে গেল – কিছুদিন আগে হঠাৎ জহরলাল নেহরুর বংশ তালিকা দেখতে গিয়ে চমকে গেছি । ওপরে চার পুরুষ পর্যন্ত তো ঠিক-ঠাক ! তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেল ! সেটা সিপাহি বিদ্রোহ দমনের পরবর্তী সময়ের কথা ! ব্যস ! আমার বংশ-লতিকা লেখার কথা মাথায় উঠল ! মনোজ

165

4