শিবাংশু

পাঠক ও প্রতিস্বর

আজ সারাদিন আমি কিস্যু লিখবো না বলে ঠিক করেছি। এবার 'শিউলি পর্ব' নিয়ে একটু পড়তে হবে। মানে 'পড়তে' হবে। আদেশ হয়েছে 'শেষ থেকে শুরু' করার। কিন্তু বহুদিন হয়ে গেলো আমি আর 'শুদ্ধ পাঠক' নেই। যে কোনও লেখাই হোক, যে কোন লেখকই হোক, শুধু পড়ে যেতে পারিনা। ভিতর ভিতর নানা সলভেন্ট, রিএজেন্ট, ক্যাটালিস্টের ক্ষরণ চলতেই থাকে। লেখার চেয়ে র‌্যাডিক্যালের খোঁজখবর বেশি হয়ে যায়। অনেকটাই বেশি। সফল পাঠক হতে গেলে ভিতরে অনেকটা শাদা পাতা প্রয়োজন হয়। যেখানে ভালো লাগা, না লাগা'গুলি অগোছালো লিখে রাখা যায়। সেই পাতার অভাব বোধ করি এখন। তাই সৎ ভাবে কোনও লেখা সম্বন্ধে মতামত দিতে গেলে সময় আর শ্রম দুইই লাগে। দু'টোরই অভাব এই মূহুর্তে, আরো অনেক অভাবের মতো'ই খিন্ন করে। ------------------------------- রচনাবিচার করার নানা মাপদন্ড হয়। তবে 'শিউলিপর্বে'র লেখা নিয়ে কোনও অবস্থানে আসার আগে মনে রাখতে হয় এখানে সবাই ভিতরে ভিতরে লেখক। যতোটা বুকের ভিতর সৃজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন, ততোটা মুখের মানচিত্রে থাকেননা। লেখালেখি করে 'বিশিষ্ট' বা 'বড়ো' হতে গেলে যতোটা পার্থিব যুদ্ধবিগ্রহ করে নিজেকে কঠোর করে তুলতে হয়, ততোটা আগুনের জ্বালা এঁরা কেউ পেরিয়ে আসেননি। ঐ জ্বালাটা লেখার শরীরটিকে উজ্জ্বল করে। নয়তো আমি মনে করি একজন তথাকথিত 'অপরিচিত' লেখক আর 'লোকপ্রিয়' লেখকের সততার সোনায় খাদের পরিমাণ একই থাকে। একজন লোকপ্রিয় কথাকার অনেক বেশি অবহেলা, অপমান,ঘাম-অশ্রুর প্রস্তুতিপর্ব পেরিয়ে আসেন। তথাকথিত 'শৌখিন' লেখকদের সেই কৃষ্ণপক্ষটি সচরাচর পেরিয়ে আসতে হয়না। তাঁদের অন্য বিকল্প থাকে। যে লেখকের 'বিকল্প' যতো কম, তিনি ততো পরিণত কথাকার হয়ে উঠতে পারেন। ----------------------------- অতি পরিচিত মানুষজনের লেখালেখি নিয়ে মন্তব্য করার কিছু গোধূলিপর্যায় থাকে। সবটা আলো নয়, সবটা আলোহীনতাও নয়। যে দেখতে জানে, তার জন্য এই আলো 'কনে দেখা'র মূহুর্ত, যে জানেনা সে শুধু আঁধার দেখে। 'বাহ, খুব ভালো' জাতীয় এড়িয়ে যাওয়া উৎসাহ দেওয়াটা সহজতম। আবার 'ভালো লাগলো না' গোছের ঈষৎ রূঢ় প্রকাশভঙ্গিটিও বস্তুত 'এড়িয়ে যাওয়া'। ঐ গোধূলির বালাই বলা যায় একে। সব লেখকই নিজের সৃষ্টির প্রতি খুব স্পর্শকাতর হ'ন। সন্তানের মতো মায়া থাকে। তবে মনে রাখতে হবে যখনই কোনও লেখা পাঠকসাধারণের দরবারে পৌঁছে যায়, তখন তা 'সবার' হয়ে যায়। লেখকও সেই 'সবার' অংশমাত্র। তাঁকেও যথাসম্ভব নির্লিপ্ত, নির্বিকার স্থিতিশীলতা অবলম্বন করতে হবে। নয়তো যেকোন লেখার প্রতি 'বিরূপ' মন্তব্যকে লেখকের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ বোধ হতে পারে। এটা একান্ত অনভিপ্রেত। এভাবেই অনেক কমরেড ইন আর্মস দূরে চলে যায়। হয়তো সেটা ভালো'ই হয়। কারণ একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন তার আত্মবিশ্বাস। কলাত্মক গুণগুলি ম্লান হয়ে যাবে, যদি শিল্পী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। 'শিল্পী' হয়ে ওঠার চাপ সবার সয়না। সে চেষ্টা না করাই উত্তম। ----------------------- 'শিউলি পর্বে'র লেখাগুলিকে নিজের মতো করে বিভিন্ন ভাগে বেছে নিয়েছি। পর্যায়ক্রমে অতি সংক্ষিপ্ত কিছু একা'দোকা শব্দ ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা থাকবে হয়তো। সব লেখা নিয়েই যে লিখতে পারবো, এমন নয়। যদি এই সব এলোমেলো মন্তব্য কারো কাছে 'জ্ঞানদান' করার স্পর্ধা বোধ হয়, তবে নিরঙ্কুশ বর্জন স্বাগত। পাঠক হিসেবে যথাসম্ভব সৎ থাকাটা জরুরি। সে প্রয়াস থাকবে নিশ্চয়। আশা করি যাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা করবো তাঁরা পাঠকের প্রতিক্রিয়াটি উদার মনে গ্রহণ করবেন। ------------------------------------------------------------------------- মেয়েদের নিয়ে মেয়েদের লেখা --------------------------------- প্রচ্ছদচিত্রটিকে দিয়েই শুরু করি। এটিও তো একজন মেয়ের আঁকা এক মেয়ের ছবি। সোমা বিশিষ্ট শিল্পী। যতোদূর জানি স্বশিক্ষিত, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠার পিছনে যে প্রস্তুতি আছে সেটি স্বতঃসিদ্ধ। আমরা এ ধরণের প্রচ্ছদ প্রথম আঁকতে দেখি শ্রদ্ধেয় গণেশ পাইনকে, বহুকাল হলো। আনন্দবাজার গোষ্ঠীর শারদ সংখ্যাগুলিতে। সোমা সেই ধারাটিকেই গ্রহণ করেছেন। এটি বিকাশ বা সঞ্জয় ভট্টাচার্য, এমন কি সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের থেকেও আলাদা। বর্ণাঢ্য, সাবলীল। তবে শরৎঋতু কি শুধু অসুরনাশিনীর মৌরসিপট্টা? বাঙালির দুর্গা সোমার তুলিতে আসার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছেন পরবর্তী সংখ্যার অবকাশে। ---------------------------- 'দুর্গেশনন্দিনী' যদি প্রথম বাংলা 'উপন্যাস' হয়, তবে বাংলা পাঠকের অভ্যেস তৈরি করেছে এই জঁরের লেখালেখিই। বঙ্কিম ছাঁচটি নিয়েছিলেন ওয়াল্টার স্কটের থেকে। সেখানে ইতিহাস গৌণ, রোমান্সটি মুখ্য। আধারটি পাঠকের পোষকতা লাভ করে নিশ্চিত। এই মূহুর্তের বাংলা উপন্যাসের জগতে 'ঐতিহাসিক' রচনার যে মডেলগুলি রয়েছে, সেখানে শরদিন্দুর মডেলটি সব চেয়ে লোকপ্রিয়। তাঁর সাধুভাষা, তৎসম শব্দের অফুরান ব্যবহার, বিশেষতঃ স্তরে স্তরে কাহিনী বুনে যাবার ক্ল্যাসিসিস্ট গঠন বাংলা পাঠককে টেনে রাখে। এটি একান্তভাবে বঙ্কিমী স্টাইল। পরীক্ষিত ও সফল। মিলনান্তিক ও সুখদায়িনী। গত পাঁচ দশকে জনপ্রিয় 'ঐতিহাসিক' উপন্যাস যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে প্রধান বিমল মিত্র ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। রচনার স্বল্প সংখ্যা স্বীকার করেও যাঁদের লেখা উল্লেখযোগ্য তাঁরা হলেন, অমিয়ভূষণ মজুমদার, অসীম রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, বাণী বসু, প্রমুখ। এঁরা কেউ বঙ্কিমী ঢংটির অনুসরণ করেননি। তাই এই মূহুর্তে বাংলায় 'ইতিহাস'কে ভিত্তি করে লিখতে গেলে একটা নির্দিষ্ট অবস্থান নিতে হবে। ------------------------- 'শিউলি পর্বে' শেষ থেকে শুরু করতে গেলে যা প্রথমে আসবে তা শ্রী'র লেখা ' বাবুল মোরা'। এ প্রসঙ্গে বলি অবধের সাম্প্রতিক, অর্থাৎ গত দুশো বছরের ইতিহাস নিয়ে কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু হজরত মহল'কে নিয়ে পৃথক কোনও লেখা চোখে পড়েনি। সেদিক দিয়ে শ্রী একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় বেছেছেন। হজরত মহল'কে নিয়ে নানারকম মিথ রয়েছে। তবে বেশিটাই সাহেবদের লেখায়। যেখানে তাঁকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, অহংকারী, অপরিণামদর্শী হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস রয়েছে। শ্রী অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন। স্বাগত প্রয়াস। যেখানে খুব বেশি ঘটনার ঘনঘটা নথিবদ্ধ নেই, সেখান থেকে 'গল্প' গড়ে তুলতে মুন্সিয়ানা লাগে। নতুন চরিত্র, পটভূমি, ঘটনাক্রম কল্পনা করতে হয়, তবে প্রামাণ্য ইতিহাসকে বাঁচিয়ে। এক্ষেত্রে শ্রী সফল। হজরত মহল চরিত্রটিকে নিয়ে তিনি যা করতে চেয়েছেন, অনেকটাই সফল হয়েছেন। বিশেষ করে একজন প্রশিক্ষু কথাকার হিসেবে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে কয়েকটি লক্ষণ নিয়ে তাঁকে একটু চিন্তা করতে অনুরোধ করবো। আমার মনে হয়েছে পাঠক হিসেবে তাঁর শরদিন্দু আচ্ছন্নতা লেখক হিসেবে নিজস্ব স্ফূর্তিকে একটু ব্যহত করেছে। ইতিহাসভিত্তিক হতে গেলে সাধু ও তৎসম শব্দের প্রয়োগ সব সময় খুব একটা জরুরি নয়। নাট্যমূহুর্ত তৈরি করার সময় সংক্ষিপ্ততম শব্দ সংযোজন করতে হয়। নয়তো টেনশনটা ধরে রাখা যায়না। প্রতিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। শুধু রেখাচিত্রটিই থাকবে। অধিক বিশদ হবার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আমিই সে' বা অমিয়ভূষণের ' গড় শ্রীখন্ড' উল্লেখ করা যায়। এহ বাহ্য, সনিষ্ঠ প্রয়াস হিসেবে শ্রী'র এই লেখাটি নিশ্চয় অভিনন্দনযোগ্য। আমি এই সুযোগে তাঁকে সেটাই জানাচ্ছি। ----------------------------------- ইতিহাসের একটি পর্ব নিয়ে সুচেতনার 'ময়নামতী'ও একটি সংযোজন। সুচেতনাকেও একটা কঠিন কাজ করতে হয়েছে। যতোটুকু লেখা আছে, সন্ন্যাসী ও নর্তকীর গল্প, সেখানে গল্পের উপকরণ কিছু নেই বললেই চলে। কল্পনাকে অনেকটা স্বাধীনতা দিতে হবে। সুচেতনা নিয়মিত লেখক। অনেকদিন ধরেই লেখেন, ফলে লেখার ক্র্যাফটটিতে নিজস্ব ভাবনাচিন্তা থাকে। এই লেখাটিতে নর্তকী ও সন্ন্যাসীকে কেন্দ্রে রাখার চাপে অন্য চরিত্র সৃষ্টি করার অবকাশ পাওয়া যায়নি।লেখাটির একটি মেসেজ আছে। তার উপর গুরুত্ব বেশ স্পষ্ট। সুচেতনার গদ্য সর্বদাই সুললিত হয়। তবে এই লেখাটিতে বিষয়বিচারে ভাষার লালিত্য একটু প্রত্যক্ষ হয়ে গেছে। অনেকসময় এই লক্ষণটি গদ্যের গতিকে ঈষৎ ব্যহত করে। ------------------------------------------ আমরা যখন থেকে লেখালেখি শুরু করেছি, কয়েকজন গদ্যকারকে কোনও বাছবিচার না করে শুধু পড়ে গিয়েছি। উদ্দেশ্য থাকতো, তাঁদের বাংলালেখার কারিগরিটিকে বুঝে ফেলা। এই সব লেখকদের মধ্যে আছেন, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী এবং অবশ্যই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন আবহ, ভিন্ন সম্পর্ক, ভিন্ন মানসিকতা, সব ক্ষেত্রেই তাঁরা কীভাবে গদ্য গড়ে তুলছেন সেটা শেখার চেষ্টা করেছি। এঁরা ছাড়াও অনেক শ্রদ্ধেয় গদ্যকার আছেন বাংলায়। তাঁরাও শেখান। খুব সযত্নে কার্যকরীভাবে শেখান। কিন্তু উল্লেখিত লেখকদের লিখনকৌশল থেকেই বিংশশতকের দ্বিতীয় অর্ধে বাংলা আখ্যানগদ্যের নির্দেশিকাটি রচিত হয়েছে। এই সময় যাঁরা গদ্য লিখতে ইচ্ছা করেন, আমি তাঁদের এই সব লেখকদের লেখা অভিনিবেশ সহকারে পড়তে বলি। লিখতে বসে বা পাঠক হিসেবে আমিও তাঁদের দিকনির্দেশগুলি মেনে চলি। ------------------------------ জল হলেন এই পাতার সব চেয়ে অনুচ্চস্বরের কথাকার। নিয়মিত লেখেন, অনেক লেখেন। সব যে পড়ার সুযোগ হয়, তা নয়। কিন্তু তিনি কখনও উচ্চকিত হ'ননা। এই সংযমটি পাঠক হিসেবে আমার ভালো লাগে। তাঁর 'স্রোতে বয়ে যাওয়া' লেখাটি আমার বেশ ভালো লাগলো। শুধু নামটির সঙ্গতি পেলুম না। গল্প বলার শিল্প তাঁর বেশ আয়ত্ব। কথকের কাজটিতেও তিনি নিপুণ। যে মেয়েটিকে কেন্দ্রে রেখে গল্পটি বোনা হয়েছে তাকে আমি চিনতে পারছি। এখানেই লেখকের বড়ো সাফল্য। তবে শব্দব্যবহার ও বাক্যসন্দর্ভ রচনায় দু'চার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া যেতো। সংলাপে কয়েক স্থানে আবেগকে একটু শিকল দেওয়া যেতো হয়তো। যেহেতু তিনি নিয়মিত লেখালেখির শ্রমস্বীকার করেন, তাই আমি নিশ্চিত তাঁর গদ্য আগামীদিনে আরো ধারালো হবে। তাঁকে ও তাঁর লেখাকে স্বাগত। ---------------------------------------------- উমালক্ষ্মীর লেখা 'অঙ্গীকার' বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে তিন প্রজন্মের মেয়েদের রোজনামচা। দ্বিতীয় মাত্রা হিসেবে তাঁদের পুরুষদের উপাখ্যানও রয়েছে। চরিত্রগুলি পরিচিত, তাদের যাপনভূমিও পরিচিত, তাই চ্যালেঞ্জটিও অধিক। মুখপাতের প্রথম স্তবকটি যেন 'ভূমিকা'। ছোটোগল্পের জন্য অধিকন্তু। তার পরেই চরিত্ররা আসতে শুরু করছে। তারা আমাদের দৈনন্দিন চেনা জীবনের অংশ। তবু তাদের নিয়ে গল্প কেন হয়? এই জন্যই হয়, এতো চেনা হওয়া সত্ত্বেও তাদের আচারব্যবহারের কয়েকটা দিক চিরকাল 'অচেনা' থেকে যায়। আপাতভাবে যুক্তিবদ্ধ জীবনে কিছু প্রবৃত্তি, কিছু দুর্বলতা জীবনের অঙ্কটিকে গরমিল করে দেয়। নারীপুরুষের পারস্স্পরিক আদানপ্রদানের ছন্দটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। বদলে যাওয়াটাই সত্য। কেন বদলাচ্ছে, সেটা গৌণ। আশাপূর্ণা দেবীর লেখায় আমরা এই টানাপড়েনের দীর্ঘ ইতিবৃত্ত দেখে থাকি। এই গল্পে প্রতিমা'র চরিত্রটি কেন্দ্রীয়। এই চরিত্রটির সঙ্গে বাকিদের সম্পর্করচনাটিই লেখকের উপজীব্য। তিনি সেটা করেছেন বিশ্বস্তভাবে। সেখানে তিনি সফল। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির উজ্জ্বলতাটি কখনও একমাত্রিক লাগতে পারে। সংসারে কেউই দেবদূত নয়। সবাইকেই মাটির তৈরি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাকিদের স্বভাবের আলোছায়া নিয়ে অল্পবিস্তর উল্লেখ থাকলেও প্রতিমা'র জন্য শুধুই 'আলো'। শেষ পরিচ্ছেদে তিয়াসকে লেখা রিনোর চিঠিটিই যদি 'অঙ্গীকার' হয়, তবে মনে হয় তা নিয়ে আরেকবার ভাবা দরকার। ভবিষ্যতের অনিশ্চিত দোলাচলে নয়, এই মূহুর্তের কঠিন বাস্তবটিই অঙ্গীকারের ভিত্তিভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পেলে লেখকের উদ্দেশ্য অধিক সফল হতো। সমস্ত ঐহিক প্রতিকূলতা থেকে প্রিয় নারীকে বাঁচিয়ে রাখার যে সাধ পুরুষ সতত পোষণ করে, বাস্তবে তা সম্ভবপর হয়না অধিকাংশ সময়েই। কারণ পরিস্থিতিটিই সচরাচর বিপরীত হয়। নারীর কাছেই পুরুষ আশ্রয় খোঁজে। প্রকৃতির ইচ্ছেটাই সেরকম। কিছু শব্দ বাক্যগঠনের সঙ্গে হয়তো পুরো মেলেনি। তবে তা নগণ্য। বর্ণনায় ডিটেলসের কাজ খুব ভালো। উমাকে স্বাগত। --------------------------- বৃষ্টি লিখেছেন 'সময়-অসময়'। প্রেম ও বিপন্নতার গল্প। আশ্বাস ও নির্ভরতার মানচিত্র। এই গল্পের ভাষাশৈলিটি কাব্যিক। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কবিতার ঊদ্ধৃতিও রয়েছে। রয়েছে কৈশোর প্রেমের গড়ে তোলা নানা মূহুর্ত। লেখকের তৎপর শ্রম ও যত্নের ছাপ রয়েছে পুরো লেখাতেই। তবে সংকটের আখ্যানটি প্রেডিক্টেবল। কারণ মূল চরিত্রগুলির যে বিকাশ লেখক দেখিয়েছেন সেখানে মানুষিক দ্বিধা, স্ববিরোধের কোনও মাত্রা নেই। একমাত্রিক প্রেমসম্পর্কে নিশ্চিন্ত আশ্বাস অবশ্যই থাকে, কিন্তু জীবন বোধ হয় আরেকটু জটিল। লেখক আশাবাদের যে বার্তাটি দিতে চেয়েছেন, সেখানে তিনি সফল। কিন্তু পাঠক হয়তো ঘটনাক্রমে আরো একটু মোচড় আশা করবে। যেকোনও প্রেম সম্পর্কই নিরঙ্কুশ হয়না। সংকোচ, সংশয়ের দোলাচল না থাকলে সম্পর্কের রক্তস্রোতে উষ্ণতার সঞ্চার হয়না। বৃষ্টি যখন এর পরের গল্পটি লিখবেন তখন অনিশ্চিতির মাত্রাটিকেও যদি বিবেচনার মধ্যে রাখেন, তবে খুশি হবো। দীর্ঘ লেখাটির জন্য তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই। -------------------------- আজ এতোটাই থাক.....

1127

10

অপন

বাংলা আধুনিক গান

শিমুল জামান আমার এখানে পাওয়া মেয়ে| শিমুল বাংলা দেশী তবে থাকে এদেশে|

3675

6

Somen dey

প্রিলিউড ইন্টারলিউডে লুকিয়ে থাকা সেই সব বিস্ময়ের নাম সলিল চৌধুরি

আমাদের সনাতন গানে তেমন ভাবে কোনো prelude বা interlude থাকত না । শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আলাপ দিয়ে শুরু করা আর আর গানের মাঝে গায়ক গায়িকার দম নেবার জন্যে কিছু ক্ষন একই রাগের চলন বাজিয়ে দিতেন , এরকমই রেয়াজ ছিল । অন্য গানে আলাপ নেই তবে গানের মাঝে ঐ গানের একটি কলি বাজিয়ে দেওয়ারই রীতি ছিল । এ দেশে সবাক সিনেমা আসার পর সিনেমায় গান দেওয়ার প্রচলন হল । সিনেমার পর্দায় নায়ক নায়িকাদের গানে লিপ দিতে দিতে কিছু সময় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল খানিকটা ব্যাতিক্রম আনার জন্যে । সেই সময়টুকু ভরিয়ে দেওয়ার জন্যে প্রয়োজন হল prelude , interlude এ কিছু মিউজিক পিস জুড়ে দেওয়ার । কিন্তু ক্রমশ সব আধুনিক গানেই prelude , interlude দেওয়া রীতি হয়ে দাঁড়ালো । যে সব কম্পোজাররা এই prelude , interlude কে শুধু filler হিসেবে না দেখে , গান কে সম্পুর্ণ ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যাবার বাহন বলে ভাবতেন তাদের মধ্যে অন্যতম সলিল চৌধুরি । তাঁর গানে prelude , interlude র ব্যাবহার রীতিমত গবেষনার বিষয় হতে পারে ।আমার সে এক্তিয়ার নেই । একজন সাধারণ শ্রোতা হিসেবে আমি আমার মত করে একটু আধটু বিস্ময়ের সন্ধান করতে পারি । বাঁশির সঙ্গে সলিল চৌধুরির সম্পর্ক প্রায় তার অক্ষর পরিচয়ের বয়স থেকে ।বালক সলিল আসামের চা বাগানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াবার সময় হাতে থাকত একটা আড়বাঁশি । সে বাঁশি্র মায়া ছাড়তে পারেন নি সারা জীবনে । কিন্তু একেবারে ছোট বয়স থেকে প্রচুর Western classical শোনার সুযোগ ঘটে ছিল ,তার পিতৃদেবের এক সাহেবের কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রচুর রেকর্ড সমেত একটি গ্রামাফোন পেয়ে যাওয়ার সুবাদে । সব জিনিয়াসদেরই বাল্যকালের দেখা আর শোনার মধ্যে , তাদের ভবিষ্যতে মহীরুহ হবার বীজ লুকিয়ে থাকে । সলিল চৌধুরিরও তাই হেয়েছে । সারা জীবন তাকে হন্ট করেছে সরল সহজ আড়বাঁশির সুর আর Western classical এ অনেকরকমের যন্ত্রসঙ্গীতের জটিল সিম্ফনি । তার গানের ভাঁজে ভাঁজে এই দুয়ের মিলে যাওয়ার অনেক নমুনা লুকিয়ে আছে । আমরা তাঁর গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাই যে এই সব অনবদ্য prelude , interlude গুলো কে লক্ষ করিনা । দু একটা উদাহরন দিলে হয়ত বোঝা যাবে prelude , interlude কি কান্ডটা করতে পারে । মনে পড়ছে লতাজীর একটি গান – ‘যদি বারণ কর তবে গাবো না গাবো না ’ গানটি সবাই অনেকবার শুনেছেন । আর একবার শুনুন এ গানে বাঁশির ব্যাবহার শোনার জন্যে । আড়বাঁশি থেকে ট্রেবল ফ্লুট , সোপার্নো ফ্লুট , ইংলিশ ফ্লুট কত রকমের বাঁশি যে ছিল এ গানের ইন্টারলুড বাজনায় ।কিন্তু শেষ পর্যন্ত আড় বাঁশি বাজি মাত করেছে , গানটির ফাঁকে ফাঁকে লতার গলায় ‘কুহু কুহু’ গাওয়ার সঙ্গে কি ভাবে বাঁশির কুহু তান মিশে যাচ্ছে , শুনে দেখুন । https://www.youtube.com/watch?v=eUgz1P-pUjc এ রকম আরো একটি উদাহরণ, সবিতা চৌধুরির গাওয়া – ‘ও আমার পদ্ম পাতার দিন ঝরে গেল / টলমল টলমল করে মুকুতার মত ছদ্মবেশে ছিল’ যেমন অনবদ্য কম্পোজিশন তেমনি অসাধারণ গাওয়া । একেই বলে সার্থক যুগলবন্দী । কিন্তু গান নয় আমরা আজ শুনব বাজনা । গান শুরু হচ্ছে আড়বাঁশির ইন্টালিউড দিয়ে । কিন্তু প্রিলিউডে চেলো ট্রাম্ফেটের মত পাশ্চাত্য বাজনা চুটিয়ে বাজান হচ্ছে , কিন্তু গানটিকে বার বার খেই ধরিয়ে দিচ্ছে সেই বাঁশি । যদিও গানের সুরে আপাত-চটুলতা আছে কিন্তু গানের কথায় আছে লুকানো বিষন্নতা , সেই ফাঁকটুকু কে ভরিয়ে দিচ্ছে বাঁশি । https://www.youtube.com/watch?v=ZbQ8bcKU8Oc পাশ্চাত্য ধ্রুপদ সঙ্গীতে খুব প্রচলিত obbligato র ব্যাবহার ।বাখ-বেটভেন রা আকছার এর ব্যাবহার করেছে তাদের সিম্ফনিতে । obbligato সম্মন্ধে খুব অল্প কথায় বলতে গেলে বলতে হয় মূল সুরের একটা সমান্তরাল অন্য সুর সৃষ্টি করা । এবং point এবং counter point বাজনা কে অদ্ভুত ভাবে মিলিয়ে দেওয়া ।মানে কমপোজার নিজেই একটা সঙ্কট তৈরি করবেন আবার সেই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসবেন তাঁর সৃষ্টি দিয়ে । এ দেশে সলিল চৌধুরিই প্রথম এনেছেন prelude , interlude এ obbligato র ব্যাবহার । একটা গানের ইন্টারলিউড শুনলে হয়ত বোঝা যাবে অরুন্ধুতির হোমচৌধুরির গাওয়া গান – চঞ্চল সোনালি পাখনায় উড়ে গেল সেই সব দিন -  ।গানে মন না দিয়ে একটু কান পেতে শুনুন ইন্টারলিউডের বাজনায় । গানের কথায় প্রায় একই রকম ভাবনা । বিষন্নতাকে সুরে বাঁধা । কিন্তু চলমান জীবনের ছন্দ যেন ধরা পড়ছে obbligato র ব্যাবহারে । https://www.youtube.com/watch?v=qHk0cp7wfKY আর একটা গান । হাজার বার শোনা  । তবু প্রতিবার শোনায় যেন নতুন কিছু আবিস্কার করা যায় । একবার গান থেকে কান সরিয়ে ইন্টারলিউডের কি ঘটছে বুঝবার চেষ্টা করা যাক । অন্তরার আগে যখন স্যাক্সোফোন বেজে উঠছে , তখন অন্য একটা সুর যেন তাকে বাধা দেবার চেষ্টা করছে , সমুদ্রের ঢেউয়ের উলটো দিকে যেমন একটা চোরা স্রোত তাকে আটকাতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না শেষ পর্যন্ত  । আর বাঁশি তো ঠিক তার আসল কাজ টি করে যাচ্ছে । https://www.youtube.com/watch?v=SpynPBaOiJo পাশ্চাত্য সঙ্গীতে আর এক ধরনের orchestration আছে যাকে বলে Chamber music . । অন্য concert এর সঙ্গে এর তফাৎ এখানে প্রতিটি বাদ্য যন্ত্রের আলাদা আলাদা ভাবে ভুমিকা আছে । তারা সব মিলে একটা আওয়াজ সৃষ্টি করে পালা করে আলাদা আলাদা ভাবে বেজে এক অসাধারন ঐক্যতান সৃষ্টিকরে । এমন একটি উদাহরণ পাওয়া যাবে ‘এমন সঘন বরষায় তুমি কেন এলে না’ গানটিতে ।এও এক যুগলবন্দী , তবে বাপ-বেটির । ভায়োলিন , চেলো , বাঁশির সঙ্গে কি ভাবে পাল্লা দিচ্ছে সেতার এবং তার পরে আমাদের ঘরের তবলা এসে গানটির হাত ধরে ফেলছে । https://www.youtube.com/watch?v=dMwzhS_Qwhw সলিল চৌধুরি এমন বহু বিস্ময়ের মণিমুক্ত ছড়িয়ে রেখেছেন তাঁর সৃষ্টির আড়ালে আবডালে । তাকে আবিস্কার করতে করতে দিব্যি একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায় । শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত নব্বই । তিনি দীর্ঘজীবি হন ।

1051

8

প্রবুদ্ধ

কবিতার দেশে ‚ ছবির দেশে

ফিয়ারফুল সিমেট্রী| সিমেট্রীর খোঁজেই তো একজন শিল্পী সারাজীবন ঘুরে মরে| তাজমহলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় সামনে একটা জিওমেট্রীর খাতা খোলা আছে| মূল সৌধটা তো ছেড়েই দিলাম‚ চার দিকের চারটে মিনার দেখে মনে হয় একটার সামনে আয়না রেখে তাতেই উল্টোদিকের মিনারটাকে দেখছি| সিকান্দ্রার গ্যালারীতে সেই পর পর সাজানো আর্চগুলো‚ একটার উপর একটাকে বসিয়ে দিলে একটাই আর্চ হয়ে যাবে‚ আক্ষরিক অর্থেই এক চুলের ফারাকও নেই| যামিনী রায়ের রাধাকৃষ্ণ যাঁরা দেখেছেন‚ একটা জিনিস খেয়াল করবেন‚ মিরর ইমেজের ব্যবহার ত্রিমাত্রিক আর্কিটেকচারে জনপ্রিয় হলেও কিন্তু দ্বিমাত্রিক ছবিতে বিশেষ ব্যবহৃত হয় না‚ বোধ হয় একটা প্লেনে একই অবজেক্ট দুই দিক থেকে দেখতে একঘেয়ে লাগে| কিন্তু রাধাকৃষ্ণে সেই একঘেয়েমি নেই‚ কারণটা হলো রঙের বৈচিত্র| একই সিমেট্রী দেখি ঘজলে| প্রতি দুই লাইন বা মতলা-র শেষে একটা শব্দ ঘুরেফিরে আসবে‚ তাকে বলে রদীফ| এই রদীফের ঠিক আগের শব্দটাকে বলে কাফিয়া‚ প্রতি দুই লাইনের কাফিয়াগুলোতে থাকবে ছন্দমিল| ও আকে খাব মেঁ তসকীন-এ-ইজতিরাব তো দে ওয়ালে মুঝে তপিশ-এ-দিল‚ মজাল-এ-খাব তো দে করে হ্যাঁয় কত্ল লগাবত মেঁ তেরা রো দেনা তেরী তরহ কোঈ তেঘ-এ-নিগহ কো আব তো দে.... দেখুন‚ তো দে এই দুটো শব্দবন্ধ হলো রদীফ‚ বারে বারে আসবে| আর মজাল-এ-খাব‚ আব এই শব্দগুলো হলো কাফিয়া‚ যাতে ছন্দমিল থাকবে| এই রদীফ আর কাফিয়ার খেলায় ঘজলে যে সিমেট্রী আসে সেটাই ঘজলের আসল মজা| তো এই সিমেট্রীকে উইলিয়াম ব্লেক কেন ফিয়ারফুল বলেছেন সেটা দেখা যাক| ব্লেকের কবিতা টাইগার (The Tyger) : Tyger Tyger, burning bright, In the forests of the night; What immortal hand or eye, Could frame thy fearful symmetry? In what distant deeps or skies. Burnt the fire of thine eyes? On what wings dare he aspire? What the hand, dare seize the fire? And what shoulder, & what art, Could twist the sinews of thy heart? And when thy heart began to beat, What dread hand? & what dread feet? What the hammer? what the chain, In what furnace was thy brain? What the anvil? what dread grasp, Dare its deadly terrors clasp! When the stars threw down their spears And water'd heaven with their tears: Did he smile his work to see? Did he who made the Lamb make thee? Tyger Tyger burning bright, In the forests of the night: What immortal hand or eye, Dare frame thy fearful symmetry? ব্লেক অনেকটা জেকিল-হাইড চরিত্র‚ ওঁর সৃষ্টিগুলো প্রথমবার দেখলে মনে হবে কোনো বিস্মিত বালকের দৃষ্টি দিয়ে উনি দুনিয়াটাকে দেখছেন‚ একটা রহস্য‚ একটা মিথের কুয়াশা ঘিরে আছে ওঁর ছবি বা কবিতায়| কিন্তু আর একটু গভীরে তিনি একজন র‌্যাডিক্যাল দার্শনিক যাঁকে বুঝতে গেলে মাথা ঘামাতে হয়| জেরুজালেমের মতই টাইগারেও অসংখ্য প্রশ্ন তুলেছেন| কে তোমায় (বাঘকে) তৈরী করলো? সে কি একই লোক যে ভেড়া তৈরী করেছে? (ভেড়া বলতে এখানে Lamb of God‚ সেই প্রবাদটা মনে পড়ে যায়‚ The hands that rocked the cradle are the hands that rule the world)| কোন শিল্প পারে তোমার পেশীর কম্পনকে ধরতে? কোন পাথরে তৈরী তোমার শরীর‚ কোন কামারের চুল্লীতে তৈরী হয়েছে তোমার মস্তিষ্ক? সবচেয়ে বড়ো দুটো প্রশ্ন‚ তোমাকে বানানোর সাহস (দু:সাহস) কার হলো? আর‚ তোমাকে দেখে কি সেই শিল্পী তৃপ্তির হাসি হেসেছিলো? জেরুজালেমের মতই ছটফটানি‚ প্রশ্নের পর প্রশ্ন| বাইবেলের প্রসঙ্গ তো এসেছেই অবধারিত (জেরুজালেমের জেসাস এখানেও ল্যাম্ব অফ গড)| বাইবেলের বুক অফ জোব-এ জোব ঈশ্বরকে নানা প্রশ্ন করে‚ কিন্তু উত্তর পায় না‚ শুধু এটা বোঝে যে ঈশ্বরকে বোঝা মানুষের সাধ্য নয়‚ ঈশ্বর প্রসঙ্গে কে কি কেন এসব প্রশ্ন উত্তরহীন| কিন্তু ঈশ্বরের অসীমত্বের কাছে এই সহজ সমর্পণের বাইরে ব্লেকের এক নাস্তিক দর্শন ছিলো| ওঁর মিথোলোজিক্যাল লেখায় একজন প্যারালাল ঈশ্বর আছেন‚ তিনি এক স্বর্গচ্যুত eternal prophet‚ নাম Los. এই লোস পৃথিবীতে থাকেন‚ একজন কামারের মতো হাতুড়ি আর চুল্লী দিয়ে সৃষ্টি করেন প্রাণ‚ কামারের হাপর ফুসফুসের মতই ওঠানামা করে| এবার ঐ চতুর্থ প্যারাটা আবার পড়ুন| ব্লেক ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করছেন‚ তুমি নও‚ প্রাণের সৃষ্টি লোসের হাতে‚ তোমার স্বর্গে নয়‚ আমাদের পৃথিবীতে| ব্লেক আরো বলছেন‚ সৃষ্টিকর্তার দায় শুধু মনের খেয়ালে সৃষ্টি করেই শেষ হয়না‚ সে সৃষ্টিকে সহ্য করার মতো দমও থাকা চাই স্রষ্টার| এখানে ব্লেক রোমান্টিক পিরিয়ডের প্রবল ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনকে সতর্ক করছেন‚ জেরুজালেম-এর Satanic mills-এর মতো| আর তার চেয়েও বড়ো ভবিষ্যতবাণী করে গেলেন‚ শেলীর ফ্রাংকেনস্টাইনের দৈত্য থেকে আজকের IS‚ সব সৃষ্টিই তো স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে| সৃষ্টির সুন্দরতার (সিমেট্রী) পেছনে এই ভয়‚ ফিয়ারটাই বাস্তব সত্য| এটাই ব্লেকের ফিয়ারফুল সিমেট্রী| তাই সিকান্দ্রার ঐ পরপর আর্চগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একবার বুক কাঁপবেই‚ এই সিমেট্রী আমায় গ্রাস করবে না তো? আজকে মানুষও তো সেই একই ছকে বাঁধা‚ সিমেট্রিক্যাল এক ব্ল্যাক হোলের সামনে দাঁড়িয়ে‚ যে ব্ল্যাক হোল তার নিজেরই সৃষ্টি| (চলবে)

1036

17

Somen dey

অন্য-গান এর সন্ধানে

অন্য-গান এর সন্ধানে ************* ‘সরাসরি আমি জানতে চেয়েছি দু মুঠো অন্ন কিনা কেও যদি ক্রোধে চীৎকার করে মানবধিকার কিনা কান পেতে কোনো কান্নার ধ্বনি তুমি কি শুনতে পাও মৌনতা কোনো জবাব না বন্ধু তুমি উত্তর দাও ...... ।’ --- এককালে বাংলা গান সম্মন্ধে প্রবাদ ছিল ‘কানু বিনা গীত নাই’ । আসলে তখন সমাজে অনাত্নীয় নরনারীর মধ্যে প্রেম হওয়াটা চালুই ছিল না । কারণ মেয়েদেরতো বিয়েই হয়ে যেত বয়স বারো তেরো ছুঁলেই । তাই জীবনে দাম্পত্য প্রেমের বাইরে আর কোনো প্রেম ছিল না, কিন্তু প্রেমের ক্ষিদে তো ছিল  ।তাই বঙ্কিমচন্দ্র অবধি গল্প লিখিয়েদের প্রেমের কথা বলতে ইতিহাসের কাল অথবা পরকীয়া আশ্রয় করতে হয়েছে । আর গান লিখিয়েরা গানের মধ্যে দিয়ে সেই প্রেমের যাবতীয় কথা বলা হত রাধা কৃষ্ণের নাম দিয়ে । তার পর মোটামুটি বিশ-তিরিশের দশকে যখন বাঙালি মেয়েরাও অবিবাহিত অবস্থায় কালেজে যেতে শুরু করল , তখনি বাঙ্গালির জীবনে যুবক যুবতীদের মধ্যে প্রেমের অঙ্কুরোদগম ঘটলো । আর তখনই কানু বিনেও প্রেমের গান লেখা হতে লাগলো । এর আগে অষ্টাদশ শতকেই রামনিধি গুপ্ত অবশ্য ‘কানু বিনে’ ব্যাক্তি প্রেমের গান লিখেছিলেন । কিন্তু তার তার জন্যে তাকে নাকি প্রচুর হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয়ে ছিল । বাংলা ‘আধুনিক গান’ এর জন্ম এবং প্রসার আসলে এ দেশে রেকর্ড ব্যাবস্থা চালু হবার পরেই ।আসলে ‘আধুনিক’ তকমাটি বাংলা গানের হটাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন  । রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখিত একটি চিঠিতে লিখেছিলেন ‘আমার আধুনিক গানে রাগ-তালের উল্লেখ নেই বলে আফসোস করেছিস’ ।কিন্তু ঐ একবারই তার পর আর কোনো লেখায় তিনি আধুনিক গান শব্দবন্ধটি ব্যাবহার করেন নি । তাই এই আধুনিক গান নামটি ঠিক এখান থেকে নেওয়া হয়নি নয় । ‘আধুনিক গান’ তকমাটি খুব সম্ভবত ব্যবসার সুবিধার্থে রেকর্ড কোম্পানিদেরই দেওয়া । আধুনিক বাংলা গানের কথা কি হতে চাইবে , কি বলতে চাইবে ,কি ধরতে চাইবে , কি ছুঁতে চাইবে, কি গ্রহন করতে চাইবে , কি বর্জন করতে চাইবে এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে অনেকবার । মীমাংসা হয়নি । তাই গানের বিষয় কতটা আধুনিক হলে সে গান আধুনিক গান বলা যাবে তা নিয়ে কোথাও কোনো ব্যাখ্যা নেই । তেমনি কতটা রাগের প্রভাব থাকলে সে গান কে আধুনিক না বলে রাগাশ্রয়ী বলা হবে , বা গানের বিষয় কতটা গ্রামীন হলে তাকে লোকগীতি বলা যাবে এ রকম কোনো ব্যাখ্যাও কোথাও পাওয়া যাবে না । ইদানীং খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠা গান ‘তু লাল পাহাড়ীর দ্যাশে যা , রাঙ্গা মাটির দ্যাশে যা ’ গানটিকে সবাই লোকগান বলে উল্লেখ করে থাকেন । কিন্তু এটি বছর চল্লিশ আগে একজন নাগরিক কবি অরুণ চক্রবর্তীর রচনা । সেই হিসেবে এটিকে আধুনিক গান বলাই উচিত । তেমনি অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গান শচীনদেব বর্মনের গাওয়া ‘আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে’ এই গানের ভাষা সে সময়ের তূলনায় যথেষ্ট আধুনিক হওয়া সত্বেও এই গান কে অনেকেই রাগাশ্রয়ী গানে তকমা দেন । আপাতত শ্রেণী বিভাগের চুল চেরা বিশ্লেশনে না গিয়ে আমরা আধুনিক বাংলা গানের প্রচলিত ধারণাটিকে আশ্রয় করি ।এবং আপাতত আধুনিক গানের সুরের কথা ভুলে গানের কথা নিয়ে দু কথা বলার চেষ্টা করি । একটা বিশাল অংশের বাংলা গানের শ্রোতাদের এমন একটা ধারণা প্রায় বদ্ধমূল হয়ে আছে যে সেই স্বর্ণযুগের গানে গানের ভাষা যেমন সম্বৃদ্ধ ছিল এখনকার গানের ভাষা সেই তূলনায় বড়ই দুর্বল । সত্যিই কি তাই ? গ্রামাফোন ডিস্কে আধুনিক গানের রেকর্ড যখন থেকে শুরু হল সেই বিশের দশক থেকে আশির দশক অবধি এই বিরাট সময় টায় কয়েক হাজার বাংলা গান লেখা হয়েছে । যাঁরা গান লিখেছেন তাঁরা অনেকেই খুব উচ্চস্তরের গীতিকাব্য রচনা করেছেন ।কিন্তু সবাই নয় ।অনেক গানেরই কথা ঘুরপাক খেয়েছে একটা চেনা বৃত্তের চারিদিকে । কিন্তু খুব ভালো সুর তাকে উৎরে দিয়েছে । যুদ্ধ ,মন্বন্তর ,দেশভাগ থেকে নকশাল আন্দোলনের মত আলোড়ন তোলা ঘটনা , যা বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিটি ধারায় গভীর ভাবে ছাপ ফেলেছিল , বাংলা গান কিন্তু এ সবের থেকে উদাসীন থেকেছে অদ্ভুত ভাবে । প্রায় সব গীতিকাররাই ব্যাক্তি প্রেমের আকূলতার বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলবার চেষ্টা করেননি ।তাই বাংলায় ‘অন্যগান’ এর সংখ্যা খুব অল্প । পিট সিগার বলেছিলেন – Right song at the right time can change history । যেমন করে David Hasselhoff এর Looking for freedom গান বার্লিনের প্রাচীর ভাঙতে উৎসাহিত করেছিল হাজার হাজার মানুষকে , যেমন করে Stevie Wonder এর গান Happy Birthday , মার্টিন লুথার কিং এর জন্মদিন কে জাতীয় ছুটি ঘোষনা করার জন্যে আমেরিকায় একটি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল , যেমন করে John Lennon এর গান Imagine there’s no heaven সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে শান্তির প্রতি সমর্থন জাগিয়ে তুলেছিল ,যেমন করে Louis Armstrong এর What a Wonderful world সারা পৃথিবীর মানুষ কে প্রকৃতি প্রেমিক হতে উৎসাহী করেছে , যেমন করে Bob Dylan এর ‘Any day now, any day now I shall be released’ সিভিল রাইটস আন্দোলন কে উজ্জীবিত করেছিল সে রকম ভাবে আমাদের সামাজিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেবার মত আমাদের কোনো গান নেই । কিন্তু আমরা আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে বাংলা আধুনিক গানের উৎসমুখে আমরা পেয়েছি দুজন বিরাট মাপের সঙ্গীত স্রষ্টা কে, যাঁরা গানের ভাষা এবং সুর এই দুই জগতেই অসীম ধন রেখে গেছেন ।বলা বাহুল্য তাঁদের নাম রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল । আজ অবধি আমাদের আধুনিক গানের ভাষা এই দুজনের দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত । কিন্তু তার পর তো সমাজ বদলেছে অনেক ভাবে । গানের ভাষার কি কোনো দায় নেই বদলে যাবার ? যেহেতু রেকর্ডের গানের সঙ্গে একটা বানিজ্যের সম্পর্ক আছে , তাই রেকর্ডে গাওয়া আধুনিক গানের জন্ম লগ্ন থেকেই গানের ভাষার উপর কোথাও একটা বানিজ্যিক নিয়ন্ত্রন পরোক্ষ ভাবে কাজ করতে লাগল ।আধুনিক কবিতার যেহেতু production cost নেই বললেই চলে ,এবং তাকে বিপনন করতে হয় না তেমন ভাবে ,তার ওপর কোনো বানিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কেও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল না। কবিতা একেবারে স্বাধীন ভাবেই চলতে লাগলো কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ।আধুনিক বাংলা গান কিন্তু সে ছাড়পত্র পেলো না ।তাকে পণ্য হয়ে থাকতে হল। সেই থেকে আধুনিক কবিতা আর আধুনিক গানের - দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে ।আর যত দিন গেছে দুটি পথের দুরত্ব বাড়তে বাড়তেই থেকেছে  । রবীন্দ্র-নজরুল যুগ শেষ হবার পরে , শুধু প্রেমেন্দ্র মিত্র যেহেতু সিনেমা জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন , তিনি একজন প্রথম সারির কবি হওয়া সত্বেও কিছু আধুনিক গান ও লিখেছিলেন । অন্য আধুনিক কবিরা সে পথ মাড়ান নি বললেই চলে । যেন যাঁরা গান লেখেন তাঁরা গীতিকার , কবি নন , এবং যাঁরা আধুনিক কবিতা লেখেন তাঁরা কবি গীতিকার হতে পারে না , এ রকমই একটা অঘোষিত ভাগাভাগি হয়ে গেল । এর ফলে যা ঘটলো , তার একটা দিক হচ্ছে আধুনিক গানে প্রেমই হয়ে উঠল নিরাপদ আশ্রয় ।সমাজ যতই বদলাক প্রেমের আবেগ বিশেষ বদলায় না । তাই প্রেমের গান বিষয় হিসেবে চিরকালীন এবং প্রেম শুধু নিরাপদই নয় , নিরপেক্ষ বিষয়ও বটে ।কারোর দিকে বা কিছুর দিকে আঙ্গুল তোলা নেই ।তর্ক ঝগড়া রাগারাগির সম্ভাবনা নেই । গান মস্তিস্কের বিষয় নয় শুধু হৃদয়ের বিষয় এ রকম একটা ভুল ধারণা কি করে যেন আম জনতার মনের মধ্যে বসে গেল । তাই সেই প্রণব রায়-অজয় ভট্টাচার্য-সুবোধ পুরোকায়স্থ এর যুগ থেকে শ্যমল গুপ্ত-গৌরীপ্রসন্ন- পুলক বন্দোপাধ্যের যুগ অবধি গানের কথায়, কয়েকটি উজ্বল ব্যাতিক্রম ছাড়া , প্রেমের গন্ডীর বাইরে গিয়ে কিছু অন্বেষণের কথা তেমন করে ভাবেন নি ।সুরকারদের মধ্যেও comfort zone হয়ে উঠল প্রেম । একদা আই পিটিএর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারনে জোতিরীন্দ্র মৈত্র , পরেশ ধর , হেমাঙ্গ বিশ্বাস , সলিল চৌধুরি এবং তার পরে অভিজিৎ , প্রবীর মজুমদার , অনল চট্টোপাধায়রা অন্য গানের ধারা কে মাঝে মাঝে সঞ্জীবিত করেছেন । কিন্তু বাংলা আধুনিক গান একটু মাথা নেড়ে চেড়ে আবার ফিরে গেছে নিরাপদ প্রেমের চেনা আশ্রয়ে , বকুল বিছানো পথের ছায়াচ্ছন্ন রোমান্টিকতায় ।কিন্তু গৌরীপ্রসন্ন-পুলক বন্দোপাধ্যায়–মুকুল দত্ত দের পরে একটা সময় গানের কথা ক্রমশ দুর্বলতর হতে থাকল ।নতুন করে তেমন গুণী গীতিকারদের দেখা পাওয়া গেল না । আর সেই সব মেলোডির যাদুকররা একে একে চলে যাওয়ায় , দুর্বল কথাকে সুরের জোরে উৎরে দেওয়াও যাচ্ছিল না আর । এর ফলে বাংলা গানের জগতে একটা সার্বিক দৈন্যতা নেমে এল । ঠিক সেই সময়টায় সুমন এলেন এবং বাংলা আধুনিক গানের জগত অন্য-গানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো ।গানের বিষয় আবার অনেক দিনের পর প্রেমের গন্ডি ছাড়িয়ে অনেক দিকে ছড়িয়ে গেল । আধুনিক গান সত্যিই আধুনিকতার হাত ধরল ।কবিতা এবং গান আবার কাছাকাছি এল । নচিকেতা-অঞ্জন দত্ত রাও লিখলেন কিছু অন্য-গান । এই অধ্যায় নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে তাই এই নিবন্ধে এই বিষয়টাকে সরিয়ে রাখছি । কিন্তু তার পর কি হল ? বাংলা গানের বিষয় কি তার অভিমুখ বদলাল নাকি ফিরে গেল তার চিরচেনা আমি-তুমি-চাঁদ-তারা-ফুলের জগতে । এর মধ্যে বাংলা-ব্যান্ড এর জন্ম হল । তাদের সুযোগ ছিল গানের কথায় নতুন কিছু বলার চেষ্টা করার । কিন্তু ‘চন্দ্রবিন্দু’ ছাড়া অন্য দল গুলি তাদের গানের মিউজিক্যাল এরঞ্জমেন্ট বদলানো নিয়ে যতটা ভাবনা চিন্তা করল , গানের কথা নিয়ে তেমন নতুন কিছু ভাবনা দেখা গেল না । *** সুমন ভবিষ্যত গানের কাছে আবেদন রেখেছিলেন যুগান্তরের খবরটা যেন গানই বয়ে আনে  । একুশ শতক এসেছে । যুগান্তরের সন্ধান গান এখনো দিতে পারেনি । তবু কোথাও কিছু বদলাচ্ছে হয়ত ।এই আকালেও কেও গান কে অস্ত্র করতে চাইছে । যে কটি পংত্তি দিয়ে এই লেখা শুরু করেছি তা একটি গানের অংশ বিশেষ । গীতিকারের নাম সৈকত কুন্ডু । সৈকত এই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গীতিকার বলে আমার মনে হয় । ব্যাক্তি প্রেমের গন্ডি ছাড়িয়ে সে যাবার চেষ্টা করছে অন্য গানের ভোরে । সৈকতের লেখা আর একটি সাম্প্রতিক সময়ের আধুনিক গান আমাকে চমকে দিয়েছে । তার কথা গুলি এই রকম । ‘সিঁদুর-কৌটো উলটে গেছে নীল আকাশের গায় মেঘ ছুঁয়ে মন রঙের চেয়ে রঙ্গীন হতে চায় কোন বধু-সাজে গোধূলি-তরণী উঠলে হটাৎ হেসে... একটা মেয়ে আকাশ দেখছে গণধর্ষন শেষে । ভাঙ্গা চাঁদ পড়ে আছে বহুদুরে , চুড়িগুলো আশেপাশে ছিটে ফোটা লাল রক্তের দাগ লাজুক সবুজ ঘাসে ... ছিঁড়ে যাওয়া সাড়ি উড়ছিল তার একটি প্রান্তে হাওয়া এখনও কাঁপছে , বজায় রাখছে দু চোখে শুকিয়ে যাওয়া ; চিত হয়ে স্থির পাথরের মত , সব পেয়েছির দেশে একটি মেয়ে আকাশ দেখছে গণধর্ষন শেষে ।...’ এই দুটি গান যে এলবামে আছে সেটির নাম ‘কিছু রোদ্দুর পড়ে রইল’ । কণ্ঠ দিয়েছেন তপোলব্ধা ভটাচার্য । সুর করেছেন রত্নদীপ আর সৌগত । এরা সবাই কৃষ্ণনগরের ছেলেমেয়ে । কৃষ্ণনগর শহরের বয়স কোলকাতার চেয়ে বেশি । তাই ভাবনায় হয়ত কোলকাতার চেয়ে এগিয়ে থাকে । আর একটি সৈকত কুন্ডুর লেখা গান শুভমিতার গাওয়া ,যেন সুমনের ছলাৎ ছল নদীর জলের গল্প বলা যেখানে শেষ হয়েছে , তার রেশ ধরে উঠে আসে - শোনো সুজন বন্ধু শোনো শোনো নদীর হাওয়া শোনো গাছের পাতায় পাতায় রোদের আসা যাওয়া শোনো ঘর ভেঙ্গে যে দাঁড়ায় এসে একলা নদীর ধারে তার দুচোখে তোমার দু চোখ ছলকে উঠতে পারে চলকে ওঠে বুকের কথা ঢেউয়ের ফনা ছুঁয়ে কারণ আমি সেই নদীটার জলের ওপর শুয়ে রোজ ধুয়ে যায় জীবন আমার পার ভাঙ্গে দুই ধারে ছলাৎ ছলাৎ গল্প নদীর কান্না হতেও পারে ... সৈকতের লেখা শ্রীকান্ত আচার্যর গাওয়া একটি গান ইতি মধ্যেই জনপ্রিয় হয়েছে । সে গানের ভাষায় এক আশ্চর্য টান আছে সোঁদা মাটির ।এ গান শুনলে খুব নিরাসক্ত থাকা যায় না , এক লাইন শুনলে পরের লাইনটার জন্যে কান পাততে ইচ্ছে করে । এই নড়বড়ে সময়ে যদি একটা গান সেটা পারে তাহলে সেটাই আর কম কি ! ‘তুমি ঠিক যেমন আছো তার থেকে ঠিক দুই পা দূরে আমাদের ছোট্টো নদী বাঁকছে মেঠো বাঁশীর সুরে, গেঁয়ো পথ গাইছে বাউল বট ঝুরিটার দোলনা ফাঁকা, ছায়া রোদ শিরায় শিরায় মৌরি ফুলের গন্ধ মাখা, যা ছিল তেমনি আছে প্রশ্ন তুমি যাচ্ছো কিনা আমি সেই নদীর বাতাস আমার কোনো নাম দিয়ো না’ ****

1155

4

অপন

ভারতীয় বাজনা

সরোদ আলি আখবর খান

1136

7

দীপঙ্কর বসু

রাগরাগিনীর পরিবেশন কাল ও তার কিছু রহস্য

একটি দিনের ২৪ ঘন্টায় প্রকৃতির রূপ এর বৈচিত্র্য ,আলোর ঔজ্জ্বল্যের তারতম্য সবই যে মানব মনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে বোধ হয় কোন সংশয়ের অবকাশ নেই, যদিও তার সঙ্গে সঙ্গীতের কোন সরাসরি সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়াটা রসিক জনোচিত হবেনা ,কেননা সঙ্গীত জিনিষটাই একটা Abstract ধারণা ,যার সঙ্গে বস্তুজগতের সম্পর্কটা নিছক রসের সম্পর্ক । প্রশ্ন উঠতে পারে রস জিনিষটা কি ? শাস্ত্র বলে,রস হল আস্বাদন মাত্র । প্রসঙ্গত একটি রবীন্দ্রগানের কথা মনে পড়ে – “ ওগো আমার চির অচেনা পরদেশী , ক্ষণতরে এসেছিলে নির্জন নিকুঞ্জ হতে কিসের আহ্বানে ।। যে কথা বলেছিলে ,ভাষা বুঝি নাই তার , আভাষ তারি হৃদয়ে বাজিছে সদা যেন কাহার বাঁশির মন মোহন সুরে …” ফিরে আসি আবার পুরণো কথায় । ভোরের আবহ যখন তার অন্তরের বার্তা বয়ে আনে মানুষের অন্তরে-তার আবেগকে উদ্দীপ্ত করে তোলে , মানুষের অন্তরে আনন্দরসের সঞ্চার ঘটে , সেই উদ্দীপ্ত আবেগজনিত বিদেহী আনন্দের প্রকাশমাধ্যম হিসেবে মানুষ তখনই সঙ্গীতের হাওয়ামহল গড়ে তোলে। কাজেই ভৈরব রাগে ভোরবেলাকার চিত্রের প্রতিলিপি খুঁজতে চাওয়া বা পুরবীতে দিনান্তের চিত্ররূপ দেখতে চাওয়া বৃথা । বিশ্বপ্রকৃতির কোন অজানা নিকুঞ্জ থেকে ,কোন অচেনা পরদেশী কি বার্তা যে রেখে যায় তা বুঝি বা নাই বুঝি ,সেই বার্তার আভাষটুকু পেয়েই মানবহৃদয় তার জবাব দেয় সুরের বিচিত্র আঁকিবুঁকি কেটে সঙ্গীতের ভাষায় । “ তোমার সুরেরই প্রতিধবণি তোমারে দিই ফিরায়ে…” এখানেই মানুষ বিশ্বস্রষ্টার সমকক্ষ । যুগযুগান্তর ধরে মানুষের এই সৃষ্টি রহস্যের দিকে শ্রদ্ধাবনত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি কি অসাধারণ কল্পনাশক্তি ও কলানৈপুন্যের সংমিশ্রনে গড়ে উঠেছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামোটি । দিন ও রাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টার কালসীমায় আসে দুটি সন্ধিক্ষণ । প্রথমটি আসে ঊষালগ্নে ,যখন রাতের আঁধার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে দিনের আলোর প্রকাশ ঘটে ,এবং অপরটি দেখা দেয় সন্ধ্যা হবার মুখে ,যখন দিনের আলো স্তিমিত হতে হতে এক সময়ে অন্ধকারের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় । এই দুটি বিশেষ সময়ে পরিবেশন যোগ্য রাগগুলি,যা সন্ধিপ্রকাশ রাগ নামে পরিচিত - ব্যবহৃত স্বরসমষ্টির দিকে সতর্ক দৃষ্টি দিলে কয়েকটি বিশেষ রাগলক্ষণ চোখে পড়বে। যথা উভয় শ্রেণীর সন্ধিপ্রকাশ রাগে ঋষভ (ঋ)ও ধৈবত(দ) স্বর দুটি কোমল , এবং একই সঙ্গে গান্ধার(গ) এবং নিষাদ(ন) স্বরগুলি শুদ্ধ । কেবল প্রাতকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে মধ্যম (ম)স্বরটি শুদ্ধ এবং সান্ধ্যকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে মধ্যমের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় –অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগে তীব্র মধ্যম (হ্ম) ব্যবহার করা হয় । বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য একটি তালিকা পেশ করা যাক – তালিকায় কিছু পরিচীত রাগের স্বরসমষ্টির দিকে নজর দিলে সন্ধিপ্রকাশ রাগের যে লক্ষনগুলির উল্লেখ করলাম তার একটি রূপরেখা পাওয়া যাবে নিচের তালিকায় দেওয়া কিছু পরিচীত রাগের স্বরসমষ্টির দিকে নজর দিলে । হিন্দুস্থানী পদ্ধতিতে স্বরগুলিকে যে ভাবে লেখা হয় কম্পিউটারে ঠিক সেই ভাবে লেখার কিছু অসুবিধা হওয়াতে আমি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত আকার মাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে স্বরগুলিকে চিহ্নিত করেছি – যেমন ষড়জ=স ,কোমল রিষভ=ঋ ,শুদ্ধ রিষভ= র ,কোমল গান্ধার= জ্ঞ শুদ্ধ গান্ধার-গ, মধ্যম=ম।তীব্রবা কড়িমধ্যম=হ্ম,কোমল ধৈবত=দ ,শুদ্ধ ধৈবত=ধ কোমলনিষাদ=ণ এবং শুদ্ধনিষাদ=ন দিবা প্রথম প্রহর ( সূর্যোদয় থেকে সকাল ১০টা আনুমানিক) রাগের নাম ব্যবহার্য স্বর ঠাট বাদী –সম্বাদী স্বর --------------------------------------------------------------------------------- ভৈরব স ঋ গ ম প দ ন ভৈরব বাদী – দ ,সম্বাদী ঋ যোগিয়া স ঋ – ম প দ ন ভৈরব বাদী – ম ,সম্বাদী -স গুনকেলী স ঋ – ম প দ – ভৈরব বাদী –দ, সম্বাদী - ম ভৈরবী স ঋ জ্ঞ ম প দ ণ ভৈরবী বাদী – ম ,সম্বাদী - স রামকেলী স ঋ গ ম হ্ম প দ ণ ন ভৈরব বাদী – দ ,সম্বাদী – ঋ -------------------------------------------------------------------------------------- তালিকাটিতে উল্লিখিত দুটি রাগের স্বরসমষ্টিতে কিছু বৈচিত্র লক্ষনীয় ।যেমন নিয়ম অনুযায়ী ভৈরবীতে গান্ধার ও নিষাদ স্বর দুটিই শুদ্ধ হবার কথা। এবং রামকেলীতে শুদ্ধ ও তীব্র – এই দুই মধ্যমএর প্রয়োগ তথা ভৈরবী রাগে কোমল গান্ধার এবং নিষাদ স্বরের ব্যবহার ব্যতিক্রমী । সম্ভবতঃ এই রাগ গুলির ব্যতিক্রমী স্বরের প্রয়োগ তোড়ি রাগের আঙিনায় সচ্ছন্দে প্রবেশ করার উপায় হিসেবে দেখা যেতে পারে । পরমেল প্রবেশক রাগ হিসেবে এগুলিকে চিহ্নিত করাটা ঠিক কতটা শাস্ত্র সম্মত হবে জানিনা তবে এই রাগগুলির উল্লিখিত স্বরবিকৃতি সেই দিকেই ঈঙ্গিত করে বলে আমার বিশ্বাস । তোড়ি ঠাটের স্বরগুলি হল স ঋ জ্ঞ হ্ম প দ ন । ভোরের আবহ তার বর্ণ ,গন্ধ সবকিছু মিলিয়ে আনন্দরসের বার্তা পাঠায় সংবেদনশীল মানুষের হৃদয় তন্ত্রীতে তা আন্দোলন জাগায় সেখানে জেগে ওঠে সুর । এ জিনিষ পদার্থ বিদ্যায় বর্ণিত sympathetic Vibration এর কথা স্মরণে আনে । ক্রমশঃ

6075

8

ঝড়

রূপকথা - উপকথা - পুরাণ

কালী সৃষ্টি ,স্থিতি এবং বিনাশ দেবী , মহাবিদ্যা , মাতৃকা মন্ত্র ওঁ ক্রীং কাল্যই নমঃ, ওঁ কপালিন্যই নমঃ, ওঁ হ্রিং শ্রিং ক্রিং পরমেশ্বরি কালিকে স্বাহা গায়ত্রীːকালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি। তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ। অস্ত্র খড়্গ সঙ্গী শিব Mount শৃগাল (শিবা) কালী বা কালিকা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত ধর্মাবলম্বীরা কালীর পূজা করেন। তন্ত্রশাস্ত্রের মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম দেবী। শাক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদিকারণ মনে করে। বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। পুরাণ ও তন্ত্র গ্রন্থগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে তাঁর মূর্তিতে চারটি হাতে খড়্গ, অসুরের ছিন্নমুণ্ড, বর ও অভয়মুদ্রা; গলায় মানুষের মুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা; বিরাট জিভ, কালো গায়ের রং, এলোকেশ দেখা যায় এবং তাঁকে তাঁর স্বামী শিবের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ব্রহ্মযামল মতে, কালী বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।[১] কালীর বিভিন্ন রূপভেদ আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন মন্দিরে "ব্রহ্মময়ী", "ভবতারিণী", "আনন্দময়ী", "করুণাময়ী" ইত্যাদি নামে কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা ও পূজা করা হয়।[২] আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। এছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা ও জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় প্রতি অমাবস্যা এবং প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবারে কালীপূজা হয়ে থাকে। কালী দেবীর উপাসকরা হিন্দু বাঙালি সমাজে বিশেষ সম্মান পেয়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ। কালীকে বিষয়বস্তু করে রচিত "শ্যামাসংগীত" বাংলা সাহিত্য ও সংগীত ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কালী সাধকেরা এবং কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বিশিষ্ট কবিরা অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত লিখেছেন। "মৃত্যুরূপা কালী" হল দেবী কালীকে নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা। ভগিনী নিবেদিতা মাতৃরূপা কালী নামে একটি কালী-বিষয়ক বইও রচনা করেছিলেন। ব্যুৎপত্তি ‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ, যার অর্থ “কৃষ্ণ, ঘোর বর্ণ” (পাণিনি ৪।১।৪২)। মহাভারত অনুসারে, এটি দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী একটি দানবীর নাম (হরিবংশ, ১১৫৫২)। ‘কাল’, যার অর্থ ‘নির্ধারিত সময়’, তা প্রসঙ্গক্রমে ‘মৃত্যু’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এর সমোচ্চারিত শব্দ ‘কালো’র সঙ্গে এর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। কিন্তু লৌকিক ব্যুৎপত্তির দৌলতে এরা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে গেছে। মহাভারত-এ এক দেবীর উল্লেখ আছে যিনি হত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন। তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক টমাস কবার্নের মতে, এই শব্দটি নাম হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে আবার ‘কৃষ্ণবর্ণা’ বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। [] রূপভেদ তন্ত্র ও পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের কথা পাওয়া যায়। তোড়ল তন্ত্র মতে কালী অষ্টধা বা অষ্টবিধ। যথা – দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালী। মহাকাল সংহিতা অনুসারে আবার কালী নববিধা। এই তালিকা থেকেই পাওয়া যায় কালকালী, কামকলাকালী, ধনদাকালী ও চণ্ডিকাকালীর নাম। অষ্টধা কালী মূল নিবন্ধ: দক্ষিণাকালী দক্ষিণাকালীর কালীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি। ইনি প্রচলিত ভাষায় শ্যামাকালী নামে আখ্যাতা। দক্ষিণাকালী করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তাঁর বামকরযুগলে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়্গ; দক্ষিণকরযুলে বর ও অভয় মুদ্রা। তাঁর গাত্রবর্ণ মহামেঘের ন্যায়; তিনি দিগম্বরী। তাঁর গলায় মুণ্ডমালার হার; কর্ণে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস; কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। তাঁর দন্ত ভয়ানক; তাঁর স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং মহাদেব শিবের বুকে দণ্ডায়মান। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিনী। তাত্ত্বিকের তাঁর নামের যে ব্যাখ্যা দেন তা নিম্নরূপ: দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁর নাম দক্ষিণাকালী। তাঁর পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়। সিদ্ধকালী কালীর একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা হয় না; তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্র-এ তাঁকে দ্বিভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্যত্র তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। তাঁর মূর্তিটি নিম্নরূপ: দক্ষিণহস্তে ধৃত খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নিঃসৃত অমৃত রসে প্লাবিত হয়ে বামহস্তে ধৃত একটি কপালপাত্রে সেই অমৃত ধারণ করে পরমানন্দে পানরতা। তিনি সালংকারা। তাঁর দক্ষিণপদ শিবের বুকে ও বামপদ শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত। মূল নিবন্ধ: গুহ্যকালী গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের নিকট অপ্রকাশ্য। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তাঁর রূপকল্প ভয়ংকর: গুহ্যকালীর গাত্রবর্ণ গাঢ় মেঘের ন্যায়; তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা; কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র; স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা; বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা; নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা। মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তাঁর মন্ত্র বহু – প্রায় আঠারো প্রকারের। মূল নিবন্ধ: মহাকালী তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়্গ,চক্র,গদা,ধনুক,বাণ,পরিঘ,শূল,ভূসুণ্ডি,নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এঁর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাঁকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর প্রথম চরিত্র শ্রী শ্রী মহাকালীর ধ্যানমন্ত্র এইরূপ ওঁ খড়্গং চক্রগদেষুচাপপরিঘান শূলং ভুসূণ্ডিং শিরঃ| শঙ্খং সন্দধতীং করৈস্ত্রিনয়নাং সর্বাঙ্গভূষাবৃতাম্ || নীলাশ্মদ্যুতিমাস্যপাদদশকাং সেবে মহাকালিকাম্ | যামস্তৌচ্ছয়িতে হরৌ কমলজো হন্তুং মধুং কৈটভম্ || মূল নিবন্ধ: ভদ্রকালী, ভদ্রকালী নামের ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গাত্রবর্ণ অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তাঁর হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ও পাশযুগ্ম। গ্রামবাংলায় অনেক স্থলে ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল – ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা’।[] মূল নিবন্ধ: চামুণ্ডা চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর বধের নিমিত্ত দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তাঁর গাত্রবর্ণ নীল পদ্মের ন্যায়, হস্তে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তাঁর পূজা করেন। অগ্নিপুরাণ-এ আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ - নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা । খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।। বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্দ্ধাধোভাগতঃ পুনঃ । দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।। কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা । লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।। কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা । এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে। মূল নিবন্ধ: শ্মশানকালী কালীর "শ্মশানকালী" রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে আমমাংস খাচ্ছেন। তাঁর গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তাঁর বাঁ-পাটি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন। কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়। শ্রীকালী গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তাঁর কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিনী ও সর্পযুক্তা।

1322

28

মানব

ইছামতী

বৃষ্টি তুই ****************************** কে জানত তোকে আজও পাব কে জানত তোর সাথেই খাব ঝালমুড়ি বাইপাসে বসে। তোকে নিয়ে ভেবে ভেবেই শেষে ছন্দ গিয়েছে জানলার কাঁচে মিশে অথবা মেঘেদের দেশে। ঘুম থেকে উঠেই কাপে কফি জোটেনি তো কোনদিন, আশায় থাকি বর্ষাতির আলিঙ্গনে। ছাদ থেকে জল পরে রোজ আসবে এক ফালি রোদ ভাবি মনে মনে।

934

12

Somen dey

নাগরিক হেমন্তিকা

আজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জানলার পর্দা সরাতেই ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল এক রাশ হাওয়া ।তাকে আমি চিনি । সে হাওয়ার ডাক নাম শিরশির, আর ভালো নাম হিমেল ।নবীন অভিনেতার স্টেজে প্রথম এপিয়ারেন্সে দেওয়ার মত উত্তেজনা তার হাবে ভাবে । বেসিনের কল খুলতেই যে জল হাতে এসে পড়ল সেও দিল এক দিনবদলের আগাম খবর । তাহলে কি বিদায় শরৎ , বিদায় শেফালি - সময় যে তার হল গত / নিশি শেষের তারার মত ? বাংলা ক্যালেন্ডার বলছে এখন মধ্য-কার্তিক । মানে হেমন্তর তো এসে যাওয়ারই কথা । আমাদের ছোটো বেলার টেক্ট বইতে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় আস্থা রেখে সব ঋতুর জন্যে দু মাসের কোটা ভাগ করে দেওয়া হয়ে ছিল ।কিন্তু ঋতুরা তো আর তেমন বাধ্য নয় , পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঘন্টা বেজে গেলেই লক্ষী ছেলের মত খাতা জমা দিয়ে চলে যাবে । ঋতুরঙ্গ নাটকে শরৎ আর হেমন্তের রঙ্গমঞ্চে exit আর entry নিয়ে বোঝাপড়ার বিস্তর গন্ডগোল আছে ।মাঝে সাঝে এ ওর ডায়লগ বলে দেয় ভুল করে । অথবা ইচ্ছে করেই করেই হয়ত ওরা এ ওর এলাকায় করে ফেলে একটু আধটু ওভারল্যাপিং । দুই ঋতুর জন্যে বেঁধে দেওয়া বেড়ার মাঝে আছে ভারত-বাংলাদেশ ছিট মহলের ‘তিনবিঘা করিডোর’ এর মত বেশ খানিকটা কাঁটাতারবিহীন জায়গা। যেখান দিয়ে মাঝে মধ্যে ওপারের আয়েষারা এপারের খাল বিল থেকে কলমি শাক তুলতে চলে আসে , মাঝে মাঝে এ পারের অর্চনারা ও পারের পুকুর থেকে গেঁড়ি গুগলি ধরতে চলে যায় । তা নিয়ে অবশ্য বিশেষ বিবাদ বাধে না । আসলে হেমন্ত তো আর হেমন্ত মুখুজ্জের মত বড় জাতের স্টার গায়ক নয় । তার আসা যাওয়ায় বিশেষ হাঁক ডাক নেই ।সে আসে ধীরে যায় লাজে ফিরে ।বিশেষ করে এই প্রাণহীন শহরে । তাই তেমন করে তার দিকে কেও নজর করে না । হ্যাঁ নজর করেছিলেন একজন । তার নাম জীবনানন্দ দাশ । তিনি ছিলেন হেমন্ত-অন্ত প্রাণ । হেমন্তের রুপে বেবাক মজে ছিলেন সারা জীবন । কত কবিতায় যে কতভাবে হেমন্ত তার কাছে ধরা দিয়েছে । হয়ত আজকের মত এমনই এক হেমন্তের সকাল বেলায় তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল – ‘ শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা রেখে অলস গাঁইয়ার মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার – চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান , হয়তো বিষন্নতার কুয়াশা জড়ানো , ধুসর শুন্যাতায় মগ্ন, এক উদাসীন , দুখজাগানিয়া হেমন্তের সঙ্গে হয়তো তিনি তাঁর নিজের খুব মিল খুঁজে পেতেন । তাই বার বার নানাভাবে ফিরে এসেছে হেমন্ত তাঁর কবিতায় । যে হেমন্ত শুধু এক ঋতু নয় যেন এক তাঁর নিজস্ব পৃথিবী যেখানে জীবনের প্রতি তীব্র ভালোবাসা হাত ধরে থাকে এক নিরুক্ত অনাসক্তি । যে বাংলাদেশ কে তিনি দেখেছিলেন ,চিনেছিলেন, ভালবেসেছিলেন সে বাংলা দেশের ভিতরে যেন আর একটা বাংলাদেশ – অপার্থিব , মায়াময় ,রহস্যাবৃতা – তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে গঙ্গাফড়িং , পানকৌড়ি , শ্যামা পোকা , বেতের নরম ফল , ধুঁধুলের বীজ , শালিখ, খঞ্জনা , মুথা ঘাস , হিজলের ছায়া , কলমীর ঘ্রাণ ।সেখানে হেমন্ত এলে সব যেন বদলে যায় – ‘ঢের কথা ব’লে তবু এক আকাশের মত নিঃশব্দতা হৃদয় আকাঙ্ক্ষা করে-শর-বনে বিজন বাতাস পানকৌড়ি’র ডাক-শীতের অস্পষ্ট গন্ধ-বিকেলের রোদ নদীতে দুইটি রাজহাঁস এরা সবই নিঃশব্দতা নিঃশব্দতা যত দূর চ’লে যেতে পারে এদের সবেরই মুখোমুখি ছায়া-হৃদয়ের ভুলে একটি হেমন্ত ঋতু কাটাতেছে মানুষের মতন আকারে।‘ শুধু নিসর্গের মোহ নয় হেমন্তের বাংলা কতটা রুপসী হতে পারে তার সন্ধান তিনিই জানতেন ।তাঁর ব্যাক্তিগত সফলতাহীন , বিষাদময় , ক্লিষ্ট জীবনে দু দন্ড শান্তি আর এক আধ খানা লুকানো বিস্ময় মনের অন্তপুর থেকে আহরন করে তাঁর জীবনকে এনে দিতে পারত একমাত্র হেমন্তই – ‘…… জীবন অনেক দেয়- তবুও জীবন আমাদের ছুটি দেয় তারপর- একখানা আধখানা লুকানো বিস্ময় অথবা বিস্ময় নয়- শুধু শান্তি- শুধু হিম কোথায় যে রয়েছে গোপন অঘ্রাণ খুলেছে তারে- আমার মনের থেকে কুড়ায়ে করেছে আহরণ। ’ আমাদের নাগরিক জীবনে হেমন্ত বিড়ম্বিত হয় বারে বারে । আমরা বরং শীতের জন্যে দিন গুনি । শীত যেন সেই আমাদের সেই বহু কাঙ্খিত ‘অচ্ছে দিন’ ।যে সেলোফেন পেপারের মুড়ে আমাদের জন্য নিয়ে আসবে সুখের উপহার । তখন অনেক সবুজ সব্জী আসবে বাজারে ,ইচ্ছে জাগবে এখানে ওখানে বেড়াতে যাওয়ার , চড়ুই ভাতি , ডোভার লেন , পৌষ মেলা , ক্রিকেট , বইমেলা আরো কত কি যে আসবে। হেমন্ত আসলে সেই প্যাসেজ টু শীতকাল । হেমন্তকে তাই বড়জোর ওই দুতের সন্মান টুকু দেওয়া যায় । তার চেয়ে বেশি আগ্রহ নেই তার জন্যে । আসলে যেখানে গেলে ধানের উপরে মাথা রেখে ভোরের রোদ কে শুয়ে থাকতে দেখা যাবে , সেখানে যাওয়া তো আমাদের হয়ে উঠবেনা । তাই হেমন্তের সঙ্গে আমাদের যে টুকু হাই-হ্যালো সম্পর্ক , সে শুধু ঐ জীবনানন্দের দু চার পংক্তি ধার করতে পারি বলে । রবীন্দ্রনাথ বর্ষা কে নাকি বসন্ত কে বেশি ভালোবাসতেন তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে । কিন্তু জীবনানন্দ যে সারা জীবন হেমন্তের প্রেমে ফিদা হয়ে ছিলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ হেমন্তে বসন্তের বানী খুঁজে পেয়েছিলেন , জীবনানন্দ বসন্তেও খুঁজে বেড়াতেন হেমন্ত কে । সে হেমন্তের বাস ছিল একেবারে তাঁর অস্তিত্বের অভ্যন্তরে । নইলে কি আর এমন ভাবে বলা যায় - যখন হেমন্ত আসে গৌড় বাংলায় কার্তিকের অপরাহ্ণে হিজলের পাতা শাদা উঠানের গায় ঝ’রে পড়ে, পুকুরের ক্লান্ত জল ছেড়ে দিয়ে চ’লে যায় হাঁস, আমি এ ঘাসের বুকে শুয়ে থাকি- শালিখ নিয়েছে নিঙড়ায়ে নরম হলুদ পায়ে এই ঘাস; এ সবুজ ঘাসের ভিতরে সোঁদা ধুলো শুয়ে আছে- কাঁচের মতন পাখা এ ঘাসের গায়ে ভেরেন্ডাফুলের নীল ভোমরারা বুলাতেছে- শাদা স্তন ঝরে করবীর : কোন এক কিশোরী এসে ছিঁড়ে নিয়ে চ’লে গেছে ফুল, তাই দুধ ঝরিতেছে করবীর ঘাসে ঘাসে : নরম ব্যাকুল। ******

1122

11

শিবাংশু

ঘোষাল, আহা ঘোষাল....

আমি যখন বালক ছিলুম, তখন ডালিয়াদি আমাদের ইশকুলের দিদিমণি ছিলেন। সেকালের রামকৃষ্ণ মিশন ইশকুলের 'দিদিমণি', সে অন্য জিনিস। একালের ইং-মিডি মিসিবাবা টাইপ 'ডেন্টিং পেন্টিং' জনতা নয়। তাই এতো প্ররোচনা সত্ত্বেও আমি অন্ততঃ চুপচাপ থাকি। নয়তো আমরাও " খেলা খেলেছিলেম, আমরাও গান গেয়েছি।" চতুর্দিকে ঝাড়ির গপ্পো হচ্ছে, তবু গান্ধিজিকে স্মরণ করে মৌনব্রত নিয়ে আছি। তবে যখন তিনি শেষ পর্যন্ত 'ঘোষাল' তুললেন, তখন আর চুপ থাকা যাচ্ছেনা। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, চঞ্চলের 'জামশেদপুরি'ত্বে আমার কিঞ্চিৎ সন্দো আছে। কোপারেতি কলেজে পড়েছে, আর 'ঘোষাল'কে বলে মিষ্টির দোকান ???!!! --------------------- যাকগে, ঘোষাল হোটেল হলো জামশেদপুরের আদি ঝাড়ির ঠেক। 'প্রাপ্তেষু ষোড়শ' হবার প্রধান লক্ষণ হলো ছেলে ঘোষাল হোটেলে চক্কর মারছে। চারদিকে অতিব্যস্ত বিষ্টুপুর বাজার। তার ঠিক মাঝখানে ঝড়ের ভরকেন্দ্রে অদ্ভুত ছায়াসুনিবিড় শান্তিঘেরা ঢালুছাদের বাংলো টাইপ একটা বাড়ি। এককালে টাটার কোনও একটা অফিস ছিলো সেখানে। সেখানেই ঘোষালবাবু একটি রেস্তোঁরা খোলেন। চারফুট উঁচু ডিভাইডার দিয়ে ঘেরা সবুজ রেক্সিন মোড়া কেবিনগুলি। নাহ, সেখানে পর্দাটানা কোনও আড়াল ছিলোনা। দিনের বেলাতেই কেমন 'নেই' হয়ে থাকতো জায়গাটা। সন্ধেবেলায় তো পুরো নির্জনতা। আমরা বলাবলি করতুম, কলকাতা শহরে যদি এরকম একটা জায়গা থাকতো, তবে প্রতি বর্গফুটে অন্তত" গোটা পাঁচেক যুগলকে ঠেলাঠেলি করতে দেখা যেতো। কিন্তু জামশেদপুর গ্রাম জায়গা। প্রতিটি হর্মোনসুন্দর ছেলে বা মেয়ের পিছনে গোটা দশেক কাকা'মামার শ্যেনচক্ষু সদা বরকরার। তাই খুব দুঃসাহসী না হলে সেকালে 'ঘোষালগিরি' করা যেতোনা। আমরা যেখানে থাকতুম, সেই টেলকো শহর ঘোষাল থেকে প্রায় দশ-এগারো কিমি। কলেজ থেকেও অন্ততঃ তিন-চার কিমি। ক্লাসের ফাঁকে ভাগা যায়না। যাতায়াত বলতে তো সাইকেল ভরোসা। কী সাইক্লিং করতুম তখন, জামশেদপুরের পাহাড়ি ওঠানামা করা রাস্তায়, ভাবা যায়না। -------------------------- ঘোষালে'র স্পেশালিটি ছিলো কবিরাজি কাটলেট, মোগলাই পরোটা আর কশা মাংস। এসব দ্রব্য একটার বেশি খাবার মতো রেস্তো থাকতো না তখন পকেটে। কিন্তু অতো লম্বা সাইক্লিং করে খিদে পেতো খুব। কী আর করা? পুরো এক বোতল টোম্যাটো কেচাপ প্লেটে ঢেলে চামচ দিয়ে মেরে দিতুম আমরা। এই পদার্থটায় ঘোষালবাবু কোনও কার্পণ্য করতেন না। ঘোষালবাবুর একটা বিশেষত্ব ছিলো। তাঁর মতো রমনীয় কোমল কণ্ঠ আমরা কদাপি কোনও পুরুষের ঠোঁট থেকে বেরোতে শুনিনি। আড়াল থেকে শুনলে পুরো সুচিত্রা সেন। -------------------- আমাদের জোয়ানবয়সে জামশেদপুরে পীরিতি করাটাকে 'পেট গরমের ধাত' মনে করা হতো । তাই চতুর্দিকে ছেলেমেয়েদের 'চরিত্র' ঠিকঠাক রাখার জন্য স্বনিয়োজিত গার্জেনরা থিকথিক করতেন। ছেলে বা মেয়ে নিজেরা বিয়ে ঠিক করেছে জানতে পারলে বাপ-মা ( কিছু শুভানুধ্যায়ীসহ) দু'চার দিন প্রচুর ড্রামাবাজি করার পর অপমানে অতি কাতর হয়ে ডিপ্রেশনে চলে যেতেন। সেমত যুগে মেয়েবন্ধু সহ ঘোষালে বসতে অসম্ভব এলেম লাগতো। কিন্তু মানুষের আসল ভগবান তো ঐ বিন্দুবৎ হর্মোন গ্রন্থিগুলি। তারাই জয়ী হতো শেষ পর্যন্ত। --------------------------- এবার একটা 'গপ্পো হলেও সত্যি' শোনাই। যেখানে ঘোষাল হোটেল আসল নায়ক। আমাদের এক বন্ধু ছিলো ( ছিলো কেন, এখনও আছে বহাল তবিয়ত, পুরো মাথায় একটাও চুল বেঁচে নেই এখন তার, তবু হৃদয় কি আর মরে? ) তা সে বরিশাইল্যা পাড়ু'র শরীরে কী করে যেন জিন মিউটেশন হয়ে কলকাত্তিয়া ডিএনএ ঢুকে গিয়েছিলো। তার সম্বন্ধে আমরা বলতুম , মানুষ হবার দরকার নেই, যে কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার শরীরে xx জিন আছে, খবর পেলে সে লাক ট্রাই করতে পৌঁছে যাবে। নিজেদের মধ্যে তাকে আমরা স্বামী ছুঁকছুঁকানন্দ বলতুম। মানে ছুঁকছুঁক করাতেই তার আনন্দ। পাঁচ-ছ কেলাস হতে না হতে সে প্রায় সফল ফ্রকচেজার। তার উপর সে গিয়ে জুটলো কো-এড আমবাগান ইশকুলে। সেতো প্রায় বেন্দাবন। আমাদের কপালে আর ডি টাটা, যতো মারকুট্টে ছেলেদের গুঁতোগুঁতির আড্ডা। কলেজ পৌঁছোতে পৌঁছোতে স্বামীজির কীর্তিময় জীবনী লিখে ফেলতে পারলে নবকল্লোলে নিশ্চিত ছাপা হয়ে যেতো। একেবারে হলিউডি না হলেও, শ্যামবাজারি ফাস্ট জীবন তার। ডি এম লাইব্রেরির মেম্বার হলো। নাহ, বই পড়ার কোনও বালাই নেই। কিন্তু ওখানে মেয়েরা বই নিতে, ফেরত দিতে আসে অনেক। কিউপিডের কুপুত্তুর সেখানে তেষ্টা মেটাতে সদা হাজির। যাকগে, সে কথা। একবার প্রায় তিন-চার দিন আড্ডা থেকে গরহাজির । আমরা চিন্তায় পড়ে গেলুম। তার নতুন বিজয়কাহিনী না শুনতে পেলে শরীর মাটি মাটি করে। ঠিক এরকম একটা সময়ে এক বন্ধু বিষ্টুপুর থেকে ফিরে বলে, ওরে পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে। স্বয়ং ঘোড়ার মুখ থেকে (মানে ঘোষালবাবু) শোনা সে এক নিদারুণ গপ্পো। কী হয়েছে? ----------------------- আমাদের স্বামীজি কিছুদিন ধরেই বলছিলো একটা ভালো শিকার ধরেছে। খুব ভালো মেয়ে (মানে ঠিক এই ভাষায় নয়। জামশেদপুরের এ সংক্রান্ত চলিত ভাষা এই পারিবারিক পাতায় ব্যবহার করা যাবেনা)। আমরা বলি, 'ভালো মেয়ে' হলে তোর চক্করে কখনও পড়ে? মাথার ভিতরে পুরো গ্যাপ। সে রেগে গিয়ে আমাকে হিংসুটে আঁতেল বলে। যাকগে, একদিন সেই নতুন শিকারটির সঙ্গে অ্যাপো হয়েছে, সন্ধেবেলা ঘোষালে। সে মেয়ে নাকি বলেছিলো সে একা আসতে পারবে না। বাড়িতে ছাড়বে না। সঙ্গে এক বন্ধু থাকবে। স্বামীজি তো তাতে আরো পুলকিত। আসলের সঙ্গে আবার ফাউ। ঠাকুর ভালো করো। ----------------------- সন্ধেবেলা সাজুগুজু করে তো সে পৌঁছেছে ঘোষাল ঠেকে। মালিক তার খুবই চেনা। তার সব 'ডেঞ্জারাস লিয়াজঁ'র সাক্ষী সে মক্কেল। একটু ফিক করে হেসে তিনি জানান। এসে গেছে। চার নম্বরে চলে যান। বিজয়গর্বে সে এগিয়ে যায় চার নম্বর টেবিলের দিকে। তার পরে একটি প্রবল বিস্ফোরণের কোলাহল। দু'টি চামুন্ডা তরুণী একজন বিপর্যস্ত পরম প্রেমময় বঙ্গবীরকে প্রায় পদদলিত করে ঘোষাল থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে যায়। ঘোষালবাবু কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর পরম কোমল স্বরে প্রশ্ন করেন, " এ নিয়ে ক'টা হলো?" মানে, ইয়ে, হয়েছে কি প্রাক্তন ও বর্তমান দুই শিকারই যে নিজেদের মধ্যে বন্ধু এবং তারা যে এভাবে একযোগে আবির্ভূত হতে পারে, সেটা স্বামীজির হিসেবে ছিলোনা। ঘোষাল, আহা... ঘোষাল...!!

1092

5

দীপঙ্কর বসু

গানের টুকি টাকি

প্রথমেই জানিয়ে রাখি সুর তরঙ্গের প্রভাব মানুষের স্নায়ু তন্ত্রে কি ভাবে কাজ করে তার কোন যুক্তি গ্রাহ্য ব্যখ্যা আমার জানা নেই । হয়ত মনস্তত্ত্ববিদেরা এই বিষয়টির ওপরে আলোকপাত করতে পারবেন । তাও সেটা কতটা বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা হবে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। ভারতীয় সংগীত তত্ত্ববিদ ভেঙ্কটমুখী (নামের বানানটা ঠিক হল কিনা জানিনা )সাতটি শুদ্ধ ও পাঁচটি বিকৃত মিলিয়ে মোট বারোটি স্বরের পারমুটেশন কম্বিনেশনের অঙ্ক কষে বাহাত্তরটি ঠাটের প্রস্তাবনা করেছিলেন । কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তার মধ্যে মাত্র দশটি ঠাটের মধ্যেই কেবল সাংগীতিক সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ ঠাট ভুক্ত সাতটি শুদ্ধ বা বিকৃত অথবা শুধু মাত্র শুদ্ধ স্বর গুলি দিয়ে সুরের এমন এক একটি প্যাটার্ন গড়ে তোলা সম্ভব যা আমাদের চিত্তকে রঞ্জিত করতে পারে, আমাদের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে পারে । এই বিশেষ রঞ্জনাশক্তি বিশিষ্ট সুরের প্যাটার্ন গুলিই হল এক একটি রাগ । প্রশ্ন জাগতে পারে রাগের মধ্যেকার রঞ্জনাশক্তির উৎসটা কোথায় । সংগীত তত্ত্বের যতটুকু আমি বুঝেছি তাতে আমার বিশ্বাস রাগরাগিণীর রঞ্জনা শক্তির মূল উৎস হল সংগতি রক্ষা করে সুরের চলনের বৈচিত্র । একটা উদাহরণ দিলে হয়তো আমার বক্তব্যটাকে সঠিক ভাবে বোঝাতে পারব । কাফি ঠাটের দুটি রাগ মিয়া কি মল্লার এবং বাহার এর কথা ভাবা যাক । ভিন্ন ঋতুতে গেও রাগদুটিতে ব্যবহার্য স্বরগুলি একই । যথা - স র জ্ঞ ম প ধ ন ণ ( আকার মাত্রিক স্বরলিপি অনুসারে জ্ঞ = কোমল গান্ধার , ন =শুদ্ধ নিষাদ এবং ণ= কোমল নিষাদ ।) একই স্বর ব্যবহার করেও তা হলে দুটি রাগকে কি ভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করা যাবে সে প্রশ্নের উত্তর হলও স্বরগুলির প্রয়োগের বৈচিত্রই এনে দেবে দুটি রাগের দুটি ভিন্ন রূপ । মিয়া কি মল্লার রাগে স্বরগুলির চলন হবে – র ম র স , ম র , প, ণ ধ ন স । স ণ প,ম প, জ্ঞ ম ,র স বাহার রাগে চলনটা পালটে গিয়ে দাঁড়াবে – ন স , জ্ঞ ম , প জ্ঞ ম,ধ ,ন স । স, ণ প ম প,জ্ঞ ম , র স বলে রাখা ভাল যে এই প্রাথমিক অতি সরলীকৃত উদাহরণটিই রাগরূপের একমাত্র বৈচিত্র নয় । রাগগুলির প্রকৃত চলনবৈচিত্র ফুটে উঠবে একমাত্র গায়ন বা বাদনের মাধ্যমে – যা লিপিবদ্ধ করা এক প্রকার অসম্ভব। ঠিক এই জায়গাতেই প্রয়োজন হয় প্রথাগত শিক্ষার – তা সে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতই হোক বা পাশ্চাত্য সংগীত । এবারে দেখা যাক ভৈঁরো রাগ শুনে অন্তরে সত্যিই ভোরের আবহটা অনুভব করা যায় কিনা । প্রথমেই জানাই ভৈঁরো আমার মনে সত্যিই ভোর হবার অনুভবের জন্ম দেয় । ললিতের সুরে অতি প্রত্যুষের আলোআঁধারির রঙ আমার চেতনায় ধরা দেয়,রামকেলী শুনে শুভ্র সকালের আলোর স্পর্শ পাই । তা হয়তো আমার সংগীত-সংস্কারের কারণেই ঘটে । আমি নিশ্চিত নই বলেই কোন মন্তব্য না করে দুই দিকপাল সংগীতবেত্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করব শুধু । রবীন্দ্রনাথের “সংগীতের মুক্তি” প্রবন্ধ থেকে – “বিশ্বের একটা হৃদয়ের আভা নিয়ত প্রকাশ পাইতেছে ।ভোরবেলার আকাশে হাওয়ায় এমন কিছু একটা আছে,যেটা কেবল মাত্র বস্তু নয় ,ঘটনা নয় , যেটা কেবল মাত্র রস । এই রসের ক্ষেত্রেই আমাদের অন্তরের সঙ্গে বাহিরের রাগ অনুরাগের মিল । এই মিলের তত্বটি অনির্বচনীয় ।যাহা নির্বচনীয় তাহা পৃথক,তাহা আপনাতে আপনি সুনির্দিষ্ট । যেখানে পদ্মফুলের নির্বচনীয়তা সেখানে তার আকার আয়তন ও বস্তু-পরিমাণ সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধভাবে তার আপনারই ।কিন্তু যেখানে পদ্মটি অনির্বচনীয় সে যেন আপনার সমস্তটার চেয়েও আপনি অনেক বেশী । এই বেশীটুকুই তার সংগীত”। ঊনবিংশ শতকের অপর এক সংগীতচিন্তা নায়ক ,রবীন্দ্রনাথের অগ্রজস্থানীয় কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন তাঁর “গীতসূত্রসার”(খ্রীঃ১৮৮৫) গ্রন্থে । কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন – “এক এক রাগ চিরকালই এক নির্দিষ্ট সময়ে গাওয়া ও শুনা অভ্যাস হওয়াতে, অন্য সময়ে সেই রাগ গীত হইলে তত সুরস বোধ হয়না । অভ্যাস অতি প্রবল ব্যপার; অভ্যাসে নূতন স্বভাবের উৎপত্তি হয় । অনেকে বলেন যে, ভৈরবের সহিত প্রাতঃকালের কোন সম্বন্ধ যদি নাই তবে তাহা বৈকালে কি রাত্রে গাইলেও প্রাতঃকাল মনে হয় কেন? ইহার কারণ স্মৃতি-উদ্দীপনা ।কোন দুইটি দ্রব্য বা কার্য সর্ব্বদাই একত্রে দেখা কি শুনা অভ্যাস হইলে তাহার একটীকে দেখিলে কি শুনিলে অপরটী স্মৃতিপথে উদিত হয়,ইহা নৈসর্গিক নিয়ম”। আপাতত ক্ষান্ত দিই । জানিনা বিষয়টাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম না আরো গুলিয়ে দিলাম ।যাই হোক বুঝলে দীপঙ্করদা বুঝদার লোক নৈলে ফাগল ।

1045

5

stuti..

বাপের বাড়ি যাত্রা

কাশের বনে বিষাদের সুর ।ধূপ আরতি ,পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে চলছে মায়ের বিদায়ের আয়োজন । ভক্তরা আকুল প্রার্থনা আর চোখের জলে মাকে বিদায় জানাচ্ছে  । মা দোলায় চেপে বসেছেন ।। গণেশ কলাবউকে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে । সরস্বতীকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে । মোবাইল হাতে বার বার পায়চারি করছে । মুশকিল হয়েছে এখন ও লক্ষী ,কার্তিকের দেখা নেই । সবাইকে পই পই করে বারণ করেছিল আজ যেন কেউ কোথাও না বেরোয় । কিন্তু কে শোনে কার কথা …...। কার্ত্তিক তো সেই মামাবাড়িতে পা দিয়েই ধড়াচূড়া ফেলে দিয়ে জিনস -টিশার্ট চড়িয়ে বান্ধবীদের সাথে বেড়িয়ে গেছিল । এখন আবার বাবু গেছেন বান্ধবীদের বিদায় জানাতে । গতবার ওর দেরী করে ফেরার জন্যই মায়ের কৈলাসে ফিরতে দেরী হয়ে গেছিল । বান্ধবীদের বিদায় জানাতে গিয়ে এক নাছোড়বান্দা বান্ধবীর পাল্লায় পরেছিল , কিছুতেই কাটাতে পারছিল না ।অবশেষে গ্যাটের কড়ি খসিয়ে একখানা দামী উপহার নিয়ে তবেই সে ছেড়েছিল । মা মোবাইলে ধরার চেষ্টা করছে কার্তিককে , সে বার বার বলেছে - চিন্তা করো না ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব । লক্ষী গেছে মলে লাস্ট মিনিটের বাজার করতে  । তার নাকি তানিস্কের একটা সেট ভীষণ পছন্দ হয়েছে ,সেটা না নিয়ে সে কিছুতেই নড়বে না । এবার মার ও ইচ্ছা ছিল কিছু আধুনিক বেশভূষা কেনেন  । কিন্তু সময় কোথায় ? আগে বাপের বাড়ি এসে বিশ্রাম করে তারপর মণ্ডপে বসতেন । এখন তো আসার আগে থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে ঝাঁকে ঝাঁকে মেসেজ এসে মার মোবাইল হ্যাঙ করে দেয় । মায়ের নাওয়া নেই খাওয়া নেই । আসতে না আসতেই ভক্তরা চ্যাঙদোলা করে মণ্ডপে বসিয়ে দেয় । ভক্তদের দিনকে দিন যা বাড়বাড়ন্ত ,কিছুতেই তর সয় না । মা মণ্ডপে বসতে না বসতেই করজোরে প্রার্থনা শুরু করে দেয় । মা এবার প্রাইজটা যেন হাতছাড়া হয়ে না যায় ।। ঢাক -ঢোল ,কাসর ঘন্টার আওয়াজে মার কান ঝালাপালা । মিষ্টি খেতে খেতে গা গুলাচ্ছে । মার ও মাঝে মাঝে দাঁত কিড়মিড় করতে ইচ্ছা করছে ভক্তদের ওপর । নিজেরা তো মাকে উপলক্ষ্য করে মোগলাই , বিরিয়ানি্‌ ,ডিমের ডেভিল খুব সাটালো আর মাকে খাওয়ালো কেবল ল্যাবড়া -খিচুড়ি -চাটনি । এই ফিউসনের যুগে অন্য রকমও তো কিছু ভাবতে পারে …......। ধূপের ধোঁয়ায় চোখ কচলাতে কচলাতে মা বার বার সরস্বতীকে বলছে -দেখ ওরা কোথায় রয়ে গেল । সরস্বতী বিচলিত  । লক্ষীর মোবাইল বার বার বলছে আউট অফ রিচ । কি জানি পেঁচা আবার দিক ভুল করে অন্য দিকে চলে গেল নাকি । গণেশ তল্পিতল্পা নিয়ে মায়ের পাশেই আছে । তার পাশে একগলা ঘোমটা টেনে কলাবউ । এবার একদল ভক্ত মাকে একটা গোলাপী গাউন দিয়েছে । মা ভেবেছেন ওটা কলাবউকে দিয়ে দেবেন । মা তো আর এ বয়সে গাউন পড়বেন না । যদিও আজকাল শিবঠাকুর বাঘছাল বারমুডা পরা শুরু করেছে । সিংহ ওদিকে হালুম হুলুম শুরু করে দিয়েছে । বেশী রাত হলে বাবার কাছে তাকে জবাদিহি করতে হবে । তাছাড়া সন্ধ্যের পর কৈলাসের রাস্তাঘাট ও খুব একটা নিরাপদ নয় । অসুরদের উপদ্রব খুব বেড়েছে । এবার স্পেসশিপ বানিয়েছিল যে ভক্তরা তারা অবশ্য অভয় দিয়েছে এভারেস্ট অবধি লিফট দিয়ে দেবে । মা এবার বেজায় খাপ্পা পুলিশভক্তদের উপর । সেই কবে থেকে একদল ভক্ত মার সবচেয়ে উঁচু প্রতিমার প্রচার চালাচ্ছিল । ফেবুকে সে খবর পড়ে মা তো আহ্লাদে আটখানা । মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে খুব খুশি ছিলেন । ভেবেছিলেন আগে ওখানেই যাবেন । পিতিবার থিম থিম শুনে কান পচে গেছে । এবার নতুন কিছু হচ্ছিল । কিন্তু পুলিশভক্তরা পাকা ধানে মই দিয়ে দিল । সব বানচাল হয়ে গেল । মায়ের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিল বিরাট পর্দা  ।পূজা বন্ধ । সেই থেকে মেজাজটা খিঁচড়ে আছে । এখন আবার ছেলেমেয়েদের দেখা নেই । নীলকন্ঠ সেই কখন উড়ে গেছে । এতক্ষনে বোধহয় কৈলাসে পৌঁছিয়ে গেল । কতবার বললেন বাপু একটু ধীরে ধীরে উড়ো । তা কে শোনে কার কথা । সে ও খবর পৌঁছে নিজের ছুটি করতে ব্যস্ত ।যাবার সময় নেপালে একবার দাঁড়াতে হবে মোমো কেনার জন্য ।কর্তার জন্য কিছু না নিয়ে গেলে আবার দক্ষযক্ষ বাঁধাবে । গতবার মোমোর সাথের ঐ ঝাল চাটনিটা গাঁজার সাথে দারুণ জমেছিল । শেষে বলে কিনা এতটুকু আনলে কেন ? এবার একটু বেশী করে নিয়ে যাবেন ভেবেছেন । বেশী রাত হয়ে গেলে আবার ওদের মোমো শেষ হয়ে যায় । ঐ যে লক্ষী আর কার্ত্তিক হন্তদন্ত হয়ে আসছে । আর দেরী করা যাবে না  । বিদায় ভক্তের দল । আসছে বছর আবার দেখা হবে ।ততদিন তোমরা নতুন থিম দিয়ে কি করে অন্যকে টেক্কা দেওয়া যায় তাই ভাবতে থাক ।

1085

14

মনোজ ভট্টাচার্য

কেয়া সংক্রান্ত কিছু মিছু !

মহিনবাবুর বে আর মোহিনীবালার বে ! কফি হাউসে আমার যাতায়াত স্কুল শেষ হওয়ার আগে থেকেই I তখনও কফি হাউসে দোতলা হয় নি I এত উচ্ছৃঙ্খলতাও আরম্ভ হয় নি I ইউনিভার্সিটি আর প্রেসিডেন্সির ছাত্র-ছাত্রীই বেশি আসত I সিটি, বিদ্যাসাগরের ছাত্ররাও আসত I কিন্তু খুব বেশি না I সেই সময় তিন-চার জন সহপাঠি সঙ্গে করে হল ঘরে প্রবেশ করতেন মক্ষীরানি ! কফি খেতে থাকা বা না থাকা কারুর সাধ্য ছিল না তার দিকে না তাকানোর ! মেয়েদের তুলনায় লম্বা , সোজা ঘাড় - মরাল গ্রীবা ( খানিকটা রাজহাসের মত ) ! হাসির ও কথা বলায় যে অত সুন্দর নদীর মত ধ্বনি হতে পারে ! ইংরিজি অনার্স - প্রথম শ্রেণীতে প্রথম ! সহপাঠি তো বটেই অধ্যাপকরা পর্যন্ত সান্নিধ্য লোভী ! – দুপাক লাট্টুর মতো পাক খেয়েই কোনও না কোন অধ্যাপকের টেবিলে বসতেন ! একটি যুবক, নাম হওয়া উচিত ছিল দীপক, মুখমন্ডলে হরপ্পার কারুকাজ, তালগাছের মত লম্বা I শুধুমাত্র ভালো ফুটবল খেলত বলে নামকরা কলেজে বিনা পয়সায় ঢুকতে পারল I পরে অবশ্য ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয় ইংরিজী নিয়ে পড়তে পেরেছিল I কানাডা প্রবাসী দাদার সংসারে থাকা ও নিজের চা-চারমিনারের খরচ ওঠে টিউশানিতে I তখন থেকেই ইবসেন, চেকভ অনুবাদ করে নাটকের ফর্মে লিখছে I বেশ জনপ্রিয় হয়েছে I কিন্তু কোনো রূপসীর সঙ্গে ভাব হওয়া ! স্বপ্নেও ছিল না ! তবু কিভাবে যে কি হলো, বিউটির সঙ্গে বিস্ট মিললো ! কিন্তু চাঁদ তো থাকে আকাশে, তার সাথে মধ্যবিত্তের মানুষ মেলে কিকরে ! তার সামাজিক অবস্থান কোথায় ! তো চাঁদ ফুরুত হয়ে গেল কানাডায় I আর দীপক ! অবিশ্বাস্য হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে, জীবনের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহননের পথ নিল I - একটা চিঠি লিখে পাঠালো আরেকজনের কাছে I নিজে গেল গঙ্গার ধারে জলে ডুবতে I যার কাছে চিঠি গেল, ধরা যাক তার নাম 'জয়া' ! নাটকের ব্যাপারে জয়া খুবই মানে দীপককে ! জয়ার কথা পরে লেখা যাবে'খন I সে দৌড়ালো গঙ্গার ধারে দীপককে বাঁচাতে I দীপক বাঁচলো I শুধু দীপকই যে বাঁচলো. তা নয় i বাঁচলো ভবিষ্যত নাট্য জগতও ! পরবর্তী কালে চরিত্ররা নাট্যকারের খোঁজ করলো ! আর হরপ্পা ছাপ চেহারায় আরেক রূপসীর আবির্ভাব হলো ! এই সবকিছুর সাক্ষী হয়ে রইল একজনা ! চিঠিটা সে দেখেছিল একবারই ! দুজনেই ছিল একই নাট্যদলে ! – একসঙ্গে নাটক লেখা – নাটক করা – নাটক নিয়ে বাইরে যাওয়া ! ক্রমশ তাদের সম্পর্ক প্রগাড় হয়েছিলো ! জয়া খুব খোলা চরিত্রের ছিল । তাদের সম্পর্ক নিয়ে কোনও লুকোছাপা করত না ! আর এই কোর্টশিপও অনেকদিন চলছিল ! এই সময়ের মধ্যেই আমার হঠাৎ বিয়া হয়ে গেল ! আমাদের কফি হাউজে নিয়ে গিয়ে খুব হৈ হল্লা হল ! তারপরেই চাপ পরে ওদের ওপর ! দুজনেই চাকরি বাকরি করছে – মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত । বিয়ে না করার কোনও কারন নেই ! – স্বাভাবিক ভাবেই ওদের বিয়ে হয়েছিলো ! কিন্তু আমি সেই সময় ছিটকে গেছিলাম অন্য কোনও গ্রহে ! মনোজ

1077

8

মনোজ ভট্টাচার্য

আমি ড্রপ পড়ে গেলাম !

আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! হঠাৎ ঠিক হল - আড্ডা মহারাজের বাড়ি এক বিরাট উৎসব হবে ! হৈ চৈ পড়ে গেল । দিকে দিকে জ্ঞানী গুনী শিল্পী কুল্পী সব প্রস্তুত হতে লাগলো । কে কি গান গাইবে – কে কি পোশাক পড়বে ! কে লাইট লাগাবে – কে মাইক লাগাবে! কে ফুল দেবে ! কে তদারকী করবে ! - সে কী উদ্দীপনা ! উৎসব মানেই তো গান বাজনা খাওয়া দাওয়া ! কেউ কেউ কাউন্টডাউনও শুরু করে দিল ! আড্ডা প্রাসাদের এক কোনে আশ্রিত এক বদ্দিবুড়ো থাকে । মাঝে মাঝে সামনে গাছের নীচে খঞ্জনী বাজিয়ে গুন গুন করে গান গায় ! দু একজন দিদিমনি দাদামনি ছাড়া কেউই তার খবর জানে না ! তারা মাঝে মধ্যে শোনে – বদ্দি-কাকুর গান ! তা এই বিরাট উৎসবের আতিশয্যে লাফালাফি ওড়াউড়ির মাঝে দুই দিদিমনি ও দাদামনি বদ্দি বুড়োকে বলেই ফেলল – ও বদ্দিকাকা, তুমি কি বাজাবে গো ? আমি - আমি আর কি বাজাতে পারি ! আমি তো কিছুই জানি না ! বদ্দি বুড়ো কাঁচু মাচু হয়ে উত্তর দিল ! না না - তা বললে হবে না ! - সেজো দাদামনি বলে উঠল । - তুমি তো খঞ্জনী বাজিয়ে সুন্দর গান গাও ! তাই বাজাবে ! তোমার খঞ্জনীর সঙ্গে আমি একটা গান গাইবো ! অ্যাঁ ! আর কিন্তু সময় নেই বদুকাকা ! এখন থেকে প্র্যাকটিস করো । - ন-দিদিমনি আদুরে গলায় জুড়ে দিল । বদ্দিবুড়ো কি আর করে ! দিদিমনি দাদামনি বলে কথা ! ওদের অনুরোধই ওর কাছে আদেশ ! বয়েসের ধরা গলায় খঞ্জনী বাজিয়ে গাইতে লাগলো – কি গাবো আমি কি শুনাবো - - ! এদিকে আড্ডা-প্রাসাদে মহোৎসবের সেই দিন এসে গেল ! – সারা পৃথিবী থেকে নিমন্ত্রিত শিল্পীরা এসে গেল । - কেউ সিন্থেসাইজার, কেউ সেতার, কেউ গীটার, কেউ তবলা, কেউ বংগোজ ইত্যাদি ! এসেই সবাই স্থলপথ, জলপথ, শূন্যপথ – যে যার পথ বেছে নিয়ে গুছিয়ে বসেছে ! আবার কেউ এডিটিং । কেউ তদারকি ! আবার কেউ খবরদারি করছে ! – একেবারে জি বাংলার সা রে গা মা পা জমজমাট প্রোগ্রাম ! নানারকম গান – কেউ গুছিয়ে করছে কালোয়াতি, কেউ আবার এখান ওখান থেকে জালিয়াতি ! তারই বাহবা – কেয়াবাত - তালি এবং নিভৃতে গালি ! সন্ধ্যে থেকে বাইরে বসে বদ্দিবুড়ো – হাতে খঞ্জনী ! কাচা একটা পাজামা পড়ে এসেছে। যদি কেউ ডাকে ভেতরে – যেতে তো হবে ! ভয় পেলে চলবে না ! হাজার হোক – আড্ডা-প্রাসাদের সম্মান বলে কথা ! দাদামনি বলেছে সঙ্গে গাইবে ! মাঝে মাঝে ঘুমে ঢুলে পড়লেও – তাড়াতাড়ি গা ঝেড়ে নিচ্ছে ! জেগে থাকার জন্যে চিমটিও কাটছে নিজেকে ! আর অপেক্ষা করছে ! যদি - - ! যত আলো ঝলমল সন্ধ্যেই হোক – একসময় নিঃশেষিত তেলের প্রদীপের মতো সেও শেষ হয় । রাত পার হয়ে যায় । পুব আকাশের কোনায় দিগন্তের আলো ভেসে ওঠে ! বদ্দিবুড়োর ঘুমও চটকে যায় ! এ কি – এ যে সকাল হয়ে গেছে ! বাড়ির ভেতর তো এখন কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না ! মাইক বন্ধ ! সবাই কি তাহলে চলে গেছে! উৎসব কি শেষ হয়ে গেছে তাহলে ! – ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখে ঘরের ভেতর এক বিশৃঙ্খল অবস্থা । সবাই গড়াগড়ি যাচ্ছে - বোতলের মতন – কার্পেটের ওপর ! বাদ্য যন্ত্র আর শিল্পীদের পার্থক্য বোঝাই যাচ্ছে না ! নানাধরনের নাসিকা গর্জনের মধ্যেই - কেউ যেন বিড়বিড় করে উঠল – বদ্দিবুড়োর খঞ্জনীর সঙ্গে আমার গান গাওয়া হল না ! – আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! – বদ্দি বুড়োর মনে হল দাদামনি যেন একটু একটু জেগে আছে ! পায়ে পায়ে বদ্দিবুড়ো ঘরের বাইরে চলে এলো ! প্রাসাদের উৎসব থেমে গেছে । কিন্তু বাইরে সারা বাড়িতে তখনও আলোগুলো ঝলমল করে জ্বলছে ! ক্রমশ পাখীদের কোলাহল বাড়ছে ! বদ্দিবুড়োর কানে এখনো বাজছে তার সেজো দাদামনির সেই গোঙানি – বদ্দিবুড়োর খঞ্জনীর সঙ্গে আমার গান গাওয়া হল না ! – আমি ড্রপ পড়ে গেলাম ! মনোজ

910

8

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ২২.০৯.২০১৫ ক্ষ সকাল সাতটা।বেড টী হাজির।মানে এক ঘন্টার মধ্যে তৈরী হয়ে নিচে গাড়িতে বসা।চা খেতে খেতে ছাদে বেড়িয়ে এলাম। সকালের আলো তালের স্বচ্ছ শান্ত জলে।ঘন গাছপালা আর পাহাড়ের সাথে নৈনাদেবীর মন্দির যেন পটে আঁকা এক ছবি।শহর আর মন্দিরের মাঝে ঝিলের জল যেন স্বর্গ মর্ত্যের এল ও সী।নীচে রাস্তা গাড়িঘোড়া বিহীন এক গা এলানো সরিসৃপ।জগ্গারস দের আওতায়।স্কুলের গাড়ি বেড়িয়ে পড়েছে।বাচ্চা আর তাদের মায়েদের আনাগোনা শুরু।চটপট তৈরী হই। আজ আবার সুখহালের গাড়ি শহরের প্রান্তে আমাদের অপেক্ষায়।যথাসময়ে আমরাও হাজির।দক্ষ হাতে গাড়ি নিয়ে সে চলল।যেন পক্ষিরাজ।আমিও মজলাম ভ্রমণে।রাস্তার ধারে গাছেরা পরম আত্মিয়ের মতন সার বেঁধে দাঁড়াল।যেন জানে এপথে আর ফিরছিনা।ওক পাইন দেওদার যারা এই দশ দিন সব সময় সাথে সাথে ছিল আরো কাছে আরো কাছে ঘন হয়ে এল।দূরের পাহাড়ের চূড়োরা মাথায় সাদা কালো মেঘের ওড়না দোলাল।জানলা দিয়ে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া বন জঙ্গলের সুবাস নিয়ে এল।গভীর খাদ অন্ধামোড় পাহাড়ে ক্রমাগত চড়া নামা সব পরীক্ষায় সফল।পৌঁছুলাম ভীম তাল।নৈনিতাল শহর থেকে বাইশ কিমী।জেলা নৈনিতাল।উচ্চতা ১৩৭০মী।ভীমতালের সৌন্দর্য্য ও বৈশিষ্ট তার ছোট্ট দ্বীপ।ঝিলের মাঝে দ্বীপ যেন কচ্ছপের পীঠ।ভুস করে ডুবে গেলেই হল! ভীমেশ্বরা মহাদব মন্দির আছে ঝিলের ধারে।ভীমের করকমলের পরশ ধন্য।অজ্ঞাতবাসের সময় পঞ্চপান্ডবের বাস স্থান ছিল বলে খ্যাত এই ভীমতাল।এখনকার মন্দির নির্মানে সাহায্য করেন কুমায়ুঁর চাঁদ বংশীয় রাজা বাজ বাহাদুর।জানা গেল ভীমতাল থেকে কাঠগোদাম যাওয়ার পায়ে হাঁটা পথের কথা।এখান থেকে তিব্বত আর নেপাল যাওয়ার পথ আছে।রোমাঞ্চ হল যখন শুনলাম এ অঞ্চল সিল্করুটের ছিল তালিকাভুক্ত।ইতিহাস বলে সম্পূর্ণ নৈনিতাল ছিল নেপালের অংশ।১৮১৪-১৬সালের এঙ্গলো নেপালীজ ওয়ারের পর এই অঞ্চল হয় বৃটিশ শাসনাধিন।ভীমতাল পাহাড় আর সমতলের মধ্যে এক বিশ্রামস্থল। ভীমতাল থেকে পাঁচ কিমী দূরে সাততাল।পাহাড় পর্বত বন জঙ্গলে ঘেরা অতি মনোরম।পাহাড়ে হিড়িম্বা মন্দির।মনে পড়ে গেল মানালির হিড়িম্বা মন্দিরের কথা ।পাইন গাছে ঘেরা প্যাগোডা ধরনের। দেখলাম বিশাল হনুমানজীর প্রতিমা।সাথে অনান্য মন্দির।প্রাচিন নয় বলে তেমন প্রভাবিত হলাম না।যেন মন্দির মানেই পাথরের গায়ে কারুকার্য্য।গর্ভগৃহে ঢোকার সাথে সাথে ধূপ চন্দন গুগ্গুল ফুলমালা বেলপাতা তুলসীদূর্বোর মিশ্রিত ঘ্রাণ ।যেন মন্দির মানেঅন্ধকারে জলতে থাকা প্রদীপ বাইরে চত্বরে বট অশ্বত্থ বেল শিউলির জটলা পাশে তির্ তির্ করে বয়ে যাওয়া নদী ।যেন মন্দির মানে মন্দিরের সুউচ্চ বিমান বিশাল পতাকায় শোভিত।যেমনটি দেখেছিলেম সোমনাথ মন্দিরে। দুফুর দুটো।পাহাড়ের রাস্তা পার হয়ে গাড়ি এসে গেল সমতলে।কিছুদুর যেতেই এসে গেল জিম করবেট ম্যুজিয়ম।কালাধুন্গির এই বাঙ্গলোয় থাকতেন জিম করবেট।ওনার ব্যাবহৃত জিনিষ সাজান।কত মানুষখেকো বাঘের শিকার করেছেন শুধু মানুষকে বাঁচাতে।বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমর্থক।বিশাল জমি মারা যাওয়ার আগে গরিব গ্রামবাসিদের দান করে গেছেন। ম্যুজিয়াম দেখে চললাম দেখতে পার্ক।গাড়ির বনে প্রবেশ নিষেধ।নিজেদের নাম আর প্যান নাম্বার জানিয়ে পাওয়া গেল বনে প্রবেশাধিকার।এল হুডখোলা জিপসী।চলল গাড়ি পার্কের দিকে।বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর পার্কের গেটের কাছে আবার বিরতি।গাইড বিনা ভীতরে না যাওয়াই ভাল।আমরা গেটের পাশেই ঘোরাঘুরি করে অপেক্ষা করতে থাকি।এলেন গাইড।চেহরা ছবি দেখে মনে হল এক্স মিলিট্রী ম্যান।গাড়ি ধরল বনের পথ।হিমালয়ের শিবালিক শ্রেণীতে এই পার্ক।তাই নুড়ি পাথরের উপর নাচতে নাচতে চলল আমাদের জিপসী।কোথাও কোথাও ছোট ছোট পাহাড়ি নদী পার হল।ঠিক যেন জিপসীর বিজ্ঞাপন।গাইড হঠাৎ চুপ থাকার ইশারা করলে।দেখি কিছু দূরে কয়েকটা হাতি।ধুলোমাখা।শরির স্বাস্থ্য ভাল নয়।গাইড দেখালেন জমির উপর তাজা পাগ মার্ক।গাছের গায়ে বাঘের নখ ধার করার চিন্হ।প্রচুর হরিন দেখা গেল হর্নবিলকে উড়ে যেতে দেখলাম।তাছাড়া কিছুই দেখলাম না।তবে সঘন গাছপালা আর পাখীর কলতানে বিকেল ছিল বেশ উপভোগ্য।জঙ্গলে মঙ্গল মঙ্গল করে যখন পার্কের গেটের কাছে তখন দেখি লোকের জটলা।সবাই উত্তেজিত।কি ব্যাপার!আমাদের গাইড নেমে গেলেন খবর নিতে। কি কান্ড !কয়েক মিনিট আগেই বাঘ এসে একটা বাঁদরকে ধরেছে।বাঁদরের চিৎকার শুনে গেটের পাশের অফিসঘর থেকে লোকজন বেড়িয়ে আসে।দেখে বাঘ বাঁদর নিয়ে জঙ্গলে ঢুকল। ওখানে সব লোক চিন্তিত।কারণ বাঘ কখনও লোকালয়ের এত কাছে আসেনি।ওখান দিয়ে গ্রামের লোকেরা করে সারাদিন আসা যাওয়া।চিন্তার বিষয়ই বটে।আমরা সব মনে মনে তখন ভাবছি একটু আগে আমরাও এখানে ঘুরেছি ফিরেছি।কি সব্বোনাশ!বাঘের ভোজন হইনি এই রক্ষে!!! সন্ধ্যে ছটা।গাড়ি চলল কাঠগোদাম। ঝক ঝকে পরিষ্কার কাঠগোদাম স্টেশন ।রাত দশটায় গাড়ি।ঠিক সময়ে গাড়ি ছাড়ল। অলবিদা ওক দেওদার পাইন অলবিদা কোশি সরজু গোমতী রামগঙ্গা অলবিদা বরফ আর মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়ো অলবিদা নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা অলবিদা চন্দ্রযান ও তার পাইলট সুখহাল অলবিদা কাঠগোদাম

936

1

মনোজ ভট্টাচার্য

সাদা না কালো !

সাদা না কালো ! মাইকেল জ্যাকশনের সেই গানটা মনে পড়ে – ব্ল্যাক অর হোয়াইট ! খুব ছোটবেলায় একবার আমার স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হয়েছিলো । এখন যদিও আমার মনেই পড়েনা – ঝগড়াটা কি নিয়ে হয়েছিলো । - কিন্তু সেইদিন আমরা যে শিক্ষা পেয়েছিলাম - সেকথা আমি কোনোদিন ভুলিনি ! আমার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে – আমি যা বলছি তাই ঠিক , আর বন্ধুটি যা বলছে তা ভুল । - আবার আমার বন্ধুও ঠিক সেইভাবে ভাবছে – সে যা বলেছে – সেটাই ঠিক আর আমি যা বলেছি – তা ভুল ! – তখন আমাদের দিদিমনি ঠিক করলেন – এমনভাবে আমাদের শেখাবেন যাতে আমরা দরকারি শিক্ষাটা ভুলে না যাই ! তিনি প্রথমে আমাকে ক্লাশের একদম সামনে নিয়ে গেলেন । টেবিলের একদিকে গিয়ে দাঁড়ালেন আর আমাকে বললেন টেবিলের আরেকদিকে দাঁড়াতে ! তারপর টেবিলের ওপর একটা বড় গোলাকৃতি বস্তু রাখলেন । - আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম – গোলাকার বস্তুটি কালো । দিদিমনি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন – সেটা কি রঙের ? সে উত্তর দিল – জিনিসটি সাদা ! আমি তো অবাক ! বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না – বন্ধু কিকরে একটা কালো জিনিসকে সাদা বলল ! ওটা কালো না সাদা - তাই নিয়ে আরেকবার তর্কাতর্কি হতে পারত ! তারপর দিদিমনি আমাকে বললেন আমার যায়গায় ফিরে গিয়ে দাঁড়াতে । - আর আমার বন্ধুটিকে বললেন সামনে গিয়ে টেবিলের ওপাশে দাঁড়াতে । - তার মানে আমাদের স্থান পরিবর্তন হল ! – তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – এই জিনিষটা কি রঙের ? – আমি দেখলাম সাদা । তাই বললাম – সাদা ! তখন আমার বন্ধু চেঁচিয়ে বলল – না, সেটা কালো ! আসলে এটা এমন বস্তু – যা আমার দিক থেকে সাদা দেখাচ্ছে ! আবার আমার বন্ধুর দিক থেকে সেটা কালোই দেখাচ্ছে ! আসলে যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে হলে তার গভীরে গিয়ে দু দিক থেকেই বিচার করতে হবে ! শুধু মাত্র শিক্ষালব্ধ বিদ্যার মাধ্যমেই তার সমাধান হয় না ! ( খুব পুরনো একটা লেখা ছিল আমার – ওয়ার্ডে নয় – দিয়ে দিলাম ! ) মনোজ

932

4

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ২০.০৯.২০১৫ ঘুট ঘুটে অন্ধকার।জানলার বাইরে থমকে আছে রাত।কটা বাজে?মোবাইল হাতরে দেখি সাড়ে তিনটে।ভোর হতে দেরি আছে।কম্বল জড়িয়ে চুপচাপ পড়ে থাকি।ঘুমোলে চলবেনা।কৌশাণীর সূর্য্যোদয় দেখা চাই।ইন্তেজার কা ফল মিঠা।চিন্তা যখন ব্যাকুলতা হয়ে উঠল।মনে পড়ল গীতায় বলেছে কর্ম করে যাও মা ফলেষু কদাচন।যত সব ।এদিকে তখন সবে আলো ফুটছে পুবদিকে।থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে পাখীর ডাক।কোন রাতের পাখী গায় একাকী সঙ্গি বিহিন অন্ধকারে!সত্যি কি ওএকলা!মনে পড়ে যায় ছোট বেলায় পড়া জয়শঙ্কর প্রসাদের কয়েকটা পঙ্ক্তি।খগ কুল কুল সা বোল রহা।কিশলয় কা অঞ্চল ডোল রহা।একি আলো হওয়ার সাথে সাথে দেখি শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা।টুপ টাপ বৃষ্টি শুরু।হায়রে !! বুঝলাম কপালে নেই সূর্য্যোদয় দেখা।বৃষ্টি থামল।পাহাড়ের চূড়ো সোনালী আলোয় ভরে গেল। পাহাড়ের গা বেয়ে যিনি উঠে এলেন তাঁকে জবা কুসম সঙ্কাশং বলা যাবেনা।ঝক ঝকে এক সোনার থালা।মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।যা দেখলাম তাও কিছু কম নয়।সালাম কৌশাণী।সালাম তোমায়। ইতিমধ্যে এসে গেল চা আর গরম জল।ব্রেকফাস্ট সারা হল।আজ আমরা যাব রাণীক্ষেত হয়ে নৈনিতাল।কৌশাণীর থেকে রাণীক্ষেত ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা।মন মাতানো। চোখজোরানো।দূরের নীল আকাশ সবুজ গাছপালা ছলাক ছলাক নদী। হাতছানি দেয়।কাছে গেলেই আবার দূরে সরে যায়।খেলায় খেলায় গাড়ি এসে যায় রাণীক্ষেত।উচ্চতা১৮৬৯মী.হিল স্টেশন।ক্যান্টনমেন্ট শহর।আছে বৃটিশ আমলের মিলিট্রী হস্পিটল।আছে কুমায়ুঁ রেজিমেন্ট আর নাগা রেজিমেন্ট।পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শহর।দূরে দেখা যায় পশ্চিম হিমালয় শ্রেণী।পাইন,ওক আর দেওদার সারিবদ্ধ।মনে হয় এক্ষুনি বাঁয়ে সে বাঁয়ে কন্ধা মিলিয়ে মার্চ পাস্ট হবে শুরু।শুধু কমান্ডারের উদঘোষের অপেক্ষা। জানাগেল রাজা সুধারদেব রাণী পদ্মিণীর মন জয় করেছিলেন।পরিবর্তে এই রমণীয় স্থান উপহার দেন রাণীকে।তাই নাম রাণীক্ষেত।যদিওনেই কোথাউ কোনো মহল কিম্বা তার ভগ্নাবশেষ। রাণীক্ষেতের আকর্ষন তার গল্ফকোর্স।এশিয়ার উচ্চতম গল্ফকোর্সের অন্যতম।নরম ঘাসে ছাওয়া প্রান্তর।দিগন্ত বিস্তৃত।ওক পাইন আর দেওদারের ছায়ায় সুনিবিড়।পাইন ফুল।নয়নাভিরাম। মানকামেশ্বর মন্দির,গুরুদ্বারা,বিনসার মহাদেব,হেয়ডাখান মন্দির দর্শণীয়।রানীক্ষেতের কুমায়ুঁ রেজিমেন্টের ম্য়ুজিয়াম দেখি অধির আগ্রহে।দুই বিশ্বযুদ্ধের নানান অস্ত্র,গোলা গুলি,কোনো জাপানী সৈনিকের রক্তমাখা বস্ত্র,বিশেষ ধরনের নৌকো,কারগিল যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র বিশ্বের আরেক রুপ তুলে ধরে।কুমায়ঁ রেজিমেন্ট দু দুবার পেয়েছে পরমবীর চক্র।দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন অনেক যুবা।তাঁদের ছবি দেয়লের গায়ে।ভীষণ ভাবে জীবিত।দুই চোখের কোনে অদম্য সাহসের হাসি।গাইডের গলায় গর্বের সুর।ইয়ে কুমায়ঁ কে জাঁবাজ দেশ কে লিয়ে কর গয়ে জান কুরবান।কর চলে হম ফিদা জাঁ আউর তন সাথিয়োঁ।অব তুম্হারে হওয়ালে বতন সাথিয়োঁ।অজান্তেই চোখে ভরে আসে জল। প্রায় প্রায় এসে গেছি।কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব নৈনাতাল।তার আগেই লাঞ্চের হল ব্যাবস্থা।অশোক(আমাদের কুক)সাপ্লাই করল ধোকার ডালনা।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি এ সম্ভব হল কি ভাবে।বলে বাড়ির থেকেই ডাল ভেজে গুঁড়ো করে আনা হয়েছে যাহ্ বাবা।ইচ্ছে থাকলে কি না হয়। লোহাঘাট যাওয়ার পথে পড়ে জাগেশ্বর ।রামগঙ্গার তীরে।মুগ্ধকর প্রাচিন স্থাপত্য।তেমনি দৃষ্টিনন্দন বাগেশ্বরের শিব মন্দির।সরজু নদীর তীরে।বৈজনত্থার শিব মন্দিরের প্রাচিনত্ব ভাবিয়ে তোলে।পাশেই নিঃশব্দে বয়ে চলেছে গোমতী নদী।রাণীক্ষেতের মন্দিরের স্থাপত্যে প্রাচিনত্বের অভাব।জাগেশ্বর,বাগেশ্বর আর বৈজনত্থার সামনে ফিকা।বৈজনত্থা যাওয়ার পথে এক ব্রীজ পার হওয়ার সময় দেখি ব্রীজের গায়ে লেখা ডিজাইন্ড এন্ড ইরেক্টেড বাই মার্টিন এন্ড বার্ণ,ক্যালকাটা।বেশ লাগল। গাড়ি আচমকা থামায় চিন্তায় পড়ল বাধা।স্থাপত্যের তুলনা আপাততঃ থাক তোলা। ব্যাপার কি? জানা গেল আমাদের গাড়ির নৈনিতাল শহরে প্রবেশ অধিকার বঞ্চিত।সব বাইরের গাড়ির হাল হাকিকত একই।শহরের রাস্তা ওনলী ফ শহরের গাড়িজ।নাও এবার।। অন্য গাড়ি ভাড়া করা হল।আমরা লটবহর নিয়ে সেই গাড়িতে উঠলাম।পিছনের গাড়িরা আমাদের দম ফেলার সময় দিতে নারাজ।আমরা প্রবিণারা সমতলের বাসিন্দা।স্থুল আর স্লথ।এক লাফে গাড়ি চড়া বস কী বাত নহী।দুলকি চালে ওঠা হল। কি কান্ড!সারা শহর লোকে লোকারণ্য।গাড়ির গতি শম্বুক।কিন্তু মল্লিতালের সবুজ জল তার উপর ঝুঁকে পড়া আকাশ ভুলিয়ে দেয় ভীড়ভাট্টা আর হট্টমালার দেশ। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম হোটেল এ।ঘরের সামনে বিরাট টেরেস।নীচে দুই থাকে রাস্তা।তারও নীচে জল থই থই মল্লিতাল।দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঘন বনে ঢাকা পর্বতমালা।তার মাথায় কালো মেঘ।ব্যাপার সুবিধের লাগল না। যা ভেবেছি।সন্ধের মুখে নামল ঝম ঝমিয়ে ।রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান হল না।রাতের নৈনিতাল ঝলমল করে উঠল টুনি বাল্বের আলোয়।এখন নৈনা দেবীর উৎসব।সুতরাং এই আলোকসজ্জা।তার সাথে ভক্তদের অবিরাম ভীড়।রাত বাড়তেই দেখি পাহাড়ের মাঝে চাঁদ।হঠাৎ মেঘের চাদর সব ঢেকে দিল। তাড়াতাড়ি ডিনার সারা হল।কাল সকালে যাব নৈনা দেবী দর্শনে।দুফুর বিকেল সন্ধে কাটাব নৈনিতালের পথে পথে ।সে রকমই ইচ্ছে নিয়ে শুয়ে পড়ি। ২১.০৯,২০১৫ নৈনিতাল।ঝিলের শহর।সাত পাহাড়ের চূড়ো যেন শহর কে রেখেছে আগলে। সবচে'উচুঁ নৈনা শিখর।তার থেকেই শহরের নাম নৈনিতাল।পুরাণে আছে সতির চোখ(নৈনা)এখানে খসে পড়েছিল।তাল সৃষ্টি হয়েছে চোখের জলে।সম্পূর্ণ কুমায়ুঁ নৈনা দেবী /নন্দা দেবী অথবা দূর্গার উপাসক। আমরা চললাম নৈনাদেবীর মন্দিরে।ঝিলের উত্তর ভাগ মল্লিতাল।দক্ষিণ ভাগ তল্লিতাল।নৈনিতালের জলের আছে বিশেষ বৈশিষ্ট।বর্ষার পর জলের রঙ সবুজ।গরম কালে গৈরিকা।আর শীত কালে তুতে নীল।আমরা ঝিলের ধার দিয়ে দিয়ে এগোতে থাকি।আমাদের বাঁদিকে ঝিল।তার সবুজ জলে খেলে বেড়াচ্ছে ছোট বড় অসংখ্য মাছ।আমাদের ডান দিকে রাস্তা।দুই ধাপে।সে রাস্তার ধারে দোকান পাটের পশরা।ব্রীজ পার হয়ে মন্দির।ব্রীজের উপর পোস্ট অফিস।বিশ্বে নজির বিহীন।ব্রীজের উপরেই ট্যাক্সি স্টেন্ড।ব্রীজ পার হলেই ফ্লাট।সমতল ভূমি।নৈনাদেবী মন্দিরের পাশেই দেখি মশজিদ আর গুরুদ্বারা।নৈনাদেবী দর্শন হল।মন্দির চত্বর দেখে বোঝা যায় মন্দিরের বয়স বেশী নয়।জানা গেল মুল মন্দির১৮৮০ তে ধ্বসের দরুন চাপা পড়ে গেছে। দেবীদর্শন হল।লোকাল নৃত্য দেখে অভিভুত।বাজনার তালে তালে নাচ।বাজানদারদের সাজ গোজ ঝকমকে।যে নেচে চলেছে সে পুরুষ না নারি বোঝা গেলনা।ছিপ ছিপে শরির।টুকটুকে লাল শাড়ি সামলিয়ে নাচে মেতে আছে।তাল এমন যে পারলে দর্শকও যোগ দেয়।ভিডিও নিলাম।লোকনৃত্য দেখার সুযোগ আসে কই! রোপ ওয়ে দিয়ে পাহাড়ে যাওয়া হল।অদ্ভুত দৃশ্য ।তালের জলে গাছপালা পাহাড় পর্বত ঘর বাড়ি সবের ছায়া স্থির হয়ে আছে। দুটো নাগাদ ফিরে আসি হোটেলে।লাঞ্চ সেরে দিবানিদ্রার আয়োজন।তখন টের পেলাম ভিডিও করার সময় সোয়টার রেখেছিলাম এক জায়গায়।আসার সময় আর সেই কথা মনে নেই। বিকেলে ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু।আমরা কয় জন বেড়িয়ে পড়লাম।পৌঁছে গেলাম মন্দিরে। হাওয়ার দাপটে মেঘ গেল উড়ে।নির্ভয়ে মেলায় ঘুরলাম।এবার পালা ফেরার। আগামি কাল আমাদের ভ্রমণের শেষ দিন।কত কিছুই দেখার থাকল বাকি।অবশ্য কালকের লিস্টে আছে জিম করবেট ন্যাশনল পার্ক।কি জানি ব্যাঘ্রকুলের দেখা পাব নাকি!সম্পূর্ণ কুমায়ু মন্ডলে আছে বাঘের ডেরা।দেখা দিলে হয়। ডিনার শেষ।গল্প শেষ।সব্বাইকে শুভরাত্রি

988

0

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ১৮.০৯.২০১৫ ভোর পাঁচটা।লজের বারান্দায় এসে দাঁড়াই।ঠান্ডা আছে।দূরে ঘন জঙ্গল।বিশাল এক হলুদমাঠকে ঘিরে আছে।পাহাড় যেন সাগরের ঢেউ।মন্ত্রপুত।অনড়।অটল।মনে পড়ে রবার্ট ফ্রস্ট The woods are lovely,dark and deep But I have promises to keep And miles to go before I sleep And miles to go before I sleep আজ আমরা যাব মুন্সিয়ারি।লম্বা ঘুরপাক। শুনলাম মুন্সিয়ারি প্রাচিন সিল্করুটের অন্তরভুক্ত।গোরিগঙ্গা বয়ে চলে নিজের ধুনে।মিলাম গ্লেশিয়ার তার উৎস।ট্রেকিং এর স্বর্গ রাজ্য।উচ্চতা ২২০০ মীটর।বরফের মুকূট পড়া পঞ্চচুল্লি।মুন্সিয়ারির আসল আকর্ষন। আমরা তৈরী হয়ে নিলাম।গাড়িরও সাজ শেষ।আজ বিশ্বকর্মা পুজো।ড্রাইভার সুখহাল গাড়ির পুজোপাঠ সারল।আমরাও উঠে পড়লাম।আবার সেই পার্বত্য রাস্তা!কখনও গোরিগঙ্গা কাছে আসে।কখনও যায় সরে।কখনও বাঁয়ে কখনও দাঁয়ে।রাস্তা এবার হল বিপদ সঙ্কুল।বাঁক গুলো অদভুত দক্ষতা দাবি করে।উনিশ বিশ হলেই বিনা টিকিটে স্বর্গারোহণ।অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্না।পাহাড়ের গায়ে বিকট দর্শন পাথর।ওয়েদারিং আর ইরোজনের প্রভাব।গভীর খাদ।পিলে চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দুফুর বারোটা নাগাদ পৌঁছেগেলাম বির্থী ফল্স।প্রায় ১২৫ মীটর উঁচু।পাশেই এক রেস্তরাঁ।সবার মন রাখতে চা হাজির। রাস্তায় পড়ল এক কালিবাড়ি।কালিবাড়ির এক ঘরে দেখি এক বাবাজি।বাঙ্গালী।নির্জনে কেমন লাগে।বললেন একা কই।আপনারা সবাই আছেন।রসিক বটে।শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন রসে বসে রাখিস মা শুকনো সন্ন্যেসী করিসনে দুফুর তিনটে নাগাদ পৌছে গেলাম মুনশিয়ারি।ইতিমধ্যে পথেই সারা হল লাঞ্চ।কারণ হোটেলে পৌঁছেই বেরুতে হবে এক স্থানিয় মন্দির দেখতে হোটেলে ঢুকেই দিল খুশ।দেখি পঞ্চচুল্লি নিজের সঙ্গিসাথি নিয়ে বিরাজমান।তবে মেঘের দৌরাত্মি এখানেও।পঞ্চচুল্লির উচ্ছতা ৬৩৩৪মী.থেকে ৬৯০৪মী.কথায় আছে এই পঞ্চচুল্লিতে পঞ্চপান্ডব শেষবারের মতন রান্না সারেন।ওনাদের স্বর্গারোহণ এখান থেকে শুরু।তার আগে শেষ খাওয়া(লাস্টসাপার) এখানেই। বিকেলে ঘুরে এলাম দূর্গামন্দির থেকে।মন্দিরে পৌঁছে মনে হল পৃথিবীর শেষ কিনারায় এসে গেছি।চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড়।সবুজ বনাণি দিয়ে ঢাকা।আছে সবুজের সব শেড।সবুজের পরেই কে যেন তুলি দিয়ে হলুদ রঙ লেপে দিয়েছে।ধাপে ধাপে সেই রঙ নেমে গেছে গভীর খাদে।মন্দির সাদামাটা।কিন্তু অদ্ভুত প্রশান্তি ।মনে হয় আর কিছু করার নেই।মিটেছে হিসেবের লেনদেন।শুধুই পারাপারের অপেক্ষা। ম্যানেজারের কথায় মনে পড়ল বিকেলের চায়ের সময় প্রায় পেড়িয়ে গেছে।ফিরে চলি হোটেলে।ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই গরম গরম চা আর টা।তোফা!রাত নটায় খাওয়া দাওয়া শেষ। শুতে যাওয়ার আগে আমার দরদে দিলের দাস্তাঁ না শোনালে রয়ে যাবে কাহানি অধুরি।পাতালভুবনেশ্বরে নামার দরুন হাতে পায়ের মাসলে বেদম ব্যাথা।বাস থেকে নামতে উঠতে মারে বাবারে করছি মনে মনে।জোরে বললে আবার সঙ্গিরা হয়ে যাবে ব্যাতিব্যাস্ত।এতেই শানাল না ।বোঝার উপর শাকের আঁটির মতন কোমরে খিঁচ লেগে গিয়ে আরেক কেলো হলো।রাতে শুতে গিয়ে দেখি কোমর হয়ে গেছে লাকড়ি।আঢ়া পাটনা হিলে যাচ্ছে মগর আমার কমর না হিলেলা পেনকিলার গিলে চললাম শুতে।আশাকরি কাল মুখে হাসি ফুটবে।শুভরাত্রি ১৯.০৯.২০১৫ আজ আমরা চললাম কৌশাণী।চন্দ্রযান রেডী।আমরাও ব্রেকফাস্ট সেরে যানে চড়ে বসলাম।গাড়ি স্টার্ট নিল।মন টপ গীয়ারে।মনে হয় সারা জীবন এরম হুহু করেএগিয়ে চলি।ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়।কোথা দিয়ে।জানলা খুলে দিই।ঠান্ডা হাওয়া এসে মুখে সস্নেহে হাত বোলায়।চোখ বুজে আসে।ওহ নো।ঘুম এস না ভাই এখন।চোখ ভরে দেখে নিতে হবে যে!ফির মুলাকাত হো ন হো।কুমায়ুঁ সৌন্দর্যের পশরা নিয়ে হাজির। পথে যেতে যেতে ছবি তোলা হয়।ধরে রাখি পাহাড়ের দৈনন্দিন জীবন।ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ব্যাগ কাঁধে চলেছে স্কুলে।মেয়েরা মাঠে কাজে ব্যাস্ত।এদের শাড়ি পরার রকম আমাদের থেকে আলাদা।শাড়ির আঁচল কোমরের চারপাশে বেড় দেওয়া কাঁধ অবধি আসেনা।মাথা একটা আলাদা কাপড়ের টুকড়ো দিয়ে ঢাকা  ।এরা খুব কর্মঠ।লবঙ্গ লতিকা বালা মৃদু মৃদু হাসিনি।যখন চকিতে তাকায় ঠোঁটে আর চোখের কোনায় স্মিত হাসি।দুঃখের বিষয় ক্যামেরা বন্দি করা গেল না।ছবি নিতে পারলাম এক মেশপালকের।দেখি এক স্কুলের মাঠে বাচ্চারা হয়েছে জড়ো।মনে হয় স্কুলে এ্যনুয়াল স্পোর্টস। নদির ধারে এক খাওয়ার দোকানে আমাদের নাস্তার বন্দোবস্ত।কাকভোরে আমাদের কুক অশোক রেঁধেবেড়ে সব গুছিয়ে এনেছে।তাই দিয়ে সারাহল ব্রেকফাস্ট।একটু বিশ্রাম নিয়ে সুখহাল আবার স্টীয়রিং এ।শুরু হল পথ চলা। টানা চার ঘন্টা ঘুরপাক খেয়ে পৌঁছেগেলাম বাগেশ্বর।মন্দিরের পিছনে বয়ে চলেছে সরযু নদি।শিতল জলে পা ডুবিয়ে দিই।আহ।সব পথকষ্ট শেষ।মন্দিরে হয় বিগ্রহ দর্শন।শিব ঠাকুর বিরাজমান।নজর কাড়ে মন্দিরের স্থাপত্য।পাথরের উপর পাথর বসান।দুই পাথরের মাঝে আছে এমন মশলা যা সময়ের ঘাত প্রতিঘাতকে করে চ্যালেঞ্জ। মন্দির দর্শন সারা হলে শুরু হল লাঞ্চ।আমরা মোটামুটি এসে গেছি কৌশাণীর কাছে।সুখহাল সন্ধের আগেই পৌঁছে যেতে চায় গন্তব্যে। আলমোড়ার থেকে ৫২ কিমী দূরে কৌশাণী ।জিলা বাগেশ্বর।উচ্চতা ১৮৯০মী.পঞ্চচুল্লি নন্দদেবী ত্রিশূল ৩০০ কিমী ব্যাপ্তিতে ঠায় দাঁড়িয়ে।সাথে ঘন পাইনের বন।একদিকে সোমেশ্বর ভ্যালী।অন্যদিকে গরুড় বেইজনাথ কট্যুয়ারি।আলমোড়া বাগেশ্বর হাইওয়ে। দূরে দূরে বরফের চুড়ো।কৌশাণী রুপে গুনে সুইটজারল্যান্ড।গান্ধিজী তাই বলেছিলেন।আমরাও সহমত।খান কয়েক গ্লেশিয়ার আছে।পিন্ডারী ,সুন্দর ঢুংগা,মিলাম আর কট্যুয়ার।ট্রেক যোগ্য।বলতে ভুলে যাচ্ছি বাগেশ্বর অবস্থিত গোমতী আর সরজু নদির সঙ্গমে। হোটেলে পৌঁছেই দেখ তে বেড়লাম অনাসক্তি আস্রম।এখানে গান্ধিজী অনাসক্তি যোগাভ্যাস করেছিলেন।।আশ্রম থেকে বেড়িয়ে বাইরে বাজারে ঘোরার ইচ্ছে ছিল।হোটেল মালিক বললেন আপনারা হোটেলের ছাদে যেতে পারেন।ভিউ খুব সুন্দর।অগত্যা ছাদে যাওয়াই ঠিক হল।রাতে খেতে বসে পেলাম আসল খবর।কিছুদিন আগে এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক সন্ধের পরে অনাসক্তি আশ্রমের গেটের কাছে একটা টেবিলের উপর বসে ছিলেন।হঠাৎ এক বাঘ দড়াম করে পড়ল এসে ওনার ঘাড়ে।টেবিল সহিত ভদ্রলোক চিতপটাং।উনি বাঘের সাথে মোলাকাতের দরুন হলেন বেহুঁশ।লাঠিসোঁটা নিয়ে লোকজন ছুটে আসাতে সে যাত্রা পেলেন রক্ষা। খেতে বসে গল্প শুরু হওয়া মানে একের পর এক চলবে।বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে শুতে এলাম।ঘরের বাইরেই ছাদ।বেড়িয়ে সিম্পলি স্পেলবাউন্ড।রাতের কৌশাণীর রুপই আলাদা সব তারারা নিচে পড়ে আছে।ঠাসবুনোট নেকলেস পড়ে দিব্যি মিটিমিটি হাসছে সদ্য যুবতি কৌশাণী শুয়ে পড়লাম।রাতও অনেক।বিশাল হোটেলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। চোখের পাতা বোজার আগে আল্লাতালাকে একটা ছোট্ট আর্জি জানালাম ।আগামী কাল যেন সানরাইস দেখতে পাই।সানসেট দেখা গেলনা।মেঘ আর বৃষ্টির দৌলতে।কৌশাণীর সানরাইস আর সানসেট অতুলনীয়। দেখি কাল কি হয়।মধুর তোমার শেষ যে নাহি পাই।ধরা দিও হে সানরাইস

1058

4

দীপঙ্কর বসু

মেঘমুলুকে কয়'টি দিন

ছয় ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন কালে বৃটিশদের হাতে দার্জিলিং ,কারসিয়াং ইত্যাদি পাহাড়ি জনপদ গুলো ক্রমশঃ অবকাশ যাপনের পক্ষে আদর্শ জায়গা হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এখানকার জলবায়ু গ্রীষ্ণকালে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী , সামরিক বাহিণীর কর্তা ব্যক্তিদের সমতলের প্রচন্ড দাবদাহের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে , আরণ্যক প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছে মন । তাদের অনেকেই এখানকার বনজ সম্পদ কে ব্যবহার করে ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন । সেই সঙ্গে প্রধানত তাদের সন্তানসন্ততিদের কথা মাথায় রেখে তারা বেশ কিছু অভিজাত শ্রেণীর স্কুল ও তৈরী করেছিলেন সে সময় । নানান বিষয়ে পড়াশনার পাশাপাশি ইউরপিয়ান অভিজাত সমাজে প্রচলিত আদবকায়দা আচার আচরনে শিক্ষিত করে তোলার ওপরেও যথেষ্ট জোর দেওয়া হত এই সব স্কুল গুলিতে । বেশ কিছু বিত্তশালী ভারতীয়দের সন্তানরাও স্থান পেতেন এই সব স্কুলে – তারাও মানুষ হতেন অভিজাত ইউরোপীয়ান জীবন ধারার মধ্যে । এর ভালোমন্দ দুই রকমের প্রভাবই পড়েছিল সেখালের সামাজিক জীবনে । সে স্বতন্ত্র প্রসঙ্গ – আপাতত পাশে সরিয়ে রাখলাম । আজ স্থানীয় এমনই কয়েকটি নামি দামি স্কুলে যাবার পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের দলটা বেরিয়েছে । যেহেতু এই কাজের সঙ্গে আমার কোনরকম ব্যবহারিক বা মানসিক যোগ ছিলনা, আমি এই স্কুলগুলির বর্তমান হালহকীকতের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টাও করিনি । শুধু এদের দুই একটি স্কুল বাড়ি দেখে মনে মনে সাধ জেগেছিল আগামি কোন জন্মে এমনি কোন একটি স্কুলে পড়াশোনা করার সূযোগ পাবার । যেমন কোলাহল মুখর দৈনন্দিন জীবনের থেকে দূরে ইউরোপীয়ান স্থাপত্যের আদলে তৈরী ডাও হিল স্কুলভবনটি ভারি পছন্দ হয়ে গেল আমার । স্কুল এর চারপাশে নিবিড় বনাঞ্চল – লম্বা লম্বা ক্রিপ্টোমেরিয়া (Cryptomeria Japonica , জাপানী ভাষায় “Sugi”) গাছেরা ভিড় করে ঘিরে রেখেছে ভবনটিকে । সে নিবিড় অরন্যভূমির ফাঁক ফোঁকরে থম মেরে আছে জমাট বাঁধা কালচে সাদা মেঘ । যেন অতর্কিতে শ্ত্রুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আত্মগোপন করে আছে । সেই অরণ্যভূমির গা ঘেঁষে রাস্তা আরো ওপরের দিকে চলে গেছে । যে অকাজের বরাত নিয়ে এসেছি এই মেঘমুলুকে , তারই তাড়নায় ঘুরতে ঘুরতে কয়েকটি বনফুলকে ক্যামেরা বন্দী করে ফেললাম । পথের ধারে ইতস্তত নিতান্ত অবহেলায় , নিছক ফুটে ওঠার আনন্দে ফুটে আছে নানা বর্ণের নানা আকৃতির , কত নাম না জানা ফুল । এরা সব সময়েই আমার চোখকে টানে । কানে কানে এসে বলে “আমায় দেখ । আমি কত সুন্দর”।সত্যিই তাদের অনেকেই গড়নে ,বর্ণে একেবারে অসাধারণ সুন্দর । এরাই পথ চলাকে করে তোলে পরম রমনীয় । কিন্তু ঝোপে ঝাড়ের আড়ালে আবডালে যেমন এই সব বনফুলেরা তারে গড়নের সৌন্দর্যে , ডেলিকেট রঙের গৌরবে পথচারীকে প্রলুব্ধ করে তেমনি ঝোপে ঝাড়ে থাকে অসংখ্য বিষাক্ত পোকামাকড় ও । কিন্তু সে কথা পরে হবে । আর একটি স্কুল আমাকে আকর্ষণ করল – সেটি ১৮৭৯ সালে স্থাপিত ভিক্টোরিয়া বয়েজ । বিশাল এলাকা জুড়ে স্কুল ভবন । এই স্কুলেই মাঠের মধ্যে আপনমনে বেড়াতে বেড়াতে দেখা হয়ে গেল স্কুলেরই একজন শিক্ষকের সঙ্গে । অচেনা একটি লোককে স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে অকারণে ঘোরাঘুরি করতে দেখে স্বভাবতই তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল আমি কে ,কোথা হইতে আসিয়াছি । আমার তরফ থেকে একটা সন্তোষজনক উত্তর পাবার পর ভদ্রলোক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে নানান কথায় মেতে উঠলেন । স্কুলের যে মাঠ টিতে আমরা দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছিলাম তার এক ধাপ নিচের একটি খেলার মাঠের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জানালেন “দেখুননা ক’দিন আগে ঐ মাঠে সিএম এর একটা মীটিং হয়েছিল । আর তার পর কি অবস্থায় মাঠটাকে ছেড়ে গেছে দেখুন” মাঠের দিকে তাকিয়ে সত্যিই আমার লজ্জা হল । চার দিকে ছেঁড়া কাগজের টুকরো , পেপার কাপ আরো হাবিজাবি অনেক আবর্জনা ছড়িয়ে আছে সারা মাঠ জুড়ে । পরনের হাল্কা চকোলেট রঙের স্যুট ,পরিস্কার করে কামানো দাড়ি এবং সযত্নে ছাঁটা মোটা গোঁফ ,আর সর্বোপরি ভদ্রলোকের ঋজু মেদহীন চেহারা আমাকে ঈর্ষান্বিত করে তুলল । ঝকঝকে চেহারা ও সুবেশী মানুষটির সঙ্গে আলাপ চলল বর্তমান স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার নানান সমস্যা নিয়ে । কথার মাঝেই ভদ্রলোকের ডাক পড়ল কোন কাজে তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন কাজে । ততক্ষণে আমার সাথীরাও তাদের কাজ সেরে ফিরে এসেছে । সাথীদের কাজের নির্ঘণ্টে দেখা গেল কিছুটা সময় হাতে আছে । ঠিক হল এই অবসর সময় টুকুর মধ্যে গিদ্দা পাহাড়ে অবস্থিত নেতাজি ভবনটি দেখে নেওয়া হবে । অতয়েব সেই উদ্দেশ্যে গাড়ি ছটল গিদ্দা পাহাড়ের দিকে। নেতাজি ভবনে যাবার পথে আমাদের গাড়ির চালক ডানদিকে একটি টিলার মাথায় ছাউনি দেওয়া ঘেরা জায়গা দেখিয়ে জানাল ওটি ভিউ পয়েন্ট । ওখান থেকে আপনারা সমতলভুমির কিছু অংশ দেখতে পাবেন পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে । টিপটিপে বৃষ্টি মাথায় করেই আমরা উঠে গেলাম ভিউ পয়েন্টে – সেখান থেকে দেখলা দূরে সবুজ সমতল ভূমিতে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী , তার ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের দল । চার দিকে কোথাও নীল বর্ণের ,কোথাও সবুজ রঙের নানা আকৃতির পাহাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । আঁকাবাঁকা অনেক পাহাড়ি পথ তাদের সাপের মত যেন জড়িয়ে ধরেছে । বেশ কিছু ছবি তুললাম আমরা সকলেই । কিছু ভাল ছবি তুলতে পারার তৃপ্তির পাশাপাশি একটা আফসোস ও রয়ে গেল – “আকাশটা যদি এমন মুখ গোমড়া করে না থাকত…”। ভিউ পয়েন্টের খুব কাছেই একটা পাহাড়ি টিলার গায়ে সুন্দর ভিলা র মত বাড়িটি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের দাদা শরৎ চন্দ্র বোস কিনেছিলেন ১৯২২ সালে ।আবার এই বাড়িতেই শরৎ চন্দ্র বোস ১৯৩৫ সালে গৃহবন্দী হয়ে ছিলেন বৃটিশ রাজের কোপে পড়ে । নেতাজি ও ১৯৩৬-৩৭ সালে এই বাড়িতে গৃহবন্দী হয়েছিলেন । এই বাড়িতে বসেই নেতাজি ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসে তাঁর প্রদত্ত ভাষণের খসড়া রচনা করেছিলেন । এ সব তথ্যই বাড়িতে ঢোকার মুখেই একটি বোর্ডে পাওয়া গেল । বেশ বড় মাপের বাড়িটি বর্তমানে নেতাজির স্মৃতি সংগ্রহালয় ও নেতাজি সম্পর্কিত গবেষণাকেন্দ্রে পরিনত হয়েছে । বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে নেতাজির পরিবারের বহু ছবি প্রদর্শিত হয়েছে । বিশেষ করে এমিলি শেঙ্কল এবং নেতাজি কণ্যা অনিতার বালিকা বয়েসে তোলা একটি আলোক চিত্র আমায় আকর্ষণ করল । কয়েকটি ঘরে শরৎচন্দ্র বোস এর ব্যবহার করা আসবাব পত্র রাখা আছে যেমন ছোট্ট একফালি শোবার ঘরে পালঙ্ক ,অপর একটি ঘরে লেখাপড়ার টেবল ,আরাম কেদারা ইত্যাদি । এই বাড়ির অভ্যন্তরে ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও লোভে পড়ে একটু অসদুপায় অবলম্বন করতেই হল । মোবাইলে কিছু ছবি তুলে ফেললাম সবার অগোচরে । কিন্তু বিধি বাম । সে সময়ে লোড শেডিং এর ফলে ঘরের মধ্যে আলো অত্যন্ত কম থাকায় ছবি গুলি ভালো হলনা । বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার মুখে বাগানে একটি ক্যামেলিয়া গাছের দিকে নজর গেল । একটী বোর্ডে লেখা দেখে জানতে পারলাম গাছটি শরৎ ছন্দ্র বোসের স্বহস্তে রোপণ করা । গাছটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে চেষ্টা করলাম অতীতের একটুকু ছোঁয়া পাবার আশায় । মনে জাগল অদ্ভুৎ রোমাঞ্চ ।

1241

22

মনোজ ভট্টাচার্য

প্যান্ডেল প্রায় শেষ !

প্যান্ডেল প্রায় শেষ ! অক্টোবরের প্রথমে প্রখর সূর্য তার অগ্নি তপ্ত রোদ্দুর বিছিয়ে রেখেছে অলস রাস্তায় । শরতকালে যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ও উৎসবের ব্যস্ততা ও উৎসাহ দেখা যায় – তা যেন একটু ম্লান । এদিকে আর মাত্র দু সপ্তাহ বাকি দুর্গাপুজোর ! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্যান্ডেল শেষ করতেই হবে । ঘরামিরা উঁচু প্যান্ডেলের সবচেয়ে উঁচু বাঁশ ও মোটা তক্তা দিয়ে তাকের মতো তৈরি করছে – প্যান্ডেলের বাঁধনটাকে আরও শক্ত করছে । আগে তো দেখতাম পাটের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধত । এখন দেখি লাল নীল হলদে সবুজ ইত্যাদি রঙিন কাপড়ের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধছে । প্যান্ডেল বা কোনও কিছু গড়ার কাজ ও কর্মব্যস্ততা দেখতে আমার খুব কৌতূহল হয় ! ঘরামি অত উঁচুতে উঠে কাজ করছে । আর আমি যেন ঘরামি হয়ে ওখান থেকে বসে বসে নীচে লোকেদের যাতায়াত ও কৌতূহল দেখতে পাচ্ছি ! আমি যেহেতু নিচে – তাই ঘরামি হয়ে আমাদের ভাবনাটাও বুঝতে পারছি ! চেম্বার স্ট্রিট বলে এক রাস্তায় একটা অনেক উঁচু তলার বাড়ি হচ্ছিল । আর আমি রোজ লাঞ্চএর সময় বের হয়ে খুব উৎসাহ ভরে দেখতাম – কিভাবে ক্রেনের সাহায্যে একটার পর একটা জিনিস তুলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওপরে – আর টুক টুক করে পরের পর স্লাইডগুলো লাগাচ্ছে ! মনে হচ্ছিল খুব তাড়াতাড়ি করছে – কিন্তু এক বছরের বেশি লেগে গেল শুধু স্ট্রাকচার তৈরি করতে ! ঐ এক বছর ধরে আমি দেখেছি কিভাবে একটু একটু করে যে কোন জিনিস গড়তে হয় । রোজ একাধিকবার গুনতাম কত তলা পর্যন্ত বাড়িটা উঠল ! আর কয়েকদিনের মধ্যেই এই প্যান্ডেল তৈরি হয়ে যাবে । তারপর এদের কাজ শেষ । তখন আসবে প্যান্ডেল সাজাবার লোকজন – আলো লাগাবার লোকজন ! – ঢাকিরা এলেই লোকেদের পুরো আনন্দ উপচে উঠবে । অবশেষে আসবে প্রতিমা । তারপর আসবে পুরুত ঠাকুর । কোনও কোনও ক্ষেত্রে হয়ত একাধিক পুরুত আসে । কোনও খুঁটিনাটিতে যেন ভুল না হয় ! কোথাও যদি কোনও ভুল হয় – তো দেবী দুর্গা – যতই দয়াময়ী হন না কেন – রাগ করতে পারে ! হয়ত অভিশাপও দিতে পারে! দু বছর আগে দেখেছিলাম – বিসর্জনের দিন – সিঁদুর খেলার পর – এয়ো রীতি করার সময় প্রদীপের শিখাতে দুর্গার অঙ্গে আগুন লেগেছিল । সঙ্গে সঙ্গে সবাই চেঁচামেচি করে তাড়াতাড়ি সেই মহিলাকে ধরে নামিয়ে – জল ঢেলে নেভানো হয়েছিলো ! – কি খানিক অং বং চং করে সবাইকে বোঝানো হল – শাস্ত্রমতে আগুন লাগে নি ! হয়ত বিসর্জনএর সময় পার হয়ে গেছিল বলেই – আগুন নির্দোষ হল ! আপাতত এইসব প্যান্ডেল তৈরি দেখলেই মাথার মধ্যে ঢাকির ঢাক বাজানোর শব্দ অনুরণিত হতে থাকে ! – যেমন এই এখন – মাথার মধ্যে অভিজিতের সেই ঢাক বাজানোর গানটা হতে আরম্ভ করেছে ! - ঢাকের তালে - - - ! মনোজ

1027

5

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা। ১৬.০৯.২০১৫ সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গল।বেড টী হাজির।আজ যাব লোহাঘাট মিনিবাস চলল পাহাড়ি পথে।প্রতি বাঁকে নতুন সাজে সে।লোহাঘাট।ঝিরঝির বয়ে চলে সাথে সাথে লোহাবতী নদি।কখনও দুই পাহাড়ের মাঝে খেলায় মেতে।কখনও গাছপালার নেয় আড়াল।মুশ্কিল হয় ছবি নেওয়া।কে যেন বলেছে কাশ্মীর গিয়ে স্বর্গ দেখা বাতুলতা।লোহাঘাট বরফ চুড়ো পাইন দেবদার নদি ঝড়না দিয়ে ঘেরা জন্নত।সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা ১৭৫৪মী।আসাও খুব আসান।নব্বই কিমী দূরে রেলওয়ে স্টেশন টনকপুর।এয়ার পোর্ট নৈনি সৈনী।লোহাঘাট পৌরাণিক স্থল।বাণাসুরকে বধ করেন শ্রীকৃষ্ণ।আছে বাণাসুর কিলা।স্বামী অবেধানন্দ স্থাপিত মায়াবতী আছে কিছুদূরে।স্বামী বিবেকানন্দের আগমনে ধন্য।মায়াবতীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দর্শককে করে দেয় অভিভুত।সংলগ্ন গ্রন্থাগারে আছে অসংখ্য বই।বই প্রেমিকরা বই কিনতে পারেন ।এখানে গেস্টহাউসে আছে থাকার সুব্যাবস্থা।তবে কোলকাতা অদ্বৈত আশ্রমের চাই অনুমোদন।আশ্রমের আসে পাশে বাঘ কখনও কখনও দেখা দেয়।জাপানী স্বামিজী তাই বললেন।আমাদের এক সঙ্গি ইতিমধ্য়ে পাশের পাহাড়ে উঠে গেছেন।বিবেকানন্দের ধ্যান করার জায়গা দেখতে।মহাবিপদ।এত ঘন জঙ্গল!অক্ষত ফিরলে বাঁচি।ফাঁড়া কাটল।উনি ফিরলেন। পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে বাস পৌঁছেগেল চিতই/গোলা দেবতার মন্দির।মন্দিরে ঢুকে হতবাক্।ছোট বড় মাঝারি হাজার হাজার(লক্ষও হতে পারে।গোনার সাহস নেই)ঘন্টা।সাথে চিঠি।অদ্ভুত দৃশ্য।গ্রামবাসীরা নিজের সমস্য়া জানিয়ে এই দেবতাকে চিঠি দেয়।সাথে কাঁসার ঘন্টা।মনে হয় ঘন্টা রিং টোনের প্রতিক।লোকগাথায় আছে গোলা দেবতা ছিলেন এক রাজপুত্র।নিজের গ্রামের দুঃখ কষ্ট দূর করাই ছিল তার কাজ।তাই সে দেবতাতে রূপান্তরিত। পৌঁছেগেলাম জাগেশ্বর।শিব মন্দির।পাশ দিয় বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী।রামগঙ্গা।মন্দিরে বাল শিব বুঢ়া শিব দুজনেই ধ্য়ানমগ্ন।মন্দিরের স্থাপত্য মনে আনে সম্ভ্রম।পাথরের উপর পাথর বসানো।সেই জামানায় এই বিশাল কান্ড !! ভাবা যায়! আবার পথ চলা।বাঁকের পর বাঁক পার হওয়া।শুধু আসা।শুধু যাওয়া ।শুধু পিছু ফিরে দেখা।দেখে দেখে আশ মেটেনা।কত রকম গাছ।ফুলের বৈচিত্রও কম নয়।অবাক হলাম যেখানে সেখানে কুমড়ো ফুল আর কুমড়ো ঝুলছে দেখে।এরা নির্ঘাত কুমড়ো ফুলের বড়া খায়না।নাহলে পথেঘাটে অনাদরে পড়ে থাকে! সন্ধে হওয়ার আগেই ঘরে ।আগামি কালের গোছগাছ।আট ঘন্টার সফর।টারগেট চকৌরি।মন খুশ।রহস্যঘন হিমালয়।কাল না জানি কি দেখি। শুভরাত্রি লোহাঘাট ১৭.০৯.২০১৫ বাসের জানলা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে ঠান্ডা হাওয়া।সর্পিল পথ ।গভির খাদ ।দূরে পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গ্রাম।ধাপে ধাপে নেমে গেছে শস্যের ক্ষেত।ধানগম শাগসব্জি আর কত কি।নিল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের ভেলা।হঠাৎ মন কি একটু উদাস হল! পৌঁছেগেলাম পাতালভূবনেশ্বর।মাইথোলজী অনুসারে এখানে তিরিশ ফুট নিচে গুফায় অবস্থান করতেন শিব।এই গুফায় পঞ্চ পান্ডব কিছুকাল ছিলেন।গুফা দর্শন করলে এক সাথে কেদারনাথ বদ্রিনাথ আর অমরনাথ দর্শনের ফল পাওয়া যায়। আমাদের ম্যানেজার সবাইকে সাবধান করলে।ভিতরে না নামাই ভাল।আমার মনে হল নিচে নামলে কেমন হয়।ধাপে ধাপে সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে নাইন্টি ডিগ্রী এঙ্গেলে।ঢোকার মুখেই সাবধান বাণী।বরসাত কে কারণ ফিসলন হ্য়ায় ঔর অক্সিজন কম।ব্লডপ্রেশর ঔর সুগার কে মরিজ নিচে ন উতরে।ম্যানেজর ,কুক,ড্রাইভার,রায়জী আর আমি শুরু করলাম নামতে।কিছুটা নেমে বুঝলাম কি সাংঘাতিক রাস্তা মাঝে মঝেই বিশাল গ্যাপ।আমার সাথিরা লম্বা পায়ের দরুন নেমে গেল ।আমি নিরুপায় হয়ে বসে নামতে লাগলাম।পিছল থেকে বাঁচার জন্য দু পাশের লাগান শিকল কষে ধরে থাকলাম।তিরিশ ফুট গভিরে বিভৎস গরম।বোঝাগেল অক্সিজেনের অভাব।আমার নিশ্বাসের কষ্ট শুরুহল।নিচে নেমেই একটা বারো বাই পোনেরোর মতন ছোট্ট জায়গা।আমাদের গাইঢ কাম পুরোহিত দেখাল শেষনাগের মাথা শিবের জটা।গলা কাটা গনেশের উপর গরুর থন থেকে দুধ নেমে আসছে।আবার শিব লিঙ্গের পূজো সেরে নিয়ে আমাদের ফুল প্রসাদ দিলে।আসলে লাইম স্টোন এরিয়া।জলের প্রভাবে নানান আকৃতি নিয়েছে রুপ।সারাক্ষণ আমায় আমার সঙ্গিদের সামলাতে হল।নিশ্বাস চলছে হাপরের মতন।সেই স্টীপ সিঢ়ি উঠতে গিয়ে আমি মৃত প্রায়।সঙ্গিরা সাহস জোগায়।দিদি ভয়ের কিছু নেই।আমরা সাথে আছি।সে তো বুঝলাম।কিন্তু আমায় নিঃশাস কে জোগাবে।শেষ কয়েক ধাপের কাছে এসে আমার জীভগলা শুকিয়ে কাঠ।মুখে ফেনা।ড্রাইভার ছেলেটি আমার আগে ছিল।সে আমায় তোলার জন্য হাত বাড়াল।অত কষ্টেও আমার কমন সেন্স নষ্ট হয়।ভাবছি আমায় তুলতে গিয়ে ও আমি একসাথে নিচে না পড়ে যাই ।ছেলেটি আমার মনোভাব বুঝেছিল কিনা জানিনা।আমার ভাবনার পরোয়া না করে এক হ্যেঁচকায় আমায় তুলে আনল।বাইরে বেড়িয়ে বুঝলাম আমি আবার ভূমিষ্ঠ হলাম।সে যে কি অনুভূতি বোঝান যাবেন।বুকের মধ্যে হালকা ব্যাথা আর নিঃশ্বাসের কষ্ট বেশ কিছুক্ষণ আমার সাথি হল।নল থেকে জল খাওয়ার উপায় নেই সারা হাতে কাদা।জলের বোতল বাসে।বাস ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে।নিরুপায় হয়ে মাধবী নিজের হাতের আঁজলা ভরে ভরে জল আনল।জল খাওয়াল। বাস রওণা হল দুফুর দুটো নাগাদ।বলা বাহুল্য় ইতিমধ্যে সারা হয়েছে লাঞ্চ।বিকেল বিকেল পৌঁছেগেলাম চকৌরী।আজব সুন্দর।চারিদিকে পাহাড়ের ঘেরাটোপ।ঝোপেঝাড়ে বিচিত্র বর্ণ ফুলের সমারোহ।ঠান্ডা?আছে বৈকি।বিকেল কাটল বারান্দায় আড্ডা মেরে।সাথে চা।রাত আটটা বাজতেই খাওয়ার ডাক এল।সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা মাঠ পেড়িয়ে ডাইনিং হল।খাওয়া সেরে ফিরলাম।শোওয়ার জোগাড়যন্ত্র চলছে হঠাৎ গেস্ট হাউসের লোক এসে সতর্ক করে গেল।ডাইনিং হল থেকে কেউ রাতে এদিকে আসবেনা।কোনো দরকার পড়লেও যেন আমরা কাউকে না ডাকি।ক্যিউঁরে বাবা।বাঘ আয়া হ্যায় ।অন্ধেরে মে কহীঁ ঘাত লগাকে বৈঠা হ্য়ায়।ওরা নাকি ওদের কুকুর গরু সব ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেছে।আঁতকে উঠে বলি আরে সিঁড়ি পর দরওয়াজা নেই।উপর আগয়া তো? না উপর নহী আয়েগা।কি বলে!বাঘ কি সিঁড়ি চড়তে পারেনা?এখানকার লোকেদের কথা অদ্ভুত যেন বাঘ নয় গরু ছাগল।এই একটুক বাগানে ঢুকে পইড়েছে।ঘরের জানলায় কেবল নেট আর গ্লাস।বাঘ তো একথাবাতে নেট ছিঁড়ে ফেলবে।গ্লাস ভাঙ্গতেই বা কতক্ষণ।বড়ী বওয়াল!ঘুরতে এসে শেষে বাঘের পেটে!লোকনাথ বাবা স্মরণ করলে কেমন হয়!রণে বনে জলে জঙ্গলে আমায় স্মরণ করো।তাই করি।মরতা ক্য়া ন করতা।একবার ভাবলাম লাইট জ্বালিয়ে শুই।তারপর ভাবলাম লাইটে আরো ভাল দেখা যাবে৬৭কেজীর নধর শরির।দরকার কি।তার থেকে অন্ধকারে ব্যাটা চোখ সেট করুক।কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। হরি ওম তত্ সত্।শুই গা।আজ রাতে বাঘের পেটে না গেলে সগ্গাল সগ্গাল হবাইরে সালাম কমু। শুভরাত্রি।সব্বা খৈর।গুড নাইট।হগ্গল ভাষায় কইয়া লই।হেশ কথা কিনা কেজানে!একটা মন্ত্র পড়ে শুতে চলে যাই।সিংহ আমার ব্য়াটা।বাঘ আমার পূত।রাম লক্ষণ বুকে আছে করবে আমার কি>

965

2

Somen dey

বড়কত্তা এবং সরগমের নিখাদ

বড়কত্তা এবং সরগমের নিখাদ ********************** জীবনানন্দ দাস ছিলেন সারা জীবন গ্রাম বাংলার রুপে আপাদমস্তক obsessed একজন কবি  । শুধু ‘রুপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থেই নয় , তাঁর বেশির ভাগ কবিতাতেই কোনো না কোনো না কোনো ভাবে ছাপ ফেলেছে বাংলাদেশের গাছ পালা , খাল বিল নদী , পাখী এমন কি কীট পতঙ্গও । কুমার শচীন্দ্র দেববর্মন তেমনি ছিলেন বাংলার লোক গানে obsessed একজন সঙ্গীত সাধক  । ধ্রুপদ সঙ্গীত সহ এ দেশের সব ধরনের এবং কিছুটা পশ্চিমেরও সঙ্গীত কে তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের মত ।নাড়া বেঁধে সঙ্গীত শিখেছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় , কৃষ্ণ চন্দ্র দে , বাদল খাঁ , আলাউদ্দিন খাঁর মত মার্গ সঙ্গীতের মহীরুহদের কাছে । কিন্তু অন্তরে গ্রহন করেছিলেন যা কি কিছু তাঁর মন কেড়েছিল তাকেই ,তিনি নিজে গান গেয়েছেন সম্পুর্ন নিজের মেজাজে ।সে মেজাজের মধ্যে সুর সৃষ্টি করেছেন খোলা মন নিয়ে ,একেবারে নিজের স্টাইলে । সে স্টাইলে ছিল সাঙ্গিতীক মেধার সঙ্গে হৃদয়ের কোমনীয়তার এক অসাধারন মিশ্রণ ।তিনি রুপকার ছিলেন লোক সঙ্গীতের সঙ্গে কাব্য সঙ্গীতের অসবর্ণ অথচ সার্থক বিবাহের ।কিন্ত সুর রচনার সময়, বিশেষ করে সিনেমার সুর রচনার সময়, সব চেয়ে বেশি গুরত্ব দিয়েছে সাধারণ মানুষের কানের কাছে সে সুরের গ্রহণযোগ্যতা কে । ******* কুমিল্লার ষাট বিঘা জমির উপর তৈরি বিরাট রাজপ্রাসাদের বসবাসকারী যুবরাজের সাধারন লোকেদের সঙ্গে মেলা মেশা করাটা রাজ পরিবারের রীতি বিরুদ্ধ ছিল । প্রাসাদে অনেক পরিচারক পরিচারিকা । কিন্তু তাদের সঙ্গে কুমার শচীনের হুকুম দেওয়ার সম্পর্ক । বাবার কাছে নবদ্বীপ চন্দ্র দেব বর্মন অবশ্য সঙ্গীত রসিক ছিলেন , সেতার বাজাতেন নিজে । তাই সঙ্গীতের প্রথম তালিম বাবার কাছেই পাওয়া ।বাড়ির ছোট বলে ছেলে বাবার একটু বেশিই আদর দিতেন । তবু বালক শচীন কি জানি কেন একটা টান অনুভব করত মাটির কাছাকাছি জগতটার জন্যে । তাঁর নিজের কথায় – ‘ ত্রিপুরার ধানের খেতে চাষী গান গাইতে গাইতে ধান চাষ করে , মাঝিরা গানের টান না দিয়ে নৌকা চালাতে জানেনা , জেলেরা গান গেয়ে মাছ ধরে, সেখানের লোকেদের গানের গলা ভগবান প্রদত্ত ’ । কিন্তু সেই জগতে তার অবাধ বিচরণ করার অনুমতি ছিল না । তবে বাবার নির্দেশে সন্ধাবেলায় ভাই বোনেরা মিলে যে উপাসনার আসর বসত , সেখানে উপাসনা ছাড়া মার্গ সঙ্গীত আধারিত গান বাজনার আসরও হত। তাঁর এক দাদা কিরন কুমার দেববর্মন আর এক দিদি তিলোত্তমা দেবীও ভাল গাইতেন । এ ছাড়া দোল উৎসবে বিখ্যাত গায়ক গায়িকারা আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন তাদের বাড়িতে গান শোনাতে । এ ভাবে বালক শচীন্দ্রের গান বাজনা শিক্ষা চলতে লাগল । ক্লাস ফাইভে উঠে স্কুলে সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে গায়ক শচীন্দ্রের প্রথম পাব্লিক এপারিয়ারেন্স । সে গান সবার ভালো লেগেছিল । স্কুলের হেডমাস্টার মশাই তার সুখ্যাতি করে শচীন্দ্রের বাবাকে একটা চিঠি দিয়েই বসলেন । এর পর তার বাবা তাকে প্রথাগত ভাবে গান শেখাতেও আরম্ভ করলেন । ***** কিন্তু এই শিক্ষায় কোথাও একটা খুঁতখুঁতানি রয়ে যেত কুমার শচীন্দ্রের মনে । কোথাও একটা সেই মাঠে ঘাটে শোনা গান সম্মন্ধে জানার আকুতি তাকে অস্থির করতো । কিন্তু রাজবাড়ির আভিজাত্যের বলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না । কিন্তু একটা উপায় বোধহয় ঈশ্বরই করে দিলেন । জীবনের উপান্তে এসে , দেশ পত্রিকার সম্পাদকের সাধাসাধিতে তিনি কিস্তিতে একটি অতি সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী লিখেছিলেন । তাতে তিনি তাঁর যে দুজন সঙ্গীত গুরুর নাম করেছিলেন তাঁরা কেও কোনো উস্তাদ সঙ্গীতজ্ঞ নন । তাদের একজনের নাম মাধব আর আর একজনের নাম আনোয়ার । তারা আসলে ছিল রাজবাড়ির দুই পরিচারক । মাধবের কাজ ছিল ছুটির দিনে দুপুর বেলা বাড়ির সবাইকে রামায়ন পাঠ করে শোনানো । তার সম্মন্ধে তিনি নিজেই লিখেছিলেন – ‘... সে যখন রামায়ন পড়ত তখন তান-খটকি ছাড়া সরল-সোজা গানের ধরণ গানের ধরণ আমাকে পাগল করে দিত । ’ আর আনোয়ার সম্মন্ধে - ‘ ... আনোয়ার রাত্রে তার দোতারা বাজিয়ে যখন ভাটিয়ালি গান করত , তখন আমার ব্যাকরণ মুখস্ত করারা দফারফা হয়ে যেত আর পরের দিন স্কুলে মাস্টারমশাই এর কাছে বকুনিও খেতাম । কিন্তু রাত্রে আবার ব্যাকরণ মুখস্ত ও অঙ্ক কষা ছেড়ে আনোয়ারের কোল ঘেঁষে বসে তার ভাটিয়ালি সুরে ও কথায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম ।’ বহু বছর পরে যখন যখন শচীন কত্তা তাঁর বোম্বাইয়ের বাড়িতে বসে বিমল রায়ের ছবির জন্যে সুর করছিলেন – ‘সখিরি বিরহা কে দুখ সহ সহ কর যব রাধে বেসুধ হোলি তো একদিন অপনে মনমোহন সে যাকর ইঁয়ু বোলি আজ সজন মোরে অঙ্গ লগালো জনম সফল হো যায়ে হৃদয় কী পীড়া , দেহ কি অগ্নি সব শীতল হো যায় ...’ তখন হয়ত অলখ থেকে কোথাও হয়ত সেই রামায়ন পড়া মাধব তাঁকে জুগিয়ে দিচ্ছিলেন সুর । আবার যখন সুর করছিলেন ‘গাতা রহে মেরা দিল / তুহি মেরী মঞ্জীল’ , বিজয় আনন্দের জন্যে , তখন হয়ত চুপি চুপি তাঁর পাশে এসে বসেছিলেন সেই অঙ্ক ভুল করিয়ে দেওয়া, ভাটিয়ালি গাওয়া সেই ছোটো বেলার আনোয়ার । (চলবে )

1005

9

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা ১৫.০৯.২০১৫ভ্রমণের রোজনামচা ১৫.০৯.২০১৫ লখনউ স্টেশন।বাঘ এক্সপ্রেসে চড়ব বলে আমরা আট জনা আর আমাদের ম্যানেজার আর কুক সাকুল্যে দশ জন বিশাল লট বহর নিয়ে হাজির।আমাদের অবাক করে ঠিক রাত বারোটা পাঁচে বাঘ এক্সপ্রেস চাগ চাগ করে স্টেশনে ঢুকে পড়লে।সুরেশ প্রভুকে সলাম ঠুকে আমরা হুড়মুড়িয়ে চরে বসলাম।অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা যে যার মত গুছিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম।ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যে লখনউ ভেসে উঠে থেকে থেকে ।খুবই মায়াবী এই শহর।আর কেতাদুরস্ত।পহলে আপ।পহলে আপ।সারাদিনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে অবধের নবাবদের সাথে।সাহদত খান।সফদরজঙ্গ।আসিফ-উদ-দৌলা।আর ওয়াজিদ আলি শাহ।এক মিউজিয়ামে গিয়ে এনাদের বিশাল বিশাল ছবির সাথে হলাম মুখোমুখি।গাইড বললে আপনারা যেদিকে এগোবেন ওনাদের পায়ের নাগরার চোঙ আর ওনাদের চোখ আপনাদের দিকে ঘুরে যাবে।তাজ্জব কী বাত।সত্যিই তাই।কে একজন বললে এনারা কি মহিলারা এলেই নড়ে চড়ে ওঠেন।ব্যানার্জীদা গাইডকে নিষ্প্রিহভাবে জিজ্ঞেস করে বসলেন ওনাদের বেগমসংখ্যা।গাইডের চোখে থেকে কি জানি কেন বেড়ল এক ঝলক আগুন।পরে রাণীবাগ এসে অটোওয়ালা জানালে এই মহলে থাকতেন আসিফ-উদ-দৌলাল তিনশো পঁয়সট্টী জন বেগম।সেই মহলের সামনেই নক্কাশীদার সুরম্য কুঠি।জানাগেল তখনকার নাচঘর।আর এখানেই কামাল আমরোহির বিখ্যাত বই 'পাকিজা'র ডান্স সিকোয়েন্স হয়েছিল ক্যামেরা বন্দি।চোখের সামনে ফুটে উঠল ঠাঁট বাট জাক জমক সহ সেই নাচ।মীনা কুমারী।ইন্হী লোগোঁ নে লে লী দুপট্টা মেরা। লগনউয়ের শেষ নবাব ছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ।যিনি একাধারে কবি,গায়ক,শায়র ও নাচ গানের সংরক্ষক।ওনাকে বলা হয় হিন্দুস্তানী থিয়েটরের প্রথম লেখক।রাধা কিষণ কী কিস্সা ওনার কৃতি।উনি কথক নাচের করেন পূনরুদ্ধার।জুহি,জোগি আর শাহ প্রসাদ রাগের জন্মদাতা।উনি লাইট ক্লাসিকল ঠুমরির প্রনেতা।ভৈরবী ঠুমরি বিশেষ ভাবে ওনার প্রিয়।যে গান কে এল সায়গল এবং অনেকে গেয়েছেন।গানের লব্জ হৃদয়স্পর্শী। बाबुल मेरा नैहर छूटल जाय चार कहार मिल,मेरी डोलिया उठाये मेरा अपना बेगाना छूटो जाय आँगन तो पर्वत भयो और भयी विदेश जाय बाबुल अपना घर,मैं चली विदेश ১৮০১সাল থেকে অবধ বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাফার স্টেট।কোম্পানি নিজের উত্তর দক্ষিণ আর পূর্ব দিকের রাজ্যের মাঝে এক পাহারাদার বসিয়েছে।উদ্দেশ্য কোনো বাহানায় ছিনিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা।সুযোগও এল।নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ গেরুয়া ধারণ করে জোগী সাজে ।শের শায়রিতে থাকে মগন।ইংরেজ বলে টোটাল ললেসনেস।প্রজারা যেখানে গান বাজনা নিয়েই ব্যাস্ত।সে দেশ অবশ্যই ইংরেজ করতলগত হওয়ার যোগ্য।ফেব্রুয়ারী ১৮৫৬।অবধ ওয়াস এন্যাক্সড।ওয়াজিদ আলিকে পাঠান হল কোলকাতার মেটিয়াবুরুজে।সেখানেই৩০ জুলাই ১৮২২ অবধের শেষ নবাবের দেহাবসান।এই সন্দর্ভে সত্যজিত রায়ের শতরঞ্জ কে খিলাড়ীর কথা উল্লেখ করতেই হয়।অনবদ্য। সারারাত অবধের কথা ভাবতে ভাবতে কখন জানি পড়েছি ঘুমিয়ে।চোখ খুলতেই দেখি গাড়ি বরেলী স্টেশন ছেড়ে দিয়েছে।বাইরের দৃশ্য এমন কিছু নজরকাড়া নয়।কিন্তু ক্ষেতক্ষামার বাড়িদালান স্কুল কলেজ বট অশ্বত্থ ছোট নদি ব্রীজ পার হওয়া ঝমাঝম দূরে মিলিয়ে যাওয়া ছোট ছোট গ্রাম ।গাড়ি এসে গেল কাঠগোদাম।নেমেই মনে হল হিমালয় কাছেই।আর ট্রেন নয়।এবার মিনি বাসে হল সফর শুরু।যাব আলমোড়া।ধীরে ধীরে গাড়ি সমতল ছেড়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরল।হেয়ার পিন বেন্ড।নো রেস নো রেলী।এনজয় দ ভ্যালী।সাথে সাথে বয়ে চলল কখনও কোশী(কৌশিকী)নদী।কখনও সুয়াল।অনেকটা কাশ্মিরের পহলগাঁওয়ের লীডর নদির মতন।কখন কোনো বাঁকে কাছে আসে কখনও লুকিয়ে যায়।পাইন আর ফার গাছ।কোনিফেরাস।মানে জম ঠান্ডা পড়ে।বরফের হাত থেকে গাছকে বাঁচাবার জন্য প্রকৃতির ব্যাবস্থা। রাস্তায় পড়ল রামকৃষ্ণ কুটীর।বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি নেমে এই আশ্রম।শান্ত পরিবেশ।মহারাজ আমাদের বালমিঠাই দিলেন।আবার গাড়ি চলল।পৌঁছুলাম লোহাঘাট।এখানেই আজকে রাতের মতন ডেরা।লাঞ্চ খেয়ে বেরতে হল মায়াবতীর জন্য।দেড় ঘন্টা মতন লাগল।এখানে বিবেকানন্দ ১৯০১এ এসেছিলেন।মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রম দেখাশুনো করছেনএক জাপানী ভক্ত।সুন্দর বাংলায় আমাদের সাথে চালালেন বার্তালাপ।আমরা গদগদ। আলমোড়া নাম কিলমোড়া প্লান্ট থেকে হয়েছে।এই ঘাস দিয়ে কাতারমল মন্দিরের তৈজসপত্র মাজা ঘসা হত। আলমোড়ার পূর্ব দিকে পিথোরাগঢ়,পশ্চিমে গহঢ়ওয়াল,উত্তরে বাগেশ্বর আর দক্ষিণে নৈনিতাল।এসব কুমায়ুর অংশ।কাঠগোদাম থেকে ৮২কিমী।আলমোড়ায় অনেক দেব দেবীর মন্দির।চিতাই দেবতা আর নন্দা দেবী প্রমুখ।নন্দা দেবী দর্শন হল সন্ধে বেলা।গলি তস্য গলি।তারপর মন্দির। ফেরার পথে দেখি আলমোড়া রাতের অন্ধকারে এক গা হীরে চুন্নি পান্নার গয়না পড়ে ঝিকমিকিয়ে আছে।ভালবাসতে বাধ্য। আলমোড়া কাল আবার কোন রুপে ধরা দেয়! অধির আগ্রহে শুতে চললাম

1024

3

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা১৪.০৯.২০১৫ সকাল হতেই সাজ সাজ রব।আজ আমরা দেখব লখনউ শহরের বিশেষ বিশেষ দর্শণীয় স্থল।পৌঁছে গেলাম শহরের সর্বাধিক আকর্ষণস্থল বড়া ইমামবড়া।আর্কিটেক্ট কিফায়ততুল্লা ইরাণী আর অবধের চতুর্থ নবাব আসিফ-উদ-দৌলার অদ্ভুত ইমারত।১৭৮৪এনেছিল অবধে ঘোর অকাল।গরিবের জান অনাহারে যায় যায়।নবাব আসিফ-উদ-দৌলা প্রজাকে অনাহার থেকে বাঁচাবার জন্য বার করলে এক অভিনব উপায়।উনি এক বিশাল সৌধ নির্মানের নিলেন সিদ্ধান্ত।যা হয়ে রইল এক দৃষ্টান্ত।যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকবে গরীবগুরব মহল করবে নির্মাণ।সূর্যাস্তের পর ঘন অন্ধকার নামলেই ধনী অমির এসে গুড়িয়ে দেবে সেই সৌধ।যদিও নবাব চেয়েছিলেন ভাঙ্গাগড়া চলবে সাথে সাথে।কিন্তু ধনীরা বসল বেঁকে।এইসা কৈসে হো সকতা।তাঁদের ইজ্জত মান সম্মান বলে কি নাই কিছুই।গরীব কে সাথ কন্ধা মিলানা।নৈব নৈব চ।রাতের আঁধারে বরণ ভাল।গরীবের কাজের রইলনা অভাব।মেহনতানা নসীব হল বেরোকটোক।তাই নবাবের প্রজার মুখে মুখে ঘুরে ফিরে একই কথা জিসকো ন দে আল্লা উসকো দে আসিফ-উদ-দৌলা। বড়া ইমামবড়ার সৌধ বিশাল।আসিফ ইমামবড়া নামেও খ্যাত।মুহর্রমের সময় এখানে সিয়া মুশলিমদের হয় জমায়েত। বিশ্বের সর্ব বৃহত এই মহলের সভাগার।যার দৈর্ঘ পঞ্চাশ মিটার আর উচ্চতা পনের মিটার ।সভাগারের ছাদ এশিয়া ট্রে।সংলগ্ন দুই ঘরের ছাদ ক্রমশঃচাইনীজ বাওল আর কাটা খরবুজা ।এই মহলের ভীতরেই সভাগার ঘিরে বারান্দা।তার এক কোনায় দাঁড়িয়ে দেশলাই জ্বলালে আমাদের গাইড।বহুদূর থেকে তা আমরা শুনলাম। এবার চললাম আমরা বড়া ইমামবাড়ার তৃতীয় ভাগে।ভুলভুলাইয়া।গাইড বললে এর ভীতর চারটে রাস্তা কিন্তু এক রাস্তা হী সহী।এর ভীতরে জব ভী আইয়ে সাথ মে গাইড জরুরী।রোজ সূর্য্য অস্ত যাওয়ার আগেই ভুলভুলাইয়ার ভীতর চেকিংগ হয়।কহীঁ কোই ফসা তো নহী।কেউ আটকে থাকলে তাকে উদ্ধার করা হয়।এবং নাচিজ থেকে ফাইন নেওয়া হয়।এই ভুলভুলাইয়া সাবিত করে দিওয়ারোঁ কে ভী কান হৈ।সরু সরু গলির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় গাইড দেখাল কোথাউ দাঁড়িয়ে কথা বললে সে কথা সবার কানে আসবে।সম্পূর্ণ মহলে নো বীমস নো গারডার নো পীলারস।ভুলভুলাইয়া তৈরী মাটি রাইস হাস্ক গুড় ডিমের যরদা দিয়ে।এই ভুলভুলাইয়া সম্পূর্ণ মহলকে ঘিরে রেখেছে।ইন্জিনিয়ারিং মার্ভেল।নো ডাউট।এখানে ইলেকট্রিসিটীর ব্যাবস্থা নেই।দিনমানেই দেখে লিতে হবেক। এবার মহলের চতূর্থ ভাগ।ছাদে ওঠা হল।অদ্ভুত অপূর্ব।দূর দিগন্তে দেখা যায় কিং জর্জ মেডিকেল কলেজ।রুমি দরওয়াজা।জামা মশজিদ।ওয়াচ টাওয়ার। ছাদ থেকে নেমে পাশের বাউলিতে যাওয়া হল।আশ্চর্য্য হতে হয়ে কিয়াফতউল্লার স্থাপত্যকলা দেখে ।দাদ দিতে হয়।বাউলির(well কুয়ো)প্রবেশ দ্বার।দেখতে সাদামাটা।কিন্তু তার মধ্যে যে এত কারিকুরি কে জানত।যে প্রবেশ দ্বারে এসে দাঁড়াবে তার ছায়া অভিনব উপায়ে পড়বে কুয়োর জলে।গাইডের ভাষায় লগভগ ঢাইশো সাল পহেলেকা সী সী টীভী ক্যামেরা।যার ছায়া জলে পড়ল সে জানেনা ।অথচ কয়েক কিলো মিটার দূর থেকে নবাবের সেনার সে নজরবন্দ।অবাঞ্ছিত।খতম।আমরা খতম না হয়ে পৌঁছেগেলাম সেই প্রান্তে যেখান থেকে দেখা গেল কারা প্রবেশ করছেন বাউলি দেখার জন্য।তিন চার তলা গভীর বাউলি।নীচে তাকিয়ে দেখি নো ওয়াটার। তাহলে ছায়া পড়ছে কোথায়?অবাক হয়ে জুনিয়র পী সী সরকারের ভাষায় বলতে ইচ্ছে হল এরেই কয় ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া। বড়া ইমামবাড়ায় শায়িত আছে আসিফ -উদ-দৌলা আর তার শার্গিদ ইন্জিনিয়ার কিফায়তউল্লা ইরানীর দেহ। বোধহয় যতবার এই স্থাপত্য দেখব ,তারা এসে সাথে সাথে চলবে।দর্শকের আচম্ভিত হওয়াই তাঁদের আসল পাওনা।আর দর্শকদের কাছে এ এক সুন্দর রমণীয় স্থান।প্রাচিন হয়েও অত্যাধুনিক।এ তো পরম পাওয়া। ওয়াচ টাওয়ার।ম্যুজিয়াম।ছোটা ইমামবাড়া।রানীবাগ দেখে ফেরার পথে সারা হল শপিং।লখনউয়া চিকন তো নিতেই হবে।নচেৎ লখনউ আসা বৃথা হোটেলে ফিরেই শুরু হল গোছগাছ।রাত বারোটায় বাঘ এক্সপ্রেস।যাব কাঠগোদাম।

864

1

মনোজ ভট্টাচার্য

পলিটিক্স কী !

পলিটিক্স কী ! ছোট্ট বিল্টু বাবাকে জিজ্ঞেস করলো – বাবা পলিটিক্স মানে কি ! বিল্টুর বাবা একটু চিন্তায় পরে গেল । তারপর ভেবে ভেবে ব্যাখ্যা করতে লাগলো – আমি হচ্ছি এই বাড়ীর মুখ্য রোজগেরে মানুষ । ধরে নাও আমি হচ্ছি ক্যাপিটালিস্ট মানে এই সংসারের মালিক । তোমার মা বাড়ির সব কিছু দেখা শুনা করে – তাহলে তাকে আমরা সরকার বলতে পারি । সে তোমাদের সব কিছু প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটায় । তাহলে তোমাদের আমরা জনগন বলেতে পারি । আর যে আমাদের কাজকর্ম করে – ন্যানি – তাকে আমরা শ্রমজীবী শ্রেনী বলতে পারি । - আর তোমার যে ছোট্ট ভাই আছে – তাকে আমরা ভবিষ্যৎ বলে ডাকতে পারি । - এখন এইগুলো নিয়ে চিন্তা করতে থাকো । দেখো তোমার মাথায় ঢোকে কিনা ! বাবার এই দীর্ঘ ভাষন শুনে বিল্টু - চিন্তা করতে করতে তখনকার মতো চলে গেল। ঐদিনই রাত্তিরে ছোটো ভায়ের কান্না শুনে বিল্টুর ঘুম ভেঙ্গে গেল । ভায়ের বিছানার কাছে গিয়ে দেখল – ভাইএর ডাইপার ভিজে গেছে । বিল্টু আর কি করে – মা-বাবার ঘরে গেল তাদের ডাকতে । - দেখে – মা বিছানায় একা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে । মাকে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছে করলো না তার । তাই গেল ন্যানির ঘরে - ন্যানিকে ডাকতে । - ন্যানির ঘর ভেতর থেকে বন্ধ । বিল্টু দরজার চাবির ছোট্ট ফাঁক দিয়ে দেখল – বাবা ন্যানির সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোচ্ছে । বিল্টু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল । নিজের যায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল । পরের দিন সকালে – ছোট্ট বিল্টু বাবাকে বলল – বাবা , আমার মনে হচ্ছে – পলিটিক্স সম্বন্ধে একটা ধারনা আমার হয়েছে । বাঃ ! – বাবা বেশ উৎসাহভরে বলল – তাহলে সেটা তোমার ভাষায় একটু বুঝিয়ে বল তো দেখি ! ছোট্ট বিল্টু বলতে আরম্ভ করলো – ঠিক আছে । যখন মালিকরা শ্রমজীবী মানুষের ওপর অত্যাচার করতে থাকে আর সরকার নাক ডাকিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে – সাধারন জনতা অবহেলিত হয় – তখন ভবিষ্যৎ গভীর পঙ্কে নিমজ্জমান হয়ে যায় ! (আমি ইচ্ছে করেই পলিটক্সের বাংলা রাজনীতি করিনি ! আর এটা একটু অর্থনৈতিক ছোঁয়াচে বক্তব্যও বটে) ! মনোজ

1892

2

ইরা চৌধুরী

ভ্রমণ

ভ্রমণের রোজনামচা:১২.০৯.২০১৫ আবার পথের হাতছানি।ঠিক হল নৈনিতাল।তার আসপাশ ।উঠল বাই কটক যাই।আসানসোলের শুভেচ্ছা ভ্রমণ আমাদের ফ্রেন্ড ফিলোসোফার গাইড।টিকিট হল।প্রতি যাত্রাই আমাদের রহস্যঘন।ভরা ভুলভ্রান্তি ।এবারইবা বাদ যায়ে কেন।আমাদের দলে যে সবচে খুঁতখুতে আর সাবধানি সেই তপনদার ভাগ্যে নাকি এই কান্ড!ফিমেল।আসি বছর।রিসার্ভেশন লিস্টের হেন যথেচ্ছাচার সওয়া চাড্ডিখানি কতা নয়।তপনদা বাক্যিহারা।বলতে চাইলেন অনেক কিছুই কিন্তু রাগের মাথায় উনি কি বললেন নিজেই বুঝলেননা।ট্যুর ম্যানেজার আবার ফ্রেশ টিকিট আনিয় এহেন ঘটনার টানলেন সমাপ্তি। ১৩.০৯.২০১৫ রাতএকটা।ঘন অন্ধকার চিড়ে আপ পঞ্জাব মেল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বেগে ধাবমান।ঘুম ঘুম চোখ।বাইরের আবছা দৃশ্য।সব শান্ত।পাটনা।ওরে একি!দলে দলে পোলাপান।তারা না মানে নিয়ম।না মানে কিছু।তারা চলেছে বেনারস।দিতে পরীক্ষা লোকপালের লেখপাল।কোন অসুবিধাই তাদের পারেনা করতে কুপোকাত।হাসি গল্প আর কথা।যদিও বোধহয় জানে ওদের সাফল্যের অনিশ্চিততা।কিন্তু এত বহতা পানি রমতা যোগি।ইতিমধ্যে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেওয়া গেল।ট্যুর ম্যানেজার সবার জন্য আনলে কেক মিষ্টি।ইত্যাদি ইত্যাদি।কিন্তু আমরা আছি অন্য অপেক্ষায়।বেনারসে আসবে আমার ছোট ভাই আর ভাবজ।কেতকী মানে আমার ভাইয়ের বৌ রান্নায় ওস্তাদোঁ কে ওস্তাদ।জানি ওরা এলে ভালমন্দ নিয়ে আসবে।যা ভেবেছি।তাই হল।গরম গরম লুচি ।সাথে আলু মটরশুঁটির দম।আর বেনারসের বরফি।বলতে ভুলে যাচ্ছি ফ্রাইড রাইসও ছিল।উফফফ কি স্বাদ।বুঝে পাইনা লোকে এত ভাল রাঁধে কি করে!রন্ধনে বৃহন্নলা না কি বলে সেই।মোদ্দা কথা খাওয়া জম্পেশ হল।তারপরে কি আর চোখ খুলে রাখা যায়।লাগাও ঘুম।চোখ খুলে দেখি গাড়ি প্রায় লখনউ এর কাছে হোটেল এ সেট হত হতেই এসে গেল প্যায়াজ পকোড়া আর চা।রাতের মেনু চিকেন রোটি। চলি এখন।পর বাত জারি রহেগা।রাত বাকি

887

1

মানব

জাঙ্গলিক

সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙ্গে গেল। কেন? কোনদিন তো এরকম হয়না, আজ কি তবে... হ্যাঁ খাতাটা সামনে টেনে নিল দেবেশ। রাত্রে ব্রাশ করা হয়েছিল। এখন আপাতত না করলেও চলবে। যা মাথায় ঘুরছে সেটা লিখে ফেলাই ভাল। - তোমার লাস্ট-সিন এর টাইম দেখতে দেখতে একটা বেজে যায়। রাত বাড়ে আরও গভীর হয় চাহিদা, আর নিবিড় করে পেতে চাওয়া হৃদয়ের তাগিদ কুলারটা শব্দ করে ওঠে হঠাৎ জোরে তারপর থেমে যায় চোখের পাতা খোলাই থাকে সারারাত, প্যাচপ্যাচে ঘামে নাকি তোর নামে? একলা থাকলে কি মানুষের কবিতা পায়? কবিতা পেলে কাউকে তো শোনানোও দরকার। কেউ একটু প্রশংসা করলে মনের ভার অল্প লাঘব হয়… ************************************************************************************ গল্পটা লিখতে লিখতে মানসিক ভাবে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ল সম্বিত। নিজের জীবন নিয়ে আর কতটুকুই বা গল্প টানা যায়। এর ওর জীবন থেকে আরও কিছু খুঁচিয়ে বের করে আনলে তবেই না গল্প। কাল মশারিটাকে খাটের তলায় ফেলে দিয়েই গল্পটাকে শেষ করবে ভেবেছিল। সেই মত গল্পটাকে পোষ্টও করে ফেলে নিজেদের বানানো একটা আড্ডার সাইটে। তারপর সাইটের পাঠকবর্গ দাবি করে গল্পটা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেবেশ আরও একটু সাহসী হলে ভালো হয়। দেবেশ সাহসী হবে? কিন্তু কিভাবে? সাহসী ছিলেন ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়-বাদল-দীনেশ। এখনকার দিনেও সবাই চায় এনাদের মত মানুষ জন্মান। তবে অবশ্যই নিজের বাড়িতে নয়, পাশের বাড়িতে হলেই ভাল হয়। হোয়াটস্যাপ টা চেক করল সম্বিত। মেসেজ এ ভর্তি। এই গ্রুপগুলোর জ্বালায় দরকারী মেসেজগুলো আর পড়া যায় না। না দেখে বিরক্তিভরে কিছু মেসেজ ডিলিট করল সে। তারপর একজায়গায় এসে থামতেই হল। মেঘনার মেসেজ। একটা কবিতার মত কিছু একটা লিখেছে মনে হচ্ছে, “বৃষ্টি হয়েছিল পথে সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে বাসা ভেঙ্গে গিয়েছিল, গাছগুলি পেয়েছিল হাওয়া সুপুরিডানার শীর্ষে রূপোলি জলের প্রভা ছিল আর ছিল অন্ধকারে – হৃদয়রহিত অন্ধকারে মাটিতে শোয়ানো নৌকো, বৃষ্টি জমে ছিল তার বুকে...” কাল রাত্রে গল্পটা পোষ্ট করার পর তার লিঙ্ক অবশ্য সে মেঘনাকে পাঠিয়েছিল। এটা কি তারই অন্তরাগ? - খুব সুন্দর রে। তোর লেখা নাকি? - ছাগল, এটা শঙ্খ ঘোষের লেখা। সকাল এরকম সাদর সম্ভাষণ পাবে ভাবেনি সে। ভেবেছিল ওই গল্পের দেবেশেরই মত কাল, পরশু, বা পরে কখনও ‘অনলাইন’ দেখানো সন্ধ্যায়; যখন বিরক্তির মাত্রা চাপিয়ে মাথাচাড়া দেবে কারুণ্য, কাঠিন্যকে ছাড়িয়ে যাবে পাশের বাড়ির শঙ্খধ্বনি, কিম্বা পড়াশুনার চাপে মাথা যখন বারো কেজির বাটখারা। জানিনা মেয়েটার হঠাৎ কি হল। এত তাড়াতাড়ি উত্তর তো গালে চড় মারলেও মানুষ দেয় না। - আমি মেঘনা আছি, মেঘনাই থাকব। তোর পারুল হতে যাব না। আজ কি ব্যাপার এত মেসেজ! সাধারণ দিনে তো এরকম হয়না। আচ্ছা, আজ তো তৃতীয় দিন। গত দুদিন ওর কোন মেসেজ আসেনি। নিতান্ত অপ্রস্তুতি কাটিয়ে একটা চলনসই জবাব দিয়ে ফেলল সম্বিত। - গল্পটার সাথে যদি নিজের কোন মিল পেয়ে থাকেন, তাহা কাকতালীয় জাঙ্গলিক বলিয়া জানিবেন। মেঘনাও কম যায় কিসে। অমনি তারও জবাব এসে গেল, - কবিতাটার সাথে আপনিও যদি নিজের কোন মিল পেয়ে থাকেন, তাহা নিছক শঙ্খঘোষীয় মাঙ্গলিক বলিয়া জানিবেন। - না রে। নিজের লাইফ খুঁচিয়ে গল্প বের করতে করতে পাবলিক তার খাই-ক্ষমতা হারাচ্ছে।(একটা একচোখা স্মাইলি)। এবার লোকজনের লাইফ খুঁচিয়ে গল্প বের করতে হবে। একদিকে এখানে কাস্টমার এখনও সন্তুষ্ট হচ্ছে না। রোজ নতুন নতুন দাবিদাওয়া করেই চলেছে। - তোর কাস্টমার? (পাঁচটা দন্তবিকশিত ও দুইচক্ষুনিঃসৃত আনন্দাশ্রুর সঙ্গমঘটিত স্মাইলি)। - হ্যাঁ, কেন? - ঠিক করে বল, কোম্পানির কাস্টমার। নাহলে পাবলিকে ভুল বুঝবে। - (মুচকি হাসির স্মাইলি) - (দুষ্টু হাসির স্মাইলি) - অ্যাই গল্পের নিচে পাবলিক কিসব কমেন্ট করছে। তুই নাকি সাহসী হবি! আমার চেয়েও বেশী? অবশ্য আমার কাছে সাহসী হবার ছোট্ট উপায় আছে, বাতলাবো? - কই দে দেখি, সাহসী হবার সহজ উপায়। -" শুন্যতাই জানো শুধু? শুন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানো না?" (সেই দন্তবিকশিত ও দুইচক্ষুনিঃসৃত আনন্দাশ্রুর সঙ্গমঘটিত স্মাইলি, এবার গোটা দশেক।) - ঢেউ? - হ্যাঁ ঢেউ। দেখি চল তুই কতটা সাহসী হতে পারিস! সামনাসামনি না হোক, গল্পে অন্তত আজ মেঘনা পারুল ঝড় ঢেউ সব এক। - চল তবে দেখা হবে, ঘুমের ঘরে আড্ডাঘরে। - বি.টি.ডব্লিউ., সাজেস্ট কর, কিভাবে সাহসী হওয়া যায়... - (একটা গোলাপি ঠোঁটের ইমোশান, সঙ্গে একটা একপাটি দাঁত বের করা মাথার খুলি ইমোশান)। - এক পাটি দাঁত রাত্রে ভাঙ্গে খাট। না থাক, বেশি গভীরে যাওয়া উচিত হবেনা। চেপে যাই। - বলিস কি? তুই খাট ভাঙবি? মাল খেয়েছিস নাকি? - মাল খাওয়া ধরতে পারলে হয়ত বেঁচে যেতাম এই চাপের দিনে। আচ্ছা আমি তো রোজ নিজের ই গল্প বলি। তোর কথা তো জিজ্ঞেসি করা হয়না। নিজের থেকে কিছু বলার ইচ্ছে করলে বল না। - নাথিং। - সাম্থিং ইন দ্যাট নাথিং? - নাহ। তারপর তুই ওটাকেই গল্প বানিয়ে ছেড়ে দে আর কি। - গুড আইডিয়া। - ব্যাড আইডিয়া। - আরও কিছু বল যাতে গল্পটাকে আর একটু বাড়ানো যায়। দেবেশের কি হবে? - তোর গল্প তুই জানিস। আমি এর মধ্যে নট মেল্টিং মাই নোজ। - তাহলে দেবেশ চুলোয় যাক, আমি এই চ্যাটবক্স টাকেই নাম ভাঁড়িয়ে গল্প করে ছেড়ে দিচ্ছি। ওই দেখ এক্ষুণি একজন কমেন্ট করেছে, দাবি করেছে যে গল্পটাকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতেই হয়, একটু অন্যভাবে, অর্থাৎ দেবেশ পারুলের গায়ে যেন বড় কোন আঁচড় না পড়ে। - আমি আমার চ্যাটবক্সের কপিরাইট দাবি করছি। - ওই প্লিজ... - ঠিক আছে। তাহলে গল্পটাকে আর বাড়াস না। একদিন দেখবি গল্পের ভিতর গল্প তার ভিতর আবার একটা... এইভাবে এমন গভীরে চলে যাবি যে আর বেরোতে পারবিনা। - হ্যাঁ, তারপর হরি পোদ্দার এর সিরিজ হয়ে যাবে (মুচকি হাসির ইমোশন) - হরি পোদ্দার? - আরে ওই হ্যারি...পটার না কি যেন। - হ্যারি পটার কে হরি পোদ্দার বানালে দাঁত ভেঙ্গে দেবো।

975

9

মনোজ ভট্টাচার্য

কোপাই নদীর জলে কথা ভেসে যায় রে - হাঁসুলি বাঁকের কথা বলবো কারে ভাই !

মঞ্চে অনেক গাছ ও – প্রস্তরবৎ তিনটে মূর্তি । এক বুড়ি মঞ্চের বা দিকে - ডানদিকে এক বুড়ো । আর মাঝখানে ঘোরাঘুরি করছে গম্ভীরা – সেও এক কুশলী ! কোপাই নদীর জলে - হাঁসুলি বাঁকের কথা কবে শেষ হয়ে গেছে – সবাই চলে গেছে শিল্পের নগরীতে । এক তো যুদ্ধ নিয়ে গেছে গ্রামের সব খাদ্য । সমস্ত আনাজ-শস্য ভীষণ আক্রা ! গ্রাম কে গ্রাম – উজাড় হয়ে যাচ্ছে – হামলিনের সেই বাশীওয়ালার সুরে ! সবাই চলেছে কাজের খোঁজে রেলের কাজে বা কোনও কারখানার কাজে ! বুড়ো শিবের অভিশাপ বন্যা হয়ে ধুয়ে দিচ্ছে হাঁসুলি বাঁকের গ্রাম ! শেষ হয়ে যাচ্ছে সামন্ততন্ত্র – জমিদারবাবুরা পর্যন্ত চলেছে শহরে ! তারাশঙ্করের হাঁসুলি বাঁকের কথা – একটা অমর সৃষ্টি ! বাংলার অর্থনীতির ইতিহাসে একটা খুব প্রয়োজনীয় সংযোজন ! – ঐ উপন্যাস থেকে নাটক করা কতটা শক্ত বা সহজ – তা বলা মুস্কিল ! কিন্তু কৌশিক কর – সেটা করেছে । মঞ্চের জন্যে কুশলীরা না কুশলীদের জন্যে মঞ্চ – আজকাল সেই কনসেপ্টটাই যেন পাল্টে যাচ্ছে ! সময় সময় মনে হচ্ছে – মঞ্চটাও যেন নাটকের এক শিল্পী ! – মঞ্চের বড় বড় গাছগুলো যখন ঝড়ে প্রচণ্ড দুলছে – সেই দুলুনিতে আমরাও ভুলে যাচ্ছি - আমরা মঞ্চের ভেতরে নেই ! নাটকের আঙ্গিক যে এত সুন্দর হয়ে যাচ্ছে ! শুধু কলাকাররা নয় – আঙ্গিকও একটা বড় ধরনের রোল ! – একটা নাটকে তো দেখেছিলাম – সমস্ত হলটা কুয়াশাচ্ছন্ন করে দিয়েছিল ! সে অন্য কথা ! শান্তিলাল ব্যানারজি ছাড়াও অন্যান্য শিল্পীরাও দারুণ অভিনয় করেছে ! সবার নাম মনে রাখা সম্ভব নয় – অথচ প্রত্যেকেই পুরো নাটকটাকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে । এমনকি গম্ভীরাও ! ওর উপস্থিতি আমি এই প্রথম দেখলাম ! নাটকের মতোই অরিজিনাল গানগুলোও অনেক পাল্টেছে ! গানের ব্যাপারে – আমার মনে হয় – পুরনো সুর বা গানের পুরো অংশ রাখলে ভালো লাগত ! গানগুলো তাদের অর্থগুলো নিয়ে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল তো ! – আর সেটের মধ্যে অন্তত একটা দুটো উইন্ডমিল বা কারখানার চিমনী রাখা যেতে পারত ! মনোজ

1034

6

Somen dey

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা ......

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা ...... ****************** কারণ আমি পথ চিনি কিনা আমি নিজেই জানি না ।তাই চান্স নেবার কি দরকার । কে করে অত সব ঝামেলা , খুঁজে বেড়াও মগজের অলি গলি , গ্রে সেল গুলো অযথা নাড়া চাড়া কর । আছে তো কাছে আইপ্যাড প্রো । সেই নেবে সব ভার । আমার মন খারাপ হলে সেই আমার মন ভালো করার গান বেছে দেবে । আমার একলা লাগলে সেই আমার সঙ্গে গল্প করবে । আমার জন্যে বেছে দেবে জানলার পর্দার রঙ , বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার ,দু দিনের ছুটিতে বেড়াতে যাবার ঠিক জায়গা । প্রেম পত্র লিখতে গিয়ে আটকে গেলে জুগিয়ে জুৎসই কোটেশন , গল্প লিখতে গিয়ে আটকে গেলে বলে দেবে দারুন একটা প্লট , কবিতার জন্যে জুগিয়ে দেবে সঠিক প্রতিশব্দ । বেড়াতে গেছি – আদ্দিস আবাবা , সিন সিনাটি অথবা দামাস্কাস । ওখানের লোকেদের কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না আমার ভাষা । আইপ্যাড প্রো দোভাষীর কাজ করে দেবে । অনেকদিন পরে বেড়াতে গেছি এক আত্নীয়ের বাড়ি । থালা সাজিয়ে খেতে দিয়েছে চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লা , ভীমনাগের সন্দেশ ।খেতে লোভ হচ্ছে , কিন্তু খাওয়া টা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিনা । আইপ্যাড প্রো এই মুহুর্তে রক্তে শর্করার পরিমান মেপে বলে দেবে খাওয়া চলবে কি না । বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে দু পেগের পর তৃতীয়টা আর খাওয়া চলবে কিনা , সেই মুহুর্তের রক্ত চাপ মাপ করে নিয়ে আইপ্যাড প্রোই বলে দেবে । যদি হটাৎ ইচ্ছে হয় দেখতে , নিজেকে দাড়ি গোঁফ রাখলে (অথবা কামিয়ে ফেললে ) কেমন লাগবে ,অথবা পাঁচ কিলো ওজন কমালে , চুলে লাল রঙ করে নিলে কেমন লাগবে দেখিয়ে দেবে সেই আইপ্যাড প্রো । কিম্বা যদি দেখতে ইচ্ছে হয় , সাহারায় বৃষ্টি পড়লে , বা জেকোকাবাদে বরফ পড়লে কেমন লাগে । কিম্বা যদি ইচ্ছে হয় জ্যোতি বসু কে হাসলে বা জনি ওয়াকার কে কাঁদলে কেমন দেখতে লাগতো , আইপ্যাড প্রো ই সে রকম ছবি তৈরি করে দেখিয়ে দেবে । ইলেক্ট্রিকের বকেয়া বিল , ব্যাঙ্কের না দেওয়া ইন্সটলমেন্ট , কোন ওষুধ কখন খেতে হবে - সব মনে করিয়ে দেবে ।এমন কি শরীর বেগড়বাঁই করলে সরাসরি ডাক্তার কে খবর দিয়ে দেবে আইপ্যাড প্রো । আইপ্যাডের পরের এডিশন টা নিশ্চয় আরো এক ধাপ যাবে ।হয়তো সেই যন্ত্রটি উলটো দিকে বসা মানুষটির মনের কথা বুঝে নেবে , বস কে খুশি করার দাওয়াই বাতলে দেবে। কোনটা মিছে কথা কোনটা সত্যি ঠিক ধরে ফেলবে । স্টিভ জোভ না থেকেও স্বর্গ থেকে নেড়ে যাচ্ছেন কলকাঠি । তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন মনুষ্য জাতি তার উদ্দেশে একদিন গান গেয়ে বলবে - তোমার উপর করিনু নির্ভর তোমা বই কারেও জানি না আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা আমি যে পথ চিনি না ......। সে স্বপ্ন সত্যি হল বলে । সেই সঙ্গে সত্যি হবে নাতো বুড়ো আইস্টাইনের দুঃস্বপ্ন ? – ‘ I fear the day that technology surpass our human interaction . The world will have a generation of idiot.’

1376

4