Mahan Human

অলস চিঠি

কখনো কখনো মস্তিস্ক ১০ / ১০ ঘরে অলস হয়ে বসে থাকে , বিছানার এক কোন থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না, তখন তোমার মত মানুষগুলো যারা ইট ভাটায় কাজ করছে , যাদের পিঠ ভিজে জল হয়ে গেছে ,কোমর থেকে জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে তাদের কথা ভাবি আর একটু স্বস্তি পায় । আমি তো এইরকম পরিবারের সদস্য হলে ,আমাকেও গায়ে গতরে নিংড়ে নিতো ইট ভাঁটার মালিকেরা । ৬,৭,৮ বা তার চেয়েও ছোটো ছেলেরা বিড়ি কানে গুঁজে নিয়ে ইটের পাহাড় বয়ে নিয়ে যায় ভাটি থেকে , তাদের চুলগুলো রুক্ষ সুক্ষ , চোখ মুখ গুলো যেন কাঁচা খিস্তি শুনে শুনে অভ্যস্ত , আমি প্রতিদিন আমার আসা যাওয়ার পথে দেখি ,দুর্ভাগ্য ক্রমে গত কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি ,ওদেরকে নিয়ে । যদিও স্বপ্নটা বেশ সুন্দর ছিল ,আমি নদীর ধারে বসে বসে ইট গুনতাম ,ওটাই আমার কাজ ছিল , নদীর ধারে গোটা ছয়েক শিমুল গাছ ছিল , শিমুল গাছ গুলো তে কোনো পাতা ছিল না, শিমুল গাছ গুলো যেন লাল লাল রঙে রাঙা ছিল । আমাদের চারপাশে যেসব পায়রার খোপ গুলো আছে ,বা প্রস্তুত হচ্ছে , ইটের গায়ে এইসব নাবালক ছেলে মেয়েদের ঘাম লেগে আছে , সেই কারণেই কি সুন্দর সুন্দর পায়রার খোপ গুলো দারুন দারুন রং দিয়ে রাঙানো থাকে ,যাতে আমরা দুর্গন্ধ ঘাম এর গন্ধ না পায় । কালিদাসের যেমন মতিভ্রম হয়েছিল , যে গাছের ডাল টা কাটবে সেই ডালটার উপরেই বসে ছিল, আমরাও কি সেইরকম করছি না , মুখে যতই শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে কথা বলি না কেন , আদতে ওই শিশু গুলো না থাকলে আমাদের স্বপ্নের আশিয়ানা বানানো হতো না । ভারত বর্ষে যত গুলো ইট ভাঁটা আছে তার প্রায় সব গুলোতেই নাবালক ছেলে মেয়েগুলো দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় কাজ করে , এবং যেসব নাবালিকা তারা প্রায় প্রত্যেকেই কোনো বা কোনো ভাবে শারীরিক ভাবে নির্যাতিতা , আমার স্বপ্নেও তারা এসেছিল । তাই হয়তো সকাল টা এত অলস । স্বপ্নের আর কি বা দোষ , ঘরে আয়না নেই তো , স্বপ্ন দিয়ে মাঝে মাঝে মুখ টা দেখে ফেলি ।

1032

12

শিবাংশু

আপনহারা, মাতোয়ারা

" ঘালিব ছুটি শরাব পর, অব ভী কভি কভি পীতা হুঁ রোজ-এ-অব্র, ও শব-এ-মহতাব মেঁ....।।" ইথাইল অ্যালকোহল নামে একটি তরল পদার্থ মানুষের সভ্যতার ব্যারোমিটার হয়ে রোয়াব দেখিয়ে বেড়ায় আদ্যিকাল থেকে। পক্ষে-বিপক্ষে, প্রেমে-অপ্রেমে, সোহাগে-ঘেন্নায়, তার মতো অ্যাটেনশন কখনও কোনও বস্তু পায়নি। এটা নিশ্চিত। কিন্তু কেন? ------------------------ শিব্রাম একবার বলেচিলেন নেশা করতে গেলে মদের নেশা কেন কোর্বো, বিশ্রী খেতে। তার চে রাবড়িমালাইয়ের নেশা অনেক ভালো। আমিও তাঁর সঙ্গে একমত। তবে রাবড়িমালাইয়ের নেশা করি জানলে ডাক্তার থেকে চিত্রগুপ্ত সবাই জীয়ন্তে ও মরণান্তে চাবুক মারবে। বরং পূর্বপুরুষদের মতো কিঞ্চিৎ সুরাপান করে বৈদিক মন্ত্র থেকে শুরু করে 'আমি স্বেচ্ছাচারী' যদি লিখে ফেলা যায়, তবে নরকবাসের সময় গায়ে দিতে চিত্রগুপ্ত একটা নতুন কম্বল স্যাংশনও করে দিতে পারেন। প্রশ্ন হচ্চে 'নেশা' নিয়ে তো মানুষ হাজার হাজার পাতা লিখে আসচে গত চার হাজার ধরে। চিরকালই অনেকে ভেবে সুখ পান, অনেক 'আধুনিক'মনস্ক মানুষও তো মদ্যপানবিরোধী হয়ে থাকেন। তবে কি 'আধুনিক' হতে গেলে মদ্যপান করতে হয় ? মডেলটা কী? ইয়ং বেঙ্গল না কলকাতার বাবু? কোহল রসায়ন দিয়ে মানুষের 'আধুনিকত্ব' কি যাচিয়ে নেওয়া যায়? প্রাগবৈদিক যুগ থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত যতো 'আধুনিক' মনস্ক মানুষ, অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্য মুনি থেকে রামমোহন রায় সব্বাই অল্পবিস্তর মদ্য পান করতেন। তার পর রামমোহনের উত্তরসূরি এবং রাণীমাতা বিক্টোরিয়ার ছানাপোনারা ব্যাপক কোলাহল করে কিছুদিন বাঙালির মদ্যপানের অভ্যেসে ছেদ ঘটিয়েছিলো। আবার সে এসেছে ফিরিয়া। গত বছর কুড়ি, যতো বাঙালি মধ্যবিত্তের বাড়ি গৃহপ্রবেশে যাই, মোটামুটি সবাই তাঁদের সেলার ও বার আগে দেখান। আর যাঁরা আগে থেকেই রসে-বশে আছেন, তাঁদের তো কথাই নাই। ব্যাপারটা শুধু সাহেবদের দেশে নয়, আমরা দেশে বসেও তা আকচার দেখি। ------------------------------ আমাদের গ্রামে তেলেঙ্গি পিয়ক্কড় বলে একটা পরিভাষা ছিলো। শহরের বিভিন্ন কারখানাগুলিতে টিপিন বয়ে নিয়ে যাওয়া অন্ধ্রপ্রদেশের অসংখ্য গ্রামীণ সন্তান সাইকেলে করে বাবুদের দুপুরের খাবার দফতর কারখানাতে পৌঁছে দিতো। সেই মানুষগুলি সন্ধে ছটার পর একেবারে মার্টার টু দি কজ। রাস্তাঘাট, নালানর্দমা, বাজারহাট যেকোনও জায়গায় তাদের পরম নিশ্চিন্তে নির্বিকল্প সমাধি নিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যেতো। আর আমি তো ট্রাইবাল এলাকার লোক। কোহলসংহিতায় ডুবে থাকা জনগণের সঙ্গে আজীবন মিলেমিশে থাকা আমাদের। চাইবাসা বা জাদুগোড়া, মুসাবনি বা মেঘাতুবুরুতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে জরুরি কাজ করতে আসার আগে আকণ্ঠ সুরাপান করে 'শক্তি' সঞ্চয় করে আসতো। এই সব জনতাকে কেউই কখনো 'আধুনিক' বলে গাল দেয়নি। ------------------------- নৈতিকতার সঙ্গে মদ্যপানকে জড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা ইংরেজ আমল থেকে আমাদের দেশে খুব প্রবল। আমাদের নৈতিকতার নানা স্ববিরোধের মধ্যে এটাও একটা উদাহরণ। প্রশ্নটি রয়েছে সংযম ও পরিমিতিবোধের মধ্যে। সারাদিন মন্দিরে ঘন্টা নেড়েও মানুষ চূড়ান্ত অনৈতিক কাজ করতে পারে। আবার একজন নিয়মিত সুরাপায়ী মানুষ মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে অনায়াসে। ------------------------- হয়তো এসব কথা বাহুল্যমাত্র। তবে যখন দেখি অনেক মানুষ তুলির এক আঁচড়ে মদিরা ও মননকে জড়িয়ে ফেলেন, তাঁদের সঙ্গেই এইসব আবোলতাবোল কতাবাত্তা। এঁদের প্রতি মহামতি ঘালিব এবং অন্যান্যরা কী বলেছেন, একটু দেখা যাক, " জাহীদ শরাব পীনে দেঁ মসজিদ মেঁ বইঠকর ইয়া উয়োহ জগহ বতা জঁহা খুদা নহি..." (ঘালিব) উত্তরে 'ইকবাল' বলেন, " মসজিদ খুদা কে ঘর হ্যাঁয়, পীনে কে জগহ নহি, কাফির কে দিল মেঁ জা, উয়াঁহা খুদা নহি..." এসব শুনে 'ফরাজে'র মনে হয়, "কাফির কে দিল সে আয়া হুঁ, উওহ দেখ কর ফরাজ খুদা মৌজুদ হ্যাঁয় ওঁহা পর, উসে পতা নহি..." শেষ পর্যন্ত 'ওয়াসি' কনক্লুড করচেন এই বলে, ".... খুদা তো মৌজুদ দুনিয়া কে হর জগহ ওয়াসি, তু জন্নত মেঁ জা, ওঁহা পীনে সে মনা নহি..." --------------------------- আমি আছি আমির খুসরু'র সঙ্গে, " প্রেমভট্টি কা মদিরা পিলাইকে, মতওয়ারি কর দিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে, ছাপ তিলক সব ছিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে....."

1145

4

Romit Bose

উড়ে এসে জুড়ে বসলাম :)

সবাইকে hi! তোমরা কেমন আছো? আমি রোমিত, কলকাতার বাসিন্দা, এবং বাংলা-আড্ডার আসরে হঠাৎ উপস্থিত এক আগন্তুক। দাদার (অরিন্দম সেনগুপ্ত -- ঝ্ড়) সাথে কথায় কথায় জানতে পারলাম এই তোমাদের আড্ডার কথা, ভাবলাম আমিও ভিড়ে যাই। :) তোমাদের সাথে আলাপের অপেক্ষায় রইলাম। :) -রোমিত

1082

2

শিবাংশু

'আমার সকাল হয় তোমার সকাল হবার অনেক আগে ...'

আমি তখন পেথম পেথম জাদুগোড়ায় গেছি। তখনও বাড়ি নিইনি। এখনকার মতো তখন জামশেদ্পুর থেকে জাদুগোড়া যাবার অতো রাস্তাঘাট ছিলোনা। সকাল ছটার স্টিল এক্ষ ধরে ঘাটশিলা, সেখান থেকে পিছু এসে রাখা মাইন্স, আবার সেখান থেকে স্থলপথে জাদুগোড়া। সে এক জাড্যাপহ ব্যাপার। জানুয়ারি মাসের জামশেদ্পুরে ভোর পাঁচটায় বাড়ি ছাড়া , একে গত জন্মের পাপ ছাড়া কিছু বলা যায়না। পুরো অন্ধকার, ঘন কুয়াশা, তার মধ্যে হাড় কাঁপানি পাহাড়ি হাওয়া। বাইকে করে দশ মাইল ঠেঙ্গিয়ে আসা, টিশনে এসে ট্রেন ধরা। নেহাৎ বাঙালির চাকরি। প্রাণ যায় পর নোকরি ন যায়ে। তখন দেখতাম এক ভদ্রলোক ( ভক্ত টাইপ, কপালে ভস্মের টিপ), সরকারি কর্মচারী, স্রেফ খাদির পাজামা পাঞ্জাবি পরে চাকুলিয়া যেতেন। আমরা পুরো হাতা পুলোভার, চামড়ার জ্যাকেট পরে কম্পমান। সেই রাত পাঁচটায় তাঁর স্নান ইত্যাদি সারা। মাথার চুল থেকে জল ঝরছে। একদিন ভুল করে জিগ্যেস করে ফেলেছিলুম এতো রাতে স্নান করলে কেমন ঠান্ডা লাগে? তাতে তিনি ঘাটশিলা পর্যন্ত যে গপ্পো করলেন তাতে আক্ষরিক অর্থে হাড় হিম হয়ে যায়। তিনি দাবি করলেন মধ্যরাত্রি সাড়ে তিনটেতে কল খুলে তার নিচে তিনি বসে থাকেন। ছাতের ট্যাংকির জল, সারা রাত ধরে হিমায়িত হয়েছে, তার নিচে আধঘন্টা তিনি বসে স্নান করেন। তার পর আধ ঘন্টা পুজো করেন এবং তিন কিমি হেঁটে এসে ট্রেন ধরেন। উনকা কামিয়াবি কা রাজ হ্যাঁয়, 'আমার সকাল অনেক আগে' !!! এর পরের 'গপ্পো হলেও সত্যি' আমার এক প্রতিবেশীর। তিনি ভোরবেলায় ওঠাকে জীবনের পুণ্যতম কাজ বলে মনে করতেন। শীতগ্রীষ্ম বারোমাস যখন তাঁর মনে হতো ভোর হয়েছে ( ঘড়ি দেখার দরকার নেই) , তিনি শয্যা ত্যাগ করত প্রচুর হাঁকডাক করে, বাড়ির সব দরজা জানালা সশব্দে খুলে, যারা তখনও ঘুমোনোর চেষ্টায় আছে, তাদের শাপশাপান্ত করে জুবিলি পার্কের দিকে যাত্রা করতেন। একদিন জানা গেলো তিনি প্রায় ঘন্টা দেড়েক "প্রাতঃ' ভ্রমণ সেরে এসে যখন বৈঠকখানায় আলো জ্বেলে স্ত্রীর কাছে চা চাইতে যাচ্ছিলেন তখন হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর পড়ায় দেখা যায় তখন রাত তিনটে বাজে। যথারীতি সেই ঘড়িটিকে শাপশাপান্ত করে বাড়ির সব ঘড়ি গুলি পরীক্ষা করে দেখেন সবগুলিতেই তিনটে বাজে। তার মানে 'ভোর' একটা দেড়টাতেই তাঁর 'সকাল' শুরু হয়ে গেছে। গপ্পোটা এখানে শেষ হতে পারতো, কিন্তু শেষটা একটু ট্র্যাজিক। অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির লোক যখন ভদ্রলোককে এই 'আমার সকাল ....' ব্যাধি সারাতে পারলো না তখন নিস্তার এলো অন্যভাবে। একদিন এরকমই এক 'ভোর' বেলা জুবিলি পার্কে দলমা থেকে একটি দলছুট হাতি এসে অন্ধকারে এই ভদ্রলোকের এক প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গীকে তাঁর সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছে দিলো। তিনি দেখতেই পাননি সেই বিপুল প্যাকিডার্মটিও অন্ধকারে বাঘাকুদা লেকের চারদিকে প্রাতঃভ্রমণ করছিলো। এভাবেই 'আমার সকাল....' তাঁর 'বরবাদি কা রাজ' হয়ে এলো। তার পর থেকে তিনি মাঝরাতে উঠে পড়েন ঠিকই, কিন্তু আলো না ফোটা পর্যন্ত প্রাতঃভ্রমণে যাননা। তার বদলে ঘরে বসে রামদেবি ইশ্টাইলে ফোঁস ফোঁস করে আয়ু বাড়ান। আমার মতো পাপাত্মা লোকজন, যারা রাত দেড়টা-দুটোর আগে কোনদিন শয্যা গ্রহণ করেনি, তারা কোথা থেকে জানবে সূর্যোদয়ের আগে কখন ভৈরব বাজে, কখন ললিত। বৈকুণ্ঠলোকে ব্রাহ্ম মূহুর্তে মেনকা ঘৃতাচীদের পাণিপীড়ন করতে করতে ঈশ্বরের বাগানে ছোটাছুটি করার কোনও অভীপ্সা নেই। আর যেরকম শোনা যাচ্ছে পাশের বাগানেই হুরীপরিদের সঙ্গে সব সুইসাইড বম্বাররাও নাকি ঘুরে বেড়ায় এখন। আমাদের তো অনন্ত নরক এক্সপ্রেসে পার্মানেন্ট বুকিং। এখনও প্রচুর জায়গা খালি আছে। স্বাগত.... 'ধর্মতলা কর্মখালি'।

1124

6

Somen dey

একটি সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ

একটি সম্পর্কের ব্যাবচ্ছেদ *************** একটি সম্পর্ক যা রক্তের সম্পর্ক নয় তবু যার অবস্থান সেই মধ্যযুগ থেকে ভারতীয় পরিবারতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে  ।যে সম্পর্ক প্রকৃত অর্থে বহুমাত্রিক , কিন্তু সেটাকে হয় কালো নয় সাদা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দিতে পারলেই এখনকার সিরিয়াল , সিনেমায় ,নাটকে , যাত্রায় ফ্যামিলি ড্রামা জমে ক্ষীর হয়ে যায় ।এ হল শাশুড়ি আর বৌমার সম্পর্ক । আমাদের ভারতীয় সমাজের বূনোটটি পুরোপুরি বুঝতে হলে আমাদের ঢুকে পড়তে হবে একেবারে ভারতীয় গৃহস্থালীর অন্দর মহলে ,যেখানে আবহসঙ্গীতে বেজে চলেছে শিল নোড়ার ঘষাঘষি বা খুন্তি কড়াইয়ের ঠোলাঠুকির শব্দ ধ্রুবপদের মত । সেটাই আসল ভারতীয় সমাজের স্থিরবিন্দু । আমাদের সমাজের এই বুনোটটি এতটাই বহুস্তরে নির্মিত যে দু একটা খণ্ডিত চিত্র দেখে, কিছু সমীক্ষার করে, কিছু সংখ্যাতত্বের নাড়াচাড়া করে ,কিছু সমাজবিজ্ঞানের থিওরি দিয়ে সেটা কে বুঝতে গেলে সে বোঝায় বিস্তর ফাঁক থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ।কারণ ডি এল রায়ের নাটকে আলেকজেন্ডার সিন্ধু নদের ধারে দাঁড়িয়ে যিশুর জন্মেরও শ তিনেক বছর আগে সেলুকাসের কাছে যে বিস্ময় প্রকাশ করে এই দেশ কে যে ‘বিচিত্র’ বলেছিলেন সে দেশ আজও বিচিত্রই আছে , হয়ত বা বিচিত্রতর হয়েছে  । এ দেশে এখনো আমাদের জীবন যাপন অনেকটাই সম্পর্ক-নির্ভর ।বহু রকমের সম্পর্ক ।আত্নীয় অনাত্নীয় পাড়াতুতো , গ্রামতুতো , ফ্ল্যাট-তুতো , অফিসতুতো ইত্যাদি নানারকমের সম্পর্ক । কিছু সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া , কিছু পাতিয়ে তোলা , কিছু সম্পর্ক প্রথমে চাপিয়ে দেওয়া কিন্তু পরে নতুন ভাবে গড়ে ওঠা – এই সব নানা ধরনের সম্পর্ক নিয়ে আমরা প্রত্যেকে এখনো পরিবার নামক একটি কাঠামোর অংশ বিশেষ হয়ে এ দেশে বসবাস করি ।আমরা এখনো ঠিক শুধু একজন স্বাধীন একক ব্যাক্তিবিশেষ নই, আত্নীয়তা ও নানান সম্পর্কের জালে বাঁধা একজন ব্যাক্তি, যাকে সমাজ, আত্নীয় , বন্ধু , প্রতিবেশী এবং পরিবারের অস্তিত্ব কে ইচ্ছেই হোক আর অনিচ্ছেতেই হোক , বহন করে নিয়েই বেড়ে উঠতে হয় ।সময়ের সঙ্গে সমাজ এবং পরিবারের কাঠামোটা আগের তূলনায় নড়বড়ে হয়েছে , পরিবার মাপে খাটো হতে হতে অনু-পরিবার হয়েছে , তবু সম্পর্কের বন্ধন একেবারে উবে যায়নি  । বৃহত্তর ভারতীয় সমাজ এখনো ভার্চুয়াল নয় সেই রিয়াল সম্পর্কের আন্তর্জালেই আবদ্ধ হয়ে আছে  । এক ছাতের নিচে বসবাস করা হোক না হোক তবুও পরিবারের অস্তিত্ব এখনো প্রবল ভাবে উপস্থিত । এই পরিবার নামক রিয়াল সম্পর্কের জালে যে কটি সম্পর্ক নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায় বিরাজ করে তার মধ্যে অবশ্যই অন্যতম একটি হল শাস-বহুর , মানে শাশুড়ি বউমার সম্পর্ক । এ এক এমন সম্পর্ক যাকে ঠিক খারাপ বা ভালোর কোনো একটি খাপে ঢুকিয়ে ফেলা যায় না ।হাসিকান্না-হীরাপান্না দিয়ে গাঁথা এই সম্পর্কের বর্ণময়তা। উপর থেকে একরকম , ভিতর থেকে আর এক রকম । এ সম্পর্কের জটিলতার জট একদিকে খোলে তো একদিকে পাকিয়ে যায়  ।তবু টিকে থাকে ।তবু বেঁধে বেঁধে থাকে । কিছুদিন আগে পর্যন্ত অনেক বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়িতে কাপড়ের উপর নানা রকমের ছুঁচের কাজকরা করা ছবি বা লেখা , কাঠের ফ্রেমে বাঁধিয়ে বাড়ির বসবার ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখার চল ছিল। এমন সুচিকর্মে একটি আপ্তবাক্য খুব দেখা যেত – ফুল লতা পাতার মাঝে লেখা ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে’ । নারীবাদীরা বলেন এ রকম আপ্তবাক্যের পিছনে ছিল রমনীদের ঘাড়ে সংসার সুখে রাখার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের ঝাড়া হাত পা থাকার পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র । হবে হয়ত । তবে সংসারকে সুখী করার পিছনে যে রমনীর ভুমিকাই বেশি সে কথাটা সর্বৈব মিথ্যা নয় । আর যে রমনীদের গুনে সংসার সুখের হওয়া না হওয়া নির্ভর করে তাঁরা হলেন বাড়ির দুই নারী ,শাশুড়ি এবং বৌমা ।কাল যিনি বৌমা ছিলে আজ তিনি শাশুড়ি , আজ যিনি বৌমা কাল তিনি শাশুড়ি হবেন । চক্রবৎ পরিবর্তন্তে এই বিবর্তন চলছে চলবে । ফার্স্ট ইয়ারে যারা কলেজে ঢুকে সিনিয়ার ছাত্রদের হাতে ragging এর শিকার হয় , তারাই যখন সিনিয়ার হয় , তারা নতুন দের ragging করে । এটা মনুষ্য মনস্তত্বের একটি দুর্বল দিক । শাশুড়ি বৌমার সম্পর্কের মধ্যে এই মনস্তত্বের দিকটি হয়ত কোথাও কাজ করে । তবে অনেক ক্ষেত্রেই উলটো রকমটাও হয় । একটি অল্প বয়সী মেয়ে যখন একটি সম্পুর্ন অজানা একটি সংসারে প্রবেশ করে এবং তাকে এই নুতন সংসারে নুনের পুতুল সাগরে মিশে যাবার দায়বদ্ধতা নিয়ে , তার দরকার নতুন বাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে কিছুটা নমনীয়তা, সহানুভুতি ও সহমর্মিতা । উল্টোদিকে সেই মেয়েটিরও নুতন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেবার মত সহিষ্ণুতা থাকা দরকার । এমনটাই এতদিন হয়ে এসেছে । নুতন শতাব্দীর আগমনের পর শ্রীমতী একতা কাপুর ‘কিঁউকি শাস ভী কভি বহু থী’ নামক সিরিয়ালের মধ্যে দিয়ে প্রায় একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন । যেন সব্বাই ঘুম ভেঙ্গে উঠে আবিস্কার করে ফেলেছে এই সম্পর্কের মধ্যেই আছে অতি উচ্চ ‘টি আর পি’ পাওয়ার যাবতীয় মালমশলা । তাই এখনকার বেশির ভাগ টেলিভিশান সিরিয়ালের কেন্দ্রে আছে শাস-বহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন । এই সব সিরিরালের যে কোনো একটির নাম যদি সুনীল গাঙ্গুলির লেখা থেকে ধার করে রাখা হয় ‘দুই নারী হাতে তরবারি’ তাহলে দিব্যি মানিয়ে যাবে। ভাবখানা যেন রাজায় রাজায় যুদ্ধের গল্প অনেক হোলো , এবার শাশুড়ি বউয়ের যুদ্ধের গল্প হোক । এসব গল্পে দখলদারি আছে , চক্রান্ত আছে , ষড়যন্ত্র আছে, রেষারেষি আছে , কভি শাস কভি বহুর হার জিৎ আছে আর হ্যাঁ কখনো সখনো মায়া মমতা ভালোবাসা ইত্যাদিও আছে । সাহিত্য কথাটা নাকি এসেছে সহিত থেকে মানে যা সমাজের সহিত চলে তাই সাহিত্য । টেলিভিশন সিরিয়াল সমাজের সহিত না চলুক, তার গল্পে কিছুটা সমাজের খিদে মেটানোর তাগিদ তো নিশ্চয় আছে । মানুষ সাধারণত দু ধরনের গল্পে আগ্রহ দেখায় – রুপকথার make-believe গল্প , অথবা এমন গল্প যার সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত করতে পারে ।এই ধারণা যদি সত্যি হয় তবে কি শাস –বহুর এই দীর্ঘ মেয়াদী লড়াইএর গল্পে দর্শকরা (যার সিংহ ভাগ মহিলারা) কি নিজেদের relate করতে পারছে ? যদি তা হয় তবে ব্যাপারটা বেশ ভয়ের  । যে সময়টা পেরিয়ে আমরা এই সময়ে এসেছি তার মধ্যে দিয়ে ঘটে গেছে বহু রকমের ওলট পালোট ।এই সম্পর্কের বিবর্তন টা খুব গুরুত্বপুর্ন । আমাদের সাহিত্যে এই দিক তা নিয়ে বিশেষ কোনো লেখা চোখে পড়েনি । বোধহয় বিষয়টার মধ্যে এতটাই গেরস্থালীর গন্ধ মাখা যে আধুনিক লেখক লেখিকারা এটাকে এড়িয়েই চলেন । আর সেই সুযোগে সিরিয়াল স্রষ্টারা লেবু চটকিয়ে অলীক কুনাট্য রঙ্গের সিরিয়াল রচনা করে যান । এর একটা ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে কিছু সরলমতী বিবাহযোগ্যা মেয়েরা যদি এই সব সিরিয়াল দেখে ভবিষ্যত শাশুড়ি কে আগের থেকেই একজন প্রতিপক্ষ ভেবে বসে থাকে এবং নুতন সংসারে ঢোকার আগেই একটি লড়াইএর strategy ঠিক করে নেয় । আর ওদিকে বাড়িতে নুতন বৌ আসার আগে শাশুড়িও কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে থাকে , এই বুঝি বৌমা এসে আমাদের ছেলেকে একেবারে কব্জা করে নিয়ে আমাদের থেকে ‘পর’ করে নেবে ।অতয়েব সহজে ‘সুচাগ্র মেদিনী’ ছাড়া চলবে না । অতয়েব দু পক্ষই শুরু করে ‘প্রতিপক্ষ’ হয়ে । আমাদের সেনসর বোর্ড অবশ্য এ সব বিষয়ে মাথা ঘামান না । তাদের দেখার বিষয় শুধু সেক্স এবং ভয়োলেন্স । আধুনিক সাহিত্যিকরা এই সম্পর্ক বিশেষ কিছু লিখুন বা না লিখুন আমাদের প্রাচীন লোককথায় কিছু গল্প প্রচলিত আছে। তার একটি এই রকম। এক গ্রামের মেয়ে বিয়ের পর যখন স্বামীর বাড়িতে গেল, শাশুড়ির সাথে শুরু হলো তার নানা রকমের খিটিমিটি। শাশুড়ির আচার আচরণ কথাবার্তা , সব ব্যাপারে কতৃত্ব করা সে সহ্য করতে পারতো না। আর শাশুড়িও সারাক্ষণ শুধু বউয়ের সব আচরনের, সব কাজের সমালোচনা করতো।  ।এই রকম একটা তেতো সম্পর্ক থাকা সত্বেও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বৌমাকে প্রতিদিন সকালে উঠে তার শাশুড়িকে প্রণাম করতে হতো। এটা সেই মেয়েটি কিছুতেই মানতে পারছিল না । মেয়েটির স্বামী যথারীতি উভয়সঙ্কটে পড়ে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকত ।এতে মেয়েটির মাথা আরো গরম হয়ে যেত । শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক এমন তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছালো যে মেয়েটি বাধ্য হয়ে তার বাবার এক বন্ধু পেশায় যিনি কবিরাজ তার কাছে গেল। সবকথা তাকে খুলে বলে তার কাছে এমন এক বিষ চাইলো যা খাইয়ে ঐ বুড়িকে সে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে পারবে। কবিরাজ মশাই কিছুক্ষন ভেবে বললেন, তোমার সমাধান আমি করে দেবো যদি তুমি আমার কথামতো চল। মেয়েটি রাজী হলো। কিছুক্ষণ পর কবিরাজ একটা পুঁটুলিতে কিছু ভেষজ লতাপাতা বেঁধে তাকে দিয়ে বললেন, এক্ষুনি কোনো বিষ দিয়ে যদি শাশুড়িকে মেরে ফেলো তাহলে মানুষ তোমাকে সন্দেহ করবে। সেজন্যে আমি এমনকিছু লতাপাতা দিয়েছি যা রোজ শাশুড়ি কে খাওয়ালে ধীরে ধীরে তার শরীরে বিষক্রিয়া ঘটবে এবং সে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে এবং মাস ছয়ে পরে দেহ রাখবে। কেও কিছু জানতে পারবে না। সপ্তাহে দু দিন করে খুব ভালো কোনো খাবার রান্না করে তার মধ্যে এই লতাপাতা মিশিয়ে তোমার শাশুড়িকে খেতে দেবে। আর লোকে যাতে তোমাকে কোনো সন্দেহ করতে না পারে সেজন্যে এসময়টায় শাশুড়ির সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করবে। কোনো ঝগড়াঝাঁটি করবে না এবং তার সবকথা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেবে। পুঁটুলিটা কাপড়ের মাঝে লুকিয়ে সে বাড়ি ফিরে এলো। বহুদিন পর তার মনটা খুব হালকা হয়ে গেল। এতদিনে সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। কবিরাজের কথামতো সে একদিন পর পর ঐ বিষমেশানো খাবার রান্না করে শাশুড়িকে খাওয়াতে লাগলো। সেইসাথে এই সময়টায় শাশুড়ির ওপর যত রাগই হোক আপ্রাণ চেষ্টায় তা দমন করে তার সব কথাকে মেনে চলতে লাগলো। শাশুড়িও বৌমার ব্যাবহারে এই পরিবর্তন লক্ষ করে মনে মনে খুব খুশি হল । এই করে করে পাঁচ মাস কেটে গেল ।ঝগড়া ঝাটি বন্ধ হয়ে গিয়ে ঘরের পরিবেশ হয়ে উঠলো অনেক শান্তিময়। ইতোমধ্যে বৌমাটি আবিষ্কার করলো তার রাগকে এখন অনেক সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আগে মুহূর্তে রেগে গিয়ে যে তুলকালাম বাধাতো এখন আর তা করে না। গত পাঁচ মাসে একবারও শাশুড়ির সাথে তার কোনো ঝগড়া হয় নি। ছোটখাটো বিষয়গুলোকে এখন খুব অনায়াসেই সে ক্ষমা করতে পারে, ছাড় দিতে পারে। ও দিকে শাশুড়ির পরিবর্তনও লক্ষণীয়। তিনি এখন বৌকে নিজের মেয়ের মতোই ভালবাসেন। আত্মীয়-পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে বলে বেড়ান, আমার বৌমার মতো ভালো মেয়ে আর হয় না। বৌ-শাশুড়ি থেকে তারা এখন মা-মেয়ের মতো মমতা-ভালবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ দুজন নারী। এমনটা কি করে ঘটলো তা না বুঝেই মেয়েটির স্বামী এটাকে রোজ সকালে উঠে যাকে ডাকে সেই পরমেশ্বরের কৃপা ভেবেই নিশিন্ত হল । ও দিকে আর একমাস পরে তার শাশুড়ি আর ইহজগতে থাকবেন না এই চিন্তায় সে আনন্দ পাওয়ার বদলে কেমন যেন বিষন্ন হয়ে যেতে লাগল । কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন সে আবার গেল সেই কবিরাজের কাছে।তার হাত ধরে বললো, দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আমি আর আমার শাশুড়িকে মেরে ফেলতে চাই না। তিনি এখন অনেক বদলে গেছেন। মায়ের মতোই তাকে এখন ভালবাসি আমি। দয়া করে যে বিষ তার শরীরে ঢুকেছে তা বের করে আনার ব্যবস্থা করুন। কবিরাজ তখন হাসলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, চিন্তা করো না মা। তোমার শাশুড়ি মরবেন না। বিষের নামে আমি তোমাকে যে লতাপাতাগুলো দিয়েছি তা আসলে বিশেষ ধরনের এক ভেষজ ভিটামিন যা তার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। বিষ আসলে ছিল তোমার মনে, তোমার দৃষ্টিভঙ্গিতে। কিন্তু সে বিষ এখন ভেসে গেছে তার প্রতি তোমার সব ভালবাসা আর শ্রদ্ধা দিয়ে। এই গল্প নিয়ে সিরিয়াল তৈরি করলে সে সিরিয়ালের আর টি আর পি বাড়বেনা । অতয়েব হে একতা কাপুরের উত্তরসুরী এবং সাঙ্গ পাঙ্গরা, তোমারা চুটিয়ে দেখিয়ে যাও শাস-বহুর ষড়যন্ত্রের নতুন নতুন কাহিনি। সন্ধার অবকাশে, সে কাহিনির কুনাট্য রঙ্গে , রাঢ়ে বঙ্গের সব শাশুড়িরা এবং হবু শাশুড়িরা ,সব বৌমা এবং হবু বৌমারা মজে থাক ।

1261

9

শিবাংশু

চলো চুনার

---------------------- একটা কথা বলা হয়, এই দুর্গটির প্রতিটি ইঁটে ইতিহাস গাঁথা আছে সেই আদিকাল থেকে। মানে সেই খ্রিস্টপূর্ব ছাপান্ন সাল। ------------- নদীর ধারে খাড়া পাহাড় চিরকালই রাজাদের কেল্লা বানাতে আকর্ষণ করে। গঙ্গার পারে নিচু পর্বতশ্রেণী কাইমুর থেকে চুনার, নদীস্রোতের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেছে এই প্রান্তটিতে, বারাণসীর দক্ষিণ-পশ্চিমে। পুরাণে বলে রাজা বলীকে বর দিতে দেবতা বিষ্ণু নাকি বামন অবতারের রূপে এসে এই পাহাড়টিতে পা রেখেছিলেন। সেই সূত্রে এর নাম হয় চরণাদ্রি। পরে তা চুনার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কিংবদন্তির বিখ্যাত রাজা উজ্জয়িনীর বিক্রমাদিত্যও নাকি তাঁর সংসারত্যাগী ভাই ভর্তৃহরির জন্য এই পাহাড়ের চূড়ায় একটি দেবালয়ও বানিয়ে দিয়েছিলেন। এই পাহাড়টি নাকি পৃথ্বীরাজ চৌহানের রাজত্বের শেষ সীমা ছিলো। তাঁর মৃত্যুর পর এটি সুবুক্তগিনের খাস তালুক হয়ে যায়। গল্পকথা যাই বলুক এই পাহাড়ে অতি প্রাচীন কাল থেকে মানুষের বসবাস রয়েছে, এটা প্রমাণিত। -------------------------- নথিবদ্ধ ইতিহাস বলে ১৫২৯ সালে জহিরুদ্দিন শাহ বাবরের সৈন্যবাহিনী এই পাহাড়টি ও তার উপরের দুর্গটি অধিকার করে ফেলে। কিন্তু ১৫৩২ সালে শের খান বা পরবর্তীকালের শেরশাহ সুরি মুঘলদের হাত থেকে এই দুর্গটি ছিনিয়ে নেন। এই পাহাড়টির নীচের দিকে সেই সময়ের কিছু মুঘল সৈন্যের সমাধিও দেখতে পাওয়া যায়। আফঘানি পঠান শের খান শুধু বিরাট যোদ্ধাই ছিলেন তাই নয়, রাজনৈতিক কৌশলেও বিশেষ দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি যুদ্ধে মৃত চুনারের কিলাদারের দুই বিধবা পত্নীকে বিবাহ করে দুর্গটি ও বিশাল নজারতের মালিকও হয়ে গেলেন। পরে হুমায়ুঁর চাপে অস্থায়ীভাবে দুর্গটি ছাড়লেও প্রথম সুযোগেই শেরশাহ এই দুর্গটি আবার অধিকার করে নে'ন এবং আমৃত্যু দখল করে রাখেন ১৫৭৫ সাল পর্যন্ত। মির্জা জলালুদ্দিন অকবর তার পরে এটির দখল নে'ন এবং আহমেদ শাহ দুর্রানির আক্রমণ পর্যন্ত চুনার দুর্গ মুঘলদেরই ছিলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেজর মুনরো ১৭৬৮ সালে চুনার দুর্গের মালিক হ'ন। কিছুদিনের জন্য বারাণসীর রাজা চেত সিংও দখল নিয়েছিলেন। তবে ১৭৯১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস স্থায়ীভাবে দুর্গটি অধিকার করেন। এখানে যুদ্ধে আহত ও অক্ষম সৈন্যদের আশ্রয় দেওয়া হতো। রাজা রণজিৎ সিংহের বিধবা রাণীকে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিলো। সিপাহীবিদ্রোহের পর থেকে বহু যোদ্ধাদের এখানে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে। এমন কি আধুনিক কালেও কাইমুর অরণ্যের সন্ত্রাসবাদীরা এই দুর্গের বিশাল অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করার চেষ্টা করেছিলো। ---------------------------- এর ভৌগলিক অবস্থিতিটি এককথায় দুর্ভেদ্য। বহুদূর থেকে গঙ্গা বেয়ে আসা নৌবহরকে এখান থেকে নজর রাখা যেতো। পাহাড়ের খাড়া দিকটি থেকে দেখলে শিবাজীর সিংহগড় ও রায়গড়ের কিলা মনে পড়ে যাবে। মূলদুর্গটি উত্তরপূর্বে, যেখানে বহু কামান ও বারুদখানার অবশেষ দেখা যায়। মাঝখানে সোনওয়া মণ্ডপ একটি হিন্দু পূজাস্থল। চতুর্দশ শতকে নেপালের রাজকন্যা সোনওয়া নাকি এই মণ্ডপটির নীচে সুড়ঙ্গটি দিয়ে গঙ্গাস্নান করতে যেতেন। বৃটিশরা এখানে গভর্নরস হাউস, বেশ কিছু বাংলোবাড়ি, গারদখানা ও প্রশাসনিক দফতর তৈরি করেছিলো। --------------------------- এই দুর্গের কোনও একটা জায়গায় চুনারের রাজা নাকি বিপুল ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছিলেন। এখনও তাঁর পরেশান আত্মা ভূত হয়ে সেসব আগলে রাখে। আমরা পাতি লোক। অতো ধনরত্ন দিয়ে আর কী করবো? জানতে পারলে পুলিশ ধরবে। তার থেকে ভালো দুর্গের র‌্যামপার্টে বসে ডাইনে-বাঁয়ে শুধু গঙ্গাকে দেখে যাওয়া। আহা, চুনার কিলা থেকে নীচে গঙ্গার দৃশ্য অতি বড়ো বেরসিকেরও প্রাণের আরাম হয়ে উঠতে পারে।

1080

8

মনোজ ভট্টাচার্য

জীবনের ঘাটে ঘাটে !

রাজরাপ্পার ছিন্নমস্তায় ! সময়টা তখন রাজনৈতিক ভাবে খুব ভয়ংকর ছিল ! ভারতে তখন স্বৈরতন্ত্র মাথা চাড়া দিয়েছে । পশ্চিমবঙ্গে তার চরম নগ্ন রূপ প্রকাশ পাচ্ছে ! বাড়ি থেকে বের হলে ফেরার নিশ্চয়তা ছিল না ! কলকাতা থেকে অসংখ্য তরুণ এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ! ভারতের কোথাও কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়ি পেলেই সেখানে চলে যাচ্ছে । খুব সংগোপনে থাকছে কিছুদিন । সেই সময় আমার একটা অভ্যেস ছিল - মাসে অন্তত এক শনিবার-রোববার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তাম যে কোনো জায়গায় । তখনও মাথায় ‘শ্রীকান্ত’ চলা-চল করত ! তখন অজ্ঞাত ‘খেয়াল-পোকা’ মাথার মধ্যে সাঁকো নাড়াত পায়ের তলায় শুরশুর করত ! এখন ভাবতে অবাক লাগে - কি করে এখনও ঠিক ঠাক বেঁচে রয়েছি ! সেই সব ফেলে আসা জীবনের কিছু কিছু অংশ অভিজ্ঞতা লিখে রাখছি - যদি কারুর উৎসাহ হয় ! যদি কেউ পড়তে চায় ! ভবিষ্যতের পাথেয় ভেবে ! ছিন্নমস্তার পাহাড়ে ! রাঁচি থেকে যে কি করে রাজরাপ্পা এসে পড়লাম তা আজ আর মনে পড়ছে না । কিন্তু ছিন্নমস্তা মন্দিরে গিয়ে পড়েছিলাম এই রকমই ঘুরতে ঘুরতে ! আগে জানতামই না - এখানে দুটো নদ নদীর সঙ্গমস্থল আছে ! - সকালে একটা বাস আসে আর বিকেলে ফিরে যায় - এখন ঠিক মনে করতে পারছি না কোত্থেকে ! অধুনা ঝাড়খন্ড এর রামগড় জেলায় রাজরাপ্পা বলে একটা সুন্দর জায়গা আছে - সেখানে ভৈরবী ( ভেরা ) নদী এসে দামোদর নদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে - প্রচন্ড গর্জন করে ! এখানেই মনে পরিয়ে দেয় – ‘ভয়ংকর সুন্দর’ কথাটা ! - একটা যেন কিছু ঘটবে-ঘটবে ভাব ! - নদী হেঁটে পার হওয়া যায় বড় পাথরের ওপর দিয়ে । ওপারে পাহাড়ের ওপর সুন্দর জঙ্গলে ঘেরা দুটো মন্দির আছে । একটা হলো ছিন্নমস্তা , আরেকটা কালী মন্দির । নদী পেরোলেই কতগুলো ছোটো ছোটো ঝুপড়ি গোছের পুজর ফুল ও চা-তেলেভাজার দোকান ! পিতা -দক্ষ রাজার শিব-হীন-যজ্ঞে যাবার জন্যে সতী যখন খুবই বায়নাক্কা করছিল ও শিব তাকে যেতে দিতে রাজি হচ্ছিল না । কারন শিব পৃথিবীর ধ্বংসের কথা জানত । তখন সতী শিবকে দশ মহাবিদ্যার রূপ দেখিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল ! – এই দশটি রূপের মধ্যে ষষ্ঠজন হল ছিন্নমস্তা ! - রতি-ক্রীড়ারত শিব-সতীর সৃষ্ঠি স্তব্ধ করার জন্যে কালী নিজের মুন্ড কেটে নিজেরই রক্ত পান করছে তাদেরই ওপর দন্ডায়মান হয়ে ! যারা এই মূর্তি দেখেছে - তারাই জানে - একটু ভয়াল ধরনের রূপ এই ছিন্নমস্তার ! আর যেহেতু নদ-নদীর সংগম স্থলে এই মন্দির - তাই রাজরাপ্পা খুবই প্রসিদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ ! মন্দিরের মধ্যে যে মূর্তি আছে - তা দেখে অবশ্য কিছুই বোঝা যায় না ! একটা দোকানে বসে আলাপ করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - ওপরে কোনো থাকবার জায়গা পাওয়া যাবে কিনা ! বলল - এখানে রাতে কেউ থাকে না - দিনে দিনে পুজো দিয়ে সবাই ওপারে চলে যায়। - কেন ? - না বাঘ আসে মন্দিরে ! - পুজো করতে নাকি ? - না - রক্ত খেতে। - মন্দিরে সকালে পশু বলি হয় - তার রক্ত নালী দিয়ে নদীতে পড়ে - সেই রক্তের লোভে নাকি বাঘ আসে ! তবে মানুষ মারে না ! ধার্মিক বলতে হবে ! তাহলে দোকানের লোকেরা কোথায় থাকে ? - তারা সব নদী পেরিয়ে ওপারে চলে যায় - ওপারে ওদের বাড়ি ঘর। আমার কিরকম জেদ চেপে গেল ! দেখি না কি হয় ! মুফতে যদি বাঘ দেখতেই পাওয়া যায় ! বলছে তো মানুষ পারে না ! - দোকানদারের সঙ্গে বলে কয়ে - রাতে এই খোলা ঝুপরিতেই থাকব ঠিক করলাম । ওখানেই চারপাশটা ঘোরাঘুরি করে - যা পাওয়া যায় তাই খেয়েই দিনটা কেটে গেল । দিন থাকতে থাকতে সব পুন্যার্থীরা ফিরে গেল । তারপর একে একে দোকানদাররাও সব ঝুপড়ির ঝাঁপ নামিয়ে আলো নিয়ে ওপারে চলে গেল । যাবার সময়ে আমাকে অবশ্য ওপারে চলে যাবার সৎ পরামর্শ দিয়ে গেল । আমি জেদ করে একা বসে রইলাম ওই ঝুপড়ি দোকানে । - দেখি তো - সত্যি বাঘ আসে কিনা ! এপাড়ে অন্ধকার ক্রমশ হামাগুড়ি দিয়ে আসছে ! - কিন্তু তবু গাছপালা - মানুষ দেখা যায় । ওপারের দোকানগুলোয় তখনো আলোর রেশ দেখা যাচ্ছে । একেবারে যে ভয় পাই নি - তা অস্বীকার করি কি করে ! প্রায় আধঘন্টা কেটে গেছে – নদীর পাশে বসে বসে - ঠিক করলাম না ভুল করলাম – ভাবছি আর অন্তিম পরিস্থিতিতে কি করবো চিন্তা করছি ! ঠিক সেই মুহূর্তেই দেখি - একটা টর্চের আলো এগিয়ে আসছে - আমার দিকেই । তখনই আমার গা টা ছম ছম করে উঠলো – এই রে ! আমি তো শুধু বাঘের কথাই ভেবেছি - কিন্তু মানুষের কথা তো চিন্তা করি নি ! - এ আবার কে রে ! - ডাকাত টাকাত নয় তো ! '- বাবুজি, আপনি এখনো বসে আছেন এখানে ? ওপাড়ে বাস তো ছেড়ে গেছে !' - মিশ্রিত ভাষাতে একজন কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো । '- আমি তো আজ এখানে থাকবো ! রাত্তিরেও এখানেই থাকবো ঠিক করেছি !' - সকাল থেকে ঘোরাঘুরির ফলে এখানকার লোকগুলোর সঙ্গে একটু-আধটু আলাপ মুখ-চেনা হয়ে গেছে । আর সবাই জেনে গেছে যে আমি কলকাতা থেকে এসেছি ! ' - আপনাকে বাবু ডাকতেছেন ! ' ' - কোন বাবু ?' আমি বেশ অবাক - এখানে আবার কোন বাবু আমায় ডাকবে ! ' - ওই মন্দিরে আছেন । আসেন আমার সঙ্গে - বাবু কথা বলবেন ।' - বলে পেছন ফিরে এগুতে লাগলো ! অগত্যা আমি আর কি করি - ওরই পিছু পিছু যেতে লাগলাম - রাজি না হলে যদি কিছু করে বসে ! জায়গাটা তো ওদেরই ! ' - নদীর ধারে বসে কি করছিলি রে ? নাম কি তোর্ ? কোত্থেকে এসেছিস ?' পরিস্কার বাংলায় প্রশ্ন শুনে চমকে উঠেছি - আবার তুই-তোকারি করছে ! দেখি ধুতি-পাঞ্জাবি গায়ে এক বয়স্ক ভদ্রলোক একটা চৌকিতে বসে - আরেক জন লোক তার পা টিপে দিচ্ছে। আমি নাম - ঠিকানা বলে জানালাম কেন দোকানে বসে আছি । ওনার নাম - সুকুমার বোস - উনি নাকি এই কালী মন্দির করিয়েছেন । কলকাতায় আমাদের পাড়ার কাছেই নিকাসী পাড়ায় থাকেন । আমার চিকিৎসক পিতামহর রুগী-যজমান - এদের বাড়ির সবাই । আমাদের সবার কুশল জানতে চাইলেন ! মজার খবর হলো - 'ছিন্নমস্তা' বলে একটা সিনেমা হয়েছিল - উনিই নাকি প্রযোজক ! যাইহোক, এই পরিচিতির ফলে - আমার আর বাইরে থাকা হলো না – আর এখানে ভোগ করার জন্যে এক গোবিন্দভোগ চাল আছে – ওটা নাকি ব্রাহ্মণদেরই খাওয়াতে হয় ! তা সেই চালের ঘী সহযোগে সদ্ব্যবহার আমাকেই করতে হলো - ভট্টাচার্য নামের খাতিরে ! আর আমার আধ্যাত্মিক চেতনা জাগরণের জন্যে মন্দিরে গিয়ে একাকী ধ্যান করতে হলো - যদি কোনো আত্ম-উপলব্ধি হয় ! ওনার হয়ত আমাকে ভবিষ্যতের স্বামী মনোজানন্দ বলে ধারনা হয়েছিল ! - তা হিরণ্যকশিপুর ভাগ্যে আর দিব্য লাভ হলো না ! কিন্তু রাত্রিবাস হলো মন্দিরের ভেতর স্টোর রুমে - দস্তুর মতন লেপ-কম্বল মুড়ি দিয়ে ! পরের দিন সকালে ফিরছি যখন - তখন রামানুজ নামে ওই মন্দিরেরই একজন পুজারী কথায় কথায় জানালো - ওরা আমাকে নকশাল ভেবেছিল - তাই সুকুমার বাবু আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল ! দরকার পরলে পুলিশের হাতে তুলে দিত ! বলে কী ! যাক, সে যাত্রা খুব বেঁচেছি ! - বাঘ অথবা পুলিশের থাবা থেকে ! মনোজ

1250

38

কিকি

আনকা শব্দের ডিক্সোনারি

শব্দ কৃতজ্ঞতা- ইমদাদুল হক মিলন। পুস্তক- নূরজাহান। ১) পালান- আঙিনা ২) উকাল-বমি ৩) ছ্যাপ- থুতু ৪) য়োড়া- ঝুড়ি ৫) উদিস- টের ৬) ডাঙ্গর- ডাগর ৭) গুড়মুড়া- গোড়ালি ৮) বিনল- ফুটল ৯) মিহি- দিকে/ আমার মিহি নজর রেখ। ১০) সালুন/ সুরা- ঝোল ১১) কহি- চিচিঙ্গা ১২) জের-টিন/ মুড়ির জের। ১৩) খলিফা- দর্জি ১৪) খাদা- মাটির পাত্র, যেখানে ভাতের ফ্যান ঢালে। ১৫) আইচায়- মালা ১৬) অডু-অতটুকু ১৭) যেডু- যতটুকু ১৮) নিয়াস- দীর্ঘশ্বাস ১৯) ডোল- গোলা ২০) কুকুড়া- মুর্গি ২১) মেউন্না- মেনিমুখো ২২) রাড়ি- বিধবা ২৩) বউয়া- তেল, পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে বানানো এক ধরনের ভাত। ২৪) গাওয়ালি-ফেরি করা, ফেরিওয়ালা। ২৫) খুতি-টাকা পয়সার থলে। ২৬) হরি-শাশুড়ি ২৭) কাইজ্জাকিত্তন- ঝগড়াঝাঁটি ২৮) আমরুজ- জামরুল ২৯) জ্যাতা- জ্যান্ত ৩০) আঐলে- আড়ালে ৩১) ছনছায়- দাওয়া ৩২) কুয়ারা- ঢং ৩৩) বরকি- ছাগল ৩৪) কলুই- মটর ৩৫) পালান- বাগান ৩৬) হবিরে-তাড়াতাড়ি ৩৭) কোনাকানছি- আনাচ কানাচ ৩৮) আথাল- গোয়ালঘর ৩৯) দামড়ি- এঁড়ে বকনা ৪০) লুকা- নাড়িভুঁড়ি ৪১)ভুরা-ঢিবি ৪২)ফ্যারা- হাম (রোগ) ৪৩)শেলটাকি-শোল মাছের বাচ্চা ৪৪)আলাম- আস্ত ৪৫)পাথালি কুল-পাঁজাকোল ৪৬)বোগলে- সামনে ৪৭)হাকিহুকি-ফিসফাস ৪৮)কোনাইচ্চা- চৌকো ৪৯)ওস- শিশির ৫০)হরমাইল-পাটখড়ি ৫১)ম্যাড়া-রোগা ৫২)লউং-আঙুল ৫৩)ঢিপলা-দলা ৫৪)দইকুলি-দোয়েল পাখি ৫৫)ফাল-লাফ ৫৬)ঢোর-স্বরনালি ৫৭)মিষ্টাইয়া-মিটিমিটি ৫৮)দিগদারি-যন্ত্রণা ৫৯)কন্নি-কনুইয়ের গুঁতো ৬০)আসাম-আসনপিঁড়ি ৬১)ওদাইন্না-ন্যাতানো ৬২)আকাতলি-বগল ৬৩)কুইদদা-রেগে ওঠা ৬৪)হামতাম- আস্ফালন ৬৫)হামলাইয়া- লুকিয়ে ৬৬)কদু-লাউ ৬৭)উসসি-শিম ৬৮)সিং-সিঁধ

1657

11

মানব

রোজ রোজ

কেদারাবিলাস ************************************** বয়েস হল দাঁত পড়ল হল বাঁধালেম আবার। এত অল্পেই সব কিছু করব কেন সাবাড়? চুল পাকলে কালো করি, সবুজ হল মন, ফু্লটুসিকে আবার মনে পড়ছে সারাক্ষণ। 'হরে কৃষ্ণ' ছেড়ে এবার ধরি 'ফিরে চলো'; অর্কুট তো উঠেই গেল, ফেসবুক টা এল। কান মলে দেওয়া সেই পণ্ডিত মশাই... জানেনই না তার ছেলেও খায় আমারই ধোলাই। চেয়ারই তো দেখি শুধু আজ ঘরে-বাইরে চাটাইগুলোর যায়গা হল মাচার উপরে মোবাইলটাও নতুন আজ, ভেগেছে ফুচকাওয়ালা তেঁতুল জল ছেড়ে আজ পিৎ্জা খাওয়ার পালা। লাল সবুজ গেরুয়াগুলো আজ অন্য লোকে পরে, নীল-সাদাকেও দেয়নিকো আজ বিতর্ক ছেড়ে। শুধু, রয়ে গেছে সেই পুরনো টিফিন বাক্সখানা... আর রয়েছে জমানো কিছু স্মৃতির আনাগোনা।

1118

16

ঝড়

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

মানুষ স্বপ্ন দেখে| অহরহ‚ প্রতিনিয়ত| কিছু স্বপ্ন সত্যি হয়‚ কিছু হয় না| কিন্তু সত্যি না হলেও কিছু স্বপ্ন আবেশ রেখে যায়| তেমনই কিছু স্বপ্নের আবেশ ধরে রাখার প্রচেষ্টা|

1316

30

দীপঙ্কর বসু

কলঙ্কিত নায়ক রথীন্দ্রনাথ

গতকাল মনোজদার কাছ থেকে শুভম নামে একটি পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা ধার করে এনেছি । বইটা হাতে পেয়ে কয়েকটা পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে "রথীন্দ্রনাথের শেষ জীবন"শীর্ষক একটি প্রবন্ধের ওপরে চোখ আটকে গেল । প্রবন্ধ লেখক নিত্যপ্রিয় ঘোষ । লেখাটি আগ্রহ জাগালো বিশেষত এই কারণে যে রথীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খুব সামান্যই জানি । তার একটা কারণ হয়তো ব্যক্তি রথীন্দ্রনাথ আজীবন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত পিতার খ্যাতির ছায়ায় নিঃশব্দে রবীন্দ্রনাথের বহু কাজের বোঝা টেনে গেছেন আজীবন - স্বয়ং বহু গুনের অধিকারী হওয়া সত্বেও নিজেকে তেমন ভাবে জনমানসে নিজেকে মেলে ধরেননি অথবা বিশ্ববিশ্রুত পিতার প্রতিভার দীপ্তির ঔজ্জ্বল্যে ঢাকা পড়ে গেছে তার নিজস্ব দীপ্তি । যেমনটা হয়েছে দ্বিজেন্দ্রনাথ ,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রমুখ রবীন্দ্রাগ্রজদের ক্ষেত্রে । প্রবন্ধের শীর্ষক দেখেই সহজে অনুমান করে নেওয়া যায় যে যে রথীন্দ্রনাথের প্রযুক্তিবিদ্যাগত প্রতিভা অথবা শিল্পকলায় তাঁর নিজস্ব অবদান এর ওপরে আলোকপাত করা প্রবন্ধের লক্ষ্য নয় - লক্ষ্য রথীন্দ্রনাথের জীবনের একটি কলঙ্কিত অধ্যায় এবং সেই কলঙ্কের বোঝা কাঁধে নিজের পিতার সৃষ্ট ( যার পিছনে স্বয়ং রথীন্দ্রনাথের অবদানও কম নয়) বিশ্বভারতির সঙ্গে যাবতীয় সংস্রব ত্যাগ করে সুদুর দেহরাদুনে চলে যেতে বাধ্য হবার কাহিনীকে তুলে ধরা । রবীন্দ্রনাথের প্রয়সণের পর রথীন্দ্রনাথের হাতেই ছিল উপাচার্য হিসেবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনভার । বিশ্বভারতীর আর্থিক অনটন মেটানর জন্য দীর্ঘকাল নানান সংগ্রামে পরিশ্রান্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই রথীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বভারতীকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তন করতে । রথীন্দ্রনাথ অবশেষে সফলও হয়েছিলেন ।কিন্তু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যাল্যয় হিসেবে ্বিশ্বভারতীর রূপান্তর ব্যক্তিগত ভাবে রথীন্দ্রনাথের পক্ষে শুভফলদায়ী হয়নি । তিনি ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করছিলেন যাদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকাল কর্মসচিব হিসেবে কাজ করে এসেছেন সরকারি শাসনে যাবার পর তারা রথীন্দ্রনাথকে আর ততটা মান্য করে চলতেননা । তারা প্রতি পদে কর্মসমিতির সভায় কাজে এবং কথায় যে ভাবে রথীন্দ্রনাথের বিরোধীতা করতেন তা রথীন্দ্রনাথকে বিমূঢ করে ছিল। একই সঙ্গে তারা রথীন্দ্রনাথের নৈতিক চরিত্র নিয়ে একটা প্রচারাভিযানে নেমে পড়েছিলেন । সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলও তারা তাদের প্রচারে ইন্দিরাদেবী , মীরাদেবী(ছোটো বোন) এমনকি খোদ স্ত্রী প্রতিমাদেবীর সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন !! অভিযান চলেছিল শান্তিনিকেতন আশ্রমেরই এক বাসিন্দা কমলা বিশীর কন্যা মীরার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের মেলামেশাকে কেন্দ্র করে । পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে রথীন্দ্রনাথের মধ্যস্থতায় এক সময়ে মীরার বিয়ে হয় আশ্রমেরই এক প্রাক্তন ছাত্র নির্মল চ্যট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে । এক যোগে সতীর্থদের এবং পরিবারের ঘনিষ্ট জনেদের মিলিত আক্রমনে দিশাহারা হয়ে অবশেষে ১৯৫৩ সালে রথীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদে ইস্তফা দিয়ে শান্তিনিকেতন ত্যাগকরেন চিরদিনের এই ভাবেই দিনে দিনে শান্তিনিকেতন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে ।প্রবন্ধকার যেমন গোটা প্রবন্ধে কোথাও মীরা চট্টোপাধ্যায় ওঁ রথীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে সমাজবহির্ভূত সম্পর্কের কেচ্ছার সত্যাসত্য বিচারের চেষ্টা করননি তেমনি আমার পক্ষেও কোন সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়া অসম্ভব । শুধু দুঃখিত বোধ করি একটা মহান স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে দেখে ।

1380

8

ঝরাপাতা

মুক্তি

প্রতিটি মানুষের সহজাত স্বভাব, সে বন্ধন্মুক্ত হতে চায়। মুক্তি চাওয়াটা কোনরকম অলংকার চাওয়ার মত ব্যাপার নয়। এর প্রয়োজনীয়তা আছে জীবনের জন্য। শুধু মানুষ কেন, প্রানীরাও স্বাধীনতা চায়। বাচ্চারাও কোন বন্ধন চায়না। আমারা দেখে থাকব যদি একটি শিশুর গলায় একটি মালা পরিয়ে দেওয়া হয়, সে তার সহজাত স্বভাবে ওটাকে টেনে খুলে ফেলতে চাইবে কারন শিশুটি বন্ধন চায় না। মুক্তি আমাদের প্রকৃত স্বভাব। কিন্তু প্রতিদিনকার জটিলতায় আমরা যে একটু একটু করে সেটা হারিয়ে ফেলি আর অলঙ্কারের মত জড়িয়ে রাখি আমাদের অনাবশ্যক পরিস্থিতিগুলকে। এই ভার বহন করতে করতে একসময় আমরা পালিয়ে বাঁচতে চাই। ভাবি এরই নাম মুক্তি। মুক্তি হোল আমার নিজস্ব আবেগ(emotional garbage) থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এক জঙ্গল সমান দুশ্চিন্তা যা আমাকে কষ্ট দেয় সেই সব ভারকে দূরে সরিয়ে বাঁচার নাম মুক্তি। মুক্তি আমার ভেতরেই বিদ্যমান, তাকে খুঁজে নেওয়ার নামই মুক্তি। *** এই নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। আজ এই পর্যন্ত।

1174

4

শিবাংশু

ব্যাপ্ত হোক.

যদিও ইস্টার প্রাচীন পূর্ব সেমিটিক প্রজনন, প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইশতারের সঙ্গে জড়িত একটি উদযাপন, কিন্তু খ্রিস্টিয় ঐতিহ্যে তা একটা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে এসেছিলো। নিউ টেস্টামেন্ট বলে, ইস্টার পর্বটিই সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ খ্রিস্টিয় উদযাপন। তাঁদের মতে এর মধ্যে দিয়েই মৃত্যুর উপর শাশ্বত জীবনের জয় ঘোষণা করা হয়। খ্রিস্টের নশ্বর পার্থিব অস্তিত্বের পুনরুত্থান তত্ত্বটি অনেকে স্বীকার করেন না। কিন্তু এর সঙ্গে বিজড়িত প্রাগৈতিহাসিক লোকাচার, যেমন পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি প্রার্থনা বা খ্রিস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সেমেটিক ইহুদি প্রথা পাসওভার ও সামূহিক শোকপর্ব লেন্টকে যদি যুক্তির বিচারে বাতিলও করা হয়, তবু "ব্যাপ্ত হোক জীবনের জয়...." আহ্বানটির মানবিক মূল্য স্বীকার করতেই হবে। ইস্টার হয়তো সেই জন্যই একটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যাপন। --------------------------- দুঃখশোক, তৃষ্ণার উপর জীবনের জয়'কে যিনি মানুষের একমাত্র সার্থকতা হিসেবে স্বীকার করেছিলেন, ইস্টার উদযাপন করতে আজ সকালে তাঁর কাছে যাবার ইচ্ছে হলো। নাহ, খ্রিস্ট ন'ন, তাঁর দর্শনগুরু শাক্যমুনি গৌতমবুদ্ধকে স্মরণ করে যে 'শান্তিস্তূপ'টি নিপ্পনভক্তরা স্থাপন করেছিলেন ধবলগিরি বা ধৌলি'তে, সেখানেই রওনা দিলুম কিছুক্ষণ বসার জন্য। কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে দেখা করা, কথা বলা। শব্দহীন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাওয়া সেই মানুষদের, যাঁদের দৌলতে পৃথিবী এতো হিংস্র অপহ্নবের শিকার হবার পরেও মানুষের বাসযোগ্য হয়ে রয়ে গেছে। ------------------------------------------ শহর থেকে একটু দূর, নদী পেরিয়ে অনুচ্চ পাহাড়টির কাছে যাওয়া। ভোরসকালে গাড়ির ভিড় থাকেনা। যতোটা উপরে যাওয়া যায়, ততোদূর গাড়ি পৌঁছে যায় অনায়াস। ভোরের আলোয় সেই শাদা বিরাট স্তূপটির পিছনে যখন সূর্য একটু একটু করে বেড়ে ওঠে, পশ্চিমমুখী মূল প্রবেশ থেকে তাকে খুব বিনম্র মনে হয়। এই টিলাটি এককালে পিয়দস্সি অশোকের প্রিয় ভূমি ছিলো। দয়ানদীর পারে এই পাহাড়টির ভিত্তিভূমিতে অশোক স্থাপন করেছিলেন তাঁর দণ্ডনীতির বিশদ শিলালিপি। কিংবদন্তি বলছে এই প্রান্তরেই কুখ্যাত কলিঙ্গযুদ্ধের রক্তস্নান দেখে চণ্ডাশোকের ধর্মাশোক হয়ে ওঠা। যদিও এসবের কতোটা কাহিনী, কতোটা ইতিহাস, বলা যায়না, তবু এর স্থানমাহাত্ম্য অস্বীকার করার মতো নয়। প্রামাণ্য বৌদ্ধ ইতিহাসে প্রাচীন ধৌলি রাজ্য ও তার প্রভাবের ইতিবৃত্ত অনেক সূত্রেই আমরা দেখতে পাই। ---------------------------------------------- ১৯৭২ সালে জাপান বুদ্ধ সঙ্ঘ এবং কলিঙ্গ-নিপ্পন বুদ্ধ সঙ্ঘের মিলিত প্রয়াসে, জাপানের নিচিরেন বৌদ্ধগোষ্ঠীর নিপ্পনজেন মিয়োহোজি মঠের প্রধান ভিক্ষুর তত্ত্বাবধানে এই স্তূপটির স্থাপনা হয়। নাম দেওয়া হয় 'শান্তিস্তূপ'। অগণ্য শ্রেষ্ঠ মন্দিরের দেশ, ওড়িশা ও ভুবনেশ্বরের গরিমা মনে রেখেও এই স্তূপটি বিশালত্ব ও গাম্ভীর্যে মানুষের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য স্বতোৎসার আকর্ষণ করে চলেছে। এর চারপ্রান্তে বুদ্ধের বাল্যমুদ্রা, ভূমিস্পর্শমুদ্রা, ধর্মচক্রপ্রবর্তনমুদ্রা এবং মহাপরিনির্বাণের অনুপম মূর্তিগুলি নির্মিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বাস রিলিফ প্যানেলে বুদ্ধের জীবনকালের ধারাবিবরণী এবং কলিঙ্গ ইতিহাসে বৌদ্ধ সভ্যতার ইতিবৃত্তও দেখা যায়। ওড়িশার দিগগজ ভাস্করদের যোগদানে এই সব কলাকৃতি যে আধুনিক ভারতের ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের একটা পর্যায় হয়ে উঠতে পেরেছে, সেটা নিশ্চিত। শৈলি বিচার করলে এই সব ভাস্কর্য দেশের দুই শ্রেষ্ঠ ঘরানা, কলিঙ্গ ও মথুরা'র মিশ্রণ। ------------------------------ সচরাচর পুরী যাবার পথে ব্যস্ত পর্যটকের দল ত্বরিত যাত্রাভঙ্গ করে এই স্তূপটি দেখতে আসেন। কিন্তু শুধুমাত্র পর্যটক আকর্ষণ নয়, এর কাছে চাইলে আরো অনেক কিছু পাওয়ার আছে। এই অর্বাচীন নির্মাণটির হয়তো অনুরাধাপুরা বা সারনাথের মতো কোনও গরিমাময় ইতিহাস নেই ; কিন্তু এই ঠিকানায় দুদণ্ড শান্তিতে বসে নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো মৌন অবকাশ দেশের খুব কম দেবস্থানেই পাওয়ার সুযোগ হয় । ঐ উঁচু পাহাড়ের শিখর থেকে দেখা দয়ানদী, আদিগন্ত সবুজ প্রান্তর, ভাসানো হাওয়ার প্লাবন, নীলাচলের দিকচিহ্ন ঘেরা অপার চরাচর , আমাদের দশ ফুট বাই দশফুট পৃথিবীর গারদখানার শিকল থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও, মুক্তি দেয়। সব সাধনই তো বাঁধন ছেঁড়ার। কালসমুদ্রে আলোর যাত্রী হওয়ার ক্ষণিক আনন্দ কখনও কখনও হরিপদ কেরানিরও নসিব হয়ে যায়, এইভাবে।

1051

8

শিবাংশু

বুরা না মানো....

হোলির বাজারে একটাই স্লোগান। বুরা না মানো, হোলি হ্যাঁয়। হাজার বছর আগে রাজারা বছরের এই একটা দিন ভাঁড়েদের অনুমতি দিতেন তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা বটকেরা করার জন্য। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। তা কেউ না মানলেও বিহারিদের জন্মগত ভাঁড়ামির অধিকারে হোলির দিন " সা রা রা রা রা" র জলে এসব শৌখিন মজদুরিকে রঙের বালতিতে চুবিয়ে দেওয়ার গপ্পো শেষ হওয়ার নয়। -------------------------------------- যেমতি আমরাও পাড়াগেঁয়ে লোক; এবং সেই অধিকারে হোলির রংবাজি করতে আটকায় কে? একটু চান্স নেওয়া যাক। আমাদের কচি বয়সে শহরের লোকেদের প্রতি মনোভাবটি ছিলো, " তোমাদের দিকে তাকাইয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই...."। ঠিক যেন রেঙ্গুনের শরৎ আর জোড়াসাঁকোর প্রিন্স। আমাদের সব চেয়ে কাছের কাছের শহর কলকেতা। তা, সেখানের লোকজন সম্পর্কে ভাগলপুরের ন্যাড়া একটাই পরিভাষা তৈরি করে দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, যার কর্তাপদ দর্জিপাড়ার নতুনদা। আর কর্ম মানে " ঠুন ঠুন পেয়ালা।" বাল্যকালে যখনই কলকেতায় যেতুম (আফটার অল আমরাও তো সাবেকি বিডন স্ট্রিট আর নতুনবাজার পার্টি । কিন্তু পূর্বপুরুষ প্রকৃষ্ট সময়ে স্বর্গ হইতে বিদায় নিয়েছিলেন), চোখে পড়তো সেই সব উজ্জ্বল বঙ্গবীরদের যাঁরা সেরেফ গামছা সম্বল হয়ে রাস্তার পাশের রকে জ্ঞানগর্ভ মণিমুক্তো ছড়িয়ে যেতেন। ঘনাদার হুতুমি এডিশন সব। আমরা বলতুম, হাওড়া ব্রিজের পশ্চিমের দুনিয়াটি সম্বন্ধে কিছু না জানলেও আইসল্যান্ডের বাজারে কোন বস্তুটি সস্তায় পাওয়া যাবে, সেটা তাঁদের নখদর্পণে। বিস্ময়ের আর কী দোষ? আমরা তো অভিভূত হয়ে থাকতুম। একটু বড়ো হবার পর, মানে হাই ইশকুল তক যেতে যেতে ছবিটি পাল্টে যখন পরিবত্তোন হলো, তখন কহানিতে ভিন্ন টুইস্ট। শ্রেণীশত্রু নিধনের সময়। স্টেনসিলকাটা চিনের চেয়ারম্যানকে আধ ময়লা নোনাধরা দেওয়ালে দেখলেই সাবধান হয়ে যাওয়া। অচেনা গলিতে, আধোচেনা পাড়ায় উঁকি দেওয়া একেবারে মানা। যতো অপ্রতিরোধ্যই হোক না কেন, রাইকিশোরির পিছু পিছু একটা সীমানা পর্যন্ত গিয়েই চুপচাপ টক করে ট্র্যামে উঠে যাওয়া। হাওয়ায় খানিকটা দীর্ঘশ্বাস....নিরেট কার্বন ডাই অক্সাইড.... ------------------------------------ আমাদের গ্রামে কিছু অরণ্যের প্রবাদ ছিলো। কলকেতার লোকদের 'সড়া অন্ধা' টেস্টটি কী? সুনিশ্চিত হবার ছাপটি কেমন ? কোনও মজ'বুড়ো তার খুব সোজা উত্তর দিয়েছিলেন। পাকা ছেলে আর ন্যাকা মেয়ে। কলোসাল রাজনৈতিক ভুল উক্তি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আমার কলকাত্তাই সখিরা অবশ্য এসব 'অবিমৃষ্যকারিতা' ( মানেটা জানিনা, তবে বিরাট কিছু হবে মনে হয়। কী ওজন?) মাফ করে দেন। মজা হলো, ছেলেরা পাকা কি না তা নিয়ে আমাদের বিশেষ মাথাব্যথা ছিলোনা। কিন্তু আমাদের গ্রামের মেয়েরা কলকাতার মেয়েদের মতো শৈল্পিক ন্যাকামি এক্কেরে করতে পারতো না। পাঁচভাগ করতো ওভারডু আর পঁচানব্বই ভাগ আন্ডারডু। হ্যাঁ, আমাদের গাঁয়ের বান্ধবীরা আর একটি কাজ পারতো না। তা হলো কলকাতার মেয়েদের মতো প্রসাধন করতে। তা তাদের যখন এই কথাটি বলা হতো, তখন তারা একযোগে, প্রায় ইউনিয়ন বানিয়ে, সরব উচ্চকিত হয়ে উঠতো, 'আমাদের ওসব ন্যাকামি আসেনা। ' কী মুশকিল, আমরাও তো সেই কথাই বলছি। একমাত্র সান্ত্বনা ছিলেন দাদু, ' যে পারে সে আপনি পারে, পারে সে ফুল ফোটাতে।' সঠিকমাত্রায় ন্যাকামি করতে পারা সৃজনশীল উদ্যম, সবার আসেনা। --------------------------------------- কেউ কেউ বলেন, নিজস্ত্রীর ন্যাকামি কেউ ( পড়ুন হীনমন্য 'পুরুষ' জাতি) সহ্য করেনা, কিন্তু পরস্ত্রীর সামান্য ন্যাকামির ইঙ্গিত দেখলেই দন্তবিস্ফার করে স্ট্যান্ডিং ওভেশন আর হার্মোনি সহযোগে 'বন্দে মাতরম' গীত। এতো শাশ্বত সত্য। যদি কিছু ফারাকই না থাকলো তবে পরস্ত্রীর গরিমা কীভাবে ফুটে উঠবে? প্রতিটি রহস্যময়ী নারী দুর্বৃত্ত উকিলি নিয়মে মাত্র একজন 'অযোগ্য' পুং স্পেসিমেনের বিবাহিতা স্ত্রী। অথচ বাকি বিশ্বচরাচর তো বিনিদ্র অপেক্ষা করে আছে তার পায়ের কাছে সাম্রাজ্য পেতে দিতে। এমন একটা জন্মগত সুযোগ ঠাকুর তো পুরুষদের দেননি। 'মহানায়ক' জাতীয় দুয়েকজন মাত্র মর্যাদাপুরুষোত্তম এই প্রিভিলেজের অধিকারী। বাকিরা কোথায় যাবে? --------------------------------------- হে মহতী, মর্যাদাশালিনী, করুণাময়ী, জগজ্জননী, পাপনাশিনী, ললিতাবৃন্দ, কৃপাভরে অক্ষম পুরুষজাতির পাপ মার্জনা করুন। এই গ্রহের লীলাখেলা শেষ হলেই আপনারা সবাই পুণ্যবলে বৈকুণ্ঠলোকে পাড়ি দেবেন আর পাপী পুরুষজাতি ফিরে যাবে তাদের রৌরব নরকে । তব তক কে লিয়ে আজ্ঞা দিজিয়ে , আপাততঃ, বুরা না মানো..... চলুক....

1267

5

ঝরাপাতা

গানে গানে

আজ দখিন-বাতাসে নাম-না-জানা কোন্ বনফুল ফুটল বনের ঘাসে। 'ও মোর পথের সাথী,পথে পথে গোপনে যায় আসে।' কৃষ্ণচূড়া চূড়ায় সাজে, বকুল তোমার মালার মাঝে, শিরীষ তোমার ভরবে সাজি ফুটেছে সেই আশে। 'এ মোর পথের বাঁশির সুরে সুরে লুকিয়ে কাঁদে হাসে।' ওরে দেখ বা নাই দেখ, ওরে যাও বা না-যাও ভুলে। ওরে নাই-বা দিলে দোলা, ওরে নাই-বা নিলে তুলে। সভায় তোমার ও কেহ নয়, ওর সাথে নেই ঘরের প্রণয়, যাওয়া-আসার আভাস নিয়ে রয়েছে একপাশে। 'ওগো ওর সাথে মোর প্রাণের কথা নিশ্বাসে নিশ্বাসে।' https://youtu.be/z3A3y6OyDLU

1050

7

dalia mukherjee

পূজোবিভ্রাট ( শেষ পর্ব)|

ওদিকে শুরু হয়ে গেছে ফুল বিতরণের পালা। ন্যাপলা একটু ভদ্রভাবে বসে গেল চক্ষুবুজে। বোসকর্তা বোসগিন্নিকে চুপি চুপি বললেন, " চুপ করে যাও গিন্নি, যা বলছে তাই কর। নইলে কে জানে, তোমার ও মুখে কালসিটে পড়ে যেতে পারে!।" গিন্নি আর কি করেন? অঞ্ছলীর ফুল হাতে ধরলেন, ততক্ষনে ক্যাসেটে মন্ত্র শুরু হয়েছে, " যা দেবী, সর্ব্বভুতেষূ, শক্তিরূপেন সংস্থিতা, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ নমঃ নমা।" সবাই সমস্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন, কিন্তু বোসগিন্নি যেন বাকশক্তি রোহিত হয়ে গেছেন? গলা তাঁর শুখিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে তো এককাপ চা ও পেটে পড়েনি! মনে মনে বললেন," ক্ষমা কর মা, এই অবলাকে ক্ষমা কর। এই হতচ্ছাড়া পাড়ার ছেলেগুলোকে নরকেও ঠাঁই দিওনা, কিন্তু আমি নিরূপায়, আমাকে ক্ষমা কর মা গো।" কোন রকমে অঞ্ছলী পর্ব শেষ করে প্রসাদের থালা হাতে নিয়ে কর্তার সঙ্গে ফিরে এলেন বোসগিন্নি। কর্তা বললেন," গিন্নি, এই এখনকার যুগের পূজো। এই পূজোকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। নয়তো আমাদের ও ওই পুরুতদের মত হাল হবে। মুখে কালসিটে পড়বে। এখন তো তবু পুরুত পাওয়া যাচ্ছে, এরপরে তাও জুটবেনা। পুরুতরা সব বড় বড় চাকরী নিয়ে কোলকাতা ছাড়বে। অবস্থা তখন আর ও জটিল হয়ে যাবে।" বোসগিন্নি" হা কপাল," বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এই পূজোর জন্যে এত কান্ড, এত প্যান্ডেলের জৌলুস, ১৫০ টাকা চাঁদা দেওয়া?" না, সামনের বছরে অন্য ব্যাবস্থা করবে গো কর্তা , আর যাইহোক, এই কোলকাতায় আর নয়।" কর্তা নিঃশব্দে সায় দিলেন, এ ছাড়া আর উপায় ই বা কি?? (শেষ)

1032

6

শিবাংশু

হোলি খেলত নন্দলাল

'প্রদ্যোতস্য সুতা বসন্তসময়স্তংচেতি নাম্রা ধৃতি কামঃ কামমুপৈত্বয়ং মম পুনর্মনৈ মহানুৎসবঃ ।।' ( শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকে কামউৎসবে রাজার উক্তিঃ সপ্তম শতক) --------------------------- 'প্রদ্যোতের কন্যা ( রতি দেবী), বসন্তসময় এবং তুমি বিদ্যমান। অতএব নাম দ্বারাই কাম পর্যাপ্ত সন্তোষ লাভ করুন। এই মহান উৎসবকে ( বসন্তকালীন কামমহোৎসবকে) নিজস্ব উৎসব মনে করছি। ' --------------------------------------- জীমূতবাহন লিখেছিলেন দায়ভাগ গ্রন্থ দ্বাদশ শতকে। তা'তে রয়েছে হোলাক বা হোলক উৎসবের কথা। সারা উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশেও এই উৎসবটির সম্যক প্রচলন ছিলো। সময়ের সঙ্গে এই পার্বণটির ক্রমবিবর্তন বেশ আকর্ষণীয় বিষয়। আদিযুগে এই উৎসবটি ছিলো কৃষিসমাজের পূজা অনুষ্ঠান। শস্যপূর্ণা চ বসুন্ধরার কামনায় নরবলি ও যৌনলীলাসম্পৃক্ত নৃত্যগীত উদযাপন ছিলো এর মুখ্য অঙ্গ। এই অনার্য ঐতিহ্যের সঙ্গে পরবর্তীকালের বৈদিক উপচার হোমযজ্ঞ মিলে যায়, নরবলির বদলে পশুবলি প্রচলিত হয়। সুশস্যকামনায় পূজা অর্চনার ক্ষেত্রে যেমন বলি ও যজ্ঞ গৃহীত হয়, একইভাবে হোলির শৃঙ্গাররসমুখর দিকটি কেন্দ্র করে বসন্ত, মদন ও কাম উৎসবের এবং রাধাকৃষ্ণের লীলাখেলার উৎপত্তি হলো। এর সঙ্গে কোন এক মূর্খ রাজাকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার জন-ইচ্ছাটিও প্রথা হিসেবে সামগ্রিকভাবে হোলি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলো। --------------------------- যেরকম নথিভুক্ত ইতিহাসে দেখা যায়, তৃতীয়-চতুর্থ শতকে, অর্থাৎ গুপ্তযুগের প্রাথমিক সময়কাল থেকেই ষোড়শ শতক পর্যন্ত সম্পূর্ণ পুরাণযুগে বসন্ত বা মদন বা কামমহোৎসব নামে একটি উৎসব উত্তরভারতের সর্বত্র অতিসমারোহে পালিত হতো। এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায় তৃতীয়-চতুর্থ শতকে বাৎসায়নের কামসূত্রে, সপ্তম শতকে শ্রীহর্ষের রত্নাবলীতে, অষ্টম শতকের মালতী-মাধব নাটকে, একাদশ শতকে অল-বিরুনির লেখায়, দ্বাদশ শতকে জীমূতবাহনের কালবিবেক গ্রন্থে এবং ষোড়শ শতকে রঘুনন্দনের বিবরণে। এই উৎসবে প্রচুর নৃত্যগীতবাদ্য, শৃঙ্গারসূচক সংলাপ ও যৌনতাব্যঞ্জক অঙ্গভঙ্গি মুখ্য স্থান নিয়ে থাকতো। পূজা অনুষ্ঠানের অভীষ্ট দেবতা ছিলেন মদন ও রতি দেবী এবং পুষ্পময় চৈত্রের অশোকবৃক্ষের ছায়ায় তার আয়োজন করা হতো। সপ্তম শতকে রচিত শ্রীহর্ষের রত্নাবলী নাটকে মদন মহোৎসবে ভিজ্যুয়ালটি এইভাবের বর্ণনা করা হচ্ছে, 'অহো, পৌরগণের আহ্লাদ অত্যন্ত উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইতেছে, যেহেতু দিবস প্রারম্ভতুল্যকারী কুন্কুমচূর্ণবদ গৌর , বিক্ষিপ্ত পীত চূর্ণরাশি ও স্বর্ণালংকরণ দীপ্তি এবং কিণ্কিরাত পুষ্পশোভিত ভার অবনত পীত পরিচ্ছদশোভিত কৌশাম্বী নগর যেন স্বর্ণদ্রব মন্ডিত লোকযুক্ত হইয়া শোভা পাইতেছে'। (অর্থ, পীত বস্ত্রশোভিত পুরবাসীরা পীতচূর্ণরাশি ( আবির) প্রক্ষেপ করে অশোকবৃক্ষের ছায়ায় স্বর্ণমন্ডিত হয়ে কামউৎসব উদযাপন করছে।) যেরকম অনুমান করা হয়, ষোড়শ শতকের পরবর্তীকালে চৈত্রীয় কামমহোৎসব, ফাল্গুনী দোলপূর্ণিমায় প্রচলিত হোলি উৎসবের সঙ্গে মিলে যায় এবং মদন উৎসব উদযাপনের দিন শেষ হয়ে যায়। আসলে মুসলিম রাজাদের আমলে হোলি উৎসব রাজ অনুগ্রহে প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং মদন উৎসবকে গ্রাস করে নেয়। তবে এর ধর্মীয় দিকটি বেঁচে থাকে যখন একাদশ শতক নাগাদ রাধাকৃষ্ণের ঝুলন উৎসব এই চৈত্রীয় পার্বনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। অল-বিরুনির বিবরণ ছাড়াও গরুড় ও পদ্মপুরাণে এমত পড়া যায়। তারও পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠান চৈত্র পূর্ণিমা থেকে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এগিয়ে আসে। এই উৎসবের প্রধান পালনীয় কৃত্য ছিলো ঝুলন আরোহী রাধা ও কৃষ্ণের প্রতি সখিসহচরীরা আবীর, কুমকুম ও পুষ্পবৃষ্টি করবে। বাংলায় এই জন্যই উৎসবটিকে 'দোলযাত্রা' বলা হয়, ঝুলনে দোলায়িত পুরুষ-প্রকৃতির যুগ্মসম্মিলনের দৈবী মাহাত্ম্য মুখর এর গরিমা। প্রাক বৈদিক আদিম কৃষিজীবী সমাজের ব্যাকানালিয়ার উদযাপন ব্রাহ্মণ্য প্রভাবে হোলির বর্তমান রূপে বিবর্তিত হয়েছে। এখনও এই উৎসব মূলত 'শূদ্রে'র উৎসব। হোলিকাদহন বা বাংলায় যার নাম চাঁচর, তার আগুন অস্পৃশ্য শূদ্রদের থেকে গ্রহণ করার বিধি রয়েছে। ----------------------------------- উত্তর ভারতে প্রচলিত হোলি উৎসবের যে সাধিত অমার্জিত উদযাপন রয়েছে তার থেকে ঊনবিংশ শতকের বাবুকালচারভিত্তিক নাগরিক বাঙালির 'দোলযাত্রা'র চোরাস্রোত আর অবক্ষয়ের ডাইনামিক্সের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য ছিলোনা। এই পর্যায় থেকে দোলউৎসব উদযাপনে ব্রাহ্ম রুচিবোধ ও য়ুরোপীয় সফিস্টিকেশন নিয়ে আসার কৃত্যটি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেকালের বাঙালির থেকে একালের বাঙালির রুচি ও মননবোধে আরো অসংখ্য পরিমার্জন সাধনের পথে কবির এই প্রয়াসটিও অল্পবিস্তর সফল হয়েছিলো। তবে শান্তিনিকেতনী দোলের পৌত্তলিকতা, কালিদাসের কুমারসম্ভব বা বিহার অওধের শারীরমাংসে তপ্ত "রং বরসে" জুনুন, সবই পরস্পর পৃথক নিগূঢ় রণিত সন্ধান। দিনের শেষে উৎস খুঁজতে গেলে হোলি একান্তভাবে মানুষের উৎসব। দৈবী মহিমা আরোপ করে তার প্রতি অবিচার করার কোনও হেতু নেই।

1215

6

শিবাংশু

মলয় আসিয়া

একটা গান হঠাৎ শুনতে শুনতে একজনের কথা মনে পড়ে গেলো। এই সব গানের স্মৃতিচারণে আমাদের শৈশব-কৈশোরের একটা মেদুর পর্যায় পায়ে পায়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। এইচ এম ভি'র শারদ-অর্ঘ নামক বইটি, যেটি হাফ-ক্রাউন সাইজে ছাপা হতো। শিল্পীদের প্রতিকৃতির পাশে দু'টি গানের লিরিকসহ গীতিকার-সুরকারের নাম। শাদাকালো ছবি, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের ছবি বদলাতো না। ভূপেনদার গুর্খা ক্যাপ, চোখে রেব্যান কালো কাঁচ, প্রতিবার একই রকম। যতোদিন ইশকুলে ছিলুম, বইয়ের দোকানে গিয়ে নাড়াচাড়া করতুম বইটি। কলেজে ওঠার পর কিছু পয়সা বাঁচিয়ে কিনে ফেলতুম। তার পর রোববার আড়াইটা বাজলেই রেডিওর সামনে বসে পুজো করার মতো নিষ্ঠায় পছন্দের গানগুলি গলায় তোলার চেষ্টা। প্রথমে মান্না'দা, তার পর মানবেন্দ্র বা শ্যামল, হেমন্তও। কলেজে শোনাতে হবে, সে কি চাপ। ------------------------------- যতোদূর মনে পড়ছে ১৯৬৫-৬৬তে আমার মামাশ্রী একটা জলসা শুনে এসে বাড়িতে উচ্ছ্বসিত ঘোষণা করলেন, তোদের মান্না দে'র অন্ন উঠলো এইবার। আমি তো তখন নেহাৎ বালক, প্রায় শিশুও বলা যায় গানের বিচারে। তাঁর দিদি, মানে আমার মা বলেন, কেন রে? মামা একেবারে ঘোরগ্রস্ত হয়ে বলতে থাকেন, কাল বুঝলি একটা ছেলের গান শুনলাম, কোথায় লাগে মান্না দে? শুরু করলো একটা গান দিয়ে , " শ্রীমতী যে কাঁদে" কী রেঞ্জ রে বাবা, আর তেমন মিষ্টি। এবার পুজোয় নাকি রেকর্ড করেছে। মা বলেন, বেশ অনুরোধের আসরে শোনা যাবে এখন। তাই হলো এই গানটি বেশ কিছু মাস ধরে অনুরোধের আসরে বাজবেই। অন্য গানটা, " কিছু নেই, তবু দিতে চাই", সেটাও হতো। আমি তো তখন থেকেই মান্না দে'র একান্ত পাখা। খুব অবোধভাবে মা'কে প্রশ্ন করি, মা, এর পর কি আর কেউ মান্না দে'র গান শুনবে না? মা হাসেন। ----------------------------------------- তার পরেই একদিন স্থানীয়সংবাদে খবর তরুণ গায়ক মলয় মুখোপাধ্যায় একটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। পিছু পিছু আনন্দবাজার। আমার মামা তো তো প্রায় অন্নজল ত্যাগ করার মতো অবস্থা। বাবা বললেন এও তো দীপক মৈত্রের মতো-ই হলো। বহুদিন আগে এই গায়ক একটি সফল রেকর্ড করে গত হয়েছিলেন। --------------------------------- আরো বয়স হতে "শ্রীমতী যে কাঁদে" গলায় তুলতে পারলুম কি না জানিনা। সি-শার্পে তার সপ্তকে ধৈবত পর্যন্ত যায় প্রথম বিস্তারটি। এলেম লাগে। ঐ রেঞ্জটি তার পরে শুনেছি শুধু মান্নাদার গলায় "ও মেরি জোহরা জবিঁ" আর " যখন কেউ আমাকে পাগল বলে"র মুখড়ার বিস্তারে। গানের চলনটি একেবারে মান্নাদার স্টাইল, কিন্তু স্কেল আর সুর লাগানো মানবেন্দ্রের ঘরের। একটা মাত্র রেকর্ড করে ঐ পর্যায়ের খ্যাতি এবং তার পর ট্র্যাজিক নায়কের প্রতি ভালোবাসা, বাংলার শ্রোতাসমাজ মলয় মুখোপাধ্যায়ের প্রতি উজাড় করে দিয়েছিলো। অবশ্য আরেকটা কথা বলা হলোনা । এখন যখন মলয় মুখোপাধ্যায়ের গান'দুটি শুনি, তখন মনে হয় মলয় তাঁর সমসাময়িক জটিলেশ্বরের ধরণটাই নিয়েছিলেন। প্রায় একই সময়ে রেকর্ড হওয়া " কে যেন আমার কানে কানে বলে গেলো" বা "পাগল হাওয়া"য় জটিলেশ্বরের ছাঁদটি যেন অবিকল মলয়ের গানের মধ্যে পাচ্ছি। --------------------------- সব পলাশই শেষ পর্যন্ত ফোটেনা। তবু বসন্ত এসেই যায়। প্রিয় কবির কয়েকটা শব্দ ছড়ানো থাক এখানে, 'অমিল পয়ার ছন্দে রচিত বসন্তকাল শেষ হয়ে এলো। পথের উপর আজ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম চারিপাশে মাঠ কালো কালো ধান গাছে ঢাকা আছে, এই সব সুমুদ্রিত ধানগাছগুলি আমার এ জীবনের বসন্তের অভিজ্ঞতা। .... আমার ভরসা এই প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে স্বভাবত কিছু রস ঝরে যাবে মাঝে মাঝে বসন্তসন্ধ্যায়।' (বিনয়)

1312

6

দীপঙ্কর বসু

গান দিয়ে হাত বুলিয়ে বেড়াই এই ভুবনে

এক একটি গান হঠাৎ করে কেমন জানি পেয়ে বসে আমাকে । গানের শ্রোতাই বল , আর গাইয়ে বাজিয়েই বল,কম বেশি সবার ই এমনটা হয় মাঝে মাঝেই । ঘুরি ফিরি –সারাদিন সেই গান মনের মধ্যে একটানা বেজেই চলে । অনেক সময়ে দীর্ঘ দিন ধরে মগজে সে গানের কথাগুলি ,সুরের নানান বাঁক চোর হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে কোন এক অজানা রহস্য লোকের পানে । যেমন ,এখনি একটি গানের কথা মনে পড়ছে - “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়” – কিশোর বয়সে গানটি আমাকে যে কি গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল সেই স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে । গানটির অর্থ বোঝার বয়স সেটা ছিলনা ,এমনকি সুরের কারিকুরি , অথবা অলঙ্করণের কোন বৈশিষ্ট সচেতনভাবে চিহ্নিত করে উঠতে পারার ক্ষমতাও ছিল অনায়ত্ব । তবু – “দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে গানের সুরে আমার মুক্তি উর্দ্ধে ভাসে” গানের অন্তরার এই অংশটি যেন কোন যাদু মন্ত্রে এক অজানা মুক্তির আস্বাদ এনে দিত – আমাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিত এক বিশালত্বের সামনে । কথাটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের শোনালো কি ? একটি এগারো কি বারো বছর বয়সী বালকের কাছে “বন্ধন” , “মুক্তি” ইত্যাদি শব্দগুলোর কি কোন বিশেষ তাৎপর্য থাকে ? আরো কয়েক বছর পরে স্কুলে একটু উঁচু ক্লাসে পড়েছি - ”অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ” মানে বই মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লাইনটার ব্যখ্যা লিখেছি বটে ,কিন্তু সত্যিই কি সেই ব্যখ্যা লাইনটির কোনও ব্যঞ্জনা আমার হৃদয়তন্ত্রীতে সাড়া জাগিয়েছিল ? উত্তরটা খুবই সোজা – জাগায়নি । কিন্তু গানের সুরে সেই মুক্তির একটা অস্ফুট আনন্দরূপ অমোঘভাবে প্রতিধ্বণি জাগিয়ে তুলত আমার সেই এগারো বারো বছর বয়েসেই । আবার , সঞ্চারীতে – “ দুঃখ বিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে” পঙক্তিটি সুরে উচ্চারণের মধ্যদিয়ে যেরোমাঞ্চ জাগত ,তাও ভোলার নয় । তার ষড়জ থেকে ধাপে ধাপে মধ্য সপ্তকের মধ্যম স্বরে নেমে আসা এবং সেই একই স্বরে তেওড়া তালের সাত মাত্রা স্থিত হওয়ার মধ্যে যে শুধু সুরের নাটকীয়তাই প্রকাশ পেয়েছে তাই নয় ,সুরের ওই সাতমাত্রাকালব্যপী মধ্যম স্বরে স্থিতি জাগতিক সুখ দুঃখ, আপদ বিপদকে জয় করবার দৃঢ সঙ্কল্প বুঝি বা নিকষকালো অন্ধকারের মধ্যে স্থির অচঞ্চল দীপশিখার ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে মানসচক্ষে । অণৃতভাষনের দায় এড়াতে বলে রাখা ভাল যে সে বয়সে নিছক অনভিজ্ঞতার কারণেই রবীন্দ্রগানের বাণীর এই চিত্রে রূপান্তরের রহস্য স্পষ্টভাবে ধরা দেয়নি । তবে সেদিনের সেই রোমাঞ্চ ,সেই নিবিড় আনন্দ-অনুভুতি যে মিথ্যা ছিলনা ,সে কথা প্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করতে আমার দ্বিধা নেই । বস্তুত জীবনের অনেকগুলি বছর রবীন্দ্র গানের নিবিড় সান্নিধ্যে বসবাস করার ফাঁকে কখন জানিনা অতি সঙ্গোপনে এ গানের বানী-ব্যঞ্জনা সুরের পাখায় ভর করে আমার চেতনার ঘাটে এসে পৌঁছেছিল। তারই আলোতে রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় । তাই খুব অবাক হই ,কিছুটা বেদনা বোধ ও জাগে যখন কেউ নিছক শ্রুতিসুখের খাতিরে বা বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখচেয়ে অথবা শতাব্দী প্রাচীন রবীন্দ্র গানকে আধুনিক যুগের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার মহান ব্রতে ব্রতী হয়ে রবীন্দ্রগানের সুর নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় মাতেন ।

1092

11

কিকি

বই চই............. সিন্মা টিন্মা...............

লং জার্নী ! এই নামে একটা পত্রিকা দেখে কিনে ফেলি | পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখি আমাদের অদিতি ভট্টচার্যের লেখা - সিংহ সদনে কিছুক্ষন - গির জাতীয় উদ্যানে ও অভয়ারন্য নিয়ে লেখা | সব সিংহের ব্যাপার-স্যাপার ! - সিংহ পরিবারের একটা ছবি আছে - দেওয়ার ইচ্ছে ছিল ! এখন আর হলো না | নামটা থেকেই বোঝা যায় - পর্যটনের খবর বেশ কিছু আছে | স্বল্প সময়ের ও দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণের জন্যে ! - পড়তে ভালই লাগে ! মনোজ

1171

11

dalia mukherjee

পুজো বিভ্রাট

বোসবাবুদের পাড়ায় তিনটে দুর্গাপূজো হচ্ছে। তিন ক্লাবেব তরফ থেকেই পূজোর চাঁদা চাওয়ার হিড়িক, বোসবাবুর ওপর জোড় জুলুম সব ই হয়েছে। ২০০ টাকার নীচে ব্যাটারা চাঁদা নেবেনা, বোসবাবুও ১০০ টাকার বেশী দেবেননা। পাড়ার ছেলেদের চোখরাঙ্গানী, জুলুম, শেষে ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হল। সেই থেকেই বোসবাবুর মেজাজ খিঁচড়ে আছে। " কি দিনকাল এল, এ্যাঁ! মায়ের নাম করে ইচ্ছেমত চাঁদা দেবার ক্ষমতাও নেই! জোড় জবরদস্তির ব্যাপার হয়ে গেছে??' তার ওপর গিন্নির বায়নাক্কার ও শেষ নেই। মেয়ের এই বছর প্রথম বিয়ের বছর, প্রথম পূজো , তাই ভাল করে বিয়ের তত্ব করতেই হবে। ১০০০০ টি টাকা তো পূজোর বোনাস পেয়েছেন। মেয়ে জামাই, তার গুষ্টি গোত্তরকে পূজোয় দিতেই ৮০০০ বেড়িয়ে গেছে, মাত্র ২০০০ টাকা, গিন্নির ঘ্যান ঘ্যান, প্যানপ্যান আর সহ্য হচ্ছেনা বোসবাবুর।" মেয়ের বড়লোক শ্বশুরবাড়ি, তাদের সঙ্গে তুমি কি ছাপোসা মানুষ পাল্লা দিতে পারবে?"কিন্তু কে বোঝাবে? বলেনা, স্ত্রী বুদ্ধি, ভয়ংকরম। ওঃ, কি যে করবেন বোসবাবু ভেবে পাননা। গিন্নির মুখের সঙ্গে তো কোনদিন ই পাল্লা দিতে পারেননি। মনে হয়, এই পূজো গেলে যেন বাঁচেন। কোনমতে নিজের জমানো কিছু টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনে গিন্নির হাতে দিয়ে একটু শান্ত করতে পেরেছেন। আজ সপ্তমী, সেই সাতসকাল থেকেই মাইকে হিন্দি গান বাজছে। বোসগিন্নি অন্ধকার থাকতে থাকতেই উঠে পড়েছেন। বাড়িতে গোপাল আছেন, তাঁকে জল দিয়ে তারপর প্যান্ডেলে যেতে হবে পূজোর অঞ্জলী দিতে। স্নান সেরে বাগানে গিয়েই মাথা গরম হয়ে গেল বোসগিন্নির। " আ মল যা! হতচ্ছাড়ারা গাছের একটা ফুল ও রাখেনি গা! গোপালের পায়ে যে একটা ফুল দেব, সব তুলে নিয়েছে গা!'বোসবাবু বাইরে এসে গিন্নিকে বললেন, ' চিৎকার করে লাভ নেই গিন্নি, ওদের অ তো ফুলের দরকার।" তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন গিন্নি," তা তুমি বুড়ো ওঠতো সেই সাত সকালে, তুমি এই সময় একটু বাগানে বসে পাহাড়া দিতে পারনা??" " ওরে বাবা গিন্নি! তাহলে আমাকে আর স্বশরীরে আমাকে এখানে দেখতে পেতেনা। এতক্ষনে স্বর্গে পৌঁছে গেছি দেখতে। আজকালকার এই ছোঁড়াদের কিছু না বললেই তারা আগে হাত পা দিয়ে কাজ সারবে, তারপর যা করার তুমি কর। " গিন্নি গজগজ করতে করতেই যা দু একটা ফুল বাগানে ছিল, তুলে নিয়ে ঠাকুর ঘরের দিকে রওনা দিলেন, কর্তাকে তাড়া দিয়ে গেলেন, স্নান করে তৈ্রি হবার জন্যে। সকাল ৮ টা থেকে মাইকে ঘোষণা শুরু হল, " মাসীমা, দিদিরা, আসুন তাড়াতাড়ি, অঞ্জলী শুরু হচ্ছে।" বোসগিন্নির মাথায় আবার জ্বলল আগুন, " পোড়ারমুখো পুরুতের কি ক্ষিদে পেয়েছে গা! বলি বেলা ১১ টার আগে তো কখনোই অঞ্জলী শুরু হয়না, এবারে ৮ টার মধ্যেই অঞ্জলীর জন্যে তাড়া পড়ে গেছে গা! " যাইহোক, গোপাল তো জলখাবার খেয়েছেন, নতুন কাপড়খানা পড়ে , পূজোর থালা হাতে নিয়ে কর্তা গিন্নি চললেন প্যান্ডেলের দিকে। সেখানে গিয়ে তো আর একপ্রস্থ খাবি খাওয়ার পালা বোসগিন্নির। " বলি পুরুতের আসনে বসে আছে ওটা আমাদের ন্যাপলা না!!" পাড়ার একটি ছেলে এসে থামাতে যায়," মাসীমা, বেশী চেঁচাবেন না, আমাদের পুরুত মশাইকে ও পাড়ার ছেলেরা মেরে ধরে নিজেদের পাড়ায় নিয়ে গেছে, অন্য পুরুত পাওয়া গেলনা, তাই ন্যাপলাকে এনে বসিয়েছি।" বোসগিন্নির ভির্মি খাবার জোগার, কোনমতে চেঁচিয়ে উঠলেন," তা বামুন পেলিনা হতচ্ছাড়ার দল? ন্যাপলা কোন কায়েতের ছেলে, তাকে বসালি পুরুতের আসনে? বলি কলি কি শেষ হতে চলেছে??আমিষ খাওয়া কায়েতকে বানালি বামুন? তা ও মন্ত্রর কি জানে শুনি?" " ও মাসীমা, ও তো আর মন্ত্র পড়বেনা, মন্ত্র পড়া হবে ক্যাসেটে। " " সেটা আবার কি জিনিস হতচ্ছাড়ার দল।" "আরে মাসীমা সেকালের লোক, ক্যাসেট বুঝবেননা, বল রেডিও।" ফোরণ কাটল ওপাশ থেকে আর একটি ছেলে। মাসীমার চেঁচানি আর থামেনা, " বলি রেডিওতে মন্ত্র পড়বে স্বয়ং মা দূর্গার, আর ন্যাপলা পূজোর আসনে বসে ছ্যাবলামি করবে? বলি পূজো নিয়ে ছেলেখেলা নাকি? তোদের যে নরকেও ঢুকতে দেবে না রে!" ওদিক থেকে ন্যাপলা বলে ওঠে," তা না দিক মাসীমা, এখনকার মত কাজ উদ্ধার তো হল। পুরুতটাকে জবরদস্ত পিটিয়েছে ও পাড়ার ছেলেরা, বেচারার মুখে কালসিটে পড়ে গেছে, আমিও বহুৎ জোড় বেঁচে গেছি মার খেতে খেতে। পালিয়ে তবে বেঁচেছি।

1073

4

শিবাংশু

একজন উপেনের দুঃখ

গত ঊনচল্লিশ বছর কোনও জায়গায় টানা তিন-চার বছরের বেশি থাকিনি। কোথাও আঠা শুকোতে পায়নি।সারা দেশই আমার বাড়ি। মাঝে মাঝে ফিরে এসেছি জামশেদপুর, আবার উড়ে গেছি অচিরেই অন্য কোনও ঠিকানায়। কাছে, দূরে। কিন্তু জামশেদপুরই তো আমাদের বারাণসী, সুবর্ণরেখাই আমাদের গঙ্গা। থাকি না থাকি, ফিরে যাওয়া মানেই তো জামশেদপুর। জন্ম, ধর্ম, বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধুবান্ধব, সংক্ষেপে ঈশ্বর-পৃথিবী-ভালোবাসা সবই তো টাটাবাবার শহর। আমার বেড়ে ওঠার সাতাশ বছর যে কোম্পানি কুঁড়েঘরে। যার প্রতিটা ইঁটের সঙ্গে আত্মীয়তা ছিলো সুগভীর। তা এখন ধূলিসাৎ হয়ে বড়ো রাস্তা। শুধু উঠোনের আমগাছটা এখনো দাঁড়িয়ে। ঐ কাঠা দুই তো উপেনের ছিলোনা কোনওদিন। তাই বাবুও কিছু বলার প্রয়োজন বোঝেননি। আজ শুনলুম টিনপ্লেট গলফ মাঠ থেকে শুরু হওয়া তারকোম্পানি পর্যন্ত যে নিলডি'র ছায়াবীথি। দুপাশে বনস্পতির টানা সানসেট ব্যুলেভার্ড। বট, অশথ, গামার, শাল, মহুয়া, কৃষ্ণচূড়া, কদম, সব গাছ। তাদের প্রাচীন বল্কলে বেড়ে ওঠা গরিব আত্মীয়দের মতো স্যাপ্রোফাইট, পরজীবী উদ্ভিদের সলজ্জ সংসার, সব কাটা গেছে। প্রাচীন মহীরুহদের মৃতদেহগুলি পিরামিডের মতো সাজানো রাস্তার দুদিকে। ভাবতে পারিনা। -------------------------------------------- রাস্তা হবে, উন্নয়ন? গাড়ির জন্য জায়গা করে দেওয়া? কতো বাস্তববাদী প্রশাসন আমাদের। একটু কম হলে কী ক্ষতি হতো? উপেনের বাড়ির রাস্তাটা এতো অচেনা হয়ে যেতোনা। আমাদের সাইকেলের শহর, চড়াই রাস্তায় হাঁপানো, নামো রাস্তায় গড়গড়িয়ে উড়ে যাওয়া। ঘুরে ঘুরে ওড়া বটফল, ম-ম কদমফুলের সোঁদা বিকেল। দূর থেকে দেখি মেঘ উড়ে আসছে নিলডি'র ওপার থেকে, গোলমুড়ি ক্লাবের আঙিনায় আকাশছোঁয়া শালবীথির মাথা ছুঁয়ে, গলফ মাঠ পেরিয়ে ঝুমুর ঝুমুর জল ঝরাতে ঝরাতে মেঘ উড়ে গেলো। নামডি বস্তির হাই টেনশন তারের গ্রিড ভিজিয়ে উড়ে গেলো দখিন গ্রামে বার্মা মাইনসের গুডস ইয়ার্ড। --------------------------- আমরা তো বিভূতিভূষণ নই। আমাদের মেশিনের শহর, মিস্ত্রির শহর। জন্ম থেকে দেখি মেশিনের মধ্যে মানুষ, মানুষের মধ্যে মেশিন। পুরোনো অভ্যেস। বয়লারশপের গ্রীষ্ম, ফাউন্ড্রির তপ্ত বৈশাখ, পৌষের শেষরাতে পথে পথে শীতকাঁপুনির এ-শিফট। আমরা তো জানতুম মেশিন কুসুমের থেকে ভালো। অনেক কাছের। তার মন আছে। তার কোনও ঝগড়া ছিলো না ঐ শাল, শিরিস, অশথ, কদমের সঙ্গে। তাদের ফুলের সঙ্গে, তাদের ফলের সঙ্গে, তাদের না ফোটা কুঁড়ির সঙ্গে, তার নীচে হেঁটে যাওয়া, আমাদের না বলা কথাগুলির সঙ্গে। -------------------------------- এটা কী নষ্টোলজি? পদ্যওয়ালার বাতিক? পরিবেশের রাজনীতি? না নিষ্কম্মার নিরর্থক জাবর কাটা। যে যাই বলুক, আমি তো একেই উপেনের শাশ্বত হাহাকার বলে জানি।

1171

10

মনোজ ভট্টাচার্য

মায়া মৃদঙ্গ !

নাটক-সিনেমা তো বিনোদন মাত্র ! যাবেন দেখবেন এবং হলের বাইরে এসেই ভুলে যাবেন ! ব্যস ! – কিন্তু কই - কিছু কিছু থিয়েটার বা সিনেমা দেখে তো ভুলে যাওয়া যায় না ! – নিজে অনুধাবন করার চেষ্টা করি – অন্যকে বলার চেষ্টা করি ! - কেন? আসলে কিছু কিছু মানুষ আছেন – যারা বিনোদনের মাধ্যমকে মানুষের ভাবনাকে নাড়াতে ভালবাসেন ! মানুষকে কিছু দিতে চান – কিছু নতুন করে চিন্তা করার বস্তু ! মায়ামৃদঙ্গ – এমনই একটা সিনেমা ! সিনেমা বলতে আমার দ্বিধা হচ্ছে ! এটা যেন একটা নাটক – সেলুলয়েডের ওপর প্রান্তিক বাংলার একটা বাস্তবায়িত নাটক ! কিছু পোস্টার দেখে মনে হয় – আরেকটা সমকামী নাটক ! সচরাচর যা হয় আরকি ! দেখতে শুরু হওয়ার সময়েও তাই মনে হয় ! তা নয়ত আলকাপ গানের দলের এক সর্দারের দু দুটো বৌ থাকা সত্ত্বেও কেন তারই হাতে গড়া এক মেয়ে সাজা ছেলেকে কেন অন্তরঙ্গ দৃশ্যে দেখানো হয় ! কেনই বা তার সুন্দরী স্ত্রীর প্রশ্ন হয় – কি এই ছেলেটার মধ্যে আছে – যা তার মধ্যে নেই ! সেই প্রশ্নটাই – একটা গোটা সিনেমা জুড়ে বেজে চলেছে ! মায়া ! পৃথিবীতে শুধু মায়াই বোধয় দীর্ঘস্থায়ী ! মায়ার বাজন, মায়ার বাঁধন – সমস্ত প্রচলিত যৌনতা, ঘর সংসার ভেঙ্গে স্থায়ি হয়ে থাকে জীবনে ! আমার খুব প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা সিরাজের উপন্যাস – বাংলার প্রান্তিক গানের দলের সর্দারের এক অদ্ভুত সম্পর্ক নিয়ে ! এক আলকাপ গানের দলের মালিক ঝাকসু সর্দার – একটি সুশ্রী ছেলেকে মেয়ের মতন করে বড় করেছে । দলের গানের দোহার বা নাচের মেয়ে হিসেবে উপযুক্ত । তার নাচ দেখে বা অঙ্গভঙ্গি দেখে সবাই তার প্রতি আকৃষ্ট হয় । অন্যের লোলুপতার হাত থেকে বাঁচিয়ে শান্তি নামের ছেলেটিকে সযত্নে নিজের কাছে দলের অন্যে সুশিক্ষিত করে তোলে । - সুন্দরী স্ত্রী পর্যন্ত ছেলেটিকে হিংসে করে । কি আছে এই ছেলেটির মধ্যে – যার জন্যে স্বামী শুধু এই ছেলেটির কাছেই পড়ে থাকে ও আগলে রাখে ! এই হিংসে নিয়েই – এক রাত্তিরে ছেলেটিকে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে জোর করে যৌন কামনা মেটাতে চায় । ঝাকসুর আগমনের ফলে – ছেলেটি লজ্জায় ও অপরাধবোধে পালিয়ে যায় । পালিয়ে যায় – ওদের জীবন থেকে । এইখানে শুরু হয় ঝাকসুর বিয়োগান্ত জীবন ! তার গান বন্ধ হয়, দলও বন্ধও করে দেয় ও সেই স্ত্রীও মারা যায় । - ঠিক এই পর্যায় এসে – মনে হল সেলুলয়েড থেকে ছাড়া পাওয়া - নাটকের দৃশ্য নেমে এসেছে ! যেমন দেব শঙ্কর তেমনি গৌতম হালদার ! এইখানে মনে হল – শেক্সপেরিয়ান ট্র্যাজেডি ! এরপরেও আরও একটা বিয়োগান্ত ঘটনা থেকে আরেকজন গানের মাস্টারের আবির্ভাব হয়েছে । এবং শেষ পর্যন্ত এই গানের ধারাটিও বজায় রাখা হয়েছে ! লক্ষণীয় হল – সমস্ত সিনেমাটা হয়েছে বাইরে বাইরে । শুধু গ্রামীন গানের আসর । খুব সুন্দরভাবে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছে ! - গান খুবই সুন্দর । যেটা আমার অবাক লেগেছে – সকালের উজ্জ্বল দৃশ্যের চেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে সন্ধ্যের আলো-আধারি পরিবেশ ! – এটা কি ট্র্যাজেডির রং ! তবে রাজা সেনের গাটস আছে বৈকি ! শুধু নাট্য-ব্যক্তিত্ব দিয়ে পুরো একটা সিনেমা করা ! - কোনও যৌনতা নেই – শুধু আভাষ ! বাংলা সিনেমা দেখতে হলে – এরকম সিনেমাই কাম্য ! মনোজ

1793

9

Somen dey

শ্রীজাত সংবাদ

শ্রীজাত ক্রমশ যে ভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বা ছড়িয়ে যাচ্ছেন তাতে অচিরেই তাঁর একজন বড় সড় কাল্ট ফিগার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ।বঙ্গদেশের এই গোলমেলে সময় একজন বাঙালি কবি যদি গিমিক চটক বা অন্য কোনো চাতুরীর আশ্রয় না করে শুধু কলম কে অস্ত্র করে এক জন কাল্ট ফিগার হয়ে উঠতে পারেন তা হলে সেটা তো একটা বড় স্বান্তনার জায়গা হওয়ার কথা ।মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে এই সময়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি তার সমসাময়িকদের এবং অনেক অগ্রপথিকদেরও যে অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছেন এটা স্বীকার করে নিতেই হবে । খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামী দুজনেই লেখালেখির জগতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন । কিন্তু ওঁদের দুজনেরই এই জায়গাটায় পৌঁছানোর পিছনে একটা দীর্ঘ চড়াই উতরাইয়ের যাত্রাপথ আছে । কয়েক হাজার পৃষ্ঠার পরিক্রমণ আছে। কল্পনাসুন্দরীর পদতলে অনেকটা আয়ুস্কাল বলিদান দেওয়া আছে । সৃজনপ্রতিভার বিশালত্বর সঙ্গে জনপ্রিয়তার সম্পর্ক যে সব সময় হাত আর দস্তানার মতই হয় না এ কথাটা বোধহয় নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই ।এই দুজনের প্রথম গুণটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই । সেই সঙ্গে এঁদের জনপ্রিয়তার মাত্রা বোঝাতে বলা যেতেই পারে এঁরাও রাস্তায় বেরোলে ভক্তদের দ্বারা মবডও হয়ে যেতেন ( জয় এখনও হয়ে যান কিনা জানা নেই )। এটাও নিশ্চয় যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যে অনেক বড় পাওয়া । শ্রীজাত এই সময়ের কবি । এই সময়ের স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিক ভাবে বুঝতে পেরেছে ।পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্যে সাদা সাদা পাতার উপরে কালো কালো অক্ষর গুলোই যে একমাত্র অবলম্বন নয় এটা বুঝতে তার দেরি হয় নি ।একজন কবির পক্ষেও যে ইলেক্ট্রনিক মেডিয়াকে কি ভাবে কাজে লাগানো যায় সেটার একটা চমৎকার উদাহরণ সে হয়ে উঠেছে । তাই শ্রীজাত যা পাচ্ছে , তা বোধহয় এই বাংলার কোনো কবি বা লেখকের পাওয়া হয়ে ওঠেনি । ফেসবুকে তার প্রতিটি পোস্ট পড়বার সঙ্গে সঙ্গে দুই থেকে চার হাজার লাইক পড়ে যাচ্ছে।ফেসবুকে তার ছোটো ছোটো গদ্য গুলি অভূতপুর্ব সাড়া পাচ্ছে । আশে পাশে দেখা মানুষ বা ছোট খাটো কোনো ঘটনা একটু অন্যরকম ভাবে দেখা এবং তা নিয়ে ঝরঝরে ভাষায় লেখা গুলি সবাই আগ্রহ নিয়ে পড়ছে ।লেখা গুলো নীললোহিতের ‘চোখের সামনে’ সিরিজের লেখাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর তার ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ তো ফেনোমেনাল হয়ে উঠেছে । প্রত্যেক কবিতা এক একটা সনেট । কিন্তু সেটা বড় কথা না । এই কবিতা গুলো তে শেষের লাইনের এমন কিছু থাকছে , যা পাঠকের মনে একটা জোরালো অভিঘাত তৈরি করতে পারছে । হয়ত তাৎক্ষনিক । তবুও কখনো আলতো কখনো বা জোরে ঘা দিচ্ছে পাঠকের মননে এবং ঘুমন্ত বিবেকে । পাঠকের মধ্যে তারাও আছেন যারা সহজে অন্য কবিতার আশে পাশে যান না । কিছু পংত্তি যে গুলো এখানে সেখানে মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে , কিছু আবার সোশাল মেডিয়াতে ‘ভাইরাল’ হয়ে উঠছে , সে রকম কিছু ঝড় তোলা লাইন তুলে দিচ্ছি – যে এখনো ভেবে দেখছো পথে নামবে কি না আমি তার মনুষ্যত্ব স্বীকার করিনা মতে মিললে চিরসখা ,অন্যথায় ফাঁসি এ যদি বিশ্বাস হয় আমি অবিশ্বাসী আগে সেই বাড়ি থেকে নিয়ে এসো চাল যে বাড়িতে কোনো হত্যা হয়ন গতকাল অতও নির্লজ্জ নয় মাথার বাসনা কাটা গেলে যাবে । তবু নোয়াতে পারবো না আজও বেঁচে আছি কাল হয়ত লাশ আমি তবু লিখে যাবো আমার বিশ্বাস মানুষ থেকেই মানুষ আসে । বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায় আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ তফাত শুধু শিরদাঁড়ায় যারা ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’ র সনেট গুলি এখনো পড়েন নি কিন্তু এই লাইন গুলি পড়ে সেগুলি পড়তে আগ্রহী হচ্ছেন তারা খুঁজে পেতে পরে নিতে পারেন । ***** এ পর্যন্ত যা লিখলাম তা একটি ভুমিকা মাত্র । এবার যা বলতে চাইছি , সেইটা আসল ভয়ের জায়গা আর সেই জন্যেই এই লেখা । এ সব লেখা পড়ে এবং ব্যাক্তিগত ভাবে তার কিছু আচরণ দেখে বা শুনে ,যেমন প্রবল চাপের মুখেও সরকারী পুরস্কার নিতে অস্বীকার করা , এ সব জেনে আমাদের আস্থা জন্মেছিল এই তরুণ কবির শিরদাঁড়ায় । মনে হয়েছিল তিনি শঙ্খ ঘোষের কাছ থেকে নিয়ে নেবেন ব্যাটন । কিন্তু কাল একটি ইংরেজী সংবাদ পত্রে প্রকাশিত খবরে জানলাম শ্রীজাত সরকারী দলের ভোটের প্রচারের জন্যে গান লিখে দিচ্ছে । গানটিতে ঠিক কি লেখা হয়েছে তা এখনো জানা হয় নি । শ্রীজাত কৈফিয়ৎ দিয়েছে এটা তার প্রোফেশনাল লিরিসিস্ট হিসেবে একটি কাজ মাত্র । অন্য কিছুই বলব না শুধু বলতে চাই - বাজারেও সন্ধে নামে... পসরা, খরিদ, সব সারা... বাড়ি ফিরে ভেবে দেখো, তোমাকে বিচার করে কারা ? এটি ১০ই মার্চ তারিখে শ্রীজাতরই লেখা একটি পোস্ট । আমি শুধু শেষে পুর্ণচ্ছেদ এর জায়গায় একটি জিজ্ঞাসার চীহ্ন জুড়ে দিলাম ।

1801

3

শিবাংশু

বসন্ত কীভাবে আসে......

বসন্ত কীভাবে আসে ? --------------------------------- তা বসন্ত নিয়ে তো অনেক কিছুই তো লিখেছি, বার বার। কবে লেখা 'বসন্তের ভিসা পাসপোর্ট' লেখাটি নিয়ে এখনও কোন কোনও বন্ধু তাঁদের ভালো লাগা জানিয়ে যান। এ সব দেখে বলা যায়, ভালোবেসে দেখিয়াছি বসন্তঋতুরে, দূরে গিয়ে দেখিয়াছি বসন্তঋতুরে, ঘৃণা করে.... না ঘৃণা করে দেখি নাই বসন্তঋতুরে, কোনওদিন। তবু সে মাথার চারিপাশে ..... -------------------------------------- যদিও আমার প্রিয় ঋতু বর্ষা, আমার জন্মঋতুও বটে, অনেক বেশি লেখা আদায় করেছে আমার থেকে, অনেক বেশি আনন্দ আর আত্মীয়তাও অনুভব করি তার সঙ্গে। কিন্তু বসন্তের প্রতি অন্য টান। বহুদিন আগে একটি বিবাহের আমন্ত্রণলিপি পাঠিয়েছিলুম বন্ধুদের। যার উপরে লেখা ছিলো শুধু, " ...সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি কোনও এক বসন্তের রাতে...." কেউ বুঝেছিলেন। কেউ জিগিয়েছিলেন, তোর উড বি বৌয়ের নাম কি 'সবিতা'। যখন বলি, 'না'। তখন কেউ কেউ সাবধান করে দেন, দেখিস, সব কিছু নিয়ে পাকামি করিস না। এসব সবিতাটবিতাদের নিয়ে কাব্য করতে গিয়ে হততড় সে ফেঁসে যাবি। বৌ জান কেরোসিন করে দেবে। ভাবি, 'সবিতা' থাকুক না থাকুক, বসন্ত আসুক না আসুক, আমাদের জীবনে কেরোসিনের বিপুল ভূমিকা, রেশনকার্ডের তোয়াক্কা করেনা। ---------------------------------------- সেই কোন কাল থেকে কবিশিল্পীরা বসন্তঋতুর গুণগান গেয়ে গেছেন। জানিনা এন্ডোক্রিনোলজিস্টরা এই নিয়ে কী বলেছেন, তবে হর্মোন তো নিশ্চয় তার ভূমিকা যথাযথ পালন করে যায়। প্রাণ উতল তো হয় সবারই, মনও ভাসে এপার ওপার। ফুল ফোটে অনন্ত উৎসাহে, আবির ওড়ে, আশ্লেষ জাগে, আসক্তি বেড়ে ওঠে রক্তমাংসে। বর্ষার আসার পদধ্বনি শোনা যায়। বসন্ত আসে শব্দহীন, মুখচোরা কিশোরীর মতো। ফিরে যায়, ফিরে ফিরে চায়। রুদ্রপলাশ, অর্ঘপলাশ, রক্তশিমুল, শুকনো পাতা ঝরে পড়ার শব্দভাসান। --------------------------------------- এক কুড়ি বারো.... খুব একটা অল্প সময় নয়। তবু তেমন লম্বা তো লাগেনা। জিন্দগি বড়ি হোনি চাহিয়ে.....ইত্যাদি। বহিরঙ্গে ব্যতিক্রম বলতে একজন সিঁদুর পরা শুরু করেছিলেন, অন্যজনের জন্য ছিলো পিলিয়নে একজন স্থায়ী সওয়ার। অর্থকে নিরর্থক মনে হওয়ার দিন ফুরিয়েছিলো। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সময় মানে শুধু বালিয়াড়ির উপর টায়ারের দাগ, রাতের জোয়ার এসে আবার নতুন জমি তৈরি করে দেয়, রোজ। ------------------------------------- দিনগুলো ঝরে পড়ে হলুদ পাতার মতন। আবার একটা ১০ই মার্চ, শেষ ফাল্গুনে সাজানো কচি পাতার চালচিত্র। আবার বসন্তে সেই নিরন্তর আকুলতার বাউল গান, -সেই ডালে ফুল ফুটলো কি গো, ওগো কও ফুটলো কতো? চলো, জিত হি লেঙ্গে বাজি হম তুম.....

1221

9

James

চুপ চাপ- একা একা (ক)

এই কদিন আগের কথা‚ সঠিক বলতে হলে পনেরো ই ফেব্রুয়ারী তার জন্মদিন| ভ্যালেন্টাইন দিবসের ঠিক আগে| জন্মদিন নিয়ে অবশ্য কোনদিনই আদিখ্যেতা ছিল না‚ না আমাদের বাড়ীতে‚ না তাদের বাড়ীতে (এটা পরে জেনেছি)| আমাদের মানে গ্রামের বাড়ীতে‚ আসলে জন্মদিন হতো মহাত্মাদের‚ ইস্কুল ছুটি থাকতো‚ কি কারণে মহৎ কে জানে! এত গণ্ডা দশক পেরিয়েও আনতি পারলাম না সেই কার্য্য কারণ! আর জেনেও দরকার কি‚ শুধু শুধু অবশিষ্ট ব্রেন সেল গুলোকে ভারাক্রান্ত করা| তার ওপর অমুক তারিখ ই যে সঠিক দিন‚ কে বলেছে? বাপ‚ দাদা বা কাকা ইস্কুলে মাষ্টারের কাছে ভর্তি করবার সময় আন্দাজে একটা তারিখ দিয়ে দেন‚ ব্য়স সেটাই হয়ে গেল | তো‚ আজকাল অন্যদের দেখে শুনে একটু তো ভান করতেই হয়‚ বিশেষ করে তার অফিসে লোকজন মনে করে কেক আনে‚ সেটাই চালু প্রথা| সেদিন সকালে আমি দেরীতে উঠেছি‚ তার আবার আর্লি শিফ্ট‚ বেরিয়ে গেছেন; আমার তো ফ্লেক্সি টাইম‚ যখন খুশী গেলেই হলো‚ মানে সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্য়ে সাতটা এই স্লটে ৭:২১ মিনিট কাজ করলেই হলো| আসলে কাজের মাপ সময়ে নয় আউটপুটে| এইরকম শিফ্ট পড়লে আর আমি যদি দেরীতে ফিরি‚ তাহলে দিনের পর দিন যোগাযোগ ডাইনিং টেবিলে রাখা‚ চাপা দেওয়া চিট এর মাধ্যমে| নাহ‚ ফোনে বা ইমেল ক্যালেন্ডারে রিমাইন্ডার রাখিনা কারুর জন্মদিনের‚ বার্ষিকীর| এমনিতে যদি মনে না থাকলো তাহলে মনে না থাকলেই ভাল! আর একটা দিন অন্যদিনের থেকে কি এমন আলাদা? মানে আমার মতে পুরো ব্যাপারটাই আস্ত ঢপ| শুধু লোক দেখানো| হাসপাতালে অসুস্থ পরিজন বন্ধুকে দেখতে গিয়ে লোকে যেমন খোশগল্পে মাতে! প্রসঙ্গে ফিরে আসি| সন্ধ্যেবেলা ফেরবার সময় ভাবলাম কিছু একটা নিয়ে যাই| কিছু একটা‚ কিন্তু কি? পুষ্পস্তবক- ধ্যুস‚ পুষ্প ছাড়া আল ফাল পাতা নাতা ঘাস দিয়ে একটা কিম্ভুতকিমাকার মাল‚ একদিন বাদেই ঝরে পড়ে কার্পেট নষ্ট করবে| ইয়াহ‚ খাবার জিনিষ কিছু নিয়ে গেলে কেমন হয়? ইউরেকা| কিন্তু কি নিয়ে যাই‚ মিলিয়ন পাউন্ড কোশ্চেন| চিকেন টিক্কা- "ঘাসের বড়ায় বরঞ্চ বেশী স্বাদ |" এদিক সেদিক করতে গিয়ে শেষ অবধি ম্যাকডোনাল্ড থেকে এক পীস আপেল পাই‚ তিনি ওটা পছন্দ করেন| তাই সই‚ গচ্চা মাত্র এক পাউন্ড! ভাল করে ডবল ঠোঙ্গায় মুড়ে গাড়ীর পেছনে ডবল ওয়াল বাক্সে‚ যাতে করে বাড়ী পৌঁছুনো অবধি গরম থাকে| তিনি খুউব খুশী হলেন‚ 'দাদাগিরি'র সাথে গরম গরম আপেল পাই! আগে ছিল সামর্থ্যের অকুলান‚ এখন হজম শক্তির! (ফিরে পাওয়া লেখা-Courtesy: অ্যাডমিন | ভাবা যায়! বালা হলে সাতদিন হত্যে দিয়েও সম্পাদকের দেখা মিলতো না! তার ওপর‚ 'নেবেন নেবেন‚ না নেবেন attitude)

1190

3

মনোজ ভট্টাচার্য

সেদিন - উদয় সদনে !

সেদিন উদয় সদনে ! যখন আমাদের ট্যাক্সিটা উদয়-সদনএ দাঁড়ালো – সেদিন এক ভদ্রলোক বললেন – এখানে বর-বউয়ের গাড়ি দাঁড়াবে – আপনারা পেছিয়ে নিন । আমার কিরকম মনে হল – বর তো সামনে দাঁড়িয়ে – তাহলে সরতে বলছে কেন ! গাড়ি রেখে যখন প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতে তিনিই আবার জিজ্ঞেস করলেন – আপনারা ! কিরকম ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে বললাম – সোমা - ! ও, আপনারা সোমার বন্ধু । - আমার নাম মনোজ - ! আরে হ্যাঁ হ্যাঁ – আপনাকে তো আমি চিনি ! এত আপনার নাম শুনেছি ! – আমি ওর স্বামী ! আপনারা ভেতরে বসুন । তখন আমি চিন্তায় – কোথায় দেখেছি এনাকে ! সিনেমায় নাকি সিরিয়ালে ! বরুন চন্দের মতো ! – এত সুন্দর কন্দর্পকান্তি সুপুরুষ ! আমজনতার ভীড়েও যাকে চিনে নেওয়া যায় ! ভেতরে গিয়ে দেখি সন্দর্পন-চন্দ্রিমার ফটো সেশান চলছে । বেশ একা একাই অন্তরঙ্গ-মুহূর্ত কাটাতে চাইছিল । আমরা কিরকম রসভঙ্গ করলাম । পকেট থেকে ছোটো ক্যামেরা বার করে ফটোগ্রাফার সেজে গেলাম । - আরও একজন ওখানে ছিল – আগেই আমার চেনা উচিৎ ছিল – সে হল অর্জমা । ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যেন কোনও মন্দিরের গায়ে আঁকা কোন চরিত্র ! আমার মনে কিন্তু তখনো পুরনো চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছে । এত কন্দর্পকান্তি চেহারা নিয়েও সোমা-আনন্দ হয়ে আছেন ! ইশস ! এই চেহারার কাছাকাছি হলেও আমরা কিছু-মিছু করে দেখাতে পারতাম ! এক অনিচ্ছাকৃত ভুলের অপরাধে যাবজ্জীবন কয়েদ ! ইয়ে তো না-ইনসাফি ! - অথচ রাজা যযাতি – নিজের পুত্রের কাছ থেকে যৌবন ধার নিতে দ্বিধা করেন নি ! এই চিন্তাটা অবশ্য ভেঙ্গেছিল পরে – সোমা সুন্দরী যখন কক্ষে আবির্ভূত হলেন ! কক্ষটা কিরকম ঝলমল করে উঠল । তখন দেখলাম – না ! ঠিকই আছে ! সুন্দরের ঘরে সুন্দরীই মানায় ! – সেদিন পুরো সন্ধ্যেটাই হাইজ্যাক করে নিল সোমা ! ক্রমশ একে একে সবাই আসতে লাগলো । একটা কথা না লিখে পারা যায় না ! মহিলাদের সৌন্দর্য দেখতে হলে – বিয়েবাড়ি হচ্ছে আসল স্বর্গ ! – বর-বৌ তো সুন্দর বটেই ! তাদের মা-বাবা আরও সুন্দর ! কিন্তু আর যেসব মেয়েরা এসেছিলেন – শাড়ি-গয়নায় – হাস্য-কলরোলে - সুন্দরতর ! কেন জানি আমার মনে হয় মেয়েরা তাদের সৌন্দর্যের ডালি ওই একদিনই বোধয় উজাড় করে দেয় – দর্শন-পিয়াসীদের জন্যে ! আর ওই একদিনই মেয়েদের বয়েস স্থির হয়ে - সময়কে স্তব্ধ করে রাখে ! তখনই মনে হয় – আমরা বলি বটে – পুরুষরা সুন্দর প্রানীদের মধ্যে ! কিন্তু সত্যি কি তাই ! এত সুন্দর বৈভবের মাঝে নিজেদের অকিঞ্চিৎকর মনে হয় নাকি ! আসরে কে আগে এসেছে কে পরে এসেছে – সেসব আর মনে নেই । শুধু দেখেছি এক একজন ঢুকছেন – শাড়ি ঝলমল করিয়ে অলঙ্কার চমকিয়ে – হাসিতে মুক্ত ঝরিয়ে ! আমার গেঁয়ো অবাক করা ভাবটাকে দমন করে চেনার চেষ্টা করি ! আরে ! আমি তো চিনি উহারে – দেখিয়াছি গড়িয়াহাটার মোড়ে ! মনে পড়ে রুবি রায় ! - কেউ কেউ দেখলাম অভিযোগ করেছে – আমি নাকি স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দিই নি ! - হতেও পারে – সেই মুহূর্তে কি আমি সেস্থানে ছিলাম ! সবার কথাই বলা উচিৎ আমার ! খাবার-দাবার এপিটাইজার থেকে মেন কোর্স – মায় পান পর্যন্ত কিছু লেখা উচিৎ ! কিন্তু সেগুলো সবই মামুলি ! কি আর লিখবো ! দেখা হল এক আবির চ্যাটার্জির সঙ্গে ! হতেই পারে - শিল্পীর বাড়ি – আসতেই পারে আবির ! কিন্তু না – তিনি আবির নন । আমাদের চির মজলিশী-আড্ডাধারী – অরিন্দম চক্রবর্তী – এক নম্বর ! চিনতে পেরেই তো আগে অভিযোগ – আপনারা স্টেশনের ফ্ল্যাটফরমে রাত কাটিয়েছেন ! ভাবখানা যেন ফ্ল্যাটফরমের ভাড়া দেন নি কেন ! আমি তাড়াতাড়ি স্ত্রীর দিকে দেখিয়ে দিলাম ! তারপর আলাপ হল – নানান বিষয় নিয়ে । লেগে গেল দীপঙ্করবাবুর সঙ্গে তর্ক ! আমি এসবের মধ্যে নেই ! একে জানি কম – বুঝি আরও কম ! এদের সঙ্গে তর্ক করে ফাঁসি আরকি ! – ও, প্রায় ভুলেই মেরে দিচ্ছিলাম – আরেক বেচারা শিশিরবাবুর সঙ্গে দেখা হল । প্রায় আমার মতোই স্ত্রীর পাশে ভয়ে ভয়ে বসেই রইলেন ! বেশি কথাও বলা বারন – ডালিয়ার কড়া নির্দেশ ! অনেকে বয়স্ক লোকেদের সঙ্গে স্ত্রীদের পরিচয় করান না - নিশ্চয় কোনও কারন আছে । কিন্তু তার ছেলের সাথে আলাপ করিয়ে দেওয়ার কারণটা কি - ধরতে পারিনি । তবে ফিরবার সময়ে মনে হল - এই যা কিছু তো বলা হল না ! সন্ধ্যা যত সুন্দরই হোক – যত সুন্দরীদেরই সমাগম হোক - সময় তো ঢলে পরে রাতের কোলে ! দূরত্বও কম নয় ! এই দক্ষিণতর প্রদেশ থেকে একেবারে উত্তরোত্তর দেশে ! নব দম্পতির দিন ক্রমশ সুন্দর থেকে সুন্দরতর হবে ! – সোমা ও সোমা-আনন্দের স্মৃতি থেকে এদিন হয়ত ধূসর হয়ে যাবে । কিন্তু আমাদের কাছে এই দিনটার মানে থেকে যাবে একটা বিরাট অর্থবহ হয়ে ! সুখকর সন্ধ্যে তো আসে না ঘন ঘন ! মনোজ

1033

10

জল

বারোয়ারী গল্পের সার সংক্ষেপ

এখনো পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে :- ১ম পর্ব :- জল জনৈকা কলেজপড়ুয়া একটি মেয়েকে দেখে মনসুরের মন উতলা হয়| ঘটনাচক্রে সে মনসুরের দোকানেই বৃষ্টির দরুন আশ্রয় নেয় ও একই সাথে মনসুরের মনও নেয়| ২য় পর্ব :- ঝড় রিণি আর মিনি দুই বোন| মিনি বড়| মা-বাবার মৃত্যুর পর বোন রিণিকে বড় করা ও সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আদিমতম পেশা হিসাবে সে একজন উচ্চশ্রেণীর এসকর্ট গার্ল| রিণির জীবনটা সুন্দর আর সুস্থ হোক‚ তাই অঙ্কনের সাথে রিণির সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন সে‚ যদিও রিণি তার ব্যক্তিগত জীবনে কারও নাক গলানো পছ্ন্দ করে না| ৩য় পর্ব :- শ্রী মৌলালীর উঠতি মস্তান মুন্না‚ আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্দীপের কাছের মানুষ| মুন্নার জীবনে অনেক অপ্রাপ্তি আছে‚ আছে অনেক খেদ| ভদ্রলোকের মত একটা জীবনের বড় আকাঙ্খা ছিল তার‚ কিন্তু সোনাগাছিতে বড় হওয়া আর মায়ের স্নেহহীন মুন্নার গন্তব্যই যেন পূর্বেই স্থির হয়ে গিয়েছিল| একসময় সোনাগাছির দালাল ফটিকের সাগরেদ ছিল‚ তারপর তো সেখান থেকে বেড়িয়ে নিজের একটা আলাদা পরিচয় সে বানিয়েছে| একটা লোটোর দোকান যদিও আছে তার‚ তবে সেটা তার ব্যবসা নয়‚ লোকের চোখে ধুলো দেওয়া| আসল ব্যবসা অন্যকিছু| বিকাশের মত কিছু মুর্খই তার কাস্টমার| ৪র্থ পর্ব :- স্তুতি ছোট্ট ভোলার চোখে অনেক স্বপ্ন| আর সব স্বপ্নের কেন্দ্রেই আছে তার মা| বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়া মায়ের জন্য সে একটা চমৎকার বাগানঘেরা বাড়ি বানাতে চায়‚ যেমনটা বানায় টুনটুনি পাখি ঠোঁট দিয়ে পাতা বুনে বুনে‚ ঠিক তেমনটাই সে বানাবে বলে টিনের বক্সে পয়সা জমায়| ৫ম পর্ব :- ঝড় মেয়েটা আবার আসে তার দোকানে টপাপ ভরতে| টপাপ ভরতে গিয়ে নাম্বারটা মাথায় ঢুকিয়ে নেবার চেষ্টা করে মনসুর| মেয়েটা ৫০০ টাকার নোট এগিয়ে দিলে খুচরো দিতে পারে না| মেয়েটাকে তো সে দিল দিয়েছে‚ একশ টাকা কি জিনিস‚ তাই নির্দ্ধিধায় পরে দিতে বলে নামটা কৌশলে জেনে নেয়| তার হুরী পরীর নামটা বারবার অনুরণিত হয় তার মনে| ৬ষ্ঠ পর্ব :- কিকি জীবন যেমনই হোক মিনি আদ্যন্ত গুনী মেয়ে| বাবার মত বই পড়তে‚ গান শুনতে‚ ঘর গোছাতে‚ সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে বড় ভালোবাসে| তার ভালোবাসার তলে কমলামাসিও যেন কবে থেকে বড় আপন হয়ে গেছে| যেদিন কোন অ্যাসাইনমেন্ট থাকে না সেদিন সে অন্য মানুষ| একঘেয়ে জীবনটাকে সে বদলে নিতে চায় ঘরের আসবাব অদলবদল করে‚ বোনের মনের মত রান্না করে| আসলে সে সবাইকেই ভালো রাখতে চায়| সবার ভালো থাকার মধ্যেই যে সে নিজে ভালোবাসতে চায়| ৭ম পর্ব :- উমা সন্দীপকে মাঝে মাঝেই বেশ নৃশংস মনে হয় মুন্নার| বিশেষ করে ভোলার মত একটা বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে যখন মাসাজ করায় তখন তার শৈশব বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়| ঐ শৈশবটাকে সে বেজায় ঘেন্না করে| আর এই ঘেন্নার প্রতিশোধ তুলতেই সে খুন করেছিল তার মায়ের নাগরকে| তারপর অনেক হাত ঘুরে এই সন্দীপের কাছে সে ঠেক নিয়েছে| মানুষ খুন করতে তার হাত কাঁপে না‚ তবুও কোথাও যেন তার দিলটা পাত্থরের মত হয়ে যায়নি| আর হয়ে যায়নি বলেই মিনির জন্য একটা দরদ সে অনুভব করে| ৮ম পর্ব :- ঝিনুক রিণির মনটা আজ বেজায় ভালো| সারাদিন আজ সে অঙ্কনের সাথে কাটিয়েছে| অঙ্কন আই আই এম এ সুযোগ পেয়েছে| শুধু একটু একটু মনটা খারাপ‚ কি করে থাকবে সে এতদিন অঙ্কনকে ছেড়ে| বাড়ি ফেরার পথেও ঘোরের মধ্যেই থাকে সে| দের্রেঅ কারণে মনসুরের দোকানে টাকা দিতে যাওয়াটা হয় না| ভোলার কাছ থেকে কিনে নিয়ে আসে দুটো জুঁইয়ের মালা| ৯ ম পর্ব :- জল ঘর গোছাতে গোছাতেই হাতে পড়া সেই চিঠিটা যেন মিনির অতীত খুঁড়ে তুলে আনে| মনে পড়ে কত কিছু| রজতের কথা‚ তার এসকর্ট হয়ে ওঠার কথা| সন্দীপের সাথে আলাপ| কিন্তু রিণিকে নিয়ে আজকাল সে বড্ড চিন্তা করে| মেয়েটা কি তার আদরে বড্ড বেড়ে উঠছে না| সারাক্ষন ফোনে কথা বলেই যায়| একদিন ওর খবর নেবে| ১০ম পর্ব :- হিমু হঠাৎ করেই পৃথাকে দেখে রোহিত| পৃথা‚ রোহিতের একসময়ের প্রেমিকা| কিন্তু আজ অন্য কারও বউ| কার বউ জানার খুব ইচ্ছেতেই সন্দীপকে ফোন করে‚ আর জানতে পারে কে এক অঙ্কনের বউ| আর এই অঙ্কন যে একটা বড় খেলোয়ার সেটাও সন্দীপের কাছ থেকে জানে সে| এসব কি তার হ্যালুসিনেশন নাকি বাস্তব? ১১শ পর্ব :- ভোঁদড় ক্যাফেতে বসে বসেই অতীতচারী হয় মিনি| মনে পড়ে সীমাকে| এই সীমাই তার এই জীবনের পথপ্রদশক| এমনি এমনি লাইনের মেয়ে হওয়া যায়| কিন্তু এসকর্ট গার্ল হত গেলে কিছু প্রশিক্ষন লাগে| যেগুলো খুব যত্ন করে তাকে শিখিয়েছ সীমাই| কিছুটা নিজের স্বার্থে| যাই হোক আজ সে সন্দীপের খুব কাছের মানুষ| তার বিজনেসে একটা কার্যকারী অংগ| ১২শ পর্ব :- প্রবুদ্ধ ক্যাফেতে আসে মুন্না| প্রথম দর্শনে একটু অচেনা ঠেকে মিনির কাছে| অতীত থেকে বর্তমানে ফিরতে সময় নেয়| আজকের দিনটা সন্দীপের জন্য| মুন্নার সাথে এগিয়ে যায়|

1113

1

dalia mukherjee

বুড়ো স্যারের গল্প ( শেষ পর্র্ব)

বুড়ো স্যারকে নিয়ে শুরু করেছিলুম গল্প, কিন্তু কপালদোষে লেখাটা পুরোটা গেলনা। তাই আবার বসলুম বুড়োস্যারকে নিয়ে লিখতে। কিন্তু বয়স তো হয়েছে আমার , সব ভুলে যাই। কোথায় যেন শেষ করেছিলুম। ও হ্যাঁ, তা বুড়োস্যার ছিলেন প্রচন্ড গুলবাজ, বুড়োস্যার উনুনের কাছাকাছি থাকলে বোধহয় উনুনে গুল দিতে হোতনা। ওমা! গুল জানেননা! ওই তো, কয়লার গুঁড়ো থেকে গুল বানায়। তা দিয়েও তো কয়লার বদলে উনুন জ্বালানো যায়! তা জানবেন কি করে? এখনকার সময় তো আর উনুন চলেনা? ওই কি যেন বলে, গ্যাস, গ্যাস দিয়েই তো রান্নাবান্না হয়। আমাদের সময় বাপু ওই উনুন জ্বালিয়েই রান্না করতে হোত। তা কয়লা যখন বাড়ন্ত, কয়লাবালা আসছেনা, তখন ওই গুলগুলো খুব কাজে লাগত। সে যাক গে। যা বলছিলুম। একদিন ক্লাসে নাচন আর মনীন্দ্রের মধ্যে লেগেছে খুব ঝগড়া। কি নিয়ে , সেটা আর মনে নেই। আরে বাপু! ক্লাস সেভেনের কথা, অত কি মনে থাকে নাকি? তা সেই ঝগড়ার দৌলতে ক্লাসে হয়ে গেল দুটো ভাগ। এ ওকে মারে তো এ তার নাক ফাটায়। আমাদের শ্যামাপ্রসাদ স্কুল ছিল ছেলে মেয়ে মেশানো স্কুল। ওই যে কো এডুকেশান না কি যেন বলে! তা এর মধ্যে আবার পড়ল বুড়োস্যারের ক্লাস। দুদলের ছেলেদের ই মন বেজার হয়ে আছে। আমরা মেয়েরা মজা দেখছি। ক্লাসে বেশ গন্ডগোল। এইসময় বুড়ো স্যার ঢুকলেন ক্লাসে। একবার ক্লাসের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বসলেন তাঁর চেয়ারে। বার কয়েক হাই তুলে একটা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হঠাৎ বলে উঠলেন, "তরা আমার কাছ থিকা কিছু শিখবি। জানস, আমি স্বর্গের সিঁড়ি দ্যাখসি।" তা সেই ঝগড়ার গুণে ছেলেদের মেজাজ তো তিরিক্ষি হয়েই ছিল। আর স্যারের এই গুলমারা কাঁহাতক সহ্য করা যায়? পেছন থেকে একটি ছেলে বলে উঠল, " তা উঠে গেলেননা কেন স্যার?" ব্যাস! স্যারের মুখ হয়ে উঠল রক্তবর্ণ, কাঁপতে লাগলেন স্যার ঠক ঠক করে। ছেলেটির কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে নিজের টেবিলের কাছে নিয়ে এলেন। তারপরে যা হাতের কাছে পেলেন, ডাস্টার, বেত, সব দিয়ে ছেলেটিকে এমন রামধোলাই দিলেন, ছেলেটি তারপরে তিনদিন স্কুলে আসতে পারেনি। আর আমরা মেয়েরা বলতে লাগলুম, " তা তোর ই বা অমন করে বুড়ো স্যারকে রাগাবার দরকার কি ছিল।" ওই যে বলে না, ভিমরতি ধরা, তাইতেই ধরেছিল ছেলেটিকে। আমাদের ক্লাসে দুলু বলে একটি বিচ্ছু মেয়ে ছিল। সবসময় তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে বেড়াত। তা সেই দুলু আবার বুড়োস্যারকে দুচোখে দেখতে পারতনা। মার ও খেয়েছে বুড়োস্যারের কাছে জবরদস্ত। তা আমাদের যুগে এপ্রিল ফুলের খুব চলন ছিল। ১লা এপ্রিল এলেই সবাই সবাইকে এপ্রিল ফুল করত। এই যেমন , একটি ছেলেকে এপ্রিল ফুল করতে কেউ গিয়ে বলল, " এই তোকে অঙ্কের স্যার অফিসঘরে ডাকছেন।" ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখে অফিস ঘরে গিয়ে অঙ্কের স্যারকে বলল," স্যার আমাকে ডেকেছেন?" ব্যাস! স্যার অমনি বলে উঠলেন" আ মল যা! তোকে ডাকতে যাব কেন রে! পেয়েছিস তো অঙ্কে তিন, তা তোকে দিয়ে আমার কম্মটা কি? " ব্যাস ছেলেটি শুখনো মুখে ক্লাসে এল, আমরাও এপ্রিল ফুল বলে উঠলুম। এইসব হোত আর কি! তা সেদিন ছিল এপ্রিল ফুল। দুলুর মাথায় জেগেছে দুষ্ট বুদ্ধি। বুড়োস্যারের ক্লাস, স্যার ক্লাসে আসার আগে দুলু স্যারের চেয়ারের চার পায়াতে চারটে পাথর রেখে দিল। বুড়ো স্যার এসে যেই বসতে গেছেন, ব্যাস। দড়াম করে পা দুটো ওপরের দিকে তুলে একেবারে চিৎপটাং। আমরা না পারছি হাসতে। দুজন ছেলে গিয়ে স্যারকে ধরে তোলে। তারপরে স্যার জানতে চাইলেন," কে করসে?" একটি ছেলে বলে দিলে দুলুর নাম। আর যায় কোথায়! বেধরক মার দুলুকে। তা দুলুর তাতে বয়েই গেছে। বাড়িতে মা/ বাবার কাছে, আর স্কুলে স্যারেদের কাছে মার খেয়ে খেয়ে তো দুলুর হাড়ে দুব্বো গজিয়ে গেছে। দুলু বুড়োস্যারের সে মারকে ডোন্ট তোয়াক্কা। এই বুড়োস্যার ছিলেন আবার পুরোহিত। লোকের বাড়ি বাড়ি পুজো করতেন। তা করবেন ই তো! ভটচার্য বামুন , সে তো পুজুরি বামুন। আমার মা বলতেন, " ভটচার্য রা তো চালকলাবাঁধা বামুন। তারা ব্যবসা বানিজ্যের জানবে কি? লোকের বাড়ি পুজো করেই তাদের দিন কাটে।"আমিও অবশ্য ভটচার্য, কপাল গুণে মুখুজ্জে কুটিলের হাতে পড়েছি। তা বুড়োস্যার আমাদের বাড়িতেও পুজো করতেন। আর চালকলা বাঁধার সময় নজর ও রাখতেন, সব দেওয়া হয়েছে কিনা? তা বাড়িতে পুজো হলে আমাকেই যেতে হোত বুড়োস্যারের বাড়িতে পুজো করার জন্যে বলতে।স্যার থাকতেন আমাদের ই দুটো বাড়ি পরে একজনের বাড়িতে ভাড়া। স্যারের যে কি দৈন্যের দশা ছিল, তা নিজের চোখে দেখেছি। তখনকার দিনে কতই বা মাইনে পেতেন স্কুলে? আর কিছু প্রাইভেট টিউশানি করে স্যারের দিন কাটত। বাড়িতে তখনো একটি ছেলে, চাকরী নেই, বেকার। আর মেয়ে আমাদের সঙ্গেই কলেজে পড়ত। তখন ই দেখেছি বুড়োস্যারের হুঁকো খাওয়া। এর আগে আমি কোনদিন হুঁকো দেখিনি। আবার বুড়োস্যারের সঙ্গে টেলকো স্যারের ছিল আদায় কাঁচকলায়। বুড়োস্যার পূবে যাবেন তো টেলকো স্যার পশ্চিমে। টেলকো স্যার আমাদের পড়াতেন ইতিহাস। তা ওই বুড়োস্যারের মতই। বোর্ডে কতগুলো প্রশ্ন লিখে দিয়ে বলতেন, " এর উত্তর খাতায় লেখ। আমাদের উত্তর লিখতে হোত। আর স্যার যথারীতি টেবিলের ওপরে পা তুলে ঘুমোতেন। হেডস্যার মাঝে মাঝে রাউন্ড দিতেন, এই স্যারেদের ঘুমোনোর কথা সবই জানতেন, তা হেডস্যার ও তো বোধহয় সেই একই দলে। তাই বিশেষ কিছু বলতেননা। তবে যদি এই স্যারেরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতেন আজ স্কুলে স্কুল পরিদর্শক আসবেন, এই স্যারেদের একেবারে অন্য মূর্তি। ক্লাসে এসে পড়ানোর কাজে খুব ব্যস্ত হয়ে যেতেন। মন দিয়ে পড়াতেন। তা যা বলছিলুম। এই বুড়োস্যারের সঙ্গে একবার টেলকো স্যারের তুমুল ঝগড়া হোল, শেষে অন্য স্যারেরা এসে ছাড়ালেন। দুই স্যারে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আমরা বিকেল পাঁচটার সময় মাঠে কিৎকিৎখেলছি, আর দেখছি বুড়োস্যার পাহাড়ি থেকে পড়িয়ে আসছেন, আর টেলকো স্যার পাহাড়িতে যাচ্ছেন নিজের বাড়ি। গরমকালে বিকেল পাঁচটায় বেশ রোদ। দুজনের মাথায় ছাতা। দুজনে দুজনকে দেখে ছাতা দুটো হেলিয়ে দিলেন, যাতে কেউ কারুকে দেখতে না পায়। আমাদের খেলা বন্ধ হয়ে গেল, স্যারেদের দেখে হেসে মরি সবাই। এই ছিলেন আমাদের বুড়ো স্যার। তারপর আমার বিয়ে হয়ে গেল, চলে এলুম বিদেশে। একদিন মায়ের চিঠিতে খবর পেলুম বুড়ো স্যার আর নেই। সেদিন মনটা সত্যি খারাপ হয়ে গেছিল, বুড়ো স্যারের সঙ্গে আর আমার দেখা হবেনা? বড় খিটখিটে আর রাগী মানুষ ছিলেন এই বুড়ো স্যার, কিন্তু কত দারিদ্রের মধ্যেও তো নিজের কর্ম করে গেছেন। পারিবারিক ঝঞ্ছাট স্যারের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছিল, তাঁর ভেতরটা তো আমরা কোনদিন দেখতে চাইনি। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে একদিকে খুব কষ্ট হয়েছিল, অন্যদিকে ভেবেছিলুম, না ভালই হয়েছে, স্যার তাঁর কর্মফল থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

3150

5

মনোজ ভট্টাচার্য

খোলা প্ল্যাটফমে রাত কাটানো !

খোলা প্ল্যাটফর্মে রাত কাটালাম সবাই ! কিছুতেই বরহমপুর পর্যন্ত রিজার্ভেশান পাওয়া গেল না ! আগামী চার মাস পর্যন্ত নাকি ফেরার টিকিট নেই ! এসব তো এজেন্টের বুলি ! কতকাল ধরে শুনছি ! কিন্তু কিই বা করা যায় ! তা বলে তো গোপালপুর যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করা যায় না ! অগত্যা সবাই ঠিক করল আমরা পুরী যাব – জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে ! সেখান থেকে গোপালপুর । ওই ট্রেনে খুব ভালো খেতে দেয় ! আমরা তো কদিন আগেই পুরী ঘুরে এসেছি – ট্রেনে ভালো খাবার দিয়েছিল ! – আর চেয়ার-কারে উটকো কোনও ঝামেলাও নেই ! তাই হাওড়া থেকে পুরী যাওয়া হবে শতাব্দীতে । তারপর রাত্তিরে ওখানে কোথাও কাটিয়ে সকালে ট্যাক্সিতে গোপালপুর যাব । - ট্রেনে উঠে ওখানকার যাত্রীরাই বুদ্ধি দিল – পুরী পর্যন্তই বা যেতে হবে কেন ! ভুবনেশ্বরে নেমে ট্রেনে বা গাড়িতে গোপালপুর যাওয়ার ! ভুবনেশ্বরে ডরমিটারিতে থাকা যায় ! – আমরা রাজি হয়ে গেলাম । কটকে রাতের খাবার দেওয়া হয় - ওটা রেখে দেওয়া হল । তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার দরকার নেই । নামলাম ভুবনেশ্বর – প্রায় সাড়ে আটটা ! প্রথমেই খোঁজ করলাম কোথায় আছে ডরমিটারি । - আমাদের সচরাচর রাতে ডর্মএ থাকার দরকার পরে না বলে – সব নিয়ম কানুন জানি ও না ! এমন কি কোন স্টেশানে কোথায় যে ডরমিটারি – তাও বাইরের লোকজন বিশেষ জানে না । তাই অত বিরাট জনবহুল স্টেশানের গায়ে একটা ছোট্ট দরজা দিয়ে যখন পোর্টার আমাদের স্টেশানের ওপরে নিয়ে গেল – বেশ অবাক লাগলো । নীচে অত হট্টগোল – অথচ ওপরে বেশ নির্জন ! একজন বেশ বয়স্কা মহিলা দরজার সামনে বসে আছে । - আমরা থাকতে চাই – শুনেই বলে দিল – থাকার যায়গা নেই । তারপর বলে – নীচের অফিশ থেকে পারমিশন করাতে হবে । - তিনজনকে সেখানে থাকতে বলে আমি একা নীচে গিয়ে কাউন্টারে দেখা করে বললাম । রাত্তিরে থাকতে চাই ! অনেক কষ্টে বোঝাতে পেরেছি মনে হল । সেও আমাদের টিকিট দেখতে চাইল । দেখাতেই মাথা নাড়া । কেন ? কারন আমাদের টিকিট তো পুরী পর্যন্ত – এখানে তো ওরা ডর্ম দিতে পারবে না ! পুরীতে গিয়ে থাকতে হবে ! – ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলাম ওপরে । আবার অনুরোধ করলাম সেই মহিলাকে ! কা কস্য পরিবেদনা ! পোর্টারমশাই বুদ্ধি দিল – অন্তত বিশ্রামকক্ষে থাকতে । সেটা ভালো বুদ্ধি । সেই কক্ষের সামনে গিয়ে দেখি – ভেতরে মানুষজন থিক থিক করছে ! এখন কি রথযাত্রা নাকি সাগরস্নান ! – ঢুকতেই পারলাম না । আবার গেলাম – এ সি বিশ্রামকক্ষে । সেখানে পরিষ্কার বলে দিল – মেয়েদের থাকার যায়গা হবে না ! – বোঝো কান্ড ! এরা যে 'না' ছাড়া কিছুই জানে না ! বললাম – বাইরে বেড়িয়ে কোনও হোটেলে রাত কাটিয়ে ভোর পর্যন্ত কাটাই ! কেউ রাজি হল না । ওরা খোলা প্ল্যাটফর্মেই থাকতে চাইল । ওদের তো আবার কেন্দ্রিয় সরকারী পেনশান – রীতিমত বড়লোক বলা চলে ! আমরা তো প্রায় উঠাইকিরি আমজনতা ! তিনজন মহিলা যদি থাকতে চায় – আমি তো কোন ছার ! অগত্যা ! – খোলা প্ল্যাটফর্মে আগে যে রাত কাটাই নি – তা নয় । একাধিকবার রাত্তিরে থাকতে হয়েছে । কিন্তু তখন দিনকাল ছিল – অন্যরকম ! – তবু সাহস করে রয়েই গেলাম । একটা স্তম্ভের নীচে স্কোয়ার রকে বসার যায়গা । সেখানেই আমাদের ঠাই হল ! – খাবারগুলো খেয়ে নেওয়ার পরেই – অন্য দুজন মহিলা দিব্যি কুকুরকুণ্ডলী হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ! আমাদের তো ওভাবে ঘুম আসে না । আমি আবার পাহারাদার ! ঘুমের প্রশ্নই নেই ! একপাশে শুয়ে রইলাম ! রাত বাড়ে । ট্রেনের সংখ্যাও কমে আসতে লাগলো । ট্রেনের চেয়েও ভয়াবহ হল সারাক্ষণ ট্রেনের ঘোষণা – তিনবার করে ! ঘ্যান ঘ্যান খ্যান খ্যান করে ঘোষণা করেই যাচ্ছে ! এছাড়া মালগাড়ির সান্টিং তো হচ্ছেই ! – প্ল্যাটফর্ম যখন মোটামুটি খালি খালি – তখন আরম্ভ হল দু-তিনটে বাচ্ছা ছেলের কুকুর নিয়ে সারা প্ল্যাটফর্মে দৌড়ে দৌড়ে খেলে বেড়ানো ! – কি আর করা – এটা তো ওদেরই খেলার যায়গা ! পিকচার তো আভি ভি বাকি হায় জী ! রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ হঠাতই গায়ে ও চশমায় জল লাগতে দেখি – প্ল্যাটফর্ম ধোয়া শুরু হয়েছে ! বিরাট বিরাট হোশ পাইপ দিয়ে অত বড় প্ল্যাটফর্ম ধোয়া হচ্ছে । - আমরা তো রকের ওপর শুয়ে ছিলাম । কিন্তু অন্য যারা মেঝেতে শুয়েছিল – তাদের সব্বাইকে তুলে দিতে লাগলো । ওরে ব্বাস ! সে কী হুল্লোড় আরম্ভ হয়ে গেল ! – একদিকে হোশপাইপওলারা অন্যদিকে শয়নকারীরা – সে কী চেঁচামেচি – প্রায় হাতাহাতি হবার জোগাড় ! প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে স্টেশন ধৌত করা হল ! সূর্য উঠল কিনা বোঝা গেল না – কিন্তু সেই রাত্রিও কেটে ভোর হল । - আমরাও সেখান থেকে পাততাড়ি গোটালাম ! স্টেশনের বাইরে গিয়ে একটা ট্যাক্সির বন্দোবস্ত করা গেল ! শেষপর্যন্ত গোপালপুর অন সী ! ঘণ্টা তিনেক পরে পৌঁছলাম ! কলকাতার অফিশে যদিও বলেছিল – কোনও যায়গা নেই পান্থ-নিবাস এ – কিন্তু সরাসরি গিয়ে দিব্যি যায়গা পেয়ে গেলাম । এবং তুলনায় সস্তাও ! একেবারে সমুদ্রের ধারে । তার আগে একটা হোটেলে গেছি । দারুণ লাগলো । হোটেলের লবির সামনে সমুদ্রের ঢেউ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ! লবিতে চেয়ার পাতা ! শুধু এখানে বসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে পারে ! আমাদের তো ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল । - কিন্তু হোটেলের ম্যানেজার – নিজেই এ সি নেই, টি ভি নেই, ফ্রেশ জল নেই – বলে নাকচ করে দিল । ভাবা যায় ! ম্যানেজার খদ্দের ফেরাচ্ছে ! – একমাত্র এখানেই সম্ভব ! আমার গোপালপুর স্মৃতি চল্লিশ বছর আগেকার ! তাই কিছুই মেলে না । প্রথম যেটা আমাকে অবাক করলো – সেটা হল – গাঁয়ের মানুষজন বেলাভূমি নোংরা করছে না – সকালবেলায় ! বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ! এমন কি সমুদ্রের ধারে বেশ সাজানো গোছানো হয়েছে ! অনেক উন্নতি হয়েছে ! – শুনলাম গোপালপুরে মিলিটারি সেন্টার হবে । একটা এয়ারপোর্টও হবে ! – তখন কি আর এই নির্জনতা থাকবে ! এখানকার বেলাভূমি খুব প্রশস্ত নয় । আর খুব হাল্কা বালি ! ফলে বালির মধ্যে পা ডুবে যায় ! আর হাঁটতে বেশ অসুবিধে হয় ! কিন্তু বেশ নির্জন ধরনের ও ওলাদের ঝামেলাও তত নয় ! ফলে চুপচাপ বসে সমুদ্রের ঢেউ গোনা যায় ! মানে বেশ উপভোগ্য ! কাছেপিঠে মন্দির নেই ! একটা আছে – তারা-তারিনী – সে মন্দিরে যেতে হলে যেতে হবে গাড়িতে করে ! ফিরে আসার পর সব শুনে আমাদের কিছু শুভানুধ্যায়ী – আমাকে তো রীতিমত শাসিয়ে গেল – ভবিষ্যতে কোনোদিন যেন এভাবে না বেরই ! কোনদিন কোন বিপদে - - ! এরকম গ্যারান্টি কি দেওয়া যায় ! – কোনদিন আবার পায়ের তলায় শুরশুরানি লাগে ! আপাতত এ পর্যন্তই ! মনোজ

1312

10