dalia mukherjee

বুড়ো স্যারের কথা|

হ্যাঁ, আমাদের বুড়ো স্যার। ইনি আমাদের স্কুলে ড্রইং করাতেন। এই ক্লাস সিক্স, সেভেনে। ক্লাসে আসতেন ফিটফাট ধুতি আর পাঞ্চাবী পড়ে, ড্রইং এঁকে দিতেন বোর্ডে। তারপরে টেবিলের ওপরে ঠ্যাং টা তুলে মারতেন ঘুম। আর আমাদের সেই বোর্ডের ড্রইং দেখে খাতায় আঁকতে হত। খানিক্ষন পরে ঘুম ভেঙ্গে জিগেস করতেন," হইসে তগো ড্রইং? খাতা লইয়া আয় আমার কাছে।" আমরা একে একে যেতাম বুড়ো স্যারের টেবিলের দিকে। কারুকে উনি দিতেন ১০ এ ১০, কারুকে বা ১০ এ ৩। আমি কোনদিন ও ওনার হাতে ৩ এর বেশী পাইনি। তা পাব কেন? ওনার দুই ভাইপো আছে না? তারা তো বেশী নম্বর পাবেই। তা এই বুড়ো স্যারের ওনেক গুণ ছিল। গুল মারতে বুড়োস্যার ওস্তাদ ছিলেন। উনি বোধহয় ভগবানের সব দেখেছেন। স্বর্গদ্বারের কাছ অবধি ওনার যাতায়াত ছিল। একদিন ক্লাসে এসে বললেন," জান, আমি লহ্মীনারায়ণের নাচ দেখসি।" >

1090

0

Somen dey

তোমারি তুলনা তুমি- (শেষ অংশ )

‘ ….পৃথিবীতে নেই কোন বিশুদ্ধ চাকুরি। এ কেমন পরিবেশে রয়ে গেছি সবে --- বাকপতি জন্ম নিয়েছিল যেই কালে, অথবা সামান্য লোক হেঁটে যেতে চেয়েছিল স্বাভাবিকভাবে পথ দিয়ে, কী করে তা হলে তারা এ রকম ফিচেল পাতালে হৃদয়ের জন-পরিজন নিয়ে হারিয়ে গিয়েছে ? ’ ‘বিশুদ্ধ চাকুরি’ নেই জেনেও সেই চাকুরির সন্ধানে বরিশালের উদার আকাশ আর হিজল- কাঁঠাল-জামের আদ্র মাটি থেকে উৎপাটিত হয়ে আবার এই ইঁট-কাঠ-লোহার কোলকাতায় এসে পড়লেন কবি  ।তার ওপরে সে তখন এক উত্তাল সময় - ১৯৪৭ এ যখন দেশভাগের আগুনে দুই বাংলা অশান্ত। উদ্বাস্তু সমস্যায় কলকাতা জর্জরিত । সেই সময়েই বরিশাল থেকে কলকাতায় এলেন জীবনানন্দ জীবিকার সন্ধানে। কোনো নির্দিষ্ট আয়ের নিরাপত্তা ছাড়াই । এই নুতন জীবনের শুরুটা মোটেই রমণীয় হলনা ।একদিকে কবি হিসেবে তাঁর তেমন কোনো পরিচিতি তখনো গড়ে ওঠেনি , অথচ তাঁর সমসাময়িক কবিরা বুদ্ধদেব বসু , প্রেমেন্দ্র মিত্র , অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত , অমিয় চক্রবর্তী , সুধীন দত্ত , বিষ্ণু দে এঁরা সবাই ব্যাক্তিগত জীবনে এবং সাহিত্যিক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত । এই দুঃখ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে অনেক দিন । অশোক মিত্রের লেখায় জানতে পারি এ রকম সময়ে কবি তাঁকে একান্তে ডেকে নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসুর পঞ্চাশ হাজার টাকা ফিক্সড আছে কিনা ।হয়ত এক ধরণের হীনমন্যতায় শিকার হয়ে পড়েছিলেন । অন্য দিকে জীবনানন্দের ব্যাক্তিগত জীবনও তেমন মসৃন নয় । দাম্পত্য জীবনে একটু একটু করে ফাটল ধরছে । থাকেন কোলকাতার এক মেসে । প্রায় উপার্জনহীন এবং কবি হিসেবে তিনি তখনো কলকাতার সাহিত্য জগতে কোনো ছাপ ফেলতে ব্যর্থ । তাঁর কবিতা তখনো পত্র পত্রিকার অফিস থেকে ফেরত আসে । কবিতা লিখে পয়সা পাওয়া যায় না । তাই শুধু অভাবের তাগিদেই গল্প উপন্যাস লেখার কথা ভেবেছেন , লিখেওছিলেন ।পরামর্শ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসুর সঙ্গে। দেশ পত্রিকার অফিসে গিয়ে সাগরময় ঘোষের কাছে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তাব দেন । সাগরময় ঘোষ উপন্যাস প্রকাশে রাজিও হন । কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে উপন্যাস আর জমা দেন নি । সেই সময় কোলকাতার কবিতার জগৎ আন্দোলিত হচ্ছে কল্লোল , কালি কলমের কবিদের দ্বারা । আধুনিকতার সংজ্ঞা খুঁজছেন এই গোষ্ঠির সদস্যরা । সবাই রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে যাবার বাসনায় যাচ্ছেন ইয়োরোপের কবিতায় আধুনিকতার অনুসন্ধানে  ।এই কবিদের গোষ্ঠি একটা আন্দোলনের মুখ হবার চেষ্টা করছে । স্বভাবলাজুক , মিতবাক , অবগুণ্ঠিত জীবনানন্দ এই গোষ্ঠির একজন গৌণ সদস্য হয়েছেন মাত্র ।কারো কাছে বিশেষ কল্কে পান নি । তিনি এই কবিতার আন্দোলন কে মন থেকে মানেন নি । তাঁর একটা নিজস্ব সুস্পষ্ট মত ছিল । কখনো রবীন্দ্ররীতিকে অস্বীকার করার কথা বলেন নি । তিনি মনে করতেন নতুন ধারা আসতে পারে ভাষার নতুন ব্যাবহারে । রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে একটি প্রবন্ধে তিনি দ্বিধাহীন ভাষায় বললেন – অর্থহীন অসন্তোষে বা দুর্বল বিদ্রোহের অভিমানে আমি আমার পুর্ববর্তী বড় কবিকে ডিঙ্গিয়ে গেলাম অকাব্যের জঞ্জালের ভিতর – সাহিত্যের ইতিহাসে এ রকম আন্দোলনের কোন স্থান নেই । (রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা, কবিতার কথা) অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর নিজের কবিতার আঙ্গিক নিয়ে যে খুব উৎসাহ পেয়েছিলেন , তা নয় ।উত্তর কালের সবচেয়ে প্রতিভাবান কবি সম্মন্ধে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা পাই শুধু একটি দায়সারা মন্তব্য - "তোমার কবিতা চিত্ররূপময়, সেখানে তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।" এছাড়া আর কোনো মুল্যায়ন খুঁজে পাই না । রবীন্দ্রনাথের মতন আধুনিক এবং উদারচেতা মানুষের পক্ষে এই উদাসীনতা খুবই আশ্চর্য লাগে। বুদ্ধদেব বসুও প্রথমে তাঁকে রবীন্দ্রনাথের মত তাঁকে প্রকৃতির কবি বলেই চালিয়ে দিয়েছিলেন – "ছবি আঁকতে তার অসাধারণ নিপুণতা; তার ছবিগুলো শুধু দৃশ্যের নয়, বিশেষভাবে গন্ধের ও স্পর্শের।" অনেক পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন জীবনানন্দ একজন ‘খাঁটি আধুনিক কবি’ । সুধীন দত্ত তাঁর পত্রিকার জন্যে জীবনানন্দের পাঠানো একটি কবিতা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । তবে বিষ্ণু দে অবশ্য তাঁর ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি নিজে হাতে সংগ্রহ করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ছেপেছিলেন । আর সজনী কান্ত দাস শনি বারের চিঠি তে তো আক্রমণের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন । শত লাঞ্ছনার মধ্যে জীবনানন্দের একমাত্র সম্বল ছিল তাঁর আত্নবিশ্বাস । তাঁর ডায়রির পাতায় তিনি এক জায়গায় লিখছেন – I ought to just do that for what I stand and in which I excel and delight and which is my true vocation : কল্লোল , কালি কলমের কবি গোষ্ঠি যে ভাবে রবীন্দ্রনাথ কে অস্বীকার করার উদ্দেশ্য সে সময়ের ইয়োরোপের কবিতার আঙ্গিক কে আশ্রয় করার চেষ্টা করেছিলেন সেটাও জীবনানন্দের পছন্দের ছিল না । তিনি লিখেছিলেন ‘বর্তমান কবিদেরও অল্পবিস্তর পরষ্পরনিঃসক্ত বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী তেমনি বোদলেয়ার ও ফরাসী প্রতীকী কবিদের থেকে শুরু করে ইয়েটস, এলিয়ট ও পাউন্ড-এর কাছে গেলে খানিকটা হৃদয়ের সাহচর্য ও কিছুটা অভিনবত্বের গরিমা সে সব জায়গায় খুঁজে পেয়েছে বলে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার চর্চা আধুনিক বাঙালি কবির তেমন মন যোগাত না; অন্তত যারা আধুনিক বিশিষ্ট বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথকে তারা বিস্পষ্ট সম্ভ্রমে প্রণাম জানিয়ে মালার্মে ও পল ভেরলেন, রসাঁর, ইয়েটস ও এলিয়ট-এর সাদর্থক বা নঙর্থক মননবিচিত্রতার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।‘ রুপসী বাংলার একটি কবিতার একটি লাইন ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রুপ খুঁজিতে যাই না আর ‘ এ শুধু একটি কবিতার আবেগ তাড়িত উচ্চারণ নয় । এ তাঁর প্রত্যয়ী ঘোষনা । তাঁর যা কিছু আহরণ তা এই বাংলার আকাশ বাতাস নদী মাঠ থেকে । এ কবিতার শেষ কটি পংক্ততিতে তাই নিসর্গ মুগ্ধতার থেকে আমাদের তিনি নিয়ে যান এক কালহীনতার দিকে , বাংলার নিজস্ব লোকপুরাণে, মনসামঙ্গলে। বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে- কৃষ্ণা দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায়- সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়, শ্যামার নরম গান শুনেছিলো- একদিন অমরায় গিয়ে ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায় বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিলো পায় অসহায় বেহুলাকে স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবার সর্তে ইন্দ্রসভায় দেবতাদের মনোরঞ্জনের জন্য নাচতে হচ্ছে তীব্র যন্ত্রনা বুকে নিয়ে । সে যন্ত্রণার উপমা উঠে আসে সেই বাংলার প্রকৃতি থেকেই – ছিন্ন খঞ্জণার মত, এ যন্ত্রণার এর চেয়ে ভালো উপমা আর কি হতে পারে । আবার তিনি শুধু বাংলার মানচিত্রে সীমাবদ্ধ ররে গেছলেন তা নয় , তাঁর ইতিহাস ভুগোল এবং সমাজচেতনা চলে গেছে মেসিডোনিয়া, নীলনদ্‌ তাইগ্রিস, মিশর্‌ লিবিয়া, হংকং ,সাংহাই এমন কি সুদুর মেরু প্রদেশে । – ‘কোনো গ্লসিয়ার হিমস্তব্ধ কর্মোরান্ট পাল বুঝিবে আমার কথা ; জীবনের বিদ্যুৎ কম্পাস অবসানে ‘ এখানে ‘কর্মোরান্ট ‘ বাঙালি পাঠকের কাছে সম্পুর্ণ অচেনা শব্দ ।এখনকার আগ্রহী পাঠক উইকি খুঁজে পেতে পারেন এই নামের পাখির কিছু বিবরণ । একধরনের সামুদ্রিক পাখি । মাছ খায় ।বাসা বাঁধে সমুদ্রের উপকুলে । এ পাখি নাকি ডাইনোসরের সময়েও ছিল । অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে হাজার হাজার বছর । তবে তার মধ্যে অনেক পাখি হয়ত গ্লসিয়ারে হিমস্তব্ধ হয়ে গেছে । শ্যামা দোয়েল ফিঙ্গে পানকৌড়ি হাঁড়িচাচা পাখি যাঁর প্রিয় সেই কবি ঠিক কোন সংকেত দেবার জন্যে এ রকম অচেনা পাখির উপমা দিলেন তার সন্ধান আমরা করতে থাকবো । অভিযোগ অনেক উঠেছে  । সাধারণ পাঠকের কাছে দুর্বোদ্ধতার অভিযোগ , বামপন্থীদের কাছে বুর্জোয়া পন্থার অভিযোগ , ছান্দসিকের কাছে ভুল ছন্দে কবিতা লেখার অভিযোগ , নীতিবাগীশের কাছে অশ্লীলতার অভিযোগ । কিন্তু জীবনানন্দ কখনো নিজের পথ পরিবর্তনের কথা ভাবেন নি । নিজের ডিকশন বদলান নি । তাঁর কথা ছিল – ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময় চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো ; কবিতা লেখবার পথে কিছুদুর গিয়েই আমি বুঝেছি , গ্রহণ করেছি । এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে ।’ (কবিতার কথা ) আসলে সংকেত ছড়িয়ে আছে তাঁর সমস্ত কাব্য জগত জুড়ে । জীবনানন্দের চেতনা অবচেতনা অধিচেতনার জগতের সংকেত আমাদের জন্যে রেখে গেছেন । কিছু তার কিছু আবিস্কৃত কিছু এখনো অনাবিস্কৃত । তবু আবিস্কারের আগ্রহ বেঁচে থাকবে , যতদিন বাংলা কবিতা লেখা হবে । এমেরিকান কবি Archibald MacLeish একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে স্মরনীয় - A poem should not mean but be’  । জীবনানন্দের কবিতা তাই ।ভালো করে কিছু বোঝাবার আগেই তা কবিতা হয়ে ওঠে । **** মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি, না এলেই ভালো হত অনুভব করে; এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে; দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়– শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়। কবিতা থেকে আবার মানুষ জীবনানন্দে ফিরে যাই । ‘না এলেই ভালো হত’ এবং ‘এসে যে গভীরতর লাভ হল’ এই দোলাচলের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে তাঁর নানা বর্ণের সৃষ্টি , আশা এবং আশাহীনতার ।ব্যাক্তিগত জীবন তাঁর লেখাকে ঠিক কতখানি প্রভাবিত করেছে তা বলা মুস্কিল । কবিতায় যে ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার বলতে পারেন নি তা কি বলতে চেয়েছেন উপন্যাসে ? তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস টি প্রকাশিত হয় উনিশ বছর পরে । তিনি নিজে তাঁর উপন্যাস প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । তাঁর স্ত্রী ছিলেন অনিচ্ছুক । প্রধাণত তাঁর ভাই অশোকানন্দ দাশের আগ্রহেই এই প্রথম উপন্যাস টি প্রকাশিত হয় । উপন্যাসের মূল বিষয় একটি স্ত্রী শাসিত সংসারে দাম্পত্য জীবনের অসঙ্গতি । তাঁর মৃত্যুর পর আমরা জানতে পারি অসংখ্য কবিতার সঙ্গে তিনি নিভৃতে বসে চোদ্দটি উপন্যাস ও ১০৮ টি ছোট গল্পও লিখেছিলেন । মাল্যবান ছাড়া অন্য উপন্যাসেও কবির জীবনযন্ত্রণা খণ্ডিত অংশ উঠে এসে নানা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে । ‘কারূবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে । সব সময় শিল্প সৃষ্টি করবার আগ্রহ তৃষ্ণা .... কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে’ কারুবাসনা উপন্যাসের নায়কের এই কথা জীবনানন্দের স্বগতোক্তির মতন লাগে । এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়। যাপিত জীবনে রণ রক্ত সফলতা কোনো দিন আঁকড়ে ধরে থাকতে চাননি । তবু শেষ সত্যের অনুসন্ধান ছাড়েন নি । মৃত্যুর কথা এসেছে ঘুরে ঘুরেই । তাঁর স্ত্রীর কথায় - "...মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষন ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? ‘’ কবিতাতেও থেকে থেকে এ রকম এক প্রগাঢ় নিদ্রার কথা বলতেন – ‘যে ঘুম ভাঙ্গে নাকো কোনোদিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর শান্তি আছে তাতে ।‘ তাই তাঁর অন্তর্ধানও তাঁর কবিতার মতনই রহস্যে ঘেরা । কলকাতার ইতিহাসে ট্রাম চাপা পড়ে আজ পর্যন্ত অন্য কারো মৃত্যু ঘটেনি । তাই সন্দেহ জাগে কবি কি এতটাই আত্নবিস্মৃত হয়ে চলা ফেরা করতেন ! নাকি তাঁর মৃত্যু আসলে স্বেচ্ছামৃত্যু ছিল  ।তাঁর দুই কাছের মানুষ সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং ভুমেন্দ্র গুহ দুজনেই সে রকম সন্দেহ প্রকাশ করেছেন । কিন্তু সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিবরণ আমরা পাই তাঁর আর এক বন্ধু সুবোধ রায়ের লেখা থেকে - "জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচন্ড এক ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতি কষ্টে টেনে হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কটা আর উরুর হাড়।" ( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়) এই অবস্থায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে । যেখানে তার আশে পাশে পুলিশ কেসের রোগীরা শুয়ে আছেন আর আবহ সঙ্গীতের মত শোনা যাচ্ছে খইনি টেপা দারোয়ানের গান । ‘সুখ আর শান্তি’ নয় অপরিসীম যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছেন ১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর থেকে ২২শে অক্টোবর দিনটি পর্যন্ত । তার পর অনন্ত শান্তিকল্যান । হাসপাতালে জীবনের শেষ কয়েকদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে দেখতে আসেন নি । তিনি নাকি ব্যাস্ত ছিলেন টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে । যখন তাঁর শবদাহ দাহ করার জন্যে প্রস্তুত হয়ে রাখা আছে , তখন কলকাতা কেন্দ্রিক অনেক কবি সাহিত্যিকরা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাচ্ছেন , সেই সময় লাবণ্য দেবী জীবনানন্দের বন্ধু ভুমেন্দ্র গুহর কাছে জানতে চেয়েছেন – ‘অচিন্ত্যবাবু এসেছেন , বুদ্ধবাবু এসেছেন , সজনীকান্ত এসেছেন , তাহলে তোমাদের দাদা নিশ্চয় বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন ; বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো , আমার জন্যে কি রেখে গেলেন বলো তো ? ’ প্রশ্ন টি লাবণ্য দেবীর দিক দিয়ে খুব অসঙ্গত ছিল , এমন কথা বোধহয় বলা যায় না  । কবির শ্রাদ্ধ বাসরে রাখবার জন্যে একটি ছবি অনেক সন্ধান করেও আয়োজকরা যোগাড় করতে পারেন নি  । এমন কি তাঁর স্ত্রী ও দিতে পারেন নি । উত্তরকালের কবিদের জন্যে তিনি কতটা আলোর সন্ধান দিয়ে গেছেন তার পরিমাপ তাঁরাই করবেন ।এ নিবন্ধ শেষ করা যাক এ কালের বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামীর একটি কবিতা দিয়ে – একটি পাখী ডাকছে তার কাকলী মাধবীলতা যতটা বাগান... আকাশে চক্কর মেরে মাথায় দু চারটি তারা ডুবে গেলে পর এককোনে আড়ামোড়া ভেঙ্গে উঠে সর্বনিম্ন ডালের ওপর হাফহাতা গেঞ্জীপরা কনুই লাগিয়ে সোজা দাঁড়ান মালকোঁচা টানটান কে উনি ? কে উনি ? ব্যাক্তি ? মহাশয় ? বাগানের মালি বা দেখাশোনার লোক ? দুটি পাখি ডাকছে , তিনটি, কাকলি মাধবীলতা কতটা বাগান পার হল ? দোর খোলো ,সারা মাথা তারা ডুবে সবাই যখন ঘুমচোখ চারজন ,পাঁচজ্‌ন ষষ্ট , সপ্তম , অষ্টম পাখি জড়ো হচ্ছে ভুলে যাচ্ছে কাকলি বা গান মাথায় চক্কর মেরে ভোর-অন্ধকার দেখছে , দূরে হাওড়া ব্রিজের মাথায় কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে আবার অনেকদিন পর শ্রী দাশ , জীবনানন্দ , কী রকম সুর্যটিকে তুলে দিয়ে যান ।

1225

8

Somen dey

তোমারি তুলনা তুমি -২

তোমারি তুলনা তুমি -২ ********************** ‘কবিরে পাবেনা তার জীবন চরিতে’ এমন একটি সাবধান বাণী লিখে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবাইকে কোনো কবির ব্যাক্তিগত জীবনের প্রতি অতি ঔৎসুক্য থেকে সংযত থাকতে বলেছিলেন । কিন্তু আমাদের উৎসাহ তাতে বিন্দুমাত্র কমেনি । প্রিয় কবির জীবনযাপনের ব্যাক্তিগত খুটি নাটি জানবার ইচ্ছেতে কোনো দিন ভাটা পড়েনি । তার প্রমান ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট’ নামে একটি বই বহুদিন ধরে বেস্ট সেলার হয়ে আছে । যারা পাঠ্য পুস্তকের বাইরে রবীন্দ্রনাথের কোনো বইই পড়েননি তারাও বোধহয় পড়ে ফেলেছেন এই বইটি । তার কারণটা আর নাই বা বললাম। বাঙালি শিলং এ বেড়াতে গিয়ে আজও খোঁজে লাবণ্যর সেই বাড়িটি । নীরা, যার মন খারাপ হলে কোলকাতায় ট্রাফিক জ্যাম হয়ে যায় , সে কোলকাতার কোন পাড়ায় বাস করতো এ নিয়ে তর্ক আজও চলে । আর একটি ছোট্টো মফস্বল শহর যে বাঙালি কাছে কি ভাবে চিরকালের আগ্রহের জায়গা হয়ে রয়ে যেতে পারে তা তো আমরা জানি । শহরের নাম নাটোর । যেখানে বনলতা সেন থাকতেন । হাজার বছর পথ হাঁটার পর বাঙালি বোধহয় ভুলবেনা বনলতা সেন কে । অনেকে ভাবেন এই একটি কবিতা লিখলেই জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন । কিন্তু একটি সত্য আমরা এখন জানতে পেরেছি ( দেবী প্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের সৌজন্যে) হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে – এই লাইনটি কবিতার প্রথম খসড়াতে ছিলই না । কবিতাটি শুরু হয়েছিল এ ভাবে – জীবনের সব লেন দেন / বনলতা সেন । আর শেষ হয়েছিল – ‘কত যে ঘুমিয়ে রব বস্তির পাশে কত যে চমকে জেগে উঠিব বাতাসে হিজল জামের বনে থেমেছে স্টেশনে বুঝি রাত্রি নিশুথির বনলতা সেন ।’ নিঃসন্দেহে প্রথম খসড়ার চেয়ে যে কবিতা আমাদের মুখে মুখে ফেরে সেটি অনেক বেশি সুন্দর । কথা হচ্ছিল জীবন চরিত নিয়ে । মানুষ জীবনানন্দ কে যারা কাছ থেকে দেখেছেন তাদের খণ্ডিত স্মৃতি চারণ থেকে একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করা যাক কবিকে । বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন একজন শিক্ষাব্রতী আর মা ছিলেন সেকালের একজন নামকরা কবি – কুসুমকুমারী দাশ । বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয় তাঁর প্রথম স্কুল । এখান থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন ব্রজমোহন কলেজে । সেখান থেকে প্রথম বিভাগে আই এ পাশ করে চলে আসেন প্রেসিডেসি কলেজে । ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাই সেকন্ড ডিভিশনে । পরীক্ষার আগে তিনি ব্যাসিলাস ডিসেন্ট্রিতে খুব ভুগেছিলেন । ইচ্ছে ছিল সে বছর পরীক্ষা ড্রপ দেওয়ার । কিন্তু মায়ের জোরাজুরিতে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন । মায়ের কথা তিনি কিছুতেই ফেলতে পারতেন না । বাবার সঙ্গে একটা সম্ভ্রমের দুরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে সব কথা হত । কোনো দিন মায়ের সঙ্গে কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনা হত কিনা তা অবশ্য আমরা জানতে পারিনা । কুসুমকুমারীর কবিখ্যাতি কিন্তু সে সময় কিছু কম ছিল না । ‘প্রবাসী’ আর ‘মুকুল’ পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু কবিতা ছাপা হয়েছিল । আর একটি কবিতার তো আমাদের কাছে প্রায় প্রবাদ প্রতীম হয়ে গেছে – আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ? মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন মানুষ হইতে হবে এই তার পণ --- জীবনানন্দ অবশ্য প্রথম থেকেই এই জাতীয় কবিতা থেকে অনেক দুরের যাত্রী । এম এ পাশ করে চাকরী পান সিটি কলেজে ।সে কলেজে ব্রাহ্মদের রমরমা ।ছাত্রদের সরস্বতী পুজো করা নিয়ে পরিচালন সমিতির একটি বিরোধ বাধে এবং তাতে ছাত্রদের সমর্থন করার অপরাধে জীবনানন্দের চাকরী যায় । তার পরে চাকরী করতে যেতে হয় তাঁর সাধের রুপসী বাংলা ছেড়ে দিল্লী তে রামযশ কলেজে  ।সুদুর দিল্লীতে হয়ত খুব একাকীত্ব বোধ করছিলেন । মাথায় উঁকি দিচ্ছিল সেই বিখ্যাত লাইন গুলি – ‘...সকল লোকের মাঝে বসে আমার নিজের মুদ্রা দোষে আমি একা হতেছি আলাদা আমার চোখেই শুধু ধাঁদা আমার পথেই শুধু বাধা...।’ অনুভব করেছিলেন বাস্তব জীবনে একজন জীবন সঙ্গিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা । তেমন কেও এলে কেটে যাবে একাকীত্ব ।এমনটাই ভেবেছিলেন হয়ত  । সেই ভেবেই লাবণ্য গুপ্ত কে দেখতে এলেন জীবনানন্দ , লাবণ্যর জেঠামশাইয়ের ঢাকার বাড়িতে । লাবণ্য তখন ঢাকার ইডেন কলেজে হোস্টেলে থেকে আই এ পড়েন । সে কালের নিরিখে যথেষ্ট প্রগতীশীল । সুন্দরী এবং সপ্রতিভ । ব্রাহ্ম পরিবারের রীতিনীতি বেশ খোলা মেলা ছিল । জেঠামশাই জীবনানন্দ কে পাত্রী কে একান্তে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলেন । গত তিন প্রজন্মের বাংলা ভাষাভাষী কবিযশপ্রার্থীরা যে জীবনানন্দের কবিতায় খুঁজে পান রোমান্টিকতার আশ্রয় , তিনি মানুষটি কি আদতে রোমান্টিক ছিলেন ? তাঁর জীবনে যে নারী প্রথম আসতে চলেছে তাকে তাঁর করা প্রশ্ন গুলি জেনে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে । সেগুলি ছিল এ রকম - আপনার নাম কি ? আই এ তে আপনি কি কি সাবজেক্ট নিয়েছেন? কোন সাবজেক্টটি আপনার বেশি পছন্দ ? পাত্রী কোনো রকমে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েই উঠে চলে যায় অন্দরমহলে । প্রশ্নের উত্তর পেয়ে জীবনানন্দের কি ধারণা হয়েছিল তা আমরা জানতে পারি না । তবে এর পরেই জীবনানন্দ বিয়েতে মত দেন ।১৯৩০ সালের ২৬শে বৈশাখ , শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে ঢাকা শহরে খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামের রোহিনীকুমার গুপ্তর কন্যা লাবন্য গুপ্তর সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় কবি জীবনানন্দের । দেখতে এসে পাত্রীকে করা প্রশ্ন গুলি মধ্যে কোনো রোমান্টিকতার রেশ ছিল না এটা আমাদের মনে হতেই পারে । কিন্তু ফুলশয্যার রাতে ? আমাদের প্রিয় কবি কি কথা বলেছিলেন নবোঢ়া বধুকে ? সে রাত্রে সংলাপ ছিল এই রকম - আমি শুনেছি তুমি ভালো গান গাইতে পারো । আমায় একটা গান শোনাবে ? - কোন গান ? - জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে গানটা যদি জানো তবে সেটাই শোনাও সে রাত্রে পর পর দু বার গান টি গাইতে হয়েছিল লাবণ্য কে । অনেক দিন পরে কবিপত্নী কবি জিজ্ঞেস করেছিল ফুলশয্যার রাতে এই গানটি কেন শুনতে চেয়েছিলেন । উত্তরে কবি বলেন – এই লাইন দুটির মানে জানো ? আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া তোমার বীণা হতে এসেছে নামিয়া – জীবনের শুভ আরম্ভ তে তো এই গানই গাওয়া উচিত , শোনা উচিত । এ পর্যন্ত যা জানলাম তা জানতে পারলাম তার অনেকটাই কবি পত্নীর লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’ থেকে । এ বই তে যা লিখেছেন , বোঝা যায় তিনি খুব সন্তর্পণে লিখেছেন । ইচ্ছে করেই লিখতে চান নি এমন কিছু যাতে মানুষ জীবনানন্দের বিচিত্র স্বভাবের থেকে সৃষ্টি হওয়া দাম্পত্য সম্পর্কের ফাঁক গুলো ধরা পড়ে । এ বইতে মানুষ জীবনানন্দ আর সম্মন্ধে যা যা জানতে পারি তা সার সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায় – খুব সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন ।মিলের ধুতি পরতেন ।তাও একটু উঁচু করে পরতেন মানে ধুতি হাঁটুর নীচে বেশি দূর নামত না  ।এবং তাঁর জামা কাপড়ের ব্যাপারে কারো মন্তব্য গ্রাহ্য করতেন না। ডিম খেতে খুব ভালো বাসতেন । লেখার খাতা প্রাণপণে আগলে রাখতেন । দুই সন্তান মঞ্জুশ্রী আর সমরানন্দ কে খুব ভালোবাসতেন , যে কোনো গৃহী মানুষের মত ।ছোট বেলায় মেয়ের একবার অসুখ করে তখন মেয়েকে কোলে নিয়ে সারারাত পায়চারী করতেন । মেয়েকে রান্না ঘরে যেতে বারন করতেন , পাছে আগুনে পুড়ে যায় । আশা ছিল মেয়ে তার মত কবিতা লিখবে একদিন। ছেলের সঙ্গে বন্ধুর মত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন । একটু নার্ভাস প্রকৃতির ছিলেন । বিয়ের পর লাবণ্য বি এ পরিক্ষা দিয়েছিলেন কবিরই উৎসাহে । রেজাল্ট বেরোবার সময় তিনি এতটাই নার্ভাস ছিলেন রেজাল্টের খাম হাতে পেয়েও অনেকক্ষন ধরে নিজে কিছুতেই খুলতে পারেন নি খাম । কারো কাছে কিছু নিতে কুণ্ঠিত বোধ করতেন । বিয়েতে শ্বশুর বাড়ি থেকে একটি আংটি পেয়ে বেশ বিড়ম্বিত বোধ করেছিলেন । তবে তাঁকে দেখে যতটা শান্ত নিরীহ মনে হত আসলে তিনি তেমন ছিলেন না । লাবণয়র কথায় ‘ছাই চাপা আগুন’ । শান্ত ভাবে অল্প কথায় নিজের ব্যাক্তিত্য প্রকাশ করতেন কখনো কখনো । লাবণ্য দাশের স্মৃতিচারন পড়লে মনে হতে পারে তাদের দাম্পত্য জীবন মসৃন ভাবেই কেটেছে । কিন্তু তেমনটা বোধহয় নয় । ভুমেন্দ্র গুহ এবং অশোক মিত্র মশাই যাঁরা দুজনেই কবির খুব কাছের মানুষ ছিলেন তাঁদের স্মৃতিচারণে আমরা একটা অন্য রকম ছবি পাই । ‘মাল্যবান’ উপন্যাসে , যেটি কবির ভাই অশোকানন্দ দাশের মতে কবির ছদ্ম বেশে আত্নজৈবনিক উপন্যাস , সেখানেও দাম্পত্য সম্পর্কের অশান্তির দিকটি উঠে এসেছে । সে কথায় পরে আসছি । দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন বিয়ের পরে বছর খানেক; ১৯৩৫ সালে বরিশালে চলে এসে যোগ দেন ব্রজমোহন কলেজে, ছিলেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ১৯৫১ থেকে '৫২ সাল পর্যন্ত পড়িয়েছেন খড়গপুর কলেজে, ১৯৫৩ সালে বারিষা কলেজে, পরের বছর হাওড়া গার্লস কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। খরগপুর কলেজে অধ্যাপনা করার সময় সপ্তাহান্তে কলকাতায় চলে আসতেন এবং প্রায়শই কলেজ কামাই করে আরো কয়েকদিন থেকে যেতেন । তাই এই চাকরীটি চলে যায় । পরে ডায়মন্ড হারবার কলেযে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তাঁর শুভনুধ্যায়ীরা । সে চাকরীতে তিনি যোগদান করেন নি যাতায়াতের অসুবিধার অজুহাতে । ঘন ঘন চাকরি হারানোর ফলে জীবনের অনেকটা সময় প্রচণ্ড অর্থকষ্টেই কেটেছে । গ্রাসাছাদনের জন্যে ইন্সিওরেন্সের দালালি পর্যন্ত করতে হয়েছে । তবু তার মধ্যে কিন্তু লেখা চালিয়ে গেছেন পুরো দমে । ওই এক জায়গায় তিনি কখনো হাল ছাড়েন নি । বোধহয় আগামী পৃথিবীর কথা ভেবে । সেটাই আমাদের পরম সৌভাগ্য । (শেষ হয় নি )

1130

8

Somen dey

তোমার ই তুলনা তুমি (১)

তোমারি তূলনা তুমি (১) আনন্দ যার জীবনে বিরলতম অনুভব সেই কবিরই নাম জীবনানন্দ । বিষন্নতার সঙ্গে নিত্য সহবাস করতে করতে এই পিতৃদত্ত নামটির ভার হয়তো কখনো কখনো তাঁর কাছে খুব অবহ মনে হয়েছে । অথবা এই নামটিই হয়তো সাহাজ্য করেছে বেদনা-বিধুর বিপন্নতায় নির্বাসিত জীবনে সতত সৃষ্টিশীল থাকতে । আমরা সে রহস্য কোনোদিন সমাধান করতে পারবো না । জীবনানন্দকে কেউ বলেছেন নির্জনতম কবি , কেও বলেছেন নিশ্চেতনার কবি , কেও বলেছেন অবচেতনার কবি । জীবনানন্দ এই সব মতগুলিকেই ‘ আংশিক ভাবে সত্য ‘ বলেছেন । যখন তিনি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছেন রবীন্দ্র নাথ সুর্যের মত জ্বল জ্বল করছেন বাংলার সাহিত্যের আকাশে । বাংলা কবিতার যে আঙ্গিক, যে ভাব্‌ যে ভঙ্গীকে যে তিনি হিমালয়চিত উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন তার সামনে দাঁড়িয়ে সে সময়ের যে কোনো কবির অসাহায়বোধ অবশ্যম্ভাবী ছিল । আর কি কিছু লেখার বাকি আছে ? রবীন্দ্র নাথ কি আধুনিকতার শেষ ধাপে রেখে যাবেন কবিতাকে ? এ প্রশ্ন গুলো যখন নবীন কবিদের জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছে তখন কল্লোল , কালিকলম প্রভৃতি পত্রিকা চেস্টা করছে রবি ঠাকুরের হাত ছাড়িয়ে একটা নতুন পথে হাঁটবার | একটি অনুচ্চারিত বিদ্রোহকে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেস্টা করছেন বুদ্ধদেব বোস , অচিন্ত কুমার সেনগুপ্ত , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বিষ্ণু দে রা । তবে এরা যতই বিদ্রোহের ভাব দেখান আসলে এঁদের অন্তরে রবীন্দ্র নাথ শালগ্রাম শিলার মত অনড় । ছন্দের বন্ধন ভেঙ্গে বেরোতে পারলেও আঙ্গিকে রবি ঠাকুর ফিরে ফিরে আসছেন । ঠিক এই সময় জীবনানন্দ এ সব আন্দোলনের কথা মুখে না বললেও কবিতার আঙ্গিক একেবারে ভেঙ্গে তছনছ করে দিতে চাইলেন। কিন্তু সে সময় কেও তাকে বিশেষ পাত্তা দিলেন না । কল্লোল , কালি কলমের কবিরা সকলেই জীবনে কোনো না কোনো ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত । কবিতা তাদের বাঁচা মরার সংগ্রাম নয় । জীবনানন্দর তখন অপরিসীম অর্থ কষ্ট । কলেজে অধ্যাপনার চাকরি কোনোক্রমে জোটাতে পারলেও সে চাকরি শেষ পর্যন্ত রাখতে পারেননি ।এ দিকে তাঁর কবিতা সম্পাদকরা প্রত্যাখ্যান করছেন । নানা ভাবে অপমানিত হচ্ছেন । বিবাহ করেছেন কিন্তু সে বিবাহও সুখের হয় নি । মোটা মুটি এই রকম একটা ক্লিষ্ট জীবন যাপনের মধ্যেই তাঁর বেশির ভাগ কবিতার সৃষ্টি হয়েছে । এই সব দারিদ্র মালিন্য হীনমন্যতা তাঁর কবিতাকে কি প্রভাবিত করেছিল ? বোধহয় না । মুখচোরা অন্তর্মুখী নির্বিরোধী মানুষটি রবির আলোতে আলোকিত না হয়ে , রবীন্দ্রনাথ কে পাশ কাটিয়ে একা একাই চললেন অন্য একটা এবড়ো খেবড়ো অনালোকিত রাস্তায় । সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা দলছুট মানুষদের সমাজ হয় তাচ্ছিল্য করে নয় ছাপ মেরে দেয় পাগোল বলে । এ ক্ষেত্রেও তাই হল । কেউ বললো দুর্বোধ্য , কেউ বললো অশ্লীল। তবু তিনি লেখার আঙ্গিক পাল্টালেন না । প্রথম প্রকাশিত বই ‘ঝরা পালক’ থেকে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধুসর পান্ডুলিপি’ বেরোতে লেগেছিল ন বছর সময় । বোঝাই যায় তিনি পাঠকের কাছে সমাদৃত হন নি সেই সময়ে । তবু এই ন বছরে নিজেকে নিয়ে গেলেন আরো বেশি বিমুর্ততার দিকে।ডুব দিলেন নতুন অবচেতনায় জগতে ।

1565

7

মনোজ ভট্টাচার্য

কিছু কিছু সুন্দর অভিব্যক্তি !

কিছু কিছু সুন্দর অভিব্যক্তি ! আমার একটা অভ্যেস আছে – এমন অনেক সাময়িক পত্রিকা পড়ি – যার নামই হয়ত অনেকে জানেই না ! তারা এখনও লিটিল ম্যাগাজিনের ছায়া থেকে বেরতেই পারে নি! যদিও অনেক বিদগ্ধ লেখক সেখানে লেখেন এবং বেশ ভালই লেখেন ! হয়ত বাজারী পত্রিকায় লেখা দেওয়া তাঁরা পছন্দ করেন না ! তারই মধ্যে একটা হল - শুভম -! লেখাগুলো – বিশেষ করে প্রবন্ধগুলো খুবই সুপাঠ্য – এবং চিন্তনীয় ! রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড প্রত্যাখ্যান বা রথীন্দ্রনাথের শেষ জীবন ইত্যাদি বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ লেখা আছে ! নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ! কিন্তু একটা লেখা পড়ছি এখন – নলিনী বেরার – জোন থার্টি । উনি ফ্রান্স যাচ্ছেন – তারই ওপর লেখা ! ভ্রমণ কাহিনী – আমরা তো অনেকই পড়ে থাকি । কিন্তু কিছু কিছু অভিব্যক্তির প্রকাশ এত সুন্দর – মনে হল এখানে শেয়ার করি । হয়ত নিনাবালি বা মুনিয়ার বা যারা দেশে আসা যাওয়া করতে হয় - তাঁদের ভালো লাগতেও পারে ! “ - - ভিসার জন্যে তোলা আমাদের সব ফটো বাতিল । অথচ পরিমান মতো কোথায় কোথায় না ছবি তুলিয়েছি । কলেজ স্ট্রিট ওয়েলিংটন ধর্মতলা । - - অগত্যা ‘নিউ বম্বে ফটো’, চার নম্বর হো চি মিন সরনি। সাদরে চা খাওয়াল । তদুপরি স্টুডিয়োর দেয়াল-গাত্রে উপর্যুপরি সাঁটা ছবি দেখে আমাদের রোমাঞ্চ হল । কে নেই ? সর্বশ্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, মনোজ মিত্র, স্রীমতী অপর্ণা সেন - -! ( ইয়ে, মনোজ ভট্টাচার্যের নামটা লিখতে ভুলে গেছে দেখছি !) এর ঠিক দুদিন পরে কুরিয়ার ‘ক্রোনোপোষ্ট ইন্টারন্যাশানাল’ এর হাত ঘুরে এসে গেল বহু আকাঙ্খিত সেই ‘আটেসটেশন ডি অ্যাকাউলি’। তর্জমা করলে যার মানে দাঁড়ায় ‘সার্টিফিকেট অব বোর্ডিং অ্যান্ড লজিং’! - - আর দেখে কে ! ‘মুস্করা কর ডাল দী রুখপর নকাব । মিল গায়া জো মিলনা থা জওয়াব ‘! সাধু শেঠের মুদিখানায় গদিতে ফর্দ ফেলে দিয়ে শশব্যস্ত বলি – ‘ফ্রান্স যাচ্ছি – জিনিস কটা একটু তাড়াতাড়ি দিন তো ।‘ - - ফর্দ টুকতে টুকতে সেরেস্তার বাবু এতক্ষণে আচমকা মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ অ্যাঁ, কোথায় যাচ্ছেন বললেন ? ফ্রান্স ? তারমানে ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস ?’ আইনি ছাড়পত্র দেখিয়ে অন্দরে ঢোকামাত্রই শিহরিত হলাম । কোথায় আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ ! কোথায় বড় হয়েছি ! কোথায় কাটিয়েছি এ যাবত জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই ! এক্ষণে আবার কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি ! অথচ – “ ছিটকিনি খুলে দাও এই দণ্ডে পিছল জোছনায় থুবড়ে মুখ শুয়ে রব ঘাসে ডোবাবো শিশিরে জিহ্বা যদি দাও খুলে দাও তবে চাঁদ এসে নুয়ে পড়ে গ্রিলে থ্যাবড়ায় নখরে ডাকে আয় চলে আয় কাকে ছেড়ে কোথায় জোড়াব কি আছে আমার বলো এইটুকু শেষ হয়ে গেলে খালি গা উদোম পায়ে ছিনছাতুর করে নদীজলে মিশে পাথর পাথর হয়ে গড়তে গড়াতে যাব যদি ছিটকে উঠে ভেঙ্গে পড়ি জলে তর্পণে তোলো ছিটকিনি খুলে দাও এই দণ্ডে পিছল জোছনায় থুবড়ে মুখ শুয়ে রব ঘাসে ডোবানো শিশির জিহ্বা “ “কুছ লোগোঁ সে জবতক ন মুলাকাত হুই থী ম্যায় ভী য়ে সমঝতা থা খুদা সবসে বড়া হ্যায় “! তর্জমা হল এই, জীবনে যদি কিছু লোকের সঙ্গে দৈবাৎ দেখা না হত, তবে ভাবতাম খোদাই সবচেয়ে বড় । তদন্তকারী অফিশারকে দেখে আমারও মনে হল তিনি বুঝি ঈশ্বরের থেকেও বড় ! অভিবাসন দপ্তরের বাগবিতণ্ডায় সামান্য দেরী হয়েছিল । তা স্বত্বেও, বলতে বাধা নেই –একমাত্র আড়াই ইঞ্চি দৈর্ঘের কাঁচিটি ছাড়া, কি পোস্ত, কি লঙ্কার গুঁড়ো, কোনও কিছুই আমাদের খোয়া যায়নি । “কুছ লোগো সে জবতক ন মুলাকাত হুঈ থী” – ইমিগ্রেশান কাউন্টারের খোদার চেয়ে বড় না হোক, ঈশ্বরপ্রতিম লোকটার সঙ্গে আমার এই প্রথম মুলাকাত হল । বলা বাহুল্যই, লোকটা পোস্তখেকো ভেতো বাঙ্গালিই ছিল । রাত ঠিক আটটা তিরিশে আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ, হাওড়া-কলকাতার সংযোগ রহিত হল । বলা যায় নাড়ি ছিঁড়ল । দমদম বিমানঘাঁটির রানওয়ে ছাড়িয়ে – “এই তো উড়ান দিল পাখি, ছেঁড়া ছেঁড়া ।“ কান্না-পালক ছুঁয়ে যায় বুক, আমার জন্মের মাটি, দেশ-গাঁ প্রসুতির ঘর জন্মলগ্ন আবহ সঙ্গীত”। কলকাতা ছাড়ল বটে, বাঙলা এখনও ছাড়েনি ! কি ভূগোল কি ভাষায় । মনে হয়, মেঘহীন আকাশে ফিং-ফোটা জ্যোৎস্না পড়েছে । জানলার ধারে বসে ‘মেঘপাতালের’এর তলায় চোখ রাখলে ‘বাঘঘুগনি’ পোকার মতো আলোর ফুড়গুনি । জোনাকি পোকা তো নয় – দেশে-ঘরে বলে ‘বাঘঘুগনি' পোকা । এক সময় ভূখণ্ডও সরে গেল – থাকল বাকি ভাষা ! আ মরি বাংলাভাষা ! ( অনেকদিন পর মনে পড়িয়ে দিল মুজতবা আলিকে !)

1854

8

dalia mukherjee

আমাদের সরস্ব্তী পুজো|

সরস্বতী পুজো এলেই মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। কি আনন্দ ই না করেছি এই সরস্বতী পুজোয়। সরস্বতী পুজোর দিন আমাদের বাড়িতে হোত খিচুড়ি, সঙ্গে নানা রকমের ভাজা ভুজি, বাঁধাকপির তরকারি। সেদিন আমাদের খেতে হোত নিরামিষ। আর আমাদের বাড়ির নীচে এক বরিশালের পরিবার ভাড়া থাকতেন। তাঁদের মেয়ে মাধু ছিল আমার খুব বন্ধু। ওঁদের বাড়ি আসত জোড়া ইলিশ। সেই ইলিশ পুজো করে তারপরে রান্না করা হোত। একটা ইলিশের মাথায় সিন্দুর পড়িয়ে, ধান দুর্ব দিয়ে সাজিয়ে শাঁখ বাজিয়ে রান্নাঘরে তোলা হোত।মাধুর ঠাকুমা আমাদের ডাকতেন, " তোমরা এসো, আজ আমাদের বাড়ি ইলিশ খাইবা"। আমার মা, বাবা কোনদিন ই গোঁড়া ছিলেননা। মা বলতেনঃ "ডাকছেন যা, ওদের বাড়ি খেয়ে আয়।"আমি আর আমার ছোট ভাই মহানন্দে যেতুম নীচে মাধুদের বাড়ি ইলিশ খেতে। কত রকমের যে ইলিশের পদ মাধুর মা বানাতেন তার ইয়ত্বা নেই। ইলিশের ভাপা, ইলিশ ভাতে, ইলিশের পাতুরি, শেষপাতে ইলিশের অম্বল, আর কুলের অম্বল। রাতে আমাদের বাড়ি হোত লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম। মাধুরা কয় ভাইবোনে আসত রাতে আমাদের বাড়ি খেতে। পরের দিন শেতল ষষ্ঠি, আমরা খেতুম গোটাসেদ্ধ। মা অনেক গোটাসেদ্ধ বানাতেন, ভাতের বেশী গোটাসেদ্ধ ই আমরা খেতুম। তবে সরস্বতী পুজোর দিন দুপুরে ভোগ খাওয়া ছিল আমাদের স্কুলে। বাড়িতে রাতে লুচি খাওয়া হোত।সকাল থেকে পাড়ার পুজোতে মাইকে গান বাজত তারস্বরে, " সরস্বতী, বিদ্যেবতী, তোমায় দিলেম ছেঁড়া পুঁথি, একটু দয়া কর মাগো বিদ্যে যেন হয়।" আমিও মনে মনে বলতুম, " মাগো, কদিন বাদেই পরীক্ষা, ভালভাবে পাশ করি যেন মাগো" সবচেয়ে বেশী আনন্দ করেছি স্কুলের সরস্বতী পুজোতে। সেই ভোরে উঠে স্নান সেরে শাড়ি পড়ে স্কুলে যাওয়া,অঞ্জলী দেওয়া, প্রসাদ খাওয়া। এসব হোত স্কুলেই। রাতে প্রতি সরস্বতী পুজোতে একটা করে থিয়েটার হবেই। তার রিহার্সাল শুরু হোত দুমাস আগে থেকে। আমরা যখন এম,ই স্কুলে পড়ি, আমাদের স্কুল ছিল সকালে। আর আমাদের থিয়েটারের পার্ট দেওয়া হোত ছোট দেখে। যেমন একবার রামের সুমতি তে আমি হয়েছিলুম গোবিন্দ, অচলায়তনে হয়েছিলুম আশ্রম বালক। হাই স্কুলে ওঠার পরে আমাদের বড় পার্ট দেওয়া হোত। রিহার্সালের জন্যে দুপুরে আবার আমাদের স্কুলে যেতে হোত। কি উৎসাহ নিয়েই না সব করেছি। ক্লাস ইলেভেনে যখন উঠলুম , সরস্বতী পুজোর ভার পড়ল আমাদের ওপরে। ছেলেরা ঠাকুরের অর্ডার দেওয়া, ঠাকুর আনা, পুজোর সব ব্যবস্থা করা, এইসব কাজের ভার পেল। আর মেয়েরা ঠাকুর সাজানো,ফুলের ব্যবস্থা, নৈবেদ্য সাজানো , ফল কাটা এইসবের ভার পেল। সেবারে থিয়েটার হয়েছিল আরোগ্য নিকেতন। আমি হয়েছিলুম কবিরাজ। ওরে বাবা! ধুতি সামলাব , না পার্ট বলব। তবে জমেছিল খুব। সেদিন কোন পাড়াতেই কোন ফাংসান হোতনা, কেননা সকলের ই আগ্রহ স্কুলের থিয়েটার দেখতে যাবার। সেই আমার দেশে শেষ থিয়েটার করা। এদেশে আসার পরে কর্তাদের থিয়েটার ক্লাবের সঙ্গে বার তিনেক ডাচ থিয়েটার করেছি অবশ্য। য়ামাদের কলেজটা ছিল একটু দূরে, বাসে করে যেতে হোত। তাই কলেজের সরস্বতী পুজোতে সেরকম মাতামাতি করিনি বা করতে পারিনি। সরস্বতী মাতার আশীর্বাদ পাবার জন্যে অতি কষ্টে কুল না খেয়ে নিজের লোভ সংবরণ করতুম। কিন্তু যেই না সরস্বতী পুজোর প্রসাদ খাওয়া হোত, সঙ্গে কুল, ব্যাস! আর আমাদের পায় কে? সেনবাবুদের বাড়িতে নারকেল কুলের গাছ ভরে আছে কুলে, যারা এসব মানেনা সেই দুষ্টু ছেলেগুলো রোজ দুপুরে গাছ ঠেঙ্গিয়ে কুল পাড়ছে, আর খাচ্ছে। আর আমরা হাঁ করে দেখছি। পূজোর আগে কুল খাওয়া? নৈব, নৈব চ।কিন্তু পুজো হয়ে গেলেই সারা দুপুর চলত আমাদের কুল খাওয়া।সেনবাবু এত গালাগালি দিয়েও কিছু করতে পারলেননা। শেষে রাগের চোটে গাছটাই কেটে দিলেন। তাঁর দুপুরের ঘুমের আর কখনো ব্যাঘাত হয়নি। পাশের বাড়ির টুনুর দিদার বাড়িতে টোপাকুলের গাছটা কুলে ভরে থাকত। যখন কুলগুলো পাকত, গাছটা লাল হয়ে থাকত, অজস্র কুল পড়ত পাশের গলিটাতে। আমরা সেই গলি থেকে তুলে ই কুল খেতুম। তা টুনুর কি আর সহ্য হয়? সেও বাপ বাপান্ত করতে ছাড়তনা। আর আমরা টুনুকে আরও ক্ষেপাবার জন্যে গান গাইতে থাকতুম। এইভাবে চলত আমাদের সারাদুপুর কুল চুরি। অবশ্য সকালে যখন স্কুল ছিল, দুপুরে স্কুল হওয়াতে এসব বন্ধ ই হয়ে গেছিল । তখন ওই স্কুল যাবার পথে কারুর বাড়ি কুলগাছ দেখলে হয়তো দু চারটে কুল পেড়ে নিতুম। তবে কুলের অম্বল টা আমার কোনদিন ই প্রিয় ছিলনা। এইভাবে আমরা সরস্বতী পুজো, কুল খাওয়া উপভোগ করেছি। এখন বসে বসে ওই স্মৃতিচারণ করি, আর ভাবি কোথায় চলে গেল সেই দিনগুলি, কেন থাকলনা সে সোনার খাঁচায় বন্দী হয়ে. এখন সে আছে আমার মনের মণিকোঠায়, মাঝে মাঝে সেই মণিকোঠা যায় খুলে, আর বেরিয়ে পড়ে সে, জেগে ওঠে আমার স্মৃতি। তা এই সরস্বতী পুজো এলেই আমার ছেলেবেলার সরস্বতী পুজোর কথা বড্ড মনে পরে।

1059

7

জল

সরস্বতী পুজো-বাঙালীর ভ্যালেন্টাইন ডে

তখন বেশ বড়‚ তবে গ্রাজুয়েশন করা হয়নি| মানে চলছে আর কি| তা আমাদের টাইপ স্কুলে স্যার বললেন এবার বেশ বড় করে পুজো হবে| সবাই আসবে কিন্তু| সেদিন আগল ছাড়া বাঁধন হারার দিন‚ স্বাধীনতার দিন কেউ না এসে পারে| আমি আর রুবি আমাদের পাড়া থেকে বেশ সেজেগুজে‚ শাড়ি সামলে সুমলে গেছি| শাড়ি তো নয় যেন অকূল পাথার| কুঁচি সামলাই তো আঁচল লুটোয়‚ আঁচল সামলাই তো কুঁচি খুলে যায়| তার ওপর রাস্তা যেন প্রমীলা কূলের অধীনে| নানান বয়সী রঙীন প্রজাপতির বশ সেদিন রাস্তা| আর ছেলেরা তো বরাবর বুভুক্ষুর দল (প্লিজ কেউ কিছু মনে করো না‚ জাস্ট মজা করে লিখলাম) তাকাতে তাকাতে চোখের পাতা ছিঁড়ে পড়ে গেলেও তাকাতে ছাড়ে না| তা যাই হোক‚ পৌঁছে তো গেলাম| পেটের মধ্যে নানান সাইজের ইঁদুর ডন-বৈঠক দিয়েই চলেছে| এই ইঁদুরগুলো মহাপাজি‚ যেদিন উপোস -তিরেস হবে সেদিনই ওদের বেশি বাড়াবাড়ি| তা গিয়ে দেখলাম পুরোহিত অমিল| স্যার ধুতি-চাদর গায়ে যাকে দেখছে তাকেই পাকড়াও করার ব্যর্থ চেষ্টা করেই চলেছেন ঘন্টাখানেকের ওপর হল| এদিকে ফলের থালায় কুলের আকূল আহ্বান| আমরা কি আজকের খোকাখুকুদের মত ছিলাম যে কুল খাবো‚ তখন অঞ্জলি না দিয়ে কুল খেতে নেই| অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি| তা অনেকটা সময় গত হয়েছে‚ সবার পেটেই চুহা ডাকছে| অবশেষে এসে হাজির হলে নতুন স্যার| কি ঘ্যামচ্যাক দেখতে| ফর্সা গায়ের রঙ| লম্বা আর কোঁকাড়ানো একমাথা চুল| পরণে পাজামা আর সিল্কের পাঞ্জাবী| নতুন স্যর ঢুকতেই আমাদের স্যর যেন হাতে চাঁদ পেলে| আরে তুমি ব্রাহ্মন তাই না? কি যেন পদবী তোমার? মুখার্জী না চ্যাটার্জী? আর পায় কে| নতুন স্যর কিছু বুঝে উঠে উত্তর দেবার আগেই স্যর বললেন নাও পাজামাটা খুলে ফেলো| একঘর ছাত্র-ছাত্রী‚ আর তিনি নতুন এসেছেন‚ তখনও সবার সাথে চেনাপরিচিতি নেই| তার ওপর কথা নেই বার্তা নেই বলে কিনা পাজামা খুলে ফেলো| বেচারা নতুন স্যর কেঁদে ফেলে আর কি| পাজামার দড়ি পেটের ওপর থেকে আন্দাজ করে জোরে ধরে থাকে| যেন স্যর এখুনি জোর করে খুলে দেবে| ততক্ষণে ঘর জুড়ে হাসি ফেটে বের হতে চাইছে| নতুন স্যার আরও যেন গুটিয়ে যেতে চাইছেন| মিনমিনে স্বরে বলে কি বলছেন স্যার? আরে তোমাকেই তো পুজোটা করতে হবে| ওরে আমার বিয়ের ধুতিটা নিয়ে এসো তো কেউ‚ আমার টেবলে রাখা আছে| এসব কাজে কেউ দেরী করে না| কে একটা ছুটে গিয়ে নিয়ে এল স্যারের বিয়ের ধুতি| কিন্তু কে পড়াবে সে ধুতি| স্যার তো পারেন না‚ ও স্যার বিয়েতে কে পড়িয়ে দিয়েছিল? কে যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়| তার সাথে হি হি হা হা| এবার স্যারও লজ্জা পেয়ে যান| এই চুপ কর সব বলে ধমকে ওঠেন মৃদু| তোমরা কেউ পার ধুতি পরাতে? স্যার জানতে চান ছেলেদের দিকে তাকিয়ে| কেউ উত্তর দেয় না| এর থেকেও শক্ত কাজ বোধহয় করতে পারে কিন্তু ধুতি পরাতে পারে না| কি কুক্ষণে যে আমি পাপিয়াকে বলছিলাম একিগো এরা কেউ ধুতি পড়তে জানে না‚ আর আমি মেয়ে হয়ে পারি| সেটা যে সে ওখানে ফাঁস করবে কে জানতো| চেঁচিয়ে বলে স্যার জলি পারে| স্যার আর নতুন স্যার দুজনেই থতমত খেয়ে যায়| আর আমর অবস্থা যে কি ‚ সে বলার না| আমি ভাবছি পাপিয়ার মাথায় কিছু একটা ছুঁড়ে মারি| এরা বন্ধু??? এদিকে তখন দুপ্রান্তের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে হাসির ফোয়ারা| আর আমাদের স্যার তো মুচকে মুচকে হাসছেন‚ কিন্তু নতুন স্যার লজ্জায় পুরো লাল| মনে মনে বলছেন নির্ঘাত ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি| অবশেষে স্যার সময় চলে যাচ্ছে দেখে নিদান দিলেন এক কাজ কর লুঙ্গির মত করে ধুতিটা পড়ে ফেলো| অগত্যা স্যার তাই করলেন| শুরু হল পুজো| নতুন স্যার গায়ত্রী মন্ত্রই জানে না| ওপাড়ের দশকর্মার দোকান থেকে কিনে আনা পাঁচালী থেকে পড়ে পড়ে পুজো করছেন| একে একে হল সব| এবার আরতি আর হোমযাগ বাকি| আরতি করছেন স্যার| ঘেমে নেয়ে একসা| পঞ্চপ্রদীপ শেষ‚ ধুপের আরতি শেষ‚ এবার পানশাঁখ| ব্যস পানশাঁখে আরতি চলছে আর ধুতি ফরর ফরর করে খুলে প্রপাত ধরণীতলে| আর কি‚ পুজো মাথায়| এক হাতে ঘন্টা‚ অন্য হাতে পানশাঁখ আর সামনে ধুতিবিহীন স্যার কল্পনা করে নাও সবাই| আমরা আর সেদিন অঞ্জলি দেব কি? হাসতে হাসতে নিজেদের হালত খারাপ| এদিকে স্যারও আর নতুন স্যারের দিকে তাকাচ্ছে না‚ নতুন স্যার কারও দিকেই তাকচ্ছে না| শেষে আমরা মেয়েরা সব বাইরে বেড়িয়ে গেলাম| খানিক পরে স্যার ডাকলেন| দেখলাম স্যার আসনে বসে ভোগ দিচ্ছেন| যজ্ঞ মুলতবী হয়ে গেল| আর আমরা হাস হাসতে সেদিন যে কি অঞ্জলি দিলাম বীনাপাণিই জানেন| (এবার কিন্তু তোমরা কেউ লেখ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা)

1278

3

মনোজ ভট্টাচার্য

অহর্নিশ পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে !

অহর্নিশের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ! সকালে বন্ধুর মেয়ে – সোমা মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী – ফোন করে জানালো বিকেলে জীবনানন্দ হল এ একটা আলোচনা সভা হবে – যেন যাই । ওর বা ওর স্বামীর সঙ্গে প্রায় দুবছর কথা নেই । হঠাৎ করে গিয়ে উঠতে পারবো কিনা – সে সব কোনও কথা নেই ! কি নিয়ে আলোচনা – তাও জানালো না । নির্দ্বিধায় বলল – খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয় ! অহর্নিশ পত্রিকার সঙ্গে বা ওর সম্পাদকের সঙ্গে আমার অনেকদিন ধরেই সম্পর্ক ! এর আগেও ওদের বাৎসরিক সভায় গেছি ! শুভাশিস চক্রবর্তী ছেলেটি খুবই সিরিয়াস ধরনের – বিশেষ করে সাহিত্যের বিষয় ! সেই অহর্নিশ পত্রিকার বিশতম বার্ষিকী ! কুড়িতে বুড়ি ছুঁল ! এবারের সংখ্যায় বিষয় লেখা আছে – ত্রিপুরার জন্য ! হলে পৌঁছতে মিনিট দশেক দেরি হয়ে গেছিল । ভেতরে ঢুকে দেখি শঙ্খ ঘোষ । চারজন ত্রিপুরার কবি সমাবৃত হয়ে সভা অলঙ্কার করে আছেন । একটা কথা লিখছি । ত্রিপুরা রাজ্য সম্পর্কে আমাদের মতো কলকাতাবাসীদের খুব বেশি আগ্রহ বা জ্ঞান আগে দেখিনি । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বইটাতে ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার রাজাদের বাংলাপ্রীতি লেখা আছে ! রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা লেখার মধ্যে ত্রিপুরার রাজাদের নামের উল্লেখ আছে – শুধু তাই নয় তাঁর মুল্যবান রচনার প্রেক্ষাপটে রয়ে গেছে এদের নাম ও ঐতিহাসিক পরম্পরা ! তাই শুধুমাত্র বাংলাভাষী রাজ্য বলেই আমি বারো সালে ওখানে গিয়ে অবাক হয়ে গেছিলাম ! ত্রিপুরা নাম এলো কথা হতে । ‘ককবরক’ হল ত্রিপুরার অন্যতম ভাষা । ককবরক ভাষায় ‘তৈ-প্রা’ মানে জলের নিকটবর্তী স্থান । ‘তৈ-প্রা’ থেকে তেপ্রা ও তিপ্রা – শেষে ত্রিপুরা । আবার মতান্তরে রাজা ত্রিপুর এর নাম থেকে ত্রিপুরা এসেছে । আবার এও হতে পারে – দশমহাবিদ্যার অন্যতম ত্রিপুরাসুন্দরী থেকেও ত্রিপুরা নাম এসে থাকতে পারে । – তবে এত সুন্দর একটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্য আমাদের দেশেই আছে ! – বিমানবন্দর যেন একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ! আর আগরতলা শহরটা সত্যিই দেখবার মত ! সকালে উঠে দেখা যাবে – রাস্তা খুব পরিষ্কার । বেলা নটার পর থেকেই সারা রাস্তা জুড়ে ফিরিওলারা হাট বানিয়ে ফেলল ! কোন জিনিস বিক্রি হয়না সেখানে ! সারা দিন ধরে বিকিকিনি হলো । বিকেল ছটার সময় দেখা যাবে – সেই সকালের মতোই পরিষ্কার ! ম্যাজিকের মতো উধাও সব ক্রেতা-বিক্রেতা, সামগ্রী, ও সবার ব্যবহৃত জঞ্জাল ! সেই রাস্তা দিয়ে কি স্মুদলি গাড়ি চলাচল করছে ! – আমরা রাত্তিরেও দোকানে খেয়েদেয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরেছি ! কোনও সমস্যা নেই ! আমি হঠাৎ আগরতলার কথা লিখতে শুরু করলাম কেন ? – কারন এই সভায় অনেক দেখলাম ত্রিপুরার মানুষ এসেছেন ! সবাই বাংলায় কথা বলাবলি করছে । একটু অ-কারান্ত উচ্চারণ ! কিন্তু পরিষ্কার – কোনও জড়তা নেই ! চারজন ত্রিপুরার কবি প্রত্যেকেই তাঁদের কবিতার থেকে কিছু কিছু অংশ পড়ে শোনালেন ! ত্রিপুরার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সম্বন্ধে আমি সম্যক অভিহিত নই ! – তবে বুঝতে পারলাম – পশ্চিমবঙ্গের মতো অস্থির অবস্থা ওখানে নেই ! তবে একটা কবিতার এই লাইনটা না দিয়ে পারলাম না । ‘এত রক্ত কেন ?’ - “রাজারও হৃদয়ের মধ্যে ক্রমাগত এই প্রশ্ন উঠিতে লাগিল – ‘এত রক্ত কেন’ ?” অনেকের আলোচনার মধ্যে দিয়ে ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্য-ধারা প্রকাশিত হতে লাগলো! গোপা দত্ত ভৌমিকের সরস আলোচনাও খুব উপভোগ্য হয়ে উঠল ! তারও পরে একটা চমক ছিল । অহর্নিশের নিজস্ব একটা আলেখ্য – মেঘদুত পঠন ! একটু অন্য ধরনের ! পূর্ব মেঘ ও উত্তর মেঘ ! সংস্কৃত শ্লোক পাঠ করছেন রাজা ভট্টাচার্য ! ও - কি গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ! ঠিক মেঘের মতোই গুরুগম্ভীর ! আর তারই সঙ্গে সঙ্গে সেটা বাংলায় সুনন্দিত গলায় আবৃতি করল সোমা মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী ! – এই পর্বটা মনে হল আমাদের অতিরিক্ত পাওয়া ! এত পরিশীলিত অনুষ্ঠান কি সুন্দরভাবে সন্ধ্যেটাকে নতুন দিনের দিশায় পৌঁছে দিল ! মনোজ

1317

11

শিবাংশু

সুমনসিম্ফনি-১

গান ভালো লাগার যে আবেগ বা মনন তা মগজে গজাল মেরে আনা যায়না। সে তখনই 'সুখদা' যখন সে 'স্বয়মাগতা'। ------------------------------ যেমন আমি সুমনকে শুধু তাঁর নিজস্ব গানের মানদন্ডেই মূল্যায়ণ করার পক্ষে। রবীন্দ্রসঙ্গীত বা হিমাংশু দত্তের গান তাঁর শখের ব্যাপার, সেখানে তাঁর কিছু প্রমাণ করার নেই। তাঁর 'হয়ে ওঠা গান' বইটি নিশ্চয় অনেকেরই পড়া আছে। এই 'হয়ে ওঠা' ব্যাপারটি আমার মনে হয় শুধু তাঁর নিজের গানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তিনি জানিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিছু তালিম তিনিও নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ কৈশোর পেরিয়ে কঠিন হতে থাকে এবং নমনীয়তা হারায়। আমাদের চেনা গানে সঠিক সুরসংস্থান করতে গেলে কণ্ঠের নমনীয়তা অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি নিজের গানের মাঠটিই পাল্টে ফেলেন এবং গান পরিবেশনের সময় মূলত বিদেশি ছাঁচের স্ট্যাকাটো ধরনটি গ্রহণ করেন। এই পরীক্ষায় যে তিনি বেশ সফল হন, তার সাক্ষী ইতিহাস। ---------------------------- তিরানব্বই সালে একটি অনুষ্ঠানের সূত্রে তিনি আমাদের শহরে এসেছিলেন। তখন তাঁর সূর্য মধ্যগগন যাত্রী। একটা সারা দিন তাঁর সঙ্গে নানা আড্ডা, আলোচনায় কেটেছিলো। তখন বলেছিলেন তিনি একজন একটি বিশেষ সময় কালের গায়ক। হয়তো পাঁচ বছর পরেই তাঁর গান আর কেউ শুনবেনা। আমরা তো চমৎকৃত। তখন তাঁকে আমরা সলিল চৌধুরির পর বাংলা গানের মসিহা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছি, তাঁর মুখে এমন কথা? কিন্তু তিনি নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে যে কতোটা ওয়াকিফ ছিলেন তা এভাবেই প্রমাণ হয়ে যায়। ---------------------------------- শিল্পী হিসেবে নিজের এই মূল্যায়ণ তিনি আত্মমর্যাদার অঙ্গ হিসেবেই করেছিলেন হয়তো। কিন্তু প্রায় বিশ বছর কেটে যাবার পরেও তাঁর গান মানুষ শুনছে আর এই সব গান থেকে অন্তত পঞ্চাশ ষাটটি গান বাংলা গানের মাইল ফলক হিসেবে আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবে। ------------------------------------ নচিকেতার সঙ্গে তাঁর গানের তুলমামূলক আলোচনা নিয়ে বহু শ্রোতা আগ্রহী হয়ে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, নচিকেতার সুর যোজনার বৈচিত্র্য নিয়ে আমার মতো ইতর লোকও অনেক কথা লিখতে পারে। অকৃপণভাবে ভাংড়া থেকে গজল, রক থেকে রেগি, ভাটিয়ালি থেকে গোয়ান সুর, হির থেকে ব্লুজ, বৈঠকি থেকে বাউল, সবই তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। কিন্তু তার মধ্যে কটা শেষ পর্যন্ত শিল্পমূল্য অর্জন করে উঠতে পেরেছে সেটাই জরুরি। 'সাফল্য' একটি ঘটনা তো বটেই। কিন্তু এক সময় " ক্যয়সে বনি সিলোরি কে বিনা চটনি", বাজারের ভাষায় 'ছপ্পর ফাড়কে' হিট হয়েছিলো। অতএব, শেষ কথা কে বলবে? ------------------------ আমাদের ছোটোবেলায় দেখতুম সত্যম্বর অপেরার একটি আসরে যতো উচ্ছ্বসিত দর্শকের ভিড় থাকে, বহুরূপীর সারা বছরে ততো দর্শক জোটেনা। তাই এভাবে কে সফল আর কে বিফল, তা বিচার করতে যাওয়াটা মূঢ়তা। দিনের শেষে "... ভালো আমার লেগেছে যে , রইলো সেই কথাই..." ------------------------- এখানে একটা গান শুনি আমরা। গানটি সম্পর্কে সুমনের কিছু স্মৃতিচারণ রয়েছে, সেটাও পড়ি। আর পড়ি এর লিরিকটি। কেন সুমনকে নিয়ে লিখতে প্রয়াস পাই, তার কিছুটা প্রমাণ এখান থেকে সংগ্রহ হয়ে যাবে। ------------------------ "সিলভার স্প্রিং এর বাসা। বোধহয় ১৯৮৩ সালের গরমকাল। রাতের ডিউটি সেরে বাসায় ফিরেছি। বসার ঘরটা নানান বাজনা আর যন্ত্রে ঠাসা। এর পাশে একটা ইলেকট্রিক পিয়ানো। সদ্য কিনেছি। নতুন প্রেমের মতো সারাদিন হাতছানি দিয়েছে পিয়ানোটা। ঘরে ঢুকেই আফিসের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে সটান গিয়ে বসলাম পিয়ানোয়। ঘরের আলো জ্বালাইনি। মস্ত কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের আলো যেটুকু ঢুকছে তাতে ঘরটা আবছায়া। বাইরের আলো মানে রাস্তার স্থিমিত আলো। পিয়ানোয় একটা কর্ড বাজিয়ে জানলা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল দূরে একটা তারা। মুহূর্তের মধ্যে কি যে হয়ে গেল। এরকম আর কখনো হয়নি। পিয়ানো বাজিয়ে, ধীরে ধীরে আস্ত একটা গান বেঁধে ফেললাম - কথায় সুরে মিলিয়ে। কথাটা লিখতে হল না। লাইনগুলো গাইতে গাইতে আপনিই তৈরি হয়ে গেল সুর সমেত। আমার আর কোন গান আমি এভাবে বাঁধিনি। এর আগে বা পরে কখনও গোটা একটা গান কথা বা সুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসেনি আমার ভিতর থেকে। কি করে যে এটা সম্ভব হয়েছিল আমি আজও জানিনা। এটুকুই শুধু জানি যে গানটা বাঁধার সময় বিশেষ ভাবতে হয়নি আমাকে।" ('সুমনের গান সুমনের ভাষ্য' ) "সারারাত জ্বলেছে নিবিড় ধূসর নীলাভ এক তারা তারই কিছু রং নাও তুমি শহরে জোনাকি জ্বলে না - নয়তো কুড়োতাম সে আগুন নীল - হয়তো, যা কিছু নেই নাইবা হল সব পাওয়া না পাওয়ার রং নাও তুমি। বড় বেরঙ্গিন আজকাল কাছাকাছি কোন রং পাই না, তাই দিতে পারি না কিছু কিছুই রাঙানো হল না - নয়তো আগামীর রঙে ছোপাতাম - হয়তো এই মলিন আর এ-ধূসর পথ চাওয়া এ চাওয়ার রং নাও তুমি।"

984

6

মানব

কাব্যি-কথা

ঘরের খেয়ে বনের মানুষ তাড়ানোই স্বভাব রেগে যেতে গিয়ে দেখি হরমোনের অভাব বইয়ের পোকা, খেলার ভক্ত কতই মানুষ হয় সব কিছুতেই হেরে আমার হারার নেইকো ভয় এমনি করেই একদিন মেট্রোরেলে চড়ে দিলাম পাড়ি, দিল্লি থেকে একটু আসবো ঘুরে রবিবারের দুপুর তাই ভিড়ে ভিড়ে ঠাসা এরই মাঝে পকেটমারের শুরু ঝেড়ে কাশা হাত ধরেছি হাতেনাতে ভয়েতে সে চুন বলে, ‘ছেড়ে দাওগো দাদা, ঘরেতে নেই নুন’ আমার আবার দয়ার শরীর ছেড়েই দিলাম তারে একটু দূরেই গোল বাঁধলো পাঁচটি মিনিট পরে তাকিয়ে দেখি সেই লোকটাই গণধোলাই খায় মনে মনে ভাবতে থাকি, ‘আমিই বোকা, হায়’।

981

6

Somen dey

শুনতে শুনতে -১

শুনতে শুনতে -১ *********** এক একটা গান এক এক টা দিনে না বলে কয়ে কেমন করে যেন ঢুকে পড়ে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে একেবারে অন্দর মহলে  । খোলা জানলা দিয়ে ড্রইং রুমে ঢুকে পড়া একটা ভোমরার মত । নাছোড়বান্দা ভোমরা টা যেমন ঘরে ঢুকে গোত্তা মেরে ঘরের এদিক থেকে ও দিকে এলোমেলো জিক জ্যাক ফরম্যাশনে ঘুরে বেড়ায় । একটু ক্লান্ত হলে সোফার হ্যান্ডেলে , বইয়ের তাকে বা ফুলদানীর গায়ে বসে খানিক জিরিয়ে নেয় । তার পর আবার নুতন উৎসাহে আবার আরম্ভ করে উড়তে উড়তে গুন গুন করা ।ঠিক তেমনি তেমনি এ রকম হটাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা গানের একটা কলি সারাদিন ধরে অন্দরমহলে ঘুরে বেড়ায়, কাজের ফাঁকে ফাঁকে থেকে থেকে মনটাকে টেনে ধরে ।হয়ত বহুবার শোনা গান ।তবে একটা নতুন চেহারা নিয়ে আসে । সেদিন যেন গানটা জেদ ধরে বসে তার ভল্টে রাখা গয়না গাটি গুলো , সে আমাকে দেখাবেই দেখাবে । আজ সকাল থেকে তেমনি করে আমার ভিতরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে একটা গান  । আর থেকে থেকে উড়ে বেড়াচ্ছে । কবে কার সে গান ! বোধ হয় হাফ প্যান্ট পরে কোনো এক শীতের দুপুরে রেডিও তে অনুরোধের আসরে প্রথম শোনা । সেই কৈশোরের প্রায় সব কিছুই তো ঘসা কাঁচের ওপারে ধুসরতার হারিয়ে গেছে । তবে এ গান কোথা থেকে উঠে এলো । আসলে গানের কোনো বয়স হয় না । একটা জন্ম তারিখ থাকে ।তবে সেটার কোনো মানে নেই । এ গানের জন্মতারিখের হিসেবে এ গানের বয়স অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে । *** কোনো প্রিলিউড মিউজিক ছাড়াই শুরু হয় এ গানের মুখড়া - -মরি হায় গো হায় হায় এলে যখন আমার ভাঙ্গা / ঘরে শুন্য আঙ্গিনায় যে কোনো সৃষ্টিকে কান্নার রঙ যেমন করে সুন্দর করে দিতে পারে তেমন আর কিছু পারে না । সে রকম কান্না দিয়েই শুরু । এ গানের আদ্য প্রান্ত নির্ভেজাল সলিল চৌধুরির ঘরানা । খামাজ নিয়ে তাঁর প্রিয় খেলা । আবার ইমন দিয়ে মাঝে মাঝে একটু মোচড় দেওয়া । কিন্তু তাও এ গান শুনতে শুনতে কেন দেখা দিচ্ছে একটি আলখাল্লার প্রান্ত দেশ ? কোথাও কি কোনো মিল আছে আমার চেনা কোনো গানের সঙ্গে ? সে কি কথার ধরনে নাকি সুরের চলনে ? গান অন্তরাতে এগিয়ে যায় ‘তখন আমার ঝরা মালায় নিভু নিভু সুরভি পেতে জ্বালায় মৌ মাছিরা পরাগ দোলে চলে যায় যায় গো ... যায় এবারে যেন আলখাল্লাটা আরো একটু হাওয়ায় দুলে উঠলো , পাশা পাশি যে সুরটা আবছা সুরধুনীর মত বয়ে যাচ্ছিল সেটা কল কল স্বর শোনা গেল । ‘মৌমাছিরা পরাগ দোলে চলে যায়’ জায়গাটা খুব মিল লাগলো অন্য আর একটা গানের সঙ্গে । কিন্তু এ মিল ঠিক সে রকম মিল নয় যে শুনলেই চট করে ধরা যাবে । মনে পড়ল ‘বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী’ লাইন টা ।মানে সেই ‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী ’ গানটি । কিন্তু বাকিটা ? বাকি গানটায় মিল আর অমিলগুলো যেন মাঝে মাঝে আসে আর যায় । একটি শিশুর মুখে যেমন কখনো তার পিতার আবার কখনো তার মায়ের মুখের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় । আসলে পাশাপাশি শুনলে বা গাইলে মিলটা তেমন বোঝা যায় না । হারমোনিয়াম বা কী বোর্ডে সুরটা তুলতে গেলে হয়ত বোঝা যেতে পারে মিল গুলো । রবীন্দ্রনাথের ওই গানের ছোটো ছোটো স্বর বিন্যাস গুলো কে নিয়ে একটু আগে পরে করে সাজিয়ে একটা নুতন নির্মান । রামানন্দ বন্দোপাধ্যায়ের ছবিতে যেমন করে যামিনী রায় আসেন তেমনি করেই এসেছে এ গানে রবীন্দ্রনাথ । এ গানের শেষ অন্তরার শেষ লাইন ‘চৌদিকেতে বিদায় করুণ সুরে গায়’ আর ‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী’ গানের শেষ অন্তরার শেষ লাইন ‘চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি’ । ‘চৌদিকে’ শব্দটি কি খুব সচেতন ভাবে রেখেছিলেন সলিল চৌধুরি । এভাবেই রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণ স্বীকার করেছিলেন ? হয়ত হ্যাঁ , হয়ত না । সে যাই হোক গানটির শরীরে আজও মুগ্ধতা আদায় করে নেবার অনেক কিছু আছে । **** এ গানের আর একটি ঐতিহাসিক পটভুমি আছে । তখন সবিতা ব্যানার্জি সবে এসেছেন সলিল চৌধুরির জীবনে । প্রথম স্ত্রী কে হারিয়ে সলিল চৌধুরি ব্যাক্তিগত জীবনে তখনো সব কিছু সামলে সামলে উঠতে পারেন নি ।একজন সাধন সঙ্গিনীর প্রয়োজন ভীষন ভাবে অনুভব করছেন । সে একাকীত্ব গানের ছত্রে ছত্রে আছে । সুরের মিল ছাড়াও এ গানের কথাও যেন মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথকে ‘সকাল বেলা চেয়ে দেখি / দাঁড়িয়ে আছো তুমি একি / ঘর ভরা মোর শুন্যতারি বুকের পরে ’ এখান থেকেই হয়ত জন্ম নিয়েছে –‘এলে যখন আমার ভাঙ্গা ঘরে শুন্য আঙ্গিনায়’ । সেই সঙ্গে আবার সেই সঙ্গে এ গান সলিল চৌধুরির সুরে সবিতার ব্যানার্জীর প্রথম রেকর্ড ।দুজনেরই খুব আলাদা একটা ইমোশন্যাল এটাচমেন্ট ছিল এই গানটির সঙ্গে । সেই জন্যেই এ গানটির আর কোনো ভাষায় রুপান্তরিত করেন নি । যেটা সলিল চৌধুরি তাঁর অধিকাংশ হিট গানের ক্ষেত্রেই করেছিলেন এ গানের ক্ষেত্রে সেটা করেন নি  । https://www.youtube.com/watch?v=11Or3yjiIVQ

1086

6

শিবাংশু

প্রাণপণ গাছের শিকড়

বরাইবুরুর শালবন শেষ হয়ে আবার শালবন বসেছে। সামাজিক বনসৃজন। এই শীতের শেষে সেখানে পাতায় কতো রং। একটু গরম পড়লেই শিমুলের খোসা ফেটে তুলোবীজ উড়তে থাকে চারদিকে। হাওয়ার থেকে মাথায়, গায়ে, আস্তিন ছুঁয়ে ঘুড়ির টানে আবার আকাশে উড়ে চলে যায়। ------------------------------- একটা প্রশ্ন উড়ছে। কোন সন্তান প্রেয়? ছেলে না মেয়ে? কীভাবে আসে এ ভাবনা, জানিনা। আশীর্বাদের বাছাবাছি? সন্তান তো আশীর্বাদমাত্র। এই শরীর থেকে জন্ম নিয়েছে হয়তো। কিন্তু সে তো নিসর্গের অংশ। কিছুদিন সঙ্গে থাকে। আবার ঐ শিমুল বীজের মতো নিজের আকাশে উড়তে চলে যায়। হাজার হাত বাড়িয়ে তাকে ধরাছোঁয়া যাবেনা। তার কক্ষপথ আলাদা। চলার পথে হয়তো কখনও দুটো সমান্তরাল চলতে থাকা রেলকামরা থেকে পরস্পর উঁকি দিয়ে রুমাল নেড়ে চলে যাওয়া, যতোক্ষণ না ট্র্যাকের রেখা দুদিকে সরে যাচ্ছে। আঁকড়ে থাকা, বলা ভালো আঁকড়ানোর চেষ্টা, নিরাশা ছাড়া আর তো কিছুই দেবেনা। তবু বিহঙ্গ হে, পাখা বন্ধ করতে শেখোনা, কেন? -------------------------------- সকালে সঙ্গিনী একটা ফেবু বার্তা দেখালেন। তাঁর এক বন্ধুর পাঠানো, একজন মা তিনিও। " Our children are ultimately our showpieces, are'nt they"। দুজনে হেসে উঠি। আমাদের দীর্ঘ পথ চলা থেকে যে সব সার সত্য অনেক মূল্যে আহরণ করেছি, সে সব অলীক জগতের দৈববাণী হয়ে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। আমার ছেলে আই আই টি, আই আই এম। প্রত্যুত্তরে হয়তো ভেসে এলো আমার মেয়ে এম আই টি। এখন স্ট্যানফোর্ডে। তার পর? তার আর পর নেই। না, আছে। আমাদের ট্রেন তো নিজের ট্র্যাকেই, নিজের মতো চলে যাবে। তবে সন্তানস্নিগ্ধ ঐ শব্দগুলি, ঐ ব্যঞ্জনাগুলি 'আমাদের' জীবনে কেমন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসবে কোনোদিন? কন্যা বা পুত্রবধূ সন্তানসম্ভবা হলে ছ'মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। বন্ধুহীন, সাহচর্যহীন দূর অচেনা বিদেশে ছ'মাসের কারাদন্ড। সন্তানের সাফল্য তার ব্যস্ততার পরিমাপে। সপ্তাহান্তে গাড়ি নিয়ে কোথাও গাছপালা, হ্রদ, পাহাড়, পার্ক দেখতে যাওয়া। সন্তানের শিকড় বদলে গেছে, বসে গেছে, স্থায়িত্বের স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছে হয়তো। কিন্তু? ওঁহা হম অজনবি হ্যাঁয়। তবে সন্তানের প্রয়োজনে যদি বাপ-মা এগিয়ে না যায়, তবে কে যাবে? পরবর্তী প্রজন্মের অংকুরকে ছুঁয়ে দেখার সাধও তো থাকে কোথাও, মনের কোণে, অলক্ষ্যে। স্নেহ অতীব বিষম বস্তু। --------------------------------- কয়েকদিনের জন্য দেশে এলে, "দেখো, তোমার মা যেভাবে সানি'কে হ্যান্ডল করছেন, আমার রিজার্ভেশন আছে। কতো আননোন ইনফেকশন চারদিকে। ঐটুকু বাচ্চা ...উইল ডেফিনিটলি ফল সিক।" ঠিকই তো, নতুন শো'পিস। মিং রাজত্বের নীল পটারি। দেখো, মগর দূর সে..... ---------------------------------------------- সব গল্পই কি একরকম? হয়তো না। ব্যতিক্রম নিয়মকে প্রতিষ্ঠা দেয়। বাপ-মা অসুস্থ হলে, নিরাময় না হলে, সন্তান কাঁদে তো। নিজের মতো কাঁদে। কোনোটা দেখা যায়, কোনোটা যায়না। তারা সতত 'নিজের মতো'। সেটাই তো স্বাভাবিক, স্বাগত বিবর্তন। কিন্তু বারবার দেখি বাপ-মা আর 'নিজের মতো' হয়ে উঠতে পারেন না। হয়তো হতে চান না। জীবনের যে পর্যায়ে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা হঠকারিতা ছাড়া আর কিছু নয়, সব জেনেও তাঁরা অনেকেই সে চেষ্টা করে যান। সন্তানকে জানতে দিতে চাননা, বাপ-মা'ও নিসর্গের অংশ। যেমন রোদ, বৃষ্টি, ক্লোরোফিল, ভিটামিন ডি। পূর্বগামিনী ছায়া, একদিন পশ্চিমগামিনী হবেই। তবু বাপ-মা'র জন্য শো'পিসের 'সম্মান', 'নিরাপত্তা', 'স্বাচ্ছন্দ্য' যেকোনও মূল্যে বজায় রাখতেই হবে। তারাই তো আমাদের 'সার্থকতার প্রতীক', সাফল্যের সাঁঝবাতি । ভালোবাসা মানে কি শুধু আলখাল্লা-পরা স্মৃতির মেঘ? ------------------------------------- " ......মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের সবই দরকার। আমরা ঘরবাড়ি গড়বো- সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো। রুপোলি মাছ, পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো।" (একবার তুমিঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

1885

9

জল

অবকাশ -১

বাড়ি মানে শুধু চার দেওয়াল আর একটা ছাদ নয়, বাড়ি মানে একটা সময়ের দলিল, ইঁটের পাঁজরে লেগে থাকা আবেগ, বাড়ির আত্মার সাথে একাত্নটা, আবেগঘন মুহুর্তে বাড়িকে আপন আত্মার অংশ করে নেওয়াই হল অবকাশ।

1302

73

মনোজ ভট্টাচার্য

বই মেলা - মেলা বই !

বই মেলা - মেলা বই ! কদিন আড্ডার সবাই যেমন হা-হুতাশ কান্নাকাটি – হায় হায় করছিলেন – তাতে আমার মনে হল – আমরা এখানে থাকলে তো কেউ তাকিয়েও দেখেন না ! আর ঠিক তখনই মনে পড়ল – আড্ডার মধ্য-মণি জামশেদপুরের বাবিদা গেছেন বই মেলায় ! তাই সবাই পিত্যেস করে বসে আছেন – কি রসদ উনি আনেন মেলা থেকে ! মেলায় আমরা পৌঁছেছি দুপুর দুপুর । - তখনই দেখি কিভাবে জন-সমাগম হতে আরম্ভ হয়েছে ! – তবে নিরাপত্তার কারনে – পুলিশী উপস্থিতি এবার বেশিই মনে হল। তবে সেটা উৎপাতের পর্যায় পড়েনি ! প্রতিবারের মতোই বিভিন্ন হলগুলো এক একজনের নামে হয়েছে । প্রথমটাই বিজয়া রায়ের নামে, পরেরটা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের নামে, তার পরেরটা বাদল বসুর নামে ইত্যাদি । - কিন্তু এই হলের মধ্যে বেশির ভাগ ইংরিজি বই বা উচ্চ শিক্ষা স্তরের বইয়ের স্টল ! একটু দমবন্ধকর পরিবেশ ! – বরং বাইরের স্টলগুলো আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যায়গা বলা যায় ! স্টলের ভেতরের মানুষদেরও চেনা চেনা লাগলো ! আর ফুটপাথের ওপর বসে বিভিন্ন চিত্রশিল্পী, কারুশিল্পী ইত্যাদির দোকানগুলো – সত্যিই দেখবার মতো । - এখানেই তো বেশি ভিড় ! এইরকমই এক ফুটপাথের শিল্পদ্রব্যের সামনে ফটো নিতে গিয়ে বাধা পেলাম ।- তুলবেন না প্লীজ ! – ঠিক আছে – তুললামই না ! - খানিক পরেই দেখি – কেউ বা কারা ফটো নিচ্ছে । আবার ক্যামেরা বার করেছি । যথারীতি বারন । তাহলে ওনারা যে তুলছেন ! – ওনারা হল – মিডিয়ার লোক ! – আরে, আমিও তো মিডিয়ার লোক! – দোকানি-শিল্পী বুঝতেই পারলেন - আমার মিথ্যে কথা ! কি আর করা ! জস্মিন দেশে জদাচরেৎ ! আমাদের খুবই ইচ্ছে করে দোকানে দোকানে ঢুকে ঢুকে বইগুলো একটু হাত দিই বা সুচনাগুলো পড়ি ! কিন্তু দোকানদারদের মুখগুলো খুব খুসী খুসী দেখলাম না । গুরুচণ্ডালীতে উঁকি মেরে দেখলাম – এক ভদ্রলোক বসে আছেন বটে – কিন্তু আড্ডা মারার জন্যে খুব উৎসুক মনে হল না ! কিন্তু তার পরের দোকানেই – ভেতর থেকে ডাকাডাকি করে আমাদের দুজনকে বুকে টেনে নিল - মানে ভেতরে নিয়ে গেল আরকি ! - টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউট । ওখানেই আবার একজন ছিলেন – রবীন্দ্র গবেষক! আলোচনা শুরু হয়ে গেল । এই প্রসঙ্গে আগে বলা দরকার – আমি শুভম নামে একটা শারদীয়া পত্রিকা – পড়তে পড়তে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ দেখলাম । রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবন । লিখেছেন নিত্যপ্রিয় ঘোষ ! এসব কেউ পড়ে কিনা জানি না ! অনেক তথ্য – যা বিশ্বভারতী কেন্দ্রিয় সরকার গ্রহন করবার পর – কিভাবে রথীন্দ্রনাথকে বহিস্কার করার চক্রান্ত ও তারই স্বজনেরা তাতে লিপ্ত থাকার কাহিনী বলা হয়েছে । এই আলোচনা প্রসঙ্গেই অবধারিতভাবে এসে গেল – রবীন্দ্রনাথের নামে কিশ্যা - বেশ কিছু তথাকথিত রবীন্দ্র-গবেষক নাটক-উপন্যাস লিখে টি ভিতে দেখিয়ে - ভালই টাকা কামাচ্ছে -! কোথা থেকে শুরু – কোন দিকে চলেছে – লেখার ধরন – এইসব আলচনান্তে – ফোন নম্বর দেওয়া ! ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম বলিভিয়ার স্টল, ও আরও অনেক স্টল । আর দেখলাম – একটা বোতল দাঁড়িয়ে আছে । বই কিনলে বোতল ফ্রী ! – হ্যাঁ – এইভাবেই নিজের বোতল-পুরান পত্রিকা বিক্রি করতেন – দাদাঠাকুর ! এখন করছে দোকানদার ! তবু তো কিছু মানুষ তাঁর নামটা জানতে পারছে ! বিদূষক শরচ্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ! কিন্তু বই মেলার সবচেয়ে বেশি যায়গা দখল করেছে – জাগো মা বাংলার মাটি ও মানুষ । খুব সম্প্রতি দেখা গেছে - মা-মাটি-মানুষের ১৬তম শতবার্ষিকী উপলক্ষে - শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে ! তা সেখানেও সেরকম ভিড় নেই ! – টয়লেটের পাশেই দেখলাম বি জে পির মুখ – মনে হল স্বচ্ছ ভারতের মুখ দেখিতেছি ! মেলার ভিড় বেড়েছে অনেক গুন ! চাটএর দোকানদার বলল – ষোল লাখ টাকা নাকি দিতে হয় ওদের ! তার মানে নিশ্চয় সে টাকা ওঠে ! কিন্তু সে টাকার কতটুকু যায় বইয়ের প্রকাশকদের পকেটে ! – যেমন আমাদের মতো কটা লোক অত দাম দিয়ে বই কিনবে – কটাই বা কিনবে ! - আমরা তো মাঝেমাঝে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথেও তো ঢুঁ মারি ! – তার ওপর অন লাইনে বই পড়ার অভ্যেসটাও তো গড়ে উঠেছে ! একটা কথা মনের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে দোলা খাচ্ছে । লেখাটা খুবই প্রতিক্রিয়াশীল হবে নিশ্চিত। - বিনা পয়সার মেলায় - এত মজা আছে যে বই কেনাটা আবশ্যিক নয় ! তার বদলে খাওয়া দাওয়া টি ভি উৎসব ! - আবার একটা জন মঞ্চ আছে – এসব ছেড়ে কার সময় আছে – পাঁচিল ডেঙ্গানো সুশীল লেখকদের দলীয় বার্তা শোনার ! বইমেলা নাম হলেও বইয়ের চেয়ে মেলা বেশি ! বেশ একটা জম্পেস হট্টমেলার দেশ ! মনোজ

930

8

সুভাষ

রূপান্তরী-৭ : উপসংহার ও ধন্যবাদজ্ঞাপন

আমাকে রূপান্তরী শীর্ষক ব্লগ রচনা করার প্রথম প্রেরণা দেন শ্রীমতী শ্রীপর্ণা পাল, পরে আরও অনেকে। কাজটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলাম, পরে টের পেলাম তা নয়, কারণ আমি দায়সারা ভাবে কোন কাজ করতে পারিনা। অকপটে জানাই, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পছন্দ করে এসেছি, রাতভর অনুষ্ঠান শুনেছি, কিছু রাগ চিনতে শিখেছি, কিন্তু গভীরে যাইনি, তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্লগ রচনা করার মত পাণ্ডিত্য অর্জন করিনি। প্রচুর পড়াশোনা করে ও আন্তর্জালের মাধ্যমে জ্ঞান সঞ্চয় করে বুঝলাম রাগের পরিচয়, চলন, পকড় ইত্যাদিতে কিছু মতভেদ আছে। অবশেষে পণ্ডিত ভাতখণ্ডের অনুসরণে রাগসঙ্গীতের পরিচয়পর্ব সারলাম। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চর্চা থাকায় ঐ পর্বসকল অনায়াসে রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। পাঁচ দশকের উপর সব জঁরের গান শোনার সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থাকায় রূপান্তরিত গান চিহ্নিত করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। দেড় মাস গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তর্জাল ভ্রমণের পর অবশেষে এটি শেষ করতে পারলাম। আমার ব্লগের সাথে অন্যান্য text ব্লগের একটি প্রধান পার্থক্য হ’লো এই যে আমি You Tube Video-র মাধ্যমে মূল ও রূপান্তরিত গানের উদাহরণ রেখেছি। তাই এটি সমগ্ররূপে অনুধাবন ক’রতে প্রচুর expenses on internet হয়, কিন্তু video examples বাদ দিলে এই ব্লগ নীরস হয়ে যায়। হয়তো এই জন্যই আমার ব্লগ আশানুরূপ hits পায়নি। *********************************************************** এবার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পালা। (সুবিধার্থে নামের সম্ভাষণ বাদ দিচ্ছি)। প্রথমে ধন্যবাদ জানাই শ্রীপর্ণা পাল ও অরিন্দম রায় (admin) এই দুজনকে — আমাকে এই ব্লগ রচনার সু্যোগ দেওয়া এবং আমার জন্য special nested blog with lock/unlock feature incorporate করার জন্য। দীপঙ্কর বসু আমাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাপারে ব্যাপক সাহায্য করেছেন, তাঁকে জানাই আমার অপরিসীম ধন্যবাদ। অপন বসু, মুনিয়া ঘোষ, অরিন্দম সেনগুপ্ত, সোমেন দে, শিবাংশু দে, কৌশিক ঘোষ, অরিন্দম চক্রবর্তী, হিমাদ্রী চক্রবর্তী, সুতপা সেন, জলি চক্রবর্তী,‌ তৃপ্তি বেরা ও আরও অনেকে নানাভাবে আমাকে উৎসাহিত করেছেন, আমার আন্তরিক ধন্যবাদ এঁদের সবাইকে। যে সকল বন্ধুগণ নিজেদের অমূল্য সময় ব্যয় করে আমার ব্লগ দেখেছেন, তাদেরও আমার ধন্যবাদ জানাই। সলিল চৌধুরীর সকল গানের সংগ্রাহক নেদারল্যান্ড নিবাসী বন্ধু গৌতম চৌধুরী ও You Tube-এ প্রচুর দুষ্প্রাপ্য গানের উপস্থাপক বন্ধু পূজন দড়িপা আমাকে কিছু গানের সন্ধান দিয়েছেন, এঁদের জানাই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আমার পুরোনো বন্ধু (৺মুকুল দাসের স্নেহধন্য ছাত্র) অভিজ্ঞ পিয়ানোবাদক জয়ন্ত মল্লিক “সকলি ফুরালো” scoresheet-এ আমার প্রস্তুত chord arrangement দেখে দিয়েছেন, তাকে স্কচের বদলে জানাই শুধুই ধন্যবাদ! পরিশেষে, বিলম্বিত ডিনার ও আমার বদমেজাজ সহ্য করে ব্লগ রচনায় মদদ দেওয়ার জন্য আমার স্ত্রী ইন্দিরাকে জানাই সপ্রেম ধন্যবাদ। রূপান্তরী ব্লগ রচনার জন্য প্রয়োজনীয় tools & resources একটি ছবিতে নিবদ্ধ করলাম, দেখুন।

1293

8

সুভাষ

রূপান্তরী-৬ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী ফিল্মী গান

হিন্দী ছবিতে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বহুল পরিমানে রূপান্তর হয়েছে। সলিল চৌধুরী, রাহুল দেববর্মন, শঙ্কর জয়কিশেন ও আরো অনেকে বিদেশী গানের অনুসরণে হিন্দী গান রচনা করেছেন। সলিল চৌধুরী (১৯২৩-১৯৯৫) দিয়ে শুরু করছি। তাঁর পিতা আসামের এক চা বাগানে ডাক্তারের চাকরি করতেন, তাই তাঁর বাল্যকাল সেই মুক্ত প্রকৃতির মাঝে কেটেছে। তখন ভারত স্বাধীনতা লাভ করেনি, চা বাগানে ইংরেজ সাহেবদের দাপট ছিল। সেই রকম কোন এক সাহেব বাগান ছেড়ে দেশে যাওয়ার সময় তাঁর গ্রামোফোন ও প্রচুর রেকর্ড ডাক্তারবাবুকে দিয়ে যান। সঙ্গীতপিপাসু সলিল চৌধুরী সেইসব রেকর্ডের সঙ্গীতমাধুর্যে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর সঙ্গীতে প্রত্যক্ষে অথবা পরোক্ষে বিদেশী সঙ্গীতের প্রভাব পড়েছে। একটি Polish গানের সুর ও তালের মেলবন্ধনে উদ্বুদ্ধ হ’য়ে তিনি মধুমতী ছবির একটি গান রচনা করলেন। প্রথমে দেখুন ও শুনুন Polish song: “Szla dzieweczka do gajeczka”. তবে video-টি এই সাইটে দেখা যাবেনা, পর্দার link follow ক’রে You Tube-এই দেখতে হবে! অথবা নীচের link-টি copy করে browser-এর address bar-এ paste করলে সাথে সাথে খুলে যাবে।. https://youtu.be/o39o2ao-5eA

1224

1

সুভাষ

রূপান্তরী-৫ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক গান

রূপান্তরীর এই পর্বে আমি উদাহরণসহ শোনাবো পাশ্চাত্যসঙ্গীত প্রভাবিত কিছু বাংলা গান, তবে বক্তৃতা কম থাকবে, কারণ এখানে আমি বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাস লিখতে বসিনি। “ars longa, vita brevis” অর্থাৎ শিল্প দীর্ঘ, জীবন অল্প। প্রথমে থাকছে একটি পুরাতন American folk song, compose ক’রে গেয়েছেন এক কালো মানুষ, Lead Belly অথবা Leadbelly নামে পরিচিত, আসল নাম Huddie William Ledbetter. বারো তারের গীটারের সাথে ইনি নীল গান গাইতেন। উগ্রস্বভাবের এই মানুষ আইন মানতে চাইতেন না, প্রায়ই জেলে থাকতেন, কিন্তু তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে অনেকসময় ছাড়াও পেতেন... এই গানটির দুজনের গাওয়া শোনাব, প্রথমে শুনুন blues music-এর জন্মদাতা সীসেভরা কণ্ঠের গায়ক Lead Belly-র গান Irene Goodnight.

1291

3

দীপঙ্কর বসু

স্মৃতি-বিস্মৃতি ছায়ে -১

৫ সোনারপুরার গলি থেকে বড় রাস্তায় বেরিয়ে আমরা ঠিক করলাম খেতে যাবার আগে আমরা পঞ্চকোট কালিবাড়িটা দেখে নেব । এ মন্দিরের কথা আমার জানা ছিলনা । ইরা ভরসা দিল মন্দিরটা সুন্দর আর সেই সঙ্গে জুড়ে দিল ওয়ারেন হেস্টিংস এর সঙ্গে কাশীরাজের লড়াই এর কাহিনী । সেই রণস্থল পঞ্চকোট কালিবাড়ির কাছেই । জানত খবরটা আমার মনযোগ আকর্ষণ করবেই । কাশীরাজ চৈৎ সিং কে বশে আনতে ওয়ারেন হেস্টিংস সৈন্যসামন্ত নিয়ে ঘিরে ফেলেছিলেন গঙ্গা তীরের চৈৎ সিং এর দুর্গ ।১৭৮১ সালের ১৭ই অগাস্ট বেধেছিল লড়াই । কিন্তু পরম পরাক্রমশালী হেস্টিংস বাহিনীর সঙ্গে এটে ওঠা চৈৎ সিং এর ক্ষমতায় কুলায়নি সেদিন । নিজের কেল্লার মধ্যেই বন্দী হন চৈৎ সিং । কেল্লা ঘিরে রাখে হেস্টিংস এর ফৌজ । কিন্তু বেশিদিন বন্দীদশায় কাটাতে হয়নি চৈৎ সিং কে । গঙ্গা মুখো কেল্লার একটি জানালা দিয়ে চৈৎ সিং পালিয়েছিলেন । খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা অসি ঘাট থেকে পদযাত্রা শুরু করে চৈৎ সিং ঘাটে সে কেল্লা এবং কেল্লার সেই জানালাটা আমরা দেখেছি – অতটা উঁচু থেকে নিচে নামার কোন অবলম্বনহীন সেই জানালা দিয়ে কি করে পালালেন চৈৎ সিং ভাবতে অবাক লাগে। ইরার তার শোনা কথা জানালো – কেউ বলে ওই জানালা দিয়ে বন্দী চৈৎ সিং লাফিয়ে পড়েছিলেন গঙ্গার জলে এবং সাঁতরে গঙ্গা পেরিয়ে রামনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন । আবার অন্য কেউ কেউ বলে বর্ষার ভরা গঙ্গায় ওই জানালার নীচেই বাঁধা ছিল একটি নৌকো । নিজের পাগড়ি খুলে দড়ির মত পাকিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন নিচের দিকে আর সেই পাকানো কাপড় বেয়ে নিচে নেমে এসে নৌকোতে চেপে গঙ্গা পার হয়ে রামনগরে চলে গিয়েছিলেন । সোনারপুরা থেকে রিক্সা চেপে আমরা অকুস্থলে পৌছলাম বটে ,কিন্তু সেখানে গিয়ে জানাগেল পঞ্চকোট মন্দিরে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে । অগত্যা ফিরতি পথে কিছুক্ষনের জন্য দাঁড়ালাম ওয়ারেন হেস্টিংস এবং চৈৎ সিং এর যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে । একটা ঘিঞ্জি অপরিচ্ছন্ন অঞ্চলে রেলিং ঘেরা একফালি সমাধিক্ষেত্র – পুরাতত্ত্ববিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য বলে খ্যাত হলে কি হয় , পুরাতত্ত্ববিভাগ শুধু রেলিং দিয়ে জায়গাটাকে ঘিরে রাখা ছাড়া আর কোন দায়িত্ব স্বীকার করেনি । একটা পাথরের ফলকের লেখা পড়ে অবগত হলাম যে চৈৎ সিং এর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ইংরেজ পক্ষের যে কয়জন প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের ওই জায়গাতেই সমাধিস্থ করা হয়েছে । কিছুটা হতাশ মনেই অবশেষে একটা অটো চেপে আমরা হাজির হলাম রবীন্দ্রপুরী নামে একটা অপেক্ষাকৃত ঝকঝকে অঞ্চলে । ইরার অতি পরিচিত একটি চিনে রেস্তোরাঁয় ঢোকা হল । কেতাদুরুস্ত ভাবে আহারকক্ষটি স্বল্পালোকিত ,মৃদু বাজনা বাজছে । পছন্দ মত একটা বসার জায়গা খুজে বের করতে গিয়ে ইরা বোধহয় খেয়াল করেনি গোটা আহারকক্ষের মেঝে সমতল নয় – বসার আয়োজনে বৈচিত্রের খাতিরে সেটি কয়েকটি ধাপে বিভক্ত । ফলে আনমনে চলতে গিয়ে সেই উচ্চতার হেরফেরটা লক্ষ্য না করেই পা বাড়ান মাত্র ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে প্রায় প্রপাত চ ...। কিন্তু কোন মন্ত্রে যে অমন বিশ্রী রকমের পদস্খলন সত্বেও নিজের ভূপতনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করল তা বাবা বিশ্বনাথই জানেন । আমি শুধু অবাক হয়ে দেখলাম এই আকস্মিক দুর্ঘটনার মধ্যেও ইরা প্রচুর হাস্য রসের উপাদান খুজে পেল । আমি তাকে দেখে শুনে চলার সদুপোদেশ দিতে যাচ্ছিলুম কিন্তু হাসির তোড়ে সে সব কথায় উড়েই গেল । পুরনো দিনের গল্প করতে করতে খাবারের অর্ডার দেওয়া হল – স্টারটার হিসেবে এল বেবী কর্ণ ,বেশ মুচমুচে খেতে । সেটি খেতে গিয়ে আমার সাধজাগল পানীয়ের –কিন্তু সে বস্তু ওই রেস্তরাঁয় অমিল ,কাজেই একটা ঢোঁক গিলে মনোবাসনাটা চেপে গেলাম আমি । অতঃপর সেজুইন রাইস আর চিলি পনীর এল মেইন কোর্স হিসেবে । খাওয়া যত না হল ফেলা গেল তার প্রায় দ্বিগুন । তবে দিনটা হিসেব করে চলার ছিলনা কাজেই অপচয়টা গায়ে না মেখে বেরিয়ে এলাম রেস্তোরাঁ থেকে । খাবার আগে না পরে সঠিক মনে পড়ছেনা , সেদিন দুর্গাবাড়ির কাছে আর একটি পার্ক দেখেছিলাম এবং সেখানে কিছু ছবিও তুলেছিলাম পরে জেনেছি যে সেটি আসলে সুন্দর বাগান ঘেরা ভাস্করানন্দের সমাধি মন্দির । সুন্দর কারুকাজ করা মন্দিরটি রাস্তা থেকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল ।সাদা প্তহের তৈরী মন্দিরের মধ্যে ভাস্করানন্দের সমাধি ।উঁচু বেদীর উপরে যেন একটি গোলাকার শিবলিঙ্গ । পরে একটু খোজখবর নিয়ে জানতে পেরেছিলাম এই ভাস্করানন্দের পরিচয় । ১৮৩৩ সালে কানপুরের কাছে মিথেলপুর গ্রামে এক বিদ্বান ব্রাহ্মন মিশ্রলালের ঘড়ে জন্ম হয়েছিল এক শিশুর । তার নাম দেওয়া হয়েছিল মতিলাল ।অজ্ঞাতপরিচয় এক সন্ন্যাসী নবজাতক মতিলালকে আশীর্বাদ করে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে এ শিশু কালে এক মহাপুরুষ হবেন । অত্যন্ত মেধাবী ও উদার ও সংসারউদাসীন স্বভাবের মতিলালকে সংসারী করার জন্যে পিতা মিশ্রলাল অল্প বয়েসে তার বিবাহ দেন এক পরমাসুন্দরী কন্যার সঙ্গে । মতিলালের একটি পুত্রেরও জন্ম হয় ,কিন্তু তা সত্বেও মাত্র আঠেরো বছর বয়েসে মতিলাল গৃহত্যাগ করলেন । বারাণসীতে মতিলাল শাস্ত্রপাঠ করেছিলেন ।গৃহত্যাগ করার পরে তিনি গেলেন উজ্জয়িনিতে তপস্যার জন্য । সেখান থেকে দ্বারকায় গিয়ে শঙ্করাচার্যের সারদা মঠে বেদান্তের পাঠ নিয়ে এলেন এবং সাতাশ বছর বয়েসে সন্ন্যাসী পূর্ণানন্দ সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহন করেন । মতিলালের নবজন্ম হল ভাস্করানন্দ সরস্বতী নামে । নানান অলৌকিক ক্রিয়াকর্ম এবং সরল নির্লোভ জীবন যাপন তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল । বারাণসীতেই ভাস্করানন্দ তাঁর গোটা জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ,শুধু ১৮৯৯ সালে দেহত্যাগের পূর্বে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে নিজের জন্মভূমি দেখতে গিয়েছিলেন ।

1285

52

Somen dey

টুসু পরব –একটি যথার্থ হৃদয়ের উৎসব

পশ্চিম বাংলা এখন উৎসবময় । নানা ছুতোয় নানান রকমের উৎসব হচ্ছে সরকারী উদ্যমে । হটাৎ করে যেন আমাদের শিকড় বড়বেশি করে টানতে আরম্ভ করেছে । বর্ষা বসন্ত জল মাটি , নবান্ন ,অমুক ষষ্টি , তমুক সক্ক্রান্তি এ সব কে আরবানাইসড করে এক ধরণের উৎসবের হুজুগ লেগে গেছে  । গতকাল যে পৌষ সঙ্ক্রান্তি গেল সেটা আমরা পিঠে পরব বলেই জানি । বাড়িতে পিঠে হোক না হোক মিষ্টির দোকানে কিছু বিশেষ পিঠের চুটিয়ে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু শহুরে মানুষদের কজনই বা খোঁজ রাখেন এ দিনটি টুসু পরব বলে রাড় বাংলার মাটর সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষদের একটি হৃদয়ের উৎসব । ‘আমাদের’ বলতে এই আমরা যারা নিজেদের ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে পড়ি বলে মনে করি তাদের ‘টুসু ’ নামে কোনো আরাধ্য দেবী নেই । এক মাস ধরে এই রাঢ় বাংলার, বিশেষ করে মানভুম অঞ্চলে পূজিত হবার পরে মকর সংক্রান্তির দিন যে টুসু প্রতিমাকে কে খড়কাই , সুবর্নরেখা , কাঁসাই , গেঁদাই , শীলাই নদীতে বিসর্জন দেওয়া হবে তার সঙ্গে আমাদের তথাকথিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক আমরা তেমন করে স্বীকার করি না । সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য মহাশয় রচিত সাম , যজু ও ঋক বেদের থেকে সংগৃহীত সর্ব প্রকার পূজাপাঠের যে একমাত্র ম্যানুয়ালটি পাওয়া যায় তাতে এই টুসু পূজার জন্যে কোনো মন্ত্র নির্দিষ্ট করা নেই । কারন টুসু উৎসব এক অবৈদিক, অস্মার্ত, অপৌরাণিক এবং অব্রাহ্মণ্য উৎসব। আমাদের পাঁজীতে এ উৎসবের নির্ঘন্ট দেওয়া থাকে না  । টুসু এক কুমারী কন্যা । এর পূজাও করেন কুমারী কন্যারা ।আমরা যাদের নিম্নবর্গের মানুষ বলি সেই তাদের বাড়ির কুমারী কন্যারা । কিন্তু এ পূজার কোনো মন্ত্র তন্ত্র , নেই নির্ধারিত ক্রিয়া-কর্ম , কোনো বিশেষ উপাচারও নেই । অঘ্রান মাসের শেষ দিন থেকে পৌষ মাসের শেষ দিন অবধি রাঢ় বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে এই টুসু পুজিত হন  ।যে হেতু মন্ত্র তন্ত্র নেই , তাই এ পূজায় কোনো ব্রাহ্মনের প্রয়োজন হয় না । সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের ‘অশিক্ষিত’ মেয়েরা নিজেদের সাজানো রঙিন কাগজের চৌদলের উপর প্রতিষ্ঠিতা পোড়ামাটির টুসুর মূর্তির সামনে বসে নানা রকমের গান বাঁধেন আর সেই গান করেন কখনো সম্মিলিত কখনো একক কণ্ঠে । সে গানে টুসুর মহিমা কীর্তন শুধু নয় , থাকে তাদের যাপিত জীবনের সাধ আহ্লাদ , আশা নিরাশা , ঠাট্টা তামাশার কথা । এবং তাতে ছায়া ফেলে তাদের ঘিরে থাকা আধুনিক সময় , এবং তাদের গাঁ-ঘরের পারিপার্শ্বিক । কখনো থাকে ক্ষোভ প্রতিবাদ , কখনো থাকে দুঃখ বিষাদ ।এক মাস ধরে এই মন্ত্রহীন পুজার শেষে মকর সংক্রান্তির দিন ব্যাথিত হৃদয়ে তাদের ঘরের মেয়ের প্রাণের প্রতিমা কে তারা বিসর্জন দিয়ে আসে তাদের কাছের কোনো এক নদী অথবা পুকুরে । ফুল বেলপাতা নয় , ধানের তুষ দিয়ে এ পূজার ডালি সাজানো হয় বলে সম্ভবত এই দেবীর নাম টুসু হয়েছে  । কোল, মুন্ডা, ওরাওঁ, সাঁওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, ভুঁইয়া, কুর্মি, মাহাতো ,বাউরী বাগদী মহিলারা এই পূজো করেন । কিন্তু আশ্চর্য লাগে এই ভেবে গোটা পূজার্চনার ব্যাপারটা পরিচালিত হয় এই শ্রেনীর মহিলাদের দ্বারা আর এই উৎসবের প্রধান আকর্ষন এই মেয়েদের তাৎক্ষনিক ভাবে রচিত রচিত গান । নতুন ফসল ঘরে আসার খুশি উদযাপনের এর চেয়ে সুন্দর রুপ য়ার কি বা হতে পারে । এ তাদের প্রাণের গানের ভাষা আর সে গানে কখনো তাদের টুসু একেবারে আটপৌরে মেয়ে , তাদেরই মতন - ‘টুসু সিনাচ্ছেন , গা দলাচ্ছেন হাতে তেলের বাটি নয়ে নয়ে চুল ঝাড়ছেন গলায় সোনার কাঠি...’ আবার কখনো তাকে নিয়ে গ্রাম্য কোন্দল - আমার টুসু মুড়ি ভাজে, চুড়ি ঝনঝন করে গো উয়ার টুসু হ্যাংলা মাগি, আঁচল পাইত্যে মাগে গো। গাঁয়ের মেয়ে যখন শহরে চলে যায় লেখা পড়া শিখতে তখন সে কিছুটা শহুরে হয়ে যায় , হয়তো তার গ্রামের প্রতি টান কমে যায় , তেমনি একটা অভিমানের জায়গা থেকে গান বেরিয়ে আসে - ‘না রহিবেন গাঁয়ে টুসু যাবেন ইবার শহরকে আলতা চরন জুতায় ঢেকে দিবে না পা ডহর কে গীত গাহিবেন অবাক কলে , পান কিনিবেন দোকান লে বছর বছর সাধ জাগিলে আসতে পারেন উখান লে গঙ্গা সিনান , সিনেমা টকি , গড়ের মাঠ আর কালিঘাট বতর পাইলে লেখাপড়ায় হরেক কিসিম লিবেন পাঠ ‘ আবার টুসু যেন তাদের প্রিয় সখী , তাকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার আহ্বান - ‘চল টুসু খেলতে যাবো রানীগঞ্জের বটতলা অমনি পথে দেখাই আইনব কয়লাখাদের জল তুলা উলোট পালট ফুলুট বাঁশিতে আমার মন মানে না ঘরেতে ...’ আবার এ গানেরই শেষের লাইনে সেই জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়ার ব্যাথা, টুসুর কাছে কিন্তু কোনো চাওয়া নেই ,রুপং দেহি , ধনং দেহি নেই , জমিতে ধান না হওয়ার জন্যে কোনো অভিযোগ নেই , বরং তাকে সঙ্গী করেই চলুক জীবন সংগ্রাম – ‘ চল টুসু চল টাটা যাবো ধান হইল না কি খাবো ’ আবার সেই টুসু কে, পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিন বিদায় দিতে হবে , এক মাস ধরে সে ঘরে ছিল । তার সঙ্গে মনের প্রাণের কথা হয়েছে , তাই তাকে বিদায় বেলার মালা খানি , গান দিয়েই পরিয়ে দেওয়া – আমার টুসু ধনে বিদায় দিব কেমনে মাসাবধি টুসুধন কে পুজ্যাছি যতনে । শাঁখা সাড়ি সিঁদুর দিলাম আলতা দিলাম চরনে । মনে দুঃখু হয় বড় ফিরে যেতে ভবনে দয়া কইরে আসবে আবার থাকে যেন মনে ভুইলনা ভুইলনা টুসু আসবে আমার সনে । আমরা নবমী নিশি শেষে দুর্গার বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ব্যাথা নিয়ে অনেক গান শুনেছি , কবিতা পড়েছি । সে গান বা কবিতা হয়তো অনেক পরিশীলিত । ছন্দের বাঁধুনী অনেক মজবুত , গান অনেক সুরেলা । তবে ভাবনায় এই টুসুর গানেরই সমগোত্রীয় । সেই একই আবেদন - পুনরাগমনায়চ-স্থাপিতাসী জলে ম্বয়া । মাঝে মাঝে ভাবি বিপুলা এ পৃথিবী তো দূরের কথা এই ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া – বাংলা দেশ টাকেই বা কতটুকু চিনলাম । পুরুলিয়া , বাঁকুড়া জেলার বাড়িতে বাড়িতে যে কতকাল ধরে টূসু পরব হয়ে আসছে , মকর সঙ্ক্রান্তির দিন মেলা বসে আসছে পরকুল, পরেশনাথ, কেচন্দা, লক্মীসাগর, বীরপাট ও সুইসা ও মানবাজার কাশীপুর, হুড়া, ঝালদা, বলরামপুর, তালতলায়, তার খবর আমরা ক জনই বা রাখি । আমাদের দৌড় তো ওই সৌখিন বইমেলা বা পৌষমেলা অবধি । যখন আমরা পাঁজী পুঁথি দেখে আমাদের চেনা দেব দেবীর পুজো করি , তখন ভয়ে হোক আর ভক্তিতে হোক আমাদের থাকে একশো ভাগ নিয়ম-নিষ্ঠা , আর চেষ্টা করি সেই হাজার হাজার বছর আগে রচিত বেদে যে মন্ত্র বলা আছে তা যেন যথাবিহিত উচ্চারিত হয় । যে মানুষ টি ভক্তি ভরে পুজায় অংশ নিচ্ছে তার কাছে সে মন্ত্র বোধ্যই হোক আর অবোধ্যই হোক , তার সঙ্গে আমাদের আজকের জীবনের যোগ থাক অথবা নাই থাক । কিন্তু এই যে টুসু পুজোর গান , এখানে ওরা নির্ভয়ে আজকের জীবনের সুখ দুঃখের কথা শোনান তাদের আরাধ্য দেবীর কাছে । আমাদের বোধহয় নতুন করে ভাবা দরকার কারা বেশি আধুনিক আমরা না ওরা ! এই মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা জীবনের দর্শন , এই সরলতায় সম্বৃদ্ধ গান , যা শুনে বার বার মনে হয় – ...সে গানে বিদ্ধ বুক রক্তে অশ্রু ছল ছল এ যদি আমার দেশ না হয় তো কার দেশ বল ? আর ভাবতে ভালো লাগে আর কেও না হোক রবীন্দ্রনাথ স্বীকৃতি দিয়েছেন এই আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির এই ‘নিম্ন- অংশ ’ টিকে - ‘গাছের শিকড়টা যেমন মাটির সঙ্গে জড়িত এবং তাহার অগ্রভাগ আকাশের দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তেমনি সর্বত্রই সাহিত্যের নিম্ন-অংশ স্বদেশের মাটির মধ্যেই অনেক পরিমাণে জড়িত হইয়া ঢাকা থাকে; তাহা বিশেষরূপে সংকীর্ণরূপে দেশীয়, স্থানীয়। তাহা কেবল দেশের জনসাধারণেরই উপভোগ্য ও আয়ত্তগম্য, সেখানে বাহিরের লোক প্রবেশের অধিকার পায় না। সাহিত্যের যে অংশ সার্বভৌমিক তাহা এই প্রাদেশিক নিম্নস্তরের থাক্‌'টার উপরে দাঁড়াইয়া আছে। ’ আচ্ছা, এই যে ওদের আরাধ্য দেবী কে ঘিরে, চলমান জীবন থেকে উপকরন নিয়ে নির্বিশেষ মানুষদের গান বাঁধার উৎসব, আর সেই সুযোগে আরো একটু সবাই মিলে বেঁধে বেঁধে থাকার চেষ্টা , এমন উৎসব আমাদের , মানে যারা তথাকথিত ‘উচ্চ বর্গ’র মানুষ , তাদের নেই কেন ?বোধহয় আমরা সেই অকৃত্তিম সরলতা টা হারিয়ে এসেছি সভ্যতার রাজপথ দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ।

1245

9

সুভাষ

রূপান্তরী-৪ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত

প্রথম উদাহরণ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত (English air) “Drink To Me Only With Thine Eyes” – Johnny Cash Scale : B flat Major, Time : 3/4. (গলার আর্তি লক্ষণীয়।)

1714

0

সুভাষ

রূপান্তরী-৩ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী গান

হিন্দী গানের, বিশেষত ফিল্মী গানের ভাণ্ডারে সর্বপ্রকার সঙ্গীতের অফুরন্ত সম্ভার আছে —রাগসঙ্গীত অন্যতম। এই বিরাট ভাণ্ডার থেকে আমি শ্রেষ্ঠ গানের ঊদাহরণ চয়ন করেছি, তবে পূর্বে আলোচিত রাগ পুনরায় উল্লেখ করব না যাতে সকলে বিভিন্ন রাগের সমানভাবে পরিচয় পেতে পারেন। প্রথমে ভোরের রাগ ভৈরবী ধরা যাক। এই রাগ সাধারণত ঠুংরী গায়নে ব্যবহৃত হয়। প্রথম উদাহরণ ( শাস্ত্রীয় ) বাজুবন্দ খুল খুল যায় – ঠুংরী – জনাব গুলাম আলি রাগ ভৈরবী, ত্রিতাল (ষোল মাত্রা, বিভাজন ৪/৪/৪/৪) শাস্ত্রীয় পরিচয় এইরূপ : ঠাট - ভৈরবী, বাদী - ম, সম্বাদী - স, জাতি – সম্পূর্ণ সময় – প্রাতঃকাল আরোহণ – স ঋ জ্ঞ ম পদ ণ র্স অবরোহণ – র্স ণ দ পমজ্ঞ ঋ স পকড় – ম জ্ঞ স ঋ স দ্‌ ণ্‌স [Improvisation-হেতু গায়কেরা উপরের বিধি লঙ্ঘন ক’রতে পারেন] আসুন, উনার একটি live program উপস্থিত উচ্ছসিত দর্শক-শ্রোতাদের সাথে উপভোগ করি।

1213

2

মনোজ ভট্টাচার্য

ডালের নিমন্ত্রন !

ডালের নিমন্ত্রন ! কাল বেশ মজার ঘটনা ঘটলো ! আমি কমপ্লেক্সের গোল রকে বসে রুদ্রবাবুর সঙ্গে আলোচনা করছি কোনও ব্যাপার নিয়ে । এমন সময় একটি খুবই সুন্দর দেখতে মেয়ে ও তার স্বামী – তিরিশের কাছাকাছি বয়েস – রুদ্রবাবুর সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলো । উদাসীন থেকেও যা বুঝলাম – মেয়েটি রামমোহন রায়ের ওপর কিছু নিয়ে একটা গবেষণা করছে ! বাঃ ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো ! ছেলেটির নাম বিশাল ও মেয়েটির নম্রতা – এ ত’ একেবারে অবাঙ্গালি নাম ! বিশাল ভরদ্বাজ ও নম্রতা শিরোদকারের নাম জানি । বিশাল যেন চেষ্টা করছে আমার সঙ্গে কথা বলার । - নিজে থেকে কিছু না বললে আমি আর কি বলি ! সুযোগ এলো । আগের দিন নাকি রুদ্রবাবু ওদের কোনও খাওয়া দাওয়ার পার্টিতে গেছিল – সেই প্রসঙ্গেই কথা হচ্ছে । খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমার আবার কোনো উৎসাহ জাগে না ! মানে কোন ফান্ডা নেই আরকি । এই আড্ডাতেই দেখি জলদেবী ও বাবিদা সকালের খাওয়া থেকে খিচুড়ি ইত্যাদি নিয়ে লাইনের পর লাইন লিখতে পারেন ! আমি শুধু অবাক হয়ে খাবারের গন্ধ শুঁকি ! – আর ভাবি - এনারা কত বড় সব খাইয়ে রে বাবা ! লাইনের পর লাইন খেয়েই যাচ্ছেন ! – সে যাই হোক – আমার কথায় ফিরে আসি ! ডাল-জাতীয় কিছু একটা খাওয়ানো হয়েছিল । সেটা কিসের ডাল ! মুশুর না মুগের ! – নম্রতা বলল – ওটা নাকি কোন ডালের নয় – ওটা হল কড়াইশুটির ডাল ! মশলা মিশিয়ে ওরকম খেতে হয়েছে ! পঞ্চাশ রকম মশলা দিতে হয়েছে ! কড়াই শুটির ডাল – এটা নতুন ! ঠাট্টা করে বলে ফেলি – এর পর থেকে যখুনি ওনাকে ডাল খাওয়াবেন – আমার নামেও কিছু পাতের পাশে ফেলবেন ! নাহলে - - ! কথাটা বোধয় বলার অপেক্ষায় ছিল । ঝপ করে লুফে নিল ওরা দুজনেই ! – আরে আপনি হলেন দাদুর বন্ধু – তো আমাদেরও দাদু হলেন ! – আপনি এখুনি চলেন – আমাদের এখনো অনেক ডাল আছে ! সর্বনাশ ! কালকের ওই ডালে আমাকে ঝোলাবে নাকি ! – যতই বলি – আরে আমি ডালের অত ভক্ত নই ! কে শোনে কার কথা ! বিশাল এক হাত ধরে আর নম্রতা আরেক হাত ধরে টেনে তুলল ! – সেই সময় রুদ্রবাবুও ধুনো দিলেন । আরে চলুন না – অতো করে বলছে ! – মনে হল ওনার ইচ্ছে আছে – আরেকবার সে ডাল সাঁটতে ! কি বিপদ বলুন দেখি ! মিষ্টি টিস্টি বা বিরিয়ানি জাতীয় কিছু হলেও বা কথা ছিল ! স্রেফ ডাল ! তাও নাকি কড়াইশুঁটির ! ক্রমশ জানতে পারলাম - বিশাল কি একটা ব্যাবসা করে । ওরা নাকি এখানকার তিনশো বছরের বাসিন্দা ! আমি ঠাট্টা করে জিজ্ঞাসা করলাম – তাহলে তো কলকাতাকে জন্মাতে দেখেছ ? – ঠিক বুঝতে না পেরে বলল – ওরা মুর্শিদাবাদের আদি বাসিন্দা ! তিন পুরুষ না চার পুরুষ আগে ওখানে এসেছে ! সে তুলনায় কিন্তু নম্রতারা কয়েক পুরুষ ধরে ভবানিপুরে থাকে । বাড়িতে নাকি সব বাঙ্গালি কালচার ! এখন এখানে আছে । কাজ করে একটা কলেজে – কি নাম বলল জায়গাটার – প্রায় সুন্দরবনের কাছে । রোজ সকালে পঞ্চাশ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যায় ! আর বিকেলে পঞ্চাশ কিলোমিটার চালিয়ে ফেরে । পথ হয়ত বেশি নয় । কিন্তু সময় ! – এই বিরাট ট্র্যাফিক জ্যামের রাস্তায় এতটা যাতায়াত ! খুব উৎসাহভরে তো ওদের ঘরে নিয়ে গেল ! ওদের ফ্ল্যাটে ঢুকে একটা নতুন জিনিস দেখলাম ! – দেওয়ালের মধ্যে বিছানা টাঙানো ! – এটা আমার অনেক দিনের ফ্যান্টাসি – কতটা স্পেস বাঁচানো যায় ! আমাকে দেখালো – কি করে বিছানা নামানো ও ওঠানো যায় ! – ওরা নিজেরা ডিজাইন করে – করিয়েছে ! দেওয়ালে কাঠের ফ্রেম করে – তার মধ্যে বিছানাসুধ্যু খাট ঢুকে যাচ্ছে ! - কত নিয়েছে – সে প্রশ্ন আর করিনি ! আন্দাজ করে নিয়েছি ! এখনো এখানে কারুর বাড়িতে দেখি নি ! – বিদেশেই দেখেছি । বিশাল যখন বিছানা দেখাচ্ছে – নম্রতা তখন সেই ডাল করছে ! – জ্যেঠু, চলে আসুন – ডাল হয়ে গেছে ! – আমরা ফিরে টেবিলে বসে ছোটো বাটি করে সেই ডাল খেলাম । - অনেক রকম মশলা দিয়ে একটা স্যুপ বানিয়েছে – একটু অন্য রকম খেতে হয়েছে ! – আমি কিন্তু এর চেয়ে ভালো মুশুর ডাল করতে পারতাম – সে আর কে জানে ! – বাঃ বাঃ বলতে বলতে উঠতে যাবো – বিশাল বলে উঠল – আরে আরে উঠছেন কেন ? এ তো শুধু এপিটাইজার হল । এখন তো খানা বাকি আছে ! কাম সারসে ! আমার তখন বেশ অস্বস্তি হতে লাগলো । এরা কি সত্যিই রাত্তিরের খাবার খাইয়ে ছাড়বে ! – ঘরে আছে বুড্ডি বৌ – কিচ্ছু জানে না ! – যতই আপত্তি জানাই – ততই জোর খাটাচ্ছে ! তারই মধ্যে আলাদা আলাদা প্লেটে করে খাবার এলো । একটু একটু করে অন্তত পাঁচ রকমের সবজির তরকারি ! একটা চিনতে পারলাম – কাঁচ কলার কোপ্তা ! – একটু করে সবই টেস্ট করতে হল ও বেশ বেশ বলতে হল ! তখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি – উঠে পড়ার । অবশেষে এলো মিষ্টি ! মিষ্টির চেয়ে মেঠাই বলাই ভালো ! কিন্তু দারুণ খেতে ! এখানকার মিষ্টির মতন অত মিষ্টি নয় । যদিও মিষ্টির পরিমান কম – কিন্তু বেশ সুস্বাদু ! আমরা তো বিদেশে – এই ধরনের মিষ্টি খেতে অভ্যস্ত ! ব্যস - বিশাল নম্রতাও মিষ্টি হয়ে গেল আমাদের কাছে ! ঢুকেছিলাম দাদু হয়ে – বের হলাম জ্যেঠু হয়ে ! মনোজ

1128

5

সুভাষ

রূপান্তরী-২ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক / রাগপ্রধান গান

প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা গান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (এবং লোকসঙ্গীত) প্রভাবিত হয়েছে। অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল, রামপ্রসাদ ইত্যাদি মনীষীদের গানে এই প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমি এখানে প্রচলিত অর্থে আধুনিক গানে রাগসঙ্গীতের প্রভাব উদাহরণসহ উপস্থাপনা করবো। অনুসারী রাগের পরিচয়ও সাথে সাথে দেওয়া হবে। প্রথম উদাহরণ ( শাস্ত্রীয় ) বনাবন আয়ী – খয়াল (গৎ) - উস্তাদ সলামত আলি খান ও নজাকত আলি খান রাগ কলাবতী, ত্রিতাল (ষোল মাত্রা, বিভাজন ৪/৪/৪/৪) শাস্ত্রীয় পরিচয় এইরূপ : ঠাট - খাম্বাজ, বাদী - প, সম্বাদী - স, জাতি – ঔড়ব সময় – মধ্যরাত্রি আরোহণ – স গ প ধ ণ ধ প ধ র্স অবরোহণ – র্স ণ ধ প গ প গ স পকড় – প গ প, ধ ণ ধ, র্স ণ ধ, প গ প গ স

2442

3

সুভাষ

রূপান্তরী-১ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অ আ ক খ হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গোড়ার কথা সহজ ভাবে শুরু করছি, যদিও অধিকাংশই সকলের জানা। হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীতের সুর প্রয়োগের কিছু পদ্ধতি আছে যার দ্বারা বিভিন্ন রাগের পরিচয় পাওয়া যায়। সকলেই জানেন, সঙ্গীতে সাত স্বরের মাঝে চারটি কোমল (ঋ, জ্ঞ, দ, ণ) ও একটি তীব্র [হ্ম] স্বর আছে, সব সমেত এই বারোটি স্বর আছে : স (ঋ) র (জ্ঞ) গ ম [হ্ম] প (দ) ধ (ণ) ন এইসকল স্বর বিভিন্ন সমন্বয়ে সাজিয়ে, বিভিন্ন চলনে, অর্থাৎ স্বরের আরোহণ ও অবরোহণ নির্দিষ্ট পারম্পর্যে রেখে, কখনো বা কোন কোন স্বর বর্জন ক’রে, এক একটি রাগের সৃষ্টি হয়। কোন রাগে কি কি স্বর কি ভাবে ব্যবহৃত হবে তার স্বর সমন্বয় কেমন হবে, সে সবই নির্ধারিত হয়েছে প্রাচীনকালে। পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে জীবনব্যাপী সাধনার দ্বারা হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার রূপরেখা তাঁর ছয় খণ্ডের ক্রমিক পুস্তকমালায় প্রস্তুত ক’রে গিয়েছেন। প্রথমত তিনি হিন্দুস্থানে প্রচলিত শাস্ত্রীয় রাগগুলির একটি সাধারণীকৃত রূপ, ক্ষেত্রবিশেষে তার বিভিন্নতা সহ, লিপিবদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি শাস্ত্রীয় রাগ-রাগিণীর উপরে আধারিত অসংখ্য বন্দীশ হিন্দুস্থানের বিভিন্ন ঘরানা ও অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং সংকলিত করেছেন। তৃতীয়ত, তিনি প্রাচীন সংগীত শাস্ত্রসমুদয়ে বিধৃত ভারতীয় সংগীততত্ত্ব এর আধুনিক যুক্তি সম্মত রূপরেখা প্রস্তুত করেছেন। এই প্রসঙ্গে জানাই এই সমগ্র রাগসঙ্গীতের প্রায় দুই হাজার বন্দীশের উদাহরণসহ CD প্রস্তুত করেছেন শ্রী ইন্দুধর নিরোদী, বিশদ বিবরণ আন্তর্জালের এই নিবন্ধে বিবৃত :- http://scroll.in/article/726180/2000-classical-compositions-from-musicologist-bhatkhandes-century-old-books-are-now-on-cd প্রতিটি রাগের নিজস্বতা এইভাবে প্রকাশিত হয়: ১) ‘বাদী’ অর্থাৎ সর্বাধিক ব্যবহৃত (মুখ্য) স্বর ২) ‘সম্বাদী’ অর্থাৎ দ্বিতীয় মুখ্য স্বর ৩) রাগের চলন অর্থাৎ স্বরসমুহের ওঠা (আরোহণ) ও নামা (অবরোহণ) ৩) ‘পকড়’ অর্থাৎ স্বরমালিকা বা কিছু নির্দিষ্ট স্বরের পারম্পর্য, যার থেকে রাগের চরিত্রটি বোঝা যায়। এবার রাগের পরিচিতি সম্বন্ধে আরও দু চার কথা বলি। আরোহণ অবরোহণে কয়টি স্বর থাকবে এই হিসাবে রাগের জাতির পরিচিতি হয়। সবকটি স্বর থাকলে বলা হয় সম্পূর্ণ, ছয়টি = ষাড়ব, পাঁচটি = ঔড়ব। ............................................................................................................................................. আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই সবকটি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ, যথা কাফী। আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব, যথা সোহিনী। আরোহণে সাত, অবরোহণে ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ-ষাড়ব, যথা পিলু। আরোহণে সাত, অবরোহণে পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় সম্পূর্ণ-ঔড়ব, যথা নট। আরোহণে ছয়, অবরোহণে সাতটি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব-সম্পূর্ণ, যথা খমাজ অথবা খাম্বাজ। আরোহণে ছয়, অবরোহণে পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় ষাড়ব-ঔড়ব, যথা জনরঞ্জনী। আরোহণে পাঁচ, অবরোহণে সাতটি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব-সম্পূর্ণ, যথা বিহাগ। আরোহণে পাঁচ, অবরোহণে ছয়টি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব-ষাড়ব, যথা জোগিয়া। আরোহণ অবরোহণ দুটিতেই পাঁচটি স্বর থাকলে জাতি হয় ঔড়ব, যথা মালকোশ। ................................................................................................................................................ পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে একই বৈশিষ্ট সম্পন্ন বিভিন্ন রাগের একটি শ্রেণীবিভাগ করেছেন, যার নাম ঠাট। রাগসঙ্গীতে এমন দশটি ঠাট নির্দ্ধারণ করা হয়েছে , যথা কল্যাণ, বিলাবল, ভৈরব, কাফী, খমাজ, ভৈরবী, পূরবী, আশাবরী, মারোয়া ও তোড়ী। কিন্তু একই রাগ ভিন্ন ঠাটে থাকতে পারে অথবা একই ঠাট ভিন্ন রাগের হতে পারে, তবে সে আলোচনা এখানে করতে চাই না, কারণ আমরা শুধু সহজ ভাবে রাগের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে অবহিত হতে চাই। এই প্রসঙ্গে জানাই রাগের নানারকম পরিবেশনা হতে পারে, যেমন ধ্রুপদ, ধামার, খয়াল, তারানা, টপ্পা, ঠুংরী প্রভৃতি। ঠুংরীতে রাগের কিছু নিয়ম ভাঙা যায়। বন্ধনমুক্তিতে ঠুংরীর মনোগ্রাহীতা বৃদ্ধি পায়, তবে কট্টর সঙ্গীতজ্ঞরা এটি প্পছন্দ করেন না। প্রায় সাড়ে তিনশ হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীতের বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া এখানে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যে যে গানগুলির উদাহরণ দেব, তার নিজস্বতার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করবো। রাগসঙ্গীত অনুভুতির বিষয়, অধিক জ্ঞানে একজন রসিক শ্রোতার প্রয়োজন নাই। আমরা যখন একটি বর্ণময় ফুটন্ত ফুল দেখে বিমল আনন্দ পাই, তখন কি তার botanical নাম জানার কোন দরকার আছে? তেমনি যদি একটি ময়ুরের পেখম তোলা নাচ দেখি, কত সুন্দর অনুভুতি হয়, ornithology জানলে কি সেই অনুভুতির কোন তারতম্য হবে? রবীন্দ্রনাথের উপর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কতখানি প্রভাব ফেলেছিল, সে আলোচনার পূর্বে শ্রীমতি কৌশিকী চক্রবর্তীর একটি ঠুংরী শোনাই, এটি রাগ ভিন্ন ষড়জ আধারিত, তবে মতান্তর আছে। এই রাগের পরিচয় জানাই : ঠাট বিলাবল, জাতি ঔড়ব, বাদী ম, সম্বাদী স, মতান্তরে ধ ও গ, বর্জিত র, প, পকড় মগ মধনস। একটি গান যে কত আনন্দের ও প্রত্যয়ের সাথে গেয়ে শ্রোতার মনোরঞ্জন করা যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। **********************************************************************

3461

5

অরিন্দম

আমাদের চারপাশে কণাদের কথা

আমাদের চারপাশে কণাদের কথা ------------ প্রিয় হিমু তা সেদিন আমি-তুই-প্রবুদ্ধ আলোচনা করছিলাম ঈশ্বর কণা না হিগস্-বোসন। ঈশ্বর এল কেন? আমি ও প্রবুদ্ধ তোকে বলেছি ঘটনাটি ঠিক কী হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে, কণার ইতিহাস জানা দরকার। বিজ্ঞানে কল্পনার স্থান আছে কিন্তু সেটা একেবারে প্রথমিক স্তর।কল্পনা বা চিন্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই'ত প্রশ্ন করতে শেখায়। কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ ভাবছে কেমন করে তৈরি হয়েছে বিশ্বব্রহ্মান্ড। কেমন করেই বা পৃথিবী ও জীবজগৎ। বহু প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছে, বহুর পায়নি। যা পেয়েছি, পেয়েছি। যা পায়নি তা থাক, সেসবই প্রচলিত ঈশ্বরের দান বা হাত এটা বিজ্ঞানীরা মেনে নেয়নি শুধু। কোন রক্তচক্ষু তাঁদের অনুসন্ধান থামাতে পারেনি। তাঁরা গবেষণা করে গেছেন। অনুসন্ধানের অপর নাম গবেষণা। দুটি জগত। একটি জড়, অন্যটি জীব। জড়ের জন্ম আগে। জীব পরে। জড়জগতের কথাই এখন আমরা ভাবি। এই যে চারপাশে যা কিছু দেখছি তা আসলে কী দিয়ে তৈরী? কী দিয়ে তৈরি বললে এককথায় উত্তর দেওয়া যায় কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাকে ভেঙে দেখতে চেয়েছেন। প্রথমেই যাঁর কথা মনে আসে, সে কণাদ। একজন ভারতীয়। সেই প্রথম বলে আমাদের চারপাশের সকল জিনিস একক কণা দিয়ে তৈরী। নাম পরমাণু। এখন কণাদ কী করে পরমাণুর ধারনা করলেন? খুবই সংগত প্রশ্ন। আমাদের কাছে কিছু জ্ঞাত কিছু অজ্ঞাত। জ্ঞাত জিনিসকে কাজে লাগিয়ে অজ্ঞাতকে জানার চেষ্টা করা হয়। কণাদও তাই করেছিলেন। জ্ঞাত জিনিসকে ছ'ভাগে ভাগ করলেন। দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ ও সমবায়। এরমধ্যে দ্রব্য কে বাছলেন প্রথমে। তাকে ন ভাগে ভাগ করলেন পৃথ্বী, অপ, তেজস, বায়ু, আকাশ, দিশ, কাল, আত্মা ও মানস। আত্মা দেখে চিত্ত চঞ্চল হওয়ার কোন কারণ নেই। পৃথ্বী, অপ, তেজস, বায়ু র মধ্যে বস্তুধর্ম আছে। আকাশ, দিশা ও কাল জায়গা জুড়ে আছে, তাই বললেন ওদের মধ্যে বস্তুধর্ম নেই এবং আত্মা ও মানসের মধ্যেই বস্তুধর্ম নেই। যা আছে তা হলো চেতনা ধর্ম। এদের মধ্যে হয়ত সম্পর্ক আছে কিন্তু কণাদ সেই নিয়ে ভাবতে বসেননি। বরং বস্তুধর্ম যাদের আছে তাদের নিয়েই তাঁর চিন্তা শুরু হলো। এরপর কণাদ বললেন, এই দ্রব্যদের ভাঙতে থাকলে যেখানে এসে থামতে হবে, অর্থাৎ হাতে থাকবে শুধুই পরমাণু। এও বললেন পরমাণুকে ভাঙা যায়না, এতো ছোট যে পরিমাপও অসম্ভব। আবার একথাও বললেন একেক দ্রব্যের পরমাণু এক এক রকম। মানে ধর, মাটির রয়েছে গন্ধগু। জলের স্বাদগুণ। আগুনের বর্নগুণ। বাতাসের স্পর্শ। এবং এরা সকলেই গতিশীল। আবার একইরকম পরমাণু যোগ করলে দ্বিপরমাণুক, ত্রিপরমাণুক বা চতুর্পরমাণুক ধারনাও দিলেন কণাদ। একটা ঘটনা জানবি, যে কোন সৃষ্টিশীল মানুষেরাই এক পরিবারের সদস্য। কেউ উত্তরসূরী কেউ বা পূর্ব। একজন কিছুটা দেখে, ভাবে ও বলে, পরেরজন সেখান থেকে শুরু করে পথ চলা। সে আবার কিছু মত রাখে, কিছু বাতিল করে। এভাবেই এগিয়ে চলে সভ্যতা। সত্যি জানিস, এরকমটাই হলো। কণাদের বহু বছর পর অন্য দেশের অন্য একজন কণাদের কথা নিয়ে ভাবতে বসলেন। গ্রিক দার্শনিক, চিকিৎসক ও পদার্থবিদ এমপেডোক্লেস ও দার্শনিক পদার্থবিদ লিউসিপ্পাস। কণাদকে মানলেন ওঁরা। তবে খুব বেশিদূর এগোতে পারেননি। লিউসিপ্পাসের ছাত্র ছিল ডেমোক্রিটাস। গুরুর থেকে শিষ্য এগোল একধাপ। শিষ্য বললো, এই বিশ্ব দুরকমের জিনিস দিয়ে তৈরী, মাহাশূন্য ও পরমাণু। পরমাণু সত্যি সুতরাং স্বাদ, গন্ধ, শব্দ, আগুন আর মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করা যাবে। মৌচাকে ঢিল। বলে কী লোকটা! এই যাবতীয় সবকিছুর মালিক হলো ঈশ্বর। সেই শেষকথা আর এ ব্যাটা বলে কীনা পরমাণু সার কথা! দেশে বিদেশে চিত্র এক। শঙ্করাচার্য থেকে মনু কেউ কনাদের কথা মনেননি ছ্যা ছ্যা করতেন, ঠিক সেরকমি মানেননি প্লেটো, অ্যারিস্টটল ডেমোক্রিটাসকে। এও বিরোধীতা সত্যি আবার এও সত্যি এদেশে একজন কবি যেমন বারেবারে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ঠিক সেরকমই অন্যদেশেও। "আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ" আসার অনেক আগেই চেতনার রঙে রোমান কবি লুক্রোসিয়াস ডেমোক্রিটাসের ভাবনার ওপর ভিত্তি করে লিখে ফেললেন "দেয়ার আর মেনি ওয়ার্ল্ডস"। নানা পঙ্ক্তিতে ছাড়ানো ছেটানো রইল পরমাণুর কথা। এরপর ১৭৭৬ সাল খুব গুরুত্বপূর্ণ বছর কণাদের ভবিষ্যতের জন্য। জন্ম নিলেন, জন ডালটন। রোজকার আবহাওয়া লেখা আর টিউশনি করে দিন চালাতেন পাশাপাশি ছিল ওই খোঁজার পাগলামি। বর্ণান্ধ ছিলেন কিন্তু আমাদের চিনিয়ে দিলেন অনেককিছু। ১৮০১ সালে প্রকশিত হলো আংশিক চাপ সূত্র। তার দু'বছর পর গ্যাসের দ্রাব্যতা নিয়ে গবেষণাপত্র লিখলেন।। আমরা দেখতে পেলাম পরমাণুর আপেক্ষিক ভর নিয়ে কথা বলছে কেউ। লিখলেন বই, "এ নিউ সিস্টেম অফ কেমিক্যাল ফিলোজফি'। পরমানু বিষয়ে হাজারো কথা। কণাদ ও ডেমোক্রিটাসের কথা মানলেন। কোন মৌলের পরমাণু একসাথে মিশে কোন যৌগ তৈরী করলে তারমধ্যে সবকটা মৌল সরল সংখ্যা অনুপাতে যুক্ত হবে। সরল গুণানুপাত সূত্র এসে গেল। পরমাণু কি অবিভাজ্য থেকে গেল? তখনকার মতন "কী" এখন বলে "কি" লিখলাম। উত্তর- না। ময়দানে চলে এলেন নিউটন, বোলৎজমান ও টমসন... আজ এইটুকু থাক। আবার লিখব সামনের সপ্তাহে। শুভেচ্ছা সহ অরিন্দম পু- দেখ হিমু, ঠাকুরদা চিঠি দিয়ে শুরু করেছিলেন বিশ্বপরিচয়। লিখেছিলেন বোসবাবুকে। তাতে কী? গুরু "অর্ধেক জীবন" লেখার সময় বলেছিলেন শুধু মহাপুরুষ, মহাকবি, মহাবিজ্ঞানীরাই আত্মজীবনী লিখবে এমন কথা নেই, যুদ্ধ ফেরত সেনা, অফিস ফেরত কেরানীও লিখতে পারে। সেইকথা মাথায় রেখেই, তোকে লেখা আমার চিঠি। সকলেরই জানা আছে, নতুন বা মৌলিক কিছু নয় তবু আগে পড়া, নতুন করে পড়া হয় কিছু। সেও তো কম কথা নয়। ------------------------------------------------------------ আমাদের চারপাশে কণাদের কথা (২) --------------- প্রিয় হিমু এ বড় সুখের সময়। এই সকালবেলা। সেরকম শীত পড়েনি আবার গরম নেই। একটা মনোরম আবহাওয়া। আমাদের পাশের বাড়িতে এক সংগীত রসিক ভদ্রলোক থাকেন। প্রতিদিন নানারকম গান শোনা যায়। রবীন্দ্র সংগীতই বেশি, তবে আজ সুমন চালিয়েছেন। কাকতলীয় অথবা তুই হয়তো বলবি এর পিছনে ভগবানের হাত, সে যাকগে। কানে ভেসে আসছে, প্রথম সবকিছু। হ্যাঁরে, প্রথম সবকিছু। সবকিছুরই একটা প্রথম থাকে। আবিষ্কারেরও। ডালটন সাহেবতো বলেইছিলেন এবার বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম বিস্ময়কর প্রতিভা আইজাক নিউটনও সেইকথা মানলেন। এবং বললেন, গ্যাসের আয়তন বাড়া মানেই তো পরমাণুগুলো আরও বেশি বেশি করে ফাঁকা জায়গা দখল করছে। বিজ্ঞানীরা একে অপরের কাজ ও কথাকে মন দিয়ে শোনে, যাচাই করে তারপর গ্রহণ বা বর্জন। এইসময় ইংলন্ড ও জার্মানী বিজ্ঞান গবেষণায় দুই দৈত্য। ডালটন ও নিউটনকে ঘিরে ইংল্যান্ডের বিজ্ঞান মহল আবার জার্মানীতে আর্নস্ট ম্যাককে ঘিরে তাঁর অনুরাগীরা। তাঁরা বলে পরমাণু কি দেখা যায়? যদি নাই দেখা গেল তাহলে তানিয়ে মাথা ঘামাবো কেন! কথাটা ফেলে দেওয়ার মতন নয়। তত্ত্বীয় বিজ্ঞানচর্চা না পরীক্ষানির্ভর, এই নিয়ে ভাবনা শুরু হয় বিজ্ঞান মহলে। এই ভাবনা ও তার ফলের মধ্যবর্তী সময় খুব কম নয়। এই সময়ে নিউটনের ভাবনাকে স্মরণে রেখেই দুজন বিজ্ঞানী কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এক্জন, লাডভিগ বোলৎ্সম্যান অন্যজন ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কয়েকটি মৌলিক অঙ্গীকারের(Assumptions) ভিত্তিতে পদার্থের গতীয় তত্ত্ব(Kinetic Theory of Matter)। আবার গ্যাসের গতীয় তত্ত্ব হচ্ছে আণবিক বিশৃঙ্খলা নীতি(Principle of Molecular Chaos)কে মান্যতা দেন(লক্ষ্য করছিস নিউটন সাহেব যা বলেছিলেন বা ভেবেছিলেন সেই পথ ধরেই এগোলেন ওঁরা)। এইভাবেই আগের প্রজন্মের বিজ্ঞানী পরের প্রজন্মকে ভাবনার রসদ দিয়ে যায় একদিন রিচার্ড ফেইনম্যানও দিয়েছিলেন ন্যানো পার্টিকেলের ভাবনা। যাকগে যেটা বলছিলাম, এরপর ম্যাক্সওয়েল ও বোলৎজম্যান অণুগুলির গতিবেগ বিতরণ সূত্র(Law of Distribution of Molecular Velocities) উদ্ভাবিত করেন এবং তার ভিত্তিতেই গ্যাসের নানা ধর্মাবলী- উষ্ণতা, চাপ, তাপ-পরিবাহিতা(Thermal Conductivity), সান্দ্রতা(Viscosity) সামনে আসে। কিন্তু ওঁদের গবেষণা মূলত তত্ত্বীয়, পরীক্ষানির্ভর ছিলনা। আর সবচেয়ে দুঃখের কথা জানিস এই দুই বিজ্ঞানীর জীবনের পরিনতি সুখের ছিলনা। ম্যাক্সওয়েল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন আর ম্যাক ও তাঁর শিষ্যদের আক্রমণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যা করেন লাডভিগ বোলৎজম্যান। তুই হয়ত পড়তে পড়তে ভাবছিস, কণাদের কথা বলতে বলতে গ্যাসে নিয়ে এল ব্যাটা। আগের দিন বলেছি তড়বড় করবিনা। সব আসবে আস্তে ধীরে। তা যে কথা বলেছিলাম আগে, নিউটনকে কেন্দ্র করে তত্ত্বীয় গবেষণা খুব জাঁকিয়ে বসেছিল কিন্তু পরীক্ষানির্ভর গবেষণা সেরকম উল্লেখযোগ্য ছিলনা। খাতা-কলমে গবেষণায় মূলধন অনেক কম লাগে, হাতে-কলমে অনেক বেশী। গৌরী সেন থেকে সুদীপ্ত সেন মোচ্ছবে টাকা দেয়, মন্দির নির্মাণ করে কিন্তু শিক্ষায় ঢালেনা। কথায় আছে টাকা, টাকা আনে, ঠিক সেরকমই একজন শিক্ষিত মানুষই বোঝে শিক্ষার মর্ম। গবেষণার প্রয়োজনীয়তা। এমনিতে শুনেছি লক্ষ্মীর সঙ্গে সরস্বতীর বনিবনা নেই। বেশ কিছুক্ষেত্রে তার প্রমাণও মেলে কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। লক্ষ্মী আর সরস্বতী একসঙ্গেও থাকে। মার্ক জুকেরবার্গ বা বিল গেটস নয়। আমি যাঁর কথা বলবো তিনি হলেন হেনরি ক্যাভেনডিশ। অকৃতদার ক্যাভেনডিশ তাঁর জীবনের অর্জিত অর্থ ও সম্পত্তি দান করে দেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে। স্থাপিত হয় ক্যাভেনডিশ গবেষণাগার। এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ম্যাক্সওয়্লে। তবে গবেষণাগারকে সেভাবে সাজিয়ে তুলেতে পারেনননি। * ক্যাভেনডিশ গব্ষণাগারকে সাজাতে প্রথমে লর্ড কেলভিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রত্যাখ্যান করেন কেলভিন। এমনকী ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যুর পরও তাঁকে অনুরোধ করা হয়, তখনও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এরমাঝে কিছুদিনের জন্য এসেছিলেন লর্ড র্যালে কিন্তু থাকেননি বেশিদিন, অবশেষে আঠাশ বছরের যুবক জে জে টমসনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ক্যাভেনডিশ অধ্যাপক পদে যোগ দেন তিনি। টমসনের কথায় আসার আগে আরো দু একজনের কথা। বিজ্ঞানী হক্সবী।। কী দেখলেন হক্সবী? দেখলেন কাচের পাত্র থেকে বায়ু বের করে দিলে পাত্রে বায়ুর চাপ বাইরের চাপের চেয়ে ষাটভাগের এক ভাগ হয়। আর এক যদি কোন তড়িত উৎসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে কাচের নলের ভিতর আলোর ফুলকি দেখা যাবে। যেন আকাশের বিদ্যুতকে ঘরে নিয়ে আসা। (অবশ্য বিবাহিত পুরুষ তো আদিকাল থেকেই ঘরে বিদুৎলতা দেখে আসছে। যাকগে) এইসময় অনেকেই মেতেছিল এই কাজে কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন, মাইকেল ফ্যারাডে। মাইকেল ফ্যারাডে আমাদের কাছে খুব পরিচিত নাম। সারা জীবনে অনেক অনেক উল্লেখযোগ্য করেছেন তবে তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজটি হলো তড়িৎবিশ্লেষণ(electrolysis) সূত্র। সাল ১৮৩৩। টমসন তখনও জন্মগ্রহণ করেননি। ফ্যারাডের সঙ্গে আর তিনজনের কথা বলতে হবে। প্রযুক্তিবিদ ও পদার্থবিদ। এক হাইনরিখ গেইজলার, দুই, ড্যানিয়েল রুহমকর্ফ এবং তৃতীয়্জন টমসন রীজ উইলসন। গেইজলার সারাজীবন মেতেছিলেন ভ্যাকুয়াম পাম্প নিয়ে। আগের তুলনায় কত বেশি কাচের নল থেকে বায়ু বের করা যায় এই ছিল তাঁর লক্ষ্য। রুহমকর্ফ লেগেছিলেন তারের কুন্ডলী পাকিয়ে অল্পমানের বিদ্যুৎবিভবকে, উচ্চমানের বিদ্যুৎবিভবে পরিণত করার লক্ষ্যে। আর উইলসন বানিয়েছেন ক্লাউড চেম্বার। এই কাজটি নোবেল পুরস্কার পায়। এইসময়ে অন্যত্র অনেকে এই কাজ নিয়ে মেতে আছে। যেমন ধর জুলিয়াস প্ল্যাকার, ইউজেন গোল্ডস্টেইন ও প্ল্যাকারের ছাত্র স্যার উইলিয়াম ক্রুকস। প্ল্যাকার কাচের নলের দুদিকে ধাতবপাতে বিদ্যুৎ সংযোগ করলেন এবং গেইজলার নির্মিত পাম্প দিয়ে পাত্রের ভিতরের বাতাস বের করতে লাগলেন। দেখলেন, যখন পাত্র প্রায় শূন্য তখন ক্যাথোড পাতের কাছাকাছি জায়গা থেকে সবুজ আলো তৈরী হলো। এবং এও বললেন ক্যাথোড পাতের উপর ক্যাথোড রশ্মির চরিত্র নির্ভর করবে। প্ল্যাকার অবশ্য রশ্মির নাম ক্যাথোড দেননি। ক্যাথোড নামটি দেন ইউজেন গোল্ডস্টেইন। গোল্ডস্টেইন অনেককিছু মানলেন প্ল্যাকারের কিন্তু মানলেন না, ক্যাথোড পাতের উপাদান ও রশ্মির চরিত্র সম্পর্কতি ব্যাখ্যাটি। এদিকে ক্রুকস্ বললেন, এই রশ্মি আসলে নলের মধ্যে আয়নিত গ্যাস অণুর যাত্রাপথ। যেমন খুশি ঘুরে বেড়ায় নলের মধ্যে। গোল্ডস্টেইন ও ক্রুকসের মধ্যে তর্ক লাগলো। ওদিকে জার্মানিতে হাইনরিখ হারৎজ বললেন, এই ক্যাথোড রশ্মি আলোর মতই এক অস্তিত্ব। তরঙ্গায়িত। বুঝতেই পারছিস কী ধুন্দুমার কান্ড চলছে। বিজ্ঞানীরা কোনদিন একে অপরকে এক ইঞ্চি জায়গা দেয়নি। বিস্তর চাটাচাটি, কটুক্তি... (আমাদের চাটাচাটি সেখানে শিশু) এইসময় জনস্টোন স্টোনি এগিয়ে এলেন। ফ্যারাডের সূত্র ধরে তড়িতের একেক খুঁজছিলেন(অর্থাৎ (F=N.e) e কী হবে? স্টোনি যে মানটি দিলেন পরে জানা গেল সেটা সঠিক নয় কিন্তু সেইসময় সেই কাজটি প্রশংসিত হয়েছিল। (* এই প্রসঙ্গে রিচার্ড ফেইনম্যানের কথা মনে এল, একবার একজন সাংবাদিক ফেইনম্যানকে বলেছিলেন, কী মশাই আপনার আজ এই বলছেন তো কালকেই অন্যকথা। কোনটা ঠিক? রসিক ফেইনম্যান হেসে বলেছিলেন যার মানে, দুটোই ঠিক তবে সময় নির্ভর। এখন যতদূর অবধি দেখছি হাতে যা যা পেয়েছি তারমধ্যে থেকেই কার্য-কারণ সম্পর্ক স্থাপন, পরে অন্যকিছু সামনে এলে হয়ত সেই সম্পর্ক বদলে যাবে।) যাকগে তবে স্টোনি আর একটি কাজ করেছিলেন, রাম না জন্মাতেই রামায়ণ বলতে পারিস। তড়িতের এককের একটি শব্দ বা নাম দিলেন। ইলেকট্রন। * এইবার টমসন। ক্যাভেনডিশ গবেষণাগারে যোগ দিয়ে ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে মেতে উঠলেন। তার লক্ষ্য ছিল ক্যাথোড রশ্মিকণার আধান(e) ও ভর(m) এর অনুপাত বের করা। তিনি "ডিসচার্য টিউব"(তড়িৎদ্বার লাগানো পাত্র যার থেকে ক্যাথোড রশ্মি তৈরী হয়)। নানারকম গ্যাস ব্যবহার করলেন। অধান ও ভরের অনুপাত মাপলেন, এবং সীদ্ধান্তে এলেন, ক্যাথোড রশ্মি যে কণা দিয়ে তৈরী, সেই কণা সকল মৌলরেই উপাদান। ওঁর সঙ্গী ছিলেন টাউনসেল্ড ও উইলসন। টমসনের সঙ্গে আরও দুজনের নাম আসবে। এক কাউফম্যান, দুই মিলিকান(এই প্রথম একজন মার্কিন পদার্থবিদ সামনে এল)। মিলিকান বিখ্যাত তাঁর তৈলবিন্দু পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। এসে গেল ইলেকট্রণ। এরই সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীদের একটি চরিত্র না তুলে ধরলে অন্যায় হবে। বিজ্ঞানীরা মানুষ, তাঁদের ভয়ঙ্কর ইগো থাকে, অন্যকে কটাক্ষ করে কিন্তু যখ্ন প্রমাণ নিয়ে কেউ হাজির হয় তখন তাকে স্বাদরে গ্রহণ করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে। একদিন যে ম্যাক ও উইলহেম ওসওয়াল্ডের জন্য বোলৎজম্যান আত্মহত্যা করেছিলেন, সেই ওসওয়াল্ড তাঁর বিখ্যাত বই "আউটলাইনস অফ জেনারেল কেমিস্ট্রিতে" পরমাণু চিন্তা ও ইলেকট্রণকে স্বীকৃতি দেন। ইলেকট্রণ এসে গেল, তাহলে কী হাত পা গুটিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকা! উঁহু বসে থাকা বলে কোন কথা নেই বিজ্ঞানীদের অভিধানে। শুরু হলো। খেলা। ভাঙার খেলা.... এতক্ষণ কোথাও ঈশ্বরের দেখা পাইনি। মনে আসেনি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মনে এল- হে ঈশ্বর তুলে নাও, কাকে ছেড়ে কার কথা বলবো!!! চলি রে, আজকের মত। হয়ত সামনের সপ্তাহে আবার আসবো, দেখি কতদূর কী হয়। ভালো থাকিস। শুভেচ্ছা সহ অরিন্দম --------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৩) ********************* প্রিয় হিমু তা একসময় পরমাণু ছিল পরমাণুতেই। এরপর তাতে ইলেকট্রন পাওয়া গেল। ইলেকট্রনের ভর খুব কম, আধান ঋণাত্মক। সেই থেকে বিজ্ঞানীদের মনে চিন্তা ও প্রশ্ন এল তাহলে ধনাত্মক আধান থাকবে এবং পরমাণুর গঠন ঠিক কী হবে। টমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করার পর সেই নিয়ে ভাবতে লাগলেন ওদিকে সেইসময় ইউজেন গোলড্স্টেইন ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে গবেষণা করতে করতে অ্যানোড পাতটাকে চায়ের ছাকনির মতন ফুটো করে দিলেন, সেই ফুটোর মধ্য দিয়ে একদল ধনাত্মক কণা বেরিয়ে এল। এই শুনে টমসন বললেন, বাহ এটা তো বেশ কেকের মডেলের মতন। কেকে যেমন ছড়িয়ে থাকে পেস্তা সেরকমই পরমাণুতে ছড়িয়ে আছে ইলেকট্রন। বড় কেক হলে বেশি পেস্তা, ছোট হলে কম, সেই নিয়মেই ইলেকট্রনের সংখ্যা বাড়ে, কমে। সেই সময় জাপানি বিজ্ঞানী হান্তারো নাগাওকা বললেন শনির বলয় বা সৌরজগতের কথা ভাবতে। মডেল হিসেবে চমৎকার কিন্তু সে শুধুই কল্পনায় ছিল। প্রমান তখনও হাতে আসেনি। এবার মঞ্চে এলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। মানুষ্টি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। হা`্র্তজ রেডিও তরঙ্গ আবিষ্কার করছেন আবার রেডিও তরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র বানিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ১৮৯৫ সালে রাদারফোর্ড ক্যাভেনডিশ গবেষণাগারে টমসনের অধীনে কাজে যোগ দিলেন। আর সেই ১৮৯৫ সালে উইলহেম কনরাড রন্টজেন এক্স-রশ্মি আবিষ্কার করলেন। ১৯০১ সালে নোবেল লাভ। ঠিক এইসময়ের আশেপাশে হেনরি বেকারেল তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছেন। রাদারফোর্ড এক্স-রশ্মি ও তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেখতে লাগলেন তেজস্ক্রিয় রশ্মির দস্যুকণাগুলো গ্যাসের অণু পরমাণুতে ঠোক্কর মেরে কীভাবে ইলেকট্রন বের করে আনে। বেরিয়ে আসা ইলেকট্রন গুলো কী হয় ইত্যাদি। এরপর রাদারফোর্ডের সহযোগী হলেন উইলহেম গাইগার ও আর্নেস্ট মার্সডেন। খুব পাতলা সোনার পাতের পর্দা ঝুলিয়ে রেডিয়াম থেকে আলফা রশ্মি পাঠালেন... কয়েকদিন পর গাইগার এসে বললেন কয়েকটা আলফা কণা ফেরত আসছে...স্পার্ক খেলে গেল রাদারফোর্ডের মাথায়। একটি লম্বা গবেষণাপত্র লিখলেন, "দি স্ক্যাটারিং অফ আলফা অ্যান্ড বিটা পার্টিকলস বাই ম্যাটার অ্যান্ড দ্য স্ট্রাকচার অফ দি অ্যাটম"। একটি পরমাণুতে নিউক্লিয়াস কোথায় থাকে, ইলেকট্রণ কোথায় থাকে পরিষ্কার করে বোঝালেন। আলফা কণা নিয়ে একটু বেশি পসেসিভ ছিলেন রাদারফোর্ড তাই তাকে মাঝেমাঝে "মাই পার্টিকেল" বলতেন কিন্তু "গড পার্টিকেল" বলেননি। যাই হোক নিউক্লিয়াসকে ঘিরে বনবন করে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রন তো তার ওপর গিয়ে পড়ছেনা, পড়লে কোন অস্তিত্ব থাকতনা, তাই তিনি সৌরজগতের নিয়মের কথা ভেবে বললেন, অপকেন্দ্রিক(Centrifugal) বল ও বৌদ্যুতিক আকর্ষণী বল পরস্পরকে বাতিল করছে।কিন্তু এখানে একটু ত্রুটি ছিল, কারণ তড়িতচুম্বকীয় তত্ত্ব থেকে জানা যায় যে যদি আহিত কণিকা ত্বরণশীল(Accelerated) বা মন্দনশীল(Decelerated) হয় তাহলে তা থেকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিঃসৃত হয়। শক্তি কমে। বেগও। তাহলে এইভাবে শক্তি ও বেগ কমতে কমতে একদিন ওরা নিউক্লিয়াসে এসে পড়বে। কিন্তু সেরকম হচ্ছেনা, সুতরাং নিশ্চয়ই কিছু আছে। এবার মঞ্চে এলেন নীলস বোর। নীলস বোর সংশোধন করেছিলেন রাদারফোর্ডের মডেলটি। এইটুকু বললে একটা বড় অংশ বাদ থাকে। নীলস বোর সংশোধন করতেই পারতেন না যদি না প্রবাদ প্রতিম বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক কোয়ান্টাম সূত্র আবিষ্কার করতেন। আবার বেশকিছুদিন বাদে সেই সূত্রের ওপর কাজ করে তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আলোর দিশা দেখালেন আর এক ভারতীয় নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজটি মাথায় রেখেই এগিয়ে গিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর ফর্মূলা অনেক বড়, অনেক ব্যাপক। এই প্রসঙ্গে বলি বোসন কণার আবিষ্কর্তা সত্যেন্দ্রনাথ নন, আইনস্টাইন। বোসন আসলে কোন কণাই নয়, সে একটি কণাগোষ্ঠী। দেখলি বলতে বলতে কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম। নিশ্চয়ই ভাবছিস সবেত প্রোটন এল, নিউক্লিয়াসের গঠন এল সামনে এরমধ্যেই বোসন... এই এক মুশকিল জানিস। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও কাজকর্ম সমসাময়িক না হলেও, প্রজন্মে প্রজন্মে এত জড়িয়ে থাকে যে কান টানলে মাথা আসার মতন হয়। যে কোন একজনকে নিয়ে পড়তে শুরু কর, নালা-নদী পেরিয়ে সাগরে এসে পৌঁছবি। কিন্তু এইখানে আর একটা কথা বলতে হবে, আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে যত প্রচার পেয়েছেন এবং প্রায়শই কথায় কথায় আমরা আপেক্ষিক তত্ত্বটি লাগিয়ে দিই তার থেকে অনেক কম প্রচার পেয়েছেন সাধারণ জন-মানসে এই উল্লিখিত কাজটির জন্য। এই কাজটির জন্যই ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার পান আইনস্টাইন। যাই হোক ফিরে যাই ১৯১৩ সালে। নীলস বোরের একটা কথা অনেকের মনে ধরলো। তিনি বললেন যে কোন মৌলের রাসায়নিক ধর্ম তার পরমাণুর নানা কক্ষপথে ইলেকট্রন বিন্যাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এও দেখা গেছে কোন মৌলের নানা আইসোটোপ থেকে যখন বিটা রশ্মি বেরোয় তখন এদের গতিবেগ ভিন্ন হয়। কেউ আস্তে, কেউ জোরে। সঙ্গে সঙ্গে মনে প্রশ্ন আসে অনেকের কেন এরকম হয়? বিজ্ঞানে কল্পনা/চিন্তার উল্টোপিঠে প্রশ্ন কী ও কেন। সবসময়। রাদারফোর্ড অনুমান করেছিলেন নিউক্লিয়াসে এমন কণা থাকতে পারে যার ভর প্রোটনের সমান কিন্তু অধান বলতে কিছু নেই। নামও দিয়েছিলেন নিউট্রন। তাঁর ধারনা ছিল একটা প্রোটন আর একটা ইলেকট্রন যোগ হলে একটা নিউট্রন পাওয়া যাবে। রাদারফোর্ড বিগ বস। হাতে তেমন প্রমাণ নেই, সকলে চুপচাপ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা একটু এঁড়ে টাইপ। ভাল কাজ করেছো, প্রশংসা পেয়েছো তা বলে যা বলবে তাই মানবো না, পরখ করে দেখবো। এমনকী প্রিয় শিষ্য হলেও। জেমস স্যাডউইক সেই শিষ্য রাদারফোর্ডের। ফ্রান্সে এইসময় দাপটের সঙ্গে কজ করছে, ফ্রেডরিক জোলিও আর আইরিন জোলিও কুরি। বেরিলিয়াম থেকে নিঃসৃত রশ্মিকে একটি পাতলা মোমের তৈরি দেয়ালের দিকে পাঠিয়েছিলেন ওঁরা। ওঁরা কিন্তু নতুন কণার উল্লেখ করলেন না। কিন্তু ওদের কাজ মন দিয়ে দেখে স্যাডউইক উইলসন ক্লউড চেম্বার নাইট্রোজেনে ভর্তি করে পরীক্ষা শুরু করলেন। বিশদে যাচ্ছিনা। ১৯৩২ সালে নিউট্রন আবিষ্কার হলো। ১৯৩৫ সালে স্যাডউইক নোবেল পেলেন। বিজ্ঞানীরা কেউ কাউকে পাত্তা দেয়না বা কী লেভেলের চাটে সেটা বুঝতে গেলে একটা নমুনা দিই- এতরো ম্যজারানা জোলিও দম্পতি উদ্দেশ্য করে বললেন- "Oh, look at the idiots; they have discovered the neutral proton, and they don't even recognise it" আবার জোলিও দম্পতি মুক্ত মনে অভিনন্দন জানালেন স্যাডউইককে। এইরকম মম্তব্য, নানারকম বাদানুবাদ, প্রমাণ ছাড়া মানবো না বা বিগ বস হলেও মুখের ওপর অন্য কথা বলবো কিন্তু প্রমান পেলে সঙ্গে সঙ্গে বুকে টেনে নেবো, এসবই হলো প্রকৃত যুক্তিবাদীর চরিত্র। বিজ্ঞানীদের চরিত্র। ধর্মীয় পান্ডাদের মধ্যে বা ধর্মীয় গুরুদের অনুগামীদের মধ্যে এরকম দেখিনা। কেন কে জানে!!! বিস্ময় আছে কিন্তু প্রশ্ন নেই কারন প্রচলিত ধর্ম ও ঈশ্বর ভাবনার মধ্যে যা আছে তা শুধুই বিশ্বাস। জাস্ট বিশ্বাস। যাকে আমি অন্ধ বিশ্বাস বলি। শেষের কথাগুলো হয়ত শেষেই বলতাম কিন্তু কী জানিস এটাতো চিঠি, তাই লিখতে লিখতে কোথায় একটা রাগ জন্মায়। মনে হয় এই জিনিয়াস লোকগুলোর দিনরাত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করাকে কত সহজে আমরা ইশ্বরের লীলাখেলা বলে চালিয়ে দিই। যাকগে আরও কিছু বলার আছে যেরকম ধর কোন কণা কে জোরে ধাক্কা মারতে চাইছি তা সেতো হাত দিয়ে মারা যাবেনা(ঈশ্বরের হাত কোথায় কে জানে!) তাই অ্যাকসেলারেটর যন্ত্রের কথা বলতে হবে। বলবো পরের সপ্তাহে। আজ আসি। ভালো থাকিস অরিন্দম -------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৪) ----------- প্রিয় হিমু ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর দেখা দিয়েছেন সে সম্পর্কে কোন প্রমাণিত তথ্য হাতে নেই কিন্তু ১৯৩২ সালের মধ্যে আমাদের সামনে বিজ্ঞানীরা নিয়ে এলেন ইলেকট্রন-প্রোটন- নিউট্রন কে। পরমাণুর গঠনের চিত্রও সামনে এল। পল ডিরাক একজন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে এক মালায় গাঁথার কাজ করছিলেন, করতে করতে তিনি ধারনা করলেন এমন একটি কণা আছে যার ভর ইলেকট্রনের মতনই কিন্তু আধান ধনাত্মক। অ্যান্টি ইলেকট্রন। শুনতে কেমন লাগল, বদলে বললে পজিট্রন। কিন্তু শুধু বললেই হবেনা, দেখাতো পেতে হবে। এগিয়ে এলেন কার্ল অ্যান্ডারসন। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে কাজ করছিলেন। এই রশ্মিকে ক্লাউড চেম্বারে পাঠিয়ে আয়নিত কণার আলোকচিত্র গ্রহণ করলেন। পরীক্ষার জন্য চেম্বারের মাঝামাঝি সীসার টুকরো বসিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকে যে কণা পাওয়া গেল তারা আধানে ধনাত্মক এবং ভর ইলেকট্রনের সমান। প্রথমে ভেবেছিলেন নাম দেবেন পজিটিভ ইলেকট্রন কিন্তু সেটা ভাল শোনাল না। খুবই স্বাভাবিক সুনীলের পাশে এক অ-কবি থাকতেই পারে কিন্তু তাকে কুনীল বলাটা সঙ্গত নয়। সুতরাং নাম রইল পজিট্রন। তবে এই কণা সচারচর দেখা যায়না, মহাজাগতিক রশ্মিতে ধরা পড়ে, সুপারনোভাতে দেখা যায়। পুন্ডরীকাক্ষ পুরকায়স্থ কে মনে আছে? ছদ্মবেশে এসেছিলেন, এবং ছদ্মবেশেই নিজের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম করতে করতে গাড়িতে বসা এক শিশু কন্যাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ক্ষুদ্র বলিয়া উহাকে অবহেলা করিবেন না... কণাদের মধ্যে এইরকম একজন ফোটন, আইনস্টাইন যাকে ক্ষুদ্র বলে অবহেলা করেননি। অল্প কথায় বলতে গেলে বলবো, তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস যদি কালে ভদ্রে বিটা কণা নিঃসরণ করে এবং পজিট্রন আর ইলেকট্রন একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়লে ,ফোটন কে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বারেবারে একই ঘটনা ঘটেছে, যেরকম ধর জোলিও দম্পতি চিনতেই পারেনি নিউট্রনকে ঠিক সেইরকম চিনেও ঠিক সময়ে পজিট্রনের কথা সামনে আনতে পারেননি, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট। সেইকথা "কেমব্রিজ ফিজিক্স ইন থার্টিস"-এ বলেছিলেন অ্যান্ডার্সন নিজেই। তবে জোলিও দম্পতির সঙ্গে একটু অমিল ওঁরা খেলায় করেনি আর ব্ল্যাকেট একদম সিওর হতে একটু(!!) বেশি সময় নিয়ে নিলেন। সময় বয়ে যায়, সে অপেক্ষা করবেনা কারুর জন্য... সহজ করে বললে পজিট্রন(অ্যান্টিইলেকট্রন) পেলাম তাহলে অ্যান্টিপ্রোটন ও থাকবে নিশ্চয়ই? সাপ থাকলে বেজি থাকবে এবং এদের চোখে দেখা যায় কিন্তু কণাদের তো খালি চোখে দেখা যাবেনা। এইখানে দরকার পড়ল, কণিকা ত্বরণ যন্ত্র(কেউ কেউ ত্বরক যন্ত্র বলে) বা অ্যাকসেলারেটরের। এ্মনিতে আমারা খালি চোখে যা দেখি, তাতে দেখি রসায়নবিদরা নানা রঙের তরল এতে ওতে মিশিয়ে একটা নতুন কিছু তৈরী করছে। রাসায়নিক বিক্রিয়া বলি, কিন্তু কণা পদার্থবিদরা যখন পরীক্ষানিরীক্ষা করে তখন তাঁদের নজর নিউক্লিয়াসের দিকে। নিউক্লিয়াসকে ধাক্কা মেরে ভাঙতে হবে সুতরাং শক্তির প্রয়োজন। গতিবেগ বাড়াতে হবে কণাদের সুতরাং তৈরী হলো অ্যাকসেলারেটর। প্রথম অ্যাকসেলারেটর যন্ত্র তৈরি করেছিলেন নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট লরেন্স। ওঁর সঙ্গে ছিলেন মিলটন স্ট্যানলি ও লিভিংস্টোন। অ্যাকসেলারেটরকে মূলত তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, এবং ভাগটা মূলত নির্ধারিত হয় কীভাবে কণারা শক্তি অর্জন করবে এবং কোন পথে , তার সঙ্গেই যুক্ত অ্যাকসেলারেটরের গঠন বৈশিষ্ট্য... ১) এক ধাপে শক্তি অর্জন ও সরলরেখায় গমন করে এমন যন্ত্র- কক্রফ্ট-ওয়াল-টন বিভব পরিবর্ধক(Voltage multiplier) যন্ত্র বা ভ্যান-ডে-গ্রাফ উৎপাদক(Van de Graaff generator) শ্রেণীর অন্তর্গত। ২) ধাপে ধাপে শক্তি অর্জন করে কিন্তু সরলরেখায় চলে রৈখিক ত্বরণযন্ত্র(Linear accelerator) ৩) ধাপে ধাপে শক্তি অর্জন করে হয় সর্পিল(Spiral) বা বৃত্তাকার(Circular)। সাইক্লোট্রন, বীটাট্রন, সিংক্রোট্রন প্রভৃতি যন্ত্র এই শ্রেণীর অন্তর্গত। অ্যাকসেলারেটর নিয়ে খুব বিশদে বলে লাভ নেই। লাভ লোকসান অবশ্য অন্য কথা, আমার পক্ষে বলা অসম্ভব। শুধু বলতে পারি ১৯৩১ সালে বার্কলে থেকে শুরু হয়ে, গতিশক্তি ১.০ MeV থেকে ২০০৮ অবধি সার্নে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের গতিশক্তি ২.৭৬ TeV (* একদম নীচে একটা লিংক দেব, সেখান থেকে eV, MeV, GeV, TeVর সম্পর্ক গুলো খুঁজে পাবি) বিশুদ্ধ ও ফলিত বিজ্ঞান কীরকম হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে দেখছিস। যাকগে, আবার ফিরে যাই অ্যান্টিপ্রোটন আবিষ্কারের কথায়। বিভাট্রন নামক অ্যাকসেলারেটর নিয়ে কাজ শুরু হলো। প্রোটোন কণাকে ৬.২ GeV দিয়ে উত্তেজিত করে লক্ষ্যবস্তু তামার নিউক্লিয়াসে ছুঁড়ে মারা হলো। সেই উত্তেজিত প্রোটন তামার নিউক্লিয়াসের কোনো এক নিউট্রনকে ছিঁড়ে দুটুকরো করে দিল। একটা চেনা প্রোট্ন অন্যটি অ্যান্টিপ্রোটন। অ্যান্টিপ্রোটনের আবিষ্কর্তা এমিলিও সেগ্রে। ওঁর সঙ্গে ছিলেন ওয়েন চেম্বারলেন, ১৯৫৯ সালে এই কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার পান দুজনেই। বাড়িতে দেখবি অধিকাংশ সময় মেয়েরা কেস খায়। অন্যদের রাগ-তেজ ঝড়-ঝাপটা তাদের ওপর দিয়ে যায়, মেয়েরা সংসারের নিউক্লিয়াস। ঠিক সেরকমই পরমাণু যখন তেজস্ক্রিয়তা দেখায় সব চোটপাট নিউক্লিয়াসের ওপর দিয়ে যায়। নিউক্লিয়াসে প্রোটন নিউট্রন থাকে কিন্তু মাঝে মাঝে বেরোয় ইলেকট্রন। আসলে বেরোয় নিউট্রন ভেঙে। নিউট্রন ভেঙে একটা ইলেকট্রন ও একটা প্রোটন। কিন্তু যা বলবে বা ভাববে তাই মেনে নেবেনা বিজ্ঞানীরা। একটা ইলেকট্রন ও একটা প্রোটন বেরোল সুতরাং আধানের পরিবর্তন হলোনা কিন্তু দেখা গেল ভরবেগের পরিবর্তন হচ্ছে, সুতরাং আর কেই আছে। পাউলি বললেন আর একটি কণা অ্যান্টি ইলেকট্রন নিউট্রিনো বা নিউট্রিনো। আবার সেই রাম না জন্মাতেই রামায়্ণ (মনে পড়ছে পর্ব ২তে ইলেকট্রন নামকরণ প্রসঙ্গে বলেছিলাম কথাটা)। অবশেষে অপেক্ষা করতে হলো ১৯৫৬ সাল অবধি। বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক রেইনস্স আর ক্লাউড কাউয়ানের পরিশ্রম সমফল হলো। পাউলিং-এর অনুমান ও তাত্ত্বিক গবেষণা সঠিক প্রমানিত হলো। আর নিউট্রিনো না থাকলে এনরিক ফার্মি বিটা নিঃসরণের তত্ত্বই তৈরি করতে পারতেন না। বিজ্ঞানে অনুমান/ কল্পনা প্রথমে আসে কিন্তু প্রমান না হাতে এল সেই নিয়ে স্পষ্ট মত কেউ দেয়না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গ্রেভিটন কণার কথা। এর দেখা এখনো পাওয়া যায়নি। কথায় বলে, যদি হয় সুজন তেঁতুল পাতায় ন-জন... তা মানুষের ক্ষেত্রে এই কথা খাটে কিন্তু পরমাণুর জন্য? ছোট্ট নিউক্লিয়াসে একগাদা প্রোটন আর নিউট্রন কী করে থাকে? কী সেই আকর্ষণ? বিজ্ঞানী হিদেকি য়ুকাওয়া এই নিয়ে ভাবতে শুর করলেন। মহাকর্ষ বল না তড়িৎজনিত বিকর্ষণ বল কে বেশি? তা গননা করে এক তীব্র বলের সন্ধান পেলেন। অতীতে আমরা দেখেছি তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের কিছু আচার আচরনের জন্য আইনস্টাইন ফোটন কণাকে কাজে লাগিয়েছিলেন, এবারো প্রাথমিকভাবে তাই হলো য়ুকাওয়া একটি কণার সংযোজন করলেন, নাম দিলেন মেসন। মেসন কথার অর্থ মাঝারি। এই নতুন কণার ভর ইলেকট্রনের চেয়ে বেশি কিন্তু প্রোটনের চেয়ে কম। হিসেব কষে দেখা গেল ইলেকট্রনের চেয়ে ২৭৬ গুণ ভারী এই মেসন। জীবনকাল ১/১০০০০০০ সেকেন্ড। বললেন কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণ? লেগে গেল প্রায় ১০ বছর। এগিয়ে এলেন বিজ্ঞানী সেসিল ফ্র্যাঙ্ক পাওয়েল। পাওয়েলের গবেষণা গুরু ছিলেন উইলসন। তাঁর অধীনে কাজ করতে করতে ক্লাউড চেম্বারে কণা সনাক্তকরনে আলোকচিত্রের সার্থ্ক ব্যবহার উদ্ভাবন করেন। আর তা থেকেই পাওয়েল যে কণা পেলেন তা ইলেকট্রনের চেয়ে ২৭৬ গুণ ভারী। সুতরাং য়ুকাওয়ার অনুমান সত্যি বলে প্রমাণিত হলো। ভারী মেসন কণার নাম দিলেন পাই-মেসন আর হালকার নাম দিলেন মিউ-মেসন। এদেরকে যথাক্রমে পাইয়ন ও মিউয়ন বলে ডাকা হয়। ১৯৫০ সালে পাওয়েল নোবেল পুরস্কার পান। তাহলে এখন আমাদের হাতে এসে গেল অনেকগুলো কণা এবং চারটি বল, যথাক্রমে- মহাকর্ষীয় বল, তড়িৎচুম্বকীয় বল, তীব্র বল আর দুর্বল বল। এই তীব্র বলের জন্যই প্রোটন ও নিউট্রন ১/১০০০০০০০০০০০০০ সেমি সাইজের মধ্যে আটকে থাকে। এই যে এতখানি পথ পরিক্রমা কোন মিরাকেল চোখে পড়লো? কোথাও ঈশ্বরের হাত? উঁহু। তাহলে আর একটু এগিয়ে দেখতে হবে। দেখবো পরের সপ্তাহে। আজ আসি। ভালো থাকিস। আরিন্দম পুঃ- ও যে লিংকটার কথা বলেছিলাম, সেটা এখানে থাকল- http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/electric/ev.html --------------------------------------------------------------------------------------- আমাদের চারপাশে কণাদের কথা(৫) ----------- প্রিয় হিমু আমাদের চারপাশে চার রকম বল আর অনেকগুলো কণা। এ যেন এক হট্টগোলের মেলা। নতুন ক্ণা হাতে এলে নতুন নামও দিতে হবে। সেইরকম আসতে লাগল হ্যাড্রন, লেপ্টন, কোয়ার্ক। কণা সামনে এল। নাম দিলাম। এবার নাম যত বাড়বে গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিস্তর, তখন কণাদের মধ্যে পরিবার বা গোষ্ঠী নিয়ে ভাবনার সূত্রপাত হলো। এখন বৈশিষ্ট্য কিছু থাকতে হবে যা দেখে কোন কণা কোন গোষ্ঠীর বা পরিবারের অন্তর্গত তা বোঝা যায়। হ্যাড্রন এখন যারা তীব্র বলের কথা শুনে চলে, অর্থাৎ নিয়্ন্ত্রাধীন হয় তারাই হ্যাড্রন। যেরকম, নিউট্রন, প্রোটন। ইলেকট্রন শোনেনা। নিউট্রোনো ও না। সুতরাং ওরা হ্যাড্রন নয়। দিনে দিনে নানারকম হ্যাড্রনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। নামকরনের জন্য গ্রীক বর্ণের সাহায্য নিতে হচ্ছে। পাইয়ন, ক্যায়ন, প্রোটন, নিউট্রন, ল্যামডা, সিগমা, জাই ও ওমেগা এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। লেপ্টন ১৯৭৫ সালে রৈখিক ত্বরণযন্ত্র (Linear accelerator) মার্টিন পল ও কয়েকজন বিজ্ঞানী একটা নতুন কণার খোঁজ পেলেন। মিউয়নের চেয়ে সতেরোগুণ ভারী। এর নাম হল টাওয়ন। ইলেকট্রন, মিউয়ন, টাওয়ন এবং প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত হলো নিউট্রিনো। অর্থাৎ ইলেকট্রন-নিউট্রিনো, মিউয়ন-নিউট্রিনো ও টাওয়ন-নিউট্রিনো। মোট ছয় জন মিলে লেপ্টন পরিবার। কোয়ার্ক ১৯৬১ সালের কথা, জর্জ জোয়াইগ ও মুরে গেলম্যান হ্যাড্রনদের গঠন নিয়ে গবেষণাপত্র লিখলেন। ওরা বললেন সব হ্যাড্রনই যে জিনিস দিয়ে তৈরি তা হলো কোয়ার্ক। কোয়ার্ক নামটা কেন দিয়েছিলেন গেলম্যান? কথিত আছে তিনি ছিলেন একজন পাখি প্রেমিক(বিজ্ঞানীরা মানুষ সুতরাং গবেষণার বাইরেও তাঁদের নানারকম শখ থাকে)। কোয়ার্ক হলো একরকমের পাখির ডাক। তাত্ত্বিক প্রমাণের পাশাপাশি পরীক্ষালব্দ্ধ প্রমাণের প্রয়োজন হয়। সেকথা মাথায় রেখেই স্ট্যানফোর্ডের কণা ত্বরণযন্ত্রের তৈরী হলো। সেই যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ হলো এ "মানস-কণা" নয়। সত্যি সত্যিই সে হ্যাড্রনে আছে। এরপর চললো কোয়ার্ক নিয়ে আরো কাজ। এবং কোয়ার্কের রঙের সঙ্গে রঙ বদলের কারণও এলও সামনে। এবং ইলেকট্রণের ঠিকাণা শুধু কক্ষপথের নম্বর দিলে সম্পূর্ণ হবেনা তার সঙ্গে কোয়ান্টাম সংখ্যা বা (n,l,m o s) ও দিতে হবে। মেলাবেন তিনি মেলাবেন, এই সব ধারণা নিয়ে বিজ্ঞানী মহল বসে থাকেনা, থাকেনি কোনদিন, আবার পাশাপাশি এও সত্যি একদম উদাসীন ছিলেন না বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানে পসিবিলিটি বা সম্ভাবনা খুব দামী কথা। বিজ্ঞানীরা প্রথমে মহাকর্ষীয় বলকে সরিয়ে রাখলেন। হাতে রইল তিন বল, তড়িতচুম্বকীয়, তীব্র ও দুর্বল। কণা ত্বরণযন্ত্রের জোর বাড়াতে হবে। সুতরাং চলল সেই নিয়ে কাজ। যত সহজে বাড়ানোর কথা লিখছি বা পড়তে পড়তে ভাবছিস, বিষয়টি ঠিক তার উল্টো। অ্যাকসেলারেটর নিয়ে একটু পড়লেই বুঝতে পারবি। এখন এই বলদের মেলানোর জন্য বিজ্ঞানীরা যে তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছেন তার নাম সুপার্স্ট্রিং থিওরি। একে অনেক থিওরি অফ এভরিথিং ও বলে। আবার কণাবিজ্ঞানীরা কোয়ার্ক আবিষ্কারের পর থেকই মত্ত একটি স্ট্যান্ডার্ড মডেল খুঁজে পেতে। বিজ্ঞানীরা বললেন মৌলকণাদের রয়েছে দুই ভাগ। বোসন ও ফার্মিয়ন। মোটামুটি ভাবে বোস-আইনস্টাইন থিওরি মেনে চললে তাদের বোসন বলবো আর যারা ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান থিওরি মেনে চলের তাদের ফার্মিয়ান। ব্যতিক্রম আছে, সেতো থাকেই। যাকগে, এবার এগিয়ে এলেন পিটার হিগস। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক জায়গায় তিনি এক বিচিত্র বোসন কণার সন্ধান দিলেন। সেই ১৯৬৪ সালে আর দুজন বিজ্ঞানী রবার্ট ব্রাউট আর ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ট ও লিখলেন গবেষণাপত্র। মজার কথা আমরা যাকে আজ হিগস-বোসন বলি পিটার হিগস তাকে বারবার "স্কেলার বোসন" বলে অভিহিত করতে চেয়েছিলেন। মিতভাষী বিজ্ঞানী নিজের নামটি জড়াতে চাননি কোনদিন। এদিকে অ্যাকসেলারেটারের উন্নতি চলছে অবশেষে ২০০৮ সালে সার্ন(ইউরোপীয়ান অর্গানাইজেশান ফর নিউক্লিয়ার রি্সার্চ) একটি যন্ত্র খাড়া করল, নাম লার্জ হ্যান্ড্রন কলাইডার। এই যন্ত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় কণাদের মধ্যে। তবে কয়েকলক্ষ পাঠালে হয়ত দু-চারটে সেই দুর্ঘটনায় পড়ে। এই যন্ত্রের জন্য পৃথিবীতে সাতভাগে ভাগ হয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন। সুতরাং এর কথা কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ শব্দে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যাপক কর্ম-কান্ডটি একটু খুঁজলেই বুঝতে পারবি। এরপর ২০১১ সালের ২৪মে বিজ্ঞানীরা জানালেন, "কোয়ার্ক-গ্লুয়ন-প্লাজমার" অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কৃষ্ণ গহ্বরের মতোই তার খুব বেশি ঘনত্ব। বিগ ব্যাং থিওরির স্বপক্ষে একটি যুৎসই প্রমাণ হাতে এল। তরপর ২০১২, ৪ঠা জুলাই, ঘোষণা করা হলো ১২৫-১২৬ MeV ভরের হিগস-বোসন কণার অস্তিত্ব। তবে এই পরীক্ষা যেরকম সময় সাপেক্ষ ঠিক সেইরকম ব্যয় সাপেক্ষ তাই আর পাঁচটা পরীক্ষার মতন কয়েকবার করে ফেলা সম্ভব নয়, সুতরাং কাজ চলছে, একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলবার মতন অবস্থায় যেতে। এইভাবে হয়ত একদিন ধীরে ধীরে পৃথিবীর উৎস সৃষ্টির রহস্যের উন্মোচন করবেন বিজ্ঞানীরা। একটি বিন্দুতে মিলবেন। যবে করবেন তখন তাঁরা সামনে নিয়ে আসবেন কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যা সামনে নিয়ে এসেছেন তাও কিছু কম নয়। বিজ্ঞানীরাই পেরেছেন আর কাউকে(কোন ধর্মীয় গুরুকে) তো দেখলাম না। বিজ্ঞান আছে বিজ্ঞানের জগতে কিন্তু ঈশ্বর ও মানুষ ? বিজ্ঞানের জগত, যুক্তিবাদের, তার ভাষা অঙ্ক কিন্তু ঈশ্বরের জগত? সে বড় গোলমেলে, তারচেয়ে মানুষের জগত আপাত দৃষ্টিতে সহজ হলেও নিহিতার্থে জটিল, না হলে দশচক্রে ঈশ্বর কণা হয়!!! হয়েছিল যে ভাবে- বিজ্ঞানী লিও লেডারম্যান। নোবেলজয়ী। ১৯৯৩ সালে একটি বইয়ের পান্ডুলিপি নিয়ে জান প্রকাশকের কাছে। বইয়ের নাম দিয়েছিলেন- দি গড পার্টিকেলঃ ইফ দি ইউনিভার্স ইজ দি আন্সার, হোয়াট ইজ দ্য কোশ্চেন?" প্রকাশকের সায় নেই। কারণ এটি একটি তির্যক মন্তব্য, "ঈশ্বরকণা বুঝতে যদি গোটা বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের দরকার হয়, তাহলে হে ঈশ্বর তোমার প্রয়োজন কোথায়?" প্রকাশক নাছোড়। বললেন "দি গড পার্টিকেল" দিলে মন্দ হয়না, লোকে বুঝবে(পড় খাবে)। রেগে গিয়ে লেডারম্যান বললেন, তাহলে "গডড্যাম পার্টিকেল" দিন। মা-কালী লজ্জায় আবার জিভ কেটেছিলেন কিনা জানা নেই(অবশ্য সারা পৃথিবীতে ঈশ্বর বিশ্বাসীরা এতবার তাকে লজ্জায় ফেলেছে হয়ত জিভটাই নেই আর) তবে বিপদ বুঝে প্রকাশক জিভ কেটে বলেছিলেন, এহেন নাম রাখা যাবেনা। বিজ্ঞানী পিটার হিগসকে এই প্রশ্ন করা হলে, বিনয়ী হিগস বলেছিলেন- অস্বস্তিকর। বড় অস্বস্তিকর এইসব নাম। আমি নিরশ্বরবাদী, আমার কথা ছেড়ে দিন। যারা বিশ্বাস রাখেন ঈশ্বরে, তারা নামের অপব্যবহার দেখে কেমন দুঃখ পাবেন সে কথাটাই ভাবছি।" হকিং সাহেব বলেছেন- ধর্ম আর বিজ্ঞানে একটা স্পষ্ট ভাগ রয়েছে। ধর্মে রয়েছে একজন সর্বময় কর্তা। বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সবাই হকিং সাহেব হয়না, ওরকম মনের জোর কম লোকের হয় নইলে এইরকম শরীর নিয়েও একজন বলতে পারে- সায়েন্স মেক গড আননেসেসারি... প্রয়োজন অপ্রয়োজন সরিয়ে রেখে একটু যুক্তি দিয়ে কি ভাববো না আমরা? এখনও কী সময় আসেনি, মুক্ত কন্ঠে উচ্চারণ করার- জয় বিজ্ঞান(নিছক স্লোগান নয়)। --- যাকগে এবার অন্যকথা- ১। এটা কোন লেখা নয়, মানে মৌলিক লেখা নয়। বিভিন্ন বই থেকে ন্যানোতম অংশ তুলে নেওয়া। একটা আউটলাইন। যে কোন নাম, সে কণা হউক বা বিজ্ঞানী, খুঁজে নাও আন্তর্জালে। এগিয়ে চলো। বিস্ময় ও ভালবাসাধনায় খুঁজতে থাক মনের মধ্যে আসা প্রশ্নের উত্তর। তবে সেই প্রশ্ন-উত্তর যেন এরকম না হয়- কে বলেছে ঈশ্বরকে দেখা যায়না? -মহাভারত ও ব্যামাক্ষ্যাপা সিরিয়ালে কোটি কোটি ভারতবাসী দেখেছে(সৌজন্যে সৈকত বন্দোপাধ্যায় রবিবাসরীয় আবাপ) চলিরে। ভালো থাকিস। অরিন্দম ------------- ঋণস্বীকার - শরদীয়া প্রতিদিন- পলাশ বরন পাল, অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তীর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ও না ঈশ্বরকণা নির্বাচিত রচনা সংকলন, অভী দত্ত মজুমদার তথ্য সংগ্রহ- পরমাণু ও কেন্দ্রক গঠন পরিচয়- ডঃ সমরেন্দ্র নাথ ঘোষাল পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষা / দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী Atomic physics and human knowledge/ Niels Bohr Thirty years that shook physics: story of quantum theory/ George Gamow

2397

13

প্রবুদ্ধ

তাত্ত্বিক ব্লগ

দীপঙ্করদা /মনোজদা‚ একটা সরল প্রশ্ন| চীনকে নিয়ে সমালোচনা করা যাবে এটা নিয়ে আশাকরি তোমাদের কোনো আপত্তি নেই| যদি সমালোচনা করতেই হয়‚ তাতে আমেরিকাকে আনা কি বাধ্যতামূলক? যেমন হিউম্যান রাইটস ইস্যু| এখানে চীন যদি ইউঘুরদের ওপর এথনিক ক্লেনজিং চালায়‚ চালাচ্ছে এটা তো অস্বীকার করা জাবে না‚ সেটা একটা standalone ঘটনা| নিন্দনীয় ঘটনা| ফোকাসটা সেখানে| ফ্রান্স কেন সিরিয়াতে বোমা ফেলছে সেটার সাথে কি এর সম্পর্ক আছে? মনে হয় না| এর মধ্যে কোনটা বেশী ধংসাত্মক‚ সেটাও তুলনা করা অর্থহীন| এটা কিন্তু আমার যুক্তি নয়‚ সেন সাহেবেরই যুক্তি| উনি যখন আলোচনা করছেন ভারত কোথায় কোথায় চীন থেকে শিক্ষা নিতে পারে‚ এবং কোথায় কোথায় চীন থেকে পিছিয়ে আছে (ওঁর দুটো বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম এই রকমই)| সেখানে উনি সেই stats গুলো ব্যবহার করেছেন যেটা ওঁর লেখার সাথে সাযুজ্য রেখে চলবে| তাই উনি চীনের authoritarian সরকাররের সমালোচনায় যাননি‚ গেলে লেখার ফোকাসটা নড়ে যেতো| দুই| চীন কোথায় কোথায় এগিয়েছে সেটা সেন সাহেবের লেখা থেকে ইন্টারনেট‚ সর্বত্র প্রতিফলিত| দীপঙ্করদা এখানে কিন্তু যে যে ডেটা দিচ্ছো সেগুলো সবই প্রথম বিশ্বের ওয়েবসাইট থেকেই নেওয়া(ধরে নেওয়া জায় আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইটও তার মধ্যে আছে)| সে ডেটার sanctity আছে‚ কারণ ওয়েবসাইটগুলোর চালক সবই দাইয়িত্বশীল সংস্থান| কিন্তু চীনের ভেতর কোথায় কোথায় সমস্যা হচ্ছে‚ সেটা তো চীন-সরকার-নিয়ন্ত্রিত CCTV-4 দেখাবে না| আমেরিকা কিন্তু তার দেশের ভেতর কোনো ঘাপলা হলে সেটা প্রকাশ করে‚ চীনের মতো লুকিয়ে রাখে না| এক্জন সাংবাদিক আমেরিকা গিয়ে জেভাবে তথ্য সংগ্র করতে পারে‚ চীনে পারবে কি? কেন এই লুকোচুরি? আয়রন কার্টেন থিওরী কেন কম্যুনিস্ট সরকারের সাথে সমার্থক? তিন| যেহেতু আমি নিজেই লেবার মার্কেটের সাথে সরাসরি জড়িয়ে আছি‚ চীনের লেবার মার্কেটের খবর নেওয়াটা খুব কঠিন কাজ নয়‚ আর অ্যানালিসিস করাও সহজ| তোমাদের মন:পুত হচ্ছে না ঠিকই‚ কিন্তু গ্রাম থেকে শহরে আসা "মাইগ্র্যান্ট".লেবার ও তাদের জন্য হুকৌ সিস্টেম‚ এর ভয়াবহতা অস্বীকার কোরো না| আরো খোঁজখবর নাও| মিনিমাম ওয়েজ দিয়ে যদি বিচার করতে চাও তো দেখো‚ প্রতি ঘন্টার মিনিমাম ওয়েজের তুলনা (এটা ২০১১-এর হিসেব‚ মিনিমাম ওয়েজ বছরে ১০-১৫% করে বাড়ে সব দেশেই| আর ভারতের মতো চীনেও অঞ্চলভিত্তিক মিনিমাম ওয়েজ হয়‚ আমি গড়টা নিয়েছি):. (In USD) চীন-2.12 চীনের প্রতিযোগী দেশগুলির হিসেব: জাপান 6.54 দ: কোরিয়া 5.1 গাল্ফ দেশ 4.5 ইওরোপ (ENG/GER) দশ ডলারের বেশী আমেরিকা 7.25 ভারতের ক্ষেত্রে এটা এতো কম (এক ডলারেরও কম) যে বলতে লজ্জা হয়| প্রতি মাসে ওয়ার্কারদের স্যালারি রিলিজ করার সময় আরো লজ্জা হয়| কব-ডগলাস ফর্মুলা ধরলে আয় = technology * sqroot (capital) * sqroot (labour)| এখানে সস্তা লেবার দিয়ে চীনের আয় কতো বাড়ছে আনুপাতিক হিসেব কোরো| দেশটার জনসংখ্যা দেখো‚ লেবার কেন সস্তা এক কথায় উত্তর বেরিয়ে আসবে| তার উপর গোটা দেশে একতাই ত্রেড ইউনিয়ন‚ সেটাও সরকার-নিয়ন্ত্রিত| এটা কি খুব হেল্দি একটা তত্ত্ব‚ মনোজ দা? সস্তা ও লো-কোয়ালিটি প্রোডাক্টের প্রধান কারন যদি এই undervalued labor হয় তো বাকী কারণগুলো হলো: ১| অতি নিকৃষ্ট কোয়ালিটি কন্ট্রোল পলিসি ২| কোনো after-sales service নেই| কেনো আর ফেলে দাও| এই সার্ভিস দিতে ভালো কোম্পানীগুলো কতো পয়সা খরচ করে আমরা জানি ৩| কোনো ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট নেই| চীন সারা পৃথিবীর যেকোনো ডিজাইন কপি করতে পারে| কেউ সেদেশে ঢুকে তার মাথার একটা চুলও ছিঁড়তে পারবে না|উদাহরণ হন্ডা বাইকের হুবহু চীনা কপি| পেটেন্টের খরচটা কতটা বেঁচে গেলো ৪| ৫০‚০০০ ইউনিট বানিয়ে ২০‚০০০ দেখানো| দেদার ট্যাক্স ফাঁকি| যেহেতু বাকী ৩০‚০০০০ ইউনিট পুরোটাই বিক্রী হয়ে যাচ্ছে‚ সেই ট্যাক্স থেকেই সরকারের পুষিয়ে যাচ্ছে| তার উপর ওদেশে শুধু VAT আছে‚ মানে কোনো ভ্যালু অ্যাড না হলে ট্যাক্স দিতে হয় না| এটা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার বিশাল একটা লুপহোল| ৫| মার্কেটিং-এর পেছনে কোনো খরচ নেই| ৬| ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো importer চাইনীজ মাল রিজেক্ট করলেও চীনা সাপ্লায়ারকে কিস্যু করতে পারবে না| ৭| কোনো HSE রেগুলেশন নেই| চীনা মোবাইলে SAR value কোনোদিন দেখতে পাবে না| ৮| ডলারের তুলনায় ইউয়ানের আন্ডারভাল্যু‚ যাকে কারেন্সী ম্যানিপুলেশন বলে| ইউয়ান ডলারের তুলনায় ৩০-৪০% undervalued| অর্থাৎ সিধা সিধা ৩০-৪০% কম খরচ| ৯| ডাম্পিং| ধরা জাক ভারতে চীন তালা এক্সপোর্ট করবে| আগে দেখে নেবে আলিগড়ে কতো তালা তৈরী হয় ও তার দাম কতো| এবার তার দ্বিগুণ সংখ্যক তালা অর্ধেক দামে ভারতে ডাম্প করবে| এই ডাম্পিং পলিসির বিপজ্জনক ট্রেন্ড তো আমরা ভারতীয় মার্কেটে দেখতেই পাচ্ছি| অথচ‚ তোমাদের ঐ আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত WTO কিন্তু ডাম্পিং নিয়ে কিছু বলে না‚ ভারতের মতো গরীব দেশে করলই বা ডাম্পিং| আমেরিকা ৫০ টার মতো প্রোডাক্ট anti-dumping policy দিয়ে চীনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে| একটু খোঁজ নিও এই প্রোডাক্টগুলো নিয়ে কিভাবে ভরতের মার্কেটে চীন ঝাঁপিয়ে পড়েছে: Steel fence posts, iron pipe fittings, aluminum extrusions, tires, hand trucks, ironing tables, wooden bedroom furniture, and paper products. এর কিছু counter-logic-ও আছে| সেটা পরে বলবো|

1259

6

সুভাষ

রূপান্তরী -- মুখবন্ধ

আমি চিরকালই গান-বাজনার ভক্ত। ১৯৬২ সালের উচ্চ মাধ্যমিকে পেলাম National Scholarship, তার প্রথম কিস্তি পেয়েই চুপিচুপি একটি (4-speed) record player কিনলাম, সাথে দুটি 78 rpm গালার রেকর্ড – Billy Vaughn-এর “Come September / Berlin Melody” ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “তারা ঝিলমিল / মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা”। অমতে কেনার জন্য বাড়িতে সবাই বকাঝকা করল কিন্তু একমাত্র সন্তান হওয়ার সুবাদে রেহাই পেলাম। সেই থেকে আমার গান/বাজনার নেশা। শিবপুরে ভর্তি হলাম, দ্বিতীয় বর্ষে আমার রুমমেট স্প্যানিশ গীটার কিনে তখনকার একজন প্রথম শ্রেণীর শিল্পীর (৺খোকন মুখার্জী) কাছে বাজনা শিখতো; ও practise করতো, আমি সতৃষ্ণ নয়নে দেখতাম — আমাকে ছুঁতে দিত না। আমি কিন্তু ওর অনুপস্থিতিতে ওর গীটারে টুং টাং করতাম, ওর lessons তুলে ফেলতাম। বই পড়ে নিজে নিজেই বিভিন্ন প্রকারের chords ও তার প্রয়োগ শিখে শেষ পর্যন্ত college orchestra-য় যোগ দিয়েছিলাম। আমাদের college reunion-এ প্রতি বছর হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হতো —বছরের পর বছর রাতভর দেশের সকল বড় বড় শিল্পীদের গান ও বাজনা শুনেছি, শুনেছি আর মজেছি, পরে বইপত্তর পড়ে আর আলোচনা করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করেছি। এছাড়া আমি American / British / Jamaican / African folk song এবং Negro Spiritual / Blues / Jazz / Western Classical প্রভৃতি গভীর আগ্রহভরে শুনে নিজের কানটাকে উপযুক্ত করেছি। বাংলা লোক / আধুনিক / রবীন্দ্রনাথ / সলিল চৌধুরী / দ্বিজেন্দ্রলাল / অতুলপ্রসাদ / রজনীকান্ত- সঙ্গীতাবলী, পুরাতনী, প্রাদেশিক লোকসঙ্গীত, হিন্দী বেসিক/ফিল্মের গান, হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বাংলা ব্যান্ড — শ্রোতা হিসেবে প্রায় কিছুই বাদ রাখিনি। ইদানীং Vinyl / Cassette-এর গান digitize করছি ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনেক স্বরলিপি staff notation-এ রূপান্তর করছি। এইভাবে অবসর জীবন কাটাই। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে vinyl, reel ও cassette tape, audio CD, iTunes download দিয়ে নিজের গানের ডালি সাজিয়েছি। আমার ‘retiring room’ এখন গানে গানে ভরে গেছে! Sorry, ঝোঁকের মাথায় আড্ডার বন্ধুদের কাছে নিজের ঢাকটা একটু বেশী পিটিয়ে ফেললাম! বন্ধুগণ, যদিও আমি একজন সফল শিল্পী হওয়ার সুযোগ ও সময় পাইনি, তবু সব জঁরের গানের এক রসিক ও সমঝদার শ্রোতা হতে পেরে আমি গর্বিত। তাই আমার চর্চা, পঠন ও অভিজ্ঞতা-প্রসূত এই “রূপান্তরী” ব্লগের উপস্থাপনা। পছন্দ/অপছন্দ/উপেক্ষা আপনাদের অধিকার, মন্তব্যের অপেক্ষা আমার। .............................................................................................................................. আমার ব্লগসকল এই ভাবে সাজাচ্ছি রূপান্তরী : মুখবন্ধ : ধান ভানতে শিবের গীত রূপান্তরী-১ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত (উদাহরণ সহ) রূপান্তরী-২ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা গান...........ঐ রূপান্তরী-৩ : হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী গান……... ঐ রূপান্তরী-৪ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত রবীন্দ্রসঙ্গীত…………… ঐ রূপান্তরী-৫ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত বাংলা আধুনিক গান……. ঐ রূপান্তরী-৬ : পাশ্চাত্য সঙ্গীত প্রভাবিত হিন্দী ফিল্মী গান………. ঐ রূপান্তরী-৭ : উপসংহার ও ধন্যবাদজ্ঞাপন ............................................................................................................................... এই ব্লগ রচনাহেতু কিছু গ্রন্থ থেকে প্রয়োজনানুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করেছি, যথা – ১) হিন্দুস্থানী সঙ্গীত পদ্ধতি (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে ২) রাগপঞ্জী – রবি গুহ মজুমদার ৩) রবীন্দ্র রচনাবলী— জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ (বিভিন্ন খণ্ড) ৪) রবীন্দ্রসঙ্গীত : রাগ–সুর নির্দেশিকা — সুধীর চন্দ ৫) ত্রি–নিবন্ধে রবীন্দ্রসঙ্গীত — অমিয়মুকুল দে ৬) A Hundred Devotional Songs of Tagore – Mohit Chakrabarti ৭) বিলাতী গান-ভাঙা রবীন্দ্রসঙ্গীত – অনুরাধা পালচৌধুরী ৮) ছয় তারের গান – অরুণেন্দু দাস (‘মহীনের ঘোড়া’-র প্রবাসী সদস্য) ৯) A Book on Orchestra / Orchestra on Ten Indian Ragas – V. Balsara ১০) Rudiments and Theory of Music – Associated Board of The Royal Schools of Music, London ১১) Teach Yourself Music – King Palmer (Associate of The Royal Academy of Music) ....................................................................................................................................................................... সকল উদাহরণ ইচ্ছাপূর্বক কপিরাইট না ভেঙে অবাণিজ্যিক শোনার জন্য ‘You Tube’ থেকে নেওয়া হয়েছে। (All examples taken from ‘You Tube’ for non-commercial private listening, without intentionally infringing or violating any copyright) ........................................................................................................................................................................ ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’– ‘মল্লার’ সুর প্রভাবিত এই রবীন্দ্রসঙ্গীতের আমার রূপান্তরিত Staff Notation এই ব্লগের সাথে সংযোজন করলাম। “হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু, রাগ: মল্লার ঘন মেঘের ভুরু কুটিল কুঞ্চিত, তাল: তেওরা হল রোমাঞ্চিত বন বনান্তর-- রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৯৩৩ দুলিল চঞ্চল বক্ষোহিন্দোলে স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলনস্বপ্নে সে কোন্‌ অতিথি রে। সঘনবর্ষণশব্দমুখরিত বজ্রসচকিত ত্রস্ত শর্বরী, [রূপান্তর: সুভাষ চট্টোপাধ্যায়] মালতীবল্লরী কাঁপায় পল্লব করুণ কল্লোলে-- কানন শঙ্কিত ঝিল্লিঝঙ্কৃত॥“ শ্রীমতী ইমন চক্রবর্তী গীত ’হৃদয় মন্দ্রিল’ গানটির একটি মনোরম You Tube video উপস্থাপনা করলাম

1079

5

নব ভোঁদড়

আমিও লিখবো‚ আমিও লিখবো

ফরবিডেন সিটি‚ নিষিদ্ধ শহর| আমাদের ভারতীয়দের কাছে লাল কেল্লা যেমন ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক‚ ফরবিডেন সিটি চীনেদের কাছেও তেমন| বরং হয়তো তুলনায় আরো বেশী| গ্রেট মুঘলদের মধ্যে মাত্র দুজন লালকেল্লায় কখনো না কখনো থেকেছেন| শাজাহান অল্প কয়েক বছর লালকেল্লা থেকে শাসন করে আবার আগ্রা কেল্লায় ফেরৎ যান| একমাত্র ঔরংজেব কখনো আগ্রা কেল্লা থেকে শাসন করেন নি| কিন্তু তিনিও অনেকটা সময় ঔরঙ্গাবাদে কাটিয়েছেন| মোট সময়ের হিসাবে হয়তো লালকেল্লার প্রায় সমান সমান সময়ই| অন্যদিকে মিং এবং চিং দুটি রাজবংশ প্রায় পাঁচশো বছর ধরে ফরবিডেন সিটি থেকে চীন শাসন করেছে| শেষ চিং সম্রাট পুই এখান থেকেই বিতাড়িত হয়েছেন| আবার চীন বিপ্লবের সাফল্যের পর মাও এই ফরবিডেন সিটির দেয়ালের ওপর থেকেই চীন গনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষনা করেছেন| এখনো চীনের স্বাধীনতা দিবসে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান এই ফরবিডেন সিটির দেয়ালের ওপর থেকে সেনাবাহিনীর অভিবাদন গ্রহন করেন| ফরবিডেন সিটির সামনে দাঁড়িয়ে একবার বইতে পড়া পুরোনো বেইজিংএর সিটি প্ল্যান মনে মনে ঝালিয়ে নিলাম| ফরবিডেন সিটি ছিল সম্রাটের বাসভবন এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র| তার সামনে তিয়েন-আন-মেন ছিল উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের বাসস্থান - অর্থাৎ রাজকীয় শহর| ফরবিডেন সিটি এবং তিয়েন-আন-মেনের ইম্পিরিয়াল সিটি - দুটিই ছিল দেয়াল ঘেরা| ইম্পিরিয়াল সিটির দেয়াল বহুদিন হল আর নেই| তবে মাও মৌসলিয়ামের পেছনে যে সুন্দর গেটটি এখনো আছে সেটিকে বলা হয় স্বর্গীয় শান্তির দরজা| এইটিই ছিল সেই দেয়াল ঘেরা ইম্পিরিয়াল সিটির প্রবেশদ্বার| ফরবিডেন সিটির প্ল্যান আয়তাকার| বাইরের দেয়াল‚ তার ভিতরে আরো অনেকগুলি দেয়াল| সবচেয়ে ভেতরে অন্ত:পুর| চীনে প্রাসাদের এই প্ল্যানকে বলা হয় মণিমঞ্জুষা বা জুয়েল বক্স প্ল্যান| দামী গয়নার বাক্স যেমন একটির ভেতর আর একটি রাখা হয়‚ সবচেয়ে ভেতরে থাকে কোহিনূর মনি‚ এই প্রাসাদের গঠনও তেমনি| মণিমঞ্জুষা শুনে অবাক হন নি নিশ্চয়ই| মহাযান ও তন্ত্রযান বৌদ্ধধর্মের সুবাদে চীনের পন্ডিত ও অভিজাত সমাজ সংস্কৃতভাষার সাথে পরিচিত ছিলেন| এখনো চীনে ইতিহাসের আলোচনায় কিছু কিছু সংস্কৃত শব্দ দেখা দেয়| আমরা দাঁড়িয়ে আছি মেরিডিয়ান গেটের সামনে| এই গেটটি পেরিয়ে ফরবিডেন সিটিতে ঢুকতে হয়| মেরিডিয়ান গেটে পাঁচটি প্রবেশদ্বার| মাঝের দরজাটি মোটামুটি সম্রাটের জন্য সংরক্ষিত| মোটামুটি বলছি‚ কেন না কিছুকিছু সময়ে সম্রাট বাদে আরো কেউকেউ মাঝের দরজা ব্যবহার করতে পারত| যেমন প্রধানা সম্রাজ্ঞী বিয়ের জন্য ফরবিডেন সিটিতে ঢুকতেন এই মাঝের দরজা দিয়ে| কিন্তু একবার ঢোকার পর সম্রাটের স্ত্রীরা কেউ আর কখনো ফরবিডেন সিটি থেকে বেরোতেন না| রাজকীয় সিভিল সার্ভিসের প্রবেশিকা পরীক্ষার শেষ মৌখিক পরীক্ষা হত ফরবিডেন সিটিতে| পরীক্ষকমন্ডলীতে স্বয়ং সম্রাট বসতেন| এই পরীক্ষায় প্রথম তিন স্থানাধিকারী জীবনে এই একবার মাঝের দরজা দিয়ে বেরোনোর সম্মান পেতেন| মাঝের দরজার দুপাশের দুটি দরজা রাজবংশীয় পুরুষ ও রাজপুরুষদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল| সব শেষের দুটি দরজা শুধু সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার দিন খোলা হত‚ পরীক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য| মাসে তিনদিন সম্রাট প্রকাশ্য দরবারে বসতেন| তখন যে সব মন্ত্রীরা দরবারে ডাক পেতেন না‚ তারা এই মেরিডিয়ান গেটের সামনে অপেক্ষা করতেন‚ যদি সম্রাটের তাদের প্রয়োজন হয়| অবশ্য সম্রাট কোন মন্ত্রীর ওপর রুষ্ট হলে তার বেত্রদন্ড ও প্রাণদন্ডও এই মেরিডিয়ান গেটের সামনেই হত| এছাড়া মেরিডিয়ান গেটের ওপর যে ঘর আছে সেখান থেকে সম্রাট যুদ্ধজয় করে ফিরে আসা সৈন্যদল ও তাদের লুটের বোঝা পরিদর্শন করতেন| গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ঘোষণা এখানেই জনগনকে পড়ে শোনানো হত| নীচের ছবিগুলোর ক্যাপশন দিতে পারছি না| তাই এখান থেকেই বলে দি কোনটা কি| মাওয়ের ছবিওলা যে গেটটা দেখছেন সেটি হল মেরিডিয়ান গেট| গেটে পাঁচটা দরজার তিনটে দেখা যাচ্ছে| বাকী দুটো এই তিনটের থেকে খানিকটা দূরে| মেরিডিয়ান গেটের দুটি উইং আছে‚ সে দুটিও এই ছবিতে আসে নি| শেষ দুটি দরজা এই দুই উইংএ| লাল রঙের ওপরে রিলিফে করা যে সিংহের মুখ‚ সেটা মেরিডিয়ান গেটের মাঝের দরজার গায়ে নকার বা কড়া| মার্বেলের সিংহী মূর্তি হল চীনে বাড়িতে দরজার সামনে যে সিংহ-সিংহী মূর্তি থাকে তার একটি| ওরা ইংরাজীতে বলে ফু-ডগ| কি করে বোঝা গেল এটা সিংহী? দরজার সামনে এই মূর্তি দুটির মধ্যে যেটি সিংহের মূর্তি তার থাবার নীচে থাকে একটি বল (পৃথিবীর প্রতীক)| সিংহীর থাবার নীচে থাকে বাচ্চা সিংহ| এই ছবিটি ফরবিডেন সিটির সামনে রাখা সিংহ-সিংহী জোড়ার সিংহী| আমার এক চীনে ছাত্রকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এই সিংহীকে কি ইংরাজীতে ফু-বিচ বলা উচিৎ হবে? সে আমাকে উত্তর দিয়েছিল - চীনেরা তত ভাল ইংরাজী জানে না| এই থাপ্পরটি খাবার পর চীনেদের সাথে ওদের সংস্কৃতি নিয়ে আর কখনো রসিকতা করার চেষ্টা করি নি|

1264

37

মানব

কিংকর্তব্য

ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ, কি হয় কি হয়। আমাকে নিয়ে যাওয়া হল সেই ঘরে যেখান থেকে আমার খারাপ সময়ের শুরু হয়েছিল। সেই অন্ধকার ঘর যেখানে লাথির পর লাথি খেয়ে আর কাতুকুতু দিয়ে কোনরকমে বেঁচে বেরিয়ে এসে করেছিলাম সেই কান্ড, যার জন্য এখন আমার এই অবস্থা। এতক্ষণে আলোয় আসাতে অন্ধকারে রাজীবদার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে চিনলাম। আমাদেরই ব্যাচমেট রূপম ছিল তাহলে ওটা। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাটা মজা নিচ্ছিল! একটু যদি সতর্ক করে দিত তাহলে এতবড় অঘটনটা হয়ত আমি নাও করতে পারতাম। “আমাকে কষ্ট দেওয়ার কি শাস্তি কি হতে পারে তোরা কিছু বলবি নাকি আমিই ঠিক করব?” সবাই চুপ। তখন বেশ অভিমান নিয়ে রাজীবদা বলল, “তুই এইভাবে আমার উপর অত্যাচার করলি, এটা কিন্তু ঠিক নয়। এখন আমিও তোকে একটু কষ্ট দিই কি বলিস? চল বেশী বাড়াবাড়ি না করে প্যান্টটা খুলে ফেল তো দেখি।” সবাই খুব কষ্ট করে হাসি চেপে বসে আছে দুপাশের খাটের উপর। হস্টেলের এক একটা রুমে দুটো করে সিঙ্গল খাট, প্রতিটা খাটে একটা করে ম্যাট্রেস, আর তার উপর সাদা চাদর পাতা। এবার একটু জোরে হুঙ্কার শোনা গেল, তুই কোন কোম্পানির আন্ডারওয়ার পরিস সেটা দেখতে চাইনি। যা বলেছি তাই কর। নাহলে আজ তোর কপালে অনেক কষ্ট আছে। দুদিকের সহপাঠিদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি ভয়ে এবং অনেক্ষণ ইতস্ততঃ করে শেষপর্যন্ত দাদার কথামত কাজ সেরে ফেললাম। ঘরের মধ্যে এক রাজীবদা বাদে সবাই ফার্স্ট ইয়ার। না পারে তারা প্রতিবাদ করতে, না পারে প্রাণ খুলে হাসতে। শুধু মুখ চাপা কতকগুলো ফিকফিক শব্দ আর আমার চোখমুখ লাল। এমন সময়ে বাইরে থেকে দরজা ঠকঠক। বলা বাহুল্য, এইধরণের কাণ্ডকারখানার সময় দরজা বন্ধ করাই থাকত। কখন কে এসে পড়ে, কিচ্ছু তো বলা যায় না। যাইহোক দরজা খোলা হল। আর সারা ঘরের ফিচফিচ শব্দ তুমুল হাসিতে পরিণত হল। ঘটনা এই যে, বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সুবু এবং অনেকটা আজকেরই মতন কাণ্ড গতকাল এই রাজীবদার সাথেই করে ফেলেছে সে। কাল দুপুরে অনেকেই ভাতঘুম দিচ্ছিল ওদের রুমে। দুটো সিঙ্গল খাটকে জুড়ে দিলে ৬-৭ জনের শোবার ব্যবস্থা হয়ে যায়। সঙ্গে হাল্কা সুরে চলছে, ‘কেন করলে এরকম...বল’। এমন সময় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে হাজির রাজীবদা। যেইনা সে সুবুকে খোঁচা মেরেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় সুবু রাজীবদাকে এমনভাবে ধরে রাখল, যাতে সে না পারছে পালাতে, আর লজ্জায় না পারছে কাউকে ডেকে তুলতে। এমন সময় কেউ একজন দুম করে দরজাটা খুলে ওই অবস্থায় ওদের দেখে ফেলে। তারপরই ঘটনাটা আমাদের মধ্যে জানাজানি হয়। আজ এই সময়ে সুবুর আগমনটা নিছক কাকতালীয় কি? এই অবস্থায় আমাকে দেখে বেচারা তো বুঝতেই পারল না কি হয়েছে।। আমাকে বলা হল ঘটনা ব্যাখ্যা করতে। আমি কোনরকমে হাসি চেপে রেখে হাত নেড়ে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। মুখ খুললেই গল্প বলার আগেই হাসিতে ভাসিয়ে দিতাম, বিপিনের মত। অবশেষে যা হওয়ার তাই হল। সুবুকেও একই অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল আমার পাশে। রাজীবদা একজনকে পাঠালো রসগোল্লা আনতে। এরপর আবার রসগোল্লা দিয়ে কি হয়ে ভাবতেই আমার কেমন ভয় ভয় করতে শুরু করল। দুজনের মুখ দিয়েই তখন অল্প অল্প খিক খিক, ফ্যাচ ফ্যাচ। একবার করে সমবেত জনতার মাঝে হাসির রোল উঠছে আর ওদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই বলে যে হাসলে ওদেরও এই অবস্থা হবে। রসগোল্লা এসে গেল। সবাই একটা করে পেল আর আমরা দুজন স্পেশাল ক্যাটাগরি তাই আমরা দুটো করে পেলাম। রসগোল্লা খাওয়া হলে এবার সিগারেট। সুবু তো আরামসে সিগারেট খেতে শুরু করল। আমি আপত্তি রাজীবদা বলে উঠল, সিগারেট তোকে খাওয়ানো হবেই। মুখ দিয়ে খাবি না তো কি হয়েছে... (চলবে)

1143

33

প্রবুদ্ধ

সাহিত্যের আলোচনা

আলোচনাটা শুরু হয়েছিলো শিবাংশুদার "প্রতিবাদ ও প্রতিফলন" লেখাটা দিয়ে| মূল সুত্রটা অবশ্যই উমা-র লেখা গল্প অঙ্গীকার| তারপর গত কয়েকদিনের আলোচনাটা খুব ইন্টারেস্টিং হওয়ায় সেটাকে আমার নিজেরই স্বার্থে ব্লগে তুলে রাখলাম| অনুমতি না নিয়ে লেখাগুলো তুলে দেওয়ার জন্য কেউ আশাকরি খ্চ‚ মানে রেগে যাবেন না| ---------------------------------------------------------------------------------------------- প্রতিবাদ ও প্রতিফলন শিবাংশুদা‚ ০২|১২|২০১৫ এ পাতায় ও পাতায় নানা আলোচনা হচ্ছে 'প্রতিবাদ' ও তার প্রতিফলন নিয়ে। এ পাতায় অরিন্দম যা বলেছে তা নিয়ে কিছু কথা রেখে দিই এখানে। 'প্রতিবাদ' একটা মানসিকতা। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার নানা প্রয়োজন, নানা প্রেক্ষিত, নানা প্রকাশ। আমি সব পরিপ্রেক্ষিতগুলিকে আমার বক্তব্যে ধরিনি। আমার উপজীব্য ছিলো শুধুমাত্র মানুষের দাম্পত্যজীবনে অবিচার, অবিশ্বাস ও তার প্রতিবাদ, প্রতিফলন কী ধরণের ছন্দপতন আনে এবং কেন? ---------------------------------- দর্শক, কথক বা পাঠক; লেখক কোনোটাই নয়। সে এক চতুর্থ মাত্রা। তাই লেখক যখন পাঠকের কাছে জানতে চায়, কেমন লাগলো আমার লেখাটা? পাঠকের কাছে তিনটি বিকল্প। ভালো লাগলো, ততো ভালো লাগলো না অথবা ঠিক বলতে পারবো না। এর কোনোটাই লেখকের সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেনা। কারণ লেখকের মাত্রাটি যে আসলে কী, তা পাঠকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। 'ভালো লাগলো' শুনলে অহম কিছু পরিতৃপ্ত নিশ্চয় হবে। কিন্তু তাতে তার লেখকসত্ত্বায় কোনও ভিন্ন সার্থকতা যোগ হবেনা। লেখক নিজেকে ভালো লাগানোর জন্য লেখে। যদি অন্য কারো তা ভালো লেগে যায় তবে তাকে বলা যায় পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। আমি যে গান গাই, জানিনে সে কার উদ্দেশ্যে..... ----------------------- যে লেখক বিশেষ গোত্রীয় পাঠকের জন্য শব্দবাণিজ্যে তল্লীন, তাঁর নাম হতে পারে চেতন ভগত বা শোভা দে। পাঠক হিসেবে তাঁরা আমার লেখক ন'ন। ---------------------- তথাকথিত আন্ডার'ডিফাইনড ( শব্দটির সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ জানিনা) চরিত্রের প্রতি বাংলা লেখক বা পাঠকদের দুর্বলতা চিরকালের। তবে এই রকম চরিত্র হলেই যে মৌনতার ভাষা বা স্তব্ধতার গান তার আয়ত্বের মধ্যে থাকবে, তা নয়। শীর্ষেন্দু প্রথম থেকেই এই ধরণের চরিত্রকে তাঁর লেখায় বড়ো পরিসর দিয়েছেন এবং তা পাঠকের আনুকূল্য পেয়েছে। সহনশীলতা ও মৌনপীড়ন এক অনুভূতি নয়। সহনশীল মানুষের প্রতিক্রিয়া সচরাচর ইতিবাচী হয়। কারণ এমন একজন মানুষ সমস্ত ঘটনাক্রমকে সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করেন। কারো কোনো একটি বিশেষ সংলাপ শুনে বা আচরণ দেখে, তার প্রতি নিজস্ব অবস্থান তাঁরা বদলান না। কারণ তাঁদের পরিপ্রেক্ষিত যুক্তি আধারিত। কিন্তু পীড়িত মানুষের মৌনতা'র মধ্যে ইতিবাচী কিছু থাকেনা। পুরোটাই দাঁত চেপে সহ্য করার নিরুপায় অবমাননা ছাড়া কিছু নয়। বাইরের পৃথিবীতে তার অনেক মাত্রা আছে। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কে তার একটিই মাত্রা, তা নিয়েই লেখকের কারিকুরি। হ্যামলেট জিতবে না হারবে, সেটা লেখক ঠিক করেন।তিনি কোনো অর্থেই 'সমাজসংস্কারক ' ন'ন। লেখক, সমাজসংস্কারক হতে চাইলে তার থেকে বড়ো বিপর্যয় আর কিছু নেই। সহজ উদাহরণ, স্তালিনের আগের রুশ সাহিত্য এবং তার পরবর্তী পর্ব। ---------------------------------------------- দাম্পত্য অবিচারের প্রতি সহমর্মী লেখকের যে প্রতিবাদ আমাকে প্রথম চমকে দিয়েছিলো সেটি হেনরিক ইবসেনের Et dukkehjem(1879) । ইংরিজিতে The Doll's House। প্রায় দেড়শো বছর আগে এক পুরুষ লেখকের লেখা এক নারীর প্রতিবাদের ইতিবৃত্ত। বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে অনেক লেখা যায়, কিন্তু সেটা ভিন্ন প্রবন্ধ হয়ে যাবে। সে চেষ্টা থাক। একটা কথা বলি, লেখার মধ্যে লেখকের নিজের জীবন থেকে উঠে আসা নানা অভিজ্ঞতা, ধ্যানধারণা, অভ্যেস, ব্যক্তিগত ব্যসন এসেই যায়। কিন্তু সেই সব ব্যক্তিগত চাপ যদি তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, তবে লেখক আর লেখক থাকতে পারবেন না। তিনি হয় দর্শক, নয় পাঠক হয়ে যাবেন। লেখকের অগ্নিপরীক্ষা সেখানেই। সচেতন বার্তা দেবার জন্য অনেক লোক আছেন। তার জন্য 'লেখক' হবার প্রয়োজন নেই।কিন্তু একজন সফল লেখকের বার্তাটি একান্তভাবে অবচেতনগামী হবে। পাঠকের দাঁড়াবার জায়গাটিকে, স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে সে। নয়তো লেখার কী দরকার? দেশে নবকল্লোল, মনোহর কহানিয়াঁ কি কম পড়িয়াছে? -------------------------------- অবশ্য এসব কথাবার্তা কিছুই 'প্রতিমা'কে উদ্দেশ্য করে নয়।:-) তার নিরুপায়ত্ব আমি বুঝি। কিন্তু তার 'প্রতিবাদ' আমাকে ধন্দে ফেলে। পৃথিবীতে সবাই তাকে মাড়িয়ে যাবে। কিন্তু, লেখক তো তা পারেন না। প্রতিমাকে প্রেরণা আর কে দেবে? "..... গম্ভীর স্থির প্রতিজ্ঞাগুলি সারি দিয়ে দাঁড়ায় ত্রস্ত মনের সামনে প্রহরীর মতোঃ আমাদের প্রত্যেকের ইঁদুরের মতো মরাই শেষ নয়, তারপরেও মহত্তম ভবিষ্যৎ ...." ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০২|১২|২০১৫ শিবাংশুদা যদি দাম্পত্যজীবনের কথা মাথায় রেখেই এইসব বলে থাকেন তাহলে তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়‚ কুমু থেকে চারু হয়ে তৃষা এবং আরো অনেকে আসবে| বিদেশী সাহিত্যও আসবে| সে বিষয় আপাতত থাক| কিন্তু‚ আপনার ঝিনুককে লেখা মন্তব্য পড়ে আপনার মনের কথা বোঝার ক্ষমতা আমার হয়নি যে উহা দাম্পত্যনির্ভর বক্তব্য| কেন্দ্রীয় চরিত্র‚ পার্শ্বচরিত্র‚ প্রতিবাদী সত্ত্বা‚ গান্ধীর উপমা ইত্যাদি প্রভৃতি যথেষ্ট বিভ্রান্তিকর| আর সেই কারণেই শীর্ষেন্দুর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রর কথা উল্লেখ করেছিলাম| দেখলাম সে বিষয়ে আপনি খুব একটা কিছু বলেননি| এবং স্বাভাবিকভাবেই শীর্ষেন্দুর প্রীতির উল্লেখ করেছেন| হ্যাঁ সত্যি শীর্ষেন্দু ওর কাহিনী এইসব চরিত্রকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে| আর একটা ব্যাপারে একদম ঠিক বলেছেন এরমধ্যে(এই আলোচনার) প্রতিমা নেই| প্রতিমাকে দেখার চোখ হয়তো ভিন্ন‚ হয়তো বা এক হবে কিন্তু প্রতিমা শুধুই স্ত্রী নয় তাই যখন লিখব তার সব সম্পর্কের ওপর আলো ফেলেই লিখব| ভালো থাকবেন| অরিন্দম ------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ‚ ০২|১২|২০১৫ "প্রতিমা"কে প্রেরণা দেওয়ার কাজ যদি লেখকেরই থাকে‚ তাহলে তো শিবাংশুদা কাফকা কাম্যু মার্কেজ হেস এরা তো কেউ পাঠকই পাবে না| নিরুপায় অবমাননা নিয়ে কোনো লেখা তৈরী হবে না তাহলে? হ্যামলেট জিতলো কি হারলো.... হ্যামলেট জিতলো কোথায়? সবাই প্রতিমাকে মাড়িয়ে যাবে‚ কিন্তু লেখক তা পারেন না? না শিবাংশুদা‚ এই জাস্টিফিকেশনটা আমার ঠিক কনভিন্সিং লাগলো না| এভাবে ফর্মুলেট করা যায় না| -------------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, পাঠককে অনুপ্রেরিত না করতে পারলে লেখককে কে মনে রাখবে? পাঠক 'পাওয়া না পাওয়া'র অঙ্কটা অতো সরল নয়। যাঁদের নাম লিখেছো, নিছক সংখ্যাবিচার করতে গেলে তাঁদের থেকে পালপ ফিকশন লেখকদের প্রতি আনুগত্য মানুষের অনেক অনেক বেশি। নিরুপায় অবমাননার গল্প দিয়ে জমি তৈরি হয়। চরিত্ররা তার উপর চলাফেরা করে। সেটা তো ভিত্তি, থাকবেই।কিন্তু যে চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া নেই, সে চরিত্র কখনও দাঁড়াতে পারবে না। আর যে চরিত্রের প্রতি লেখকের প্রেরণা নেই, সে কখনই কালের বিচারে টিকবে না। --------------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ‚ ০২|১২|২০১৫ তাও পুরোটা মানতে পারলাম না শিবাংশুদা| এক‚ কথাটা হচ্ছিলো লেখক চরিত্রকে অনুপ্রেরণা দেবে কিনা তাই নিয়ে| তুমি পাঠককে অনুপ্রেরণা দেওয়ার কথা বলছো| বেশ‚ কিন্তু পাঠককে অনুপ্রেরণা দেবে লেখক‚ নইলে লেখককে কেউ মনে রাখবে না? ঐ নামগুলোর একটা আবার করছি| কাফকা| অনুপ্রেরণা তো দূর‚ মনে ডিপ্রেশন নিয়ে কাফকা পড়তে বসলে যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে| তবু ঐরকম মনের অবস্থা নিয়েই কাফকা পড়া উচিত| এখানে অনুপ্রেরণার কোনো প্রশ্নই নেই| আর সংখ্যাতত্বের বিচারের তো কোনো অর্থই নেই| একজন পাঠকও যদি কাফকা পড়ে‚ তাকে দিয়েই লেখক-পাঠক সম্পর্ক establish হতে পারে| দুই‚ চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া না থাকলে সে চরিত্র দঁড়াতে পারবে না? হুড়মুড় করে দশটা উদাহরণ এসে গেলো‚ তবু ইচ্ছা করেই ভিস্যুয়াল মিডিয়মের থেকে উদাহরণ নিচ্ছি‚ বুনুয়েল? He loved to hate his characters. That obscure object of desire-এ প্রৌঢ় মাতিউ‚ বা নাজারিন-এর ধর্মযাজক নাজারিও‚ বুনুয়েলের মনে একটু মায়াদয়া থাকলে ঐরকম নির্দয়ভাবে একটা চরিত্র আঁকতে পারতেন না| চরিত্রের প্রতি লেখকের মায়া বা প্রেরণা থাকতেই হবে? চরিত্রের প্রতি ঘৃণা নিয়ে লেখক হওয়া যাবে না? যা: শিবাংশুদা‚ লেখার জগতটা বড়ো বেশী সীমাবদ্ধ হয়ে গেলো যে! ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০২|১২|২০১৫ The Hitchhiking Game অনুবাদটি পান্থবালিকার চলন্ত গাড়ি থামিয়ে প্রেম প্রেম খেলা| মিলান কুন্দেরা| যা দেখেছে‚ দেখছে তাই যেন লিখে যাচ্ছে| চরিত্রকে ফেলে দিচ্ছে পাঠকের সামনে| লেখকের কোন বিশেষ পক্ষপাতিত্ব চোখে পড়েনি| অতিরিক্ত বিধি-নিষেধ সৃষ্টির পরিসরকে ক্ষুদ্র করে| ------------------------------------------------------------------------------------------------ শিবাংশুদা‚ ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, অরিন্দম, 'মানসিক অবসাদ' নিয়ে কাফকা পড়া উচিত? এ রকম কিছু বলতে চাইছো কি? নিজে পণ্ডিতি না করে এক আধটা লেখা'র নাম করছি। যদি সম্ভব হয়, দেখো। হয়তো কাফকা সম্বন্ধে টিপিক্যাল পশ্চিম য়ুরোপীয় সরলরেখায় নড়াচড়ার বাইরে অন্য রকম খোঁজ পেতেও পারো। ১. Franz Kafka: A dialectical Approach : Stephan Bird-pollan ২. Reading Kafkaa: Elizabeth Boa ৩. Labyrinth of Pure Reflection : Franz Kafka ----------------------- বুনুয়েল সম্পর্কে বলছো, "He loved to hate his characters"। এখানে "Love" শব্দটা কেন আসছে? অনেকভাবেই তো ঘৃণাকে সরাসরি প্রকাশ করা যেতো। তা না করে এভাবে লেখা কেন? কারণটি অতি সরল। ভালোবেসে বা ঘৃণা করে, নিজের সৃষ্ট চরিত্রদের সঙ্গে লেখক প্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। গ্যোথে 'ফাউস্ট'কে কি ভালোবাসতেন? যদি ভালো না বেসে থাকেন, তবে তো ঘৃণাই করতেন। সেটাই তাঁর প্যাশন। সে জন্যই লেখাটি দেশকালের সীমাবদ্ধতা থেকে উপরে চলে গেছে। --------------------------- কোনও লেখকই চরিত্র বাছার সময় তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। তবে তো লেখাটা হয়েই উঠবে না। ভঙ্গি নানা রকম থাকবে। সরল পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন লেখকের কলমটাই শুধু চলছে এখানে। মন'টা অন্য কোথাও। সেটাই লেখকের মায়া বা ছলনা। 'মায়া' মানে অন্ধ স্নেহ নয়। ইল্যুশন সৃষ্টি করা লেখকের সৃষ্টিশীলতার অংশ। পশ্য, গিওর্গি লুকাচ বা টেরি ইগলটন। অনেক কিছুই পাবে সেখানে। ------------------------ যদি কোনও চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত প্রত্যক্ষভাবে প্রকট হয়ে ওঠে, তবে তার মানে লেখক এখনও পরিপক্ক হয়ে উঠতে পারেননি। অথবা সেমত লেখকের দ্বারা দাদের মলমের বিজ্ঞাপন ব্যতীত আর কিছু লেখা সম্ভব নয়। লেখালেখি একধরণের আচরণীয় ধর্ম। তার গতিপথ প্রহ্লাদের হাত ধরতে পারে, আবার হিরণকশিপুকেও আশ্রয় করতে পারে। তবে কোনও ভঙ্গিই লেখাকে লেখকের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। ------------------------------------------------------------------------------------------ প্রবুদ্ধ ০২|১২|২০১৫ আমি ভেবেই রেখেছিলাম এইবার শিবাংশুদা যে উত্তর দেবেন সেটা ট্যান যাবে| প্রায় যাচ্ছিলো-ও‚ হাত তুলে ধরতে পারলাম| কাফকা কি করে পড়তে হয় সে নিয়ে পড়াশুনা করা আমার লেভেলের বাইরে| তাও তিন তিনটে বই| তবে আমি তো আর উইকি নই যে সব কথা রেফারেন্স দিয়েই বলবো| নিজে যেটুকু পড়ে বুঝেছি সেটাই আমার নিজের কাছে সৎ বিশ্লেষণ| তাতে দেখেছি উৎফুল্ল হয়ে কাফকা নিয়ে বসলে পড়াটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়| মনে কিছু চাপ থাকলে‚ অবসাদ থাকলে‚ কাফকা পড়াটা‚ যাকে বলে‚ তাগড়া হয়| লাভ টু হেট একটা চালু কথা‚ তাই বল্লাম| লাভ মানে এখানে সেই লাভ নয়| বুনুয়েলের ইউএসপি-ই হলো চরিত্রগুলির প্রতি চরম নির্লিপ্ততা| এমনকি সেগুলো নিয়ে ব্যাখ্যা করাতেও স্পৃহা নেই| লাটাই ওঁর চেয়ারের পাশে পড়ে থাকে অনাদরে‚ চরিত্রগুলি আলগা সুতোয় জমিতে চলাফেরা করে| চরিত্রের প্রতি মায়া? কুরোসাওয়া বা চ্যাপলিনের মতো? নেই‚ বুনুয়েলের নেই| তবে আগে বলেছিলে চরিত্রের প্রতি মায়া‚ এখন দেখছি মায়া মানে ইল্যুশন বলছো| চরিত্রের প্রতি ইল্যুশন? ঠিক বুঝলাম না| আর শেষে গিয়ে কি কষ্ট হলো‚ ইসসস‚ কোন্যান ডয়েল থেকে বিভুতিভুষণ‚ সব্বাই দাদের মলমের বিজ্ঞাপন লিখছেন! চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত একেবারে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে কিনা‚ তাই এই শাস্তি| ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম ০২|১২|২০১৫ শিবাংশুদা বইয়ের নামগুলো দিয়েছেন খুব ভালো লাগলো। কিন্তু কুন্দেরার গল্প পড়তে পড়তে চরিত্রের প্রতি কোনরকম বিশেষ মনোযোগের চিহ্ন দেখলাম না। পরিবেশনায় একটা নির্লিপ্ততা আছে। এখন সত্যি সত্যি যদি সেটা নাও থাকে, মনেমনে যদি কোন চরিত্রকে ভালোবাসেন বা ঘৃণা করেন তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। মনের মধ্যে ঢুকবো কী করে! সেটা মার্কেসের কিছু লেখা পড়েও মনে হয়েছে। অন্যদিকে চরিত্রের প্রতি লেখকের প্রত্যক্ষ পক্ষপাত প্রকট হয়ে উঠলে সে দাদের মলমের বিজ্ঞাপন লিখবে, এ বড় কঠিন সীদ্ধান্ত, তার আগে একটু দেখতে হবে/বুঝতে হবে প্রত্যক্ষ পক্ষপাত বলতে আপনি কাকে বলছেন। বরং একটা সরল প্রশ্ন করি, নিখিলেশের প্রতি দাদুর পক্ষপাত প্রত্যক্ষ বা অপুর প্রতি বিভূতিভূষণের? ----------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ আরে ফাগোল, তিনটেই বই নয়। প্রথমটা বই আর পরের দুটো প্রবন্ধ। তিন নম্বরটা কাফকার নিজের লেখা। কোন্যান ডয়াল থেকে বিভূতিভূষণ, কোন চরিত্রের প্রতি তাঁদের 'প্রকট পক্ষপাত' রয়েছে বাবু। একটু শুনি নাহয়। ------------------------------------------------------------------------------------------- প্রবুদ্ধ ০২|১২|২০১৫ উহুঁ উহুঁ শিবাংশুদা, আগের প্রশ্ন আগে। যেটা তোমায় অরিন্দমবাবু আগেই করেছে। ------------------------------------------------------------------------------------------ বৃষ্টিম্যাম ০২|১২|২০১৫ শিউলি পর্ব আমার বলতে গেলে কিছুই পড়া হয়নি এখনও | পুরো বইটায় চোখ বোলানো আছে | নানান ব্যক্তিগত সমস্যায় সময় করে উঠতে পারিনি | উমার গল্পের সমালোচনা পড়তে পড়তে আজ ওর গল্পটাই আগে পড়েই ফেললাম | প্রতিমার চরিত্রকে আমার কখনও দুর্বল মনে হয়নি | প্রতিবাদ করার ভাষা সবার এক নয় | কেউ সোচ্চারে করে‚ কেউ মৌন হয়ে আবার কেউ হয়্তো উদাসীনতা অবলম্বন করে | শিবাংশুদাকে এই অধমের একটা প্রশ্ন ছিল ... সব সময় কি সংসারে সোচ্চারে প্রতিবাদ করা যায় ? প্রতিবাদ না করার বিভিন্ন কারণ থাকে | সেইসব কারণগুলো মোটেই তুচ্ছ নয় | সন্তান‚ সমাজ‚ আর্থিক অবস্থা আরো অনেক কিছুর কথা ভেবে কম্প্রোমাইস করতে হয় | আজও আমাদের সমাজে একজন মেয়ের একা থাকার সুযোগ নেয় পুরুষমানুষ | আড়ালে‚ আবডালে কুকথা‚ নিন্দা এসবের কথা তো ছেড়েই দিলাম | তবুও কিন্তু প্রতিমা ভেবেছিল‚ একদিন তার ফ্ল্যাটে সে চলে যাবে | স্বামীর প্রতি যাবতীয় কর্তব্য পালন করে একান্ত মুহূর্তে তাকে প্রত্যাখান করাও এক ধরনের প্রতিবাদ | আমি এইটুকুই বলতে চাই ‚ সব পরিস্থিতিতে তীব্র প্রতিবাদ করা বা ছেড়ে চলে যাওয়া হয়তো বাস্তবে সম্ভব হয়্না অনেকেরই | কিছু মানুষ যেমন প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসে আবার কিছু মানুষ অনেক অপ্রাপ্তি ‚ কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে না এসে রয়ে যায় নানান কারনে | তাই বলে কি কোনো লেখক এই দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষদের কথা লিখবেন না ? ------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০২|১২|২০১৫ প্রবুদ্ধ, অরিন্দমের প্রশ্ন বলতে কি পক্ষপাতের ইশারা? যদি তাই হয়, তবে আমার ধারণাটি বলি। বাংলাভাষায় দু'টো শব্দ আছে, একেবারে পৃথক ভাব তাদের, কিন্তু অনেকেই সেগুলিকে এক ভাবে দেখেন। 'পক্ষপাত' ও 'সহমর্মিতা', এই দু'টি শব্দ। 'পক্ষপাত' স্পেসিফিক ভাব আর 'সহমর্মিতা' জেনেরিক ভাব। 'পক্ষপাত' মানে অন্ধ আনুকূল্য। 'সহমর্মিতা' মানে যৌক্তিক মানবিক অবস্থান। আরেকটু ব্যাখ্যা করি। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে যখন একজন পাকিস্তানি সৈনিক নিহত হ'ন, তখন তাঁর পরিবারের প্রতি আমি সহমর্মিতা বোধ করি। কিন্তু তা বলে আমি একজন ভারতীয় হিসেবে কখনও পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি কোনও রকম পক্ষপাত বোধ করিনা। --------------------------------------------- কবি নিখিলেশের প্রতি পক্ষপাত দোষদুষ্ট ন'ন। তিনি নিখিলেশের সহমর্মী। কারণ নিখিলেশ বস্তুতঃ ব্যক্তি কবির মাউথপিস মাত্র। সত্যি কথা বলতে কবি'র আরো অনেক চরিত্রের মতো নিখিলেশ চরিত্রটি ঠিক রক্তমাংসের মানুষ নয়। একটা আদর্শবিশেষ'কে মানুষের রূপ দিতে গেলে শিল্পের বাস্তবতার সঙ্গে ছলনা করতে হয়। রম্যাঁ রল্যাঁর জাঁ ক্রিস্তফ ধরণের সমস্যা। এই রকম একটি চরিত্রের প্রতি পক্ষপাতী হলে লেখক বাস্তবতার থেকে বিযুক্ত হয়ে যা'ন। কবি তা হ'ননি। ----------------------------------------------------- একই ভাবে বিভূতিভূষণের সঙ্গে অপু'র সম্পর্ক বিচার করা যায়। অপু পথের পাঁচালির মূল চরিত্র নয়। সজনীকান্তের প্রশ্নের জবাবে লেখক নিজে বলেছেন এই উপন্যাসটির নায়ক শুধুমাত্র 'পথ'। অন্য উপন্যাসগুলিতেও একই রকম সম্পর্ক উভয়ের মধ্যে। অপু চরিত্রটির সঙ্গে বিভূতিভূষণের কিছু লৌকিক মিল রয়েছে। কিন্তু তাছাড়া লেখক ও অপু চরিত্রটির মধ্যে সমান্তরাল টানা যায়না। বিভূতিভূষণ অপুর সহমর্মী। চরিত্রটি নিজের মতো খেলে যায়। লেখক তার মানসলোকের ওঠাপড়া নিজের মধ্যে বোধ করছেন। কোনও পক্ষপাত নেই। পক্ষপাতী লেখক তাঁর কল্পিত চরিত্রটিকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেননা। এই সমস্যাটি অপটু লেখকদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। --------------------------------------- দক্ষ লেখকেরা কখনও নিজস্ব পক্ষপাত'কে সৃজিত চরিত্রের উপর আরোপ করেননা। ভালো লেখার এটাও একটা শর্ত। ---------------------------------------------------------------------------------------------- অরিন্দম‚ ০৩|১২|২০১৫ শিবাংশুদা পক্ষপাত ও সহমর্মিতার প্রসঙ্গে আপনি নিখিলেশের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অবস্থানটি বলেছেন। হককথা, বহুবার পড়তে পড়তে এ বিশ্বাস আমারও হয়েছে নিখিলেশ রক্তমাংসের নয়। আপাত শক্তির সঙ্গে নিহিত শক্তিত দ্বন্দ্ব ও উত্তরনের প্রসঙ্গে লেখকের নিজস্ব মতটি প্রকাশ করার জন্য নিখিলেশের সৃষ্টি। আপনার প্রদত্ত সংজ্ঞা মাথায় রেখেই বলছি, সাহিত্যে তাহলে পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই। অথচ জীবনে আছে। কোন বিশেষ ঘটনায় কখনও কখনও মানুষ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়। আমার গদ্যের গুরু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ওপর পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। অসবর্ণ বিবাহে তাঁর আপত্তি কিন্তু আমার নিজের অবস্থান সেক্ষেত্রে অন্য। শীর্ষেন্দু যেসব চরিত্র একেঁছেন হতেই পারে তারা ওরকমই। যা দেখেছেন তাই দেখিয়েছেন। এমনতো নয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই শীর্ষেন্দুর চরিত্রদের প্রবল যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তাহলে কিন্তু বলতেই হয় সাহিত্যে পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র নেই। আর যা নেই তা নিয়ে অহেতুক চিন্তা করার দরকার কী! গদ্য পাঠের সময় যে জিনিসটা আমার কাছে প্রধান লক্ষ্যের বিষয় তা'হল চরিত্ররা কতটা বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য আর সময়ের চালচিত্রে যে তথ্য ও পারিপার্শ্বিক চিত্র দেখানো হয়েছে তা কতটা নির্ভরযোগ্য। সেখানে আপোষ চলেনা। অরিন্দম * যদি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র আপনার জানা থাকে জানাবেন| সেইক্ষেত্রে পক্ষপাত সহমর্মিতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হবে| -------------------------------------------------------------------------------------------------- শিবাংশুদা ০৩|১২|২০১৫ অরিন্দম, ১. "আপনার প্রদত্ত সংজ্ঞা মাথায় রেখেই বলছি, সাহিত্যে তাহলে পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই। অথচ জীবনে আছে। কোন বিশেষ ঘটনায় কখনও কখনও মানুষ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়।" স্পষ্ট হওয়া দরকার 'সাহিত্য' বলতে তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছো। 'পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র নেই' এ কথা আমি বলিনি। আমার বক্তব্য, 'পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্র'কে কেন্দ্র করে যে আখ্যান রচিত হয়, তা টিকে থাকে না। ২."এমনতো নয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই শীর্ষেন্দুর চরিত্রদের প্রবল যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ হতে হবে।" এমন শর্ত কে দিয়েছে? আমি তো নই নিশ্চয়ই? 'যুক্তিবাদ' বা 'নিরপেক্ষতা' দিয়ে আখ্যানের চরিত্রদের বিচার করা হয়না। ৩. "তাহলে কিন্তু বলতেই হয় সাহিত্যে পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র নেই। আর যা নেই তা নিয়ে অহেতুক চিন্তা করার দরকার কী!" পুনরায় একই উপপাদ্য। উত্তর একই। ৪. " যদি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পক্ষপাত দুষ্ট চরিত্র আপনার জানা থাকে জানাবেন়" লেখকের 'প্রতিষ্ঠা'র কোনও সার্বভৌম পরিভাষা নেই। যাঁদের অনেক বই বিক্রি হয়, তাঁরা কি 'প্রতিষ্ঠিত'? অথবা যাঁরা সরকারি পুরস্কারে ধন্য, তাঁরা? সে যাই হোক, লেখকের 'প্রতিষ্ঠা'র সঙ্গে লেখার প্রতিষ্ঠা সমান্তরাল নয়। আশি-নব্বইয়ের শীর্ষেন্দুর সঙ্গে দু হাজারদশের শীর্ষেন্দু মেলেন না। পাঠক হিসেবে শীর্ষেন্দুর লেখায় 'পক্ষপাত' দুষ্ট অংশটা এড়িয়ে চলি। একটা সুন্দর আপেলের গায়ে একটু থ্যাঁতলানো দাগের মতো। ------------------------------------------------------------------------------------------ প্রবুদ্ধ ০৩|১২|২০১৫ শিবাংশুদা‚ বুঝলাম যে লেখক চরিত্রের (কেন্দ্রীয় চরিত্রই ধরে নিচ্ছি কারণ তুমি বারবার সেখানেই ফোকাস করছো) প্রতি সহমর্মী হতে পারেন‚ কিন্তু পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন না| পক্ষপাতী লেখক তাঁর কল্পিত চরিত্রটিকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেননা। তবে লেখার জগতটা এতো বড়ো ও খোলা যে লেখক এটা করবেন ওটা করবেন না এমনটা দাগানো যায় না| আমি একটা উপন্যাসের কথা বলছি যেখানে বিষয়ের প্রতি‚ ও কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত রয়েছে| সহমর্মিতার তো কোনো প্রশ্নই নেই কারণ চরিত্রটি লেখকের নিজের ভাষাতেই "a vain and cruel wretch" ও "a hateful person." অন্য কেন্দ্রীয় চরিত্র‚ একটি নাবালিকা মেয়ে‚ তাকে লেখক দেখিয়েছেন শুধু ঐ হেটফুল পার্সনের চোখ দিয়েই| ফলে মেয়েটির চরিত্রটা একটা সেক্স ফ্যান্টাসির মোড়কেই বন্দী হয়ে আছে‚ কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েও তার নিজের কোনো বক্তব্যই নেই| বোধ হয় বুঝতে পারছো আমি লোলিটা-র কথা বলছি| পঞ্চাশের দশকে তো বটেই‚ এখনো‚ আমার তো মনে হয় ভবিষ্যতেও‚ মধ্যবয়সী কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের (নায়ক বলছি না) এক নাবালিকার সাথে যৌন সম্পর্কের মতো বিষয় পাঠককে এথিক্যালি বিব্রত করবে| লেখক সমাজ সংস্কারক নন‚ এথিকসের মতো ঘোলাটে জিনিস নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা থাকার কথাও নয়| তবু এমন একটা NSFW বিষয়‚ সেটা নিয়ে নবোকোভের রীতিমত পক্ষপাত ছিলো| কারণ এই একই বিষয়‚ যাকে হেবেফিলিয়া বলে‚ নিয়ে উনি আরো তিনটে উপন্যাস লিখেছিলেন (Laughter in the dark, Volshevnik, Origin of Laura)‚ কবিতা লিখেছেন (Lilith)‚ গল্প লিখেছেন (Nursery tale)‚ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লিখেছেন (Kingdom by the sea)| এমন একটা abhorring বিষয়ের ওপর এমন ফেটিশ‚ তোমার ডেফিনিশন অনুযায়ী অন্ধ আনুকূল্য‚ এটা নবোকোভের এক নম্বর পক্ষপাতিত্ব| দুই নম্বর পক্ষপাতিত্ব‚ বিষয়টাকে সচেতনভাবে গ্লোরিফাই ও মোর‌্যালাইজ করা| লোলিটা বইয়ের মধ্যে বই‚ ফরাসী সাহিত্যের পন্ডিত হুমবার্টের জবানীতে লেখা একটি কাল্পনিক বই "Lolita, or the Confession of a White Widowed Male" হুমবার্টের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে| এই কাল্পনিক বইয়ের শুরু থেকেই‚ এমনকি ড: রে নামে একজন চরিত্রের লেখা কাল্পনিক মুখবন্ধে কিভাবে হুমবার্টের হেবোফিলিয়াকে জাস্টিফাই করা হয়েছে দেখাই‚ "আমি হুমবার্টকে মহিমান্বিত করছি না..হুমবার্ট is horrible, he is abject, he is a shining example of moral leprosy...‚ কিন্তু how magically his singing violin can conjure up ...... a compassion for Lolita that makes us entranced with the book while abhorring its author!.... এই বই একটা poignant personal study‚ যার একটা মোরাল (নীতিকথা) আছে‚ to warn us of dangerous trends; to point out potent evils.." তেরো-চোদ্দ বছরের লোলিটাকে নিয়ে সারা উপন্যাস জুড়ে হুমবার্ট যা করে‚ সেটা রে-র নাম করে তো নোবোকভই magical singing violin বলে গ্লোরিফাই করলেন| আর হুমবার্টের সমস্ত কার্যকলাপকে তো বুনুয়েলের মতো নির্লিপ্তি বা গোদারের মতো ঘৃণা দিয়েই আঁকা যেতো‚ নীতিকথা কেন আনলেন নোবোকোভ? সেটা কি হুমবার্টকে পাঠক যাতে একটু সহানুভুতির সাথে দেখে তার জন্য? লেখক অবশ্যই হুমবার্টের সহমর্মী নন‚ কিন্তু পক্ষপাত? পুরো বইটা জুড়ে পাতায় পাতায় স্পষ্ট যে হুমবার্টের হেবোফিলিয়া থাকলেও সে মানুষ‚ আর ডোলোরেস (লোলিটা)-এর পরিচয় সে শুধু একটা সেক্স ফ্যান্টাসি| এর চেয়ে বেশী পক্ষপাত‚ এমন পৈশাচিক বিকৃত চরিত্রের ওপর‚ আমি অন্তত দেখিনি শিবাংশুদা| এক এক জায়গায় তো নোবোকোভ রীতিমত পাঠককে ম্যানিপুলেট করছেন যাতে সেও হুমবার্টের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেই বিষয়টাকে দেখে| তিন নম্বর পক্ষপাত| নোবোকোভের অনেক গুলি ব্যক্তিগত পছন্দ বা ফেভারিট জিনিস তিনি হুমবার্টের ওপর ন্যস্ত করেছেন| এটা একরকম আনুকুল্য| ছোটো করে সেগুলো বলছি| ১| নোবোকোভের খুব প্রিয় কবি ছিলেন পো| গল্পে হুমবার্টের প্রথম প্রেমিকার নাম অ্যানাবেল লী‚ পো-এর কবিতা অবলম্বনে| এই নামটা নিয়ে হুমবার্ট অবসেসড| হুমবার্ট লেখকের চোখে তত ঘৃণিত নন যতটা পাঠকের চোখে‚ তাই প্রিয় কবির কবিতার নাম জড়ালেন হুমবার্টের নামের সংগে| ২| নোবোকোভের আর এক প্রিয় লেখক লুই ক্যারোল‚ যাঁকে নোবোকোভ বলতেন The first Humbert| এটা যখন প্রথম জানতে পারি‚ সত্যি বলছি শিউড়ে উঠেছিলাম| লুই ক্যারোল আর হুমবার্ট একই ধরণের লোক‚ নোবোকোভ কি এই বলতে চেয়েছিলেন? ৩| হুমবার্টের চরিত্র কার ওপর ভিত্তি করে আঁকা? উত্তর হলো চার্লস চ্যাপলিন‚ যাঁর চার ক্রমানুক্রমিক স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের তফাত যথাক্রমে ১২‚১৯‚২১ ও ৩৬ বছরের! এখন কেউ যদি চ্যাপলিনের আদলে কোনো চরিত্রের জন্ম দেয়‚ সে কি শুধু চ্যাপলিনের হেবোফিলিয়াকেই ফোকাসে রাখবে‚ না কি সচেতনে‚ বা অবচেতনে‚ চ্যাপলিনের মহৎ মানবিকতাকে ঐ চরিত্রে বসিয়ে দেবে না? আর যে মুহুর্তে হুমবার্টকে মানবিক রংএ আঁকা হলো‚ এসে গেলো চরিত্রটির প্রতি পক্ষপাত| তাই সতেরো বছরের গর্ভবতী লোলিটাকে অর্থসাহাজ্য করার বর্ণণায় হুমবার্ট লেখকের সহানুভুতি পায়| ---------------------------------------------------------------------------------------------------

1078

1