মনোজ ভট্টাচার্য
ধান্যকুরিয়ার রাজবাড়ি ! অনেকদিন আগে শুনেছিলাম বটে জায়গাটার নাম – ধান্যকুরিয়া ! কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সময়-সুযোগ হয়ে ওঠেনি ! কদিন আগেই একটা প্রবন্ধ পড়ে ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে উঠল ! – আর পায়ের তলায় সুড়সুড়ি লাগলেই – চলো কটক যাই ! আমাদের আবার একজন নয় ! আটজন ! মানে কাছাকাছি বয়েসী চার দম্পতি ! আমাদের কোনও কর্ম নেই – এক অর্থে বিশ্ব বেকার ! – প্রায় - চলো যাই বেরিয়ে পড়ি দশা ! আমার একটা বৃদ্ধদের সাংগঠনিক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও – পালিয়ে গেলাম ! কি আছে – সেখানে ? সে অর্থে কিছুই নেই ! কটা প্রাসাদপম বাড়ি – শোনা যায় রাজবাড়ি ! গায়েনদের, বল্লভদের ও সাউদের ! – পত্রিকায় বা ওয়েবসাইটে যেরকম ছবি দিয়েছে – একেবারে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের মতো ! – তাহলে চলা যায় ! আমাদের মতো বাঙ্গালীদের কাছে আবার কোথাও যাবার নাম শুনলেই আগে মনে হয় – কি খাবো ! ভালো হোটেল – নিদেন পক্ষে একটা চলনসই ধাবা ! – আজকাল সবাই এই ধাবা শব্দটাই ব্যবহার করে দেখেছি ! – ভাত পাওয়া যায় কিনা, মাছ পাওয়া যায় কিনা, ইত্যাদি ! পত্রিকায় বা ওয়েবসাইটে সে সব কথা লেখা থাকে না! সিঁথি থেকে বেরিয়ে সোদপুর হয়ে – দুই বন্ধুকে তুলে সোজা মধ্যমগ্রাম হয়ে বারাসাত থেকে টাকি রোড ধরে বসিরহাট ইত্যাদি ! মধ্যে এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্রেক ফাস্ট সেরে নেওয়া গেল । খুবই এলাহি ব্যবস্থা – বন্ধুর বাড়ি থেকে এনেছে ! রাস্তা এত খারাপ ও তার জন্যেই জ্যাম-জমাট ! আগে শুনেছিলাম ঘণ্টা দুয়েক – কিন্তু দেখা গেল চার ঘণ্টা লেগে গেল ধান্যকুরিয়া আসতে ! গায়েন রাজবাড়ি খুঁজতে খুব বেশি অসুবিধে হল না ! যেরকম ধারনা হয়েছিল – প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখবো হয়ত ! আরে এ তো রীতিমত রুপকথার মতো ! সদ্য রং করানো হয়েছে । বিরাট পুরনো আমলের গেট – এক পাল্লা খোলা ! গাড়ি বাইরে রেখে আমরা ঢুকলাম ! ঢুকেই বাঁ দিকে মন্দির – শ্যামসুন্দরের ! আগামী তিন চার তারিখে পুজো ! তাই তার আয়োজন চলছে ! কয়েকজন শ্যামসুন্দরের অঙ্গ প্রক্ষালন করার জন্যে কলকাতার কুমারটুলি থেকে এসেছে । আমি বাড়ির মূল ফটকের ভেতর ঢুকি । বিরাট উঠানের চারদিকে চারটে দালান ! বাংলা সিনেমার স্যুটিংএর স্পট – ক্যামেরার জন্যে রেডি ! কেউ কোথাও নেই । এদিকে জানলার চিকগুলো সব বন্ধ ! তাও আমি চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – কেউ আছেন কিনা – কথা বলতে পারবেন কিনা ! – ওপরে দেখলাম কাপড় শুকচ্ছে ! তার মানে কেউ তো থাকেনই ! বেশ কয়েকবার হাঁকাহাঁকি করার পর ওপর থেকে মহিলা কণ্ঠ শোনা গেল – কেউ নেই – কেউ কথা বলতে পারবেন না ! – বোঝো কাণ্ড ! – বাবা বলছে – বাবা বাড়ি নেই ! - তাও দালানগুলোর কটা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম ! এবার ডানদিকে এগিয়ে দেখি একটা ছোটো মতন প্রবেশপথ । সেখানে একটা বেঞ্চিতে বসে এক মহিলা ফোনে কথা বলছেন ! একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ! জানি তো মহিলাদের ফোন – ব্যাটারি শেষ না হলে কথা ফুরবে না ! – হঠাৎ তিনি উঠে ভেতর দিকে হাঁটা দিচ্ছেন ! – আরে আরে যাচ্ছেন কোথা ! আমি তো আপনার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি !- ওনার এতক্ষণে হুশ হল – সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ! বাকি কথা পরে হবে বলে ফোন বন্ধ করলেন ! আপনাদের কি কারুর সময় হবে আমাদের সঙ্গে একটু কথা বলার ? – আমি মহিলাকে বলতে উনি বললেন – আমার স্বামী এখন ফোনে আছেন । ওনার সঙ্গে কথা বলবেন । ইতিমধ্যে আমাদের সবাই এসে পড়েছে । এত জনকে দেখে বোধয় ওনার খানিকটা উৎসাহ ফিরে এলো । কথা আরম্ভ হয়ে গেল ! ইতিমধ্যে ওনার স্বামীও ভেতর থেকে এসে দাঁড়ালেন ! ওনার নাম আরতি গায়েন ও স্বামীর নাম দেবীপদ গায়েন ! উনি বলেই দিলেন – গাইন নয় কিন্তু – অনেকে আবার গাইন লিখে দেন । গুপী গাইনের মতো ! আমি জিজ্ঞেস করে জানলাম – ওদিকে মানে যেখানে আমি ডাকাডাকি করেছি – সেই দিকে এই পরিবারের এক সরিক থাকে । কিন্তু তারা উত্তর-টুত্তর দিতে পারে না । কোনও লোক এলে কোনও কথা-টথা বলে না ! এখানে তো প্রায়ই - রিপোর্টার বা বাইরের লোকজন আসে ! এইভাবে আমরা ক্রমশ একটা আড্ডার মধ্যে জমে গেলাম ! দেবুবাবুকে ওখানে অনেক কাজ করাতে হচ্ছিল – কেয়ার টেকারকে দিয়ে । যেহেতু সামনের সপ্তাহে উৎসব তাই খুবই ব্যস্ত ! উনিই নাকি প্রত্যেক মাসে এসে এখানে রক্ষণাবেক্ষণ করেন ! – খুব ব্যস্ততার মধ্যেও অনেক অনেক কথা বলে চলেছেন ওনারা ! ওরা যে আড্ডাবাজ তা কে জানতো ! তারই মধ্যে আবিস্কার হল ওদের বর্তমান বাড়ি শোভাবাজার – রাজবল্লভ পাড়ায় । অর্থাৎ বাগবাজারে ! – সেই বাগবাজার কানেকশান ! দেবুবাবুর কথাবার্তায় যা জানা গেল – এই রাজবাড়ি প্রায় দেড়শ বছর আগে তৈরি – উনি নাকি চতুর্থ প্রজন্ম । এই বাড়িতে ওনার জন্ম ! আপাতত সব সরিকের উত্তরাধিকাররাই নাকি সব ভারতের বাইরে কাজ করে । তবে এই উৎসব বা দুর্গা পুজা উপলক্ষে তাদের সমাবেশ হয় এখনও ! কথায় কথায় নহবতখানা দেখিয়ে বললেন – এই নহবতখানার গঠনশৈলী দেখুন । এর নীচের সেকশানটা হল হিন্দু স্থাপত্য ! দোতলায় দেখুন ক্রিশ্চান স্থাপত্য । আর ওপরটা দেখুন – মুসলমান স্থাপত্য ! এখানে সর্ব ধর্ম সমন্বয় ! – সত্যি মুল রাজবাড়ির সঙ্গে মানিয়ে তৈরি করা ! – একটা কথা গ্রামের লোকেদের বলা আছে – এই বাড়ির মর্যাদা এই গ্রামের মর্যাদা ! তাই ওনার অবর্তমানেও যেন এই রাজবাড়ি একইরকম থাকে ! সেটা কতদিন সম্ভব বাস্তবে – তা বলা যায় না ! এই প্রাসাদ এখনও হেরিটেজ হয় নি ! রক্ষণাবেক্ষণ সব এখনও মালিকদের ! কিন্তু এত বড় বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা বিশাল ব্যয় সাপেক্ষ ! কে ভার নেবে ! বিরাট এল টাইপের বাড়ি ! - একদিকে শ্যামসুন্দরের মন্দির আগেই লিখেছি ! এখন উৎসবের সময় বলে বাড়ির ভেতরে আর যাওয়া হল না ! – কিন্তু আমরা আমন্ত্রিত হলাম তিন চার তারিখের পুজোয় ! যেহেতু আমাদের অন্য বাড়িগুলো দেখতে হবে – তাই বিদায় নিতেই হল ! দেবুবাবু একেবারে গেটের বাইরে এসে আমাদের বিদায় জানালেন ! আমাদের ফোন নম্বর আদান প্রদান হল ! তারপর আমরা গেলাম বল্লভবাড়ি ! বল্লভদের একটা বাড়ি গ্যালিফ স্ট্রিটে ছিল । সেখানে আমরা ছোটবেলায় খেলতাম ! তাই মনের মধ্যে একটা উচ্চ ধারনা পোষিত হচ্ছিল ! বল্লভবাড়ি দেখে সেই ভাবটা একটু দমে গেল । সব জানলা দরজাই বন্ধ ! আমি খুজতে খুজতে বাড়ির পেছনে চলে গিয়ে ছবি তুলে নিয়েছি । সেরকম উল্লেখযোগ্য নয় ! তবে সামনে গেটের কাজ গুলো বেশ চিত্তাকর্ষক ! মুস্কিল হল – একজন কেয়ারটেকার । তার নাকি জ্বর ! খুবই অনিচ্ছুক ! একটু কড়া হতেই হল ! আমি ধমকেই বললাম – কেউ যদি নাই থাকে তবে ওয়েবসাইটে দেওয়া কেন ! তখনই সে আমতা আমতা করে শুধু একতলাটা দেখে নিতে বলল ! বল্লভবাড়ির কোনও রক্ষণাবেক্ষণ হয় বলে মনে হয় না ! নানান অংশে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পরছে । - বাড়ির পেছনের দিকে একেবারে জঙ্গল ! শুধু শাপ-খোপ কেন বাঘ ভাল্লুকও অসম্ভব নয় ! এই বাড়ির খুবই জীর্ণ দশা ! - সমানে এত তাড়া দিচ্ছে যে কিছু হাতে দিয়ে আমাদের বেরিয়ে পড়তেই হল ! তারও পর ! যেতে হল সাউ বাড়ি ! জানিনা সত্যি রাজবাড়ি কিনা ! কিন্তু বাড়িটা খুবই ছোট ! – হয়ত এখন পেছনের অংশটা - অন্য বাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে ! চারিদিক বন্ধ জানলা দরজা – ছোটখাটো একটা ভুতুড়ে বাড়ির মতন ! ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে ! সামনে একটা রকে বসে একজন বলল – এখানে কেউ থাকে না । কেয়ার টেকার নেই ! – এটা কার বাড়ি – সে ঠিক করে বলতেও পারল না ! পাশের গলির নামটা দেখে বোঝা গেল এটা সাউদের বাড়ি ! কেউ হয়ত ছিল পতিত চরন সাউ নামে ! তারই নামে রাস্তা । তবে হ্যাঁ ! এ বাড়িটা দেখে বলা যেতে পারে ভৌতিক রাজবাড়ি ! গায়েনদের একটা রাসমঞ্চ আছে একেবারে খোলামেলা ! বেশ পুরনো ! একটা দিনের ঘোরার পক্ষে একেবারে পারফেক্ট ! মনোজ
মানব
ব্যাগটা নিয়ে নেমে যেতেই ড্রাইভার কান্নাকাটি শুরু করল। আমি দাবী করলাম যে আমি তো আগেই বলেছিলাম মিটার চালিয়ে আসতে, তাহলে তো টাইম নিয়ে এত ভাবতে হত না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। আরও পঞ্চাশ টাকা নিয়েই ছাড়ল। বিগত পাঁচ বছরে কোলকাতার জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ। আবার দিল্লী শহরে বিগত দুই বছরেই সেই সংখ্যাটা প্রায় দশ লক্ষ। জনগণনার বাইরে হয়ত সংখ্যাটা আরও বেশি হবে। সে যাইহোক জীবনযাত্রার সুবিধা যত বাড়বে জনসংখ্যা ততই বাড়বে এ আর আশ্চর্য কি। কিন্তু সমস্যাটা হল ক্যাপাসিটি – ধারণক্ষমতা। আমাদের প্রিয় শহরগুলি আর কতদিন এভাবে আমাদের আশ্রয় দিতে পারবে? তিন বছর আগেও এতটা রাস্তাভর্ত্তি জনতা দেখতে পেতাম না। আর এখন অফিস যেতে মাত্র দশটি মিনিট লেট হলে পাক্কা এক ঘন্টা কাটিয়ে দিতে হয় দশ মিনিটের রাস্তায়। অফিস তো নাহয় সময়ে পৌঁছে গেলাম, কিন্তু ফেরার সময়? আট ঘণ্টার চাকরি, লাঞ্চ টাইম মিলিয়ে সাড়ে আট বা ধরুণ নয় ঘন্টা কাটিয়ে যেই বেরিয়েছি, ওব্বাবা! দেখতে পাবেন জনতা কারে কয়। তবে দশঘণ্টা অফিস করে বেরোলে কিন্তু আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি চলে যেতে পারবেন, ভিড় ছাড়াই। কিন্তু খামোকা দশ ঘন্টা করতে যাবেন কেন আপনি, যেখানে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে চলছে এত আলোড়ন! সেদিন বরাবরের মত অটোয় চেপে অফিস যাচ্ছি, রাস্তা মোটামুটি বন্ধ। পাঁচ মিনিটে দুপা দুপা করে এগোচ্ছে। সবার গা ঘামে ভিজে একাকার, হত কারও কারও মাথাও ঘেঁটে ঘন্ট। এরই মাঝে দুএকটা মোটরবাইক টেনেটুনে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগল। একজন তো ধরাশায়ীও হল একবার। স্পিড তেমন ছিল না তাই আঘাতও তেমন লাগেনি। কিন্তু সে চালক এমন এক হিরোসুলভ ভাব দেখিয়ে বাইকটাকে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল, দেখে যেন মনে হল কিছুই হয়নি। [এখানে একটা উদাহরণ না দিলেই নয়। শীতকালে নিশ্চয়ই সবার ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু সেই ঠাণ্ডায় কানে মাফলার বাঁধা বা টুপি পরাকে পৌরুষের অপমান বলে মনে করেন কেউ কেউ, এবং যথারীতি খালি মাথায় সমস্ত ঠাণ্ডাটা সহ্য করে পৌরুষ জাহির করে ঠাণ্ডা লাগিয়ে বসেন।] পাশের লেনটা খালি ছিল। আমার অটোচালক সেদিক দিয়ে ঘুরিয়ে গাড়িটা একটু এগিয়ে দিল। হঠাৎ পিছন থেকে একজন একাকী গাড়ির মালিক বেড়িয়ে এসে শুরু করল চরম অপমান। - এই তোমাদের মত অটোওয়ালারা আছে বলেই রাস্তায় জ্যাম লাগে। খালিই এদিক ওদিক করবে আর রাস্তা ব্লক করবে। বেচারা অটোওয়ালা নিজের কোন দোষ দেখতে না পেয়ে চুপ করে রইল। ভাবছিলাম, হ্যা ভাবছিলাম... কে বেশী দায়ী। পাশের লেন দিয়ে (যদিও রং সাইড নয়) একটু এগিয়ে নিতে চাওয়া অটোওয়ালা, নাকি একার জন্য ইয়াব্বড় একটা গাড়ি নিয়ে রাস্তা বুক করা গাড়িওয়ালা? প্রশ্নটা রয়েই যাবে, এবং জ্যামও। কারণঃ ১. পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ভিড়ে ঠাসা। ২. একা গাড়ি চালালে/ অড ইভেন লঙ্ঘন করলে ফাইন করবেন কাদের? যাদের ওইটুকু ফাইনে কিচ্ছুই যায় আসেনা তাদের? দেশে ভি. আই. পি. এর অভাব আছে কি? ৩. জনসংখ্যা কমাবেন কি করে? জন্মনিয়ন্ত্রণ? সে তো জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারকে কমানোর সামান্য প্রচেষ্টা মাত্র। ৪. ট্রাফিক সিগ্ন্যাল তো ভিড়কে থামায়। গতিকে আরও রোধ করে। এ দিয়ে সাকুল্যে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ তবুও হতে পারত। কিন্তু কজন মানে? আমি নিজেই তো ট্রাফিক লাইটে বিশ্বাস করে দু বার মরতে মরতে বেঁচেছি। ভাবনার জালের বিস্তার আজ এটুকু। বাকি গল্প কমেন্টে হোক।
অলভ্য ঘোষ
পাগলী বুকে দুধ ভর্তি স্তন দুটো ছেঁড়া ব্লাউজের ফাঁক ফুঁড়ে যেন বের হয়ে আসতে চাইছে। ফুটপাতের কোনায় কাটা মুরগির মতো লাল টুকটুকে নাড়ি ভুড়ি জড়ানো রক্ত স্রাব ভেসে যাওয়া ধুলায় ধুকপুক করছে মানবের ভ্রুণ। পথ চলতি লোকেরা যেন ভিড় করে সিনেমা দেখছে। দুই হাতের উপর ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেও পড়ে যায় দুর্বল পাগলী টা। প্রসবের আবর্তে ক্ষরণ হয়েছে অনেকটা রক্ত। এতটা রক্ত ঝড়ে এ দেশের স্বাধীনতাও আসেনি। দূরে এক সাংবাদিক গল্পটাকে খবরের হেডলাইনে পরিবেশিত করতে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল খুঁজে চলেছে। ট্রাফিক পুলিশ ভিড় সরাতে ব্যস্ত। ভোটের প্রচারে লালবাতি সাইরেনওলা মন্ত্রী যাবেন এ পথ দিয়ে। প্রসূতি পাগলীর খবর পেয়ে কোন এক খ্রিস্টান মিশনারীর লোক এসে হাজির। ভ্যাটিক্যান সিটি থেকে তাদের নাকি কেউ আবার সন্ত উপাধি-ধারী। হাড়হাভাতে এদেশের সদ্যজাতের চাহিদা খুব বিদেশে। মোটা মোটা ডোনেশন দেয় তারা। এই তো কদিন আগে ইঁদুর ছানার মত বড়দির নার্সিং হোমে রেট করে মিলেছিল চালান হবার জন্য প্রস্তুত কলকাতার নবজাতক। মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস সমাজ সেবিকারা যেন এগিয়ে চলেছে গোয়েন্দাদের মত পাগলী টার দিকে। পাবলিকের চোখের পাতা পড়ছে না। -কে মা করেছে পাগলীটাকে? -অপজিশন। কখন যেন লাল বাতি সাইরেন বন্ধ করে গাড়ির সওয়ার ন্যাওটা পুলিশকে কানে কানে ফিসফিস করে বলে; -ভালো করে একটা ইনকয়েরি করে দেখো! এ দেশের রাজনীতির বেশ্যারা প্রচার পেতে নিজের মাকেও লাইনে দাঁড় করায়। বিরোধী ক্যাডারদের হাতে পাগলির ধর্ষণ! হট কেক।কোটে প্রমাণ হতে হতে ভোট ফুরাবে। বিরোধীরাও সদলবলে উপস্থিত হলো। একদল বিরোধী পাগলীর জাত খুঁজে পেল। পাগলী টাকে বলল সীতা মাইয়া; রাবণ নয় ধর্ষনের তীর মহম্মদের দিকে। আর এক দল বিরোধী; ধর্মের ভোট নয় মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বিঘ্ন তারা গদি হারানোর পর থেকে। শাসকের ব্যর্থতা ঝান্ডা উড়িয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে ময়দান কাঁপাচ্ছে যখন;র্যাব নামার আগে পাগলী টা হঠাৎ একগাদা থুতু ছুড়ে দিল সংবিধানের দালালদের মুখে। ঘৃণার সে বজ্র নিক্ষেপে বিন্দুমাত্র গরল ছিল না অ্যাসিডের মত । খসে পড়ল না দাঁত ,মুখ ,নাক-চোখ; পুড়ে ছাই হলো না এদেশের মেকি গণতন্ত্র; সার্বভৌমত্ব! কারো কারো ইচ্ছে করলো পাগলীটার তলপেটে ছুটে দিয়ে কেঁত কেঁত করে লাথি কষিয়ে দিতে। সাহসে কুলালো না। উৎসুখ মানুষের ভিড়ে কত মানব দরদী মোবাইলে বন্দি করে চলেছে গোটা দৃশ্যপট । নারীবাদী মানবতাবাদীরা মিডিয়ায় বসে সন্ধ্যাবেলায় গালভরা মানব অধিকারের বহু চর্চিত,চর্বিত বুলি কপচে বাড়ি ফিরে বিছানায় শরীর চায় স্ত্রীর। মাসিকের অসম্মতির ও বারণ মানে না। কারো আবার প্রিয় নারী কখনও কখনও স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে থানায় পৌঁছলে ছোটবেলার টিকার দাগের মত বুদ্ধিজীবীর প্রিয় ব্যান্ডের সিগারেটের ছ্যাঁকা মেলে শরীরের আনাচে কানাচে। টিপ্পনি নয়! বাসে, ট্রামে ,মিছিলের ভিড় ঠেলে ভারতবর্ষের নারী বাড়ি ফিরে গা আলগা করে গোণে তার স্তনের উপর নখের আদমশুমারি। পাগলীটা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো আবার; -"ভালবাসা না বাল! শুধু চোদার তাল।" কেউ কেউ ফিক ফিক করে হাসল। কেউ কেউ মুখ চাওয়া চাই করল । কুকুর ধরার মত ফাঁসকল করে পাগলী ধরা হলো। পাছায় ইনজেকশন ফুটতে ঘুমে ঢলে পড়ল সে। সভ্য সমাজের উদ্দেশ্যে তার অসভ্য কথাটির তাৎপর্য বুঝলো না কেউ! আজকের শিশু বাঁচবে কিনা জানি না; কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারিকা পর্যন্ত সমস্ত ভারতবর্ষের ভারত মাতা মনে হলো পাগলিটাকে। সে ছাড়া আমরা সকলেই অসুস্থ। © অলভ্য ঘোষ অনুলিখন: নিবেদিতা পাল
মনোজ ভট্টাচার্য
উধাও একটা দিন ! মনে পড়ে অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টি ডেজ ! যখন ফিলিয়াস ফগ ও জাঁ পামপর্তু - ফিরে এসে দিন গুনল – তখন দেখল আশি দিন হয়ে গেছে ! – মনেও ছিল না পুবদিক থেকে ঘুরলে একটা দিন ফেরত পাওয়া যায় ! আমারও কদিন ধরে খুব দিন ভুল হয়ে গেছে ! – এখন আর আমার দিন কি প্রয়োজনে লাগে ! দিনগুলি কিন্তু দেওয়ালে ঝোলে ! - তাই যখন কোথাও যেতে টেতে হয় – তখনি ক্যালেন্ডার দেখি ! অনেকটা আয়না দেখার মত ! আজকাল আমি আয়না দেখতেও ভয় পাই ! শুধু দাড়ি কাটার সময়ে আয়নার লোকটাকে দেখতে হয়! সাদা ফেনায় লাল ছোপ না পড়ে ! সে যাই হোক – বুধবার রাজা অয়দাপাউসকে দেখতে গেছিলাম বাগবাজার মঞ্চে । তখন দিনটাও মনে ছিল । তারপর গতকাল একটা বিশেষ কাজে যেতে হল ব্যারাকপুরে । শুধু যেতে আসতে এত সময় লাগে – ওখানেই বোধয় দিনের হিসেবটা গোলমাল হয়ে গেছে ! আমার দৃঢ় ধারনা জন্মে গেল – সেটা শনিবার ! অথচ ভিড় ভাট্টা অন্য দিনের মতোই ছিল ! রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নটা । পরের দিন রোববার যেহেতু একটা কাজ আছে – তাই মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম ! সকালে বাজারে গিয়ে সব কিনে কাগজ নিতে গিয়ে - দিল একটা ! রোববার তো দুটো নেওয়ার কথা ! আজ দুটো কাগজ না ?- কাগজওলা বলল – কেন জ্যেঠু ! শনিবার তো একটাই নেন ! শনিবার তো একটাই নিয়েছি ! আজ তো রোববার ! – আজ তো শনিবার ! – আপনার দিন ভুল হয়ে যাচ্ছে ! পাশ থেকে আরেকজন আমি বলে উঠল - আমাদের আবার শনিবার-রোববার কী ! সবই তো রোববার ! – সে তো ঠিক কথাই বটে ! চার্লস ল্যাম্বের সেই সুপার অ্যানুয়েশান – আমরা শনিবার রোববারগুলো হারিয়েছি ! হাতে কাগজখানা নিয়ে দেখি – শনিবারই বটে ! কাগজের খবর – সত্যি-মিথ্যে যাই লিখুক না কেন – দিনটা ওরা ঠিকই রাখে ! বেশ আজ শনিবার ! তাহলে গতকাল নিশ্চয় শুক্রবার ছিল ! – তাহলে বুধবারের পরের দিনটা কোথায় গেল ? বৃহস্পতিবার ! বৃহস্পতিবার কোথায় গেল ! আর এখানে বৃহস্পতিবার দিনটা তো নীরবে উবে যেতে পারে না ! সব বাড়িতেই বৃহস্পতিবারকে প্রায় বেঁধে রেখে দেয় – পাছে দিনটা ফুরুত করে পালিয়ে না যায় ! সকালে ফুলউলির কাছে দর কষাকষি করে ফুল কেনা ! শশা-কলা কেনা ! সেখানেও প্রায়ই দেখি ফলওলার কাছে বাপান্ত ঝগড়া ! – মিষ্টির দোকানে ভিড় – ওরে আমারটা আগে দে-রে ! বেস্পতিবারের সেসব ক্ল্যাসিকাল ঘটনা কোথায় গেল ! অনেককাল আগে বিমল করের একটা গল্প পড়েছিলাম – অনেকটা এরকম ! একটা লোক কোন এক মাইনিং অঞ্চলে গাড়ি চালিয়ে এক জায়গা থেকে দুরে আরেকটা জায়গায় যাবার সময় – ছোটো একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিল । - তারপর উল্টোদিক থেকে আসা কোনও গাড়ির চালকের সাহায্যে আবার গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছল সেইদিন অনেক রাতে । ক ঘটা পরই দিন পাল্টে গেল – স্বভাবতই বারও পাল্টে গেছে । - কিন্তু সেই লোকটি কিছুতেই দিনটা মেলাতে পারছে না ! একটা আস্ত দিন তার ক্যালেন্ডার থেকে হারিয়ে গেল ! ও, আরও একটা হিন্দি সিনেমাও দেখেছি । সেখানে নায়িকা কোন এক বারে পান করতে ঢুকেছিল । দু-তিনজন লোক তাকে বেহুশ অবস্থায় তুলে নিয়ে গেছিল – মজা লুটবে বলে । - কিন্তু সেখানে কিভাবে অজয় দেবগন এসে তাকে বাঁচাল । পরে সে বলল – রোববার সে একটা সিনেমা দেখে বারে ঢুকেছিল । কিন্তু অজয় যখন তাকে বাঁচাল – তখন মঙ্গলবার হয়ে গেছে ! – তাহলে সোমবারটা গেল কোথায় ! – সিনেমাটার নাম সানডে জাতীয় কিছু ! সিনেমা হিসেবে কিছু নয় – কিন্তু মিসিং দিনের ঘটনাটা দারুণ ইন্টারেস্টিং ছিল ! এত ধানাই পানাই করার পরেও আমার সাধের বেস্পতিবার দিনটা কোথায় গেল ? কিছুতেই মেলাতে পারছি না কেন ! – জীবনে আমরা কদিনই বাঁচি ! বিশেষ কোনও ঘটনা ছাড়া আমরা তো মনেই করতে পারিনা সেই অকেজো দিনগুলোর কথা ! তাহলে সেই দিনগুলো তো আমাদের বিস্মরণীয় হয়ে আছে নাকি ! সেগুলোর কে হিসেব রাখে ! কিন্তু তবু – আস্ত একটা দিন কি ভাবে উধাও হয়ে যাবে জীবন থেকে ! মনোজ
চঞ্চল
ফিরে দেখা - আমি বিকাশ বলছি ........................................................ হঠাৎ করেই গতকাল পিতাজি আমাকে তার ঘরে ডাকলেন| পারতপক্ষে বাবার সাথে আমাদের কথাবার্তা কমই হয়| আর পাঁচজন সাধারণ পিতা-পুত্রের মত সম্পর্ক আমাদের নয়| সবসময় একটা দুরত্ব বজায় থাকে| যে দুরত্বের সবটাই সন্মানের‚ শ্রদ্ধার আর পারিবারিক প্রথা মেনে| পিতাজি ডেকেছে কেন সেটা বেশ রহস্যের| খুব দরকার না থাকলে তো আমাদের ডাকেন না| কিন্তু সেই ডাককে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই| দাদারাই কোনদিন পারল না‚ আমি তো কোন ছার! - এসো আমার কাছে বসো| পিতাজি যে ডিভানে বসে হুক্কা খাচ্ছিলেন‚ আমি তার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসতে গেলাম| - নাহ‚ ওখানে নয় আমার কাছে এসে বসো| এবার আমার চমকানোর পালা| বাবা তো কখনো এমনভাবে আমাকে কাছে ডাকেননি! মনেও পড়ে না কখনো এমন মুহুর্ত আমার জীবনে এসেছে| - আমাকে তোমরা খুব ভয় পাও তাই না? - হাঁ জি‚ না জি !! থতমত খেয়ে যাই‚ ঠিক কি বলতে হয় এমন পরিস্থিতিতে আমি তো জানি না| বাবা মুচকি হাসলেন একটু| এটাও বেশ দুর্লভ| আজ কেন জানি না সব কিছু ভীষন ভালো লাগছে| মনে হচ্ছে মা আর দাদিকে বাদ দিলে এমন আপন ব্যবহার বাবার কাছ থেকে কখনো পায়নি| এই প্রথম বাবাকে বড় আপনজন মনে হচ্ছে| বাবার খুব কাছ ঘেঁষে বসলাম আমি| - আমি জানি‚ আমি জানি‚ তোমরা সবাই আমাকে ভয় পাও| পিতাজি কথাগুলো বলতে বলতে মাথা নাড়লেন| একটু দুরে দাঁড়ানো বাবার খাস নৌকরকে হাতের ইশারা করতেই সে তাড়াতাড়ি এসে বাবার সামনের টেবিলে রাখা বাহারি গ্লাসে দারু ঢেলে দিল| বাবাকে কখনও দারু খেয়ে নেশা করতে দেখিনি| খাওয়ার পর একটু খান মাপ বুঝে| ভরা গ্লাসে চুমুক দিয়ে পাশে রাখা তোয়ালে দিয়ে মোচটা মুছলেন| তারপর বললেন‚ - যে জন্য তোমায় ডেকেছিলাম‚ সম্বন্ধীজি আজ এসেছিলেন ওঁনার একটা প্রস্তাব নিয়ে| উনি চান বিয়েটা তোমার পরীক্ষার আগেই হয়ে যাক| - কেন? বেশ জোরেই হয়ত শব্দটা বেরিয়েছে আমার মুখ থেকে| পিতাজি দেখলাম ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন| - আগে পুরো কথাটা শোন| ওঁনার মাতাজির শরীর খুব খারাপ| যেকোন সময় যা কিছু একটা হয়ে যেতে পারে| মাতাজির ইচ্ছে উনি ওঁনার প্রিয় নাতনীর বিয়ে দেখবেন| তুমি তো জানো সম্বন্ধীজির ইচ্ছে ছিল তুমি মাট্রিক পাশ করলে বিয়েটা দেবেন‚ কিন্তু ওঁনার মাতাজির জন্য উনি বিয়েটা এগিয়ে আনতে চেয়ে আমার হাত ধরে অনুরোধ করলেন| আমি ওঁনাকে কথা দিয়ে দিয়েছি| সেইমত আমরা তৈয়ারি শুরু করে দিয়েছি‚ তুমিও তৈরি হও| - লেকিন পিতাজি‚ আমি কিছু বলবার অক্ষম চেষ্টা করলাম কিন্তু বাবা থামিয়ে দিলেন‚ -তোমাকে জানিয়ে দিলাম মাত্র| এখন তুমি যেতে পারো| মাথা নিচু করে পিতাজির ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম| বাবার মুখের ওপর কথা বলার মত স্পর্ধা আর সাহস কোনটাই আমার নেই| এখন সেটা পরিস্কার হল| কিন্তু ঠিক এখনই তো আমি বিয়ে করার জন্য মনে মনে তৈরি নই| আমার তো কত কাজ বাকি আছে‚ অনেক কিছু করতে হবে| সেদিনের কথা খুব মনে পড়ছে| অন্তরাকে চিঠি দিয়েছিলাম খুব আশা নিয়ে| অন্তরা উত্তর দেয়নি| উল্টে ওদের পাশের বাড়ির সন্তোষ ভৈয়া এসে আমাকে ধমকে গেল| আমি চাইলে তখনই ওর কাম তমাম করে দিতে পারতাম‚ এত গুস্সা আমার হচ্ছিল| বিকাশ ঠাকুর সে পঙ্গা!! কিন্তু আমি চেপে গেছিলাম| এক তো চিঠিটা দিয়েছিলাম সেটা কেউ জানতই না| এই ব্যাপারে আমি জানি আমার বন্ধুরা আমাকে হেল্প করবেই না| এমনকি আমার সবসে করিবি দোস্ত চন্নুও আমাকে হেল্প করছে না| তাই চন্নুকেও চেপে গেছি ব্যাপারটা| তবে একমাত্র চন্নুটাই আমাকে একটু বোঝে‚ দিল খোলকে ওর সাথেই কথা বলা যায়| কিন্তু কেন জানি না এই ব্যাপারটায় ও একদম আমায় হেল্প করছে না|একবার তো ব্যাটা বচ্চা সিংয়ের কাছে অচ্ছাখাসা ধুলাই ভি করিয়ে দিল| বাইরের বাগানে চলে এলাম| মগরমছ তলাবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম| কাজের লোকেরা ওখানে ওদের খেতে দিচ্ছে| ওদের খেতে দিতে আমারও খুব ভালো লাগে| -ছোটেমালিক ইয়ে লো‚ ইনলোগো কো খিলাও| একজন এগিয়ে এসে কাঁচামাংসের বালতিটা আমার দিকে এগিয়ে দিল| - নাহ! তোরাই খাওয়া‚ বলে নিজের ঘরে চলে আসলাম| মনটা বেশ চঞ্চল হয়ে আছে| অন্তরার সাথে কি সন্তোষ ভৈয়ার কিছু চক্কর আছে? কোথায় অন্তরা আর কোথায় সন্তোষভৈয়া! বেতুকি সোচ‚ কিন্তু অসম্ভবও নয়| কাউকে লাগাতে হবে অসলি বাত জাননে কে লিয়ে| সন্তোষ ভৈয়া‚ লোক মোটেই ভালো না| শহরে একটা রেস্টোরেন্ট-কাম-বার আছে| খুব খারাপ লোগোকে সাথ উঠনা-বৈঠনা ওর| কি যেন নাম ওর বারটার.. মনে পড়েছে "শাকিবালা"| অনেক খারাপ মেয়েরা তো ওখানে যায়| হে ভগবান‚ অন্তরা যেন ঐ লোকের পাল্লায় না পড়ে| তবাহ হ যায়েগি ও লড়কি!! এখুনি কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হয়| বাইকটা বের করলাম| কপাল বটে আমার ‚ ঠিক এসে হাজির বাবার বিশ্বাসী লেঠেল সিপাহি| - ছোটামালিক মেঁ বৈঠটা হুঁ আপকে পিছে| বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে বসেই পড়ল বাইকের পিছনে বন্দুকটা কাঁধে নিয়ে| যদিও জানি সিপাহী বাবার অনুগত তবু আমাকেও কিছুটা সমঝে চলে| - এক বাত য়াদ রখ‚ এখন কোথায় যাচ্ছি‚ কেউ যেন জানতে না পারে| মনে থাকবে? - হাঁ ছোটে মালিক| হাওয়াতে ভর করে বাইকটাকে উড়িয়ে একেবারে শাকিবালা বারের সামনে হাজির হলাম| বাইকটা আর সিপাহীকে বাইরে দাঁড় করিয়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম| এই প্রথম আমি এখানে এলাম| জমজমাট বার| সিগারেটের ধোঁয়া আর দারুর উৎকট গন্ধে জায়গাটা একদম যেন নরক লাগছে| আমাকে লল্লন বলেছিলে ও এইখানে কাজ করে| একজন ওয়েটারকে জিজ্ঞাসা করালাম‚ - আপ এহি পে রুকে‚ মে উসে বুলা দেতা হুঁ| আমি বাইরে চলে এসে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম| লল্লন আমাদের মুন্সির ছেলে| আমার খুব অনুগত| লেখাপড়া তেমন একটা ওর দ্বারা হবে না বুঝেই এই বারে কাজ নিয়েছে| বেশ চৌকস ছেলে| -আরে ছোটে মালিক‚ আপ য়হা? আমাকে ডেকে নিতেন| এখানে কি ব্যাপার| - না‚ একটা জরুরী দরকার আছে| একটু দুরে চল ‚ কথা আছে| বার থেকে বেশ একটু দূরে একটা চায়ের দোকানে চলে এলাম| -শুন তেরে কো এক কাম করনা হ্যায়‚ সন্তোষ ভৈয়া হ্যায় য়ঁহাপর? - হাঁ উপরে আছে‚ যেখানে ডান্স চলছে| ও বলে| - একটা কথা বল‚ সন্তোষ ভৈয়ার সাথে কি আমাদের স্কুলের বাসুস্যারের মেয়ের কোন চক্কর আছে?সচ সচ বোলিও| লল্লন একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমার দিকে বোকার মত তাকিয়ে রইল| ওর হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছিল ও অনেক কিছুই জানে‚ কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছে| - ডর মত‚ সচ বতা আমি ওকে আশ্বস্ত করে জানতে চাইলাম| -ছোটেমালিক আমার নৌকরি চলে যাবে ভৈয়া যদি জানতে পারেন| -নৌকরি যাবে না‚ তুই সব বল| আমি ওকে আবারও আশ্বস্ত করলাম| -মালিক চক্কর তো হ্যায়| ওর কাছ থেকে যা জানলাম সেটা হল‚ সন্তোষ ভৈয়া প্রায়ই বনারস যায়‚ অন্তরার সাথে দেখা করতে| ওদের মনে হয় কিছু প্ল্যান আছে‚ কিছুদিন আগে লল্লন শুনেছিল সন্তোষ ভৈয়া বেশ কিছুদিনের জন্য বনারস যাবে‚ তারপর সেখান থেকে অন্য কোথাও| কিন্তু ঠিক কোথায় যাবে সেটা শুনতে পায়নি| - ঠিক হ্যায়| অব যা‚আরও কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাতে ভুলবি না‚ ঠিক হ্যায়| - অচ্ছা মালিক‚ লেকিন দেখনা মেরি নৌকরি না চলি যায়ে| ওর চোখের কাতর অনুনয় আমার চোখ এড়ায় না| আমি বাইকে উঠতে উঠতে ওকে হাত তুলে আশ্বস্ত করলাম শুধু| মাথাটা ঠিক কাজ করছে না| এবার কি করব আমি? সামনেই বিয়ে‚ অন্তরা বনারসে| জানি অন্তরা আমায় ভালোবাসে না| আচ্ছা ও কি সত্যি জানে না সন্তোষ ভৈয়া কিরম বাজে লোক| কি করে ওর সাথে জড়িয়ে পরল? বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে| কার কাছে যাব? কাকে জানাব এসব কথা? কে আমায় বুদ্ধি জোগাবে? চাইলে আমি নিজেই অনেক কিছু করতে পারি‚ কিন্তু সিচুয়েশন কুছ অলগ হ্যায়| শালা চুন্নুকে পাশ যাব? কিন্তু বেশ রাত হয়ে গেছে| এখন যদি চন্নুর কাছে যাই তাহলে ফিরতে দেরি হবে| বাড়িতে শোরগোল পড়ে যাবে আমাকে খোঁজার জন্য| এমনিতেই ফতোয়া আছে‚ বিয়ের আগে আগে বাড়ি থেকে বেরোনো চলবে না| কাল বরং চুন্নুর সাথে একবার দেখা করে নেবো| রাতে দাদির কাছে শুয়ে পড়লাম| বাবার কাছে বকুনি খেলে‚ মনখারাপ থাকলে আমি দাদির কাছেই শুই| দাদির পিঠে মুখ গুঁজে দিলেই আমার ঘুম চলে আসে| দাদির গায়ের গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগে| দাদি জিজ্ঞেস করেছিল‚ - কেয়া রে আজ ফির পিতাজি সে ডাট খায়া কেয়া? -উঁহু বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম| দুদিন বাদেই বিয়ে| বাড়িতে নাতে-রিস্তেদার ভরে গেছে| আজ সত্যনারায়ণ কথা আছে সকালে‚ তারপর কুলদেওতার পুজো হবে| পুরো মহল লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে| বনারস থেকে সাহনাইও এসেছে| সুবহ সে পোঁ পোঁ করে দিমাগ কা চটনি করে দিয়েছে| আমাদের তো অনেক রসম| এরপর হলদি কুটাই‚ মাতৃপুজন‚ সিলপোহা‚ ইমলি ঘুটাই কত যে কান্ড| দিমাগ খরাব করে রেখে দিয়েছে| কখন যে চুন্নুওয়ার কাছে যাব জানি না| কিন্তু যেমন করেই হোক একবার দেখা করতেই হবে| বিকালে আবার পিতাজির কিছু পরিচিত মিনিস্টাররা আসবেন‚ তাদের জন্য জবরদস্ত খানাপিনার আয়োজন হয়েছে| তখনই একটু যা সময় পাওয়া যাবে| সিপাহিকে আগে থাকতেই বলে রাখি বরং‚ একা তো বেরোতে দেবে না| চাচাদের বাড়ি থেকে কেউ আসবে না| ওদের তো নেওতাই দেওয়া হয়নি| শাম হতে হতে আমার যে কি বুরা হালত হয়েছে কি বলব| সারা বদন টুট রহা থা| কিন্তু চুন্নুর কাছে একবার না গেলে তো নয়| এখন ঘড়িতে ৭-৩০ বাজে| গেস্টরা সব এসে গেছে| দারুর ফোয়ারা চলছে বাইরের বাগানে| এক্দম সহি সময়| সিপাহিকে ডেকে বাইকে করে সোজা চুন্নুর চাচার বাড়ি| - এ চুন্নুওয়া বাহার আ যা| - ওয়ে তু য়হা!! চুন্নু অবাক‚ আরে তোর শাদি দুদিন পর‚ তুই বেরোলি কেন এখন? তোর বাবা জানলে তোকে কুটে রেখে দেবে রে!!| - বকওয়াস বন্ধ কর‚ চল আমার সাথে| - কঁহা? -দরকার আছে তোর সাথে| চল রাজভোগ এ গিয়ে কেবিনে বসে কথা বলব| তুই সাইকেল নিয়ে আয়‚ আমি ওখানে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি| এই মুসুন্ডটা সাথে আছে তাই‚ না হলে তোকে সাথে নিয়েই যেতাম| জলদি আ| বলে সোজা রাজভোগ রেস্টোরেন্টে চলে এলাম| সিপাহিকে বাইরে চা-পানি দিয়ে বসিয়ে আমি কেবিনের ভিতর চলে এলামা| কেবিনে পারতপক্ষে কেউ একটা বসে না‚ কেউ বসে গালগল্প করলেও কেউ ডিস্টার্ব করে না|চুন্নুর পসন্দের আইটেম সামোসা আর রসমালাই আর্ডার করে বসতে না বসতেই চুন্নু দেবা কে নিয়ে হাজির| -বৈঠ যা| - কি ব্যাপার কিছু গড়বড় করেছিস মনে হচ্ছে| চন্নু বসতে বসতে সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল| ইতিমধ্যে খাবার হাজির| আমি আর দেরি না করে আদ্যোপান্ত সব ওদের বললাম| খেতে খেতে ওদের খাওয়া প্রায় মাথায় ওঠার জোগাড়| গোল গোল চোখ করে ওরা আমার কথা শুনছিল| - সালে ইতনা ক্লুছ হো গয়া? - এবার বল কি করি? আমার অবস্থা তখন ডুবতে হুয়ে কো তিনকে কা সহারার মত| - কিন্তু তুই একটা কথা বল‚ তুই কেন অন্তরার ব্যাপারে এত খোঁজখবর করছিস? - দেখ ভাই আমি তো বিয়ে করেই নিচ্ছি| কিন্তু বাসুস্যার‚ অন্তরার কিছু উল্টা-সিধা হলে স্কুলে মুখ দেখাতে পারবে না| আর তোদের বঙ্গালী সমাজও ওঁনাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে|কুছ ভি হো‚ স্যার আমাকে পছন্দ করে না জানি‚ কিন্তু উঁনকি ইজ্জত পে আঁচ আয়ে এটা আমি চাই না| আখির হমারে স্কুলকা ইজ্জত কা সওয়াল ভি তো হ্যায় না| আমি সত্যিটা বলতে পারলাম না ওদের| বাসুস্যারের জন্য না‚ অন্তরার জন্য এসব কিছুই আমি করছি | এ সত্য ওদের বলতে পারলাম না| -সালে কো মরওয়া দে কেয়া? - তোর মাথা খারাপ হয়েছে| এক্দম এসব চিন্তা করবি না| যা মাল তুই‚ মাথাগরম করে ওসব করেও ফেলতে পারিস| বনারসে তোদের জানাশোনা কেউ আছে? চন্নু বলল| - হাঁ হ্যায় তো| - কে? - আমার বাবার বন্ধু এক মিনিস্টারের বেটা| বনারস গেলে আমরা ওদের বাড়িতেই উঠি তো| সহি বতায়া য়ার| ওকে বলি লোক লাগিয়ে ওদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে? -এক্দম তাই কর| সন্তোষ ভৈয়া মনে হয় না জলদবাজিতে কিছু করবে| ওর ঘর-বাড়ি‚ বার সব এখানে| জানাজানি হয়ে গেলে এখানে টেঁকা মুশকিল হয়ে যাবে| -লেকিন উস হরামির ওপর ভরসাও তো করা যায় না| আমি বললাম| -দেখ ভাই‚ এরপরও যদি কিছু হয় তবে আমি বলব অন্তরার নসিব| এত বুদ্ধিমতী মেয়ে ও| আমার মনে হয় না এমন কিছু করবে যাতে ওর ফ্যামিলির ইজ্জতের ফালুদা হো যায়ে| চন্নু বলল| - রহনে দে তু| অত যদি বুদ্ধিমতী‚ তাহলে ঐ হরামির সাথে ইস্ক করবে কেন? চন্নুর কথা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম| -ছোড় না য়ার| তুই কেন এত উতলা হচ্ছিস? এসব ছাড় আর মন দিয়ে বিয়েটা কর| হোনেওয়ালা বিবিকা ফটো লায়া হ্যায় কেয়া? হামে ভি দিখা| চন্নু আর দেবা দুজনেই বলল| -ভাগ সালো কাম কা না কাজ কা‚ ঢাই মণ অনাজ কা| আমার ভিতরে কি চলছে কি করে বোঝাই ওদের| ওরা হাসি-মজাক করছে| আরও বেশ কিছুক্ষণ চলল এসব| তারপর আমরা উঠে পরলাম বাড়ি ফেরার জন্য| - সালো‚ ঠিক সময়ে শাদি পে পৌঁছে যাস‚ দেরি করিস না|তোরা কেউ না থাকলে আমি কিন্তু বিয়েতে বসব না| - ফিকর নট| আমরা পৌঁছে যাব| আমি‚ সিপাহিকে বাইকের পিছনে বসিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন পার্টি একদম জমজমাট| দু একজন তো টল্লি হয়ে বাইরে বাগানেই উল্টে পরে আছে| হলের ভেতর যারা বসে অছে তাদের অবস্থাও টাইট| বাইরে কত যে পুলিশ আর হওয়ালদার এসেছে আর সেইমত তাদের পার্সোনাল বডিগার্ড| সালে কুত্তেলোগ যতই পয়সাওয়ালা হোক না কেন ফোকটে দারু পেলে‚ মাথার চোটি পর্যন্ত গিলবে| যানে দো! আমার কি? হলে ঢুকে দু একজন যারা তখনও হুঁশে ছিল তাদের গোর লাগি আর নমস্তে করে নিলাম| দু-একজন বিয়ে নিয়ে ভদ্দা মজাকও করল| আমিও মুচকি হেসে‚ সৌজন্য দেখিয়ে ওখান থেকে কেটে পরলাম| বচপন থেকে দেখে আসছি এসব‚ নতুন কিছু নয়| এসব নিয়ে এখন মাথা না ঘামিয়ে এখনই একবার বনারসে ফোন করা দরকার| কপাল ভালো ছিলা‚ ফোনটা ঠিকঠাকই কাজ করছে| নাম্বার মেলাতে পেয়েও গেলাম| - জগদিশভৈয়া আমি বিকাশ বলছি... একটু উদাস হয়ে যাচ্ছি আমি| রাত পোহালেই বিয়ে আমার| আজ সব মনের কথা খুলে বলতে চেয়েছিলাম চুন্নুকে| কিন্তু বলা হল না| কি বা বলতাম? ইস্ক কিসিসে শাদি কিসিসে| এই যে চন্দা‚ আমার হোনেওয়ালি বিবি‚ ওকে তো আমি চিনি অনেক আগে থাকতেই| ওকে বিয়ে করছি তাতে তো কই আমার কোন অপরাধবোধ জাগছে না| বরং বেশ একটা রোমাঞ্চ জাগছে| তাহলে অন্তরার জন্যই বা আমি এত উতলা হচ্ছি কেন? ও তো আমায় ভালোবাসে না| ভালোবাসা তো দুর কি বাত‚ আমায় পছ্ন্দই করে না| তবে কেন ওকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না? কেয়সা রিস্তা হ্যায় ইয়ে? ইস চাহত কো ম্যায় কেয়া নাম দুঁ? এর কোন নামই তো নেই| কেন পাশ কাটাতে পারছি না ইস চাহতকি?| ফিরভি দিল কি আধে হিস্সে তে ঘর করে বসে আছে? ইয়ে দর্দ কেয়সা? খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে| কিন্তু দাদি বলেন‚ মর্দরা কখনো কাঁদে না| ছোট থেকে তো তাই জেনে এসেছি| খুব খুব কষ্ট হচ্ছে| আমি বুঝতে পারছি অন্তরাকে আমি আমার জিন্দেগীতে জায়গা দিয়ে ফেলেছি‚ পারব না ওকে ভুলতে‚ কিছুতেই না| আমার সব কথা শুনে চুন্নু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল| বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ও| সবাই খেতে চলে গেছে‚ শুধু চুন্নু আর দেবা আমার কাছে| এবার ওরাও চলে গেল| মনটা বেশ হালকা লাগছে সব কথাগুলো বলে ফেলার পর| এমনিতেই বিয়েটা চন্দার সাথে আমার এখন হচ্ছে ঠিক কথা‚ কিন্তু চন্দা আরও দুবছর ওদের নিজেদের বাড়িতেই থাকবে| দুবছর পর গওনা হলে চন্দা আমাদের বাড়ির বউ হয়ে আসবে|এটাই আমাদের রসম| আমি কিন্তু বিয়েতে বসেও অন্তরার কথা ভাবছি| আচ্ছা অন্তরা যদি কাউকে ভালোবাসে‚ বিয়ে করে তাতে আমার কি? ওর ভালোমন্দের দায়িত্ব তো আমার নয়| তাহলে আমি জগদিশ ভৈয়ার জন্য অপেক্ষা করছি কেন? জগদিশ ভৈয়া আজ আসতে পারেনি‚ পাটির মিটিং আছে| কাল আসলে অন্তরার ব্যাপারে সব জানতে পারব| বিয়ের রসম শুরু হয়ে গেছে‚ চলবে রাত একটা অবধি| বৃষ্টি অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে| আমার বাড়ির লোকেরা এখন বিয়ের তৈয়ারি নিয়ে বেজায় ব্যস্ত| পিতাজি‚ মৌসাজি আর বাকি বড়রা লওন্ডা নাচ দেখতে বসেছে| ঘন ঘন বন্দুকের আওয়াজে বোঝাই যাচ্ছে যে ওখানে মেহফিল ভালো জমেছে| ঐ ছেলেরা মেয়ে সেজে যে নাচে‚ তাদের দেখতে এদের এত কি যে ভালো লাগে বুঝি না| কখনও কখনও তো এই মেয়ে সাজা ছেলেদের কে নিয়ে যাবে‚ তাই নিয়েও মারামারি লেগে যায়| এদিকে তো আমার কোমর ব্যথা হয়ে গেছে পন্ডিতজির কথায় একবার খাড়া হো যাও আর একবার বেয়ঠ যাও করতে করতে| চন্দাকে একটু পরে ওর বাড়ির লোকেরা মন্ডপে নিয়ে চলে এল| সাথে সেই মেয়েদের নাকি সুরে গানও চলছে‚ কি যে গাইছে তার কিছুই বুঝছি না| কিন্তু চন্দাকে দেখে আমার প্রচন্ড হাসি পেয়ে গেল| আমি নিজেকে ঠিক কন্ট্রোল না করে হেসেই ফেলেছিলাম| চন্দার চিমটি খেয়ে নিজেকে থামালাম| হলুদ রঙের শাড়ি পরে আর বিশাল ঘোমটার ভিতরে যে বসে আছে তাকে আমি ভালো করেই চিনি| কিন্তু এই সাজে তাকে বেশ অচেনা লাগছে| ছোটবেলায় এই চন্দার হাতের চড়-চাপড় যে কত খেয়েছি‚ কিন্তু বিয়ের পরও এসব চলবে নাকি! চিন্তার বিষয়| ও কলেজে পড়ে‚ আমি সবে স্কুল কমপ্লিট করব|ঠিক আছে আমি দুবার ফেল করেছি‚ তাও তো ও আমারে থেকে একটু ছোট| তাও একটু ইজ্জত সে পেশ এলে কি এমন ক্ষতি হবে ওর| আখিরকার আমি তো ওর পতি না কি!! চন্নু আমার পাশে এসে বসল| ওদের দিকে এতক্ষণে তাকাবার ফুরসৎ পেলাম| এতক্ষণ চন্দার দিকেই মনটা ছিল| কি আশ্চর্য্য মনের এই গতি প্রকৃতি! একটু আগেই আমি অন্তরার কথা ভাবছিলাম‚ চন্নুকে বলছিলাম‚ কত কি? আর এখন আমি চন্দাকে ছেড়ে বন্ধুদের দিকে তাকাবার ফুরসতই পাচ্ছি না| ধোতি আর চাদরের আমার সাত বন্ধুর যা রুপ খোলতাই হয়েছে যে কি বলব| হঠাৎ দেখলাম ঘোমটার ভিতর থেকে চন্দা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে| কি হল আবার? আমি চন্দাকে জিজ্ঞাসা করলাম‚ - তবিয়ত ঠিক আছে তো? -য়ে আপকে দোস্ত লোগ হ্যায়?চন্দা কাঁপতে কাঁপতেই জানতে চাইল| - হাঁ তো? - কেয়া শানদার দোস্ত হ্যায়| বলে আরও বেশি বেশি কাঁপতে লাগল| ওহ এবার বুঝলাম‚ চন্দা কাঁপছে না হাসছে আমার বন্ধুদের পোশাক দেখে| সত্যিই মনে হচ্ছে বিয়েবাড়ি নয় হোরি খেলতে এসেছে এরা| এই রে হাসি আমারও পাচ্ছে| চন্দার হাসি এত ছুঁয়া ছুঁত কেন? হাসি নয় আসলে চন্দা‚ চন্দাকে আমার কিন্তু বেশ লাগছে| ওর এই হাসি‚ আমার পাশে ওর এই হাজিরা আমি যেন আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছি| তবু কপট রাগ দেখিয়ে বললাম‚ আমার দোস্তদের নিয়ে মজাক আমার একদম পসন্দ না| এই চন্নু তোরা নিজেদের কপড়া বদল কিউ নেহি লেতা হ্যায়? -আগে কাপড়গুলো শুকিয়ে যাক তবে তো পরব| ওকে হাসতে দে‚ তবুজ্জু দিস না| এই চন্নুটাও একটা চিজ| ধোতি-চাদর পরে কেমন যেন স্বামীজির মত গম্ভীর হয়ে বসে আছে| বাকিরাও তাই| যেন আমার বিয়ে নয়‚ কোন ধরমসন্মেলনে এসেছে এরা| -কাল কখন বের হবি এখান থেকে? চন্নু জিজ্ঞাসা করল আমাকে| -য়ে তো পতা নহি‚ তবে শুনেছি বিকেল চারটে - পাঁচটা নাগাদ হবে| কেন? -না‚ আমরা ভাবছিলাম‚ তোর বিয়েটা শেষ হলে চলে যাব| কাল না হয় তোরা ফিরলে তোদের বাড়িতে গিয়ে তোদের সঙ্গে দেখা করে আসব| কি বলিস তুই? - চলে যাবি তোরা? রাত এক বজনে কো হ্যায়| তাই কর‚ তোরা বরং ফিরেই যা| শুধু শুধু এখানে বসে থেকে কি করবি| আমার মামেরে ভাইরা আছে ওরাই সব সামলে নিতে পারবে| তোদের যা হালত হয়েছে‚ চলেই যা| ওদের ঐ হালত দেখে আমারই খারাপ লাগছে‚ ওদের বসিয়ে রাখার কোন মানে হয় না| - ঠিক হ্যায়| আমরা যাই| কাল দেখা হবে| আর চন্দা ম্যাডাম‚ হাম য্যায়সে দিখ রহে হ্যায়‚ ওয়েসে তো হ্যায় নহি| আপনার পাশের ছেলেটিকে সামলাতে হলে আমাদের শরনে আপনাকে থাকতেই হবে‚ এইটা আগে থাকতেই বুঝে নিন| চুন্নু হাসতে হাসতে বলল| - মুঝে পতা হ্যায়| ঘোমটার ভেতর থেকে মিহি কন্ঠ ভেসে এলো| হো হো করে আমরা হেসে উঠলাম| বিয়ের রসম প্রায় শেষ হবার মুখে| একটু পরেই এখান থেকে উঠতে হবে| পিতাজি আর মামাজি‚ মৌসাজিরা সব এসে গিয়েছেন| ওঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছে| পিতাজি আমার কাছে এসে বললেন‚ -শোনো আমি বাড়ি ওয়াপস যাচ্ছি| তোমার বন্ধু আর স্যার লোগও চলে গেছে| এখানে তোমার ভাইরা রইল| ঠিক সময় খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিয়ে নেবে|কাল দোপহর খানা খেয়েই তোমরা রওনা দেবে| সেইভাবেই সিপাহী আর মুনিমজিকে বলে দিয়েছি| আর সম্বন্ধীজিও তোমার কাছাকাছি থাকবেন| কিছু দরকার পড়লে ওঁনাকে বলবে| বলে পিতাজি আর দাঁড়ালেন না| দলবল নিয়ে রওনা দিলেন|চন্দার পিতাজিও দেখলাম বাবার পিছন পিছন হাত কচলাতে কচলাতে দৌড়লেন|উনিও কিছু একটা পলিটিক্যাল উল্লু সিধা করার ফিকরে আছেন|সবাই নিজের নিজের কাজ গোছানোতেই লেগে আছে| কুছ তো ডিল হুয়া ইস সাদিমে| ..... আবার আমি- ইয়ে দুনিয়া কে বদলতে রিস্তে ............................................................. বিকাশকে রিসিভ করে আনার পর বিকাশকে নিয়ে আমি আর দেবা চলে এলাম আমাদের আড্ডা রাজভোগ রেস্টোরেন্টে| আমি‚ দেবা আর বিকাশ ভিতরে বসে চুপচাপ চা খেতে লাগলাম| | - আজ জগদিশ ভৈয়ার সাথে কথা হল বুঝলি| বিকাশই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল| -কি বলল? - সন্তোষ ভৈয়া তো হফতে দো হফতে মে অন্তরাকে সাথ মুলাকাত করতে যায়| তাছাড়া ও বেটার সাথে বনারসের ফেমাস য়েলচিকো বারের মালিকের সাথে ভালো দোস্তি আছে| শুধু দোস্তি নয়‚ শেয়ারও আছে ঐ বারে আমার মনে হয়| অন্তরা হোস্টেল থেকে বেরিয়ে সন্তোষ ভৈয়ার সাথে মাঝে মাঝে ঐ বারেও যায়| জগদিশ ভৈয়ার খাস জানপহচান আছে ঐ বারের মালিকের সাথে| তাই সব খবর পেতে সুবিধাই হয়েছে| তাছাড়া জগদিশ ভৈয়াকে বলে একটা লোক তো ওদের পিছনে লাগিয়ে রেখেছিলাম নজর রাখার জন্য| সবসে জরুরী বাত ইয়ে হ্যায় কে‚ ওরা বেশ কিছুদিন আগেই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে নিয়েছে. অব বতা কেয়া করনা হ্যায়? জগদিশ ভৈয়া জানতে চেয়েছিল আমার কাছে| আর কি করার আছে বল| আমি তো ভাবছি কি মেয়ে য়ার? সাদি করনে কে লিয়ে দুসরা কৈ নহি মিলা থা কেয়া ? বল? কুছ দিন পহলে তক তো ও দিল মেঁ ছাই হুয়ি থি‚ অভি লগ রহা হ্যায় যো হুয়া হ্যায় অচ্ছা হি হুয়া হ্যায় মেরে লিয়ে| - একদম ঠিক| আমি বললাম| আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম| গতকাল বিকাশ যেভাবে বলছিল অন্তরাকে কোনদিন ভুলতে পারবে না‚ আমি বেশ চিন্তায় পড়ে গেছিলাম ছেলেটা না কোন গন্ডগোল করে| আরও বললাম‚ - তুই এখন বিয়ে করেছিস‚ আর চন্দাও এত ভালো মেয়ে‚ তোর জন্য অন্তরাকে দিল সে নিকাল দেনা হি সহি হোগা| ইসবার তো তু পাশ হো হি যায়েগা‚ কি বলিস? না হলে কিন্তু চন্দার সামনে তুই এক্দম ছোট হয়ে যাবি| - হাঁ ইসবার তো পাশ হোনে হোগা| আর সচ বতায়ে‚ আমার না চন্দাকে বেশ ভালো লাগছে| উসপে দিল আ গয়া য়ার| বেশ একটু লজ্জা লজা মুখে বলে বিকাশ| আমরা হাসি ওর এই লজ্জা দেখে| - লেকিন কালই তো ও নিজের বাড়ি ফিরে যাবে| ফির দো সাল বাদ গওনাকে বাদ মেঁ আয়েগী| তব তক আমি কি করি? বেশ কাতর প্রশ্ন বিকাশের| ওয়ে একবাত পতা হ্যায়? অফিসার ফ্ল্যাট নম্বর ৬৩‚ যেটা খালি হয়েছিল সেখানে একটা জৈন ফ্যামিলি এসেছে| ওঁদের দুটো মেয়ে‚ দোনো জুড়য়া বহন‚ দোনো কা নাম সোনিয়া অর মোনিয়া| এখানে গার্লস স্কুলে ক্লাস ১০ এ অ্যাডমিশন নিয়েছে| লেকিন কেয়া দিখতি হ্যায় দোনো‚ একদম পঠাকা হ্যায়| দেবা হৈ হৈ করে বলে উঠল| -কেয়া‚ বিকাশ প্রায় লাফিয়ে উঠল চেয়ার থেকে| -কব আই হ্যায়? আগে বলিস নি সালা‚ বেকার সময় নষ্ট করলাম আমরা| চল চল‚ এখুনি চল একবার দর্শন তো কর আতে হ্যায়| চল বে বেয়্ঠ যা পিছে দোনো| এই না হলে আমাদের বিকাশ!!! (শেষ)
অলভ্য ঘোষ
আমাদের ছোট বেলায় হাবে ভাবে নীতি মালায় বোঝান হয় যৌনতা গর্হিত কাজ। ফলে যৌনতা নিয়ে ভুল বোঝা থাকে দীর্ঘদিন।অথচ কাজটা সকলেই করে। আধ্যাত্মিকতা আর যৌনতা দুটোই প্রয়োজনীয়।পরস্পর বিরোধী আগে ভাবতাম। এখন মনে হয় একে অপরের পরিপূরক।নিয়ন্ত্রক বা নির্ণায়ক। In general Spirituality cannot be classified without Sexuality. হিন্দু ধর্মে কাম ,ক্রোধ ,লোভ, মোহ ,মাৎসর্য পরিত্যাজ্য।ষড়রিপু অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান এই ছ'টি শক্র হলো-কাম, ক্রোধ,লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। কাম শব্দের আভিধানিক প্রতিশব্দ হলো সম্ভোগেচ্ছা। কাম শব্দটির বহুবিধ ব্যবহার থাকলেও যৌনবিষয়ক সম্ভোগশক্তিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। যৌনতা বিষয়ে পাশ্চাত্য অভিমত বিশেষ করে সিগমুন্ড ফ্রয়েড এর অনুসরণ করলে বলা চলে;The Sexuality is not only physical appearance. It have more mental activity. Very complicated; involved with every human expression.বাৎসায়নের কামসূত্রের প্রথমেই লেখা আছে অর্থ অনর্থের মূল।কামের মানসিক ,শারীরিক, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সেখানেও মেলে। Certain characteristics are believed to be innate in humans; these characteristics may be modified by the physical and social environment in which people interact.Human sexuality is driven by genetics and mental activity. The sexual drive affects the development of personal identity and social activities. An individual's normative, social, cultural, educational, and environmental characteristics moderate the sexual drive. Sexuality may be experienced and expressed in a variety of ways; including thoughts, fantasies, desires, beliefs, attitudes, values, behaviors, practices, roles, and relationships. These may manifest themselves in biological, physical, emotional, social, or spiritual aspects.আবার অসভ্য পশুদের যৌনতা কেবল প্রজননের। সিংহী বারো বছর অন্তর সন্তান প্রসব করে। তাই তাদের সংযমী বলা হয়।পশুর প্রজননের একটি নির্দিষ্ট ঋতু আছে। উৎকৃষ্ট জীব মানুষের প্রজননের নির্দিষ্ট সময় নেই। মানুষের যৌন তা কেবল প্রজননের জন্য নয়।রামকৃষ্ণদেব বলতেন দুটি একটি বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে ভাই বোনের মত সংসারে থাকা উচিৎ। এখন অনুভব করি মানুষ মাত্রই থাকা চাই নিয়ন্ত্রিত কামশক্তি। এ নিয়ন্ত্রিত কামশক্তি যখন অনিয়ন্ত্রিত, বেপরোয়া ও বেসামাল হয়ে যায় তখনই তা হয়ে যায় শত্রু।আধ্যাত্মিকতা নিয়ন্ত্রক বা নির্ণায়ক।যেমন ভক্ত না থাকলে ভগবানের প্রয়োজন নেই। তেমনি রিপু না থাকলে আধ্যাত্মিক চর্চার বা কি প্রয়োজন।চোর ডাকাত গুণ্ডা বদমাইশ যেমন না থাকলে পুলিশ কোট কাচারি জেল খানা উঠে যাবে। তেমনি রিপুর তাড়না না থাকলে আধ্যাত্মিকতা গুরুত্ব হারাবে। সত্য, রজ ও তম।সাধু সত্য গুণের। সংসারী লোকের হোল মধ্য অবস্হা। রজ গুণ।চোর গুন্ডা চরিত্রহীন লম্পট তম গুণের।সত্ত্ব-রজ-তম (সৃষ্টি, স্থিতি, লয়) এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ত্রিগুণের অধিন।ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারি এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে আমাদের জীবন গঠিত।একি মানুষের মধ্যে এক এক সময় এক একটি গুণ কম বেশি প্রকটিত হয় বলে আমার ধারণা। অংক কষার সময় শিশু হাতের কড় গুনে তবে বলে দুই আর দুই এ চার।একটু বড় হলে তাকে আর কড় গুনতে লাগেনা।ঈশ্বর একটি চিহ্ন মাত্র। বীজগণিতের অঙ্কে যেমন এক্স। তেমনি আমাদের অনিত্য জীবনের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ মেলাতে এক্স এর মত ঈশ্বর ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। আধ্যাত্মিকতায় দেবতা থাকতে হবে এমনটা ভুল ধারণা।বিঞ্জান; দেশ মাতৃকার সেবা,শিল্প সাহিত্য এমনকি সিনেমা নির্মাণে ও খেলা ধুলায় ও আধ্যাত্মিক চর্চা সম্ভব । ঋষি অরবিন্দ , কাল মার্কস , লেনিন , আইনস্টাইন ,রবীন্দ্রনাথ ,গান্ধীজী ,রাশিয়ান চিত্রনির্মাতা তারকাভস্কি , ডা আবুল কালাম কত নাম বলবো।এরা সবাই জ্ঞানে অজ্ঞানে(consciously or unconsciously)আধ্যাত্মিকতাবাদ মতে আধ্যাত্মিক সাধনা করেছেন।সফল ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনির সফলতার পেছনে তার আড়ম্বরহীন অতি সাধারণ জীবন যাপন কৃচ্ছ সাধন আমাদের রাবণের তপস্যার কথা মনে করায় নাকি? সাধনা আর কিছুই নয় সংযম নিরন্তর অভ্যাস। সম্ভোগ মানে সমান ভোগ। ভোক্তা ও ভোগ্য যখন সমান ভোগ পেয়ে তৃপ্ত হয় সেটাই সম্ভোগ। সম্ভোগ একতরফা নয়। সুনিপুণ নিয়ন্ত্রিত ভোগেই সম্ভোগ সম্ভব হয়। শিশু ভোগের অন্ন ছিটিয়ে খায়।যত সে পরিণত হয়।সুচারু নিয়ন্ত্রিত হয় তার ভোগ। এই সুকুমার নিয়ন্ত্রিত চিরন্তন সত্য চেতনার প্রকাশয়ই আধ্যাত্মিকতা। গাড়ি চললে তবে তার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে নিয়ন্ত্রণ কিসের দরকার । তাই চালক ছাড়া গাড়ি নিষ্ক্রিয়। গাড়ি ছাড়া চালক কর্মহীন। পৃথিবীর মানবিক উন্নতি আধ্যাত্মিক উন্নতি না হলে কেবল বৈষয়িক উন্নতি তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব প্রজ্ঞার।সবচেয়ে বড় অসুখ বিভেদ বিভাজন।শিশুকে মা যেমন কেবল বুকের দুধ খাইয়ে বড় করে না ;স্নেহ মমতায় লালিত করে। স্নেহ বর্জিত শিশুর যেমন নমনীয়তা কোমলতা গড়ে ওঠেনা তেমনি আধ্যাত্মিকতা ছাড়াও মানবতা জন্মাবে না। সূক্ষ্ম বোধ বস্তু থেকে জন্মায় না।আত্মা থেকে জন্মায়।যতই দামি হোক বস্তু কেবল খেলনা স্থূল।প্রজ্ঞার স্পর্শ ছাড়া বস্তু বস্তু হীনতায় ভোগে।দুই টাকার কলম কার নেই।সকলে কিনতে পারেন।তবে তা সকলের হাতে সমান মূল্যবান হয় না।কেবল মূল্য পায় জ্ঞানীর হাতে। ঞ্জান মানবিক বিকাশের পথ।আধ্ম্যাতিকতার সোপান। আধ্যাত্মিকতায় চিরন্তন মুক্তি জড় বস্তু কেন্দ্রিকতা থেকে। ©অলভ্য ঘোষ
শিবাংশু
ভালো লাগা বদলায় না, ভালো লাগার বৃত্তটা শুধু বেড়ে যায় বয়েসের সঙ্গে। চিত্রতারাদের ভালো লাগার সহজ যুক্তি নিজের মধ্যে খুঁজলেই পাওয়া যায়। সিনেমা নামের ক্র্যাফটটাই তো দুই মেরুর মধ্যে বাঁধা। ইল্যুশন আর ফ্যান্টাসি। যে পাত্র বা পাত্রীর ইল্যুশন তোমার ফ্যান্টাসির যতো কাছে তুমি ততো বেশি তার পাখা। এটা বুঝবার জন্য সুধীর কক্কড়কে লাগেনা। চিত্রতারারা মানুষের সদা পরিবর্তনশীল ফ্যান্টাসি আর বাজার ভাওয়ের সঙ্গে বদলে যান। 'সৃষ্টিশীলতা' নামক যে বালাইটি আমরা বাজারের বিপক্ষে সিনেমার সঙ্গে জুড়তে চাই, সেও যদি জনগণেশের ফ্যান্টাসির খুব বেশি দূরে চলে যায়, তবে ছবি নিশ্চিত প্রত্যাখ্যাত হবে। চিত্রতারাদের আয়নায় আমরা আমাদের না পাওয়া ফ্যান্টাসিগুলোকে খুঁজে পেতে চাই। 'চিত্রতারা' তো একটা কোনও একক মানুষ নয়, একটা সমষ্টির ধারণা তাঁরা। একজন অমিতাভ বচ্চন মানে একজন নির্দেশক, সম্পাদক, আলোকচিত্রী, সজ্জাকার, সংলাপলেখক, শব্দযন্ত্রী, সঙ্গীত পরিচালক, নেপথ্যগায়ক, আরও কতো সৃজনশীল মানুষের সফল আয়োজন। অমিতাভ তো শুধু মিছিলের মুখ। আমরাও তো জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে শুধু 'মুখে'র দিকে তাকিয়েই দিন কাটিয়ে যাই। আমাদের ন্যায়-অন্যায়, শাদা-কালো, রুচি-অরুচি সব স্থির করে দেয় সেই সব মুখ, যাদের জন্য হাজার চাঁদবণিক জলে জাহাজ নামায়। আমাদের সমাজশরীরে চিত্রতারাদের মুখই সবচে প্রত্যক্ষ। আমাদের মতো লোকজন, যারা সমাজের পায়ের কড়ি আঙুলের ফেলে দেওয়া নখের মতো মূল্যহীন, তারাও যখন আয়নায় সামনে দাঁড়ায়, মাথায় চিরুনি চালাতে চালাতে নিজের কাঁধের উপর দেখতে চায় অমিতাভের 'মুখ'। হরিপদ কেরানি তার কোটরগত চোখ, নিষ্প্রাণ মুখশ্রী, পলকা খাঁচার সীমানা পেরিয়ে যখন চাঁদের আলোয় প্রেয়সীর মুখের দিকে তাকায়, তখন তার অবচেতন মনে মাধুরী দীক্ষিতের মুখচ্ছবি কোথাও তো উঁকি দিয়ে যায়ই। 'ভালো লাগা' এভাবেই আসে, এভাবেই 'ভালো লাগা'র বৃত্তও বেড়ে যায় প্রতিদিন। এককালে যেমন মোহিত ছিলুম রেখার নামে। যেন হুসেনের লম্বা তুলি থেকে ক্যানভাসে আছড়ে পড়া এক নারী। হ্যাঁ, আরো কোটি মানুষের মতো ঐ মহিলা একসময় আমার ফ্যান্টাসির জগতকে গ্রাস করে রেখেছিলেন। অফিসে কাঁচের নীচে তিনি, মেসে সারা দেওয়ালজোড়া তাঁর অগণন প্রতিকৃতি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় চিত্রতারাদের নিয়ে কালনেমির লঙ্কাভাগ। যাঃ, তোর রেখাকে নিয়ে তুই ফোট। অতিষ্ঠ বন্ধুর শুভকামনা !! ভাবা যায় 'তোর' রেখা.....??!! খালি হাঁথ শাম আই হ্যায় খালি হাঁথ জায়েগি আজ ভি ন আয়া কো ই খালি লৌট জায়েগি .......................
মানব
হ্যাঁ মানুষটি অঞ্জন দত্ত। গায়ক, অভিনেতা, আবার পরিচালকও বটে। হয়ত অনেকেই বলবেন গানে সুর নেই, কিংবা হয়ত বলবেন সব গানের একই রকম সুর, হয়ত বা কথার প্রাধান্য বেশি। সে যে যাই বলুন আমারই মত অনেকের জীবনে এই মানুষটির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ একটাই - জীবনের সাথে, বাস্তবের সাথে যোগাযোগ। স্কুলের গেটের বাইরে – আজও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে স্কুলজীবনে ফিরে যেতে? সেই যেখানে স্কুল বাসের হর্ণ উপেক্ষা করে অপেক্ষা করছেন আপনি, অথবা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন অন্য কেউ। এক মুহূর্তের চোখে দেখা আর তারপর ছুট্টে গিয়ে বাস ধরা আর বাস ড্রাইভারের বকুনি খাওয়া। তারপর সিটে বসে খাতাটা বের করা, যেখানে রেখে দেওয়া ওর স্পর্শমাখা ‘চ্যাপ্টা গোলাপ ফুল’। শুনেই দেখুন না গান খানা। কথা দিচ্ছি হতাশ হবেন না। ২৪৪১১৩৯ – হ্যাঁ নম্বরটা পুরনো। অন্তত কোলকাতার বুকে এই নম্বরে কল করলে রঙ নাম্বারই বলবে। তবুও এই ফোন নাম্বারটা দশজন বাঙালীর মধ্যে সাতজনেরই মুখস্থ। কারণ একটাই... বেলা। বেলা বোস। মৌলালীর মালা, আদরের রমা, রঞ্জনার মত চরিত্রদের আমাদের জীবনে অবাধ যাতায়াত। স্যাক্সোফোন হাতে স্যামসন, কিম্বা ধরুন কাঞ্চন জানার সেই মন কেমন করা গল্পটা – “বেড়াতে যদি তুমি যাও কোনদিন আমার ক্যালিংপঙ জেনে রেখো শংকর হোটেলের ভাড়া টুরিস্ট লজের থেকে কম রাত্রির নেমে এলে আসবে তোমার ঘরে চুল্লিটা জ্বালিয়ে দিতে আর কেউ নয় সে যে আমার ফেলে আসা নীলচে পাহাড়ি মেয়ে বলো না তাকে আমি দারোয়ান শুধু বলো করছি ভালোই রোজগার ঐ বস্তির ড্রাইভার চিগমির সাথে যেন বেঁধে না ফেলে সংসার আর কিছু টাকা আমি জমাতে পারলে যাবো যাবো ফিরে পাহাড়ি রাস্তার ধারের বস্তির আমার নিজের ঘরে আর যদি দেখ তার কপালে সিঁদুর বলো না কিছু তাকে আর শুধু এই সত্তর টাকা তুমি যদি পারো গুজে দিও হাতে তার ট্রেনের টিকিটের ভাড়াটা সে দিয়েছিলো কানের মাকড়ী বেঁচে ভালোবাসার সেই দাম তুমি দিয়ে দিও আমার কাঞ্চনকে...” আর বেশি সময় নিয়ে জন্মদিনটা পার করে দিতে চাইনা। তাই অঞ্জন দত্তকে জন্মদিনের শুভকামনা জানিয়ে আজকের মত শেষ করি। বাকী কথা তোলা রইল। না বলে যাচ্ছিনা।
ইরা চৌধুরী
এলিফেন্টা যাবো ঠিক হল।আগের দিন ভোরে আমার এক বান্ধবী এল কলকাতার থেকে।আমাদের সাথে ননস্টপ ঘুরবে বলে।তাকে ভোরবেলা রিসিভ করলাম দাদর স্টেশনে।সেদিন বিকেলে ইস্কন মন্দির আর পৃথ্বী থিয়েটর দেখার ইচ্ছে ছিল।বেড়িয়েও পড়লাম।কিছুদূর যেতেই বর্ষা ঘিরে ফেলল।কি আর করা কোনোরকমে মন্দির দর্শন করা গেল।কিন্তু পৃথ্বী থিয়েটারে পৌঁছে কিছুই নসীব হলনা।ঘুরে দেখা তো দিল্লী দূর অস্ত এক কাপ চায়ের সাথেও দেখা হলনা।বাড়ি ফিরে গরম গরম চায়ের সাথে আবার প্লানিং শুরু।এলিফেন্টা চল। সকাল দশটায় শান্তাক্রুজ থেকে লোকালে চার্চগেট।চার্চগেট থেকে ট্য়াক্সিতে গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়া।জানা গেল সকাল নটার থেকে দুফুর আড়াইটের মধ্য়ে প্রতি আধঘন্টা অন্তর লঞ্চ ছাড়ে এলিফেন্টার উদ্দেশ্য়ে।দূরত্ব ছয় মাইল।চড়ে পরলাম।উঠেই হালত পস্ত(ভগবান তখন মুচকি হাসছে)।একি লঞ্চ ঢেউয়ের তালে তালে মার নাচানাচি চালাচ্ছে।পা রাখতেই হাত পাখির ডানার মতন খুলে যাচ্ছে।মাথা মাথার জায়গায় নেই মনে হল।বডি কন্ট্রোল করবে কে?ছবি তোলা আর যাবেনা।হায়রে!কিছুদূর যাওয়ার পর লঞ্চ দেখি ধাত্সথ।হবে নাইবা কেন! সামনে দেখি বিশাল বিশাল দেশিবিদেশি তেলবাহি জাহাজ অত জলের মাঝে স্টেচু।নো হেলদোল।কাছেই বম্বেহাই।নজর সব ওদিকেই।পাড়ে এসে ভীড়ল তরি(লঞ্চ)।খালাশির হাত ধরে পা চলালাম মাটির উপর।জমিতে পা রেখেই বুঝলাম পায়ের নিচে মাটি কতবড় আশ্বাস।তো যা বলছিলাম।দেখি সামনেই টয়ট্রেন।টয়ট্রেন চেপে একেবারে মন্দিরের পাদদেশে।তবে অনেক সিঁড়ি আছে।সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠা গেল।দম শেষ।মনে পড়ল যখন কলেজের জোগ্রাফির ট্য়ুরে এসেছিলাম এই ধাপ গুলি হাসাহাসি ধাক্কাধাক্কি করতে করতে পার করে কখন মন্দিরে ঢুকে গেছি টেরও পাইনি।আর এখন ! এই দিল রুক যা জরা।ফির চলনা অহিস্তা অহিস্তা।বুঢ়াপা আ গয়া হ্য়ায় তেরা। মন্দিরে ঢুকে মহেশমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল এতদিন ধরে এরম শান্ত ভাবে আছে কি করে!মনে হয় যেন আমাদের সাথে সাথেই ও এসে দাঁড়িয়েছে।সবাই বলে এই কেভ থেকে কিছু দূরে পুলকেশিন দ্বিতীয় হর্ষবর্ধনকে হারিয়েছিল।এ ভাবে উত্তর ভারতের প্রভাব থেকে দক্ষিন ভারত রক্ষা পায়।কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ।স্থাপত্য়কলা আর মূর্তিকলায় উত্তরের প্রভাব।ইলোরার সাথে আছে সাদৃশ্য়।কলায় আছে গুপ্ত যুগের প্রভাব।মহেশমূর্তিতে শিব তিন রুপে হাজির।creator,preventer &destroyer. ইলোরার মতন এখানেও দেখলাম শিবের বিয়ে পাথরে খোদাই।অর্ধনারিশ্বর।গঙ্গার মর্ত্য়ে আগমন।বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম।কারণ লঞ্চের নির্দেশ সাড়ে চারটের মধ্য়ে রওণা দিতে হবে।এত তাড়া কেন।জিজ্ঞেস করাতে জানা গেল হাওয়া খারাপ হ্য়ায়।সে আবার কি! এতক্ষণ তো বারিশ হী খারাপ ছিল।আমরা একটু দেরি করে ফেলেছিলাম।সাড়ে চারটের জায়গায় পৌনে পাঁচটায়।লঞ্চ ছাড়ল পাঁচটায়।দিব্বি মুম্বইয়ের দিকে এগোতে লাগল।ক্রমশ গেট ওয়ে অব ইন্ডিয়া আর তাজ হোটেল হয়ে উঠল দৃশ্য়মান।একটা কথা বলি শুরু থেকেই কি যাওয়ার সময় কি আসার সময় সমুদ্র এক আধ আঁজলা জল লঞ্চের যাত্রিদের মুখে ছুঁড়ে মারছিল।কি জানি কি ধরনের রসিকতা!এমন কোনো যাত্রি নেই যে নোনা জলের স্বাদ পায়নি। এসব জল ছোঁড়াছুড়ি করতে করতে হঠাৎ সে ক্ষেপে উঠল।লঞ্চ তখন মোচার খোলা।একবার বাঁদিক জলের কাছে চলে যায় তো একবার ডান দিক।বাঁদিকের সব যাত্রি কিবা নর কিবা নারি সব বাঁদিকে।বাঁদিক গেল হেলে।এক মহিলা দেখি তার স্বামী আর পুত্র কে জড়িয়ে কাঁদছে।ছেলে মার কান্না দেখে কান্না জুড়ে দিল।যাত্রির মধ্য়ে কেউ বলে উঠল জয় শিব শংকর।আরেকজন জবাবে বলল এত দেরিতে মনে পড়ল! সামনের লঞ্চের অবস্থা দেখে এবারে একটু চিন্তা হল।সে পাড়ের কাছে যেতে চাইছে কিন্তু ঢেউ তাকে আবার এলিফেন্টায় ফিরে যেতে বলছে।আমাদের অবস্থাও হল তথৈবচ।ক্য়াপটেন উপায় না দেখে ইন্জিন বন্ধ করে দিল ।পাবলিক ভয়ে পেয়ে গেল।ভাবল ডিজেল শেষ।এবার মাঝ দরিয়ায় ডুবে মরতে হবে।তা কোনো মতে খালাশিরা আর ক্য়াপটেন মিলে লঞ্চকে বাগে এনে কিনারায় আনল। আবার খালাশির হাত ধরে ধরে দুলতে দুলতে পাড়ে উঠলাম। এবারে আমাদের তিন জনের কথা বলি।সারা লঞ্চে আমরাই স্থিতপ্রজ্ঞ।আমি সবার আগে লঞ্চের মুখের কাছে বসেছিলাম।ভালো ছবি তুলব বলে।আমি যতবার ভাইঝি কল্পনা আর বন্ধু সীমার দিকে তাকাই পিছন ফিরে দেখি ওরা নিশ্চিন্ত মনে বসে আছে।ভাবলেশহীন।আমি ছবি তোলাতে এত ব্য়াস্ত ভয় পাওয়ার সময় পেলাম না।কেবল একবার মাথায় এল মরনা হী হ্য়ায় তো থোড়ি সী জিন্দগী অওর জী লে। ইতিমধ্যে দেখি মাথার উপর হেলিকেপ্টার ।আর পারে সার দিয়ে লোক দাঁড়িয়।সবার চোখে মুখে কি হয় কি হয় ভাব।দুই স্টীমার তখন আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের সাথে।যাক!শেষরক্ষা হল।টলায়মান আমরা ডাঙ্গায় উঠলাম।ভাইঝি বললে এই বর্ষায় আমি তোমাদের নিয়ে এলিফেন্টায় আসি!তাও আবার আজ হাই টাইড।কিছু হলে সবাইকে কি জবাবদিহি করতাম!বললাম তুমি থাকলে ত সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে!সবার আয়ু আছে বলতে হবে!
মানব
বেশ সকাল সকাল ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আজ। পাড়ায় কেমন যেন হইচইএর শব্দ। দূর থেকে শব্দটা আসছে, তাই একবার কমছে আবার বেড়ে উঠছে হাওয়ার সাথে সাথে। কি নেই সে শব্দে মেশানো! মহিলাদের কান্নার শব্দ, পুরুষের বলিষ্ট গালাগালি থেকে শুরু করে ছেলেছোকরাদের হইচই সব পাওয়া যাবে সেখানে। ঘুম যখন ভেঙ্গেছে তখন তো একবার দেখতে হচ্ছে ব্যাপারটা কি। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছে তাই দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়লাম। গোয়ালারা ছানা নিয়ে রওনা দিয়েছে ভোরের ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে, ছাত্রছাত্রীরা চলেছে পড়তে। দোকানদাররা হয়ত অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও আধঘন্টা শুয়ে নিচ্ছে, এত সকালে আর কেইবা জিনিস কিনতে আসবে। পাশের পাড়ার নান্টুকাকাকে দেখলাম স্টেশনের দিক থেকে সাইকেল চালিয়ে আসতে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও কাকা কি হয়েছে? এত হইহই চলছে কেন?’ বেশ রেগে আছে বলে মনে হল কাকা। সেইভাবেই সাইকেল থেকে একটা পা নামিয়ে জবাব দিল, “আর বলিস না, ওই সুকান্ত কে চিনিস তো- কুন্ডুদের? ওর হাত পুড়েছিল, তা ওরা অধীর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। পাশ করা ডাক্তার তো, ভালই দেখবে বলে মনে হয়, শুধু ফি টা একটু বেশী। তা কি করা যাবে... কিন্তু ডাক্তার বাবাজীবন কি করেছে জানিস?” বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি? ফি ছাড়াই দেখে দিয়েছে?” “এই হয়েছে তোদের... ছেলেছোকরাদের স্বভাব। কথার মাঝখানে কথা বলা স্বভাবটা গেল না।” কান থেকে বিড়ি টা বের করে সেই কানেই লুকিয়ে রাখা একটা দেশলাই কাঠি বের করল নান্টুকাকা। রাস্তার পাশের ইলেক্ট্রিক পোল-এ ঘষে কিকরে যেন আগুন জ্বালিয়ে ফেলল কাঠিটাতে, তারপর বিড়ির মোটা দিকটা মুখে নিয়ে ফু দিয়ে আবার সোজা করে মুখে নিল। অবশেষে বিড়িতে আগুন দিল। একবার মন ভরে টেনে নিয়ে হাল্কা আমেজে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “ওর হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিল! তা পোড়া হাতে ব্যান্ডেজ করলে পুঁজ তো হবেই, সে হাত একেবারে ফুলে ফেঁপে একাকার। তাই সকাল সকাল চিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি যাই।” “আরে তুমি ওদের বাড়ির চিৎকার কিকরে শুনতে পেলে? থাক’ তো এ পাড়ায়... ওরা তো ওপাড়ায়...” মাথা চুলকে নিতান্ত ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই বুঝলাম কি ভুলখানা করে ফেলেছি। ঘটনাটা মোটামুটি ঝাপসা ভাবে ফুটে উঠছে চোখের সামনে। সুকান্তদের বাড়ির থেকে একটা বাড়ি পরেই বাংলার ঠেক, সেই ঠেকে সারারাত কাটিয়ে নান্টুকাকার ঘুম ভাঙ্গে ওদের বাড়ির চিৎকারে। তারপর তিনি পরোপকারের জন্য পাড়াসুদ্ধ লোক জড়ো করে ডাক্তারের বাড়ি যান হামলা করতে। “বেশি পাকা! সকাল সকাল যতসব ফাজিলের সামনে পড়তে হল। সারাটা দিন আজ খারাপ কাটবে গো।” এই বলে বড়ই বিমর্ষ মনে নান্টুকাকা রওনা দিলেন বাড়ির পথে। আমিও আমার সাইকেলটা বের করে নিয়ে রওনা দিলাম ডাক্তারের বাড়ির উদ্দেশ্যে। প্রচণ্ড ভীড় আর গালিগালাজের দিকে এগিয়ে গেলাম ধীরে ধীরে। সে দৃশ্য দেখে তো চক্ষু চরকগাছ। ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনে বহু মানুষের জমায়েত। আর সবার সামনে বেচারা সুকান্তকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কোথায় তার হাতের ব্যান্ডেজ? তার যত না ক্ষতি হয়েছে ডাক্তারের ব্যান্ডেজে, তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে ব্যান্ডেজ খুলে দিয়ে, বোধহয় এই মহান কাজটি ওর বাড়ির লোকেদেরই। গলগল করে রস গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে কিন্তু কোন ওষুধ তো দূরের কথা, কিভাবে আরও বেশি ক্ষত দেখানো যায়, তারই চেষ্টা করা হচ্ছে। যেন তাদের আসল উদ্দেশ্যটা হল ডাক্তারকে অপদস্ত করা। ছেলেটা এদিকে মরল কি বাঁচল, সেদিকে কারও খেয়ালই নেই। এমনিতে আমি বড্ড ভীতু আর গোবেচারা গোছের মানুষ। এরা ডাক্তারকে গালাগালি করছে, গেটের দরজা উপড়ে ফেলছে, এসব বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই, কিন্তু সুকান্তের এই দুরবস্থা আমার সহ্য হল না। বাড়ির লোকেদের অবহেলায় অনেকটা এরকমভাবেই একবার আমার এক বন্ধুকে হারিয়েছি একেবারে বিনা চিকিৎসায়। কিন্তু এবারে আর নয়। সেই রাতটার কথা আজও ভুলতে পারিনি... কোনদিনও পারবনা। পাশের বাড়ি থেকে মাঝরাত্রে শুধুমাত্র একটা গোঙ্গানির আওয়াজ পেয়েছিলাম... ব্যাস, না আর কিচ্ছুই নেই সেই রাত্রের স্মৃতিতে। আর দেখেছিলাম সকালে নীল হয়ে যাওয়া গাবলুর মরামুখটা। বিভিন্ন জনের মুখ থেকে বিভিন্ন কথা শুনে যেটুকু মিল পেয়েছিলাম তা এইরকম – মাঝরাত্রে হঠাৎ গাবলু বেশ জোরে চিৎকার করে ওঠে। স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে ভেবে ওর মা জেগেও ঘুমিয়ে পরে। কিন্তু ছেলের ছটফটানি বেড়েই চলে, বুকেও নাকি প্রচণ্ড ব্যাথা শুরু হয়। তখন অনুমান করে নেওয়া হয় নিশ্চয়ই অম্বল জাতীয় কিছু... তাই তেল জল মালিশ করে দিয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয় তাকে। কে জানত, এই ঘুম পাড়ানোটাই ছিল তাকে অন্তিম শয্যায় শুইয়ে দেওয়া। কে জানত ছেলেটা সাপের কামড়ে চিৎকার করে উঠেছিল... শুধু সেই ভূলের সাক্ষী হয়ে পড়েছিল তার নীল দেহখানা। সেই সকালটাও ছিল এমনি একটা মনোমুগ্ধকর সকাল... শুধু ওই দেহটা ছাড়া। আর আজকের সকালটাও... শুধু ওই হাতটা... ওই পুড়ে যাওয়া রস গড়াতে থাকা হাতটা ছাড়া। এই হাত যাতে দেহ হয়ে উঠতে না পারে তার জন্য তো আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। ভীড়ের মধ্যে মোড়ল গোছের একজন মানুষ ছিলেন কুণালদা। ওনাকে পাশে ডেকে এনে সমস্ত ঘটনাটা বোঝালাম। পাশের গ্রামের একজন ভালো ডাক্তার আছেন রাজীববাবু। ওনার কাছেই নিয়ে যাওয়া ঠিক হল। এদিকে অধীর ডাক্তারের এখনও নাকি ঘুম ভাঙেনি, তাই ওনার বাবা মা এলেন ব্যাপারটা মেকআপ দিতে। আমরা রওনা দিলাম পাশের গ্রামের উদ্দেশ্যে। পিছনে পড়ে রইল যত আবেগ মাখা বক্রোক্তি, ঘৃণা, রাজনীতি। রাজীব ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছালাম। আমি সাইকেলে, আর বাকীরা রিক্সায় চড়ে। এত সকালেও এত মানুষের লাইন হবে ভাবতে পারিনি। “আরে এ তো মোটে কুড়ি টাকা, জানলে তো এখানেই নিয়ে আসতাম। শুধু শুধু ওখানে একশটা টাকা নিয়ে নিল গালে চড় মেরে।” সুকান্তর মা উত্তেজিত হয়ে বলল। এত টেনশনের মধ্যেও ইচ্ছা হচ্ছিল ওনার চরণে একখানি প্রণাম করতে। ছেলের সমস্যাটা নিয়ে না ভেবে, কিম্বা ডাক্তার কেমন চিকিৎসা করেন সেসব না ভেবে উনি দেখছেন কুড়ি টাকা... অপূর্ব... আমাদের লাইন এল তাড়াতাড়িই একটু ইমার্জেন্সি হিসাবে। ভিতরে ঢুকলাম, একখানি পুরনো দিনের কাঠের চেয়ারে বসে ডাক্তারবাবু দেখে চলেছেন রোগী। কিছু ওষুধ দিলেন আর একমাসের সম্পূর্ণ বিশ্রামের ব্যাপারটাও ভাল করে বুঝিয়ে দিলেন। আমি জানি যে এক সপ্তাহের বেশি এ ছেলে বিশ্রাম পাবেনা, তাই একটু তাড়াতাড়ি ভাল হবার কথাটা বলতেই ডাক্তারবাবু আর একটা ভাল ওষুধ লিখে দিলেন। তবে বলে দিলেন, দামটা একটু বেশি। হ্যাঁ সুকান্তর বাবা এতক্ষণ সব চুপচাপ শুনছিলেন। তিনি আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলেন না। নানা, ও একমাসেরই রেস্ট পাবে। আগের ওষুধগুলোই থাক। বাইরে বেরিয়ে আসতে আসতে সুকান্তর মা জিজ্ঞেস করলেন, “আরে এ কি পাশকরা ডাক্তার নয় নাকি? লুঙ্গী পরা, ওইরকম একটা মাটির ঘর, তারপর আবার কুড়িটাকা নেয় মাত্র...” আমি একবার নেমপ্লেটটার দিকে তাকালাম। তার নামের নীচে লেখা এম. বি. বি. এস.(গোল্ড মেডেলিস্ট)। আরও অনেক কিছু অবশ্য লেখা ছিল, সবটা বুঝিনি, যেটুকু বুঝেছি তাই যথেষ্ট। সুকান্তর হাত দু-সপ্তাহের মধ্যেই সেরে যায়। অধীর ডাক্তার এরপর থেকে গ্রামে আর রোগী দেখেন না, ভোরবেলায় বেরিয়ে যান আবার সন্ধ্যের পর বাড়ি ফেরেন। তিনি সম্ভত কোন সরকারী হাসপাতালে চাকরী করেন। শুধুমাত্র সস্তায় চিকিৎসার জন্যই গরীব লোকেরা পাঁচ মাইল পথ পেরিয়ে রাজীব ডাক্তারের কাছে যান। আর একটু ধনী যারা তারা এখন চিকিৎসা করান উজ্জ্বল ডাক্তারের কাছে যার নেমপ্লেট এ বড় বড় হরফে লেখা “আর. এম. পি.”। ফি মাত্র পঞ্চাশ টাকা।
শিবাংশু
দুর্জনে বলেছিলো এই এনারাইয়ের ভারত-আগমন নিয়ে আবাপে সম্পাদকীয় লেখা হবে। হয়তো হয়েছে। আমার চোখে পড়েনি। তাঁর শুভাগমন ঘটলে সাধারনত কিছু দাওত-দস্তরখান প্রতিবারই। দু'চারজন পুরোনো মজলিশি পাপী তো একত্র হয়ে রাজাউজির না হলেও, মুখেন কেরানি-মজুর মারা তো হয়েই থাকে। তার ব্যত্যয় হলোনা এবারও। -------------------- এবারের মেহরবান বেপরওয়াহ ইয়ংম্যান মনোজদা। নিনা পাঁজিপুঁথি ঘেঁটে ভোরবেলা একটা সময় দিয়েছিলো। কারণ তার আইটিনেরারি পাল্লা দিতে পারে শুধু পল্টুদার সঙ্গে। আমরা পাতি সড়কছাপ জনতা তার মর্ম আর কী বুঝবো? যাকগে, ভোর আটটায় শয্যাত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ি ন'টার মধ্যে। কারণ দশসকালের মধ্যে মদীয় গৃহ হইতে লালদীঘি পৌঁছোনো চ্যালেঞ্জ তো বটেই। মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে হাঁটা। তারপর পাতালরেল এবং আবার সকালবেলার অফিসপাড়া। পিচবাঁধানো রাস্তা আর পাথরবাঁধানো ফুটপাথ। লাটসাহেবের শাদা ধবধবে দেউড়ি পেরিয়ে ট্রামবাসের ছুটোছুটি তখনও যেন ঠিক দুরস্ত হয়নি। বহুদিন পরে ঐ রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হলো। ফুটপাথে আসর সাজিয়ে বসা দোকানিরা একটু একটু আড়মোড়া ভাঙছে। দেওয়ালের সঙ্গে দড়ি টাঙিয়ে ঝোলানো হয়ে গেছে কয়েক হাজার কালোকোট। মফস্সলের উকিল বাবুবিবিরা দরদাম করছেন ইতিউতি। কিছু নবীন বেচুবাবুরাও রয়েছেন সেখানে। এদেশে কোটপাৎলুনের মেয়াদ তো বছরে এক-আধ সপ্তাহ। থলিঝুলি থেকে জুতোমোজার পসার পেরোতে পেরোতে টেলিফোন ভবনের দিকে এগো'ই। সবাই তো 'লাইমলাইটে'ই থাকতে চায়। স্বীকার করুক বা না করুক। লালবাজারের মোড়ে এসে নিনাকে ফোন লাগাই। পৌঁছে গেছো? সে তো আকাশ থেকে পড়ে। অ্যাত্তো তাড়াতাড়ি? মানে? দশটা বলা হয়েছিলো তো? আরে নাহ, মনোজদা তো বললেন বারোটার আগে দোকানই খুলবে না। বোঝো? লাইমলাইট তো দশটাতেই খোলে রে বাবা। তাআই? আসছি, আসছি। আছো কোথায়? বাড়িতেই তো। সেরেছে। কোথায় মুদিয়ালি আর কোথায় ডালহৌসি? --------------------------- যাকগে। নিজেই গিয়ে ইঁটফিঁট পাতি না হয়। গুটিগুটি এগোতে গিয়ে দেখি সরাইখানার সামনে তিনজন জনতা অলরেডি গুলতানি করছেন। মনোজদা পুজোকমিটির সেক্রেটারির মতো অত্যন্ত অ্যাকটিভ হয়ে লাইন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন। মানে মনে হলো সে রকম। খুউব স্মার্ট বডি ল্যাঙ্গোয়েজ। আর মাথায় হাকিমউদ্দৌলাহ মেহসুদের টুপি। সে খুদা কা প্যারা হবার আগে উইল করে দিয়ে গেছে। কলকাতার হিসেবে সেদিন সকালে ঠাণ্ডাই ছিলো বলা যায়। সাহেবশঙ্খকে দেখে তা লাগছিলো'ও বটে। কিন্তু তৃতীয়জন যেন বসন্তসন্ধ্যায় গড়ের মাঠে মলয়ানিল উপভোগ করতে এসেছেন। বেশ বিস্ময় প্রকাশ করলেন তিনি। কলকাতার লোকজন এতো গরমজামা কেন যে পরে এই আবহাওয়ায়? হয়তো খরচা করে কিনেছে, তাই। বোঝা যায়, তিনি রাজধানীর চার ডিগ্রির গরিমা এখানেও বহন করে নিয়ে এনেছেন। ------------------------- বেশ কিছুদিন ধরেই যে কোনও আলোচনা ডিমনির দিকেই বাঁধা থাকে। এনারাইদের যে কতো ভোগাচ্ছে অনামুখো ব্যাংকগুলো তা নিয়ে সক্কাল সক্কাল সবাই সরব। ঊনচল্লিশ বছরের ব্যাংকার তো একটু ব্যথা পাবেই। তবে তাকে কখনও 'বঙ্গ আমার'এর দেশে ব্যাংক চালাতে হয়নি। বরং গ্রাহকের রূপে সে অনেক ঠোকাঠুকি করেছে এদেশের চিরবিপ্লবী ব্যাংকওয়ালাদের সঙ্গে। এমন কি দিল্লির ম্যাডামও যখন বলেন সেখানে ব্যাংকের লোকজন এখানের থেকে অনেক ভদ্রসভ্য, একটু ব্যথা লাগে বইকি। এসব জরুরি আলোচনা চলার ফাঁকে দেখা গেলো অজিতবাবুর গাড়ি দূরে দাঁড়িয়ে আর নিনা টেলিফোন ভবনের সিঁড়িতে কলম্বাসের দূরবীন হাতে। দের আই, দুরুস্ত আই। অমিতদার সঙ্গে এক বছর পরে দেখা। রাস্তার উপরেই কাবুলিওয়ালাদের মডেলে কোলাকুলি হলো জবরদস্ত। ততোক্ষণে 'লাইমলাইটে'র প্রস্তুতিও সারা। ইন্টিরিয়রটাতে বেশ একটা সাহেবি পুরোনো আবহ রয়েছে। টান সোফা পাতা। আয়নাঘেরা দেওয়াল। একটা পুরোনো ইংরিজি উষ্ণতা রয়েছে সেখানে। পছন্দ হয়ে গেলো বেশ। জানা গেলো মনোজদা নাকি সেখানের প্রাচীন দেবতা খদ্দের। আমাদের চিরাচরিত সাউথ সিটি'র তুলনায় স্বর্গ বলা যায়। স্বচ্ছন্দ, আরামদায়ক, নিভৃত। অতো সকালে আমরাই ছিলুম শুধু। মনার্ক অফ অল উই সার্ভে। অমন পরিবেশে আড্ডা জমে উঠতে সময় লাগেনা। এই কাগজ, সেই কাগজ, এই লেখা, সেই লেখা। এই লোক, সেই লোক। সঙ্গতভাবেই এটা একটু 'কন্ডিফেনসিয়াল'। অবাক হবেন না। দুজন ফেভারিট মজলিশি হিমু আর কৌস'কে নিয়ে কথা হলো। দুজনেরই পিলে চমকে দেবার অপার ক্ষমতা নিয়ে সবাই একমত। নতুন লোকেরা তো চমকাবেনই। পুরোনোরাও মাঝেমাঝে পিড়িং (কৌসের ট্রেডমার্ক) খেয়ে যায়। তবে ছেলেদুটো এ-ওয়ান। সেতো মুখেন মারিতং বদুচাচাও তাই। যাঁরা তাকে দেখেছেন তাঁরা তার ভদ্রতা নিয়ে পাঁচমুখ। যা কিছু পিড়িংবাজি, সব কীবোর্ডে। গায়েব লোকজনদের নিয়ে একটু পিএনপিসি তো হতেই হবে। সবার আগে তো বাবিদা। সেই কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন ভদ্রলোক। কিন্তু দর্শন নেই। ক্যামেরা হাতে কার পিছু পিছু ভিক্টোরিয়া না প্রিন্সেপ ঘাট পৌঁছে গেছেন সেই নিয়ে বেশ নিবিড় আলোচনা চললো। তার মধ্যেই তিনি বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে প্রবেশ করলেন ঘনাদার ইস্টাইলে। ইতোমধ্যে মনোজদার আতিথ্যের ফিতে কাটা হয়ে গেছে। স্যুপ আর ফিশ ফিঙ্গার দিয়ে গৌরচন্দ্রিকা। বেশ সাহেবি মেজাজ। আড্ডার বিষয় তো আকাশে বাতাসে। স্রেফ ধরে আসরে নামিয়ে দিতে হয়। গাড়ি দৌড়োতে থাকে। এটাই মজলিশি কালচার। কোথায় কোথায় সারা পৃথিবীতে লোকজন ছড়িয়ে রয়েছে। কোন অদৃশ্য টানে বরফের মতো জমে যায় তাদের হৃদ্য ভালোবাসা। অনেকে তো দেখেছি বাড়ির লোকেদের থেকে মজলিশি বন্ধুদের সঙ্গে বেশি বিনিময় করেন সারাদিনে। কিছু তো পা'ন তাঁরা নিশ্চয়। ব্যাপারটা একেবারেই ভার্চুয়াল থাকেনা। অজান্তে কেমন একটা টান তৈরি হয়ে যায়। বিপ্রতীপ স্বভাবের মানুষেরা নিজেদের ইতিবাচক প্রবণতাগুলি নিয়ে আন্তরিকতায় মুখর হয়ে ওঠেন কিছুক্ষণ। জিন্দগি মেঁ অওর ক্যা রকখা হ্যাঁয়? ------------------------------ এর মধ্যে পৌঁছে যান সুদীপদা। প্রবীণ এই মানুষটিকে রোগটোগ দমাতে পারেনা। সব সময় পৌঁছে যান আড্ডায়, যেখানেই হোক না কেন সেটা? নেই নেই করেও আমরা তখন সাতজন। কিকি'কে আমরা মিস করছিলুম। ফোনেই কথা হলো আমার সঙ্গে। উই আর সেভন। মুখ আর হাত একসঙ্গে ব্যস্ত। মনোজদা জিন্দাবাদ। মাঝখানে নিনা'কে উঠে যেতে হলো। রাজার বাড়ি নেমন্তো ছিলো তার। আমরা আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে গেলুম। রাস্তার মোড়ের ঝুপড়িতে চা না খেলে নাকি বাঙালির আড্ডা পুরো হয়না। সেটাও হলো বাস আড্ডার ধারে একটা মারাত্মক খানাখন্দঘেরা চায়ের ঠেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তার পর? অবশ্যই পর নেই। কেউ মিনি, কেউ ট্যাক্সি কেউ বা মেট্রো। আসছে বছর আবার? নিশ্চয় আবার। আমি আর এ পথ মাড়াবো না, এই আমার শেষ লেখা, যাবার আগে শেষ কথাটি যাই বলে, ইত্যাদি পার্টিং মনোলগ ছাপিয়ে জেগে থাকে মজলিশি স্পিরিট। স্পিরিট মানে একাধারে মদ ও ভূত। এ দুটো নেশা এড়িয়ে কে আর থাকতে পারে? তা'কে লাল সলাম। ------------------ কেউ কেউ বলছেন লোকে হাসেনা কেন? তাঁদের জন্য ক'টা ছবিও থাক...
অলভ্য ঘোষ
মানুষ বিভ্রান্ত ; শুধু এদেশে নয় সারা পৃথিবীতে। পশ্চিম ইউরোপ,উত্তর আমেরিকা,জাপান,অস্ট্রেলিয়া(কালোরা বাদে)পৃথিবীর বিভিন্ন বিত্তশালী অঞ্চলে সাধারণ মানুষের গড় আয় পনেরো\বিশ হাজার ডলার হলেও তারা সর্বহারা মানুষের দলেই রয়েগেছে । শ্রম ছাড়া কিছুইনেই বেচার মত । বাড়ি,গাড়ি,ফ্রিজ,ডিস্ ওয়াশার,টিভি,কম্পিউটার বিভিন্ন কোম্পানি থেকে কিস্তিতে কেনা বাবদ হাজারটা ঋণ থাকে মৃত্যু পর্যন্ত শোধ হয়না । ধনতন্ত্রী দেশগুলিতে মানুষের জীবনের গুন (কোয়ালিটি অফ লাইফ )বাড়েনি,বরং কমে গেছে । অনেক থেকেও তারা সুখী নয় । অসাম্যের দরুন সে সব দেশে সামাজিক সুস্থতা নেই; আত্মহনন, নেশাগ্রস্ততা, খুনখারাপি, বিবাহবিচ্ছেদ, ধর্ষণ, বেশ্যাবৃত্তি, গুণ্ডামি, ডাকাতি, রাহাজানি,চুরি,পাগলামি বেড়েই চলেছে । তাই তথাকথিত উন্নত দেশগুলির মানুষ চরম অসুখী ও মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত । তৃতীয়বিশ্বর মানুষের উভয় সংকট আর্থিক ও মানসিক দরিদ্রতা । মুষ্টিমেয় দেশি ও বিদেশি শোষকরা নানা শৃঙ্খলে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে । সাম্রাজ্যবাদ,পুঁজিবাদ ,মাফিয়া চক্র,উগ্রপন্থা ,সামন্ততান্ত্রিক স্বৈরাচারী ক্ষমতা মানুষকে কেবল দাশ বানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ক্রমশ পণ্য সভ্যতার দিকে ঠেলেদিয়ে তাকে যন্ত্রমানবে পরিণত করেছে । বিপন্ন বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে । আত্মার সাথে ,বিবেকের সাথে শরীরের বিচ্ছিন্নতাবাদ নিজের মধ্যে নিজেকে টুকরো করতে করতে চেতনাকে স্থূল করে তুলেছে । সবই আজ ব্যবসার অংকে বিচার হয় । আজকের এই পণ্য বাস্তবতায় মানুষ কেবল ভোটার ;একটা পরিসংখ্যান । নিজেদের প্রকৃত অস্তিত্ব ভুলে লাল-নীল-সাদা-কাল-সবুজ-বেগুনিতে আপাত সম্মোহিত। উদার অর্থনীতির খোলা দরজা দিয়ে ডেংডেংকরে ঢুকে-পড়া অ্যামেরিকান কোম্পানিগুলো আসলে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানিরই রূপান্তর । ইংরেজ ও জমিদারেরা সামনের দরজা-দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রস্থান করলেও সাম্রাজ্যবাদী নয়া উপনিবেশিকতাবাদের দোসরেরা পিছনের ভেজান দরজা-দিয়ে ঢুকে পড়েছে চুপিসারে । সর্বত্রই বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের ছড়াছড়ি সাধারণের ধন প্রাণ যায় যায় অবস্থা । স্বাধীনতা আজো অধরা সাধারণের । সংরক্ষণ ,আরক্ষণ সমর্থন করবে নাকি বিরোধিতা করবে ? ব্যক্তিগত শরিয়তি আইন রক্ষা-করবে নাকি সকলের জন্য অভিন্ন বিধির বলবত হোক চাইবে ? ধর্মনিরপেক্ষতা (secularism) নাকি ছদ্মবেশী হিন্দুত্ব-বাদ ? আর এস এস নাকি এস এফ আই ? সব গুলিয়ে গ । মুক্ত বাজারে জাতীয়তাবাদের সারাৎসার জীবের জৈবিক প্রক্রিয়ায় নির্মিত মল বা বিষ্ঠার মতো পরিত্যাজ্য । সুবিধাবাদীর রাজনৈতিক বাতাবরণে কখনোই জন-দরদী গণতান্ত্রিক মতাদর্শের জন্ম হয়না । কারণ জনগণের চেতনার গলাটিপে ধরে আখের সিদ্ধি এধরনের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য যা সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে । আবহমান কাল থেকেই শোষিত নিপীড়িত মানুষ জাতিধর্ম ভৌগলিক স্থানাঙ্ক নির্বিশেষে এই ভূধরায় একি আকাশের তলায় অবস্থান করছে । নৈতিক ,অর্থনৈতিক ,সামাজিক,রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে অনিশ্চিত জীবনে রোজ মরছে যারা তাদের সবকিছুকে গোল পাকিয়েদিয়ে তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে পৃথিবী ,দেশের মধ্যে দেশ ,গোষ্ঠীর মধ্যে গোষ্ঠী,ধর্মের মধ্যে ধর্ম ,বর্মের মধ্যে বর্ম ,ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তি । আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে দাস সমাজে ,দাস থেকে সামন্ত সমাজে,সামন্ত থেকে ধনতন্ত্রী সমাজে ধনতন্ত্রী পুঁজিবাদী সমাজ থেকে পণ্য সমাজে এবং পণ্য সমাজ থেকে দ্রুত যন্ত্র সমাজে ঢুকে পরেছি যেখানে মানুষের হাত পা মস্তিষ্ক সবি আছে তবে নিয়ন্ত্রিত রিমোট কন্ট্রোলে । হয়তো আর একটা যুদ্ধ ধ্বংসই মানুষের শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটিয়ে আবার পিছিয়ে নিয়ে-যাবে আদিম রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদী সমাজে । কত কোটিবার যে নগর ধ্বংস হয়েছে । ইতিহাসও সঠিকভাবে জানেনা । যাই হোক এই সংকীর্ণ শ্রেণিসংঘাতের আগোল ছিঁড়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ;গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন করে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে Albert Camus এর মতো বলতে হবে "Don't Walk behind me ; I may not lead . Don't walk in front of me ; I may not follow ; just walk beside me and be my friend . " বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন করতে হবে তাদের নিজেদের ।
মনোজ ভট্টাচার্য
আর এক সিনেমাওয়ালা ! এখনও দঙ্গল দেখা হয় নি ! সে কী ! – একটা হীনমন্যতায় ভুগছিলাম ! হঠাৎ সকালে উঠেই ঠিক হল – আজই যেতে হবে ! মিত্রায় নুন শোতে হচ্ছে ! - বিধান সরনিতে আমাদের আজকাল যাওয়া হয় না । তাই আরও দুটো কাজ সারতে পারলে ভাল ! – কিন্তু এ পাড়ায় মুস্কিল হচ্ছে – বারোটা না বাজলে সকাল হয় না ! সব দোকানপাট বন্ধ থাকে ! তাই অন্য কাজ আর হল না । অগত্যা মিত্রা সিনেমা হলে এক ঘণ্টা আগে পৌঁছে দাঁড়িয়ে থাকি ! টিকিট কাউন্টারের লোক ছাড়া আর কাউকে দেখা গেল না । যখন সিঁড়িতে বসবো কিনা চিন্তা করছি – ঠিক সেই সময় – সিনেমার টিকিট কাটা আছে ? তাকিয়ে দেখি এক সুদর্শন ধুতি পাঞ্জাবী পড়া – আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ! আমরা বলি – টিকিট আছে ! উনি গেট কিপারকে বলে গেট খুলিয়ে বেঞ্চিতে বসতে বললেন ! - এখন এখানেই বসুন ! - হলে এখন ঝাঁট দেওয়া হচ্ছে – তা নয়ত ভেতরে বসতে বলতাম – বলে চলে গেলেন ! ভদ্রলোকের আন্তরিক কিছু কথায় আমাদের বেশ ভাল লাগলো ! এখনও কি কেউ অপরিচিত লোকের সঙ্গে এত আন্তরিকভাবে খোলা মেলা কথা বলে ! নিজেরাই বলাবলি করছি – আমাদের পরিচিত কিনা ! এমন তো হতে পারে – পরিচিত কিন্তু আমরা চিনতে পারছি না ! সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হবে ! শো আরম্ভ হবার ঠিক আগেই তিনিই এসে – আমাদের দুটো বেশ সুবিধেজনক সীটে বসিয়ে দিলেন ! – আমাদের সঙ্গে কিছু অন্তরঙ্গ রসিকতাও করলেন ! - আমাদের কিন্তু বেশ অস্বস্তি হতে লাগলো ! এত লোকের সামনে আমাদের নিয়ে আলাপ করছেন ! – আমরা আবার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে যেতে হবে না বলে নিচে কমদামী টিকিট কাটি । সিনেমা আরম্ভ হল ! – এবং আড়াইটা নাগাদ শেষও হল ! - লেকিন পিকচার তো আভি ভি বাকি হায় দোস্ত ! গেট দিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি সেই ভদ্রলোক মেন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে – ও তার সামনে দুজন – একজন তো জাপানি মনে হল - ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছেন ! – আমাদের দেখেই উনি প্রায় এগিয়ে এসে বলতে লাগলেন – এই যে আসুন ! - এরা কাজ করেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ! এখানে এসে আমার ইন্টার্ভিউ নিচ্ছে । এরা আমায় জিজ্ঞেস করছে – কেন আমি এখনও এই হল খুলে রেখেছি ! এখন তো সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে । এখনও সিনেমা হল চালিয়ে যাচ্ছি কেন ! আমার মুখে এসে গেল – পিকচারওয়ালা ! – উনি লুফে নিলেন কথাটা । ওটা তো আমাকে নিয়েই করা ! আপনারা দেখেন নি কৃতজ্ঞতা স্বীকারে আগেই আমার নাম দেওয়া ! ও তো আমাকে বলেই করেছে ! এই ডিমনিটাইজেশানে আমার কি ক্ষতি হয়েছে ! – আমার আর কি ক্ষতি হবে ! আমি তো ক্ষতিতেই হল চালাচ্ছি ! হলে কটা লোক দেখতে পেলেন ! সরকার ক্ষতিপূরণের টাকা দিচ্ছে না ! – তবু কেন হল বিক্রি করে দিচ্ছি না ! এই যে ছেলেটা – রাস্তার ওপর দাঁড়ানো এক স্ন্যাক বিক্রেতার কাঁধে হাত রেখে উনি বলে যাচ্ছেন – এ আমার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার অসুবিধেই করছে । তবু এই হলটা বন্ধ করে দিলে এর কি হবে ! এই হলে কতগুলো লোক কাজ করে দেখেছেন ! ওই লোকগুলো কোথায় যাবে ! ওরা তো সিনেমার কাজ ছাড়া আর কিছুই জানে না ! ওরা কি করবে – বলুন দেখি ! আমরা বলি – শুধু ওরাই বা কেন ! আমরা যারা এখনও সিনেমা হলে এসে বাংলা সিনেমা দেখি – আমরাই বা কোথায় যাব ! এইভাবেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা পাড়া - তৎকালীন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ইতিহাস - নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা হতেই থাকল ! কত সিনেমা হল, কত থিয়েটার হল ছিল আর কিভাবে উধাও হয়ে গেল ! যদিও কমার্শিয়াল সিনেমার মান কত নীচে নেমে গেছে – তবুও সে সব সিনেমাও দেখাতে হয় ! অনেকক্ষণ আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ বোধয় জেগে উঠলেন । বললেন – চা খাবেন ? – আমি বললাম – উল্টোদিকে সাঙ্গুভ্যালী রেস্টুরেন্টে চলুন ! উনি বললেন – চলুন ওপরে ! ভালো চা খাবেন ! আবার হলে ঢুকে – যে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চাই না – সেই সিঁড়ি দিয়েই ওপরে উঠে একেবারে ওনার নিজস্ব চেম্বারে গেলাম ! ওখানে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করছেন – তারা খুবই অবাক চোখে আমাদের দেখতে লাগল । হয়ত মালিকের আত্মীয়-স্বজন হবে ! যে লোকটি প্রথম থেকে আমাদের দেখছিল – সে তো খুবই খাতির দেখাল । ঘরে ঢুকে আমরা দেখতে পেলাম – টেবিলের ওপর একটা কম্পিউটার ! দেওয়ালে লাগানো রয়েছে একটা ‘দর্জিপাড়ার মিত্তির পরিবার’ বংশ-লতিকা ! দেখছি দেখে উনি বলে দিলেন – ওয়েবসাইটে দেখে নেবেন ! – উল্টোদিকে খুব সম্ভবত ওনার বাবার ছবি ! আর সি সি টি ভি তে বিভিন্ন জায়গার রানিং ছবি দেখা যাচ্ছে ! - না । ঘরে কিন্তু কোন উত্তমকুমার থেকে দেবকুমারের কোনও ছবিই নেই ! – আরম্ভ হয়ে গেল – গল্প ! আমরা কে কি করি – কোথায় থাকতাম – এখন কোথায় থাকি ! ইত্যাদি ! উনি হলেন দিপেন মিত্তির – মানে দর্জিপাড়ার মিত্তির ফ্যামিলি ! – এককালে তো খুব পয়সাওলা পরিবার ছিল ! এখন কি অবস্থা – জানি না ! নিজে বিয়ে করেন নি । কেন ? জিজ্ঞেস করাতে বললেন – অনেক মানুষের অনেক কিছু পায় না ! আমারও ছোটবেলা থেকেই প্রেম বা বিয়ে পায় নি ! খুবই লাজুক ছিলেন ! মা ছাড়া আর কারুর দিকে তাকাবার সাহস পান নি ! আর ওনার কথায় ‘ছোটবেলা থেকেই সিনেমা নিয়েই আছি’ ! – এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য কারন মনে হল না ! – সে যাই হোক ! তাতে তো আর আলাপচারিতা আটকায় না ! – আমার ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে তো খুব খোলামেলা আলোচনা করতে লাগলেন ! কোনও জড়তা বা দ্বিধা তো নেই ! যেটা দেখা গেল – সেই সিনেমাওয়ালার মতোই সারা দিন নাকি এই হলেই থাকেন । একবার খেতে যান দুপুরে ও রাতের শো তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে যান বাড়ি ! কথায় কথায় জানিয়ে দিলেন – ওনার কোথাও কোন বন্ধু বা আড্ডা নেই ! অর্থাৎ সোজা বাড়িই যান ! আমাদের তো মনে হল না – উনি খুব লাজবতি বা ইন্ট্রোভার্ট ধরনের মানুষ ! যিনি একেবারে অজানা দুজন মানুষের সঙ্গে প্রায় যেচে আলাপ করে মন কেড়ে নিতে পারেন – তিনি কি করে বন্ধু-হীন হতে পারেন ! – আমরা ইতিমধ্যে ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া করেছি ! কিন্তু আমাদের কাছে – দিনটা একেবারে উপরি পাওয়া ! সচরাচর এই বয়েসে কেউ যেচে বন্ধুতা করে না ! বিশেষ করে শহরে ! আর আচমকা এমন একজন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিল ! তবে এই একজন সিনেমাওয়ালার দর্শন পাওয়া, যে শুধু নিজের ছাড়া হলের সমস্ত কর্মচারী – এমনকি রাস্তার ফেরিওলার ভবিষ্যৎ পর্যন্ত ভাবে ! এইরকম সিনেমাওয়ালার সান্নিধ্যে আসা – সে তো আমাদের পরম প্রাপ্তি ! মনোজ
অলভ্য ঘোষ
যে দেশে এই অতিমানব যত বেশি জন্মায় সে দেশের সাধারণ ততো দুর্বল।কারণ সাধারণ শক্তিশালী হলে অতিমানব কে জন্মাতে হতো না।এটাই ট্রাজেডি ভারতে মহাপুরুষের ছড়াছড়ি।।ব্যক্তি সংগ্রাম দিয়ে সংগঠিত প্রতিষ্ঠান টলানোর স্বপ্ন ;গাঁজা খেয়ে রাজা হওয়া।ইতিহাস বলে জনগণের উত্থানই কেবল দিতে পারে সার্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন।তাই মানুষের ভবিতব্য ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে না থেকে আজি তাকে নিজহাতে তুলে নিতে হবে।নেতা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। হ্যামলীনের বাঁশীওয়ালার মত তার কোন Supernatural Power বা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নেই ।জনগনই শক্তির উৎস। একটা দেশের মানবসম্পদ সেদেশের জনগণ।ভারত প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ উভয় সম্পদে সমৃদ্ধশালী কেবল উভয় সম্পদই লুট হয়ে যায় এ দেশে।আর লুটেরারা চায় সাধারণ সংগঠিত না হোক।তারা ভাগ্য নিয়তি ভগবান এসবে একটু বেশি করে আস্থা রাখুক।তাতে সংগঠিত সংগ্রামের বৈজ্ঞানিক চেতনা খর্ব হয় অতি সহজে।আবার সাধারণের নেতা হিসেবে নিজেদের লোক নিয়োজিত করে সাধারণের নিয়ন্ত্রণ করে পুঁজি বাদী ,সম্রাজ্য বাদীর দল।যদি ধরে নিই যে কোন আন্দোলনের নেতা বাঞ্ছনীয় তবুও মুখ্য জনগন। যেমন বিবাহে মুখ্য পাত্র পাত্রী ঘটক নয়।নেতা কেউ হয়ে জন্মায় না। জনগণি তার নেতার জন্ম দেয়।নেতৃত্বের আভিজাত্য নিয়ে কখনো নেতা হওয়া যায় না। নেতা কেবল জনগণের ইন্টারপ্রেটার দোভাষী।জনগণের ভাবি তার ভাব। সে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
Dr Samya Dutta
গিলবার্ট কোম্পানির তৈরি অমন একপিস জাঁদরেল গ্র্যান্ডফাদার ক্লক কোনো সদাগরী আপিসের কেরানির হাতে আসবার কথাই নয়! পার্ক স্ট্রিটের রাসেল এক্সচেঞ্জ থেকে সিধা নিউ আলিপুরের কোনো খানদানী ড্রয়িংরুমে শোভা পাওয়াটাই ও'ঘড়ির পক্ষে দস্তুর। তবুও যে ঠাকুর্দা সনাতন আঢ্যি চমৎকার দাঁওখানা মারতে পেরেছিলেন, সে নেহাৎ ইন দ্যা ইয়ার নাইন্টিন ফিফটি তাঁর গুড লাকটা ভালো চলছিল বলে! ভাড়াবাড়িটার ঘুপচি ঘরে দিনমানেও আলো ঢোকে না। হারুর মা চলতে-ফিরতে হরদম ঘড়িতে হোঁচট খায়। নেপালবাবু নিজেও খান, কিন্তু প্রাণ থাকতে গ্র্যান্ডফাদারের শেষ স্মৃতিচিহ্নটি তিনি একচুলও সরাবেন না। ঠাকুর্দা ঘড়ির দশা এখন ঠাকুর্দারই শেষ বয়সের মত। এখানে-সেখানে উইপোকাদের মৌরসিপাট্টা, পুরনো পালিশের চটা উঠে উঠে কেসটার গায়ে বিচিত্র সব মহাদেশের মানচিত্র- তা হলেই বা! ওই গুমগুমে ঘন্টাধ্বনি তো এতটুকুও টসকায়নি! শুনলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। এবাড়িতে শীতের সকালগুলো আড়মোড়া ভাঙে বেশ বাঁধাধরা গতে। চানঘরের দরজাটা বেজায় অবাধ্য, কিছুতেই খিল আঁটতে চায় না। ঠিক সাতটায় ঘড়িটার প্রথম ঢং আর বেয়াড়া খিলটাকে বশে আনতে আনতে নেপালবাবুর প্রথম 'শালা' উচ্চারণ- এই দুইয়ের সমাপতন এবাড়ির রুটিন। তারপর শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে নেপালবাবু ঠিক আরও ছ'বার সম্বন্ধীকে স্মরণ করেন, প্রতিবার ঘড়ির ঢং-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ভিজে শরীরে শীতের কামড়টা যত জাঁকিয়ে বসে, গলার পর্দায় কাঁপনও তত পাল্লা দিয়ে বাড়ে। শেষ 'শালা'টা মুখ থেকে বেরোনোর আগেই কিন্তু নেপালবাবুকে উত্তরের বক্স জানালাটা খুলে ফেলতে হবে, কারণ টবের তুলসীনারায়ণের এখন জলগ্রহণের সময়। আদুর গায়ে মাঘের কনকনে হাওয়ার মুখে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো কষ্টকর, তাই 'তুলসী, তুলসী তুমি নারায়ণ'-এর পর বাকিটা তাঁকে 'হুঁ হুঁ' করে সংক্ষেপে সারতে হবে। বাড়ির লাগোয়া বাজারের একমাত্র নালাটি তাঁর এই জানলার ঠিক পাশে, ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকেই হালকা হবার তাগিদে এখানে আসতে হয়। তাই কষ্টসহিষ্ণু নেপালবাবু যদিও বা কদাচিৎ 'তোমার শিরে ঢালি জল' অবধি অগ্রসর হন, নাকে দুর্গন্ধ ঢোকামাত্র "এই শালা, এটা বারোয়ারি পেচ্ছাপখানা পেয়েছিস? হারামজাদা, তোর বাড়ির দেয়ালে মুতে আসব, দেখবি?" ইত্যাদি বলে চেঁচাতে একরকম বাধ্য হবেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও কি শান্তি আছে? বাসি ক্যালেন্ডারে মা লক্ষ্মী কখন থেকে একখানি ধুপের অপেক্ষায় বসে আছেন। তা ধুপ ধরাতে গিয়ে হাতের দেশলাই যদি হাওয়ায় নিভেই যায়, নেপালবাবুকেও তো 'ধ্যাশ্শালা' বলতেই হবে! শেষটায় চারবারের চেষ্টায় ধুপ জ্বললে, নেপাল আঢ্যি সেই ধুপ বনবন করে বারকতক মা লক্ষ্মীর সামনে ঘুরিয়ে, ক্যালেন্ডারে মায়ের পায়ের কাছটা খাবলে একবার প্রণাম ঠুকে নেবেন। খাবলানোর চোটে হয়তো বৈশাখের কয়েকটা দিন ছিঁড়ে হাতেই চলে আসবে! তা সেসব নিতান্তই আর পাঁচটা দিনের ব্যাপার। আজ দিনটা অন্যরকম। আজ বাজারে যাবার মুখে বাড়িওয়ালীর ছেলে সত্যর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সত্য দাঁত মাজার ব্রাশ মুখের ভেতর চিবোতে চিবোতে বলল, "কাকাআউ, ঙাঁ অলছিল... এ আঁসের আড়াটা, অডি এট্টু আড়াটাড়ি..." অন্যদিন হলে নির্ঘাত নেপালবাবু চোখ পাকিয়ে, মুখে ফেনা তুলে তর্ক জুড়ে দিতেন, "ভাড়া! কীসের ভাড়া হে! বলি, দু'বেলা পাম্প চলে না কেন? সিঁড়ির আলো জ্বলে না কেন? কল থেকে জল না পড়ে ছাদ ফুটো হয়ে পড়ছে, আবার ভাড়া! হুঃ!" আজ কিন্তু সেসব কিছুই বললেন না। বরং কন্ঠে মধু ঢেলে বললেন, "বাবা সত্য! আজ তো সবে দোসরা। পেনশনটা তুলতে দাও, তারপর নাহয়... আহা! তোমাকে কি তাগাদা দিতে হয়েছে কখনও? তোমার বাবা বেঁচে থাকতে কিন্তু..." সত্যর পরলোকগত পিতার স্মৃতিচারণ অসমাপ্তই থেকে গেল, দোতলার জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে সত্যর মা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, "মিঠে কথায় ভুলিসনি, সতে! তোর বাপকেও অমনধারা কথার ফাঁদে ফেলেই অক্ত চুষে খেয়েছে!" সর্বৈব মিথ্যা! এলেবেলে একটা দিনে এমন ভয়ানক অনৃতভাষণ শুনলে নেপালবাবুর শিখার কাছটা কি দপ করে জ্বলে উঠত না? কিন্তু, আজকের দিনটা তো আর... আজ নেপালবাবু একটা পীড়িত হাসি হেসে শুধু বললেন, "বৌদি, গরীব ভাইটার কথাও একটু ভেবে দেখুন! আসছে হপ্তায়... কথা দিচ্ছি..." হারুর মা ঠিক এইসময়টায় কাজে আসে। সদর দরজার সামনে মনিবের সঙ্গে তার নিত্য ঠোকাঠুকি হয়। আজও নেপালবাবুকে তার নিয়মমাফিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হল। "এবেলা কী রান্না হবে?" গতকাল অবধি নেপালবাবু এই প্রশ্নের উত্তরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছেন, "আমার পিন্ডি!" আজ টাকটা বারকতক চুলকে, কী যেন একটু ভেবে নিয়ে বললেন, "দুপ্পুরটা একটু হালকা দেওয়াই ভালো, নইলে আবার... ভাতে-ভাত যা হোক করে দে না!" ওই যে বললাম, আজ দিনটা একটু ব্যতিক্রমী। ভাগ্যিস সতে বেটা টের পায়নি! নেপালবাবুর পকেটে আজ কড়কড়ে টাকা। আজ দুধ আসবে, একটু বেশি করেই আসবে, আর আসবে গোবিন্দভোগ চাল। আর...আর, ফেরার পথে মুদির দোকানে একটিবার ঢুঁ মারতে হবে। উমদা কাজু-কিশমিস চাই, সঙ্গে চাই পাটালি, ভালো খেজুর গুড়ের পাটালি। আজ নেপালবাবু পায়েস রাঁধবেন। নলেনগুড়ের পায়েস। ছেলেবেলায় শোনা একটা গান গুনগুন করে ভাঁজতে গিয়ে নেপালবাবু টের পেলেন, মুখের ভেতরটা লালায় ভরে যাচ্ছে: "আযা পিয়া, তোহে পেয়ার দুঁ/ গোরি বাঁইয়া..." -বেশি লাগবে না? কী বলিস! আরে, পরমান্ন বলে কথা! -"তা'বলে অ্যাত্ত!" বিস্ময়ে হারুর মায়ের হাঁ বন্ধ হতে চায় না। -নয়তো কী? দু'কেজি দুধে একমুঠো চাল। সরেস গোবিন্দভোগ। এই হচ্ছে হিসেব, বুঝলি? -কই, বিশ্বেসদের বুড়িটা সেবার পায়েস দিয়ে গেল... সেই যে গো, মনে নেই? আরে, নাতিটার বাট্টে না কী যেন ছিল... তা, তিনি তো... -থাম দিকিনি, থাম! ওটা পায়েস হয়েছিল? দুধ একদিকে, চাল একদিকে, আর চিনি আর একদিকে। যেন কারো সঙ্গে কারোর মুখ দেখাদেখি নেই! ওই সাদা ফ্যাটফ্যাটে দুধ-ভাতের নাম পায়েস? ছোঃ! ডানহাতে হাতাটা নাড়তে নাড়তেই বাঁ-হাতখানা নেড়ে নেপালবাবু বিশদে বোঝাতে শুরু করেন, "চালটা যখন সেদ্ধ হয়ে আসবে... টিপে দেখে নিতে হয়, বুঝলি? তখন পাটালিগুলো ছেড়ে দিয়ে দুধটাকে ফুটতে দে। যত ফুটবে, তত ঘন হবে। শেষটায় যখন লালচে হয়ে আসবে, দেখবি বুজকুরি কাটছে... তখন আঁচ বন্ধ করে ঢাকনা দিয়ে দাও, ব্যস! খালি নামানোর সময় এট্টু কাজু-কিশমিস ছড়িয়ে দিলেই..." নেপালবাবু জিভের জল সামলান। অশথ্ব গাছটার মগডালে একটা পেটকাটি ঘুড়ি আটকা পড়েছে। উত্তুরে বাতাসে বল পেয়ে, ঘুড়িটা আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাঁধন কাটিয়ে পালানোর। আওয়াজ হচ্ছে লাগাতার... ফরফর...ফরফর... জানলা দিয়ে একমনে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন বলেই হারুর মায়ের কথাটা তাঁর ঠিক কানে গেল না। -কে আসবে বললি? -ঝুমুদিদি গো! বাচ্চাদুটোরে ইস্কুল থেকে নেবার পথে হয়ে যাবে বলল। অশথ্ব গাছের মাথা থেকে মনটা মাটিতে ফিরে আসতে খানিকক্ষণ সময় নেয়। আচমকা হোঁচট খেয়ে কোঁৎ পাড়ার মত থেমে থেমে প্রশ্নটা করলেন নেপালবাবু, "ঝুমু...আসবে! এখানে! মানে, আজ? আজই? মানে, তুই...তুই জানলি কীকরে?" । -ওই দেকো! আপনেরে ফোন করে পায়নি বলেই তো, আমায় খপরটা দেতে বলল... বাবু, আমার হারুটার জন্যি এট্টু পায়েস নে যাবো? ও বাবু?" একসঙ্গে হাজার হাজার ছুঁচ শরীরে বিঁধলে কেমন যেন অবশ-অবশ লাগে। তখন ঠান্ডা হাওয়ার ঠকঠকানিও আর টের পাওয়া যায় না, খোলা জানলার সামনে বসে থাকতে থাকতেই একটু ঢুল এসে যায়। আট নম্বর বিড়িটা দু'আঙুলের ফাঁকে ফুরিয়ে যেতে যেতে ছ্যাঁকা দিয়ে গেল। ঘুম জড়ানো গলায় একটিবার "উরিশ্শালা!" বলে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন নেপালবাবু। বাতিটা জ্বালানো হয়নি। ঘর অন্ধকার পেয়ে পায়ের কাছটা ছেঁকে ধরেছে মশায়। "ধুশ্শালা!" নেপালবাবু পায়ের গোছটা চুলকে নিলেন। রাত কত হল? বাইরেটাও কেমন থমথমে, কেবল অশথ্ব গাছটা থেকে এখনও শব্দ আসছে: ফরফর... ফরফর... ধুশ্শালা! ঘরময় তুলোর ওড়াউড়ি। নাতিদুটো দাদুর বালিশ নিয়ে কৌরব-পান্ডব খেলেছে। তারপর যুদ্ধবাজের বুভুক্ষা নিয়েই পায়েস সাবড়েছে, পাক্কা দু'বাটি। তাদের মাও বাদ যায়নি। আরও এক। চক্ষুলজ্জার খাতিরে জামাইয়ের জন্যও টিফিন কৌটো ভরে দিতে হয়েছে। বাকিটা নিয়ে গেছে হারুর মা। পায়েস খেয়ে হারূ কাল সকালে দাদুকে পেন্নাম করতে আসবে। ফরফর... ফরফর... "ধুশ্শালা!" ঘুড়িটার মরিয়া প্রচেষ্টায় এবার তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠেন নেপালবাবু। উঠে জানলাটা বন্ধ করতে যাবেন, পিছনে একটা 'ঠুং' শুনে তাঁর কান খাড়া হয়ে ওঠে। একজোড়া দুর্বল পা একটা একটা ক্ষয়াটে শরীরকে বয়ে এনেছে ঘরের ভেতর। পায়ের আওয়াজে ক্লান্তির ছাপ ঢেকে দিচ্ছে হাপরের মত শ্বাস টানার শব্দ। রোগা মানুষটার লম্বা ছায়া পড়েছে মেঝেতে। আর তার হাত থেকে যে জিনিসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা হয়েছে এইমাত্র, অন্ধকারেও সেটার দুলতে দুলতে স্থির হওয়াটা দেখতে পেলেন নেপালবাবু। সেটা আর কিছুই নয়, তাঁর পায়েসের হাঁড়ি! -কী গো? তুমি... এত রাত্তিরে! শরীরটা আবার খারাপ হল নাকি? রোসো, ডাক্তারকে একটা... ধুশ্শালা! ফোনটা আবার কোথায়... -আহ! থামবে তুমি? অত ব্যস্ত হবার কিছু হয়নি। -তবে? কনকলতার চোখজোড়া কোনদিনই ঠিক পটলচেরা নয়। তবে, শরীরটা রোগা বলেই বোধহয় চোখদুটো এখন বড়বড় দেখায়। সেই বড়বড় চোখদুটো কিছুক্ষণ নেপালবাবুর মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল। "খেয়ে নাও।" -খেয়ে নেব? কী খেয়ে নেব? -কেন? সারাটাবেলা হাত পুড়িয়ে যা রাঁধলে! শুয়ে থাকি বলে কি খবর পাইনা ভেবেছ? মেয়েরা যখন খাচ্ছিল, বিষনজরে দেখছিলে তো! নাও, যেটুকু আছে, খেয়ে উদ্ধার করো দেখি! -যাহ্! কী যে বল... ও পায়েস... ও আমি কীকরে খাবো? -কেন? -গেল মাসে সুগারের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার কী ধমকটাই না দিলে! আবার পায়েস খেয়েছি শুনলে... ওরে বাবা! না না, রক্ষে করো! দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে মানুষটার কীর্তিকলাপ দেখে দেখে, কনকলতা এখন বিস্মিত হতেও ভুলে গেছেন। তবুও কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলেন, "তবে, অত খেটেখুটে রাঁধলে কেন?" নেপালবাবু একটা বোকাটে হাসি হাসেন। তারপর আমতা আমতা করে বলেন, "তোমার মনে আছে? ঝুমু তখন খুব ছোটো... রাঙাপিসিমাদের কুলতলির বাড়িতে খাঁটি গুড় আসত। পিসিমা পায়েসটা করতেনও চমৎকার! তুমি সেবার খুব তৃপ্তি করে খেয়েছিলে।" -হুঁ... -বাপরে বাপ! এক জামবাটি পায়েস একাই মেরে দিলে। -যাহ্! মোটেই না। -"হে হে।" হাঁড়িটার গায়ে পায়েসের চাঁচিটুকু লেগে রয়েছে। নেপালবাবু সেটুকু যত্ন করে তুলে বৌয়ের মুখের সামনে ধরলেন। "নাও, খেয়ে নাও। লক্ষীটি।" দুই বুড়োবুড়ি পাশাপাশি বসে পড়েন। খানিকক্ষণ চুপচাপ, শুধু বাইরে থেকে আওয়াজ আসে, ফরফর... ফরফর... -ডাক্তারের সাথে কাল কী কথা হল গো? স্বামীকে নতমুখে চুপ করে থাকতে দেখে কনকলতা বলে ওঠেন, "দেখো, ডাক্তার যদি হাল ছেড়ে দিয়েই থাকে, আর ওসব ওষুধপত্তর-হাসপাতালের হ্যাঙ্গাম কেন? এই তো বেশ আছি! না বাপু, আর ওই রে নিতে যেতে পারবো না।" নেপালবাবুর মুখে ব্যথাতুর নীরবতা। কনকলতা আবার বলেন, "সমু এমাসে টাকা পাঠায়নি, না?" উত্তর নেই। নিস্তব্ধ ঘরে কেবল কনকলতার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। -শোনো, যেকটা দিন আছি, আমার সামনে অমন গোমড়া মুখ করে থেকো না বাপু! একটু হাসো তো! কী হল? সেই বোকাটে হাসিটা হাসতে গিয়ে নেপালবাবুর দু'চোখে জল টলটল করে ওঠে। -উফ! আচ্ছা, শোনো! এই, শোনোনা... কাল একটু দই-পটল করবে? কনকলতার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। এবার নেপালবাবুও সত্যিকারের হাসি হেসে ফেলেন। "তোমার মনে আছে? সেবার ভাগলপুরের জেঠুমণিদের বাড়িতে..." দুই বুড়োবুড়ির মাঝে একটা ঝুঁঝকো আঁধার এতক্ষণ গুমরে মরছিল। এবার কোথা থেকে একফালি মরা চাঁদের জ্যোৎস্না এসে জোটে। ঠিক নলেনগুড়ের পায়েসের মত তার রঙ। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, পেটকাটি ঘুড়িটা একটা দমকা বাতাস পেয়ে, অশথ্ব গাছের ডাল ছাড়িয়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়।
সৌমিত্র বিশ্বাস
অনেক অনেক দিন হল সময় নিয়ে ব্লগ খোজা হয় না। আজ ছোট্ট বাবুটা সকাল সকাল ঘুমিয়ে যেতেই পুরোনো অভ্যসটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। গুগলে ঠিক কি লিখে সার্স দিয়েছিলাম মনে নেই কিন্তু এই সাইটা ইনডেক্সের প্রথমেই চলে এলো। ক্লিক করে এখনে এসেই চমকে গেলাম, একটু ব্যতিক্রমী মনে হল সবকিছু। চট করে রেজিষ্ট্রেশন করে ফেললাম।
নব ভোঁদড়
ছিল নাকি‚ একফোঁটা জল? সেইখানে‚ দুপুরবেলায়? তেষ্টাও পেয়েছিল নাকি? মনে মনে এখন মেটাই|
মনোজ ভট্টাচার্য
মধ্য প্রদেশ ভ্রমণ ! ( তৃতীয় পর্ব ) মান্ডু বা মান্দভগড় – বোধহয় মণ্ডপ-দুর্গা থেকে হয়েছে ! দুর্গ মানে আশ্রয় ! দাই-মা কা ডেরা বা মহল – একটা গোলাকার প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের সামনে আমাদের গাইড বেশ একটা ম্যাজিক দেখাল । প্রাসাদের ঠিক উল্টোদিকে একটা জলাশয়ের সামনে এসে – চেঁচিয়ে কিছু বললেই তার প্রতিধ্বনি আসতে লাগল । ঠিক একটা নিদিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালেই প্রতিধ্বনিটা শোনা যাচ্ছে ! রূপমতির চত্বর ! এটা একটা পবিত্র ও সুন্দর প্রেমের কাহিনী । মালোয়ার রাজকন্যা রূপমতি খুব সুন্দর গান গাইতেন ও কবিতাও লিখতেন ! মান্ডুর সুলতান বাজ বাহাদুর রূপমতির গান শুনতে পেয়ে তার প্রেমে পড়ে যায় ও হিন্দু ও মুসলিম রীতিতে দুজনে বিয়েও করে ! একটা সর্ত ছিল ! প্রতিদিন সকালে সবার আগে রূপমতি গান গাইতে গাইতে নর্মদা দর্শন করবে ! আর সেই সময় বাজ বাহাদুর দূর থেকে তা অবলোকন করবেন ! বাজ বাহাদুর আর রূপমতির কাহিনী প্রসারিত হতে থাকল আর সম্রাট আকবরের কানেও এসে পৌঁছল – তিনি আদম খান নামে এক সেনাপতিকে পাঠালেন রূপমতিকে নিয়ে আসতে । সম্রাটের অতশত সৈন্যর কাছে মান্ডুর অতি কম সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বাজ বাহাদুর পরাজিত হল ! তাই দেখে রূপমতি তার অন্তরঙ্গ সখীদের নিয়ে বিষ খেয়ে আত্মঘাতি হন ! এইসব কারনেই এই রূপমতির চত্বর – এখানকার বাসিন্দাদের কাছে খুব পবিত্র ! কোনও এক সম্রাটের হারেমে নাকি দেড় হাজার বেগম বা রমণী ছিল ! তার আবার দুটো জিনিস একেবারে না-পসন্দ ছিল । এক – কোন রমণীর চুল যেন সাদা না হয় – আর দুই কোন রমনী যেন স্থুলকায়া না হয় ! – পাকা চুল সাদা হওয়ার জন্যে এক ধরনের ফলের গাছ আনা হয়েছিল । সেই ফলের সাবানের মতো মাথায় লাগিয়ে সামনের পুকুরের জলে ধুতে হত ! – আর স্থুলকায়া রানীদের জন্যে কি করা ! – সম্রাটের প্রাসাদে অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে হত রানীদের – সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে একটি করে আসরফি রাখা থাকত ! প্রতিটি আসরফি কুড়িয়ে কুড়িয়ে এনে জমা দিতে হত । পরে অবশ্য সেই আসরফিগুলো দিয়ে ইতরজনেদের মধ্যে ভোজ দেওয়া হত ! সিঁড়ির ধাপগুলো খুবই অসমান – উচু-নীচু ! একবার ওঠাই প্রচন্ড শ্রমসাধ্য ! তাই তো এখন সবাই জিমএ যায় ! কে অত সিঁড়ি ভাঙবে ! – আমাদের অনেকেই একবার উঠতে পারেনি ! এ রকম কত গল্প ও প্রেম-গাথা কথিত আছে ! – মনে হয় যেন প্রাসাদের প্রত্যেকটা গম্বুজ প্রত্যেকটা অলিন্দ এইসব সুখদুঃখের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ! কে জানে হয়ত কোন এক থামের ভেতরেই আছে – কোনও মানুষের জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস ! লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম – খুব সম্ভবত জব্বলপুরে ঋষি হোটেলে আমাদের বাস থামতেই – বেশ কয়েকজন সুবেশা মহিলা মালা হাতে ও চন্দন সহযোগে সবাইকে সম্বর্ধনা করলো ! একদম হাওয়াইয়ান রীতিতে ! নিজেদের মনে হচ্ছিলো সম্মানীয় অতিথি ! সে তো বটেই ! আমরা তো সম্মানীয় অতিথি বটেই ! - কিন্তু কোনও হোটেলেই তো বিশেষ কোনও সম্বর্ধনা জানানো হয় হয়নি ! এমন কি এত জন অতিথি হোটেলে পদার্পণ করতেই – একটা অনীহা ভাব ! – ভালই লাগল ঋষি হোটেলটাকে ! এবং অবশ্যই মহিলাদেরও ! মধ্য প্রদেশ এত বড় ও এত দর্শনীয় স্থান আছে – যে কোনও ট্র্যাভেল এজেন্টএর মাধ্যমে এলে একবার কেন – কয়েকবার এলেও দেখা পূর্ণ হয় না ! আর আমাদের মত লোকেদের পক্ষে একাকি দেখাও সম্ভব নয় ! – তবু যেটুকু চোখে ধরে – মনে ধরে – দেখে যা - - ! ( শেষ ) মনোজ
শিবাংশু
বাঙালির উমা আসেন শরৎকালে। আমাদের উমা আসার কোনও নিশ্চিত সময় নেই। তিনি ছয়ঋতুর যেকোনও সময় এসে আবির্ভূত হ'ন। কিন্তু স্পিরিটটা একই রকম। মজলিশি ইভেন্ট ম্যানেজার পার এক্সেলেন্স শিল্পীদেবীর ফোন এসেছিলো দু'চারদিন আগে। এবার তিনি আসবেন বছরের শেষদিনে। তবে তো সেদিনই বোধন। সাকিন সেই একই। সাউথ সিটি মল। যেখানে ফুডকোর্টে নিজের গলার আওয়াজই শোনা যায়না। তবু আমাদের আড্ডা বোধ হয় কথা শুনতে পারলেও জমে যায়। সময় দেওয়া ছিলো দোপহর বারহ বজে। আমি সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছে দেখি ততোক্ষণে বাবিদা দ্য সিনিয়র থেকে সস্ত্রীক ঋত্বিক দ্য জুনিয়রসহ সোমা, সাহেবশঙ্খ অলরেডি পৌঁছে গেছেন।তবে দেবীর তখনও দর্শন নেই। একটু দেরিতেই এলেন উমামহেশ্বর, লক্ষ্মীদেবী সমভিব্যাহারে। একটু পিছিয়ে সুদীপদা। অ্যাবং সর্বশেষে কিকি দ্য গ্রেট। এমত আবহে কী আর গপ্পো জমতে দেরি হয়? দু'চারটে ভদ্রস্থ বিষয় 'আলোচনা'র পরেই ফোকাসে এসে যায় চিরাচরিত মজলিশি কিস্যার ইয়ার্কি ফাজলামি। গুরু বলেছিলেন, " এতো বুড়ো কোনওদিন হবো নাকি আমি/ হাসি'তামাশারে যবে কবো ছ্যাবালামি।" গুরুবাক্য বৃথা হয়না। অতএব ফোয়ারার মতো হাস্যপরিহাস আর মাঝে মাঝে কিছু গম্ভীর 'প্রপঞ্চ' (দেবাশিসের পেটেন্ট ট্যাগলাইন)। কী কী কথা হলো তার বিশদ এখানে দেওয়া হবেনা। সেসব শুধু আড্ডাধারীদের কপিরাইট। মহেশ্বরবাবু সক্রিয়ভাবে অন্যদের এলবো আউট করে প্রভূত খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করে ফেললেন। থিম ছিলো তাঁর বর্তমান নিবাস, স্যামচাচার ভোজনপসন্দ লিস্টি থেকে। সেসব উড়ে যেতে পলকও লাগলো না। তার পর আবার নতুন উদ্যমে পরচর্চা। ------------------- এর পরের আড্ডাটি আবার কবে হবে এই প্রসঙ্গে কথা উঠতেই স্থির হলো মজলিশের দীর্ঘমেয়াদি উপযুক্ত সুপাত্রের উদ্বন্ধনই হবে সঠিক উপলক্ষ্য। পাত্র নিজে এ বিষয়ে খুব নিশ্চিত না হলেও ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়ে গেলো। আড্ডার নেশায় ঋত্বিক সেই খড়্গপুর থেকে ধেয়ে এসেছে। বাকিরাও ফিরে যাবে যথাস্থানে। আসছে বছর আবার হবে প্রতিশ্রুতিসহ সভাভঙ্গ হলো বটে। কিন্তু কাস্টমারি তিনতলার কাচের মেঝের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোটুসেশনটা না হলে আর কিছু না হোক, মহাভারত তো নিশ্চয় অশুদ্ধ হয়ে যাবে। তা কিছুতেই হতে দেওয়া যায়না। সেটা হলো। শেষ ছবিটি তোলা হবে কোনও অচেনা মানুষের হাতে। যাতে সবাই নিজেদের শ্রীমুখ নিয়ে ফোটোস্থ হবার গৌরব অর্জন করতে পারেন। তাও হলো। তবে মিস করলুম কয়েকজন নিশ্চিত মজলিশিকে। যাঁরা নানা কারণে এবার এসে পৌঁছোতে পারলেন না। পরের বার নিশ্চয় আসবেন। -------------------------- কৎবেলের জয়ধ্বনি দিয়ে ভক্তগণ নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।
মানব
চরিত্রঃ ১। প্রবাল – ইঞ্জিনিয়ার ২। মিহির – স্বনির্ভর ৩। অর্নব – সাহিত্যিক ৪। সুকান্ত – শিক্ষক (চারিদিকে প্রস্তুতি চলছে কলেজ ফেস্টের। বিভিন্ন রকম সাউন্ড চেক, লাইট চেকের শব্দ, আর ঝিকিমিকি নানা রঙের আলোতে চারিদিক মুখর। এরই মধ্যে অর্ণবের প্রবেশ।) অর্ণব – কলেজের ভাগ্যাকাশে আজ চাকরীর দুর্দশা। তার ক্লাসরুম গুলিতে আজ প্রতিশ্রুতির বাতেলা। কে চাকরী দেবে ষাটখানা ছেলেকে, কে ঘোচাবে তাদের বেকারত্বের জ্বালা... (দুরন্ত গতিবেগে প্রবালের প্রবেশ) প্রবাল – আরে অর্ণব যে, এতদিন পর কলেজের দিকে কি মনে করে? অর্ণব – আমি তো ভাই এখানেই থাকি। তুই ই তো এলি বহুদিন পর? আরে বেশ নধর হয়েছে তো চেহারাখানা। কি ব্যাপার? (ভুঁড়িতে খোঁচা মেরে) প্রেম ট্রেম নাকি? প্রবাল – হ্যাঁ তা পাঁচ বছর হয়ে গেল বৈকি। অর্ণব – ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে? প্রবাল – আরে তা না, আমি কলেজ ছাড়ার কথা বলছিলাম। আর লক্ষ্য করে দেখ আজকের দিনটাতেই আমাদের হস্টেল লাইফের শেষ হয়েছিল, আর সেই দিনটাও ছিল সোমবার। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে বারবার। অর্ণব – আঃ অত চাপ নেওয়ার কোন দরকার নেই ভাই। এসেছি যখন বিন্দাস মজা করে কাটাবো। বেশি ক্যালকুলেশন কপচানোর দরকার নাই। প্রবাল – ধুর তোদের আর মানুষ করতে পারলাম না। তোর মনে আছে মাজিদা যখন তোকে সিগারেট ধরাতে বলেছিল তুই ধুপের মত করে সিগারেটখানা ধরলি আর জ্বালাতে গিয়ে পুরো সিগারেটটা কালো করে ছেড়ে দিলি। অর্ণব – তাও তো চেষ্টার কোন ত্রূটি রাখিনি বল। তবুও কি বিচ্ছিরি রকমের গালাগালি করল বল! প্রবাল – শালা অত দামি সিগারেট চোখে দেখেছিস কোনদিন? ওই জিনিস যদি কেউ পুড়িয়ে কালো করে দেয় যে কেউ তাকে খিস্তি মারবে। অর্ণব – কিন্তু মাজিদারও তো বোঝা উচিত ছিল যে আমি যখন সিগারেট খাইনা তখন নিশ্চয়ই আমি মুখে নিয়ে ধরাবোনা। প্রবাল – তা, লেখালেখি করে তো আশাকরি ভালোই কামাচ্ছিস। অর্ণব – হ্যাঁ ওই কি যেন বলে, ‘আমার বকলেসহীন জীবন জিন্দাবাদ।’ টাকাপয়সা ঠিকঠাক জুটুক বা না জুটুক, জীবনে আনন্দ আছে, মনের মত কাজ পেয়েছি বলে। সেই সময়ে ঠিকঠাক ডিসিশনটা নিয়েছিলাম বলেই তো। আর তোর সাথে সেই দুঘন্টার আলোচনা হয়েছিল এটা নিয়ে, মনে আছে? প্রবাল – মনে আবার থাকবেনা। সে যা টেনশন দিয়েছিলি! অর্ণব – (ফোনের দিকে তাকিয়ে) এই দেখ ভাগ্নের মেসেজ এসেছে। উন্নাসিক কি সমাস জিজ্ঞেস করছে। মেনে নিলাম দুচারখানা বই লিখে পেটের ভাতটা জোগাড় হয়ে যাচ্ছে। তাই বলে এরা কেন বোঝে না যে আমি বাংলা অনার্স নই, আমি বি. টেক. এর স্টুডেন্ট। জানিনা বললেও আবার উল্টো বিপদ। মনে মনে ভাববে মামাটা চোথা করে পাশ করেছে। প্রবাল – খুব একটা ভুল ভাববে কি? চোথা শিল্পে তুই যে বিবর্তন এনেছিলি, তা সত্যিই প্রেরণার যোগ্য। সে যাইহোক, আপাতত কি যেন বলছে ভাগ্নে? অর্ণব – হ্যাঁ, উন্নাসিক... প্রবাল – উনুনের শিক, জ্বলন্ত সমাস... অর্ণব – হাঃ হাঃ। তুই পারিসও। তা কাজকর্ম কেমন চলছে? অবশ্য তোর তো ভালভাবেই চলার কথা। ইঞ্জিনিয়ারিং কে ভালোবেসে তুই ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিস। নিজের প্রেমিকাকে বিয়ে করলে বিবাহিত জীবন সুখেরই হবার কথা। প্রবাল – (মাতলামি করে) শালা, প্রেম নিয়ে আমাকে গল্প শুনতে হচ্ছে একটা লেখকের কাছে, যে কিনা জীবনে একটাও প্রেমের গল্পও লেখেনি। কি দিন এলো মাইরি... অর্ণব – তোর মনে হচ্ছে নেশা হয়ে গেছে। চল চল একটু রেস্ট নিবি চল। সারারাত আবার জাগতে হবে তো। প্রবাল – আরে না। কোন নেশা টেশা নয়। এমনি একটু চমকে দিলাম। এই এলাকার এমন কোন নেশা নেই যেটা আমি চেখে দেখিনি। কিন্তু আজকাল আর তেমন সময় হয়ে ওঠেনা। কাজের বড়ই চাপ, সময়ের বড়ই অভাব। অর্ণব – আজ অন্তত ওসব ছাড়, ফুলটুস এনজয় করব আজকে... (প্রস্থান) (রাস্তা চলতে চলতে মিহির আর সুকান্তের মধ্যে গল্প) মিহির – সিরিয়াসলি জানিস, আমি ভাবতে পারিনি, তুই শালা মাস্টারবাবু আমার সাথে বার-এ মাল খেতে আসবি। আমি ভাবলাম তুই বড্ড অদর্শবান হয়ে গেছিস। সুকান্ত – সঙ্গদোষ রে, সঙ্গদোষ। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে নরকবাস। তুই যে কি মাল, ভগবানও বোধহয় তা ডিসাইড করে উঠতে পারেননি। তাই আমাকে যদি স্বর্গ আর নরকের মাঝখানে ঝুলিয়ে ফেলে রাখেন, আমার অবস্থাখানা কি হবে ভেবে দেখেছিস? মিহির – আবে, ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা পা আছে বলেই হাঁটার বদলে দৌড়াতে হবে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে? একটু ধীরেসুস্থে চলতে পারিসনা? সুকান্ত – তুই যদি পেল্লাই এমন একখানা পেট বানাস, যার ভার নিতে তোর পায়েরা হিমসিম খায় সেটা কি আমার দোষ? আস্তে চলতে বাপু আমার কষ্ট হয়। আস্তে চললেই মনে হয় যেন একটা পা ছোট আর একটা পা বড় হয়ে গেছে। মিহির - আরে ওই দুটোকে দেখ। কেমন হাঁ করে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আছে। হ্যাংলা যত্তসব। (স্টেজের অন্যপাশে পার্কের চেয়ারে প্রবাল আর অর্ণব বসে বসে গল্পগুজব করছে। প্রবালের হাতে কোল্ড ড্রিঙ্কস এর বোতল, আর অর্ণবের হাতে ফুল ক্রীম দুধের প্যাকেট। সে প্যাকেট টা ছিঁড়ে মুখে ঢালতে শুরু করল।) সুকান্ত – তা মামণিরা যখন দেখানোর জন্যই এত সেজেগুজে আসে, না দেখাটাই তো ওদের অপমান। দেখাটা তো ওদেরকে রেসপেক্ট জানানো বই আর কিছুই নয়। যখন অফিস জব করতাম, জানিস, শুধু ছেলেরা ফর্মালস পরে আসত। আর মেয়েরা হাত-কাটা, পা-কাটা, এখানে কাটা ওখানে কাটা পরে এলেও অফিসের বস কিচ্ছু বলত না। আর বলবেই বা কেন। শালা যত্তসব লোকদেখানো জেন্টলম্যান। দেশ এত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও ছেলেরা সবদিক থেকে এত বঞ্চিত কেন বলতে পারিস? মিহির – সে তো বটেই। সব জায়গায় মহিলাদের জন্য সিট বরাদ্দ, আর এদিকে ওরা এসে বসছে জেনারেল সিটে। পুরুষ যাত্রীরা টোটাল কনফিউসড, মহিলা সিটটা খালি থাকা সত্ত্বেও বেচারারা বসতে পারেনা, পাছে কোন মহিলা এসে অপমান করে তাকে তুলে দেয়। সুকান্ত – এ তো দেখছি মদ খাওয়ার আগেই আমাদের নেশা চড়ে গেছে। চল ওদের সাথে দেখা করি। মদ খাওয়া চুলোয় যাক। ওই ব্যাটা অর্নব, ওই প্রবাল... এসেছিস একবার জানালিনা? সেই তো দেখেই ফেললাম। অর্ণব – আরে তা নয়। আমি কাউকেই জানাইনি। ভাবলাম একবার এমনি এমনিই ঘুরে আসা যাক। এখানে এসে হঠাৎ করেই প্রবালের সাথে দেখা, আর এখন তোদের সাথে। তা ভাই মিহির, তোমার স্বনির্ভর প্রকল্প কেমন চলছে? মিহির – আর বলিসনা। আমার প্রথম প্রকল্প ছিল কাঁচামাল কিনে এনে জোড়া লাগিয়ে পাওয়ার ব্যাঙ্ক, মিনি টর্চলাইট এইসব বানিয়ে বিক্রী করা। তা ধীরে ধীরে কাজটা কেমন যেন বোরিং টাইপের হয়ে যাচ্ছিল, আর শরীরে অত ধকল সহ্য হচ্ছিল না। একদিন পুরনো কোম্পানি থেকে পাওয়া আমার বিজনেস কার্ড পকেট থেকে পড়ে গেল, আর একজন ক্রেতার চোখে পড়ল সেটা। সে বলল, ‘একি, তুমি এতবড় কোম্পানিতে চাকরী করতে, আর আজ দরজায় দরজায় ফেরি করে বেড়াও? কি ব্যাপার, চাকরী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি? চুরির কেস?’ রাগে মাথায় রক্ত উঠে যাবার যোগাড়। কোনরকমে নিজের রাগ সামলে বাড়ি ফিরলাম। তারপর ডিসাইড করলাম, করতেই যদি হয় তো শালা ইনোভেটিভ কিছু করব। অর্ণব – তা কি এমন করলি ভাই? আমরাও ট্রাই করতে পারি তাহলে। স্বনির্ভর সংস্থা একটা খুলেছিস জানি, কিন্তু কি নিয়ে কাজ করিস তার ডিটেলস আর জানা হয়ে ওঠেনি... মিহির – একটু মার্কেট ঘেঁটে পাবলিকের দাবীটা বুঝতে চেষ্টা করলাম। তারপর অনেক এদিক ওদিক ঘুরে, অনেক তথ্য সংগ্রহ করে বাজারে ছাড়লাম সস্তায় স্মার্টফোনের জন্য সোলার চার্জার। ওইযে তোর হাতে যে পাওয়ার ব্যাংকটা রয়েছে, ওঠা আমার কোম্পানিরই তৈরী। দিনের বেলা ঘন্টা দুয়েক রোদে ফেলে রাখলেই হল। পুরো চারদিন তোর মোবাইলকে জাগিয়ে রাখতে পারবে, উইথ নেট, ইভেন উইথ জি. পি. এস.। সুকান্ত – আরিব্বাস, একটু লেগ ডাস্ট দাও গুরু। মিহির – আরে করিস কি! টিচার হয়ে যদি আমার লেগ ডাস্ট নিতে চাস, তাহলে লক্ষী, সরস্বতী দুজনেরই অভিশাপ লাগবে। প্রবাল – ভাই, তোর কোম্পানিতে একটা চাকরী হবে? মিহির – না ভাই, অত মাইনে দিয়ে আমি লোক রাখতে পারবনা। কোনরকমে দুচারটে প্রোডাক্ট বেচে ক’রে খাচ্ছি, আবার তোদের মত বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার রাখতে গেলে, দেনার দায়ে নিঃস্ব হয়ে যাব। আমার ব্যাবসায় নজর দিসনা বাপু। বেশ তো চাকরী করছিস। সুকান্ত – তা অর্ণব তুই তো লেখালেখির পাশাপাশি নাটক টাটকও করতিস এককালে? সেসব কি এখনও করছিস নাকি? লাইনটা তো মোটামুটি একই রকম... অর্ণব – বাহ, বেশ সময়ে প্রশ্নটা করেছিস। এ সম্পর্কে আমি একটা নাট্যকাব্য বা কাব্যনাট্য টাইপের কিছু লিখেছিলাম, সেটাই তবে করে শোনানো যাক। আশাকরি এই প্রশ্নের উত্তর এর মধ্য দিয়েই পেয়ে যাবি। এই চল তো পার্কের মাঝে মিনি স্টেজটায় গিয়ে পড়া যাক। দুচারটে দর্শক যোগাড় হলেও মন্দ হয়না। প্রবাল – হ্যাঁ হ্যাঁ, চল না। কলেজ লাইফে কতবার স্টেজে উঠে মেকআপ দিয়েছি। শুধু কি বলতে হবে বলে দে। অর্ণব – আরে নিজে থেকে কিছু করতে হবেনা। শুধু এই কাগজে যা লেখা আছে, হ্যাঁ, এই ক্যারাক্টার টা তুই পড়বি, আর এটা আমি। (দুই বন্ধু হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে পার্কের মাঝের ছোট্ট স্টেজে উঠে জোর গলায় শ্রুতিনাটক শুরু করে দেয়।) মিহির – পাগলা আছে মালদুটো, সিরিয়াসলি। (স্টেজ থেকে প্রবাল ও অর্ণব) - ওহে গোবর্ধন, শুনিলাম নাটকের দলে লিখাইয়াছ নাম! - শুনিয়াছ ভায়া সঠিক, তবে মামলা বড়ই প্যাথেটিক। - কি এমন বল’ ঘটিল’? কহিতেছ কথা এমন জটিল... - রোজ রোজ করিতেছি রিহার্সাল, বস বা ডিরেক্টর সবাই দিতেছে গালাগাল নিজের জন্য বল সময় কোথা পাই বিজি শিডিউল-এ তিল ধারণের নাইকো ঠাঁই। - আহা! দু-চারখানা রোল দাও নামিয়ে, ফাউ-ফকটে কিছু পয়সা নাও কামিয়ে। - সে গুড়ে ভায়া বালি, চা-সিঙ্গারাই মাঝে মাঝে জোটে খালি। আর টাকা? এসব কাজে পকেটই শুধু হয় ফাঁকা। অফিসেতে কাজ করে পাই ঘন্টায় এক শত বিশ, আর নাটক করা, যেন ঘরের খাইয়া তাড়াই বনের মহিষ। - আমার ঘন্টা তো ভাই আরও সস্তা, মাঝে মাঝে যদি করি বিকেলের নাস্তা পকেটেতে টান পরে মাসের শেষকালে, পড়া শেষে পড়লাম চাকরীর জাঁতাকলে। এর থেকে মুক্তির উপায় কি আছে? জানিতেই আসিলাম তোমার কাছে। - আমার কেস ভাই বড়ই জটিল, রিহার্সালে যেতে যেতে খবর রটিল, করিতেছি হিরোগিরি বড় এক দলে, বসের কানে খবরটা কেউ দিল তুলে। সর্বনাশের মাথায় বাড়ি, এরেই বোধহয় কয়, ইনক্রিমেন্টের তো হলই নয়ছয়, তার উপর শোনালেন বন্ধ ঘরে ডেকে সরে এসেছি যে আমি কাজের ফোকাস থেকে। আতস কাঁচ নিয়ে তাই তুললাম ছবি ফেসবুক-এ আপলোডে লাইক পেল খুবই। - আমার এমন হলে থুথু ফেলে ডুবি, তুমি হয়ে গেলে ভায়া ফ্রাস্ট্রু খাওয়া কবি? - ভগবানের দয়া ভায়া, তিনিই করেন সবই। ওসব ছেড়ে এবার তুমি একটু কাশো ঝেড়ে, কেন তব আগমন এতদিন পরে? - আসিনাই জেনো শুধু খোঁজ খবর নিতে ভাবিলাম একটু হোক খাওয়াদাওয়া ফ্রিতে তার সাথে নাটকের কথাটাও পাড়িব কি করিয়া তোমার দলে আমিও ভিড়িব এতক্ষণ শুনিলাম তোমার বিবরণ মনে হয় পেলাম যেন নতুন এক জীবন নাটক ফাটক মাথাতেই থাকুক আপাতত এখন শুধুই লিখে যাব আজব সাহিত্য এই নাও তোমার কপি, এই কপিটা আমার শুরু করি পড়তে তবে এর সারৎসার... (দুজনে মিলে সুর করে) আহা সবাই মিলে ওপেন দিল-এ খুলেছিলাম গ্রুপ হঠাৎ করেই মোদের ফটোয় লেগে গেল ধুপ কি জ্বালা বল... কি জ্বালা বল...ছলছল করছিল দুচোখ তবু বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ‘ওদের ভালো হোক’ যেমন সবাই বলে... যেমন সবাই বলে...দলে দলে যোগ দিয়ে নির্দলে সময় ঘড়ি, নদীর জলও সেই নিয়মেই চলে আমিও চলে যাব... আমিও চলে যাব...মলে যাব সব ব্যাটারই কান যে দলেরই হোক, অভদ্রলোক, সে বাম কিম্বা ডান, যতই ঝাড়ুক ইংলিশ... যতই ঝাড়ুক ইংলিশ...করুক মালিশ, মাখন কিম্বা তেল আসলে লোক দেখানো দেখনদারি, সব ব্যাটাই আঁতেল আমিও আঁতেল বটি... আমিও আঁতেল বটি...খুঁটিনাটি গুচ্ছ আদিখ্যেতায় তাই নতুন করে ভাবের ঘোরে এলাম আবার হেথায়... আহা হরি বল... আহা হরি বল...কাঁধে তোলো নিতে পারলে ওজন নইলে লোক ডাকো, ডাকতে থাকো, যত প্রয়োজন...(Tempo X 1, 2, 3, 3) (চারিদিকে দর্শকরা হাততালিতে ফেটে পড়ল। মাঝে মাঝেই কোরাসে শব্দ শোনা যায়, ‘আর একটা হোক, আর একটা হোক’।) অর্ণব – না না, স্টকে যেটুকু ছিল ছেড়ে দিয়েছি। আর কিসসু নেই... এই তোরা বুঝতে পারছিস তো আমার কেসটা? নাটক করার আনন্দ? সুকান্ত – বিলক্ষণ! সে আর বলতে। তা এখন তো চাকরী ছেড়ে দিয়েছিস, এখন তো আবার নতুন করে চেষ্টা করতে পারিস? অর্ণব – না ভাই, ওটা আর হবেনা। তবে সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছি কয়েকটা, একটা মোটামুটি সিলেক্টও হয়ে গেছে। সুকান্ত – বাংলা তো? ভালো বাংলা সিনেমা প্রায় উঠেই গেছিল একটা সময়। তোদের মত দুচারটে উটকো লেখক এসে পড়াতে তাও একটা দুটো ভালো সিনেমা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে... চেষ্টা চালিয়ে যা বস। অর্ণব – আমার লেখার থেকে অনেক নিম্নমানের লেখা নিয়ে সিনেমা অলরেডি হয়ে গেছে ভাই। কোথাও না কোথাও তো চান্স পেয়েই যাব। তবে তোর কাজটা বেশ শান্তির, তাইনা? সুকান্ত – একরকম বলতে পারিস। ছেলে পড়িয়ে যে আনন্দ তা আর কিছুতেই নেই। আর একটা মজা কি জানিস? একটা সময়ে ছাত্র হিসাবে যে সাবজেক্ট গুলোতে প্রায় ফেল করতে করতে বেঁচেছি, টিচার হবার পর সেগুলো কত সুন্দর করে বুঝে যাই, আবার গোটা ক্লাসকে সেগুলো বুঝিয়েও দি। মিহির – ভাবা যায়!! আরে যেটা বলার জন্য তোদের কাছে আসা... এইভাবে হ্যাংলার মত মেয়ে দেখছিলি বলে দূর থেকেই তোদের চিনতে পেরেছি। তা বিয়ে টিয়ে কবে করছিস? প্রবাল – প্রেমটা আগে জুত করে করতে হবে, তারপর বিয়ে। তোরা শুরু কর, আমি লাইনে তো থাকলামই। সুকান্ত – উহ, একটা সময় তোর পাল্লায় পরে যা সময় গেছে। ব্যাটাচ্ছেলের উঠলো বাই তো বেনাচিতি যাই। সারারাত ধরে একটা অচেনা মেয়ের বাড়ি খুঁজতে সারারাত ঘুরিয়েছিস। তারপর রাত দুটোর সময় খিদেয় তেষ্টায় দাদুর দোকানে গিয়ে আলুসেদ্ধ দিয়ে স্যান্ডুইচ। মিহির – দাদুর ব্যাবসায়িক বুদ্ধি কিন্তু দারুণ ছিল বল... রাত দুটো থেকে ভোর পাঁচটা... তার মধ্যেই যা ইনকাম। মাত্র তিনঘণ্টা ডিউটি্। আমরা এত পড়াশুনা করেও ওই দাদুর ধারেকাছে পৌঁছাতে পারলামনা রে। তা আমি বিয়ে করছি, সঙ্গীতা কে, পরের বছর। সবাইকে ছুটি নিয়ে আসতে হবে কিন্তু বলে রাখলাম। সুকান্ত – ওরে কাকা। তলে তলে এসব চলছিল, জানতেও পারলামনা কোনদিন। যাইহোক আমাদের জানিয়েছিস, নেমন্তন্ন করেছিস এতেই আমরা ধন্য। তা অর্ণব বাবা, তোমার বিয়ের ব্যাপারে কিছু বল’। অর্ণব – তুই কি শেষে বিয়ে পাগলা হয়ে গেলি নাকি? এক তো বাড়িতে এত টেনশন দিচ্ছে বিয়ে বিয়ে করে এখন আবার তুই এলি। বাড়ি গেলেই তিন-চারটে করে ফটো নিয়ে দেখাতে বসে যায় মা বাবা মিলে। ছেলেটার একটা হিল্লে হয়ে গেলে যেন বাঁচে। এবার দেখবি ধীরে ধীরে কন্যাদায় কথাটা উঠেই যাবে। পুত্রদায়ে পরবে বাবা-মায়েরা এবার। সুকান্ত – আরে ওই মেয়েটাকে দেখ কি হেব্বি দেখতে, চেনা চেনা লাগছে না? প্রবাল – তোর মেয়ে মেয়ে বাই গেলনা বাপু। মেয়ে দেখলেই খালি চেনা চেনা লাগছে। বাড়িতে জানে? অর্ণব – আরে ও তো আমাদের হস্টেলের পাশের কলোনিতে থাকত, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট রসিকের মেয়ে না? হ্যাঁ হ্যাঁ। দ্যাখ মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেছে। সুকান্ত – ধুর তোদের সঙ্গে পার্কে বসে বাওয়ালি করতে গিয়ে আমাদের বার-এ যাওয়ার প্ল্যানটাই ভেস্তে গেল। সে কি আর করা যাবে, বন্ধু যখন, রাস্তায় একা তো আর ছেড়ে দিতে পারিনা। নিজের নেই ঠিকানা, হাজার লোকের আনাগোনা। অর্ণব –(ঘড়ি দেখে) আরে অনেকটা দেরি হয়ে গেল, এই সময় রিইউনিয়ন না কি যেন একটা হবার কথা আছে চল চল কলেজে যাওয়া যাক। মিহির – ও, তাই নাকি, চল চল। প্রবাল – সবই তো হল কিন্তু ক্যাম্পাসিং এর কি হালচাল? সুকান্ত – মনে তো হয়না কিছু হচ্ছে বলে, তাও ছেলেগুলো দুঃখ ভোলার জন্য যে এরকম একটা চেষ্টা করছে আমাদের সবাইকে ডেকে এনে, এটাই তো অনেক। অর্ণব – একি... লুৎফার চোখে, থুরি সুকান্তের চোখে জল?(চোখ মুছিয়ে দেয় আবেগের সঙ্গে) সবাই হেসে ওঠে... (সমাপ্ত)
Dr Samya Dutta
আপনি যদি মনে করেন, ভরপেট ভাত আর পাশে পাশবালিশ পেলেই একটি নিটোল ভাতঘুম সেরে নিতে পারবেন, তাহলে বলতে হয়, আপনি ঘুমিয়েই আছেন, এখনও ঘুমোতে শেখেননি। ঠিক যেরকম এবং যতখানি ঘুমুলে তাকে তোফা ঘুম বলা চলে, সেরকম ঘুম এক তোফা- অর্থাৎ উপহার বিশেষ। ভাতের গরম আর পাশবালিশের নরম ছাড়াও আরেকটা জিনিস লাগে। এতক্ষণ যে বইটা পড়তে পড়তে চোখের পাতা বুজে আসছিল, সেইটা আড়াআড়ি বিছিয়ে দিন বুকের ওপর। এইবার চোখ বুজেই দিব্যি টের পাবেন, ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি আপনার মাথার কাছটিতে বসে ইকির-মিকির খেলছেন। আর পায়ে-পায়ে ঘুমপরী নেমে আসছেন আপনার চোখে। ব্যস! এরপর শুধু মনে মনে 'আয় ঘুম, যায় ঘুম, দত্তপাড়া দিয়ে' দু'কলি ভেঁজে নিন। ওই মনে মনে হলেই হবে। এই দেখুন, আপনি এক্কেবারে ঘুমিয়ে কাদা! এত জোগাড়যন্ত্র করে যেই না একটা ফুরফুরে ঘুম এসেছে, নাকটাও হয়তো ফুরফুর করে বার দুই ডেকে উঠেছিল...বেমক্কা বারকতক হাঁচি হাঁচতে গিয়ে, হাঁউ-মাঁউ-কাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ করে খাট থেকে প্রায় ছিটকেই পড়েছি। ধড়মড় করে উঠে বসে, চোখটোখ কচলে নিয়ে দেখি, একটা সাহেবসুবো গোছের লোক, পেন্সিলের মত খাড়াই নাক আর সেই নাকে রসগোল্লার মত চশমা, প্যাটপ্যাট করে আমার দিকে চেয়ে আছে। এইবার লোকটা তার পেন্সিলের মত নাকটা কুঁচকে সিঙাড়ার মত করে, ভয়ানক রকমের একটা ভেচকুরি কেটে বলল, "যাক বাবা, উঠেছ তাহলে!" আমি খুব চটেমটে বললাম, "কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলে কেন শুনি?" লোকটা বলল, "ওমা, তোমার নাক ডাকছিল যে!" -তা'তে কী হল? -তাও বুঝি জানো না? শোনো, সেই একজন লোক ছিল, সে মাঝেমাঝে এমন ভয়ঙ্কর নাক ডাকাত, যে, সবাই তার উপর চটা ছিল। একদিন তাদের বাড়ি বাজ পড়েছে, আর অমনি সবাই দৌড়ে তাকে দমাদম মারতে লেগেছে। হোঃ হোঃ হোঃ..." এইবার আমার বেজায় রাগ হল, তেড়ে উঠে বললাম, "তুমি বাপু লোক ভালো নও!" লোকটা অমনি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করলে, "উঁহু.. লোক নয়, লোক নয়, আমার নাম হল শ্রোডিঙ্গার। আমার নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার ভাইয়ের নাম শ্রোডিঙ্গার, আমার পিসের নাম শ্রোডিঙ্গার।" -তার চেয়ে বললেই হয়, তোমার গুষ্টিশুদ্ধু সবাই শ্রোডিঙ্গার। লোকটা, থুড়ি, শ্রোডিঙ্গারটা একটু ভেবে বলল, "তা তো নয়। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম। আমার মামার নাম কোয়ান্টাম, আমার খুড়োর নাম কোয়ান্টাম, আমার শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম।" শ্বশুরের নাম কোয়ান্টাম শুনে কেমন যেন একটু সন্দেহ হল। বললাম, " ঠিক বলছ?" শ্রোডিঙ্গারটা আবার একটু ভেবে বলল, "না না, আমার শ্বশুরের নাম কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন।" -যত্তসব বাজে কথা! তোমার নাম যাই হোক, আমার নাকে রুমাল ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলে কেন? একথা শুনে শ্রোডিঙ্গারটা মনে হল খুব দুঃখ পেল। মুখখানা বেগুনভাজার মত বিষন্ন করে বলল, "না হে, রুমাল নয়, ওটা আদতে একটা বেড়াল।" -বেড়াল কীরকম? -কীরকম শুনবে? তাহলে... অ্যায়! এই দেখ নোটবই, পেন্সিল এ'হাতে, এই দেখ ভরা সব কিলবিল লেখাতে। পড়ে দেখ দেখি, কিছু বোঝো কিনা! পড়ে অবিশ্যি আমি কিছুই বুঝিনি, কিন্তু পাছে সেকথা বললে শ্রোডিঙ্গারটা আবার দুঃখ-টুঃখ পেয়ে বেগুনভাজার মত বিষন্ন হয়ে যায়, তাই খুব খানিকটা ঘাড়-টাড় নেড়ে হুঁ হুঁ করে গেলাম। শ্রোডিঙ্গার খুশি হয়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্সের মধ্যে বেড়ালটা যেই না ঢুকেছে, অমনি একখানা রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্ট ছেড়ে দিয়েছি।" -বেড়ালের তালব্য শ-এ আকার ল-এ আকার! তারপর? -তারপর... হো হো হো... সেকথা বলতেও আমার বেজায় হাসি পাচ্ছে... রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্টটা যেই অ্যাক্টিভ হবে, অমনি দিকে দিকে রেডিওবার্তা রটে যাবে... আর সঙ্গে সঙ্গে... হি হি হি...উফ্! গেল গেল, নাড়ি-ভুঁড়ি সব ফেটে গেল... ফ্লাস্কের বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে এসে- -পুসিক্যাট পপাত চ! -এবং মমার চ! মার্জার মায়ের ভোগে! হা হা হা, ভাবো দেখি, কী মজার ব্যাপার! -কিন্তু...রুমাল তাহলে আসছে কোথ্থেকে? শ্রোডিঙ্গার এবার হঠাৎ হাসি-টাসি থামিয়ে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, "সেইখানেই তো হিসেবটা মিলছে না।" -"মিলবে না কেন?" আমি তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম, "এ তো খুব সোজা হিসেব।" -"না হে, তুমি ব্যাপারটা তলিয়ে ভাবছ না। অঙ্কটা এলসিএমও নয়, জিসিএমও নয়। সুতরাং হয় ত্রৈরাশিক, নাহয় ভগ্নাংশ।" বলেই শ্রোডিঙ্গারটা ছকাছক করে মাটিতে একটা ছক কেটে বলল, "মনে কর, এলিমেন্টটা অ্যাক্টিভই হল না আদৌ। তখন?" -কোয়ায়েটলি ভেবে দেখলে, কোয়ায়েট পসিবল। তেজস্ক্রিয় আদপেও সক্রিয় হল না, তার তেজ হয়তো আগাগোড়া নিষ্ক্রিয়ই থেকে গেল, নিষ্কৃতি পেলে না একটুও। এ তো হতেই পারে। পদার্থ অপদার্থের মত আচরণ করতেই পারে। -তাহলে তো বাতাসে বিষও মিশল না! ফলে বেড়ালটার কড়া জানও এযাত্রায় আর কড়কে গেল না। -হুঁ! তাহলে বেড়ালটাকে এখন কী বলব? বেড়াল তো বেঁচে থাকতে পারে, আবার টেঁসেও যেতে পারে। -পারেই তো! তাই, জীবিত বলতে পারো, মৃত বলতে পারো, আবার একসঙ্গে দুটোই বলতে পারো। -দুটোই? কীরকম? শ্রোডিঙ্গার এবার একচোখ বুজে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে বিচ্ছিরি ভাবে হেসে বললে, "তাও বুঝলে না?" আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। মনে হল, 'একসঙ্গে দুটোই' ব্যাপারটা আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, " হ্যাঁ হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে।" শ্রোডিঙ্গার মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, বাক্স যতক্ষণ না খোলা হচ্ছে, দ্যা বেড়াল ইজ বোথ ডেড অ্যান্ড অ্যালাইভ।" -তা তুমি বাস্ক খুলে কী দেখলে? শ্রোডিঙ্গার খানিকক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, "ওইখানেই তো মুশকিল, হিসেবটা ওখানেই ঘেঁটে গেল। খুলে দেখলাম, বেড়াল-টেড়াল কিচ্ছুটি নেই। জীবিত, মৃত, জীবন্মৃত- কিস্যু লয়। তার বদলে, ওই রুমালটা পড়ে আছে।" -ওইটে? -হুঁ। আমি অবাক হয়ে বললাম, "তা, এতে মুশকিলের কী আছে? ছিল বেড়াল, হয়ে গেল রুমাল। ছিল ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস। এ তো হামেশাই হচ্ছে।" -ঠিক! ঠিক বলেছ। উত্তরটা মিলছিল না, তোমার ওই বইটা দেখতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল। -আমার বই? ও, যেটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ওইটে? -ইয়েস! ওই বইতেও ঠিক এই কথাটাই লিখেছে। -কী লিখেছে? -ওই তুমি যা বললে, "এ তো হামেশাই হচ্ছে।" এইবার আমার বেজায় রাগ হয়ে গেল। বললাম, "তখন থেকে খালি আবোলতাবোল বকছ। দিলে তো মাথাটা গরম করিয়ে! আমার বাপু রাগ হলেই আবার খিদে-খিদে পায়। এখন কী খাই বল দেখি? দেখ না ফ্রিজিডেয়ারটা হাঁটকে, কিছু পাও কিনা।" শ্রোডিঙ্গার আবার সেরকম ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেসে উঠল। "উঁহু! সেটি হবার নয়, সে হবার যো নেই। ফ্রিজিডেয়ার বিলকুল ফাঁকা, কিস্যুটি নেই। তবে হ্যাঁ, এইটে মনে রেখো- নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?" বলেই আবার একটা ভেচকুরি কেটে জানলা গলে পালিয়ে গেল। নেই বললেই হল! শ্রোডিঙ্গারের কথায় প্রথমটা খুব রেগে গেসলাম। তারপর যেই মনে পড়ল, মামার আনা মিহিদানার হাঁড়িটা এখনও ফ্রিজেই আছে, অন্তত দুপ্পুর অবধি তাকে সেখানেই স্বমহিমায় বিরাজমান দেখেছি, অমনি রাগ-টাগ গলে জল হয়ে গেল। চুলোয় যাক শ্রোডিঙ্গার, হমারে পেটমে চুহা দৌড় রাহা হ্যায়। ফ্রিজের একদম নীচের তাক থেকে মিহিদানার হাঁড়িটা যেন আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাক বুঝে, যেই না তাকে বগলদাবা করে তার ঢাকনা খুলেছি- আচমকা ফুটফাট দুমদাম ধুপধাপ শব্দে তান্ডব কোলাহলে সারা বাড়িটা একেবারে কাঁপিয়ে তুলল। মনে হল যেন, যত রাজ্যের মিস্ত্রিমজুর সব একযোগে ছাদ পিটতে শুরু করেছে, দুনিয়ার যত কাঁসারি আর লাঠিয়াল যেন পাল্লা দিয়ে হাতুড়ি আর লাঠি ঠুকতে লেগেছে। আমি তো ভয়ের চোটে হাঁউমাঁউ করে হাত থেকে হাঁড়ি-টাঁড়ি ফেলে দিয়ে, পড়ার বইয়ে যাকে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়' বলে, তারও এককাঠি ওপরে উঠে একেবারে 'কিংকংকর্তব্যবিমূঢ়' হয়ে হাঁ করে বসে রইলাম। কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিলাম জানি না, হঠাৎ একটা বিটকেল গুরুগম্ভীর আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠতে হল। চেয়ে দেখি একটা দেড় হাত লম্বা বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ দাড়ি, আর মাথাভরা টাক। সেই টাকে আবার খড়ি দিয়ে কবিতা লিখেছে। বুড়োটার হাতে একটা হুঁকো, তা'তে কল্কে-টল্কে কিচ্ছু নেই, সেটাকেই দূরবীনের মত করে চোখের সামনে ধরে আমাকে দেখছে। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা রঙিন কাঁচ বের করে সেগুলো দিয়ে আবার কিছুক্ষণ দেখল। দেখা-টেখা শেষ হলে, তেমনি ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, "অন্তমিলটা মিলিয়ে দাও তো হে! চটপট!" আমি দস্তুরমত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, "মিল? কিসের মিল?" -উঁহু উঁহু! 'কিসের'-এর সঙ্গে তো অনেক কিছুই মিল দেওয়া যায়। এই যেমন ধর- পিসের, সিসের ইত্যাদি প্রভৃতি। ও তো খুব সোজা, সবাই পারে। ওকথা বলছি না। ওই শ্রোডিঙ্গার যে লাইনটা বললে, তার সঙ্গে মিল দিয়ে একখানা লাইন ভেবে বের করো দেখি! তবে বুঝব, তুমি কেমন কবি! ব্যাজার মুখ করে বললাম, " আমি ওসব পারি না।" -"পারবে না? তুমিও পারবে না? ইস! তোমার ওপর যে বড্ড ভরসা ছিল হে!...নাহ্! তেত্রিশ বছর কাটলো, একটা মিল আর মিলল না।" বুড়োটা মনে হল হতাশ হয়েছে, ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "তবে আমারও তোমার মতই দশা হয়েছিল। তাই না প্রথম লাইনটা লিখতে পারলুম।" -কীরকম? -গল্পটা তোমায় বলিনি, না? আচ্ছা শোনো... আমার নাম কবি কালিদাস। আমি হলাম হাফটাইম কবি, বুঝলে? -হাফটাইম কেন? -আগে ফুলটাইম কাব্যচর্চা করতুম। তারপর আমার ব্রাহ্মণী সেনকো গোল্ডে খাতা খুললেন। তাই, এখন দিনের মিনিমাম একটা সময়, মিনি নামের মিনি সাইজের একটা মেয়েকে টিউশনি পড়াতে হয়। তা সেদিনও মিনিবাস থেকে নেমে মিনির বাড়ির দিকেই যাচ্ছি, এমন সময় চোখে ঝিলমিল লেগে গেল। -কানা হয়ে গেলে নাকি? -উঁহু! কানা নয়, মিহিদানা। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে তা'তেই চোখ আটকে গেসল। কিনেই ফেললুম, এক হাঁড়ি। -তাপ্পর? -এমনিতে আমার ছাত্রীটিকে পড়ানোর বিশেষ ঝঞ্ঝাট নেই, বুঝলে? 'নদী শব্দের রূপ কর' বলে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়লেই হল। মিনিও স্লেট নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে লেগে যায়। তা সেদিনও মিহিদানার হাঁড়িটা চেয়ারের তলায় রেখে সবে চোখদুটো বুজেছি, মিহি স্বপ্নের দানায় চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে, অমনি- ঠিক ওইরকম শব্দকল্পদ্রুম! বাসরে বাস! একলাফে চেয়ার-টেবিল ডিঙিয়ে ঘরের মধ্যিখানে গিয়ে পড়েছি। -বলো কী! -তবে আর বলছি কী! ঠাসঠাস দ্রুমদ্রাম শুনেই খটকা লেগেছিল। গোলমাল একটু কমলে পর, হাঁড়ি খুলে দেখি, ওমা! মিহিদানা কই, এ তো চীনেপটকা! -অ্যাঁ! -হ্যাঁ। আর তাই দেখেই না ওই লাইনখানা ভেবে ফেললুম! ওই মিহিদানা নেই দেখেই তো! রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি আবার স্বভাবকবি কিনা- 'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে?' কিন্তু ওই এক লাইনই। মনের মত একপিস মিল, সে অমিলই থেকে গেল। অনেক মাথা চুলকেও আর কল্কে পেলাম না। তা বাপু, একটু দেখবে নাকি মাথা খাটিয়ে? এবার আমি বড় বাড়াবাড়ি রকমের বিরক্ত হয়ে গেলাম। "একে ওই শ্রোডিঙ্গার না কুলাঙ্গার কে একটা এসে কাঁচা ঘুমটা চটকে দিলে, তার ওপর হাঁড়ির মিহিদানা পটকা হয়ে ফাটতে লেগেছে, এত সব দেখেশুনে আমার আর কাব্যি-টাব্যি পাচ্ছে না। যাও তো বাপু, জ্বালিয়ো নাকো মোরে! বিদেয় হও, পথে যেতে যেতে ওসব ভাবার অনেক মওকা পাবে।" এই অবধি যেই না বলেছি, বুড়োটা বেজায় উত্তেজিত হয়ে আট দশ পাক বনবন করে ঘুরে নিলে। "কী বললে, কী বললে? পথে যেতে যেতে? অ্যাঁ! তাই বললে তো? ওরে মা রে, মেশোমশাই রে, মিলেছে রে, মিলেছে! ও শ্রোডিঙ্গার, ভাই আমার, শুনে যা! মিল গয়া মিল ! 'নেই, তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে? কহেন কবি কালিদাস, পথে যেতে যেতে।' কেয়াবাত! ওরে বুধো রে! বিভূষণ-বিভীষণ-বিভূতিভূষণ সব বাগিয়ে নিয়েছি রে! 'কহেন কবি কালিদাস...' হুঁ হুঁ বাবা, 'পথে যেতে যেতে।' কেয়াব্বাত! (ক্রমশ)
Arnab Bhattacharya
ইতিহাসের বীরেশবাবু একবার ভবিষৎবাণী করলেন.. করেই ফেললেন.. বললেন... অসাধারণ.. তুই নিজেই লিখে ফেলবি একদিন... ইতিহাস.. হাঁসফাঁস করেই বললেন..!! তা, আমাকে বাবর আকবর আর হলদিঘাটের সন তারিখ জিজ্ঞেস করা কেন বাপু... বললাম.. স্যার পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে কি লাভ... দেখুন পৃথিবী কত এগিয়ে গেছে..!! পৃথিবী এগোক আর না এগোক.. বীরেশবাবু এগিয়ে এলেন... অগ্নিশর্মা... ইতিহাস মানে জানিস.. জানিয়েই ছাড়বেন...!! ঠান্ডা মাথায়... ঠ্যাঙ কাঁপিয়ে.. শালীনতায় ভরা মোটের ওপর উত্তর ছিল.. যার শুরুতেই ইতি তা জেনে কি হবে..!! এক চড়ে.. আর জানিনা... বাবাকে অনেক জ্ঞান শুনতে হয়েছিল... আর তারপরে বাবা সেইগুলো সুর তালে কনভার্ট করে আমার পিঠে বাজিয়ে..যারপরনাই হাতের সুখ...!! ভূগোলের মুক্তি দিদিমণি সত্যিই মুক্তি চাইতেন.. আমার কাছ থেকে মুক্তি... স্কুলের সাথে চুক্তির কারনে যুক্তি করতে পারতেন না...!! ভূগোলে ভূমি গোলাকার.. এর সবচেয়ে বড় যুক্তি কি..!" তা আমার ভূগোল পরীক্ষার খাতায় পাওয়া যায় বলেই উনি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন..! কদাচিৎ কিছু সংখ্যারা আমার ভূগোল খাতায় অবতীর্ণ.. আর, উনি হাহাকার করতেন.. পৃথিবীর আকার বদলে যাবে বলে..!! বাংলার অমূল্যস্যার সমাসে সন্ধিতে এমন বন্দী করলেন... যে পালানোর ফন্দী আঁটতে স্বরচিত রচনাকৌশল আবিষ্কার করতে হল..!! দেরি করে স্কুলে গেলাম.. প্রশ্ন কোথায় ছিলি...!! বললাম হাসপাতাল..!! ব্যস... বল দেখি সমাস...!!! বিনাবাক্যব্যয়ে.. "মানুষ হাসতে হাসতে যেস্থানে পাতাল প্রবেশ করে.."!! উনি বললেন "আশ্চর্য"..!! আমি ভাবলাম সমাস করতে বললেন..!! তড়িঘড়ি জবাব.. "আশায় থাকেন যে আচার্য.."!! যেমন আপনি আছেন.. আমি একদিন সমাস সন্ধি শিখে যাব.. সেই আশা..!! অবাক হয়ে তাকিয়ে উনি... আমি অস্বস্তিতে... বললাম আমাকে সন্ধিবিচ্ছেদ করতে দিন..!! মৃদুস্বরে বললেন...তুই বিচ্ছেদ করবি.. আর যে তাদের সন্ধি করাতে পারবনা রে বাবা...!! রসায়নে রসের যোগান তদানীংকালে কি কমে গেছিল.. জানিনা...!! রসায়নে একফোঁটাও রস আনয়ন করতে পারিনি.. মানে পারেননি রসময়বাবু..!!! তা মাঝে মাঝে রসময়ের সাথেও রসিকতা হত... একবার বলেছিলাম... স্যার কে এই মিস্ট্রি সলভ করে সেটাই জানিনা তাই তো কেমিস্ট্রি... নাহ বাবাকে স্কুলে যেতে আলাদা চটিজুতো কিনতে হয়েছিল.. মানে কিনিয়েই ছেড়েছিলাম...!! অঙ্কশাস্ত্র আর পদার্থবদ্যার শিক্ষকদের বদান্যতায় এই অপদার্থ পড়াশোনা নামক অমোঘ দৌড়ে টিকে ছিল...!! বিজ্ঞানী হবার সবরকম সম্ভাবনা ছিল ... হয়েই যেতাম... বাধসাধল বাংলায় সুপন্ডিত এক স্থানীয় দাদা যিনি দাদাস্থানীয়... বিজ্ঞানী আর বি-জ্ঞানীর মধ্যে আমাকে ঝুলিয়ে মানে ঝুল ফুল দিয়েও বলা চলে... নিজে গেলেন সটকে....!! আমি সেই ঝুলনায় বসে আজ সফটওয়্যারে দোল খাচ্ছি...!! তাই বাংলা জানা খুব দরকার.. মোদ্দা কথা হল.. বাঙলা না জানলে বিজ্ঞানী হওয়া যায়না..!!!
Dr Samya Dutta
♢♢♢♢♢♢ অমৃতের পুত্র ♢♢♢♢♢♢ "বিরহিণী রাধার কাছে কৃষ্ণনাম করে ফেললেন, বন্ধু!" বৃদ্ধ হাসলেন, "কিন্তু এবিষয়ে একবার মুখ খুললে যে আর থামতে জানিনে.....শেষে আপনি হয়তো ভেবে বসলেন, বুড়োটা একেবারে ছিটগ্রস্ত!" অনাবিল আনন্দের হাসিতে প্রাচীন মুখখানা ভরে উঠল। জানলা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে তাঁর মুখে, উদ্ভাসিত মুখ থেকে হাসির তরঙ্গ ঢেউ তুলছে সাদা দাড়ি-গোঁফে। চোখের কোলের কুঞ্চন আরো গভীর হল, মুখের বলিরেখায় হালকা কাঁপন। হাসি জিনিসটা বড় সংক্রামক। বৃদ্ধকে হাসতে দেখে এবার আমার ঠোঁটের কোণেও আলগা হাসি। বললাম, "আপনার বড় প্রিয় বিষয়, তাই না?" -আমি তাঁর সঙ্গ পেয়েছি মোটে পাঁচটা বছর, তা সেও ধরুন অর্ধশতাব্দী আগেকার কথা। তবু..... কীরকম জানেন? মনে করুন, বইয়ের ভাঁজে একখানা ফুল রেখে দিয়েছিলেন.....অনেকদিন পর খুলে দেখলেন..... হয়তো শুকিয়ে গেছে, ঝরে পড়েছে পাপড়িগুলো ..... তবু, নাকের কাছে আনলে একটা সুগন্ধ..... বৃদ্ধের কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসছিল। শেষের কথাকটা আমায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে শুনতে হল। এক মুহুর্তের নীরবতা, তারপর হাত দেখিয়ে আমাকে তাঁর পাশে এসে বসতে বললেন। লম্বা চাতালটার একপাশ থেকে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে চারতলার ছাদ পর্যন্ত। সিঁড়িটা দিনের বেলাতেও বেশ অন্ধকার, তবে দোতলা অবধি উঠলে ছাদের খোলা দরজা দিয়ে আলো আসতে দেখা যায়। উঠতে উঠতে মনে মনে হাসছিলাম, অন্ধকারের শেষে আলোয় উত্থান? কখনো কখনো সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে এসে উপমারা এমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, অবুঝ মন ভেবে বসে, এই বুঝি জীবনের নতুন এক পরিচ্ছেদ শুরু হল! কী অদ্ভুত! যে ছেলেটি এতক্ষণ আমাকে পথ দেখিয়ে আনছিল, এবার আমায় বসতে বলে নীচে গেল খবর দিতে। দেখলাম, বসার ব্যবস্থা বলতে দু'দিকে দেয়ালের সঙ্গে লাগানো মুখোমুখি দুটো তক্তা। একপাশে মেঝেয় ডাঁই করা কিছু বইপত্র, একখানা জলের কুঁজো- এছাড়া ঘরের নিরাভরণ রূপটা প্রথম দর্শনে কেমন চোখে লাগে! যেন অনাবশ্যককে ছেঁটে ফেলার একটা নির্মম চেষ্টা..... কী জানি! হয়তো এভাবে বাহুল্যের বন্ধন ছিঁড়ে না ফেললে একটা ঘর প্রকৃত আশ্রয় হয়ে ওঠে না। বসে থাকতে থাকতে এলোমেলো ভাবনার একটা ঘোর এসে গিয়েছিল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হতে তাই প্রথমটায় একটু চমকে উঠেছিলাম। একটা ধীর অথচ দৃপ্ত পদধ্বনির অনুরণন তুলে অশীতিপর মানুষটা খোলা ছাদ পেরিয়ে ঘরে ঢুকলেন। একঝলক দেখেই মনে হল, এঁর আর কোনো পরিচয় অনাবশ্যক। লুপ্তকেশ, মুখে সাদা মেঘের মত গোঁফ-দাড়ির জঙ্গলের মাঝেও যেটা নজর কাড়ে, সেটা তাঁর গভীর, কালো দুটো চোখ। শান্ত, কিন্তু উজ্জ্বল। প্রশস্ত কপাল, কাঁধদুটো পার্থিব অভিজ্ঞতার ভারে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পড়েছে। ইনিই তিনি! -হাসছেন যে? বৃদ্ধের প্রশ্নে একটু লজ্জিত হলাম। "মাফ করবেন, কিন্তু আপনাকে হঠাৎ দেখলে মনে হয়, বাইবেলের পাতা থেকে উঠে এলেন বুঝি!" -"তাই? তবে এইমুহুর্তে কিন্তু আমি দোতলা থেকে উঠে আসছি।" হাসতে হাসতে বৃদ্ধ উল্টো দিকের তক্তায় বসেছিলেন। এইবার আমি তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। খানিকক্ষণ অপলক চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। কোনো কথা নেই। ভুরুদুটো সামান্য কোঁচকানো, আর অস্ফুট একটা হাসি মুখময় খেলে বেড়াচ্ছে। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তিনি বললেন, "ইয়ংম্যান, দেখছি এরমধ্যেই আপনার ভারতবর্ষের ছোঁয়া লেগে গেছে!" আমি হাসলাম।আমার শরীরের যেটুকু অংশ উন্মুক্ত ছিল, সেখানে চামড়ার রঙ এখন ব্রোঞ্জের মত। দেখিয়ে বললাম, " হ্যাঁ, আমার মাও বোধহয় আর আমাকে একনজরে চিনতে পারবেন না।" -গায়ের রঙ..... সে তো অবশ্যই! তবে আমি কিন্তু সেকথা বলিনি। -তাহলে? বৃদ্ধ একমুহুর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর হঠাৎ তাঁর ডানহাতের তর্জনীটা দিয়ে আমার বুকের ঠিক মাঝখানে স্পর্শ করলেন। একটু নড়েচড়ে বসলাম। খুব মৃদু, গম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি এখানকার কথা বলছি। এইখানে এক ভারতবর্ষ বাসা বেঁধেছে, স্বয়ংপ্রকাশ ..... যেন সহস্রদল পদ্ম, একেএকে তার দলগুলি মেলে ধরছে। । অপেক্ষা করুন, কালে কালে তার পূর্ণ রূপ দেখবেন। রাই ধৈর্যং, রহু ধৈর্যং!" ".....আজ আমার কথাগুলো বড় বেশি অভিযোগের মত শোনাচ্ছে, তাই না? বিশ্বাস করো, এতদিন এসব কথা বুকের ভেতর চেপে রেখেছি শুধু এই ভেবে যে, একদিন তুমি নিজেই নিজের ভুল বুঝতে পারবে। কিন্তু তোমার কাছে বয়সোচিত পরিণতি আশা করাটাও বোধহয় বাতুলতা! তাই নতুন করে আরো একবার তোমার হঠকারিতার পরিচয় পেয়ে বিস্ময়ে, হতাশায় আজ আমার ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে মনের গোপন কুঠুরি থেকে এতদিনের চাপা ক্ষোভ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। খুব একটা দোষ আমায় দেওয়া যায় কি? কী জানো রাফা, পরিচয়ের প্রথম দিকে কিন্তু তোমার চরিত্রের এই দিকটা আমাকে আকৃষ্টই করেছিল। তোমার মত সুদর্শন যুবকের প্রকৃতিতে এই উদাস, বাউণ্ডুলে ভাবটা কুমারী বয়সের যেকোনো মেয়ের মনকেই একটা বাড়তি রোম্যান্টিক মেদুরতায় আচ্ছন্ন করবে, সে আর আশ্চর্য কি? বলা বাহুল্য, আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। কিন্তু আশা করেছিলাম, সাংসারিক দায়দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়লে যেমন সব ছন্নছাড়া প্রেমিকেরই স্বামীতে উত্তরণ হয়, তোমার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হবে না। ছয় বছরের বিবাহিত জীবনে আমার সে আশা কিভাবে ধূলিসাৎ হয়েছে, সেসব স্মৃতিচারণ এখন অপ্রাসঙ্গিক। তা'তে তিক্ততাই কেবল বাড়বে, আর সেটা আমার এই চিঠি লেখার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বলতে পারো রাফা, আমাদের একমাত্র সন্তান কী দোষ করেছিল? নিজের ছেলের প্রতি এই উদাসীনতা, এই দায়িত্বজ্ঞানের অভাব তুমি নিজে ক্ষমা করতে পারো? কেনির সামনে একটা গোটা জীবন পড়ে আছে, এইসময় তার মাথার ওপর বাবার ছায়াটুকু কতখানি প্রয়োজনীয়, তা কি সত্যিই তোমার অজানা? এই তুলনাটা টানতে আমি ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হচ্ছি, তবু বলি, নিজের ছেলে না হওয়া সত্ত্বেও কেনির প্রতি কর্তব্য পালনে গিলের তরফে কোনো ত্রুটি আমি কখনো দেখিনি। সাত বছরের কেনির এখন কতটুকুই বা বিচারশক্তি, কিন্তু কাল যদি সে প্রশ্ন করে, আমাদের এই মৃত সম্পর্কের লাশ কেন তাকে বহন করতে হচ্ছে, বাবা হিসেবে পারবে তো উত্তর দিতে?....." রেলগাড়ির দুলুনিতে আমার ভালোই ঘুম হয়। কাল রাতেও কামরায় অত হৈচৈ না হলে, আমার ঘুম বোধহয় একেবারে হাওড়ায় এসেই ভাঙতো। কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমটায়, তার ওপর কামরার অন্ধকারে কারো মুখ দেখাই দায়। আবছা আলোয় মনে হল সেই ফেজ মাথায় মুসলমান ভদ্রলোকটিকে দেখলাম, খুব উত্তেজিত। দিনভর মারোয়াড়িদের উচ্চস্বরের আলাপ শুনেছি, এবার তাদেরও গলা পেলাম। একমাত্র আমার সামনের বার্থের মাদ্রাজি ব্রাহ্মণটিই দেখলাম অবিচলিত। উঠে বসেছেন, তবে বিশেষ হেলদোল নেই। ট্রেন থেমেছিল প্রায় একঘন্টা। কেন, সেটা কাল রাতে আমরা জানতে পারিনি, জানলাম আজ সকালে ট্রেন থেকে নেমে। আসলে রাতের পথ ছিল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, অন্ধকারে আমাদের গাড়ি নাকি একটা প্যান্থার জাতীয় জানোয়ারকে ধাক্কা মেরেছিল। তৎক্ষণাৎ ট্রেন থেমে যায়, কিন্তু শত চেষ্টা সত্বেও জন্তুটার লাশ ইঞ্জিনের লোহার খাঁচা থেকে আলাদা করা যায়নি। বাধ্য হয়ে লাশটা সমেত ওইভাবেই গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। মৃত জন্তুটা এই এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে, তবু তার ঘাতককে মরণ-আলিঙ্গন থেকে মুক্তি দেয়নি। আমার মাদ্রাজি সহযাত্রীটি প্রথম থেকেই আমার কৌতূহল উদ্রেক করেছিলেন। দুপুরের দিকে ইনি যখন ট্রেনে ওঠেন, মারোয়াড়িদের পাটোয়ারি আলোচনায় তখন কামরায় কান পাতা দায়। মুসলমান ভদ্রলোকটি একপাশে বসে ঢুলছিলেন। অবশ্য তিনি যে খুব মিশুকে নন, সেটা আগাগোড়াই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনিতেই ভাষা এখানে মানুষের সাথে আলাপ জমানোর একটা বড় অন্তরায়, অথচ কথা বলার জন্য আমার মন তখন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম, এই নতুন আগন্তুকও উঠেই একটা বই খুলে বসলেন- অর্থাৎ মেলামেশায় উৎসাহী নন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমিয়ে নেব কিনা ভাবছি, হঠাৎ চোখ আটকে গেল ব্রাহ্মণের হাতের বইটায়। ইনি বসেছেন আমার ঠিক উল্টো দিকে, সুতরাং বইটা ভালো করে দেখার জন্য আমাকে বিশেষ কষ্ট করতে হল না। 'দ্য লাইফ অফ.....' বাকিটা তাঁর আঙুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। তবে প্রচ্ছদে যাঁর ছবি আছে, তিনিই বোধহয় বইয়ের বিষয়বস্তু। হঠাৎ মনে হল, ছবিটা আমার চেনা.....আগে কোথাও দেখেছি.....কোথায়? লন্ডন? গতবছর, নাকি তারও আগে? কী একটা আলোচনা সভা..... হঠাৎ খেয়াল হতে দেখি, ব্রাহ্মণ চোখে কৌতুহলের সঙ্গে কিছুটা বিষ্ময় মেশানো চাহনি নিয়ে আমাকে জরিপ করছেন। ধরা পড়ে গিয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসলাম। -"এঁকে চেনেন? শুনেছেন এঁর কথা?" আমার ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই প্রচ্ছদের ছবিটার ওপর আঙুলের দুটো টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। -"ছবিটা চেনা চেনা মনে হল, তাই..... হ্যাঁ, হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে, লন্ডনে এঁর জীবন সম্পর্কে একটা বক্তৃতা শুনছিলাম। খুব আকর্ষণীয় চরিত্র, নিঃসন্দেহে!" বলতে বলতেই আমার খেয়াল হল, দু'বছর আগেই ঠিক করেছিলাম, এঁর সম্পর্কে আরও পড়াশোনা করব। তারপর সময়াভাবে আর..... বক্তার একটা কথা শুনে তখনই বেশ আশ্চর্য হয়েছিলাম, কী যেন.....আমি মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, "দ্যা লাস্ট অফ দ্যা হিন্দু সেজেস?" -"অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পারফেক্ট।" ব্রাহ্মণ বেশ জোর গলায় বললেন। দেখলাম, বলার সময় ওঁর চোখ দুটো অদ্ভুত ভাবে জ্বলে উঠল। "দ্যা লাস্ট অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পারফেক্ট।" -আচ্ছা, এঁরই এক শিষ্য তো..... -ঠিক ধরেছেন। সশরীরে আর নেই, কিন্তু এখনও পশ্চিমের দুটি মহাদেশেই তাঁর বিরাট প্রভাব। -তাই তো! আপনি বললেন বলে মনে পড়ল, আচ্ছা..... আপনি নিশ্চয়ই জানেন এঁর কথা। বলুন, প্লিজ বলুন..... আমিও জানতে চাই..... উৎসাহের বশে ব্রাহ্মণের হাঁটুদুটো চেপে ধরেছিলাম। আমার ছেলেমানুষি আগ্রহ দেখে ভদ্রলোক হাসলেন। - শুনতে চান, তা বেশ! কিন্তু আমার কাছে কেন? আসল লোকই তো রয়েছেন! আপনি বোধহয় কলকাতা যাচ্ছেন? -আজ্ঞে হ্যাঁ। -আমার গুরু থাকেন কলকাতার নেটিভ কলোনির একেবারে মধ্যিখানে। তিনি এই মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পার্ষদদের অন্যতম। আপনি চান তো..... আজ সকালে ট্রেন থেকে নেমে দেখি সেই মাদ্রাজি ভদ্রলোকটিও আমার পেছন পেছন নেমেছেন। চোখাচোখি হতেই বললেন, "নাম, ঠিকানা- সব মনে আছে তো?" -"Mastar-mah-asaya..... Mastar mahasaya....." বারকয়েক উচ্চারণ করে সড়গড় হয়ে নিলাম। "আমহার্স্ট স্ট্রিট বললেন তো?" -হ্যাঁ, স্থানীয় লোকে ওই নামেই চিনবে। আসলে আমার গুরুর কর্মজীবন কেটেছে স্কুলমাস্টার হিসেবে। তা, আর দেরি কেন? বেলা বাড়ছে, যেতে হয় তো এইবেলাই..... আমি বিদায় নিয়ে যেতে যেতেও ঘুরে এলাম। ব্রাহ্মণ কুলির পিঠে মাল চাপাতে ব্যস্ত ছিলেন, আমাকে ফিরে আসতে দেখে অবাক হলেন। -ইয়ে, মানে..... কোনো পরিচয়পত্র..... সুপারিশ-টুপারিশ..... আমার একদিনের সহযাত্রীটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা স্নেহের হাসি হাসলেন। বড় স্নিগ্ধ সে হাসি। "বন্ধু, আপনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন, এই ইচ্ছেটাই তো আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয়পত্র! আর কোনো সুপারিশের প্রয়োজন নেই।" ".....এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু তোমার এই হঠকারিতা সমর্থনের অযোগ্য। সতেরো তারিখ তোমায় জাহাজে তুলে দিতে আসব। কিন্তু সেই জাহাজ তোমায় কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা ভেবে দেখেছ? এমন একটা দেশে চললে, যেখানে আমাদের স্বদেশী, সভ্য মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। শুনেছি কলেরা, ম্যালেরিয়ায় প্রতি বছর লাখো মানুষ মারা যায়.....আর, আগের মত শান্তির পরিবেশও যে আর নেই! শুনতে পাই, কিছুটা শিক্ষাদীক্ষা আর সভ্যতার স্বাদ পেতেই নেটিভরা রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। যারা আজ থেকে একশো বছর আগেও ছিল অসভ্য, বর্বর, আজ তাদের রাজদ্রোহের উন্মত্ততা দেখলে তোমার জন্য আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে ওঠে। ঈশ্বরের পরিত্যক্ত ওই দেশ থেকে তোমার কী পাওনা আছে, রাফা? কিসের সন্ধানে যাচ্ছ? আমি এখনো আশাবাদী তুমি অন্তত শেষমুহূর্তে এই খামখেয়াল ত্যাগ করবে। আমার কথায় না হোক, তোমার নিজের জন্য, কেনির জন্য। ঈশ্বরের কাছে তোমার শুভবুদ্ধির প্রার্থনা করি। ইতি, এখনো তোমার শুভাকাঙ্খী, অগাস্টা।" -"বিয়ে করেছিলে, তা'তে কী? তিনি বলতেন, কেল্লার ভেতর থেকে যুদ্ধ করা! আমিও সংসারের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম..... কিন্তু বিধির বিধান, আমার বন্ধু একদিন নিয়ে গেল রাসমণির বাগান দেখাতে....." আমি কথার মাঝখানে বাধা দিলাম। "এদেশের আধ্যাত্মিক সম্পদের কথা বলছিলেন না? কিন্তু, মনে করুন, এই আমার মত..... পশ্চিমের মানুষরা.....ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের শিরায় শিরায়। আজ ঘটনাচক্রে এখানে এসে পড়েছি, কিন্তু এই সম্পদের খোঁজ পেলেই বা কী? যদি বিশ্বাস ঠিকঠিক না থাকে.....ঈশ্বর এসে আমার সদর দরজায় কড়া নাড়লেও তো চিনতে পারব না! " -"তুমি ঘাটে নেমে ডুব দিয়ে চান কর অথবা কেউ ঠেলে জলে ফেলে দিক- ভিজতে যে হবেই।" চমকে উঠলাম। অবশ্য এই ক'দিনের নিত্য যাতায়াতে চমকে ওঠাটাও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ছেলেবেলায় একটা গল্পে পড়েছিলাম, সারাদিনের কাজ শেষে এক ক্লান্ত চাষা গেছে এক সরাইখানায়। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যায় যায়, চাষা বললে, যেভাবে পারো আমার তৃষ্ণা নিবারণ করো। যদি দামি মদ আনতে হয়, আনো। বিরলতম আরক আনতে হলেও কুছ পরোয়া নেহি! কিন্তু সরাইখানার মালিক তাকে দিলে এক গেলাস জল, আর তাই খেয়েই চাষার তৃষ্ণা উধাও। দেখে সরাইখানার মালিক মিটিমিটি হাসে। তারপর চাষা রোজ আসে, ভাবে আজ নিশ্চয়ই দুর্লভ কোনো অমৃত দেবে, কিন্তু রোজই পায় সেই এক গেলাস জল। আর রোজ সেই চাষা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে, ওই এক গেলাস জলেই তার তৃষ্ণার নিবৃত্তি, প্রাণের আরাম। সেই মূঢ় চাষার মতই হতবাক হয়ে বসেছিলাম। ঘরে আরো গুটিকয় লোক। মেট্রোপলিটন কলেজের দুটি ছোকরা এসেছে। এবার তাদের একজন প্রশ্ন করল, "আপনি কি আমাদের নিয়মিত শাস্ত্রপাঠ করতে উপদেশ দেবেন?" - শাস্ত্রপাঠ..... সেও জরুরী। তবে ভগবান লাভ করা শুধু পাণ্ডিত্যের কর্ম নয়। নির্জনে গোপনে তাঁকে প্রার্থনা করতে হয়। যীশু বলতেন- "ভেরিলি আই সে আনটু ইউ, এক্সসেপ্ট ই বি কনভার্টেড, অ্যান্ড বিকাম অ্যাজ লিটল চিলড্রেন, ই শ্যাল নট এন্টার ইনটু দ্যা কিংডম অফ হেভেন।" যারা জগতে নগণ্য তারাই ঈশ্বরের অতি প্রিয়। আবার যারা জগতে গণ্যমান্য তারা তাঁর কাছে নগণ্য। শিশুর মত সরল হলে তবে ঈশ্বর লাভ হয়। এমনি কাণ্ড। এখানকার বড়, বড় নয়। তাঁর জন্য যাঁরা ব্যাকুল তাঁরাই বড়। কেননা, তাঁরা যে তাঁর অতি প্রিয়। ঈশ্বর? তাঁর জন্য ব্যাকুলতা কী জিনিস জানিনা, তবে বেশ বুঝতে পারি এই অসমবয়সী বন্ধুটির প্রতি আমার একটা টান তৈরি হয়েছে। কলকাতায় রইলাম, তা বেশ কিছুদিন তো হল..... এখন হিসেব করে দেখছি, তার অধিকাংশই কেটেছে এনার সাথে এই ঘরে বসে আলাপচারিতায়। ইনিও বোধহয় আমার মনোভাব টের পেয়েছেন। আজ এসেছি, তখন সন্ধ্যে হব হব। ঘরে ঢুকতেই বললেন, "ওই রে, আবার এসেছে!" ঘরময় একটা হাসির রোল উঠল। আমি অবাক হয়ে তাকাতেই বললেন, "এমনি নেশায় বুঁদ হয়ে আমিও তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। সেই গল্পটা শুনেছ? একটা ময়ূর ছিল, বুঝলে! তাকে ক'দিন ধরে ঠিক বিকেল চারটের সময় আফিম খাইয়ে দিত। তারপর দেখা গেল, রোজ যেই চারটে বাজে, অমনি ময়ূরটা গুটিগুটি পায়ে এসে হাজির হয় আফিম খেতে।" এবার আমিও হাসিতে যোগ দিলাম। বললাম, "ভক্তি বড়, না কর্ম?" -শুদ্ধাভক্তিই শেষ কথা। তবে সেসব তো ফস করে হয় না! তোমরা হলে রজোগুণী- তোমাদের ভেতরে কর্মের প্রবৃত্তি আছে, কী করা! তাই, বলা হচ্ছে, নিষ্কাম কর্ম। মাথা নাড়লাম। এক গেলাস জল। একবুক পূর্ণতা নিয়ে বসে আছি আমি। আর আমার সেই অসমবয়সী বন্ধু, সেই সরাইখানার মালিকের মতই নির্মল হাসি হাসছেন আমার দিকে চেয়ে। -তুমি চলে যাচ্ছ? -হ্যাঁ। হয়তো দিনদুয়েকের মধ্যেই। -তোমাকে একটা কথা বলি..... যদি আবার কখনো কলকাতায় আসো, হয়তো আর দেখা হবে না। আমার ঘট ভেঙে দেবার সময় হয়ে এসেছে। বন্ধন..... সেসব এখন বড় অসহ্য লাগে। চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ আগে এক তরুণ সাধু এসেছিলেন। যাবার সময় প্রণাম করে বিদায় নিতে যাচ্ছেন, উনি বাধা দিলেন "ওটা করবেন না। 'তৃণাদপি সুনীচেন'- ওসব থাক।" সাধু চলে যাবার পর আমরা খোলা ছাদে এসে বসেছিলাম। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে শুরু করলেন। এবার খুব ধীর লয়ে, থেমে থেমে, কিছুটা তদগত ভাবে, "এই 'আমি'টাই হল যত নষ্টের গোড়া! 'আমি' অর্থাৎ অহঙ্কার। আমি ম'লে ঘুচবে জঞ্জাল। গুরুর কৃপায় সে উপায়ও বোধহয় খুঁজে পেয়েছি। সুতরাং, আর কেন..... তুমি.....জেনো, আমি তোমার সঙ্গেই আছি।" আবার বিরতি, এবার আরো দীর্ঘ। হঠাৎ 'কুমারসম্ভব' আবৃত্তি করলেন। ".....এইখানে দেবাদিদেবের ধ্যানের বর্ণনা আছে, শোনো। গুহাভ্যন্তরে মহাদেব সমাধিমগ্ন, আর গুহাদ্বারে নন্দী বেত্রহস্তে পাহারা দিচ্ছেন আর সকল জীব ও সমস্ত প্রকৃতিকে তাদের যাবতীয় চঞ্চলতা ত্যাগ করতে আদেশ দিচ্ছেন। তাঁর অলঙ্ঘনীয় আদেশে বৃক্ষ নিষ্কম্প, ভ্রমর গুঞ্জনহীন, বিহগকুল মূক.....বোঝাতে পারছি?" নিঃশব্দে ঘাড় নাড়লাম। বেশ গুমোট বোধ হচ্ছিল। কলকাতা শহরের বাতাস যেন আচমকা এই ছাদটাকে সন্তর্পণে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে, অথচ কাছেপিঠের যেকটা মন্দির এখান থেকে চোখে পড়ে, তাদের চুড়োয় পতাকারা দিব্যি হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। এবার আমিও বিদায় নেব ভাবছিলাম, কিন্তু বলতে গিয়েও থামতে হল। মরা চাঁদের আলো এখন তাঁর মুখ জুড়ে খেলা করছে, সে মুখে অদ্ভুত এক প্রসন্নতার ছায়া। দু'চোখ বন্ধ। ধ্যানগম্ভীর নন, মনে হল ধ্যানসুন্দর। তাঁকে বিরক্ত না করে তাই যথাসম্ভব নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম। আমহার্স্ট স্ট্রিট শুনশান, যেন একটা নিস্তব্ধতার চাদর কেউ বিছিয়ে দিয়ে গেছে। কেবল আশেপাশের কোনো মসজিদ থেকে একটানা আওয়াজ আসছে, "আল্লাহু আকবর।" গাঢ় কালো আকাশের নীচে ঘুমের অতলে তলিয়ে আছে কলকাতা। দূরে, খুব দূরে, দিগন্তের কাছে একপোঁচ সাদার প্রলেপ ধরেছে সবেমাত্র। তা'তে অন্ধকার তরল হয়নি, এখনও তা অনাগত কোনো উজ্জ্বল দিনের ভবিষ্যৎবাণীই কেবল। কিন্তু ভেবে দেখলে, সেই বা কম কী? অগাস্টার চিঠিটা এতদিন বয়ে বেরিয়েছি পকেটে। এবার সেটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতেই একমুখী হাওয়া ছুট দিল গঙ্গার দিকে। যাক! পাঁচহাজার বছরের এই সভ্যতার সব মলিনতা ধুইয়ে দিয়ে বইছে এই নদী, আমার পুরনো জীবনের নোংরা কঙ্কালটা নাহয় সেই স্রোতস্বিনী গঙ্গার বুকেই বিসর্জন দিলাম। আমি জানি, নিশ্চিত জানি, আমার আগামী দিনগুলো আর দিশেহারা হয়ে পড়বে না। ছিন্নবীণার তার ঠিক সুরে বেঁধে দিয়েছেন এক দক্ষ যন্ত্রী, যিনি ওই চারতলা বাড়িটার ছাদের এককোণে ধ্যানমগ্ন। তিনি আমার বন্ধু, আমার মাস্টারমশাই। আনকোরা নতুন এক রাফায়েলের তিনিই জন্মদাতা। শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের ডায়রি থেকে: ইউনিভার্সিটির সেনেট হলের বারান্দায় কিছু ভবঘুরে এসে জোটে রাত গভীর হলে। অন্যত্র যাদের রাতটুকু কাটানোর মত একটা আশ্রয় জোটে না, কলকাতা শহর এইখানে নিভৃত কোল পেতে রাখে তাদের জন্য। এরা কেউ দিনমানে মজুর খাটে, কেউ বা ধাঙড়ের কাজ করে। আর যারা একান্ত অক্ষম, তারা এই শহরের ভিক্ষান্নে প্রতিপালিত। এই দলটার মধ্যমণি এখন কানা ভিখিরি লক্ষণ। উদাত্ত গলার খাতিরেই বোধহয় তার রোজগার বাকি ভিক্ষাজীবীদের তুলনায় কিছু বেশি হয়। রাফায়েল যখন খুব ধীর পায়ে এই দঙ্গলটার দিকে এগিয়ে আসছে, লক্ষণ তখনও গান গাইছিল: "মন কি তত্ত্ব কর তাঁরে, যেন উন্মত্ত আঁধার ঘরে । সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত, অভাবে কি ধরতে পারে ৷৷ অগ্রে শশী বশীভূত কর তব শক্তি-সারে । ওরে কোঠার ভিতর চোর-কুঠরি, ভোর হলে সে লুকাবে রে ৷৷ ষড় দর্শনে না পায় দরশন, আগম-নিগম তন্ত্রসারে ।" আমি ইশারায় রাফায়েলকে বসতে বললাম। ভিখুয়া ডোম বসেছিল আমার পাশে। আমার দিকে ফিরে তার ছোপধরা দাঁত দেখিয়ে হাসল, "এ বুড়া বাবা, তু আবার এসেচিস? পাগাল আচিস নাকি রে! কেনো আসিস বলতো রোজ রোজ?" -ভালো লাগে, তাই আসি। ইঁট-কাঠের বাড়িতে শুয়ে আমার ঘুম হয়না রে! আমার মাথার ওপর ছাদ আছে, ভাবতেই দমবন্ধ হয়ে আসে। এই 'আমি'টা কে বল দেখি? কোথায়? মাথার ওপর ছাদ দেবারই বা আমি কে? কিন্তু ভাবলে কী হবে, বাড়িতে থাকলে 'আমি'টা আঠার মত লেগে থাকে। তার চেয়ে এই ভালো, আদপে যে আমার কিছুই নেই, সেটা এখানে না এলে টের পাওয়া যায় না। -কী যে বলিস! পাগাল আছিস পুরা..... এ সাহিব কে আছে রে? -পাগল! তোর-আমার মতই। অনেকদিনের অনেক জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে হালকা হতে এসেছে। -জঞ্জাল ফেলতে এসেছে এখানে..... এতো রাতে কে সাফ কারবে বলতো.....এ লখনা, গানা বন্ধ কিঁউ কিয়া রে? শুরু হো যা ফির..... লক্ষণ আবার গান ধরে। রাতের নিরন্ধ্র অন্ধকারে ঘুমোয় সুসভ্য কলকাতা। শুধু এক জন্মান্ধ ভিখারীর গানে জেগে থাকে একটুকরো শহর। উঁচু উঁচু ইমারতের দম্ভের ভিড়ে, একটুকরো নিরহঙ্কার শহর। "সে যে ভক্তিরসের রসিক, সদানন্দে বিরাজ করে পুরে ৷৷ সে ভাব লাগি পরম যোগী, যোগ করে যুগ-যুগান্তরে । হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন, লোহাকে চুম্বকে ধরে ৷৷ প্রসাদ বলে মাতৃভাবে আমি তত্ত্ব করি যাঁরে । সেটা চাতরে কি ভাঙব হাঁড়ি, বোঝ না রে মন ঠারে ঠোরে ৷৷" (রাফায়েল হার্স্ট তাঁর ভারতভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন পল ব্রান্টন ছদ্মনামে। 'শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত'-এর রচয়িতা শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ওরফে মাস্টার মহাশয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় কথামৃতকারের দেহত্যাগের অল্পকাল পূর্বে।) তথ্যসূত্র: শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা (স্বামী গম্ভীরানন্দ) In search of secret India (পল ব্রান্টন)
Nilanjan
অনুরণন ------ আজ বাড়ি ফিরে হঠাৎ নিজের বীণার দিকে চোখ পড়ে গেল ভাস্করের।কত দিন বাজায়নি সে তার তানবাহার কে।তানবাহার নাম রেখেছিল সে তার বীণার।তাকে বীণা বাজাতে শিখিয়েছিল মৌসুমি নিজের হাতে।নিজের ঘরে রাখা স্বরস্বতী মূর্ত্তির সামনে ধূপকাঠি ধরিয়ে যখন মৌ বীণা বাজাতো সেই লাল পাড় সাদা শাড়ী টা পড়ে,স্নান করে উঠে আসা সেই ভেজা চুল,কপালে সিঁদুর হাতে সোনার বালা,শাখা, পলা, আর পায়ে ভাস্করের দেওয়া সেই রুপো দিয়ে তৈরি নুপুর। সকালের মিষ্টি রোদের সাথে মৌ এর হাতের তৈরি বেড টি খেয়ে আধবোজা চোখে মৌয়ের বীণার অনুরণন ভাস্করকে নতুন শক্তি দিত।প্রেম করে ওদের বিয়ে হয়েছিল।নতুন সংসারের নতুন প্রেম ওদের আরো কাছাকাছি এনে দিয়েছিল।কিন্তু আজ......আজ সেই প্রেম ওদের একাকার করে দিয়েছে......সেই দিনের সেই গাড়ির ধাক্কা টা ওদের আলাদা করতে পারে নি।একসাথে শপিং করে ফিরছিল ওরা।বাইকে চেপে।হঠাৎ ব্রেকফেল হওয়া একটা গাড়ি যমদূত হয়ে ওদের বাইকে ধাক্কা মারে.....তারপরে সব অন্ধকার।কোথাও কিচ্ছু নেই.....কিন্তু আজ এতদিন পরে বাড়ি ফিরেও কোন কিছুই ছুঁতে পারছে না ভাস্কর,এমনকি তার মৌ এর ছবিটাও না।ব্যর্থ হয়ে বিছানায় বসে ফুপিয়ে কাঁদছিল ভাস্কর।হঠাৎ খুব চেনা একটা গলার স্বর শুনতে পেল সে,"এমা!!আমি তো জানতাম সারাজীবন শুধু একা আমি কেঁদেছি"ভাস্কর চমকে তাকিয়ে দেখে মৌ দঁাড়িয়ে আছে....."তুমি আবার এখানে ফিরে এলে?"ভাস্কর অবাক হয়ে বলল,"আবার মানে??এটা আমাদের বাড়ি।এখানে যাব না তো কোথায় যাব? "মৌ আগেকার মতই ভাস্করের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,"ভুলে গেলে সেই গাড়ির ধাক্কায় শুধু আমি মারা যাই নি......"তারপর বরফের মতো ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া ভাস্কর তার গালে অনুভব করল আর সেই সাথে মৌ এর গলার স্বর,"তুমিও মারা গেছিলে।আমরা আলাদা হই নি,মৃত্যুতেও না।" (ক্রমশ....)
Dr Samya Dutta
'যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়...'- আজ্ঞে না, আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যেতেন না। এক রাবড়ি ব্যতীত অন্য কোনো নেশাই তাঁর ছিল না। জমিদার বংশে জন্মেছিলেন, কিন্তু জীবনটা কাটিয়েছেন ত্যাগীর মত। আমার সেই গুরু, মুক্তারামের সেই মুক্তপুরুষ, আমাদের ফুটপাতে শুয়ে আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলেন। শিব্রাম চক্কোত্তি- গতকাল ছিল তাঁর জন্মদিন। না, নতুন কিছুই লেখা হয়নি। উচিত ছিল নিশ্চই, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এদিকে নতুন লেখা দিচ্ছি না বলে শ্রীপর্ণা ম্যাডাম গুছিয়ে বকে দিয়েছেন। এই লেখাটা ভোটের সময়ে লেখা, নেহাতই খেলাচ্ছলে। আসলে কেবলমাত্র ভোটের কালি লাগানো আঙুলের ছবি পোস্ট করতে বাধো-বাধো ঠেকছিল, অথচ নিজেকে দায়িত্ববান নাগরিক প্রমাণ না করলেই নয়। তাই আবোলতাবোল লিখে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। সেই বাসি মালই ছাড়ছি, ভালো না লাগলে গালাগালিটা আড়ালে দেবেন: ☆☆☆☆ ভোট দিলেন হর্ষবর্ধন ☆☆☆☆ রোব্বারে হর্ষবর্ধনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফি রোব্বারই যাই, প্রচুর চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র বন্দোবস্ত থাকে। হর্ষবর্ধনও খাওয়াতে ভালোবাসেন, গলা অবধি খেলেও গলাধাক্কা দেননা, গলাধঃকরণ করিয়েই ছাড়েন। গিয়ে দেখি দুই ভাই ভারি চিন্তিত মুখে বসে। আমাকে দেখে গোবর্ধন শুধালে, "এই যে, শিব্রামবাবু। আপনি তো বেশ পন্ডিত মানুষ, একটা প্রশ্নের চটপট উত্তর দিন দেখি!" আমি বিনিত ভাবে বললাম, " ভাই গোবরা, পন্ডিত হতে গেলে শুনেচি অনেক পড়াশুনো করতে হয়। আমি নিজের লেখাই কখনো পড়ি না, সুতরাং পন্ডিত আমি হতেই পারি না, সে পণ্ডশ্রম আমি কখনো করিনি।কিন্তু, তোমার মনে হঠাৎ কি প্রশ্নের উদয় হল? তোমাকে তো প্রশ্নাতীত বলেই জানতুম।" -"আচ্ছা, বলুন দেখি, গণতন্ত্র কা'কে বলে?" ভারি জটিল সমস্যায় পড়া গেল। গণতান্ত্রিক দেশেই থাকি বলে শুনেছি, পাঁচবছর অন্তর ভোট হয় দেখেছিও। আমি অবশ্য ভোট দিতে যাই না, এসব পাঁচপেঁচি ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই, বরং বাড়তি পাঁচ মিনিট ঘুমিয়ে নিই ভোটের দিন। আমতা আমতা করে বললাম, "ইয়ে, গণতন্ত্র আসলে একরকম তন্ত্রসাধনা বই নয়। তবে প্রক্রিয়া-প্রকরণ জানা নেই ভাই, বলো তো তারানাথ তান্ত্রিককে শুধোই!" -"হুমম, তাই হবে। তন্ত্রসাধনাই হবে। শবসাধনার প্রয়োজন হয় বলেই বুঝি এত খুনজখম করতে হয়।" হর্ষবর্ধনের সুচিন্তিত মতামত। "কিন্তু, ভোট তো দেন আপনি। ভাটের কথা তো নয় সেটা, তা দেন কা'কে?" -"আজ্ঞে, আমি ভোট দিতে যাই না। রোদ্দুরে পুড়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে ভাবলে লালায়িত হই না মোটেই, লালা ঝরে না আমার। কা'কে ভোট দেব ভেবে মাথা না ঘামিয়ে বরং মেসেই শুয়ে থাকি, ঘুমিয়েই নিই একচোট।" -"উঁহু! এটা কোনো কাজের কথা হল না মশাই।" গোবরার আপত্তি, "গণতান্ত্রিক অধিকার-টধিকার নাহয় নাই বুঝলেন, অন্তত গুড়-জল খেতেও তো যেতে পারেন। গেলেই দেয় শুনেচি, গালাগালিও করে না চাইলে।" -"না ভাই। গুড় শুনলেই পেট গুড়গুড় করে আমার। তাছাড়া নীরেও আসক্তি নেই, নিরাসক্তই বলতে পারো।" -"কিন্তু, ভোট দিতে যাবার বাহানায় খানিক প্রাতঃভ্রমণ তো হয়, সফর করেও তো আসতে পারেন খানিক।" হর্ষবর্ধন ভেটো প্রয়োগ করেন। -"আমার সব সফর ওই সোফার ওপরেই। সোফায় শুয়ে শুয়ে, সো ফার অ্যান্ড নো ফারদার।" কিন্তু যুক্তিতে হর্ষবর্ধন ন বধ্যতে। "সে আপনি যাই বলুন মশাই! ভোট আমি দেবই। কিন্তু কা'কে দেব, সেইটে এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি, এই যা!" -"ওই মাখনের দলকেই দিলে হত না দাদা! জিতলে সন্দেশ-দরবেশ কিসব খাওয়াবে বলছিল যে!" -"সন্দেশের দর যে বেশ, তা আমার ভালোরকমই জানা আছে।মাখনের মত বর্বরের পয়সায় খেতে আমারও আপত্তি নেই। বারেবারে তাদের ধণক্ষয় করিয়েই আমার এত বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু ওদিকে যে গড়গড়ি!" -"গড়গড়ি?" আমার আর গোবরার সম্মিলিত কৌতুহল। -"গড়গড়ি। আগে আমাদের কাঠের কারখানাতেই কাজ করত। পরে তহবিল ভেঙে চম্পট দেয়। ইদানীং চাপাতি ছাপ দলের হয়ে কারখানাতেই তোলা তুলতে আসত। বলে গেছে, ভোট চাপাতিতে না দিলে গড়গড়ির হাতেই গড়াগড়ি যাবে, মুন্ডু একদিকে আর ধড় একদিকে।" আমি গোবরাকে সাবধান করে দিই, "তাহলে মাখনের সাথে মাখোমাখো না হওয়াই ভালো, কাজ নেই বেশি মাখামাখিতে। তুমি গড়গড়ির হাতে গেলে, তোমার দাদার বংশ আর গড়াবে কি করে?" -"ঠিক!" হর্ষবর্ধন সমর্থন করেন, "আমার ছেলেপুলে-নাতিনাতনি নেই বটে, কিন্তু নাতিবৃহৎ তুই তো আছিস। তুই গেলেই বর্ধন বংশ লোপ পেল, আর বর্ধিত হতে পা'বে না। না রে গোবরা! ওসব মাখন-ফাখনকে ভোট দেওয়া তোর চলবে না।" -"চেতলায় থেকে থেকে তুমি ভারি হীনচেতা হয়ে পড়েছ দেখছি দাদা! চেতনা লোপ পেয়েছে তোমার। আচ্ছা, মাখনকে নাহয় ছেড়েই দিলাম, নিষ্কর করের কথাটাও ভাববে না তুমি! আমাদের কারখানা থেকেই তো কাঠ নেন ভদ্দরলোক। ধার বাকিতেই নেন অবিশ্যি, কিন্তু তা'বলে তাঁর ধার ধারবে না তুমি! ভোটটাই দেবে না তাঁকে! এরপর কাঠ চাইতে এলে মুখ দেখাতে পারবে ভেবেছ?" বুঝলাম দুই ভাইয়ের সমস্যার সমাধান সহজে হবে না। ভোটাধিকারের একটা ফয়সালা না করে এঁরা জলযোগের নামও করবেননা, এদিকে আর দেরি করলে মেসের হরিমটরও এবেলা আর জুটবে না। তাই ভোটের পরদিন এসে খবর নেব বলে পলায়নপর হই, একরকম পালিয়েই আসি পা চালিয়ে। খোঁজ অবশ্য আমাকে নিতে হয় না। ভোট দিয়ে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধনই সরাসরি এসে হাজির হন আমার মেসে, একেবারে সশরীরে। -"ভোটটা দিয়েই এলাম মশাই।" হর্ষবর্ধনের ঘোষণা। -"ভুটভুটি চেপেই গেসলাম দুজনে, আমার মোটরবাইকেই।" গোবরার সঙ্গত। -"যাক! সব ভালো যার শেষ ভালো। কিন্তু, দিলেন কা'কে? মাখন না গড়গড়ি? নাকি করের করতলগতই হয়ে গেলেন শেষটায়?" দুভাই প্রাণখোলা হাসি হাসতে থাকেন। "না মশাই, অনেক ভেবেচিন্তেও যখন কূল পেলাম না, তখন দাদা একটা জব্বর মতলব ঠাউরালে।" গোবরা দাদার গরবে গর্বিত হয়। "ভাবলুম, কাউকে চটিয়ে লাভ কি!" দাদাও আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন, "গুনতিতে দেখলুম মোট পাঁচজনের নাম ওই যন্তরে। তাই হাতের পাঁচ আঙুল পাঁচটা বোতামে রেখে একসাথে টিপে দিইচি। আমিও, গোবরাও। সবাইকেই খুশি করা হল, আবার যন্তরের কল্যানে আমাদের যন্তরনাও আর রইল না। জয় গণতন্ত্র মাঈ কি!" -"অ্যাঁ! " -"হ্যাঁ।" আমার বিঘতখানেক লম্বা হাঁয়ের দিকে পুলকিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন বর্ধন অ্যান্ড বর্ধন কোম্পানির দুই মালিক।
Dr Samya Dutta
পুরা-কথা: ....দানবরাজ ইল্বল তখন করজোড়ে নিবেদন করলেন, " হেঁ হেঁ, লজ্জা করবেন না স্যার, পেট ভরে খাবেন! বেশি কিছু করতে পারিনি, আপনার অনারে একটু ল্যাম্ব স্টু করেছি মাত্তর। স্যার কি খাওয়া শুরু করে দিলেন নাকি? হাত ধোয়া-টোয়া.... কী বলছেন? শুদ্ধাত্মা ঋষির আবার ডেটল সাবানের কী প্রয়োজন? তা তো বটেই, তা তো বটেই, 99.99% জীবাণু তো ব্রহ্মতেজেই মরে যাবে.... বেশ, বেশ, খান স্যার, খান! সব ঠিক আছে? ঝাল-টাল, নুন-টুন? " অগস্ত্য মুনি একটি আস্ত ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ উদরস্থ করে একটা নাতিবৃহৎ ঢেকুর তুললেন। ইল্বলরাজের গোঁফের ফাঁকে কি একটু মুচকি হাসি দেখা গেল? মিলিটারি গোঁফজোড়ায় একবার আদরের তা দিয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, " পিয়া তু উ উ উ, অব তো আ যা.... আয় রে বাতাপি, বেরিয়ে আয়, ভাইটু!" ওমা, কোথায় কী! যে বাতাপি অন্যদিন সিগনাল পাওয়া মাত্র মুনিপ্রবরদের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, আজ সে নট নড়নচড়ন, নট কিচ্ছু! ইল্বলের মুখ শুকিয়ে আমসি! আর তাই দেখে অগস্ত্য মুনি ভুঁড়ি-টুঁড়ি কাঁপিয়ে, মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে প্রথমে খিঁ খিঁ, তারপর খ্যাঁক খ্যাঁক, শেষে খ্যাঁখৌ খ্যাঁখো করে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে বললেন, " ফ্রম গুড়-বাতাসা টু বাতাপি, যো অন্দর গ্যায়া, সমঝো বিলকুল হজম হো গ্যায়া। কুছু নাহি নিকলেগা।" উত্তর-কথা: অ্যায়, অ্যায় বেরিয়েছে! আড়চোখে কমোডের তলদেশে একবার চোখ বুলিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন অগস্ত্যবাবু। আর শুধু নীচুতলায় কেন, কমোডের খোলা ঢাকনায়, মায় পেছনের দেয়ালেও তাঁর রেক্টাল স্প্রে পেন্টিং-এ নতুন দেওয়াল লিখন হয়ে গেছে। একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন অগস্ত্য সাধুখাঁ। বসার টাইমিং-এ সামান্য দেরি হয়ে যাওয়ায় সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়নি, তা হোক! ওটুকু কোল্যাটারাল ড্যামেজ। কবিতার খাতাটা কলের মাথায় ব্যালান্স করে রাখা ছিল, পেনটা সাবানের কৌটোয় হেলানো। সাবধানে টেনে নিয়ে অগস্ত্যবাবু লিখতে শুরু করেন: আবির্ভাব সময় সকালবেলা/ ডান হাতে জ্বলন্ত চারমিনার, বাঁ হাতে বালতি/ মানব চলেছে তার সাধন কক্ষে/ ক্যাঁচ! দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়/ আর তার একটু পরেই --- আবির্ভাব / নিস্তব্ধ, শূন্য প্যানের 'পরে, পড়িল সে ছড়াত করে/ মূর্তিমতী তুমি আম! একটু আগেই ভুলিয়েছিলে আমার বাপের নাম/ থকথকে জেলী রূপ! অপূর্ব, অদ্ভুত! / কপালে রক্তচন্দন, জীবনে নাহিকো বন্ধন, পিছলিয়ে চলে যাও অতল গহ্বরে / বারবার আনি জল, যেন তব ট্রাঙ্ককল/ হাত দুটি ব্যথিত আজিকে / দুধ মুড়ি যাই খাই, অথবা মন্ডা- মিঠাই, সবে লয়ে এক সাথে দেখা দাও সুপ্রভাতে/ তোমাকে পারি না আর, তাই তব খুরে খুরে নমস্কার।নমস্কার। নমস্কার। নাহ্, বেড়ে হয়েছে! কফি হাউসে এমন একখানা 'জীবনমুখী কবিতা' পড়তে পারলে অনেকগুলো থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দেওয়া যাবে। ক্লাস নাইনকে বোর্ডে জ্যামিতি শেখাচ্ছিলেন অগস্ত্যবাবু। হঠাৎ একটা মিহি, প্রায় কানে শোনা যায় না, এমন শব্দ পেয়ে ফার্স্ট বেঞ্চের রাখাল বলে উঠল, " ওই রে, সম্পাদ্য বেরিয়েছে! " সঙ্গে সঙ্গে চাঁদা-কম্পাস ফেলে গোটা ক্লাস ব্যস্ত হয়ে পড়ল মুখে রুমাল চাপা দিতে। খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর আবার সতর্কতা জারি হল, "এইবার উপপাদ্য!" ব্যাস! আবার রুমাল চাপা। ফার্স্ট বয় সুবোধ বেচারি স্যারের ঠিক পেছনেই বসে। স্যারের ভয়ে প্রথম দু'বার মুখে রুমাল চাপা দিতে পারেনি, কিন্তু 'প্রতিপাদ্য' শোনামাত্র সে দম টেনে নিঃশ্বাস বন্ধ করল। বোর্ডে ইউক্লিডকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে অগস্ত্যবাবু এবার ছাত্রদের দিকে ফিরলেন। আড়চোখে সুবোধের বেগুনি হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, " বাবা রাখাল, গুরুমশাইকে নিয়ে ঠাট্টা করাটা কি উচিত হচ্ছে, বাপ! এবার কিন্তু আমিই অঙ্কের খাতা দেখব! তাই বলি কি, রুমাল-টুমাল ভারি বিলাসিতার জিনিস, ওসব সরিয়ে রেখে কষ্টসহিষ্ণু হও। মনে রেখো, যে সয়, সেই রয়; আর যে না সয়, সে পরের বছরও এই ক্লাসেই রয়।" ফিজিক্সের মাস্টার রসিক যেমন চালিয়াত, তেমনি ফিচেল। জয়েনিং-এর দিন পরে এসেছিল সবুজ জামা আর ক্যাটক্যাটে মেরুন প্যান্টুল। বেজায় উৎসাহিত হয়ে অগস্ত্যবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভাই, তুমি বুঝি মোহনবাগান?" ওইখানটায় তাঁর মস্ত দুর্বলতা। -কী বলছেন দাদা! আমার বাবা তো মোহনবাগানে খেলত! -"অ্যাঁ!" অগস্ত্য সাধুখাঁ রোমাঞ্চে আর বিষ্ময়ে প্রায় কেঁদে ফেলেন, "কী নাম বল তো?" -ওই যে আটের দশকে লেফ্ট আউট খেলত.... আহা, কী নামটা চট করে বলে ফেলুন....পেটে আসছে তবু মুখে আসছে না.... -" আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে! তবে হ্যাঁ, ভালো কথা.... অন্য কেউ হলে বলতুম না, নেহাৎ তুমি বলেই...." অগস্ত্যবাবু ফিসফিসিয়ে ওঠেন, "বাকিদের সঙ্গে বেশি মাখামাখিতে কাজ নেই। সবকটা কুচুটে, আর ইস্টবেঙ্গল!" সেই ফিচেল ফিজিক্স টিচার আজ অগস্ত্যবাবুকে টিচার্স রুমে ঢুকতে দেখে, কতকটা যেন আপন মনেই ফোড়ন কাটল, " প্রভুপাদ আবির্ভূত হলেন, জয় গুরু!" ঘরের ভেতর একটা চাপা হাসির হিল্লোল উঠল। অগস্ত্যবাবু কড়া চোখে একবার তাকিয়ে, রসকেটাকে ভষ্ম করে দিয়ে নিজের আসনে বসে পড়লেন। পিছনেই বসে ছিলেন বাংলার হরগৌরীবাবু। অগস্ত্যবাবুর পিঠে একটা পেনের খোঁচা দিয়ে বললেন, " দেখো সাধুখাঁ, ফাইনালের খাতা দেখছি। দয়া করে, এখন আর তোমার ওই 'ফুসিকা প্রাণঘাতিকা'টি ছেড়োনা বাপু!" কথাটা পড়তে পেল না, একটা প্রাণঘাতী দুর্গন্ধ পেয়ে রসিক চেঁচিয়ে উঠল, " হরদা, ফাইনাল সামলান! রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করেছেন।" নাক আর গলার মাঝে 'ফোঁৎ' গোছের একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করে অগস্ত্যবাবু আনন্দবাজারটা টেনে নিলেন। জ্যোতিষার্ণব বলছেন, " মেষ রাশির জাতক আজ পেটের অসুখে ভুগতে পারেন...." সে আর নতুন কী! অগস্ত্য সাধুখাঁ বারোমাস পেটের রোগ নিয়ে ঘর করেন। ছয় মাস তাঁর কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে, বাকি ছয় মাস ডায়রিয়া। তাছাড়া গ্যাস, অম্বল, চোঁয়া ঢেকুর আর ওই 'ফুসিকা' তো তাঁর পুরাতন ভৃত্য। এ নিয়ে অবিশ্যি তাঁর মনোভাবটা বেশ ডোন্ট কেয়ার ধরনের। "পরমহংসদেব কী বলেছেন জানো? শরীর ধারণ করলে তার ট্যাক্স তো দিতেই হবে, ওগুলো হল সেই ট্যাক্সো!" মুর্গি-মাটন তিনি ছাড়বেন না, চিকিৎসা করাবেননা। অ্যালোপ্যাথি তাঁর বিলকুল না পসন্দ! হাত ফেঁড়ে ব্লাড নেবে, পেট ফেঁড়ে, পিঠ ফেঁড়ে এটা নেবে, সেটা নেবে, ধুস! নিজে এককালে হোমিও শিখেছিলেন, গিন্নী খুব ঘ্যানঘ্যান করলে ওই হুমোপাখির মিষ্টি গুলিই খান। সাধুখাঁগিন্নী কিন্তু দত্তদের বৌয়ের কাছে বিস্তর অনুযোগ করেন। "আর ভাই, পনেরো বচ্ছর বে হয়েচে, একটা রাত একটু শান্তিতে ঘুমুতে দিলে না গা!" -কেন, দাদার বুঝি খুব নাক ডাকে? -নাক নয় ভাই, পেছন ডাকে। খালি শব্দ আর গন্ধ! আর পেছন বন্ধ হল তো গলা। ঢ্যাক ঢ্যাক করে ঢেকুর! ঘুমের ঘোরে কেউ অমন ঢেকুর তুলতে পারে, বাপের কালে দেকিনি! টিফিন পিরিয়ডে মাঠের বকুল গাছটার তলায় বসে পকেট থেকে চিঠিটা বের করল বিন্ধ্য। চিঠিটা আজ সকালের ডাকে এসেছে, আলমোড়ার পোস্টমার্ক। ওপরে তার নাম লেখা: বিন্ধ্য সাধুখাঁ, কেয়ার অফ অগস্ত্য সাধুখাঁ। এই হাতের লেখা তার ভীষণ চেনা: " দাদুভাই, তোমার চিঠি পেতে একটু দেরি হল। আসলে ক'দিন বাড়িতে ছিলুমনা। করবেট সাহেবের গপ্প বলেছিলাম তোমায়, সেই করবেটের নামে এদিকে মস্ত জঙ্গল আছে, সেইখানে বেড়িয়ে এলুম। কী ভাবছ, দাদুভাই তোমায় ফাঁকি দিয়ে বেড়িয়ে নিলে? তুমি একটু বড় হও, তোমাকেও নিয়ে আসব। কিন্তু, তোমার চিঠি পড়ে সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে গেল। তোমার বাবা পিটিএ মিটিং-এ গিয়ে প্রথমে বিশ্রী গন্ধ ছেড়েছে, তারপর হড়হড় করে হেডমিস্ট্রেসের টেবিলে বমি করে দিয়েছে, আর সেই নিয়ে তোমার বন্ধুরা হাসাহাসি করেছে, এ তো ভারি লজ্জার কথা! তোমার বুঝি ইস্কুলে যেতে খুব লজ্জা করছে? ঠিক হ্যায়, শরমাও মাত! তোমায় কিচ্ছুটি ভাবতে হবে না, এর ব্যবস্থা আমিই করছি! কয়েকদিনের মধ্যেই তোমাদের ওখানে গিয়ে পড়ব। তবে সেটা এখন গোপন রেখো, টপ সিক্রেট! আর সাবধান! চিঠি যেন বাবার হাতে না পড়ে! ততদিন সাবধানে থেকো, আর রোজ স্কুলে যেও। ইতি, তোমার দাদুভাই আজ ইস্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভা। মঞ্চ আলো করে হেডমাস্টার নিত্যগোপালবাবুর পাশে বসে রয়েছেন স্কুল ইনস্পেক্টর ডি.সি.গড়গড়ি। বাকি মাস্টাররাও রয়েছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বাজেট কম বলে সবার জন্য লুচি-বোঁদে, কেবল ইনস্পেক্টর সাহেবের জন্য মা তারা মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্পেশাল প্যাকেট, তার পাঁচ খোপে পাঁচ রকম মিষ্টি, আর মধ্যিখানে মা তারার স্পেশালিটি রাজাধিরাজ ভোগ। অগস্ত্যবাবু একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। ক্লাস টেনের ছোকরাদের উদ্বোধনী সঙ্গীত, মাল্যদানটান শেষ হবার পর সবে সেক্রেটারি নন্দবাবু বলতে উঠেছিলেন, " আজকের এই শুভদিনে...." ইত্যাদি, দারোয়ান রামচতুর হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দিলে, " ইনিস্পেকটার সাহিবকা পাকিট গায়াব!" গায়েব মানে! বলছিস কী রে হতভাগা! এর উত্তরে রামচতুর কাঁচুমাচু মুখ করে জানালে, ইসমে তার কোনো কসুর নেই। সে বরাবর খাবারের প্যাকেট পাহারা দিচ্ছিল, "বস একবার থোড়া ধার মারনে গ্যায়া থা, উও ভি সিরফ পাঁচ মিনট কে লিয়ে।" আর এসেই দেখে প্যাকেট বেপাত্তা! অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। নিত্যগোপালবাবু টেনশনে দৌড়াদৌড়ি করছেন, আর সব্বাইকে ধমক মারছেন। গড়গড়ি সাহেবও ব্যাপারটা টের পেয়েছেন, তাঁর মুখ কালো হয়ে গেছে। সেক্রেটারি নন্দবাবু তাঁকে হাতটাত কচলে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছেন। পিটি টিচার বাঁটুলবাবু বললেন, " গেটটা লাগিয়ে দিন। কেউ যেন বেরোতে না পারে। সবার তল্লাশি নেব।" শুনে নিত্যগোপালবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন, "ক্ষেপেছেন মশাই! সাতশো ছাত্তর, তাদের শ পাঁচেক গার্জেন, তল্লাশি করতে চাইলে ভাঙচুর শুরু হয়ে যাবে যে!" এদিকে গার্জেনরাও ততক্ষণে নানারকম পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন: -থানায় খবর দিন। -দমকল ডাকুন, দমকল। -না না, নির্বাচন কমিশন। -রাষ্ট্রপুঞ্জের নম্বরটা কত যেন? গোলমালটা বেশ পাকিয়ে উঠেছে, চিন্তায় সবার মাথার চুল ছেঁড়ার দশা, এমন সময়.... "ব্যোম শঙ্কর! ব্যোম কালী কলকাত্তাওয়ালি!" হাঁকটা এসেছে স্টেজের পিছন দিক থেকে, আর এসেছে কামান দাগার মত। সবাই চমকে উঠে দেখেছে, এক পেল্লায় সাধুবাবা! মাথায় জটা, বুক অবধি লম্বা দাড়ি, পরনে নেংটির মত একটা কাপড় আর গোটা শরীরে ছাইভস্ম মাখা। সাধুবাবার এক হাতে ত্রিশূল আর অন্য হাতে একটা চিমটে। সাধু জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, "চোর খুঁজতে থানা-পুলিশ করছিস হতভাগারা! আর ইদিকে ত্রিকালজ্ঞ সন্ন্যাসী তোদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারো! পাষণ্ড! পামর! আমার মা না চাইলে, পুলিশের সাধ্যি আছে, চোর ধরে দেবে?" নন্দবাবু ভক্ত লোক, সম্প্রতি চার ধামের যাত্রা করে এসেছেন। তিনি সবার আগে ছুটে গিয়ে সাধুর পায়ে পড়ে গেলেন। "বাবা, অধমদের বাঁচান, বাবা! প্যাকেট উদ্ধার না হলে মুখ দেখাতে পারব না।" সাধু হা হা করে হেসে, নন্দবাবুর পিঠে দুটো চাপড় মেরে বললেন, " ওঠ ব্যাটা! স্বামী জৃম্ভনানন্দ থাকতে ভয় কী রে!" হাসি হাসি মুখ করে নন্দবাবু চোখের জল মুছতে মুছতে সাধুর পা ছাড়লেন, আর অমনি যেন বাবাজীর পদধূলি নেবার হরির লুঠ পড়ে গেল। শুধু গড়গড়ি দূর থেকে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। অগস্ত্যবাবুও গিয়েছিলেন প্রণাম ঠুকতে, বাবাজীর সঙ্গে একবার চোখাচোখি হতে মুখটা কেমন যেন চেনা ঠেকল। কিন্তু ভালো করে দেখার আগেই ভূগোলের শিক্ষক টেকো শিবপদবাবু তাঁকে কনুই-এর গুঁতোয় স্থানচ্যুত করলেন। এবার বাবাজীকে সসম্মানে নিয়ে তোলা হল স্টেজে। মাঠে তখন পিন ড্রপ সাইলেন্স। সমবেত দর্শকের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে সাধুবাবা প্রথমে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিসব মন্ত্র পড়লেন। তারপর কান পেতে কিছু একটা শোনার ভঙ্গি করে ত্রিশূলটা ভীষণ জোরে দু'বার স্টেজে ঠুকে বললেন, "কী বললি মা? চোর এখানেই আছে? চোরের পাতলুন দেখব? হলদে হয়ে যাবে? বেশ! তবে তাই হোক, মা! সবই তোর ইচ্ছে। ব্যোমকালী! ....অ্যায়ো, তুম!" এবার আদেশ হল রামচতুরের প্রতি, " সবকা পাতলুন চেক করো। পেহলে মাস্টার লোগোকা। জিসকা পিছওয়াড়া পিলা হোগা, উসকো কান পাকড়কে লে আও!" অগস্ত্যবাবুর গতকাল থেকে ডায়রিয়া সংক্রান্তি শুরু হয়েছে। আজ সকালে পরিমাণে ঘাটতি দেখে ডায়রিতে নোট করেছিলেন, " সকাল সাতটা। আনন্দবাজার সহযোগে আড়াইশো গ্রাম। বিকেলে পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা।" প্যাকেট চুরির চূড়ান্ত টেনশনের মধ্যেই টের পাচ্ছিলেন, নিম্নচাপ ক্রমশ বর্ধমান। ভেবেছিলেন, গোলমাল মিটলে একফাঁকে সেরে আসবেন। কিন্তু সাধুবাবা এসে পড়ে সব ঘেঁটে দিলেন। রামচতুর এবার মাস্টারদের লাইন করে দাঁড় করাতেই, অগস্ত্যবাবু টের পেলেন, চাপের চোটে কোলন এখন কোলে উঠতে চাইছে। অগস্ত্যবাবুর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। তিনি প্যাকেট নেননি, হলফ করে বলতে পারেন, কিন্তু সেকথা কা'কে বিশ্বাস করাবেন? মোক্ষম সময়েই যে তাঁর পেট সাবোতাজ করেছে! প্রথমে ফিজিক্সের রসিক, সসম্মানে পাশ.... অগস্ত্যবাবু দাঁতে দাঁত চেপে আছেন.... হেডমাস্টার নিত্যগোপালবাবু, বাঁটুলবাবু, পাশ....পাশ.... অগস্ত্যবাবুর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে.... শিবপদবাবুর কাছে আসতেই.... ছ্যাড়-ছ্যাড়-ছ্যাড়াক! একটা বিশ্রী আওয়াজ তুলে অগস্ত্য সাধুখাঁর পেট পুরোপুরি ধর্মঘটে চলে গেল। অবাক দর্শক দেখল সবুজ মাঠের খানিকটা পীতাভ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ সব চুপ, তারপর আকাশ ফাটিয়ে একটা " চোর, চোর! দুয়ো, দুয়ো!" রব উঠল। সাধুবাবা স্টেজ থেকে এক লাফে নেমে সোজা অগস্ত্যবাবুর সামনে এসে চিমটেটা দিয়ে সজোরে তাঁর নাক টিপে ধরলেন। ব্যাথায় চোখ জলে ভরে গেল, 'আঁ আঁ' করে একটা চিৎকার করতে করতে সেই ঝাপসা চোখেই অগস্ত্যবাবু দেখলেন, সাধুবাবা তাঁরই পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা প্যাকেট বের করে এনেছেন। তার ওপর লেখা, 'মা তারা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।' রাত দশটা নাগাদ ইস্কুলের ভাঙা পাঁচিলের পাশে বসে দাড়ি আর পরচুলা খুলতে খুলতে স্বামী জৃম্ভনানন্দ বললেন, " বাবা রসিক, আরেকটু চুলকে দাও তো! উফ! পরচুলোয় এত উকুন কে জানত! " রসিক মাষ্টার একগাল হেসে বললে, "এই দিই! থ্যাঙ্কু জ্যাঠামশাই! আজ যা উপকার করলেন...." পুনশ্চঃ আরো ছয় মাস অতিক্রান্ত। অগস্ত্যবাবু এখন কলকাতার নামী অ্যালোপ্যাথকে দেখিয়ে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। রোজ মর্নিং ওয়াক করেন, আমিষ ছেড়েছেন, সম্প্রতি উইলও করেছেন: " আমার পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্রাদি যে উত্তরপুরুষ ক্রনিক পেটের ব্যারামে ভুগবে, সে আমার সমুদয় সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হবে।"
Dr Samya Dutta
'লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে'- একথা বলে কে? যে বলে, সে নির্জলা দুষ্টু লোক। আমার ঠাকুমা কিন্তু ভারি ভালোমানুষ। ঠাকুমা বলে, বেশি পড়ালেখা করলে চাঁদি গরম হয়, রাত্তিরে চোঁয়া ঢেকুর ওঠে, আর চাঁদনি রাতে পেতনিতে ধরে। সেই ছোট্টটি থেকে ঠাকুমার সব কথাই আমি হাঁ করে গিলি আর ধাঁইধাঁই বিশ্বাস যাই। তা একথাটাই বা অবিশ্বাস করি কেন? বিশেষ করে কথাটা যখন আমার মনে ধরেছে খুউউব! অবিশ্বাসের কারণ অবিশ্যি এমনিও ছিল না, কিন্তু আমার বিশ্বাসটাই আরও পাকাপোক্ত করে দিয়ে গেলেন বিদ্যেধর বিশ্বাস, অর্থাৎ আমার বিদ্যে পিসে। পিসের আদি নিবাস ছিল কলকাতায়। বিদ্যাধর বিদ্যা কম ধরতেন না, বস্তুত ধরাধামের কোনো বিদ্যাই তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল না। নবীন, প্রাচীন, অর্বাচীন সব শাস্ত্র গুলে খেয়ে পিসে অ্যায়সা বিচক্ষণ হয়ে উঠেছিলেন, যে সাহেবরা তাঁকে আদর করে ডাকত 'Very intelligent pandit,' সংক্ষেপে 'ভিআইপি।' বিদ্যে পিসে বইয়ের সঙ্গেই সই পাতিয়েছিলেন। বইয়ের বিরহবেদনা একদন্ডও সইতে পারতেন না। হুঁকো খেতে খেতে ফুকো পড়তেন, সাত্রে পড়ে তাঁর রাত্রে ঘুম হত না। শেষে মায়াকোভস্কি আর বুকাওস্কি পড়ে যেই না মাথায় খুস্কি হয়েছে, ডাক্তার তাঁকে নিদান দিলেন চেঞ্জে যেতে। আর যায় কোথা? ডাক্তারের মুখ থেকে কথা খসেছে কি খসেনি, পিসে কলকেতা ছেড়ে কেটে পড়েছেন- রানাঘাট, ডায়মন্ডহারবার হয়ে একদৌড়ে সোওওজা সেই তিব্বত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিব্বতের ঠান্ডাটা সবার সয় না। পিসেরও সইল না। মাথার খুস্কি তো গেলই না, মাঝখান থেকে সেখানকার বরফের ওপর দিয়ে স্কি করতে করতে পিসে গিয়ে পড়লেন অতল খাদে। এতখানি অধঃপতন আত্মায় সইল না, দেন অ্যান্ড দেয়ার পরমাত্মায় বিলীন হয়ে গেলেন। পপাত চ অ্যান্ড মমার চ! সশরীরেই পড়েছিলেন, কিন্তু পড়ামাত্রই অশরীরী হয়ে গেলেন। ভিআইপি থেকে এক ধাক্কায় আর.আই.পি। তা যেতে তো সবাইকেই হবে, দু'দিন আগে বা পরে! 'জন্মিলে মরিতে হবে' ইত্যাদি... কিন্তু যেতে যেতে পথে, পিসে আমাকে একেবারে পথে বসিয়ে গেলেন। দেখা গেল, মৃত্যুর পূর্বে বিদ্যে পিসে উইল করে গেছেন। অ্যান্ড ইফ দেয়ার ইজ আ উইল, দেয়ার ইজ আ উকিল। শামলা-গায়ে সেই শ্যামবর্ণ উকিল, শেয়ালের মত মুখ করে পিসের অন্তিম উইলটি ব্যক্ত করলেন। জানতে পারলুম, পিসে তাঁর বইয়ের তাকটি তাক করে আমার ঘাড়েই চাপিয়ে গেছেন। আর শুধু তাক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তাকের বইগুলোও ঠাকুমার এই বাধ্য নাতিটিকে গছিয়ে গেছেন। বই এবং বইয়ের তাক, দুইই আমার ভাগে পড়েছে। যাতে একেবারে বয়ে না যাই, সেদিকে তাকিয়েই নাকি তাঁর এই সিদ্ধান্ত। সকলে বাড়ি-গাড়ি, মায় বৈঠকখানার তাকিয়াটি অবধি ভাগ করে নিলে, আমি কেবল ইয়া ব্বড় তাক ঘাড়ে নিয়ে তাকধিনাধিন নাচতে নাচতে বাড়ির পথ ধরলাম। কিন্তু বাড়ির দরজা অবধিই পৌঁছনো গেল। তাকের দিকে একঝলক তাকিয়ে, ওই দরজা থেকেই মা আমাকে দরজা দেখিয়ে দিলে। ভদ্রলোকের সঙ্গে তবু এককথা চলে, ভদ্রমহিলার কাছে নো ট্যাঁ-ফোঁ! সাফ কথা, ধুলোটুলো ঝেড়ে সাফসুতরো না করলে, ওই তাকের এবাড়িতে প্রবেশ নিষেধ, এবং সেইসঙ্গে আমার অর্থাৎ তাকের মালিকেরও। অগত্যা একহাতে ন্যাকড়া, একহাতে ঝুলঝাড়া আর অন্যহাতে কলিন স্প্রে নিয়ে মলিন মুখে তাকের যাবতীয় মলিনতা দূর করতে নেমেছি। বাপরে বাপ! কী ঝুল! আর সেই ঝুলে ঝুলে থাকবার জন্য মাকড়সাদের মধ্যে যেন ঝুলোঝুলি পড়ে গেছে। মাকড়সা, মাকড়সার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতবৌ এবং তাদের ছেলেমেয়েরা মিলে সে এক হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার। ঝুলঝাড়াটা বাগিয়ে ধরে যেই না ঝুল ঝাড়তে গেছি, ওই অত্ত মাকড়সা তাদের আট পায়ে লেফট-রাইট করে তেড়ে এসেছে! কী ব্যাপার? না তারা 'ঊর্ণনাভ উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি।' তাদের দাবি মানতে হবে, নইলে তাকের দাবি ছাড়তে হবে। কী দাবি? মোস্ট সিনিয়র মাকড়সা এগিয়ে এসে ম্যাকম্যাকিয়ে বললে, "উচ্ছেদ চলবে না। আর যদি একান্তই উচ্ছেদ করতে হয়, তবে মাকড়সাদের পুনর্বাসন দিতে হবে আর সেটাও মাকড়দার কাছাকাছিই দিতে হবে।" যেই না বলা, অমনি সবকটা মিলে "চলছে না, চলবে না," "দিতে হবে, দিতে হবে" ইত্যাদি বলে পোঁ ধরেছে। সে কী শব্দকল্পদ্রুম, বাপরে বাপ! কিন্তু আমিও অত সহজে ছাড়বার পাত্র নই। বললাম, " তা বাপু, তোমরাই যে এ অঞ্চলের আদিবাসী, তার প্রমাণ কই? বলি, কদ্দিন হল এখানে আছ, অ্যাঁ?" মোস্ট সিনিয়র মাকড়সা একটু ভেবে বলল, "তা আছি অনেকদিন, তবে ঠিক আদিবাসী আমাদের বলা চলে না। আগে এখানে কতগুলো টিকটিকি থাকত। তারপর যেই না বিদ্যেবাবুর রামছাগলটা এসে সব টিকটিকি খেয়ে ফেলেছে, ব্যস! আমরাও এসে ঘাঁটি গেড়েছি।" বলেই খ্যাঁ খ্যাঁ, খৌঁ খৌঁ, খৌঁয়া খৌঁয়া করে তার কী হাসি! আর সেই হাসি শুনেই সব ব্যাটাচ্ছেলে মাকড়সা একসাথে হাসতে লেগেছে। কেবলই হাসে, গড়াগড়ি দেয় আর বলে, "এই গেল গেল, পেট ফেটে গেল!" এসব দেখেশুনে আমার বেজায় রাগ হল। ভাবলুম মাকড়সারা বুঝি আমায় নিয়ে মশকরা কচ্চে। তাই চোখ লাল লাল আর গোল্লা গোল্লা করে কষে ধমক দিলাম, "অ্যায়ো, মাকড়ামি করতা হ্যায়? হম কৌন হ্যায়, জানতা নেহি? অভি অভি তাক ছোড়কে নিকালো, নেহি তো হমারা অভিভাবককো বুলায়েগা, তব মজা টের পায়েগা।" দেখলাম ওষুধ ধরেছে। সিনিয়র মাকড়সা মিটমিট করে আমার দিকে চেয়ে বলল, "বাপু হে, বলি অত হ্যাঙ্গামে কাজ কি? তার চেয়ে মিটমাট করে নিলেই হয়।" বলামাত্র বাকিগুলোও কোরাস ধরল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, নিলেই হয়, নিলেই হয়।" -হ্যাঁ খোকা, ওই গানটা শুনেছ তো? আরে, কোনটা কী হে, ওই গানটা! আরে ওইটে... শোনোনি? ওরে, ও মাকু, গা তো বাবা, গেয়ে শোনা... একটা ছোকরা গোছের মাকড়সা, বোধহয় মাকড়সাদের যাত্রাপালায় সখী সাজে, খুব করুণ গলায় গান ধরল: "স্পাইডারম্যান,স্পাইডারম্যান ফ্রেন্ডলি নেবারহুড, স্পাইডারম্যান।" ওই দুকলিই জানে। সেটাই একবার গাইল, দু'বার গাইল, পাঁচবার দশবার গাইল। তা, আমার গানটা মন্দ লাগেনি, কিন্তু মানেটা বুঝি বুঝি করেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। সেটা মুখে বলতেই, সিনিয়র মাকড়সা মাথা নেড়ে বলল, "হুঁ, মানেটা খুব শক্ত। সবাই ধরতে পারেনা। এর মানে হল গিয়ে: মাকড়-মানুষ ভাইভাই, এক ঠাঁই, এক ঠাঁই।" তার কথা শেষ হতেই আবার সবাই মিলে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলে, "এক ঠাঁই, এক ঠাঁই।" তা বলছিলুম কী, প্রস্তাবটা আমারও খুব একটা যে খারাপ লেগেছে, তা নয়! আমি ততক্ষণ একটু ভেবে নিই, আর... আর আপনাদের কি আজ বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়, অফিস এবং আদালত, নবান্ন ও পলান্ন সব ছুটি নাকি মোয়াই, অ্যাঁ? যান, এসব আজেবাজে কথায় কান না দিয়ে নিজের কাজে মন এবং নিজের চরকায় তেল দিনগে! যান যান!
Dr Samya Dutta
জ্যেষ্ঠ ডিউক কহিলেন, "হে মেলাংকলিক মদনা! তুমি কহিলে যে, কলিকালে এক নাটুকে নটবরলাল ছোকরার আবির্ভাব ঘটিবে। সেই ছোকরা আপন ড্রামাবাজির ড্রামটি কিরূপে পেটাইবে এবং আপনার রঙ্গিলা রঙ্গের দ্বারা পৃথিবীর এই রঙ্গশালাটিকে কী প্রকারে রঙ্গিন করিবে, তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। হে পুঙ্গিপুঙ্গব, তুমি এই আখ্যান সবিস্তারে বর্ণনা কর।" জ্যাক কহিল, "ইরিত্তারা! কী ভাসা নামিয়েচো কাকা! পুরো বঙ্কিমের বাপ বিদ্যেসাগর তো! সেভেনে সমোস্কিত ছিল, না? অ্যাঁ! ছিল বলচো? তবে একপিস ডায়ালগ যা ঝেড়েছ না, উফফ! মাখন কাকা, পুরো মাখন! 'পৃথিবীর রঙ্গশালা!' হেব্বি হাইট হয়েচে। All the world's a stage, and all the men and women merely players... His acts being seven ages... তা, এ ছোঁড়ার সাতকাহন আর তোমায় কী বলব কাকা! তবু শুনতে যখন চাইচ...অ্যাজ ইউ লাইক ইট! তো কেসটা হচ্চে, এ মালের ন্যাংটোবেলায়, মানে তকনো প্যান্টে ইন করেনি আর কি- ইনফ্যান্টই বলতে পারো... তকনো মিউ মিউ করে Mewling আর পুক পুক করে puking in the nurse's arms... নচ্ছারটার নাটুকেপনার তকন থেকেই লিমিট নেইকো। খেতে নাটক, ঘুমুতে নাটক, বোসতে তকনো শেকেনিকো- কিন্তু শিকলে বস বোসতেও নাটক কত্ত নিঘ্ঘাত! কিন্তু কেসটা কী বলো তো... ওসব চ্যাংড়ামি এক সাইডে, আর নাটকের এস্টেজে উঠে নটরাজ হওয়া আরেক সাইডে। মহানায়ক কি আর গাছে ফলে কাকা! বলো? সে ছিল আমাদের যৈবনে গুরু উত্তমকুমার, উফফ! কী অ্যাক্টো! টোটাল গায়ে কাঁটা, চোখে জল, হলে সিটি... কিন্তু এসব নভিস নাবালককে নাটকে নাবালে কী কেলো হয়, শোনো..." এস্থলে এন্ট্রি নেওয়া একান্ত এসেন্সিয়াল। ফরেস্ট অফ আর্ডেনের আপদটি ডিউকডাডুর মাথায় যত খুশি খাজা গপ্পের কাঁঠাল ভাঙুক, এই যে আত্মকথনের জন্য আমার পরাণটা আটুপাটু করছে, তার কারণ হ্যাজ। ব্যাপারটা হল গে, বাজারে আমার ফিচেল বদনামটা বড্ড বেশি ফেটেছে। তা'তে যে আমি অখুশি হয়েছি, এমনটা অবিশ্যি নয়। তবে, ওই যে, কে যেন কবে যেন কার যেন কানেকানে কুমন্তর দিয়েছিলেন, রসিক হতে হলে আগে রসের হাঁড়িটা নিজের মাথায় ভাঙো! অর্থাৎ ব্যঙ্গের বাণখানি আগে নিজের দিকে বাগিয়ে ধর। আমার সেন্স অফ হিউমার আগে আমাকেই হিট করুক, তার ধাক্কায় যদি সেন্সলেস হয়ে না পড়ি, তবেই ইস জাঁহাকো লেকে জাঁকিয়ে খিল্লি করনা জায়েজ হ্যায়! তো, হিউমারের হিগস-বোসন কণাটি হল এই- ফিচলেমির ফাতনাটি আগে আপন অন্তঃস্থলে ডোবাতে হবে। অলরাইট, ভেরি গুড! ও ভয়ে কম্পিত নয় বীরের হৃদয়, ইত্যাদি! তা, যেমনটা জ্যাক বলছিল আর কি! বড় হয়ে আমি যে গিরীশ ঘোষ দ্যা সেকেন্ড বা ওই গোছেরই কিছু একটা হব, তা আমার কোষ্ঠীতেই লেখা ছিল। কিন্তু, মাঝখান থেকে কী, কেন, কিভাবে ঘটে গিয়ে কেসটা কেঁচিয়ে দিল- সেকথা যদি জানতে চান, একটু অতীতে ফিরতে হবে। বেশি নয়, এই বিশ-বাইশ বছর। আপত্তি নেই তো? তাহলে আসুন, ষষ্ঠী তিথির ষষ্ঠীপুজোর ফাঁকে সেই গল্পটাই চট করে সালটে দিই: প্রতিটা মফস্বলের প্রতিটা পাড়ার প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ মেনে আমাদের পাড়াতেও পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ হয় শ্যামা-শাপমোচন, নাহয় চিত্রাঙ্গদা-চন্ডালিকার চর্বিতচর্বন হত। মূল স্টার ইয়ার কলাকার, অর্থাৎ আমাদের মায়েরা তাঁদের ছানাপোনাদের, অর্থাৎ আমাদের ট্যাঁকে করে নিয়ে যেতেন রিহার্সালে। তা, সে আমাদের শৈশবের কিরকম শুরুওয়াতকাল, সেটা বোঝাতে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। মনে করুন, বৈশাখের বিজবিজে গরমে বিব্রত কোনো বালক সখেদে বলল, "খুব গওম কচ্চে!" তৎক্ষণাৎ বাকিরা সমস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করত, "ওমা! তুই এখনো প্যান্টু পরে আছিস কেন?" এবার প্রথম বালকটিও 'সত্যিই তো! জগৎ গরমে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, তোমার কি বসনাবৃত হবার বিলাসিতা সাজে?' ইত্যাদি ভেবে দেন অ্যান্ড দেয়ার দিগম্বর হয়ে যেত। তারপর প্রশস্ত ছাদের একদিকে চলত নাটকের মহড়া, অন্যদিকে নগ্নসুন্দর মহাকালদের ধরাধরি-ব্যাটবল-লুকোচুরি খেলা। তবে, প্রতিভা আর ল্যাজ কখনও চাপা থাকে না। থাকলে ঠিক ঠেলে বেরোবেই। আর আমরা ছিলাম, যাকে বলে 'জন্ম হইতেই নাটকের জন্য বলিপ্রদত্ত।' সুতরাং, স্রেফ ধরাধরি খেলায় আমাদের ধরে রাখা গেল না। 'পীতবসন পরা সন্ন্যাসী' আনন্দর পেছনে পায়চারি করার জন্য একদল চ্যালার প্রয়োজন পড়েছিল। নাটকের প্রধান উদ্যোক্তা স্থির করলেন, এই চপলমতি চিংড়িদের দিয়েই চ্যালার কাজ করাবেন। আমাদের আর পায় কে! মা-মাসিরা মাসাধিক কাল মহড়ায় মত্ত, সেই অজুহাতে সন্ধ্যেবেলার পড়াশোনাও মুলতুবি আছে, আমরা তা'তেই চোদ্দআনা খুশি ছিলাম। ফাউ হিসেবে যদি স্টেজে ওঠার সুযোগটুকুও পাওয়া যায়, বাকি দু'আনাও আপসে এসে যায়। মারহাব্বা! দেখতে দেখতে এসে পড়ল সেই শিহরণ জাগানো সন্ধ্যা। আনন্দর সঙ্গে ম্যাচিং কস্টিউমে সাজুগুজু করে আমরা কচিরাও মনোরম রূপ ধরলাম। তবে, ড্রেসিংরুমের আয়নার নিজেকে দেখে কিন্তু আমি মোটেও প্রীত হইনি। তখনও টেনিদার সঙ্গে আমার টরেটক্কা হয়নি, নইলে হাবুল সেনের কথা মনে পড়ে আতঙ্কিতই হতাম। "তরে কেমন লাগতে আসে? তুই যেন বজ্রবাঁটুল, প্যান্টুল পইরা চালকুমড়া সাজছস!" অবশ্য প্যান্টুল আমি পরিনি, আমাকে পরানো হয়েছে ধুতি। সেটা আবার বেখাপ্পা রকমের বড়। বোধহয় আমাকে দিয়ে স্টেজে এক রাউন্ড ঝাঁট দিইয়ে নেবার পরিকল্পনা ছিল। ড্রেসারকাকুর কাছে একবার মৃদু প্রতিবাদ করতে গেছিলাম। তিনি তখন আনন্দকে সাজাবার আনন্দে মশগুল, আমার চাঁদিতে চাঁটি মেরে ভাগিয়ে দিলেন। কী আর করা! দীর্ঘশ্বাস দমন করে ফিরে এলাম। হায় মূঢ় মানব! ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ নট, যে কিনা মঞ্চাভিনয়ের মোড়ই ঘুরিয়ে দেবে, তার আজ পুণ্য আবির্ভাব। একটা ইতিহাসের সূচনা হতে যাচ্ছে, আর তুমি কিনা... যাকগে! 'চন্ডালিকা'র গল্প আপনারা সবাই জানেন। নতুন করে বলা অনাবশ্যক, বিস্তর আজেবাজে সিনের পর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ক্ষণ। আনন্দ স্টেজের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত হেঁটে যাবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে 'বুদ্ধং শরণং' আর হাতজোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে তাকে ফলো করবে তার ফলোয়ারের দল অর্থাৎ আমরা। এই দলটিকে সাজানো হয়েছে সাইজের ডিক্রিজিং অর্ডারে। অর্ডার অনুযায়ী আমার স্থান হয়েছে পেনাল্টিমেট। এই নিয়েও আমার একটু ক্ষোভ ছিল- তা সেকথা থাক। স্টেজের একপাশ দিয়ে এন্ট্রি নিয়েই একবার চট করে মুখ তুলে ওপরের দিকে দেখে নিলাম। স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হবে বলে সব রেডি, 'ওরে কে আছিস! আরো ফুল নিয়ে আয়' ইত্যাদি হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে, সুরাসুর শঙ্খধ্বনি করবেন বলে শাঁখ থাবড়ে নিচ্ছেন, এমন সময়- কেরেকটেকটাকট ঘ্যাচাং! না, একবার ভেবে দেখুন, কত খুচরো গাড্ডায় পড়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে যায়! কত তুচ্ছ হিড়িকে হিস্ট্রির পাতাজুড়ে হিস্টিরিয়া দেখা দেয়, সেকথাই বলছিলাম, আর কি! হলটা কী, আমার ঠিক পিছনে যে মহাপ্রভু ছিলেন, তিনিই ঝাঁকের সবচেয়ে কচি কই। দু'পায়ে হাঁটার বিদ্যেটা তিনি অতি অল্পকাল আগেই আয়ত্ত করেছেন। তাই, যাতে অবশিষ্ট গ্যাং-এর সাথে গতি মেলাতে অসুবিধা না হয়, তাঁকে শেখানো হয়েছিল একটু বড় বড় পদক্ষেপে মার্চ করার মত করে হাঁটতে। এমনিতেই আমার ধুতির পঞ্চাশ শতাংশ মাটিতে লুটোচ্ছিল, মার্চপাস্ট করার মারকাটারি উত্তেজনায় মহাপ্রভু আমার ধুতিটিকে দিলেন মাড়িয়ে। আগেই বলেছি, ধুতিটার যা সাইজ তা'তে আমার মত আরেকজনকে ঢুকিয়ে নেওয়া যেত। আচমকা এই প্রবল পেছুটান এসে পড়ায়, জাড্যের সূত্র মেনে ধুতি জমে রইল পেছনে, আমি বীরদর্পে সামনে এগিয়ে গেলাম। ব্যাপারটা গোড়ায় ধরতে পারিনি, দর্শকদের মধ্যে 'হা হা' হাসির রোল উঠতে দেখে যখন খেয়াল করলাম, ততক্ষণে আমার রোলের দফারফা হয়ে গেছে! আনন্দসহ বাকি সন্ন্যাসীরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ন যযৌ ন তস্থৌ! স্টেজে টাঙানো রবীন্দ্রনাথের ছবিটার দিকে আড়চোখে চেয়ে দেখি, বেচারি রবি কবি তাঁর নাটকের এহেন কমিক পরিণতিতে লজ্জায় প্রায় চোখ বুজে ফেলেছেন। দেখুন, আগেই বলেছি, আমি হলাম বর্ন অ্যাক্টর। তা, বর্ন অ্যাক্টররা কোনো বিপর্যয়েই বিবর্ণ হন না। আমিও হলাম না। পেছনের পয়মালটিকে প্যাঁদানোর সুযোগ পরেও পাওয়া যাবে। আপাতত উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে, মাটিতে পড়ে থাকা ধুতিটাকে একহাতে তুলে অন্য হাতটা সেই নমস্কারের ভঙ্গিতেই স্টেডি রেখে প্রথমে দর্শকের দিকে তাকিয়ে একটা কোলগেট হাসি দিলাম। তারপর এক দৌড়ে তাদের ওভারটেক করে, আনন্দর ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাইজাম্প মেরে উইংসের ওপারে উধাও হলাম। সুকুমারমতি পাঠক এই গল্প শুনে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করতেই পারেন। এমনকি রাবীন্দ্রিক ডিসকোর্স নিয়ে যাঁরা নিত্য ডিসকাস থ্রো করছেন, চন্ডালিকায় আচমকা ন্যুড আর্ট ঢুকে পড়লে তাঁদেরও ভিরমি খাওয়ারই কথা। তবে কিনা কোষ্ঠীতে লেখা ছিল আমি প্রথমে নট্য কোম্পানির নটসূর্য হব, তারপর চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত হয়ে নাগাড়ে বিশ বচ্ছর গলা কাঁপিয়ে ডায়ালগ ঝাড়ব, "মাহাআআ! আআআমি কিন্তু চুউউউরি করিইইনি!" আর তা'তেই বাজার কাঁপবে। তারপর কলিকাল কালো হলে সত্যজিৎ যখন সত্যচ্যুত হয়ে 'সৃ' হবেন, তখন সেই একই কম্বুকন্ঠে বলব, "আমিই ইন্ডাস্ট্রি!" তা, সেসব কিছুই আর হল না! মেকুরে হুড়ুম খাইয়া হক্কৈর কইরা দিল!
শমীক
এ এক আজব দেশে এসে পড়লাম। জানিনা স্বপ্নে না কল্পনায়। এখানে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত। তবে সেটা মার্ক্সের থেকে বেশী মনে হচ্ছে লেনানের imagine গানের মত। হ্যাঁ, দেশও নেই, ধর্মও নেই। তবে একটা প্রশাসন আছে। তার স্বরূপটা বুঝে উঠতে আরো কয়েকদিন লাগবে। খাবার দাবার co-oprative -এ পাওয়া যাচ্ছে। আমি সে অর্থে একটা কমিউনেই আছি। কেননা সেখানে অনেকেই আছে। বিশেষতঃ মার্থা আর মারুমের সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। ওরা বোধহয় পরস্পরকে ভালবাসে। তা যাই হোক। আমাকে বেশ ভালবাসে। আমি তো এখানে দেখছি, বেশ বিখ্যাত। আমার অনুগত একটা দলের মত এরা আমায় ঘিরে রেখেছে। কিন্তু আমার আবার মার্ক্সীয় শিক্ষা উথলে উঠছে। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার পাচ্ছি। কিন্তু আমার সাধ্য অনুযায়ী কাজটা যে কি সেটাই বুঝতে পারছি না। একটা হলুদ জামা পরা মেয়ে দেখছি। বেশ চুটকুলি লাগছে। একটু ইন্টু মিন্টু হলে মন্দ হয়না। ঠারকিবাজী ছাড়া আমার তো কোনো কাজই দেখছি না। কাজ এসেছে। কিন্তু সেটা এদের so called norms – এর বিপরীত। আমার গলায় একটা চেন আছে। তাতে শিবের symbolic একটা লকেট। এটা নিয়ে এরা সেদিন এক তাত্ত্বিক আলোচনায় বসে গেল। আমাকে বেশী cross করায় আমিও stonch হয়ে গেলাম। কিছুটা জলমগ্ন থাকার কারণে শিব নিয়ে একটা প্রায় monograph নামিয়ে দিলাম (একটা কথা অনস্বীকার্য, জল ও বাতাস এখানে যে level -এ পাওয়া যায়, তা তুলনাহীন)। কমিউনের লোকে case -টা খেয়ে গেল। ফলে পরদিন থেকে program হল একটা শিবমন্দির (ঠিক মন্দির নয়, archive type -এর কিছু) তৈরী করতে হবে। ব্যাস, আর দেখে কে ? আমি তো রাস্তায় মিছিলও নামিয়ে ফেললাম। মিছিল এরা দেখেনি। প্রশাসন থেকে ডাক এল। সিরিন বলে একজন আমাকে আটক করে অনেকক্ষণ জেরা করল। বললঃ “আপনি কি ধর্ম ফিরিয়ে আনতে চাইছেন নাকি ?” আমি বললামঃ “না, ঠিক সেভাবে ভাবিনি।“ সিরিন বলেঃ “একজন legendary myth -এর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন শুনলাম।“ আমি একটু ঝেঁকে গেলাম। তার মানে এরা শিবকে ইতিহাস বলে মনে করে। বললামঃ “So what! legendary should be portrayed as inspiration.“ সিরিন বললোঃ “দেখুন, আমরা কোনো মতের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করি না। কিন্তু আপনার এই প্রস্তাবনায় আমরা কোনো সামাজিক সাহায্য করব না। যদি আপনি ব্যক্তিগত surplus থেকে সাহায্য পান, আমরা বাধা দেব না।“ ভয়ে সিরিনকে আর জিজ্ঞাসা করলাম না, ‘ব্যক্তিগত surplus’ টা কি ? তবে মার্থাকে রাতে বললাম। তখন রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। মার্থা আর আমি পাশাপাশি শুয়ে সেদিনের গতি অগতির হিসাব করছিলাম রোজকার মত। মার্থাকে সব বলছিলাম সিরিনের কথা। বললঃ “তুমি কি সত্যিই এটা চাও ? ভিতর থেকে চাও ?” মার্থা যেন একটু বেশী সরে আসল। আমিও আরও একটু ঘন হয়ে বললামঃ “তুমি কি জাননা, আমি কি চাই ?” (ঠারকি তো, তাই শেষটা একটু sexy ভাবে হিস হিস করে বললাম।) মার্থা case টা খেয়ে গেল। প্রায় গায়ের উপর এসে বললঃ “We will fight for it and I know we will win.“ (শেষটা ও ও আমার মত হিস হিস করে বলল।) আর কি সয়? আমি মার্থাকে জড়িয়ে ধরলাম। “You are my comrade!“ মার্থা হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরল। তারপর আস্তে আস্তে আমার কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে, চুলে হাত বুলাতে বুলাতে চুমু খেতে লাগল। আমি মার্থাকে পাগলের মত জড়িয়ে ধরলাম। বারবার দ্বিধা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, মারুমের কথা জিজ্ঞাসা করে নিই। তবে ওই চরম মুহূর্তে সেটা অবান্তর বলে মনে হল। মনে হল, reciprocation is (or, may be) legitimate. আমি আর মার্থা পাগলের মত একে অপরকে চুমু খেতে শুরু করলাম। একে অপরের শরীর জানতে শুরু করলাম। আর একে অপরের শরীরে মিশে গেলাম। মাঝে আর একবার মারুমের কথা মনে এসেছিল। কিন্তু মার্থা যে আবাগে, যে আন্তরিকতায় আমাকে গ্রহণ করল, তাতে আমি ডুবে গেলাম, ভেসে গেলাম (spontaneity কে তো সব থেকে বেশী point দিতেই হয়)। পরদিন line of action! ওই যে সিরিন বলেছে ‘ব্যক্তিগত surplus‘, ওটা আমি clarify করলাম। Extra labour দিয়ে কেউ earn করতে পারে, সেটা তার স্বাধীন। প্রশাসনের under -এ নয়। প্রশাসন তাতে দাঁত ফোটাতে পারবে না। ব্যাস, ওটাই হল আমার trump card. শ্লোগানে, মিছিলে, আবেদনে ফাটিয়ে দিলাম। আমার পুরো কমিউন আমাকে support করল। আর support করল অদ্ভূত ভাবে হাজার হাজার মানুষ। যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখনই খবর এল মূর্তি স্থাপনের জন্য যথেষ্ট রসদ হাজির। এমনকি মূর্তির পিছনের দেওয়াল করার রসদও চলে এসেছে। এরপরটা দেখার মত। সিরিনের মত আমারও ভয় করল। হাজারে হাজারে উন্মত্ত জনতা নাচছে। ধর্ম কি ফিরে এল নাকি ? তবে একটা আশ্চর্য ব্যাপার, কেউ ফুল মালা দিয়ে পুজো করছে না। যেন একটা পুরোনো relics খুঁজে পেয়েছে। আমাদের পোস্টার, ব্যানারে লেখা পুরাণের গল্প গুলো গোগ্রাসে গিলছে। এই উন্মাদনাটা নতুন কিছু উপলব্ধির, যেটা ওদের জনজীবনে নেই। মনে হয়, এরা মহাভারতটা এখনো খুঁজে পায়নি। যা হোক, আমি কি আর এসব বোঝার জায়গায় ছিলাম ? বাড়ী (বা, কমিউন) ফিরলাম। গোটা শহর জয়ের আনন্দে উত্তাল। আমার গোটা কমিউনও তাই। ফিরে দেখি, সেই হলুদ জামা পরা মেয়েটা। ফিরতেই জড়িয়ে ধরল। আমি আর chance নিলাম না। একটু আদরই করে ফেললাম। But naturally I was deadly waiting for martha. মার্থা ঢুকলো। আমরা শুধু চোখে চোখে পরস্পরের দিকে তাকালাম। তারপর বাকি ছিল, বিষ্ফোরণ। পাগলের মত বারে বারে জয়ের জয়সূচক চুমু এঁকে দিলাম একে অপরের চোখে। ও ঢুকতেই আমি এমন ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ওর sunglass ছিটকে গিয়ে ভেঙ্গে গেল। আমি জানতাম, ওটা surplus earn ছিল। কিন্তু তখন তো আমরা বন্য। চুমায় চুমায় ভরিয়ে দিলাম ওর সবকিছু। ও পাগলের মত আমায় জড়িয়ে শুধু বলতে থাকলঃ “আমরা জিতেছি! We have won! We have won!” আমি মার্থাতে সমর্পিত হলাম। ক্রিয়ার প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় হাই হাই করে হাঁপাচ্ছি, আমার হৃদপিন্ডে চার ডবল ধুকপুকুনি বাড়িয়ে মারুম ঢুকল ঘরে। “কি ?” – মারুম বলল। আমি বললামঃ “কি !” তারপর যা হয়, আমরা বাগবাজার গঙ্গার ধারে। বাতাস টানছি। ধুম নেশা হয়ে গেল। মারুম বললঃ “জলে নামবে ?” আমি – “চল।“ ঘাটে দু তিনবার আছাড় খেয়ে জলে নামলাম। কি আনন্দ! Lovely! বলে বোঝানো যাবেনা। দু’ চারবার সাঁতার কাটলাম ছোটো দূরত্বে। আমি তো বেশী দূর সাঁতার জানিনা। মারুম এগিয়ে এল কাছে। বললঃ “সাবান মাখবে ?” মাখলাম। তারপর মারুম সাবান মাখাল। আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। মারুম আরও ঘনিষ্ঠ হল। শেষমেষ জড়িয়ে ধরল। আমি বিরক্তিতে ছাড়াতে চাইলাম। কিন্তু দেখলাম, মারুমের শরীর নরম হয়ে আসছে। মারুম আমায় আরো জড়িয়ে ধরল। দেখলাম শরীরে শিহরণ জাগছে। ঘাবড়ে গেলাম। আমি কি শালা gay হয়ে গেলাম নাকি ? একি, মারুমের শরীর নরম। মারুম আমায় চেপে ধরেছে। ওর বুক ফুলে গেছে। নরম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি। মারুম আমাকে চুমু খাচ্ছে। আমি যতই নেশা করে থাকি, দেখছি ওর শরীরে স্তন জেগে উঠেছে। ভয়ে আমার গা হাত পা কাঁটা দিয়ে উঠল। আরে, এরা কি ভূত নাকি ? তবু আমি sexually provoked হয়ে গেলাম। এক অদ্ভূত কৌতুহলে আমি সেগুলো অনুভব করতে শুরু করলাম। তারপর আরও গভীরে যাত্রা করে দেখলাম ও সত্যিই মেয়ে হয়ে গিয়েছে। ওই জলের মধ্যে ওর শরীর আমার কাছে জল হয়ে গেল। কি স্বচ্ছন্দে আমি মাছের মত বিচরণ করতে লাগলাম সেই শরীরে। একটা ভয়ংকর ঘোরের মধ্যে আমি কমিউনে ফিরে এলাম। ফিরে ইস্তক যেন কাউকে মুখ দেখাতে পারছি না। কি হল, সেটাও বোধশক্তির বাইরে। মারুমের সাথে জল থেকে ওঠার পর কোনো কথা বলিনি। সেটা মূলতঃ লজ্জায়। তারপর আরও লজ্জা, ফিরেই মার্থার মুখোমুখি। মাথা নিচু করে আমার বাঙ্কে ঢুকে পড়লাম। সন্ধ্যা অবধি কেউ ডাকেনি। dinner - এ মার্থা ডাকল। আমার কি লজ্জা! উঁ, আঁ করে বললামঃ “আমি খাবনা।“ এক ঘন্টা পরে ওরা ফিরে এল। মার্থা আবার ডাকল। বললঃ “তুমি জানতো কাল কি ?” এবার প্রথম আমার মনে পড়ল, হ্যাঁ, কাল আমার চলে যাবার দিন। এই জগৎ ছেড়ে আমার চলে যাবার দিন। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। তারপর ভয়ে আবার শুতে যাচ্ছিলাম। মার্থা বললঃ “এসো, কথা আছে।“ ওর গলায় কেমন একটা command ছিল। একজন অপরাধীর মত দাঁড়ালাম মার্থা আর মারুমের মাঝখানে। Over smart হওয়ার ঢঙ করে বললামঃ “আমি কাল চলে যাব। তোমরা ভাল থেকো। পরস্পরকে ভালবেসো। মার্থাও শুনেছি যাবে। তবে কাছেই। আমি এত দূরে যাব, আর আসা যাবেনা।“ মারুমকে বললামঃ “তোমাদের খুব miss করব। Sorry, আমি কিছু ভুল করেছি। কিন্তু আমি তো আর থাকব না। তাই আর ভুল হবেনা।“ এ বাবা, দেখছি গোটা কমিউন কেমন আমার দিকে জ্বলজ্বল চোখ করে এগিয়ে আসছে। আমিতো ভাবলাম এই শেষ। ক্যালাবে নাকি ? ম্রিয়মাণ হয়ে বললামঃ “Sorry!“ ঠিক সেই মুহূর্তে মার্থা আমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল। আমি জানি এটাই শেষ। হয়ত এভাবেই ওরা মারে। হয়ত কোনো injection! মার্থা আর এক হাতে মারুমকেও জড়িয়ে ধরল। খুব মিষ্টি স্বরে বললঃ “Darling, this world is not binary! আমরা তিনজনেই তিনজনকে ভীষণ ভালবাসি। এখানে নারী পুরুষ ভেদ নেই। যে কেউ যখন ইচ্ছে নারী বা পুরুষ হতে পারে। যে যার choice - এ নারী বা পুরুষ হয়ে থাকে। তুমি এত ভয় পেওনা। আবার বলছি, আমরা তিনজনেই তিনজনকে ভালবাসি। That’s all! There is no possession!” ( Lennon - এর গানটার কথা আবার মনে পড়ল।) মারুম তো আমার প্রতিটা সংগ্রামে আমার পাশেই ছিল। যদিও আমি আর মার্থাই command দিচ্ছিলাম। Lead করছিলাম। কখনই ও তার মাঝখানে আসেনি। মনে পড়ল, শিব তো অর্ধনারীশ্বর। এজন্যই কি এরা শিব নিয়ে এতটা excited ছিল? যা হোক, মার্থা বললঃ “নারী পুরুষ নেই। তুমি আমাদের দুজনকেই ভালবাসতে পার। আবার আমরা একে অপরকে ভালবাসি। তুমি ঠিক বুঝবে না হয়ত।“ আমি বুঝিনি। হয়ত ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। হয়ত ভয়ে কল্পনার সে জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। এখন ভাবি, কিসের ভয় ? মার্থা আর মারুম বেঁচে থাক ওদের নিয়মে। আমিই হয়ত মেনে নিতে পারিনি। তাই এই ঢ্যামনা জগতে পড়ে আছি। এই ভাই, ছুঁয়োনা আমাকে, একটু measure কর।
শমীক
অনেক শূন্যতা ঘেঁটে অবশেষে শান্তি পাব বলে লুকিয়েছি ভিড়ের আড়ালে শূন্য হাতে নয় যত্নে ঝুলিতে ভরে কাল কিছুটা শিশুর ধৃষ্টতা কিছুটা আমার কঙ্কাল। কিছুটা শিশির ধোয়া সন্তান সন্তানের বড় কাছাকাছি জেগেছিল রাত্রি এক ঘোর অবিশ্বাসী। কতটা বেদনা তার নেবে দিবানিশি যে পরাজয় বালিশে মাথা রেখে কাঁদে, জ্বলে, পোড়ে তবু দগ্ধ হয়না অবিরাম দিনলিপি লেখে। অহোরাত্র তাম্র পাত্র ভরে যতই ঢেলেছি থালায় ঘন বিষ ব্যঙ্গের সুরে দুয়ার বলেছে আজ থাক, 'আজ'-কে চলে যেতে দিস। এসব শূন্যতা গেলে রাতের কোঠরে ভোর বেলা মাঠে নেমে যাই যেখানে বনের দেখা শুরু সেখানে গাছ পথ হাঁটি পায় কিছুটা তোমাকে চেনাতে আমি ভীরু। তোমারই চোখের নিচে চোখ তোমার এই ভুরুর নিচে বালি আমাকে কিছু শব্দ দাও আজ সরবে শূন্যতা ঢেকে ফেলি। লোকের ভিড়ে হারিয়ে গিয়ে লোক গানের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে গান শতক থেকে অর্ধ গেল চুরি আর বাকিটা পূর্ণ জাগুক প্রাণ। ০২/১২/২০১৬ (পঞ্চাশ পূরণে)